দ্রোণপর্ব্ব
পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ
| নারায়ণাস্ত্রমোক্ষ পর্ব্বাধ্যায় |
নারায়ণাস্ত্রমোক্ষ পর্ব্বাধ্যায়।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! এইরূপে মহাবীর দ্রোণ নিহত ও বহুসংখ্য বীর নিপতিত হইলে, কৌরবগণ শস্ত্রনিপীড়িত ও শোকে একান্ত কাতর হইলেন এবং শত্রুগণের অভ্যুদয় দর্শনে দীনবদন ও অশ্রুপূর্ণলোচন হইয়া বারংবার বিকম্পিত হইতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের চেতনা ও উৎসাহ বিনষ্ট হইয়া গেল এবং মোহাবেশ প্রভাবে তেজঃও প্রতিহত হইল। তখন তাঁহারা হিরণ্যাক্ষ-বিনাশ-কাতর দৈত্যগণের ন্যায় ধূলিধূসরিত-কলেবর হইয়া অশ্রুকণ্ঠে আর্ত্তস্বর পরিত্যাগপূর্ব্বক দশদিক্ নিরীক্ষণ করত আপনার আত্মজ দুর্য্যোধনকে পরিবেষ্টন করিলেন। রাজা দুর্য্যোধন ক্ষুদ্র মৃগসমূহের ন্যায় নিতান্ত ভীত সেই কৌরবগণ-কর্তৃক পরিবৃত হইয়া আর তথায় অবস্থান করিতে সমর্থ হইলেন না। তিনি সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়নে সমুদ্যত হইলে, আপনার পক্ষীয় যোধগণ দিবাকরের করজালে সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়াই যেন ক্ষুৎপিপাসায় একান্ত কাতর ও নিতান্ত বিমনায়মান হইলেন। কৌরবগণ সূর্য্যের পতনের ন্যায়, সমুদ্রশোষণের ন্যায়, সুমেরু পরিবর্তনের ন্যায় ও দেবরাজ ইন্দ্রের পরাজয়ের ন্যায় দ্রোণাচার্য্যের নিধন নিরীক্ষণ করিয়া ভীতমনে পলায়ন করিতে লাগিলেন। গান্ধাররাজ শকুনি ভয়বিহ্বল রথিগণের সহিত এবং সূতপুত্র কর্ণ পলায়মান সেনাগণের সহিত ভীত হইয়া মহাবেগে প্রস্থান করিতে আরম্ভ করিলেন। মদ্ররাজ শল্য রথ, অশ্ব ও মাতঙ্গকুল সঙ্কুল বহুল সৈন্য-সমভিব্যাহারে ভয়ে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করত পলায়ন করিতে লাগিলেন। কৃপাচার্য্য হতভূয়িষ্ঠ' হস্তী ও পদাতিগণে পরিবৃত্ত হইয়া বারংবার "কি কষ্ট! কি কষ্ট!” বলিতে বলিতে রণস্থল পরিত্যাগপূর্ব্বক গমন করিলেন। মহাবীর কৃতবর্মা বহুসংখ্য বেগগামী অশ্ব এবং হতাবশিষ্ট কলিঙ্গ, অরট্ট, বাহ্লীক ও ভোজসৈন্যদিগের সহিত, মহাবীর উলুক পদাতিগণের সহিত এবং মহাবল পরাক্রান্ত প্রিয়দর্শন দুঃশাসন গজসৈন্যের সহিত সাতিশয় উদ্বিগ্ন হইয়া ধাবমান হইলেন।
বৃষসেন অযুত রথ ও তিন সহস্র হস্তী, মহারাজ দুর্য্যোধন অসংখ্য গজ, অশ্ব ও পদাতি এবং সুশর্মা হতাবশিষ্ট সংশপ্তক-গণকে লইয়া অনতিবিলম্বে প্রস্থান করিলেন।
হে মহারাজ। এইরূপে সকলেই দ্রোণাচার্য্যকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া হস্তী, অশ্ব ও রথে আরোহণপূর্ব্বক চতুৰ্দ্দিকে ধাবমান হইলেন। কৌরবগণমধ্যে কেহ কেহ পিতা, কেহ কেহ ভ্রাতা ও মাতুল, কেহ কেহ পুত্র ও বয়স্য, কেহ কেহ সম্বন্ধী এবং কেহ কেহ সৈন্যগণ ও স্বস্রীয়গণকে পলায়নে ত্বরান্বিত করত মহাবেগে গমন করিতে লাগিলেন। উঁহাদের কেশকলাপ বিকীর্ণ এবং তেজঃ ও উৎসাহ এককালে বিনষ্ট হইয়া গেল। উহারা কৌরবসৈন্য নিঃশেষিত হইয়াছে বিবেচনা করত নিতান্ত ভীত হইয়া দুই জনে এক দিকে গমন করিতে সমর্থ হইলেন না। কতকগুলি বীর কবচ পরিত্যাগপূর্ব্বক দ্রুতপদসঞ্চারে গমন করিতে লাগিল। সৈনিক পুরুষেরা পরস্পর পরস্পরকে গমনে নিষেধ করিল; কিন্তু কেহই রণস্থলে অবস্থান করিতে সমর্থ হইল না। যোধগণ সুসজ্জিত রথসকল পরিত্যাগ করিয়া অবিলম্বে অশ্বে আরোহণ ও পদদ্বারা সঞ্চালন করিতে লাগিলেন।
এইরূপে সৈন্যগণ ভীতমনে ধাবমান হইলে একমাত্র দ্রোণাত্মজ অশ্বত্থামা স্রোতের প্রতিকূলগামী গ্রাহের ন্যায় শত্রু-গণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন প্রভদ্রক, পাঞ্চাল, চেদি ও কেকয়গণ এবং শিখণ্ডী প্রভৃতি বীরবর্গের সহিত তাঁহার ঘোরতর যুদ্ধ উপস্থিত হইল। তিনি পাণ্ডবগণের বহুবিধ সেনা বিনষ্ট করিয়া অতিকষ্টে সেই সঙ্কট হইতে বিমুক্ত হইলেন।
তৎপরে তিনি সৈন্যগণকে পলায়ন করিতে দেখিয়া রাজা দুর্য্যোধন-সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে মহারাজ! এই সমস্ত সৈন্য কি নিমিত্ত ভীতমনে ধাবমান হইতেছে? তুমি বা কেন ইহাদিগকে নিবারণ করিতেছ না? আর আমিও তোমাকে পূর্ব্ববৎ প্রকৃতিস্থ দেখিতেছি না। এক্ষণে বল, কি নিমিত্ত তোমার সৈন্যগণ এইরূপ অবস্থাপন্ন হইয়াছে? কর্ণ প্রভৃতি মহারথগণ আর যুদ্ধে অবস্থান করিতেছেন না। সৈন্যগণ অন্য কোন সংগ্রামে এইরূপ ধাবমান হয় নাই। এক্ষণে সৈন্যগণের কি কোন অনিষ্ট ঘটনা হইয়াছে?
অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন দ্রোণপুত্রের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে তাঁহার পিতৃবিনাশ রূপ ঘোরতর অপ্রিয় সংবাদ প্রদান করিতে সমর্থ হইলেন না। তিনি রথারূঢ় অশ্বত্থামাকে নিরীক্ষণ-পূর্ব্বক বাষ্পাকুললোচনে ভগ্ন নৌকার ন্যায় শোকসাগরে নিমগ্ন হইয়া লজ্জাবনত মুখে কৃপাচার্য্যকে কহিলেন, হে শারদ্বত। সৈন্যগণ যে নিমিত্ত ধাবমান হইতেছে, তুমি অগ্রে গুরুপুত্রকে তাহা বিজ্ঞাপিত কর। তখন কৃপাচার্য্য অপ্রিয় সংবাদ প্রদান করিতে হইবে বলিয়া বারংবার সাতিশয় দুঃখ অনুভবপূর্ব্বক পরিশেষে অশ্বত্থামার সমক্ষে দ্রোণাচার্য্যের নিধন-বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিতে সমুদ্যত হইয়া কহিতে লাগিলেন।
হে আচার্য্যতনয়! আমরা অদ্বিতীয় রথী মহাবীর দ্রোণকে অগ্রসর করিয়া কেবল পাঞ্চালগণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া-ছিলাম। ঐ সময় কৌরব ও সোমকগণ মিলিত হইয়া পরস্পরের প্রতি তর্জন-গর্জন করত পরস্পরকে বিনাশ করিতে লাগিলেন। তখন তোমার পিতা কৌরবপক্ষীয় বহুসংখ্যক সৈন্যের নিধন দর্শনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ব্রাহ্ম-অস্ত্র আবিষ্কৃত করত ভল্লাস্ত্রে বহুসংখ্যক সৈন্যের প্রাণ সংহার করিলেন। পাঞ্চাল, কৈকেয়, মৎস্য ও পাণ্ডবসৈন্যগণ কালপ্রেরিত হইয়া দ্রোণ-সন্নিধানে আগমনপূর্ব্বক বিনষ্ট হইতে লাগিল। সেই পঞ্চাশীতি-বর্ষ বয়স্ক আকর্ণ পলিত মহারথ দ্রোণ ব্রহ্মাস্ত্রপ্রভাবে সহস্র মনুষ্য ও দ্বিসহস্র হস্তী বিনাশ করিয়া বৃদ্ধাবস্থাতেও ষোড়শ-বর্ষীয়ের ন্যায় রণস্থলে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে বিপক্ষ সৈন্যগণ একান্ত ক্লিষ্ট ও ভূপালগণ বিনষ্ট হইলে পাঞ্চালেরা নিতান্ত ক্রোধাবিষ্ট ও সমরে পরাজুখ হইল। তখন অরাতিনিপাতন দ্রোণাচার্য্য দিব্যাস্ত্র বিস্তারপূর্ব্বক পাণ্ডবদিগের মধ্যে মধ্যাহ্নকালীন প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডের ন্যায় নিতান্ত দুর্নিরীক্ষ্য হইয়া উঠিলেন। পাঞ্চালগণ দ্রোণশরে একান্ত সন্তপ্ত, হতবীর্য্য ও উৎসাহশূন্য হইয়া বিচেতন হইয়া রহিল।
বিজয়াভিলাষী বাসুদেব তদ্দর্শনে পাণ্ডবগণকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, হে পাণ্ডবগণ! অন্যের কথা দূরে থাকুক, সাক্ষাৎ দেবরাজ ইন্দ্রও দ্রোণাচার্য্যকে পরাজয় করিতে সমর্থ নহেন। অতএব তোমরা ধৰ্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক বিজয়লাভ কর। দ্রোণাচার্য্য যেন তোমাদিগকে সমূলে উন্মুলন করিতে সমর্থ না হয়েন। আমার বোধ হইতেছে, ইনি অশ্বত্থামা বিনষ্ট হইয়াছেন, জানিতে পারিলে আর যুদ্ধ করিবেন না। অতএব কোন ব্যক্তি মিথ্যাবাক্য প্রয়োগপূর্ব্বক অশ্বত্থামা নিহত হইয়াছে, এই কথা আচার্য্যের কর্ণগোচর করুক। হে দ্রোণনন্দন! মহাত্মা ধনঞ্জয় কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর কোনক্রমেই তাহাতে অনুমোদন করিলেন না। অন্যান্য ব্যক্তি উহাতে সম্মত হইলেন। ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির অতি কষ্টে কৃষ্ণের বাক্যে অঙ্গীকার করিলেন। অনন্তর ভীমসেন লজ্জাবনত বদনে দ্রোণ-সন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে তোমার মিথ্যা নিধন-বৃত্তান্ত কহিল; কিন্তু তোমার পিতা তাহার বাক্য মিথ্যা জ্ঞান করিয়া ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে উহা সত্য কি মিথ্যা জিজ্ঞাসা করিলেন। তখন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বিজয় বাসনা ও মিথ্যাভয়ে যুগপৎ অভিভূত হইলেন। তিনি পরিশেষে মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার এক অচলসদৃশ কলেবর অশ্বত্থামা নামে করিবরকে ভীমশরে নিহত দেখিয়া দ্রোণ-সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক মুক্তকণ্ঠে কহিলেন, হে আচার্য্য! আপনি যাঁহার নিমিত্ত অস্ত্র ধারণ করিতেছেন, আপনার সেই প্রিয়তম পুত্র অশ্বত্থামা নিহত হইয়া অরণ্যশায়ী সিংহশিশুর ন্যায় ভূমিশয্যায় শয়ান রহিয়াছেন। হে আচার্য্যকুমার! ধর্মরাজ মিথ্যাবাক্যের দোষ সম্যক্ অবগত ছিলেন, এই নিমিত্ত তিনি মুক্তকণ্ঠে অশ্বত্থামা নিহত হইয়াছে বলিয়া অস্পষ্টাক্ষরে কুঞ্জর শব্দ উচ্চারণ করিলেন। তখন তোমার পিতা তোমাকে নিহত অবধারণ করিয়া শোকসন্তপ্ত মনে দিব্যাস্ত্রসমুদায় উপসংহার করত আর পূর্ব্বর্বৎ সংগ্রাম করিলেন না। ঐ সময় নিতান্ত ক্রুরকর্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁহাকে একান্ত উদ্বিগ্ন ও শোকসন্তাপে অভিভূত দেখিয়া তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। লোকতত্ত্ববিশারদ মহাবীর দ্রোণ তাঁহাকে আপনার মৃত্যুস্বরূপ অবলোকন করিয়া দিব্যাস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রায়ো-পবেশন করিলেন। তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন বামহস্তে তাঁহার কেশ গ্রহণ করিয়া শিরশ্ছেদনে সমুদ্যত হইল। তদ্দর্শনে সকলেই চতুৰ্দ্দিক্ হইতে "সংহার করিও না, সংহার করিও না” বলিয়া দ্রুপদ-তনয়কে নিবারণ করিতে লাগিল। মহাবীর অর্জুনও সত্বর রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া বাহুদ্বয় উদ্যত করত, হে ধৃষ্টদ্যুম্ন! তুমি আচার্য্যকে বধ করিও না, উঁহাকে জীবিতাবস্থায় আনয়ন কর, বারংবার এই কথা বলিয়া তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন; কিন্তু নৃশংস ধৃষ্টদ্যুম্ন কৌরবগণ ও অর্জুনের বাক্যে কর্ণপাত না করিয়া তোমার পিতার শিরশ্ছেদন করিল। হে বৎস! এই নিমিত্তই সৈন্যগণ নিতান্ত ভীত হইয়া ধাবমান হইতেছে এবং আমরাও এককালে উৎসাহশূন্য হইয়াছি।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর অশ্বত্থামা পিতার নিধন-বার্তা শ্রবণ করিয়া পদাহত ভুজঙ্গের ন্যায় ও ইন্ধন সংযুক্ত বহ্নির ন্যায় রোষানলে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন এবং করে কর নিষ্পেষণ দশনে দশন পীড়ন করত আরক্তলোচন হইয়া ভুজঙ্গের ন্যায় দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! যে মহাবীর অশ্বত্থামার নিকট মানব, বারুণ, আগ্নেয়, ঐন্দ্র, নারায়ণ ও ব্রাহ্ম অস্ত্র প্রভৃতি সমুদায় অস্ত্র নিয়ত বিদ্যমান রহিয়াছে, সেই মহাবীর অশ্বত্থামা, দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন অধর্মযুদ্ধে বৃদ্ধ পিতাকে নিধন করিয়াছে শ্রবণ করিয়া কি কহিলেন? মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য পরশুরামের নিকট ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করিয়া পুত্রের সদ্গুণাভিলাষে তাঁহাকে দিব্যাস্ত্র প্রদান করিয়াছিলেন। ফলতঃ এই ভূমণ্ডলে মানবগণ পুত্র ভিন্ন আর কাহাকেও আপনার অপেক্ষা গুণসম্পন্ন করিতে কামনা করে না। মনস্বী আচার্য্যগণেরও এইরূপ স্বভাব যে তাঁহারা পুত্র বা অনুগত শিষ্যকেই আপনাদের রহস্যসকল প্রদান করিয়া থাকেন। হে সঞ্জয়! দ্রোণপুত্র দ্রোণের শিষ্য হইয়া তাঁহার নিকট বিশেষরূপে সমস্ত দিব্যাস্ত্র লাভ করিয়াছেন। ঐ মহাবীর যুদ্ধে দ্রোণের দ্বিতীয় এবং তিনি অস্ত্রে পরশুরাম, যুদ্ধে পুরন্দর, বীর্য্যে কার্ত্তবীর্য্য, বুদ্ধিতে বৃহস্পতি, ধৈর্য্যে ভূধর, তেজে অগ্নি, গাম্ভীর্য্যে সমুদ্র ও ক্রোধে সর্পবিষসদৃশ বলিয়া কীর্ত্তিত হইয়া থাকেন। সেই মহাবীর সমরে অপরিশ্রান্ত, ধনুর্ব্বেদবিশারদ ও একজন অদ্বিতীয় মহারথ; তিনি ভীষণ সমরাঙ্গনে অব্যথিতচিত্তে বেগগামী অনিল ও ক্রোধাবিষ্ট অন্তকের ন্যায় ভ্রমণ করিয়া থাকেন। সেই ধনুর্দ্ধর শরনিক্ষেপে প্রবৃত্ত হইলে বসুন্ধরা ব্যথিত হইয়া উঠেন। তিনি স্বয়ং বেদস্নাত', ব্রতস্নাত', ধনুর্ব্বেদবিশারদ ও দাশরথির ন্যায় গম্ভীর প্রকৃতি, এক্ষণে সেই সত্যপরাক্রম মহাবীর অশ্বত্থামা দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন অধৰ্ম্মযুদ্ধে পিতাকে বিনাশ করিয়াছে শ্রবণ করিয়া কি কহিলেন? হে সঞ্জয়! ধৃষ্টদ্যুম্ন যেমন দ্রোণের মৃত্যুস্বরূপ অশ্বত্থামাও সেইরূপ ধৃষ্টদ্যুম্নের অন্তকস্বরূপ সৃষ্ট হইয়াছেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! পুরুষপ্রধান অশ্বত্থামা, দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন ছলপূর্ব্বক পিতাকে নিহত করিয়াছে, শ্রবণ করিয়া বাষ্পাকুলনেত্রে ও ক্রোধে নিতান্ত অধীর হইলেন। তাঁহার কলেবর জীবক্ষয়-প্রবৃত্ত প্রলয়কালীন অন্তকের ন্যায় ক্রোধে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। তখন তিনি বারংবার অশ্রুপূর্ণ নেত্রদ্বয় পরিমার্জিত করিয়া উষ্ণ নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে রাজন! পিতা অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ করিলে নীচাশয় পাণ্ডবগণ যেরূপে তাঁহাকে নিহত করিয়াছে এবং ধর্মধ্বজধারী যুধিষ্ঠিরও যেরূপে অতি অন্যায় ও নিষ্ঠুর কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছেন, তাহা শ্রবণ করিলাম। যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেই জয় কিংবা পরাজয় হইয়া থাকে। সংগ্রামে বিনাশই প্রশংসনীয়। ব্রাহ্মণেরা কহিয়া থাকেন যে, ন্যায় যুদ্ধে বিনষ্ট হওয়া দুঃখাবহ নহে। আমার পিতা ন্যায় যুদ্ধে কলেবর পরিত্যাগ করিয়া বীরলোকে গমন করিয়াছেন। অতএব তাঁহার নিমিত্ত শোক করা কর্তব্য নহে; কিন্তু তিনি যে ধৰ্ম্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াও সমস্ত সৈন্যসমক্ষে কেশাকর্ষণদুঃখ অনুভব করিয়াছেন, তাহাতেই আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। আমি জীবিত থাকিতে যখন আমার পিতা এইরূপ দুরবস্থাগ্রস্ত হইলেন, তখন অন্য লোকে কি নিমিত্ত পুত্রকামনা করিবে? লোকে কাম, ক্রোধ, অজ্ঞানতা, দ্বেষ ও বালকত্ব-নিবন্ধনই অধর্মাচরণ ও অন্যকে পরাভব করিয়া থাকে। দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন আমাকে বিশেষ না জানিয়াই এই দারুণ অধর্ম কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছে। এক্ষণে সেই দুরাত্মা অবশ্যই স্বকার্য্যের ফল অনুভব করিবে। আর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ছলপূর্ব্বক আচার্য্যকে অস্ত্র পরিত্যাগ করাইয়াছেন। আজি বসুন্ধরা অবশ্যই তাঁহার শোণিত পান করিবেন। হে রাজন! আমি সত্য ও ইষ্টাপূর্ত্তদ্বারা শপথ করিয়া কহিতেছি যে, সমস্ত পাঞ্চালগণকে বিনষ্ট না করিয়া কখনই জীবন ধারণ করিব না। আজি আমি মৃদু বা দারুণ যে কোন রূপে হইক না কেন, সমরে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সমস্ত পাঞ্চালগণকে বিনাশ করিয়া শান্তি লাভ করিব। মানবগণ পুত্রদ্বারা ইহকাল ও পরকাল মহাভয় হইতে পরিত্রাণ পাইবে বলিয়াই পুত্রকামনা করিয়া থাকে; কিন্তু আমি আমার পিতার শৈলপ্রতিম পুত্র; বিশেষত শিষ্য জীবিত থাকিতে তিনি বন্ধুহীনের ন্যায় সেই দুরবস্থা প্রাপ্ত হইলেন। অতএব আমার বাহুবল, পরাক্রম ও দিব্যাস্ত্রসকলে ধিক্, যাহা হউক, এক্ষণে আমি যাহাতে পরলোকগত পিতার ঋণ হইতে মুক্ত হইতে পারি, অবশ্যই তাহার অনুষ্ঠান করিব।
হে ভরতসত্তম। স্বমুখে স্বীয় গুণ কীর্ত্তন করা কদাপি সাধু জনের কর্ত্তব্য নহে; কিন্তু আমি পিতৃবিনাশ সহ্য করিতে না পারিয়াই আপনার পৌরুষ প্রকাশ করিতেছি। আজি জনাৰ্দ্দনসহায় পাণ্ডবগণ আমার পরাক্রম দর্শন করুক। আমি যুগান্তকালের ন্যায় সমস্ত সৈন্য বিমৰ্দ্দন করিয়া বিচরণ করিব। কি দেব, কি গন্ধর্ব্ব, কি অসুর, কি উরগ, কি রাক্ষস, কেহই আজি আমাকে সমরে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে না। এই ভূমণ্ডলে আমার ও অর্জুনের সমান অস্ত্রবিশারদ আর কেহই নাই। আজি আমি প্রজ্বলিত ময়ূখমালা' মধ্যবর্তী মার্তণ্ডের ন্যায় তেজঃসম্পন্ন সৈন্যগণের মধ্যগত হইয়া দৈবাস্ত্র প্রয়োগ করিব। আজি আমার শরজাল তৃণীর হইতে বহির্গত হইয়া পাণ্ডব-গণকে বিদলিত করত আমার পরাক্রম প্রকাশ করিবে। আজি কৌরবপক্ষীয়েরা দেখিতে পাইবেন যে, দিক্সকল আমার জলধরসদৃশ শরধারায় সমাচ্ছন্ন হইয়াছে। মহাবায়ু যেমন বৃক্ষসমুদায় পাতিত করে, তদ্রূপ আমি শরজালপ্রভাবে শত্রু গণকে নিপাতিত করিব।
হে মহারাজ! আমার নিকট নিক্ষেপ ও উপসংহার' মন্ত্র সমবেত যে অস্ত্র আছে, কি অর্জুন, কি কৃষ্ণ, কি ভীমসেন, কি সহদেব, কি রাজা যুধিষ্ঠির, কি দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্ন, কি শিখণ্ডী, কি সাত্যকি, কেহই সেই অস্ত্র অবগত নহে। হে মহারাজ! পূর্ব্বে একদা নারায়ণ ব্রাহ্মহ্মণ বেশ ধারণপূর্ব্বক পিতার নিকট উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহাকে যথাবিধি প্রণামপূর্ব্বক উপহার প্রদান করিয়াছিলেন। ভগবান নারায়ণ সেই উপহার স্বীকার করিয়া তাঁহাকে বর প্রদান করিতে উৎসুক হইলেন। তখন আমার পিতা তাঁহার নিকট হইতে নারায়ণাস্ত্র প্রার্থনা করিলে তিনি তাহা প্রদান করত কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! রণস্থলে তোমার তুল্য যোদ্ধা আর কেহই হইবে না; কিন্তু তুমি সহসা এ অস্ত্র প্রয়োগ করিও না। ইহা শত্রু বিনাশ সাধন না করিয়া কখনই নিবৃত্ত হয় না। এই অস্ত্র সকলকেই বিনাশ করিতে পারে, ইহা অবধ্যের বধসাধনেও পরাজুখ হয় না; অতএব ইহা সহসা প্রয়োগ করা কর্তব্য নহে। সমরাঙ্গনে রথ ও অস্ত্র পরিত্যাগে অভিলাষী ও শরণাগত শত্রুগণের প্রতি এই অস্ত্র নিক্ষেপ করা উচিত নহে। যে ব্যক্তি অস্ত্রদ্বারা অবধ্যকে পীড়িত করে, সে স্বয়ং ইহা দ্বারা নিপীড়িত হয়। হে মহারাজ! ভগবান্ নারায়ণ এই বলিয়া সেই মহাস্ত্র প্রদান করিলে পিতা উহা গ্রহণ করিলেন। তখন সেই মহাত্মা আমাকে কহিলেন, হে অশ্বত্থামন্! তুমি এই অস্ত্রপ্রভাবে তেজঃপুঞ্জ-কলেবর হইয়া নানাবিধ দিব্য অস্ত্র বর্ষণ করিতে সমর্থ হইবে। এই বলিয়া ভগবান্ নারায়ণ স্বর্গলোকে গমন করিলেন।
হে রাজন! আমি এইরূপে নারায়ণের নিকট সেই অস্ত্র লাভ করিয়াছি; এক্ষণে তদ্দ্বারা দানববিদ্রাবী শচীপতির ন্যায় আমি পাণ্ডব, পাঞ্চাল, মৎস্য ও কেকয়গণকে বিদ্রাবিত করিব। আমি যখন যেরূপ বাসনা করিব, আমার শরনিকর তৎক্ষণাৎ সেইরূপ হইয়া শত্রুমণ্ডল নিপতিত হইবে। আমি রণস্থলে অবস্থানপূর্ব্বক অনাকুলিতচিত্তে অয়োমুখ শরনিকর ও বিবিধ পরশু নিক্ষেপ করিয়া মহারথগণকে বিদ্রাবিত-ও অতি ভীষণ নারায়ণাস্ত্রদ্বারা পাণ্ডবগণকে পীড়িত করিয়া অরাতিগণকে বিনষ্ট করিব। আজি মিত্র, ব্রাহ্মণ ও গুরুদ্রোহকারী পাষণ্ড, পাঞ্চালাপসদ ধৃষ্টদ্যুম্ন কখনই আমার হস্তে পরিত্রাণ পাইবে না।
হে কুরুরাজ! মহাবীর দ্রোণতনয় এই কথা কহিলে কৌরবসৈন্যগণ প্রতিনিবৃত্ত হইয়া হৃষ্টচিত্তে শঙ্খ, ভেরী, ডিণ্ডিম প্রভৃতি বাদিত্র বাদন করিতে লাগিল। ভূতল অশ্বক্ষুর ও রথচক্রে পরিপীড়িত হইয়া শব্দায়মান হইল। সেই তুমুল শব্দে ভূমণ্ডল, দিত্মণ্ডল ও আকাশমণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল। তখন মহারথ পাণ্ডবগণ সেই মেঘগম্ভীর তুমুল শব্দ শ্রবণে সকলে সম্মিলিত হইয়া মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন। এদিকে আচার্য্যপুত্র অশ্বত্থামাও ঐ সময়ে সলিলস্পর্শপূর্ব্বক নারায়ণাস্ত্র প্রাদুর্ভূত করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে নারায়ণাস্ত্র প্রাদুর্ভূত হইলে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত, বৃষ্টিপাত ও মহাবেগে বায়ুসঞ্চার হইতে লাগিল। ঐ সময় ধরাতল কম্পিত, সাগর-সকল সংক্ষুব্ধ, নদীসকল বিপরীত দিকে প্রবাহিত, গিরিশৃঙ্গ-সমুদায় বিদীর্ণ, দিত্মণ্ডল তিমিরাচ্ছন্ন, দিনকর মলিন, মাংসলোলুপ প্রাণিগণ প্রহৃষ্ট চিত্ত, সমাগত দেব, দানব ও গন্ধর্ব্বগণ শঙ্কিত ও কুরঙ্গগণ পাণ্ডবগণের দক্ষিণ পার্শ্ব দিয়া ধাবমান হইল। সকলেই সেই তুমুল কাণ্ড দর্শনে পরস্পরকে তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল এবং ভূপতিগণ অশ্বত্থামার সেই ভীষণাস্ত্র সন্দর্শনে ভীত ও ব্যথিত হইয়া উঠিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! শোকসন্তপ্ত দ্রোণনন্দন পিতৃবধ অসহ্য বোধ করিয়া সৈন্যগণকে নিবর্তিত করিলে পাণ্ডবগণ কৌরবসৈন্যগণকে সমাগত দেখিয়া ধৃষ্টদ্যুম্নের রক্ষার্থ কিরূপ পরামর্শ নির্দ্ধারিত করিলেন, তাহা আমার নিকট কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! যুধিষ্ঠির প্রথমতঃ আপনার দুর্য্যোধন প্রভৃতি পুত্রগণকে পলায়ন করিতে দেখিয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে পুনরায় যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছে শুনিয়া অর্জুনকে কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! দেবরাজ বজ্র ধারণপূর্ব্বক যেরূপ বৃত্রাসুরের প্রাণসংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণকে নিপাতিত করিলে কৌরবগণ আত্মপরিত্রাণার্থ জয়াশা পরিত্যাগ-পূর্ব্বক পলায়ন করিয়াছিলেন। বিপক্ষ পক্ষীয় কিয়ৎসংখ্যক ভূপতি বিচেতন হইয়া হতপার্ফি, হতসারথি, পতাকা, ধ্বজ ও ছত্রবিহীন, ভগ্নকূবর, ভগ্ননীড় রথে আরোহণ, কেহ কেহ ভীত হইয়া স্বয়ং পদাঘাতে রথাশ্ব পরিচালন, কেহ কেহ ভয়াতুর হইয়া ভগ্নাক্ষ, ভগ্নযুগ ও ভগ্নচক্র রথে আরোহণ, কেহ কেহ অশ্বপৃষ্ঠে অর্দ্ধস্খলিত আসনে উপবেশনপূর্ব্বক পলায়ন করিয়াছিল। উহাদের মধ্যে অনেকে নারাচদ্বারা গজস্কন্ধের সহিত গ্রথিত হইয়া মাতঙ্গগণকর্তৃক অপনীত, অনেকে অস্ত্র ও কবচ-বিহীন হইয়া বাহন হইতে ক্ষিতিতলে নিপতিত ও হস্তী, অশ্ব, রথচক্রদ্বারা নিষ্পেষিত এবং অনেকে মোহবশতঃ পরস্পরকে অবগত না হইয়া, হা ভ্রাতঃ! হা পুত্র! বলিয়া চীৎকার করত ভয়ে পলায়ন-পরায়ণ হইয়াছে। আর অনেকে দৃঢ় বিক্ষত পিতা, পুত্র, ভ্রাতা ও মিত্রদিগকে উত্তোলনপূর্ব্বক বৰ্ম্মনির্মুক্ত করিয়া তাহাদের গাত্রে জলসেক করিয়াছে। হে ধনঞ্জয়! দ্রোণাচার্য্য নিহত হইলে কৌরবসেনাগণ এইরূপ দুরবস্থাপন্ন হইয়াছিল কিন্তু এক্ষণে প্রতিনিবৃত্ত হইতেছে। অতএব যদি তুমি তাহাদিগের আভ্যাগমনের' কারণ পরিজ্ঞাত থাক, তবে আমার নিকট কীর্ত্তন কর। একত্র মিলিত তুরঙ্গের হ্রেষারব, মাতঙ্গের বৃংহিতধ্বনি ও রথনেমির গভীর নিম্বনে বারংবার তুমুল শব্দ সমুত্থিত | হওয়াতে আমার সেনাগণ কম্পিত হইয়াছে; এক্ষণে যেরূপ লোমহর্ষণ তুমুল শব্দ শ্রবণগোচর হইতেছে, বোধ হয়, উহা দেবেন্দ্র সমবেত ত্রিভুবন গ্রাস করিতে পারে। বোধ হয়, দ্রোণাচার্য্য নিহত হওয়াতে সুররাজ বাসব কৌরবগণের হিতার্থ ভীষণ নিনাদ করত সমরাঙ্গনে আগমন করিয়াছেন। মহারথগণ এই ভয়ঙ্কর শব্দ শ্রবণে রোমাঞ্চিত গাত্র ও নিতান্ত শঙ্কিত হইয়াছেন। অতএব হে ধনঞ্জয়! এক্ষণে কোন্ মহারথ সুররাজের ন্যায় সমরে অবস্থানপূর্ব্বক সেই পলায়মান কৌরবগণকে যুদ্ধার্থ প্রতিনিবৃত্ত করিতেছেন? অর্জুন কহিলেন, হে মহারাজ! কৌরবগণ যাঁহার বলবীর্য্য আশ্রয় করিয়া ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক উগ্র কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া শঙ্খবাদন করিতেছে এবং আপনি, দ্রোণাচার্য্য ন্যস্তশস্ত্র' হইয়া দেহ ত্যাগ করিলে কোন ব্যক্তি দুর্য্যোধনের সহায় হইয়া ভীষণ নিনাদ করিতেছে, এই মনে করিয়া যাহার প্রতি সংশয়ারূঢ় হইয়াছেন, সেই মত্তমাতঙ্গগামী কুরুকুলের অভয়প্রদ মহাত্মার বিবরণ কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। হে মহারাজ! যে বীর জন্মগ্রহণ করিলে দ্রোণাচার্য্য ব্রাহ্মণগণকে সহস্র গোধন দান করিয়াছিলেন, যে বীর জাতমাত্র উচ্চৈঃশ্রবার ন্যায় হ্রেষারব পরিত্যাগ করিলে ত্রিলোক কম্পিত হওয়াতে ইহার নাম "অশ্বত্থামা” হইল, বলিয়া দৈববাণী হইয়াছিল, আজি সেই বীরপুরুষ সমরে সিংহনাদ করিতেছেন। হে রাজন! অদ্য পাঞ্চালতনয় ধৃষ্টদ্যুম্ন অতি নৃশংস কার্য্যানুষ্ঠান-পূর্ব্বক যাঁহাকে অনাথের ন্যায় সমরে নিহত করিয়াছেন, এক্ষণে সেই মহাত্মা দ্রোণের নাথস্বরূপ অশ্বত্থামা সমরে অবস্থান করিতেছেন। দ্রুপদকুমার আমার গুরু দ্রোণাচার্য্যের কেশপাশ ধারণ করিয়াছিল; অতএব গুরুপুত্র কখনই তাঁহাকে ক্ষমা করিয়া পৌরুষ প্রকাশে ক্ষান্ত হইবেন না।
হে ধর্মরাজ! আপনি ধর্মজ্ঞ হইয়াও রাজ্যলোভে গুরুর নিকট মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করত ঘোরতর অধর্ম্মে পতিত হইলেন। বালিবধে শ্রীরামের যেরূপ অকীর্ত্তি হইল, দ্রোণাচার্য্যের নিধনে ত্রৈলোক্যমধ্যে আপনারও তদ্রূপ চিরস্থায়িনী অকীর্ত্তি হইল। দ্রোণাচার্য্য আপনাকে শিষ্য ও সত্যধৰ্ম্মপরায়ণ বলিয়া জানিতেন; সুতরাং তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আপনি কখনই মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ করিবেন না, কিন্তু আপনি অশ্বত্থামা নিহত হইয়াছেন, এই কথা স্পষ্টাভিধানে ও কুঞ্জর শব্দ অব্যক্ত-রূপে উচ্চারণ করিয়া গুরুর নিকট সত্যাচ্ছাদিত মিথ্যাকথা কহিয়াছেন। হে মহারাজ! দ্রোণাচার্য্য আপনার বাক্য শ্রবণেই শস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক নির্মম ও গতচেতন হইয়া আপনার সমক্ষে বিহ্বল হইয়া পড়িলেন। এইরূপে আপনি দ্রোণের শিষ্য হইয়া সত্যধৰ্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক তাঁহাকে পুত্রশোকসন্তপ্ত করিয়া নিপাতিত করিলেন। হে ধর্মরাজ! আপনি তৎকালে অধর্মাচরণ-পূর্ব্বক গুরুর বধসাধন করিয়াছেন; এক্ষণে যদি সমর্থ হন, তবে অমাত্যগণে পরিবৃত হইয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে অশ্বত্থামার হস্ত হইতে রক্ষা করুন। অদ্য আমরা সকলেই পিতৃনিধনে রোষিত গুরুপুত্র হইতে দ্রুপদনন্দনকে পরিত্রাণ করিতে অক্ষম হইব। যিনি অলৌকিক ভাব অবলম্বনপূর্ব্বক সকল লোকের সহিত সৌহার্দ্য করিয়া থাকেন, অদ্য সেই মহাবীর পিতার কেশগ্রহণ বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া সংগ্রামে আমাদিগকে ধ্বংস করিবেন। হে মহারাজ! আমি আচার্য্যের জীবন রক্ষার্থ আপনাকে মিথ্যাকথা কহিতে বারংবার নিষেধ করিয়াছিলাম কিন্তু আপনি স্বধর্ম পরিত্যাগ করত তাঁহাকে সংহার করিলেন; আমাদিগের বয়ঃক্রম অধিকাংশই অতীত হইয়াছে, অল্পমাত্র অবশিষ্ট আছে। এক্ষণে এই অধর্মাচরণ হওয়াতে সেই জীবিতকাল বিকৃত হইল। দ্রোণাচার্য্য সৌহাদ্যবশতঃ ও ধর্মানুসারে আমাদের পিতার তুল্য ছিলেন। আপনি অল্পকালস্থায়ী রাজ্যের নিমিত্ত তাঁহার প্রাণনাশ করিলেন। দেখুন, ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্মদেব ও দ্রোণাচার্য্যকে আপনার পুত্রগণের সহিত এই সসাগরা পৃথিবী প্রদান করিয়াছিলেন, কিন্তু আচার্য্য তাদৃশ অবস্থায় অবস্থিত ও শত্রুকর্তৃক তদ্রূপ সৎকৃত হইয়াও আমাকে সতত পুত্রাপেক্ষা সমধিক স্নেহ করিতেন। হে রাজন! গুরু কেবল আপনার বাক্যেই ন্যস্তশস্ত্র হইয়া নিহত হইয়াছেন; তিনি যুদ্ধ করিলে ইন্দ্রও তাঁহাকে বিনাশ করিতে পারিতেন না। হায়! আমরা রাজ্য-লালসায় লঘুচিত্ত ও অনার্য্য হইয়া সেই নিত্যোপকারী বৃদ্ধ আচার্য্যের প্রাণ সংহার করিলাম। তুচ্ছ রাজ্যলোভে গুরুহত্যা করিয়া মহৎ পাপে লিপ্ত হইলাম। আচার্য্য নিশ্চয় জানিতেন যে, অর্জুন আমার নিমিত্ত আপনার পুত্র, কলত্র, পিতা ও ভ্রাতৃগণকে পরিত্যাগ করিতে পারে, কিন্তু আমি সেই মহাত্মার নিধনসময়ে উপেক্ষা করিয়া রহিলাম; অতএব নিশ্চয়ই আমাকে পরলোকে অবাশিরাঃ হইয়া নরকভোগ করিতে হইবে। আজি যখন আমরা মৌনব্রতা-বলম্বী বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আচার্য্যকে রাজ্যার্থে নিহত করিয়াছি, তখন আমাদের জীবনে কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই; মরণই শ্রেয়ঃ।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। অর্জুন এইরূপে কহিলে, মহারথগণ তাহা শ্রবণ করিয়া ভাল-মন্দ কিছুই কহিলেন না। তখন মহাবাহু ভীম ক্রোধাবিষ্ট হইয়া অর্জুনকে বিস্মিত করত কহিতে লাগিলেন, হে পার্থ! অরণ্যগত মুনি ও জিতেন্দ্রিয় শংসিতব্রত ব্রাহ্মণ যেমন ধর্মোপদেশ প্রদান করিয়া থাকেন, তদ্রূপ তুমিও ধর্মোপদেশ প্রদান করিতেছ। দেখ, যে ক্ষত্রিয় অন্যকে ক্ষত হইতে পরিত্রাণ করেন, ক্ষতই যাঁহার জীবনোপায় এবং যিনি দেব, দ্বিজ ও গুরুর প্রতি ক্ষমাশীল, তিনিই অবিলম্বে রাজ্য, ধর্ম, যশঃ ও শ্রী লাভ করিয়া থাকেন। তুমি সমগ্র ক্ষত্রিয়গুণে সমলঙ্কৃত আছ; অতএব এক্ষণে মূর্খের ন্যায় বাক্য প্রয়োগ করা তোমার সমুচিত হইতেছে না। হে কৌন্তেয়! তুমি ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্রের ন্যায় পরাক্রমশালী। মহাসাগর যেমন বেলাভূমি অতিক্রম করে না, তদ্রূপ তুমিও ধৰ্ম্মপথ অতিক্রমে প্রবৃত্ত হও না। তুমি যে এক্ষণে ত্রয়োদশ বর্ষ সঞ্চিত ক্রোধে জলাঞ্জলি প্রদান করিয়া ধর্মলাভের অভিলাষ করিতেছ, এই গুণে কে না তোমাকে প্রশংসা করিবে? এক্ষণে ভাগ্যক্রমে তোমার মনঃ সততই ধৰ্ম্মপথে ধাবমান হইতেছে এবং তোমার বুদ্ধিও নিরন্তর অনৃশংসতার অনুসরণ করিতেছে; কিন্তু তুমি এইরূপ ধর্মপরায়ণ হইলেও বিপক্ষেরা অধর্মাচরণপূর্ব্বক তোমার রাজ্যাপহরণ ও প্রিয়তমা দৌপদ্রীকে সভায় আনয়ন-পূর্ব্বক পরাভব করিয়াছিল। আমরা বনবাসের নিতান্ত অনুপযুক্ত হইয়াও তাহাদের নিকৃতিপ্রভাবে বল্কল ও অজিন ধারণপূর্ব্বক ত্রয়োদশ বৎসর অরণ্যে বাস করিয়াছি। হে ধনঞ্জয়! এইসকল স্থলে ক্রোধ প্রকাশ করিতে হয়; কিন্তু তুমি ক্ষত্রিয়ধর্মাবলম্বী হইয়া তৎসমুদায় সহ্য করিয়াছ। আজি আমি তোমার সহিত সমবেত হইয়া বিপক্ষগণকে সেই অধর্ম্মের প্রতিফল প্রদানে প্রবৃত্ত হইয়াছি। এক্ষণে সেই রাজ্যাপহারী ক্ষুদ্রাশয় বিপক্ষগণকে বন্ধু-বান্ধবের সহিত সংহার করিব।
পূর্ব্বে তুমি কহিয়াছিলে, আমরা যুদ্ধ আরম্ভ করিয়া সাধ্যানুসারে জয়লাভের চেষ্টা করিব; কিন্তু এক্ষণে ধর্মানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া আমাদিগকে নিন্দা করিতেছ। সুতরাং তুমি পূর্ব্বে যাহা বলিয়াছিলে, উহা এক্ষণে আমার মিথ্যা বলিয়া বোধ হইতেছে। এক্ষণে আমরা বিপক্ষদিগের গর্জনে অতিশয় ভীত হইয়াছি এবং তুমিও ক্ষতে ক্ষার প্রদানের ন্যায় বাক্শল্যদ্বারা আমাদিগের মর্ম্ম বিদ্ধ করিতেছ। আমার হৃদয় তোমার বাক্শল্যে পীড়িত হইয়া বিদীর্ণ হইতেছে। তুমি ধার্মিক হইয়াও অধৰ্ম্মতত্ত্ব সম্যক্ অবগত হইতেছ না। হে অর্জুন! তুমি স্বয়ং প্রশংসার ভাজন এবং আমরা সকলেও প্রশংসনীয়; কিন্তু তুমি আপনাকে ও আমাদিগকে প্রশংসা না করিয়া যে তোমার ষোড়শ অংশেরও উপযুক্ত নয়, বাসুদেব বিদ্যমান থাকিতে সেই অশ্বত্থামাকে প্রশংসা করিতেছ। তুমি স্বয়ং আত্মদোষ কীর্ত্তন করিয়া কি নিমিত্ত লজ্জিত হইতেছ না? আমি ক্রোধভরে এই সুবর্ণমালিনী গুর্ব্বী গদা উদ্যত করিয়া ভূমণ্ডল বিদীর্ণ, পর্ব্বত-সকল বিক্ষিপ্ত ও অচলসদৃশ বৃক্ষসকল ভগ্ন এবং শরনিকরে অসুর, রাক্ষস, উরগ, মানব ও ইন্দ্রের সহিত সমাগত দেবগণকে বিদ্রাবিত করিতে পারি। হে অমিতবিক্রম ধনঞ্জয়! তুমি আমাকে এইরূপ অবগত হইয়াও কি নিমিত্ত অশ্বত্থামা হইতে ভীত হইতেছ? অথবা তুমি অবস্থান কর, আমি গদা গ্রহণপূর্ব্বক হরি যেমন ক্রোধাবিষ্ট গর্জনশীল হিরণ্যকশিপুকে জয় করিয়াছিলেন, তদ্রূপ অন্যান্য বীরবর্গের সহিত অশ্বত্থামাকে পরাজয় করিব।
অনন্তর পাঞ্চালরাজতনয় ধৃষ্টদুম্ন অর্জুনকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপন, দান ও প্রতিগ্রহ- এই ছয়টি ব্রাহ্মণের কার্য্য; কিন্তু দ্রোণ ইহার কিছুই অনুষ্ঠান করিতেন না। অতএব আমি তাঁহাকে সংহার করিয়াছি বলিয়া তুমি কি নিমিত্ত আমার নিন্দা করিতেছ? তিনি স্বধর্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক ক্ষত্রিয়ধর্ম প্রতিগ্রহ করিয়াছিলেন এবং নীচকার্য্য-পরতন্ত্র হইয়া অমানুষ অস্ত্রদ্বারা আমাদিগকে বিনাশ করিতেছিলেন। সেই মহাবীর ব্রাহ্মণবাদী' ও অতিশয় মায়াবী; তিনি মায়াবলেই আমাদিগের সংহারে প্রবৃত্ত হইয়া-ছিলেন; সুতরাং তাঁহার প্রতি কোন কার্য্যের অনুষ্ঠানই অন্যার্য্য বলিয়া প্রতিপন্ন হইতে পারে না। এক্ষণে যদি অশ্বত্থামা ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ভয়ঙ্কর সিংহনাদ পরিত্যাগ করেন, তাহাতেই বা ক্ষতি কি? তিনি বৃথা গর্জনদ্বারা কৌরবপক্ষীয়গণকে সমরে প্রবর্তিত করিয়া তাহাদিগের রক্ষণে অসমর্থ হইয়া সংহারের কারণ হইবেন। হে ধনঞ্জয়! তুমি ধার্মিক হইয়া আমাকে তোমার গুরুঘাতী বলিয়া নিন্দা করিতেছ, কিন্তু আমি দ্রোণ বিনাশার্থই হুতাশন হইতে প্রাদুর্ভূত হইয়াছি। আর দেখ, সংগ্রামকালে যাঁহার | কার্য্য ও অকার্য্য উভয়ই সমান জ্ঞান ছিল, তাঁহাকে ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় বলিয়া কিরূপে নির্দেশ করিব? যিনি ক্রোধে অধীর হইয়া ব্রহ্মাস্ত্রদ্বারা অস্ত্রানভিজ্ঞ ব্যক্তিকে বিনাশ করেন, তাঁহাকে যে কোন উপায়দ্বারা হউক না কেন, বধ করাই অবশ্যকর্ত্তব্য।
হে অর্জুন! ধার্মিকেরা অধার্মিককে বিষতুল্য বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাকেন; অতএব তুমি ধর্মার্থতত্ত্বজ্ঞ হইয়াও কি নিমিত্ত আমার নিন্দা করিতেছ? আমি ক্রুরকর্ম্মপরায়ণ আচার্য্যকে রথোপরি আক্রমণপূর্ব্বক বিনাশ করিয়াছি। তাহাতে আমার কোনরূপেই নিন্দার কার্য্য করা হয় নাই; কিন্তু তুমি কি নিমিত্ত আমাকে অভিনন্দন করিতেছ না? আমি দ্রোণাচার্য্যের সেই কালানল, অর্ক ও বিষসদৃশ ভীষণ মস্তক ছেদন করিয়া সাতিশয় প্রশংসাভাজন হইয়াছি; কিন্তু তুমি কি নিমিত্ত আমার প্রশংসা করিতেছ না? দ্রোণ আমারই বন্ধু-বান্ধবগণের বধসাধন করিয়াছেন; অতএব তাঁহার শিরশ্ছেদন করিয়াও আমার ক্ষোভ-দূর হয় নাই। আমি যে জয়দ্রথের মস্তকের ন্যায় তাঁহার মস্তক চণ্ডাল-সমক্ষে নিক্ষেপ করি নাই, এই নিমিত্তই আমার অতিশয় মৰ্ম্মপীড়া উপস্থিত হইয়াছেন। হে ধনঞ্জয়! আমি শুনিয়াছি, শত্রুবিনাশ না করিলে অধৰ্ম্মস্পৃষ্ট হইতে হয়। হয় শত্রুকে বিনষ্ট করা, না হয় স্বয়ং তাহার হস্তে বিনষ্ট হওয়াই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। আচার্য্য আমার শত্রু ছিলেন; অতএব তুমি যেমন পিতৃসখা মহাবীর ভগদত্তকে সংহার করিয়াছিলে, তদ্রূপ আমি ধর্মানুসারে দ্রোণকে সংহার করিয়াছি। তুমি যখন স্বীয় পিতামহকে বিনাশ করিয়া আপনাকে ধার্মিক বলিয়া প্রতিপন্ন করিতেছ; তখন আমি পাপস্বভাব শত্রুকে বিনাশ করিয়াছি বলিয়া কেন আমাকে অধার্মিক বিবেচনা করিবে? হে পার্থ! আমি সম্বন্ধনিবন্ধন স্বগাত্রকৃত' সোপাননিষণ্ণ কুঞ্জরের ন্যায় তোমার নিকটে অবনত হইয়া আছি; অতএব আমার প্রতি এরূপ বাক্য প্রয়োগ করা তোমার কর্তব্য হইতেছে না। যাহা হউক, এক্ষণে আমি কেবল দ্রৌপদী ও দ্রৌপদীর পুত্রগণের নিমিত্ত তোমার এই সমস্ত বাক্যদোষ সহ্য করিয়া তোমার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করিলাম। আচার্য্যের সহিত শত্রুতা যে আমাদিগের কুল-পরম্পরাগত, ইহা সকলেই অবগত আছে; তোমাদের কি ইহা বিদিত নহে? হে অর্জুন! যুধিষ্ঠির মিথ্যাবাদী নহেন এবং আমিও অধার্মিক নহি। আচার্য্য শিষ্যদ্রোহী পাপস্বভাব ছিলেন বলিয়া আমি তাঁহাকে বিনাশ করিয়াছি। এক্ষণে তুমি যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও, তোমার জয়লাভ হইবে।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! যে মহাত্মা সাঙ্গবেদ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, যিনি ধনুর্ব্বেদে অদ্বিতীয়, যাঁহাতে লজ্জা ও দেবসেবাই সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং প্রধান পুরুষগণ যাঁহার অনুগ্রহে দেবগণেরও দুষ্কর অদ্ভুত কার্য্যসমুদায়ের অনুষ্ঠান করিতেছেন; সেই মহর্ষিনন্দন দ্রোণ অশ্বত্থামার মিথ্যা বিনাশ বার্তা শ্রবণে রোরুদ্যমান হইলে নীচ প্রকৃতি ক্ষুদ্রমতি নৃশংসা-চারপরায়ণ ধৃষ্টদ্যুম্ন সর্ব্বসমক্ষে তাঁহাকে সংহার করিয়াছে। কি আশ্চর্য্য। এ বিষয়ে কেহই রোষ প্রকাশ করিতেছে না। অতএব ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম ও ক্রোধে ধিক্। হে সঞ্জয়! পাণ্ডবেরা এবং অন্যান্য ধনুর্দ্ধর ভূপালগণ এই বিষয় শ্রবণ করিয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে কি কহিলেন, তাহা কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! দ্রুপদতনয় অর্জুনকে সেই কথা বলিলে অন্যান্য পাণ্ডবগণ তৃষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন। মহাবীর অর্জুন সেই ক্রুরস্বভাব ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতি কটাক্ষনিক্ষেপ করিয়া অনর্গল অশ্রুজল বিসর্জন ও দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক ধৃষ্টদ্যুম্নকে ধিক্কার প্রদান করিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব, কৃষ্ণ ও অন্যান্য বীরগণ লজ্জা-বনতমুখে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন সাত্যকি ক্রোধভরে কহিলেন, এই পরুষবাক্য প্রয়োগে প্রবৃত্ত নরাধম পাঞ্চাল-কলাঙ্গারকে শীঘ্র বিনাশ করিতে পারে, এমন কি কোন ব্যক্তিই নাই? হে ধৃষ্টদ্যুম্ন! ব্রাহ্মণ যেমন চণ্ডালকে নিন্দা করিয়া থাকেন, তদ্রূপ পাণ্ডবগণ তোমার এই পাপকর্ম দর্শনে তোমার নিন্দা করিতেছেন। তুমি এই সাধু লোকের নিন্দনীয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া জনসমাজে বাক্য ব্যয় করিতে কি নিমিত্ত লজ্জিত হইতেছ না? তুমি আচার্য্যবধে প্রবৃত্ত হইলে তোমার জিহ্বা ও মস্তক কি নিমিত্ত শতধা বিদীর্ণ হইল না এবং কি নিমিত্তই বা তুমি অধৰ্ম্মপ্রভাবে অধঃপতিত হইলে না? তুমি এই গর্হিত কার্য্য অনুষ্ঠান করিয়া জনসমাজে শ্লাঘা প্রকাশ করত পাণ্ডব, অন্ধক ও বৃষ্ণিগণের নিকট নিন্দনীয় হইতেছ। তুমি তাদৃশ অনার্য্য কার্য্য সংসাধন করিয়া পুনরায় আচার্য্যের প্রতি বিদ্বেষভাব প্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ; অতএব তুমি আমাদিগের বধ্য; তোমাকে মুহূর্ত্তকাল জীবিত রাখায় আমাদের কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। হে নরাধম! তোমা ভিন্ন অন্য কোন্ ব্যক্তি ধর্মাত্মা সাধু আচার্য্যের কেশ গ্রহণপূর্ব্বক বধসাধন করিতে অধ্যবসিত' হইয়া থাকে? তুমি পাঞ্চালকুলের কলঙ্ক! তোমার নিমিত্ত তোমার উর্দ্ধতন সপ্ত এবং অধস্তন সপ্ত এই চতুৰ্দ্দশ পুরুষ যশোভ্রষ্ট ও অধোগামী হইয়াছেন। তুমি অর্জুনকে ভীষ্মঘাতী বলিতেছ; কিন্তু ভীষ্মদেব স্বয়ংই আপনার বিনাশ সাধন করিয়াছেন। তোমার সহোদর শিখণ্ডীই সেই ভীষ্মের নিধনের মূল। হে ধৃষ্টদ্যুম্ন! এই পৃথিবীতে পাঞ্চাল-পুত্রগণ অপেক্ষা পাপকারী আর কেহই নাই। তোমার পিতা ভীষ্মের সংহারার্থ শিখণ্ডীকে সৃষ্টি করিয়াছেন; কিন্তু মহাবীর অর্জুন সেই ভীষ্মদেবের মৃতস্বরূপ শিখণ্ডীকে রক্ষা করেন। তুমি ও তোমার ভ্রাতা তোমরা উভয়েই সাধুগণের নিন্দনীয়। পাঞ্চালগণ তোমাদের নিমিত্ত ধৰ্ম্মভ্রষ্ট হইয়াছেন এক্ষণে তুমি যদি পুনরায় আমার সন্নিধানে পূর্ব্বের ন্যায় বাক্য প্রয়োগ কর, তাহা হইলে বজ্রকল্প গদাদ্বারা তোমার মস্তক চূর্ণ করিব। তুমি ব্রাহ্মণহন্তা, মনুষ্যেরা তোমার মুখা-বলোকন করিয়া আপনার প্রায়শ্চিত্তের নিমিত্ত সূর্য্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া থাকে। রে দুর্বৃত্ত। এই দেখ, আমার গুরু সম্মুখে অবস্থান করিতেছেন, তুমি আমার গুরুর গুরুকে বধ করিয়া পুনরায় তিরস্কার করত লজ্জিত হইতেছ না? এক্ষণে তুমি অবস্থানপূর্ব্বক আমার এক গদাঘাত সহ্য কর; আমি তোমার গদাঘাত বারংবার সহ্য করিব।
হে মহারাজ! ধৃষ্টদ্যুম্ন সাত্যকিকর্তৃক এ রূপ তিরস্কৃত হইয়া ক্রোধাভরে হাস্যমুখে কহিতে লাগিলেন, হে যুযুধান! তুমি স্বয়ং অনার্য্য ও নীচ প্রকৃতি হইয়া আমাকে নিরপরাধে তিরস্কার করিতেছ। আমি তোমার এই সকল তিরস্কার-বাক্য শুনিয়াও তোমাকে ক্ষমা করিলাম। ইহলোকে ক্ষমা গুণই প্রশংসনীয়। পাপ কখন ক্ষমা গুণকে স্পর্শ করিতে পারে না। পাপাত্মারা কেবল ক্ষমাবাকে পরাজিত বোধ করিয়া থাকে। তুমি ক্ষুদ্রতম, নীচ স্বভাব, পাপপরায়ণ এবং সর্ব্বতোভাবে নিন্দনীয় হইয়াও আমার নিন্দা করিতেছ। হে সাত্যকি! তুমি যে, নিবারিত হইয়াও ছিন্নভুজ প্রায়োপবিষ্ট ভূরিশ্রবার প্রাণ সংহার করিয়াছ, তাহা হইতে দুষ্কর্ম আর কি হইতে পারে? দ্রোণাচার্য্য পূর্ব্বে দিব্যাস্ত্র ব্যূহ নির্মাণ করিয়া পরিশেষে শস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক আমাকর্তৃক নিহত হইয়াছেন, ইহাতে আমার কি অধৰ্ম্ম হইবার সম্ভাবনা? যে ব্যক্তি অন্যের শরে ছিন্ন বাহু, মুনির ন্যায় প্রায়োপবিষ্ট ও সমরপরাজুখ ব্যক্তির প্রাণসংহারে প্রবৃত্ত হয়, সে কি বলিয়া অন্যের নিন্দা করে? হে যুযুধান! যখন বলবিক্রমশালী সোমদত্ততনয় তোমাকে পদাঘাতে ভূতলে নিপাতিত করিয়া বিক্রমপ্রকাশ করিয়াছিল, তুমি সেই সময় কেন তাহাকে সংহার-পূর্ব্বক সৎপুরুষোচিত কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে না? প্রতাপশালী সোমদত্তপুত্র পার্থকর্তৃক অগ্রে পরাজিত হইলে তুমি তাহাকে নিপাতিত করিয়াছ। দেখ, দ্রোণাচার্য্য যে যে স্থানে পাণ্ডবসেনা বিদারণ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, আমি শর সহস্র বর্ষণপূর্ব্বক সেই সেই স্থানে গমন করিয়াছিলাম; কিন্তু তুমি অন্য নির্জিত ব্যক্তির সংহাররূপ চণ্ডালসদৃশ কৰ্ম্মানুষ্ঠানপূর্ব্বক স্বয়ং নিন্দনীয় হইয়া আমার প্রতি পরুষবাক্য প্রয়োগ করিতেছ। হে বৃষ্ণি-কুলাধম! তুমি পাপকর্ম্মের আবাস'; আমি তোমার ন্যায় দুষ্কর্মকারী নহি; অতএব তুমি পুনরায় আমাকে নিষেধ করিও না, মৌনাবলম্বন কর। যদি তুমি অজ্ঞানতাপ্রযুক্ত পুনরায় আমার প্রতি পরুষবাক্য প্রয়োগ কর, তবে নিশ্চয়ই তোমাকে শরনিকর-দ্বারা যমালয়ে প্রেরণ করিব। রে মূর্খ! কেবল ধৰ্ম্মপথ অবলম্বন করিলে যুদ্ধে জয় লাভ হয় না। কৌরবগণ ও পাণ্ডবগণ যে যে অধর্মাচরণ করিয়াছেন, তাহা শ্রবণ কর। কৌরবগণের অধৰ্ম্মপ্রভাবে রাজা যুধিষ্ঠির বঞ্চিত ও দ্রৌপদী পরিক্লিষ্ট হইয়াছিলেন। তাহারা অধর্মাচরণপূর্ব্বক পাণ্ডবগণের সর্ব্বস্বান্ত করিয়া উহাদিগকে পাঞ্চালীর সহিত অরণ্যে প্রেরণ করিয়াছিল। উহারা অধর্মাচরণপূর্ব্বক মদ্ররাজকে আপনাদের পক্ষে আনয়ন করত বালক সৌভদ্রকে নিধন করিয়াছে। এদিকে পাণ্ডবগণের অধর্মাচরণে কুরুপিতামহ ভীষ্মদেব নিহত হইয়াছেন। তুমি ধৰ্ম্মতত্ত্ববেত্তা হইয়াও অধর্মসহকারে ভূরিশ্রবার জীবন নাশ করিয়াছ। ধর্মজ্ঞ কৌরব ও পাণ্ডবগণ বিজয়াভিলাষী হইয়া এইরূপ আচরণ করিয়াছেন। হে শৈনেয়। পরম ধর্ম ও অধর্ম্মের তত্ত্ব নিতান্ত দুর্জেয়। যাহা হউক, এক্ষণে তুমি পিতৃগৃহে গমন না করিয়া কৌরবগণের সহিত যুদ্ধ কর।
হে মহারাজ! মহাবীর সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্নের মুখে এইরূপ পরুষ ও ক্রুর বাক্য শ্রবণ করিয়া কম্পিত হইতে লাগিলেন। তাঁহার নয়নদ্বয় রোষানলে তাম্রবর্ণ হইয়া উঠিল। তখন তিনি রথে শরাসন সংস্থাপনপূর্ব্বক সর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত গদাহস্তে ধৃষ্টদ্যুম্নের অভিমুখে ধাবমান হইয়া কহিলেন, রে দুরাত্মন্! তুমি বধাই; অতএব তোমার প্রতি পরুষবাক্য প্রয়োগ না করিয়া তোমাকে নিপাতিত করিব। তখন বাসুদেব সাত্যকিকে সহসা কালান্তক যমের ন্যায় ধৃষ্টদ্যুম্নের সম্মুখীন হইতে দেখিয়া তাঁহার নিবারণার্থ ভীমসেনকে প্রেরণ করিল। মহাবল পরাক্রান্ত বৃকোদর তৎক্ষণাৎ রথ হইতে অবরোহণ ও বাহু প্রসারণপূর্ব্বক ক্রুদ্ধ সাত্যকিকে নিবারণ করত তিনি ছয় পদ গমন করিবামাত্র তাঁহাকে ধারণ করিলেন। এইরূপে মহাবীর সাত্যকি ভীমকর্তৃক নিবারিত হইলে মহাত্মা সহদেব অবিলম্বে রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া তাঁহাকে মধুরবাক্যে কহিলেন, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ যুযুধান! অন্ধক, বৃষ্ণি ও পাঞ্চালগণ অপেক্ষা আমাদিগের আর অন্য বন্ধু নাই এবং আমরাও অন্ধক, বৃষ্ণিগণের বিশেষতঃ কৃষ্ণের যেরূপ মিত্র, সেরূপ আর কেহই নহে। অতএব তোমরা আমাদের যেরূপ মিত্র, আমরাও তোমাদের সেইরূপ সুহৃৎ। আর পাঞ্চালগণ সমুদ্র পর্যন্ত অন্বেষণ করিলেও পাণ্ডব ও বৃষ্ণিগণ অপেক্ষা প্রিয় সুহৃৎ কুত্রাপি প্রাপ্ত হইবেন না; সুতরাং ধৃষ্টদ্যুম্নের বিশেষ সৌহাদ্দ আছে, সন্দেহ নাই; অতএব হে সর্ব্বধৰ্ম্মজ্ঞ! এক্ষণে তুমি মিত্রধর্ম স্মরণ করিয়া কোপ সংহারপূর্ব্বক ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন কর। ধৃষ্টদ্যুম্নও তোমাকে ক্ষমা করুন। আমরাও এক্ষণে ক্ষমাবান্ হইতেছি। শান্তি অপেক্ষা হিতকর আর কিছুই নাই।
হে মহারাজ! সহদেব সাত্যকিকে এইরূপে সান্ত্বনা করিলে দ্রুপদকুমার হাস্য করিয়া কহিলেন, হে ভীমসেন! তুমি এই যুদ্ধমদান্বিত সাত্যকিকে পরিত্যাগ কর। সমীরণ যেমন ভূধরে মিলিত হয় তদ্রূপ ঐ দুরাত্মা আমার সহিত মিলিত হউক। আমি অচিরাৎ নিশিত শরনিকরে ইহার ক্রোধ, যুদ্ধশ্রদ্ধা ও জীবন বিনষ্ট করিব। ঐ দেখ, কৌরবগণ পাণ্ডবগণের অভিমুখীন হইতেছে; আমি অচিরাৎ এই পাপাত্মাকে সংহার করিয়া উহাদিগকে পরাজয়পূর্ব্বক সুমহৎ কার্য্য সংসাধন করিব। অথবা অর্জুন কৌরবগণকে নিবারণ করুন। আমি সায়কনিকরে যুযুধানের মস্তক ছেদন করিব। সাত্যকি আমাকে ছিন্নবাহু ভূরিশ্রবার ন্যায় বোধ করিতেছে। অতএব আমি সংগ্রামে অন্যকে পরিত্যাগ করিয়া অগ্রে উহাকে বিনাশ করিব। অথবা সাত্যকি আমাকে সংহার করুক। ভীমসেনের ভুজদ্বয়ার্ন্তগত সাত্যকি পাঞ্চালপুত্রের সেই বাক্য শ্রবণে সর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত কম্পিত হইতে লাগিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সাত্যকি বৃষভদ্বয়ের ন্যায় গর্জন আরম্ভ করিলে মহাত্মা বাসুদেব ও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সেই বৃষদ্বয়-সদৃশ বীরদ্বয়কে বহুযত্নে নিবারণ করিলেন। তৎপরে প্রধান প্রধান ক্ষত্রিয়গণ ও সেই ক্রোধসংরক্তনেত্র ধনুর্দ্ধারী বীরদ্বয়কে নিবারণ করিয়া যুদ্ধার্থ অন্যন্য যোধগণের প্রতি ধাবমান হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর দ্রোণনন্দন, অশ্বত্থামা কল্পান্তকালীন অন্তকের ন্যায় শত্রুবিনাশ করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার ভল্লাস্ত্রের আঘাতে অসংখ্য অরাতি নিপাতিত হওয়াতে সমরাঙ্গন পর্ব্বতের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। ধ্বজসকল উহার বৃক্ষ, অস্ত্রসমুদায় শৃঙ্গ, গতাসু গজনিচয় মহাশিলা, অশ্বগণ কিংপুরুষ, শরাসনসকল লতা, রাক্ষসগণ, পক্ষী ও ভূতসমুদায় যক্ষগণের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা মহাসিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক পুনরায় দুর্য্যোধনকে প্রতিজ্ঞা শ্রবণ করাইয়া কহিতে লাগিলেন, হে রাজন! আমি সত্য বলিতেছি, যখন কুন্তীতনয় যুধিষ্ঠির ধৰ্ম্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত আচার্য্যকে অস্ত্র পরিত্যাগে বাধিত করিয়াছেন, তখন আজি তাঁহার সমক্ষেই পাণ্ডবসৈন্য বিদ্রাবিত করিয়া দুরাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিনাশ করিব। আর যদি পাণ্ডবপক্ষীয়েরা রণে পরাজুখ না হইয়া আমার সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলে সকলেই আমার হস্তে নিহত হইবে। আমাদিগের সেনা-সমুদায়কে প্রতিনিবৃত্ত কর।
হে মহারাজ! আপনার পুত্র দ্রোণতনয়ের সেই কথা শ্রবণ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক সৈন্যগণকে ভয়শূন্য করিয়া প্রতিনিবৃত্ত করিলেন। পরিপূর্ণ অর্ণবদ্বয়ের ন্যায় পুনরায় কৌরব ও পাণ্ডবসৈন্যের সমাগম উপস্থিত হইল। কৌরবগণ অশ্বত্থামার উত্তেজনায় স্থিরচিত্ত হইলেন এবং পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ আচার্য্য নিধনে নিতান্ত হৃষ্ট ও উদ্যত হইয়া উঠিলেন। এইরূপে সেই উভয় পক্ষীয় বীরগণ জয়লাভে কৃতনিশ্চয় হইয়া সমরাঙ্গনে মহাবেগে ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন পৰ্ব্বত পৰ্ব্বতে এবং সাগর সাগরে যেরূপ পরস্পর প্রতিঘাত হইয়া থাকে, কৌরব ও পাণ্ডবসৈন্যের তদ্রূপ প্রতিঘাত হইতে লাগিল। উভয় পক্ষীয় সেনাগণ হৃষ্টচিত্তে সহস্র শঙ্খ ও ভেরী নিনাদ করিতে আরম্ভ করিলে সমুদ্রমন্থন সময়ে যেরূপ ঘোরতর শব্দ সমুত্থিত হইয়াছিল, সৈন্যমধ্যে তদ্রূপ অতি ভীষণ শব্দ সমুত্থিত হইল।
হে মহারাজ! ঐ সময় মহাবীর অশ্বত্থামা পাণ্ডব ও পাঞ্চালসৈন্যগণকে লক্ষ্য করিয়া নারায়ণাস্ত্রের আবির্ভাব করিলেন। সেই অস্ত্র হইতে দীপ্তাস্য পন্নগের ন্যায় অসংখ্য প্রজ্বলিত শরজাল বিনির্গত হইয়া পাণ্ডবগণকে ব্যাকুলিত করত মুহূর্ত্তমধ্যেই দিবাকর-কিরণের ন্যায় দিত্মণ্ডল, নভোমণ্ডল ও সেই সেনামণ্ডল সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। লৌহময় বজ্রমুষ্টি-সকল গগনমণ্ডল প্রাদুর্ভূত হইয়া জ্যোতিঃপদার্থের ন্যায় বিচরণ করিতে লাগিল। চতুৰ্দ্দিকে বিচিত্র শতঘ্নী, বজ্রমুষ্টি, গদা ও সূর্য্যমণ্ডলাকার ক্ষুরধার চক্রসকল দীপ্তি পাইতে লাগিল। হে মহারাজ! এইরূপ অস্ত্রনিচয়ে গগনমণ্ডল সমাকীর্ণ হইলে, পাণ্ডব, পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ তদ্দর্শনে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইলেন। পাণ্ডব-পক্ষীয় মহারথগণ যে যে স্থলে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন, নারায়ণাস্ত্র সেই সেই স্থানে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। অনেকে সেই অনলসদৃশ নারায়ণাস্ত্রে বিদ্ধ হইয়া সাতিশয় পীড়িত হইলেন। শিশিরাপগমে হুতাশন যেরূপ শুষ্ক তৃণরাশি দগ্ধ করিয়া থাকে তদ্রূপ সেই নারায়ণাস্ত্র পাণ্ডবসেনাগণকে বিনষ্ট করিতে লাগিল।
হে মহারাজ! ঐ সময় ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অশ্বত্থামার অস্ত্র-প্রভাবে স্বীয় সৈন্যমধ্যে কতকগুলিকে বিনষ্ট, কতকগুলিকে জ্ঞানশূন্য ও কতকগুলিকে ধাবমান এবং অর্জুনকে সমরে উদাসীন অবলোকন করিয়া ভীতচিত্তে কহিলেন, হে ধৃষ্টদ্যুম্ন! তুমি পাঞ্চালসেনা-সমভিব্যাহারে পলায়ন কর। হে সাত্যকি! তুমি বৃষ্ণি ও অন্ধকগণে পরিবৃত হইয়া প্রস্থান কর। ধর্মাত্মা বাসুদেব জনসমূহের উপদেষ্টা। উনি স্বয়ং আপনার পরিত্রাণের উপায় উদ্ভাবন করিয়া লইবেন। হে সৈন্যগণ! আমি তোমাদিগকে কহিতেছি আর যুদ্ধ কর্তব্য নহে। আমি নিশ্চয়ই সোদরগণের সহিত অনলে প্রবেশ করিব। হায়! আমি ভীষ্ম ও দ্রোণরূপ সাগর হইতে সমুত্তীর্ণ হইয়া এক্ষণে দ্রোণপুত্ররূপ গোষ্পদে বন্ধুগণের সহিত নিমগ্ন হইলাম। আমি সচ্চরিত্র আচার্য্যকে সংগ্রামে নিপাতিত করিয়াছি বলিয়া ধনঞ্জয় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হইয়াছেন। এক্ষণে তাঁহার অভিলাষ পূর্ণ হউক। রণবিশারদ |
ক্রুরকর্মা মহারথীরা যখন যুদ্ধানভিজ্ঞ বালক অভিমন্যুকে বিনাশ করেন, তখন যে দ্রোণাচার্য্য তাহাকে রক্ষা করেন নাই। দীন-ভাবাপন্ন সমাগত দ্রৌপদী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে যিনি পুত্র সমভিব্যাহারে উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছিলেন, অন্যান্য সমস্ত সৈন্যগণ পরিশ্রান্ত হইলে যিনি অর্জুনজিঘাংসু দুর্য্যোধনকে কবচবদ্ধ ও সিন্ধুরাজের রক্ষার্থ নিযুক্ত করিয়াছিলেন, যে ব্রহ্মাস্ত্রবেত্তা আমার জয়াভিলাষী সত্যজিৎপ্রমুখ পাঞ্চালগণকে সমূলে উন্মুলিত করিয়াছেন এবং কৌরবগণ অধৰ্ম্মপূর্ব্বক আমা-দিগকে রাজ্য হইতে নির্ব্বাসিত করিলে যিনি আমাদিগকে যুদ্ধ করিতে নিবারণ করিয়াছিলেন, আমাদের সেই পরম সুহৃৎ দ্রোণাচার্য্য নিহত হইয়াছেন; এক্ষণে আমিও বান্ধবগণের সহিত নিহত হই। হে মহারাজ! যুধিষ্ঠির এইরূপ কহিলে পর মহাত্মা বাসুদেব বাহুসঙ্কেতদ্বারা পাণ্ডবপক্ষীয় সৈন্যগণকে নিবারণ করত কহিলেন, হে যোধগণ! তোমরা শীঘ্র অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ-পূর্ব্বক বাহন হইতে অবতীর্ণ হও। তোমরা নিরায়ুধ ও ভূতলে অবতীর্ণ হইলে এ অস্ত্র আর আমাদিগকে বিনাশ করিতে সমর্থ হইবে না। এ অস্ত্রের প্রতিঘাত করিবার এই মাত্র উপায় আছে। তোমরা যে যে স্থানে শত্রু নিবারণার্থ বা অস্ত্রবল নিরাকরণার্থ যুদ্ধ করিবে, সেই সেই স্থানে কৌরবেরা অতি ভীষণ হইয়া উঠিবে। আর যাহারা অস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া বাহন হইতে অবতীর্ণ হইবে, তাহারা কখনই এ অস্ত্রে বিনষ্ট হইবে না। যুদ্ধ কার্য্যে আহত হওয়া দূরে থাক্ যাঁহারা যুদ্ধ করিবার নিমিত্ত চিন্তা করিবেন, তাঁহারা রসাতলে প্রবেশ করিলেও এই অস্ত্র তাঁহাদিগকে নিহত করিবে। হে মহারাজ! পাণ্ডবপক্ষীয়েরা বাসুদেবের বাক্য শ্রবণ করিয়া সকলেই অস্ত্র ও যুদ্ধ চিন্তা পরিত্যাগ করিতে বাসনা করিল।
তখন মহাবীর ভীমসেন যোধগণকে অস্ত্র পরিত্যাগে উদ্যত অবলোকন করিয়া তাহাদিগকে আহ্লাদিত করত কহিতে লাগিলেন, হে যোধগণ! তোমরা কদাচ অস্ত্র পরিত্যাগ করিও না। আমি শরনিকর নিপাতে অশ্বত্থামার অস্ত্র নিবারণ করিতেছি। আমি এই সুবর্ণময়ী গুব্বী গদা সমুদ্যত করিয়া দ্রোণপুত্রের নারায়ণাস্ত্র বিমৰ্দ্দিত করত অন্ধকের ন্যায় রণস্থলে বিচরণ করিব। এই ভূমণ্ডলমধ্যে যেমন কোন জ্যোতিঃপদার্থই সূর্য্যের সদৃশ নহে, তদ্রূপ আমার তুল্য পরাক্রমশালী আর কোন মনুষ্যই নাই। আমার এই যে ঐরাবত-শুণ্ডসদৃশ সুদৃঢ় ভুজদণ্ড অবলোকন করিতেছ, ইহা হিমালয় পর্বতেরও নিপাতনে সমর্থ। আমি অযুত নাগতুল্য বলশালী; দেবলোকে পুরন্দর যেরূপ অপ্রতিদ্বন্দ্বী, নরলোকমধ্যে আমিও তদ্রূপ। আজি আমি দ্রোণপুত্রের অস্ত্র নিবারণে প্রবৃত্ত হইতেছি, সকলে আমার বাহুবীর্য্য অবলোকন করুন। যদি কেহ এই নারায়ণাস্ত্রের প্রতিযোদ্ধা বিদ্যমান না থাকে, তাহা হইলে আমি স্বয়ং সমস্ত কৌরব ও পাণ্ডবগণ-সমক্ষে এই অস্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হইব। হে ভ্রাতঃ অর্জুন! তুমি গাণ্ডীব ধনুঃ পরিত্যাগ করিও না, তাহা হইলে তোমার কোপ শিথিল হইবে। অর্জুন ভীমের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে মহাবীর! নারায়ণাস্ত্র, গো ও ব্রাহ্মণের বিপক্ষে আমি গাণ্ডীব ধারণ করি না, ইহা আমার উৎকৃষ্ট নিয়ম। শত্রুনিসূদন ভীমসেন অর্জুনের বাক্য শ্রবণানন্তর সূর্য্যের ন্যায় তেজঃসম্পন্ন মেঘগম্ভীরনিস্বন স্যন্দনে আরোহণপূর্ব্বক দ্রোণ-পুত্রের প্রতি ধাবমান হইয়া লঘুহস্ততা প্রদর্শন করত নিমেষমধ্যে তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিলেন। মহাবীর অশ্বত্থামা তদ্দর্শনে হাস্য করিয়া প্রদীপ্তাগ্র মন্ত্রপূত শরজালে ভীমসেনকে আবৃত করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর বৃকোদর সেই কাঞ্চন-স্ফুলিঙ্গসদৃশ দীপ্তাস্য' ভুজঙ্গতুল্য প্রজ্বলিত মৰ্ম্মভেদী শরসমূহে সমাকীর্ণ হইয়া রজনীযোগে খদ্যোত পরিবেষ্টিত পর্ব্বতের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। অশ্বত্থামার সেই ভীষণ অস্ত্র তাঁহার প্রতি অর্পিত হইয়া অনিলোদ্ভূত' অগ্নির ন্যায় পরিবর্দ্ধিত হইয়া উঠিল। তখন ভীমসেন ভিন্ন আর সমুদায় পাণ্ডবসৈন্য নিতান্ত ভীত হইয়া অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক সকলেই রথ ও অশ্ব হইতে ক্ষিতিতলে অবতীর্ণ হইতে লাগিল। তাঁহারা সকলের ন্যস্তায়ুধ ও বাহন হইতে অবতীর্ণ হইলে সেই বিপুল বীর্য্য ভীষণ অস্ত্র ভীমসেনের মস্তকে পতিত হইল। তখন প্রাণিগণ ও বিশেষতঃ পাণ্ডবেরা ভীমসেনকে তেজোদ্বারা পরিবৃত দেখিয়া হাহাকার করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় অর্জুন ভীমসেনকে নারায়ণাস্ত্রে সমাচ্ছন্ন দেখিয়া অস্ত্রের তেজঃ ধ্বংস করিবার মানসে বৃকোদরকে বারুণাস্ত্রে পরিবৃত করিতে লাগিলেন। অর্জুনের লঘুহস্ততাপ্রভাবে মুহূর্তমধ্যে নারায়ণাস্ত্র বারুণাস্ত্রে পরিবৃত হইলে উহা কাহারও নেত্রগোচর হইল না। ক্ষণৈক পরে ভীমসেন পুনরায় দ্রোণপুত্রের অস্ত্রপ্রভাবে অশ্ব, সারথী ও রথে সমাচ্ছন্ন হইয়া পাবকমধ্যস্থিত জ্বালাব্যাপ্ত দুর্লক্ষ্য অনলের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। হে মহারাজ! নিশাবসানে জ্যোতিঃপদার্থসকল যেমন অস্তগিরিতে গমন করে, তদ্রূপ অসংখ্য শরজাল ভীমসেনের রথে নিপতিত হইতে লাগিল। এইরূপে বৃকোদর অশ্বত্থামার অস্ত্রে সারথি, রথ ও অশ্বগণের সহিত সমাচ্ছন্ন হইয়া প্রদীপ্ত অনলে পরিবেষ্টিত হইলেন। প্রলয়কালীন হুতাশন যেমন এই চরাচর জগৎকে ধ্বংস করিয়া বিশ্বস্রষ্টার মুখমণ্ডলে প্রবেশ করে, তদ্রূপ অশ্বত্থামার ভীষণাস্ত্র ভীম-শরীরে প্রবেশ করিতে আরম্ভ করিলে উহা সূর্য্য প্রবিষ্ট অনলের ন্যায় বা অনলে প্রবিষ্ট সূর্য্যের ন্যায়, কাহারও বোধগম্য হইল না।
তখন মহাবীর অর্জুন ও বাসুদেব সেই ভীষণ অস্ত্রে ভীমের রথ সমাকীর্ণ দ্রোণপুত্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী বিবর্জিত, পাণ্ডব-পক্ষীয় সেনাগণকে নিক্ষিপ্তাস্ত্র' ও যুধিষ্ঠির প্রভৃতি মহারথগণকে সমরবিমুখ অবলোকন করিয়া রথ হইতে অবরোহণ ও ভীম-সমীপে গমনপূর্ব্বক মায়াবলে সেই অস্ত্রবলসম্ভূত তেজোরাশি-মধ্যে অবগাহন করিলেন। নারায়ণাস্ত্রসম্ভূত হুতাশন সেই বীরদ্বয়ের অস্ত্র পরিত্যাগ, বীর্য্যবত্ত্বা ও বারুণাস্ত্রের প্রভাব-নিবন্ধন তাহাদিগকে দগ্ধ করিতে সমর্থ হইল না। তখন সেই নর ও নারায়ণ নারায়ণাস্ত্রের শান্তির নিমিত্ত বলপূর্ব্বক ভীমসেনকে ও তাঁহার অস্ত্র-শস্ত্রসকলকে আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহারথ বৃকোদর সেই বীরদ্বয়কর্তৃক আকৃষ্যমাণ হইয়া সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। দ্রোণনন্দনের সুদুর্জয় অস্ত্রও পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। তখন বাসুদেব ভীমসেনকে কহিলেন, হে পাণ্ডুনন্দন! তুমি নিবারিত হইয়াও কি নিমিত্ত যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইতেছ না? যদি এক্ষণে যুদ্ধদ্বারা কৌরব-গণকে পরাজয় করিবার সম্ভাবনা থাকিত, তাহা হইলে আমরা অবশ্যই যুদ্ধ করিতাম এবং মহারথগণও সমরে পরাজুখ হইতেন না। ঐ দেখ, তোমার পক্ষীয় সমুদায় বীরগণই রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়াছেন; অতএব তুমিও অবিলম্বে রথ হইতে অবরোহণ কর। বাসুদেব ইহা কহিয়া বৃকোদরকে রথ হইতে ভূতলে আনয়ন করিলে ভীমসেন সর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত রোষে লোহিতনেত্র হইয়া আয়ুধ পরিত্যাগ করিলেন। নারায়ণাস্ত্রও প্রশান্ত হইল।
হে মহারাজ! এইরূপে বিধিনির্ব্বন্ধের অনুল্লঙ্ঘনীয়তা-নিবন্ধন সেই ভীষণ নারায়ণাস্ত্রের সুদুঃসহ তেজঃ প্রশান্ত হইলে সমুদায় দিক্-বিদিক্ নিৰ্ম্মল হইল; বায়ু অনুকূল হইয়া প্রবাহিত হইতে লাগিল; কুরঙ্গ ও বিহঙ্গগণ শান্তভাব অবলম্বন করিল; যোধ ও বাহনগণ আনন্দিত হইলেন এবং ভীমসেন প্রাতঃকালীন সূর্য্যের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তখন হৃতাবশিষ্ট পাণ্ডবসেনাগণ সেই নারায়ণাস্ত্রের সংহার অবলোকন করিয়া দুর্য্যোধনের বিনাশার্থ সমরে প্রবৃত্ত হইল। রাজা দুর্য্যোধন তদ্দর্শনে দ্রোণপুত্রকে কহিলেন, হে অশ্বত্থামন্! পাঞ্চালগণ বিজয়-বাসনায় পুনরায় সংগ্রামে উপস্থিত হইয়াছে; অতএব তুমিও পুনর্ব্বার সেই অস্ত্র পরিত্যাগ কর। দ্রোণনন্দন দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণে দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, হে মহারাজ! সেই অস্ত্র আর প্রত্যাবর্তিত করা সাধ্যায়ত্ত নহে। উহা প্রত্যাবর্তিত হইলে প্রযোক্তার প্রাণ সংহার করে। বাসুদেব কৌশলক্রমে সেই অস্ত্রের প্রতিঘাত করিয়াছেন, তন্নিমিত্ত শত্রুসংহার হইল না। যাহা হউক, পরাজয় ও মৃত্যু উভয়ই সমান; বরং পরাজয় অপেক্ষা প্রাণত্যাগই শ্রেয়ষ্কর। ঐ দেখ, শত্রুগণ শস্ত্রপ্রভাবে পরাজিত হইয়া মৃতকল্প হইয়াছে। তখন দুর্য্যোধন কহিলেন, হে আচার্য্যকুমার! যদি এক্ষণে পুনরায় সেই অস্ত্র প্রয়োগের সম্ভাবনা না থাকে, তবে অন্য অস্ত্রদ্বারা গুরুহন্তা পাণ্ডবগণকে নিপাতিত কর। দিব্যাস্ত্রসকল তোমাতে ও অমিততেজাঃ মহাদেবে বিদ্যমান রহিয়াছে। তুমি ইচ্ছা করিলে ক্রুদ্ধ পুরন্দরকেও পরাভূত করিতে পার।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! দ্রোণাচার্য্য নিহত ও নারায়ণাস্ত্র প্রতিহত হইলে অশ্বত্থামা দুর্য্যোধনকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া যুদ্ধার্থ সমাগত পাণ্ডবগণকে অবলোকনপূর্ব্বক পুনরায় কি কার্য্য করিলেন?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! সিংহলাঙ্গুলকেতন মহাবীর অশ্বত্থামা পিতৃবিনাশে ক্রোধান্বিত হইয়া ভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতি ধাবমান হইলেন এবং মহাবেগে পঞ্চবিংশতি ক্ষুদ্রক বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রজ্বলিত পাবকসদৃশ চতুঃষষ্টি শরে দ্রোণপুত্রকে, সুবর্ণময় সুশাণিত পঞ্চবিংশতি শরে তাঁহার সারথিকে ও চারি বাণে তাঁহার চারি অশ্বকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদে মেদিনী কম্পিতা করত তাঁহাকে বারংবার বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তৎকালে বোধ হইল, যেন সমস্ত লোকের প্রাণ সংহার হইতেছে। তৎপরে অস্ত্রবিশারদ মহাবল পরাক্রান্ত ধৃষ্টদ্যুম্ন জীবিত-নিরপেক্ষ হইয়া অশ্বত্থামার প্রতি গমনপূর্ব্বক পুনরায় তাঁহার মস্তকোপরি শরধারা বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা পিতৃবধ স্মরণে ক্রোধান্বিত হইয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিয়া দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন এবং ক্ষুরদ্বারা তাঁহার শর ও শরাসন ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে শরনিকরে পীড়িত করিয়া তাঁহার সারথি, রথ ও অশ্বসমুদায়কে বিনষ্ট করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় ধৃষ্টদ্যুম্নের অনুচরগণও অশ্বত্থামার শরজালে সমাচ্ছন্ন হইল। তখন পাঞ্চালসৈন্যগণ নিশিত শর প্রহারে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ ও নিতান্ত কাতর হইয়া সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিল।
হে মহারাজ! ঐ সময়ে মহাবীর সাত্যকি যোধগণকে পরাজুখ ও ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিতান্ত নিপীড়িত নিরীক্ষণ করিয়া তৎক্ষণাৎ অশ্বত্থামার অভিমুখে স্বীয় রথ সঞ্চালন করিলেন এবং অবিলম্বে তথায় সমুপস্থিত হইয়া প্রথমতঃ আট ও তৎপরে বিংশতি বাণে অশ্বত্থামা ও তাঁহার সারথিকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার চারি অশ্বের উপর চারি বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক সত্বর তাঁহাকে বিদ্ধ করত ধনুঃ ও ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। পরে দ্রোণপুত্রের সুবর্ণমণ্ডিত ও অশ্বযুক্ত রথ চূর্ণিত করিয়া তাঁহার বক্ষঃস্থলে ত্রিংশৎ শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত অশ্বত্থামা এইরূপে শরজালে সংবৃত ও নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া কিংকর্তব্যতা বিমূঢ় হইলেন।
হে মহারাজ! তখন মহারথ দুর্য্যোধন আচার্য্যপুত্রকে তদবস্থ অবলোকন করিয়া কূপ ও কর্ণ প্রভৃতি বীরগণের সহিত সাত্যকির উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর দুর্য্যোধন বিংশতি, কৃপাচার্য্য তিন, কৃতবর্মা দশ, কর্ণ পঞ্চাশৎ, দুঃশাসন একশত ও বৃষসেন সাত শরে সাত্যকিকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর সাত্যকি এইরূপে সেই মহারথগণকর্তৃক বিদ্ধ হইয়া ক্রোধভরে ক্ষণকালমধ্যে তাঁহাদিগকে রথবিহীন ও সমর-পরাজুখ করিলেন। ঐ সময় অশ্বত্থামা সংজ্ঞালাভ করিয়া বারংবার নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক দুঃখিতমনে চিন্তা করিতে লাগিলেন এবং তৎপরে অন্য রথে আরোহণপূর্ব্বক শত শত শর বর্ষণ করিয়া সাত্যকির নিবারণে প্রবৃত্ত হইলেন। মহারথ | সাত্যকি অশ্বত্থামাকে সমাগত সন্দর্শন করিয়া পুনরায় তাহাকে রথবিহীন ও সমরপরাজুখ করিলেন। ঐ সময়ে পাণ্ডবগণ সাত্যকির পরাক্রম দর্শনে প্রীত হইয়া শঙ্খধ্বনি ও সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। সত্যবিক্রম' সাত্যকি এইরূপে ভারদ্বাজতনয়কে রথবিহীন করিয়া বৃষসেনের অনুগামী ত্রিসহস্র মহারথ, কৃপাচার্য্যের সার্দ্ধ অযুত হস্তী ও শকুনির পাঁচ অযুত অশ্ব বিনাশ করিয়া ফেলিলেন।
অনন্তর মহাবীর অশ্বত্থামা অন্য রথে আরোহণপূর্ব্বক রোষাবিষ্টচিত্তে সাত্যকির বিনাশ-বাসনায় ধাবমান হইলেন। অরাতিনিপাতন সাত্যকি পুনরায় দ্রোণপুত্রকে সমাগত সন্দর্শন করিয়া উপর্যুপরি নিশিত শর নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার হৃদয় বিদীর্ণ করিতে লাগিলেন। মহাধনুর্দ্ধর অশ্বত্থামা এইরূপে অতিমাত্র বিদ্ধ ও নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া সহাস্য বদনে কহিতে লাগিলেন, হে সাত্যকে! আচার্য্যঘাতী দুষ্ট ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতি যে তোমার পক্ষপাত আছে, তাহা আমার অবিদিত নাই; কিন্তু তুমি কখনই আমার হস্ত হইতে উহাকে পরিত্রাণ করিতে বা স্বয়ং পরিত্রাণ প্রাপ্ত হইতে সমর্থ হইবে না। আমি সত্য ও তপস্যাদ্বারা শপথ করিয়া কহিতেছি যে, সমস্ত পাঞ্চালগণকে বিনাশ না করিয়া কখনই শান্তিলাভ করিব না। তুমি পাণ্ডবসৈন্য, বৃষ্ণি-সৈন্য ও সোমকদিগকে একত্র করিলেও আমি তাহাদের সকলকে বিনষ্ট করিব।
হে মহারাজ! মহাবীর অশ্বত্থামা এইরূপ কহিয়া পুরন্দর যেমন বৃত্রাসুরের প্রতি বজ্র নিক্ষেপ করিয়াছিলেন, তদ্রূপ সাত্যকির প্রতি এক সূর্য্যরশ্মিসদৃশ সুপর্ব্ব উৎকৃষ্ট শর নিক্ষেপ করিলেন। অশ্বত্থামা নিক্ষিপ্ত সায়ক সাত্যকির বৰ্ম্মসংবৃত দেহ ভেদ করিয়া, ভুজঙ্গ যেমন নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক বিলমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ ধরাতলে প্রবিষ্ট হইল। মহারাজ! মহাবীর সাত্যকি সেই বাণের আঘাতেই অঙ্কুশাহত মাতঙ্গের ন্যায় অতিমাত্র কাতর ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া সশর শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক রথোপরি অবসন্ন হইলেন। তখন সারথি সত্বর তাঁহাকে লইয়া অশ্বত্থামার নিকট হইতে পলায়ন করিল। তখন ভারদ্বাজতনয় ধৃষ্টদ্যুম্ন ভ্রূদ্বয়ের মধ্যস্থলে এক আনতপর্ব্ব সুপুঙ্খ শর নিক্ষেপ করিলেন। পাঞ্চালতনয় পূর্ব্বেই অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়াছিলেন, এক্ষণে পুনরায় শরপীড়িত হইয়া ধ্বজযষ্টি অবলম্বনপূর্ব্বক রথোপরি অবসন্ন হইলেন। এইরূপে ধৃষ্টদ্যুম্ন সিংহাদ্দিত কুঞ্জরের ন্যায় অশ্বত্থামার শরনিকরে নিপীড়িত হইলে পাণ্ডবপক্ষ হইতে মহাবীর অর্জুন, ভীমসেন, পুরুবংশোদ্ভব বৃহৎক্ষেত্র, চেদিদেশীয় যুবরাজ ও অবন্তীনাথ সুদর্শন - এই পাঁচ মহারথ শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক হাহাকার করিতে করিতে দ্রুতবেগে অশ্বত্থামার অভিমুখে গমন করত চতুৰ্দ্দিক্ হইতে তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। পরে তাঁহারা সকলেই বিংশতি পাদ গমনপূর্ব্বক যত্নসহকারে ক্রোধাবিষ্ট গুরুপুত্রের উপর যুগপৎ পাঁচ পাঁচ শর নিক্ষেপ করিলেন। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা আশীবিষসদৃশ পঞ্চবিংশতি শরদ্বারা একবারে তাঁহাদিগের পঞ্চবিংশতি বাণ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। পরে বৃহৎক্ষেত্র সাত, অবন্তীনাথকে তিন, অর্জুনকে এক ও বৃকোদরকে ছয় শরে নিপীড়িত করিলেন। মহারথগণ অশ্বত্থামার শরে বিদ্ধ হইয়া কখন সকলে যুগপৎ, কখন পৃথক্ পৃথক্ সুবর্ণপুঙ্খ শাণিত শরনিকরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। পরে যুবরাজ বিংশতি, অর্জুন আট ও অন্য তিন জনে তিন তিন শরে অশ্বত্থামাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা অর্জুনকে ছয়, বাসুদেবকে দশ, ভীমসেনকে পাঁচ, যুবরাজকে চারি এবং মালব ও পৌরবকে দুই দুই বাণে আহত করিয়া ভীমসেনের সারথির উপর ছয় বাণ নিক্ষেপ ও দুই বাণে তাঁহার কাৰ্ম্মক ও ধ্বজ ছেদনপূর্ব্বক পুনরায় পার্থের প্রতি শরজাল বর্ষণ করত সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। ইন্দ্রতুল্য পরাক্রম উগ্রতেজাঃ দ্রোণতনয়ের অগ্র ও পশ্চাদ্ভাগে নিক্ষিপ্ত সুনিশিত শরজালে ভূমণ্ডল, দিত্মণ্ডল ও আকাশমণ্ডল সমাচ্ছন্ন হইল। তখন তিনি সুনিশিত তিন শরে সন্নিহিত রথারূঢ় সুদর্শনের ইন্দ্রকেতুসদৃশ ভুজদ্বয় ও মস্তক যুগপৎ ছেদনপূর্ব্বক রথশক্তি-দ্বারা পৌরবকে আহত এবং শরনিকরে তাঁহার হরিচন্দনচর্চ্চিত বাহুদ্বয় ও রথ খণ্ড খণ্ড করিয়া ভল্লদ্বারা মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় নীলোৎপল সমদ্যুতি চেদিদেশীয় যুবরাজও সারথি এবং অশ্বগণের সহিত অশ্বত্থামার প্রজ্বলিত অনলতুল্য শরনিকরে নিপীড়িত হইয়া প্রাণত্যাগ করিলেন।
তখন মহাবাহু ভীমসেন মালব, পৌরব ও চেদিদেশীয় যুবরাজকে দ্রোণপুত্রের শরে নিহত দেখিয়া সরোষ নয়নে ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গসদৃশ সুনিশিত শরনিকর নিক্ষেপপূর্ব্বক অশ্বত্থামাকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। মহাতেজাঃ দ্রোণতনয় সেই ভীমনিক্ষিপ্ত শরজাল নিবারণপূর্ব্বক তাঁহাকে নিশিত শরনিকরে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত বৃকোদর ক্ষুরপ্রদ্বারা অশ্বত্থামার শরাসন ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে শরবিক্ষত করিতে লাগিলেন। মহামনাঃ দ্রোণনন্দন তৎক্ষণাৎ সেই ছিন্ন চাপ পরিত্যাগপূর্ব্বক অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া ভীমসেনকে শরজালে নিপীড়িত করিলেন। এইরূপে মহাবল পরাক্রান্ত অশ্বত্থামা ও ভীমসেন জলধারাবর্ষী জলধরদ্বয়ের ন্যায় শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। যেরূপ দিনকর মেঘজালে আবৃত হইয়া থাকেন, তদ্রূপ দ্রোণকুমার ভীমনামাঙ্কিত সুবর্ণপুঙ্খ সুনিশিত শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইলেন। ভীমসেনও দ্রোণপুত্র-পরিত্যক্ত নতপর্ব্ব শরজালে সমাবৃত হইতে লাগিলেন। হে মহারাজ! ঐ সময় বৃকোদর দ্রোণপুত্রের অসংখ্য শরে আহত হইয়াও কিছুমাত্র ব্যথিত হইলেন না দেখিয়া সকলেই চমৎকৃত হইল। অনন্তর মহাবীর পাণ্ডবতনয় সুবর্ণবিভূষিত যমদণ্ডসদৃশ নিশিত দশ নারাচ পরিত্যাগ করিলেন। ভুজঙ্গমগণ যেমন বল্মীকমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ সেই নারাচসকল দ্রোণপুত্রের জক্রদেশ ভেদ করিয়া দেহমধ্যে প্রবিষ্ট হইল। অশ্বত্থামা এরূপে মহাত্মা ভীমসেনকর্তৃক বিদ্ধ হইয়া ধ্বজযষ্টি অবলম্বনপূর্ব্বক নয়নদ্বয় নিমীলিত করিলেন এবং মুহূর্ত্তমধ্যে পুনরায় সংজ্ঞা লাভ করত সরোষ নয়নে ও শোণিতাক্ত-কলেবরে ভীমসেনের রথের প্রতি ধাবমান হইয়া আকর্ণপূর্ণ আশীবিষসদৃশ শত বাণ পরিত্যাগ করিলেন। সমরশ্লাঘী ভীমসেনও তাঁহার বলবীর্য্য স্মরণ করিয়া ভীষণ শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন অশ্বত্থামা নিশিত শরজালে ভীমসেনের কার্ম্মুক ছেদন ও কলেবর ক্ষত-বিক্ষত করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর বৃকোদর তৎক্ষণাৎ অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক শাণিত পাঁচ বাণে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে সেই রোষতাম্রাক্ষ বীরদ্বয় বর্ষাকালীন বারিবর্ষী মেঘদ্বয়ের ন্যায় শরজাল বর্ষণপূর্ব্বক পরস্পরকে সমাচ্ছন্ন ও ভীষণ তলশব্দে মেদিনীমণ্ডল কম্পিত করত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন শরৎকালীন মধ্যাহ্নগত দিনকরসদৃশ প্রতাপশালী দ্রোণনন্দন সুবর্ণভূষিত শরাসন বিস্ফারণপূর্ব্বক শরবর্ষী ভীমসেনের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় তিনি কখন যে শরনিকর গ্রহণ, কখন সন্ধান, কখন আকর্ষণ ও কখনই বা বিসর্জন করিতে লাগিলেন, তাহা কিছুমাত্র দৃষ্টিগোচর হইল না। তাঁহার চাপমণ্ডল অলাতচক্রের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল এবং শরাসনচ্যুত সহস্র শর আকাশমার্গে শলভশ্রেণীর ন্যায় শোভা ধারণ করিল। তখন ভীমসেনের রথ দ্রোণপুত্রের সেই সুবর্ণালঙ্কৃত শরজালে সমাচ্ছন্ন হইয়া গেল। হে মহারাজ। ঐ সময় আমরা ভীমপরাক্রম ভীমসেনের অদ্ভুত বলবীর্য্য ও কার্য্য অবলোকন করিলাম। তিনি অশ্বত্থামার সেই শরবৃষ্টি জলধারার ন্যায় জ্ঞান করিয়া তাঁহার বিনাশার্থ সুতীক্ষ্ণ শরজাল বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তাঁহার সুবর্ণপৃষ্ঠ ভীষণ শরাসন সমাকৃষ্ট হইয়া দ্বিতীয় ইন্দ্রচাপের ন্যায় শোভমান হইল এবং ঐ চাপ হইতে সহস্র শর বিনির্গত হইয়া রণবিশারদ দ্রোণপুত্রকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিল।
হে মহারাজ! এইরূপে সেই বীরদ্বয় মহাবেগে শর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে বোধ হইতে লাগিল যে, সমীরণ সেই শরবৃষ্টির মধ্যে প্রবেশ করিতে সমর্থ নহে। তৎপরে দ্রোণনন্দন ভীমসেনের বিনাশ-কামনায় কাঞ্চনমণ্ডিত তৈলধৌত শরনিকর পরিত্যাগ করিলেন। বলবান ভীমসেন বিশিখদ্বারা অন্তরীক্ষে তাঁহার প্রত্যেক শর ত্রিধা ছেদনপূর্ব্বক দ্রোণপুত্রকে থাক্ থাক্, বলিয়া তাঁহার বিনাশার্থ পুনরায় ভীষণ শরসমূহ বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাস্ত্রবেত্তা অশ্বত্থামা অস্ত্রদ্বারা সেই ভীম-নির্মুক্ত শরবৃষ্টি নিবারণপূর্ব্বক ভীমসেনের শরাসন ছেদন করিয়া তাঁহাকে অসংখ্য শরে নিপীড়িত করিলেন। তখন বলবান্ বৃকোদর চাপবিহীন হইয়া ক্রোধভরে অশ্বত্থামার রথের প্রতি সুদারুণ রথশক্তি নিক্ষেপ করিলেন। দ্রোণকুমারও পাণিলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক নিশিত শরনিকরে মহোল্কাসদৃশ সহসা সমাগত রথশক্তি ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ইত্যবসরে মহাবীর ভীমসেন সুদৃঢ় শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক হাসিতে হাসিতে বিশিখজালে অশ্বত্থামাকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন দ্রোণতনয় আনত-পর্ব্ব শরদ্বারা ভীমসেনের সারথির ললাট বিদারণ করিলেন। সারথি অশ্বত্থামার শরে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া অশ্বরশ্মি পরিত্যাগপূর্ব্বক বিমোহিত হইল। সারথি মোহিত হইলে অশ্ব-গণ ধনুর্দ্ধরগণের সমক্ষে পলায়ন করিতে লাগিল। তখন অপরাজিত অশ্বত্থামা ভীমসেনকে পলায়মান অশ্বগণকর্তৃক সমর হইতে অপনীত অবলোকন করিয়া আহ্লাদিতচিত্তে বিপুল শঙ্খ বাদিত করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে ভীমসেন পলায়ন-পরায়ণ হইলে পাঞ্চালগণও ধৃষ্টদ্যুম্নের রথ পরিত্যাগপূর্ব্বক শঙ্কিতচিত্তে চতুৰ্দ্দিকে পলায়ন করিতে লাগিল। তখন দ্রোণতনয় সেই পলায়মান পাণ্ডবসেনাকে শরনিকরে নিপীড়িত করত মহাবেগে তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। তখন পাণ্ডবপক্ষীয় অন্যান্য ক্ষত্রিয়গণ অশ্বত্থামার শরনিকরে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া ভীতমনে দশদিকে পলায়ন করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় মহাবীর ধনঞ্জয় সেই সমস্ত সৈন্যগণকে ছিন্ন ভিন্ন দেখিয়া অশ্বত্থামাকে সংহার করিবার বাসনায় তাহাদিগকে নিবারণ করিলেন। সৈন্যগণ অর্জুন ও বাসুদেবের প্রযত্নে নিবারিত হইয়া তথায় অবস্থান করিতে লাগিল। তখন একমাত্র ধনঞ্জয়, সোমক, যবন, মৎস্য ও অন্যান্য পৌরবগণের সহিত সমবেত হইয়া অবিলম্বে সিংহ-লাঙ্গুলধ্বজ অশ্বত্থামার নিকট গমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে গুরুপুত্র! তুমি পুনরায় আমাকে তোমার সেই বল, বীর্য্য, জ্ঞান, পুরুষকার, দিব্যতেজঃ এবং ধার্তরাষ্ট্রগণের প্রতি প্রীতি ও আমাদিগের প্রতি বিদ্বেষ-বুদ্ধি প্রদর্শন কর। এক্ষণে দ্রোণসংহারকারী মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্নই তোমার অহঙ্কার চূর্ণ করিবেন; অতএব তুমি সেই কালানলতুল্য বিপক্ষগণের অন্তকসদৃশ ধৃষ্টদ্যুম্নের এবং আমার ও বাসুদেবের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। তুমি অতিশয় উদ্ধত, আমি অদ্যই তোমার দর্প চূর্ণ করিব।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা মহাবল পরাক্রান্ত ও সম্মানভাজন। অর্জুনের প্রতি তাঁহার সবিশেষ প্রীতি আছে এবং অর্জুনও তাঁহার প্রতি সমুচিত সদ্ভাব প্রদর্শন করিয়া থাকে। অর্জুন স্বীয় প্রিয়সখা অশ্বত্থামাকে লক্ষ্য করিয়া পূর্ব্বে কখনই এইরূপ কঠোর বাক্য প্রয়োগ করে নাই, কিন্তু আজি কি নিমিত্ত তাঁহাকে এইরূপ কহিল?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! ইতিপূর্ব্বে যুধিষ্ঠিরের সেই সমস্ত বাক্যে মহাবীর ধনঞ্জয়ের মর্ম্মদেশ নিতান্ত ব্যথিত হইয়াছিল। এক্ষণে আবার চেদিদেশীয় যুবরাজ, পুরুবংশীয় বৃহৎক্ষত্র ও মালবদেশীয় সুদর্শন নিহত এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি -ও ভীমসেন পরাজিত হইলে পূর্ব্বদুঃখসমুদায় স্মৃতিপথে সমারূঢ় হওয়াতে তাঁহার অন্তঃকরণে অভূতপূর্ব্ব ক্রোধের উদ্রেক হইল। এই নিমিত্তই তিনি কাপুরুষের ন্যায় সম্মানভাজন অশ্বত্থামার উপর নিতান্ত অনুপযুক্ত অশ্লীল ও অপ্রিয় বাক্য প্রয়োগ করিলেন। হে মহারাজ! আচার্য্যতনয় ক্রোধোপহতচিত্ত ধনঞ্জয়-কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া তাঁহার ও বিশেষতঃ বাসুদেবের উপর সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইলেন। তখন তিনি আচমনপুরঃসর যত্নসহকারে দেবগণেরও দুর্দ্ধর্ষ বিধূম পাবকসদৃশ আগ্নেয়-অস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক মন্ত্রপূত করিয়া দৃশ্য ও অদৃশ্য শত্রুগণের উদ্দেশে চতুর্দিকে নিক্ষেপ করিলেন। সেই অস্ত্রের প্রভাবে নভোমণ্ডলে জ্বালাকরাল ভীষণ শরবৃষ্টি প্রাদুর্ভূত হইয়া অর্জুনকে পরিবেষ্টন করিল। ঐ সময় গগনতল হইতে মহোল্কাসকল নিপতিত হইতে লাগিল। ক্ষণকালমধ্যে, গাঢ়তর অন্ধকার সহসা সেনাগণকে সমাচ্ছন্ন করিল। দিঘণ্ডল অপ্রকাশিত হইল। রাক্ষস ও পিশাচগণ সমবেত হইয়া ভীষণ নিনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিল। অমঙ্গলজনক সমীরণ প্রবাহিত হইল। সূর্য্যদেব আর উত্তাপ প্রদানে সমর্থ হইলেন না। বায়সগণ চতুৰ্দ্দিকে ভয়ঙ্কর রবে চীৎকার করিতে লাগিল। জলদজাল রুধিরধারা বর্ষণপূর্ব্বক গম্ভীর গর্জন করিতে আরম্ভ করিল। তৎকালে গো প্রভৃতি পশু-পক্ষী ও ব্রতপরায়ণ মুনিগণ শান্তিলাভে সমর্থ হইলেন না। মহাভূতসকল পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। বোধ হইল যেন, সূর্য্যের সহিত সমুদায় বিশ্ব উদ্ভ্রান্ত ও জুরাবিষ্টের ন্যায় নিতান্ত সন্তপ্ত হইতেছে। মাতঙ্গগণ অস্ত্রতেজে সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়া তাহা হইতে পরিত্রাণ পাইবার নিমিত্ত দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ-পূর্ব্বক ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল। জলাশয়সকল সন্তপ্ত হওয়াতে তন্মধ্যস্থিত জীবজন্তুগণ তেজঃপ্রভাবে দগ্ধপ্রায় হইয়া কোনক্রমেই শান্তিলাভে সমর্থ হইল না। ঐ সময় দিত্মণ্ডল ও নভোমণ্ডল হইতে গরুড় ও সমীরণের তুল্য বেগশালী নানাবিধ শরনিকর প্রাদুর্ভূত হইতে লাগিল। অরাতিগণ মহাবীর অশ্বত্থামার বজ্রবেগ তুল্য সেই সমস্ত শরদ্বারা সমাহত ও দগ্ধ হইয়া অনলদগ্ধ পাদপের ন্যায় নিপতিত হইল। উন্নতকায় মাতঙ্গগণ শরানলে দগ্ধ হইয়া জলধরের ন্যায় গভীর গর্জন করত ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল। তন্মধ্যে কতকগুলি অরণ্যমধ্যে দাবানল পরিবেষ্টিত হইয়াই যেন ভীতচিত্তে অনবরত চীৎকার করত ধাবমান হইল। অশ্ব ও রথসকল কাননমধ্যে দাবানলদগ্ধ মহীরুহশিখরের ন্যায় দৃষ্টিগোচর হইতে লাগিল। বহুসংখ্যক রথ ভস্মীভূত হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। এইরূপে ভগবান্ হুতাশন প্রলয়কালীন সম্বর্ত্তক অনলের ন্যায় সেই পাণ্ডবসৈন্যকে দগ্ধ করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! আপনার পক্ষীয় বীরগণ এইরূপে অশ্বত্থামার শর প্রভাবে পাণ্ডবসৈন্যগণকে দগ্ধ হইতে দেখিয়া হৃষ্টমনে সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক অবিলম্বে তূর্য্যধ্বনি করিতে লাগিলেন। তৎকালে চতুৰ্দ্দিক অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হওয়াতে মহাবীর অর্জুন ও সমস্ত সৈন্যগণকে আর কেহই দেখিতে পাইল না। হে মহারাজ! দ্রোণাত্মজ অশ্বত্থামা ঐ সময় ক্রোধভরে যেরূপ অস্ত্রপ্রয়োগ করিয়াছিলেন, আমরা পূর্ব্বে আর কখন সেইরূপ অস্ত্র দর্শন বা শ্রবণ করি নাই।
এইরূপে অশ্বত্থামার শরজালপ্রভাবে সমুদায় সৈন্য নিতান্ত নিপীড়িত হইলে মহাবীর ধনঞ্জয় উহা প্রতিহত করিবার নিমিত্ত ব্রহ্মাস্ত্র পরিত্যাগ করিলেন। তখন মুহূর্তকালমধ্যে সেই গাঢ়তর অন্ধকার নিরাকৃত ও দিঘণ্ডল সুনিৰ্ম্মল হইল। সুশীতল অনিল প্রবাহিত হইতে লাগিল। ঐ সময় আমরা সেই অক্ষৌহিণী সেনা অস্ত্রতেজে দগ্ধ ও অনভিব্যক্ত রূপে নিহত নিরীক্ষণ করিলাম। অনন্তর মহাবীর ধনঞ্জয় ও বাসুদেব ঘোর অন্ধকার হইতে বিমুক্ত হইয়া অক্ষত শরীরে পতাকা, ধ্বজ, রথ, অশ্ব, অনুকর্ষ ও আয়ুধের সহিত সুশোভিত ও নভোমণ্ডলে চন্দ্র-সূর্য্যের ন্যায় অবলোকিত হইলেন। তখন পাণ্ডবগণ একান্ত হৃষ্ট হইয়া মুহূৰ্ত্তমধ্যে তুমুল কোলাহল এবং শঙ্খ ও ভেরী ধ্বনি করিতে লাগিলেন। উভয় পক্ষীয় সেনাগণ কেশব ও অর্জুনকে তেজঃসমাচ্ছন্ন নিরীক্ষণ করিয়া নিহত বলিয়া স্থির করিয়াছিল; এক্ষণে ঐ বীরদ্বয়কে অক্ষত দেখিয়া হৃষ্টান্তঃকরণে শঙ্খধ্বনি করিতে আরম্ভ করিল। তখন কৌরবগণ পাণ্ডবদিগকে প্রফুল্ল-চিত্ত নিরীক্ষণ করিয়া একান্ত ব্যথিত হইল।
অনন্তর মহাবীর অশ্বত্থামা কৃষ্ণ ও অর্জুনকে তেজঃ-প্রতিমুক্ত অবলোকন করিয়া দুঃখিত মনে মুহূর্তকাল তদ্বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলেন এবং পরিশেষ শোকাকুলিতচিত্তে বিষণ্ণ মনে দীর্ঘ উষ্ণ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কাৰ্ম্মক পরিহারপূর্ব্বক মহাবেগে রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া "অহোধিক্! সমুদায়ই মিথ্যা!” এই কথা বারংবার উচ্চারণ করত রণস্থল হইতে মহাবেগে গমন করিতে লাগিলেন। গমনকালে নীরদশ্যামল বেদবিভক্তা' দেবী সরস্বতীর আবাসস্বরূপ ব্যাসদেব তাঁহার সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। দ্রোণতনয় মহাত্মা কৃষ্ণদ্বৈপায়নকে নিরীক্ষণ করিয়া অভিবাদনপূর্ব্বক দীনভাবে ক্ষীণকণ্ঠে কহিলেন, হে ভগবন্। আমার অস্ত্র কি নিমিত্ত নিষ্ফল হইল? কোন মায়াপ্রভাবে বা আমার কোন ব্যতিক্রম হওয়াতে এই অস্ত্রশক্তির অনিয়ম ঘটিয়াছে, তাহা আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয় যে জীবিত আছেন, ইহা নিতান্ত আশ্চর্য্য। যাহা হউক, কালকে অতিক্রম করা নিতান্ত দুষ্কর। আমি অস্ত্র প্রয়োগ করিলে কি অসুর, কি গন্ধর্ব্ব, কি পিশাচ, কি রাক্ষস, কি সর্প, কি পক্ষী, কি মনুষ্য, কেহই উহা নিষ্ফল করিতে সমর্থ হয় না। কিন্তু এক্ষণে সেই মৎপ্রযুক্ত মৰ্ম্মঘাতী অস্ত্র কেবল সেই অক্ষৌহিণী সেনা বিনাশ করিয়া প্রশান্ত হইল। মর্ত্যধর্মপরায়ণ কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয় কি নিমিত্ত উহাতে বিনষ্ট হইলেন না? হে ভগবন্! আপনি ইহার যথার্থ স্বরূপ কীর্তন করুন; শ্রবণ করিতে আমার অতিশয় অভিলাষ হইতেছে। মহাত্মা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন দ্রোণপুত্রকর্তৃক এইরূপে প্রার্থিত হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে ভারদ্বাজতনয়! তুমি বিস্ময়ান্বিত হইয়া আমাকে যে গুরুতর বিষয় জিজ্ঞাসা করিতেছ, তৎসমস্ত কীর্ত্তন করিতেছি, অবহিত হইয়া শ্রবণ কর। পূর্ব্বকালে পূর্ব্বতন লোকদিগেরও পূর্ব্বজ বিশ্বকর্তা ভগবান্ নারায়ণ কার্য্য সাধনার্থ ধর্ম্মের পুত্র হইতে জন্ম পরিগ্রহ করেন। সেই সূর্য্য ও অনলপ্রতিম কমললোচন মহাতেজাঃ হিমালয় পর্ব্বতে প্রথমতঃ ষষ্টিলক্ষ ও ষষ্টিসহস্র বৎসর ঊর্দ্ধবাহু হইয়া বায়ু ভক্ষণপূর্ব্বক কঠোর তপোনুষ্ঠান করত আত্মাকে পরিশুষ্ক করিয়াছিলেন। তৎপরে তিনি পূর্ব্বপেক্ষা দ্বিগুণ কাল অন্য কঠোর তপশ্চরণ করিয়া তেজঃ-প্রভাবে রোদসী পরিপূরিত করিলেন এবং পরিশেষে সেই তপঃপ্রভাবে নিতান্ত নির্লেপ্ত হইয়া একান্ত দুর্নিরীক্ষ্য দেবাদিদেব বিশ্বযোনি জগৎপতি পশুপতির সন্দর্শন লাভে কৃতকার্য্য হইলেন। মহাত্মা ত্রিপুরনিসূদন শম্ভু সর্ব্বদেবের প্রভু এবং সূক্ষ্ম হইতেও সূক্ষ্মতর ও মহৎ হইতেও মহত্তর। তিনি রুদ্র, ঈশান, হর, জটাজুটধারী, চৈতন্যস্বরূপ এবং স্থাবর ও জঙ্গমের নিদানভূত। তিনি শুভ্র, দুর্নিবার, তিগ্নমন্যু' সর্ব্বসংহর্তা, প্রচেতা', অনন্তবীর্য্য এবং দিব্য শরাসন ও তৃণীর, হিরণ্যবৰ্ম্ম, পিনাক, বজ্র, শূল, পরশু, গদা, সুদীর্ঘ অসি ও মুষলধারী। অহি তাঁহার যজ্ঞোপবীত, পরিধেয় ব্যাঘ্রাজিন, করে দণ্ড ও বাহুতে অঙ্গদ; তিনি সতত জীবসমূহে পরিবেষ্টিত, অদ্বিতীয় পুরুষ ও তপস্যার নিধান। বৃদ্ধেরা ইষ্টবাক্যদ্বারা সতত তাঁহাকে স্তুতি করিয়া থাকেন। তিনি স্বর্গ, মর্ত্য, চন্দ্র, সূর্য্য, বায়ু, জল, অগ্নি ও এই জগতের পরিমাণ। দুরাচারেরা কখনই সেই মোক্ষদাতা, ব্রহ্মদ্বেষি-নিহন্তা' আদিপুরুষের দর্শনে সমর্থ হয় না। বিশুদ্ধবৃত্ত ব্রাহ্মণগণ বিশোক ও নিষ্পাপ হইলে তাঁহার দর্শন লাভ করিতে পারেন।
হে ভারদ্বাজতনয়! ভগবান্ নারায়ণ সেই তেজোনিধান অক্ষমালাধারী পার্ব্বতীর সহিত ক্রীড়মান অন্ধকনিপাতক বিরূপাক্ষকে দর্শন করিয়া হৃষ্টচিত্তে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতপুরঃসর ভক্তিভাবে তাঁহাকে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। হে আদিদেব! হে বরেণ্য! দেবগণেরও পূর্ব্বজ যে প্রজাপতিগণ এই বসুন্ধরা রক্ষা করিতেছেন, তাঁহারা সকলেই তোমার দেহসম্ভূত। তুমি সুর, অসুর, গন্ধর্ব, যক্ষ, রক্ষ, পিশাচ, নাগ, নর, সুপর্ণ প্রভৃতি বিবিধ জীবগণের সৃষ্টিকর্তা। তোমার নিমিত্তই ইন্দ্র, যম, বরুণ, কুবের, বিশ্বকর্মা, সোম ও পিতৃলোকেরা স্ব স্ব কার্য্য সাধন করিতেছেন। রূপ, জ্যোতিঃ, শব্দ, আকাশ, বায়ু, স্পর্শ, আজ্য, সলিল, গন্ধ, উর্ব্বী, কাল, ব্রহ্মন্, বেদ এবং চরাচর বিশ্ব তোমা হইতেই উদ্ভূত হইয়াছে। তোমার প্রভাবে সলিলরাশি পৃথক্ পৃথক্ অবস্থিত রহিয়াছে। কিন্তু প্রলয়কাল উপস্থিত হইলে সমস্ত একাকার হয়। কৃতবিদ্য ব্যক্তি প্রাণিগণের এইরূপ উৎপত্তি ও সংহার অবগত হইয়া তোমার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকেন। তুমি স্বপ্রকাশ, সত্যস্বরূপ মনোগম্য, জীবাত্মা ও পরমাত্মারূপ দুইটি পক্ষী, চতুর্ব্বিধ বাক্যরূপ শাখাসম্পন্ন পিপ্পলবৃক্ষ এবং পঞ্চমহাভূতঃ, মনঃ ও বুদ্ধি- এই সাত ও শরীর প্রতিপালক অন্য দশ ইন্দ্রিয়রূপ রক্ষকের সৃষ্টি করিয়াছ; কিন্তু তুমি ঐ সমুদায় হইতে স্বতন্ত্র। অনন্ততত্ব প্রযুক্ত তুমি অনিৰ্দ্দেশ্য; ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান এই কালত্রয় তোমারই সৃষ্ট এবং তোমা হইতেই সপ্ত ভুবন ও বিশ্বসংহার উৎপন্ন হইয়াছে। হে দেব! আমি তোমার নিতান্ত ভক্ত; এক্ষণে প্রার্থনা করিতেছি, তুমি আমার প্রতি কৃপাদৃষ্টি প্রদান কর। তুমি বিপক্ষেরও বিপক্ষ; এক্ষণে আমার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ কর; বিপক্ষতাচরণ করিও না। তুমি বৃহৎ, প্রকাশ স্বরূপ, দুর্জেয় ও আত্মা; লোকে তোমার তত্ত্ব অবগত হইলেই তোমাকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে।
হে দেবপ্রধান! তুমি সর্ব্বজ্ঞ ও স্বধর্মবেদ্য; আমি তোমাকে অর্চ্চনা করিবার নিমিত্ত তোমার স্তুতিবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছি। এক্ষণে তুমি বিকৃত না হইয়া আমাকে আমার অভিলষিত নিতান্ত দুর্লভ বর প্রদান কর।
হে দ্রোণপুত্র! নারায়ণ অচিন্ত্যাত্মা পিনাকপাণি নীলকণ্ঠকে এইরূপে স্তব করিলে তিনি তাঁহাকে বর প্রদান করত কহিলেন, হে নারায়ণ! আমি তোমার প্রতি প্রীত হইয়া কহিতেছি যে, মনুষ্য, দেব, দানব ও গন্ধর্ব্বগণের মধ্যে কেহই তোমার তুল্য বলশালী হইবে না। দেব, অসুর, উরগ, পিশাচ, গন্ধর্ব্ব, নর, রাক্ষস, বা সুপর্ণগণ বিশ্বমধ্যে কেহই তোমাকে পরাস্ত করিতে পারিবে না। তুমি সমরাঙ্গনে আমা হইতে অধিক পরাক্রমশালী হইবে; আমার প্রসাদে কোন ব্যক্তি কি শস্ত্র, কি বজ্র, কি অগ্নি, কি বায়ু, কি আর্দ্র বস্তু, কি শুষ্ক পদার্থ, কি স্থাবর, কি জঙ্গম দ্রব্য কিছুতেই তোমার ক্লেশোৎপাদন করিতে সমর্থ হইবে না। হে ভারদ্বাজতনয়! পূর্ব্বকালে হৃষীকেশ এইরূপে বর লাভকরিয়াছিলেন। এক্ষণে তিনি বাসুদেবরূপে মায়াপ্রভাবে সমুদায় জগন্মণ্ডল মুগ্ধ করিয়া বিচরণ করিতেছেন। মহাত্মা অর্জুন তাঁহা অপেক্ষা ন্যূন নহেন। উনি সেই নারায়ণের তপঃপ্রভাব-সঞ্জাত নরনামা মহর্ষি। ঐ দুই মহাত্মা আদ্য দেবগণেরও শ্রেষ্ঠ; উহারা লোকযাত্রা বিধানের নিমিত্ত যুগে যুগে জন্ম গ্রহণ করিয়া থাকেন। হে মহামতে! তুমিও সেই কৰ্ম্ম এবং তপোবলে তেজঃ ও ক্রোধযুক্ত হইয়া রুদ্রদেবের অংশে জন্ম পরিগ্রহ করিয়াছ। তুমি পূর্ব্ব জন্মে একজন দেবতুল্য বিজ্ঞ ছিলে। তুমি এই জগৎকে মহেশ্বরময় জ্ঞান করিয়া তাঁহার প্রিয়চিকীর্ষায় নিয়মদ্বারা আত্মাকে পরিক্লিষ্ট এবং পরম পবিত্র মন্ত্র জপ, হোম ও উপহারাদি দ্বারা সেই দেবাদিদেবকে অর্চ্চনা করিয়াছ। ভগবান্ রুদ্রদেব তোমার পূজায় প্রীত হইয়া তোমাকেও অভিমত উৎকৃষ্ট বরসকল প্রদান করেন। কৃষ্ণ ও অর্জুনের জন্ম, কৰ্ম্ম ও তপস্যা যেরূপ উৎকৃষ্ট, তোমারও তদ্রূপ। তাঁহারা যেরূপ যুগে যুগে দেবাদিদেবকে লিঙ্গে অর্চ্চনা করিয়াছেন, তুমিও তদ্রূপ করিয়াছ। যিনি মহাদেবকে সর্ব্বরূপ অবগত হইয়া সতত শিবলিঙ্গ অর্চ্চনা করিয়া থাকেন, ইনি সেই রুদ্রসম্ভূত ও রুদ্রভক্ত কেশব। উঁহাতে আত্মযোগ ও শাস্ত্রযোেগ নিরন্তর বিদ্যমান আছে। দেবগণ, সিদ্ধগণ ও মহর্ষিগণ পরলোকে উৎকৃষ্ট স্থান লাভার্থ সতত তাঁহার অর্চ্চনা করিয়া থাকেন। ভগবান্ বাসুদেব শিবলিঙ্গকে সর্ব্বভূতে উৎপত্তিকারণ জানিয়া সতত অর্চ্চনা করেন; মহাত্মা বৃষধ্বজও কৃষ্ণের প্রতি বিশেষ প্রীতি প্রদর্শন করিয়া থাকেন; অতএব বিবিধ যজ্ঞানুষ্ঠানপূর্ব্বক কৃষ্ণের অর্চ্চনা করা অবশ্য-কর্তব্য।
হে মহারাজ! জিতেন্দ্রিয় মহারথ দ্রোণপুত্র বেদব্যাসের সেই বাক্য শ্রবণগোচর করিয়া রুদ্রদেবকে নমস্কার ও কেশবকে মহান্ বলিয়া জ্ঞান করিতে লাগিলেন; তাঁহার গাত্র পুলকিত হইয়া উঠিল। তিনি তৎপরে মহর্ষি বেদব্যাসকে অভিবাদনপূর্ব্বক সৈন্যমধ্যে প্রতাগত হইয়া অবহার করিলেন। তখন পাণ্ডবগণও অবহারে প্রবৃত্ত হইলেন। হে মহারাজ! এইরূপে বেদপারদর্শী ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য্য পাঁচ দিনমাত্র যুদ্ধ করিয়া অসংখ্য সেনাবিনাশ-পূর্ব্বক ব্রহ্মলোকে গমন করিলেন, সমরাঙ্গনে আচার্য্য নিহত হওয়াতে কৌরবগণের দুঃখের আর পরিসীমা রহিল না।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! অতিরথাগ্রগণ্য দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নকর্তৃক নিহত হইলে পাণ্ডব ও কৌরবগণ কি করিল, তাহা আমার নিকট কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! দ্রোণাচার্য্য নিপাতিত ও কৌরবগণ রণপরাজুখ হইলে কুন্তীপুত্র ধনঞ্জয় স্বীয় বিজয়াবহ অদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করিয়া যদৃচ্ছাক্রমে সমাগত ব্যাসদেবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ভগবন্! আমি যৎকালে সংগ্রামে সুনিশিত শরনিকরে শত্রুনাশে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম, তৎকালে পাবকসন্নিভ কোন্ পুরুষকে আমার অগ্রভাগে অবলোকন করিলাম? তিনি শূল উত্তোলনপূর্ব্বক যে যে দিকে ধাবমান হইলেন, সেই সেই দিকের বিপক্ষগণ বিনষ্ট হইতে লাগিল। তৎকালে সকলে বোধ করিল যে, আমা হইতে সমুদায় সৈন্য ভগ্ন হইতেছে। কিন্তু বস্তুতঃ আমি তৎকালে কেবল সেই হুতাশনসন্নিভ পুরুষের পশ্চাদ্ভাগে অবস্থানপূর্ব্বক তৎকর্তৃক ভগ্ন সৈন্যগণকে নিপীড়িত করিয়াছি। হে মহর্ষে! সেই সূর্য্যের ন্যায় তেজঃসম্পন্ন শূলপাণি মহাপুরুষ কে? আমি দেখিলাম, তিনি ভূতলে পদ স্পর্শ বা শূল পরিত্যাগ করিলেন না। তাঁহার তেজঃপ্রভাবে শূল হইতে সহস্র সহস্র শূল বিনির্গত হইতে লাগিল। ব্যাসদেব কহিলেন, হে অর্জুন! তুমি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্রের নিদানস্বরূপ সর্ব্বশরীরশায়ী', ত্রৈলোক্যশরীর', সর্ব্ব-লোকনিয়ন্তা, তেজোময়, দেবাদিদেব মহাদেবকে দর্শন করিয়াছ। যে মহাত্মা ভুবনব্যাপী, জটিল, মঙ্গলদায়ক, ত্রিনেত্র, মহাভুজ, রুদ্র, শিখী, চীরবাসাঃ, স্থাণু, বরদাতা, জগৎপ্রধান, জগদানন্দ-কর, জগদ্যানি, বিশ্বাত্মা, বিশ্বস্রষ্টা, বিশ্বমূর্ত্তি, বিশ্বেশ্বর, কর্ম্মের ঈশ্বর, শম্ভু, স্বয়ম্ভু, ভূতনাথ, ত্রিকালস্রষ্টা, যোগস্বরূপ, যোগেশ্বর, বরিষ্ঠ, পরমেষ্ঠী, দুর্জেয়, জ্ঞানাত্মা, জ্ঞানস্বরূপ, জ্ঞানগম্য, লোকত্রয়বিধাতা, লোকত্রয়ের আশ্রয়, জন্ম-মৃত্যু-জরাবিহীন ও ভক্তগণের বাঞ্ছিতপ্রদ, তুমি সেই দেবাদিদেবের শরাণাপন্ন হও। বামন, জটিল, মুণ্ডী, হ্রস্বগ্রীব, মহোদর, মহাকায়, মহোৎসাহ ও মহাকর্ণ প্রভৃতি বিবিধ বিকৃত বেশধারী, বিকৃতান, বিকৃতপাদ প্রাণিগণ তাঁহার পারিষদ। তিনি তাঁহাদের কর্তৃক পূজিত হইয়া প্রসন্নচিত্তে তোমার অগ্রে গমন করিয়া থাকেন। সেই লোমহর্ষণ ভয়ঙ্কর সংগ্রামে বহুরূপধর মহাধনুর্দ্ধর মহেশ্বর ভিন্ন আর কোন্ ব্যক্তি মহাবীর অশ্বত্থামার, কূপ ও কর্ণের রক্ষিত সেনাগণকে পরাভব করিতে বাসনা করিতে পারে? যাহা হউক, মহাত্মা মহেশ্বর অগ্রে অবস্থিত হইলে কোন ব্যক্তি সংগ্রামে অবস্থান করিতে সমর্থ হয় না। এই ত্রিলোকমধ্যে তাঁহার সমান আর কেহই নাই। মহাদেব কোপাবিষ্ট হইলে তাঁহার আগমনেই অসংখ্য সৈন্য নিহত, কম্পিত ও পতিত হইয়া থাকে। স্বর্গে সুরগণ নিরন্তর তাঁহাকে নমস্কার করেন। যে সমস্ত স্বর্গ-লাভোপযুক্ত ব্যক্তি এবং অন্যান্য মানবগণ সেই উমাপতি মহাদেবের অর্চ্চনা করিয়া থাকেন, তাঁহারা ইহালোকে সুখ-স্বছন্দে কালযাপন করিয়া পরলোকে সঙ্গতি লাভ করেন, সন্দেহ নাই। অতএব হে অর্জুন! তুমি সেই রুদ্র, নীলকণ্ঠ, সূক্ষ্ম, দীপ্ততম, কপর্দী, করাল, পিঙ্গলাক্ষ, বরদ, যাম্য, রক্তকেশ, সদাচারনিরত, শঙ্কর, কল্যাণকর, হরিনেত্র, স্থাণু, হরিকেশ, কৃশ ভাস্কর, সুতীর্থ, দেবদেব, বেগবান, বহুরূপ, প্রিয়, প্রিয়বাসাঃ, উষ্ণীষধর, সুবজ্র, বৃষ্টিকর্তা, গিরিশ, প্রশান্ত, যতি, চীরবাসাঃ, সুবর্ণালঙ্কৃতবাহু, উগ্র, দিপতি, পর্জন্যপতি, ভূতপতি, বৃক্ষপতি, গোপতি, বৃক্ষাবৃতদেহ, সেনানী, অন্তর্যামী, ধ্রুবহস্ত, ধনুর্দ্ধর, ভার্গব, বিশ্বপতি, মুঞ্জবাসাঃ সহস্রমস্তক, সহস্রনয়ন, সহস্রবাহু ও সহস্রচরণ, ভূতভাবন ভগবান্কে নিরন্তর নমস্কার কর। যিনি বরদ, ভুবনেশ্বর, উমাপতি, বিরূপাক্ষ, দক্ষযজ্ঞবিনাশন, প্রজাপতি, অনাকূল, ভূপতি, অব্যয়, কপদী, ব্রহ্মাদির ভ্রাময়িতা, প্রশস্তগৰ্ত্ত, বৃষধ্বজ, ত্রৈলোক্যসংহারসমর্থ, ধর্মপতি, ধৰ্ম্মপ্রধান, ইন্দ্রাদির শ্রেষ্ঠ, বৃষাঙ্ক, ধার্মিকগণের বহু ফলপ্রদ, সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মস্বরূপ, যোগধৰ্ম্মৈকগম্য, শ্রেষ্ঠ প্রহরণধারী, ধর্মাত্মা, মহেশ্বর, মহোদর, মহাকায়, দ্বীপিচৰ্ম্মবাসাঃ, লোকেশ, বরদ, ব্রহ্মণ্য, ব্রাহ্মণপ্রিয়, ত্রিশূলপাণি, খড়াচৰ্ম্মধারী, পিনাকী, লোকপতি ও ঈশ্বর, তুমি সেই দেবদেব মহাদেবের শরণাপন্ন হও। আমি সেই চীরবাসাঃ শরণ্য ঈশান দেবের শরণাপন্ন হইলাম। সেই বৈশ্রবণসখা, সুরেশ, সুবাসাঃ, সুব্রত, সুধন্বা, প্রিয়ধন্বা, বাণস্বরূপ, মৌর্ব্বীস্বরূপ, ধনুঃস্বরূপ, ধনুর্ব্বেদগুরু, উগ্রায়ুধ, দেব, সুরাগ্রগণ্য, বহুরূপ, বহু ধনুর্দ্ধর, স্থাণু, ত্রিপুরঘ্ন, ভগনেত্রঘ্ন, বনস্পতির পতি, নরগণের পতি, মাতৃগণের পতি, গণপতি, গোপতি, যজ্ঞপতি, জলপতি, দেবপতি, পৃষ্ণাদন্ত-বিনাশন, এ্যম্বক, বরদ, হর, নীলকণ্ঠ ও স্বর্ণকেশ ভগবানকে নমস্কার।
হে ধনঞ্জয়! এক্ষণে আমি আপনার জ্ঞান ও শ্রবণানুসারে তাঁহার দিব্য কৰ্ম্মসমুদায় তোমার নিকট কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। তিনি কোপাবিষ্ট হইলে সুর, অসুর, গন্ধর্ব্ব ও রাক্ষসগণ পাতালগত হইয়াও পরিত্রাণ পায় না। পূর্ব্বে দক্ষরাজ যজ্ঞের সমুদায় সামগ্রী আহরণ করিয়া বিধিপূর্ব্বক যজ্ঞ আরম্ভ করিয়া-ছিলেন। মহাদেব কুপিত ও নিৰ্দ্দয় হইয়া তাঁহার যজ্ঞ ধ্বংস করত বাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক ভীষণ নিনাদ করিতে লাগিলেন। তখন সুরগণই কেহ শান্তিলাভে সমর্থ হইলেন না। তাঁহারা মহেশ্বরকে কুপিত ও সহসা যজ্ঞ বিনষ্ট দর্শন এবং তাঁহার জ্যানির্ঘোষ শ্রবণ করিয়া নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। তখন সমুদায় সুরাসুর নিপতিত ও মহাদেবের বশীভূত হইলেন। তৎকালে সলিলরাশি সংক্ষুব্ধ, বসুন্ধরা কম্পিতা, পৰ্ব্বত ও দিক্সকল বিশীর্ণ এবং নাগগণ মোহিত হইতে লাগিল। গাঢ় অন্ধকার প্রাদুর্ভূত হওয়াতে সমুদায়ই অপ্রকাশিত হইল। সূর্য্য প্রভৃতি সমুদায় জ্যোতিঃপদার্থের প্রভা ধ্বংস হইয়া গেল। ঋষিগণ ভীত ও সংক্ষুব্ধ হইয়া আপনাদিগের ও অন্যান্য প্রাণিগণের মঙ্গলার্থ শান্তি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সূর্য্যদেব যজ্ঞীয় পুরোডাশ ভক্ষণ করিতেছিলেন, শঙ্কর হাস্যমুখে তাঁহার নিকট ধাবমান হইয়া তাঁহার দশনোৎপাটন করিলেন। দেবগণ তদ্দর্শনে কম্পিত-কলেবর হইয়া তাঁহার চরণে প্রণিপাতপূর্ব্বক যজ্ঞস্থল হইতে পলায়ন করিতে লাগিলেন। মহাদেব তাহাতেও ক্ষান্ত না হইয়া পুনরায় দেবগণের প্রতি স্ফুলিঙ্গ ও ধূমপূর্ণ সুনিশিত শরজাল সন্ধান করিলেন। তখন দেবগণ তাঁহাকে প্রণাম করত তাঁহার নিমিত্ত বিশিষ্টরূপ যজ্ঞভাগ কল্পিত করিয়া তাঁহার শরণাপন্ন হইলেন। তখন কৈলাসনাথ কোপ পরিত্যাগপূর্ব্বক সেই যজ্ঞ পুনঃস্থাপন করিলেন। হে অর্জুন! সুরগণ সেই অবধি তাঁহার নিকট নিতান্ত ভীত আছেন; অদ্যাপি তাঁহাদের ভয় দূরীভূত হয় নাই।
পূর্ব্বকালে স্বর্গে মহাবল পরাক্রান্ত অসুরগণের সুবর্ণ, রৌপ্য ও লৌহ নিৰ্ম্মিত তিনটি পুর ছিল। কমলাক্ষ সুবর্ণময়, তারকাক্ষ রজতময় ও বিদ্যুম্মালী লৌহময় পুর অধিকার করিত। দেবরাজ সমুদায় অস্ত্রদ্বারা ঐ পুরত্রয় ভেদ করিতে পারেন নাই। অনন্তর ইন্দ্রাদি দেবগণ মহাত্মা মহেশ্বরের শরণাপন্ন হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে প্রভো! এই ত্রিপুরনিবাসী অসুরত্রয় ব্রহ্মার বরে দর্পিত হইয়া লোককে নিতান্ত নিপীড়িত করিতেছে। হে দেবদেবেশ! আপনি ভিন্ন আর কোন ব্যক্তি ইহাদিগের বিনাশ সাধনে সমর্থ হইবেন না। অতএব আপনি স্বয়ং ইহাদিগকে বিনাশ করুন, তাহা হইলে সর্বকার্য্যে পশুগণ আপনার ভাগ্য-ব্যবস্থায় নিয়োজিত হইবে।
হে অর্জুন! দেবগণ এইরূপ কহিলে ভগবান্ ভূতভাবন তাঁহাদিগের হিতার্থ তাঁহাদের বাক্য স্বীকার করিলেন এবং সেই ত্রিপুর নিপাতনার্থ গন্ধমাদন ও বিন্ধ্যাচলকে বংশধ্বজ, সসাগরা ধরিত্রীকে রথ, নগেন্দ্র অনন্তকে অক্ষ, সূর্য্য ও চন্দ্রমাকে চক্র, এলাপত্র ও পুষ্পদন্তকে অক্ষকীলক, মলয়াচলকে যূপ, তক্ষককে যুগবন্ধন, ভূতগণকে যোক্ত্র, চারি বেদকে চারি অশ্ব, উপবেদ-নিচয়কে কবিকা', সবিত্রীকে প্রগ্রহ, ওঁকারকে প্রতোদ, ব্রহ্মাকে সারথি, মন্দর পর্ব্বতকে গাণ্ডীব, বাসুকিকে গুণ, বিষ্ণুকে উৎকৃষ্ট শর, অগ্নিকে শল্য, অনিলকে শরপক্ষ, বৈবস্বত যমকে পুঙ্খ, চপলাকে শিঞ্জিত ও সুমেরু পর্ব্বতকে ধ্বজ করিয়া সেই দিব্য-রথে আরোহণপুরঃসর এক অপ্রতিম ব্যূহ নির্মাণপূর্ব্বক দেবগণ ও ঋষিগণকর্তৃক সংস্তুত হইয়া সেই ব্যূহমধ্যে অচলের ন্যায় সহস্র বৎসর অবস্থান করিলেন। পরিশেষে সেই পুরত্রয় অন্তরীক্ষে একত্র মিলিত হইলে তিনি ত্রিপর্ব্বযুক্ত শল্যে ভেদ করিলেন। তখন দানবগণ সেই ত্রিপুর বা ত্রিলোচনের প্রতি কিছুতেই দৃষ্টিপাত করিতে সমর্থ হইল না। ঐ সময় কালাগ্নি বিষ্ণু ও সোম সংযুক্ত শল্যদ্বারা ত্রিপুর দগ্ধ হইতে আরম্ভ হইলে পার্বতী বালকরূপধারী মহাদেবকে ক্রোড়ে লইয়া সেই পথদর্শনার্থ সমাগত হইলেন। তিনি দেবগণের মনের ভাব অবগত হইবার মানসে কহিলেন, হে দেবগণ। আমার ক্রোড়ে কে অবস্থান করিতেছে? তখন দেবরাজ ইন্দ্র দুৰ্দ্দৈবক্রমে বালকের উপর অসূয়াপরবশ হইয়া অবজ্ঞা প্রকাশপূর্ব্বক বজ্র নিক্ষেপে উদ্যত হইলেন। ভগবান্ ভূতনাথ তদ্দর্শনে ঈষৎ হাস্য করিয়া তাঁহার বজ্রসংযুক্ত বাহু স্তম্ভিত করিলেন। পুরন্দর এইরূপে সেই বালকরূপী মহাদেবের প্রভাবে স্তম্ভিতবাহু হইয়া সুরগণ-সমভিব্যাহারে সত্বর ব্রহ্মার সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। তখন সুরগণ ব্রহ্মাকে প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আমরা পার্ব্বতীর ক্রোড়ে বালকরূপধারী এক অদ্ভুত জীবকে অবস্থিত দেখিয়া তাঁহার অভিবাদন করি নাই। বালক আমাদের সেই অপরাধে ক্রুদ্ধ হইয়া যুদ্ধ না করিয়াও অবলীলা-ক্রমে আমাদিগকে পুরন্দরের সহিত পরাজিত করিয়াছেন। আমরা সেই বালকের বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিতে আপনার নিকট আগমন করিয়াছি।
ব্রহ্মবিদগ্রগণ্য ব্রহ্মা দেবগণের সেই বাক্য শ্রবণান্তর যোগপ্রভাবে সেই অমিততেজাঃ বালককে ত্রিলোচন জানিতে পারিয়া ইন্দ্রাদি দেবগণকে কহিলেন, হে সুরগণ! সেই বালক এই চরাচর জগতের প্রভু ভগবান্ ভূতভাবন মহেশ্বর। তাঁহা অপেক্ষা আর কিছুই শ্রেষ্ঠতর পদার্থ নাই। তোমরা পার্ব্বতীর ক্রোড়ে যাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়াছ, তিনি সেই পার্ব্বতীর নিমিত্তই বালকরূপ ধারণ করিয়াছেন; অতএব চল, আমরা সকলে তাঁহার নিকট গমন করি। তিনি সর্ব্বজনেশ্বর দেবাদিদেব মহাদেব। তোমরা সকলে সেই বালকসদৃশ ভুবনেশ্বরকে জ্ঞাত হইতে সমর্থ হও নাই।
লোকপিতামহ ব্রহ্মা দেবগণকে এই কথা বলিয়া মহেশ্বরের নিকট গমন ও তাঁহাকে অবলোকনপূর্ব্বক সর্ব্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করিয়া বন্দনা করত কহিলেন, হে দেব! তুমি এই ভুবনের যজ্ঞগতি ও শ্রেষ্ঠতর ব্রত। তুমি ভব, তুমি মহাদেব, তুমি ধাম ও তুমিই পরমপদ। তুমি এই চরাচর বিশ্বে ব্যাপ্ত রহিয়াছ! হে ভগবন্ ! হে ভূতভবেশ! হে লোকনাথ! হে জগৎপতে! তুমি ক্রোধা পুরন্দরের প্রতি কৃপাবলোকন কর।
হে অর্জুন! ভগবান্ মহেশ্বর ব্রহ্মার বাক্য শ্রবণে প্রসন্নতা প্রদর্শনে উন্মুখ হইয়া অট্টহাস্য আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় সুরগণ ভগবতী পার্ব্বতী ও রুদ্রদেবকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন। দক্ষযজ্ঞবিনাশন দেবাদিদেব মহাদেব ও পার্ব্বতী দেবগণের স্তবে তাঁহাদের প্রতি প্রসন্ন হইলেন। দেবরাজ ইন্দ্রের বাহুও পুনরায় প্রকৃতিস্থ হইল। সেই রুদ্রদেবই শিব, অগ্নি ও সর্ববেত্তা। তিনি ইন্দ্র, বায়ু অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও বিদ্যুৎ। তিনি ভব, পর্জন্য ও নিষ্পাপ। তিনি চন্দ্র, সূর্য্য, ঈশান ও বরুণ। তিনি কাল, অন্তক, মৃত্যু, যম, রাত্রি ও দিবা। তিনি মাসার্দ্ধ, মাস, ঋতুসমূহ, সন্ধ্যাদ্বয় ও সংবৎসর। তিনি ধাতা, বিধাতা, বিশ্বাত্মা, বিশ্বকৰ্ম্মকারী। তিনি স্বয়ং অশরীরী হইয়াও সকল দেবগণের আকার স্বীকার করিয়া থাকেন; তিনি দেবগণের স্তবনীয়। তিনি এক প্রকার, বহু প্রকার, শত প্রকার, সহস্র প্রকার ও শতসহস্র প্রকার। বেদপরায়ণ ব্রাহ্মণগণ কহিয়া থাকেন যে, তাঁহার ঘোরা ও শিবা নামে দুই মূর্ত্তি আছে। ঐ মূর্তিদ্বয় আবার বহু প্রকার হইয়া থাকে। অগ্নি, বিষ্ণু ও ভাস্করই তাঁহার ঘোরা মূর্তি এবং সলিল, চন্দ্র ও জ্যোতিঃপদার্থসমুদায়ই তাহার সৌম্য মূর্তি। বেদাঙ্গ, উপনিষৎ, পুরাণ ও অধ্যাত্ম-নিচয়'মধ্যে যাহা নিতান্ত গূঢ় আছে, তাহাই দেব মহেশ্বর। তিনি বহুল ও জন্মবিবর্জিত।
হে অর্জুন! সেই ভূতভাবন ভগবান্ শিব এইরূপ। আমি সহস্র বৎসরেও তাঁহার সমস্ত গুণ কীর্ত্তন করিতে সমর্থ নহি। সেই শরণাগতানুকম্পী' দেবাদিদেব শরণাগত ব্যক্তি সর্ব্বগ্রহ-গুহীত ও সর্ব্বপাপ সমন্বিত হইলেও তাহার উপর প্রীত হইয়া তাহার মুক্তি প্রদান করিয়া থাকেন। তিনি মনুষ্যদিগকে আয়ুঃ, আরোগ্য, ঐশ্বর্য্য, বিত্ত ও সমগ্র অভিলাষ প্রদান এবং পুনরায় প্রত্যাহরণ করিয়া থাকেন। ইন্দ্রাদি দেবগণের মধ্যে তাঁহারই ঐশর্য্য বিদ্যমান আছে। তিনি মনুষ্যগণের শুভ ও অশুভ বিষয়ে ব্যাপৃত রহিয়াছেন। তিনি স্বীয় ঈশ্বরত্বপ্রভাবে সমুদায় অভিলষিত বিষয় লাভ করিতে পারেন। তিনি মহতেরও ঈশ্বর ও মহেশ্বর। তিনি বহুতররূপ পরিগ্রহ করিয়া এই বিশ্বে ব্যাপ্ত রহিয়াছেন। তাঁহার আস্যদেশ সমুদ্রে অধিষ্ঠিত হইয়া তোয়ময় হবিঃ পান করিয়া বড়বামুখ নামে কীর্ত্তিত হইতেছে। তিনি প্রতিনিয়ত শ্মশানে বাস করেন। মনুষ্যেরা এই বীরস্থানে তাঁহার পূজা করিয়া থাকে। সেই ঈশ্বরের উজ্জ্বল ভয়ঙ্কর বহুতর রূপ আছে। মনুষ্যেরা ঐ সমস্ত রূপের উপাসনা ও বর্ণনা করিয়া থাকে। লোকে তাঁহার কার্য্যের মহত্ত্ব ও বিভুত্ব প্রযুক্ত বহুতর সার্থক নাম কীর্ত্তন করে। বেদে তাঁহার শতরুদ্রীয় স্তব, অনন্ত রুদ্র মন্ত্র উল্লিখিত হইয়াছে। তিনি দিব্য ও মানুষ অভিলাষসকল প্রদান করিয়া থাকেন। সেই বিভু এই বিশ্ব-সংসারে ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছেন। ব্রাহ্মণ ও মহর্ষিগণ তাঁহাকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া কীর্ত্তন করেন। তিনি দেবগণের আদি। তাঁহার আস্যদেশ হইতে হুতাশন প্রাদুর্ভূত হইয়াছে। তিনি নিরন্তর পশুপালন, পশুগণের সহিত ক্রীড়া ও পশুদিগের উপর আধিপত্য বিস্তার করেন। এই নিমিত্ত লোকে তাঁহাকে পশুপতি বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকে। তাঁহার লিঙ্গ নিত্য ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিয়া অবস্থান করিতেছে এবং সতত লোকসকলকে উৎসবযুক্ত করেন, এই নিমিত্তই লোকে তাঁহাকে মহেশ্বর বলিয়া কীর্ত্তন করে। ঋষি, দেবতা গন্ধর্ব্বগণ তাঁহার লিঙ্গের অর্চ্চনা করিয়া থাকেন। সেই লিঙ্গ উন্নতভাবে অবস্থিত আছে। উহা পূজিত হইলে মহেশ্বর আনন্দিত হইয়া থাকেন। ত্রিকালমধ্যে মহাত্মা মহেশ্বরের স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বহুতর রূপ প্রতিষ্ঠিত আছে, এই নিমিত্তই তিনি বহুরূপ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। তিনি একাক্ষিদ্বারা জাজ্বল্যমান বা সর্ব্বতঃ অক্ষিময় হইয়া অবস্থান করিতেছেন। তিনি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া লোকমধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, এই নিমিত্ত লোকে তাঁহাকে সর্ব্ব বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাকে। তিনি ধূম্ররূপ, এই নিমিত্ত ধূজ্জটী বলিয়া প্রসিদ্ধ এবং তাঁহাতে বিশ্বদেব অবস্থান করিতেছেন বলিয়া তিনি বিশ্বরূপ নামে প্রখ্যাত হইয়াছেন। তিনি সর্ব্বকার্য্যে অর্থসকল পরিবর্দ্ধিত ও মনুষ্যগণের মঙ্গল অভিলাষ করেন, এই নিমিত্ত শিব নামে প্রসিদ্ধ আছেন। তিনি সহস্রাক্ষ, অযুতাক্ষ ও সর্ব্বতঃ অক্ষিমৎ'। তিনি এই মহৎ বিশ্বকে প্রতিপালন করিতেছেন, এই নিমিত্ত লোকে তাঁহাকে মহাদেব বলিয়া নিৰ্দ্দেশ করিয়া থাকে। সেই ভুবনেশ্বর ত্রিলোক প্রতিপালন করিতেছেন বলিয়া এ্যম্বক নামে বিখ্যাত হইয়াছেন। তিনি প্রাণের উৎপত্তি ও স্থিতির কারণ এবং সমাধিদ্বারা সাক্ষিরূপ হইয়াও অবিকৃত রহিয়াছেন বলিয়া লোকে তাঁহাকে স্থাণু নামে কীর্ত্তন করিয়া থাকে। চন্দ্র ও সূর্য্যের আকাশাকীর্ণ তেজোরাশি তাঁহার কেশস্বরূপ হওয়াতে তিনি ব্যোমকেশ নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। কপি শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ, বৃষ শব্দের অর্থ ধৰ্ম্ম। মহাত্মা মহাদেব শ্রেষ্ঠ ও ধৰ্ম্ম স্বরূপ বলিয়া বৃষকপি নামে বিখ্যাত আছেন। তিনি ব্রহ্মা, ইন্দ্র, বরুণ, যম ও কুবেরকে নিগ্রহ করিয়া সংহার করেন বলিয়া লোকে তাঁহাকে হর নামে কীর্ত্তন করে। তিনি উন্মীলিত নেত্রদ্বয় হইতে বলপূর্ব্বক ললাটে নয়ন সৃষ্টি করিয়াছেন, এই নিমিত্ত ত্র্যম্বক নামে কথিত হইয়া থাকেন। তিনি কি পাপাত্মা, কি পুণ্যশীল, সমুদায় শরীরীর শরীরে সমভাবে প্রাণ অপান প্রভৃতি পাঁচ প্রকার বায়ুরূপে অবস্থান করিতেছেন। যিনি মহাদেবের বিগ্রহ পূজা ও লিঙ্গার্চ্চনা করেন, তাঁহার নিত্য লক্ষ্মী লাভ হয়। তাঁহার কেবল এক পদ অগ্নিময় ও অন্য পদ সোমময় এমন নহে, সমুদায় শরীরেই অর্দ্ধাংশ অগ্নিময় ও অর্দ্ধাংশ সোমময় বলিয়া কথিত আছে। তাঁহার অগ্নিময় দেহ দেবগণ ও মনুষ্যগণ অপেক্ষা অধিক দীপ্তিমান। মহাত্মা মহাদেবের যে মঙ্গলদায়িনী মূর্তি আছে, তিনি সেই মূর্তি ধারণপূর্ব্বক ব্রহ্মচর্য্যানুষ্ঠান এবং তাঁহার যে ঘোরতরা মূর্তি আছে, তাহা ধারণপূর্ব্বক সকলকে সংহার করেন। তিনি দহনশীল, তীক্ষ্ণ, উগ্র, প্রতাপশালী এবং মাংস, শোণিত ও মজ্জাভোজী বলিয়া রুদ্র নামে উক্ত হইয়া থাকেন।
হে অর্জুন! তুমি সংগ্রামকালে যে পিনাকধারী দেবদেব মহাদেবকে তোমার অগ্রভাগে অবস্থিত ও শত্রুসংহারে প্রবৃত্ত দেখিয়াছ, এই তাঁহারই গুণকীর্ত্তন করিলাম। তুমি সিন্ধুরাজ বধে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলে কৃষ্ণ তাঁহাকেই তোমায় স্বপ্নে প্রদর্শিত করিয়া-ছিলেন। ঐ ভগবান্ সংগ্রামে তোমার অগ্রে অগ্রে গমন করিয়া থাকেন। তুমি যাঁহার প্রদত্ত অস্ত্রের প্রভাবে দানবগণকে নিপাতিত করিয়াছ, তোমার নিকট সেই দেবদেবের ধন্য, যশস্য, আয়ুষ্য পরম পবিত্র, বেদসম্মিত শতরুদ্রীয় ব্যাখ্যা করিলাম। যে ব্যক্তি সর্বদা এই সর্ব্বার্থসাধক সর্ব্বপাপ বিনাশন, দুঃখভয় নিবারণ পবিত্র চতুর্ব্বিধ' স্তোত্র শ্রবণ করে, সে সমুদায় শত্রু গণকে পরাজিত করিয়া শিবলোকে পূজিত হয়। যে মনুষ্য সর্ব্বদা যত্নবান্ হইয়া মহাত্মা মহাদেবের মঙ্গলপ্রদ সাংগ্রামিক দিব্য চরিত্র ও শতরুদ্রীয় পাঠ বা শ্রবণপূর্ব্বক বিশ্বেশ্বরের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করে, ত্রিনয়ন প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে অভিলষিত বর প্রদান করেন। হে অর্জুন! তুমি এক্ষণে গমনপূর্ব্বক সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও। জনার্দ্দন যাহার পার্শ্বস্থ মন্ত্রী ও রক্ষয়িতা, তাঁহার পরাজয় সম্ভাবনা কখনই নাই।
হে মহারাজ! পরাশরতনয় ব্যাসদেব সংগ্রামস্থলে অর্জুনকে এই কথা বলিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন।
হে রাজন! এইরূপে মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণাচার্য্য পাঁচ দিন ঘোরতর যুদ্ধ করিয়া কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হইলেন। বেদাধ্যয়নে যে ফল, এই দ্রোণপর্ব্ব অধ্যয়নেও সেই ফল লাভ হয়। এই পর্ব্বে নির্ভয় ক্ষত্রিয়গণের যশঃ বর্ণিত এবং অর্জুন ও বাসুদেবের জয় কীর্ত্তন হইয়াছে। এই পর্ব্ব প্রত্যহ পাঠ বা শ্রবণ করিলে মহাপাপলিপ্ত পুরুষও পাপমুক্ত হইয়া মঙ্গল লাভ করিতে পারে। ইহা শ্রবণ ও পাঠে ব্রাহ্মণগণের যজ্ঞফল লাভ এবং ক্ষত্রিয়গণের ঘোরসংগ্রামে বিজয় লাভ এবং বৈশ্য ও শূদ্রের ধন-পুত্রাদি অভিলষিত বিষয় লাভ হয়, সন্দেহ নাই।
