কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

আদিপর্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

বৈবাহিক পর্ব্বাধ্যায়
বিদুরাগমন পর্ব্বাধ্যায়
রাজ্যলাভ পর্ব্বাধ্যায়
অর্জুনবনবাস পর্ব্বাধ্যায়
সুভদ্রাহরণ পর্ব্বাধ্যায়
হরণাহরণ পর্ব্বাধ্যায়
খান্ডবদহন পর্বাধ্যায়

আদিপর্ব

বৈবাহিক পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ ও নরোত্তম নর এবং সরস্বতীকে' নমস্কার করিয়া জয়' উচ্চারণ করিবে।

পিতার নিকট ধৃষ্টদ্যুম্নের পাণ্ডবদিগের পরিচয় দান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, যে মহারাজ। রাজকুমার ধৃষ্টদ্যুম্ন পিতাকর্তৃক পরিপৃষ্ট হইয়া হৃষ্টচিত্তে যথাবৎ বৃত্তান্ত বর্ণন করত কহিতে লাগিলেন, হে পিতঃ! যিনি দেবতুল্য রূপবান্ কৃষ্ণা-জিনধারী যাঁহার নয়নযুগল আয়ত ও লোহিতবর্ণ, যিনি সেই ধনুতে গুণাধিরোপণ করিয়া অনায়াসে লক্ষ্যবিদ্ধ করিয়াছিলেন, যে তপস্বী দ্বিজগণকর্তৃক পরিবেষ্টিত ও পূজ্যমান হইয়া দেবতা ও ঋষিগণে পরিবৃত দানবসভা প্রবিষ্ট সুররাজের ন্যায় গমন করিতে লাগিলেন, কৃষ্ণা সানন্দিত নাগবধূর ন্যায় সেই নাগেন্দ্র-তুল্য বীরপুরুষের অজিন গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহার অনুবর্তিনী হইলেন।

অনন্তর সেই ক্ষিতিপ-সমাজে কোন ভূপাল এক প্রকাণ্ড মহীরুহ উৎপাটনপূর্ব্বক সমাগত রাজগণকে অবরোধ করিলেন। হে নরেন্দ্র। চন্দ্রসূর্য্যসদৃশ সেই বীরযুগল সমস্ত পার্থিবসমক্ষে কৃষ্ণাকে গ্রহণপূর্ব্বক নগরের বহির্ভাগস্থ ভার্গব ঋষির পর্ণশালায় গমন করিলেন। তথায় অবিকল সেই দুই জনের ন্যায় আর তিনটি মহাবীর ও অগ্নি শিখার ন্যায় তেজস্বিনী এক বৃদ্ধা উপবিষ্ট ছিলেন। বোধ হয়, ঐ বৃদ্ধা তাঁহাদিগের জননী হইবেন। অনন্তর তাঁহারা দুই জন সেই বৃদ্ধা বর্ষীয়সীর চরণে অভিবাদনপূর্ব্বক কৃষ্ণাকে প্রণাম করিতে কহিলেন এবং "কৃষ্ণা এই স্থানে থাকিলেন", এই বলিয়া সকলে ভিক্ষার্থে গমন করিলেন। কৃষ্ণা তাঁহাদিগের আহৃত ভৈক্ষ্য গ্রহণপূর্ব্বক তাহার অগ্রভাগ দেবসাৎ ও বিপ্রসাৎ করিয়া সেই বৃদ্ধা ও সেই সমস্ত নরপ্রবীরদিগকে পরিবেশন করিলেন, পরিশেষে স্বয়ং ভোজন করিলেন। দ্রৌপদীও তাঁহাদিগের পাদোপাধানস্বরূপ পদতলে শয়ন করিলেন। শয়নান্তে তাঁহারা গভীরঘনগর্জনস্বরে বিচিত্র কথাসকল কহিতে লাগিলেন, কিন্তু তাদৃশ কথা-প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও শূদ্রের কোন প্রকার উপযোগিতা নাই; অতএব নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, তাঁহারা ক্ষত্র-কুলজাত হইবেন, নতুবা যুদ্ধের কথায় তাঁহাদিগের এত সমাদর কেন? যাহা হউক, এতদিনে আমাদিগের আশা ফলবৃতী হইল। শুনিয়াছি, পাণ্ডবেরা অগ্নিদাহ হইতে মুক্ত হইয়াছেন। বোধ হয় তাঁহাদিগেরই অন্যতম শরাসন সজ্য ও লক্ষ্য বিদ্ধ করিয়াছেন। আর এরূপ জনশ্রুতি হইয়াছে যে, পাণ্ডবেরা প্রচ্ছন্নবেশে দেশে দেশে ভ্রমণ করিতেছেন।

পাণ্ডবসহ কৃষ্ণার বিবাহমন্ত্রণা।

তখন দ্রুপদরাজ হৃষ্টচিত্তে পুরোহিতকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! আপনি ভার্গব কৰ্ম্মশালায় গমন করিয়া লক্ষ্যভেদকারী বীরপ্রবরের কুলশীলের পরিচয় জিজ্ঞাসা করুন। পুরোহিত নৃপতির আদেশানুসারে তথায় উপনীত হইয়া বাগাড়ম্বর-পর্ব্বক তাঁহাদিগের ভূরি ভূরি প্রশংসা করিয়া সমগ্র রাজবাক্য অবিকল কহিতে লাগিলেন। মহারাজ পাঞ্চালেশ্বর আপনাদিগকে জানাইয়াছেন যে, তিনি সেই লক্ষ্যবেদ্ধাকে নয়নগোচর করিয়া অপার আনন্দসাগরে মগ্ন হইয়াছেন। তিনি কহিয়াছেন, আপনারা অরাতিমস্তকে পদাঘাত এবং আমার ও আমার আত্মীয়বর্গের হৃদয় আনন্দিত করুন। মহারাজ পাণ্ডু দ্রুপদের প্রিয়সখা ছিলেন, তন্নিমিত্ত তাঁহার নিতান্ত বাসনা যে, তিনি আপন দুহিতা কোন কৌরবকে সম্প্রদান করেন। তাঁহার অভিলাষ এই যে, অর্জুন তদীয় কন্যার পাণিগ্রহণ করেন, তাহা হইলেই তাঁহার পুণ্যকীর্ত্তি ও সুকৃতি সকলেই চরিতার্থতা প্রাপ্ত হয়।

পুরোহিত সমুদায় নিবেদন করিয়া ক্ষান্ত হইলে মহানুভব যুধিষ্ঠির অতি বিনীতভাবে তাঁহাকে সন্দর্শন করিয়া সমীপস্থ ভীমকে কহিলেন, ইঁহাকে পাদ্য ও অর্ঘ্য প্রদান কর। ইনি দ্রুপদরাজের অতীব মান্য পুরোহিত। ইঁহাকে অধিকতর পূজা করা কর্তব্য। ভীম জ্যেষ্ঠের নির্দেশানুসারে তৎসমুদায় সম্পাদন করিলে, ব্রাহ্মণ পূজা পরিগ্রহ করিয়া সুখে অধ্যাসীন' হইলেন। যুধিষ্ঠির কহিলেন, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ যেমন নিষ্কাম হইয়া ও ধৰ্ম্মপথে দৃষ্টি রাখিয়া কন্যা পণিত' করিয়াছিলেন, তদনুরূপ কার্য্যও করিয়াছেন। তিনি তদ্বিষয়ে কুল, শীল, গোত্র ও জাতির কোন অপেক্ষা করেন নাই। তাঁহার প্রতিজ্ঞা ছিল, যিনি কাৰ্ম্মক সজ্য এবং লক্ষ্যবিদ্ধ করিতে সমর্থ হইবেন, তিনিই কন্যারত্ন লাভ করিবেন। মহাত্মা অর্জুনই সমস্ত রাজমণ্ডল হইতে কৃষ্ণাকে জয় করিয়াছেন! এইরূপ ঘটিয়াছে বলিয়া তাঁহাকে দুঃখ করিতে নিষেধ করিবেন। তাঁহার এই কন্যাটি অতি রূপবতী ও সুলক্ষণসম্পন্না, বোধ হয়, অচিরাৎ রাজার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে। সেই কার্মুকে গুণযোজনা করা হীনবল ব্যক্তির অসাধ্য এবং অকৃতাস্ত্র নীচকুলজাত ব্যক্তি কোনক্রমেই সেই দুর্ভেদ্য লক্ষ্য পাতিত করিতে পারে না; অতএব দুহিতার নিমিত্ত পাঞ্চালরাজের পরিতাপ করিবার আবশ্যকতা নাই। যুধিষ্ঠির পুরোহিতসমক্ষে এই সমস্ত কথা বলিতেছেন, ইত্যবসরে রাজপ্রেরিত অপর এক ব্যক্তি ভোজ্য নিবেদন করিবার নিমিত্ত তথায় সমুপস্থিত হইল।

দ্রুপদ-ভবনে পাণ্ডবগণের বরণ।

রাজদূত কহিল, দ্রুপদ বরযাত্রিগণের নিমিত্ত অত্যুৎকৃষ্ট খাদ্য দ্রব্যের আয়োজন করিয়াছেন, আপনারা তথায় গমন করিয়া দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণপূর্ব্বক সেই সমস্ত দ্রব্যসামগ্রী গ্রহণ করুন। এখানে বিলম্ব করিবার আর প্রয়োজন নাই। এই সকল কাঞ্চন-পদ্মখচিত সদশ্বযুক্ত, রাজোচিত রথে আরোহণ করিয়া দ্রুপদভবনে আগমন করুন। পাণ্ডব দূতমুখে এই কথা শ্রবণ করিয়া পুরোহিতকে অগ্রে প্রেরণ করিলেন এবং কুস্তী ও দ্রৌপদীকে এক যানে আরোহণ করাইয়া আপনারা অপর অপূর্ব্ব যানে আরোহণপূর্ব্বক যাত্রা করিলেন। ধর্মরাজ পুরোহিতের বচন শ্রবণ করিয়া যাহা কহিয়াছিলেন, তদ্দ্বারা তাঁহাদিগকে কৌরব বলিয়া জানিতে পারিয়া দ্রুপদরাজ নানাপ্রকার দ্রব্য-সামগ্রীর আয়োজন করিয়া রাখিলেন। তাঁহারা উপস্থিত হইলে সেই পবিত্র ফল, মাল্য, বৰ্ম্ম, গো, রজ্জু, কৃষিনিমিত্তক, নানা-প্রকার বীজ, অন্যান্য শিল্পনিমিত্তক দ্রব্যসামগ্রী ও ক্রীড়ানিমিত্তক বিবিধ বস্তুজাত এবং অশ্ব, রথ, সুতীক্ষ্ণশর, শরাসন, খড়া, শক্তি, প্রাস, ভুষণ্ডী ও পরশু প্রভৃতি সাংগ্রামিক দ্রব্য ও রত্নময় শয্যা ও বিবিধ বসনভূষণ তাঁহাদিগকে উপহার প্রদান করিলেন।

কুন্তী দ্রৌপদীকে লইয়া দ্রুপদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। তত্রস্থ স্ত্রীগণ কৌরবরাজপত্নীর পরিচর্যা করিতে লাগিলেন। মহাপুরুষ-লক্ষণাক্রান্ত, অজিনোত্তরীয় পুরুষপ্রবীর পাণ্ডবদিগকে নয়নগোচর করিয়া রাজা, রাজকুমার, সচিব, ভৃত্য ও রাজার সুহৃদ্বর্গ, সকলেই আনন্দপ্রবাহে নিমগ্ন হইলেন। পাণ্ডবেরা গৃহ-প্রবিষ্ট হইয়া অশঙ্কিত ও অসঙ্কুচিতচিত্তে পাদপীঠ সহিত মহার্হ আসনে উপবেশন করিলেন। অনন্তর দাস, দাসী ও সূপকারেরা উজ্জ্বল বেশভূষা পরিধানপূর্ব্বক সুবর্ণপাত্রে পার্থিবভোজ্য বহুবিধ সুস্বাদু অন্ন ব্যঞ্জন পরিবেশন করিল। তাঁহারা স্বেচ্ছাস্বরূপ ভোজন করিয়া সাতিশয় তৃপ্ত ও প্রীত হইলেন। অনন্তর উপদীকৃত অন্যান্য সমস্ত ধনসম্পত্তি পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল সাংগ্রামিক দ্রব্য লইবার বাসনা করিলেন। তদ্দর্শনে রাজা, রাজপুত্র এবং মন্ত্রিগণ হৃষ্টমনে কুন্তীতনয়দিগকে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।

দ্রুপদকর্তৃক পাণ্ডবদিগের রাজ্য প্রদানের আশ্বাস।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে ভরতবংশাবতংস জনমেজয়। তদনন্তর পাঞ্চালরাজ যুধিষ্ঠিরকে আহ্বান করিয়া ব্রাহ্মবিধানা-নুসারে বিবাহ দিবার অভিপ্রায়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনারা ব্রাহ্মণ, কি ক্ষত্রিয়, কি গুণসম্পন্ন বৈশ্য কিংবা শূদ্র অথবা কোন দেবতা মায়া করিয়া ব্রাহ্মণবেশ ধারণপূর্ব্বক ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেছেন, ইহা কিরূপে জানিতে পারিব? দ্রৌপদী-সন্দর্শনার্থ অনেকানেক দেবগণ আগমন করিয়াছিলেন; অতএব আপনি কে? সত্য করিয়া বলুন, আমার মনে মহান্ সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে। হে পরন্তপ। আপনি সমুদায় সত্য করিয়া বলুন; সত্যই রাজাদিগের অতীব আদরণীয়, অভীষ্টসিদ্ধির ব্যাঘাত জন্মিলেও তাঁহাদের মিথ্যা কথা বলা উচিত নহে। হে অরিন্দম! আপনার নিকট যথার্থ অবগত হইয়া আমি বিধিপূর্ব্বক বিবাহের উদ্যোগ করিব।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, রাজন! উদ্বিগ্ন হইবেন না, প্রীতি লাভকরুন, আপনার মনোরথ সম্পূর্ণ হইল। আমরা ক্ষত্রিয়, মহাত্মা পাণ্ডুর তনয়, সাধুশীলা কুন্তী আমাদিগের জননী; আমি সর্ব্ব-জ্যেষ্ঠ, আমার নাম যুধিষ্ঠির; ইঁহাদিগের একের নাম ভীমসেন; অপরের নাম অর্জুন ইঁহারাই রাজসভায় আপনার কন্যাকে জয় করিয়াছেন। আর যে স্থানে দ্রৌপদী রহিয়াছেন, তথায় নফুল, সহদেব ও জননী অবস্থিতি করিতেছেন। হে নরর্ষভ! আমরা ক্ষত্রিয়, আপনি মনোদুঃখ দূর করুন। আপনার কন্যা পদ্মিনীর ন্যায় হ্রদ হইতে হ্রদান্তর প্রাপ্ত হইলেন। মহারাজ! আপনাকে এই সমুদায় যথার্থতত্ত্ব নিবেদন করিলাম, আপনি আমাদিগের পরম পূজনীয় ও আশ্রয়স্থান।

যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণ করিয়া আহ্লাদে ক্ষণকাল বাঙ্ নিষ্পত্তি করিতে অসমর্থ হইলেন। পরে যত্নপূর্ব্বক হর্ষোৎফুল্ল-লোচনে হর্ষোদ্রেক কিঞ্চিৎ সংবরণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কিরূপে রাজ্যচ্যুত ও নগর হইতে বহিষ্কৃত হইলে? যুধিষ্ঠির আনুপূর্ব্বিক সমস্ত বৃত্তান্ত রাজাকে নিবেদন করিলেন। রাজা শ্রবণ করিয়া বারংবার ধৃতরাষ্ট্রের নিন্দা করিতে লাগিলেন এবং তাঁহাদিগকে রাজ্য প্রদান করিবেন, এইরূপ প্রতিশ্রুত হইয়া যুধিষ্ঠিরকে আশ্বাসিত করিলেন।

দ্রৌপদীকে বিবাহ-প্রস্তাব ও ব্যাসের আগমন।

অনন্তর কুন্তী, কৃষ্ণা, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব নৃপাদিষ্ট হইয়া ভবনে প্রবেশ করিলেন। তথায় যজ্ঞসেনকর্তৃক পূজিত হইয়া উপবেশন করিলেন। পরে প্রত্যাশ্বস্ত রাজা, পুত্রের সহিত মিলিত হইয়া যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, অদ্য শুভ দিবস অতএব অর্জুন আভ্যুদয়িক ক্রিয়ান্তে দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণ করুন। যুধিষ্ঠির কহিলেন, রাজন! আমারও দারসম্বন্ধ কর্তব্য হইয়াছে। দ্রুপদ প্রত্যুত্তর করিলেন, আপনি আমার কন্যার পাণিগ্রহণ করুন অথবা আপনার মনোনীত ব্যক্তিকে বিবাহ করিতে অনুমতি করুন। যুধিষ্ঠির কহিলেন, মহাশয়। পূর্ব্বে জননী অনুমতি করিয়াছেন যে, দ্রৌপদী আমাদিগের সকলেরই মহিষী হইবেন। আমি অদ্যাপি দারপরিগ্রহ করি নাই এবং ভীমও অকৃতবিবাহ। অর্জুন আপনার কন্যারত্ন জয় করিয়াছেন বটে, কিন্তু আমাদিগের ভ্রাতৃগণের মধ্যে নিয়ম আছে যে, যে কোন উৎকৃষ্ট বস্তু প্রাপ্ত হইলে আমরা তাহা সকলে একত্র ভোগ করিয়া থাকি; অতএব আমরা কোনক্রমেই চির আচরিত নিয়ম লঙ্ঘন করিতে পারিব না; কৃষ্ণা ধৰ্ম্মতঃ আমাদিগের সকলেরই মহিষী হইবেন। অগ্নি-সাক্ষী করিয়া আমাদিগের জ্যেষ্ঠাদি ক্রমে তনয়ার পরিণয়ক্রিয়া সম্পাদিত করুন। দ্রুপদ কহিলেন, হে কুরুনন্দন! এক পুরুষের বহু পত্নী বিহিত আছে বটে, কিন্তু এক স্ত্রীর অনেক পতি কুত্রাপি শ্রবণগোচর করি নাই। তুমি অতি পবিত্রস্বভাব ও পরম ধার্মিক, তোমার এরূপ কথা উত্থাপন করা অনুচিত। লোকাচার ও বেদবিরুদ্ধ অধর্ম কর্ম্মের অনুষ্ঠান করা কদাচ তোমার উচিত হয় না। যুধিষ্ঠির কহিলেন, মহারাজ! ধৰ্ম্ম অতি সূক্ষ্ম পদার্থ, ধর্ম্মের গতি আমরা কিছুই জানি না, পূর্ব্বপুরুষদিগের আচরিত পদ্ধতিক্রমেই চলিয়া থাকি। আমার মুখে অনূত' বাক্য কদাচিৎ উচ্চারিত হয় না এবং আমার হৃদয়েও অধর্ম কদাচ স্থানলাভ করিতে পারে না, বিশেষতঃ আমাদিগের জননী এ বিষয়ে আদেশ প্রদান করিয়াছেন, আমারও ইহা মনোগত বটে। রাজন! ইহা সনাতন ধৰ্ম্ম, আপনি ইহার অনুষ্ঠান করুন, কিঞ্চিন্মাত্র শঙ্কিত হইবেন না। দ্রুপদ কহিলেন, হে কৌন্তেয়। কল্য তুমি ও তোমার জননী এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন, তোমরা সকলে ইতিকর্ত্তব্যতা স্থির করিয়া যাহা বলিবে তাহাই করিব। বৈশম্পায়ন কহিলেন, রাজন! তাঁহারা সকলে মিলিত হইয়া বিবাহ বিষয়ক এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, ইত্যবসরে যদৃচ্ছাক্রমে মহর্ষি দ্বৈপায়ন তথায় সমুপস্থিত হইলেন।

ব্যাসের নিকট দ্রুপদের প্রশ্ন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মহাত্মা দ্বৈপায়নকে সমাগত দেখিয়া পাণ্ডবগণ ও মহাযশাঃ পাঞ্চাল্য গাত্রোত্থান-পূর্ব্বক অভিবাদন করিলেন। মহর্ষি তাঁহাদিগের প্রদত্ত পূজা প্রতিনন্দনপূর্ব্বক কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া পবিত্র কাঞ্চনাসনে সমাসীন হইলেন। তাঁহার আদেশক্রমে সকলেই মহার্হ আসনে উপবেশন করিলেন। অনন্তর মুহূর্তকাল গত হইলে রাজা দ্রৌপদীর নিমিত্ত ঋষিকে মধুরবাক্যে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্। একা দ্রৌপদী কিরূপে অনেকের ধর্মপত্নী হইবেন? কিন্তু সঙ্কর হইবেন না, ইহা কিরূপে ঘটিতে পারে; আপনি এ বিষয়ে যাহা যথার্থ হয়, আজ্ঞা করুন। ব্যাসদেব কহিলেন, লোকাচার-গর্হিত ও বেদবিরুদ্ধ এই দুরবগাহ' ধৰ্ম্মবিষয়ে তোমাদের কাহার কি মত, আমি অগ্রে তাহা শুনিতে অভিলাষ করি। দ্রুপদ কহিলেন, যাহা লোকাচার ও বেদবিরুদ্ধ আমার মতে তাহাই অধৰ্ম্ম; হে দ্বিজোত্তম! এক স্ত্রী বহু পুরুষের পত্নী, ইহা কদাপি দৃষ্ট হয় না। ইহা মহাত্মা প্রাচীন পুরুযদিগেরও আচরিত ধৰ্ম্ম নহে এবং গুণবান্ ব্যক্তিরাও কখন এরূপ ধর্ম্মের অনুষ্ঠান করিবেন না, অতএব আমি এ বিষয়ে কি কর্তব্য কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। ইহাতে আমার সম্পূর্ণ সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে।

সমস্যার সমাধান।

ধৃষ্টদ্যুম্ন কহিলেন, হে তপোধন। জ্যেষ্ঠ সুশীল ও সদাচার-সম্পন্ন হইয়া কনিষ্ঠ ভ্রাতার ভার্য্যায় কিরূপে গমন করিবেন? ধৰ্ম্ম অতি সূক্ষ্ম পদার্থ, ধর্ম্মের গতি আমরা কিছুই জানি না, সুতরাং ধর্মাধৰ্ম্মের নিশ্চয় করা আমাদিগের অসাধ্য। অতএব কৃষ্ণা যে পঞ্চ স্বামীর মহিষী হইবেন, ইহা আমরা কোনরূপেই ধৰ্ম্মতঃ অনুমোদন করিতে পারি না। যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে ব্রহ্মন। আমার মুখে কদাচ অন্বত বাক্য নিঃসৃত হয় না এবং আমার মনোমন্দিরে অধর্মের প্রবেশাধিকার নাই। অতএব যখন আমার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ মত হইয়াছে, তখন আমি ইহাকে কোনক্রমে অধৰ্ম্ম বলিতে পারিব না। পুরাণে শ্রবণ করিয়াছি, ধর্মপরায়ণা জটিলানাম্নী গৌতমবংশীয়া এক কন্যা সাত জন ঋষিকে বিবাহ করেন এবং বাক্ষীনাম্নী মুনিকন্যা প্রচেতাঃ নামক ভ্রাতৃদশের সহধর্মিণী হয়েন। বিশেষতঃ পণ্ডিতেরা কহিয়াছেন, গুরুলোক যাহা অনুমতি করিবেন, তাহাই ধৰ্ম্ম ও নিঃসংশয়ে অনুষ্ঠেয়; গুরুলোকের মধ্যে মাতা পরম গুরু, তিনি আজ্ঞা করিয়াছেন, লব্ধদ্রব্য ভিক্ষার্জিত বস্তুর ন্যায় সকলেই ভোগ কর; অতএব হে দ্বিজোত্তম! ইহা পরম ধৰ্ম্ম বলিয়া আমার বোধ হইতেছে। কুন্তী কহিলেন, ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির যাহা কহিলেন, আমি তাহা কহিয়াছি বটে। আমি অন্‌তবাক্যে সাতিশয় ভয় করিয়া থাকি, কিরূপে এই মিথ্যা হইতে পরিত্রাণ পাইব! ব্যাসদেব কহিলেন, হে ভদ্রে! অনূত হইতে পরিত্রাণ পাইবে। তুমি যাহা কহিয়াছ, তাহাই সনাতন ধৰ্ম্ম, হে পাঞ্চাল! আমি ইহার নিগূঢ়তত্ত্ব সর্ব্ব সমক্ষে ব্যক্ত করিব না। যেরূপে উক্ত ধৰ্ম্ম বিহিত ও সনাতন বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছে, তাহা কেবল আপনিই শুনিতে পাইবেন। কৌন্তেয় যাহা কহিয়াছেন, তাহা প্রকৃত ধৰ্ম্ম বটে, তাহাতে আর কোন সন্দেহ নাই।

তদনন্তর ভগবান্ দ্বৈপায়ন গাত্রোত্থান করিয়া দ্রুপদের কর গ্রহণপূর্ব্বক রাজভবনে প্রবেশ করিলেন। যে স্থানে তাঁহারা প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, তথায় পাণ্ডবগণ, কুন্তী এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন গমন করিলেন। পরে মহর্ষি ব্যাস, বহুব্যক্তির একপত্নীতা যে ধৰ্ম্মবিরুদ্ধ নহে, এই বিষয় রাজাকে বলিতে আরম্ভ করিলেন।

পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদীর উদ্ভব ইতিহাস।

ব্যাসদেব কহিলেন, হে রাজন! পূর্ব্বে দেবতারা নৈমিষা-রণ্যে এক মহাসত্র আরম্ভ করেন। সেই সত্রে বৈবস্বত যম ব্রতী হইয়াছিলেন। তিনি যজ্ঞে দীক্ষিত হইয়া অবধি প্রজা বিনাশরূপ স্বীয় কর্ত্তব্য কর্মে বিরত থাকেন, সুতরাং অনতিকাল বিলম্বে প্রজাসংখ্যা বহুল হইয়া উঠিল। সোম, শুক্র, বরুণ, কুবের, রুদ্র, বসুগণ, অশ্বিনীকুমার এবং অন্যান্য দেবতারা মিলিত হইয়া বিশ্বপ্রণেতা প্রজাপতির নিকট গমন করিলেন এবং সর্ব্বলোক-পিতামহকে নিবেদন করিলেন, হে লোকনাথ! আমরা মনুষ্যসংখ্যার বৃদ্ধি দেখিয়া সাতিশয় ভীত হইয়াছি, এক্ষণে যাহাতে নিরুদ্বিগ্নচিত্তে সুখে কালযাপন করিতে পারি, এই আশয়ে আপনার শরণাগত হইলাম। পিতামহ কহিলেন, তোমরা অমর, মনুষ্যজাতির নিকট তোমাদের ভয়ের বিষয় কি? দেবতারা কহিলেন, মর্ত্যলোক দেবলোকতুল্য হইয়াছে, কিছুমাত্র বিশেষ নাই, এই নিমিত্ত আমরা উদ্বিগ্ন হইয়া প্রভেদকরণমানসে আপনার নিকট আগমন করিলাম। ভগবান্ প্রত্যুত্তর করিলেন, যম যজ্ঞে ব্যাপৃত রহিয়াছেন বলিয়া লোকের মৃত্যু হইতেছে না। তাঁহার সত্র সমাপনানন্তর নরলোকের অন্তকাল উপস্থিত হইবে। তোমাদিগের বলবীর্য্যে যমের শরীর অলঙ্কৃত ও সবল হইয়া উঠিবে। তৎকালে নরলোকের শৌর্য্য বীর্য্য থাকিবে না।

তাঁহারা বিধাতার বাক্য শ্রবণানন্তর যে স্থানে দেবতারা যজ্ঞ করিতেছিলেন, তথায় যাত্রা করিলেন। পথে গমন করিতে করিতে তাঁহারা বিশ্রামার্থ ভাগীরথীতীরে উপবেশন করিলেন। ইত্যবসরে গঙ্গাজলে একটি সুবর্ণ পদ্ম তাঁহাদের নয়নগোচর হইল। তদ্দর্শনে তাঁহারা সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন এবং তাহার তথ্যানুসন্ধানার্থ মহাবল ইন্দ্র সন্নিকটস্থ প্রদেশে ভ্রমণ করিতে করিতে দেখিলেন যে, যে স্থানে ভাগীরথী প্রভৃতরূপে প্রবাহিত হইতেছেন, সেই স্থানে একটি কামিনী জলার্থিনী হইয়া গঙ্গায় অবগাহনপূর্ব্বক রোদন করিতেছেন। তাঁহার অশ্রুবিন্দু গঙ্গাজলে পতিত হইয়া কাঞ্চনপদ্মরূপে পরিণত হইতেছে। ইন্দ্র সেই অদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করিয়া নিকটবর্তী হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ভদ্রে! তুমি কে? কাহার নিমিত্ত রোদন করিতেছ? তাহা যথার্থ করিয়া বল। ললনা কহিলেন, হে দেবরাজ! আমি কে এবং যে নিমিত্ত রোদন করিতেছি আমার সমভিব্যাহারে কিয়দ্দূর গমন করিলে তাহার সবিশেষ জানিতে পারিবেন। তৎশ্রবণে ইন্দ্র সেই স্ত্রীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিয়া অনতিদূরে দেখিলেন, এক পরম সুন্দর যুবা পুরুষ গিরিরাজ-শিখরোপরি সিংহাসনে অধ্যাসীন হইয়া এক সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী যুবতী স্ত্রী-সমভিব্যাহারে পাশক্রীড়া করিতেছেন। দেবরাজ যুবাকে পাশ-ক্রীড়ায় আসক্ত ও অভ্যাগত-সৎকার-বিমুখ দেখিয়া ক্রোধভরে কহিলেন, এই ভূমণ্ডল আমার অধীন, আমি ইহার প্রভু; আমার সমুচিত সৎকার না করিয়া পাশক্রীড়ায় প্রমত্ত থাকা অতীব অনুচিত। তখন সেই দেব ইন্দ্রকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া ঈষৎ হাস্য করত তাঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিবামাত্র দেবরাজ তৎক্ষণাৎ স্থাণুর ন্যায় স্তম্ভিত হইয়া রহিলেন।

পাশক্রীড়া সমাপনানন্তর মহাপুরুষ সেই রোরুদ্যমানা স্ত্রীকে কহিলেন, ইহাকে আমার নিকটে আনয়ন কর; আমি ইহাকে এরূপ উপদেশ প্রদান করিব, যাহাতে ইহার শরীরে পুনর্ব্বার দর্প প্রবেশ না করে। তখন সেই স্ত্রী ইন্দ্রকে স্পর্শ করিবামাত্র তদীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গসকল শিথিল হওয়াতে তিনি তৎক্ষণাৎ ভূতলে পতিত হইলেন। ইন্দ্রকে তদবস্থ দর্শনে ভগবান্ উগ্রতেজাঃ কহিলেন, হে শত্রু! পুনর্ব্বার এরূপ কৰ্ম্ম কদাচ করিও না। তুমি অপরিমিত বলশালী, অতএব এই পৰ্ব্বত উত্তোলনপূর্ব্বক যে বিবরে সূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী ভবাদৃশ ব্যক্তিরা সমাসীন আছেন, সেই ছিদ্রে তুমিও প্রবেশ কর। ইন্দ্র সেই বিবরানুসন্ধানপূর্ব্বক তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া তুল্যতেজাঃ অন্য চারিজনকে দেখিতে পাইলেন। তাঁহাদিগকে তাদৃশ জ্যোতিৰ্ম্ময় অবলোকন করিয়া "আমিও কি ইঁহাদিগের ন্যায় হইতে পারিব না?” দুঃখিতমনে এইরূপ বিতর্ক করিতে লাগিলেন।

অনন্তর ভগবান্ মহাদেব ক্রুদ্ধ হইয়া নেত্র বিস্ফারণ-পূর্ব্বক ইন্দ্রকে কহিলেন, হে শতক্রতো! তুমি বালস্বভাবসুলভচপলতায় আমাকে অপমান করিয়াছ, অতএব তোমাকে এই গুহামধ্যে প্রবেশ করিতে হইবে। দেবরাজ মহাদেবকর্তৃক এইরূপ অনুজ্ঞাত হইয়া ভয়ে গিরিরাজমস্তকে পবনচালিত অশ্বত্থপত্রের ন্যায় কম্পিত হইতে লাগিলেন। পরে বিবর-প্রবেশ-সময়ে কৃতাঞ্জলিপুটে ত্রিলোচনকে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! অদ্যাবধি আপনাকেই এই অশেষ ভুবনের রক্ষণাবেক্ষণ করিতে হইবে। তৎশ্রবণে দেবদেব হাস্য করিয়া কহিলেন, ইহা ভবাদৃশ গর্বিত লোকের অধিকারযোগ্য নহে। পূর্ব্বে ইঁহারাও তোমার ন্যায় গর্বিত ছিলেন; অতএব এই গুহাপ্রবিষ্ট হইয়া সকলে একত্র কালযাপন কর। অধুনা তোমরা স্বীয় গর্হিত কৰ্ম্মফলে মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হও। পরে জন্মান্তরীণ স্ব স্ব কৰ্ম্মফলার্জিত মহার্হ ইন্দ্রলোকে পুনরায় গমন করিবে। তোমাদিগের যাহা যাহা কর্ত্তব্য তৎসমুদায় আদেশ করিলাম।

শিববাক্য শ্রবণ করিয়া ভূতপূর্ব্বেন্দ্রেরা কহিলেন, হে প্রভো! আমরা দেবলোেক পরিত্যাগপূর্ব্বক যে স্থানে মোক্ষ অতীব দুষ্প্রাপ্য, সেই নরলোকে গমন করিব; কিন্তু ধৰ্ম্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমার ইঁহারাই যেন কোন মানুষীর গর্তে আমাদিগকে উৎপন্ন করেন। ইহা শ্রবণ করিয়া ইন্দ্র মহাদেবকে পুনর্ব্বার কহিলেন, আমি স্বীয় বীর্য্যে কার্যক্ষম এক পুরুষ উৎপাদন করিব, তিনি ইঁহাদিগের পঞ্চম হইবেন। ইন্দ্রের এবম্প্রকার মিনতিতে সম্মত হইয়া ভগবান্ উগ্রতেজাঃ তাঁহাদিগের স্ব স্ব অভীষ্ট প্রদান করিলেন এবং লোকললামভূতা সেই ললনাকে তাঁহাদিগের ভার্য্যা নিদ্দিষ্ট করিলেন। অনন্তর মহাদেব তাঁহাদিগের সমভিব্যাহারে নারায়ণ-সমীপে উপনীত হইলেন। নারায়ণ মহাদেবের নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া তাঁহার নির্দিষ্ট নিয়মে অনুমোদন করিলেন। পরে ধর্ম প্রভৃতি দেবগণ ভূমণ্ডলে অবতীর্ণ হইলেন। তাঁহারা বিদায় হইলে নারায়ণ স্বীয় মস্তক হইতে কেশযুগল উৎপাটন করিলেন। তন্মধ্যে একটি শুক্ল, দ্বিতীয়টি কৃষ্ণবর্ণ। সেই কেশযুগল যদুকুলকামিনী দেবকী ও রোহিণীতে সমাবিষ্ট হইল। শুভ্রকেশ বলদেবরূপে এবং কৃষ্ণকেশ কেশবরূপে অবতীর্ণ হইলেন; তন্নিমিত্তই লোকে বাসুদেবকে কেশব কহে।

পূর্ব্বে ইন্দ্ররূপী যে মহাপুরুষেরা অদ্রিগুহায় নিবদ্ধ ছিলেন, তাঁহারাই পাণ্ডবরূপে ভূমণ্ডলে অবতীর্ণ হইলেন এবং ইন্দ্রের অংশে সব্যসাচী অর্জুন জন্মগ্রহণ করিলেন। পূর্ব্বেন্দ্রগণ এইরূপে পঞ্চপাণ্ডব হইলেন এবং তাঁহাদিগের বনিতা হইবার নিমিত্ত মহাদেবের উপদেশক্রমে লক্ষ্মী দ্রৌপদীরূপে আবির্ভূতা হইলেন। মহারাজ। দৈবসংযোগ ব্যতিরেকে কখন কি ধরণীতল হইতে অলোকসামান্য স্ত্রীরত্ন সমুৎপন্ন হইতে পারে?

হে নরেন্দ্র। আমি প্রীতিপূর্ব্বক আপনাকে অত্যাশ্চর্য্য দিব্য চক্ষুঃ প্রদান করিতেছি, আপনি সেই দিব্য চক্ষুঃ উন্মীলন করিলে অনায়াসে জানিতে পারিবেন, কুন্তীতনয়েরা পবিত্র পূর্ব্ব দেহ ধারণপূর্ব্বক জগতীতলে বিচরণ করিতেছেন। মহর্ষি ব্যাস স্বীয় তপঃপ্রভাবে রাজাকে দিব্য চক্ষুঃ প্রদান করিলেন। রাজা তদ্দ্বারা দেখিতে পাইলেন, পাণ্ডবেরা অতি পবিত্র পূর্ব্ব শরীর ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। তাঁহাদিগের মস্তকে হেমকিরীট ও সর্ব্বাঙ্গে বিবিধ অলঙ্কার দীপ্তি পাইতেছে। সুচারু রূপলাবণ্য-সম্পন্ন তপন তুল্য তেজস্বী সেই তরুণগণ পরিষ্কৃত দিব্য বস্ত্র এবং সুগন্ধ ও রমণীয় মাল্য ধারণ করিয়া অনির্বচনীয় শোভমান হইয়াছেন। রাজা দ্রুপদ সেই পরম সুন্দর ভূতপূর্ব্বইন্দ্রদিগকে নয়নগোচর করিয়া এবং ইন্দ্রপ্রতিম যুবাকে ইন্দ্রাত্মজ শ্রবণ করিয়া যুগপৎ প্রীত ও বিস্মিত হইলেন। তিনি মায়াময়ী দ্রৌপদীকে সাক্ষাৎ সোম ও বহ্নির ন্যায় দীপ্তিমতী দেখিয়া এবং রূপ, তেজঃ যশঃ প্রভৃতি সর্ব্বপ্রকারে তাঁহাকে পাণ্ডবগণের অনুরূপা পত্নী বিবেচনা করিয়া পরম পরিতুষ্ট হইলেন।

পার্থিবেন্দ্র দ্রুপদ এই অদ্ভুত ব্যাপার নেত্রগোচর করিয়া ব্যাসদেবের চরণ গ্রহণপূর্ব্বক নিবেদন করিলেন, মহর্ষে! আপনাতে সকলই সম্ভবে, আপনার পক্ষে ইহা বিচিত্র নহে! মুনিবর রাজার প্রতি প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, মহারাজ! শ্রবণ করুন।

কোন তপোবনে এক মহর্ষিকন্যা বাস করিতেন। সেই রূপবতী কন্যা, পরিণয়কাল অতীত হইলেও অনুরূপ ভর্তৃভাগিনী হইলেন না। অনন্তর তিনি কঠোর তপস্যাদ্বারা ভগবান্ ভবানীপতিকে প্রসন্ন করিলেন। মহাদেব তাঁহার প্রতি প্রীত হইয়া স্বয়ং তাঁহাকে কহিলেন, তুমি স্বাভিলষিত বর প্রার্থনা কর। ঋষিকন্যা ত্রিলোচনকর্তৃক এই প্রকার আদিষ্ট হইয়া তাঁহাকে বারংবার, কহিলেন ভগবন্! আমি সর্ব্বগুণসম্পন্ন পতি প্রার্থনা করি। দেবেশ শঙ্কর কন্যার প্রতি প্রীত হইয়া তাঁহাকে অভিলষিত বর প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, ভদ্রে! তোমার পাঁচজন স্বামী হইবেন। ঋষিতনয়া পুনর্ব্বার মহাদেবকে কহিলেন, প্রভো! আমি এক পতি প্রার্থনা করি। দেবদেব কহিলেন, ভদ্রে! তুমি উপর্যুপরি পাঁচবার পতি প্রার্থনা করিয়াছ, অতএব জন্মান্তরে তোমার পঞ্চস্বামী হইবে। মহারাজ। আপনার কন্যা সেই দেবরূপিণী মহর্ষিনন্দিনী; ভগবান্ চন্দ্রশেখর ইঁহার পঞ্চস্বামী বিধান করিয়াছেন। ইনি স্বর্গলক্ষ্মী, পাণ্ডবগণের নিমিত্ত আপনার যজ্ঞে সমুৎপন্ন হইয়াছেন। ইনি অতি কঠোর তপস্যার ফলে আপনার দুহিতৃত্ব লাভ করিয়াছেন। এই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী দেবদুর্লভা দেবী স্বকীয় কর্মফলে পঞ্চপাণ্ডবের সহধর্মিণী হইবেন। স্বয়ম্ভূ এই নিমিত্তই ইঁহার সৃষ্টি করিয়াছেন, এক্ষণে আপনার যেমন অভিরুচি হয়, করুন।

দ্রুপদকন্যার পাণিগ্রহণ।

দ্রুপদ কহিলেন, মহর্ষে! পূর্ব্বে সবিশেষ শ্রবণ না করিয়া অন্যথা করিবার যত্ন পাইয়াছিলাম; এক্ষণে আপনার নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলাম। দৈবের প্রতিকূলাচরণ করা নরলোকের অসাধ্য, অতএব দেবতারা যাহা বিধান করিয়াছেন, তাহাই বিধেয় ও শ্রেয়স্কর, সন্দেহ নাই। অদৃষ্টের ফল অখণ্ডনীয়, স্বেচ্ছানুসারে কেহ কোন কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিতে পারেন না, বরহেতু যে বিধি নিদ্দিষ্ট হইয়াছে, তাহাই অবশ্য কর্তব্য। ভগবান্ মহাদেব প্রীত হইয়া কৃষ্ণার প্রার্থনানুসারে তাঁহাকে অভিলষিত বরদান করিয়াছেন, এক্ষণে ইহার ভালমন্দ দেবতাই জানেন। যখন মহাদেব এইরূপ বিধান করিয়াছেন, তখন ইহাতে ধৰ্ম্মই হউক বা অধর্মই হউক, আমি এ বিষয়ে অপরাধী নহি। পাণ্ডবেরা বিধিপূর্ব্বক ইঁহার পাণিগ্রহণ করুন, ইঁহাদিগের নিমিত্ত কৃষ্ণা সৃষ্টা ও সমুদ্ভূতা হইয়াছেন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ভগবান্ ব্যাসদেব ধৰ্ম্ম-রাজকে কহিলেন, "অদ্য শুভদিন; অদ্য চন্দ্রমাঃ পুষ্যা নক্ষত্রে গমন করিবেন, অতএব অদ্যই অগ্রে তুমি দ্রৌপদীর পাণিপীড়ন কর"। রাজা যজ্ঞসেন পুত্র-সমভিব্যাহারে বহুসংখ্যক কন্যাযাত্রী নিমন্ত্রণ করিলেন এবং তনয়ার সর্ব্বাঙ্গ রত্নাভরণে বিভূষিত করিয়া আনয়ন করাইলেন। রাজার মন্ত্রিগণ, সুহৃদ্বর্গ, প্রধান প্রধান পুরবাসী লোক ও ব্রাহ্মণসকল প্রীতমনে বিবাহদর্শনে আগমন করিতে লাগিলেন। রাজভবন জনগণে পরিশোভিত হইল। চত্বরভূমি প্রফুল্লপঙ্কজমালাপরিকীর্ণ এবং সৈন্যসামন্ত ও বিচিত্র রত্নসমূহে খচিত হইয়া পার্ব্বণ-শব্বরীর' তারকাব্যাপ্ত নির্মূল নভোমণ্ডলের ন্যায় দীপ্তি পাইতে লাগিল।

অনন্তর কৌরবরাজপুত্রেরা সুস্নাত হইয়া মাঙ্গল্য ক্রিয়া সকল সমাপনান্তে মহার্হ বেশভূষা সমাধানপূর্ব্বক পুরোহিত ধৌম্যসমভিব্যাহারে সভামধ্যে প্রবেশ করিলেন। বেদবিৎ পুরোহিত বহ্নি স্থাপন ও মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক প্রজ্বলিত হুতাশনে আহুতি প্রদান করিয়া যুধিষ্ঠিরের সহিত কৃষ্ণার পাণিগ্রহণক্রিয়া সম্পাদন করিলেন। পরে উভয়কে অগ্নি প্রদক্ষিণ করাইয়া পরিণয় সমাপন করিলেন। অনন্তর যুধিষ্ঠিরকে অনুমতি করিয়া পুরোহিত রাজগৃহ হইতে বহির্গমন করিলেন। পরিশেষে অপর পাণ্ডবেরা উল্লিখিত প্রণালীক্রমে সেই বরবর্ণিনীর পাণিগ্রহণ করিলেন। মহারাজ! এইরূপে মহারথ কৌরবেরা অহরহঃ অধিকতর শোভা ধারণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে যত দিবস অতীত হইতে লাগিল, মহানুভবা দ্রৌপদীর কন্যাভাবের কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য হইল না।

পরিণয় সম্পন্ন হইলে দ্রুপদরাজ পাণ্ডবদিগকে বহুবিধ ধন ও পর্ব্বতের ন্যায় মহোন্নত একশত হস্তী, মহার্হ বেশভূষা-বিভূষিত একশত দাসী এবং সুবর্ণালঙ্কৃত ও সুবর্ণপ্রগ্রহোপেত। অশ্বচতুষ্টয়যোজিত একশত রথ প্রদান করিলেন। মহানুভব দ্রুপদরাজ সমাগত দর্শকদিগকে পৃথক্ পৃথক্ ধন, মহামূল্য পরিচ্ছদ ও প্রভাভাস্বর' বিভূষণ প্রদানপূর্ব্বক বিদায় করিলেন। অনন্তর ইন্দ্রপ্রতিম পাণ্ডবগণ সেই অলোকসামান্য স্ত্রীরত্নলাভকরিয়া পাঞ্চালরাজপুরে পরম সুখে বিহার করিতে লাগিলেন।

দ্রৌপদীকে কুন্তীর আশীর্ব্বাদ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, পাণ্ডবগণ সহায় হওয়াতে দ্রুপদের দেবতা হইতেও আর আশঙ্কা রহিল না। পুরনারিগণ কুন্তীকে পাইয়া তাঁহার নাম সংকীর্ত্তনপূর্ব্বক চরণবন্দনা করিলেন। মঙ্গলসূত্রধারিণী অবগুণ্ঠনবতী দ্রৌপদী শত্রুকে অভিবাদনপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে বিনীতভাবে সমীপদেশে দণ্ডায়মান হইলেন। কুত্তী, সেই সুশীলা সদাচারসম্পন্না, সুরূপা, সর্ব্বলক্ষণাক্রান্তা পুত্র-বধূকে স্নেহসম্ভাষণপূর্ব্বক আশীর্ব্বাদ করিলেন, "বৎসে। ইন্দ্রাণী ইন্দ্রের প্রতি, স্বাহা বিভাবসুর প্রতি, রোহিণী চন্দ্রের প্রতি, দময়ন্তী নলের প্রতি, ভদ্রা বৈশ্রবণের প্রতি, অরুন্ধতী বশিষ্ঠের প্রতি এবং লক্ষ্মী নারায়ণের প্রতি যেমন ভক্তিমতী ও প্রণয়বর্তী হইয়াছেন, তুমি ভর্তৃগণের প্রতি তদনুরূপ হও। হে ভদ্রে। তুমি বীর সন্তান প্রসব করিবে, স্বামীসহ যজ্ঞে দীক্ষিত হইবে, তোমার সৌভাগ্যের পরিসীমা থাকিবে না। হে বৎসে। তুমি অতিথি, গৃহাগত সাধু, বালক, বৃদ্ধ ও গুরুজনের সৎকারে ব্যাপৃত হইয়া সময় যাপন করিবে। তোমা হইতে কুরুজাঙ্গল প্রভৃতি প্রধান প্রধান জনপদে রাজা অভিষিক্ত হইবেন। অশ্বমেধ যজ্ঞে স্বামীদিগের বলবিক্রমা-জ্জিত বসুমতী বিপ্রসাৎ করিয়া এবং পৃথিবীর উৎকৃষ্ট বস্তুজাত প্রাপ্ত হইয়া শত শত বৎসর পরম সুখে কালযাপন করিবে। হে বৎসে। অদ্য তোমাকে যেমন অভিনন্দন করিলাম, তুমি পুত্রবতী হও, পুনর্ব্বার এইরূপ অভিনন্দন করিব।”

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ কৃতদার পাণ্ডবদিগের যৌতুকস্বরূপ বিচিত্র বৈদূর্য্য মণি, সুবর্ণের আভরণ, নানাদেশীয় মহার্হ বসন, রমণীয় শয্যা, বিবিধ গৃহসামগ্রী, বহুসংখ্যক দাস দাসী, সুশিক্ষিত গজবৃন্দ, উৎকৃষ্ট ঘোটকাবলী, অসংখ্য রথ এবং কোটি কোটি রজত কাঞ্চন, শ্রেণীবদ্ধ করিয়া প্রেরণ করিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কৃষ্ণপ্রেরিত দ্রব্যসামগ্রীসকল আহ্লাদপূর্ব্বক গ্রহণ করিলেন।

বৈবাহিক পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


আদিপর্ব

বিদুরাগমন পর্ব্বাধ্যায়।

পাণ্ডবগণের পরিচয় প্রকাশ ও দুর্য্যোধনের দুশ্চিন্তা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এদিকে কৌরবকুলের বিশ্বাসভূমি' গূঢ়চরেরা আসিয়া রাজাদিগকে সমাচার প্রদান করিলেন যে, পাণ্ডবেরা দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। যে মহাত্মা সেই শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক লক্ষ্য বিদ্ধ করিয়াছিলেন, তাঁহার নাম অর্জুন। তিনি সমস্ত বিজয়ীর শ্রেষ্ঠ। আর যিনি সমরসাগরে অবতীর্ণ হইয়া মদ্রাধিপতি শল্যকে উৎক্ষিপ্ত ও ভূতলে পাতিত করেন এবং পাদপাঘাতে অরাতিসকলকে সন্ত্রাসিত করিয়াছিলেন, সংগ্রামে যাঁহার ভয়সম্ভ্রমের লেশমাত্রও দেখিতে পাওয়া যায় নাই, যাঁহার স্পর্শ শত্রুসেনারা অনল-স্পর্শসম ভীষণ বলিয়া বোধ করিয়াছিল, সেই মহাত্মার নাম ভীম। সেই প্রশান্তস্বভাব ব্রাহ্মণরূপী পুরুষদিগকে পাণ্ডব জানিয়া রাজগণ সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। পূর্ব্বে সকলেই শ্রবণ করিয়াছিলেন যে, কুন্তী পুত্রগণ সমভিব্যাহারে জতুগৃহে দহনদগ্ধ হইয়াছেন, এক্ষণে তাঁহারা জীবিত আছেন শুনিয়া, জন্মান্তর লাভ করিয়াছেন বলিয়া মনে করিতে লাগিলেন। পুরোচনকৃত নৃশংস ব্যবহার রাজাদিগের স্মৃতিপথে উদিত হওয়াতে তাঁহারা ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্মকে ধিক্কার প্রদান করিতে লাগিলেন। স্বয়ংবর সম্পন্ন হইলে সকল রাজগণ পাণ্ডবদিগকে চিনিতে পারিয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।

অর্জুন লক্ষ্য বিদ্ধ করিলেন দেখিয়া রাজা দুর্য্যোধন সাতগুণ অশ্বত্থামা, শকুনি, কৃপাচার্য্য ও কর্ণ সমভিব্যাহারে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। দুঃশাসন লজ্জিত হইয়া ধীরে ধীরে তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, রাজন! তিনি ব্রাহ্মণরূপী না হইলে দ্রৌপদীকে লাভ করিতে পারিতেন না। তাঁহাকে ধনঞ্জয় বলিয়া কেহই যথার্থ চিনিতে পারেন নাই। দৈব ও পুরুষকারের মধ্যে দৈবই শ্রেষ্ঠ, পুরুষকার নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। দেখুন, আমরা পুরুষকার অবলম্বনপূর্ব্বক পাণ্ডবগণের কত প্রকার অনিষ্টচেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু তাহারা অদ্যাপি জীবিত রহিয়াছে; অতএব পুরুষকারকে ধিক্কার প্রদান করি। তাঁহারা দুঃখিত ও বিগতচেতাঃ হইয়া এইরূপ কথোপকথন ও পুরোচনকে নিন্দা করত হস্তিনাপুরে প্রবেশ করিলেন; দুর্য্যোধন প্রভৃতি সকলে মহাতেজাঃ পাণ্ডবদিগকে অগ্নি হইতে বিনির্মুক্ত ও দ্রুপদের সহিত সংযুক্ত দেখিয়া এবং শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও অন্যান্য দ্রুপদপুত্রদিগকে যুদ্ধবিশারদ চিন্তা করিয়া সাতিশয় ভীত হইলেন এবং তাঁহাদিগের সঙ্কল্প শিথিল হইয়া পড়িল।

ধৃতরাষ্ট্রের কপট আনন্দ।

অনন্তর যখন বিদুর শ্রবণ করিলেন যে, পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীর পাণিপীড়ন করিয়াছেন এবং ধৃতরাষ্ট্রতনয়েরা লজ্জিত ও ভগ্নদর্প হইয়া প্রত্যাগত হইয়াছেন, তখন তাঁহার প্রীতির আর পরিসীমা রহিল না। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! ভাগ্যবলে কৌরবেরা বিজয় লাভকরিয়াছেন। ধৃতরাষ্ট্র বিদুরবাক্য শ্রবণগোচর করিয়া আহ্লাদপূর্ব্বক কহিলেন, কি সৌভাগ্য! কি সৌভাগ্য! বিদুর! কি শুভ সমাচারই প্রদান করিলে! তৎকালে সেই প্রজ্ঞাচক্ষুঃ রাজা বিশেষ বুঝিতে না পারিয়া মনে করিয়াছিলেন যে দ্রৌপদী তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্য্যোধনকেই বরমাল্য প্রদান করিয়াছেন; এই নিমিত্ত তিনি আজ্ঞা প্রদান করিলেন, যেন দুর্য্যোধন দ্রৌপদীকে বহুবিধ ভূষণে ভূষিত করিয়া তাঁহার সমীপে আনয়ন করেন। বিদুর তাঁহার মনোগত ভাব বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, মহারাজ! পাণ্ডবেরা বরমাল্য প্রাপ্ত হইয়াছেন। তাঁহারা সকলেই কুশলে আছেন, দ্রুপদরাজ তাঁহাদিগকে যথেষ্ট সমাদর ও সম্মান করিয়াছেন। সেই স্বয়ংবর প্রদেশে তুল্যবলশালী অনেকানেক বন্ধুবান্ধব আসিয়া তাঁহাদিগের সহিত মিলিত হইয়াছেন।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ভালই হইয়াছে। তাঁহারা পাণ্ডুর পুত্র বটে, কিন্তু আমি তাঁহাদিগকে স্বীয় সন্তান অপেক্ষাও অধিক মনে করি, তাঁহাদিগের প্রতি আমার সমধিক স্নেহ আছে। যখন সেই মহাবীর পাণ্ডবেরা ক্ষেমবান্ এবং মহাবলপরাক্রান্ত বান্ধবগণের সহিত মিলিত হইয়াছেন, তখন বিলক্ষণ প্রতীত হইতেছে যে, আমার দুরাত্মা পুত্রদিগের আর নিস্তার নাই। সবান্ধব দ্রুপদের সহিত মিত্রতা করিয়া, কোন্ ক্ষত্রিয় কৃতকার্য্য হইতে বাসনা না করে? বিদুর, ধৃতরাষ্ট্রকে পুনর্ব্বার কহিলেন, মহারাজ! চিরকাল যেন আপনার এইরূপ বুদ্ধি থাকে।

অনন্তর দুর্য্যোধন এবং কর্ণ ধৃতরাষ্ট্রের নিকট আগমন-পূর্ব্বক নিবেদন করিলেন, তাত। বিদুরের সন্নিধানে আমরা কোন প্রকার দোষ কীর্ত্তন করিতে পারিব না; অতএব আমা-দিগের অভিলাষ যে, বিজনপ্রদেশে আপনাকে নিবেদন করি, এ আপনার কীদৃশী ইচ্ছা, বিপক্ষের বৃদ্ধিকে আপন বৃদ্ধি বলিয়া মনে করিতেছেন? বিদুরের নিকট সপত্নদিগের স্তুতিবাদ করিতেছেন এবং কর্তব্য কর্মে মনোযোগ করিতেছেন না? হে তাত! শত্রুদিগের বলবিঘাত' করা সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য হইয়াছে। এক্ষণে আপনার উত্তম সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব এমন একটি মন্ত্রণা করা আবশ্যক যে, তাহারা যেন আমাদিগের পুত্রগণ ও বন্ধুবান্ধবদিগকে গ্রাস করিতে না পারে।

পাণ্ডবদিগের হেয় প্রতিপন্নার্থে ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রণা-ভিক্ষা।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, তোমাদিগের যাহা অভিলাষ, আমি তাহাতেই সম্মত আছি! বিদুরের নিকট অভিসন্ধি গোপন রাখাই আমাদের উচিত। আমি তন্নিমিত্তই তাহার নিকট সর্ব্বদা পাণ্ডবদিগের গুণকীর্ত্তন করিয়া থাকি। বিদুর আকার বা ইঙ্গিত দ্বারা আমার অভিপ্রায় কিছুমাত্র বুঝিতে পারেন না। হে সুযোধন! তুমি যাহা বিবেচনা করিয়াছ বল। হে রাধেয়! তুমিও যাহা মনে করিয়াছ বল, এ সময়ে বলিবার কোন বাধা নাই। দুর্যোধন কহিলেন, তাত। অদ্য সুবিশ্বস্ত ও সুনিপুণ কতিপয় ব্রাহ্মণদ্বারা গোপনে কুন্তীতনয় ও মাদ্রীসুত যুগলের পরস্পর ভেদোৎপাদন করিব, অথবা দ্রুপদরাজ এবং তদীয় পুত্রগণ ও অমাত্যবর্গকে বিপুল ধনরাশিদ্বারা বশীভূত করিব, যাহাতে তাঁহারা যুধিষ্ঠিরকে পরিত্যাগ করেন, কিংবা তথায় বাস করিতে প্রবৃত্তি দেন এবং যেন তাহাদিগের সমক্ষে সর্ব্বদা বলেন যে, তাহাদের হস্তিনাপুরে বাস করা অতীব দোষাবহ; এইরূপ করিলে তাহারা পরস্পর অনৈক্য প্রযুক্ত কোন পরামর্শ না করিয়া তথায় বাস করিতে অভিরুচি করিবেন, সন্দেহ নাই। অথবা উপায়নিপুণ-কুশল পুরুষেরা কুন্তীতনয়দিগের অনুগত হইয়া তাহাদিগের সৌভ্রাত্র ভঙ্গ করিয়া দিক, কিংবা বহুপতির অশেষ দোষোল্লেখপূর্ব্বক কৃষ্ণার হৃদয় দূষিত করিয়া কলহোৎপাদন করুক, অথবা দ্রৌপদীর প্রতি পাণ্ডবগণের চিত্রভেদ, পশ্চাৎ পাণ্ডবদিগের প্রতি দ্রৌপদীর মনের মালিন্য জন্মাইয়া দিক। অথবা উপায়কুশল কতিপয় ছদ্মবেশী পুরুষ নির্জনে ভীমসেনকে বিনষ্ট করুক, যেহেতু ভীমই তাহাদের সর্ব্বাপেক্ষা অধিক বলবান। অর্জুন তাহার সাহসেই সাহসী হইয়া আমাদিগের তৃণতুল্য জ্ঞান করে; যেহেতু ভীমই সর্ব্বাপেক্ষা বলবান, প্রচণ্ড ও পাণ্ডবগণের আশ্রয়ভূত। তাহাকে নিহত করিতে পারিলেই সকলে নিস্তেজ ও ভগ্নোৎসাহ হইয়া রাজ্যের নিমিত্ত কিছুমাত্র যত্ন করিবে না। বৃকোদর পৃষ্ঠরক্ষা করিলে অর্জুনকে পরাজয় করা দুঃসাধ্য, কিন্তু ভীম ব্যতিরেকে অর্জুন একাকী রণস্থলে কর্ণের চতুর্থাংশ রূপে পরিগণিত হইতে পারে কি না সন্দেহ! তাহারা ভীম ব্যতীত আপনাদিগকে দুর্ব্বল ও আমাদিগকে বলাধিক জানিয়া আর রাজ্যের নিমিত্ত যত্ন করিবে না। যদ্যপি এখানে আসিয়া আমাদিগের নির্দেশবর্তী হইয়া চলে, তবে তাহাদের বিনাশচেষ্টা করিতে ত্রুটি করিব না। অথবা সুরূপা প্রমদাগণদ্বারা একে একে তাহাদিগের সকলকেই প্রলোভন দেখান যাউক, তাহা হইলে কৃষ্ণা তাহাদিগের প্রতি বিরাগ প্রদর্শন করিবেন সন্দেহ নাই। কিংবা তাহাদিগকে আনয়ন করিবার নিমিত্ত রাধেয়কে প্রেরণ করুন এবং বিবিধ কৌশলদ্বারা তাহাদিগকে একত্র করিয়া কালগ্রাসে পাতিত করুন।

হে তাত! উল্লিখিত উপায়সমূহের মধ্যে আপনি যে উপায়টি উৎকৃষ্ট বিবেচনা করেন, অচিরাৎ তাহার প্রয়োগ করুন; কারণ ক্রমে সময় অতীত হইতেছে। তাহাদিগের নিগ্রহার্থ এই সকল চেষ্টাই সাধীয়সী বোধ হইতেছে, কিন্তু ইহা ভাল কি মন্দ তাহা বলিতে পারি না। কেমন হে কর্ণ। তুমি কি বিবেচনা কর?

কর্ণের অভিমত।

কর্ণ কহিলেন, দুর্য্যোধন! তোমার প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত বোধ হইতেছে না। কৌশলদ্বারা তাহাদিগের অনিষ্টচেষ্টা করা নিরর্থক। পূর্ব্বেও ত তুমি সূক্ষ্ম উপায়দ্বারা তাহাদিগের নিগ্রহচেষ্টা পাইয়াছিলে, কিন্তু তাহাতে কৃতকার্য্য হইতে পার নাই। যখন পাণ্ডবেরা শৈশাবস্থায় সহায়বিহীন হইয়া এই স্থানে বর্তমান ছিল, তুমি তৎকালেও তাহাদিগের কোন হানি করিতে পার নাই। এক্ষণে ত তাহারা বৈদেশিক ও সহায়সম্পন্ন হইয়া সর্ব্বতোভাবে প্রবল হইয়াছে, অতএব আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, তুমি উক্ত উপায়কলাপ' দ্বারা তাহাদিগকে নষ্ট করিতে পারিবে না এবং কোন প্রকার ব্যসনেও কলুষিত করিতে পারিবে না। তাহারা দৈববলে আত্মরক্ষায় সমর্থ হইয়া পিতৃ-পৈতামহপদের ইচ্ছুক ও উপযুক্ত হইয়াছে। যাহারা এক পত্নীতে অনুরক্ত, তাহাদের সৌভ্রাত্র' অবশ্যই বদ্ধমূল হইবে, সংশয় নাই; সুতরাং তাহাদিগের পরস্পর ভেদ উপস্থিত করাও নিতান্ত সহজ ব্যাপার নহে। যে দ্রৌপদী তাদৃশ দীনাবস্থা নিরীক্ষণ করিয়াও পাণ্ডবদিগকে বরণ করিয়াছেন, অধুনা সেই দ্রৌপদী তাহাদিগের প্রতি বিরক্ত হইবেন, একথাও কোনক্রমেই সঙ্গত বোধ হয় না। বিশেষতঃ বহুভর্ভূতা স্ত্রীলোকদিগের অতীব আদরণীয়, কৃষ্ণা সেই রমণীকুলবাঞ্ছিত ফল বিনা যত্নে প্রাপ্ত হইয়াছেন, সুতরাং পতির প্রতি তাঁহার বিদ্বেষবুদ্ধি উৎপাদন করিতে কোনক্রমেই সমর্থ হইবে না। পাঞ্চালেশ্বর, পরম ধার্মিক ও ব্রতপরায়ণ; তাঁহার অর্থস্পৃহা নাই; তাঁহাকে অর্থরাশি প্রদান করিলেও তিনি পাণ্ডবদিগকে পরিত্যাগ করিবেন না; তাঁহার পুত্রও গুণবান্ ও পাণ্ডবগণের প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত; অতএব স্পষ্ট প্রতীত হইতেছে, পাণ্ডবেরা উপায়সাধ্য নহে; অতএব হে তাত! পাণ্ডবেরা বদ্ধমূল না হইতেই তাহাদিগকে যুদ্ধে বিনষ্ট করা আমাদিগের পক্ষে শ্রেয়ঃকল্প, আপনি তদ্বিষয়ে সবিশেষ মনোযোগী হউন। অস্মৎপক্ষ প্রবল ও পাঞ্চালপক্ষ হীনবল থাকিতে থাকিতেই তাহাদিগকে প্রহার করুন, আর বিলম্বের প্রয়োজন নাই। হে পার্থিব। যদবধি পাণ্ডবগণ গান্ধার রাজ্যে প্রভৃত বাহন, অসংখ্যক বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য লাভনা করিতেছে, যদবধি পাঞ্চালরাজ মহাবল পরাক্রান্ত স্বীয় পুত্রগণ সমভিব্যাহারে তাহাদিগের সাহায্যার্থ বদ্ধপরিকর হইতেছে এবং যদুবংশাবতংস কৃষ্ণ যাবৎ পাণ্ডবগণের রাজ্যের নিমিত্ত যাদব-বাহিনী লইয়া পাঞ্চালরাজসদনে সমাগত না হইতেছেন, তৎকালমধ্যে আপনি বিক্রম প্রকাশ করুন। যদি পাণ্ডবগণের নিমিত্ত সমস্ত ধনসম্পত্তি অশেষ ভোগসুখ ও রাজ্য পর্যন্তও পরিত্যাগ করিতে হয়, কৃষ্ণ তাহাতেও কখন পরাম্মুখ হইবেন না। হে মহারাজ! বিক্রমই ক্ষত্রিয়দিগের স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম। দেখুন, মহাত্মা ভরত বিক্রমদ্বারা পৃথিবী জয় করিয়াছেন এবং ইন্দ্র ত্রিলোকীর আধিপত্য প্রাপ্ত হইয়াছেন। আমরা ভবদীয় চতুরঙ্গিণী সেনা সমভিব্যাহারে ত্বরায় দ্রুপদের প্রাণ সংহারপূর্ব্বক পাণ্ডব-দিগকে আনয়ন করি। তাহাদিগের প্রতি সাম, দান, ভেদ এই ত্রিবিধ উপায় প্রযুক্ত করিলেও নিষ্ফল হইবে। তাহাদিগকে পরাজয় করিতে কেবল একমাত্র বিক্রমই সাধীয়ান্ উপায় আছে, অতএব বিক্রম প্রকাশদ্বারা তাহাদিগকে পরাভূত করিয়া অখণ্ড সাম্রাজ্য নিষ্কণ্টকে সম্ভোগ করুন। মহারাজ! বিক্রম ভিন্ন বিজয় লাভের আর কোন উপযুক্ত উপায়ান্তর লক্ষ্য হয় না।

রাধেয়বচন শ্রবণানন্তর ধৃতরাষ্ট্র তাঁহার প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিলেন, হে কৃতাস্ত্র মহাপ্রাজ্ঞ সূতনন্দন! ঈদৃশ বিক্রমসম্পন্ন বাক্য প্রয়োগ করা তোমার উপযুক্ত বটে, সন্দেহ নাই, কিন্তু ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর এবং তোমরা দুইজন পুনর্ব্বার মন্ত্রণা করিয়া যাহা আমাদিগের শ্রেয়স্কর বিবেচনা হয়, কর। অনন্তর রাজা ধৃতরাষ্ট্র পূর্ব্বোক্ত মন্ত্রীদিগকে আনয়নপূর্ব্বক তাঁহাদিগের সহিত মন্ত্রণা করিতে লাগিলেন।

ভীষ্মের পরামর্শ।

ভীষ্ম কহিলেন, পাণ্ডবগণের সহিত সংগ্রাম করা আমার অত্যন্ত অনভিমত। আমার নিকট ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু উভয়ই তুল্য। গান্ধারীতনয়দিগের সহিত আমার যেরূপ সম্বন্ধ, কুন্তীপুত্রদিগের সহিত তাহার কিছুমাত্র ন্যূন নহে। হে ধৃতরাষ্ট্র! তাহারা আমার, তোমার, দুর্য্যোধনের ও অন্যান্য কৌরবগণের রক্ষণীয়, সুতরাং তাহাদিগের সহিত যুদ্ধ করা সর্ব্বতোভাবে অবিধেয়। বরং অর্দ্ধেক রাজ্য প্রদানপূর্ব্বক সন্ধিস্থাপন করা উচিত, কারণ ইহা তাহাদিগেরও পৈত্রিক রাজ্য। বৎস দুর্য্যোধন! তুমি যেমন মনে করিতেছ, ইহা আমার পৈত্রিক রাজ্য, পাণ্ডবেরাও সেইরূপ বিবেচনা করিয়া থাকে। যদি মহাযশাঃ পাণ্ডবেরা রাজ্য প্রাপ্ত না হয়েন, তবে তুমি কোন্ শাস্ত্রানুসারে রাজ্য লাভ করিবে? এবং তোমাদের পর ভরতবংশে যে সকল রাজকুমারেরা জন্মগ্রহণ করিবে, তাহারাই বা কিরূপে প্রাপ্ত হইবে? অথবা যেমন তুমি ধৰ্ম্মতঃ রাজ্যলাভ করিয়াছ, তাহারাও ইতিপূর্ব্বে রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হইয়াছিল; অতএব বিবাদে প্রয়োজন নাই, সৌহার্দপূর্ব্বক তাহাদিগকে রাজ্যার্দ্ধ প্রদান করিলেই উভয় পক্ষের মঙ্গল, ইহার অন্যথাচরণ করিলে আমাদিগের অত্যন্ত অহিত কৰ্ম্ম করা হইবে এবং তোমারও অতিমাত্র অকীর্ত্তি- | ঘোষণা হইবে। অতএব হে তাত। কীর্ত্তিরক্ষণে যত্নবান্ হও, কীর্তিই মানবজাতির অসাধারণ বল। কীর্তিবিহীন মনুষ্যের জীবনধারণ করা কেবল বিড়ম্বনামাত্র। যদবধি কীর্ত্তি অক্ষুণ্ণ থাকে, তাবৎ মনুষ্য সার্থকজন্মা। একবার কীর্তি লোপ হইলে লোক জন্মের মত উৎসন্ন হইয়া যায়। অতএব হে মহাবাহো। তোমার ও ত্বদীয় পূর্ব্বপুরুষগণের অনুরূপ কীর্ত্তিরক্ষারূপ কুলোচিত ধর্ম্মের অনুষ্ঠান কর। পৃথা ও তৎপুত্রেরা ভাগ্যবলে জীবিত রহিয়াছেন। পাপাত্মা পুরোচনের দুষ্টাভিসন্ধি সিদ্ধ না হইতেই সে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। যদবধি পাণ্ডবদিগের দাহবৃত্তান্ত প্রচারিত হইয়াছে, তৎকাল পর্যন্ত আমি লোকের নিকট মুখ দেখাইতে পারি না। কুন্তীর তাদৃশী দুরবস্থা শ্রবণে সকলে তোমাতেই দোষারোপ করিয়া থাকে, পুরোচনকে অনুমাত্র দোষী বিবেচনা করে না। অতএব এক্ষণে পাণ্ডবদিগের জীবিকা নির্দ্ধারণ ও তাহাদিগের আনয়ন তোমার দোষক্ষালনের একমাত্র উপায় আছে। হে কুরুনন্দন! পাণ্ডবেরা জীবিত থাকিতে স্বয়ং ইন্দ্র ও তাহাদিগের পৈত্রিক অংশ গ্রহণ করিতে পারিবেন না। রাজ্যে উভয়েরই তুল্যাধিকার আছে বটে, কিন্তু বিশেষ এই যে, তাহারা সকলেই এই মতাবলম্বী, ধৰ্ম্মনিরত ও অধৰ্ম্ম-পরাজুখ। অতএব যদি ধৰ্ম্মরক্ষা করা কর্তব্য হয়, আমার প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান করা উচিত বোধ হয় এবং আত্মকুশলের অভিলাষ থাকে, তবে পাণ্ডবদিগকে অর্দ্ধ রাজ্য প্রদান করা সর্ব্বতোভাবে বিধেয়।

দ্রোণাচার্য্যের অভিমত।

দ্রোণাচার্য্য কহিলেন, মহারাজ! শাস্ত্রে শ্রবণ করিয়াছি, মন্ত্রণার্থ আনীত হিতৈষী পুরুষদিগের ধর্মার্থসঙ্গত ও যশস্কর কথা কীর্তন করা কর্তব্য। এ বিষয়ে মহাত্মা ভীষ্মের যে মত, আমারও সেই মত। কুন্তীপুত্রদিগকে রাজ্যভাগ প্রদান করাই বিধেয়, ইহা হইলেই সনাতনধৰ্ম্ম রক্ষা পায়। অতএব হে মহারাজ! পাণ্ডব-দিগের নিমিত্ত প্রভৃত রত্নপ্রদানপূর্ব্বক কোন এক প্রিয়ংবদ ব্যক্তিকে অবিলম্বে দ্রুপদ-সন্নিধানে প্রেরণ করুন। সেই ব্যক্তি তথায় উপস্থিত হইয়া দ্রুপদকে বলুক যে, আপনার সহিত সম্বন্ধলাভে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পরম সৌভাগ্য বোধ করিয়াছেন। আপনি ও দুর্য্যোধন উভয়েই এ বিষয়ে সাতিশয় প্রীত হইয়াছেন, ইহাও যেন দ্রুপদ ও ধৃষ্টদ্যুম্নের নিকট বারংবার উল্লেখ করে। তৎপরে কুন্তীনন্দন যুধিষ্ঠিরাদি ও মাদ্রীতনয় নকুল সহদেবকে পুনঃ পুনঃ সান্ত্বনা করিয়া স্বজনসম্বন্ধের ঔচিত্য ও প্রিয়ত্ব কীর্ত্তন করিবে। হে রাজেন্দ্র! আপনার আদেশানুসারে ঐ পুরুষ সুবর্ণময় শুভ্র বহুবিধ আভরণ দ্রৌপদী, দ্রুপদতনয় ও কুন্তীর সহচরীকে সমর্পণ করুক। দ্রুপদ ও পাণ্ডবদিগের এইরূপ সান্ত্বনাবাক্য প্রয়োগ করিয়া পরিশেষে পাণ্ডবদিগের আগমনের কথা উত্থাপন করুক। দ্রুপদ পাণ্ডবদিগকে প্রত্যাগমনের আদেশ করিলে তাঁহাদিগকে আনয়ন করিবার নিমিত্ত দুঃশাসন, বিকর্ণ ও সুশোভিত সৈন্যমণ্ডলী গমন করুক। পাণ্ডবেরা আগমনপূর্ব্বক প্রকৃতিগণকর্তৃক অনুমত হইয়া তোমার সহিত পৈত্রিকপদে প্রতিষ্ঠিত হইবেন। হে মহারাজ! ভীষ্ম ও আমার মত এই যে, আপনি স্বাত্মজতুল্য পাণ্ডবদিগের প্রতি এইরূপ উপায় প্রয়োগ করেন।

কর্ণের কুমন্ত্রণা।

কর্ণ কহিলেন, মহারাজ! আপনি যাঁহাদিগকে সর্ব্বদা অর্থ ও মানদ্বারা সৎকার করিয়া থাকেন এবং সর্ব্বকার্য্যে যাঁহাদিগের পরামর্শ গ্রহণ করেন, সেই ভীষ্ম ও দ্রোণ আপনাকে সন্মন্ত্রণা প্রদান করিলেন না, ইহা অপেক্ষা আর কি আছে? যিনি দুষ্ট মনঃ ও প্রচ্ছন্ন অন্তঃকরণদ্বারা অন্যকে হিতোপদেশ দেন, তিনি কিরূপ সাধুসম্মত হইতে পারেন? হিতার্থে হউক বা অহিতার্থে হউক, অর্থবান্ ব্যক্তি কৃতপ্রজ্ঞ হউন বা অকৃতপ্রজ্ঞ হউন, বালক হউন বা বৃদ্ধই হউন, সহায়সম্পন্ন হউন বা অসহায়-সম্পন্ন হউন, সর্ব্বত্র সমুদায় লাভ করিতে পারেন।

এরূপ কিংবদন্তী আছে যে, পূর্ব্বকালে রাজগৃহনামক নগরে মগধরাজবংশীয় অম্বুবীচনামা এক রাজা ছিলেন। ইন্দ্রিয়বিকল ও শ্বাসরোগগ্রস্ত সেই ভূপাল কেবল অমাত্যগণের সাহায্যে সমুদায় রাজকার্য্য পর্যালোচনা করিতেন। মহাকর্ণি নামে তাঁহার এক মন্ত্রী ছিল। ঐ মূর্খ মন্ত্রী রাজ্যমধ্যে একাধিপত্যলাভও আপনাকে সর্ব্বাপেক্ষা বলসম্পন্ন অনুমান করিয়া নানা প্রকারে অবনীপালকে অবমাননা করিতে লাগিল এবং ভূপাল-ভোগ্য অঙ্গনারত্ন ও ধনসম্পত্তিসমুদায় স্বয়ং সর্ব্বতোভাবে অধিকার করিল। এই সমস্ত অধিকার করিয়াও সেই লুব্ধপ্রকৃতি মন্ত্রীর অন্যান্য বস্তুলাভে লোভবৃত্তি পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। প্রভুর সর্ব্বস্ব আত্মসাৎ করিয়াও তাহার উদরপূর্তি হইল না। পরিশেষে সমস্ত রাজ্যসম্পত্তি হস্তগত করিবার নিমিত্ত লোলুপ হইল। আমরা শুনিয়াছি যে, ঐ মন্ত্রী বহুবিধ কৌশল করিয়াও তদীয় রাজ্যাধিকার করিতে পারিল না। ইহাতে বুঝা গেল যে, তাঁহার সেই পুরুষেন্দ্রতা' কোন অনির্বচনীয় কারণপ্রযুক্ত হইবে, সন্দেহ নাই। অতএব হে মহারাজ! যদি ভাগ্যে থাকে, তবে সমুদায় লোক বিরোধী হইলেও আপনি অনায়াসে রাজ্যলাভকরিবেন; নতুবা একান্ত যত্ন করিলেও রাজ্যলাভ হওয়া দুর্ঘট হইয়া উঠিবে। এক্ষণে মন্ত্রিগণের সাধুতা ও অসাধুতা পর্যালোচনা করিয়া দুষ্টের ও সতের বাক্য বিবেচনা করুন।

দ্রোণ কহিলেন, কর্ণ! বুঝিলাম, তুমি কেবল আপনার মনোগত ভাবদোষে এই কথার উল্লেখ করিতেছ। রে দুষ্ট! তুমি পাণ্ডবদিগের নিমিত্ত রাজার নিকট আমাদিগের প্রতি দোষারোপ করিতেছ। হে কর্ণ! আমি পরম হিতকর বাক্য কহিয়াছি, তুমি সেই বাক্যকে দুষ্টবাক্য কহিতেছ, যদি ইহা অপেক্ষা কোন সুপরামর্শ প্রদান করিতে পার, কর, কিন্তু আমার মতে ইহার অন্যথা করিলেই কুরুবংশ সমূলে ধ্বংস হইবে, সন্দেহ নাই।

বিদুরের সুপরামর্শ।

বিদুর কহিলেন, মহারাজ! ব্রাহ্মণগণ আপনাকে অবশ্যই হিতোপদেশ প্রদান করিবেন, কিন্তু আপনার শ্রবণেচ্ছা না থাকিলে সেই বাজ্জাল সকলই বিফল হইবে। কুরুপ্রধান ভীষ্ম আপনাকে প্রিয় ও হিতবাক্যে উপদেশ দিয়াছিলেন, কিন্তু আপনি তাহা গ্রহণ করিলেন না এবং দ্রোণও বহুতর শ্রেয়স্কর কথা কহিয়াছেন, কিন্তু রাধাপুত্র কর্ণ তাহা আপনার হিতকর বিবেচনা করিলেন না। এক্ষণে এই দুই পুরুষসিংহ অপেক্ষা কোন্ ব্যক্তি অধিক বুদ্ধিমান ও আপনার পরম মিত্র ইহা ভাবিয়া স্থির করিতে পারিতেছি না। ইঁহারা বিদ্যা, বুদ্ধি ও বয়ঃক্রমে সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং আপনার ও যুধিষ্ঠিরাদির প্রতি সমভাবে স্নেহ করিয়া থাকেন। ইঁহারা সত্যাচরণ ও ধর্মানুষ্ঠান বিষয়ে দাশরথি রাম ও গয় অপেক্ষা কোন অংশে ন্যূন নহেন। ইঁহারা পূর্ব্বে কদাচ আপনাকে অহিতবাক্যে উপদেশ দেন নাই এবং আপনার কোনরূপ অনিষ্ট চেষ্টা পাইয়াছেন ইহাও লক্ষ্য হয় না, অতএব এক্ষণে দ্রোণ ও ভীষ্ম মহারাজের অশুভ সঙ্কল্পে মন্ত্রণা করিবেন, ইহা নিতান্ত অশ্রদ্ধেয়। এই জীবলোকে এই দুই ব্যক্তিই অধিকতর প্রাজ্ঞ ও শ্রেষ্ঠ, সুতরাং ইঁহারা আপনাকে কখন কূটপরামর্শ প্রদান করিবেন না। আর ইঁহারা অর্থলোলুপ হইয়া অন্যতর পক্ষে পক্ষপাত প্রদর্শনপূর্ব্বক মন্ত্রণা করিবেন, ইহাও নিতান্ত অসম্ভব। অতএব হে মহারাজ। আপনার পক্ষে ইহাই শ্রেয়ঃকল্প বোধ হইতেছে। দুর্য্যোধন প্রভৃতি যেমন আপনার পুত্র, পাণ্ডবেরাও তদ্রুপ পুত্রস্থানীয়, সন্দেহ নাই। যাঁহারা এই বৃত্তান্ত সম্যক্ না জানিয়া পাণ্ডবপক্ষে কুমন্ত্রণা প্রদান করিবেন, সেই মন্ত্রী কোন অংশে সাধুদর্শী নহেন। কিন্তু যদি আপনার স্বীয় সন্তানগণের নিমিত্ত অন্তঃকরণে কোন বিশেষ অভিসন্ধি করিয়া থাকেন, আর মন্ত্রীরা যদি তাহা প্রকাশ করেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আপনার হিতানুষ্ঠান করা হইবে না। মহাত্মা ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্য্য এই নিমিত্ত আপনার মনোগত ভাব জিজ্ঞাসা করেন নাই।

হে মহারাজ! ইঁহারা যে পাণ্ডবদিগের অজেয়ত্ব কীর্ত্তন করিলেন, তাহার যথার্থ্য বিষয়ে কোন সন্দেহ করিবেন না, আপনার মঙ্গল হউক। দেবরাজ ইন্দ্র কি সেই শ্রীমান্ অর্জুনকে যুদ্ধে পরাজয় করিতে পারেন? অযুত মাতঙ্গতুল্য বলশালী ভীমসেনকে দেবতাবাও সংগ্রামে পরাজয় করিতে সমর্থ নহেন। কোন্ ব্যক্তি জীবনেচ্ছা সত্ত্বে সেই যমসদৃশ যমজ নকুল সহদেবকে যুদ্ধে পরাজয় করিতে অগ্রসর হইবে? ধৈর্য্য, ক্ষমা, সত্য ও দয়াগুণে অলঙ্কৃত পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে রণে সহ্য করে এমন লোক ত্রিজগতে লক্ষ্য হয় না। বিশেষতঃ বলদেব ও সাত্যকি যাঁহাদিগের পক্ষ, বাসুদেব মন্ত্রী, পাঞ্চালরাজ শ্বশুর এবং মহাবলপরাক্রান্ত ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি ভ্রাতৃবর্গ শ্যালক, সেই দুর্জয় পাণ্ডবেরা যুদ্ধে কাহাকে না পরাজয় করিতে পারেন? অতএব এক্ষণে তাঁহাদিগকে নিতান্ত দুর্জয় বিবেচনা করিয়া ধর্মানুসারে পৈত্রিক ধন বিভাগ করিয়া দিন। অদ্য পাণ্ডবদিগের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়া পুরোচনকৃত যে মহতী অকীর্ত্তি ত্বৎকৃত বলিয়া লোকবিদিত হইয়াছে, তাহা ক্ষালন করুন। পাণ্ডবগণের প্রতি অনুগ্রহ ও তাঁহাদিগের জীবন আমাদিগের ক্ষত্রিয় জাতির সর্ব্বতোভাবে শ্রেয়স্কর। পূর্ব্বে মহারাজ দ্রুপদের সহিত আমাদিগের বৈরভাব ছিল, এক্ষণে তাঁহাকে সংগ্রহ করিলেও স্বপক্ষের মঙ্গল করা হইবে। যাদবেরা বহুসংখ্যক ও মহাবলপরাক্রান্ত, বিশেষতঃ যে পক্ষে কৃষ্ণ, তাঁহারাও সেই পক্ষে অবশ্যই থাকিবেন, সুতরাং যে পক্ষে কৃষ্ণ তৎপক্ষে নিশ্চয়ই জয় লাভ হইবে। হে রাজন। যে কার্য্য সন্ধিদ্বারা সম্পাদন করিতে পারা যায়, কোন্ হতভাগ্য ব্যক্তি তাহার নিমিত্ত বিগ্রহ করিতে উদ্যত হইয়া থাকে?

মহারাজ। পৌর ও জানপদবর্গ, পাণ্ডবেরা জীবিত আছেন শুনিয়া তাঁহাদিগকে দেখিবার নিমিত্ত অতিমাত্র উৎসুক হইয়াছে, এক্ষণে তাহাদিগের প্রিয় কার্য্য সম্পাদন করুন। দুর্য্যোধন, কর্ণ ও শকুনি, ইহারা নিতান্ত অধার্মিক, দুর্বৃদ্ধি ও বালক, ইহাদিগের কথায় কর্ণপাত করিবেন না। আমি পূর্ব্বেই ত কহিয়াছি, দুর্য্যোধনের অপরাধে এই সুবিস্তীর্ণ রাজবংশ উচ্ছিন্ন হইবে।

পাঞ্চালরাজ্যে পাণ্ডবানয়নে বিদুরকে প্রেরণ।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে বিদুর। শান্তনুনন্দন ভীষ্ম ও মহর্ষি দ্রোণ ইঁহারা আমাকে শ্রেয়স্কর বিষয়েই উপদেশ দিয়াছেন, আর তুমি যাহা কহিতেছ, তাহাও অভ্রান্ত বটে। মহাবীর কুন্তীপুত্রগণ যেমন পাণ্ডুর পুত্র, ধৰ্ম্মতঃ আমারও সেইরূপ পুত্রস্থানীয়, সন্দেহ নাই; মৎপুত্রগণ যেমন এই রাজ্যের অধিকারী, তদ্রুপ পাণ্ডবেরাও অধিকারী সংশয় কি। অতএব হে বিদুর। তুমি যাও, সৎকার প্রদর্শনপূর্ব্বক কুন্তী ও দেবরূপিণী দ্রৌপদী সমভি-ব্যাহারে পাণ্ডুনন্দনদিগকে আনয়ন কর। আমাদিগের ভাগ্যবলে কুন্তী ও পাণ্ডবেরা জীবিত আছেন এবং আমাদিগের ভাগ্যবলেই তাঁহারা দ্রুপদকন্যা দ্রৌপদীকে লাভ করিয়াছেন। আমাদিগের কি সৌভাগ্য যে, দুৰ্ম্মন্ত্রী পুরোচন পাণ্ডবদিগের অপকার করিতে যাইয়া স্বয়ং পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে।

অনন্তর ধর্মজ্ঞ ও সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের আদেশানুসারে বিবিধ রত্ন ও ধনসম্পত্তি গ্রহণপূর্ব্বক দ্রুপদ ও পাণ্ডবদিগের সন্নিধানে উপনীত হইয়া দ্রুপদকে সংবর্দ্ধনা করিলেন। মহারাজ দ্রুপদও ধৰ্ম্মপথ অনুসরণ করিয়া সাদর সম্ভাষণপূর্ব্বক বিদুরকে ন্যায়ানুসারে অনাময় জিজ্ঞাসা করিলেন। অনন্তর বিদুর, বাসুদেব ও পাণ্ডবগণকে নয়নগোচর করিয়া স্নেহভরে আলিঙ্গন-পূর্ব্বক কুশল প্রশ্ন করিলেন। তাঁহারাও যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্রের আদেশক্রমে বারংবার সস্নেহ কুশল প্রশ্ন করিয়া তাঁহাদিগকে বিবিধ রত্ন ও বহুবিধ ধন প্রদান করিলেন। তদনন্তর কুন্তী, দ্রৌপদী ও দ্রুপদপুত্রদিগকে এবং পাণ্ডবগণকে যথাদত্ত ধন ও অলঙ্কার প্রদান করিয়া কেশব ও পাণ্ডবসন্নিধানে বিনীতবচনে দ্রুপদকে কহিলেন, মহারাজ। আমি যাহা নিবেদন করিতেছি, আপনি, আপন পুত্রগণ ও অমাত্যবর্গ, সকলেই শ্রবণ করুন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পুত্র ও অমাত্য সহিত সাতিশয় প্রীত হইয়া বারংবার আপনার কুশল জিজ্ঞাসা করিয়াছেন; আর তিনি আপনার সহিত এই সম্বন্ধ হওয়াতে নিতান্ত আহ্লাদিত হইয়াছেন; শান্তনুনন্দন ভীষ্ম ও কৌরবগণ আপনার সর্ব্বাঙ্গীণ মঙ্গলবার্তা জিজ্ঞাসা করিয়াছেন এবং আপনার প্রিয়সখা ভরদ্বাজনন্দন দ্রোণ, আপনাকে উদ্দেশে আলিঙ্গন করিয়া কুশল প্রশ্ন করিয়াছেন। ধৃতরাষ্ট্র ও কৌরবেরা আপনার সহিত সম্বন্ধলাভে আপনাদিগকে চরিতার্থ বোধ করিয়াছেন। হে যজ্ঞসেন! তাঁহারা এই সম্বন্ধে সংযত হইয়া যাদৃশ প্রীত হইয়াছেন, ইহা অপেক্ষা তাঁহাদিগের পক্ষে রাজ্যলাভও তাদৃশ প্রীতকর নহে। এক্ষণে এই সমস্ত অনুধাবন করিয়া পাণ্ডবগণকে তথায় গমন করিতে আদেশ করুন। কুরুবংশীয়েরা পাণ্ডুনন্দন-দিগকে সন্দর্শন করিবার নিমিত্ত সাতিশয় উৎসুক আছেন। কুন্তী ও পাণ্ডবেরা বহুদিবসাবধি প্রবাসে আছেন, সুতরাং ইঁহারাও রাজধানী দর্শন করিতে উৎসুক হইয়া থাকিবেন। পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকেরা এবং কৌরবমহিলাগণ পাঞ্চালী দ্রৌপদীকে দেখিবার নিমিত্ত প্রতীক্ষা করিতেছেন; অতএব আপনি অনতিবিলম্বে সস্ত্রীক পাণ্ডবগণকে গমন করিতে আদেশ করন। এ বিষয়ে আমার সম্পূর্ণ সম্মতি আছে। ইঁহারা তথায় গমন করিলে আমি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কতিপয় দ্রুতগামী দূত প্রেরণ করিব। তাহারা দ্রৌপদী, কুন্তী ও পাণ্ডুনন্দনদিগকে পুনরায় লইয়া আসিবে।

বিদুরাগমন পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


আদিপর্ব

রাজ্যলাভ পর্ব্বাধ্যায়।

দ্রুপদের সম্মতিদান।

দ্রুপদ কহিলেন, হে মহাপ্রাজ্ঞ বিদুর! তুমি যাহা কহিলে ইহা যথার্থ, কৌরবগণের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ হওয়াতে আমারও যথেষ্ট পরিতোষ জন্মিয়াছে। আর মহাত্মা পাণ্ডবগণের স্বদেশে গমন করা আমার মতে উচিত। কিন্তু আমি স্বয়ং ইঁহাদিগকে এ স্থান হইতে বিদায় করিতে পারি না। যাহা হউক, যদি মহাত্মা যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জুন, পুরুষশ্রেষ্ঠ নকুল ও সহদেব তথায় গমন করিতে মানস করেন এবং ইঁহাদের পরম প্রিয়কারী ধর্মাত্মা বলদেব ও বাসুদেবের ইহাতে সম্মতি থাকে, তাহা হইলে স্বরাজ্যে গমন করুন; তাহাতে আমার কিছুমাত্র আপত্তি নাই।

তখন যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে রাজন! আমি এবং আমার অনুজগণ আপনারই অধীন, অতএব আপনি যাহা আজ্ঞা করিবেন, তাহা আমাদের শিরোধার্য্য ও অবশ্য কর্ত্তব্য কার্য্য। কৃষ্ণ কহিলেন, পাণ্ডবগণের স্বদেশগমনে আমার সম্পূর্ণ মত আছে, অথবা সর্ব্বধৰ্ম্মবিৎ মহারাজ দ্রুপদের যে মত আমারও সেই মত।

দ্রুপদ কহিলেন, মহাবাহু পুরুষশ্রেষ্ঠ বাসুদেব যাহা কর্ত্তব্য বলিয়া বিবেচনা করিতেছেন তদ্বিষয়ে আমারও সম্পূর্ণ মত আছে। মহাভাগ পাণ্ডবগণ আমার ও কৃষ্ণের উভয়েরই সুহৃৎ, বিশেষতঃ পুরুষোত্তম বাসুদেব পাণ্ডবগণের যেরূপ মঙ্গল চিন্তা করেন, মহাত্মা যুধিষ্ঠির স্বয়ং সেরূপ করিতে পারেন না।

হস্তিনাপুরে পাণ্ডবদিগের আগমন।

পাণ্ডবগণ এইরূপে দ্রুপদ কর্তৃক স্বরাষ্ট্রগমনে সমনুজ্ঞাত হইয়া কৃষ্ণা ও যশস্বিনী কুন্তীকে সঙ্গে লইয়া কৃষ্ণ ও বিদুরের সমভিব্যাহারে পরমসুখে হস্তিনানগরে গমন করিলেন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুনন্দনগণ আগমন করিতেছেন শুনিয়া তাঁহাদের প্রত্যুদ্গমনের নিমিত্ত কৌরবগণ এবং ধনুর্দ্ধর বিকর্ণ, চিত্রসেন, দ্রোণ ও কৃপাচার্য্যকে পাঠাইলেন। মহাবল পরাক্রান্ত পাণ্ডব-গণ সেই সমুদায় জনগণকর্তৃক পরিবৃত হইয়া ক্রমে ক্রমে হস্তিনাপুরমধ্যে প্রবেশ করিলেন। তাঁহারা নগরে প্রবেশ করিবামাত্র নগরের সমস্ত লোক সাতিশয় কৌতূহলাক্রান্ত হইল। তখন সমাগত যাবতীয় প্রিয়চীকির্ষু পুরবাসীগণ মহাত্মা পাণ্ডু-তনয়দিগকে নানা প্রকার স্তব করিতে লাগিল। তাহারা কহিল, এই সেই ধৰ্ম্মজ্ঞ পুরুষশ্রেষ্ঠ পুনর্ব্বার আগমন করিতেছেন, যিনি আমাদিগের স্বীয় পুত্রের ন্যায় প্রতিপালন করেন। এই ধর্মাত্মা এখানে আসাতে বোধ হইতেছে, যেন সেই লোকপ্রিয় মহারাজ পাণ্ডু আমাদের হিতসাধনার্থে বন হইতে প্রত্যাগত হইলেন। আহা! আজ পাণ্ডুতনয়গণ নগরে পুনরাগত হওয়াতে আমাদের কি পর্য্যন্ত আহ্লাদ হইতেছে। আমরা যদি কখন দান করিয়া থাকি, যদি হোম করিয়া থাকি এবং যদি তপস্যা করিয়া থাকি, তবে সেই পুণ্যফলে পাণ্ডুনন্দনগণ শতায়ুঃ হইয়া এই নগরে বাস করুন।

তদনন্তর পাণ্ডুতনয়গণ জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র ও পিতামহ ভীষ্ম এবং অন্যান্য গুরুজনের পাদবন্দন করিলেন। পৌরগণ তাঁহাদিগকে কুশল জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। পরিশেষে তাঁহারা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞানুসারে গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন।

পাণ্ডুনন্দনগণ কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিলে পর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্ম তাঁহাদিগকে আহ্বান করিয়া আনিলেন। ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস কৌন্তেয়। তুমি ভ্রাতৃগণের সহিত আমার বাক্য শ্রবণ ও তাহার মর্ম্ম বিবেচনা কর। তোমরা রাজ্যের অর্থাংশ গ্রহণ করত খাণ্ডবপ্রন্থে গিয়া বাস কর, তাহা হইলে দুর্য্যোধনাদির সহিত তোমাদিগের পুনরায় বিবাদ হইবার আর সম্ভাবনা নাই। যেমন সুরপতি দেবগণকে রক্ষা করেন, অর্জুন খাণ্ডবপ্রস্থে তোমাদিগকে সেইরূপ রক্ষা করিলে আর কেহই তোমাদের অনিষ্ট করিতে পারিবে না।

পাণ্ডবগণের অর্দ্ধরাজ্যপ্রাপ্তি ও খাণ্ডবপ্রস্থে গমন।

পাণ্ডবগণ অর্দ্ধরাজ্যপ্রাপ্তির অনুমতি পাইয়া রাজাজ্ঞা স্বীকার ও তদীয় চরণে প্রণিপাতপূর্ব্বক কৃষ্ণসমভিব্যাহারে অরণ্য পথে খাণ্ডবপ্রস্থে প্রবেশ করিলেন। তাঁহাদিগের আগমনে খাণ্ডবপ্রস্থ অলঙ্কৃত ও সুনগরীর ন্যায় সুশোভিত হইল। তৎপরে তাঁহারা কোন পবিত্র স্থানে শান্তিকার্য্য সমাধা করিয়া নগরের পরিমাণ করিতে লাগিলেন। ঐ নগর সমুদ্রসদৃশ পরিখাদ্বারা অলঙ্কৃত; পাণ্ডুবর্ণ মেঘমালা ও হিমরশ্মির' ন্যায় গগনস্পর্শী প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত; শ্বেতনাগ সমাবৃত পাতালগঙ্গা ভোগবতীর ন্যায় সুশোভিত; গরুড়ের ন্যায় দ্বিপক্ষ দ্বারসমূহ ও পরম রমণীয় সৌধসমূহে সমাকীর্ণ মন্দর ভূধরের ন্যায় অত্যুন্নত; অস্ত্রশস্ত্র সুরক্ষিত গোপুরসমুদায়ে সুশোভিত; ভীষণ ভুজঙ্গমাকার শক্তি, তীক্ষ্ণ অঙ্কুশ, শতঘ্নী, লৌহচক্র প্রভৃতি অস্ত্রকলাপ, যন্ত্রসমুদায় ও তল্ল'সমূহদ্বারা অলঙ্কৃত এবং যোধগণকর্তৃক সুরক্ষিত। ঐ নগরমধ্যে সুবিস্তৃত রাজপথসকল সুবিভক্ত রহিয়াছে; কোন-প্রকার দৈব্য পীড়া নাই; সুধাধবলিত বিবিধ পরমোৎকৃষ্ট ভবন-সমুদায় চতুর্দিকে শোভা পাইতেছে। ফলতঃ ইন্দ্রপ্রস্থ নগর তৎকালে নভোমণ্ডলস্থ বিদ্যুৎসমাবৃত মেঘবৃন্দের ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিল। উহার মধ্যে পরম রমণীয় প্রদেশে কুবের গৃহতুল্য ধনসম্পন্ন কৌরবগৃহ বিরাজিত রহিয়াছে। নগরের চতুদ্দিকে আম্র, আম্রাতক, নীপ, অশোক, চম্পক, পুন্নাগ, নাগপুষ্প, লকুচ, পনস, শাল, তাল, তমাল, বকুল, কেতক, প্রাচীনামলক, লোধ, অঙ্কোল, জম্বু, পাটল, কুজক, অতিমুক্তক, করবীর, পারিজাত প্রভৃতি ফলপুষ্প-ভারনমিত সুমনোহর বৃক্ষসমুদায়ে পরিপূর্ণ উদ্যানসকল শোভা পাইতেছে। ঐ সমস্ত উদ্যানে মত্ত ময়ূর, কোকিল প্রভৃতি বিবিধ সুকণ্ঠ পক্ষিগণ সর্ব্বদা মধুরস্বরে গান করিতেছে। আদর্শের ন্যায় স্বচ্ছ বহুবিধ গৃহ, মনোহর লতাগৃহ ও বিচিত্র চিত্রগৃহসক্স উহার মনোহারিণী শোভা সম্পাদন করিতেছে। হংস, বক, চক্রবাক্, কারণ্ডব প্রভৃতি নানাজাতীয় জলচর পক্ষিগণে শোভিত, স্বচ্ছজলপরিপূর্ণ, পদ্মরেণুসুবাসিত, বৃহৎ বৃহৎ বাপী, সরোবর, পুষ্করিণী ও তড়াগসমুদায় উহাতে শোভা পাইতেছে। ঐ নগরমধ্যে ক্রমে ক্রমে সর্ব্ববেদবেত্তা ব্রাহ্মণগণ সর্ব্বভাষাবিশারদ ব্যক্তিগণ ধনাকাঙ্ক্ষী বণিক্সণ এবং শিল্পোপজীবী সুনিপুণ জনগণ আসিয়া বাস করিতে লাগিল।

পাণ্ডবগণ খাণ্ডবপ্রস্থের পরম রমণীয় শোভা নিরীক্ষণ করিয়া অতিমাত্র প্রীত হইলেন এবং পিতামহ ভীষ্ম ও জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতিক্রমে তথায় বাস করিলেন। ইন্দ্রতুল্য মহাধনুর্দ্ধর পঞ্চপাণ্ডব বাস করাতে খাণ্ডবপ্রন্থের পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর রমণীয়তা পরিবর্দ্ধিত হইল। মহাবীর বাসুদেব ও বলদেব পাণ্ডবদিগকে খাণ্ডবনগরে রাখিয়া তাঁহাদিগের অনুমতি গ্রহণপূর্ব্বক দ্বারবর্তী প্রস্থান করিলেন।

যুধিষ্ঠিরের রাজ্যলাভ।

জনমেজয় কহিলেন, হে তপোধন। মহাসত্ত্ব মহাবল পরাক্রান্ত মদীয় পিতামহগণ রাজ্যলাভানন্তর খাণ্ডবপ্রস্থে বাস করত কোন্ কোন্ কৰ্ম্ম করিয়াছিলেন, তাঁহাদের ধর্মপত্নী দ্রৌপদী একাকিনী হইয়া কিরূপে তাঁহাদের পাঁচজনের মনোরক্ষা করিয়াছিলেন, আর তাঁহারা পঞ্চভ্রাতাই বা কি প্রকারে একাকিনী দ্রৌপদীতে অনুরক্ত হইয়া অবিবাদে কালযাপন করিতেন, এই সমস্ত শ্রবণ করিতে আমার সাতিশয় অভিলাষ হইতেছে, আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক বর্ণনা করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! পাণ্ডবগণ ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞানুসারে রাজ্যপ্রাপ্ত হইয়া কৃষ্ণাসমভিব্যাহারে খাণ্ডবপ্রস্থে বাস করিতে লাগিলেন। সত্যপ্রতিজ্ঞ মহাতেজাঃ যুধিষ্ঠির রাজা হইয়া ভ্রাতৃচতুষ্টয়সমভিব্যাহারে ধর্মানুসারে প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। সেই শত্রুক্ষয়কারী মহাপ্রাজ্ঞ, সত্যনিষ্ঠ, ধর্মপরায়ণ পঞ্চভ্রাতা পরমাহ্লাদে তথায় বাস করত রাজাসনে উপবিষ্ট হইয়া সমস্ত পৌরকার্য সম্পাদন করিতেন।

খাণ্ডবপ্রস্থে নারদের আগমন।

একদা তাঁহারা পঞ্চ ভ্রাতা একত্র হইয়া সুখে উপবিষ্ট আছেন; এমন সময়ে দেবর্ষি নারদ যদৃচ্ছাক্রমে তাঁহাদের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। মহাত্মা যুধিষ্ঠির তাঁহাকে উপবেশনার্থে এক মহার্হ আসন প্রদান করিলেন। দেবর্ষি উপবিষ্ট হইলে যথাবিধি অর্ঘ্যপ্রদান পুরঃসর তাঁহাকে সৎকার করিলেন। দেবর্ষি পূজা গ্রহণানন্তর পরম প্রীত হইয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে আশীর্ব্বাদ করিয়া আসন পরিগ্রহ করিতে অনুমতি করিলেন। ধর্মাত্মা ধৰ্ম্মনন্দন দেবর্ষির নির্দেশানুসারে আসনে উপবেশন করিয়া দ্রৌপদী-সমীপে তদীয় আগমনবার্তা পাঠাইলেন। দ্রুপদরাজ-দুহিতা নারদের আগমনবার্তা শ্রবণে শুচি ও সুসংবৃতাঙ্গী হইয়া তাঁহার সমীপে আগমন করিলেন এবং চরণবন্দনাপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে বিনীতভাবে দণ্ডায়মান রহিলেন। দেবর্ষিসত্তম নারদ রাজনন্দিনী দ্রৌপদীকে বিবিধপ্রকার আশীর্ব্বাদ করিয়া অন্তঃপুরে গমনে অনুমতি করিলেন।

পাঞ্চালরাজতনয়া তথা হইতে গমন করিলে ঋষিশ্রেষ্ঠ নারদ নিভৃতে যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চ ভ্রাতাকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবগণ! তোমরা পঞ্চ ভ্রাতা; কিন্তু একাকিনী দ্রুপদতনয়া তোমাদের ধর্মপত্নী; অতএব যাহাতে তোমাদের পরস্পর ভ্রাতৃবিচ্ছেদ না হয়, এমন কোন উপায় বিধান কর। পূর্ব্বকালে লোকত্রয়বিশ্রুত সুন্দ ও উপসুন্দ নামে দুই ভ্রাতা ছিল। তাহারা অন্যের অবধ্য। ভ্রাতৃদ্বয়ের পরস্পর এররূপ সৌহার্দ্দদ ছিল যে তাহারা একত্র শয়ন, একত্র উপবেশন ও এক রাজ্য শাসন করিত। কেবল তিলোত্তমার নিমিত্ত বিবাদ করিয়া পরস্পর পরস্পরকে সংহার করিয়াছিল। তোমাদের পঞ্চ ভ্রাতারও এক্ষণে পরস্পর যৎপরোনাস্তি সৌহাদ্দ আছে, অতএব দেখিও যেন বিবাদ না হয়, এই নিমিত্তই আমি কোন সদুপায় স্থির করিতে কহিতেছি।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে মহর্ষে! আপনি যে সুন্দ ও উপসুন্দের কথা কহিলেন, তাহারা কাহার পুত্র? কি প্রকারে উৎপন্ন হইয়াছিল? কেনই বা তাহারা পরস্পর ভেদ হইল? এবং কি করিয়াই বা পরস্পর পরস্পরকে সংহার করিয়াছিল? আর যে অপ্সরা তিলোত্তমার রূপলাবণ্য দর্শনে তাহারা কামান্ধ হইয়া পরস্পরের প্রাণ নাশ করে, সেই অপ্সরাই বা কাহার কন্যা? হে তপোধন। এই সমস্ত বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে আমার একান্ত বাসনা হইতেছে, আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক সবিস্তর বর্ণন করুন।

ব্রহ্মার নিকট সুন্দ-উপসুন্দের বরপ্রাপ্তি।

নারদ কহিলেন, হে কুন্তীনন্দন যুধিষ্ঠির। তুমি ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে সেই সুন্দোপসুন্দের পুরাতন ইতিহাস শ্রবণ কর। পূর্ব্বকালে মহাসুর হিরণ্যকশিপুর বংশে নিকুম্ভ নামে মহাবল পরাক্রান্ত তেজস্বী এক দৈত্য জন্মগ্রহণ করে। ঐ দৈত্য যাবতীয় দানবগণের অধীশ্বর ছিল। ভীমপরাক্রম ক্রুরমনাঃ সুন্দ ও উপসুন্দ তাহারই পুত্র। ঐ মহাবল পরাক্রান্ত একনিশ্চয়' ও এককার্যনিরত ভ্রাতৃদ্বয় সর্ব্বদা সমদুঃখসুখ হইয়া কালযাপন করিত। তাহারা কেহ কাহাকে পরিত্যাগ করিয়া ভোজন, শয়ন বা গমন করিত না। সতত পরস্পর পরস্পরের প্রিয় কার্য্য করিত এবং পরস্পরকে প্রিয় বাক্য কহিত। ফলতঃ তাহাদিগের দুই ভ্রাতাকে দেখিলে বোধ হইত যেন, এক মূর্ত্তি দ্বিধা বিভক্ত হইয়াছে। সেই সহোদরদ্বয় ক্রমে ক্রমে বয়ঃপ্রাপ্ত হইল।

কিয়দ্দিন পরে সুন্দ ও উপসুন্দ ত্রৈলোক্যবিজয় সঙ্কল্পে দীক্ষিত হইয়া বিন্ধ্যপর্বতে গমনপূর্ব্বক অতি কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিল। সেই জটাবল্কলধারী বীরদ্বয় তপোনুষ্ঠানকালে ক্ষুৎপিপাসা পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল বায়ু ভক্ষণ ও আপনাদের গাত্রমাংস ছেদন করিয়া অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিত এবং অনিমেষলোচন ও উর্দ্ধবাহু হইয়া চরণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে নির্ভর করত দণ্ডায়মান থাকিত। এইরূপে তাহারা বহুকাল কঠোর তপস্যা করিল। বিন্ধ্যাচল তাহাদের অত্যুগ্র তপঃপ্রভাবে তাপিত হইয়া ধূম মোচন করিতে লাগিল।

দেবগণ সেই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে যৎপরোনাস্তি ভীত হইয়া তাহাদের তপোবিঘ্ন সাধনে যত্নবান্ হইলেন। তাঁহারা কখন বিবিধ রত্ন, কখন বা সুন্দরী স্ত্রীসমুদায়দ্বারা তাহাদিগকে প্রলোভিত করিবার চেষ্টা করিতেন, কিন্তু তাহারা কিছুতেই বিচলিত হইল না। তখন দেবগণ মায়াজাল বিস্তার করিয়া তাহাদের তপোবিঘ্ন করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। একদা তাহারা তপস্যা করিতে করিতে দেখিল, একটা শূলধারী বিকটাকার রাক্ষস তাহাদের মাতা, ভগিনী, পত্নী ও অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদিগকে প্রাণ সংহারার্থ লইয়া যাইতেছে। রাক্ষসভয়ে তাহাদিগের বসন ভূষণ ও মাল্যাদি পরিভ্রষ্ট হইল। পরে তাহারা সেই দুই ভ্রাতাকে উদ্দেশ করিয়া "পরিত্রাণ কর, পরিত্রাণ কর” বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করিতে লাগিল। সুন্দ ও উপসুন্দ তাহাতে কিছুমাত্র বিচলিত হইল না। তদ্দর্শনে সেই সমস্ত স্ত্রীগণ ও রাক্ষস অন্তর্হিত হইল।

তদনন্তর সর্ব্বভূতহিতকারী ভগবান্ ব্রহ্মা সেই মহাসুর-দ্বয়ের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে বর প্রদান করিতে উদ্যত হইলেন। দৃঢ়বিক্রম সুন্দ ও উপসুন্দ ভগবান্ কমল-যোনিকে সমাগত দেখিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে দণ্ডায়মান হইয়া কহিতে লাগিল, হে পিতামহ! আপনি যদি আমাদিগের প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে এই বর দিন, যেন আমরা সর্ব্বমায়াভিজ্ঞ, সর্ব্বাকোবিদ ও মহাবলপরাক্রান্ত হই; ইচ্ছানুরূপ রূপ ধারণ করিতে পারি এবং উভয়ে অমর হই। ব্রহ্মা কহিলেন, আমি অমরত্ব ভিন্ন তোমাদের সমুদায় প্রার্থনায় সম্মত হইলাম। অমরত্ব বিধান করিলে তোমরা দেবতাদিগের সমান হইবে। তোমরা সকলের উপর একাধিপত্য করিবে বলিয়া এই কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিয়াছ, অতএব তোমাদিগকে অমরত্ব প্রদান করা বিধেয় নহে। তোমরা ত্রৈলোক্য বিজয়ের মানসে তপশ্চরণে সমুদ্যত হইয়াছ, এই নিমিত্ত তোমাদিগকে অমরত্ব প্রদান করিলাম না।

তখন সুন্দ ও উপসুন্দ কহিল, হে পিতামহ। যদি আপনি নিতান্তই আমাদিগকে অমর না করেন, তবে এই বর প্রদান করুন যেন ত্রৈলোক্যস্থ যাবতীয় স্থাবর বা জঙ্গম পদার্থ হইতে আমাদের কোন ভয় না থাকে; কেবল আমরা পরস্পর পরস্পরকে সংহার করিতে পারি। ব্রহ্মা কহিলেন, হে দানবেন্দ্র! আমি তোমাদের প্রার্থনায় সম্মত হইলাম; আমি বর দিতেছি, তোমরা যেরূপ প্রার্থনা করিলে তোমাদের তদনুরূপ মৃত্যুই হইবে। ভগবান্ কমলযোনি দৈত্যদ্বয়কে এইরূপ অভিমত বরপ্রদান দ্বারা কঠোর তপস্যা হইতে নিবৃত্ত করিয়া ব্রহ্মলোকে গমন করিলেন। সুন্দ ও উপসুন্দ ইহারাও সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার বরে সর্ব্বলোকের অবধ্য হইয়া স্বীয় ভবনে প্রস্থান করিল।

স্বাভিলাষিত বর লাভানন্তর প্রত্যাগত ভ্রাতৃদ্বয়কে অবলোকন করিয়া তাহাদের সুহৃদ্বর্গ পরম পরিতুষ্ট হইল। তৎপরে সুন্দ ও উপসুন্দ স্বীয় জটাভার পরিত্যাগপূর্ব্বক মস্তকে কিরীট, অঙ্গে মহার্হ আভরণ এবং দিব্য বসন পরিধান করিল। তৎকালে তাহারা যেন অকালকৌমুদী'র সার্ব্বকালিক প্রাদুর্ভাব প্রবর্তিত করিল। তাহাদিগের বান্ধবগণ আনন্দসলিলে ভাসমান হইল। স্থানে স্থানে নৃত্যগীত, স্থানে স্থানে বাদ্যোদ্যম ও স্থানে স্থানে "দীয়তাং ভুজ্যতাং” ইত্যাদি বাক্য প্রয়োগ হইতে লাগিল। কামরূপী দৈত্যগণ এইরূপে আনন্দসাগরে নিমগ্ন হইয়া অবিচ্ছিন্ন বিহার দ্বারা শত শত বৎসর এক মুহূর্তের ন্যায় অতিবাহিত করিতে লাগিল।

ত্রিলোকে সুন্দ-উপসুন্দের উপদ্রব।

নারদ কহিলেন, এইরূপে দৈত্যপুর আনন্দে পরিপূর্ণ হইল। দানবেন্দ্র সুন্দ ও উপসুন্দ ত্রৈলোক্য জয় করিবার মানসে মন্ত্রণা করিয়া সৈন্যগণকে সুসজ্জিত হইতে আদেশ করিল। তৎপরে তাহারা সুহৃদ্গণ, বৃদ্ধ দৈত্যগণ ও মন্ত্রিগণের অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক মঘানক্ষত্রযুক্তা রজনীতে প্রাস্থানিক মঙ্গলাচরণ করত গদা, পট্টিশ, শূল, মুদ্গর প্রভৃতি বহুবিধ অস্ত্রশস্ত্রধারিণী দানববাহিনী সমভি ব্যাহারে যুদ্ধযাত্রা করিল। গমনকালে চারণগণ মাঙ্গলিক স্তুতি পাঠ করিয়া তাহাদের প্রীতিবন্ধন করিতে লাগিল।

তদনন্তর সেই যুদ্ধদুৰ্ম্মদ কামচারী দানবদ্বয় অন্তরীক্ষে গমন করত দেবগণের ভবনে প্রবেশ করিল। দেবগণ তাহাদের আগমন দেখিয়া এবং ব্রহ্মার বর দানের বিষয় জানিতে পারিয়া স্বর্গ পরিত্যাগপূর্ব্বক ব্রহ্মলোকে প্রস্থান করিলেন। সুন্দ ও উপসুন্দ অনায়াসে ইন্দ্রলোক জয় করিয়া যক্ষ রক্ষঃ প্রভৃতি খেচরগণের প্রাণ নাশ করিতে লাগিল এবং ক্রমে ক্রমে রসাতলস্থ নাগগণ ও সমুদ্রতীরবাসী ম্লেচ্ছজাতিদিগকে জয় করিল। পরে সমস্ত মেদিনীমণ্ডল-বিজয়ার্থী মহাবল পরাক্রান্ত দানবদ্বয় স্বীয় সেনা-গণকে আহ্বান করিয়া কহিল, দেখ, রাজর্ষি-গণ মহাযজ্ঞ দ্বারা এবং দ্বিজগণ হব্য' কব্য দ্বারা দেবগণের তেজঃ ও সম্পত্তি পরিবর্দ্ধিত করিতেছে। চল আমরা সকলে একত্র হইয়া সেই অসুরদ্বেষী দুষ্ট রাজগণ ও ব্রাহ্মণগণের প্রাণনাশ করি। সুন্দ ও উপসুন্দ সৈন্যগণকে এইরূপ আদেশ করিয়া মহাসমুদ্রের তীরে গমন করিল। তথায় যে সকল ব্রাহ্মণ যজ্ঞ করিতেছিলেন এবং যাঁহারা যজ্ঞ করাইতেছিলেন, তাঁহা-দিগের বিনাশ করিল। সৈন্যগণ তপোধনদিগের আশ্রমস্থিত অগ্নিহোত্র লইয়া জলে নিক্ষেপ করিল। মুনিগণ ক্রুদ্ধ হইয়া শাপ দিতে লাগিলেন, কিন্তু ব্রহ্মার বরপ্রভাবে সে শাপ কোন কার্য্যকারক হইল না। যখন তপোধনেরা দেখিলেন, তাঁহাদের শাপ শিলানিক্ষিপ্ত শিলীমুখের ন্যায় ব্যর্থ হইল, তখন তাঁহারা অগত্যা তপোনুষ্ঠান পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়নপরায়ণ হইলেন। অধিক কি কহিব, পৃথ্বীতলে যে সমস্ত মহর্ষি তপসিদ্ধ, দান্ত ও সমপরায়ণ ছিলেন তাঁহারাও গরুড়ভয়ে ভীত সর্পগণের ন্যায় পলায়ন করিতে লাগিলেন। তাহাদিগের উপদ্রবে আশ্রম সকল ভগ্ন ও কলস, শ্রুব প্রভৃতি যজ্ঞীয় দ্রব্যসামগ্রীসকল চতুৰ্দ্দিকে বিশীর্ণ হইল। ফলতঃ তৎকালে জগৎ কালগ্রস্তের ন্যায় শূন্যপ্রায় হইতে লাগিল।

এইরূপে মহর্ষিগণ পলায়ন করিলে সুন্দ ও উপসুন্দ তাঁহাদিগকে বিনাশ করিবার মানসে নানাপ্রকার কৌশল আরম্ভকরিল। তাহারা কখন মদস্রাবী মত্ত কুঞ্জরের রূপ ধারণপূর্ব্বক দুর্গমধ্যে লুক্কায়িত ঋষিগণকে বধ করিত; কখন সিংহরূপী কখন বা ব্যাঘ্ররূপী হইয়া তপোধনগণের প্রাণ সংহার করিত। সেই দুর্দান্ত দানবদ্বয়ের দৌরাত্ম্যে বহুসংখ্যক নৃপতি ও ব্রাহ্মণ প্রাণত্যাগ করিলেন। যজ্ঞানুষ্ঠান ও বেদাধ্যয়ন একেবারে রহিত হইল; উৎসবের সম্পর্কও রহিল না। চতুদ্দিকে কেবল হাহাকার শব্দ, সকলেই ভয়ে কম্পান্বিত কলেবর। ক্রয় বিক্রয়, ব্যবসা এবং কৃষি, গোরক্ষা সমুদায় নিবৃত্ত হইল। দেবকার্য্য, পিতৃকার্য্য ও পুণ্যোদ্বাহ প্রভৃতি শুভ কৰ্ম্মসকল বিলুপ্তপ্রায় এবং নগর ও আশ্রম সমুদায় উৎসন্ন হইয়া গেল। চতুৰ্দ্দিকে কেবল অস্থি ও কঙ্কাল দৃষ্ট হইতে লাগিল। তৎকালে ভূমণ্ডল একেবারে দুপ্রেক্ষ্য' হইয়া উঠিল। চন্দ্র সূর্য্য প্রভৃতি গ্রহগণ, তারাসমুদায়, নক্ষত্রমণ্ডল ও অন্যান্য দেবগণ সেই ক্রুরকর্মা দানবদ্বয়ের নৃশংসাচরণ দর্শনে বিষাদসাগরে নিমগ্ন হইলেন। এইরূপে সুন্দ ও উপসুন্দ ক্রুরকর্ম দ্বারা সমস্ত দিক্ বিজয় করিয়া নিষ্কণ্টকে কুরুক্ষেত্রে বাস করিতে লাগিল।

ব্রহ্মার নিকট ত্রিজগতের প্রার্থনা।

নারদ কহিলেন, তদনন্তর সমস্ত দেবর্ষিগণ, সিন্ধুগণ ও পরম ঋষিগণ, সুন্দোপসুন্দকৃত সেই উপদ্রব দর্শনে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইলেন। ঐ সকল জিতক্রোধ, জিতাত্মা ও জিতেন্দ্রিয়গণ জগতের দুরবস্থা দর্শনে অনুকম্পা-পরতন্ত্র হইয়া ব্রহ্মার ভবনে গমন করিলেন। তথায় দেখিলেন, সর্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ কমলাসন দেবগণের সহিত সুখে উপবিষ্ট রহিয়াছেন। সিদ্ধগণ ও ব্রহ্মর্ষিগণ তাঁহার চতুর্দিকে উপবিষ্ট রহিয়াছেন। তখন দেবাদিদেব মহাদেব, অগ্নি, বায়ু, চন্দ্র, সূর্য্য, ইন্দ্র, ঋষিগণ, বৈখানসগণ, বালখিল্যগণ ও মরীচিপায়ী বানপ্রস্থগণ পিতামহের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। মহর্ষিগণ তথায় গমন করিয়া অতি কাতরস্বরে সুন্দোপসুন্দকৃত উপদ্রব-বৃত্তান্ত আনুপূর্ব্বিক নিবেদন করিলেন। তখন দেবগণ, সিন্ধুগণ ও পরম ঋষিগণও ঐ দানবদ্বয়ের দৌরাত্মবৃত্তান্ত পিতামহকে জানাইলেন।

তিলোত্তমার আবির্ভাব।

ভগবান্ কমলাসন তাঁহাদিগের বাক্য শ্রবণানন্তর কর্তব্য বিষয়ে মুহূর্ত্তকাল চিন্তা করত সুন্দ ও উপসুন্দকে সংহার করিবার বাসনায় বিশ্বকর্মাকে আহ্বান করিলেন। বিশ্বকর্মা তৎক্ষণাৎ তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। তখন সর্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা তাঁহাকে এক সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী কামিনী নির্মাণ করিতে আদেশ করিলেন। বিশ্বকর্মা "যে আজ্ঞা” বলিয়া ব্রহ্মার বাক্য স্বীকার ও তাঁহাকে নমস্কার করিয়া পুনঃ পুনঃ চিন্তা করত তাঁহার আজ্ঞানুরূপ রমণী নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিলেন। ত্রিলোকমধ্যে কি স্থাবর, কি জঙ্গম যে কোন বস্তু অতীব রমণীয় বলিয়া বিখ্যাত বিশ্বজিৎ বিশ্বকর্মা সেই সকল বস্তু তথায় আনয়ন করিলেন। তিনি নির্মাণকালে সেই কামিনীর গাত্রে কোটি কোটি রত্ন সন্নিবেশিত করিলেন। বিশ্বকর্মাবিনির্মিত রত্নসংঘাত খচিত সেই কামিনী ত্রিলোকস্থ সমস্ত মহিলাগণের অধিক্ষেপ স্বরূপ হইল। তাহার গাত্রে এমন একটি স্থান ছিল না যে, দর্শকগণের দৃষ্টি যে স্থানে পতিত হইলে আসক্ত না হয়। ফলতঃ মূর্তিমতী লক্ষ্মীরূপা সেই কামিনী সর্ব্বভূতের মনোনয়নহারিণী হইলেন। ঐ লোকললামভূতা ললনা রত্ন-সমূহের তিল তিল অংশ লইয়া নিৰ্ম্মিত হইয়াছিল বলিয়া সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা তাহার নাম তিলোত্তমা রাখিলেন। তিলোত্তমা ব্রহ্মাকে নমস্কার করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, ভগবন্! কি নিমিত্ত আমাকে সৃষ্টি করিলেন, আজ্ঞা করুন। ব্রহ্মা কহিলেন, তিলোত্তমে! তুমি দানবরাজ সুন্দ ও উপসুন্দের সমীপে গমনপূর্ব্বক স্বীয় সম্পত্তিদ্বারা তাহাদিগকে এইরূপে প্রলোভিত কর, যেন তাহারা তোমার অলোকসামান্য রূপলাবণ্য দর্শনে মুগ্ধ হইয়া পরস্পর বিরোধ করে।

তিলোত্তমাদর্শনে শিবের চতুরানন এবং ইন্দ্রের সহস্রলোচন।

তিলোত্তমা "যে আজ্ঞা” বলিয়া পিতামহকে নমস্কার করিল এবং দেবগণকে প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল। দেবসভায় ভগবান্ বিষ্ণু পূর্ব্বমুখে, মহেশ্বর দক্ষিণমুখে, অন্যান্য দেবগণ উত্তরমুখে এবং ঋষিগণ সর্ব্বতোমুখে উপবিষ্ট ছিলেন। তিলোত্তমা অতি সাবধানতাপূর্ব্বক ভগবান্ মহাদেব ও ইন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করিল। প্রদক্ষিণকালে সে মহাদেবের দক্ষিণ পার্শ্বে গমন করিলে তদীয় অলোকসামান্য লাবণ্য দর্শনার্থ দক্ষিণদিকে গমন করিলে তদীয় অলোকসামান্য লাবণ্য দর্শনার্থ দক্ষিণদিকে তাঁহার এক মুখ নির্গত হইল, পশ্চাদ্ভাগে গমন করিলে পশ্চাৎভাগে আর এক মুখ নির্গত হইল এবং উত্তরদিকে গমন করিলে সে দিকেও আর একটি মুখ নির্গত হইল। ভগবান্ পুরন্দরেরও সর্ব্বাঙ্গে অতি বিশাল সহস্র লোচন আবির্ভূত হইল। এইরূপে পূর্ব্বকালে ভগবান্ মহাদেব চতুর্মুখ এবং বলিনিসূদন ইন্দ্র সহস্রলোচন হইয়াছিলেন। অধিক কি বলিব, তৎকালে সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা ব্যতীত তত্রস্থ সমস্ত দেবগণ ও ঋষিগণ তিলোত্তমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রহিলেন। এইরূপে তিলোত্তমা দেবগণকে প্রদক্ষিণ করিয়া সুন্দ ও উপসুন্দকে প্রলোভিত করিতে গমন করিল। তিলোত্তমা গমন করিলে দেবগণ ও পরম ঋষিগণ তাহার অতীব রমণীয় রূপলাবণ্য স্মরণ করিয়া পিতামহের অভিসন্ধি সিদ্ধপ্রায় বিবেচনা করিলেন। পরিশেষে ভগবান্ ভূতভাবন কমলযোনি সমস্ত ঋষিগণ ও দেবতাকে বিদায় করিলেন।

সুন্দ-উপসুন্দের সংহার ও পঞ্চপাণ্ডবের ভ্রাতৃত্ববন্ধনের অঙ্গীকার।

নারদ কহিলেন, এদিকে দানবরাজ সুন্দ ও উপসুন্দ স্বীয় বাহুবলে ত্রিভুবনবিজয়কার্য্যে কৃতকার্য্য হইয়া নিষ্কণ্টক হইল। দেব, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, নাগ, রাক্ষস ও ভূপতিগণের সমস্ত রত্নজাত অপহরণপূর্ব্বক পরমাহ্লাদে কালাতিপাত করিতে আরম্ভ করিল। তাহারা যখন দেখিল যে, ত্রিলোকমধ্যে কেহই তাহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নাই, তখন একেবারে যুদ্ধাদি চেষ্টা পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল উত্তমোত্তম স্ত্রী, মাল্য, গন্ধ, ভক্ষ্য ও পানীয় প্রভৃতি বিবিধ মনোহর উপভোগ্য বস্তু ভোগ করত অমরের ন্যায় কখন অন্তঃপুরোদ্যানে, কখন পর্ব্বতে, কখন বনে, কখন বা অন্যান্য অভিলষিত স্থানে বিহার করিতে লাগিল।

একদা ঐ দানবদ্বয় বিহারার্থ সমশিলাতলসম্পন্ন নানাবিধ সুগন্ধি পুষ্পে সুশোভিত, পাদপপুঞ্জে পরিপূর্ণ, বিন্ধ্য পর্ব্বতের প্রস্থদেশে গমন করিল। পরিচারকগণ তথায় সর্ব্বপ্রকার ভোগ্য বস্তু প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছে। তখন সুন্দ ও উপসুন্দ সন্তুষ্টচিত্তে কামিনীগণ-সমভিব্যাহারে মহামূল্য আসনে উপবিষ্ট হইল এবং রমণীগণ নৃত্য, গীত, বাদ্য ও স্তুতিবাদদ্বারা তাঁহাদিগকে আহ্লাদিত করিতে লাগিল। ঐ সময়ে বরবর্ণিনী তিলোত্তমা সূক্ষ্ম রক্তাম্বর পরিধান ও মনোহারিণী বেশভূষা ধারণপূর্ব্বক ঐ পৰ্ব্বতস্থ কাননে পুষ্প-চয়ন করিতে আরম্ভ করিল। সে নদীতীরজাত কর্ণিকার সকল চয়ন করিয়া অল্পে অল্পে সুন্দোপসুন্দ সমীপে সমুপস্থিত হইল। দানবদ্বয় তৎকালে সুরাপানে মত্ত হইয়াছিল।

চারুহাসিনী তিলোত্তমা তাহাদের নয়নগোচর হইবামাত্র উভয়েই এককালে কন্দর্পশরে জর্জরিত হইল। তখন তাহারা দুই জনেই তিলোত্তমা গ্রহণাভিলাষে আসন হইতে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক তাহার নিকট গমন করিয়া সুন্দ তাহার দক্ষিণ কর ও উপসুন্দ বাম কর ধারণ করিল। বরপ্রদান-মদ, ধনমদ, বলমদ এবং সুরাপান-মদ প্রভৃতি নানামদে মত্ত এবং কন্দর্পশরে জর্জরিত সেই দানবদ্বয় ভ্রুকুটি-বন্ধনপূর্ব্বক পরস্পর পরস্পরকে কহিতে লাগিল। সুন্দ কহিল, এ আমার ভার্য্যা, সুতরাং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পত্নী বলিয়া তোমার গুরু হইল। উপসুন্দ কহিল, এ আমার ভার্য্যা, সুতরাং কনিষ্ঠ ভ্রাতার পত্নী বলিয়া তোমার বধূ হইল। এইরূপে "এ আমার ভার্য্যা, তোমার নয়, আমার ভার্য্যা তোমার নয়,” এই কথা বারংবার কহিতে কহিতে তাহারা কামে মোহিত হইয়া চিরপরিচিত সৌভ্রাত্র ও সৌহার্দ্দে এককালে জলাঞ্জলি প্রদানপূর্ব্বক ক্রোধভরে উভয়ে ভয়ঙ্কর গদা গ্রহণ করিল; এবং "আমি পূর্ব্বে বধ করিব," "আমি পূর্ব্বে বধ করিব,” বলিয়া পরস্পর পরস্পরকে প্রচণ্ড আঘাত করিতে করিতে রুধিরাক্তকলেবর হইয়া গগনচ্যুত সূর্য্যদ্বয়ের ন্যায় দুই জনেই ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। তখন সেই মহাবীরযুগলকে ভূতলশায়ী দেখিয়া তত্রস্থ রমণীগণ ও দানবসমুদায় ভয়ে কম্পিতকলেবর হইয়া পাতালতলে পলায়ন করিল।

তদনন্তর সর্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা দেবগণ ও মহর্ষিগণ সমভিব্যাহারে তিলোত্তমা সমীপে আগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। বিধাতা হৃষ্টচিত্ত তইয়া তাহাকে বরপ্রদান করিবার মানসে কহিলেন, হে ভাবিনি। সূর্য্য যে পথে যাতায়াত করেন, তুমি সেই পথে গমনাগমন করিবে; তেজঃ প্রভাবে কেহই তোমাকে স্পষ্ট দেখিতে পাইবে না। ব্রহ্মা তিলোত্তমাকে এইরূপ বর প্রদানানন্তর ইন্দ্রহস্তে ত্রৈলোক্য রক্ষার ভারার্পণপূর্ব্বক ব্রহ্মলোকে প্রস্থান করিলেন।

হে পাণ্ডবগণ! পূর্ব্বকালে সুন্দ ও উপসুন্দ এইরূপে বাল্যকালাবধি একনিশ্চয় থাকিয়াও কেবল তিলোত্তমার নিমিত্তই উভয়ে বিবাদ করত পরস্পর পরস্পরকে সংহার করিয়াছিল। অতএব আমি তোমাদের প্রতি একান্ত স্নেহবান্ হইয়া উপদেশ দিতেছি যে, যাহাতে দ্রৌপদীর নিমিত্ত তোমাদের পরস্পর ভেদ না হয়, এমন কার্য্য কর, তাহা হইলে আমি পরম প্রীত হইব।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাত্মা পাণ্ডুনন্দনগণ মহর্ষি নারদের এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহার সমক্ষে পরস্পর এই নিয়ম করিলেন যে, আমাদের পাঁচ জনের মধ্যে একজন যখন দ্রৌপদীর নিকটে থাকিবে, তখন অন্য জন তথায় যাইতে পারিবে না। যে এই নিয়ম উল্লঙ্ঘন করিবে, তাহাকে ব্রহ্মহ্মচারী হইয়া দ্বাদশ বৎসর বনে বাস করিতে হইবে। ধর্মাত্মা পাণ্ডবগণ এইরূপ নিয়ম করিলে তপোধন নারদ পরম প্রীত হইয়া স্বাভিলষিত স্থানে প্রস্থান করিলেন। হে ভরতবংশাবতংস জনমেজয়। পাণ্ডুতনয়গণ এই-রূপে নারদের উপদেশানুসারে নিয়ম করিয়াছিলেন; তন্নিমিত্তই তাঁহাদের পরস্পর প্রণয় ভঙ্গ হয় নাই।

রাজ্যলাভ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


আদিপর্ব

অর্জুনবনবাস পর্ব্বাধ্যায়।

রাজার কার্য্যে সুখী কুরুদেশ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, পাণ্ডবগণ নারদসমক্ষে এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া খাণ্ডবপ্রস্থে বাস করিতে লাগিলেন। তাঁহারা স্বীয় শস্ত্রবলে ক্রমে ক্রমে অন্যান্য ভূপতিগণকে বশীভূত করিলেন। দ্রুপদনন্দিনী কৃষ্ণা সেই অপরিমিত বলশালী পঞ্চ ভ্রাতার বশবর্তিনী হইলেন। পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীকে পত্নীলাভকরিয়া যেরূপ প্রীত হইয়াছিলেন, দ্রৌপদীও তাঁহাদিগকে পতি পাইয়া তদ্রুপ আনন্দিত হইয়াছিলেন। মহাত্মা পাণ্ডবগণের ধর্মানুষ্ঠান জন্য সমস্ত কুরুদেশ দোষশূন্য ও সুখসমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠিল।

অর্জুনকর্তৃক ব্রাহ্মণের গোধন উদ্ধার।

তাঁহাদের রাজ্যপ্রাপ্তির বহুদিন পরে কতিপয় তস্কর একত্র হইয়া এক ব্রাহ্মণের কতকগুলি গোধন অপহরণ করিল। তাহাতে ব্রাহ্মণ ক্রোধে কম্পিত হইয়া খাণ্ডবপ্রস্থে আগমনপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে করিতে পাণ্ডবগণের নিকট কহিতে লাগিল, হে পাণ্ডবগণ! প্রশান্ত ব্রাহ্মণের হবিঃ কাকে ভক্ষণ করিতেছে; নীচ পশু শৃগাল, শার্দুলের শূন্য গুহায় প্রবেশ করিতেছে; যে রাজা ষষ্ঠাংশ কর গ্রহণ করিয়াও প্রজাগণকে রক্ষা না করেন, তিনি রাজ্যস্থ সমস্ত লোকের সমগ্র পাপের ভাগী হয়েন। হে পাণ্ডবগণ! চৌরে ব্রাহ্মণের ধন অপহরণ করিতেছে, ধর্মার্থ নাশ হইতেছে এবং আমি কাতরস্বরে ক্রন্দন করিতেছি; অতএব তোমরা আমাকে রক্ষা কর।

কুন্তীনন্দন ধনঞ্জয়-সমীপে রোরুদ্যমান ব্রাহ্মণের সেই সকল কাতরোক্তি শ্রবণে অনুকম্পা পরতন্ত্র হইয়া "মা ভৈঃ”” বলিয়া তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করিলেন। ঐ সময়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আয়ুধাগারে দ্রৌপদীর সহিত অধ্যাসীন ছিলেন। অর্জুন দুঃখার্ত ব্রাহ্মণের রোদনে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইয়াও পূর্ব্ব-প্রতিজ্ঞানুসারে আয়ুধাগারে প্রবেশ করিতে পারিলেন না এবং যুধিষ্ঠিরের অনুমতি না লইয়া গমন করিতেও সমর্থ হইলেন না। তখন তিনি দোলাচলচিত্ত' হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, নির্দোষ ব্রাহ্মণের ধন অপহৃত হইয়াছে, ব্রাহ্মণ রোদন করিতেছেন, উঁহার অশ্রু প্রমার্জন করা নিতান্ত কর্তব্য; এদিকে মহারাজকে উপেক্ষা করিয়া গমন করিলে মহান্ অধৰ্ম্ম জন্মে। কি করি! যদি দ্বারস্থ রোরুদ্যমান ব্রাহ্মণকে রক্ষা না করি, তাহা হইলে জনসমাজে আমাদের রাজ্যপালনে উপেক্ষাজন্য কলঙ্ক ঘোষণা হইবে; আর যদি মহারাজের অনুমতি না লইয়া যাই, তাহা হইলে তাঁহার অপমান করা হয় এবং যদি তাঁহার অনুমতি লইবার নিমিত্ত আয়ুধাগারে প্রবেশ করি, তাহা হইলে প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘনজন্য আমাকে বনে গমন করিতে হয়। কিন্তু রাজসন্নিধানে গমন করিলে আর সকল দোষই পরিহার করা হয়। যাহা হউক, প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘনজন্য মহান্ অধৰ্ম্মই হউক বা বনে বাসই হউক, ব্রাহ্মণের গোধন রক্ষা করা সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য, যেহেতু শরীর রক্ষা অপেক্ষাও ধর্ম্মের গৌরব অধিক।

কুন্তীনন্দন ধনঞ্জয় মনে মনে এইরূপ নিশ্চয় করিয়া শস্ত্রাগারে প্রবেশ করিলেন এবং মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনুমতি লইয়া হৃষ্টচিত্তে ধনুঃশর গ্রহণপূর্ব্বক ব্রাহ্মণকে কহিলেন, হে ব্রাহ্মণ! শীঘ্র আমার সহিত আগমন করুন। পরস্বাপহারী সেই ক্ষুদ্র চৌরগণ এখনও বহুদূরে পলায়ন করিতে পারে নাই; আমি ত্বরায় তাহাদিগকে আক্রমণ করিয়া আপনার গোধন আনয়ন করিতেছি। মহাবাহু অর্জুন ব্রাহ্মণকে এই কথা বলিয়া ধনু ও বৰ্ম্ম ধারণপূর্ব্বক রথে আরোহণ করিয়া প্রস্থান করিলেন। পরে অল্পক্ষণের মধ্যেই বাণদ্বারা দস্যুগণকে সংহার করিয়া ব্রাহ্মণের গোধন লইয়া তাঁহাকে প্রদান করিলেন। ব্রাহ্মাণ অর্জুনকর্তৃক এইরাপে উপকৃত হইয়া প্রসন্নচিত্তে তাঁহার যশঃ কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন।

প্রতিজ্ঞারক্ষার্থে অর্জুনের বনযাত্রা।

মহাত্মা ধনঞ্জয় এইরূপে ব্রাহ্মণের উপকার করিয়া স্বভবনে প্রত্যাগমন করিলেন এবং সমস্ত গুরুজনকে অভিবাদন করিয়া ও তাঁহাদের কর্তৃক অভিনন্দিত হইয়া মহারাজ ধর্মরাজের সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, হে প্রভো। আপনি দ্রৌপদী-সহবাসে আয়ুধাগারে অবস্থিত ছিলেন, সেই সময়ে আমি তথায় প্রবেশ করিয়া নিয়ম উল্লঙ্ঘন করিয়াছি; তন্নিমিত্ত এক্ষণে পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞানুসারে বনে গমন করিব, আপনি অনুমতি করুন। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির সহসা অর্জুনমুখে এই অপ্রিয় বাক্য শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইলেন এবং সবাষ্প-গদ্গদস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে ভ্রাতঃ। যদি তুমি আমাকে প্রভু বলিয়া জ্ঞান কর, তবে আমি যাহা বলিতেছি, শ্রবণ কর। তুমি কেবল ব্রাহ্মণের উপকারার্থে আমার গৃহে প্রবেশ করিয়াছিলে, তাহাতে আমার কিছুমাত্র অপ্রিয়ানুষ্ঠান করা হয় নাই, আমার সে বিষয়ে সম্মতি আছে। সস্ত্রীক কনিষ্ঠের গৃহে প্রবেশ করিলেই জ্যেষ্ঠের অধর্ম হইয়া থাকে, কিন্তু সপত্নীকে জ্যেষ্ঠের গৃহে প্রবেশ করাতে কনিষ্ঠের কিছুমাত্র পাপ নাই, অতএব হে মহাবাহো। তুমি আমার বচনানুসারে বনগমনে নিবৃত্ত হও; তোমার ধর্ম লোপ হইবে না; তুমি যাহা করিয়াছ, তাহাতে আমার অণুমাত্রও অবমাননা হয় নাই।

অর্জুন কহিলেন, হে মহারাজ। আপনি কহিয়াছেন, ছলপূর্ব্বক ধর্মানুষ্ঠান করিবে না; অতএব আয়ুধ স্পর্শ করিয়া কহিতেছি, আমি কদাচ সত্য হইতে বিচলিত হইব না। মহাত্মা অর্জুন এই বলিয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনুমতি গ্রহণ পুরঃসর দ্বাদশবর্ষ বনবাসে যাত্রা করিলেন।

অর্জুন-উলুপী সাক্ষাৎ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, কুরুকুলপ্রদীপ মহাবাহু অর্জুন বনে প্রস্থান করিলে বেদবেদাঙ্গ ও দিব্যাখ্যানবেত্তা এবং অধ্যাত্মশাস্ত্রবিশারদ ব্রাহ্মণগণ, ভিক্ষোপজীবিসকল, পৌরাণিক সূতগণ, কথকগণ এবং বনবাসী সন্ন্যাসিসকল তাঁহার অনুগমন করিলেন। পাণ্ডুনন্দন সেই সমস্ত মধুরভাষী মহাত্মাগণ ও অন্যান্য সহায়ে পরিবৃত হইয়া দেবগণসমাবৃত অমররাজের ন্যায় গমন করিতে লাগিলেন। গমন করিতে করিতে রমণীয় বিচিত্র কানন, সরোবর, নদী, সাগর, বিবিধ দেশ ও পুণ্য তীর্থসকল দর্শন করিলেন। তিনি ক্রমে ক্রমে গঙ্গাদ্বারে গমন করিয়া তথায় আশ্রয় নির্দ্ধারিত করিলেন।

বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে রাজন! সেই স্থানে বিশুদ্ধাত্মা ধনঞ্জয় যে অদ্ভুত কৰ্ম্ম করিয়াছিলেন, তাহা শ্রবণ কর। কুন্তীনন্দন ধনঞ্জয় ব্রাহ্মণগণ-সমভিব্যাহারে তথায় বাস করিলে বিপ্রগণ স্থানে স্থানে অগ্নিহোত্র আরম্ভ করিলেন। গঙ্গাতীরস্থ পুষ্পোপহারালঙ্কৃত সেই সমস্ত মন্ত্রপূত হুতাশন এবং কৃতাভিষেক, সংযমী, সৎপথাবলম্বী মহাত্মা দ্বিজগণদ্বারা গঙ্গাদ্বার অতীব শোভাকর হইল। এইরূপে আশ্রম প্যাকুল' হইলে একদা অর্জুন অভিষেকার্থ গঙ্গায় অবতীর্ণ হইলেন। তথায় স্নান ও পিতামহগণের তর্পণ করিয়া অগ্নিকার্য্য করিবার নিমিত্ত যেমন জল হইতে উঠিতেছিলেন, অমনি নাগরাজদুহিতা উলুপী আপনার মনোরথ পূর্ণ করিবার আশয়ে তাঁহাকে জলমধ্যে আকর্ষণ করিয়া লইল। অর্জুন পরমার্জিত নাগরাজভবনে সমুপস্থিত হইয়া হুতাশন অবলোকন করিয়া সেই স্থানেই অগ্নিকার্য্য সমাধা করিলেন। তিনি অসঙ্কুচিতচিত্তে হোমক্রিয়া সম্পাদিত করিলেন দেখিয়া, হুতাশন পরম পরিতুষ্ট হইলেন। অগ্নিকার্য সমাধা হইলে অর্জুন ঈষৎ হাস্য করিয়া নাগরাজদুহিতাকে কহিলেন, হে ভীরু। তুমি কি সাহসে এরূপ সাহসিক কার্য্য করিলে? হে ভাবিনি। এ প্রদেশের নাম কি? তুমিই বা কে? এবং কাহার কন্যা?

উলুপী কহিল, হে রাজন। ঐরাবতকুলে সমুদ্ভুত কৌরব্য নামে এক নাগ আছেন, আমি তাঁহার দুহিতা, আমার নাম উলুপী। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! আমি তোমাকে অভিষেকার্থ গঙ্গায় অবতীর্ণ দেখিয়া কন্দর্পশরে জর্জরিত হইয়াছি। এক্ষণে তুমি আত্ম-প্রদানদ্বারা এ অশরণা অবলার মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ কর।

অর্জুন কহিলেন, হে ভদ্রে! আমি ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নির্দেশানুসারে দ্বাদশবার্ষিক ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিয়াছি; সুতরাং আমি স্বাধীন নহি। হে জলচারিণি! তোমার প্রিয়ানুষ্ঠান করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ আছে বটে, কিন্তু আমি পূর্ব্বে কখনই মিথ্যা কহি নাই, অতএব হে ভুজঙ্গমে! যাহাতে আমার অনুতানুষ্ঠান না হয়, তোমারও প্রিয়কার্য্য সম্পাদন করা হয় এবং ধর্মহানি না হয়, এমন কোন উপায় চিন্তা কর।

উলুপী কহিল, হে পাণ্ডবেয়। তুমি যে নিমিত্ত ভূমণ্ডলে ভ্রমণ করিতেছ এবং তোমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা যে নিমিত্ত তোমাকে ব্রহ্মচর্য্যানুষ্ঠানে অনুমতি করিয়াছেন, আমি তৎসমুদায় অবগত আছি। তোমরা পূর্ব্বে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে যে, যে সময় আমাদের একজন দ্রৌপদীর সমীপে থাকিবেন, তৎকালে অন্য কেহ তথায় গমন করিলে তাঁহাকে দ্বাদশবর্ষ বনে বাস ও ব্রহ্মচর্য্যানুষ্ঠান করিতে হইবে। হে ধর্মাত্মন্! তোমরা দ্রৌপদীর নিমিত্ত পরস্পর এইরূপ বনবাসের নিয়ম করিয়াছিলে, অতএব আমার অভিলাষ সফল করিলে তোমার অধৰ্ম্ম হইবে না। হে পৃথুলোচন! আর্ত্ত ব্যক্তিকে পরিত্রাণ করা তোমাদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম; অতএব আমাকে পরিত্রাণ করিলে তোমার অধৰ্ম্ম হইবে না। যদিও ইহাতে তোমার যৎকিঞ্চিৎ ধর্মহানি হয়, আমার প্রাণদান করিলে ততোধিক ধৰ্ম্মলাভ হইবে। হে পার্থ! আমি তোমাতে নিতান্ত ভক্ত এবং একান্ত অনুরক্ত হইয়াছি! তুমি সাধুগণের পদবী অবলম্বনপূর্ব্বক আমার বাসনা পরিপূর্ণ কর। যদি তুমি ইহাতে অসম্মত হও, তাহা হইলে আমি নিশ্চয়ই প্রাণত্যাগ করিব; অতএব আমার প্রাণদান করিয়া পরমোৎকৃষ্ট ধর্ম উপার্জন কর। হে পুরুষোত্তম কৌন্তেয়! তুমি প্রত্যহ অনাথ দীনগণকে রক্ষা করিয়া থাক, আমি অদ্য তোমার শরণাপন্ন হইয়াছি এবং আমার অভিলাষ পূর্ণ কর বলিয়া বারংবার প্রার্থনা করিতেছি; তুমি আত্মপ্রদানদ্বারা মনোরথ সফল করিয়া আমার প্রিয়ানুষ্ঠান কর।

কুস্তীনন্দন ধনঞ্জয় নাগরাজদুহিতা উলুপীকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া ধর্মবুদ্ধিতে তদীয় মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন। তিনি যেই রাত্রি তথায় বাস করিয়া সূর্যোদয়কালে নাগভবন হইতে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক উলুপী সমভিব্যাহারে পুনরায় গঙ্গাদ্বারে প্রত্যাগমন করিলেন। পতিব্রতা উলুপী, অর্জুনকে "তুমি সমস্ত জলচরগণকে জয় করিতে পারিবে” এই বর প্রদান করিয়া এবং তাঁহাকে রাখিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন।

ধনঞ্জয়-চিত্রাঙ্গদার পরিণয়।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। তদন্তর ইন্দ্রাত্মজ অর্জুন ব্রাহ্মণদিগকে সেই সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিয়া হিমাচলের পার্শ্বদেশে গমন করিলেন। তিনি ক্রমে ক্রমে অগস্ত্যবট, বশিষ্টপৰ্ব্বত ও ভৃগুতুঙ্গে গমন করিয়া পরম পবিত্রতা লাভকরিলেন। কুরুসত্তম অর্জুন অসংখ্য বাসভবন ও সহস্র সহস্র গোধন বিপ্রসাৎ করিয়া হিরণ্যবিন্দুর তীর্থে অবগাহনপূর্ব্বক অনেকানেক পুণ্যস্থান সন্দর্শন করিতে লাগিলেন। পরে বিপ্রগণ সমভিব্যাহারে হিমগিরি হইতে অবতীর্ণ হইয়া উৎসুকমনে পূর্ব্বদিক্ দর্শনে যাত্রা করিলেন। এইরূপে নন্দা, অপরনন্দা, কৌশিকী, গঙ্গা প্রভৃতি মহানদীসকল এবং গয়া প্রভৃতি পুণ্য তীর্থ পর্য্যটন করিয়া আপনাকে পবিত্র করিলেন। অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ প্রভৃতি জনপদে যে সকল তীর্থ, দেবালয় এবং সিদ্ধাশ্রম আছে, অর্জুন সর্ব্বত্র গমন, দর্শন ও ধনদান করিয়াছিলেন। অনন্তর সমভিব্যাহারী ব্রাহ্মণেরা কলিঙ্গ রাজ্যের দ্বারদেশ পর্য্যন্ত আসিয়া তাঁহার অনুমতি গ্রহণপূর্ব্বক প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় অত্যল্পমাত্র সহায়সম্পন্ন হইয়া সাগরাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তিনি কলিঙ্গদেশ ও তত্রত্য পুণ্যতীর্থসকল অতিক্রম করিয়া সুরম্য হ্যাবলী অবলোকন করিতে করিতে চলিলেন। মহাবাহু অর্জুন তাপসগণ পরিশোভিত মহেন্দ্র পৰ্ব্বত নিরীক্ষণ করিয়া মহাসাগরের উপকূলমার্গ মণিপুরে গমন করিলেন এবং তত্রত্য দেবালয় ও পূণ্যতীর্থসকল সন্দর্শন করিয়া তদ্দেশীয় রাজার নিকটে উপনীত হইলেন। মণিপুরেশ্বর পরম ধার্মিক। চিত্রাঙ্গদা নামে তাঁহার এক পরমসুন্দরী দুহিতা ছিল। রাজকুমারী স্বেচ্ছাক্রমে পুরমধ্যে ভ্রমণ করিতেছিলেন, এমন সময়ে অর্জুন তাঁহাকে নয়নগোচর করিয়া মনে মনে সেই বরবর্ণিনীর পাণিগ্রহণ করিবার বাসনা করিলেন। পরে রাজার নিকট উপনীত হইয়া স্বীয় অভিলাষ প্রকাশপূর্ব্বক কহিলেন, রাজন! আমি ক্ষত্রিয়, এই কন্যা আমাকে সম্প্রদান করুন! তাহা শ্রবণ করিয়া রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কাহার পুত্র এবং তোমার নাম কি? অর্জুন কহিলেন, আমি কুন্তীপুত্র নাম ধনঞ্জয়। মণিপুরেশ্বর তাঁহাকে পুনর্ব্বার কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! অস্মদ্বংশে প্রভঞ্জন নামে একজন রাজর্ষি ছিলেন। তিনি নিঃসন্তানতাপ্রযুক্ত পুত্র কামনায় অতি কঠোর তপস্যা করেন। ভগবান্ ভবানীপতি তদীয় উগ্র তপস্যায় প্রসন্ন হইয়া "তোমাদিগের প্রত্যেকের এক এক পুত্র হইবে” বলিয়া তাঁহাকে বর প্রদান করিয়াছিলেন। তদবধি আমাদিগের বংশে এক একটি করিয়া পুত্র উৎপন্ন হয়। হে ভরতর্ষভ। আমার পূর্ব্বপুরুষদিগের সকলেরই পুত্র জন্মিয়াছিল কিন্তু আমার এই একমাত্র কন্যা, সুতরাং আমি ইঁহাকে পুত্র বলিয়া জ্ঞান করিয়া থাকি। ইহা দ্বারা বংশ রক্ষা হইবে, এই আশয়ে আমি ইঁহাকে পুত্রিকা' গ্রহণ করিয়াছি, অতএব ইঁহার গর্ন্তজাত পুত্র আমারই বংশধর হইবে; হে পাণ্ডব! যদি এই নিয়মে সম্মত হও, তাহা হইলে আমার কন্যার পাণিপীড়ন করিতে পারিবে। অর্জুন নিয়মানুরূপ পাণিগ্রহণপূর্ব্বক তথায় তিন বৎসরকাল বাস করিয়া রহিলেন। পরে পুত্র উৎপন্ন হইলে তিনি চিত্রাঙ্গদাকে আলিঙ্গনপূর্ব্বক রাজার নিকট বিদায় লইয়া গমন করিলেন।

অপ্সরা বর্গার শাপকাহিনী।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর অর্জুন দক্ষিণ-সাগরে তপস্বিজন-সুশোভিত অতি পবিত্র তীর্থস্থানে গমন করিলেন, কিন্তু পূর্ব্বে যে সকল তীর্থস্থানে অনেকানেক তপস্বি-জনের সমাগম হইত, মহর্ষিগণ সেই পঞ্চতীর্থ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। অগস্ত্যতীর্থ, সৌভদ্র, পৌলোম, অশ্বমেধ-ফলোৎপাদক কারন্ধম তীর্থ ও অশেষ পাপহারক ভারদ্বাজ তীর্থ, অর্জুন এই পঞ্চ তীর্থ দর্শন করিলেন। তিনি সেই সমস্ত তীর্থ জনশূন্য এবং ধর্মবুদ্ধিপরায়ণ মহর্ষিগণকর্তৃক ত্যাজ্যমান দেখিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মহর্ষিগণ। ব্রহ্মবাদীরা কি নিমিত্ত এই সকল তীর্থ পরিত্যাগ করেন? তাপসেরা প্রত্যুত্তর করিলেন, হে কুরুনন্দন! এই তীর্থে পাঁচটি কুম্ভীর বাস করিতেছে, তাহারা অবগাহনমাত্রেই তাপসদিগকে সংহার করিয়া থাকে; এই কারণে আমরা এই পঞ্চতীর্থ পরিহার করিয়াছি।

মহর্ষিগণের বাক্য শ্রবণান্তর মহাবীর অর্জুন তাঁহাদের কর্তৃক নিবারিত হইয়াও সেই সমস্ত তীর্থস্থান দর্শনার্থে যাত্রা করিলেন এবং সৌভদ্রতীর্থে উপস্থিত হইয়া অবগাহনপূর্ব্বক স্নান করিতে লাগিলেন। এই অবসরে এক কুম্ভীর আসিয়া তাঁহার পাদগ্রহণ করিল। ধনঞ্জয় সেই ভয়ঙ্কর কুম্ভীরকে বলপূর্ব্বক গ্রহণ করিয়া উত্থিত হইলেন। কুম্ভীর অর্জুনকর্তৃক উদ্ধৃত হইবামাত্র সর্ব্বালঙ্কারশোভিতা সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী এক নারীরূপ পরিগ্রহ করিল। এই অদ্ভুত ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়া অর্জুন প্রীতমনে সেই নারীকে কহিলেন, হে কল্যাণি! তুমি কে? কি নিমিত্ত জলচরী হইয়াছ? আর পূর্ব্বে এমনই বা কি পাপ করিয়াছিলে? দিব্যাঙ্গনা কহিল, হে মহাভাগ। আমি দেবারণ্য-বিহারিণী এক অপ্সরা, আমার নাম বর্গা, ধনপতি কুবের আমাকে যথেষ্ট সমাদর করিয়া থাকেন। একদা আমি চারি সহচরী সহিত দেবরাজ ইন্দ্রের ভবনে গমন করিয়াছিলাম। প্রত্যাবর্তনকালে অধ্যয়নপর পরম রূপবান্ একান্তচারী' এক ব্রাহ্মণকে নয়ন-গোচর করিলাম। তিনি স্বকীয় তেজঃ ও তপঃপ্রভাবে প্রদীপ্ত দিবাকরের ন্যায় সকল বনবিভাগ আলোকময় করিতেছেন। আমরা আকাশমার্গ হইতে তপঃ প্রভাব, আকার ও সৌন্দর্য্য সন্দর্শন করিয়া তাঁহার তাদৃশ তপস্যার বিঘ্ন সম্পাদন করিবার নিমিত্ত তথায় অবতীর্ণ হইলাম। তৎপরে সৌরভেয়ী, সমীচী, বুদ্বুদা ও লতা এই চারি সহচরী সমভিব্যাহারে তপস্বিসন্নিধানে গমন করিলাম। গমন করিয়া মধুর সঙ্গীত ও হাস্যালাপে তাঁহাকে বিবিধ প্রকারে প্রলোভন দেখাইতে লাগিলাম, কিন্তু তিনি কিছুতেই ভূক্ষেপ করিলেন না। তৎকালে তিনি ধ্যানে মনোনিবেশ করিয়াছিলেন, আমরা কোনমতেই তাঁহাকে বিচলিত করিতে পারি নাই। অনন্তর ব্রাহ্মণ আমাদিগের এইরূপ ভাবভঙ্গী দর্শনে তৎক্ষণাৎ ক্রোধপরবশ হইয়া অভিসম্পাত করিলেন, "রে অপ্সরোগণ! আমার শাপপ্রভাবে তোরা শত বৎসর কুম্ভীরযোনি প্রাপ্ত হইয়া থাক।"

অপ্সরাগণের শাপমোচনের নিমিত্ত অর্জুনের নিকট বর্গার আর্তি।

বর্গা কহিল, হে ভরতবংশাবতংস! অনন্তর আমরা অভি-শাপগ্রস্ত ও একান্ত দুঃখিত হইয়া ব্রাহ্মণের শরণাপন্ন হইলাম। কহিলাম, হে বিপ্র! আমরা রূপ, যৌবন ও কন্দর্পমদে মত্ত হইয়া আপনার নিকট যে অপরাধ করিয়াছি তাহা ক্ষমা করুন। আপনি মহাত্মা, আমরা যে আপনাকে প্রলোভন দেখাইবার নিমিত্ত আগমন করিয়াছিলাম, তাহাতেই আমাদিগের বধ পর্যাপ্ত হইয়াছে। ধার্মিকেরা স্ত্রীলোকদিগকে অবধ্যা কহেন, অতএব হে তপোধন! আপনি স্বধর্ম প্রতিপালন করুন, আমাদিগের প্রতিহিংসা করিয়া আপনার কি উপকার দর্শিবে? ব্রাহ্মণই সর্ব্বজীবের বন্ধু, একথা যেন নিতান্ত অমূলক না হয়। শরণাগত লোকদিগকে আশ্রয় প্রদান করাই সাধুদিগের কার্য্য, এক্ষণে আপনার শরণাপন্ন হইয়াছি, ক্ষমা করুন।

তখন চন্দ্রসূর্য্যসমপ্রভ দ্বিজবর অপ্সরাদিগের এইরূপ স্তুতিবাক্যে প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, হে অপ্সরোগণ! শত বা শত সহস্র শব্দ আনন্ত্যবাচক বটে, কিন্তু আমি শত বৎসর শব্দ নিৰ্দ্দেশ করিয়াছি, উহা কেবল পরিমাণবাচকমাত্র, আনন্ত্যবাচক নহে। কিন্তু যৎকালে তোমরা কুম্ভীরযোনি প্রাপ্ত হইয়া জলমধ্যে মনুষ্যের পাদগ্রহণ করিবে, তদবসরে যদি কেহ তোমাদিগকে জলমধ্য হইতে উদ্ধার করিতে পারেন, তাহা হইলে তোমরা পুনর্ব্বার স্বমূর্ত্তি লাভ করিতে পারিবে। আমি পরিহাসচ্ছলেও কদাচ মিথ্যা কহি নাই। আর তোমরা যে তীর্থে বাস করিবে, তাহা তদবধি পবিত্র নারীতীর্থ বলিয়া সর্ব্বত্র বিখ্যাত হইবে।

বর্গা কহিল, অনন্তর আমরা বিপ্রকে প্রদক্ষিণ ও অভি-বাদনপূর্ব্বক দুঃখিত মনে তথা হইতে অপসৃত হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলাম, যিনি আমাদিগকে স্থলে আকর্ষণপূর্ব্বক পূর্ব্ববৎ রূপসম্পন্ন করিবেন, আমরা সেই মহাত্মার কতকালে সন্দর্শন পাইব? আমরা মূহূর্তকাল এইরূপ চিন্তা করিতেছি ইত্যবসরে দেবর্ষি নারদ আমাদিগের নয়নপথে পতিত হইলেন। তাঁহাকে দৃষ্টিগোচর করিবামাত্র আমরা সন্তুষ্টমনে অভিবাদন করিয়া লজ্জাবনতমুখে দণ্ডায়মান রহিলাম। দেবর্ষি আমাদিগকে দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। আমরাও আদ্যোপান্ত সমুদায় নিবেদন করিলাম। তখন তিনি সবিশেষ শ্রবণ করিয়া কহিলেন, দক্ষিণ মহাসাগরের কচ্ছদেশে পঞ্চতীর্থ নামে অতি পবিত্র ও রমণীয় স্থান আছে, তোমরা তথায় যাইয়া বাস কর। পাণ্ডুনন্দন অর্জুন অচিরকালমধ্যে তথায় উপস্থিত হইয়া তোমাদিগের দুঃখমোচন করিবেন, সন্দেহ নাই। তৎপরে আমরা তদীয় আদেশানুসারে এই স্থানে আগমন করিয়াছি। অদ্য আমার দুঃখমোচন হইল সত্য বটে কিন্তু আমার অপর চারি সহচরী এই জলমধ্যে বাস করিতেছেন, আপনাকে তাঁহাদিগেরও দুঃখশান্তিরূপ শুভ কৰ্ম্ম করিতে হইবে।

বজ্রবাহনের জন্ম।

অনন্তর পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ অর্জুন তাহাদিগেরও শাপমোচন করিয়া দিলেন। তাহারা জলমধ্য হইতে উত্থিত ও পূর্ব্বাকার প্রাপ্ত হইয়া পূর্ব্ববৎ শোভা পাইতে লাগিল। অনন্তর মহাবীর অর্জুন তীর্থশুদ্ধি সম্পাদনপূর্ব্বক অপ্সরাদিগকে গমনের আদেশ দিয়া চিত্রাঙ্গদাকে দর্শন করিবার নিমিত্ত পুনর্ব্বার মণিপুরে গমন করিলেন। তথায় চিত্রাঙ্গদাগর্তে বজ্রবাহন নামক পুত্র উৎপাদন করিয়া গোকর্ণ তীর্থে যাত্রা করিয়াছিলেন।

প্রভাসে কৃষ্ণের সহিত অর্জুনের সাক্ষাৎ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর অমিতবিক্রম অর্জুন ক্রমে ক্রমে অপরান্ত' প্রদেশস্থ সমস্ত তীর্থ ও পবিত্র আয়তনে গমন করিলেন। পশ্চিম সমুদ্রের উপকূলে যে সমস্ত তীর্থ ও পুণ্যায়তন আছে, সেই সমস্ত স্থানেও পর্য্যটন করিয়া পরিশেষে প্রভাসে উপস্থিত হইলেন। প্রিয়সখা অর্জুন প্রভাসে আসিয়াছে শুনিয়া বৃষ্ণিবংশাবতংস কৃষ্ণ তথায় গমন করিলেন। কৃষ্ণ অর্জুন-সাক্ষাৎকারলাভে পরম পরিতোষে পরস্পর আলিঙ্গন ও কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া সেই স্থানে অবস্থিতি করিলেন। পরে কৃষ্ণ প্রিয়সখা অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে অর্জুন! তুমি কি নিমিত্ত এই সমস্ত তীর্থ পর্য্যটন করিতেছ? অর্জুন বাসুদেবসমক্ষে আপনার তীর্থপৰ্য্যটনবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত সমস্ত কীর্ত্তন করিলেন। তাহা শ্রবণ করিয়া কৃষ্ণ "সঙ্গত হইয়াছে” বলিয়া তদ্বাক্যে প্রত্যুত্তর দিলেন। তৎপরে তাঁহারা প্রভাসে স্বেচ্ছানুসারে বিহার করিয়া বাসার্থ রৈবতকপর্ব্বতে উপস্থিত হইলেন। বাসুদেবের আদেশানুসারে তদীয় অধিকৃত পুরুষেরা ইতিপূর্ব্বেই রৈবতকপর্ব্বত সুসজ্জিত ও আহার-সামগ্রীসকল আহরণ করিয়া রাখিয়াছিল। অর্জুন সেই সমস্ত ভোজনীয় দ্রব্য গ্রহণ ও উপযোগ করিয়া কৃষ্ণের সহিত নট-দিগের নৃত্যগীত দর্শন ও শ্রবণ করিলেন। তৎপরে তাহাদিগকে সমুচিত সৎকার ও পারিতোষিক প্রদানপূর্ব্বক বিদায় করিয়া সুপরিচ্ছন্ন শয়নমন্দিরে গমন করিলেন। তথায় দুগ্ধফেনধবল শয্যায় শয়ন করিয়া প্রিয়সখার নিকট বহুতর নদী, পল্বল', পৰ্ব্বত ও বনবৃত্তান্তসকল বর্ণন করিতে লাগিলেন। সেই স্বর্গ-সন্নিভ শয্যায় শয়ান অর্জুন যথাবৎ বৃত্তান্তসকল বর্ণন করিতে করিতে নিদ্রায় বিচেতন হইলেন। প্রভাতকালে সুমধুর সঙ্গীত ধ্বনি, বীণাবাদ্য ও মাঙ্গল্য স্তুতিবাদদ্বারা প্রতিবোধিত হইলেন।

অনন্তর অর্জুন তৎকালোচিত সন্ধ্যাবন্দনাদি কার্য্য সমাধানানন্তর বাসুদেবকর্তৃক অভিনন্দিত হইয়া কাঞ্চননির্মিত রথে আরোহণপূর্ব্বক দ্বারকায় যাত্রা করিলেন। তাঁহার সৎকারার্থ দ্বারকাপুরী ও তত্রত্য ক্রীড়াকাননসকল অলঙ্কৃত ও সুশোভিত হইল। অর্জুন পুরপ্রবেশ করিলে তাঁহাকে দেখিবার নিমিত্ত দ্বারকাবাসী শতসহস্র লোক সত্বর রাজমার্গে আগমন করিতে লাগিল। অন্ধক, ভোজ ও বৃষ্ণিবংশীয় মহিলাগণ গবাক্ষদ্বারে দণ্ডায়মান রহিল। অর্জুন এইরূপে যাদবগণকর্তৃক সমাদৃত ও সৎকৃত হইয়া নমস্যবর্গকে নমস্কার করিলেন। তৎপরে রাজ-কুমারেরা আসিয়া তাঁহার সৎকার করিলেন। অর্জুন সমস্ত সমবয়স্কদিগকে আলিঙ্গন করিয়া কৃষ্ণের সহিত সুরম্য হর্ম্মে কতিপয় দিবস সুখে অতিবাহিত করিতে লাগিলেন।

অর্জুনবনবাস পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


আদিপর্ব

সুভদ্রাহরণ পর্ব্বাধ্যায়।

কৃষ্ণের সুভদ্রাহরণের পরিকল্পনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর কিয়দ্দিবস রৈব-তকপর্ব্বতে অন্ধক ও যদুবংশীয়দিগের মহান উৎসব আরম্ভ হইল। উক্ত বংশোদ্ভূত বীরপুরুষেরা উৎসবোপলক্ষ্যে রৈবতকবাসী ব্রাহ্মণদিগকে প্রচুর অর্থ দান করিলেন। সেই পর্ব্বতের সন্নিহিত প্রদেশসকল রত্নমণ্ডিত অট্টালিকাবলী ও কল্পপাদপসমূহদ্বারা সুশোভিত হইল এবং স্থানে স্থানে নৃত্যগীত, স্থানে স্থানে বাদ্যোদ্যম হইতে লাগিল। যদুবংশীয় রাজকুমারেরা বহুবিধ অলঙ্কারে অলঙ্কৃত হইয়া সুসজ্জিত সুবর্ণযানে আরোহণ-পূর্ব্বক বারংবার ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিলেন। শত সহস্র পুরবাসীরা কেহ বহুবিধ দিব্য যানে, কেহ সামান্য যানে, কেহবা পুত্রকলত্র সমভিব্যাহারে পাদচারে সঞ্চরণ করিতে লাগিল। বলদেব মধুপানে মত্ত ও গন্ধর্ব্বগণকর্তৃক অনুগত হইয়া নিজ ভার্য্যা রেবতীর সহিত ভ্রমণ করিতে লাগিল। প্রবলপ্রতাপ যদুবংশীয় রাজা উগ্রসেনও অঙ্গনা-সহস্রে পরিবৃত হইয়া গন্ধর্ব্বদিগের সুমধুর সঙ্গীত শ্রবণপূর্ব্বক পরম সুখে বিহার করিতে ছিলেন। রুক্মিণীতনয় ও শাল্ব, ইঁহারাও মধুপানে নিতান্ত উন্মত্ত হইয়া দিব্যাম্বর পরিধান ও দিব্য মাল্য ধারণপূর্ব্বক বিহার করিতেছিলেন। অক্রুর, সারণ, গদ, বন্ধ, বিদূরথ, নিশঠ, চারুদেষ্ণ, পৃথ, বিপৃথ, সত্যক, সাত্যকি, ভঙ্গকার, মহারব, হাদ্দিক্য ও উদ্ধব, ইঁহারা এবং অন্যান্য যদুবংশীয়েরাও পৃথক্ পৃথক্ গন্ধর্ব্বগণ ও অঙ্গনাগণ পরিবৃত হইয়া উৎসব করিতেছিলেন।

এই পরমাদ্ভুত কৌতূহল আরম্ভ হইলে বাসুদেব অর্জুন সমভিব্যাহারে তথায় উপস্থিত হইলেন; উপস্থিত হইয়া উৎসব-সমাজে ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেছেন, এই অবসরে তাঁহারা, সখীজনপরিবৃতা সর্ব্বালঙ্কারশোভিতা সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী বসুদেব-দুহিতা সুভদ্রাকে দর্শন করিলেন। দর্শন করিবামাত্র অর্জুনের অন্তঃকরণ চঞ্চল হইয়া উঠিল। তখন কৃষ্ণ প্রিয়সখা অর্জুনকে তদেকান্তমনাঃ' দেখিয়া হাস্যমুখে কহিলেন, সখে! বনচর হইয়াও অনঙ্গশরে চঞ্চল হইলে! এ কি! ইনি বসুদেবের কন্যা, সারণের সহোদরা এবং আমারই ভগিনী; ইঁহার নাম সুভদ্রা। হে সখে! যদি তোমার মন নিতান্তই ইহার প্রতি অনুরক্ত হইয়া থাকে, তবে আমি এই কথা পিতার কর্ণগোচর করি। অর্জুন কহিলেন, হে কৃষ্ণ! পরমরূপ-সম্পন্না সুভদ্রা বসুদেবের কন্যা ও বাসুদেবের ভগিনী; সুতরাং কাহার না মনোমোহিনী হইবেন? কিন্তু ইনি আমার মহিষী হইলেই সকল মঙ্গল সম্পাদিত হয়। অতএব এক্ষণে কি উপায়ে আমার সুভদ্রা লাভ হইবে, অনুসন্ধান কর। তাহা যদি মনুষ্যের সাধ্যাতীত না হয়, তদ্বিষয়ে আমি অবশ্যই যত্ন করিব। বাসুদেব প্রত্যুত্তর করিলেন, হে অর্জুন! স্বয়ংবরই ক্ষত্রিয়দিগের বিধেয়, কিন্তু স্ত্রীলোকের প্রবৃত্তির কথা কিছুই বলা যায় না, সুতরাং তদ্বিষয়ে আমার সংশয় জন্মিয়াছে। আর ধর্মশাস্ত্রকারেরা কহেন, বিবাহোদ্দেশে বলপূর্ব্বক হরণ করাও মহাবীর ক্ষত্রিয়দিগের প্রশংসনীয়। অতএব স্বয়ংবরকাল উপস্থিত হইলে তুমি আমার ভগিনীকে বলপূর্ব্বক হরণ করিয়া লইয়া যাইবে; কারণ স্বয়ংবরে সে কাহার প্রতি অনুরক্ত হইবে কে বলিতে পারে?

অনন্তর বাসুদেব ও অর্জুন এইরূপ ইতিকর্ত্তব্যতা স্থির করিয়া ইন্দ্রপ্রস্থগত ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নিকট দ্রুতগামী দূত প্রেরণ করিলেন। যুধিষ্ঠির এই বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া তদ্বিষয়ে অর্জুনকে অনুমোদন করিলেন।

সুভদ্রাহরণ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর যুধিষ্ঠিরকে এই সংবাদ প্রদান ও তাঁহার মত গ্রহণপূর্ব্বক, রৈবতক পর্ব্বতে সুভদ্রা গমন করিয়াছেন, ইহা অবগত হইয়া, তথায় যাইবার নিমিত্ত বাসুদেবের অনুজ্ঞা লাভ করিলেন। তিনি কবচ, বৰ্ম্ম, অঙ্গুলিত্রাণ ধারণপূর্ব্বক সুবর্ণকিঙ্কিণীজালালঙ্কৃত অস্ত্রশস্ত্রোপেত প্রজ্বলিত হুতাশনকল্প অপূর্ব্ব দিব্যরথে আরোহণপূর্ব্বক মৃগয়াব্যপদেশে কৃষ্ণকে ইতিকর্তব্যতা নিবেদন করত রৈবতক পর্ব্বতে গমন করিলেন।

এদিকে সুভদ্রা মহাগিরি রৈবতক ও দেবতাদিগকে অর্চ্চনা ও দ্বিজাতিগণের আশীর্ব্বাদ গ্রহণপূর্ব্বক শৈলকে প্রদক্ষিণ করিয়া দ্বারকাভিমুখে যাত্রা করিতেছেন, ইত্যবসরে মহাবীর অর্জুন মদনবাণে একান্ত আহত হইয়া সেই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী সুভদ্রাকে বলপূর্ব্বক গ্রহণ করিয়া রথে আরোহিত করিলেন।

তদনন্তর তিনি সুভদ্রাকে সেই সুবর্ণময় রথে আরোহিত করিয়া নিজ রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থে প্রস্থান করিলেন। সৈনিক পুরুষেরা সুভদ্রাকে অপহৃত দেখিয়া মহাকোলাহলপূর্ব্বক দ্বারকাপুরীর উভয়পার্শ্বে ধাবমান হইল। তাহারা তত্রত্য সুধৰ্ম্মা-নাম্নী সভায় সমুপস্থিত হইয়া সভাপালসন্নিধানে অর্জুনের বলবিক্রমের বিষয় সমুদায় নিবেদন করিল। সভাপাল সৈন্যমুখে সুভদ্রাহরণ-বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া মহাসুবর্ণময় রণভেরী বাদন করিতে লাগিলেন। সেই ভেরীরব শ্রবণ করিবামাত্র ভোজ, বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয়েরা অতিমাত্র ক্রুদ্ধ হইয়া অন্নপান পরিত্যাগ-পূর্ব্বক চতুৰ্দ্দিক্ হইতে আগমন করিতে লাগিলেন। তাঁহারা তথায় উপস্থিত হইয়া বিচিত্র মণিবিদ্রুমাদিখচিত, অপূর্ব্ব আস্তরণপটে আচ্ছাদিত, শত শত সুবর্ণময় সিংহাসনে প্রজ্বলিত হুতাশনের ন্যায় উপবিষ্ট হইলেন। সভাপাল অনুচরবর্গের সহিত সমুপবিষ্ট যাদবদিগের নিকট অর্জুনবৃত্তান্ত সমস্ত বর্ণন করিলেন।

মহাবীর যাদবেরা অর্জুনের এই অসহ্য অত্যাচার শ্রবণে ক্রোধে লোহিতলোচন হইয়া অহঙ্কার প্রকাশপূর্ব্বক আসন হইতে উত্থিত হইয়া তৎক্ষণাৎ সারথিদিগকে আদেশ করিলেন, তোমরা শীঘ্র রথযোজনা কর এবং প্রাস, মহার্হ ধনু ও বৃহৎ কবচসকল আনয়ন কর। কেহ কেহ উচ্চৈঃস্বরে সারথিকে আহ্বান করিয়া রথযোজনা করিতে আদেশ দিলেন। কেহ বা স্বয়ংই সুবর্ণালঙ্কৃত তুরঙ্গমগণকে যানে যোজনা করিতে লাগিলেন। রথ, কবচ এবং ধ্বজপতাকাসকল আনয়ন করিলে সেই বীরসর্ম্মৰ্দ্দ তুমুল হইয়া উঠিল।

অর্জুনের বিরুদ্ধে বলরামের রোষপ্রকাশ।

তদন্তর মধুপানে মত্ত নীলাম্বরধর মহাবীর হলধর তাঁহা-দিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে বীরগণ! তোমরা কি করিতেছ? কৃষ্ণ মৌনভাবে রহিয়াছেন, তাঁহার অভিপ্রায় না জানিয়া ক্রোধ প্রকাশ করা, কিংবা তর্জন গর্জন করা সকলই বৃথা; বৃথা কেন আস্ফালন করিতেছ? মহামতি বাসুদেব প্রথমতঃ স্বীয় অভিপ্রায় ব্যক্ত করুন, পরে ইঁহার যেরূপ ইচ্ছা তোমরা তদনুসারে কার্য্য করিবে। বলদেবের এইরূপ যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্যবাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহারা সকলেই সাধুবাদ প্রদান-পূর্ব্বক মৌনভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন।

বলদেবের বাক্যাবসানে তাঁহারা পুনরায় সভামধ্যে উপবেশন করিলেন। সকলে উপবিষ্ট হইলে বলদেব কৃষ্ণকে কহিলেন, হে কৃষ্ণ! দেখ সকলেই তোমার মুখ নিরীক্ষণ করিতেছেন, এ সময় কেন মৌনাবলম্বন করিয়া রহিয়াছ? আমরা তোমার উপরোধেই সেই কুলপাংশুল' অর্জুনকে সৎকার করিয়াছি, কিন্তু সে সৎকারের উপযুক্ত পাত্র নহে। কোন পুরুষ আপনাকে কুলীন বিবেচনা করিয়া কি, যে পাত্রে ভোজন করে মেই পাত্র চূর্ণ করিয়া থাকে? কোন মূঢ় ব্যক্তি পূর্ব্বকৃত সম্বন্ধে আদর ও নূতন সম্বন্ধ সংস্থাপন করিতে ইচ্ছা করিয়া এবং | ঐশ্বর্য্যের অভিলাষ রাখিয়া এইরূপ সাহসিক কার্য্য করিতে সমর্থ হয়? অর্জুন আমাদিগকে তাদৃশ অবমাননা ও তোমাকে অনাদর করিয়া অদ্য বলপূর্ব্বক আপন মৃত্যুস্বরূপ সুভদ্রাকে হরণ করিয়াছে। হে গোবিন্দ! মস্তকে পদাঘাততুল্য তাহার এই অসহ্য অত্যাচার কিরূপে সহ্য করিব? সর্পকে পদাঘাত করিলে সে কি তাহা ক্ষমা করিয়া থাকে? আমি একাকীই অদ্য এই বসুন্ধরাকে নিষ্কৌরব করিব, অর্জুনের এই ব্যতিক্রম আমি কখনই সহ্য করিব না। তখন অন্ধকগণও নিবিড় মেঘবৎ গম্ভীরস্বরে গর্জমান বলদেবের বাক্যে অনুমোদন করিলেন।

সুভদ্রাহরণ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


আদিপর্ব

হরণাহরণ পর্ব্বাধ্যায়।

কৃষ্ণের আদেশানুসারে পার্থের সুভদ্রার পাণিগ্রহণ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, যাদবেরা এইরূপে স্ব স্ব বলবীর্য্য প্রকটনপূর্ব্বক তর্জন গর্জন করিতে লগিলেন। অনন্তর বাসুদেব অর্থভূয়িষ্ঠ' বাক্যে কহিলেন, অর্জুন আমাদিগের কুলের অবমাননা করেন নাই, বরং সমধিক সম্মান রক্ষাই করিয়াছেন। তিনি তোমাদিগকে অর্থলুব্ধ মনে করেন না বলিয়াই অর্থদ্বারা সুভদ্রাকে গ্রহণ করিতে চেষ্টা করেন নাই। স্বয়ংবরে কন্যা লাভকরা অতীব দুরূহ ব্যাপার, এইজন্য তাহাতেও সম্মত হন নাই এবং পিতামাতার অনুমতি গ্রহণপূর্ব্বক প্রদত্তা কন্যার পাণিগ্রহণ করা তেজস্বী ক্ষত্রিয়ের প্রশংসনীয় নহে; অতএব আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, কুন্তীপুত্র ধনঞ্জয় উক্ত দোষ সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া বলপূর্ব্বক সুভদ্রাকে হরণ করিয়াছেন। এই সম্বন্ধ আমাদিগের কুলোচিত হইয়াছে এবং কুল, শীল, বিদ্যা ও বুদ্ধিসম্পন্ন পার্থ বলপূর্ব্বক হরণ করিয়াছেন বলিয়া, সুভদ্রাও যশস্বিনী হইবেন সন্দেহ নাই; অর্জুনকে সামান্য জ্ঞান করিও না; তিনি সর্ব্ববিষয়ে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ; সেই মহাযশাঃ সুপ্রসিদ্ধ অর্জুন কুন্তিভোজের দৌহিত্র। তদীয় জন্মে ভরতকুল অলঙ্কৃত হইয়াছে। মহাদেব ব্যতিরেকে তাঁহাকে যুদ্ধে পরাভব করিতে পারে, এমন ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হয় না। তাদৃশ রথ, মদীয় ঘোটক এবং লঘুহস্ত পার্থ যোদ্ধা, এই সমস্ত একত্র হইলে ত্রিভুবনমধ্যে এমন বীর কে আছে যে, তাঁহার সম্মুখীন হইতে পারে? অতএব আমার বিবেচনায় প্রফুল্লমনে শীঘ্র ধনঞ্জয়সন্নিধানে যাইয়া সান্ত্ববাদদ্বারা তাঁহাকে নিবৃত্ত করা সকলের কর্তব্য; কারণ যদি পার্থ তোমাদিগকে বলে পরাভব করিয়া স্বনগরে গমন করেন, তাহা হইলেই তোমাদিগের যশোরাশি সদ্যই বিনষ্ট হইবে, কিন্তু সান্ত্ববাদে পরাজয়ের সম্ভাবনা নাই। যাদবগণ কৃষ্ণের উপদেশা-নুসারে অর্জুনকে প্রতিনিবৃত্ত করিলে তিনি যথাবিধি সুভদ্রার পাণিগ্রহণ করিলেন এবং যাদবগণকর্তৃক পূজিত হইয়া যথেষ্ট বিহার করত দ্বারকাতে সংবৎসর অতিবাহিত করিলেন। পরে পুষ্করতীর্থে গমন করত একাদশ বৎসর অতিবাহিত করিলেন। এইরূপে দ্বাদশবর্ষ পরিপূর্ণ হইলে পুনরায় প্রত্যাগমন করিলেন।

খাণ্ডবপ্রস্থে সুভদ্রার আগমন এবং দ্রৌপদীর সহিত মিলন।

অর্জুন যথানিয়মে নৃপসন্নিধানে গমনপূর্ব্বক ব্রাহ্মণ-দিগকে অর্চ্চনা করিয়া দ্রৌপদীর নিকট উপনীত হইলেন। দ্রৌপদী রমণীস্বভাবসুলভ ঈষৎ প্রণয়কোপ প্রকাশ করিয়া কহিলেন, হে কৌন্তেয়! যে স্থানে সাত্বতকুমারী আছে, তথায় গমন কর। অথবা তোমারও নিতান্ত দোষ নাই, গুরুভার বস্তু দৃঢ়রূপে বদ্ধ থাকিলেও কালক্রমে তাহার পূর্ব্ব বন্ধ শিথিল হইয়া যায়। কৃষ্ণা এবংবিধ নানাপ্রকার পরিহাস করিতে আরম্ভকরিলে, ধনঞ্জয় তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ সান্ত্বনা এবং তাঁহার নিকট বারংবার ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। পরে অর্জুন রক্তবস্ত্রপরিধানা সুভদ্রাকে গোপালিকার বেশ ধারণপূর্ব্বক শীঘ্র অন্তঃপুরে প্রস্থান করিতে আজ্ঞা দিলেন। বরাঙ্গনা সুভদ্রা সেইরূপ বেশভূষায় অধিকতর শোভমানা হইয়া গৃহে প্রবেশ-পূর্ব্বক পৃথার চরণবন্দনা করিলেন। কুন্তী প্রীতমনে সেই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরীর মস্তক আঘ্রাণ করিয়া ভূরি ভূরি আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। সুভদ্রা তথা হইতে দ্রৌপদী সন্নিধানে গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনপূর্ব্বক কহিলেন, আমি অদ্যাবধি আপনার অনুচরী হইলাম। কৃষ্ণা গাত্রোত্থানপূর্ব্বক কৃষ্ণভগিনীকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, তোমার পতি নিঃসপত্ন হউন। মাধবভগিনী "তাহাই হউক" বলিয়া দ্রৌপদীকে প্রত্যুত্তর প্রদান করিলেন। পাণ্ডবগণ এবং কুন্তীর আর আহ্লাদের পরিসীমা রহিল না। পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ অর্জুন নির্বিঘ্নে ইন্দ্রপ্রস্থে গমন করিয়াছেন শুনিয়া বাসুদেব, বলদেব ও যদুবংশীয় অন্যান্য বীরপুরুষেরা, ভ্রাতৃবর্গ, কুমারগণ এবং অসংখ্য সেনাগণ সমভিব্যাহারে তথায় যাত্রা করিলেন। অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন | যাদবচমূপতি অক্রুর, মহাতেজাঃ অনাবৃষ্টি, মহানুভব উদ্ধব, সত্যক, সাত্যকি, কৃতবর্মা, সাত্বত, প্রদ্যুম্ন, শাম্ব, নিশঠ, শঙ্কু, চারুদেষ্ণ, ঝিল্লী, বিপৃথু, সারণ, গদ এবং অন্যান্য যাদব, ভোজ ও অন্ধকবংশীয়েরা বহুল যৌতুক গ্রহণপূর্ব্বক খাণ্ডবপ্রস্থে আগমন করিলেন।

কৃষ্ণ-বলরামসহ যাদবগণের খাণ্ডবপ্রস্থে আগমন।

অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির, কৃষ্ণ সমাগত হইয়াছেন শ্রবণ করিয়া তাঁহার অভ্যর্থনার নিমিত্ত নকুল ও সহদেবকে প্রেরণ করিলেন। কৃষ্ণ সাদরে পরিগৃহীত হইয়া ধ্বজপতাকাবিশোভিত খাণ্ডবপ্রস্থে প্রবেশ করিলেন। অত্রত্য রাজপথসকল নির্মূলীকৃত এবং শীতল সুগন্ধি চন্দনরসে অভিষিক্ত হইয়াছিল। কোন কোন প্রদেশ দহ্যমান অগুরুধূমে সুরভিত, কোন স্থান কুসুমমালায় সুশোভিত এবং কোন স্থান বণিদ্গণের কোলাহলে পরিপূর্ণ হইয়াছে, কোথাও বা নগরবাসী লোকেরা প্রফুল্ল মনে ভ্রমণ করিতেছে। শ্রীকৃষ্ণ বৃষ্ণিবংশীয় ভূপতিগণ ও বলদেব সমভি-ব্যাহারে নগরে প্রবেশপূর্ব্বক পৌরজন ও ব্রাহ্মণগণকর্তৃক পূজিত হইয়া ইন্দ্রালয়সদৃশ রাজভবনে প্রবেশ করিলেন। রাজা যুধিষ্ঠির বলরামের যথোচিত সৎকার করিয়া কৃষ্ণের মস্তকাঘ্রাণ এবং বাহুযুগলদ্বারা তাঁহাকে আলিঙ্গন করিলেন। কৃষ্ণ বিনীত-ভাবে ধর্মরাজ ও ভীমসেনকে অভিবাদন করিলেন। যুধিষ্ঠির সেই সমস্ত যাদবগণ ও প্রধান প্রধান অন্ধকদিগকে যথাবিধি সৎকার করিলেন। তিনি কাহাকেও গুরুবৎ পূজা করিলেন, কাহাকেও বয়স্যের ন্যায় প্রিয় সম্ভাষণ করিলেন এবং কাহারও নিকটে বা স্বয়ং অভিবাদিত' হইলেন। কৃষ্ণ ধনঞ্জয়কে জ্ঞাতিদের রত্নসমূহ যৌতুক প্রদান করিয়া বাহনচতুষ্টয়সংযুক্ত কিঙ্কিণী-জালজড়িত সহস্রসংখ্যক সুবর্ণরথ, সুশিক্ষিত সারথি, মাথুর-দেশীয় অযুত গো, শ্বেতবর্ণ বড়বাসমূহ, দ্রুতগামী অশ্বতর সহস্র, সুবর্ণালঙ্কারবিভূষিত সেবাকুশল কিঞ্চিৎ অধিকবয়স্কা সহস্র দাসী, বাহীকদেশীয় ঘোটকসমূহ, উৎকৃষ্ট সুবর্ণরাশি, মদস্রাবী অত্যুন্নত রণপরিচিত হস্তিপক বিশিষ্ট গজযূথ প্রভৃতি কন্যাধনসকল সুভদ্রাকে প্রদান করিলেন। বলরাম সেই সম্বন্ধের বহুমানপূর্ব্বক অমূল্য রত্নসমূহ, মহার্হ বস্ত্র, বহুল নাগেন্দ্র এবং শত পতাকা প্রভৃতি বস্তুজাত যৌতুক দান করিলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির উক্ত সমস্ত দ্রব্য পরিগ্রহ করিয়া সমাগত যাদব ও অন্ধকগণের যথোচিত সৎকার করিলেন। যেমন পুণ্যাত্মা লোকেরা পরম সুখে স্বর্গ ভোগ করেন, তদ্রূপ সেই সকল মহাত্মারা তথায় গীত বাদ্যদ্বারা যথেষ্ট বিহার করিতে লাগিলেন।

অভিমন্যুর জন্ম।

এইরূপে বহুদিবস অতিবাহিত হইলে বলদেব পুরঃসর সেই সকল মহাত্মারা কৌরবগণকর্তৃক রত্নসমূহ ও সম্মানদ্বারা পূজিত হইয়া দ্বারবতী নগরে প্রত্যাগমন করিলেন। কৃষ্ণ পার্থের সহিত পরম রমণীয় ইন্দ্রপ্রস্থে বাস করিতে লাগিলেন। তাঁহারা দুইজনে মৃগয়াসক্ত হইয়া মৃগ বরাহ বিদ্ধ করত যমুনাতীরে ক্রীড়া করিতেন। অনন্তর শচী যেমন জয়ন্তকে প্রসব করিয়া-ছিলেন, তদ্রুপ কৃষ্ণের প্রিয়তমা ভগিনী সুভদ্রা সুবিখ্যাত ও সর্ব্বলক্ষণাক্রান্ত এক পুত্র প্রসব করিলেন। তিনি স্বভাবতঃ অভী ও মন্যুমান্ অর্থাৎ নির্ভয় ক্রোধান্বিত ছিলেন বলিয়া তাঁহার নাম অভিমন্যু হইল। লোকে তাঁহাকে আজ্জুনি বলিয়াও সম্বোধন করিত। যেমন সংঘর্ষণদ্বারা শমীবৃক্ষ হইতে অগ্নি সমুদ্ভূত হয়, তদ্রূপ ধনঞ্জয় হইতে অভিমন্যু উৎপন্ন হইয়াছিলেন। অভিমন্যুর জন্ম হইলে ধৰ্ম্মরাজ অযুত গো ও সুবর্ণরাশি বিপ্রসাৎ করিলেন। তিনি জন্মিয়া অবধি কৃষ্ণের সাতিশয় প্রিয়পাত্র ছিলেন। শারদ-শব্বরীনাথ সন্দর্শনে লোকের যাদৃশ প্রীতি হয়, তাঁহাকে দেখিয়া পিতৃগণ ও প্রজাগণের সেইরূপ আহ্লাদ হইত। তাঁহার জাতকার্য্য প্রভৃতি সমুদায় শুভকৰ্ম্ম বাসুদেব স্বয়ং সম্পন্ন করেন। তিনি শুক্লপক্ষীয় চন্দ্রকলার ন্যায় দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিলেন। পরে অর্জুনের নিকট নিখিল ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করেন এবং বিজ্ঞান প্রভৃতি প্রধান প্রধান শাস্ত্র ও বিশেষ বিশেষ ক্রিয়াকলাপে সুশিক্ষিত হইয়াছিলেন। ধনঞ্জয় আগম' ও শস্ত্রপ্রয়োগবিষয়ে আত্মজকে আত্মতুল্য এবং সর্বাংশে কৃষ্ণসদৃশ দেখিয়া আহ্লাদ-সাগরে নিমগ্ন হইলেন।

পাঞ্চালীর পঞ্চবীরের জন্মদান।

এই সময়ে শুভলক্ষণা দ্রৌপদীও পঞ্চপতি হইতে ভূধরতুল্য দৃঢ়কায় মহাবল পরাক্রান্ত পঞ্চ পুত্র লাভ করিলেন। আদিত্যজননী অদিতির ন্যায় পাঞ্চালী যুধিষ্ঠির হইতে প্রতিবিন্ধ্য, বৃকোদর হইতে সুতসোম, অর্জুন হইতে শ্রুতকৰ্ম্মা, নকুল হইতে শতানীক এবং সহদেব হইতে শ্রুতসেন, এই পঞ্চ বীর প্রসব করিলেন। দ্রৌপদীতনয়েরা প্রত্যেকে এক এক বৎসরান্তরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহারা পরস্পর পরস্পরের হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। মহর্ষি ধৌম্য আনুপূর্ব্বিক তাঁহাদিগের জাতকর্ম, চূড়া ও উপনয়নাদি সম্পন্ন করেন। তাঁহারা বেদাধ্যয়ন সমাপন-পূর্ব্বক অর্জুনের নিকট নিখিল অস্ত্র ও ধনুর্ব্বেদ শিক্ষা করিলেন। হে ভরতর্ষভ! এইরূপে পাণ্ডবেরা দেবকুমারসদৃশ আত্মজগণের সহিত পরম সুখে খাণ্ডবপ্রস্থে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

হণাহরণ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।


আদিপর্ব

খান্ডবদহন পর্বাধ্যায়।

ইন্দ্রপ্রস্থে পাণ্ডবগণের সুখে কালাতিপাত।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, পাণ্ডবগণ ইন্দ্রপ্রস্থে বাস করত রাজা ধৃতরাষ্ট্রের ও শান্তনব ভীষ্মের আদেশে অন্যান্য রাজ-গণকে বিনষ্ট করিলেন। যেমন জীবাত্মা সুলক্ষণসম্পন্ন ও সৎকর্মশালী পুরুষের শরীরে সুখে বাস করেন, সেইরূপ সমুদায় লোক পুণ্যকর্মা ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে আশ্রয় করিয়া ইন্দ্রপ্রস্থে সুখে বাস করিতে লাগিলেন। নীতিমান্ ধৰ্ম্মরাজ ধর্মার্থকাম ত্রিবর্গ ও আত্মতুল্য ভ্রাতৃবর্গের প্রতি নির্বিশেষ অনুরাগ করিতেন। রাজা স্বয়ং ধর্মার্থকাম ত্রিবর্গের ও চতুর্থ মোক্ষের ন্যায় শোভান্বিত হইলেন। বেদাধ্যয়নশীল, যজ্ঞশীল ও শিষ্টপ্রতিপালক ভূপালকে প্রাপ্ত হইয়া প্রজাগণের কমলা অচঞ্চলা এবং বুদ্ধি ও ধর্ম্মের উৎকর্ষ হইতে লাগিল। যেমন উচ্চার্য্যমাণ বেদচতুষ্টয়দ্বারা জ্যোতিষ্টোমাদি মহৎ যজ্ঞ সুশোভিত হয়, রাজা যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃচতুষ্টয়ের সহিত তদ্রুপ নিরতিশয় শোভা প্রাপ্ত হইলেন। যেমন দেবতারা বেষ্টন করিয়া প্রজাপতির উপাসনা করেন, বৃহস্পতিতুল্য ধৌম্যাদি ব্রাহ্মণগণও ভূপাল যুধিষ্ঠিরকে সেইরূপে উপাসনা করিতেন। যেমন নিৰ্ম্মল পূর্ণ চন্দ্রের অবলোকনে প্রজাগণের নেত্র ও হৃদয় প্রফুল্ল হয়, সেইরূপ ভূপাল যুধিষ্ঠিরকে প্রাপ্ত হইয়া তাহাদিগের নেত্র ও হৃদয় আনন্দে পরিপূর্ণ হইত। তাহারা যে দৈবাধীন তাঁহার প্রজা হইয়াছে বলিয়া তাঁহার প্রতি অনুরক্ত থাকিত এমন নহে, রাজাও সর্ব্বদা প্রজাগণের মনোরঞ্জন করিতেন। ধীমান্ মিষ্টভাষী যুধিষ্ঠিরের মুখ হইতে অনুচিত, মিথ্যা, অসহ্য বা অপ্রিয়-বাক্য কদাচ নির্গত হইত না। মহাতেজাঃ যুধিষ্ঠির সতত আপনার ও অন্যের হিতসাধনেচ্ছু হইয়া পরম পরিতোষে কালাতিপাত করিতেন। সুস্থশরীর ও হৃষ্টচিত্ত পাণ্ডবগণ স্বকীয় তেজঃপ্রভাবে অন্যান্য রাজগণকে তাপিত করত ইন্দ্রপ্রস্থে বাস করিতে লাগিলেন।

কৃষ্ণার্জুনের নিকট দ্বিজবরের আগমন।

একদা অর্জুন কৃষ্ণকে কহিলেন, হে জনার্দ্দন! গ্রীষ্মের অতিমাত্র প্রাদুর্ভাব হইয়াছে, অতএব আমরা সপরিবারে যমুনায় যাইয়া জলবিহার করিতে অভিলাষ করি; সায়ংকালে সকলে প্রত্যাগমন করিব, তোমার কি অভিরুচি হয়? বাসুদেব কহিলেন, হে অর্জুন! আমারও সম্পূর্ণ ইচ্ছা হইতেছে যে, আমরা সুহৃজ্জনপরিবৃত হইয়া যথেচ্ছ জলবিহার করি। বৈশম্পায়ন কহিলেন, কৃষ্ণ ও অর্জুন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের অনুমতি লইয়া সুহৃদ্গণের সহিত যমুনায় গমন করিলেন। অনন্তর তাঁহারা নানাবিধ বৃক্ষে সমাকীর্ণ ইন্দ্রপুরসদৃশ, বিবিধ খাদ্যদ্রব্যযুক্ত ও সুগন্ধি মাল্যজালে পরিবৃত বিহারদেশে উপস্থিত হইয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। তথায় সকলেই আনন্দে বিহার করিতে আরম্ভকরিলেন। বিপুলনিতম্বা পীনোন্নতপয়োধরা মদস্খলিত গমনা বামলোচনারা ক্রীড়ামদে মত্ত হইয়া উঠিল। কেহ বনবিহার, কেহ জলবিহার, কেহ বা গৃহমধ্যে বিহার করিতে লাগিল। দ্রৌপদী ও সুভদ্রা বিবিধ বিচিত্র বসন ও নানাবিধ অলঙ্কার কামিনীগণকে প্রদান করিলেন। কোন কামিনী হৃষ্টান্তঃকরণে নৃত্যগীত আরম্ভ করিল; কেহ সুমধুরস্বরে শব্দ করিতে লাগিল; কেহ হাস্য পরিহাসে মত্ত হইল; কেহ অত্যুৎকৃষ্ট সুরা পান করিয়া গদ্গদস্বরে কথা কহিতে লাগিল; কেহ বা কাহার সহিত বিরোধ আরম্ভ করিল; কেহ বা নির্জন স্থানে যাইয়া গোপনীয় বিষয় লইয়া কথোপকথন করিতে লাগিল এবং তত্রস্থ সমৃদ্ধি-শালী অট্টালিকা সকল বেণু, বীণা ও মৃদঙ্গের সুমনোহর শব্দে পরিপূর্ণ হইল। অনন্তর মহাত্মা বাসুদেব ও অর্জুন এক মনোহর প্রদেশে গমন করিয়া মহামূল্য আসনে উপবেশন করিলেন। তাঁহারা আসনে উপবেশনপূর্ব্বক অতীত ও অন্যান্য বৃত্তান্ত লইয়া নানাপ্রকার কথোপকথন করিতে লাগিলেন। কৃষ্ণার্জুন অশ্বিনীকুমারের ন্যায় আসনে উপবিষ্ট হইয়া আমোদ প্রমোদ করিতেছেন, ইত্যবসরে তপ্তকাঞ্চনসন্নিভ তরুণারুণসঙ্কাশ' পিঙ্গোজ্জ্বল শ্মশ্রুজালজড়িত জটাচীরধারী এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। তাঁহারা সেই দ্বিজবরকে সমীপে আগত দেখিয়া আসন পরিত্যাগপূর্ব্বক তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিলেন।

খাণ্ডবদাহার্থ অর্জুনসকাশে অগ্নির প্রার্থনা।

ব্রাহ্মণ আসন পরিগ্রহানন্তর মানবশ্রেষ্ঠ বাসুদেব ও অর্জুনকে কহিলেন, আমি ব্রাহ্মণ, অধিক আহার করিয়া থাকি এবং সর্ব্বদাই অপরিমিত ভোজন করি; আপনাদের নিকটে ভিক্ষা প্রার্থনা করিতেছি, আপনারা আমার প্রার্থনা সফল করুন। ব্রাহ্মণ এইরূপ প্রার্থনা করিলে কৃষ্ণ ও পাণ্ডব তাঁহাকে কহিলেন, আপনি নানাবিধ অন্নের মধ্যে কি প্রকার অন্ন প্রার্থনা করেন, বলুন; আমরা তাহা আহরণ করিতে যত্নবান্ হই। ব্রাহ্মণ এইরূপ অভিহিত হইয়া কহিলেন, আমি অন্নভোজন করি না; আমি অগ্নি, অতএব আমার অনুরূপ অন্ন প্রদান করুন। ইন্দ্রের সখা পন্নগরাজ তক্ষক স্বীয় পরিবারবর্গের সহিত খাণ্ডববনে বাস করে। বজ্রভৃৎ ইন্দ্র ঐ খাণ্ডববন সর্ব্বদাই রক্ষা করিয়া থাকেন। আমি তাঁহার প্রভাবে খাণ্ডববন দগ্ধ করিতে পারি না। ইন্দ্র আমাকে প্রজ্বলিত দেখিলেই মুষলধারে জল বর্ষণ করিতে থাকেন, তন্নিমিত্ত আমার অভিলষিত খাণ্ডবদাহ সম্পন্ন করিতে পারিতেছি না। অতএব আপনাদের নিকট এই ভিক্ষা প্রার্থনা করি যে, আপনারা আমার সহায় হইয়া অস্ত্র ধারণপূর্ব্বক উদকধারা ও তত্রস্থ ইন্দ্রসম্বন্ধীয় প্রাণিগণকে নষ্ট করুন, তাহা হইলে আমি খাণ্ডববন দগ্ধ করিতে সমর্থ হই।

জনমেজয় কহিলেন, ভগবান্ হব্যবাহন যে নিমিত্ত অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া মহেন্দ্রকর্তৃক রক্ষ্যমাণ নানাসত্ত্বসমাকুল খাণ্ডববন দগ্ধ করিতে অভিলাষ করিয়াছিলেন, বোধ হয় তাহা সামান্য কারণ নহে; অতএব হে দ্বিজবর। আমি সেই বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি, বর্ণন করুন।

শ্বেতকিরাজার উপাখ্যান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। আমি ঋষিগণ-প্রশংসিত খাণ্ডববনদাহাশ্রিত পৌরাণিকী কথা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। মহারাজ! শুনিয়া থাকিবেন, পূর্ব্বকালে শ্বেতকি নামে মহাবল পরাক্রান্ত এক সুবিখ্যাত ভূপাল ছিলেন। এইরূপ জনশ্রুতি আছে যে, সেই রাজর্ষি অতিশয় যাজ্ঞিক ও বুদ্ধিমান্ ছিলেন। তিনি প্রভূত দক্ষিণা দানপূর্ব্বক যজ্ঞানুষ্ঠান করিতেন। ক্রিয়ারম্ভ, যজ্ঞানুষ্ঠান ও বিবিধ ধনদানবিষয়ে প্রতিদিনই তাঁহার যেরূপ অনুরাগ হইত, অন্য কোন বিষয়েই সেরূপ অনুরাগ জন্মিত না। এইরূপে মহারাজ শ্বেতকি ঋত্বিক্বণ সমভিব্যাহারে অনেকানেক যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। অনন্তর ঋত্বিগণ অনবরত উত্থিত যজ্ঞধূমদ্বারা ব্যাকুললোচন ও বহুকাল যাজন' কার্য্য সমাধানপূর্ব্বক একান্ত খিন্ন হইয়া রাজাকে কহিলেন, আপনি আমাদিগকে পরিত্যাগ করুন। রাজা তাঁহাদিগকে বিকলনেত্র ও যজ্ঞানুষ্ঠানে নিতান্ত অপটু বিবেচনা করিয়া বিদায় করিলেন এবং তাঁহাদিগের অনুমত্যানুসারে অপরাপর ঋত্বিক্মণ সমভিব্যাহারে যজ্ঞকৰ্ম্ম সমাপন করিলেন।

শ্বেতকিরাজার মহাদেবের নিকট বরপ্রার্থনা।

এইরূপে কিয়ৎকাল অতীত হইলে রাজা শতবর্ষব্যাপী এক দীর্ঘ সত্র আহরণ করিবার নিমিত্ত সেই সমস্ত ঋত্বিগণকে আহ্বান করিলেন, কিন্তু তাঁহারা উপস্থিত হইলেন না। তখন তিনি বন্ধুবান্ধবের সহিত ঋত্বিগণকে অনুনয় করিতে লাগিলেন। প্রণিপাত, সান্ত্ববাদ ও ধনদানদ্বারা বারংবার তাঁহা-দিগকে অনুনয় করিলেন, তথাচ তাঁহারা রাজার মনোরথ সফল করিলেন না। তখন মহীপাল রোষপরবশ হইয়া আশ্রমবাসী মহর্ষিদিগকে কহিলেন, হে মহর্ষিগণ। যদি আমি পতিত হইতাম এবং আপনাদিগের শুশ্রূষায় নিরত না হইতাম, তাহা হইলে আপনারা ও অন্যান্য ব্রাহ্মণেরা আমাকে ঘৃণা করিয়া পরিত্যাগ করিতে পারিতেন; কিন্তু আমি সেরূপ নহি, অতএব মদীয় যজ্ঞনিষ্ঠার ব্যাঘাত বা অযোগ্য সময়ে আমাকে পরিত্যাগ করা আপনাদিগের বিধেয় নহে। এক্ষণে আমি আপনাদিগের শরণাপন্ন হইয়াছি, প্রসন্ন হউন। সান্ত্ববাদ, দান ও যথার্থবাক্য দ্বারা আপনাদিগকে প্রসন্ন করিয়া যাহা কর্ত্তব্য, সমুদায় নিবেদন করিব। অথবা যদি বিদ্বেষবশতঃ আপনারা আমাকে পরিত্যাগ করেন, তাহা হইলে আমি যাজনকার্য্য সমাধা করিবার নিমিত্ত অন্যান্য ঋত্বিকগণের নিকট গমন করিব। মহারাজ শ্বেতকি এই কথা বলিয়া মৌনাবলম্বন করিলেন। মহর্ষিগণ রাজার যাজনকাৰ্য্য অস্বীকার করিয়া ক্রোধভরে কহিলেন, মহারাজ। আমরা বহুকালাবধি আপনার অবিচ্ছিন্ন যজ্ঞকার্য্যে নিরন্তর দীক্ষিত হইয়া একান্ত ক্লান্ত ও নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়াছি। এক্ষণে আপনি আমাদিগকে পরিত্যাগ করুন। আপনার নিতান্ত বুদ্ধি-বিপর্যয় ঘটিয়াছে, এই কারণে আমাদিগকে বারংবার এইরূপ অনুরোধ করিতেছেন। এক্ষণে আপনি রুদ্রদেবসন্নিধানে গমন করুন; তিনিই আপনার যাজনকার্য্য করিবেন।

রাজা মহর্ষিগণের এইরূপ তিরস্কারবাক্য শ্রবণ করিয়া ক্রোধে অধীর হইয়া উঠিলেন এবং কৈলাসপর্ব্বতে গমন করিয়া অতি কঠোর তপস্যার অনুষ্ঠান ও ব্রতোপবাসাদি দ্বারা দেবদেব মহাদেবকে আরাধনা করত সুদীর্ঘকাল বাস করিতে লাগিলেন। তিনি কখন দ্বাদশ দিবসে, কখন ষোড়শ দিবসে বন্য ফল মূল আহার করিতেন, কখন উর্দ্ধবাহু হইয়া ছয় মাস অনিমেষলোচনে নিশ্চল স্থাণুর ন্যায় অবস্থান করিতেন। ভগবান্ চন্দ্রশেখর রাজার এইরূপ অতি কঠোর তপস্যায় প্রীত ও প্রসন্ন হইয়া তথায় আবির্ভূত হইয়া ভুপালকে কহিলেন, মহারাজ! আমি তোমার তপস্যায় অতিশয় প্রীত হইয়াছি, তোমার মঙ্গল হউক। এক্ষণে স্বেচ্ছানুসারে বর প্রার্থনা কর। রাজর্ষি রুদ্রের এইরূপ কথা শুনিয়া প্রণিপাতপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্! আপনি সর্ব্বজন-পূজিত, এক্ষণে যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে আপনি স্বয়ং আমার যাজনকার্য্য সমাধা করিবেন, এই বর প্রদান করুন। ইহা শুনিয়া ভগবান্ উমাপতি প্রীতমনে ও সম্মিত' বচনে কহিলেন, মহারাজ। যজ্ঞকার্য্য করিতে পারে, এমন লোক এই প্রদেশে কাহাকেও দেখি না। তুমিও আমার নিকট বরার্থী হইয়া অতি কঠোর তপোনুষ্ঠান করিয়াছ; কিন্তু আমার সহিত তোমাকে একটি নিয়ম সংস্থাপন করিতে হইবে, যদি তুমি দ্বাদশ বৎসর সমাহিত ও ব্রহ্মচারী হইয়া নিরবচ্ছিন্ন ঘৃতধারাদ্বারা অনলকে পরিতৃপ্ত করিতে পার, তাহা হইলে তুমি আমার নিকট যে বিষয় প্রার্থনা করিবে, তাহা সুসম্পন্ন করিব।

শিবের অনুরোধে দুর্ব্বাসাকে যাজনকার্য্যে আহ্বান।

রাজা রুদ্রকর্তৃক এইরূপ অভিহিত ও আদিষ্ট হইয়া দ্বাদশ বৎসর ব্রহ্মচর্য্য অনুষ্ঠান করিলেন। অনন্তর দ্বাদশ বৎসর সম্পূর্ণ। হইলে তিনি পুনরায় ভূতভাবন ভগবান্ মহাদেবের নিকটে উপস্থিত হইলেন। মহাদেব রাজাকে দেখিয়া প্রীতমনে কহিলেন, মহারাজ। আমার আজ্ঞা পালন করিয়াছ বলিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলাম, কিন্তু যাজনকার্য্যে দীক্ষিত হওয়া ব্রাহ্মণদিগেরই বিধেয়; এই কারণে আমি স্বয়ং তোমার যাজনকার্য্য করিতে পারিব না। এই ভূমণ্ডলে দুর্ব্বাসাঃ নামে এক মহর্ষি আছেন, তিনি অতিশয় সুবিখ্যাত ও আমারই অংশভূত। তিনিই তোমার যাজনকার্য্য সম্পন্ন করিবেন। এক্ষণে স্বনগরে গমন করিয়া যজ্ঞীয় দ্রব্যসামগ্রী সকল আহরণ কর। রাজা ভগবান্ পশুপতির আদেশানুসারে স্বনগরে প্রতিগমনপূর্ব্বক যজ্ঞীয় দ্রব্যজাত আহরণ করিলেন। দ্রব্যসম্ভার সম্ভূত' হইলে তিনি পুনর্ব্বার রুদ্রসন্নিধানে উপনীত হইয়া কহিলেন, ভগবন্। যজ্ঞীয় দ্রব্যসম্ভার ও উপকরণ সমস্ত আহৃত হইয়াছে, এক্ষণে আপনি প্রসন্ন হইয়া অনুমতি করিলে আমি পরদিনেই যজ্ঞকার্য্যে দীক্ষিত হই। রুদ্র রাজার এই কথা কর্ণগোচর করিয়া মহর্ষি দুর্ব্বাসাকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, হে দ্বিজেন্দ্র! এই মহানুভব ভূপতির নাম শ্বেতকি, আমার নির্দেশ প্রযুক্ত তোমাকে ইঁহার যাজনক্রিয়া সম্পন্ন করিতে হইবে। মহর্ষি তৎক্ষণাৎ “তথাস্তু” বলিয়া তাঁহার বাক্য স্বীকার করিলেন। অনন্তর যজ্ঞকার্য্য যথাবিধানে আরব্ধ হইল। সেই যজ্ঞ সমাপ্ত হইলে মহর্ষি দুর্ব্বাসার আদেশানুসারে দীক্ষিত যাজক ও সদস্যগণ স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।

অগ্নিকে খাণ্ডবদহনে অনুমতিদান।

অনন্তর ভগবান্ হুতাশন বিকৃতভাবাপন্ন ও তেজোহীন হইয়া ক্রমশঃ গ্লানিযুক্ত হইতে লাগিলেন। তখন তিনি আপনাকে তেজোহীন বিবেচনা করিয়া অতিপবিত্র ও লোকপূজিত ব্রহ্মলোকে গমন করিলেন। তথায় ব্রহ্মাকে আসনে আসীন দেখিয়া নিবেদন করিলেন, ভগবন্! আমি তেজোহীন ও নির্ব্বীর্য্য হইয়াছি; এক্ষণে আপনার অনুকম্পায় পুনরায় স্বীয় নিশ্চলা প্রকৃতি প্রাপ্ত হইতে অভিলাষ করি। ইহা শ্রবণ করিয়া ভগবান্ বিশ্বনির্মাতা হাস্যমুখে বহ্নিকে কহিলেন, হে মহাভাগ। তুমি দ্বাদশ বৎসর বহুধারাহুত ঘৃত উপযোগ করিয়াছিলে বলিয়াই এরূপ গ্লানিযুক্ত হইয়াছ; কিন্তু তেজোহীনবশতঃ সহসা ভগ্নাশ হইও না; তুমি পুনর্ব্বার পূর্ব্ববৎ প্রকৃতিস্থ হইবে। পূর্ব্বে দেবনিয়োগক্রমে দেবশত্রু অসুরগণের আলয়ভূত যে ভয়ঙ্কর খাণ্ডবারণ্য দগ্ধ করিয়াছিলে, তথায় নানাবিধ জন্তুগণ বাস করে, তুমি তাহাদিগের মেদোমাংসভক্ষণে পরিতৃপ্ত হইয়া পুনরায় প্রকৃতিস্থ হইবে। অতএব শীঘ্র যাইয়া খাণ্ডববন দগ্ধ কর, তাহা হইলে অবশ্যই গ্লানিরূপ পাপ হইতে আশু মুক্ত হইতে পারিবে।

খাণ্ডবদহন।

হুতাশন ব্রহ্মার মুখে এই কথা শুনিয়া প্রচণ্ডবেগে খাণ্ডবারণ্যে গমন করিলেন। তথায় উপনীত হইয়া ক্রোধভরে সহসা প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন, বায়ু তাঁহার সাহায্য করিতে লাগিলেন। খাণ্ডববন প্রদীপ্ত দেখিয়া তত্রত্য প্রাণিগণ দাহশান্তির নিমিত্ত একান্ত যত্নবান্ হইল। করিযূথ ক্রোধপরবশ হইয়া সত্বরে শুণ্ড দ্বারা জলানয়নপূর্ব্বক অনলোপরি সেক করিতে লাগিল, বহুশীর্ষ সর্পগণ ক্রোধে মূর্ছিত হইয়া মস্তকদ্বারা জলসেক করিতে আরম্ভ করিল এবং অন্যান্য প্রাণিগণও নানা প্রকার উপায় দ্বারা অনতিকালমধ্যে দাবদাহ শান্তি করিল। বহ্নি ক্রমে ক্রমে সাত বার প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন, তাহারা সাতবারই নির্ব্বাণ করিল।

অগ্নির নিকট অর্জুনের অস্ত্রপ্রার্থনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! এইরূপে সর্ব্বদা গ্লানিযুক্ত ভগবান্ হুতাশন বারংবার হতাশ হইয়া তৎক্ষণাৎ কোপাকুলিতচিত্তে ব্রহ্মার নিকট গমন করিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে আনুপূর্ব্বিক সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। ব্রহ্মা মনোমধ্যে কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া বহ্নিকে কহিলেন, হে অনল! অদ্য দেবরাজ ইন্দ্রের সমক্ষে যে প্রকারে তুমি খাণ্ডববন দগ্ধ করিতে পারিবে, আমি এক উপায় অবধারণ করিয়াছি, শ্রবণ কর। দেবকার্য্য অনুষ্ঠান করিবার নিমিত্ত পূর্ব্বদেব' নর ও নারায়ণ মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হইয়াছেন, লোকে তাঁহাদিগকে কৃষ্ণার্জন বলিয়া আহ্বান করিয়া থাকে। তুমি কৃষ্ণার্জুন সমভিব্যাহারে খাণ্ডববনে গমন করিয়া দাবদাহ করিবার নিমিত্ত তাঁহাদিগের সাহায্য গ্রহণ কর। তৎপরে দেবগণ রক্ষা করিলেও তুমি অবলীলাক্রমে সেই অরণ্য দগ্ধ করিতে পারিবে। কৃষ্ণার্জুন সমবেত হইয়া সমস্ত বন্য জন্তুদিগকে এবং অধিক কি বলিব, দেবরাজ ইন্দ্রকেও যত্নপূর্ব্বক নিবারণ করিতে পারিবেন, ইহাতে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। এই কথা শুনিয়া হুতাশন কৃষ্ণার্জুন-সন্নিধানে উপনীত হইয়া সাহায্যদানার্থে প্রার্থনা করিলেন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। অর্জুন ও কৃষ্ণের নিকট উপস্থিত হইয়া অগ্নি যেরূপে প্রার্থনা করিয়াছিলেন, তাহা পূব্বেই আপনাকে অবগত করিয়াছি। তৎপরে অর্জুন অগ্নিবাক্য শ্রবণ করিয়া তৎকালোচিত প্রত্যুত্তর প্রদান করিয়া কহিলেন, হে অগ্নে। আমার বহুতর দিব্যাস্ত্র আছে, তদ্দ্বারা আমি শত শত বজ্রধরের সহিত যুদ্ধ করিতে পারি। কিন্তু যৎকালে আমি সমরক্ষেত্রে বিক্রম প্রকাশ করিব, তখন আমার ভুজবেগ সহ্য করিতে পারে এমন ধনুঃ নাই। আমি অতি সত্বরে শরক্ষেপ করিতে পারি, আমার শরের আবশ্যকতা নাই। আমার রথ মদীয় শস্ত্রপুঞ্জ বহন করিতে অসমর্থ, অতএব বায়ুবৎ বেগশালী পাণ্ডুরবর্ণ দিব্য অশ্ব ও এক উৎকৃষ্ট রথ প্রদান করিতে হইবে। আর কৃষ্ণেরও বাহুবল তুল্য অস্ত্র নাই, যদ্দ্বারা তিনি নাগ ও পিশাচগণকে সংহার করিতে পারিবেন। হে ভগবন্। যদ্দারা আমরা বজ্রধর ইন্দ্রকে নিবারণ করিতে পারি, তাহার উপায় অবধারণ করিয়া দিন। আমরা কেবল পৌরুষ প্রকাশ করিয়া কার্য্য সংসাধনে প্রবৃত্ত হইব, কিন্তু আপনাকে তদুপযোগী উপকরণসকল আহরণ করিতে হইবে।

অর্জুনের ব্রহ্মানিৰ্ম্মিত গাণ্ডীব লাভ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, ভগবান্ হুতাশন অর্জুনকর্তৃক এই রূপ অভিহিত হইয়া উদকমধ্যবাসী জলেশ্বর বরুণদেবকে স্মরণ করিলেন। চতুর্থ লোকপাল বরুণ তাঁহার চিন্তা অবগত হইয়া তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হইলেন। ভগবান্ হুতাশন সমাগত বরুণকে যথোচিত সৎকার করিয়া কহিলেন, জলেশ্বর। সোমরাজ তোমাকে যে ধনুঃ, তৃণীরদ্বয় ও কপি-লক্ষণ' রণ প্রদান করিয়া ছিলেন, তৎসমুদায় আমাকে শীঘ্র প্রদান কর। পার্থ গাণ্ডীবদ্বারা ও কৃষ্ণচক্র দ্বারা কোন মহৎ কৰ্ম্ম সম্পাদন অরবেন। বরুণরায় অগ্নির প্রার্থনায় সম্মত হইয়া যশঃকীর্তি-বর্দ্ধন সর্ব্বশস্ত্রপ্রমাথী, সর্ব্বায়ুধসারভূত সেই বিচিত্রবর্ণ পরমাদ্ভূত দিব্যশরাসন, অক্ষয় তৃণীরদ্বয় এবং রমণীয় এক রথ প্রদান করিলেন। ঐ রথ সুবর্ণালঙ্কারে ভূষিত রক্তবর্ণ মহাবেগশীল গান্ধর্ব্ব অশ্বগণে সংযোজিত ছিল, উহা সমস্ত যুদ্ধোপকরণ-সংযুক্ত, দেবদানবগণের অজেয়, সর্ব্বরত্নসুশোভিত কিরণরাজি-বিরাজিত, গভীর গর্জনবিশিষ্ট এবং কপিকেতনে অলঙ্কৃত। ভুবনপ্রভু বিশ্বকর্মা ঐ রথ নির্মাণ করিয়াছিলেন।

মহারাজ সোম ঐ রথে আরোহণপূর্ব্বক দানবগণকে পরাজয় করিয়াছিলেন। কৃষ্ণ ও অর্জুন সেই নবমেঘাকৃতি পরম রমণীয় রথের নিকটবর্তী হইয়া ইন্দ্রায়ুধের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। ঐ রথের ধ্বজযষ্টি সুবর্ণময়, উহার উপরিভাগে শাদুলবৎ ভয়ঙ্কর এক প্রকাণ্ড কলেবর বানর সন্নিবেশিত এবং ধ্বজে বিবিধ বৃহৎকায় জীবজন্তুর প্রতিমূর্ত্তি নির্মিত আছে। রথের ধ্বনি শ্রবণ করিলে শত্রুসৈন্যগণ বিলুপ্তচেতন হয়। যেমন সুকৃতী ব্যক্তি বিমানে আরোহণ করে, তদ্রূপ অর্জুন কবচ পরিধান, খড়াধারণ, গোধাঙ্গুলিত্র বন্ধন ও দেবগণকে নমস্কার করিয়া প্রদক্ষিণপূর্ব্বক সেই রথে আরোহণ করিলেন। পরে ব্রহ্মানিৰ্ম্মিত গাণ্ডীব ধনুগ্রহণ করিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। তখন তিনি হুতাশনসমক্ষে বলপূর্ব্বক ধনুগ্রহণ করিয়া তাহাতে জ্যারোপণ করিলেন। জ্যারোপণকালে এরূপ ভয়ানক শব্দ হইতে লাগিল যে, উহা শ্রবণে সকলেরই মন ব্যথিত হইল। কুন্তীনন্দন অর্জুন রথ, ধনুঃ ও অক্ষয় তৃণীরদ্বয় প্রাপ্ত হইয়া অতিমাত্র সন্তুষ্ট হইলেন।

কৃষ্ণের সুদর্শন চক্র ও কৌমদকী গদা লাভ।

তদনন্তর ভগবান্ হুতাশন কৃষ্ণকে সুদর্শনাস্ত্র প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, হে মধুসূদন! তুমি এক চক্রদ্বারা যুদ্ধে দেবদানবদিগকেও অনায়াসে পরাজয় করিতে পারিবে। কি মনুষ্য, কি দেব, কি রাক্ষস, কি পিশাচ, কি দৈত্য, কি নাগ, তুমি যুদ্ধে সর্ব্বাপেক্ষা সমধিকপ্রভাবসম্পন্ন এবং তাহাদের পরাজয়ে সমর্থ হইবে, সন্দেহ নাই। হে মাধব। তুমি শত্রুর প্রতি যতবার এই চক্র নিক্ষেপ করিবে, ইহা ততবারই শত্রু নিপাত করিয়া পুনরায় তোমার হস্তে আসিবে। তৎপরে বরুণদেব কৃষ্ণকে দৈত্যান্তকারিণী কৌমদকীনাম্নী গদা প্রদান করিলেন। ঐ গদার শব্দ বজ্রনির্ঘোষের ন্যায় ভয়ঙ্কর।

তখন অস্ত্রশস্ত্রসম্পন্ন রথারূঢ় কৃষ্ণ ও অর্জুন অগ্নিকে কহিলেন, হে ভগবন্! এক্ষণে আমরা সমস্ত সুরাসুরগণের সহিতও যুদ্ধ করিতে পারিব, ইন্দ্র একাকী পন্নগের' নিমিত্ত যুদ্ধ করিয়া আমাদের কি করিবেন? অর্জুন কহিলেন, এক চক্রপাণি যুদ্ধে ভ্রমণপূর্ব্বক চক্রান্ত্র নিক্ষেপ করিলে যাহা করিতে না পারেন, এমন কার্য্য ত্রিজগতে লক্ষ্য হয় না; বিশেবতঃ আমি আবার গাণ্ডীব ধনুঃ ও অক্ষয় তৃণীর লইয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছি, অতএব হে পাবক। আপনি খাণ্ডববনের চতুর্দিকে প্রজ্বলিত হইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে উহা দগ্ধ করুন; আমরা আপনার সাহায্য করিতেছি।

ভগবান্ হুতাশন, কৃষ্ণ ও অর্জুন কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া তৈজসরূপ গ্রহণপূর্ব্বক সপ্ত শিখা বিস্তার করত চতুর্দিকে প্রজ্বলিত হইয়া খাণ্ডবারণ্য দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন, তৎকালে যুগান্তকালের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। ঘনঘটার গভীর নির্ঘোষের ন্যায় প্রজ্বলিত অনলের শব্দ শ্রবণে সমস্ত জীবজন্তু কম্পান্বিত কলেবর হইল। খাণ্ডবারণ্য হুতাশনকর্তৃক দহ্যমান হইয়া সূর্যকিরণে ব্যাপ্ত পর্ব্বতেন্দ্র মেরুর ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল।

খাণ্ডবদহনে দেবগণের উদ্বেগ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, কৃষ্ণ ও অর্জুন রথদ্বয়ে আরোহণ-পূর্ব্বক খাণ্ডববনের উভয় পার্শ্বে থাকিয়া নানাবিধ প্রাণিগণ দগ্ধ করাইতে আরম্ভ করিলেন। খাণ্ডবারণ্যবাসী জন্তুগণকে যে দিকে পলায়ন করিতে দেখিলেন, তাঁহারা সেই সেই দিকে বেগে ধাবমান হইতে লাগিলেন। গমনকালে সেই বায়ুবেগগামী রথদ্বয়ের অন্তর্গত অবকাশ সকল অলক্ষ্য হইল, কেবল অলাতচক্রের ন্যায় ভ্রাম্যমাণ রথিদ্বয় দৃষ্ট হইতে লাগিলেন।

এইরূপে খাণ্ডববন দগ্ধ হইতে আরম্ভ হইলে শত শত প্রাণিগণ ভয়ঙ্কর চীৎকার করিতে করিতে ইতস্ততঃ ধাবমান হইতে লাগিল এবং বিঘূর্ণিতকলেবরে অগ্নিতে পতিত হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিল। পক্ষিগণ দগ্ধপক্ষ, দগ্ধচক্ষুঃ ও দগ্ধচরণ হইয়া মহীতলে বিলুণ্ঠনপূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল। জলাশয়সকল তীব্র তাপে ক্বাথ্যমান হওয়াতে তত্রস্থ কৃৰ্ম্ম ও মৎস্যসমুদায় বিনষ্ট হইয়া গেল। কোন কোন জন্তুর সমস্ত কলেবর প্রজ্বলিত হওয়াতে মূর্তিমান বহ্নির ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিল। কোন কোন পক্ষী তীব্র তাপে সাতিশয় সন্তপ্ত হইয়া উড্ডয়নপূর্ব্বক পলায়ন করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল; কিন্তু পার্থ তীক্ষ্ণ শরদ্বারা তাহাদিগকে খণ্ড খণ্ড করিতে লাগিলেন। কতিপয় পক্ষী অর্জুনের তীব্র শরে ক্ষতবিক্ষতাঙ্গ হইয়া চীৎকার রবে বেগে উড্ডীন ও পুনরায় খাণ্ডবাগ্নিমধ্যে পতিত হইতে লাগিল। শত শত বনবাসী জন্তুগণ খর শরে জর্জরিত কলেবর হইয়া ভয়ানক স্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। তাহাদের ঘোরতর নিনাদ মথ্যমান সমুদ্রের শব্দের ন্যায় শ্রুত হইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে প্রজ্বলিত হুতাশনের শিখাসমুদায় নভোমণ্ডল পর্যন্ত ব্যপ্ত হইয়া দেবগণের মহান্ উদ্বেগ জন্মাইল। তখন তীব্র তাপে সন্তপ্ত দেবগণ ঋষিগণকে সমভি ব্যাহারে লইয়া সুরপতি ইন্দ্রের নিকট গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে কহিলেন, হে অমরেশ্বর! বহ্নি কি নিমিত্ত অদ্য সমুদায় মর্ত্যলোক দগ্ধ করিতেছেন? অদ্য কি লোকসংক্ষয় সমুপস্থিত হইয়াছে?

বহ্নি নির্ব্বাণের প্রচেষ্টা।

সুররাজ ইন্দ্র দেবগণের মুখে সেই ভয়ঙ্কর ব্যাপার শুনিয়া এবং স্বয়ং দর্শন করিয়া খাণ্ডববন রক্ষার্থে গমন করিলেন। তিনি নানাবিধ রথসমূহদ্বারা আকাশমণ্ডল ব্যাপ্ত করত বারিবর্ষণ করিতে লাগিলেন। মেঘগণ দেবরাজের আদেশানুসারে খাণ্ডবারণ দ্যে মুষলধারে বারি নিক্ষেপ করিতে লাগিল, কিন্তু ঐ সমস্ত বারিধারা হুতাশনের তীব্রতাপবশতঃ অন্তরীক্ষেই শুষ্ক হইয়া গেল; অগ্নির উপর এক বিন্দুও পতিত হইল না। তখন সুররাজ পুরন্দর সাতিশয় সংক্রুদ্ধ হইয়া পুনরায় মহামেঘদ্বারা বেগে বারি বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তৎকালে খাণ্ডবারণ্য বারিধারাপাতে ধূমাকীর্ণ ও অগ্নিশিখাদ্বারা ব্যাপ্ত হওয়াতে বিদ্যুৎ সমাকুল ঘনঘটার ন্যায় অতি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করিল।

কৃষ্ণার্জুনের প্রতি প্রাণিকুলের রোষ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, তদনন্তর অর্জুন অসংখ্য শরবর্ষণ দ্বারা বারিবর্ষণ নিবারণ করিলেন। যেমন নীহারজালে চন্দ্রমাঃ সমাচ্ছন্ন হয়েন, তদ্রুপ অর্জুন শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক সমস্ত খাণ্ডববন আচ্ছাদিত করিলেন। তদীয় শস্ত্রকলাপে অন্তরীক্ষ পরিব্যাপ্ত হইলে একটি প্রাণীও পলায়ন করিতে পারিল না। তৎকালে নাগরাজ তক্ষক কুরুক্ষেত্রে গমন করিয়াছিলেন, তাঁহার পুত্র অশ্বসেন তথায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি অগ্নি হইতে আত্মরক্ষা করিবার নিমিত্ত অশেষ প্রকার যত্ন করিলেন, কিন্তু অর্জুনের শরজালে অবরুদ্ধ হওয়াতে কোনক্রমেই বহির্গত হইতে সমর্থ হইলেন না। তদ্দর্শনে তাঁহার মাতা স্নেহপরবশ হইয়া বিপন্ন পুত্রের রক্ষার্থে আসন্নমৃত্যুমুখে ধাবমানা হইলেন। ইতিপূর্ব্বে অশ্বসেনের মস্তক ও লাঙ্গুল দগ্ধ হইয়াছিল। নাগপত্নী অগ্নি হইতে পুত্রকে মুক্ত করিতে যাইয়া আপনি পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। অর্জুন তীক্ষ্ণধার শরদ্বারা নাগভার্য্যার মস্তকচ্ছেদন করিলেন। দেবরাজ তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া তক্ষকতনয়ের প্রাণ-রক্ষার্থ বাতবর্ষণদ্বারা অর্জুনকে অচেতন করিলেন। ইত্যবসরে অশ্বসেন পলায়ন করিল। অর্জুন ইন্দ্রের মায়া ও সর্পের প্রবঞ্চনা পর্যালোচনা করত তত্রস্থ সমস্ত প্রাণীকে দ্বিধা ত্রিধা খণ্ড করিতে লাগিলেন। কৃষ্ণ, অর্জুন ও পাবক সেই জিহ্মগামী'কে "নিরাশ্রয় হইবে" বলিয়া অভিসম্পাত করিলেন।

অনন্তর ক্রোধাবিষ্ট জিষ্ণু পূর্ব্বকৃতবঞ্চনা স্মরণ করিয়া আশুগ শরসমূহদ্বারা বজ্রধরের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভকরিলেন। দেবরাজ অর্জুনকে সমরে সংরুদ্ধ নিরীক্ষণ করিয়া অনবরত অস্ত্র নিক্ষেপে গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিলেন। প্রবল বায়ুবেগে সমুদ্রসকল সংক্ষোভিত হইয়া বেলাভূমি অতিক্রম করিতে লাগিল। জলধারাবনত মেঘমালায় নভোমণ্ডল সমাকুল হইল, ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ অবিশ্রান্ত বজ্রাঘাত ও ঘনঘটার গভীর গর্জনে যেন প্রলয়কাল উপস্থিত হইল। অর্জুন সেই ঘোরতর মেঘের নিরাকরণ করিবার নিমিত্ত অত্যুৎকৃষ্ট অস্ত্রসকল প্রয়োগ করিতে লাগিলেন। যুক্তিবিশারদ ধনঞ্জয় প্রথমতঃ মন্ত্রপূত বায়ব্যাস্ত্র দ্বারা অশনি ও মেঘের বলবীর্য্য তিরোহিত করিলেন। জলধারা শুষ্ক ও ক্ষণপ্রভা' বিলীন হইয়া গেল। এইরূপে ক্ষণকাল-মধ্যে ব্যোমতল তমোমুক্ত ও প্রশান্তরজঃ হইল, সুশীতল গন্ধবহ মন্দ মন্দ সঞ্চারে বহিতে লাগিল। অর্কমণ্ডল প্রকৃতিস্থ হইল এবং হুতাশন প্রাণিগণের দেহনিঃসৃত বসায়ারা অভিষিক্ত হইয়া পুনরায় প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন। অগ্নির শব্দে সমুদায় জগৎ পরিপূর্ণ হইল। সুপর্ণাদি পাতত্রিবর্গ কৃষ্ণার্জুনকর্তৃক খাণ্ডববন পরিব্লক্ষিত দেখিয়া গর্ব প্রদর্শনপূর্বক আকাশমার্গে উজ্জীন হইল। গরুড় বজ্রতুল্য স্বীয় নখ, তুণ্ড ও পক্ষদ্বারা কৃষ্ণার্জুনকে প্রহার করিবার মানসে আকাশ হইতে নামিলেন। উরগসমূহ দগ্ধানল হইয়া পাণ্ডবসমীপে তীব্র বিষ উদ্ধার করিতে করিতে নিপতিত হইতে লাগিল। অর্জুন শরদ্বারা তাহাদিগকে খণ্ড খণ্ড করিলেন। তাহারা পুনর্ব্বার প্রজ্বলিত হুতাশনে পতিত হইয়া ভস্মসাৎ হইল। যক্ষ, রাক্ষস, পন্নগ, গন্ধর্ব্ব ও অসুরগণ যুদ্ধার্থী হইয়া ঘোরতর নিনাদ করত উত্থিত হইল, অর্জুন তীক্ষ্ণ শরদ্বারা সেই ক্রোধমূর্ছিত জিঘাংসুদিগের মস্তকচ্ছেদন করিলেন। অরাতিকুলনিহন্তা কৃষ্ণ চক্রদ্বারা দৈত্যদানবগণের প্রাণ সংহার করিলেন। কেহ কেহ কৃষ্ণের চক্রদ্বারা চালিত ও বাণবিদ্ধ হওয়াতে মূর্ছিত হইয়া পড়িল।

যুদ্ধে মন্দরগিরির পতন।

অনন্তর ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্র শ্বেতগজে অধিরূঢ় হইয়া কৃষ্ণার্জুনকে লক্ষ্য করিয়া ধাবমান হইলেন এবং অতি বেগে অশনি গ্রহণপূর্ব্বক অপর কতকগুলি অস্ত্র সৃষ্টি করিয়া সুরগণকে কহিলেন, এইবারে কৃষ্ণার্জুন নিহত হইয়াছেন। দেবরাজ অশনি উদ্যত করিয়াছেন দেখিয়া দেবতারা স্ব স্ব অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণ করিলেন। কৃতান্ত কালদণ্ড, ধনপতি গদা, বরুণ পাশ ও বজ্র এবং মহাবল স্কন্দ শক্তি গ্রহণ করিয়া সুমেরু পর্ব্বতের ন্যায় দণ্ডায়মান হইলেন। অশ্বিনীকুমারেরা দীপ্যমান ওষধি, বিধাতা ধনুঃ, জয় মুষল, বিশ্বকর্মা পৰ্ব্বত, অংশ শক্তি, যম পরশু এবং সূর্য্য অতি ভয়ঙ্কর পরিঘাস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক মহাস্ফালন করিতে লাগিলেন। মিত্র চক্র ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। পৃষা ভগ এবং সবিতা ক্রুদ্ধ হইয়া শরাসন ও নিস্ত্রিংশ গ্রহণ করিয়া কৃষ্ণার্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। রুদ্র, বসু, মরুৎ, বিশ্বদেব এবং অন্যান্য অসংখ্য দেবগণ কৃষ্ণার্জুনের জিঘাংসায় বিবিধ অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক গমন করিলেন।

দেবতারা রণক্ষেত্রে অত্যদ্ভুত ব্যাপারসকল নিরীক্ষণ করিলেন এবং কল্পান্ত সময়ের ন্যায় ভূতগণের মোহ উপস্থিত দেখিলেন। দেবগণ সমভিব্যাহারী ইন্দ্রকে ক্রোধান্বিত অবলোকন করিয়া যুদ্ধবিশারদ কৃষ্ণার্জুন সজ্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক নির্ভয়ে দণ্ডায়মান হইলেন। তাঁহারা অমর্ষ প্রদীপ্ত হইয়া বজ্রসদৃশ শরসমূহ দ্বারা শত্রু-সমভিব্যাহারী সুরগণকে দূরীভূত করিলেন। দেবতারা বারংবার ভগ্নমনোরথ হইয়া ভয়ে যুদ্ধ পরিত্যাগপূর্ব্বক ইন্দ্রের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। দেবতাদিগকে যুদ্ধে পারস্থখ দেখিয়া নভোমণ্ডলস্থিত ঋষিগণ সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। দেবরাজও পুনঃ পুনঃ তাঁহাদিগের বল, বীর্য্য ও অসামান্য রণ-নৈপুণ্য সন্দর্শনে পরম প্রীত হইলেন। পাকশাসন, অর্জুনের ভুজবীর্য্য পরীক্ষার্থে অনবরত শিলাবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। অর্জুন অনায়াসে তাহা প্রতিহত করিলেন। তদ্দর্শনে শতক্রতু পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকরূপে অশ্ম'বর্ষণ আরম্ভ করিলেন, কিন্তু অর্জুনের বাণে সকলই লয় প্রাপ্ত হইল।

অনন্তর দেবরাজ জিঘাংসাপরতন্ত্র হইয়া স্বীয় বাহুবলে তরুলতার সহিত মন্দর গিরির শিখর উৎপাটনপূর্ব্বক অর্জুনের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। অর্জুন অজিহ্মগ' মহাবেগমান্ শরসমূহ দ্বারা সেই অদ্রিশৃঙ্গ শতধা বিচ্ছিন্ন করাতে বোধ হইল যেন নভোমণ্ডল হইতে পতনোন্মুখ সূর্য্যমণ্ডল ও গ্রহগণ ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইতেছে। গিরিশিখর খাণ্ডববনে পতিত হইবামাত্র তত্রস্থ সমস্ত প্রাণী যুগপৎ পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল।

দেবগণের পরাজয়।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, খাণ্ডবারণ্যনিবাসী দানব, রাক্ষস, নাগ, তরক্ষু, ভল্লুক, মদস্রাবী হস্তী, শাব্দুল ও সিংহ প্রভৃতি জন্তুগণ এবং অন্যান্য প্রাণিসমুদায় শৈলপতনে ভীত হইয়া উদ্বিগ্নচিত্তে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। কৃষ্ণ ও অর্জুন উদ্যতাস্ত্র হইয়া সেই বন রক্ষা করিতে লাগিলেন। পলায়মান জন্তুগণের চীৎকাররবে এবং ঔৎপাতিক শব্দসদৃশ শৈলনিপাত শব্দে খাণ্ডববন সমাকীর্ণ হইয়া উঠিল। অরণ্য দগ্ধ হইতেছে এবং কৃষ্ণ অস্ত্র ধারণ করিয়া রহিয়াছেন দেখিয়া জন্তুগণ ভয়ানক স্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। জন্তুগণের ভয়ানক নিনাদ ও অগ্নির ভীষণ শব্দে গগনমন্ডল প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। তখন মহাবাহু বাসুদেব ঐ সমস্ত জন্তগণকে বিনাশ করিবার মানসে তেজঃপ্রদীপ্ত তীক্ষ্ণ চক্র নিক্ষেপ করিলেন। ক্ষুদ্রজাতীয় প্রাণী, দানব ও নিশাচরগণ চক্রাঘাতে জর্জরিতকলেবর হইয়া প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রদীপ্ত পাবক-মধ্যে পতিত হইতে লাগিল। কৃষ্ণচক্রে বিদারিতাঙ্গ দৈত্যগণ বসারুধির-চর্চ্চিত হইয়া সন্ধ্যাকালীন মেঘের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। ভগবান্ চক্রপাণি সহস্র সহস্র পিশাচ, পক্ষী, নাগ ও পশুগণকে বিনাশ করত কালান্তক যমের ন্যায় তথায় ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। অমিত্রঘাতী কৃষ্ণ যতবার চক্র নিক্ষেপ করেন, চক্র ততবারই বহুসংখ্যক প্রাণী বিনাশ করিয়া তাঁহার হস্তে ফিরিয়া আইসে। এইরূপে বহুসংখ্যক পিশাচ, সর্প ও রাক্ষসগণ বিনাশ করাতে সর্ব্বভূতাত্মা বাসুদেবের রূপ অতীব ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল। ঐ সময় সমস্ত দেবগণ কৃষ্ণ ও অর্জুনের সহিত সংগ্রাম করিলেন, কিন্তু কেহই তাঁহাদিগকে পরাজিত করিতে পারিলেন না। সুরগণ কৃষ্ণার্জুনের হস্ত হইতে খাণ্ডবা-রণ্য রক্ষা করিতে না পারিয়া পরিশেষে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। দেবরাজ ইন্দ্র তদ্দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইয়া কৃষ্ণ ও অর্জুনকে প্রশংসা করিতে লাগিলেন।

ইন্দ্রের যুদ্ধবিরতি ও অগ্নির সন্তুষ্টিলাভ।

সুরগণ প্রতিনিবৃত্ত হইলে ইন্দ্রকে লক্ষ্য করিয়া এই দৈব-বাণী হইল "দেবরাজ! তোমার সখা ভুজগেশ্বর তক্ষক বিনষ্ট হন নাই। খাণ্ডবারণ্যদাহনকালে তিনি কুরুক্ষেত্রে গমন করিয়া-ছিলেন। আমার বাক্য শ্রবণ কর; এই বাসুদেব ও অর্জুনকে তুমি কখনই পরাজয় করিতে পারিবে না; ইঁহারা পূর্ব্বে নর ও নারায়ণ নামে সুরপুরে বিখ্যাত ছিলেন। তুমিও উঁহাদের বীর্য্য ও পরাক্রমের বিষয় সমুদায় অবগত আছ। এই দুরাধর্ষ, সর্ব্ব লোকবিশ্রুত, পুরাণ মহর্ষিদ্বয় যুদ্ধে পরাজিত হইবার নহেন। ইঁহারা সমুদায় দেব, অসুর, যক্ষ, রাক্ষস, গন্ধর্ব্ব, নর, কিন্নর ও পন্নগগণের পূজনীয়। অতএব হে বাসব! তুমি সুরগণ সমভিব্যাহারে স্বস্থানে প্রস্থানপূর্ব্বক এই খাণ্ডবদাহ নিরীক্ষণ কর।"

অমররাজ ইন্দ্র এই প্রকার অশরীরিণী বাণী শ্রবণ করিয়া সত্য বিবেচনায় ক্রোধদ্বেষ পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বর্গে প্রস্থান করিলেন। অন্যান্য দেবগণ দেবরাজকে প্রস্থান করিতে দেখিয়া সৈন্যগণ সমভিব্যাহারে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। সুরপতি অমরবর্গ সমভিব্যহারে স্বস্থানে প্রস্থান করিলে কৃষ্ণ ও অর্জুন সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক নিঃশঙ্কচিত্তে খাণ্ডববন দগ্ধ করিতে লাগিলেন। যেমন বায়ু মেঘমালাকে দূরীভূত করে, তদ্রুপ অর্জুন সুরগণকে তথা হইতে নিঃসারিত করিয়া বাণবর্ষণদ্বারা খাণ্ডব-বনস্থ জন্তুগণকে ব্যস্ত সমস্ত করিলেন। অর্জুনের শরাঘাতে ছিন্নকলেবর হওয়াতে কোন জন্তুই প্রাণ লইয়া পলায়ন করিতে পারিল না। মহাবল পরাক্রান্ত জন্তুগণ, অমোঘাস্ত্র অর্জুনের সহিত যুদ্ধ করা দূরে থাকুক, তৎকালে তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতেও সমর্থ হইল না। শত শত পক্ষিগণ অর্জুনশরাঘাতে প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক অগ্নিতে পতিত হইতে লাগিল। হস্তী, মৃগ, তরক্ষু ও অন্যান্য প্রাণিগণ কি তীরভূমি, কি বিষম প্রদেশ, কি পিতৃদেবনিবাস', কোথাও গিয়া প্রাণ রক্ষা করিতে না পারিয়া কাতরস্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। তাহাদের আর্তনাদ শ্রবণ করিয়া গঙ্গামধ্যস্থ ও সমুদ্রগর্ভস্থ মীনগণ সাতিশয় ত্রাসযুক্ত হইল। তত্রত্য বিদ্যাধরগণ ও অন্যান্য জন্তুগণ কৃষ্ণার্জুনের সহিত যুদ্ধ করিবে কি, তাহাদের সম্মুখীন হইতেই পারিল না। পলায়মান জন্তুগণের মধ্যে যাহারা এক বর্ষের অনধিকবয়স্ক, কৃষ্ণ স্বীয় চক্রদ্বারা তাঁহাদিগকেও ছেদন করিতে লাগিলেন। মহাকায় জীবগণ কৃষ্ণার্জুনের অস্ত্রাঘাতে ছিন্নশিরঃ ও ভিন্নমস্তক হইয়া প্রদীপ্ত হুতাশনে পতিত হইতে লাগিল। এইরূপে ভগবান্ হব্যবাহন কৃষ্ণার্জুন প্রভাবে মাংস রুধির ও বসাদ্বারা তর্পিত হইয়া মহাবেগে গগনস্পর্শপূর্ব্বক ধূমশূন্য হইলেন এবং দীপ্তাক্ষ দীপ্তজ্বিহ্, দীপ্তানন ও দীপ্তকেশ হইয়া প্রাণিগণের বসা পান করত পরম পরিতুষ্ট হইলেন।

অর্জুনকর্তৃক ময়দানবের মুক্তি।

হুতাশন প্রচণ্ডবেগে খাণ্ডবারণ্য দগ্ধ করিতেছেন, এমন সময়ে ভগবান্ মধুসূদন ময়দানবকে তক্ষকের ভবন হইতে পলায়ন করিতে দেখিলেন। মূর্ত্তিমান্ অগ্নি কৃষ্ণের নিকট গমন করিয়া ময়াসুরকে দগ্ধ করাইতে প্রার্থনা করিলেন। কৃষ্ণ অগ্নির প্রার্থনানুসারে অসুরকে ছেদন করিবার জন্য চক্র উত্তোলন করিলেন। ময় তদ্দর্শনে অতীব ভীত হইয়া "রক্ষা করুন, রক্ষা করুন" বলিয়া অর্জুন সমীপে গমন করিতে লাগিল। শরণাগত প্রতিপালক ধনঞ্জয় তাহার সেই করুণস্বর শ্রবণে দয়াপরবশ হইয়া "ভয় নাই” বলিয়া আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক তাহাকে জীবিতপ্রায় করিলেন। অর্জুন এইরূপে অভয় প্রদান করাতে ভগবান্ চক্রপাণি তাহাকে বধ করিবার ইচ্ছা পরিত্যাগ করিলেন; অগ্নিও তাহাকে দগ্ধ করিলেন না।

হে পৌরবংশাবতংস জনমেজয়। এইরূপে কৃষ্ণার্জুন কর্তৃক রক্ষিত হইয়া ভগবান্ হুতাশন পঞ্চদশ দিবসে সেই বন দগ্ধ করিলেন। এই পঞ্চদশ দিনের মধ্যে তত্রস্থ সমস্ত জীবজন্তুই সেই প্রচণ্ডানলে দগ্ধ হইল; কেবল অশ্বসেন, ময় ও চারিটি শাঙ্গর্ক রক্ষা পাইয়াছিল।

মহর্ষি মন্দপালের প্রার্থনা।

জনমেজয় জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ব্রহ্মন্। সেই খাণ্ডববন দাহকালে অশ্বসেন ও ময়দানব যেরূপে পরিত্রাণ পাইল, তাহা শুনিয়াছি; এক্ষণে শার্লকদিগের অনাময় কারণ শ্রবণ করিতে সাতিশয় ঔৎসুক্য হইতেছে, আপনি অনুগ্রহ করিয়া কীর্ত্তন করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে শত্রুনিপাতন। শাঙ্গক চতুষ্টয় যে নিমিত্ত সেই প্রবল খাণ্ডবানল হইতে পরিত্রাণ পাইল, তদ্বিষয়ে সবিশেষ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। মন্দপাল নামে এক পরম ধার্মিক তপঃপরায়ণ বেদপারগ মহর্ষি ছিলেন। ঐ তপঃ স্বাধ্যায়সম্পন্ন জিতেন্দ্রিয় তপোধন ঊর্দ্ধরেতাঃ ঋষিগণের আচরিত মার্গ অবলম্বন করিয়াছিলেন। কিয়দ্দিনান্তর তিনি তপস্যার পরাকাষ্ঠায় উত্তীর্ণ হইয়া দেহত্যাগপূর্ব্বক পিতৃলোকে গমন করিলেন; কিন্তু তথায় তপস্যার ফলপ্রাপ্ত হইলেন না। মহর্ষি বহুদিনানুষ্ঠিত তপস্যা নিষ্ফল হইল দেখিয়া ধর্মরাজের সমীপস্থ দেবগণকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে সুরগণ। আমি কি নিমিত্ত বহুদিবসাজ্জিত তপস্যার ফলভোগে বঞ্চিত হইলাম, বলুন। আমি মর্ত্যলোকে কোন্ কর্ত্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠান করি নাই; যাহাতে আমার তপস্যা নিষ্ফল হইল, আমি এক্ষণেই তাহা করিতেছি। হে দেবগণ! মদনুষ্ঠিত তপস্যার ফল কি, আজ্ঞা করুন।

মন্দপালকে পুত্রোৎপাদনের পরামর্শ।

দেবগণ কহিলেন, হে ব্রহ্মন্। মনুষ্য জন্মিবামাত্র দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণ, এই ঋণত্রয়গ্রস্ত হয়। ঐ ঋণত্রয়ের মধ্যে যজ্ঞদ্বারা দেবঋণ, তপস্যাদ্বারা ঋষিঋণ ও সন্তানোৎপাদনদ্বারা পিতৃঋণ হইতে মুক্ত হইতে পারে। তুমি তপশ্চরণ ও যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছ, কিন্তু তোমার সন্তান নাই; এই নিমিত্ত তোমার সমুদায় কৰ্ম্ম নিষ্ফল হইয়াছে। অতএব তুমি পরম যত্নসহকারে অপত্যোৎপাদন কর, তাহা হইলেই এই অমরলোকে পরম সুখ-সমৃদ্ধি ভোগ করিতে পারিবে। হে দ্বিজোত্তম! শাস্ত্রে কথিত আছে যে, পুত্র পিতাকে পুন্নাম নরক হইতে পরিত্রাণ করে, অতএব তুমি অবিলম্বে অপত্যোৎপাদনে যত্নবান্ হও।

অগ্নিদেবের আশ্বাস।

মহর্ষি মন্দপাল দেবগণের সেই বাক্য শ্রবণান্তর কিরূপে অল্পকালমধ্যে বহু অপত্য উৎপাদন করিবেন, তদ্বিষয়িণী চিন্তা করিতে লাগিলেন। তিনি ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া বহুপ্রসবশালী বিহঙ্গমমণ্ডলে গমন করত শাঙ্গকমূর্তি ধারণপূর্ব্বক জরিতানাম্নী এক শার্সিকার গর্তে চারিটি ব্রহ্মবাদী পুত্র উৎপাদন করিলেন। - সেই পুরুষচতুষ্টয় অণ্ডমধ্যস্থ থাকিতেই তাহাদিগকে জরিতার নিকট সমর্পণপূর্ব্বক লপিতার নিকট গমন করিলেন। জরিতা মহর্ষি কর্তৃক পরিত্যক্ত অণ্ডস্থ ঋষিগণকে পরিত্যাগ করিতে না পারিয়া প্রাণপণে তাহাদিগকে পোষণ করত খাণ্ডববনেই বাস করিতে লাগিলেন।

কিয়দ্দিনান্তর ভগবান্ হুতাশন খাণ্ডববন দাহ করিবার মানসে তথায় আগমন করিলেন। ঐ সময় মহর্ষি মন্দপাল লপিতার সহিত সেই বনে ভ্রমণ করিতেছিলেন। তিনি অগ্নিকে দেখিবামাত্র তাঁহার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া এবং স্বীয় সন্তানগণের বাল্যাবস্থা স্মরণ করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে সেই মহাতেজাঃ হুতাশনের স্তব করিতে লাগিলেন, "হে অগ্নে। তুমি সমস্ত লোকের মুখস্বরূপ; তুমি হব্যবাহন; তুমি গুপ্তভাবে সর্ব্বভূতের অন্তঃকরণে বিচরণ কর; কবিগণ তোমাকে অদ্বিতীয় ও ত্রিবিধ কহেন; এবং তোমাকে অষ্টধা কল্পনা করিয়া যজ্ঞকৰ্ম্ম নির্ব্বাহ করেন। হে হুতাশন! মহর্ষিগণ কহেন, তুমিই এই বিশ্ব সৃষ্টি করিয়াছ; তুমি না থাকিলে এই সমস্ত জগৎ ক্ষণকালমধ্যে ধ্বংস হইয়া যায়; বিপ্রগণ স্ত্রীপুত্র সমভিব্যাহারে তোমাকে নমস্কার করিয়া স্বধৰ্ম্মবিজিত ইষ্টগতি প্রাপ্ত হন। হে অগ্নে! সজ্জনগণ তোমাকে আকাশবিলগ্ন সবিদ্যুৎ জলধর বলিয়া থাকেন; তোমা হইতে অস্ত্রসমুদায় নির্গত হইয়া সমস্ত ভূতগণকে দগ্ধ করে। হে জাতবেদঃ! ইে সমস্ত চরাচর বিশ্ব তুমিই নির্মাণ করিয়াছ; তুমি সর্ব্বাগ্রে জলের সৃষ্টি করিয়া তৎপরে তাহা হইতে সমস্ত জগৎ উৎপাদন করিয়াছ; তোমাতেই হব্য যথাবিধি প্রতিষ্ঠিত থাকে; হে দেব! তুমি দহন; তুমি ধাতা; তুমি বৃহস্পতি; তুমি অশ্বিনীকুমার; তুমি মিত্র; তুমি সোম এবং তুমিই পবন।"

ভগবান্ হুতাশন অমিততেজাঃ মহর্ষি মন্দপালের এই প্রকার স্তুতিবাক্য শ্রবণে যৎপরোনাস্তি পরিতুষ্ট হইয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আমি তোমার স্তবে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি, এক্ষণে বল তোমার কি অভিলাষ পূর্ণ করিব? তখন মহর্ষি কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, হে হব্যবাহন। আপনার নিকট আমার এই প্রার্থনা যে, যৎকালে আপনি খাণ্ডববন দহন করিবেন, অনুগ্রহ করিয়া আমার পুত্রগণকে পরিত্যাগ করিতে হইবে। ভগবান্ হব্যবাহন “তথাস্তু” বলিয়া মহর্ষির প্রার্থনা পূরণে সম্মতি প্রদান করিলেন এবং তৎক্ষণাৎ ভয়ঙ্কর বেগে খাণ্ডববনমধ্যে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন।

শার্সকগণের বিলাপ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে রাজন! তদনন্তর ভগবান্ হুতাশন প্রবলবেগে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলে সেই শার্লক চতুষ্টয় আপনাদিগকে অশরণ বোধ করিয়া সাতিশয় দুঃখিত ও উৎকণ্ঠিতচিত্ত হইলেন। তাঁহাদের মাতা দীনা জরিতা স্বীয় শাবকগণকে তদবস্থ দেখিয়া দুঃখশোকাকুলিতচিত্তে বিলাপ করত কহিতে লাগিলেন, হায়! এখন কি করি! ঐ প্রজ্বলিত হুতাশন ভূমণ্ডল সমুদ্দীপিত করিয়া ভয়ঙ্কর বেগে অরণ্য দগ্ধ করিতে করিতে এই দিকেই আসিতেছেন; আর আমাদের পূর্ব্ব পুরুষ-গণের পরিত্রাণকারণ এই শাবকগুলিও আমার চিত্তাকর্ষণ করিতেছে। আমি কি করিয়া ইহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করি? ইহারা সকলেই অজাতপক্ষ এবং ইহাদিগের চরণ অতিশয় দুর্ব্বল, সুতরাং স্বয়ং পলায়নে অসমর্থ। আমারও এমন সামর্থ্য নাই যে, ইহাদিগের চারি জনকে লইয়া প্রস্থান করি; কিংবা ইহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া যাই। এখন কি করি! কাহাকে পরিত্যাগ করি, কাহাকেই বা লইয়া যাই? হে পুত্রগণ! তোমরা বল, এক্ষণে আমার কি করা কর্তব্য। আমি বিস্তর চিন্তা করিয়াও তোমাদের মোচনোপায় স্থির করিতে পারিলাম না, অতএব আমি স্বীয় গাত্রদ্বারা তোমাদিগকে আচ্ছাদন করিয়া তোমাদের সহিত এককালে হুতাশনমুখে প্রাণ সমর্পণ করি। তোমাদিগের পিতা নিতান্ত নিষ্ঠুর। তিনি গমনকালে বলিয়া গিয়াছেন যে, জরিতারি সর্ব্বজ্যেষ্ঠ, ইহাতেই কুলের প্রতিষ্ঠা হইবে, সারিসৃক্ক অপত্যোৎপাদনদ্বারা বংশ বর্দ্ধন করিবে, স্তম্বমিত্র তপস্যা করিবে এবং দ্রোণ বেদবেত্তাদিগের অগ্রগণ্য হইবে, তিনি এইমাত্র বলিয়া আমাদিগকে পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রস্থান করিয়াছেন। এখন আমি কাহাকে অবলম্বন করিয়া এই বিপদ্ হইতে উদ্ধার হই? শার্সিকা এইরূপে ইতিকর্তব্যতাবিমূঢ় হইয়া স্বীয় শাবকগণ রক্ষার কোন উপায় স্থির করিতে পারিলেন না, কেবল বিলাপ করিতে লাগিলেন।

শার্সকগণ স্বীয় জননী শার্জিকার এইরূপ বিলাপবাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, মাতঃ। আমাদিগের স্নেহ পরিত্যাগ করিয়া অগ্নিশূন্য স্থানে পলায়ন কর। দেখ, আমরা এস্থানে বিনষ্ট হইলে তোমার অন্যান্য অনেক সন্তান হইতে পারিবে, কিন্তু তুমি প্রাণ ত্যাগ করিলে বংশ রক্ষার উপায়ান্তর নাই। অতএব হে মাতঃ! এই উভয় পক্ষ বিবেচনা করিয়া যাহাতে আমাদের কুলের শ্রেয়ঃ হয়, তাহা কর। আমাদিগের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করিয়া সর্ব্বদিক্ বিনষ্ট করিও না এবং ইহা করিলে আমাদের পিতার বাঞ্ছাও ব্যর্থ হইবে না।

শার্সক-জননীর উপদেশ ও শার্সকগণের বক্তব্য।

জরিতা কহিলেন, হে পুত্রগণ! এই বৃক্ষের অতি সমীপবর্ত্তী ভূতলে এক মূষিকের গর্ত আছে; তোমরা অতি ত্বরায় তন্মধ্যে প্রবেশ কর; তথায় অগ্নিভয়ের সম্ভাবনা নাই। হে পুত্রগণ! তোমরা ঐ গর্ভমধ্যে প্রবিষ্ট হইলে আমি পাংশুদ্বারা আপাততঃ উহার মুখ বন্ধ করিয়া দিব, তাহা হইলে তোমরা এক্ষণে অগ্নি হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারিবে। পরে অগ্নি নির্ব্বাণ হইলে পর আমি পুনরায় আসিয়া পাংশুরাশি প্রক্ষেপপূর্ব্বক ঐ গর্তের মুখ পরিষ্কার করিয়া দিলে পুনর্ব্বার উঠিবে। হে বৎসগণ! প্রজ্বলিত হুতাশন হইতে মুক্ত হইবার এই একমাত্র উপায় আছে, ইহা অবলম্বন করিয়া প্রাণ রক্ষা কর।

শঙ্গরকগণ কহিলেন, মাতঃ! মূষিক স্বভাবতঃ মাংস-লোলুপ, বিশেষতঃ আমরা অজাতপক্ষ এবং মাংসপিণ্ডভূত; - আমরা গর্ভমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেই সে আমাদিগকে ভক্ষণ করিবে, - সন্দেহ নাই; এই ভয়ে গর্তে প্রবেশ করিতে সাহস হইতেছে না। পরে তাহারা কাতরস্বরে কহিতে লাগিল, হায়। এখন কিরূপে আমরা প্রজ্বলিত হুতাশন হইতে রক্ষা পাই? কিরূপেই বা মূষিকহস্ত হইতে পরিত্রাণ পাই? কি প্রকারে আমাদের পিতার অপত্যোৎপাদন নিষ্ফল না হয় এবং কি করিয়াই বা মাতা জীবিত থাকিবেন? গর্তে প্রবেশ করিলে মূষিকে ভক্ষণ করে, অন্তরীক্ষে থাকিলে অগ্নিদাহে প্রাণ যায়; এই উভয় পক্ষ বিবেচনা করিয়া দেখিলে গর্তে গিয়া মূষিকমুখে প্রাণ ত্যাগ করা অপেক্ষা অগ্নিতে ভস্ম হওয়া শ্রেয়ঃকল্প; যেহেতু মূষিকমুখে মৃত্যু হইলে গর্হিত মরণ হইবে, কিন্তু হুতাশনে কলেবর পরিত্যাগ করিলে সদ্গতি লাভ হইতে পারিবে।

পুত্রগণকর্তৃক জননীকে আশ্বাস-প্রদান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, দীনা জরিতা পুত্রগণের এই প্রকার কাতরোক্তি শ্রবণানন্তর তাহাদিগকে কহিলেন, হে বৎসগণ! একদা এই গর্ত হইতে সেই মূষিক বহির্গত হইয়াছিল, সেই সময় একটা শ্যেনপক্ষী তাহাকে শিকার করিয়া লইয়া গিয়াছে; অতএব তোমরা নিঃশঙ্কচিত্তে গর্ভমধ্যে প্রবেশ কর। শার্সকগণ কহিলেন, মাতঃ! আমরা শ্যেনপক্ষীকে মূষিক লইয়া যাইতে দেখি নাই। আর যদিও সেই মূষিককে লইয়া গিয়া থাকে, তথাপি ঐ গর্ভমধ্যে অন্য মূষিক থাকিবার সম্ভাবনা, তাহাও আমাদের ভয়াবহ। দেখ, বায়ুবেগ ক্রমে নিবৃত্ত হইয়া আসিতেছে, অগ্নি আমাদের সমীপে পর্যন্ত আসিতে পারে না পারে সন্দেহ, কিন্তু আমরা গর্ভমধ্যে প্রবেশ করিলে মূষিক হস্তে পতিত হইয়া প্রাণত্যাগ করিব সন্দেহ নাই। এক পক্ষে মৃত্যু নিশ্চয়, পক্ষান্তরে সংশয়; অতএব সংশয়িত পক্ষ অবলম্বন করাই শ্রেয়ঃ। হে মাতঃ! আমাদের মায়া পরিত্যাগ করিয়া উপযুক্ত স্থানে পলায়ন কর; আমরা বিনষ্ট হইলেও তোমার অন্যান্য পরমোৎকৃষ্ট পুত্র হইতে পারিবে।

জরিতা কহিলেন, হে পুত্রগণ! যৎকালে সেই মহাবল পরাক্রান্ত শ্যেনপক্ষী গর্ত হইতে মূষিককে লইয়া যায়, আমি তৎকালে সেই স্থানে উপস্থিত থাকিয়া তাহা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি এবং সত্বরে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করত এই বলিয়া আশীর্ব্বাদ করিয়াছি, 'হে শ্যেনরাজ। তুমি আমাদের শত্রু এই মূষিককে হরণ করিয়া আমাদিগকে নিষ্কণ্টক করিলে; এই পুণ্যফলে তুমি পরলোকে সুবর্ণময় কলেবর প্রাপ্ত হইয়া অক্ষয় স্বর্গ ভোগ করিবে।' তৎপরে ঐ শ্যেনপক্ষী মুষিককে ভক্ষণ করিলে পর আমি তাহার অনুজ্ঞা লইয়া স্বগৃহে প্রত্যাগমন করিলাম। অতএব হে পুত্রগণ! তোমরা স্বচ্ছন্দে গর্ভমধ্যে প্রবেশ কর, কিছুমাত্র শঙ্কা করিও না; আমার সমক্ষে শ্যেন মূষিককে ভক্ষণ করিয়াছে।

শার্সকগণ কহিলেন, মাতঃ! শ্যেন যে মূষিককে লইয়া গিয়াছে, আমরা তাহার কিছুমাত্রই জানি না; অতএব কি প্রকারে গর্তে প্রবেশ করি?

জরিতা কহিলেন, আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি, শ্যেন মূষিককে ভক্ষণ করিয়াছে; তোমাদের কিছুমাত্র ভয় নাই, আমার বচনানুসারে কার্য্য কর। শার্সকগণ কহিলেন, মাতঃ। তুমি কেন মিথ্যা প্রবোধবাক্যদ্বারা আমাদের ভয় ভঞ্জন করিবার চেষ্টা পাইতেছ? ঐ গর্ভমধ্যে যখন শত্রু থাকিবার সম্ভাবনা, তখন আমাদের কোনক্রমেই উহাতে প্রবেশ করা বিধেয় নহে। দেখ, আমরা তোমার কখন কোন উপকার করি নাই; অধিক কি, আমরা যে কে, তাহা তুমি বিশেষরূপে জান না, তবে কি নিমিত্ত তুমি এত কষ্ট সহ্য করিয়াও আমাদিগকে লালন পালন করিতেছ? তুমি আমাদের কে? আর আমরাই বা তোমার কে? আরও দেখ, তুমি অল্পবয়স্কা এবং দর্শনীয়াও বটে, অতএব হে মাতঃ! তুমি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া স্বামীর নিকট গমন করত সুন্দর পুত্র প্রাপ্ত হও, আমরা এই স্থানে থাকিয়া হুতাশনে প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক সদ্গতি লাভ করি। হে মাতঃ। যদি আমরা কোনক্রমে অগ্নি হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারি, তাহা হইলে তুমি পুনরায় আমাদের নিকটে আসিও।

শাস্ত্রী শাবকগণের এই প্রকার বাক্য পুনঃ পুনঃ শ্রবণ করিয়া অগ্নিশূন্য প্রদেশে পলায়ন করিলেন। শার্জী প্রস্থান করিলে অগ্নি দ্রুতবেগে মন্দপাল মহর্ষির পুত্র শার্সকগণের সমীপবর্তী হইলেন।

আত্মরক্ষার্থে শার্সকগণের অগ্নিস্তব।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! প্রজ্বলিত হুতাশন অরণ্যানী দগ্ধ করিতে করিতে ক্রমশঃ মহর্ষি মন্দপালের পুত্র শার্সকচতুষ্টয়ের সমীপবর্তী হইলে তাহাদের সর্ব্বজ্যেষ্ঠ জরিতারি পাবকসন্নিধানে ভ্রাতাদিগকে কহিতে লাগিলেন, বিপৎকাল উপস্থিত হইলে বুদ্ধিমান্ পুরুষ সর্ব্বদা জাগরূক থাকেন; বিপৎকালে কদাচ ব্যথিত হন না। যে মূঢ় ব্যক্তি বিপৎকাল উপস্থিত হইলে সতর্ক না থাকে, সে তৎকালে যৎপরোনাস্তি কষ্ট ভোগ করে এবং চরমে মোক্ষ লাভ করিতে পারে না।

তখন সারিসৃক্ক জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে কহিলেন, হে ভ্রাতঃ! এক্ষণে আমাদের প্রাণসংশয় উপস্থিত হইয়াছে। তুমি ধ্যানবান্ ও উহাপোহকুশল'; তুমি কোন না কোন উপায়দ্বারা আমাদিগকে রক্ষা কর, যেহেতু এক প্রাজ্ঞ অসংখ্য অপ্রাজ্ঞ লোক অপেক্ষা বলবান্।

স্তম্বমিত্র কহিলেন, জ্যেষ্ঠভ্রাতা পিতৃতুল্য; তিনি কনিষ্ঠ-দিগকে বিপদ হইতে মুক্ত করেন। যদি জ্যেষ্ঠ স্বীয় প্রজ্ঞাবলে বিপদ উদ্ধার না করেন, তবে কনিষ্ঠের কি সাধ্য যে, তাহার প্রতীকার করে?

দ্রোণ কহিলেন, ঐ দেখ সপ্তাস্য সপ্তজিহ্ ক্রুর হিরণ্যরেতাঃ শিখা-বিস্তারপূর্ব্বক আমাদের গৃহে আগমন করিতেছেন।

মহর্ষি মন্দপালের পুত্রগণ এইরূপে পরস্পর কথো-পকথন করত পরিশেষে প্রযত্ন হইয়া অগ্নির স্তব করিতে আরম্ভকরিলেন।

জরিতারি কহিলেন, হে জ্বলন! তুমি বায়ুর আত্মা; লতা সমূহের শরীর; পৃথিবী ও জল তোমা হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। হে মহাবীর্য্য! তোমার শিখাসমুদায় সূর্যকিরণের ন্যায় ঊর্দ্ধদেশ, অধোদেশ, পূর্ব্বদেশ ও পার্শ্বদেশে বিস্তৃত হইতেছে।

সারিসৃক্ক কহিলেন, হে ধূমকেতো! মাতা আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন; পিতা কোথায় আছেন কিছুই জানি না, আমাদের অদ্যাবধি পক্ষোদ্ভেদ' হয় নাই; অতএব হে অগ্নে! তুমি আমাদিগকে রক্ষা কর; তুমি ভিন্ন এই বালকদিগের আর শরণান্তর' নাই। হে অগ্নে! আমরা নিতান্ত কাতর হইয়া তোমার শরণাপন্ন হইতেছি। তুমি আপন কল্যাণমূর্ত্তি ও সপ্ত শিখা দ্বারা আমাদিগকে রক্ষা কর। হে জাতবেদঃ! এই ত্রিলোকী-মধ্যে তুমিই এক তপস্বী আছ; তোমার তুল্য তপোবলসম্পন্ন আর কেহই নাই। আমরা একে বালক, তাহাতে আবার ঋষিকুমার; তুমি অনুকম্পা প্রদর্শনপূর্ব্বক আমাদিগকে রক্ষা কর।

স্তম্বমিত্র কহিলেন, হে অগ্নে। তুমি এক হইয়াও অনেক, এই নিখিল ব্রহ্মান্ড তোমাকে অবলম্বন করিয়া আছে, তুমি সর্ব্বভূত ও ভুবন ধারণ করিতেছ; তুমি অগ্নি, তুমি হব্যবাহ এবং তুমিই পরমোৎকৃষ্ট হবিঃ; পণ্ডিতগণ তোমাকে একরূপ এবং তোমাকেই বহুরূপ বলিয়া জানেন। হে হব্যবাহ। তুমি এই ত্রিলোকী সৃষ্টি কর এবং প্রলয়কালে তুমিই প্রজ্বলিত হইয়া ইহা ধ্বংস কর। হে অগ্নে! তুমি এই ভুবনত্রয়ের প্রসূতি এবং তুমিই ইহার আশ্রয়।

দ্রোণ কহিলেন, হে জগৎপতে! তুমি প্রাণিগণের অন্তর্গত থাকিয়া ভুক্ত অন্ন পরিপাক কর; তোমাতেই সমস্ত জগৎ প্রতিষ্ঠিত আছে। হে বহ্নে। তুমি সূর্য্যরূপে পার্থিব রসসমুদায় আকর্ষণ কর এবং মেঘরূপে পরিণত সেই সমুদায় রস যথাকালে বর্ষণ করিয়া পৃথিবীকে সর্ব্বশস্যসম্পন্ন কর। হে প্রচণ্ডকিরণ হুতাশন! এই সমুদায় হরিতচ্ছদসম্পন্ন' লতা, যাবতীয় পুষ্করিণী এবং বরুণাধিকৃত মহোদধি তোমা হইতেই সমুৎপন্ন হইয়াছে। হে পিঙ্গাক্ষ! হে লোহিতগ্রীব! হে কৃষ্ণবর্ম্মন্! হে হুতাশন! তুমি আমাদিগকে রক্ষা কর, দগ্ধ করিও না।

ভগবান্ অনল ব্রহ্মবাদী দ্রোণকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া মহর্ষি মন্দপাল-সন্নিধানে কৃত স্বীয় প্রতিজ্ঞা অনুসরণপূর্ব্বক তাঁহাকে কহিলেন, হে দ্রোণ! তুমি ঋষি বটে; তুমি আমাকে বেদবাক্যে স্তব করিলে; তোমার ভয় নাই। আমি তোমার অভিলাষ পূর্ণ করিব। পূর্ব্বে মহর্ষি মন্দপালও তোমাদের নিমিত্ত আমার নিকট এই প্রার্থনা করিয়াছিলেন যে, আপনি খাণ্ডবারণ্য দাহকালে আমার পুত্রগণকে পরিত্যাগ করিবেন। হে দ্রোণ! মহর্ষি মন্দপালের সেই বাক্য এবং তোমার এই বাক্য এই উভয়ই আমার পক্ষে গুরুতর; অতএব বল, এক্ষণে তোমার কি হিতসাধন করিতে হইবে? আমি তোমার স্তব শুনিয়া পরম সন্তুষ্ট হইয়াছি।

দ্রোণ কহিলেন, হে হুতাশন! এই বিড়ালগণ আমাদিগকে সর্ব্বদা বিরক্ত করে, আপনি অনুগ্রহ করিয়া উহাদিগকে সবংশে - ভস্মীভূত করুন। ভগবান্ বহ্নি দ্রোণের বাক্যানুসারে বিড়াল-গণকে তৎক্ষণাৎ ভস্মসাৎ করিয়া শাঙ্গকচতুষ্টয়কে পরিত্যাগ-পূর্ব্বক প্রবলবেগে খাণ্ডববন দগ্ধ করিতে লাগিলেন।

স্ত্রী-পুত্রের প্রাণনাশের আশঙ্কায় মন্দপালের বিলাপ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, এদিকে মহর্ষি মন্দপাল স্বীয় পুত্রচতুষ্টয়ের নিমিত্ত সাতিশয় চিন্তাকুল হইলেন। তিনি পুত্রগণের পরিত্রাণার্থ অগ্নির নিকট নিবেদন করিয়াও তৎকালে মনে মনে অসুখী হইতে লাগিলেন। মহর্ষি মন্দপাল সন্তানদিগের নিমিত্ত সন্তপ্ত হইয়া অতি কাতরস্বরে লপিতাকে সম্বোধিয়া কহিলেন; লপিতে। এক্ষণে আমার পুত্রগণ না জানি কিরূপ কাতর হইতেছে। তাহারা অজাতপক্ষ এবং আত্মরক্ষায় অশক্ত। অগ্নি ক্রমে ক্রমে অধিকতর প্রজ্বলিত হইতেছেন এবং বায়ুও প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতেছেন, বোধ করি তাহারা অগ্ন্যুৎপাত হইতে মুক্ত হইতে পারিবে না। আহা। তাহাদের মাতা দীনা জরিতা স্বীয় পুত্রগণকে পরিত্রাণ করিতে না পারিয়া এবং তাহাদিগকে অশরণ দেখিয়া যৎপরোনাস্তি শোকার্ত হইবে, সন্দেহ নাই। আমার পুত্রগণ অদ্যাপি উড্ডয়ন বা গমন করিতে সমর্থ হয় নাই, জরিতা কি প্রকারে তাহাদিগকে লইয়া পলায়ন করিবে? হা পুত্র জরিতারে। হা বৎস সারিসৃক্ক। হা স্তম্বমিত্র। হা পুত্র দ্রোণ! হা প্রিয়ে জরিতে না জানি, তোমরা এখন কত কষ্ট পাইতেছ?

লপিতা মহর্ষি মন্দপালের এইরূপ বিলাপবাক্য শ্রবণে সাতিশয় অসূয়াপরতন্ত্র হইয়া কহিতে লাগিলেন, দেখ! তোমার পুত্রদিগের নিমিত্ত কিছুমাত্র চিন্তা নাই; তুমি স্বয়ং কহিয়াছ, তাহারা ঋষি। হে মহর্ষে! উহারা বীর্য্যবান্ ও তেজস্বী; অগ্নি হইতে উহাদের কিছুমাত্র শঙ্কা নাই। বিশেষতঃ তুমি তাহাদিগকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত অগ্নিকে অনুরোধ করিয়াছিলে। মহাত্মা হুতাশনও তোমার অনুরোধ শ্রবণে "তথাস্তু” বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন; তিনি কখনই আপনার প্রতিজ্ঞা বিফল করিবেন না। অতএব স্পষ্টই বোধ হইতেছে, তুমি পুত্রগণের নিমিত্ত কিছুমাত্র উৎকণ্ঠিত নও; কেবল আমার অমিত্রা সেই জরিতাকে মনে হইয়াছে বলিয়াই এত অনুতাপ করিতেছ। নিশ্চয় বুঝিলাম আমার প্রতি তোমার আর পূর্ব্বের মত স্নেহ নাই। স্নেহবান্ ব্যক্তির পুত্র কলত্রাদি সুহৃজ্জনের প্রতি উপেক্ষা করা নিতান্ত অবিধেয়; অতএব তুমি সেই জরিতার নিকটেই গমন কর, আর বৃথা অনুতাপ করিবার আবশ্যকতা নাই। আমি কুপুরুষাশ্রিতা নারীর ন্যায় একাকিনী জীবন যাপন করিব।

মন্দপাল কহিলেন, লপিতে। তুমি মনে করিয়াছ, আমি নিতান্ত কামান্ধ লোকের ন্যায় কেবল স্ত্রীসম্ভোগার্থে পৃথিবীমণ্ডলে ভ্রমণ করিতেছি, কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে। অপত্যোৎপাদন করাই আমার উদ্দেশ্য। আমার সেই অপত্যগণ এক্ষণে বিপদ্‌গ্রস্ত হইয়াছে। যে মূঢ় ব্যক্তি ভূতার্থ পরিত্যাগ করিয়া ভবিষ্যৎ অবলম্বন করে, সে সমস্ত লোকের অবমানাস্পদ হয়। ঐ দেখ, প্রজ্বলিত হুতাশন কাননস্থ সমস্ত বৃক্ষ দগ্ধ করিয়া আমার মন সাতিশয় সন্তাপিত ও উদ্বেজিত করিতেছে। আমি আর স্থির হইতে পারিতেছি না। পুত্রগণের নিকট চলিলাম। তোমার যাহা ইচ্ছা হয় কর।

পুত্রগণসমীপে মন্দপালের আগমন।

এদিকে অগ্নি মন্দপালের পুত্রচতুষ্টয়ের নিকট হইতে দূরতর প্রদেশে গমন করিলে পুত্রবৎসলা জরিতা শাবকগণের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া দেখিল, তাহারা সকলেই অগ্নি হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছে, কিন্তু সাতিশয় রোদন করিতেছে। জরিতা তাহাদিগকে তদবস্থ দেখিয়া পুত্রবাৎসল্য প্রযুক্ত পুনঃ পুনঃ স্নেহাশ্রু মোচনপূর্ব্বক অতি কাতরস্বরে একে একে তাহাদের সকলের নিকট গমন করিয়া স্নেহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। তদনন্তর মহর্ষি মন্দপাল সহসা তাহাদের নিকট উপস্থিত হইলেন, কিন্তু তাহারা কেহই তাঁহাকে অভিনন্দন করিলেন না। তিনি ব্যাকুলহৃদয়ে বারংবার পুত্রগণকে ও জরিতাকে সম্বোধন করত জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহারা কেহই ভাল মন্দ কিছুই বলিলেন না। তখন মহর্ষি জরিতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, জরিতে। তোমার জ্যেষ্ঠ পুত্র কে? তৎকনিষ্ঠ কে? তৃতীয় কে? এবং সর্ব্বকনিষ্ঠই বা কে? আমি দুঃখিত হইয়া বারংবার তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, তুমি প্রত্যুত্তর করিতেছ না। আমি তোমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়াছি বটে, কিন্তু তোমাদের নিমিত্ত মন এক মুহূর্তও সুস্থির নহে।

জরিতা মহর্ষির ঐরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, মহর্ষে! জ্যেষ্ঠ পুত্রে তোমার প্রয়োজন কি? তৎকনিষ্ঠেই বা প্রয়োজন কি? এবং তৃতীয় ও কনিষ্ঠ পুত্রেই বা তোমার আবশ্যকতা কি? তুমি এই হতভাগিনীকে পরিত্যাগ করিয়া যাহার নিকট গমন করিয়াছিলে সেই চারুহাসিনী তরুণী লপিতার নিকটেই পুনর্ব্বার গমন কর।

মন্দপাল কহিলেন, জরিতে! স্ত্রীলোকের পুরুষান্তর সেবন ও স্বপত্নীর সহিত বিবাদ করা অপেক্ষা প্রারত্রিক বিনাশক’, বৈরাগ্নিদীপক ও উদ্বেগজনক আর কিছুই নাই। সুব্রতা সৰ্ব্বভূত-বিশ্রুতা অরুন্ধতী বিশুদ্ধস্বভাব, প্রিয়কারী, হিতসাধন তৎপর, সপ্তর্ষিমধ্যস্থ মহাত্মা বশিষ্ঠ ঋষির মহিলান্তর-সংসর্গাশঙ্কা করিয়া তাঁহার অবমাননা করিয়াছিলেন, সেই নিমিত্ত তিনি সমীপে

লক্ষ্যালক্ষ্য ও অনভিরূপা হইয়াছেন। আমি অপত্য দর্শনাভিলাষে আগমন করিয়াছি, তুমিও আমাকে সেইরূপ অপমান করিতেছ। পুরুষের ভার্য্যার প্রতি সর্ব্বতোভাবে বিশ্বাস করা কদাপি কর্তব্য নহে, যেহেতু পতিপরায়ণা কামিনীও পুত্রবতী হইলে স্বামীর প্রতি পূর্ব্বের ন্যায় অনুরক্তা থাকে না।

মহর্ষি মন্দপালের বাক্যাবসানে তাঁহার পুত্রচতুষ্টয় তৎ-সমীপে সমুপস্থিত হইয়া যথোচিত পিতৃভক্তি প্রদর্শন করিল এবং মহর্ষিও সাতিশয় সমাদরপূর্ব্বক স্বীয় সন্তানগণকে আশ্বাস প্রদান করিতে লাগিলেন।

পরিবারসহ মন্দপালের স্থানান্তরে গমন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহর্ষি মন্দপাল পুত্রগণের সান্ত্বনার নিমিত্ত প্রবোধবাক্যে কহিতে লাগিলেন, হে পুত্রগণ! পূর্ব্বে আমি তোমাদের রক্ষার নিমিত্ত ভগবান্ হুতাশনের সমীপে প্রার্থনা করিয়াছিলাম, তিনিও আমার প্রার্থনাবাক্য স্বীকার করিয়াছিলেন। আমি অগ্নির বাক্য, তোমাদের জননীর ধর্মজ্ঞতা এবং তোমাদের বীর্য্যের উপর বিশ্বাস করিয়া তৎকালে তোমাদের নিকট আগমন করি নাই, অতএব হে বৎসগণ! তোমরা আমার নৃশংসাচরণ মনে করিয়া সন্তপ্ত হইও না। ভগবান্ হুতাশন তোমাদিগকে বেদবিৎ ঋষি বলিয়া জানেন। মহর্ষি স্বীয় পুত্রগণকে এইরূপে সান্ত্বনা করত তাহাদিগকে এবং ভার্য্যা জরিতাকে লইয়া সে প্রদেশ হইতে প্রদেশান্তরে প্রস্থান করিলেন।

অর্জুনকে ইন্দ্রের অস্ত্রপ্রদানের প্রতিশ্রুতি।

এদিকে ভগবান্ হুতাশন প্রচণ্ডবেগে প্রজ্বলিত হইয়া কৃষ্ণার্জুন সাহায্যে খাণ্ডবারণ্য দগ্ধ করত তত্রস্থ জীবজন্তু গণের অপরিমিত বসা ও মেদ পান করিয়া পরম পরিতৃপ্ত হইলেন।

তদনন্তর ভগবান্ পুরন্দর দেবগণ-সমভিব্যাহারে অন্তরীক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইয়া কৃষ্ণার্জুনকে কহিলেন, তোমরা যে মহৎ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে, ইহা দেবতাদিগেরও দুষ্কর; আমি তোমাদের পরাক্রম দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি; এক্ষণে তোমরা অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। তখন অর্জুন "আমাকে সমস্ত অস্ত্র প্রদান করুন" বলিয়া দেবরাজের নিকট বর প্রার্থনা করিলেন। ইন্দ্র সময় নির্দেশপূর্ব্বক কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! যে সময় তুমি তপস্যাদ্বারা ভগবান্ দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রসন্ন করিবে, আমি তৎকালে তোমাকে সমস্ত অস্ত্র প্রদান করিব। হে পাণ্ডব! সেই সময়ে আগ্নেয়, বায়ব্য ও মদীয় অস্ত্রসমুদায় লাভ করিবে। কৃষ্ণ কহিলেন, সুররাজ! আমি এইমাত্র বর প্রার্থনা করি, যেন অর্জুনের সহিত আমার কদাচ প্রণয় বিচ্ছেদ না হয়। ইন্দ্র "তথাস্তু" বলিয়া তাঁহাকে বর প্রদান করিলেন।

সুররাজ এইরূপে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে বর প্রদান করিয়া অগ্নির অনুজ্ঞা গ্রহণপুরঃসর দেবগণ-সমভিব্যাহারে পুনর্ব্বার সুরপুরে গমন করিলেন। ভগবান্ হুতাশন পঞ্চদশ দিবস প্রবলবেগে প্রজ্বলিত হইয়া মৃগপক্ষিসমাকুল খাণ্ডবারণ্য দগ্ধ করত তাহাদিগের মাংস ভোজন এবং মেদ ও রুধির পানদ্বারা পরম পরিতুষ্ট হইয়া বিরত হইলেন। পরিশেষে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে কহিলেন, হে মহাবীরদ্বয়! তোমরা আমাকে পরম পরিতুষ্ট করিয়াছ; এক্ষণে অনুমতি করিতেছি, তোমরা যথা ইচ্ছা গমন কর। ভগবান্ হুতাশনের অনুজ্ঞা লাভানন্তর কৃষ্ণার্জুন ও ময়দানব তিন জনে তাঁহাকে প্রদক্ষিণ করিয়া তথা হইতে সেই পরম রমণীয় যমুনা নদীর উপকূলে আসিয়া উপবেশন করিলেন।

খাণ্ডবদহন পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।

আদিপর্ব্ব সমাপ্ত।