কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

আদিপর্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

আস্তীক পর্ব্বাধ্যায়

আদিপর্ব

আস্তীক পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ ও নরোত্তম নর এবং সরস্বতীকে' নমস্কার করিয়া জয়' উচ্চারণ করিবে।
জরৎকারু চরিত।

শৌনক কহিলেন, হে সৌতে! মহারাজ জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পযজ্ঞ করিয়া সর্পগণকে ধ্বংস করিয়াছিলেন এবং কি কারণেই বা তপোধনাগ্রগণ্য আস্তীক মুনি প্রদীপ্ত হুতাশন হইতে ভুজঙ্গমদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন, তাহা সবিশেষ বর্ণন কর। যে রাজা সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তিনি কাহার পুত্র এবং সেই দ্বিজবর আস্তীক মুনিই বা কাহার পুত্র, ইহাও বর্ণন কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে মুনিবর! আমি আপনার নিকট অতি বিস্তীর্ণ আস্তীকোপাখ্যান আনুপূর্ব্বিক বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। শৌনক কহিলেন, হে সূতপুত্র! প্রাচীন মহর্ষি আস্তীকের ঐ মনোহর উপাখ্যান আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ জন্মিয়াছে।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, আমার পিতা নৈমিষারণ্যবাসী বিপ্রগণ কর্তৃক অভ্যর্থিত হইয়া সর্ব্বপাপ-বিনাশক ব্যাসোক্ত ঐ পুরাতন ইতিহাস তাঁহাদিগকে শ্রবণ করাইয়াছিলেন। আমি তৎসমীপে যে প্রকার শ্রবণ করিয়াছি, অবিকল সেইরূপ বর্ণন করিতেছি শ্রবণ করুন। তপোধন আস্তীকের পিতা জরৎকারু মুনি সাক্ষাৎ প্রজাপতিসদৃশ ব্রহ্মচারী, উর্দ্ধ রেতা ও পরমধার্মিক ছিলেন। তিনি সর্ব্বদা ব্রতানুষ্ঠান, উগ্রতপস্যা ও আহার সংযমে একান্ত তৎপর থাকিতেন। সেই তপোবলসম্পন্ন মহাত্মা সর্ব্বদা তীর্থ-পর্য্যটন ও তীর্থে অবগাহন করিয়া অবনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন এবং যে স্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হইত, সেই স্থানেই অবস্থিতি করিতেন। এইরূপে বহুকাল আহার নিদ্রা পরিত্যাগ ও ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া তিনি শীর্ণ-কলেবর হইয়াছিলেন, তথাপি বায়ুমাত্র ভক্ষণপূর্ব্বক কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিতেন।

একদা জরৎকারু মুনি ভ্রমণ করিতে করিতে কোন স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কতিপয় ব্যক্তি ঊর্দ্ধপাদ ও অধোমস্তক হইয়া মহাগর্তে লম্বমান রহিয়াছেন, তদ্দর্শনে তিনি কৃপাপরবশ হইয়া তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসিলেন, আপনারা কে? কি নিমিত্তই বা মুষিকচ্ছিন্নমূল ঊশীরস্তম্ব'মাত্র অবলম্বন করিয়া অধোমুখে এই মহাগর্তে লম্বমান রহিয়াছেন? পিতৃগণ কহিলেন, আমরা যাযাবর' নামক ঋষি, সন্তানক্ষয় হওয়াতে অধঃপতিত হইতেছি। আমরা নিতান্ত হতভাগ্য। আমাদিগের জরৎকারু নামে এক পুত্র আছে; সেই দুৰ্ম্মতি, পুত্রার্থ দারপরিগ্রহ না করিয়া সংসারসুখে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক অহর্নিশ কেবল তপস্যায় কালাতিপাত করিতেছে; সুতরাং কুলক্ষয় উপস্থিত দেখিয়া এই মহাগর্তে লম্বমান রহিয়াছি। আমাদিগের বংশবর্দ্ধন জরৎকারু থাকিতেও আমরা অনাথ ও দুষ্কৃতির ন্যায় হইয়াছি। তুমি কে, কি নিমিত্তই বা আমাদিগের দুঃখ দেখিয়া বান্ধবের ন্যায় অনুশোচনা করিতেছ, জানিতে বাসনা করি।

জরৎকারু তাঁহাদিগের কাতরোক্তি শ্রবণ করিয়া কহিলেন, আপনারা আমার পূর্ব্ব-পুরুষ; আমারই নাম জরৎকারু, এক্ষণে আজ্ঞা করুন, কি করিব। পিতৃগণ কহিলেন, বৎস! তোমার এবং আমাদিগের পারত্রিক মঙ্গল সম্পাদন করিবার নিমিত্ত কুলরক্ষা বিষয়ে যত্নবান্ হও। লোকে পুত্রোৎপাদনদ্বারা যেরূপ সদ্গতি-সম্পন্ন হয়, ধর্মফলদ্বারা সেরূপ সদ্গতি লাভ করিতে পারে না।

অতএব হে পুত্র! আমাদিগের নির্দেশানুসারে দারপরিগ্রহ করিয়া সন্তানোৎপাদনে যত্নবান্ হও। ইহা করিলেই আমাদিগের পরম হিতসাধন করা হইবে। জরৎকারু কহিলেন, আমি সম্ভোগার্থে দারপরিগ্রহ বা জীবিকার্থে ধনোপার্জন করিব না, কেবল আপনাদিগের হিতসাধনার্থে উদ্বাহ করিতে সম্মত হইলাম; কিন্তু তদ্বিষয়ে এক প্রতিজ্ঞা রহিল যে, যদি কন্যা আমার সনাম্নী হয় এবং তাহার বন্ধু-বান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক আমাকে সেই কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই আমি তাহাকে যথাবিধি বিবাহ করিব। কিন্তু আমি অত্যন্ত দরিদ্র, বোধ করি দরিদ্রকে কন্যা সম্প্রদান করিতে কেহই সম্মত হইবে না। হে পিতামহগণ! আমি এই নিয়মে দারপরিগ্রহ করিতে যত্নবান্ হইব, অন্যথা এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতে পারিব না। এইরূপে পরিণীতা ভার্য্যার গর্ভে সন্তান জন্মিলে আপনারা উদ্ধার হইবেন এবং অক্ষয় স্বর্গলাভ করিয়া পরম সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।

জরৎকারুর পরিণয়।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরৎকারু মুনি গার্হস্থ্যাশ্রম করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়া পত্নীলাভার্থ সমস্ত মহীমণ্ডল ভ্রমণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু কেহই তাঁহাকে কন্যা প্রদান করিল না। একদা তিনি পিতৃলোকের বাক্য স্মরণ করিয়া বন-প্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে তিনবার কন্যা ভিক্ষা করিলেন। তাঁহার সেই ভিক্ষাবাক্য শ্রবণে নাগরাজ বাসুকি স্বীয় ভগিনীকে আনয়ন করিয়া সম্প্রদান করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু জরৎকারু সেই কন্যা সনাম্নী নহে এই ভাবিয়া, তাঁহার পাণিগ্রহণে পরাজুখ হইলেন; কারণ মহাত্মা জরৎকারু প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যদি সনাম্নী কন্যা পান ও তাহার বন্ধু-বান্ধবগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক ভিক্ষাস্বরূপ তাঁহাকে সেই কন্যা সম্প্রদান করে, তাহা হইলেই তাহাকে সহধর্মিণী করিবেন।

অনন্তর মহাপ্রাজ্ঞ মহাতপাঃ জরৎকারু বাসুকিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ভুজঙ্গম! তুমি যথার্থ করিয়া বল, তোমার এই ভগিনীর নাম কি; বাসুকি কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! আমার এই অনুজার নাম জরৎকারু, আমি আপনাকে এই ভগিনীটি সম্প্রদান করিতেছি, আপনি ইহাকে গ্রহণ করুন। এই বলিয়া বাসুকি জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করিলেন। তিনিও বিধিপূর্ব্বক তাঁহার পাণিগ্রহণ করিলেন।

আস্তীকের জন্ম এবং জরৎকারুর স্বর্গারোহণ।

উগ্রশ্রবাঃ মহর্ষি শৌনককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মজ্ঞান-পারদর্শিন। পূর্ব্বকালে সর্পগণ স্বীয় জননীর নিকট এইরূপ শাপগ্রস্ত হইয়াছিল যে রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে অগ্নি তাহাদিগকে দগ্ধ করিবেন। ভুজঙ্গরাজ বাসুকি সেই শাপ বিমোচনের অভিসন্ধি করিয়া মহাত্মা জরৎকারুকে স্বীয় ভগিনী প্রদান করেন। জরৎকারু বিধিপূর্ব্বক তাঁহার পাণিগ্রহণ করিয়া তদ্‌গর্ন্তে আস্তীক নামে পুত্র উৎপাদন করেন। মহাত্মা আস্তীক বেদবেদান্তশাস্ত্রে পারদর্শী, সর্ব্বভূতে সমদৃষ্টি ও তপশ্চর্য্যায় নিতান্ত অনুরক্ত ছিলেন। তিনি পিতৃ মাতৃ উভয় কূলের দাহভয় নিবারণ করেন। পাণ্ডুকুলোদ্ভব রাজা জনমেজয় বহুকালের পর সর্পসত্র নামে এক মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। সেই সর্পকুল-কালান্তক যজ্ঞ আরব্ধ হইলে মহাতপাঃ আস্তীক ভ্রাতৃগণ, মাতুলগণ ও অন্যান্য সর্পগণকে রক্ষা করিয়াছিলেন।

জরৎকারু পুত্রোৎপাদন ও তপশ্চর্য্যাদ্বারা পিতৃলোকের উদ্ধার সাধন, বিবিধ ব্রতানুষ্ঠান ও বেদাধ্যয়নদ্বারা মুনিগণের তুষ্টিসম্পাদন এবং নানাবিধ যজ্ঞানুষ্ঠানদ্বারা দেবগণের পরিতোষ সমাধান করিলেন। তিনি এইরূপে পুত্রোৎপাদন, ব্রহ্মচর্য্য ও যজ্ঞানুষ্ঠানদ্বারা পিতৃঋণ, ঋষিগণ ও দেবঋণ স্বরূপ গুরুতর ভার হইতে মুক্ত হইয়া পূর্ব্ব-পুরুষগণের সহিত স্বর্গে আরোহণ করেন। হে ভৃগুবংশাবতংস! আমি যথাক্রমে এই আস্তীকো-পাখ্যান কহিলাম, এক্ষণে আর কি কহিতে হইবে আজ্ঞা করুন।

কদ্রু ও বিনতার বরপ্রার্থনা।

শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যাহা কীৰ্ত্তন করিলে, পুনর্ব্বার তাহাই সবিস্তরে বর্ণন কর; আস্তীক-বৃত্তান্ত বিশেষরূপে শ্রবণ করিতে আমাদিগের নিতান্ত ঔৎসুক্য হইয়াছে। অস্তীকোপাখ্যানটি অতি সুললিত ও সুমধুর বোধ হইল। ইহা শুনিয়া আমরা পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়াছি। ফলতঃ তুমি পুরাণ-কীর্ত্তন বিষয়ে স্বীয় পিতার ন্যায় পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিয়াছ। তোমার পিতা যেমন অনন্যবিষয়ানুরক্ত হইয়া প্রত্যহ আমাদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাইতেন, এক্ষণে তুমিও সেইরূপ অনন্যমনাঃ ও অনন্যকৰ্ম্মা হইয়া আমাদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাও।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমি পিতার নিকট আস্তীকোপাখ্যান যেরূপ শুনিয়াছি, অবিকল সেইরূপ কহিতেছি, শ্রবণ করুন। সত্যযুগে দক্ষপ্রজাপতির কদ্রু ও বিনতা নামে দুই পরমা সুন্দরী কন্যা ছিলেন। মহর্ষি কশ্যপ ঐ দুই কন্যার পাণিগ্রহণ করেন! একদা তিনি সেই ধর্মপত্নীদ্বয়ের প্রতি অতিমাত্র প্রসন্ন হইয়া তাহাদিগকে বরপ্রদান করিতে চাহিলেন। পরস্পর সমান পরাক্রান্ত, এইরূপ সহস্র নাগ আমার পুত্র হউক, বলিয়া কদ্রু বর প্রার্থনা করিলেন; কিন্তু বিনতা এই বর চাহিলেন, আমার দুইটি মাত্র পুত্র হউক; কিন্তু তাহারা যেন বল, বিক্রম ও শরীরে কদ্র-পুত্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয়। মহর্ষি কশ্যপ "তথাস্তু" বলিয়া তাঁহাদিগকে সেই অভিলবিত বর প্রদান করিলেন। বিনতা স্বামি-সন্নিধানে স্বাভিলষিত বর সংপ্রাপ্ত হইয়া সাতিশয় সন্তুষ্টা ও কৃতার্থম্মন্যা হইলেন। কদ্রুও তুল্যতেজস্বী পুত্রসহস্র লাভে আপনাকে কৃতকৃত্যা জ্ঞান করিলেন। মহাতপাঃ কশ্যপ পত্নীদিগকে "তোমরা স্বীয় প্রযত্নে গর্ভধারণ করিও” এই আদেশ দিয়া অরণ্যানী প্রবেশ করিলেন।

অরুণ ও গরুড়ের জন্মবৃত্তান্ত।

বহুকালের পর কদ্রু অণ্ড-সহস্র ও বিনতা অশুদ্বয় প্রসব করিলেন। পরিচারিকাগণ সেই সমুদায় অণ্ড উপস্বেদযুক্ত' ভাণ্ডমধ্যে পঞ্চশত বৎসর রাখিলেন। তৎপরে কদ্র-প্রসূত অণ্ড-সহস্র হইতে এক একটা পুত্র বহির্গত হইল। কিন্তু বিনতার অণ্ড-দ্বয় তদবস্থই রহিল। পুত্রার্থিনী বিনতা তদ্দর্শনে সাতিশয় লজ্জিতা হইয়া স্ব-প্রসূত অশুদ্বয়ের অন্যতর ভেদ করিয়া দেখিলেন যে, পুত্রের পূর্ব্বার্থকায়মাত্র সুসঙ্ঘটিত হইয়াছে, অন্যার্থ অতিশয় অপক্কাবস্থায় রহিয়াছে। তখন সেই সদ্য প্রসূত পুত্র ক্রুদ্ধ হইয়া স্বীয় জননীকে অভিসম্পাত করিলেন, "লোভপরতন্ত্র হইয়া অপক্কাবস্থায় অণ্ড ভেদনপূর্ব্বক আমাকে তন্মধ্য হইতে - বাহির করা তোমার নিতান্ত অসদৃশ কৰ্ম্ম হইয়াছে; অতএব তুমি যে সপত্নীর সহিত স্পর্দ্ধা প্রযুক্ত এই অন্যায্য কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে, পঞ্চশত বৎসর তোমাকে সেই সপত্নীর দাসী হইয়া থাকিতে হইবে।" আরও বলিলেন, এই অপর অণ্ডমধ্যে তোমার যে পুত্র আছে, যদি অকালে অশুভেদ না কর, এবং তাহাকেও আমার ন্যায় হীনাঙ্গ বা বিকলাঙ্গ না কর, তবে সেই তোমাকে দাসীত্ব হইতে মোচন করিবে। যদি তুমি আপন পুত্রকে বিশিষ্টরূপে বলবিক্রমশালী করিতে চাহ, তবে ধৈর্য্য ধারণপূর্ব্বক ইহার জন্মকাল প্রতীক্ষা কর। ইহার জন্মের আরও পঞ্চশত বৎসর বিলম্ব আছে।

অরুণ এইরূপে জননীকে শাপ প্রদান করিয়া আকাশ-পথে আরোহণপূর্ব্বক সূর্য্যদেবের সারথ্য কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। সর্পভোজী গরুড়ও যথাকালে জন্মিলেন। তিনি জন্মিবামাত্র ক্ষুধাতুর হইয়া স্বীয় জননী বিনতাকে পরিত্যাগ-পূর্ব্বক বিধাতৃ-বিহিত স্বকীয় আহার সংগ্রহার্থে আকাশমণ্ডলে উড্ডীন হইলেন।

সমুদ্রমন্থন-প্রসঙ্গে উগ্রশ্রবার কথন।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন। ঐ সময়ে উচ্চৈঃশ্রবাঃ কদ্র ও বিনতার সমীপ দিয়া গমন করিতেছিল। দেবগণ, অমৃত-মন্থন-কালে উৎপন্ন সেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট ও সর্ব্ব-সুলক্ষণ-সম্পন্ন হয়-রত্নকে গমন করিতে দেখিয়া প্রশংসা করিতে লাগিলেন।

শৌনক কহিলেন, হে সূতপুত্র! তুমি কহিলে, সেই মহাবীর্য্য অশ্বরাজ সুধা-মন্থন সময়ে উৎপন্ন হয়; অতএব জিজ্ঞাসা করিতেছি বল, দেবগণ কি কারণে ও কোন্ স্থানে অমৃত মন্থন করিয়াছিলেন।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সুমেরু নামে এক পরম রমণীয় মহীধর আছে। যাহার সুবর্ণময় শৃঙ্গ-পরম্পরার প্রভাজাল-প্রদীপ্ত সূর্য্যের প্রভামণ্ডলকে তিরস্কৃত করে, যে অপ্রমেয় ভূধর দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণের আবাস-স্থান, যাহাতে দুর্দান্ত হিংস্র জন্তুগণ সর্ব্বদা বিচরণ করে, যে পর্ব্বত প্রতিদিন রজনীযোগে নানা প্রকার ওষধি দ্বারা আলোকময় হয় এবং যে পর্ব্বত উন্নতিদ্বারা অমরলোক আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে, নানাবিধ নদনদী ও তরুলতাগণ যাহাকে সুশোভিত করিয়াছে, মনোহর বিহঙ্গমগণ যাহার বৃক্ষশাখায় বসিয়া সর্ব্বদা সুমধুর স্বরে কলরব করিতেছে, যে সুবর্ণময় মহীধর প্রাকৃত জন-সমূহের মনেরও অগোচর, একদা তপোনিয়মানুরক্ত প্রবল পরাক্রান্ত দেবগণ সেই পর্ব্বতের নানারত্ন সুশোভিত শিখরদেশে উপবেশনপূর্ব্বক অমৃতপ্রাপ্তি বিষয়ক মন্ত্রণা করিতেছিলেন। ভগবান্ ভূতভাবন নারায়ণ দেবতাদিগকে এইরূপে মন্ত্রণা করিতে ব্যাসক্ত দেখিয়া ব্রহ্মাকে কহিলেন, দেবগণ ও অসুরগণ একত্র হইয়া জলধি-মন্থন করিতে আরম্ভ করুন। মন্থন করিলে সমুদ্র হইতে অমৃত উত্থিত হইবে। তদনন্তর দেবগণকে কহিলেন, হে সুরগণ! তোমরা সমুদ্রমন্থন কর, কিন্তু বহুবিধ ওষধি এবং রত্ন-সমূহ পাইয়াও মন্থনে ক্ষান্ত হইও না। ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক অনবরতই মন্থন করিতে থাকিবে, তাহা হইলেই তোমাদের অমৃতলাভ হইবে সন্দেহ নাই।

সমুদ্রমন্থনারম্ভ।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবগণ অমৃতমন্থনে আদেশ পাইয়া মন্দর-ভূধরকে মন্থন-দণ্ড করিতে মনস্থ করিলেন, কিন্তু গগনস্পর্শী শিখর-মালায় সুশোভিত, বহুতর লতাজালে জড়িত, নানা জাতীয় বিহঙ্গনিনাদে নিনাদিত, বহুবিধ-ব্যালকুল'-সমাকীর্ণ, অপ্সরোগণ ও কিন্নরগণ কর্তৃক নিরন্তর সেবিত, একাদশ সহস্র যোজন উন্নত এবং তৎপরিমাণে ভূগর্তে নিখাত', গিরিবর মন্দরের উত্তোলনে অশক্ত হইয়া ব্রহ্মা ও নারায়ণের সমীপে গিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, আপনারা আমাদিগের হিতসাধনার্থে কোন সদুপায় নির্দ্ধারণ ও মন্দরোদ্ধরণে প্রযত্ন করুন।

অপ্রমেয়াত্মা ভগবান্ বিষ্ণু ও ব্রহ্মা দেবতাদিগের প্রার্থনায় সম্মতি প্রকাশপূর্ব্বক ভুজঙ্গাধিপতি অনন্তদেবকে মন্দরো-ত্তোলনে অনুমতি করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত অনন্ত তাঁহাদের আদেশ পাইয়া সমস্ত বন ও বনবাসিগণের সহিত সেই গিরি-বরের উদ্ধরণ করিলেন। অনন্তর দেবগণ অনন্তদেবের সহিত নীরনিধিতীরে সমুপস্থিত হইয়া সমুদ্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আমরা অমৃতলাভের জন্য তোমার জল মন্থন করিব। অর্ণব কহিলেন, মন্দরভ্রমণ দ্বারা আমাকে অনেক ক্লেশ সহ্য করিতে হইবে, অতএব আমিও যেন লাভের অংশ পাই। তদনন্তর সমস্ত দেবগণ ও অসুরগণ কুৰ্ম্মরাজকে কহিলেন, তুমি এই গিরিবরের অধিষ্ঠান' হও। কুৰ্ম্মরাজ 'তথাস্তু' বলিয়া স্বীয়পৃষ্ঠে মন্দর-গিরি ধারণ করিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র কুৰ্ম্মরাজ পৃষ্ঠে অধিষ্ঠিত গিরিরাজকে যন্ত্রসহকারে চালিত করিলেন।

এইরূপে দেবগণ মন্দর-গিরিকে মন্থন-দণ্ড ও বাসুকিকে মন্থন-রজ্জু করিয়া অম্ভোনিধি মন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত দানব-দল রজ্জুভূত বাসুকির মুখ-দেশ ও সুরগণ পুচ্ছ-দেশ ধারণ করিলেন। ভগবান্ অনন্তদেব সাক্ষাৎ নারায়ণের অংশ-স্বরূপ, এই নিমিত্ত তিনি আপন দুঃসহ বিষ-বেগ সংবরণ করিলেন। মন্থনকালে দেবগণ নাগরাজকে এমত বলপূর্ব্বক আকর্ষণ করিতে লাগিলেন যে, তাঁহার মুখ হইতে নিরন্তর ধূম ও অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সহিত নিশ্বাস-বায়ু নির্গত হইতে লাগিল। ঐ ধূমাগ্নির সহিত নিশ্বাস-বায়ু সচপলা মেঘমালা-রূপে পরিণত হইয়া নিতান্ত শ্রান্ত ও একান্ত সন্তপ্ত দেবাসুরের উপর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল; এবং সেই গিরিবরের শৃঙ্গ হইতে চারিদিকে পুষ্পবৃষ্টি হইতে আরম্ভ হইল।

দেবাসুরগণ মন্দর-ভূধর দ্বারা এইরূপে সমুদ্রমন্থনে প্রবৃত্ত হইলেন। মথ্যমান মহোদধি হইতে ঘোরতর ঘনঘটায় গভীর গর্জনের ন্যায় ভয়ঙ্কর শব্দ উঠিল। মন্দরাদ্রির মর্দ্দনে সমুদ্রস্থ শত শত জলচরগণ বিনিষ্পিষ্ট হইয়া পঞ্চত্ব পাইল এবং পাতাল-তলস্থ অন্যান্য নানাবিধ জলজন্তুগণও প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। সেই গিরিরাজ অনবরত ভ্রাম্যমাণ হওয়াতে তাহার শিখরস্থ প্রকাণ্ড বৃক্ষসকল পরস্পর সম্পৃষ্ট হইয়া বিহঙ্গকুলের সহিত ভূতলে পতিত হইতে লাগিল। মন্দর-গিরি সেই সকল তরুগণের পরস্পর সঙ্ঘর্ষণে সমুদ্ভূত হুতাশন-শিখাদ্বারা সমাবৃত হইয়া তড়িৎ-পটলাবৃত নবীন নীরদের ন্যায় সাতিশয় শোভমান হইল। পরে ঐ অনল ক্রমে ক্রমে প্রবল হইয়া অরণ্যানী-বিনির্গত কুঞ্জর, কেশরিগণ ও অন্যান্য বন্য জত্ত্বগণকে দগ্ধ করিতে লাগিল। সুঙ্ঘর্ষণজ হুতাশন এইরূপে পৰ্ব্বতস্থ সমস্ত জীবজন্তুগণকে দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিলে, সুরপতি ইন্দ্র মেঘসমদ্ভূত সলিল-সেচন দ্বারা তাহা নির্ব্বাণ করিলেন।

অনন্তর নানাবিধ মহীরুহগণের নির্যাস ও মহৌষধি-রস গলিয়া সমুদ্রে পতিত হইতে লাগিল। অমৃতসম-গুণসম্পন্ন সেই সমস্ত বৃক্ষনির্যাস ও কাঞ্চন-নিস্রাবের' প্রভাবে দেবগণ অমরত্ব প্রাপ্ত হইলেন। সমুদ্রজল পূর্ব্বোক্ত বহুবিধ উৎকৃষ্ট রসদ্বারা মিশ্রিত হইয়া ক্ষীররূপে পরিণত হইল। সেই ক্ষীর হইতে ঘৃত উৎপন্ন হইল।

মন্থন সমাপন।

তদনন্তর দেবগণ পদ্মাসনস্থ ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, ভগবন্। নারায়ণ ব্যতিরেকে আমরা সকলে নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়াছি। কোন কালে মন্থন আরম্ভ করিয়াছি কিন্তু এ পর্যন্ত অমৃত সমুত্থিত হয় নাই। তখন ব্রহ্মা নারায়ণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, তুমি ইঁহাদের বলাধান কর; তুমি ব্যতিরেকে এ বিষয়ে আর গত্যন্তর নাই। নারায়ণ কহিলেন, যাঁহারা এই কার্য্যে ব্যাপৃত আছেন, আমি তাঁহাদের সকলকেই বল প্রদান করিতেছি, তাঁহারা সকলে সম্মিলিত হইয়া অম্ভোনিধিকে আলোড়িত করুন।

সমস্ত দেবদানবগণ বিষ্ণুর এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র বলপ্রাপ্ত হইলেন এবং সকলে একত্র হইয়া পুনর্ব্বার পূর্ব্বাপেক্ষা প্রবলরূপে জলনিধি মন্থন করিতে আরম্ভ করিলেন। তদনন্তর মথ্যমান মহাসাগর হইতে সুশীতলরশ্মি-সম্পন্ন সৌম্যমূর্তি, নির্মূল শীতাংশু উৎপন্ন হইলেন। তৎপরে ঘৃত হইতে শ্বেতপদ্মোপবিষ্টা লক্ষ্মী ও সুরাদেবী উঠিলেন। উচ্চৈঃশ্রবাঃ নামে শ্বেতবর্ণ হয়-রত্নও ঘৃত হইতে উৎপন্ন হইল। পরে মহোজ্জ্বল কৌস্তুভ মণি ঘৃত হইতে সমুৎপন্ন হইয়া নারায়ণের বক্ষঃস্থলে লম্বমান হইল। লক্ষ্মী, সুরাদেবী, চন্দ্র ও মনোজব অশ্বোত্তম উচ্চৈঃশ্রবাঃ সূর্য্য-মার্গাবলম্বনপূর্ব্বক সুরপক্ষে গমন করিলেন। পরিশেষে মূর্ত্তিমান্ ধন্বন্তরি অমৃতপূর্ণ শ্বেতবর্ণ কমণ্ডলু হস্তে লইয়া সমুদ্র হইতে আবির্ভূত হইলেন। দৈত্যগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করিয়া "এই অমৃত আমার, এই অমৃত আমার,” এই বলিয়া ঘোরতর কোলাহল করিতে আরম্ভ করিল। তদনন্তর শ্বেতকায়, দন্তচতুষ্টয়-বিশিষ্ট ঐরাবত নামে মহাগজ সমুৎপন্ন হইল। বজ্রধর ইন্দ্র তাহাকে অধিকার করিলেন। সুরাসুরগণ তথাপি ক্ষান্ত না হইয়া অনবরতই মন্থন করিতে লাগিলেন। তাহাতে কালকূট গরল উৎপন্ন হইল। সধূম জ্বলদগ্নির ন্যায় ভয়ঙ্কর গরল ধরণীতল আকুল করিল। কালকূটের কটুগন্ধ আঘ্রাণ করিয়া ত্রিলোকী মূর্ছিত হইল। ব্রহ্মা তদবলোকনে ভীত হইয়া অনুরোধ করাতে সাক্ষাৎ মন্ত্রমূর্তি ভগবান্ ভবানীপতি তৎক্ষণাৎ ঐ বিষরাশি পান করিয়া কণ্ঠে ধারণপূর্ব্বক ত্রৈলোক্য রক্ষা করিলেন। তদবধি তিনি নীলকণ্ঠ নামে বিখ্যাত হইলেন।

দানবগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণে হতাশ হইয়া অমৃত ও লক্ষ্মী লাভার্থে দেবতাদিগের সহিত ভয়ঙ্কর বিরোধ আরম্ভ করিল। তখন ভগবান্ নারায়ণ মোহিনী-মায়া আশ্রয় করিয়া নারীরূপ ধারণপূর্ব্বক অসুরসমূহের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। মূঢ়মতি দানবদল মোহিনী-রূপ-ধারী ভগবানের অপূর্ব্ব রূপলাবণ্য দর্শনে মোহিত ও তদ্গতচিত্ত হইয়া তাঁহাকে অমৃত সমর্পণ করিল।

দেবগণের অমৃত পান ও রাহুর মস্তকচ্ছেদন।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, অনন্তর সমস্ত দৈত্যগণ একত্র হইয়া নানাপ্রকার অস্ত্র শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক দেবগণকে আক্রমণ করিল। তদবলোকনে মহাপ্রভাবশালী ভগবান্ নারায়ণ নরদেব সমভি-ব্যাহারে দানবেন্দ্রদিগকে বঞ্চনা করিয়া অমৃত হরণ করিলেন। অনন্তর দেবগণ বিষ্ণুর নিকট হইতে সেই অমৃত লইয়া পরমাহ্লাদে পান করিতে বসিলেন। দেবগণ অমৃত পান করিতে আরম্ভ করিলে রাহু নামে এক দুষ্ট দানব অবসর বুঝিয়া দেবরূপ ধারণপূর্ব্বক সুরগণের সহিত অমৃত পান করিতে বসিয়াছিল। অমৃত, রাহুর কণ্ঠদেশমাত্র গমন করিয়াছে, এমত সময়ে চন্দ্র ও সূর্য্য দেবতাদিগের হিতসাধনার্থে ঐ গুপ্ত বিষয় ব্যক্ত করিয়া দিলেন। ভগবান্ চক্রপাণি স্বীয় সুদর্শনাস্ত্রদ্বারা তৎক্ষণাৎ সেই দুষ্ট দানবের শিরশ্ছেদন করিলেন।

রাহুর পর্ব্বত-শিখরাকার প্রকাণ্ড মস্তক ছেদন-মাত্রে গগনমণ্ডলে আরোহণ করিয়া ভীষণ নাদে গর্জন করিতে লাগিল। তাহার কবন্ধ-কলেবর সকাননা, সদ্বীপা, সপর্ব্বতা, বসুন্ধরাকে কম্পিত করত ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল। তদবধি চন্দ্র ও সূর্য্যের সহিত রাহুমুখের চির-শত্রুতা জন্মিল। এই নিমিত্তই অদ্যাপি ঐ রাহু-মুখ তাঁহাদিগকে গ্রাস করিয়া থাকে। পরিশেষে ভগবান্ নারায়ণ মোহিনী-বেশ পরিত্যাগ করিয়া অস্ত্র শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক দানবগণকে আক্রমণ করিলেন।

সুরাসুর সংঘাত-উদ্দেশ্য অমৃতলাভ।

তদন্তর লবণার্ণব-তীরে দেবাসুরগণের ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। প্রাস, তোমর, ভিন্দিপাল প্রভৃতি সহস্র সহস্র তীক্ষ্ণাগ্র শস্ত্রবর্ষণে রণস্থল আচ্ছন্ন হইল। খড়া, চক্র, গদা, শক্তি প্রভৃতি শস্ত্রাঘাতে দানবগণ রুধির বমনপূর্ব্বক মূর্ছিত হইয়া রণশায়ী হইল। তাহাদিগের তপ্তকাঞ্চনাকার মস্তক কপাল পট্টিশাঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া অনবরত ধরণীতলে পতিত হইতে লাগিল। যুদ্ধে হত দানবগণ রুধিরাক্ত কলেবর হইয়া ধাতুরাগরঞ্জিত গিরি-কূটের' ন্যায় ভূমি-শয্যায় শয়ান রহিল। পরস্পরের শস্ত্র-প্রহার দেখিয়া রণস্থলে হাহাকার শব্দ উঠিল। দেবগণ দূর হইতে লৌহময় পরিঘাঘাত ও নিকটে দৃঢ়মুষ্টি-প্রহার করিয়া রণ করিতে আরম্ভ করিলেন। দানবেরাও ঐরূপ যুদ্ধ করিতে লাগিল। সংগ্রামের কলকল ধ্বনি গগনমণ্ডল আচ্ছাদিত করিল। চারিদিকে কেবল "ছিন্ধি, ভিন্ধি, প্রধাব, ঘাতয়, পাতয়, মারয়” ইত্যাদি ঘোরতর শব্দমাত্র শ্রুত হইতে লাগিল।

এইরূপে ভয়ঙ্কর সংগ্রাম হইতেছে, এমত সময়ে নর ও নারায়ণ রণস্থলে আগমন করিলেন। ভগবান্ নারায়ণ নরদেবের হস্তে দিব্য ধনুঃ সন্দর্শন করিয়া দানবকুল-ধূমকেতু স্বীয় চক্রান্ত স্মরণ করিলেন। মহাপ্রভাবশালী, সূর্য্যসম-তেজস্বী, অপ্রতিহতবীর্য্য ভীমদর্শন, সেই অরিনিসূদন, সুদর্শনচক্র স্মরণ-মাত্রে নভোমণ্ডল হইতে অবতীর্ণ হইল। আজানুলম্বিতভুজ ভগবান্ চক্রপাণি সেই প্রজ্বলিত-হুতাশনাকার, ভয়ঙ্কর চক্র বিপক্ষপক্ষে প্রক্ষেপ করিলেন। নারায়ণ-বিক্ষিপ্ত ভীষণ সুদর্শনাস্ত্র মহাবেগে ধাবমান হইয়া সহস্র সহস্র দানবদলের প্রাণ সংহার করিল। কোন স্থলে সমুজ্জ্বল হুতাশনের ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া দৈত্যকুল নিপাত করিল, কোথাও বা আকাশমণ্ডলে ও ধরাতলে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পিশাচের ন্যায় তাহাদিগের রুধির পান করিতে লাগিল।

নবমেঘাকৃতি মহাবল পরাক্রান্ত, দানবেরাও আকাশে উত্থিত হইয়া সহস্র সহস্র পর্ব্বত নিক্ষেপ দ্বারা দেবগণকে আকুলিত করিল। ভগ্নসানু অতি প্রকাণ্ড মহীধরগণ পরস্পরা-ভিঘাতে ভয়ঙ্কর শব্দ করিয়া ঘোরতর মেঘের ন্যায় চতুদ্দিকে পতিত হইতে লাগিল। দুর্দান্ত দানবগণ এইরূপে গভীর গর্জন-পূর্ব্বক নিরন্তর পর্ব্বত বর্ষণ করিয়া সকাননা সদ্বীপা মেদিনীকে কম্পান্বিত করিল। তখন নরদেব সুবর্ণমুখ শিলীমুখ দ্বারা দানব-বিক্ষিপ্ত পৰ্ব্বতসমূহ বিদারণপূর্ব্বক নভোমণ্ডল ব্যাপ্ত করিলেন। মহাবলপরাক্রান্ত দানবগণ দেবগণকর্তৃক ভগ্নবল হইয়া এবং আকাশমণ্ডলে জ্বলন্তাগ্নিসদৃশ সুদর্শন চক্রকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া কেহ ভূগর্তে কেহ বা লবণার্ণবগর্তে প্রবিষ্ট হইল।

সুরগণ এইরূপে জয়লাভ করিয়া যথোচিত সৎকার পুরঃসর মন্দরগিরিকে স্বস্থানে সংস্থাপন করিলেন। জলধরগণ নভোমণ্ডল এবং সুরলোক নিনাদিত করিয়া যথাস্থানে প্রতিগমন করিল। অনন্তর ইন্দ্রাদি দেবগণ আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া সেই অমৃতপূর্ণ কমণ্ডলু সুরক্ষিত করিয়া নারায়ণের নিকট সমর্পণ করিলেন।

কদ্রুর কপটতা এবং স্বীয় পুত্রদিগের শাপ দান।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ঋষিবর! অমৃত-মন্থন সময়ে শ্রীমান্ অতুলতেজাঃ উচ্চৈঃশ্রবাঃ নামক যে অশ্বরাজ, জলনিধি হইতে সমুত্থিত হয়, তাহার সমস্ত বিবরণ বিশেষরূপে বর্ণিত হইল। কদ্রু সেই অশ্বরাজকে অবলোকন করিয়া স্বীয় সপত্নী বিনতাকে কহিলেন, বিনতে। বল দেখি উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্বের কিরূপ বর্ণ? বিনতা কহিলেন, উচ্চৈঃশ্রবাঃ শুক্লবর্ণ; তোমার কি বোধ হয়? আইস এ বিষয়ে দুইজনে পণ করি। কদ্রু কহিলেন, হে মধুরহাসিনি! আমি বোধ করি এই অশ্বের পুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণ; আইস এ বিষয়ে এই পণ করা যাউক যে, যাহার অনুমান মিথ্যা হইবে সে দাসী হইয়া থাকিবে। তাঁহারা এইরূপে পরস্পর দাস্যবৃত্তি অবলম্বনে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া "কল্য এই অশ্বকে দেখিব” এই বলিয়া স্ব স্ব আবাসে প্রত্যাগমন করিলেন। কদ্র নিজ নিকেতনে আগমন করিয়া কৌটিল্য' করিবার মানসে স্বীয় সহস্র পুত্রের প্রতি আজ্ঞা করিলেন, তোমাদিগকে কৃষ্ণরূপ ধারণপূর্ব্বক উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্বের পুচ্ছদেশে লম্বমান হইয়া তৎপুচ্ছের কৃষ্ণত্ব সম্পাদন করিতে হইবে, দেখিও যেন আমাকে দাসীত্ব শৃঙ্খলে বদ্ধ হইতে না হয়। যে সকল ভুজঙ্গম তদীয় আজ্ঞা প্রতিপালনে পরাজুখ হইল, তিনি তাহাদিগকে এই অভিসম্পাত করিলেন, তোমরা পাণ্ডুবংশাবতংস রাজর্ষি জনমেজয়ের সর্পসত্রে অগ্নিতে দগ্ধ হইবে। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা কদ্রদত্ত সেই অতি নিষ্ঠুর শাপ স্বকর্ণে শ্রবণ করিলেন। পরে সর্প সংখ্যায় আতিশয্য প্রযুক্ত কদ্রদত্ত শাপ প্রজাবর্গের পরম শ্রেয়স্কর হইয়াছে বিবেচনা করিয়া অন্যান্য দেবগণের সহিত সাতিশয় আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন এবং কহিলেন, "এই সকল মহাবল হিংস্র সর্পগণের বিষ অতিশয় তীব্র ও বীর্য্যবৎ সেই তীব্র বিষে প্রজাগণের সর্ব্বদাই অনিষ্ট ঘটনা হইয়া থাকে; অতএব কদ্রু ইহাদিগকে এই শাপ দিয়া উত্তম কর্ম করিয়াছেন। তাহারা যেমন সর্ব্বদা প্রজাগণের অহিতাচরণ করে, তেমনি দৈব তাহাদিগের উপর প্রাণান্তিক দণ্ডপাত করিয়াছেন।”

ব্রহ্মা দেবগণের সহিত এইরূপে আনন্দ প্রকাশ করিয়া কদ্রুকে সমুচিত সম্মান প্রদান করিলেন এবং মহর্ষি কশ্যপকে স্বীয় সন্নিধানে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, হে পুণ্যশালিন্! যে সকল তীক্ষ্ণবিষ, মহাফণ ভুজঙ্গমগণ তোমার ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, কদ্রু তাহাদিগকে শাপ প্রদান করিয়াছেন; অতএব হে বৎস! এ বিষয়ে তোমার ক্রোধ করা বিধেয় নহে। যজ্ঞে সর্পকুল বিনষ্ট হইবে ইহা পূর্ব্বাপর বর্ণিত আছে। ব্রহ্মা, কশ্যপ প্রজাপতিকে এইরূপে প্রসন্ন করিয়া তাঁহাকে বিষহরী বিদ্যা প্রদান করিলেন।

সমুদ্রকথন।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা এইরূপে পরস্পর দাস্যবৃত্তি পণ করিয়া এবং তজ্জন্য সাতিশয় অমর্যাবিষ্ট ও রোষপরবশ হইয়া সেই রাত্রি অতিবাহিত করিলেন। পরদিবস প্রভাতে সূর্যোদয় হইবামাত্র তাঁহারা দুইজনে অনতিদূরবর্তী উচ্চৈঃশ্রবাঃ তুরঙ্গমকে দেখিবার মানসে কিয়দ্দূর গমন করিয়া অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, অগাধ, সর্ব্বভূত-ভয়াবহ, পরমপবিত্র, অম্ভোনিধি অবলোকন করিলেন। যে জলধি তিমি', তিমিঙ্গিল', মৎস্য, কচ্ছপ, মকর, নক্রচক্র' প্রভৃতি সহস্র সহস্র ভয়ঙ্কর বিকৃতাকার জলচরগণে এবং ভীষণাকার সর্পগণে নিরন্তর সমাকীর্ণ; চন্দ্র, লক্ষ্মী, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্ব, পাঞ্চজন্য শঙ্খ, অমৃত, বাড়বানল ও সর্ব্বপ্রকার রত্ন যাহা হইতে উৎপন্ন; পর্ব্বতাধিরাজ মৈনাক ও জলাধিরাজ বরুণ দেব যাহাতে সতত বাস করেন; যে সমুদ্র দানবগণের পরমমিত্র ও স্থলচর জন্তুগণের সাতিশয় ভয়াবহ শত্রু; যাহাতে ভয়ঙ্কর জলজন্তুসকল সর্ব্বদা ঘোরতর শব্দ করিতেছে এবং বায়ুবেগে অনবরত পর্ব্বতাকার তরঙ্গমালা সমুত্থিত হইতেছে, দেখিলে বোধ হয় যেন সমুদ্র, তরঙ্গরূপ হস্ত উত্তোলনপূর্ব্বক নিরন্তর নৃত্য করিতেছে; চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধি অনুসারে যাহারা হ্রাসবৃদ্ধি হইয়া থাকে; অমিততেজাঃ ভগবান্ নারায়ণ বরাহরূপ ধারণপূর্ব্বক মধ্যে প্রবেশ করিয়া যাহার জল বিক্ষোভিত ও আবিল করিয়াছিলেন এবং যাহাতে যোগনিদ্রা অনুভব করিয়াছিলেন; ব্রতপরায়ণ ব্রহ্মর্ষি অতি শত বৎসরেও যাহার তলস্পর্শ করিতে পারেন নাই; অসুরগণ অরাজক যুদ্ধে পরাভূত হইয়া যাহার মধ্যে বাস করে; যে সমুদ্র স্বীয় গর্ন্তস্থ বাড়বানলকে সর্ব্বদা তোেয়রূপ হবিঃ প্রদান করিতেছে; সহস্র সহস্র মহানদী পরস্পর স্পর্দ্ধা করিয়া যেন অভিসারিকার ন্যায় যাহাতে সতত সমাবেশ করিতেছে।

কশ্যপ পত্নীদ্বয়ের সাগরপারে গমন।

সৌতি কহিলেন, নাগগণ মাতৃশাপ শ্রবণানন্তর পরামর্শ করিল, আমাদিগের জননীর অন্তঃকরণে স্নেহের লেশমাত্র নাই, সুতরাং তাঁহার মনোভিলাষ সফল না হইলে রোষপরবশ হইয়া আমাদিগকে ভস্মসাৎ করিবেন। কিন্তু মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইলে প্রসন্না হইয়া আমাদিগের শাপ বিমোচন করিতে পারেন। অতএব চল সকলে একমত হইয়া উচ্চৈঃশ্রবার পুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণ করি। নাগেরা এই অভিসন্ধি করিয়া ঐ অশ্বের পুচ্ছদেশে কৃষ্ণকেশরূপে পরিণত হইল। ইত্যবসরে দক্ষতনয়া কদ্রু ও বিনতা গগনমার্গে উঠিয়া বায়ুবেগে বিচলিত, গভীর নিনাদযুক্ত, তিমিঙ্গিল-মকরসার্থ'-সঙ্কুল, বহুবিধ ভীষণ জন্তুগণে সমাকীর্ণ, সকল রত্নের আকর, বরুণ দেবের আবাসস্থান, নাগগণের বাসভবন, স্থানে স্থানে স্রোতস্বতীগণে পরিপূর্য্যমাণ, অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, অগাধ, অতি দুর্দ্ধর্ষ, অক্ষোভ, পবিত্র-জল-বিশিষ্ট রমণীয় জলনিধি দর্শন করিতে করিতে পরম প্রীতিসহকারে তাহার অপর পারে উপস্থিত হইলেন।

বিনতার পরাজয় ও গরুড়ের আবির্ভাব।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্র ও বিনতা সমুদ্র অতিক্রম করিয়া অতি সত্বরে তুরগ-সমীপে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, অশ্বটি শশাঙ্ক কিরণের ন্যায় শুভ্রবর্ণ; কেবল তাঁহার পুচ্ছদেশের কেশগুলি কৃষ্ণবর্ণ। তদবলোকনে বিনতা অতিমাত্র বিষন্না হইলেন। পরে কদ্রু তাহাকে দাসীর কার্য্য করিতে আদেশ করিলেন। বিনতা পণে পরাজিত হইয়াছেন, সুতরাং অগত্যা সপত্নীর দাস্য কৰ্ম্ম আশ্রয় করিতে হইল।

এই সময়ে গরুড় অবসর বুঝিয়া মাতার প্রযত্ন ব্যতিরেকে স্বয়ং অন্ডবিদারণপূর্ব্বক বহির্গত হইলেন। মহাসত্ত্ব মহাবলসম্পন্ন, সৌদামিনী-সমনেত্র, কামরূপ, কামবীর্য্য, কাম-চারী, বিহঙ্গমরাজ প্রদীপ্ত হুতাশনরাশির ন্যায় স্বকীয় প্রভামণ্ডলে সহসা দশদিক্ আলোকময় করিয়া আকাশে আরোহণ ও ঘোরতর বিরাব' পরিত্যাগপূর্ব্বক ভয়ঙ্কর প্রকাণ্ড কলেবর ধারণ করিলেন। তাহা দেখিয়া দেবগণ ভীত ও বিস্মিত হইলেন। পরে তাঁহারা আসনস্থ বিশ্বরূপী ভগবান্ অগ্নির শরণাগত হইয়া যথাবিধি প্রণতিপূর্ব্বক অতি বিনীত বচনে কহিলেন, হে হুতাশন! তুমি আর পরিবর্দ্ধিত হইও না, তুমি কি আমাদিগকে দগ্ধ করিতে ইচ্ছা করিয়াছ? ঐ দেখ, পর্ব্বতাকার প্রজ্বলিত অগ্নিরাশি ইতস্ততঃ প্রসৃত হইতেছে। অগ্নি কহিলেন, হে অসুরনিসূদন সুরগণ। তোমাদিগের আপাততঃ যাহা বোধ হইতেছে, উহা বস্তুতঃ সেরূপ নহে। আমার তুল্য তেজস্বী, বলবান, বিনতানন্দন গরুড় জন্মগ্রহণ করিয়া কলেবর বৃদ্ধি করিতেছেন; তাঁহার তেজোরাশি নিরীক্ষণ করিয়া তোমরা মোহাবিষ্ট হইয়াছ। ঐ নাগকুলান্তক কশ্যপাত্মজ সর্ব্বদা দেবতা-দিগের হিতানুষ্ঠান ও দৈত্যরাক্ষসদিগের অনিষ্ট চেষ্টা করিবেন। অতএব তোমাদিগের কোন ভয় নাই, আইস আমরা সমবেত হইয়া গরুড়ের নিকট যাই।

অনন্তর দেবগণ ও ঋষিগণ তৎসন্নিধানে গমন করিয়া গরুড়কে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। হে মহাভাগ পতগেশ্বর! তুমি ঋষি, তুমি দেব, তুমি প্রভু, তুমি সূর্য্য, তুমি প্রজাপতি, তুমি ব্রহ্মা, তুমি ইন্দ্র, তুমি হয়গ্রীব, তুমি শর, তুমি জগৎপতি, তুমি সুখ, তুমি দুঃখ, তুমি বিপ্র, তুমি অগ্নি, তুমি পবন, তুমি ধাতা, তুমি বিধাতা, তুমি বিষ্ণু, তুমি অমৃত, তুমি মহত্যশঃ, তুমি প্রভা, তুমি আমাদের পরিত্রাণস্থান, তুমি বল, তুমি সাধু, তুমি মহাত্মা, তুমি সমৃদ্ধিমান, তুমি অন্তক, তুমিই স্থিরাস্থির সমস্ত পদার্থ, তুমি অতি দুঃসহ, তুমি উত্তম, তুমি চরাচরস্বরূপ, হে প্রভৃতকীর্তে গরুড়। ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান তোমা হইতেই ঘটিতেছে, তুমি স্বকরমণ্ডলে দিবাকরের শোভা প্রাপ্ত হইয়াছ, তুমি স্বকীয় প্রভাপুঞ্জে সূর্য্যের তেজোরাশি সমাক্ষিপ্ত করিতেছ, হে হুতাশন-প্রভু! তুমি কোপাবিষ্ট দিবাকরের ন্যায় প্রজাসকলকে দগ্ধ করিতেছ, তুমি সর্ব্বসংহারে উদ্যত যুগান্ত-বায়ুর ন্যায় নিতান্ত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করিয়াছ। আমরা মহাবল পরাক্রান্ত, বিদ্যুৎসমানকান্তি, গগনবিহারী অমিত পরাক্রমশালী, খগকুল-চূড়ামণি, গরুড়ের শরণ লইলাম। হে জগৎ-প্রভো! তোমার তপ্তসুবর্ণসম রমণীয় তেজোরাশিদ্বারা এই জগন্মণ্ডল নিরন্তর সন্তপ্ত হইতেছে। তুমি ভয়বিহ্বল ও বিমানারোহণপূর্ব্বক আকাশ-পথে ইতস্ততঃ পলায়মান সুরগণকে পরিত্রাণ কর। হে খগবর! তুমি পরমদয়ালু মহাত্মা কশ্যপের পুত্র, অতএব ক্রোধ সংবরণ করিয়া জগতের প্রতি দয়াপ্রকাশ কর। তুমি ঈশ্বর, এক্ষণে ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক আমাদিগকে অনুকম্পা কর। আমরা বিষম বিপদে আক্রান্ত হইয়াছি। তোমার বজ্রনির্ঘোষ-সদৃশ ঘোররবে নভোমণ্ডল, দিঘণ্ডল, দেবলোক, ভূর্লোক ও আমাদিগের হৃদয় সতত কম্পমান হইতেছে। তুমি অগ্নিতুল্য স্বীয় শরীরের সঙ্কোচ কর। কুপিত কৃতান্তের ন্যায় তোমার অতি ভীষণ কলেবর দর্শনে আমাদের মন ব্যথিত ও শঙ্কিত হইতেছে। হে ভগবন্ | খগাধিপতি। প্রসন্ন হইয়া শরণাগত জনের সুখবহ হও।

অরুণ কর্তৃক সূর্য্যের সারথ্য স্বীকার ।

গরুড় দেবতা ও ঋষিদিগের এইরূপ স্তুতিবাদ শ্রবণ করিয়া এবং আপনার অতি প্রকাণ্ড কলেবর অবলোকন করিয়া স্বীয় তেজঃপুঞ্জের প্রতিসংহার করিলেন এবং কহিলেন, আমি আত্মতেজের সঙ্কোচ করিতেছি আর কাহাকেও ভীত হইতে হইবে না। এই বলিয়া বিহঙ্গমরাজ গরুড় অরুণকে আত্মপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া পিতৃগৃহ হইতে সমুদ্রের অপরপারবর্তিনী স্বীয় জননী সন্নিধানে গমন করিলেন। ঐ সময়ে সূর্য্যদেব দেবতাদিগের প্রতি কুপিত হইয়া প্রখর করজাল বিস্তারপূর্ব্বক ত্রিলোকী দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছেন দেখিয়া, খগরাজ স্বীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা অরুণকে পূর্ব্বদিকে স্থাপন করিলেন।

রুরু কহিলেন, সূর্য্য কি নিমিত্ত ত্রিলোক দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন? এবং দেবতারাই বা তাঁহার কি অপকার করিয়া-ছিলেন যে, তিনি তাঁহাদিগের প্রতি এইরূপ কুপিত হইলেন? প্রমতি কহিলেন, যৎকালে চন্দ্র ও সূর্য্য রাহুকে প্রচ্ছন্নভাবে অমৃত পান করিতে দেখিয়া দেবতাদিগের নিকট প্রকাশ করিয়া দেন, তদবধি তাঁহাদিগের সহিত রাহুর বৈরানু-বন্ধন হওয়াতে ঐ ক্রুরগ্রহ রাহু মধ্যে মধ্যে সূর্যদেবকে গ্রাস করিত। পরে ভগবান্ সূর্য্য এই অভিপ্রায়ে রোষাবিষ্ট হইলেন যে, আমি দেবতাদিগেরই হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত রাহুর কোপে পড়িলাম এবং তজ্জন্য কেবল আমিই একাকী বহু অনর্থকর পাপের ফলভাগী হইলাম, বিপৎকালে কাহাকেই সাহায্য করিতে দেখি না। রাহু যখন আমাকে গ্রাস করে, দেবতারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াও তাহা অনায়াসে সহ্য করিয়া থাকে; অতএব আমি অদ্য সমস্ত লোক নাশ করিব, সন্দেহ নাই। দিবাকর এইরূপ অভিসন্ধি করিয়া অস্তাচল-চূড়াবলম্বী হইলেন এবং বিশ্বসংসার সংহার করিবার মানসে স্বকীয় তেজোরাশি পরিবর্দ্ধিত করিতে লাগিলেন। তদনন্তর মহর্ষিগণ দেবতাদিগের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, অদ্য নিশীথসময়ে সর্ব্বলোকভয়াবহ মহাদাহ আরম্ভ হইবে।

তখন দেবগণ মহর্ষিগণের সমভিব্যাহারে সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মার নিকট উপনীত হইয়া বিনীত বচনে নিবেদন করিলেন, ভগবন্। কোথা হইতে ভয়ঙ্কর মহাদাহ উপস্থিত হইল? সূর্য্য লক্ষিত হইতেছেন না অথচ সর্ব্বলোকক্ষয় উপস্থিত। না জানি, সূর্য্য উদিত হইলে কি দুর্দশা ঘটিবে। পিতামহ কহিলেন, দিবাকর সর্ব্বসংহারে উদ্যত হইয়াছেন। তিনি উদিত হইয়া ক্ষণকালমধ্যেই আমাদিগের সমক্ষে সমস্ত লোক ভস্মসাৎ করিবেন। কিন্তু ইতিপূর্ব্বেই আমি ইহার প্রতি-বিধান করিয়া রাখিয়াছি। মহাত্মা কশ্যপের অরুণনামে এক মহাবীৰ্য্যসম্পন্ন পুত্র জন্মিয়াছে। সে সূর্য্যের সম্মুখে থাকিয়া তাঁহার সারথ্যকার্য্য করিবে এবং তদীয় তেজঃ প্রতিসংহার করিবে; তাহা হইলেই দেবগণ, ঋষিগণ ও সমস্ত লোকের মঙ্গল লাভের সম্ভাবনা। প্রমতি কহিলেন, তদনন্তর অরুণ পিতামহের আদেশানুসারে সূর্য উদিত হইলেই তাঁহাকে আবরণ করিয়া তদীয় সম্মুখে উপবিষ্ট রহিলেন। সূর্য্যদেব যে কারণে কোপাক্রান্ত হইয়াছিলেন এবং অরুণ যে নিমিত্ত তাঁহার সারথ্য কার্য্য স্বীকার করেন, তাহা আদ্যোপান্ত সমুদায় কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে পূর্ব্বোল্লিখিত প্রশ্নের প্রত্যুত্তর প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর।

কদ্রুর ইন্দ্রকে স্তব।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তৎপরে মহাবলপরাক্রান্ত কামচারী বিহঙ্গমরাজ গরুড় সমুদ্রের অপরপারস্থ স্বকীয় জননী-সন্নিধানে গমন করিলেন। তথায় তাঁহার মাতা বিনতা পণে পরাজিতা হইয়া আপন সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক দুঃসহ দুঃখে কালক্ষেপ করিতেছিলেন। একদা বিনতা পুত্রের নিকট উপবিষ্টা আছেন এমত সময়ে কদ্রু তাঁহাকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, দেখ বিনতে! সমুদ্রের মধ্যে এক পরম রমণীয় দ্বীপ আছে, ঐ দ্বীপে নাগগণ বাস করে, তথায় আমাকে লইয়া চল। বিনতা আজ্ঞা প্রাপ্তি-মাত্রে কদ্রুকে পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করাইয়া চলিলেন এবং গরুড়ও মাতৃনিৰ্দ্দেশ-ক্রমে কদ্রুপুত্র নাগগণকে পৃষ্ঠে লইয়া তাঁহার অনুসরণ করিলেন। বিনতানন্দন গরুড় সূর্য্যাভিমুখে গমন করাতে পন্নগগণ দুঃসহ তপনতাপে অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়া মূর্ছিত হইতে লাগিল।

কদ্র স্বীয় পুত্রদিগের তাদৃশী দুরবস্থা দেখিয়া বৃষ্টিবাসনায় সুরপতি ইন্দ্রকে স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন। হে শচীপতে, সহস্রলোচন, দেবরাজ। তুমি বল, নমুচি ও বৃত্রাসুরকে নষ্ট করিয়াছ। এক্ষণে তোমাকে নমস্কার করি। প্রচণ্ড রবিকিরণসন্তপ্ত মদীয় পুত্রদিগের উপর বারিবর্ষণ কর। হে সুরপতে। সম্প্রতি তোমা ব্যতিরেকে আমাদিগের প্রাণরক্ষার আর কোন উপায়ান্তর নাই; যে হেতু তুমিই প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে সমর্থ। তুমি বায়ু; তুমি মেঘ; তুমি অগ্নি; তুমি গগনমণ্ডলে সৌদামিনীরূপে প্রকাশমান হও এবং তোমা হইতেই ঘনাবলী পরিচালিত হইয়া থাকে; তোমাকেই লোকে মহামেঘ বলিয়া নির্দেশ করে; তুমিই ঘোর ও প্রকাণ্ড বজ্র-জো্যতিঃ স্বরূপ; তুমি আদিত্য; তুমি বিভাবসু; তুমি অত্যাশ্চর্য্য মহাভূত; তুমি নিখিল দেবগণের অধিপতি; তুমি বিষ্ণু; তুমি সহস্রাক্ষ; তুমি দেব; তুমি পরমগতি; তুমি অক্ষয় অমৃত; তুমি পরমপূজিত সৌম্যমূর্তি; তুমি মুহূর্ত্ত; তুমি তিথি; তুমি বল; তুমি ক্ষণ; তুমি শুক্লপক্ষ; তুমি কৃষ্ণপক্ষ; তুমিই কলা, কাষ্ঠা, ত্রুটি, মাস, ঋতু, সংবৎসর ও অহোরাত্র; তুমি সমস্ত পৰ্ব্বত ও বনসমাকীর্ণা বসুন্ধরা; তুমি তিমিরবিরহিত ও সূর্য্যসংস্কৃত আকাশ; তুমি তিমি-তিমিঙ্গিল-সহিত ও উত্তুঙ্গ-তরঙ্গকুলসঙ্কুল মহার্ণব; তুমি অতি যশস্বী; এই নিমিত্তই প্রতিভা-সম্পন্ন মহর্ষিগণ প্রশান্তমনে তোমার আরাধনা করিয়া থাকেন। আর তুমি স্তবে পরিতুষ্ট হইয়া যজমানের হিতসাধনার্থে যজ্ঞীয় পবিত্র হবিঃ ও সোমরস পান করিয়া থাক। ব্রাহ্মণেরা একমাত্র পারত্রিক শুভলাভের প্রত্যাশায় সতত তোমার উপাসনা করিয়া থাকেন। হে বিপুলবিক্রমশালিন্। অখিল বেদ ও বেদাঙ্গ তোমারই অচিন্তনীয় অনন্ত মহিমা কীর্ত্তন করে এবং যজ্ঞপরায়ণ দ্বিজাতিগণ তোমার স্বরূপ অবধারণের নিমিত্ত প্রযত্ন-সহকারে সতত সেই সকল বেদ বেদাঙ্গের মীমাংসা করিয়া থাকেন।

কদ্রুর স্তবে তুষ্ট ইন্দ্র।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র ককৃত স্তব শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া নীলবর্ণ জলদজালে দিঘণ্ডল আচ্ছন্ন করিলেন এবং মেঘদিগকে অনবরত মুষলধারে বারিবর্ষণ করিতে আদেশ দিলেন। জলদগণ ইন্দ্রের আদেশ পাইয়া ঘোরতর গভীর গর্জনপূর্ব্বক মুহুর্মুহুঃ সৌদামিনী স্ফুরণ ও প্রচুর বারিবর্ষণ করিতে লাগিল। তৎকালে বোধ হইল যেন আকাশে প্রলয়কাল উপস্থিত হইয়াছে কিংবা মেঘনির্ঘোষ বিদ্যুৎপ্রকাশ ও বায়ুচালিত নীরধারাদ্বারা যেন আকাশমণ্ডল নৃত্য করিতেছে। সেই মেঘাচ্ছন্ন দুৰ্দ্দিনে চন্দ্রসূর্য্য এককালে অন্তর্হিত হইলেন। তখন নাগগণ যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইল। বিশ্বমণ্ডলী সলিলভারে মগ্নপ্রায় হইল। সুশীতল বিমল জলধারা রসাতলে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। পরিশেষে সর্পগণ মাতার সহিত রামণীয়ক-দ্বীপে উপনীত হইল।

গরুড়কর্তৃক মাতার মুক্তি-অনুসন্ধান।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ প্রচুর জলধারায় অভিষিক্ত হইয়া অতিপ্রহৃষ্ট মনে সুপর্ণ-পৃষ্ঠে আরোহণপূর্ব্বক সেই মকর-সমূহের আকরভূমি, বিশ্বকর্মাবিরচিত, রামণীয়কদ্বীপে উপনীত হইল। তথায় যাইয়া প্রথমতঃ অতি ভয়ঙ্কর লবণ-মহার্ণব অবলোকন করিল। পরে সেই দ্বীপের অন্তর্বর্তী পরমশোভাকর এক পবিত্র কাননে প্রবেশ করিয়া বিহার করিতে লাগিল। ঐ কানন সাগরজলে নিরন্তর অভিষিক্ত হইতেছে। উহাতে বহুবিধ বিহঙ্গমগণ সর্ব্বদা মধুরস্বরে কলরব করিতেছে; বৃক্ষশ্রেণী নিরন্তর ফলপুষ্পে সুশোভিত রহিয়াছে; ঘনসন্নিবিষ্ট তরুরাজি, সুরম্য হর্ম, পদ্মাকর' ও স্বচ্ছ-সলিল-পূর্ণ অলৌকিক হ্রদসমূহ সর্ব্বদা উহার অপূর্ব্ব শোভা সম্পাদন করিতেছে; তথায় সুগন্ধ সমীরণ অনুক্ষণ ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেছে; অত্যুন্নত চন্দন ও অন্যান্য বহুবিধ বৃক্ষগণ সতত বিরাজিত রহিয়াছে; ঐ সকল বৃক্ষ বায়ুবেগ-সহকারে বিকম্পিত হইয়া অবিরত পুষ্পবর্ষণ করিতেছে; মধুকরগণ মধুগন্ধে অন্ধ হইয়া মৃদু-মধুর-রবে আগন্তুক ব্যক্তির মনোহরণ করিতেছে। ঐ উদ্যান গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরাদিগের প্রীতিস্থান এবং উহা দেখিলে তদ্দণ্ডেই অন্তঃকরণে আনন্দের সঞ্চার হইয়া থাকে।

কদ্র-পুত্রেরা সেই কাননে কিয়ৎক্ষণ বিহার করিয়া মহাবল পরাক্রান্ত গরুড়কে কহিল, দেখ তুমি আমাদিগকে অন্য কোন নিৰ্ম্মল জল-সম্পন্ন সুরম্য দ্বীপে লইয়া চল। তুমি সমস্ত মনোহর স্থান অবশ্যই জান; কারণ তুমি গগনে উড্ডীন হইলে কোন রমণীয় স্থান তোমার নয়নের অগোচর থাকে না। গরুড় সর্পদিগের এইরূপ আদেশ বাক্য শ্রবণ করিয়া অতি বিষণ্ণ মনে স্বীয় জননীসন্নিধানে নিবেদন করিলেন, মাতঃ। আমাকে কি কারণে সর্পগণের আদেশ প্রতিপালন করিতে হইবে, তাহা বল। বিনতা কহিলেন, বৎস। আমি দুরদৃষ্টক্রমে নাগগণের মায়াজালে পতিত ও পণে পরাজিত হইয়া সপত্নীর দাস্যবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি। গরুড়, মাতৃসন্নিধানে এই কারণ শ্রবণ করিয়া অতিশয় পরিতাপ পাইলেন ও অনতিবিলম্বে সর্পগণের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, হে নাগগণ। কোন্ বস্তু আহরণ বা কিরূপ পৌরুষ প্রকাশ করিলে আমরা দাসত্বশৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইতে পারি, তাহা জানিতে ইচ্ছা করি। তাহা শ্রবণ করিয়া সর্পেরা কহিল, হে বিহঙ্গমরাজ! যদি তুমি পৌরুষ প্রকাশ করিয়া অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হও, তাহা হইলেই দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিবে।

অমৃত আহরণে বিনতার সম্মতি দান।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, গরুড় এইরূপ অভিহিত হইয়া মাতার নিকট যাইয়া কহিলেন, জননি! আমি অমৃত আহরণ করিতে চলিলাম; পথে কি আহার করিব, বলিয়া দেও। বিনতা বলিলেন, বৎস! সমুদ্রমধ্যে বহু সহস্র নিষাদ বাস করে, তুমি তাহাদিগকে ভোজন করিয়া অমৃত আনয়ন কর; কিন্তু হে বৎস! দেখিও যেন ব্রাহ্মণ-বধে কদাচ তোমার বুদ্ধি না জন্মে। অনলসমান ব্রাহ্মণগণ সর্ব্বজীবের অবধ্য। ব্রাহ্মণ কুপিত হইলে অগ্নি, সূর্য্য, বিষ ও শস্ত্রতুল্য হয়েন। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের গুরু। এই নিমিত্ত ব্রাহ্মণ সর্ব্বভূতের আদরণীয়। অতএব হে বৎস! তুমি অতিশয় কুপিত হইয়াও যেন কোনক্রমে ব্রাহ্মণের হিংসা বা তাঁহাদিগের সহিত বিদ্রোহাচরণ করিও না। নিত্য নৈমিত্তিক জপহোমাদি ক্রিয়াকলাপে নিরত, বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হইলে যেরূপ দগ্ধ করিতে পারেন, কি অগ্নি, কি সূর্য্য, কেহই সেরূপ পারেন না। ব্রাহ্মণ সর্ব্বজীবের অগ্রজাত, সর্ব্ববর্ণের শ্রেষ্ঠ এবং সর্ব্বভূতের পিতা ও গুরু।

গরুড় মাতৃসন্নিধানে ব্রাহ্মণের এইরূপ অভাবনীয় প্রভাব অবগত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, মাতঃ। ব্রাহ্মণের কীদৃশ আকার, কি প্রকার স্বভাব ও কিরূপই বা পরাক্রম? ব্রাহ্মাণ কি হুতাশনের ন্যায় সর্ব্বদা প্রদীপ্ত, কিংবা অতিশয় সৌম্যমূর্তি; যে সকল শুভলক্ষণদ্বারা ব্রাহ্মহ্মণকে চিনিতে পারা যায়, তুমি হেতু নির্দেশ পূর্ব্বক তাহা আমাকে সবিশেষ রূপে কহিয়া দেও। বিনতা কহিলেন, যিনি তোমার জঠরদেশে প্রবেশ করিলে বড়িশের ন্যায় নিতান্ত দুঃসহ ক্লেশদায়ক হইবেন এবং প্রজ্বলিত অঙ্গারের ন্যায় কণ্ঠদাহ করিবেন, তিনিই সুব্রাহ্মণ। তুমি অতিমাত্র ক্রুদ্ধ হইয়াও ব্রাহ্মণকে বধ করিতে প্রবৃত্ত হইও না। বিনতা পুত্র-বাৎসল্য প্রযুক্ত গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, বৎস। যিনি তোমার জঠরদেশে জীর্ণ হইবেন না, তাঁহাকেই সুব্রাহ্মাণ বলিয়া জানিবে। সর্পবঞ্চিতা পরমদুঃখিতা বিনতা পুত্রের অতুল পরাক্রম বুঝিতে পারিয়াও অতি প্রীতমনে তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন, বৎস। বায়ু তোমার দুই পক্ষ রক্ষা করুন; চন্দ্র ও সূর্য্য তোমার পৃষ্ঠ, অগ্নি মস্তক এবং বসুগণ ত্বদীয় সর্ব্বাঙ্গ সর্ব্বদা নির্বিঘ্নে রাখুন। হে পুত্র! আমিও তোমার স্বস্তি শান্তি বিষয়ে তৎপর হইয়া নিরন্তর ত্বদীয় শুভানুধ্যানে এই স্থানেই রহিলাম। তুমি কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত নিরাপদে প্রস্থান কর।

গরুড় মাতৃবাক্য শ্রবণান্তর পক্ষদ্বয় বিস্তার পূর্ব্বক গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া বুভুক্ষা' প্রযুক্ত সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় নিষাদপল্লীতে উপনীত হইলেন এবং নিষাদ-সংহারের নিমিত্ত ধূলিরাশিদ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন ও সমুদ্রের জল শোষণ করিয়া সমীপস্থ সমস্ত মহীধরগণকে বিচলিত করিতে লাগিলেন। পরিশেষে বিহঙ্গরাজ প্রকাণ্ড মুখব্যাদানপূর্ব্বক নিষাদ-নগরীর পথ রুদ্ধ করিয়া বসিলেন। বিষাদ-সাগরে নিমগ্ন নিষাদগণ প্রবল বাত্যাহত ধূলিপটলে অন্ধপ্রায় হইয়া, ভুজঙ্গভোজী গরুড়ের অতি বিস্তীর্ণ আননাভিমুখে ধাবমান হইল। যেমন প্রবল বায়বেগে সমস্ত বল ঘর্ণিত হইলে পক্ষিগণ আকাশমার্গে উঠে, সেইরূপ নিষাদেরাও গরুড়ের অতি বিশাল মুখবিবরে প্রবিষ্ট হইল। পরিশেষে ক্ষুধার্ত বিহঙ্গরাজ মুখ মুদ্রিত করিয়া বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিলেন।

গজ-কচ্ছপ বৃত্তান্ত।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এক ব্রাহ্মণ ভার্য্যা সমভিব্যাহারে গরুড়ের কণ্ঠদেশে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তিনি জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় তাঁহার কণ্ঠদাহ করিতে লাগিলেন। তখন গরুড় মাতৃবাক্য স্মরণ করিয়া কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম। আমি মুখব্যাদান' করিতেছি, তুমি সত্বর বহির্গত হও; ব্রাহ্মণ সর্ব্বদা পাপাচার-তৎপর হইলেও আমার অবধ্য। ব্রাহ্মণ খগাধিরাজ গরুড়ের এই কথা শ্রবণ করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, "তবে আমার ভার্য্যা নিষাদীও আমার সহিত বহির্গত হউক।" গরুড় কহিলেন, ভাল, তুমি নিষাদীকে লইয়া অবিলম্বে আমার আস্যবিবর' হইতে বহির্গত হও। তুমি এখনও আমার উদরে প্রবেশ করিয়া ভস্মাবশেষ হও নাই; অতএব বিলম্ব না করিয়া শীঘ্র আত্মরক্ষা কর। তখন ব্রাহ্মণ নিষাদীর সহিত নিষ্ক্রান্ত হইয়া গরুড়কে সংবর্দ্ধনা করিয়া অভিলষিত প্রদেশে প্রস্থান করিলেন।

এইরূপে ব্রাহ্মণ ও তদীয় ভার্য্যা নিষাদী বহির্গত হইলে খগরাজ স্বকীয় পক্ষজাল বিস্তার করিয়া প্রবল বেগে অন্তরীক্ষে উত্থিত হইলেন এবং অনতিবিলম্বে স্বীয় পিতা কশ্যপকে দেখিতে পাইলেন। মহর্ষি কশ্যপ আপন সন্তানের সন্দর্শন পাইয়া কুশলপ্রশ্নানন্তর জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস! মনুষ্যলোকে তোমার পর্যাপ্ত আহার লাভ হইয়া থাকে? তখন গরুড় কহিলেন, পিতঃ! আমার মাতা ও ভ্রাতা কুশলে আছেন এবং আমারও সর্ব্বাঙ্গীণ মঙ্গল বটে, কিন্তু মর্ত্যলোকে আমার প্রচুর আহারদ্রব্য প্রাপ্ত হওয়া দুষ্কর হইয়াছে। আরও কহিলেন, নাগেরা আমাকে অমৃত আহরণ করিতে প্রেরণ করিয়াছে; আমি জননীর দাসীভাব মোচন করিবার নিমিত্ত অদ্য তাহা আনয়ন করিব। মাতা নিষাদগণকে ভক্ষণ করিতে কহিয়াছিলেন। বহুসংখ্যক নিষাদ ভক্ষণ করিয়াছি, তথাপি আমার সমুচিত তৃপ্তিলাভ হয় নাই। অতএব হে ভগবন্! এক্ষণে অপর কোন ভক্ষ্যদ্রব্য নির্দেশ করিয়া দিন, যাহা আহার করিলে আমি অমৃত আহরণ করিতে সমর্থ হইব। হে প্রভো! বলবতী ক্ষুৎপিপাসায় আমার কণ্ঠতালু শুষ্কপ্রায় হইয়াছে।

তখন মহর্ষি কশ্যপ কহিলেন, বৎস! অনতিদূরে ঐ পবিত্র সরোবরটা দেখিতেছ, উহা দেবলোকেও বিখ্যাত। ঐ স্থলে দেখিতে পাইবে, এক হস্তী অবাংমুখ হইয়া কূর্মরূপী স্বকীয় জ্যেষ্ঠ সহোদরকে আকর্ষণ করিতেছে। উহাদিগের আকারের পরিমাণ ও জন্মান্তরীণ বৈরবৃত্তান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।

-

বিভাবসু নামে অতি কোপনস্বভাব এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার কনিষ্ঠ সহোদর মহাতপাঃ সুপ্রতীক ভ্রাতার সহিত একান্নে থাকিতে নিতান্ত অনিচ্ছুক, এই নিমিত্ত তিনি আপন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিকট সর্ব্বদা পৈত্রিক ধনবিভাগের কথা উত্থাপন করিতেন। একদা বিভাবসু ক্রুদ্ধ হইয়া সুপ্রতীককে কহিলেন, দেখ অনেকেই মোহপরবশ হইয়া পৈত্রিকধন বিভাগ করিতে অভিলাষ করে; কিন্তু বিভাগানন্তর ধনমদে মত্ত হইয়া পরস্পর বিরোধ আরম্ভ করে। স্বার্থপর মূঢ় ব্যক্তিরা স্বীয় ধন অধিকার করিলে শত্রুপক্ষ মিত্রভাবে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগের আত্মবিচ্ছেদ জন্মাইয়া দেয় এবং ক্রমশঃ দোষ দর্শাইয়া পরস্পরের রোষবৃদ্ধি ও বৈরভাব বদ্ধমূল করিতে থাকে। এইরূপ হইলে তাহাদিগের সর্ব্বদাই সর্ব্বনাশ ঘটিবার সম্ভাবনা। এই কারণে ভ্রাতৃগণের ধন-বিভাগ সাধুদিগের অভিপ্রেত নহে। কিন্তু তুমি নিতান্ত অনুভিজ্ঞের ন্যায় ঐ কথাই বারংবার উত্থাপন করিয়া থাক। আমি বারণ করিলেও তাহাতে কর্ণপাত কর না; অতএব তুমি বারণযোনি প্রাপ্ত হও। সুপ্রতীক এইরূপে শাপগ্রস্ত হইয়া বিভাবসুকে কহিলেন, তুমিও কচ্ছপযোনি প্রাপ্ত হও।

এইরূপে সুপ্রতীক ও বিভাবসু পরস্পরের শাপপ্রভাবে গজত্ব ও কচ্ছপত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন। এক্ষণে তাঁহারা রোষদোষে তির্য্যগযোনি প্রাপ্ত, পরস্পর বিদ্বেষরত এবং শরীরের গুরুত্ব ও বলদর্পে একান্ত দর্পিত হইয়া জন্মান্তরীণ বৈরানুসারে এই সরোবরে অবস্থান করিতেছেন। ঐ দেখ, গজের বৃংহিত' শব্দে মহাকায় কচ্ছপ সরোবর আলোড়িত করিয়া জলমধ্য হইতে সত্বর উত্থিত হইতেছে। গজ তাহাকে দেখিতে পাইয়া অতি প্রকাণ্ড শুন্ডাদণ্ড আস্ফালনপূর্ব্বক জলে অবগাহন করিতেছে। উহার শুণ্ডাদণ্ড, লাঙ্গুল ও পাদচতুষ্টয়ের তাড়নে সরোবর বিক্ষোভিত হইতেছে। অতি পরাক্রান্ত কৃৰ্ম্মও মস্তক উন্নত করিয়া যুদ্ধার্থে অভ্যাগত হইতেছে। গজের কলেবর ছয় যোজন উন্নত ও দ্বাদশ যোজন আয়ত। কৃৰ্ম্ম তিন যোজন উন্নত ও তাহার পরিধি দশ যোজন। হে বৎস! উহারা পরস্পরের বিনাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়া যুদ্ধে মত্ত হইতেছে, উহাদিগকে ভক্ষণ করিয়া আপনার অভীষ্টসিদ্ধি কর। যাও তুমি এই মহাগিরিসদৃশ ঘোররূপী হস্তীকে ভোজন করিয়া অমৃত আহরণ কর।

মহর্ষি কশ্যপ গরুড়কে ভক্ষ্য-দ্রব্য নির্দেশ করিয়া দিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন, বৎস। দেবতাদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে তোমার শ্রেয়োলাভ হইবে। পূর্ণকুম্ভ, গো, ব্রাহ্মাণ এবং আর যে কিছু মাঙ্গল্য বস্তু আছে, সে সকলই তোমার শুভপ্রদ হউক। হে মহাবল পরাক্রান্ত। যৎকালে তুমি দেবতাদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবে, তখন ঋক্, যজুঃ, সাম, এই তিন বেদ, যজ্ঞীয় পবিত্র হবিঃ ও রহস্য', তোমার বলাধান করিবে। গরুড় পিতার আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া অনতিদূরে সেই নিৰ্ম্মল জল-পূর্ণ হ্রদ দেখিতে পাইলেন এবং তাহাতে নানাবিধ জলচর পক্ষীসকল কলরব করিতেছে দেখিলেন, তখন তিনি পিতৃবাক্য স্মরণ করিয়া এক নখে গজ ও অপর নখে কচ্ছপকে গ্রহণ করিয়া সত্বরে আকাশপথে উত্থিত হইলেন। অনন্তর অলম্ব নামক তীর্থে সমুপস্থিত হইয়া দেববৃক্ষগণের উপর আরোহণ করিতে ইচ্ছা করিলেন। বিটপী-মণ্ডলী' গরুড়ের পক্ষপবনে আহত হইয়া শাখা-ভঙ্গভয়ে শঙ্কিত ও কম্পিত হইতে লাগিল। বিহঙ্গরাজ সেই অভীষ্ট ফলপ্রদ, দিব্য সুবর্ণময় তরুদিগকে ভঙ্গভয়ে কম্পিত দেখিয়া অতীব উন্নত অন্যান্য বৃক্ষের সমীপে গমন করিলেন। সেই রমণীয় বৃক্ষগুলির ফলসকল কাঞ্চনময়, শাখাসমুদায় প্রবালময় এবং উহাদিগের মূলদেশ সর্ব্বদা সাগরজলে প্রক্ষালিত হইতেছে। তন্মধ্যে অত্যুচ্চ এক বটবিটপী পক্ষিরাজ গরুড়কে আগমন করিতে দেখিয়া কহিল, হে গরুড়ত্মন্! তুমি আমার এই শত যোজন বিস্তীর্ণ, অতি প্রকাণ্ড শাখায় উপবেশন করিয়া গজকচ্ছপ ভক্ষণ কর। মহীধর-তুল্য কলেবর পতগেশ্বর প্রবলবেগে বহু সহস্র পক্ষিসেবিত সেই বৃক্ষশাখায় আরোহণ করিবামাত্র তাহা ভগ্ন হইল।

অমৃত সংগ্রহে গরুড়ের যাত্রা।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাবল পরাক্রান্ত গরুড়, পাদস্পর্শ-মাত্রেই তরুশাখা ভগ্ন হইল দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা ধারণ করিলেন। বিহঙ্গমরাজ শাখাভঙ্গ করিয়া বিস্ময়বিস্ফারিতলোচনে ইতস্ততঃ অবলোকন করিতেছেন, ইত্যবসরে দেখিতে পাইলেন, তপ-পরায়ণ বালখিল্য ঋষিগণ অধঃশিরাঃ হইয়া বৃক্ষশাখায় লম্বমান রহিয়াছেন। গরুড় তদ্দর্শনে অতিমাত্র ভীত হইয়া মনে করিলেন, শাখা ভূতলে পতিত হইলে নিশ্চই ঋষিদিগের প্রাণনাশ হইবে; অতএব গজ ও কচ্ছপকে নখদ্বারা দৃঢ়রূপে ধারণ করিয়া ঋষিদিগের প্রাণ রক্ষার্থে ঐ অতি বিশাল বৃক্ষশাখা চক্ষুপুটদ্বারা গ্রহণ করিলেন। মহর্ষিগণ গরুড়ের এই অলৌকিক কৰ্ম্ম দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কারণ নির্দেশপূর্ব্বক তাঁহার এই নাম রাখিলেন, যেহেতু এই বিহঙ্গম অতি গুরুভার গ্রহণ করিয়া অবিচলিতচিত্তে গগনমার্গে উড্ডীন হইল, অতএব অদ্যাবধি ইহার নাম গরুড় বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে। অনন্তর গরুড় পক্ষপবনদ্বারা পার্শ্বস্থ সমস্ত পৰ্ব্বত বিচলিত করিয়া বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন।

গরুড় গজ-কচ্ছপ লইয়া বালখিল্য ঋষিগণের প্রাণ-রক্ষার্থে এইরূপে নানাদেশ ভ্রমণ করিলেন, কিন্তু কুত্রাপি উপবেশনের উপযুক্ত স্থান পাইলেন না। পরিশেষে গন্ধমাদন পৰ্ব্বতে উপনীত হইয়া স্বীয় পিতা মহর্ষি কশ্যপকে তপস্যায় অভিনিবিষ্ট দেখিলেন। ভগবান্ কশ্যপ সেই বলবীর্য্য-তেজঃসম্পন্ন, মনঃ ও বায়ুসম বেগবান্, অচিন্তনীয়, অনভি-ভবনীয়, সর্ব্বভূত-ভয়ঙ্কর, প্রদীপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায় সমুজ্জ্বল, অধৃষ্য, দুর্জয়, সর্ব্বপর্ব্বতবিদারণক্ষম, সমুদ্রশোষণে সমর্থ, সর্ব্বলোকসংহারে পটু, কৃতান্তসম ভীমদর্শন, উত্তুঙ্গ গিরি-শৃঙ্গাকার, দিব্যরূপী বিহঙ্গমরাজ গরুড়কে অভ্যাগত দেখিয়া এবং তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, হে পুত্র! তুমি সহসা সাহসের কর্ম করিও না, তাহাতে অশেষবিধ ক্লেশ পাইবার সম্ভাবনা। সূর্য্যমরীচিমাত্রপায়ী' বালখিল্যগণ রোষ-পরবশ হইলে তোমাকে এই দণ্ডে ভস্মসাৎ করিবেন। এই কথা বলিয়া মহর্ষি কশ্যপ পুত্রবাৎসল্য প্রযুক্ত মহাভাগ বালখিল্য ঋষিদিগকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন। হে মহর্ষিগণ! প্রজাদিগের, হিতোদ্দেশে গরুড় এই মহৎ কৰ্ম্ম সাধন করিতে অধ্যবসায় করিয়াছে, তোমরা অনুজ্ঞা কর। বালখিল্যগণ মহর্ষি কশ্যপের অভ্যর্থনায় সেই বৃক্ষশাখা পরিত্যাগপূর্ব্বক তপশ্চরণার্থ পর্ব্বত-শ্রেষ্ঠ পবিত্র হিমালয়ে প্রস্থান করিলেন।

বালখিল্যগণ গমন করিলে বিনতানন্দন নিজ পিতা কশ্যপকে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! আমি এখন এই বিশাল বৃক্ষশাখা কোথায় নিক্ষেপ করি, আমাকে কোন নিৰ্ম্মানুষ দেশ নির্দেশ করিয়া দিন। তখন কশ্যপ মানুষশূন্য ও নিরবচ্ছিন্ন তুষাররাশিসমাকীর্ণ এক পৰ্ব্বত কহিয়া দিলেন। পক্ষিরাজ শাখা ও গজকচ্ছপ লইয়া বায়ুবেগে সেই পর্ব্বতের অভিমুখে যাত্রা করিলেন। গরুড় যে শাখা লইয়া গমন করিলেন উহা এমত স্থূল যে, শত গো-চৰ্ম্ম-নির্মিত রজ্জুদ্বারা বন্ধন বা বেষ্টন করা যায় না। পতগেশ্বর গরুড় অনতিবিলম্বে শতসহস্র যোজনান্তরে স্থিত সেই মহাপর্ব্বতে উপনীত হইয়া পিতার আদেশানুসারে তদুপরি প্রকাণ্ড বৃক্ষশাখা নিক্ষেপ করিলেন। তদীয় পক্ষপবনে আহত হইয়া গিরিরাজ কম্পিত হইল, তরুগণ পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল এবং যে সকল মণিকাঞ্চনময় শৈলশৃঙ্গ পর্ব্বতের শোভা সম্পাদন করিত তাহারা বিশীর্ণ হইয়া ইতস্ততঃ পতিত হইতে লাগিল। বৃক্ষশ্রেণী পরস্পরের শাখাঘাতে অভিহত হইয়া সৌদামিনীমণ্ডিত নবীন নীরদের ন্যায় কাঞ্চনময় কুসুমসমূহে সুশোভিত হইল। গৈরিকরাজ-রঞ্জিত পাদপসকল অবিরল ভূতলে পতিত হইয়া অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিল। তৎপরে গরুড় সেই গিরিশৃঙ্গে উপবিষ্ট হইয়া গজকচ্ছপ ভক্ষণ করিলেন। খগরাজ এইরূপে সেই কুৰ্ম্ম ও কুঞ্জরকে উপযোগ করিয়া তথা হইতে মহাবেগে উড্ডীন হইলেন।

অনন্তর দেবতাদিগের উপর অতি ভয়ঙ্কর উৎপাত আরম্ভহইল। ইন্দ্রের বজ্র ভয়ে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। অন্তরীক্ষ হইতে ধূম ও অগ্নিশিখার সহিত উল্কাপাত হইতে লাগিল। বসু, রুদ্র, আদিত্য, সাধ্য, মরুত ও অন্যান্য দেবগণের অস্ত্র শস্ত্রসকল পরস্পর বিক্রম প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। দেবাসুর-সংগ্রামেও এরূপ অভূতপূর্ব্ব দুর্ঘটনা কদাচ ঘটে নাই। বায়ু প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল, শতসহস্র উল্কাপাত হইতে লাগিল এবং মেঘ-শূন্য নভোমণ্ডল অতি গভীর রবে গর্জন করিতে আরম্ভ করিল। অধিক কি বলিব, যিনি দেবাদিদেব' তিনিও অনবরত শোণিতবর্ষণ করিতে লাগিলেন। দেবতাদিগের গলদেশের মাল্য ম্লান ও তেজোরাশি ক্রমশঃ হ্রাস হইয়া গেল। প্রলয়কালীন অতি ভীষণ মেঘের ন্যায় ঘনাবলী মুষলধারে রক্তবৃষ্টি করিতে লাগিল। ধূলিজাল গগনমার্গে উড্ডীন হইয়া দেবগণের মুকুটসকল নিষ্প্রভ করিল।

অনন্তর দেবরাজ ইন্দ্র ও সমস্ত দেবগণ এইরূপ অতি নিদারুণ উৎপাত দর্শনে ভীত ও বিস্মিত হইয়া বৃহস্পতিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্! যুদ্ধে আমাদিগকে আক্রমণ করে, এরূপ শত্রু ত লক্ষ্য হয় না। তবে কোথা হইতে এতাদৃশ ঘোরতর উৎপাত সহসা উপস্থিত হইল। বৃহস্পতি কহিলেন, হে দেবেন্দ্র! তোমারই অপরাধ ও প্রমাদবশতঃ মহাত্মা বালখিল্য-গণের তপোবলে বিনতাগর্ভে মহর্ষি কশ্যপের পক্ষীরূপী এক পুত্র জন্মিয়াছে। সেই কামরূপী, মহাবল, বিনতানন্দন অমৃত-হরণে সমর্থ। তাহাতে সকলই সম্ভব হয় বটে। সে অনায়াসে অসাধ্য সাধন করিতে পারে।

ইন্দ্র ত্বদীয় বাক্য শ্রবণ করিয়া অমৃতরক্ষকদিগকে আদেশ করিলেন, "মহাবীর্য্য মহাবল এক পক্ষী অমৃতহরণে উদ্যত হইয়াছে, আমি তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, দেখিও যেন সে বলপূর্ব্বক অমৃত হরণ করিতে না পারে; বৃহস্পতি কহিয়াছেন, সে অতুল বলশালী।" তাহা শুনিয়া দেবতারা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া অতি সাবধানে অমৃত বেষ্টন করিয়া রহিলেন এবং ইন্দ্রও বজ্রহস্ত হইয়া তথায় অবস্থিতি করিলেন। বিচিত্র বসন-ভূষণে বিভূষিত, পাপস্পর্শ-রহিত, নিরুপম বলবীর্য্য-সম্পন্ন, অসুরপুরবিদারণে পটু, সুরগণ-কাঞ্চনময়, বৈদূর্য্য-মণিময় ও চৰ্ম্মাত্মক, মহামূল্য প্রভাভাস্বর' সুদৃঢ়, কবচ; তীক্ষ্ণধার, ভয়ঙ্কর, বিবিধ অস্ত্র শস্ত্র; ধূম, অগ্নি ও স্ফুলিঙ্গ সহিত চক্র, পরিঘ; ত্রিশূল, পরশু; বহুবিধ সুতীক্ষ্ণ শক্তি; নির্মূল করবাল এবং উগ্রদর্শন গদা; এই সমস্ত অস্ত্র শস্ত্র লইয়া অমৃত রক্ষার্থে সেই স্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাঁহারা এইরূপে স্ব স্ব অস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক যুদ্ধার্থে সুসজ্জিত হইয়া সূর্যকিরণ-বিকাশিত বিগলিতান্ধকার আকাশমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইয়াছিলেন।

গরুড়-জন্মকথন।

শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! ইন্দ্রের কি অপরাধ ও তাঁহার অনবধানতাই বা কিরূপ? বালখিল্য ঋষিদিগের তপঃপ্রভাবে গরুড়ের সম্ভব ও মহর্ষি কশ্যপের পক্ষিরূপী পুত্র ইহারই বা কারণ কি? ঐ পক্ষিরাজ কিরূপে সর্ব্বভূতের অবধ্য, অনভিভবনীয়, কামবীর্য্য ও কামচারী হইলেন? আমার এই সকল বিষয় শ্রবণ করিতে নিতান্ত কৌতূহল জন্মিয়াছে, যদি পুরাণে বর্ণিত থাকে, কীর্তন কর।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাশয়! আপনি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছেন পুরাণে এই সমস্ত বর্ণিত আছে, আমি সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কোন সময়ে প্রজাপতি কশ্যপ পুত্রবাসনায় এক মহাযজ্ঞ আরম্ভ করেন। তাঁহার যজ্ঞা-নুষ্ঠানকালে ঋষিগণ, দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণ সাহায্যদান করিবার নিমিত্ত তথায় সমাগত হইয়াছিলেন। মহর্ষি কশ্যপ দেবরাজ | ইন্দ্রকে এবং বালখিল্য মুনিগণ ও অন্যান্য দেবতাদিগকে যজ্ঞীয় কাষ্ঠভার আহরণ করিতে নিয়োগ করিলেন। ইন্দ্র আপন বীর্য্যানুরূপ প্রচুর কাষ্ঠভার আনয়নকালে পথিমধ্যে দেখিলেন, অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ বালখিল্যগণ সকলে সমবেত হইয়া বহুকষ্টে একটি পত্রবৃন্ত আহরণ করিতেছেন। তাঁহারা অতি খর্ব্বাকৃতি, দুর্ব্বল ও নিরাহার, সুতরাং জলপূর্ণ এক গোষ্পদে মগ্ন হইয়া ক্লেশ পাইতেছিলেন। বলদৃপ্ত পুরন্দর তদ্দর্শনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া তাঁহাদিগকে উপহাস ও অবমাননা করিলেন এবং লঙ্ঘন করিয়া অতি সত্বর-পদে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। ঋষিগণ এই-রূপে অবমানিত হইয়া সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইলেন এবং ইন্দ্রের ভয়াবহ এইরূপ এক অতি মহৎ যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা ঐ যজ্ঞে এই কামনায় আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন যে, আমাদিগের তপঃপ্রভাবে ইন্দ্র হইতে অধিক শৌর্যবীর্য্য-সম্পন্ন, কামরূপ, কামবীর্য্য, কামগামী, সর্ব্বদেবের অধিপতি অন্য এক দারুণ ইন্দ্র উৎপন্ন হউন।

দেবরাজ ইন্দ্র তাহা জানিতে পারিয়া প্রজাপতি কশ্যপের শরণাগত হইলেন। কশ্যপ ইন্দ্রমুখে সমুদায় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া বালখিল্য মুনিগণের নিকট গমন করিয়া কার্য্যসিদ্ধির প্রার্থনা করিলেন। সত্যবাদী বালখিল্য মুনিগণ তৎক্ষণাৎ "অভীষ্টসিদ্ধি হইবে” এই কথা বলিলেন। তখন প্রজাপতি কশ্যপ তাঁহাদিগকে মধুর সম্ভাষণে পরিতৃপ্ত করিয়া সাদর-বচনে কহিতে লাগিলেন, দেখ ব্রহ্মার নিয়োগক্রমে ইনি ত্রিভুবনে ইন্দ্র হইয়াছেন, তোমরা আবার ইন্দ্রান্তর প্রার্থনা করিতেছ, তাহা করিলে ব্রহ্মার নিয়ম অন্যথা করা হইবে, কিন্তু তোমাদিগের সঙ্কল্প মিথ্যা হয় ইহাও আমার অভিপ্রেত নহে, অতএব তোমরা যে ইন্দ্রের নিমিত্ত কামনা করিতেছ, তিনি পতগেন্দ্র হউন। হে ঋষিগণ! দেবরাজ প্রার্থনা করিতেছেন, তোমরা তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হও। এইরূপ অভিহিত হইয়া বালখিল্যগণ কশ্যপকে যথাবিধি পূজা করিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, হে প্রজাপতে! আমরা ইন্দ্রার্থে এবং তোমার পুত্রার্থে এই মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছি, এক্ষণে এই কর্ম্মের ভার তোমার প্রতি অর্পিত হইল, তুমিই ইহা প্রতিগ্রহ' করিয়া যাহা শ্রেয়স্কর হয়, কর।

ঐ কালে কল্যাণবতী, কীর্তিমতী, ব্রতপরায়ণা, দক্ষসুতা বিনতা দীর্ঘকাল তপোনুষ্ঠান করণানন্তর ঋতুস্নান করিয়া পুত্র-বাসনায় স্বামিসন্নিধানে আগমন করিলেন। মহর্ষি কশ্যপ বিনতাকে সন্নিহিতা দেখিয়া কহিলেন, দেবি। অদ্য তোমার মনোরথ পূর্ণ হইবে, বালখিল্য মুনিগণের তপঃপ্রভাবে ও আমার সঙ্কল্প-বলে তোমার গর্তে মহাভাগ ও ভুবনবিজয়ী দুই বীর পুত্র জন্মিবে। তাহারা ত্রিভুবন-পূজিত ও ত্রিলোকীর অধীশ্বর হইবে। তুমি প্রমাদশূন্য হইয়া এই সুমহোদয়' গর্ব ধারণ কর। সর্ব্বলোক-সৎকৃত কামরূপী ঐ দুই বিহঙ্গম সমস্ত পক্ষিজাতির উপর ইন্দ্রত্ব করিবে। অনন্তর মহর্ষি কশ্যপ অতি প্রীতমনে ইন্দ্রকে কহিলেন, সেই দুই মহাবীৰ্য্য বিহঙ্গম তোমার ভ্রাতা ও সহায় হইবে এবং তাহারা তোমার কখন কোন অপচয় করিবে না। তোমার সকল সন্তাপ দূর হউক, তুমিই ইন্দ্র থাকিলে, কিন্তু হে বৎস! তুমি অহঙ্কার-পরতন্ত্র হইয়া যেন আর কদাচ ব্রহ্মবাদী ঋষিদিগকে পরিহাস বা অবমাননা করিও না। তাঁহাদিগের বাক্য বজ্রস্বরূপ এবং তাঁহারা অতিশয় কোপন-স্বভাব।

দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি কশ্যপকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে সুরলোকে প্রস্থান করিলেন। বিনতাও চরিতার্থ হইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। পরে কশ্যপবনিতা বিনতা যথাকালে অরুণ ও গরুড় নামে দুই পুত্র প্রসব করিলেন। অরুণ অঙ্গবৈকল্য প্রযুক্ত সূর্য্যের সারথি হইয়াছেন, তদীয় ভ্রাতা গরুড় পক্ষিগণের ইন্দ্রত্বপদে অভিসিক্ত হইয়াছেন। হে ভৃগুনন্দন! সেই বিনতানন্দন গরুড়ের অতি বিচিত্র চরিত্র কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।।

অমৃত আনয়নে দেবগণের বাধা।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র। দেবতারা সকলে সমবেত হইয়া অতি সাবধানে অমৃত রক্ষা করিতেছেন, এই অবসরে গরুড় অতি সত্বরে তাঁহাদিগের নিকটে উপস্থিত হইলেন। দেবতারা সেই মহাবল গরুড়কে দেখিয়া ভীত ও কম্পিত হইলেন এবং আপনারাই পরস্পর অস্ত্রাঘাত করিতে লাগিলেন। তথায় অপ্রমেয় বল ও অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল বিশ্বকর্মাও অমৃত রক্ষার্থে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি মুহূর্তকাল গরুড়ের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিয়া পরিশেষে তদীয় পক্ষ, নখ ও চঞ্চুপুট দ্বারা ক্ষত বিক্ষত ও মূর্ছিত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন। পরে গগনচারী বিহগরাজ পক্ষপবনে ধূলিপ্রবাহ উত্থাপিত করিয়া সমস্ত লোক ও দেবগণকে আচ্ছন্ন করিলেন। দেবতারা ধূলিজালে আকীর্ণ হইয়া মোহপ্রাপ্ত হইলেন এবং তৎকালে অমৃতরক্ষকেরাও অন্ধপ্রায় হইলেন। এইরূপে গরুড় দেবলোক আলোড়িত করিয়া পক্ষতাড়ন ও তুগুপ্রহারে দেবগণকে বিদীর্ণ-কলেবর করিলেন। তখন সহস্রলোচন ইন্দ্র পবনকে আদেশ করিলেন, দেখ, পবন! তুমি এই রজোবর্ষণ নিরাকরণ' কর, ইহা তোমারই কৰ্ম্ম। বায়ু তৎক্ষণাৎ তাহা অপসারিত করিলেন।

অনন্তর অন্ধকার নিরস্ত হইলে দেবগণ পক্ষিরাজ গরুড়কে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। সুরগণ বধ করিতে উদ্যত হইলে মহাবল পরাক্রান্ত গরুড় মহামেঘের ন্যায় সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর ঘোরতর গর্জন করিতে করিতে নভোমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। দেবতারা গরুড়কে অন্তরীক্ষে আরূঢ় দেখিয়া পট্টিশ, পরিঘ, শূল, গদা, প্রজ্বলিত ক্ষুরপ্র ও সূর্য্যাকৃতি চক্র ইত্যাদি নানা শস্ত্রদ্বারা তাঁহাকে আকীর্ণ করিলেন।

পক্ষিরাজ গরুড় দেবগণকর্তৃক এইরূপে আহত হইয়াও তুমুল সংগ্রাম করিতে কিছুমাত্র বিচলিত বা সঙ্কুচিত হইলেন না। বরং পক্ষদ্বয় ও বক্ষঃস্থলের অধিকতর আঘাতে তাঁহাদিগকে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত করিলেন। সুরগণ এইরূপে গরুড়-যুদ্ধে পরাভূত ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া পলায়ন করিতে লাগিলেন। গন্ধর্ব্ব ও সাধ্যগণ পূর্ব্বদিকে, রুদ্র ও বসুগণ দক্ষিণদিকে, আদিত্যগণ পশ্চিমদিকে এবং অশ্বিনীকুমার দুইজনে উত্তরদিকে প্রস্থান করিলেন।

অনন্তর পতগেন্দ্র গরুড় অশ্বক্রন্দ, রেণুক, ক্রথনক, তপন, উলুক, শ্বসন, নিমেষ, প্ররুজ ও পুলিন এই সমস্ত যক্ষের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। প্রলয়কালে মহাদেব রোষ-পরবশ হইলে যেরূপ অতি ভীষণ হয়েন, বিনতানন্দনও সেইরূপ অত্যুগ্র হইয়া পক্ষ, নখ ও তুণ্ডাগ্র দ্বারা সকলকে ছিন্ন ভিন্ন করিলেন। সেই মহাবল, মহোৎসাহ বীরপুরুষেরা ক্ষত বিক্ষত হইয়া রুধিরবর্ষী ধারাধরের' ন্যায় শোভমান হইলেন।

খগেশ্বর সেই সমস্ত যক্ষদিগের প্রাণসংহার করিয়া যে স্থানে অমৃত রহিয়াছে তথায় উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের চতুষ্পার্শ্বে অগ্নি প্রজ্বলিত হইতেছে। সেই অগ্নির শিখা অতি ভয়ঙ্কর এবং তদ্দ্বারা আকাশমণ্ডল আচ্ছন্ন হইয়াছে, দেখিলে বোধ হয় যেন বিভাবসু' বায়ুকর্তৃক প্রেরিত হইয়া সূর্য্যদেবকে দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। অনন্তর মহাত্মা গরুড় শতাধিক অষ্টসহস্র মুখ নির্গত করিলেন এবং ঐ সকল মুখদ্বারা নদী পান করিয়া প্রচণ্ডবেগে তথায় আগমনপূর্ব্বক নদীজলে জ্বলন্ত অনল নির্ব্বাণ করিলেন। অগ্নি নির্ব্বাণ হইলে গরুড় তাহার মধ্যে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত অন্য এক শরীর ধারণ করিলেন।

গরুড়ের অভীষ্ট-সিদ্ধ ও বিষ্ণুর বরদান।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, পক্ষিরাজ অতি ভয়ঙ্কর স্বর্ণময় কলেবর ধারণ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন, অমৃতের নিকট লৌহময় ক্ষুরের ন্যায় তীক্ষ্ণধার একখানি শাণিত চক্র নিরন্তর ভ্রমণ করিতেছে। অগ্নিতুল্য প্রদীপ্ত ও সূর্য্যসম তেজস্বী ঐ ঘোররূপ যন্ত্র, অমৃত হরণার্থ আগত ব্যক্তিব্যূহের কণ্ঠনালী ছেদন করিবার নিমিত্ত নির্মিত হইয়াছে। গরুড় অঙ্গসঙ্কোচপূর্ব্বক ক্ষণমাত্রেই তাহার মধ্যাবকাশ দ্বারা প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, সেই চক্রের অধঃস্থলে জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল, মহাবীর্য্য, মহাঘোর, নিয়ত ক্রুদ্ধ ও নির্নিমেষনেত্র, দুই সর্প অমৃত রক্ষা করিতেছে। তাহাদিগের বিদ্যুতের ন্যায় মুখ হইতে অনবরত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতেছে এবং চক্ষুদ্বয় নিরন্তর বিষ উদ্ধার করিতেছে। তাহাদিগের একতর যাহার প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করে, সে তৎক্ষণাৎ ভস্মসাৎ হইয়া যায়। তখন বিহঙ্গমরাজ ধূলিনিক্ষেপপূর্ব্বক ঐ উভয় সর্পের নয়নদ্বয় আচ্ছন্ন করিলেন এবং অদৃশ্যভাবে আকাশ হইতে তাহাদিগের কলেবর ছিন্ন ভিন্ন করিয়া অমৃত গ্রহণপূর্ব্বক অতি দ্রুতবেগে গগনমণ্ডলে উত্থিত হইলেন। কিন্তু তিনি স্বয়ং অমৃতপান না করিয়া সূর্য্যপ্রভা আবরণ পূর্ব্বক অপরিশ্রান্তমনে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।

বিনতানন্দন অমৃত হরণ করিয়া আকাশপথে গমন করিতেছেন, এই অবসরে অবিনাশী দেবাদিদেব নারায়ণের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকার হইল। নারায়ণ গরুড়ের লোকা-তিশায়িনী ক্রিয়া দর্শনে পরম সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, হে বিহঙ্গমরাজ! প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে অভিলষিত বর প্রদান করিব। গরুড় কহিলেন, আমি আপনার উপরিভাগে অবস্থান করিতে বাসনা করি। এই বলিয়া পুনর্ব্বার নারায়ণকে কহিলেন, আর আমি যাহাতে অমৃতপান ব্যতিরেকে অজর ও অমর হইতে পারি, এইরূপ বর প্রদান করুন। বিষ্ণু কহিলেন, "তোমার অভীষ্টসিদ্ধি হউক।” তখন গরুড় আপনার অভিলষিত বর লাভ করিয়া নারায়ণকে কহিলেন, "ভগবন্। প্রার্থনা কর আমিও তোমাকে বরপ্রদান করিব।" নারায়ণ মহাবল গরুড়কে কহিলেন, "তুমিও আমার বাহন হও” এবং স্বপ্রদত্ত বরের অন্যথা না হয় এই জন্য পুনর্ব্বার কহিলেন, "তোমাকে আমার রথের ধ্বজ হইয়া থাকিতে হইবে" পতগেশ্বর "তথাস্তু” বলিয়া বায়ুবেগে গমন করিলেন।

দেবরাজ ইন্দ্র অমৃতাপহারক পক্ষীকে অন্তরীক্ষে গমন করিতে দেখিয়া রোষভরে বজ্র প্রহার করিলেন। গরুড় বজ্রাঘাতে আহত হইয়াও হাস্যমুখে কহিলেন, "দেখ, দেবরাজ। বজ্রাঘাতে আমার কিছুমাত্র ব্যথা জন্মে নাই; কিন্তু যে মুনির অস্থি হইতে এই বজ্রের উৎপত্তি হইয়াছে, তাঁহার বজ্রাস্ত্রের ও তোমার সম্মানের নিমিত্ত আমি একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিতেছি, এই পক্ষের অন্ত নাই;" এই বলিয়া পক্ষিরাজ একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিলেন। দেবগণ ঐ উৎসৃষ্ট পক্ষটি অতি সুন্দর দেখিয়া হৃষ্ট মনে কহিলেন, এই পর্ণ (অর্থাৎ পক্ষ) অতি সুন্দর, অতএব অদ্যাবধি গরুড়ের নাম সুপর্ণ হইল। সহস্রাক্ষ ইন্দ্র এইরূপ অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শনে বিস্মিত হইয়া মনে করিলেন, এই পক্ষী সামান্য পক্ষী নহে, ইনি অবশ্যই কোন মহাপ্রাণী হইবেন। এইরূপ কল্পনা করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, "ওহে বিহঙ্গম! আমি তোমার অলৌকিক বলবীর্য্য জানিতে এবং অনন্তকালের নিমিত্ত তোমার সহিত মিত্রত্ব সংস্থাপন করিতে বাসনা করি।”

ইন্দ্রের সহিত গরুড়ের বন্ধুত্ব এবং বিনতার মোক্ষপ্রাপ্তি।

গরুড় কহিলেন, হে দেবরাজ! তোমার স্বেচ্ছাক্রমে অদ্যা-বধি তোমার সহিত আমার মিত্রত্ব সংস্থাপন হইল। আমার বল নিতান্ত দুঃসহ ও একান্ত মহৎ। যদিচ স্বকীয় গুণকীর্তন ও বল-প্রশংসা করা পণ্ডিতমণ্ডলীর অনুমোদিত নহে, বিশেষতঃ অকারণে আত্মপ্রশংসা অতিশয় অন্যায়, তথাপি তুমি আমার সখা এবং আগ্রহাতিশয় সহকারে জিজ্ঞাসা করিতেছ, এই নিমিত্ত কহিতে প্রবৃত্ত হইলাম, শ্রবণ কর। আমার বলের কথা অধিক কি বলিব, আমি পৰ্ব্বতকাননাদি-সহিতা এই সসাগরা বসুন্ধরাকে অক্লেশে এক পক্ষে বহন করিতে পারি। আর যদি তুমিও ঐ পক্ষ অবলম্বন কর, তবে তোমাকেও লইয়া যাইতে পারি। এই চরাচর বিশ্বকে বহন করিতে হইলেও, আমার কিছুমাত্র পরিশ্রম বোধ হয় না।

গরুড় এইরূপে স্বীয় বলের পরিচয় প্রদান করিলে সর্ব্বলোকহিতকারী দেবরাজ কহিলেন, হে বিহঙ্গমরাজ! তুমি যাহা কহিলে তোমাতে সকলই সম্ভব; এক্ষণে আমার সহিত সখ্য সংস্থাপন কর এবং অমৃতে যদি প্রয়োজন না থাকে তবে আমাকে প্রত্যর্পণ কর; এই অমৃত যাহাদিগকে অর্পণ করিবে তাহারাই আমাদের উপর উপদ্রব করিবে। গরুড় কহিলেন, হে সহস্রলোচন! আমি কোন কারণবশতঃ এই অমৃত লইয়া যাইতেছি, প্রার্থনা করিলে ইহার বিন্দুমাত্রও কাহাকে প্রদান করিব না; কিন্তু আমি যে স্থানে ইহা রাখিব, তুমি তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপহরণ করিও। ইন্দ্র কহিলেন, হে বিহঙ্গমরাজ! আমি তোমার এই কথা শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইলাম, এক্ষণে আমার নিকট অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। তখন গরুড় কদ্রপুত্রদিগের দৌরাত্ম্য ও মাতার ছলকৃত দাসীভাব স্মরণ করিয়া কহিলেন, আমি সকলের ঈশ্বর হইয়াও তোমার নিকট এই বর প্রার্থনা করিতেছি যেন মহাবল সর্পসকল আমার ভক্ষ্য হয়। দানব-নিসূদন ইন্দ্র "তথাস্তু” বলিয়া দেবদেব যোগীশ্বর মহাত্মা হরির নিকট গমন করিলেন। চক্রপাণি দেবরাজ-মুখে সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া গরুড়া-ভিলষিত বিষয়ে অনুমোদন করিলেন। পরে ভগবান্ ত্রিদশেশ্বর গরুড়কে পুনর্ব্বার কহিলেন, তুমি অমৃতস্থাপন করিলেই আমি তাহা অপহরণ করিব, এই বলিয়া সাদর সম্ভাষণে তাঁহাকে বিদায় দিলেন। গরুড় অনতিবিলম্বে স্বীয় জননীর সন্নিধানে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক হৃষ্টমনে সর্পদিগকে কহিলেন, এই আমি অমৃত আহরণ করিয়াছি; এক্ষণে এই কুশের উপর রাখিতেছি, তোমরা শীঘ্র স্নান পূজা করিয়া পান কর। দেখ তোমরা যাহা কহিয়াছিলে তাহা আমি সম্পাদন করিলাম; অতএব অদ্যাবধি আমার মাতা দাস্যবৃত্তি হইতে মুক্ত হউন। সর্পগণ “তথাস্তু” বলিয়া স্নান করিতে গমন করিল। এই অবসরে দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত অপহরণ করিয়া স্বর্গে প্রস্থান করিলেন। সর্পেরা স্নান, পূজা ও মঙ্গলাচরণ সমাপন করিয়া প্রফুল্লমনে অমৃতপান করিতে আসিয়া দেখিল, গরুড় যে কুশাসনে অমৃত রাখিব বলিয়াছিলেন তথায় অমৃত নাই। পরে বিবেচনা করিল, আমরা যেমন ছলক্রমে বিনতাকে দাসী করিয়াছিলাম, তেমনি ছলে অমৃত হরণ করিয়াছে। তখন নাগগণ এই স্থানে অমৃত রাখিয়াছিল, এই বিবেচনা করিয়া সেই কুশাসন অবলেহন করিতে লাগিল। তাহাতেই তাহাদিগের জিহ্বা দুই খণ্ডে বিভক্ত হইয়াছে এবং পরম পবিত্র অমৃত কুশে সংস্পৃষ্ট হইয়াছিল বলিয়া, তদবধি কুশের নাম পবিত্রী হইয়াছে। মহাত্মা গরুড় এইরূপে অমৃতের হরণ ও আহরণ করিয়াছিলেন এবং সর্পদিগকে দ্বিজিত্ব' করিয়াছিলেন।

অনন্তর খগরাজ পরিতুষ্ট মনে সেই কাননে বিহার করিয়া ভুজঙ্গমগণ ভক্ষণপূর্ব্বক স্বীয় জননী বিনতাকে আনন্দিত করিলেন। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণগণ-সন্নিধানে এই অপূর্ব্ব উপাখ্যান শ্রবণ বা পাঠ করিবে, সে মহাত্মা খগরাজ গরুড়ের চরিত কীর্ত্তন প্রযুক্ত পাপ-স্পর্শশূন্য হইয়া স্বর্গারোহণ করিবে, সন্দেহ নাই।

কদ্রুপুত্রের নামকথন।

শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি ভুজঙ্গমগণের মাতৃশাপ ও বিনতার পুত্রশাপের কারণ এবং বিনতাগর্ভসম্ভূত পক্ষিদ্বয়ের নাম কীর্ত্তন করিলে, আর কদ্রু ও বিনতা স্বভর্তা কশ্যপের সন্নিধানে কিরূপে বর প্রাপ্ত হয়েন, তাহাও কীর্ত্তন করিলে। কিন্তু এ পর্যন্ত সর্পদিগের নাম কীর্ত্তন কর নাই। আমরা এক্ষণে প্রধান প্রধান পন্নগগণের নাম শ্রবণ করিতে বাসনা করি, বর্ণন কর।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন। সর্প সংখ্যায় বহুত্ব প্রযুক্ত সকল সর্পের নাম উল্লেখ করিব না, কেবল প্রধান প্রধান সর্পের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।

শেষ নাগ প্রথমতঃ জন্মগ্রহণ করেন। তদনন্তর বাসুকি; তাহার পর ঐরাবত, তক্ষক, কর্কোটক, ধনঞ্জয়, কালিয়, মণিনাগ, আপূরণ, পিঞ্জরক, এলাপত্র, বামন, নীল, অনিল, কলাষ, শবল, আর্য্যক, উগ্রক, কলসপোতক, সুরামুখ, দধিমুখ, বিমলপিণ্ডক, আপ্ত, করোটক, শঙ্খ, বালিশিখ, নিষ্ঠানখ, হেমগুহ, নজ্য, পিঙ্গল, বাহ্যকর্ণ, হস্তিপদ, মুদ্গরপিণ্ডক, কম্বল, অশ্বতর, কালীয়ক, বৃত্ত, সংবর্ত্তক, শামুখ, কুষ্মাণ্ডক, ক্ষেমক, পিণ্ডারক, করবীর, পুষ্পদংষ্ট্র, বিশ্বক, বিশ্ব, পাণ্ডর, মুষকাদ, শঙ্খশিরাঃ পূর্ণভদ্র, হরিদ্রক, অপরাজিত, জ্যোতিক, শ্রীবহ, কৌরব্য, ধৃতরাষ্ট্র, শঙ্খপিণ্ড, বিরজাঃ, সুবাহু, শালিপিণ্ড, হস্তিপিণ্ড, পিঠরক, সুসুক, কৌণপাশন, কূটর, কুঞ্জর, প্রভাকর, কুমুদ, কুমুদাক্ষ, তিত্তিরি, হলিক, কৰ্দ্দম, বহুমূলক, কর্কর, অকর্কর, কুণ্ডোদর এবং মহোদর। হে দ্বিজোত্তম। প্রধান প্রধান সর্পগণের নাম কীর্ত্তন করিলাম, বাহুল্য প্রযুক্ত অন্যান্যের নামোল্লেখ করিলাম না। হে তপোধন। ইহা ব্যতিরেকে আরও সহস্র সহস্র অযুত অযুত, অর্বুদ অর্বুদ সর্প আছে, তাহাদের সংখ্যা করা অতিশয় দুঃসাধ্য।

শেষনাগের ভ্রাতৃসঙ্গ ত্যাগের সঙ্কল্প।

শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! তুমি, মহাবল পরাক্রান্ত অতি দুর্দ্ধর্ষ প্রধান প্রধান সর্পগণের নাম কীর্ত্তন করিলে, এক্ষণে ঐ সকল সর্পগণ জননীদত্ত শাপ শ্রবণানন্তর কি করিয়াছিল, তাহা বর্ণন করিয়া আমার কৌতূহলাক্রান্ত চিত্তকে সন্তুষ্ট কর।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তাহাদিগের সর্ব্বজ্যেষ্ঠ মহাযশাঃ ভগবান্ শেষনাগ, স্বীয় জননী কদ্রুকে পরিত্যাগ করিয়া, বায়ুভক্ষ্য, ব্রতপরায়ণ, একান্তচিত্ত, জটাবল্কলধারী ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া গন্ধমাদন, বদরিকাশ্রম, গোকর্ণ, পুষ্কর, হিমবান প্রভৃতি পুণ্যতীর্থে গমনপূর্ব্বক অতি কঠোর তপস্যা করিতে লাগিলেন। তপোনুষ্ঠান-কালে তাঁহার গাত্রের মাংস, চৰ্ম্ম ও শিরাসমুদায় শুষ্কপ্রায় হইয়া গেল।

সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা তাঁহাকে তপস্যায় একান্ত অনুরক্ত দেখিয়া স্বয়ং তৎসন্নিধানে আগমনপূর্ব্বক কহিলেন, নাগরাজ! তুমি এ কি কৰ্ম্ম করিতেছ? অতঃপর প্রজাগণের হিতসাধনে সচেষ্ট হও, তোমার তীব্র তপস্যার দ্বারা সমস্ত প্রজাগণ সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়াছে, আর তপস্যায় প্রয়োজন নাই, অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।

শেষ কহিলেন, আমার সহোদর ভ্রাতৃগণ অতি মূঢ়, আমি তাহাদিগের সহিত একত্র বাস করিতে বাসনা করি না, আপনি তদ্বিষয়ে অনুমতি প্রদান করুন। তাহারা শত্রুর ন্যায় সর্ব্বদা পরস্পর বিবাদ বিসংবাদ করে; অতএব আমাকে আর যেন তাহাদিগকে দেখিতে না হয়। এই অভিলাষেই আমি তপস্যা করিতে আসিয়াছি। তাহারা সর্ব্বদা সপুত্রা বিনতার অনিষ্টচেষ্টা করে। বিহঙ্গমশ্রেষ্ঠ বৈনতেয় আমাদিগের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা, তিনি পিতা কশ্যপের বরপ্রভাবে মহাবল পরাক্রান্ত হইয়াছেন। আমার সহোদরগণ সর্ব্বদা তাঁহার প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করে। তন্নিমিত্ত আমি স্থির করিয়াছি যে, তপোনুষ্ঠান করিয়া কলেবর পরিত্যাগ করিব, তাহা হইলে লোকান্তরে আর সেই দুরাত্মা-দিগের মুখাবলোকন করিতে হইবে না।

শেষনাগকে ব্রহ্মার আশীর্ব্বাণী।

ব্রহ্মা শেষনাগের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, বৎস শেষ! আমি তোমার সোদরগণের আচার ব্যবহার বিলক্ষণরূপে অবগত আছি এবং তাহারা জননীকর্তৃক অভিশপ্ত হইয়াছে, তাহাও জানি; অতএব তোমার ভ্রাতৃগণের দৌরাত্ম্য প্রযুক্ত আর শোক করিবার আবশ্যকতা নাই, আমি অদ্য তোমাকে বরদান করিতেছি, অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। হে পন্নগোত্তম! আমি তোমার প্রতি পরম সন্তুষ্ট হইয়াছি। সৌভাগ্যক্রমে তোমার ধর্মে মন হইয়াছে দেখিয়া যৎপরোনাস্তি প্রীত হইলাম, আশীর্ব্বাদ করি তোমার বুদ্ধি ধর্মে সুস্থিরা হউক!

শেষ কহিলেন, হে সর্ব্বলোকপিতামহ। আমি এই বর প্রার্থনা করি যেন ধর্ম্মে, শমগুণে ও তপস্যায় আমার অচলাভক্তি থাকে। ব্রহ্মা কহিলেন, বৎস! আমি তোমার শম ও দম দেখিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলাম, কিন্তু হে বৎস! তোমাকে এই সর্ব্বলোক-হিতকর কার্য্যটি সম্পাদন করিতে হইবে। পৰ্ব্বতকাননাদি-সমবেত এই ধরণীমণ্ডলকে তোমায় এইরূপে ধারণ করিতে হইবে, যেন উহা আর বিচলিত না হইতে পারে। শেষ কহিলেন, হে বরদ প্রজাপতে! হে ধরানাথ! হে ভূতনাথ! হে জগন্নাথ! আপনি যেরূপে আজ্ঞা করিতেছেন, আমি ঐরূপে মহীধারণ করিব; কিন্তু আপনি পৃথিবীকে আমার মস্তকোপরি স্থাপন করুন। ব্রহ্মা কহিলেন, হে ভুজঙ্গোত্তম! পৃথিবী স্বয়ং তোমাকে পথ প্রদান করিবেন, তুমি সেই পথ দিয়া ধরিত্রীর অধোভাগে গমনপূর্ব্বক ইঁহাকে ধারণ কর, তাহা হইলেই আমার পরম প্রীতিকর কার্য্য করা হইবে।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভুজঙ্গমাগ্রজ শেষ "যে আজ্ঞা" বলিয়া পৃথিবীদত্ত বিবরদ্বারা রসাতলে প্রবেশপূর্ব্বক সসাগরা বসুন্ধরাকে মস্তকোপরি ধারণ করিলেন। এইরূপে মহাব্রতশালী ভগবান্ অনন্ত ব্রহ্মার নির্দেশানুসারে একাকী ধরা ধারণ করিয়া পাতালতলে বাস করিতে লাগিলেন। সর্ব্বামরোত্তম ভগবান্ পিতামহ, খগবর বিনতানন্দনকে অনন্তদেবের সখা করিয়া দিলেন।

আত্মরক্ষার্থ নাগগণের মন্ত্রণা।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভুজঙ্গোত্তম বাসুকি মাতৃদত্ত শাপ শ্রবণ করিয়া কিরূপে সেই শাপ মোচন হইবে, তদ্বিষয়িণী চিন্তায় একান্ত মগ্ন হইলেন। তদনন্তর তিনি ধর্মপরায়ণ ঐরাবত প্রভৃতি ভ্রাতৃ-গণের সহিত পরামর্শ করিলেন যে, মাতা আমাদিগকে যে শাপ প্রদান করিয়াছেন তাহা তোমরা সকলেই জান; অতএব আইস আমরা যাহাতে সেই শাপ হইতে মুক্ত হইতে পারি এরূপ চেষ্টা করি। সর্ব্বপ্রকার শাপেরই প্রতিবিধানোপায় আছে, কিন্তু মাতৃদত্ত শাপমোচনের কোন উপায় দেখি না। জননী অব্যয়, অপ্রমেয়, সনাতন ব্রহ্মার সমক্ষেই আমাদিগকে শাপ প্রদান করিয়াছেন এবং সর্ব্বলোেকপিতামহ ব্রহ্মা তাঁহাকে শাপ প্রদানে উদ্যতা দেখিয়াও নিবৃত্ত করেন নাই ইহা শুনিয়া আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হইতেছে। বোধ করি নিশ্চয়ই আমাদিগকে সমূলে বিনষ্ট হইতে হইবে। তথাপি সম্প্রতি যাহাতে সমস্ত ভুজঙ্গগণের মঙ্গল হয়, তদ্বিষয়ে পরামর্শ করা যাউক। আমরা সকলেই বুদ্ধিমান্ ও বিচক্ষণ, মন্ত্রণাদ্বারা অবশ্যই কোন না কোন উপায় স্থির করিতে পারিব। দেখ পূর্ব্বকালে অগ্নি গুহামধ্যে তিরোহিত হইয়াছিলেন, কিন্তু দেবগণ পরামর্শদ্বারা তাঁহার পুনরুদ্ভাবন করেন; অতএব এক্ষণে যাহাতে জনমেজয়ের যজ্ঞ না হয়, অথবা নিষ্ফল হয়, তাহার চেষ্টা দেখা যাউক।

মন্ত্রণাবিশারদ সর্পগণ ভুজঙ্গরাজ বাসুকির এই কথা শুনিয়া তৎকার্য্য সম্পাদনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করিলেন। তাঁহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ কহিলেন, আইস আমরা ব্রাহ্মণ বেশ ধারণ করিয়া জনমেজয়ের নিকট যাইয়া তিনি যাহাতে সর্পযজ্ঞ না করেন, এইরূপ ভিক্ষা প্রার্থনা করি। কোন কোন পণ্ডিতাভিমানী ভুজঙ্গম কহিলেন, চল আমরা সকলে গিয়া তাঁহার মন্ত্রী হই, তাহা হইলে তিনি অবশ্যই আমাদিগের পরামর্শ লইয়া সকল কার্য্য অনুষ্ঠান করিবেন। তিনি যজ্ঞবিষয়িণী কোন মন্ত্রণা জিজ্ঞাসা করিলে, আমরা তদনুষ্ঠানে ইহলোক ও পরলোকে নানাপ্রকার দোষ ঘটিতে পারে, ইহা প্রদর্শন করিয়া এবং অন্যান্য কারণ দর্শাইয়া যাহাতে সেই যজ্ঞ না হয়, এরূপ পরামর্শ দিব। কেহ কহিলেন, রাজার হিতসাধনে তৎপর যে কোন সর্পযজ্ঞ-বিধানজ্ঞ ব্যক্তি সেই যজ্ঞের উপাধ্যায় হইবেন, কোন ভুজঙ্গম যাইয়া তাঁহাকে দংশন করিবে; উপাধ্যায়ের মৃত্যু হইলে সুতরাং যজ্ঞানুষ্ঠানের বিষম ব্যাঘাত জন্মিবে; তদ্ভিন্ন অন্যান্য যে সকল সর্পসত্রজ্ঞ ব্যক্তি সেই যজ্ঞে ঋত্বিক্ হইতে আসিবেন, আমরা সকলে যাইয়া তাঁহাদিগকে দংশন করিব, তাহা হইলে আর যজ্ঞ হইতে পারিবে না।

এই কথা শুনিয়া অন্যান্য ধর্মপরায়ণ দয়াবান্ নাগগণ কহিলেন, তোমরা যাহা কহিতেছ, এ অতি অসৎ পরামর্শ; ব্রহ্মহ্মহত্যা করা কোনক্রমেই বিধেয় নহে, বিপৎকালে ধৰ্ম্মপথ অবলম্বনপূর্ব্বক প্রতীকার চেষ্টা করাই কর্তব্য, কারণ অধর্মানুষ্ঠান সমস্ত জগতের বিনাশকারী। কতকগুলি ভুজঙ্গম কহিলেন, আমরা জলধর-কলেবর ধারণ করিয়া মুষলধারে জলবর্ষণদ্বারা প্রজ্বলিত যজ্ঞাগ্নি নির্ব্বাণ করিব, কিংবা রাত্রিকালে ঋত্বিগণ অনবহিত হইলে সর্প তথায় উপস্থিত হইয়া শ্রুভাণ্ড প্রভৃতি যজ্ঞীয়দ্রব্য সমুদয় অপহরণ করিবে, তাহা হইলেই যজ্ঞের বিঘ্ন ঘটিবে। অথবা শত শত ভুজঙ্গম সেই যজ্ঞস্থলে এককালে উপস্থিত হইয়া তত্রত্য সমস্ত লোকদিগকে দংশন করিতে উদ্যত হইবে, তাহা হইলে তাহাদিগের অবশ্যই ভয় জন্মিবে। কিংবা সর্পগণ সংস্কৃত যজ্ঞীয় সামগ্রীসমুদায় স্বীয় মূত্র ও পুরীষ দ্বারা দূষিত করিবে তাহাতেও যজ্ঞবিঘ্নের বিলক্ষণ সম্ভাবনা।

অন্যান্য নাগগণ কহিল, আমরাই ঐ যজ্ঞে ঋত্বিক্ হইয়া প্রথমেই "দক্ষিণা প্রদান কর” বলিয়া যজ্ঞবিঘ্ন সমুৎপাদন করিব, তাহা হইলেই রাজা আমাদিগের বশীভূত হইবেন এবং যাহা বলিব তাহাই করিবেন। অপর ভুজঙ্গমগণ কহিল, রাজা যখন জলক্রীড়া করিবেন, সেই সময়ে তাঁহাকে ধরিয়া আপনাদিগের আলয়ে আনয়নপূর্ব্বক বদ্ধ করিয়া রাখিব। কোন কোন পণ্ডিতাভিমানী ভুজঙ্গম কহিলেন, আইস আমরা অন্যান্য চেষ্টা পরিত্যাগ করিয়া রাজা জনমেজয়কেই দংশন করি, তিনি মরিলে সকল অনর্থের মূলচ্ছেদ হইবে। পরিশেষে সকলে বাসুকিকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে রাজন। আমরা স্ব স্ব বুদ্ধি অনুসারে কহিলাম, এক্ষণে আপনার যাহা অভিরুচি হয় করুন, আর কালক্ষেপ করা কোনক্রমেই বিধেয় নহে। এই বলিয়া সমস্ত নাগগণ তাঁহার মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন।

বাসুকি তাঁহাদিগের বাক্য শ্রবণানন্তর ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গমগণ! তোমরা সকলে যে যে উপায় নির্দেশ করিলে তন্মধ্যে একটিও আমার মনোগত হইতেছে না, যাহাতে সকলের হিতসাধন হয় তাহাই করা কর্তব্য; অতএব এ বিষয়ে ভগবান্ কশ্যপকে প্রসন্ন করাই আমার শ্রেয়ঃকল্প বোধ হইতেছে। জ্ঞাতিগণের প্রতি সৌহার্দ্দদ ও আত্মস্নেহবশতঃ আমি তোমাদিগের বাক্যানুসারে কর্ম্ম করিতে ইচ্ছা করি না, কারণ এক্ষণে আমি তোমাদের সর্ব্বজ্যেষ্ঠ; যাহাতে সমস্ত বান্ধবগণের মঙ্গল হয়, আমার সর্ব্বতোভাবে তাহাই করা কর্ত্তব্য, এ বিষয়ে দোষগুণ যে কিছু ঘটিবে, তোমরা কেহই তাহার অংশভাগী হইবে না, সমস্তই আমার উপর পড়িবে, এই নিমিত্ত আমি সবিশেষ সন্তপ্ত হইতেছি।

নাগরক্ষায় ব্রহ্মার উপদেশদান।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, বাসুকির ও অন্যান্য নাগগণের এই সকল বাক্য শ্রবণ করিয়া এলাপত্রনামক সর্প বাসুকিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গনাথ! সেই সর্পসত্র অবশ্যই হইবে সন্দেহ নাই এবং যে জনমেজয় রাজা হইতে আমাদিগের মহৎ ভয় উপস্থিত, তাঁহাকেও বঞ্চিত করিতে পারা যাইবে না। হে রাজন! যে ব্যক্তি দৈবপর হয় তাহার দৈবের উপর নির্ভর করাই সর্ব্বতোভাবে বিধেয়, কারণ সে স্থলে দৈব ব্যতিরেকে তাহার রক্ষা পাইবার আর কোন উপায়ান্তর নাই। হে পন্নগোত্তম! আমাদিগের এ ভয়কে দৈবভয় বলিতে হইবে; অতএব দৈব অবলম্বন করাই উত্তম কল্প বোধ হইতেছে। এ বিষয়ে আমি যাহা কহিতেছি, তোমরা অবধানপূর্ব্বক শ্রবণ কর। যখন মাতা আমাদিগকে শাপ দেন, আমি সেই সময়ে ত্রাসাকুলিতচিত্তে তাঁহার ক্রোড়ে বসিয়া দেবগণের এই কথা শুনিয়াছিলাম। দেবগণ সাতিশয় দুঃখিত হইয়া ব্রহ্মার নিকটে গিয়া কহিলেন, হে পিতামহ! পাষাণহৃদয়া কদ্রু আপনার সম্মুখেই স্বীয় প্রিয়পুত্রগণকে যেরূপ দারুণ অভিসম্পাত করিলেন, মাতা হইয়া পুত্রের প্রতি সেরূপ শাপ প্রদান করিতে কেহই পারে না। আপনিও "এবমস্তু” বলিয়া তাঁহার সেই বাক্যে অনুমোদন করিলেন; অতএব হে ব্রহ্মান্। আপনি কি নিমিত্ত তাঁহাকে স্ব-সমক্ষে শাপ প্রদানে উদ্যতা দেখিয়াও নিবারণ করিলেন না, তাহা শুনিতে বাসনা করি।

ব্রহ্মা কহিলেন, সর্পগণ অতিশয় তীক্ষ্ণবিষ, খল ও প্রজাগণের অহিতকারী, অতএব আমি প্রজাগণের হিতকামনায় শাপ প্রদানোদ্যতা কদ্রুকে নিবারণ করি নাই। কিন্তু সর্পসত্রে কেবল তীক্ষ্ণবিষ, নীচাশয় ও পাপাচার বিষধরদিগেরই বিনাশ হইবে। ধার্মিক নাগগণের কোন অপচয় হইবে না। তৎকালে তাঁহারা যে প্রকারে ঐ শাপ হইতে মুক্ত হইবেন, তাহা শ্রবণ কর। যাযাবর-বংশে অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন তপোনিরত জিতেন্দ্রিয়, জরৎকারুনামে এক মহর্ষি জন্মগ্রহণ করিবেন। তাঁহার ঔরসে আস্তীক নামে এক পুত্র জন্মিবেন। তিনি মহারাজ জনমেজয়কে সর্পযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতে নিষেধ করিবেন। তাহা হইলে ধৰ্ম্মশীল সর্পগণের পরিত্রাণ হইবে।

ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া দেবগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ব্রহ্মন্! মহাতপাঃ মহাবীর্য্য মুনিবর জরৎকারু কাহার গর্তে সেই মহানুভব পুত্র আস্তীককে উৎপাদন করিবেন? ব্রহ্মা কহিলেন, “বীর্য্যবান্ জরৎকারু, সনাম্নী কন্যাতে সেই মহাবীৰ্য্যসম্পন্ন পুত্র উৎপাদন করিবেন। সর্পরাজ বাসুকির জরৎকারুনাম্নী একভগিনী আছেন। তাঁহার গর্তে সেই পুত্র জন্মিবেন এবং তৎকর্তৃকই সর্পকুলের পরিত্রাণ হইবে।” দেবগণ ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া "তথাস্তু” বলিলেন। সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মাও তাঁহাদিগকে এই কথা বলিয়া ত্রিদশালয়ে প্রস্থান করিলেন।

অতএব হে নাগাধিরাজ বাসুকে। নাগগণের ভয়শান্তির নিমিত্ত সেই সুব্রত, ভিক্ষ্যমাণ' মহর্ষিকে তোমার জরৎকারুনাম্নী ভগিনী ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান কর। তাহা হইলেই নাগকুল পরিত্রাণ পাইবে। আমি নাগগণের এই মোক্ষোপায় শ্রবণ করিয়াছি।

ব্রহ্মাকর্তৃক নাগগণকে আশ্বাস।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ এলাপত্রের এই বাক্য শ্রবণে সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়া তাঁহাকে সাধুবাদ করিতে লাগিলেন। নাগরাজ বাসুকিও সেই কথা শ্রবণ করিয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন এবং তদবধি জরৎকারুনাম্নী নিজ ভগিনীকে অতি প্রযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎকাল পরে দেবাসুরগণ একত্র হইয়া সমুদ্রমন্থন আরম্ভ করিলেন। সর্ব্বনাগশ্রেষ্ঠ বাসুকি তাহাতে মন্থনরজ্জু হইয়াছিলেন। সমুদ্রমন্থন সমাপ্ত হইলে দেবগণ বাসুকিকে সমভিব্যাহারে লইয়া ব্রহ্মার নিকটে গমনপূর্ব্বক নিবেদন করিলেন, ভগবন্! এই নাগকুলাগ্রণী বাসুকি মাতৃশাপে ভীত হইয়া অত্যন্ত সন্তপ্ত হইয়াছেন। আপনি অনুগ্রহ করিয়া এই জ্ঞাতিকুলহিতৈষী নাগ-রাজের মাতৃশাপরূপ হৃদয় শল্য উৎপাটন করুন। ইনি আমাদিগের অত্যন্ত প্রিয়কারী ও হিতসাধনে তৎপর; অতএব অনুকূল হইয়া আপনাকে ইঁহার মনোব্যথা নিবারণ করিতে হইবে।

দেবগণের এই প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া ব্রহ্মা কহিলেন, পূর্ব্বে এলাপত্র সর্প ইঁহাকে যাহা কহিয়াছেন, সে আমারই বাক্য। ইনি সেই বাক্যানুসারে কার্য্য করুন, তাহার সময়ও উপস্থিত হইয়াছে। যাহারা দুরাচার ও পাপিষ্ঠ তাহারাই সর্পসত্রে বিনষ্ট হইবে। ধর্মপরায়ণ নাগগণের কিছুই ভয় নাই। সেই জরৎকারু জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং কঠোর তপস্যার অনুষ্ঠান করিতেছেন। নাগরাজ বাসুকি তাঁহাকে যথাকালে ভগিনী প্রদান করুন। হে দেবগণ! এলাপত্র যাহা কহিয়াছেন উহা নাগকুলের পরম হিতকর, উহাতে কোন সন্দেহ নাই।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগাধিপ বাসুকি সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া অবধি জরৎকারুকে ভগিনী প্রদান করিতে সঙ্কল্প করিলেন এবং ঐ সঙ্কল্পে বহুসংখ্যক সর্পদিগকে ত্বদীয় সন্নিধানে সতত অবস্থান করিতে প্রেরণ করিলেন। ভুজঙ্গমরাজ তাঁহাদিগকে এই কহিয়া দিলেন "ভগবান্ জরৎকারু যে মুহূর্তে দারপরিগ্রহ করিতে অভিলাষ প্রকাশ করিবেন, তোমরা তৎক্ষণাৎ আসিয়া আমাকে সংবাদ দিবে।”

মৃগয়াপ্রিয় পরীক্ষিৎ।

শৌনক কহিলেন, হে সুতনন্দন। তুমি জরৎকারুনামা যে মহর্ষির বিবরণ কহিলে, তিনি কি নিমিত্ত জগতে জরৎকারু নামে বিখ্যাত হইয়াছিলেন এবং জরৎকারু শব্দের যথাশ্রুত অর্থই বা কি তাহা আমি শুনিতে ইচ্ছা করি, বর্ণন কর।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরাশব্দের অর্থ ক্ষয়, কারু শব্দের অর্থ দারুণ। সেই মহর্ষির শরীর সাতিশয় দারুণ ছিল, তিনি কঠোর তপস্যাদ্বারা ক্রমে ক্রমে সেই দারুণ শরীরকে ক্ষীণ করিয়াছিলেন, তন্নিমিত্ত তাঁহার নাম জরৎকারু হইল এবং উক্ত কারণবশতঃ বাসুকির ভগিনীও জরৎকারু নামে বিখ্যাত হইলেন। মহর্ষি শৌনক তৎশ্রবণে কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া কহিলেন, হাঁ তুমি যাহা বলিলে, ইহা যুক্তিসিদ্ধ বটে। তুমি ইতিপূর্ব্বে যাহা যাহা কীর্তন করিলে, তৎসমস্তই আমি শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে আস্তীকের জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করিতে বাসনা করি, বর্ণনা কর।

উগ্রশ্রবাঃ শৌনকের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া শাস্ত্রানুসারে কহিতে লাগিলেন। মহামতি বাসুকি ভুজঙ্গমগণের প্রতি উক্তরূপ আদেশ দিয়া মহর্ষি জরৎকারুকে ভগিনী প্রদান করিতে উদ্যত হইয়া রহিলেন। বহুকাল অতীত হইল তথাপি উর্দ্ধরেতা স্বাধ্যায়নিরত সেই মহাত্মা দারপরিগ্রহে অভিলাষী হইলেন না। তিনি কেবল তপস্যাদি ধৰ্ম্মকর্ম্মে নিতান্ত অনুরক্ত হইয়া নির্ভয় হৃদয়ে সমস্ত মেদিনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন।

কিয়ৎকাল পরে কৌরববংশীয় পরীক্ষিৎ পৃথিবীর অধিরাজ হইলেন। তিনি স্বীয় প্রপিতামহ পাণ্ডুরাজার ন্যায় অদ্বিতীয় ধনুর্দ্ধর যুদ্ধবিশারদ ও মৃগয়াপ্রিয় ছিলেন। মহারাজ পরীক্ষিৎ সর্ব্বদাই মৃগ, বরাহ; তরক্ষু', মহিষ ও অন্যান্য বিবিধ প্রকার বন্যজন্তু শিকার করিয়া মহীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন। একদা তিনি স্বকীয় আনতপর্ব্ব শরদ্বারা এক মৃগকে বিদ্ধ করিয়া পৃষ্ঠে শরাসন ধারণপূর্ব্বক যজ্ঞরূপী মৃগের অনুসারী ভগবান্ ভূতনাথের ন্যায়, সেই মৃগের অনুসরণক্রমে নিবিড় অরণ্যানী-মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। পরীক্ষিতের বাণে বিদ্ধ হইলে কোন মৃগই জীবিতাবস্থায় পলায়ন করিতে পারে না, কিন্তু এই মৃগ যে বাণবিদ্ধ হইয়াও পলায়ন করিল, উহা কেবল তাঁহার অচিরাৎ স্বর্গলাভের প্রতি হেতু হইয়া উঠিল।

রাজা পরীক্ষিৎ মৃগের অনুসরণ প্রসঙ্গে ক্রমে ক্রমে অতি দূরদেশে উপনীত হইলেন। পরে সাতিশয় পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত হইয়া এক গোপ্রচারে উপস্থিত হইলেন এবং অবলোকন করিলেন এক তপস্বী, স্তন্যপায়ী বৎসগণের মুখ-নিঃসৃত ফেনপুঞ্জ পান করিয়া জীবন ধারণ করিতেছেন। অত্যন্ত ক্ষুৎপিপাসান্বিত রাজা সেই মুনির সন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মুনিসত্তম। আমি অভিমন্যুর পুত্র রাজা পরীক্ষিৎ, তোমাকে জিজ্ঞাসিতেছি আমি এক মৃগকে বাণদ্বারা বিদ্ধ করিয়াছিলাম, সে পলায়ন করিয়াছে, কোন্দিকে পলায়ন করিল, তুমি কি দেখিয়াছ? মুনিবর মৌনব্রতাবলম্বী ছিলেন, কোন কথাই কহিলেন না। তখন রাজা ক্রোধান্ধ হইয়া আপন ধনুর অগ্রভাগদ্বারা এক মৃত সর্প উত্তোলন করিয়া মহর্ষির স্কন্ধদেশে অর্পণ করিলেন; ঋষি তাহাতে ক্রোধ করিলেন না এবং ভালমন্দ কিছুই বলিলেন না। রাজা তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া ক্রোধ পরিত্যাগপূর্ব্বক ব্যথিতমনে আপন রাজধানী গমন করিলেন। কিন্তু সেই ঋষি তদবস্থই রহিলেন। ঐ ক্ষমতাশীল মহামুনি রাজা পরীক্ষিৎকে স্বধর্মনিরত বলিয়া জানিতেন, এই নিমিত্ত তৎকর্তৃক অবমানিত হইয়াও তাঁহাকে অভিসম্পাত করিলেন না। কুরুবংশাবতংশ মহারাজ পরীক্ষিৎও তাঁহাকে তাদৃশ ধৰ্ম্মপরায়ণ বলিয়া না জানিতে পারিয়াই তাঁহার তাদৃশী অবমাননা করিলেন।

ঐ মহর্ষির শৃঙ্গীনামে এক তরুণবয়স্ক পুত্র ছিলেন। শৃঙ্গী সাতিশয় রোষ-পরবশ। তিনি একবার ক্রুদ্ধ হইলে আর তাঁহাকে প্রসন্ন করা দুঃসাধ্য হইয়া উঠিত। তিনি সময়ে সুসংযত হইয়া সৰ্ব্বভূতহিতৈষী ভগবান্ প্রজাপতির উপাসনা করিতে যাইতেন। একদা শৃঙ্গী সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার উপাসনানন্তর ত্বদীয় আদেশ লইয়া আপন আশ্রমে প্রত্যাগমন করিতেছেন, এমত সময় তাঁহার সখা কৃশনামে এক ঋষিপুত্র হাসিতে হাসিতে তৎসন্নিধানে তদীয় পিতার অপমান বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। রুক্ষস্বভাব শৃঙ্গী কৃশমুখে পিতার অপমানবার্তা শ্রবণ করিয়া ক্রোধে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন। কৃশ হাসিতে হাসিতে কহিলেন, তুমি অত্যন্ত তপোবলসম্পন্ন ও তেজস্বী, কিন্তু তোমার পিতা স্বীয় স্কন্ধদেশে মৃতসর্প বহন করিতেছেন; অতএব হে শৃঙ্গিন। যাও যাও আর তুমি বৃথা গর্ব্ব করিও না এবং মাদৃশ সিদ্ধ, ব্রহ্মবিৎ, তপস্বী ঋষিপুত্রগণ কোন কথা কহিলে তাহাতে প্রত্যুত্তর প্রদান করিও না। হে শৃঙ্গিন। কৈ এক্ষণে তোমার সেই। পুরুষত্বাভিমান এবং তাদৃশ সগর্ব্ব বাক্যই বা কোথায় রহিল, তোমার পিতা সেইরূপ অবমানিত হইয়াও ঔদাসীন্য অবলম্বন-পূর্ব্বক রহিয়াছেন। তদ্বিষয়ে যাহা কর্তব্য কিছুই করেন নাই। আহা। ইহা দেখিয়া আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি।

রাজাকে শৃঙ্গীর শাপ।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাতেজাঃ শৃঙ্গী স্বীয় জনকের স্কন্ধে মৃত সর্প রহিয়াছে শুনিয়া সাতিশয় সংক্রুদ্ধ হইলেন এবং মৃদু-মধুরস্বরে কৃশকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কৃশ! কিরূপে আমার পিতার স্কন্ধে মৃত সর্প সংলগ্ন হইল? কৃশ কহিলেন, সখে! অদ্য মৃগয়াবিহারী পরীক্ষিৎ এই তপোবনে মৃগয়া করিতে আসিয়াছিলেন, তিনিই তোমার পিতার স্কন্ধে মৃত সর্প সমর্পণ করিয়া গিয়াছেন! তখন শৃঙ্গী ক্রোধে দুই চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া কহিলেন, "আমার পিতা সেই দুরাত্মা নরাধম রাজার কি অপরাধ করিয়াছিলেন, সত্য করিয়া বল, আজি তোমাকে আমার তপোবল দেখাইতেছি।”

কৃশ কহিলেন, অভিমন্যুতনয় রাজা পরীক্ষিৎ অদ্য মৃগয়া করিতে আসিয়াছিলেন। তিনি এক মৃগকে বাণবিদ্ধ করেন। বাণাহত মৃগ প্রাণভয়ে দৌড়িতে লাগিল। রাজাও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। পরিশেষে রাজা পরীক্ষিৎ মৃগের অনুসরণক্রমে নিবিড় কাননে প্রবিষ্ট হইলেন। মৃগও ক্রমশঃ ত্বদীয় দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইল। রাজা বহুক্ষণ অরণ্যমধ্যে পর্যটন করিয়াও তাহার অনুসন্ধান পাইলেন না। তখন তিনি ক্ষুৎপিপাসায় একান্ত কাতর হইয়া ত্বদীয় পিতার সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক বারংবার জিজ্ঞাসিতে লাগিলেন, মহাশয়! আপনি একটি শরবিদ্ধ মৃগকে এস্থান দিয়া পলায়ন করিতে দেখিয়াছেন? তোমার পিতা মৌনব্রতাবলম্বী সুতরাং ভাল মন্দ কিছুই বলিলেন না। তন্নিমিত্ত রাজা ক্রুদ্ধ হইয়া নিজ শরাসনের অগ্রভাগদ্বারা এক মৃত সর্প উত্তোলনপূর্ব্বক তাঁহার স্কন্ধদেশে সংলগ্ন করিয়া দিলেন। তোমার পিতা তথাপি সেইরূপ মৌনাবলম্বন করিয়াই রহিলেন। পরে রাজা পরীক্ষিৎ স্বীয় রাজধানী হস্তিনানগরে প্রস্থান করিলেন।

শৃঙ্গী কৃশের মুখে নিরপরাধ পিতার এইরূপ অপমান-রাজাকে এই বলিয়া অভিসম্পাত করিলেন, "যে নৃপাধম বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া কোপোপরক্ত নয়নে' আচমনপূর্ব্বক মৌনব্রতাবলম্বী মদীয় বৃদ্ধ পিতার স্কন্ধে মৃত সর্প সমর্পণ করিয়াছে, আমার বাক্যানুসারে তীক্ষ্ণ বিষধর পন্নগেশ্বর তক্ষক সপ্তরাত্রির মধ্যে ব্রাহ্মণের অপমানকারী সেই পাপাত্মাকে যমসদনে প্রেরণ করিবে।” শৃঙ্গী রাজাকে এইরূপে শাপগ্রস্ত করিয়া গোচারণস্থ স্বকীয় পিতা শমীকের সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, সত্যই তাঁহার স্কন্ধে মৃত সর্প রহিয়াছে। তিনি তদ্দর্শনে পুনর্ব্বার সাতিশয় সংক্রুদ্ধ হইয়া মনোদুঃখে রোদন করিতে লাগিলেন। পরে স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, পিতঃ। দুরাত্মা পরীক্ষিৎ বিনাপরাধে আপনার এই অপমান করিয়াছে শুনিয়া আমি তাহাকে এই উগ্র শাপ প্রদান করিয়াছি যে "পন্নগরাজ তক্ষক সেই কুরুকুলাধমকে দংশন করিয়া অব্য হইতে সপ্তম দিবসে যমালয়ে প্রেরণ করিবে।”

শমীক কুপিত পুত্রের এই অহিতানুষ্ঠান শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে পুত্র! তুমি রাজা পরীক্ষিৎকে শাপ দিয়া অতি কুকর্ম করিয়াছ। আমি ইহাতে প্রীত হইলাম না। তপস্বিগণের এরূপ ধৰ্ম্ম নহে। আমরা সেই রাজার অধিকারে বাস করি। তিনিও ন্যায়পূর্ব্বক আমাদিগকে রক্ষা করিয়া থাকেন, কখন কোন অত্যাচার করেন না। ন্যায়পরায়ণ রাজা যদিও কদাচিৎ কোন অপরাধ করেন, তাহা আমাদিগের অবশ্যই সহ্য করা উচিত। আরও দেখ যদি রাজা আমাদিগকে রক্ষা না করেন, তাহা হইলে আমাদিগের যৎপরোনাস্তি কষ্ট হইবার সম্ভাবনা। ধর্মপরায়ণ ভূপতিগণ আমাদিগকে রক্ষা করেন বলিয়াই আমরা বিপুল ধর্ম উপার্জন করিতেছি। অস্মদুপার্জিত ধর্মে রাজা-দিগেরও ধৰ্ম্মতঃ অধিকার আছে। অতএব হে পুত্র। রাজা যদিও কোন অপরাধ করেন, তাহা আমাদের ক্ষমা করা উচিত। বিশেষতঃ রাজা পরীক্ষিৎ আপন প্রপিতামহ পাণ্ডুর ন্যায় আমা-দিগকে রক্ষা করিতেছেন। প্রজাগণের রক্ষণাবেক্ষণই রাজার প্রধান ধৰ্ম্ম ও অবশ্য কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। সেই মহানুভব রাজা পরীক্ষিৎ ক্ষুধিত ও পরিশ্রান্ত হইয়া আমার আশ্রমে আগমন করিয়াছিলেন। ইহা স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, তিনি আমার মৌনব্রতাবলম্বনের বিষয় না জানিয়া এই কুকর্ম করিয়াছেন! অপিচ দেশ অরাজক হইলে তাহাতে সর্ব্বদাই নানাবিধ দোষ ঘটে এবং লোকসকল উচ্ছৃঙ্খল ও উদ্বিগ্ন হইয়া কোন ধৰ্ম্ম কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে পারে না। রাজা উচ্ছৃঙ্খল লোকদিগের প্রতি দণ্ডবিধান করেন। রাজদণ্ডভয়ে পুনর্ব্বার ধর্ম ও শান্তির সংস্থাপন হয় এবং ধৰ্ম্ম হইতে স্বর্গ সংস্থাপিত হয়। রাজার প্রভাবেই সমুদায় যজ্ঞক্রিয়া সুচারুরূপে অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে, যজ্ঞানুষ্ঠানদ্বারা দেবগণ পরম প্রীত হয়েন, দেবগণ হইতে বৃষ্টি হয়, বৃষ্টিদ্বারা শস্য জন্মে এবং শস্যদ্বারা মনুষ্যগণের পরমো-পকার দর্শে। ভগবান্ মনু কহিয়াছেন, রাজা মনুষ্যদিগের বিধাতা স্বরূপ ও দশ শ্রোত্রিয়ের সমান। সেই রাজা ক্ষুধিত ও পরিশ্রান্ত হইয়া আমার মৌনব্রতের বিষয় না জানিতে পারিয়াই এবস্তৃত গর্হিত ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইয়া থাকিবেন, সন্দেহ নাই। অতএব তুমি কি নিমিত্ত বালকতা প্রযুক্ত হঠাৎ সেই রাজর্ষির প্রতি এই কুকর্মের অনুষ্ঠান করিলে? সেই ভূপতি কোনমতেই আমাদের শাপ প্রদানের পাত্র নহেন।

পরীক্ষিতের শাপবৃত্তান্ত শ্রবণ।

শৃঙ্গী পিতার তিরস্কার-বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে পিতঃ! এই শাপ প্রদান করাতে আমার সাহস প্রকাশ করাই হউক বা দুষ্কর্ম করাই হউক এবং ইহাতে আপনি সন্তুষ্টই হউন বা অসন্তুষ্টই হউন, যাহা করিয়াছি তাহা মিথ্যা হইবার নহে। মহাশয়! আমি আপনাকে যথার্থ কহিতেছি, ইহা কখন অন্যথা হইবে না। আমি পরিহাসচ্ছলেও কখন মিথ্যা কহি না, অতএব মৎ প্রদত্ত শাপ কিরূপে মিথ্যা হইবে? শমীক কহিলেন, পুত্র! আমি উত্তমরূপে জানি, তুমি সাতিশয় উগ্রপ্রভাবশালী ও সত্যবাদী এবং পূর্ব্বে কখন মিথ্যা কহ নাই; সুতরাং তোমার সেই শাপ কখনই মিথ্যা হইবে না। কিন্তু হে পুত্র! পিতা বয়ঃস্থ সন্তানকেও শাসন করিতে পারেন, যেহেতু তদ্দ্বারা ক্রমে ক্রমে পুত্রের গুণ যশোবৃদ্ধির সম্ভাবনা; তুমি বালক অতএব তুমি অবশ্যই আমার শাসনাই। আমি জানি তুমি সর্ব্বদা তপোনুষ্ঠান করিয়া থাক, তপঃপ্রভাবশালী মহাত্মারা অতিশয় কোপনস্বভাব হইয়া থাকেন। কিন্তু হে বৎস! তুমি একে ত আমার পুত্র, বিশেষতঃ বালক, তাহাতে আবার অত্যন্ত সাহসের কার্য্য করিয়াছ, এই সকল ভাবিয়া চিন্তিয়া আমি তোমাকে ভর্ৎসনা করিলাম। এক্ষণে তোমাকে কিছু উপদেশ দিতেছি, শ্রবণ কর।

তুমি শান্তিগুণ অবলম্বন করিয়া বন্য ফল মূলাদি আহারদ্বারা ক্রমে ক্রমে ক্রোধের উপশম কর, তাহা হইলে শাপদান জন্য তোমার আর ধর্মক্ষয় হইবে না। দেখ, ক্রোধ সংযমী তপস্বি-গণের বহু যত্নে সঞ্চিত ধৰ্ম্মরাশি লোপ করে। ধর্মবিহীন লোকদিগের সদ্গতি লাভ হয় না। শমগুণই ক্ষমাশীল তপস্বি-গণের সর্ব্বত্র সিদ্ধি-দায়ক। কি ইহলোকে, কি পরলোকে ক্ষমাবানের সর্ব্বত্রই মঙ্গল; অতএব হে পুত্র। তুমি সর্ব্বদা ক্ষমাশীল ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া কালযাপন কর। ক্ষমাগুণ অবলম্বন করিলে চরমে পরম পদ প্রাপ্ত হইবে। আমি শম-পরায়ণ অতএব এক্ষণে আমার যতদূর সাধ্য সেই নরপতির উপকার করা কর্তব্য। সম্প্রতি নৃপ-সন্নিধানে এই সংবাদ পাঠাই যে, আমার পুত্র বালক ও অতিশয় অপরিণতবুদ্ধি, সে ত্বৎকৃত মদীয় অবমাননা দর্শনে ক্রোধপরতন্ত্র হইয়া তোমাকে শাপ প্রদান করিয়াছে।

দয়াবান মহাতপাঃ শমীক ঋষি, রাজা পরীক্ষিতের নিকট এই সংবাদ প্রদান করিবার নিমিত্ত শ্রুতশীলবিশিষ্ট' গৌরমুখ নামে শিষ্যকে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাঁহাকে কহিয়া দিলেন যে, তুমি অগ্রে রাজার ও রাজকার্য্যের কুশল জিজ্ঞাসিবে, তৎপরে এই অশুভ সংবাদ দিবে। গৌরমুখ গুরুর আজ্ঞানুসারে অবিলম্বে হস্তিনানগরে উপস্থিত হইয়া অগ্রে দ্বারপালদ্বারা সংবাদ দিলেন, পরে রাজভবনে প্রবেশ করিলেন। রাজা তাঁহাকে দেখিয়া পরম সমাদর পূর্ব্বক পাদ্য অর্থ্যাদি দ্বারা পূজা করিলেন। গৌরমুখ রাজকৃত সৎকার গ্রহণ ও কিয়ৎক্ষণ শ্রান্তি দূর করিয়া শমীকোপদিষ্ট বাক্যসকল অবিকল কহিতে লাগিলেন। তিনি কহিলেন, মহারাজ। শান্ত, দান্ত, পরমধার্মিক, শমীক নামে এক মহাতপাঃ মহর্ষি আপনার অধিকারে বাস করেন। আপনি শরাসনের অগ্রভাগদ্বারা সেই মৌনব্রতাবলম্বী মহর্ষির স্কন্ধে এক মৃতসর্প অর্পণ করিয়া আসিয়াছিলেন। শমগুণাবলম্বী মহামুনি শমীক আপনার সেই অপরাধ ক্ষমা করিয়াছিলেন। কিন্তু ত্বদীয় পুত্র শৃঙ্গী সাতিশয় উগ্রস্বভাব, তিনি আপনার গর্হিত অনুষ্ঠান দর্শনে ক্রোধে অধীর হইয়া আপনাকে এই অভিসম্পাত করিয়াছেন যে, সপ্তম দিবসে তক্ষকদংশনে আপনার প্রাণ বিয়োগ হইবে। শমীক মুনি শাপ নিবারণার্থ পুত্রকে যথেষ্ট অনুরোধ করিয়াছিলেন, কিন্তু কাহার সাধ্য যে সে শাপ অন্যথা করে। মহর্ষি কোপান্বিত পুত্রকে কোনক্রমে শান্ত করিতে না পারিয়া আপনার হিতার্থে আমাকে এই শাপসংবাদ দিতে পাঠাইলেন।

পরীক্ষিৎকে রক্ষার উদ্দেশ্যে কাশ্যপের যাত্রা।

রাজা পরীক্ষিৎ গৌরমুখের মুখে এই দারুণ সংবাদ শুনিয়া এবং আপন দুষ্কর্ম স্মরণ করিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণ হইলেন। মুনিবর শমীক মৌনব্রতাবলম্বী ছিলেন, এই নিমিত্তই তাঁহাকে প্রত্যুত্তর প্রদান করেন নাই, ইহা শুনিয়া রাজার শোকাগ্নি দ্বিগুণ প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। তখন তিনি ভাবিতে লাগিলেন, "শমীক মুনি এমত শান্ত-স্বভাব যে তিনি মৎকৃত তাদৃশ অপমান সহ্য করিয়াও দয়া প্রদর্শন করিয়াছেন। হায়! আমি কি কুকৰ্ম্ম করিয়াছি, সেই পরম কারুণিক মুনিবরের উপর তদ্রূপ অত্যাচার করা আমার নিতান্ত অন্যায় হইয়াছে।” এই ভাবিয়া রাজার আর পরিতাপের পরিসীমা রহিল না। রাজা বিনা অপরাধে সেই মুনিবরের তাদৃশী অবমাননা করিয়াছেন বলিয়া যেরূপ শোকার্ত হইলেন, আপনার মৃত্যুবার্তা শ্রবণে সেরূপ হইলেন না। অনন্তর, রাজা গৌরমুখকে এই বলিয়া বিদায় করিলেন যে, মহাশয়! আপনি অনুগ্রহ করিয়া সেই মুনিবরকে এই কথা বলিবেন, যেন তিনি আমার প্রতি সুপ্রসন্ন থাকেন।

রাজা এইরূপে গৌরমুখকে বিদায় করিয়া নিতান্ত উদ্বিগ্ন-মনে আপন মন্ত্রিগণ সমভিব্যাহারে মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন। মন্ত্রণানন্তর এক একস্তম্ভ-সুরক্ষিত' প্রাসাদ নির্মাণ করাইয়া তথায় নানাবিধ ঔষধ, বহুসংখ্যক চিকিৎসক ও মন্ত্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণগণ নিযুক্ত করিলেন এবং সেই প্রাসাদে সুরক্ষিতরূপে অবস্থান করিয়া মন্ত্রিগণ সমভিব্যাহারে রাজকার্য্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। তাঁহার সমীপে কেহই গমন করিতে পারিতেন না। অধিক কি কহিব, সর্ব্বত্রগামী বায়ুরও সে স্থানে সঞ্চার রহিল না।

বিষবিদ্যা-বিশারদ দ্বিজোত্তম কাশ্যপ মুনি শ্রবণ করিয়া-ছিলেন যে, রাজা পরীক্ষিৎ ভুজঙ্গশ্রেষ্ঠ তক্ষকের দংশনে প্রাণ পরিত্যাগ করিবেন। তন্নিমিত্ত তিনি মনে মনে বিবেচনা করিয়া-ছিলেন যে, তক্ষক রাজাকে দংশন করিলে আমি মন্ত্রৌষধিবলে তাঁহাকে সঞ্জীবিত করিব, তাহা হইলে আমার ধর্ম ও অর্থ উভয়ই লাভ হইবে। পরে নির্দ্ধারিত সপ্তম দিন উপস্থিত হইলে তিনি রাজাকে রক্ষা করিবার বাসনায় একাগ্রচিত্ত হইয়া রাজ-ভবনে গমন করিতেছেন, এমন সময়ে বৃদ্ধ-ব্রাহ্মণবেশধারী নাগরাজ তক্ষক পথিমধ্যে তাঁহাকে দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মুনিবর। তুমি অনন্যমনাঃ হইয়া এত সত্বরগমনে কি অভিপ্রায়ে কোথায় চলিয়াছ? কাশ্যপ কহিলেন, অদ্য কুরুকুলোৎপন্ন রাজা পরীক্ষিৎ উরগরাজ তক্ষকের বিষানলে দগ্ধ হইবেন শুনিয়া তাঁহাকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত গমন করিতেছি। তক্ষক কহিলেন, হে ব্রহ্মান্। আমিই সেই তক্ষক, আমি অদ্য সেই মহীপালের প্রাণ সংহার করিব, তুমি ক্ষান্ত হও, আমি দংশন করিলে তোমার সাধ্য কি যে তুমি তাঁহাকে রক্ষা কর। কাশ্যপ কহিলেন, তুমি দংশন করিলে আমি স্বীয় বিদ্যাপ্রভাবে অবশ্যই তাঁহাকে নির্বিষ করিব, সন্দেহ নাই।

তক্ষকের দন্তাঘাত।

তক্ষক কহিলেন, হে কাশ্যপ। যদি আমি কোন বস্তু দংশন করিলে তুমি চিকিৎসাদ্বারা তাহাকে রক্ষা করিতে পার, তবে সম্মুখস্থ এই বটবৃক্ষে দংশন করিতেছি, তুমি ইহাকে রক্ষা করিয়া আপনার মন্ত্রপ্রভাব দেখাও। কাশ্যপ কহিলেন, হে ভুজগেন্দ্র। তুমি দংশন কর, আমি এই মুহূর্তে তাহাকে পুনর্জীবিত করিতেছি। ভুজঙ্গেশ্বর তক্ষক মহাত্মা কাশ্যপের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া সম্মুখস্থ সেই বটবৃক্ষে দংশন করিলেন। বটবৃক্ষ তক্ষকের তীব্র বিষানলে মূল অবধি পল্লবাগ্র পর্যন্ত প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল এবং ক্ষণকালমধ্যে ভস্মসাৎ হইয়া গেল! তখন তক্ষক কাশ্যপ মুনিকে কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! এই বৃক্ষকে পুনর্জীবিত করিতে যত্নবান্ হও। মহর্ষি কাশ্যপ তক্ষকের বাক্য শ্রবণ করিয়া সেই ভস্মীভূত বৃক্ষের ভস্মরাশি গ্রহণপূর্ব্বক তক্ষককে কহিলেন, হে ভুজগেন্দ্র। আমার বিদ্যাবল দেখ, আমি তোমার সমক্ষেই এই ভস্মীভূত বনস্পতিকে পুনর্জীবিত করিতেছি। অনন্তর দ্বিজসত্তম কাশ্যপ স্বীয় বিদ্যাপ্রভাবে সেই ভস্মীকৃত ন্যগ্রোধ পাদপকে পুনর্জীবিত করিলেন। প্রথমে অঙ্কুর, তৎপরে পত্রদ্বয়, তদনন্তর পত্রসমূহ, পরিশেষে শাখাপ্রশাখা প্রভৃতি সমুদায় অংশ সুচারুরূপে প্রস্তুত হইল।

এইরূপে মহর্ষি কাশ্যপের মন্ত্রবলে ঐ বটবৃক্ষ পুনর্জীবিত হইল দেখিয়া তক্ষক তাঁহাকে কহিলেন, হে ব্রহ্মন। তুমি যে বিদ্যাবলে আমার বা মাদৃশ অন্য ব্যক্তির বিষক্ষয় করিবে ইহা বড় আশ্চর্য্যের বিষয় নহে, যেহেতু ভবাদৃশ মন্ত্র-বিশারদ তেজস্বী লোকের কিছুই দুঃসাধ্য নাই। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি নিমিত্ত তথায় গমন করিতেছ? তুমি যে বস্তুর লাভাকাঙ্ক্ষায় সেই নৃপের নিকট যাইতেছ, তাহা অতি দুষ্প্রাপ্য হইলেও আমি তোমাকে দিব। ব্রহ্মশাপে রাজার আয়ুঃশেষ হইয়াছে, অতএব তুমি তাঁহার রক্ষণ বিষয়ে কৃতকার্য্য হইতে পার কি না, সন্দেহ। যদি তুমি তাঁহাকে রক্ষা করিতে না পার, তাহা হইলে তোমার ত্রিলোকীবিশ্রুত যশোরাশি নিস্তেজ দিবাকরের ন্যায় একবারে অন্তর্হিত হইবে।

কাশ্যপ তক্ষক-বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গম। আমি ধনার্থী হইয়া তথায় গমন করিতেছি, তুমি আমাকে প্রচুর ধন দাও তাহা হইলেই নিবৃত্ত হইতেছি। তক্ষক কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! তুমি যত ধন আকাঙ্ক্ষা করিয়া রাজার নিকট গমন করিতেছ, আমি তদপেক্ষা অধিক দিতেছি, তুমি নিবৃত্ত হও। দ্বিজোত্তম কাশ্যপ তক্ষকের বাক্য শ্রবণানন্তর দিব্যজ্ঞানপ্রভাবে ধ্যান করিয়া দেখিলেন যে, সত্যই রাজা পরীক্ষিতের আয়ুঃশেষ হইয়াছে। তখন তিনি তক্ষকের নিকট হইতে স্বাভিলষিত অর্থ লইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন।

এইরূপে মহাত্মা কাশ্যপ প্রতিনিবৃত্ত হইলে তক্ষক অবিলম্বে হস্তিনানগরে উপস্থিত হইলেন। গমন সময়ে শুনিলেন, রাজা বিষহর মন্ত্র ও ঔষধ সংগ্রহ করিয়া অতি সাবধানে রহিয়াছেন। তখন তিনি মনে মনে চিন্তা করিলেন যে, রাজাকে মায়া প্রভাবে বঞ্চিত করিতে হইবে; অতএব এক্ষণে কি উপায় অবলম্বন করা কর্তব্য? তদনন্তর নাগরাজ তক্ষক অন্যান্য সর্পগণকে আদেশ করিলেন, তোমরা ব্রাহ্মণরূপ ধারণপূর্ব্বক, বিশেষ প্রয়োজন আছে, এই ছল করিয়া অব্যগ্রচিত্তে রাজ-সমীপে গিয়া ফল, পুষ্প, কুশ ও জল প্রদান দ্বারা তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিবে। নাগগণ তক্ষক কর্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণ-বেশ পরিগ্রহপূর্ব্বক রাজসন্নিধানে গমন করিয়া কুশ, জল ও ফল দিয়া রাজাকে আশীর্ব্বাদ করিলে, রাজা সেই সমস্ত গ্রহণ করিলেন; পরে কার্য্য সমাধানন্তর তাঁহাদিগকে বিদায় করিলেন।

ছদ্মতাপসরূপী' ভুজঙ্গমেরা গমন করিলে রাজা অমাত্য-গণ ও সুহৃদ্গণকে কহিলেন, আইস আমরা সকলে একত্র হইয়া এই সকল তাপসদত্ত সুস্বাদ ফল ভক্ষণ করি। দুর্দৈববশতঃ ভূপতির ফলভোজনে প্রবৃত্তি হইল। যে ফলের মধ্যে তক্ষক গুপ্তভাবে ছিলেন, দৈবনির্ব্বন্ধক্রমে তিনি সেই ফলটিই স্বয়ং ভক্ষণ করিতে লইলেন। ভক্ষণ করিবার সময় ঐ ফল হইতে এক অণুপরিমাণ কৃষ্ণনয়ন তাম্রবর্ণ কীট বহির্গত হইল। রাজা সেই কীট গ্রহণ করিয়া সচিবদিগকে কহিতে লাগিলেন, সূর্যদেব অস্তাচলে গমন করিতেছেন, আজি আর আমার বিষের ভয় নাই! এক্ষণে এই কীট তক্ষক হইয়া আমাকে দংশন করুক। তাহা হইলে শাপেরও মোচন হয় এবং ব্রাহ্মণের বাক্যও সত্য হয়। মন্ত্রীরাও কাল-প্রযোজিত হইয়া তাঁহার সেই বাক্যে অনুমোদন করিলেন। মরণোন্মুখ রাজার দুর্বুদ্ধি ঘটিল। তিনি সেই কীট স্বীয় গ্রীবায় রাখিয়া হাসিতে লাগিলেন। কীটরূপী তক্ষক নিজ দেহদ্বারা তৎক্ষণাৎ রাজার গ্রীবাদেশ বেষ্টন করিল। তখন রাজার চৈতন্য হইল। তক্ষক অতিবেগে গ্রীবাদেশ বেষ্টনপূর্ব্বক ভীষণ গর্জন করিয়া তাঁহাকে দংশন করিল।

জনমেজয়ের রাজ্যাভিষেক।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মন্ত্রিগণ রাজাকে তক্ষকের শরীরদ্বারা বেষ্টিত দেখিয়া বিষণ্ণ বদনে ও দুঃখিত মনে রোদন করিতে লাগিলেন। তদনন্তর তক্ষকের সেই ভয়ঙ্কর গর্জন শ্রবণে ভীত হইয়া সে স্থান হইতে পলায়ন করিলেন। তাঁহারা পলায়নকালে গগনমণ্ডলে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, ভুজঙ্গরাজ তক্ষক দীপ্তাগ্নিশিখাসদৃশ স্বীয় শরীরদ্বারা নভোমণ্ডল দ্বিখণ্ডিত করিয়া অতিবেগে গমন করিতেছেন। পরিশেষে সেই একস্তম্ভ গৃহ তক্ষকের বিষাগ্নিদ্বারা প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। মন্ত্রিবর্গ তদ্দর্শনে শঙ্কাকুলিতচিত্তে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিলেন। রাজাও বজ্রাহতের ন্যায় ভূপৃষ্ঠে পতিত ও মূর্ছিত হইলেন। রাজা পরীক্ষিৎ এইরূপে তক্ষকদংশনে প্রাণত্যাগ করিলে তদীয় মন্ত্রিগণ ও রাজপুরোহিতগণ সমবেত হইয়া তাঁহার পারত্রিক ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করিলেন। পরে পুরবাসী সমস্ত প্রজাগণকে একত্র করিয়া তাঁহার শিশু পুত্রকে পিতৃরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। ঐ অমিত্রঘাতী কুরুপ্রবীর নৃপাত্মজের নাম জনমেজয়। কুরু-বংশাবতংস মহামতি জনমেজয় শিশু হইয়াও মন্ত্রিগণ ও পুরোহিতগণের সহিত মন্ত্রণা করিয়া আপন প্রপিতামহ ধৰ্ম্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের ন্যায় সুচারুরূপে রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। অনন্তর মন্ত্রিগণ ঐ নবীন রাজার রাজকার্য্য সম্পাদনে বিলক্ষণ নিপুণতা জন্মিয়াছে দেখিয়া, তাঁহার পরিণয়ার্থে কাশীপতি | সুবর্ণবৰ্ম্মার নিকটে গিয়া তদীয় কন্যা বপুষ্টমাকে প্রার্থনা করিলেন। কাশীশ্বর সেই কুরুপ্রবীরকে বেদবিধানানুসারে বপুষ্টমা প্রদান করিলেন। রাজা জনমেজয় ঐ লোকললামভূতা' নিতম্বিনীকে পাইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। তিনি কদাচ অন্য রমণীর প্রতি কটাক্ষপাতও করিতেন না। পূর্ব্বকালে পার্থিবাগ্রণী পুরূরবাঃ যেমন উর্ব্বশীকে পাইয়া তাঁহার সহিত বিহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ ইনিও সেই মনোহারিণী বরবর্ণিনী'কে পাইয়া কদাচিৎ সুরম্য সরোবরে, কদাচিৎ বিচিত্র উপবনে তাঁহার সহিত বিহার করিয়া পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। রূপলাবণ্যবতী পতিব্রতা বপুষ্টমাও বিহার-কালে সাতিশয় প্রেমপ্রদর্শনদ্বারা প্রিয়পতিকে যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট করিতেন।

জরৎকারুর অনুতাপ।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এই সময়ে মহাতপাঃ জরৎকারু মুনি বায়ুমাত্র ভক্ষণে শীর্ণকলেবর হইয়া তপোনুষ্ঠান ও পুণ্যতীর্থে স্নান করিয়া অবনীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিতেন এবং যে স্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হইত সেই স্থানেই অবস্থিতি করিতেন। একদা তিনি পর্য্যটনক্রমে এক স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, নিরাহারে শীর্ণকলেবর, বায়ুমাত্রভোজী, পরিত্রাণেচ্ছু, অতি দীনভাবাপন্ন, স্বকীয় পিতৃগণ ঊর্দ্ধপাদ ও অধোমস্তকে তত্ত্বমাত্রাবশিষ্ট উশীরস্তম্ব অবলম্বন করিয়া এক মহাগৰ্ত্তাভিমুখে লম্বমান রহিয়াছেন। ঐ গর্তে এক প্রকাণ্ড মূষিক বাস করে। সে প্রতিদিন সেই বীরণস্তম্বের মূলসকল ক্রমে ক্রমে ছেদন করিতেছে। মহর্ষি জরৎকারু তাঁহাদিগকে নিতান্ত দীনভাবাপন্ন ও পরিত্রাণেচ্ছু দেখিয়া দয়ার্দ্রচিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনারা কে এবং কি নিমিত্তই বা এই উশীরস্তম্ব অবলম্বন করিয়া উর্দ্ধপদে ও অধোমুখে মহাগৰ্ত্তাভিমুখে লম্বমান রহিয়াছেন? আপনারা যে উশীরস্তম্ব অবলম্বন করিয়া আছেন, উহার একমাত্র তত্ত্ব অবশিষ্ট আছে। এই গর্ভনিবাসী মূষিক তাহাও ক্রমে ক্রমে ছেদন করিতেছে। ইহা ছিন্ন হইলেই আপনারা এই গর্ভমধ্যে অধঃশিরে পতিত হইবেন। আপনাদের এই দুৰ্দ্দশা দর্শনে আমার যৎপরোনাস্তি দুঃখ হইতেছে। আজ্ঞা করুন, আপনাদের কি প্রিয়কার্য্য করিব? আমার তপস্যার চতুর্থভাগ বা তৃতীয়ভাগ অথবা অর্দ্ধভাগ লইয়া যদি আপনারা এই বিপদ হইতে মুক্ত হইতে পারেন, হউন। অধিক কি কহিব, যদি সমগ্র তপস্যাদ্বারাও আপনাদের এই দুঃসহ দুঃখ নিবারণ হয়, তাহাতেও আমি সম্মত আছি।

পিতৃগণ তাঁহার সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে বৃদ্ধ ব্রহ্মচারিন্! তুমি তপঃপ্রভাবে আমাদিগকে পরিত্রাণ করিতে চাহিতেছ, কিন্তু তপস্যাদ্বারা আমাদিগকে উদ্ধার করিতে পারিবে না। আমাদিগেরও তপঃসিদ্ধি আছে। কেবল বংশক্ষয়োপক্রম হইয়াছে বলিয়া আমরা এই অপবিত্র নরকে নিপতিত হইতেছি। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা কহিয়াছেন "সন্তানই পরম ধৰ্ম্ম"। আমরা এই গর্তে লম্বমান হইয়া হতজ্ঞান হইয়াছি তন্নিমিত্ত তোমার পৌরুষ সর্ব্বলোেক বিশ্রুত হইলেও তোমাকে চিনিতে পারিতেছি না। তুমি আমাদিগের দুঃখ দর্শনে সাতিশয় কাতর হইয়াছ, অতএব তোমাকে পরিচয় প্রদান করিতেছি, শ্রবণ কর। আমরা যাযাবর নামে ব্রতশীল ঋষি, সন্তানক্ষয়ের উপক্রম হওয়াতে এই পবিত্র লোক হইতে ভ্রষ্ট হইতেছি। আমাদের কঠোর তপস্যার ফল অদ্যাপিও বিনষ্ট হয় নাই। আমাদের জরৎকারু নামে এক সন্তান আছেন। তিনি বেদবেদাঙ্গশাস্ত্রে পারদর্শী, নিয়তাত্মা, ব্রতনিরত, তপঃপ্রভাবসম্পন্ন। কিন্তু তাঁহার থাকা না থাকা উভয়ই সমান হইয়াছে। তাঁহার স্ত্রীপুত্র, বন্ধুবান্ধব কেহই নাই। কেবল কঠোর তপস্যা করিয়াই কালযাপন করেন। তিনি তপস্যা-লোভে নিতান্ত আক্রান্ত হওয়াতেই আমাদিগের এই দুর্দশা ঘটিয়াছে। এই যে উশীরস্তম্ব দেখিতেছ, ইহা আমাদের বংশবর্দ্ধক কুলস্তম্ব। আর ইহার যে সকল মূল দেখিতেছ, উহা আমাদিগের কালকবলিত সন্তানসমূহ। অর্দ্ধ ভক্ষিত যে মূলটি আমরা অবলম্বন করিয়া আছি, উহা সেই তপোনিষ্ঠ জরৎকারু। আর এই যে মূষিক দেখিতেছ, ইনি মহাবল পরাক্রান্ত কাল। ইনি সেই তপোলুব্ধ, মূঢ়মতি জরৎকারুকে ক্ষয় করিতেছেন। জরৎকারুর কঠোর তপস্যা আমাদিগকে রক্ষা করিতে পারিবে না। আমরা অতি মন্দভাগ্য, আমাদিগের মূল ছিন্নপ্রায় হইয়াছে। এই দেখ আমরা কালোপহতচিত্ত' হইয়া দুরাত্মাদিগের ন্যায় অধঃপতিত হইতেছি। আমরা সবান্ধবে এই গর্তে পতিত হইলে তাঁহাকেও কালনিয়ন্ত্রিত হইয়া নিরয়গামী হইতে হইবে। হে ব্রহ্মন্! কি তপস্যা কি যজ্ঞ, কি অন্যান্য পুণ্যকর্ম, সন্তানের সদৃশ কিছুই দেখিতে পাই না। হে বৎস। এক্ষণে তুমি আমাদের নাথস্বরূপ। তোমার সহিত সেই মূঢ়মতি জরৎকারুর সাক্ষাৎকার হইলে তাহার নিকট আমাদিগের এই দুৰ্দ্দশা-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত পরিচয় দিবে এবং কহিবে, তুমি ত্বরায় দারপরিগ্রহ করিয়া সন্তানোৎপাদনদ্বারা তাঁহাদিগকে পরিত্রাণ কর। সে যাহা হউক, তুমি যে আমাদের দুর্দশা দেখিয়া পরম বন্ধুর ন্যায় অনুতাপ করিতেছ, তন্নিমিত্ত আমরা শুনিতে ইচ্ছা করি, তুমি কে?

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরৎকারু তাঁহাদের এই বাক্য শ্রবণে সাতিশয় শোকার্ত হইয়া সবাষ্প গদ্গদস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে মহর্ষিগণ! আপনারা আমারই পূর্ব্বপুরুষ; আমিই আপনা-দিগের সেই পাপাত্মা, নরাধম ও কৃতঘ্ন পুত্র; আমার নাম জরৎকারু। সম্প্রতি আপনাদিগের কি প্রিয় কার্য্য করিতে হইবে আজ্ঞা করুন এবং আমার এই অপরাধের যথোচিত দণ্ড করুন।

পিত্রাদেশে জরৎকারুর দারপরিগ্রহ।

পিতৃগণ কহিলেন, বৎস! আমাদিগের সৌভাগ্যবলে তুমি যদৃচ্ছাক্রমে এই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছ, এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি তুমি কি নিমিত্ত দারপরিগ্রহ কর নাই? জরৎকারু কহিলেন, হে পিতৃগণ! আমার মনে সর্ব্বদাই এই ভাব উদিত হয় যে, আমি উর্দ্ধরেতাঃ হইয়া ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বনপূর্ব্বক দেহত্যাগ করিব, কদাচ দারপরিগ্রহ করিব না। এক্ষণে আপনাদিগকে এই মহাগৰ্ত্তমধ্যে পক্ষীর ন্যায় লম্বমান দেখিয়া আমার ব্রহ্মচর্য্যের বাসনা অপনীত হইল। আমি আপনাদের হিতসাধনার্থে অচিরাৎ বিবাহ করিব, কিন্তু তদ্বিষয়ে এই এক প্রতিজ্ঞা রহিল যে, যদি আমার সনাম্নী কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ প্রাপ্ত হই এবং তাহাকে ভরণপোষণ করিতে না হয়, তাহা হইলেই তাহার পাণিগ্রহণ করিব, প্রকারান্তর হইলে তদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত হইব না। আমার সেই পত্নীর গর্তে যে পুত্র জন্মিবে সেই আপনাদিগকে উদ্ধার করিবে। হে পিতামহগণ! তখন আপনারা অক্ষয় স্বর্গলাভকরিয়া পরম সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।

উগ্রশ্রবাঃ শৌনককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ভৃগু-বংশাবতংস! মহর্ষি জরৎকারু এইরূপে পিতৃগণকে আশ্বাসিত করিয়া সমস্ত মহীমণ্ডল ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি বৃদ্ধ বলিয়া কেহই তাঁহাকে কন্যাপ্রদানে উদ্যত হইল না। যখন তিনি পিতৃগণের অদেশানুসারে বিবাহ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াও তৎসম্পাদনে কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না, তখন দুঃখমনে অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। পরিশেষে পিতৃলোক-হিতৈষী মহাপ্রাজ্ঞ জরৎকারু এই বলিয়া ক্রমে ক্রমে তিনবার কন্যা ভিক্ষা করিলেন, "এস্থানে যে কোন স্থাবর বা অস্থাবর বস্তু বর্তমান আছ অথবা যাহারা অন্তর্হিত' আছ, সকলে আমার বাক্য শ্রবণ কর। আমি যাযাবরবংশে সমুদ্ভূত। আমার নাম জরৎকারু। জন্মাবধি এতাবৎকাল পর্যন্ত কেবল ব্রহ্মচর্য্যানুষ্ঠানদ্বারা কালযাপন করিয়াছি। সম্প্রতি আমার পিতৃগণ বংশলোপভয়ে আমাকে পাণিগ্রহণ করিতে আদেশ দিয়াছেন। আমি নিতান্ত দরিদ্র হইয়াও পিতৃগণের আজ্ঞাক্রমে দারপরিগ্রহাভিলাষে' নিখিল ধরণীমণ্ডল পরিভ্রমণ করিলাম কিন্তু কুত্রাপি কন্যালাভ হইল না। অতএব এক্ষণে আমি যাঁহাদের নিকট কন্যা প্রার্থনা করিতেছি, তাঁহাদের মধ্যে যদি কোন ব্যক্তির মৎ-সনাম্নী দুহিতা থাকে, আর যদি আমাকে সেই কন্যা ভিক্ষাস্বরূপ সম্প্রদান করেন এবং তাহাকে যদি ভরণপোষণ করিতে না হয়, তবে আনয়ন করুন, আমি তাহার পাণিগ্রহণ করিব।”

অনন্তর যে সকল সর্প জরৎকারুর দারপরিগ্রহাভিলাষের অনুসন্ধানে নিযুক্ত ছিল, তাহারা সত্বর যাইয়া বাসুকিকে সংবাদ দিল। নাগরাজ বাসুকি তাহাদের মুখে এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র সাতিশয় সন্তোষ প্রকাশপূর্ব্বক স্বীয় ভগিনীকে বিচিত্র বসনভূষণে বিভূষিতা করিয়া জরৎকারু-সন্নিধানে লইয়া গেলেন এবং তাঁহাকে ভিক্ষাস্বরূপ সেই কন্যা প্রদান করিলেন। কিন্তু মুনিবর কন্যার নাম ও ভরণ পোষণ বিষয়ে সন্দিহান হইয়া নাগরাজ বাসুকিকে তাহার নাম জিজ্ঞাসা করিলেন এবং কহিলেন, আমি ইহার ভরণপোষণ করিতে পারিব না। এইরূপে মহর্ষি জরৎকারু মুমুক্ষু হইয়াও দারপরিগ্রহার্থ দ্বিমনাঃ হইয়াছিলেন।

জরৎকারুর পত্নীত্যাগ।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগরাজ বাসুকি জরৎকারুকে কহিলেন, হে তপোধন! আমার এই ভগিনী আপনার সনাম্নী এবং ইনি তপঃপরায়ণা। আপনি ইহার পাণিগ্রহণ করুন। আমি ইহাকে আপনার সহধর্মিণী করিয়া দিব বলিয়াই এতাবৎকাল পর্যন্ত অভিলাষ করিয়া আছি। আর অঙ্গীকার করিতেছি, আমি সাধ্যানুসারে ইহার ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করিব। ঋষি কহিলেন, তবে এই নিশ্চয় হইল যে, আমি কদাচ ইহার ভরণপোষণ করিব না এবং ইনিও আমার কোন অপ্রিয় আচরণ করিবেন না, যদি করেন তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করিব।

বাসুকি ভগিনীর ভরণপোষণের ভার গ্রহণ করিলে মহাতপাঃ জরৎকারু তাঁহার বাসভবনে গমন করিয়া যথাবিধানে তদীয় ভগিনীর পাণিপীড়ন' করিলেন। বিবাহকালে মহর্ষিগণ তাঁহাকে স্তব করিতে লাগিলেন। অনন্তর জরৎকারু ভার্য্যা-সমভিব্যাহারে ভুজঙ্গরাজের রমণীয় অন্তঃপুরে প্রবেশপূর্ব্বক সুচারু আস্তরণ-পটে আচ্ছাদিত' বিচিত্র শয্যায় শয়ন করিলেন। পরে ভার্য্যার সহিত এইরূপ নিয়ম করিলেন যে, তুমি কদাচ আমার অপ্রিয় আচরণ করিবে না, অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে আমি তদ্দণ্ডেই তোমাকে পরিত্যাগ করিব ও ত্বদীয় বাসগৃহে আর ক্ষণমাত্রও অবস্থিতি করিব না। দেখিও যাহা কহিলাম যেন কদাপি ইহার অন্যথা না হয়। পিতৃকুল-হিতৈষিণী নাগ-রাজ-ভগিনী অতিমাত্র দুঃখিতা ও উদ্বিগ্নচিত্তে অগত্যা "তথাস্তু” বলিয়া স্বামি-বাক্যে অঙ্গীকার করিলেন এবং অতি সতর্কমনে ভর্তৃশুশ্রূষা করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎকাল পরে ভুজঙ্গরাজ-ভগিনী ঋতুস্নাতা হইয়া যথাবিধি স্বামিসেবায় নিযুক্ত হইলেন। মহর্ষির সহযোগে তাঁহার গর্ভসঞ্চার হইল। ঐ গর্ভ শুক্লপক্ষীয় শশিকলার ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। একদা মহাযশাঃ জরৎকারু একান্ত ক্লান্ত হইয়া প্রিয়তমার অঙ্কশয্যায় শিরোনিবেশ পূর্ব্বক শায়িত ও নিদ্রিত হইলেন। দ্বিজেন্দ্র নিদ্রাক্রান্ত হইলে দিনমণি অস্তাচলে গমন করিলেন। মনস্বিনী নাগভগিনী সায়ংকাল উপস্থিত দেখিয়া স্বামীর তৎকালোচিত সন্ধ্যা বন্দনাদি ক্রিয়ালোপের আশঙ্কায় চিন্তা করিলেন, সম্প্রতি আমার কি কর্ত্তব্য, ভর্তার নিদ্রাভঙ্গ করি কি না? ইনি অতি কোপনস্বভাব, নিদ্রাভঙ্গ করিলে নিশ্চয়ই কোপ করিবেন। কিন্তু জাগরিত না করিলেও নিত্যক্রিয়ার ব্যতিক্রম ঘটে। অতএব এক্ষণে কি করা উচিত? ফলতঃ কোপ ও ধৰ্ম্মশীল ব্যক্তির ধর্মলোপ এই উভয়ের মধ্যে ধৰ্ম্মলোপই নিতান্ত দূষণাবহ। অতএব যাহাতে ব্রাহ্মণের ধর্মরক্ষা হয় তাহাই করা কর্তব্য। এইরূপ নিশ্চয় করিয়া মধুরভাষিণী বাসুকি-ভগিনী জ্বলন্ত-হুতাশন-সন্নিভ তেজঃপুঞ্জাকৃতি সুখ-প্রসুপ্ত মহাতপাঃ জরৎকারুকে সম্বোধন করিয়া অতি বিনীত বচনে কহিলেন, মহাভাগ। সূর্য্যদেব, অস্তাচল শিখরদেশে আরোহণ করিয়াছেন। সন্ধ্যাতিমির পশ্চিম দিক্ অল্প অল্প আচ্ছন্ন করিতেছে। গাত্রো-খান করিয়া সন্ধ্যোপাসনা করুন, অগ্নিহোত্রের সময় উপস্থিত। ভগবান্ জরৎকারু জাগরিত হইয়া ওষ্ঠাধর পরিস্ফুরণপূর্ব্বক রোষভরে কহিলেন, হে ভুজঙ্গমে! তুমি আমার অবমাননা করিলে, অতএব আমি আর তোমার নিকট অবস্থিতি করিব না, যথাস্থানে গমন করিব। হে বামোরু! আমার এরূপ দৃঢ় নিশ্চয় আছে, আমি নিদ্রিতাবস্থায় থাকিলে সূর্য্যের সাধ্য কি যে তিনি যথাকালে অস্তগত হন। অপমানিত হইলে সামান্য লোকেও তথায় বাস করে না আমার বা মাদৃশ ধৰ্ম্মশীল ব্যক্তির কথা কি বলিব?

ত্বদীয় এতাদৃশ নিৰ্দ্দয় বাক্য শ্রবণে বাসুকি-ভগিনী কহিলেন, ভগবন্! ধৰ্ম্মলোপের আশঙ্কায় আমি আপনার নিদ্রাভঙ্গ করিয়াছি, অপমানের উদ্দেশে করি নাই। তখন জরৎকারু ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ভার্য্যা-পরিত্যাগ-বাসনায় বলিলেন, হে ভুজঙ্গমে! আমার কথা মিথ্যা হইবার নহে, আমি অদ্যই এস্থান হইতে প্রস্থান করিব। আমিত পূর্ব্বেই তোমার সহিত এইরূপ নিয়ম করিয়াছিলাম। অতএব হে ভদ্রে। এত দিন তোমার নিকট পরমসুখে ছিলাম, এক্ষণে চলিলাম; আমি গমন করিলে তোমার ভ্রাতাকে বলিও সেই মুনি গমন করিয়াছেন এবং তুমিও মদীয় অদর্শনে শোকাভিভূতা হইও না।

তাঁহার এই দারুণ কথা শুনিয়া নাগ-স্বসা জরৎকারুর মুখ শুষ্ক হইল ও হৃদয় কম্পিত হইতে লাগিল। পরিশেষে তিনি ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক বাষ্পাকুললোচনে ও গদ্গদবচনে কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, হে ধর্মজ্ঞ। নিরপরাধে আমাকে পরিত্যাগ করিও না। আমি কখন অধর্মাচরণ করি নাই এবং প্রাণপণে আপনার প্রিয়কার্য্য ও হিতানুষ্ঠান করিয়া থাকি। ভ্রাতা যে অভিসন্ধি করিয়া আপনার হস্তে আমাকে সম্প্রদান করিয়াছেন, দুরদৃষ্টক্রমে আমি অদ্যাপিও তাহা প্রাপ্ত হইলাম না। তিনিই বা আমাকে কি বলিবেন? আমার জ্ঞাতিবর্গ মাতৃশাপে অভিভূত আছেন; আপনার ঔরসে আমার গর্তে একটি পুত্র জন্মিবে এবং ঐ পুত্র হইতে তাঁহাদিগের শাপমোচন হইবে, এই অভিপ্রেত, কৈ তাহারও ত কোন বিশেষ চিহ্ন দেখিতে পাইতেছি না। অতএব এক্ষণে যাহাতে তাঁহাদিগের ঐ মনোরথ নিষ্ফল না হয় তাহা সম্পাদন করুন। হে ভগবন্। আমি জ্ঞাতিবর্গের হিতসাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছি, আমার প্রতি প্রসন্ন হউন। এই অপরিস্ফুট গর্ভাধান'পূর্ব্বক নিরপরাধে আমাকে পরিত্যাগ করিয়া কোথায় গমন করিবেন? মহর্ষি জরৎকারু সহধর্মিণীর এইরূপ বাক্য শুনিয়া তৎকালোপযুক্ত অনুরূপ বচনে কহিলেন, হে সুভগে। তোমার গর্ভে পরম ধার্মিক বেদবেদাঙ্গপারগ অগ্নিকল্প এক ঋষি জন্মিবেন, এই বলিয়া অতি কঠোর তপশ্চরণে কৃতনিশ্চয় হইয়া সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

বাসুকি-গৃহে আস্তীকের জন্ম।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন। অনন্তর নাগদুহিতা ভ্রাতৃসন্নিধানে আগমন করিয়া স্বভর্তার গমনবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত নিবেদন করিলেন। তখন ভুজঙ্গরাজ বাসুকি অতিশয় অপ্রিয় সংবাদ শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি পরিতাপ পাইলেন এবং কহিলেন, ভদ্রে! আমি যে অভিপ্রায়ে তোমাকে জরৎকারুহস্তে সম্প্রদান করিয়াছিলাম, বোধ করি তুমি তাহা সম্যরূপে অবগত আছ। যদি তাঁহার ঔরসে তোমার সন্তান উৎপন্ন হয়, তাহা হইলে সর্পদিগের সবিশেষ উপকার দর্শিবে, অর্থাৎ ঐ পুত্র রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্র হইতে আমাদিগকে পরিত্রাণ করিবে; সর্ব্বলোক-পিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা, পূর্ব্বে দেবগণের নিকট এই কথা কহিয়াছিলেন, অতএব জিজ্ঞাসা করি, সেই মুনি হইতে তোমার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে কি না? আমার জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্য এই যে, জরৎকারুকে ভগিনী সম্প্রদান করা কতদূর সফল হইল জানিতে ইচ্ছা করি। নতুবা তোমাকে আমার এরূপ প্রশ্ন করা কোনক্রমেই ন্যায্য নহে, কিন্তু কি করি নিতান্ত গুরুতর কার্য্য বলিয়াই অগত্যা এরূপ অনুচিত প্রশ্ন করিতে হইল। তোমার ভর্তা তপস্যায় একান্ত অনুরক্ত ও নিতান্ত রোষপরবশ, বোধ করি আমি অনুনয় করিলেও তিনি প্রতিনিবৃত্ত হইবেন না। বরং আমাকে অভিসম্পাত করিলেও করিতে পারেন। এই নিমিত্ত আমি তাঁহার অনুগমন করিতে চাহি না। অতএব হে ভদ্রে! তোমার ভর্তৃবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত পরিচয় দিয়া আমার চিরপ্রোত হৃদয়শল্য উন্মুলিত কর।

জরৎকারু নাগরাজ বাসুকিকে আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, ভ্রাতঃ। সেই মহাত্মা যৎকালে গমন করেন, তখন আমি পুত্রের নিমিত্ত প্রার্থনা করিয়াছিলাম। তৎপরে "অস্তি” অর্থাৎ আমার ঔরসে তোমার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে, এই উত্তর দিয়া তিনি প্রস্থান করিলেন। আমি তাঁহাকে ভ্রমক্রমেও মিথ্যা কহিতে শুনি নাই, সুতরাং এরূপ বিষয়ে কখনই মিথ্যা কথা কহিবেন না। তিনি গমনকালে আমাকে কহিলেন, হে ভুজঙ্গমে। আমি নিষ্ক্রান্ত হইলে তুমি আমার নিমিত্ত সন্তাপ করিও না। অগ্নিসম-প্রদীপ্ত ও সূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী তোমার এক পুত্র উৎপন্ন হইবে। অতএব হে ভ্রাতঃ! এক্ষণে তোমার সেই মনোদুঃখ দূর হউক। বাসুকি "তথাস্তু” বলিয়া ভগিনী বাক্য স্বীকার করিলেন এবং আহ্লাদ-সাগরে মগ্ন হইয়া মধুর সম্ভাষণ, সম্মান ও প্রার্থনাধিক অর্থদানে তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিলেন।

অনন্তর সেই মহাপ্রভাবশালী গর্ব শুক্লপক্ষীয় শশধরের ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। পরে নাগ-ভগিনী জরৎকারু যথাকালে পিতৃ মাতৃ উভয় কুলের ভয়াপহারক দেবকুমার-সদৃশ এক কুমার প্রসব করিলেন। ঐ কুমার নাগরাজ-গৃহে অবস্থিত থাকিয়া প্রতিপালিত হইতে লাগিলেন এবং স্বীয় অসাধারণ বুদ্ধিবলে বাল্যকালেই ভৃগুনন্দন চ্যবনের নিকট নিখিল বেদ ও বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিলেন। তাঁহার গর্ভাবস্থানকালে ত্বদীয় পিতা "অস্তি” বলিয়া প্রস্থান করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত তিনি আস্তীক নামে বিখ্যাত হইলেন। বাসুকি অলৌকিক ধীশক্তিসম্পন্ন সেই বালককে পরম যত্নে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। তিনিও দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইয়া নাগকুলের আনন্দ বর্দ্ধন করিতে লাগিলেন।

পরীক্ষিতের চরিত্র বর্ণন।

শৌনক কহিলেন, রাজা জনমেজয় পিতার স্বর্গারোহণ-বৃত্তান্ত মন্ত্রিগণকে যেরূপে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, হে সূতনন্দন। তুমি এক্ষণে তাহা সবিস্তর কীর্ত্তন কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র! রাজা জনমেজয় যে প্রকারে মন্ত্রীদিগকে পিতার নিধনবার্তা জিজ্ঞাসা করেন এবং তাঁহারা যেরূপে সেই বৃত্তান্ত বর্ণন করেন, তাহা কহিতেছি, শ্রবণ করুন। একদা রাজা জনমেজয় স্বীয় মন্ত্রীদিগকে কহিলেন, হে অমাত্যগণ! তোমরা আমার পিতার নিধনবৃত্তান্ত সমুদায় জান, এক্ষণে আমি তোমাদিগের নিকট তাহা আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিয়া যথোচিত প্রতিবিধান চেষ্টা করিব। ধার্মিক ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন অমাত্যগণ মহারাজ জনমেজয়কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া কহিলেন, রাজন! আপনার পিতা মহাত্মা পরীক্ষিতের যেরূপ চরিত্র ও তিনি যে প্রকারে লোকান্তরে গমন করিয়াছেন, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। ধর্মাত্মা, প্রবলপরাক্রান্ত রাজা পরীক্ষিৎ মূর্ত্তিমান ধর্মের ন্যায় প্রজাপালনপূর্ব্বক ভগবতী ভূতধাত্রীকে রক্ষা করিতেন। ত্বদীয় অধিকারকালে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র-এই চারিবর্ণ স্ব স্ব ধর্মে অনুরক্ত ছিলেন। তিনি কাহারও দ্বেষ্টা ছিলেন না এবং তাঁহার প্রতিও কেহ বিদ্বেষ করিত না। তিনি প্রজাপতির ন্যায় সর্ব্বভূতে সমদর্শী ছিলেন এবং বিধবা, বিকলাঙ্গ, অনাথ, দীন, দরিদ্রদিগকে ভরণপোষণ করিতেন। ত্বদীয় কলেবর দ্বিতীয় শশধরের ন্যায় লোকের প্রিয়দর্শন ছিল। মহারাজ পরীক্ষিৎ শারদ্বত হইতে ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করেন ও ভগবান্ ভূতভাবন বাসুদেবের অতি প্রিয়পাত্র ছিলেন। প্রজাগণ সকলেই তাঁহার প্রতি সবিশেষ অনুরক্ত ছিল। কুরুকুল পরিক্ষীণ হইলে আপনার পিতা অভিমন্যুর ঔরসে উত্তরার গর্তে উৎপন্ন হয়েন; এই নিমিত্ত তাঁহার নাম পরীক্ষিৎ হইয়াছিল। তিনি রাজধর্মে সুনিপুণ, নীতিশাস্ত্রে পারদর্শী, জিতেন্দ্রিয়, মেধাবী এবং ষডুবর্গ-বিজেতা' ছিলেন। রাজাধিরাজ পরীক্ষিৎ ষষ্টিবর্ষ বয়ঃক্রম পর্যন্ত প্রজাপালন করিয়া সংসারলীলা সংবরণ করেন। ত্বদীয় নিধনকালে সকলেই শোকাভিভূত হইয়াছিলেন। তৎপরে আপনি কুলক্রমাগত এই রাজ্যতন্ত্র ধৰ্ম্মতঃ লাভ করিয়াছেন এবং অতি শৈশবাবস্থাতেই রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া সহস্র বৎসর প্রজাবর্গ শাসন করিতেছেন।

জনমেজয় কহিলেন, মদীয় পূর্ব্বপুরুষদিগের বিচিত্র চরিত্র পর্যালোচনা করিয়া দেখিলে বোধ হয়, এই বংশে এমত কোন রাজা ছিলেন না যে, তিনি প্রজাবর্গের প্রিয়কার্য্য সম্পাদন না করিতেন। অতএব আমার পিতা তথাবিধ রাজা হইয়াও কি প্রকারে বিনাশপ্রাপ্ত হইলেন, তাহা যথার্থরূপে বর্ণনা কর, আমি শ্রবণ করিতে বাসনা করি। রাজার প্রিয় হিতাভিলাষী মন্ত্রিগণ ত্বদীয় আদেশক্রমে পরীক্ষিতের নিধনবৃত্তান্ত যথাবৎ বর্ণন করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা কহিলেন, মহারাজ! আপনার পিতা পাণ্ডুরাজার ন্যায় অসাধারণ ধনুর্দ্ধর ও মৃগয়া-তৎপর ছিলেন। একদা তিনি আমাদিগের প্রতি সমস্ত সাম্রাজ্যের ভারার্পণ করিয়া মৃগয়ার্থ অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক শাণিত বাণদ্বারা একটি মৃগকে বিদ্ধ করিয়াছিলেন। বিদ্ধ করিয়া অস্ত্র শস্ত্র সহিত অতি সত্বর পদে তাহার অনুসরণে প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু পলায়িত বাণবিদ্ধ মৃগের কিছুই অনুসন্ধান করিতে পারিলেন না। তৎকালে তিনি যষ্টিবর্ষ বয়স্ক ও অতি জীর্ণকলেবর হইয়া-ছিলেন, এই নিমিত্ত অতি অল্পকালের মধ্যে একান্ত ক্লান্ত ও ক্ষুৎপিপাসায় নিতান্ত আক্রান্ত হইলেন। পরে ইতস্ততঃ পর্যাটন করিতে করিতে অরণ্যমধ্যে এক মুনিকে দেখিতে পাইলেন। ঐ মুনি মৌনব্রতাবলম্বনপূর্ব্বক একতানমনে ধ্যান করিতে-ছিলেন। রাজা তাঁহার নিকট উপনীত হইয়া মৃগের কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। কিন্তু তিনি কিছুই প্রত্যুত্তর করিলেন না। রাজা ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত ছিলেন, সুতরাং তিনি মুনিকে উত্তরদানে পরাজুখ দেখিয়া তৎক্ষণাৎ ক্রোধাবিষ্ট হইলেন এবং তাঁহাকে প্রতিবোধিত না করিয়া রোষাবেশ প্রকাশপূর্ব্বক ধরাতল হইতে ধনুষ্কোটিং দ্বারা এক মৃত সর্প উদ্ধৃত করিয়া সেই শুদ্ধচিত্ত মুনিবরের স্কন্ধদেশে নিক্ষেপ করিলেন। তথাপি তিনি কিছুই না বলিয়া অক্ষুব্ধ-চিত্তে মৃত সর্প স্কন্ধে ধারণপূর্ব্বক পূর্ব্ববৎ অবস্থিত রহিলেন।

জনমেজয়ের প্রতিজ্ঞা।

অমাত্যগণ কহিলেন, মহারাজ! ক্ষুৎপিপাসার্ত রাজা পরীক্ষিৎ এইরূপে সেই মুনির স্কন্ধে মৃত সর্প নিক্ষেপ করিয়া স্ব-নগরে প্রত্যাগমন করিলেন। উক্ত ঋষির মহাবীর্য্য-সম্পন্ন অতি কোপনস্বভাব শৃঙ্গী নামে এক গোগৰ্ব্ব-সম্ভূত পুত্র ছিলেন। ঋষিকুমার প্রজাপতির আরাধনান্তর ত্বদীয় অনুমতি লইয়া ব্রহ্মলোক হইতে ভূর্লোকে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক সখাসন্নিধানে নিজ পিতার অপমানবৃত্তান্ত শ্রবণ করিলেন। তাঁহার সখা কহিলেন, বয়স্য! তোমার পিতা একতানমনে ধ্যান করিতেছিলেন, এই অবসরে রাজা পরীক্ষিৎ আসিয়া অকারণে তাঁহার স্কন্ধদেশে এক মৃত সর্প নিক্ষেপপূর্ব্বক প্রস্থান করিয়াছেন। মহারাজ! শৃঙ্গী অল্পবয়স্ক হইয়াও প্রাচীনপ্রায় ছিলেন। তিনি সখামুখে নিজ পিতার এইরূপ অপমান-বৃত্তান্ত শ্রবণ করিবামাত্র ক্রোধে অধীর হইয়া আচমন পূর্ব্বক আপনার পিতাকে এই অভিসম্পাত করিলেন, “যে ব্যক্তি নিরপরাধে আমার পিতার স্কন্ধে মৃত সর্প নিক্ষেপ করিয়াছে, দুর্বিষহবীর্য্যসম্পন্ন' নাগরাজ তক্ষক আমার বাক্যানুসারে সপ্তাহের মধ্যে সেই পাপাত্মাকে ভস্মসাৎ করিবে”। ঋষি-কুমার এই অভিশাপ দিয়া সখাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বয়স্য! অদ্য আমার তপঃপ্রভাব দেখ। পরে শৃঙ্গী, পিতার নিকট আগমনপূর্ব্বক স্ব-দত্ত শাপবৃত্তান্ত সমুদায় নিবেদন করিলেন। তখন সেই সদাশয় মুনিবর নিরুপায় ভাবিয়া সুশীল গুণসম্পন্ন গৌরমুখনামক শিষ্যকে এই কথা বলিয়া আপনার পিতার নিকট প্রেরণ করিলেন, "আমার পুত্র আপনাকে অভিশাপ দিয়াছে, নাগরাজ তক্ষক আসিয়া সপ্তাহের মধ্যে স্বকীয় তেজঃদ্বারা আপনাকে দগ্ধ করিবে, অতএব হে মহারাজ! তুমি অদ্যাবধি সাবধান হও।" গৌরমুখ রাজগোচরে উপনীত হইয়া বিশ্রামান্তে ঋষিবাক্য আদ্যোপান্ত নিবেদন করিলেন। হে মহারাজ! আপনার পিতা এই ভয়ঙ্কর বাক্য শ্রবণ করিয়া তক্ষকের ভয়ে সতত সাবধানে রহিলেন।

অনন্তর সেই সপ্তম দিবস উপস্থিত হইলে মহর্ষি কাশ্যপ রাজার নিকট আগমন করিতেছিলেন। ব্রাহ্মণবেশধারী নাগরাজ তক্ষক পথিমধ্যে তাঁহার সন্দর্শন পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি এত সত্বরে কোথায় যাইতেছেন এবং কি মনে করিয়াই বা যাইতেছেন? মহর্ষি কাশ্যপ কহিলেন, হে দ্বিজ! শুনিলাম অদ্য নাগরাজ তক্ষক কুরুরাজ পরীক্ষিৎকে দংশন করিবেন, আমি তাঁহাকে আরোগ্য করিব বলিয়া অতি সত্বর তথায় গমন করিতেছি। আমি সম্মুখে থাকিলে তক্ষক তাহাকে দগ্ধ করিতে পারিবেন না। দ্বিজরূপী তক্ষক কহিলেন, মহর্ষে। আমিই সেই তক্ষক। আমি তাঁহাকে দংশন করিলে তুমি কিছুতেই প্রতীকার করিতে পারিবে না। বৃথা কেন কৰ্ম্মভোগ করিবে? তুমি আমার অদ্ভুত বীর্য্য দেখ, এই বলিয়া নাগরাজ পুরোবর্তী এক বটবৃক্ষে দংশন করিলেন। বনস্পতি দংশনমাত্রই ভস্মাবশেষ হইল; মহর্ষিও বিদ্যাবলে তৎক্ষণাৎ তাহাকে পুনর্জীবিত করিলেন। তখন তক্ষক বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কহিলেন, ঋষে! তুমি কি অভিলাষে তথায় গমন করিতেছ, এই বলিয়া তাঁহাকে নানা প্রকার প্রলোভন দেখাইতে লাগিলেন। কাশ্যপ প্রত্যুত্তর করিলেন, আমি ধন লাভের প্রত্যাশায় তথায় গমন করিতেছি। তক্ষক কহিলেন, রাজার নিকট যত ধনের আকাঙ্ক্ষায় যাইতেছ, আমি তদপেক্ষা অধিক দিতেছি, তুমি নিবৃত্ত হও। ত্বদীয় এতাদৃশ প্রমোদকর বাক্য শ্রবণ করিয়া কাশ্যপ আপনার অভিলাষা-নুরূপ অর্থ গ্রহণপূর্ব্বক প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। ব্রাহ্মণ নিবৃত্ত হইলে তক্ষক ছদ্মবেশে প্রবেশ করিয়া স্বীয় দুঃসহবিষবহ্নি দ্বারা প্রাসাদোপবিষ্ট ধার্মিকবর ত্বদীয় পিতাকে ভস্মাবশেষ করিলেন। তৎপরে আপনি পিতৃরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়াছেন। মহারাজ। এই নিদারুণ বৃত্তান্ত আমরা যেরূপ দর্শন ও শ্রবণ করিয়াছি, তাহা আদ্যোপান্ত সমুদায় নিবেদন করিলাম; এক্ষণে আপনার পিতার ও মহর্ষি উতঙ্কের পরাভব বিবেচনা করিয়া যাহা সমুচিত হয়, অবিলম্বে সম্পাদন করুন।

রাজা জনমেজয় পিতার লোকান্তর গমনবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে অমাত্যগণ। তক্ষক, যে বটবৃক্ষকে ভস্মসাৎ করিয়াছিল, কাশ্যপ তাহাকে পুনর্জীবিত করেন, এই অদ্ভুত কথা তোমরা কাহার নিকট শুনিয়াছিলে! বোধ হয় পন্নগাধম তক্ষক মনে মনে এই বিবেচনা করিয়াছিল যে, "আমি রাজাকে দংশন করিলে কাশ্যপ মন্ত্রবলে তাঁহার প্রাণরক্ষা করিতে পারিবেন সংশয় নাই; সুতরাং আমাকে সর্ব্বলোকের উপহাসা-স্পদ হইতে হইবে, অতএব এই ব্রাহ্মণকে পরিতুষ্ট করিয়া প্রতিনিবৃত্ত করাই শ্রেয়ঃকল্প।” সে যাহা হউক, এক্ষণে আমি এক উপায় অবধারণ করিয়াছি, তদ্দ্বারা তাহাকে সমুচিত প্রতি-ফল প্রদান করিব। কিন্তু বল দেখি, কাশ্যপ ও তক্ষকের এই অদ্ভুত বৃত্তান্ত নির্জন অরণ্যমধ্যে ঘটিয়াছিল, ইহা কে প্রত্যক্ষ করিয়াছে? এবং কি প্রকারেই বা তোমাদিগের কর্ণগোচর হইল? আমি এই সমস্ত বিষয় উত্তমরূপে জানিয়া সর্পকুল সংহার করিব।

মন্ত্রিগণ কহিলেন, মহারাজ! আমরা তক্ষক ও কাশ্যপের এই অদ্ভুত বৃত্তান্ত যাঁহার নিকট শুনিয়াছিলাম, শ্রবণ করুন। এক ব্রাহ্মণ শুষ্ক কাষ্ঠ আহরণ করিবার নিমিত্ত সেই বটবৃক্ষে আরোহণ করিয়াছিলেন। তক্ষক ও কাশ্যপ উভয়েই তাহা জানিতে পারেন নাই। তক্ষকের বিষানলে বৃক্ষের সহিত ঐ বালগের কলেবরও ভস্মাবশেষ হয়। কিন্তু কাশ্যপের অলৌকিক মন্ত্রবলে উভয়েই পুনর্জীবিত হইয়াছিল। পরে সেই ব্রাহ্মণ আসিয়া আমাদিগকে এই সংবাদ প্রদান করেন। মহারাজ! যে দেখিয়াছে ও আমরা যেরূপ শুনিয়াছি, তাহা নিবেদন করিলাম, এক্ষণে যাহা কর্তব্য হয় করুন।

তাহা শ্রবণ করিয়া রাজা জনমেজয় অতিশয় সন্তপ্ত হইলেন এবং রোষভরে করে কর পরিপেষণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর দীর্ঘ ও উষ্ণ নিঃশ্বাস ত্যাগ এবং অশ্রু-মোচনপূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বনে থাকিয়া মন্ত্রীদিগকে কহিলেন, হে অমাত্যগণ। পিতার পরাভববৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া যাহা অবধারণ করিলাম, বলিতেছি শ্রবণ কর। দুরাত্মা তক্ষক, শৃঙ্গীকে উপলক্ষ্যমাত্র করিয়া পিতার প্রাণহিংসা করিয়াছে। এক্ষণে তাহার সমুচিত প্রতিফল দিতে হইবে। যদি কাশ্যপ আসিতেন তাহা হইলে পিতা অবশ্যই বাঁচিতেন, কিন্তু তক্ষক এরূপ দুরাত্মা যে তাঁহাকে অর্থ দিয়া প্রতিনিবৃত্ত করিয়াছে। যদি পিতা কাশ্যপের প্রসাদে ও মন্ত্রীদিগের মন্ত্রণাবলে জীবন লাভকরিতেন, তাহাতে তক্ষকের কি ক্ষতি হইত? তাহার এ অত্যাচার আর কিছুতেই সহ্য হয় না। অতএব এক্ষণে আমি, আমার, আপনার, তোমাদিগের ও উতঙ্কের সন্তোষের নিমিত্ত পিতার বৈরনির্য্যাতনে দৃঢ়নিশ্চয় করিলাম।

জনমেজয়ের সর্পসত্রের অনুষ্ঠান।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, রাজা জনমেজয় এই কথা বলিয়া মন্ত্রিগণের অনুমোদনক্রমে সর্পবংশ ধ্বংস করিতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। পরে স্বীয় পুরোহিতদ্বারা ঋত্বিগণকে আহ্বান করিয়া আপন কার্য্যের অনুকূল এই বাক্য বলিলেন, "দুরাত্মা তক্ষক আমার পিতার প্রাণ হিংসা করিয়াছে, এক্ষণে আমি তাহার প্রতীকার করিতে অভিলাষ করি, আপনারা অনুমতি করুন। হে মহাশয়গণ! আপনাদের এমন কোন কৰ্ম্ম বিদিত আছে, যদ্দ্বারা আমি সেই দুরাত্মাকে ও তাহার বন্ধুবান্ধবদিগকে প্রজ্বলিত হুতাশনে নিক্ষেপ করিয়া সবংশে ধ্বংস করিতে পারি? সে যেমন আমার পিতাকে তীব্র বিষাগ্নিতে দগ্ধ করিয়াছে, তদ্রূপ আমিও সেই পাপাত্মাকে ভস্মসাৎ করিব।" ঋত্বিকগণ কহিলেন, মহারাজ! পুরাণে বর্ণিত আছে, দেবতারা তোমার নিমিত্ত সর্পসত্র নামে এক অতি মহৎ সত্র সৃষ্টি করিয়াছেন। পৌরাণিকেরা কহিয়া থাকেন, আপনি ব্যতীত সেই যজ্ঞের অনুষ্ঠানকর্তা আর কেহই নাই। সেই যজ্ঞের অনুষ্ঠান প্রণালীও আমাদিগের বিদিত আছে, অতএব আপনি সর্পসত্র আরম্ভ করুন; তাহাতেই দুরাত্মা তক্ষকের বিনাশ হইবে, সন্দেহ নাই। রাজর্ষি এই বাক্য শ্রবণ করিবামাত্র বোধ করিলেন যেন তক্ষক প্রজ্বলিত হুতাশনে দগ্ধ হইয়াছে। পরে মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণদিগকে কহিলেন, আমি সেই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিব, আপনারা আদেশ করুন, কিরূপ যজ্ঞীয় দ্রব্যসামগ্রী আহরণ করিতে হইবে? তখন বেদজ্ঞ ও বিচক্ষণ ঋত্বিগণ শাস্ত্রানুসারে যজ্ঞভূমির পরিমাণ করিয়া মহামূল্য রত্নসমূহে ও প্রভূত ধনধান্যে সেই যজ্ঞায়তন পরিপূরিত করিলেন। ঋত্বিগণ এইরূপে যজ্ঞভূমি প্রস্তুত করাইয়া সেই সত্রে আপনারা ব্রতী হইলেন এবং রাজাকে যথাবিধি দীক্ষিত করিলেন, কিন্তু যজ্ঞারম্ভের পূর্ব্বেই যজ্ঞবিঘ্নকর এক মহৎ ব্যাপার উপস্থিত হইয়াছিল। যজ্ঞায়তন নির্মাণকালে এক জন বাস্তুবিদ্যাবিশারদ' পুরাণবেত্তা সূত্রধার তথায় উপস্থিত হইয়া কহিলেন, "যে প্রদেশে ও যে সময়ে যজ্ঞায়তনের পরিমাণ করা হইয়াছে, তদ্দ্বারা বোধ হইতেছে যে, একজন ব্রাহ্মণ হইতে এই যজ্ঞের ব্যাঘাত জন্মিবে।" রাজা এই কথা শ্রবণ করিয়া দীক্ষিত হইবার পূর্ব্বেই দ্বারপালকে আজ্ঞা করিয়াছিলেন, "যেন আমার অজ্ঞাতসারে কোন ব্যক্তি এখানে প্রবিষ্ট হইতে না পারে।"

নাগগণের বহ্নিতে প্রবেশ।

তদনন্তর বিধানানুসারে সর্পসত্র আরদ্ধ হইল। পুরোহিত-গণ স্ব স্ব কৰ্ম্মে নিযুক্ত হইয়া কৃষ্ণবর্ণ বসনযুগল পরিধান ও মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক বহ্নিতে আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন। অনবরত ধূমসম্পর্কে তাঁহাদিগের চক্ষুঃ রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। সর্পগণের নামোল্লেখপূর্ব্বক আহুতি দিতে আরম্ভ করিলে, তাহাদিগের হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। পরে নাগগণ নিতান্ত ব্যাকুল ও একান্ত অস্থির হইয়া ঘন ঘন নিঃশ্বাস পরিত্যাগ এবং পরস্পর মস্তক লাঙ্গুলদ্বারা বেষ্টন করিয়া সকরুণস্বরে পরস্পরকে আহ্বান করিতে করিতে সেই প্রদীপ্ত হুতাশনে অনবরত পতিত হইতে লাগিল। শ্বেতবর্ণ, নীলবর্ণ, কৃষ্ণবর্ণ, বালক, বৃদ্ধ, যুবা, ক্রোশ প্রমাণ, যোজন' প্রমাণ, অশ্বাকার, করিশুণ্ডাকার, মহাকায়, মহাবল পরাক্রান্ত, শত শত, সহস্র সহস্র, প্রযুত প্রযুত, অর্বুদ অর্বুদ, বহুবিধ মহাবিষ বিষধরগণ মাতৃশাপদোষে অবশ হইয়া সেই প্রজ্বলিত হুতবহ-মুখে পতিত হইতে লাগিল।

যজ্ঞে ঋত্বিক্সণের নাম এবং বাসুকির খেদ।

শৌনক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে সূতাত্মজ। সর্পকুল-সংহর্তা কুরুবংশাবতংশ রাজা জনমেজয়ের সেই সর্পসত্রে কোন্ কোন্ ঋষি ঋত্বিক্ হইয়াছিলেন এবং নাগগণের বিষাদজনক সেই দারুণ যজ্ঞে কোন্ কোন্ ঋষিই বা সদস্য হইয়াছিলেন? হে বৎস! তুমি তৎসমুদায় বর্ণন কর। তাহা হইলে আমি সর্পসত্র বিধানজ্ঞ মহর্ষিগণের নাম জানিতে পারিব। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, রাজা জনমেজয়ের যজ্ঞে যে সকল মনীষিগণ ঋত্বিক্ ও সদস্য ছিলেন, তাঁহাদিগের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। অসাধারণ বেদবেত্তা চ্যবনবংশীয় সুবিখ্যাত চণ্ডভার্গব সেই মহাযজ্ঞে হোতা ছিলেন। বৃদ্ধ সুবিদ্বান্ কৌৎস উদ্‌দ্গাতা এবং জৈমিনি ব্রহ্মা ছিলেন। আর পিঙ্গল, অসিত, দেবল, নারদ, পর্ব্বত, আত্রেয়, কুণ্ডজঠর, কালঘট, বাৎস্য, শ্রুতশ্রবাঃ, কোহল, দেবশর্মা, মৌদগল্য, সমসৌরভ প্রভৃতি অনেক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ-সকল তাহাতে সদস্য হইয়াছিলেন। ইঁহারা সকলে সেই সুমহান্ সর্পসত্রে আহুতি প্রদান করিতে আরম্ভ করিলে, অতি ভীষণাকার সর্পসকল প্রজ্বলিত হোমানলে পতিত ও বিনষ্ট হইতে লাগিল। তাহাদিগের বসা ও মেদঃ দ্বারা শত শত কৃত্রিম সরিৎ প্রবাহিত হইল এবং পৃতিগন্ধে চারিদিক্ ব্যাপ্ত হইয়া উঠিল। অনলে পতিত ও পতনোন্মুখ গগনস্থ নাগগণের তুমুল আর্তনাদে সেই প্রদেশ প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। নাগেন্দ্র তক্ষক রাজা জনমেজয়কে সত্রে দীক্ষিত শুনিয়া তৎক্ষণাৎ ইন্দ্রালয়ে গমন করিল এবং আত্মদোষের পরিচয় দিয়া পুরন্দরের শরণাগত হইল। দেবরাজ প্রসন্ন হইয়া তক্ষককে কহিলেন, নাগেন্দ্র! তুমি ভীত হইও না, আমি তোমার নিমিত্ত পূর্ব্বেই পিতামহকে প্রসন্ন করিয়াছি, অতএব আর তোমার ভয়ের বিষয় কি? মনোদুঃখ দূর কর।

উগ্রশ্রবাঃ শৌনককে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! নাগেন্দ্র এই-রূপে আশ্বাসিত হইয়া ইন্দ্রালয়ে পরমসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। এদিকে সর্পকুল ক্রমে ক্রমে ভস্মাবশিষ্ট হইতেছে দেখিয়া, স্বজনহিতৈষী বাসুকি বন্ধুবান্ধবগণের বিরহে সাতিশয় কাতর, উদ্‌ভ্রান্তচিত্ত ও ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছিত হইতে লাগিলেন। অনন্তর নাগরাজ পরিবারবর্গের অত্যল্প-মাত্র অবশিষ্ট আছে দেখিয়া নিজ ভগিনীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভদ্রে! আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গসকল শোকানলে দগ্ধ হইতেছে, শরীর অবসন্ন ও দশদিক্ শূন্য বোধ হইতেছে, মন ও নয়ন নিতান্ত উদ্‌ভ্রান্ত হইতেছে এবং হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। অধিক কি কহিব, বোধ হয় বুঝি অদ্যই আমাকে সেই প্রদীপ্ত দহনে দেহ সমর্পণ করিতে হইল। রাজা জনমেজয় আমাদিগকে সবংশে ধ্বংস করিবার নিমিত্তই সর্পসত্র আরম্ভ করিয়াছেন, সুতরাং আমাকেও যমসদনে গমন করিতে হইবে, সন্দেহ নাই। হে ভগিনী। আমি যে অভিপ্রায়ে তোমাকে জরৎকারুহস্তে প্রদান করিয়াছিলাম, এক্ষণে তাহার সময় উপস্থিত, অতএব আমাদিগের প্রাণ রক্ষা করিয়া সেই চিরাকাঙ্ক্ষিত মনোরথ পরিপূর্ণ কর। পূর্ব্বে পিতামহের মুখে শ্রবণ করিয়াছি, আস্তীক জনমেজয়ের সর্পসত্র নিবারণ করিবেন; অতএব হে বৎসে! অধুনা তুমি আমার ও আমার পরিজনবর্গের জীবনরক্ষার্থ অদ্বিতীয় বেদবেত্তা আপন পুত্রকে আদেশ কর।

আস্তীকের প্রতি মাতার আদেশ ও আস্তীকের সর্পযজ্ঞে গমন।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর নাগরাজ-ভগিনী জরৎকারু স্বীয় সন্তান আস্তীককে আহ্বান করিয়া বাসুকির বাক্যানুসারে কহিলেন, পুত্র! আমার ভ্রাতা যে অভিপ্রায়ে আমাকে তোমার পিতৃহস্তে প্রদান করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহার সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব যাহা কর্তব্য হয় কর। আস্তীক কহিলেন, মাতঃ! মাতুল কি নিমিত্ত আপনাকে মদীয় পিতার হস্তে প্রতিপাদন' করিয়াছিলেন আজ্ঞা করুন, জানিয়া প্রতিবিধান করিতেছি। তখন বান্ধব হিতৈষিণী নাগভগিনী কহিলেন, বৎস! শ্রবণ কর, সর্পকুল-জননী কদ্রু, সপত্নী বিনতাকে পরাস্ত করিয়া দাসীত্ব-শৃঙ্খলে বদ্ধ করিবেন, এই অভিসন্ধিতে আপন পুত্রদিগকে আদেশ করেন, তোমরা সত্বর যাইয়া উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্বের অঙ্গবেষ্টন করিয়া থাক, তাহা হইলে অশ্বাধিপের শুভ্রবর্ণ তিরোহিত হইয়া কৃষ্ণবর্ণ হইবে। কিন্তু তন্মধ্যে কেহ কেহ মাতৃআজ্ঞায় অসম্মতি প্রকাশ করাতে কদ্র ক্রোধভরে তাহা-দিগকে এই বলিয়া অভিসম্পাত করিলেন; "তোমরা আমার আজ্ঞা লঙ্ঘন করিলে, অতএব এই অপরাধে রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্রে দগ্ধ ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইবে।" সর্ব্বলোক-পিতামহ ব্রহ্মাও "তথাস্তু” বলিয়া সেই শাপবাক্যে অনুমোদন করেন। নাগরাজ বাসুকি প্রজাপতির সেই অনুমোদন বাক্য শ্রবণ করিয়া-ছিলেন। অনন্তর তিনি সমুদ্রমন্থনকালে ক্ষমা প্রার্থনা বাসনায় দেবগণের শরণাগত হইলেন। দেবগণ দুর্লভ অমৃতলাভে হৃষ্টচিত্ত হইয়া আমার ভ্রাতাকে সঙ্গে লইয়া ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইলেন এবং নানা প্রকার স্তুতিবাক্যে কমলযোনিকে প্রসন্ন করিয়া কহিলেন, ভগবন্। ইনি নাগরাজ বাসুকি, ইনি জ্ঞাতি-বর্গের নিমিত্ত অত্যন্ত কাতর হইয়াছেন, এক্ষণে কিরূপে মাতৃ-শাপ হইতে মুক্ত হইতে পারেন, আজ্ঞা করুন।

ব্রহ্মা কহিলেন, জরৎকারু মুনি জরৎকারুনাম্নী যে স্ত্রীর পাণিগ্রহণ করিবেন, তাঁহার গর্ভে এক সন্তান উৎপন্ন হইবেন, তিনিই সর্পগণকে মাতৃশাপ হইতে মোচন করিবেন। নাগরাজ বাসুকি এই কথা শ্রবণ করিয়া সর্পসত্র আরম্ভের কিয়ৎকাল পূর্ব্বে আমাকে তোমার পিতার হস্তে সম্প্রদান করেন, হে বৎস! তাহাতেই তুমি আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছ। অধুনা সেই অভীষ্ট-সিদ্ধির সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব আসন্ন বিপদ্ হইতে মাতুলকুলের পরিত্রাণ করিয়া নাগরাজের আশালতা ফলবতী কর।

আস্তীক "যে আজ্ঞা” বলিয়া জননীর আদেশ গ্রহণ করিলেন এবং নানা প্রকার প্রবোধবাক্যে বাসুকিকে আশ্বাসিত করিয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গেশ্বর! আমি নিশ্চয় বলিতেছি, তোমার শাপমোচন করিব এবং যাহাতে তোমার মঙ্গল হয় তদ্বিষয়ে সর্ব্বতোভাবে যত্ন করিব। আর ভীত বা দুঃখিত হইবার কোন প্রয়োজন নাই। আমি ভ্রমক্রমেও কদাপি মিথ্যা প্রয়োগ করি না। হে মাতুল! আমি অদ্যই সেই দীক্ষিত রাজা জনমেজয়ের নিকট গমন করিয়া আশীর্ব্বাদাদি দ্বারা তাঁহাকে পরিতুষ্ট করিব এবং যাহাতে যজ্ঞানুষ্ঠান রহিত হয়, তাহা করিব। আপনি আমার বাক্যে কিছুমাত্র সংশয় করিবেন না নিশ্চিন্ত থাকুন।

বাসুকি কহিলেন, বৎস আস্তীক! আমি ব্রহ্মার এই গুরুতর দণ্ডের ভয়ে হতজ্ঞান হইয়াছি, দশদিক্ শূন্য দেখিতেছি এবং আমার হৃদয় উদ্‌ঘূর্ণিত হইতেছে। তখন আস্তীক কহিলেন, আপনি সন্তাপ পরিত্যাগ করুন, আমি নিশ্চয় বলিতেছি, অচিরাৎ সেই প্রচণ্ড ব্রহ্মদণ্ডের নিরাকরণ করিব। আস্তীক এইরূপ আশ্বাসবচনে বাসুকির মনোদুঃখ দূর করিয়া স্বয়ং সমস্ত ভার গ্রহণপূর্ব্বক সর্পগণের পরিত্রাণার্থ রাজা জনমেজয়ের সেই সর্ব্বাবয়বসম্পন্ন যজ্ঞে উপনীত হইলেন। তিনি তথায় যাইয়া দেখিলেন, যজ্ঞভূমি সূর্য্যকল্প ও অগ্নিকল্প সদস্যগণে অলঙ্কৃত হইয়াছে। তপোধন তদ্দর্শনে প্রীত হইয়া সেই স্থানে প্রবেশ করিতে বাসনা করিলেন। দ্বারপালগণ প্রবেশ করিতে না দেওয়াতে তিনি সেই যজ্ঞের নানা প্রকার গুণকীর্ত্তন করিতে লাগিলেন। অনন্তর যজ্ঞভূমিতে উপনীত হইয়া চতুষ্পার্শ্ববর্তী সূর্য্যসদৃশ ঋত্বিক্ ও সদস্যগণের এবং রাজার ও হোমাগ্নির স্তব করিতে লাগিলেন।

আস্তীককর্তৃক জনমেজয়ের প্রশংসা।

আস্তীক কহিলেন, হে ভারতবংশাবতংস! চন্দ্র, বরুণ ও প্রজাপতি প্রয়াগে যে প্রকার যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন, আপনার এই মহাযজ্ঞও তদ্রূপ সর্ব্বাঙ্গসুন্দর হইয়াছে, কিন্তু হে পরীক্ষিতা-ত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। দেবরাজ ইন্দ্র একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ করিয়াছেন, আপনার এই সর্পসত্র তত্ত্বল্য এক অযুত অশ্বমেধের সদৃশ, কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। যম, হরিমেধাঃ ও রন্তিদেব রাজার যজ্ঞ যেরূপ হইয়াছিল, আপনার যজ্ঞও তদ্রূপ হইয়াছে, কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। গয়রাজা, শশবিন্দুরাজা, বৈশ্রবণ', নৃগরাজা, আজমীঢ় রাজা এবং রামরাজা যেরূপ যজ্ঞ করিয়াছিলেন, আপনার এই যজ্ঞও তৎসদৃশ হইয়াছে। কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির ও আজমীঢ় রাজার যজ্ঞ অতি সুপ্রসিদ্ধ, আপনার এই যজ্ঞ তদপেক্ষা ন্যূন নহে, কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক। সত্যবতীর পুত্র ব্যাসদেব এক মহাসত্র করিয়াছিলেন, সেই সত্রে তিনি স্বয়ং ঋত্বিকের কৰ্ম্ম করেন, আপনার এই সর্পসত্রও তদনুরূপ হইয়াছে, কিন্তু হে পরীক্ষিতাত্মজ! আমি প্রার্থনা করি, আমার বন্ধুবর্গের মঙ্গল হউক।

আপনার যজ্ঞানুষ্ঠাতা এই সকল সূর্য্যসমতেজাঃ মহর্ষিগণ | ইন্দ্রের যজ্ঞানুষ্ঠান-কর্তাদিগের সদৃশ, ইঁহাদিগের জ্ঞানের ইয়ত্তা করা অতি দুষ্কর, ইঁহাদিগকে দান করিলে অক্ষয় হয়। আপনার এই ঋত্বিকের কথা অধিক কি বলিব, ব্যাসদেব কহিয়াছেন, ইঁহার সমান লোক ত্রিলোকে লক্ষ্য হয় না, ইহারই শিষ্যোপশিষ্যগণ স্বধর্মে নিরত হইয়া এই ভূমণ্ডল ব্যাপিয়া আছেন। আপনার এই প্রজ্বলিত হোমাগ্নি দক্ষিণাবর্ত শিখাদ্বারা দেবোদ্দেশে প্রদত্ত হব্য গ্রহণ করিতেছেন। মহারাজ! আপনার সমান প্রজাপালনকর্তা ভূপাল অতি বিরল। আপনি সাক্ষাৎ ধর্মরাজ, বরুণ ও ভগবান্ বজ্রপাণির' ন্যায় এই ভূমণ্ডল রক্ষা করিতেছেন। আর আপনার বিষয়-নিস্পৃহতা দেখিয়া আমি যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইয়াছি। আপনি খট্টাঙ্গ, নাভাগ, দিলীপ, যযাতি, মান্ধাতা ও ভীষ্ম প্রভৃতি রাজেন্দ্রগণের সদৃশ, মহর্ষি বাল্মীকির ন্যায় নিগূঢ়-মহত্ত্ব, বশিষ্ঠের ন্যায় জিতক্রোধ, ইন্দ্রের ন্যায় প্রভুত্বশালী, নারায়ণের ন্যায় কান্তিসম্পন্ন, ঔর্ব্ব, ত্রিত দুই ঋষির ন্যায় তেজস্বী, যমের নায়ে ধৰ্ম্মনিয়ন্তা এবং কৃষ্ণের ন্যায় সর্ব্বগুণালঙ্কৃত। আপনি যেমন অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিপতি, তদ্রুপ যাগাদি সৎক্রিয়ার পথপ্রদর্শক। মহারাজ! অধিক কি বলিব, ধৈর্য্য, বীর্য্য গাম্ভীর্য্য, প্রভৃতি যে সকল সদ্গুণ প্রভাবে লোকে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করিতে পারে এবং রামাদির ন্যায় চিরস্বণীয় হইতে পারে, আপনি সেই সমস্ত গুণরাশিতে বিভূষিত হইয়াছেন। আস্তীক এইরূপ স্তুতিবাদদ্বারা নৃপতি, সদস্য, ঋত্বিক্ ও হব্যবাহ' প্রভৃতি সকলকেই প্রসন্ন করিলেন। অনন্তর রাজা জনমেজয় আকার ও ইঙ্গিত দ্বারা তাঁহাদিগের সকলের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া কহিতে লাগিলেন।

ইন্দ্রের শরণাগত তক্ষক এবং নাগকুল রক্ষার্থে বর প্রার্থনা।

জনমেজয় কহিলেন, ইনি বালক কিন্তু ইঁহার যেরূপ অভিজ্ঞতা দেখিতেছি, তাহাতে বালক বলিয়া কোনক্রমে প্রতীতি হয় না। যাহা হউক, আমি ইঁহার অভিলষিত বর প্রদান করিতে ইচ্ছা করি, হে দ্বিজগণ! আপনাদিগের কি অনুমতি হয়? সদস্যগণ কহিলেন, মহারাজ! ব্রাহ্মণ বালক হইলেও রাজাদিগের পূজনীয় সন্দেহ নাই। বিশেষতঃ ইনি সর্ব্বশাস্ত্রে মহামহোপাধ্যায়, অতএব তক্ষক ব্যতিরেকে আর যাহা প্রার্থনা করিবেন, তাহাই পাইতে পারেন। অনন্তর রাজা ব্রাহ্মণকে বর প্রদান করিতে উদ্যত হইলে হোতা কিঞ্চিৎ অসন্তোষ প্রকাশপূর্ব্বক তাঁহাকে কহিলেন, মহারাজ। তক্ষক অদ্যাপিও এই যজ্ঞাঙ্গনে উপস্থিত হইল না। তখন জনমেজয় কহিলেন, যাহাতে আমার ক্রিয়া সুসম্পন্ন হয় এবং সেই বিষম শত্রু তক্ষক শীঘ্র সমুপস্থিত হয়, তদ্বিষয়ে আপনারা যথাসাধ্য যত্নবান্ হউন। ঋত্বিক্সণ উত্তর করিলেন, আমরা শাস্ত্রপ্রভাবে ও অগ্নির মাহাত্ম্যে জানিতে পারিয়াছি, তক্ষক ইন্দ্রের শরণাগত হইয়া তথায় অবস্থিতি করিতেছে। পৌরাণিক মহাত্মা লোহিতাক্ষ সূতও এই কথা কহিয়াছিলেন। রাজা তৎশ্রবণে সূতকে জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি কহিলেন রাজন! ঋত্বিকেরা যাহা কহিতেছেন, তদ্বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। আমি পুরাণে অবগত হইয়াছি যে, তক্ষক প্রাণভয়ে ভীত হইয়া দেবরাজের শরণাগত হইয়াছে। সুররাজ এই বলিয়া তাহাকে অভয় প্রদান করিয়াছেন, "তুমি অতি গোপনে আমার ভবনে বাস কর, অগ্নি তোমাকে দগ্ধ করিতে পারিবেন না।” রাজা সূতবাক্য শ্রবণে অত্যন্ত বিষণ্ণ হইয়া হোতাকে নিবেদন করিলেন, মহাশয়! আপনি ইন্দ্রের আরাধনা করুন। হোতা তদনুসারে দেবরাজের আরাধনা আরম্ভ করিলে, অমরেন্দ্র বিমানে আরোহণ করিয়া তৎক্ষণাৎ অমরনগরী হইতে যাত্রা করিলেন। চতুৰ্দ্দিকে দেবতারা স্তুতিপাঠ করিতে লাগিলেন। মেঘমালা, বিদ্যাধরগণ ও অপ্সরোগণ তাঁহার অনুগমন করিল। তক্ষক প্রাণভয়ে ভীত ও সঙ্কুচিত হইয়া দেবরাজের উত্তরীয় বস্ত্রে লুক্কাইত হইল। এদিকে রাজা ক্রুদ্ধ হইয়া আজ্ঞা করিলেন, যদি সেই দুরাত্মা তক্ষক ইন্দ্রের নিকট পলায়ন করিয়া লুক্কায়িত থাকে, তবে ইন্দ্রের সহিত তাহাকে অগ্নিসাৎ কর। হোতা রাজাজ্ঞা পাইয়া তক্ষককে উল্লেখ করিয়া অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিবামাত্র নাগেন্দ্র কম্পিত-কলেবর হইয়া ইন্দ্র-সমভিব্যাহারে আকাশপথে উপস্থিত হইল। ইন্দ্র সেই যজ্ঞের আড়ম্বর দর্শনে ভীত হইয়া তক্ষককে পরিত্যাগপূর্ব্বক স্ব-স্থানে প্রস্থান করিলেন। তখন ভয়বিহ্বল তক্ষক ঋত্বিৰ্গণের মন্ত্রপ্রভাবে অবশেন্দ্রিয় হইয়া ক্রমে ক্রমে প্রজ্বলিত পাবক-শিখার সমীপবর্তী হইল।

ঋত্বিকেরা তক্ষককে সমাগত দেখিয়া কহিলেন, মহারাজ! আর চিন্তা নাই, তক্ষক আপনার বশংবদ হইয়াছে। বোধ হয় ইন্দ্র উহাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন। ঐ দেখুন সেই পন্নগেন্দ্র আমাদিগের মন্ত্রপ্রভাবে বিকলেন্দ্রিয় ও বিচেতন-প্রায় হইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে আর্তনাদ করিতে করিতে ঘূর্ণিতকলেবরে স্বর্গ হইতে আকাশপথে আগমন করিতেছে; অতএব আপনার অভীষ্ট সিদ্ধির আর বিলম্ব নাই। এক্ষণে দ্বিজবরে বর প্রদান করুন। রাজা প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, হে ব্রাহ্মণকুমার! অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। প্রার্থিত বিষয় অদেয় হইলেও আমি তাহাতে পরাম্মুখ হইব না।

জনমেজয়ের নিকট আস্তীকের প্রার্থনা।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! তক্ষকের অনলে পতিত হইবার অব্যবহিত পূর্ব্বেই আস্তীক কহিলেন, হে নরেন্দ্র! যদ্যপি আমাকে বর প্রদান করেন, তবে এই বর দিন যে, আপনার এই যজ্ঞ নিবৃত্ত হউক এবং ইহাতে যেন আর সর্পেরা দগ্ধ না হয়। ইহা শ্রবণ করিয়া রাজা জনমেজয় অনতিহৃষ্টমনে প্রত্যুত্তর করিলেন, আপনি সুবর্ণ, রজত, গো প্রভৃতি যে কোন বস্তু প্রার্থনা করিবেন, আমি অবিলম্বে প্রদান করিতেছি, কিন্তু যজ্ঞানুষ্ঠানে নিবৃত্ত হইতে পারিব না। আস্তীক কহিলেন, মহারাজ! আমি সুবর্ণ, রজত, গো, অশ্বাদির নিমিত্ত আপনার নিকট আসি নাই। মাতুলকুলের হিতার্থে আপনার নিকট অর্থিভাবে' আসিয়াছি। অতএব যদি সেই অভিলষিত অর্থসাধনে কৃতকাৰ্য্য হইতে না পারিলাম, তবে রজত সুবর্ণাদি লইয়া কি করিব? আস্তীকের এইরূপ অতর্কিতচর' বর প্রার্থনায় রাজা বিষাদসাগরে নিমগ্ন হইলেন এবং বরান্তর দিবার নিমিত্ত পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাঁহাকে ব্যবসায় হইতে বিচলিত করিতে পারিলেন না। তদনন্তর বেদজ্ঞ সদস্যেরা একবাক্যে কহিলেন, মহারাজ! পূর্ব্বে অঙ্গীকার করিয়াছেন, অতএব বর প্রদান করা আপনার সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য।

ভস্মীভূত নাগগণ।

শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন। যে সকল সর্প সর্পসত্রে দগ্ধ হইয়াছে তাহাদিগের নামোল্লেখ কর, আমি শুনিতে অভিলাষ করি। উগ্রশ্রবাঃ উত্তর করিলেন, হে দ্বিজোত্তম! সেই যজ্ঞে সহস্র সহস্র, প্রযুত প্রযুত; অর্বুদ অর্বুদ সর্পগণ বিনষ্ট হইয়াছে। বাহুল্য প্রযুক্ত সকলের নামোল্লেখ করা অসাধ্য বোধ হইতেছে। তথাপি স্মৃতি অনুসারে কতিপয় বিষোদ্বণ' প্রধান প্রধান সর্পের নাম করিতেছি, শ্রবণ করুন। পূর্ণ, শল, পাল, হলীমক, পিচ্ছল, কৌণপ, চক্র, কালবেগ, প্রকালন, হিরণ্যবাহু, শরণ, কক্ষক, কালদন্তক, ইহারা বাসুকির পুত্র; এই সকল সর্প এবং বাসুকির কুলজাত মহাবল-পরাক্রান্ত সহস্র সহস্র ভয়ঙ্কর সর্প মাতৃশাপে দগ্ধ হইয়াছে। পুচ্ছাণ্ডক, মণ্ডলক, পিণ্ডসেক্তা, রভেণক, উচ্ছিখ, শরভ, ভঙ্গ, বিল্বতেজাঃ, বিরোহণ, শিলী, শলকর, মুক, সুকুমার, প্রবেপন, মুদ্গর, শিশুরোমা, সুরোমা, মহাহনু, ইহারা তক্ষকের বংশজাত; এই সকল বিষধর প্রদীপ্ত দহনে দগ্ধ হইয়াছে। পারাবত, পারিজাত, পাণ্ডর, হরিণ, কৃষ, বিহঙ্গ, শরভ, মেদ, প্রমোদ, সংহতাপন, ইহারা ঐরাবতকুলে জাত; এই সমস্ত নাগগণ অনলে প্রবেশ করিয়াছে। এরক, কুণ্ডল, বেণী, বেণীস্কন্ধ, কুমারক, বাহুক, শৃঙ্গবের, ধূর্ত্তক, প্রাতরাতক, কৌরবকুলোৎপন্ন এই সকল সর্প ভস্মসাৎ হইয়াছে। শঙ্কুবর্ণ, পিঠরক, কুঠার, মুখসেচক, পূর্ণাঙ্গদ, পূর্ণমুখ, প্রহাস, শকুনি, দরি, অমাহঠ, কামঠক, সুষেণ, মানস, ব্যয়, ভৈরব, মুণ্ডবেদাঙ্গ, পিশঙ্গ, উদ্রপারক, ঋষভ, পিণ্ডাকর, রক্তাঙ্গ, সর্ব্বসারঙ্গ, সমৃদ্ধ, পঠবাসক, বরাহক, বীরণক, সুচিত্র, চিত্রবেগিক, পরাশর, তরুণক, মণিস্কন্ধ, অরুণি, ধৃতরাষ্ট্রকুলজাত এই সকল নাগগণ ভস্মীভূত হইয়াছে। বাহুল্য প্রযুক্ত ইহাদিগের পুত্র পৌত্রের নাম করিতে পারিলাম না। এতদ্ব্যতিরিক্ত ত্রিশিরাঃ, সপ্তশিরাঃ, দশমুণ্ড, মহাবেগবান, পর্ব্বতাকার, যোজনবিস্তীর্ণ, দ্বিযোজন-বিস্তীর্ণ, কামবল, কামরূপী, অতি ভয়ঙ্কর, নানাপ্রকার মহাবিষ বিষধরগণ প্রজাপতির শাপদণ্ডে নিপীড়িত হইয়া অনবরত প্রদীপ্ত দহনে দেহত্যাগ করিয়াছে।

সর্পযজ্ঞ সমাপন ও আস্তীকের প্রত্যাগমন।

উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! অধুনা আস্তীকের আর এক অত্যদ্ভুত উপাখ্যান শ্রবণ করুন। দেবরাজ হস্ত হইতে ভ্রষ্ট নাগরাজ তক্ষক অতিমাত্র ভীত হইয়া প্রজ্বলিত হুতাশনে পতিত হইতেছে না দেখিয়া রাজা জনমেজয় নিতান্ত চিন্তাকুল হইলেন। শৌনক জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস সূতনন্দন! বল দেখি তক্ষক কি নিমিত্ত সেই সকল মনীষী বিপ্রগণের মন্ত্রবলে হোমানলে পতিত হইল না? উগ্রশ্রবাঃ উত্তর করিলেন, মহাশয়। অলৌকিক ক্ষমতাপন্ন মহাতেজাঃ মহর্ষি আস্তীক ইন্দ্ৰ হইতে ভ্রষ্ট নাগরাজকে ভয়বিহ্বল দেখিয়া উচ্চৈঃস্বরে তিনবার "তিষ্ঠ তিষ্ঠ” এই বাক্য বলিয়াছিলেন। তাহাতেই নাগেন্দ্র ভূতলে পতিত ও ভস্মীভূত না হইয়া অন্তরীক্ষে কালযাপন করিতে সমর্থ হইয়াছিল।

অনন্তর রাজা সদস্যগণের প্রবর্তনা-পরতন্ত্র' হইয়া আস্তীককে অভিলষিত বরপ্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, যজ্ঞ নিবৃত্ত হউক, সর্পকুল নিরাপদ হউক, আস্তীক ঋষি প্রসন্ন হউন এবং সেই সূতবাক্য সত্য হউক। আস্তীককে এই বর দেওয়াতে সমাগত জনগণ মুক্তকণ্ঠে জয়ধ্বনি করিতে লাগিল এবং যজ্ঞ নিবৃত্ত হইল।

রাজা প্রীতমনে ঋত্বিক্ ও সদস্যগণকে প্রার্থনাধিক অর্থদান দ্বারা সন্তুষ্ট করিয়া বিদায় করিলেন। পূর্ব্বে যে লোহিতাক্ষ সূত "এক ব্রাহ্মণ এই যজ্ঞের অন্তরায় স্বরূপ হইবেন” এই কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন, ভূপতি তাঁহাকেও বিপুল ধনদান করিয়া দীক্ষান্ত-স্নান' করিলেন। পরিশেষে অশন বসন প্রভৃতি নানাবিধ দ্রব্য সামগ্রী প্রদানপূর্ব্বক আস্তীককে পরিতুষ্ট করিয়া গৃহে প্রেরণকালে অতি বিনীতভাবে নিবেদন করিলেন, মহাশয়! আমার অশ্বমেধ যজ্ঞে আপনাকে সদস্য হইতে হইবে।

আস্তীক অতি মহৎকার্য্যের অনুষ্ঠানে সন্তুষ্ট হইয়া রাজাজ্ঞা স্বীকারপূর্ব্বক স্বগৃহাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। তিনি প্রথমতঃ জননী ও মাতুলের সমীপে গমন করিয়া আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। সর্পগণ আপনাদিগের কুশল সংবাদ শ্রবণে আনন্দিত হইয়া আস্তীককে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদানপূর্ব্বক কহিল, বৎস! তুমি অদ্য আমাদিগের জীবন দান করিলে, আমরা তোমার প্রতি অতিশয় প্রীত হইয়াছি, এক্ষণে বর প্রার্থনা কর। তাহারা ভূয়োভূয়ঃ বলিতে লাগিল, বৎস!

আমরা তোমাকর্তৃক রক্ষিত হইয়া যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইয়াছি, এক্ষণে বল তোমার কি প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করিব?

আস্তীক কহিলেন, যদি আপনারা আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে এইমাত্র অনুগ্রহ করিবেন যে, যে সকল ধর্মপরায়ণ ব্রাহ্মণ ও অপরাপর ব্যক্তি সায়াহ্নে বা প্রাতঃকালে অসিত, আর্তিমান ও সুনীথের নাম স্মরণ করিবেন কিংবা (যে আস্তীক মুনি জনমেজয়ের সর্পসত্র হইতে তোমাদিগকে রক্ষা করিয়াছেন, আমি তাঁহাকে স্মরণ করিতেছি, হে সর্পগণ! আমাকে হিংসা করিও না, জনমেজয়ের যজ্ঞাবসানে আস্তীকের বচন স্মরণ কর, যে সর্প আস্তীকের নাম শুনিয়াও হিংসা করিতে নিবৃত্ত না হইবে, শাল্মলী বৃক্ষের ফলের ন্যায় তাহার মস্তক শতধা বিদীর্ণ হইবে;) এই ধর্মাখ্যান যাঁহারা পাঠ করিবেন, আপনারা তাঁহাদিগের কোন অনিষ্ট করিবেন না। সর্পেরা প্রসন্ন-মনে আস্তীকের প্রস্তাবে সম্মত হইয়া উত্তর করিলেন, হে ভাগিনেয়! আমরা কদাচ তোমার প্রার্থিত বিষয়ের অন্যথাচরণ করিব না। সূত, শৌনককে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে দ্বিজোত্তম! আস্তীক সমাগত নাগেন্দ্রগণের এই বাক্য শ্রবণে পরম প্রীতমনে স্বভবনাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। কিয়ৎকাল পরে তিনি পুত্র পৌত্রাদি রাখিয়া লোকযাত্রা সংবরণ করেন। হে ভূগৃত্তম! আপনার পূর্ব্বজ প্রমতি স্বীয় পুত্র রুরুর কৌতুক নিবৃত্তির নিমিত্ত আস্তীকোপাখ্যান যেরূপ কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, আমি তাহা অবিকল বর্ণনা করিলাম। এই পুণ্যবর্দ্ধক আস্তীকোপাখ্যান শ্রবণ করিলে সর্পভয় বিনষ্ট হয়, অন্তঃকরণে বিশুদ্ধ সুখের সঞ্চার হয় এবং পবিত্র ধর্মলাভ হয়।

আস্তীক পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।