কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

দ্রোণপর্ব্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

সংশপ্তকবধ পর্ব্বাধ্যায়

দ্রোণপর্ব্ব

সংশপ্তকবধ পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও ব্যাসকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

দ্রোণকর্তৃক দুর্য্যোধনকে আশ্বাস প্রদান ও দ্বাদশ দিবসের যুদ্ধারম্ভ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর উভয় পক্ষীয় সেনাগণ শিবিরে প্রবেশ করিয়া স্ব স্ব ভাগে ও স্ব স্ব গুল্মে ন্যায়ানুসারে বাস করিতে লাগিল। মহাবীর দ্রোণ সৈন্যগণের অবহার করিয়া রাজা দুর্য্যোধনকে অবলোকনপূর্ব্বক লজ্জিত মনে কহিলেন, - মহারাজ! আমি পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে, অর্জ্জুন থাকিতে দেবগণও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিতে সমর্থ হইবেন না। তোমরা দৃঢ়তর যত্ন করিয়াছিলে, তথাপি ধনঞ্জয় সেই কার্য্য সমাপন করিয়াছেন; অতএব আমার বাক্যে অণুমাত্র সন্দেহ করিও না; কৃষ্ণ ও অর্জ্জুন উভয়েই অজেয়। অতএব কোনরূপে অর্জ্জুনকে অপসারিত করিতে পারিলে আজি যুধিষ্ঠির তোমার বশবর্তী হইবেন। এক্ষণে অন্য কোন বীরকে যুদ্ধের নিমিত্ত আহ্বান করুন; তিনি অর্জ্জুনকে যুদ্ধার্থ স্থানান্তরিত করিলে যুদ্ধস্থলে অর্জ্জুন তাহাকে পরাজয় না করিয়া কখনই প্রতিনিবৃত্ত হইবে না; আমি সেই অবসরে পাণ্ডবসেনা ভেদ করিয়া ধৃষ্টদ্যুম্নের সমক্ষেই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিব। যদি যুধিষ্ঠির অর্জ্জুনের অনবস্থানকালে' আমাকে নিরীক্ষণপূর্ব্বক সংগ্রামে পরাজুখ না হন, তাহা হইলে তাঁহাকে গৃহীত বিবেচনা করিবে। হে মহারাজ। আজি এইরূপ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ও তাঁহার অনুচরগণকে তোমার বশংবদ করিব; তাহার সন্দেহ নাই।

ত্রিগত্তাধিপতি দ্রোণবাক্য শ্রবণানন্তর ভ্রাতৃগণ-সমভি-ব্যাহারে রাজা দুর্য্যোধনকে কহিলেন, মহারাজ! অর্জ্জুন বারংবার আমাদিগকে পরাভব করিয়াছে। আমরা নিরপরাধ কিন্তু সে আমাদের নিকট অপরাধ করিয়া থাকে। আমরা সেই সকল নানাপ্রকার পরাভব স্মরণ করিয়া রোষানলে নিরন্তর দগ্ধ হইতে থাকি; রজনী যোগে কিছুতেই নিদ্রাসুখ অনুভব করিতে সমর্থ হই না। সে অস্ত্রসম্পন্ন হইয়া ভাগ্যবশতঃ আমাদিগের দৃষ্টিগোচর হইয়াছে; আমরা আজি অভিলাষানুরূপ আপনার হিতকর ও আমাদের যশস্কর কার্য্যানুষ্ঠান করিব। আমরা রণক্ষেত্রের বহির্ভাগে গমন করিয়া তাহাকে সংহার করিব। আজি পৃথিবী অর্জ্জুনশূন্য বা ত্রিগর্ত্তশূন্য হইবে; আমি সত্য প্রতিজ্ঞা করিতেছি, ইহা কখনই মিথ্যা হইবে না।

প্রস্থলাধিপতি ত্রিগর্ত সুশর্ম্মা সত্যরথ, সত্যধৰ্ম্মা, সত্যব্রত, সত্যেষু ও সত্যকৰ্ম্মা এই পাঁচ ভ্রাতা এবং অযুত রথ সমভিব্যাহারী মাবেলক, ললিখ ও মদ্রকগণের সহিত নানা জনপদ হইতে সমাগত উৎকৃষ্ট অযুত রথসমভিব্যাহারে এবং মানব তুণ্ডিকেয়গণ তিন অযুত রথ লইয়া শপথ করিবার নিমিত্ত উপস্থিত হইলেন। অনন্তর সকলে হুতাশন আনয়ন ও পৃথক্ পৃথক্ স্থাপিত করিয়া কুশচীর' ও বিচিত্র কবচ ধারণ করিলেন; পরে সেই মহাত্মা ঘৃতাক্ত মৌর্ব্বী-মেখলালঙ্কৃত সহস্র শত দক্ষিণাসম্পন্ন, যাজ্ঞিক, পুত্রসমবেত, পুণ্যলোেকলাভের যোগ্য, কৃতকৃত্য, জীবিতনিরপেক্ষ, যশঃ ও বিজয়লাভার্থী এবং ব্রহ্মচর্য্য-প্রমুখ, শ্রুতিবিহিত, ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞদ্বারা প্রাপ্য লোকসমুদায় লাভে সমুৎসুক হইয়া সংগ্রামে তনুত্যাগপূর্ব্বক তথায় গমন করিতে অভিলাষী হইলেন এবং পৃথক্ পৃথক্ নিষ্ক, ধেনু ও বস্ত্র প্রদান করিয়া ব্রাহ্মণগণের তৃপ্তিসাধন, পরস্পর সম্ভাষণ ও সমরব্রত ধারণপূর্ব্বক অগ্নি প্রজ্বলিত করিলেন। পরে তাঁহারা সর্ব্বসমক্ষে সেই হুতাশন স্পর্শ করিয়া অর্জ্জুনবধে প্রতিজ্ঞা করত উচ্চস্বরে কহিলেন, 'হে ভূপালগণ! যদি আমরা অর্জ্জুন বধ না করিয়া নিবৃত্ত হই অথবা তাঁহার ভয়ে নিতান্ত ভীত হইয়া সমরে পরাজুখ হই, তাহা হইলে মিথ্যাবাদী, ব্রহ্মঘাতক, মদ্যপায়ী, গুরুদারাভিগামী, ব্রহ্মাস্ব ও রাজপিণ্ডাপহারী', শরণাগত পরিত্যাগী, আর্থিঘাতী', গৃহদাহী, গোহন্তা, অপকারী, ব্রহ্মদ্বেষী, ন্যস্তধনাপহারী, শাস্ত্রবিহিত পথ পরিত্যাগী, দীনানুসারী', নাস্তিক এবং অগ্নি ও মাতৃ-পরিত্যাগীদিগের যে লোক, আর যে ব্যক্তি মোহপরতন্ত্র হইয়া ঋতুকালে ভার্য্যাভিগমন করে, যে ব্যক্তি শ্রাদ্ধদিবসে স্ত্রী-সম্ভোগ করে ও যে ব্যক্তি ক্লীবের সহিত যুদ্ধ করে, তাহাদের যে লোক এবং অন্যান্য পাপানুষ্ঠানপরায়ণ ব্যক্তিদিগের যে লোক আমরা তাহাই প্রাপ্ত হইব।' কিন্তু যদি রণস্থলে অতি দুষ্কর কার্য্যানুষ্ঠানে সমর্থ হই, তাহা হইলে আজি নিঃসন্দেহ অভীষ্ট লোকসকল প্রাপ্ত হইব। সুশর্মা প্রভৃতি বীরগণ এইরূপ শপথ করিয়া যুদ্ধার্থ নির্গত হইলেন এবং অর্জ্জুনকে দক্ষিণদিকে আহ্বান করিতে করিতে সমরে সমুপস্থিত হইলেন। তখন অর্জ্জুন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! আমি যুদ্ধে আহুত হইয়া কদাচ নিবৃত্ত হইব না; এইরূপ ব্রত ধারণ করিয়াছি, এক্ষণে সংশপ্তকগণ আমাকে আহ্বান করিতেছে, অতএব আপনি অনুচরগণের সহিত - উহাদিগকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত অনুমতি প্রদান করুন। আমি উহাদিগের এইরূপ আহ্বান কিছুতেই সহ্য করিতে সমর্থ হইতেছি না। এক্ষণে সত্যই প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে আমি উহাদিগকে অবশ্যই বিনাশ করিব। যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে অর্জ্জুন! মহাবীর দ্রোণাচার্য্য যেরূপ অভিলাষ করিয়াছেন, তাহাও তুমি সম্যক্ কর্ণগোচর করিয়াছ, এক্ষণে যাহাতে ইহা মিথ্যা হয়, তাহার অনুষ্ঠান কর। দ্রোণ মহাবল পরাক্রান্ত, শিক্ষিত জিতশ্রম; তিনি আমাকে গ্রহণ করিবার নিমিত্ত প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন। অর্জ্জুন কহিলেন, মহারাজ! সত্যজিৎ আজি আপনার রক্ষক হইবেন; ইনি জীবিত থাকিতে দ্রোণাচার্য্য স্বীয় অভিলাষ পূরণে কদাচ সমর্থ হইবেন না। সত্যজিৎ বিনষ্ট হইলে আপনারা কেহই রণস্থলে অবস্থান করিবেন না।

অনন্তর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির প্রীতিস্নিগ্ধ নয়নে অর্জ্জুনকে অবলোকন ও আলিঙ্গন করিয়া বারংবার আশীর্ব্বাদ করত গমনে অনুমতি করিলেন। তখন যেমন ক্ষুধার্ত্ত সিংহ ক্ষুধাশান্তির নিমিত্ত মৃগগণের প্রতিগমন করে, তদ্রূপ তিনি ত্রিগত্তদিগের প্রতি গমন করিতে লাগিলেন। ইত্যবসরে দুর্য্যোধনের সৈন্যগণ রোষাবিষ্ট চিত্তে অর্জ্জুনবিহীন রাজা যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিবার নিমিত্ত নিতান্ত সন্তুষ্ট হইল। অনন্তর উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণ বর্ষাকালে প্রবৃদ্ধসলিলা অতি বেগবতী ভগবতী ভাগীরথী যেমন সরিদ্বরা সরযূর সহিত মহাবেগে মিলিত হয়, তদ্রূপ মহাবেগে মিলিত হইল।

সংশপ্তকগণকর্তৃক অর্জ্জুনকে সংগ্রামে আহ্বান।

সঞ্জয় কহিলেন, অনন্তর সংশপ্তকগণ সমতলে ভূতলে অবস্থান করিয়া হৃষ্টমনে রথদ্বারা চন্দ্রকায় ব্যূহ নির্মাণ করিলেন এবং অর্জ্জুনকে নিরীক্ষণ করিয়া হর্ষভরে চীৎকার করিতে লাগিলেন। ঐ চীৎকার শব্দ চতুৰ্দ্দিক্ ও অন্তরীক্ষ সমাছন্ন করিল, কিন্তু চারি দিক্ লোকে সমাবৃত ছিল বলিয়া প্রতিধ্বনি হইল না। তখন ধনঞ্জয় তাঁহাদিগকে নিতান্ত সন্তুষ্ট নিরীক্ষণ করিয়া সহাস্য মুখে কৃষ্ণকে কহিলেন, হে বাসুদেব! তুমি ঐ সমস্ত মুমূর্ষু ত্রিগত্তদিগকে অবলোকন কর, উহারা রোদন করিবার স্থলেই হর্ষ প্রকাশ করিতেছে অথবা উহারা কাপুরুষ; দুষ্প্রাপ্য উৎকৃষ্ট লোকসমুদায় প্রাপ্ত হইবে বলিয়া এ সময় হর্ষ প্রকাশ করিতেছে, তাহার সন্দেহ নাই। এই বলিয়া অর্জ্জুন ত্রিগত্তদিগের বিপুল বল সমুদায়ের সম্মুখীন হইয়া চতুৰ্দ্দিক্ প্রতিধ্বনিত করত মহাবেগে সুর্বণালঙ্কৃত দেবদত্ত শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন। সংশপ্তকদিগের বাহিনী সেই ভয়ঙ্কর শঙ্খধ্বনি শ্রবণে নিতান্ত শঙ্কিত হইয়া প্রস্তরময়ী মূর্তির ন্যায় নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিল। তাহাদের অশ্বসকল বিবৃত্তচক্ষুঃ, স্তব্ধকর্ণ, স্তব্ধগ্রীব ও স্তব্ধপাদ হইয়া রুধির বমন ও প্রস্রাব করিতে লাগিল; অনন্তর সং-শপ্তকগণ সংজ্ঞা লাভ করত সেনাগণকে প্রকৃতিস্থ করিয়া অর্জ্জুনের প্রতি এক কালে বাণপ্রয়োগ করিতে লাগিলেন। অর্জ্জুন পঞ্চদশ শরে সংশপ্তকবিনির্মুক্ত সহস্র শর আগত হইতে না হইতেই খণ্ড খণ্ড করিলেন। পরে তাঁহারা দশ দশ শরে অর্জ্জুনকে বিদ্ধ করিলে অর্জ্জুন তিন তিন শরে তাঁহাদিগকে বিদ্ধ করিলেন। অনন্তর সংশপ্তকগণ পাঁচ শরে অর্জ্জুনকে বিদ্ধ করিলে অর্জ্জুন দুই দুই শরে তাঁহাদিগকে বিদ্ধ করিলেন। সংশপ্তকগণ পুনরায় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া যেমন বৃষ্টিদ্বারা তড়াগ সমাচ্ছন্ন হয়, তদ্রূপ শরনিকরে বাসুদেব ও অর্জ্জুনকে সমাছন্ন করিতে লাগিলেন। তখন যেমন কাননমধ্যে ভ্রমরপংক্তি কুসুমশোভিত পাদপে নিপতিত হয়, তদ্রূপ সহস্র সহস্র শর অর্জ্জুনের প্রতি নিপতিত হইতে লাগিল।

অনন্তর সুবাহু অদ্রিসারময়' ত্রিশ শরে অর্জ্জুনের কিরীট বিদ্ধ করিলে অর্জ্জুন কিরীটস্থ সুবর্ণপুঙ্খ শরনিকরে সুবর্ণালঙ্কারে অলঙ্কৃতের ন্যায় ও উত্থিত দিবাকরের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইলেন। পরে তিনি ভল্লাস্ত্রে সুবাহুর হস্তাবাপ' ছেদন করিয়া পুনর্ব্বার তাঁহার প্রতি শরবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। অনন্তর সুশর্মা, সুরথ, সুধৰ্ম্মা, সুবাহু ইঁহারা দশ শরে অর্জ্জুনকে বিদ্ধ করিলেন। অর্জ্জুন তাঁহাদের প্রত্যেককেই শরজালে বিদ্ধ করিয়া ভল্লাস্ত্রে কাঞ্চনময় ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। পরে সুধন্বার শরাসন ছেদন ও অশ্বগণকে বিনাশ করিয়া তাহার শিরস্ত্রাণ-সুশোভিত মস্তক ছেদন করিলেন। তখন তাঁহার অনুচরগণ নিতান্ত ভীত হইয়া যে স্থানে দুর্য্যোধনের সৈন্যসকল অবস্থান করিতেছে, তথায় ধাবমান হইল। যেমন দিবাকর করজালে অন্ধকার বিনাশ করিয়া থাকেন, তদ্রূপ অর্জ্জুন রোষভরে অবিচ্ছিন্ন শরনিকরে কৌরবসেনাগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। তখন সেনাগণ ত্রস্ত, ভীত ও ছিন্ন ভিন্ন হইয়া ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিল। ত্রিগর্ত্তেরা অর্জ্জুনকে ক্রোধে নিতান্ত অধীর নিরীক্ষণ করত সাতিশয় শঙ্কিত হইলে এবং পার্থশরে আহত হইয়া ভয়ার্ত মৃগযুথের ন্যায় সেই সেই স্থানেই মোহে অভিভূত হইতে লাগিল। অনন্তর ত্রিগর্তগণ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া মহারথ ত্রিগত্তদিগকে কহিলেন, হে বীরগণ! ভীত হইও না; পলায়ন করা তোমাদের কর্তব্য হইতেছে না। তোমরা কৌরব-সৈন্য-সমক্ষে সেইরূপ ভয়ানক শপথ করিয়া এক্ষণে তাহাদের সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক প্রধান প্রধানদিগকে কি বলিবে? পলায়ন করিলে কি লোকে উপহাস করিবে না? অতএব তোমরা একত্র মিলিত হইয়া যথাশক্তি যুদ্ধ কর। এই কথা শ্রবণ করিবামাত্র তাহারা তুমুল কোলাহল সহকারে পরস্পরকে হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট করিয়া শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন। অনন্তর সংশপ্তকগণ ও নারায়ণী-সেনা মৃত্যু পর্যন্ত স্বীকার করিয়া সমরে প্রবৃত্ত হইল।

সংশপ্তকের সহিত অর্জ্জুনের মায়াযুদ্ধ ও দ্বাদশ দিবসের যুদ্ধ বিরতি।

সঞ্জয় কহিলেন, অনন্তর মহাবীর অর্জ্জুন সংশপ্তকগণকে প্রত্যাগত নিরীক্ষণ করিয়া মহাত্মা বাসুদেবকে কহিলেন, হে কেশব! বোধ হইতেছে, সংশপ্তকগণ জীবন সত্ত্বে রণস্থল পরিত্যাগ করিবে না; অতএব এক্ষণে উহাদের দিকে অশ্ব চালনা কর। আজি তুমি আমার ভুজবল ও গাণ্ডীববল অব-লোকন করিবে। যেমন রুদ্রদেব পশুগণকে বিনাশ করিয়াছিলেন, তদ্রূপ আমিও ইহাদিগকে বধ করিব। তখন বাসুদেব সহাস্য-মুখে শুভাকাঙক্ষাদ্বারা অর্জ্জুনকে অভিনন্দন করিয়া তাঁহার ইচ্ছানুসারে রথ চালন করিতে লাগিলেন। সমরে পাণ্ডুবর্ণ অশ্বগণকর্তৃক সেই রথ পরিচালিত হইলে আকাশগামী বিমানের ন্যায় অপূর্ব্ব শোভা প্রাপ্ত হইল এবং পূর্ব্বকালে দেবাসুর-যুদ্ধে সুররাজরথের ন্যায় মণ্ডল ও গতি-প্রত্যাগতি প্রদর্শন করিতে লাগিল।

অনন্তর বিবিধ আয়ুধধারী নারায়ণী-সেনাসকল ক্রোধভরে শরনিকরে অর্জ্জুনকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিল এবং মুহূর্ত্ত-কালমধ্যে অর্জ্জুন ও বাসুদেবকে নেত্রের অগোচর করিল।

তখন অর্জ্জুন ক্রোধভরে দ্বিগুণ বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক সত্বরে গাণ্ডীব শরাসন পরিমার্জিত করিয়া গ্রহণ করিলেন এবং ললাটদেশে ক্রোধচিহ্ন ভীষণ ভ্রূকুটি করিয়া দেবদত্ত শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন। অনন্তর শত্রুনিসূদন অর্জ্জুন ত্বাষ্ট্র-অস্ত্র' পরিত্যাগ করিলে সহস্র সহস্র মূর্ত্তি প্রাদুর্ভূত হইল। তখন সেনাগণ আপনার প্রতিরূপ' সেই নানা রূপে বিমোহিত হইয়া পরস্পরকে অর্জ্জুন বোধে বিনাশ করিতে লাগিল। তাহারা "এই অর্জ্জুন, এই বাসুদেব,” বলিয়া মোহপ্রভাবে পরস্পরকে বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইল। তখন সকলে ত্বাষ্ট্র-অস্ত্রপ্রভাবে বিমোহিত হইয়া এককালে ক্ষয় প্রাপ্ত হইলে রণস্থল পুষ্পিত কিংশুক বৃক্ষের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইল। সেই তাষ্ট্র-অস্ত্র শত্রুপ্রযুক্ত অস্ত্রজাল ভস্মসাৎ করিয়া বীরগণকে যমালয়ে প্রেরণ করিল।

অনন্তর মহাবীর অর্জ্জুন সহাস্য মুখে ললিখ, মালব, মাবেলক, ত্রিগর্ত ও অন্যান্য যোদ্ধাদিগকে শরনিকরে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। সেইসমস্ত ক্ষত্রিয়গণ কালপ্রেরিত হইয়া অর্জ্জুনের প্রতি বিবিধ আয়ুধজাল পরিত্যাগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। সেই ভয়ানক শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া অর্জ্জুন, রথ ও কেশব আর নয়নগোচর হইলেন না। ইত্যবসরে সংশপ্তকগণ লব্ধলক্ষ্য হইয়া পরস্পর কোলাহল করিতে লাগিলেন এবং কৃষ্ণ ও অর্জ্জুন উভয়ে বিনষ্ট হইয়াছে বলিয়া প্রীতমনে বসন বিকম্পিত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। সহস্র সহস্র বীরগণ ভেরী, মৃদঙ্গ ও শঙ্খধ্বনি করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিল। তখন বাসুদেব একান্ত ক্লান্ত ও ঘর্মাক্ত কলেবর হইয়া অর্জ্জুনকে কহিলেন, হে পার্থ! তুমি কোথায়; আমি তোমাকে নিরীক্ষণ করিতেছি না; তুমি ত জীবিত আছ? তাঁহার বাক্য শ্রবণে অর্জ্জুন সত্বর হইয়া বায়ব্যাস্ত্রে সেই সমস্ত শর নিরাকরণ করিলেন। তখন ভগবান্ প্রভঞ্জন শুষ্ক পত্ররাশির ন্যায় হস্তী, অশ্ব, রথ ও আয়ুধের সহিত সংশপ্তকগণকে বহন করিতে লাগিলেন। যেমন বিহঙ্গগণ যথাসময়ে বৃক্ষ হইতে উড্ডীন হইয়া থাকে, তদ্রূপ তাঁহারা বায়ুবেগে উড্ডীন হইয়া পরম শোভাপ্রাপ্ত হইলেন। অর্জ্জুন সত্বরে তাঁহাদিগকে নিতান্ত ব্যাকুল শত শত সহস্র সহস্র শরে প্রহার করিতে লাগিলেন। তিনি ভল্লাস্ত্রে তাঁহাদের মস্তক ও সশস্ত্র হস্ত ছেদন করিয়া শরদ্বারা করি-শুণ্ডোপম উরুদণ্ড পৃথিবীতে নিপাতিত করিলেন। তখন কাহার পৃষ্ঠদেশ খণ্ড খণ্ড, কাহার চরণযুগল ছিন্ন ভিন্ন, কাহারও বা বাহু নিকৃত্ত ও চক্ষুঃ বিকল হইয়া গেল। মহাবীর অর্জ্জুন শত্রু গণকে এইরূপ ক্ষত-বিক্ষত করত গন্ধর্ব্ব নগরাকার সুসজ্জিত রথসকল শরজালে খণ্ড খণ্ড করিয়া হস্তী ও অশ্বগণকে বিনাশ করিতে লাগিলেন। কোন কোন স্থলে ছিন্নধ্বজ রথসকল মুণ্ডিত তালবনের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইল। উৎকৃষ্ট আয়ুধসনাথ পতাকা পরিশোভিত, ধ্বজদণ্ডমণ্ডিত অঙ্কুশসম্পন্ন মাতঙ্গগণ তরুরাজি সমাকীর্ণ বজ্রাহত অচলের ন্যায় নিপতিত হইতে লাগিল। চামরপীড়, কবচাবৃত তুরঙ্গমসকল পার্থবাণে অস্ত্র', নেত্র ও জীবন বিনির্গত হওয়ায় আরোহীর সহিত ধরাসনে শয়ন করিল। অসি ও নখরবিদ্ধ, ছিন্নবর্মা, ছিন্নাস্থিসন্ধি', ছিন্নমৰ্ম্মা পদাতিগণ নিহত হইয়া অতি দীনভাবে শয়ন করিয়া রহিল। তখন কেহ নিহত, কেহ হন্যমান, কেহ নিপতিত, কেহ পাত্যমান, কেহ অবস্থিত, কেহ কেহ বা বিচেষ্টমান হইতে লাগিল। এইরূপে রণস্থল সাতিশয় ভীষণ হইয়া উঠিল। নভোমণ্ডলউড্ডীন ধূলিজাল রুধিরধারা বর্ষণে প্রশান্ত হইয়া গেল; কবন্ধশত-সঙ্কুল' রণস্থল নিতান্ত দুর্গম হইয়া উঠিল। তখন কালাত্যয়ে পশুসংহারে প্রবৃত্ত ভগবান্ রুদ্রের আক্রীড়ের' ন্যায় মহাবীর | অর্জ্জুনের সাতিশয় ভয়ঙ্কর রথ বিলক্ষণ শোভা পাইতে লাগিল। নিতান্ত ব্যাকুল অশ্ব, রথ ও কুঞ্জরগণ সমবেত অর্জ্জুনাভিমুখীন সৈন্যগণ অর্জ্জুনকর্তৃক নিহত হইয়া ইন্দ্রপুরের আতিথ্য গ্রহণ করিতে লাগিল'। তখন সেই রণক্ষেত্রনিহত মহারথগণে আস্তীর্ণ হইয়া সাতিশয় সুশোভিত হইল। অর্জ্জুন এইরূপে সমরমদে মত্ত হইলে দ্রোণাচার্য্য যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবমান হইলেন। আয়ুধধারী বিপুল বলসমুদায় যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিবার অভিলাষে সত্বর তাঁহার অনুসরণ করিতে লাগিল। তখন রণস্থল অতি তুমুল হইয়া উঠিল।

ত্রয়োদশ দিবসের যুদ্ধে ব্যূহ রচনা ও দ্রোণাচার্য্যের যুধিষ্ঠির গ্রহণের প্রতিজ্ঞা।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারথ দ্রোণাচার্য্য রজনী অতিবাহিত করিয়া মহারাজ দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে বৎস! আমি তোমারই বশংবদ, আমি অর্জ্জুনের সহিত সংশপ্তকগণের সমর উদ্ভাবিত করিয়াছি। অনন্তর অর্জ্জুন সংশপ্তকগণের সহিত সমরানল প্রজ্বলিত করিয়া তাহাদিগকে সংহার করিবার নিমিত্ত নির্গত হইলে দ্রোণ ব্যূহ রচনা করত ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিবার অভিলাষে পাণ্ডবসেনাভিমুখে নির্গত হইলেন। রাজা যুধিষ্ঠির ভারদ্বাজ বিরচিত সুপর্ণ ব্যূহ নিরীক্ষণ করিয়া মণ্ডলার্দ্ধ ব্যূহ প্রস্তুত করিলেন। মহাবীর দ্রোণ সুপর্ণ ব্যূহের মুখ, সানুচর সোদরগণে পরিবেষ্টিত রাজা দুর্য্যোধন তাঁহার মস্তক, কৃতবর্মা ও তেজস্বী গৌতম চক্ষুদ্বয়, ভূতশৰ্ম্মা, ক্ষেপশৰ্ম্মা, করকাক্ষ এবং কলিঙ্গ সিংহল, প্রাচ্য, শূদ্র, আভীর, দাশেরক, শক, যবন, কাম্বোজ, হংসপদ, শূরসেন, দরদ, মদ্র ও কেকয়গণ আর শত শত সহস্র সহস্র হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতি উহার গ্রীবা; ভূরিশ্রবাঃ, শল্য, সোমদত্ত ও বাহ্লীক অক্ষৌহিণী পরিবৃত হইয়া দক্ষিণপার্শ্বে অবস্থান করিলেন। অবন্তীদেশীয় বিন্দানুবিন্দ ও কাম্বোজ সুদক্ষিণ, ইহারা বামপার্শ্ব আশ্রয় করিয়া অশ্বত্থামার অগ্রে অবস্থান করিতে লাগিলেন। উহার পৃষ্ঠভাগে অন্বষ্ঠ, কলিঙ্গ, মগাধ, পৌণ্ড্র, মদ্রক, গান্ধার, শকুন, প্রাচ্য, পার্ব্বতীয় ও বসাতিগণ এবং পুচ্ছদেশে মহাবীর কর্ণ পুত্র, জ্ঞাতি, বান্ধবগণ এবং নানা দেশ সমাগত বহুল বল-সমভিব্যাহারে অবস্থান করিলেন। জয়দ্রথ, ভীমরথ, যাজ, ভোজ, ভূমিঞ্জয়, বৃষ, ক্রোথ ও মহাবল পরাক্রান্ত নৈষধ, ইহারা বহুসংখ্যক সৈন্য সমভিব্যাহারে ব্যূহের বক্ষঃস্থলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। দ্রোণাচার্য্যকর্তৃক হস্ত্যশ্বরথপদাতি পরিকল্পিত সুপর্ণ ব্যূহ যেন বায়ুক্ষোভিত মহাসাগরের ন্যায় নৃত্য করিতেছে বোধ হইল। যোদ্ধাসকল সমরাভিলাষে উহার পক্ষ ও প্রপক্ষ হইতে জলদকালীন বিদ্যুদ্দামমণ্ডিত গর্জমান মেঘমণ্ডলের ন্যায় নির্গত হইতে লাগিল। ঐ ব্যূহের মধ্যে প্রাগজ্যোতিষেশ্বর ভগদত্ত সুসজ্জিত মাতঙ্গে আরোহণ করিলে এবং ভৃত্যেরা পূর্ণিমা রজনীতে কৃত্তিকা নক্ষত্রযুক্ত চন্দ্রমা সদৃশ মাল্যদামবিভূষিত, শ্বেতচ্ছত্র তাঁহার মস্তকে ধারণ করিলে তিনি উদয়কালীন দিবাকরের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন। তাঁহার অঞ্জন-পুঞ্জসদৃশ মদমত্ত মাতঙ্গ বারিধারাভিষিক্ত উত্তুঙ্গ শৈলের ন্যায় নিরীক্ষিত হইল। যেমন দেবগণ দেবরাজ ইন্দ্রকে বেষ্টন করিয়া থাকেন, তদ্রূপ বিবিধায়ুধধারী অলঙ্কারে অলঙ্কৃত পার্ব্বতীয় নৃপতিগণ তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া রহিল।

অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির নিতান্ত দুর্ভেদ্য অমানুষ ব্যূহ নিরীক্ষণ করিয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে কহিলেন, হে বীর! আজি আমি যাহাতে ব্রাহ্মণের বশবর্তী না হই, তাহার উপায় বিধান কর। ধৃষ্টদ্যুম্ন কহিলেন, হে মহারাজ! দ্রোণাচার্য্য বহু যত্নেও আপনাকে বশবর্তী করিতে সমর্থ হইবেন না; আমি তাঁহার অনুচরগণকে সমরে নিবারণ করিব। আমি জীবিত থাকিতে আপনি কদাচ উদ্বিগ্ন হইবেন না; দ্রোণাচার্য্য আমাকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবেন না।

এই বলিয়া ধৃষ্টদ্যুম্ন শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলে দ্রোণাচার্য্য সেই অশুভদর্শন ধৃষ্টদ্যুম্নকে অবলোকন করিয়া ক্ষণমধ্যেই সাতিশয় অপ্রসন্ন হইয়া উঠিলেন। তখন আপনার পুত্র দুর্মুখ দ্রোণাচার্য্যকে একান্ত বিমনায়মান নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার প্রিয়ানুষ্ঠান বাসনায় ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিবারণ করিলেন। তখন উভয়ের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ধৃষ্টদ্যুম্ন দুর্মুখকে সত্বরে শরনিকরের সমাচ্ছন্ন করিয়া অনবরত শর-বর্ষণপূর্ব্বক দ্রোণকে নিবারণ করিলেন। দুর্মুখ দ্রোণকে নিবারিত দেখিয়া সত্বরে আগমনপূর্ব্বক নানা লক্ষণলাঞ্ছিত শরজাল ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিমোহিত করিলেন। তাঁহারা এইরূপে ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলে দ্রোণাচার্য্য রাজা যুধিষ্ঠিরের সেনাগণকে শরপ্রহার করিতে লাগিলেন। যেমন বায়ুবেগবশতঃ মেঘমণ্ডল ছিন্ন ভিন্ন। হইয়া যায়, তদ্রূপ রাজা যুধিষ্ঠিরের সৈন্যগণ কোন কোন স্থলে নিতান্ত বিচ্ছিন্ন হইতে লাগিল।

ঐ যুদ্ধে মুহূর্তকাল মধুরদর্শন' হইয়াছিল। পরিণামে উন্মত্তের ন্যায় নিতান্ত মর্য্যাদা শূন্য হইয়া প্রবর্তিত হইল। তখন উভয় পক্ষে আত্মাপর বিবেচনা কিছুই রহিল না; কেবল অনুমান ও সংজ্ঞাদ্বারা লোকসকল উদ্ভাসিত' হইতে লাগিল। তাঁহাদিগের চূড়ামণি, নিষ্ক, অন্যান্য ভূষণ ও বৰ্ম্মসমুদায়ে আদিত্যসঙ্কাশ প্রভাজাল' উদ্ভাসিত হইল। পতাকামণ্ডিত হস্তী, অশ্ব ও রথসকল বলাকাসনাথ জলদপটলের ন্যায় রমণীয় শোভা ধারণ করিল। মনুষ্য মনুষ্যকে, অশ্ব অশ্বকে, রথী রথীকে, হস্তী হস্তীকে বিনাশ করিতে লাগিল, ক্ষণকাল মধ্যে গজে গজে ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভহইল। সেই সমস্ত মদস্রাবী দ্বিরদ'গণের গাত্রঘর্ষণ ও দশনাঘাতে সধূম পাবক সমুত্থিত হইতে লাগিল। তখন স্খলিতপতাকা বিষাণজ্বলিতহুতাশন' করিনিকর নভোমণ্ডলে বিদ্যুদ্দামমণ্ডিত মেঘের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। যেমন শরৎকালে গগনতল জলদজালে সমাচ্ছন্ন হয়, তদ্রূপ মাতঙ্গসকল রণস্থল সমাচ্ছন্ন করিয়া ইতস্ততঃ বিকীর্ণ হইল, কেহ কেহ নিনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিল, কেহ কেহ বা তথায় নিপতিত হইল। কোন কোন হস্তী বাণ ও তোমরদ্বারা আহত হইয়া প্রলয়কালীন মেঘের ন্যায় শব্দ করিতে লাগিল। কোন কোন হস্তী বাণ ও তোমরদ্বারা বিদ্ধ হইয়া নিতান্ত ভীত হইল। কতকগুলি হস্তী বিষাণ-সমাহত হইয়া প্রলয়কালীন জলদের ন্যায় ঘোরতর আর্তস্বর পরিত্যাগ করিতে লাগিল। কতকগুলি হস্তী অন্য হস্তীদ্বারা প্রতিকূলগামী হইলে অঙ্কুশাহত হইয়া পুনরায় উন্মুত্থিত' করত শত্রুগণকে আঘাত করিল।

মহামাত্রসকল মহামাত্রকর্তৃক শর ও তোমরদ্বারা তাড়িত হইয়া প্রহরণ ও অঙ্কুশ পরিত্যাগপূর্ব্বক করিপৃষ্ঠ হইতে ভূতলে নিপাতিত হইল। মহামাত্রশূন্য মাতঙ্গসকল নিনাদ পরিত্যাগ-পূর্ব্বক ছিন্ন অভ্রখণ্ডের ন্যায় পরস্পর সংশ্লিষ্ট হইয়া নিপাতিত হইতে লাগিল। কতকগুলি হস্তী নিহত, পাতিত ও পতিতায়ুধ ব্যক্তি-দিগকে বহন করিয়া গাণ্ডীবের ন্যায় চতুর্দিকে গমন করিতে লাগিল। কতকগুলি হস্তী তোমর, ঋষ্টি ও পরশুদ্বারা আহত ও আহন্যমান হইয়া আর্ত্তস্বর পরিত্যাগপূর্ব্বক নিপতিত হইল। উহাদিগের অচলোেপম বৃহৎ কলেবর পৃথিবী আহত হইয়া সহসা কম্পিত ও শব্দায়মান হইতে লাগিল। বিনষ্ট আরোহীযুক্ত, পতাকা সমালঙ্কৃত মাতঙ্গগণ নিপতিত হওয়াতে পৃথিবী ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত পর্ব্বতদ্বারা পরিকীর্ণের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইল। করিসমারূঢ় মহামাত্রসকল রথীদ্বারা ভল্লাস্ত্রে নির্ভিন্নহৃদয় হইয়া অঙ্কুশ ও তোমর পরিত্যাগপূর্ব্বক ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল। কোন কোন হস্তী নারাচে আহত হইয়া ক্রৌঞ্চের ন্যায় চীৎকার ন করিয়া উভয় পক্ষীয় বীরগণকে বিমর্দিত করত দশদিকে গমন করিল। তখন বসুন্ধরা হস্তী, অশ্ব ও রথে পরিপূর্ণ এবং মাংস, শোণিত ও কদমে নিতান্ত দুর্গম হইয়া উঠিল; বীরগণ সচক্র, বিচক্র', অতি বৃহৎ রথসকল দশনে মথিত করিয়া রথীর সহিত । উৎক্ষিপ্ত করিতে লাগিল। রথসকল রথীশূন্য, অশ্ব ও মাতঙ্গগণ আরোহীশূন্য ও নিতান্ত ভীত হইয়া চতুর্দিকে পলায়ন করিল; তথায় পিতা পুত্রকে ও পুত্র পিতাকে সংহার করিতে লাগিল। এইরূপে অতি তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইলে তৎকালে কিছুই অনুভূত হইল না। লোহিত বর্ণ কৰ্দ্দমে মনুষ্যসকলের গুলল্ফ পর্যন্ত নিমগ্ন হইল; তখন বোধ হইতে লাগিল, যেন পাদপ-সকলে প্রদীপ্ত দাবানলে প্রোথিত হইয়াছে। বস্ত্র, কবচ, ছত্র ও পতাকাসকল শোণিতসিক্ত হওয়াতে সমস্ত শোণিত বলিয়াই প্রতীয়মান হইতে লাগিল। নিপাতিত অশ্ব, রথ ও নরসমুদায় রথনেমির প্রত্যাবর্তনে বহুধা ছিন্ন হইল। সেই সৈন্যসাগর - গজসমূহ রূপ মহাবেগশালী, বিনষ্ট মনুষ্য রূপ শৈবাল শোভিত, - রথসমূহ রূপ তুমুল আবর্ত্তযুক্ত হইয়া উঠিল। জয়াভিলাষী - বীরপুরুষেরা বাহনরূপ বৃহৎ নৌকাদ্বারা তাহাতে অবগাহন - করত নিমগ্ন না হইয়া বিপক্ষগণকে মোহাবিষ্ট করিতে - লাগিলেন। চিহ্নসম্পন্ন যোদ্ধৃগণ শরজালে সমাচ্ছন্ন হইলে কোন ব্যক্তিই চিহ্নবিহীন হইয়াছে উপলব্ধি করিতে সমর্থ হইল না।

মহাবীর দ্রোণ সেই ভয়ঙ্কর ঘোরতর সমরে শত্রুগণকে মোহাবিষ্ট করিয়া যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবমান হইলেন।

সত্যজিতের সহিত দ্রোণের যুদ্ধ ও দ্রোণকর্তৃক সত্যজিতের মস্তক ছেদন।

সঞ্জয় কহিলেন, হে রাজন! তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য যুধিষ্ঠিরকে সমীপে সমাগত দেখিয়া তাঁহার উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহাসিংহ গজযূথপতি আক্রমণ করিবার উদ্যোগ করিলে করিগণ যেরূপ শব্দ করে যুধিষ্ঠিরের সৈন্যগণ সেইরূপ কোলাহল করিতে আরম্ভ করিল। সত্যবিক্রম সত্যজিৎ দ্রোণকে অবলোকন করিয়া যুধিষ্ঠিরের রক্ষার্থ আচার্য্যের প্রতি ধাবমান হইলে মহাবীর দ্রোণও সত্যজিৎ-সৈন্যগণকে বিক্ষোভিত করত বলি ও ইন্দ্রের ন্যায় ঘোরতর সংগ্রাম করিতে লাগিলেন। সত্যবিক্রম সত্যজিৎ নিশিতাস্ত্রে দ্রোণকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার সারথির উপরে সর্পবিষসদৃশ কৃতান্ত সম পাঁচ বাণ নিক্ষেপ করিলেন। সারথি সত্যজিতের বাণাঘাতে মূর্ছাপন্ন হইল। অনন্তর মহাবীর সত্যজিৎ দ্রোণের অশ্বগণকে দশ ও উভয় পার্ফি সারথিকে দশ বাণে বিদ্ধ করিয়া মণ্ডলাকার গমনে বিচরণপূর্ব্বক ক্রুদ্ধচিত্তে আচার্য্যের ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন।

মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সমরে সত্যজিতের কার্য্য সন্দর্শনে তাঁহাকে কালপ্রাপ্ত বোধ করিয়া অবিলম্বে তাঁহার সশর শরাসন ছেদনপূর্ব্বক মৰ্ম্মভেদী সুতীক্ষ্ণ দশ শরে তাঁহার কলেবর বিদ্ধ করিলেন। মহাপ্রতাপশালী সত্যজিৎ সত্বর অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া দ্রোণের উপর কঙ্কপত্রযুক্ত ত্রিংশৎ শর নিক্ষেপ করিলেন। পাণ্ডবগণ দ্রোণাচার্য্যকে সত্যজিৎকর্তৃক আক্রান্ত দেখিয়া হৃষ্ট চিত্তে বীরনাদ ও বসন কম্পন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় মহাবীর বৃক ক্রোধভরে দ্রোণের বক্ষঃস্থলে ষষ্টি বাণ বিদ্ধ করিলেন। উহা অদ্ভুতের ন্যায় প্রতীয়মান হইল। এইরূপে মহারথ দ্রোণ শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া ক্রোধে নেত্রদ্বয় উদ্বর্তনপূর্ব্বক মহাবেগে সত্যজিৎ ও বৃকের শরাসন ছেদন করিয়া ছয় বাণে সারথি ও অশ্বসমুদায় সমভিব্যাহারে তাঁহাকে সংহার করিলেন। তখন মহাবীর সত্যজিৎ সত্বরে অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক দ্রোণাচার্য্যের এবং তাঁহার অশ্বসমুদায়, সারথি ও ধ্বজের উপর নিশিত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণ সমরে সত্যজিতের প্রহার সহ্য করিতে না পারিয়া তাঁহার বধের নিমিত্ত সত্বরে অশ্ব, ধ্বজ, শরাসনমুষ্টি এবং পার্শনী পাফি সারথিদ্বয়ের উপর শরনিকর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে দ্রোণাচার্য্য বারংবার শরাসন ছেদন করাতে মহাবীর সত্যজিৎ ক্রোধভরে দ্রোণের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিতে লাগিলেন। বীরবরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য সংগ্রামে সত্যজিৎকে তাদৃশ প্রভাবসম্পন্ন দেখিয়া ক্রোধভরে অর্দ্ধচন্দ্র বাণে তাঁহার মস্তক ছেদন করিলেন।

সত্যজিৎ নিহত দেখিয়া যুধিষ্ঠিরের পলায়ন।

এইরূপে মহারথ সত্যজিৎ নিহত হইলে মহারাজ যুধিষ্ঠির দ্রোণের ভয়ে ভীত হইয়া মহাবেগে পলায়ন করিতে লাগিলেন। পাঞ্চাল, কেকয়, মৎস্য, চেদি, করুষ ও কোশলগণ যুধিষ্ঠিরের রক্ষার্থ দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। হুতাশন যেমন তুলারাশি দহন করে, তদ্রূপ মহাবীর দ্রোণাচার্য্য যুধিষ্ঠিরকে আক্রমণ করিবার বাসনায় সেই সমাগত সৈন্যগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। তখন মৎস্যরাজের কনিষ্ঠ ভ্রাতা মহাবীর শতানিক দ্রোণকে বারংবার সৈন্য সংহার করিতে নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার সমীপে আগমনপূর্ব্বক দুষ্কর কর্ম সম্পাদনের বাসনায় কর্মার পরিমার্জিত সূর্যরশ্মিসমপ্রভ ছয় বাণে তাঁহাকে, তাঁহার সারথিকে ও অশ্বসমুদায়কে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করত পুনরায় দ্রোণের উপর শরবর্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সত্বরে ক্ষুরপ্র নিক্ষেপ করিয়া শতানিকের কুণ্ডল সুশোভিত মস্তক ছেদন করিলেন। মৎস্যগণ তদ্দর্শনে ভীত হইয়া পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল।

মহাবীর দ্রোণাচার্য্য এইরূপে মৎস্যগণকে পরাজয় করিয়া চেদি, করুষ, কৈকেয়, পাঞ্চাল, সৃঞ্জয় ও পাণ্ডব সৈন্যগণকে বারংবার পরাজয় করিতে লাগিলেন। সৃঞ্জয়গণ ক্রোধান্বিত মহাবীর দ্রোণাচার্য্যকে হুতাশনের বনদহনের ন্যায় সৈন্যগণকে সংহার করিতে দেখিয়া সত্বরে সুসজ্জিত হইতে লাগিল। অমিত্রনিহন্তা মহাবীর দ্রোণাচার্য্যের শরাসন নিঃস্বন চতুৰ্দ্দিকে শ্রুত হইল। তাঁহার হস্তবিনিক্ষিপ্ত সায়কসমুদায় অসংখ্য অশ্ব, হস্তী, রথ ও পদাতিগণকে সংহার করিল। গ্রীষ্মকালে প্রবল বায়ুবেগে সঞ্চালিত জলধরপটল যেমন শিলাবৃষ্টি করে, তদ্রূপ মহাধনুর্দ্ধর, মহাবাহু মিত্রগণের অভয়প্রদ মহাবীর দ্রোণ শরবর্ষণপূর্ব্বক ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তাঁহার হেমমণ্ডিত শরাসন অগ্রমধ্যস্থিত বিদ্যুতের ন্যায় চতুর্দিকে দৃষ্ট হইতে লাগিল। তাঁহার ধ্বজস্থিত বেদী হিমবানের শৃঙ্গের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। সুরাসুর-নমস্কৃত মহাপ্রভাবশালী বিষ্ণু যেমন দানবদল দলন করিয়াছিলেন, তদ্রূপ মহাবীর দ্রোণাচার্য্য পাণ্ডবসেনাগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। মহাপ্রাজ্ঞ, সত্য-পরক্রম, দ্রোণাচার্য্যের অস্ত্রপ্রভাবে রণস্থলে অসংখ্য শৃগাল, কুকুর, ক্রব্যাদ্ ও পিশিতাশনগণে সংকীর্ণ মানবকুলাপহারিণী', ভীরুজনভয়প্রদা শমনসদনগামিনী নদী প্রবাহিত হইল; কবচ-সমুদায় তরঙ্গস্বরূপ, ধ্বজসমুদায় আবর্ত্তস্বরাপ, গজ ও বাজিসমুদায় গ্রাহস্বরূপ, অসিসকল মীনস্বরূপ, বীরগণের অস্থিসকল কর্করস্বরূপ, ভেরী ও মুরজসমুদায় কচ্ছপস্বরূপ, চৰ্ম্ম ও বৰ্ম্মসকল প্লবস্বরূপ, কেশকলাপ শৈবাল ও শাম্বলস্বরূপ, শরসমুদায় বেগস্বরূপ, শরাসনসকল স্রোেতঃস্বরূপ, বাহুসকল পল্লবস্বরূপ, নিহত নরগণের মস্তকসকল শিলাস্বরূপ উরুসকল মীনস্বরূপ, গদাসকল উড়প'স্বরূপ, উষ্ণীষনিচয় ফেনস্বরূপ, অস্ত্রসমুদায় সরীসৃপস্বরূপ, মাংস ও শোণিতরাশি কর্দমস্বরূপ কেতুসকল বৃক্ষস্বরূপ ও সাদিগণ তাহার নক্রস্বরূপ হইয়া শোভা পাইতে লাগিল।

তখন পাণ্ডুনন্দনগণ অন্যান্য বীরগণ সমভিব্যাহারে দ্রোণ কৃতান্তের ন্যায় সৈন্যগণকে সংহার করিতেছেন নিরীক্ষণপূর্ব্বক চতুর্দিক হইতে তাঁহার অভিমুখীন হইয়া সেই ভুবনতপন দিনকরসদৃশ প্রতাপশালী মহাবীরকে নিবারণ করিতে আরম্ভকরিলেন। কৌরবপক্ষ রাজা ও রাজপুত্রগণ তদ্দর্শনে সকলে সমবেত হইয়া দ্রোণের রক্ষার্থ তাঁহার চতুর্দিক পরিবেষ্টন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর শিখণ্ডী পাঁচ, ক্ষত্রবৰ্ম্মা বিংশতি, বসুদান পাঁচ, উত্তমৌজাঃ তিন, ক্ষত্রদেব পাঁচ, সাত্যকি শত, যুধামন্যু আট, যুধিষ্ঠির দ্বাদশ, ধৃষ্টদ্যুম্ন দশ ও চেকিতান তিন বাণে দ্রোণকে বিদ্ধ করিলেন।

মহাবীর দ্রোণাচার্য্য বীরগণের বাণাঘাতে মত্তমাতঙ্গের ন্যায় ক্রুদ্ধ হইয়া রথসৈন্য অতিক্রমণপূর্ব্বক দৃঢ়সেনকে নিপাতিত করিলেন। পরে সহসা ভূপতি ক্ষেমের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নয় শরে বিদ্ধ করাতে তিনি তৎক্ষণাৎ নিহত হইয়া রথ হইতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন অন্যের অরক্ষণীয় মহাবীর দ্রোণ চতুৰ্দ্দিক্ বিচরণপূর্ব্বক সৈন্য-গণের মধ্যস্থলে সমুপস্থিত অন্যান্য বীরগণকে রক্ষা করিতে লাগিলেন। ঐ মহাবীর শিখণ্ডীকে দ্বাদশ, উত্তমৌজাকে বিংশতি শরে বিদ্ধ করিয়া ভল্লদ্বারা বসুদানকে সংহার করিলেন। অনন্তর অশীতি শরে ক্ষেমবৰ্ম্মকে ও ষডুবিংশতি শরে সুদক্ষিণকে বিদ্ধ এবং ভল্লদ্বারা ক্ষত্রদেবকে রথ হইতে নিপাতিত করিয়া যুধামন্যুর উপর চতুঃষষ্টি ও সাত্যকির উপর ত্রিশ বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক সত্বরে যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহারাজ ধৰ্ম্মনন্দন সত্বরে বেগবান্ অশ্বসমুদায় সঞ্চালনপূর্ব্বক দ্রোণের সমীপ হইতে প্রস্থান করিলেন।

ঐ সময় মহাবীর পাঞ্চালতনয় দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলে মহাবাহু দ্রোণ তাঁহাকে শরাসন, অশ্বগণ ও সারথির সহিত অবিলম্বে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। মহাবীর পাঞ্চাল-নন্দন দ্রোণের শরে নিহত হইয়া আকাশমণ্ডল হইতে পতিত জ্যোতির ন্যায় রথ হইতে নিপাতিত হইলেন। এইরূপে সেই - পাঞ্চালতনয় নিহত হইলে চতুর্দিকে দ্রোণকে সংহার কর, দ্রোণকে সংহার কর, বলিয়া শব্দ হইতে লাগিল। তখন মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণ সাতিশয় ক্রুদ্ধ পাঞ্চাল, মৎস্য, কৈকেয়, সৃঞ্জয় - ও পাণ্ডবগণকে বিক্ষোভিত করিতে আরম্ভ করিলেন। তৎকালে সাত্যকি, চেকিতান, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, বার্দ্ধক্ষেমি, চৈত্রসেনি, সেনাবিন্দু ও সুবর্চ্চাঃ এবং অন্যান্য বহুসংখ্যক বীরগণ কৌরব-গণ সমবেত দ্রোণের নিকট পরাজিত হইলেন। হে মহারাজ। এইরূপে কৌরবগণ জয়লাভ করিয়া পলায়মান পাণ্ডবসৈন্য-গণকে সংহার করিতে লাগিল। যেমন দানবগণ ইন্দ্রের নিকট পরাজিত হইয়া কম্পিত হইয়াছিল, তদ্রূপ পাঞ্চাল, মৎস্য ও কৈকেয়গণ দ্রোণের নিকট পরাভূত হইয়া কম্পিত হইল।

পাণ্ডবদিগের পরাজয়ে কৌরবদিগের উল্লাস।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সমুদায় পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণকে সংগ্রামে পরাজুখ করিলে কে তাঁহার অভিমুখীন হইয়াছিলেন? কি আশ্চর্য্য! তৎকালে কৃতজ্ঞ, সত্যনিরত, দুর্য্যোধন হিতৈষী, চিত্রযোধী, মহাধনুর্দ্ধর, শত্রুকুলের ভয়বর্দ্ধন, জন্তমাণ ব্যাঘ্রসদৃশ, মদস্রাবী মাতঙ্গসম দ্রোণাচার্য্য জীবিতাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে কোন বীরই ক্ষত্রিয়গণের যশস্কর কাপরুষবর্গের অসেবিত, শ্রেষ্ঠ পুরুষ-দিগের সেবিত, সমরাভিলাষে সমুত্তেজিত হইয়া তাঁহার সম্মুখীন দ্ধ হইতে পারিল না। বল কোন্ কোন্ বীর সমরে সমুদ্যত হইয়াছিলেন?

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! কৌরবগণ পাঞ্চাল, পাণ্ডব, মৎস্য, সৃঞ্জয়, চেদি ও কৈকেয়গণ সমুদ্রবেগে পরিচালিত প্রবসমুদায়ের ন্যায় দ্রোণের শরাঘাতে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া পলায়ন করিতেছে দেখিয়া সিংহনাদ ও বিবিধ বাদ্য বাদন করত বিপক্ষ পক্ষের রথ, হস্তী ও নরগণকে নিবারিত করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সৈন্যগণমধ্যস্থিত স্বজনপরিবৃত মহারাজ দুর্য্যোধন বিপক্ষ পক্ষের সৈন্যগণকে তদবস্থ দর্শন করিয়া হৃষ্টচিত্তে হাস্য করিয়া কর্ণকে কহিতে লাগিলেন, হে রাধেয়। ঐ দেখ, দ্রোণ সায়কাভূত পাঞ্চালগণ সিংহ সন্ত্রাসিত মৃগযুথের ন্যায় একান্ত বিত্রাসিত হইয়াছে। বৃক্ষসমূহ যেমন বায়ুবেগে ভগ্ন হয় তদ্রূপ উহারা দ্রোণশরে ভগ্ন হইয়াছে; বোধ হয় আর সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইবে না। ঐ দেখ অসংখ্য সৈন্য মহাত্মা দ্রোণের রুক্মপুঙ্খশরের আঘাতে পলায়নে অসমর্থ হইয়া ইতস্ততঃ ঘূর্ণায়মান হইতেছে। ঐ দেখ, হস্তিযূথ যেমন হুতাশনদ্বারা নিরুদ্ধ হইয়া মণ্ডলীভূত হয়, তদ্রূপ বহু সংখ্যক সৈন্য মহাবীর দ্রোণ ও কৌরবপক্ষ অন্যান্য বীরগণকর্তৃক নিরুদ্ধ হইয়া মণ্ডলীভূত হইয়াছে। ঐ দেখ অনেকে দ্রোণের ভ্রমরসদৃশ নিশিত সায়কে বিদ্ধ ও পলায়নপর হইয়া পরস্পর মিলিত হইতেছে। ঐ দেখ, ক্রোধপরায়ণ ভীমসেন পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণকর্তৃক পরিত্যক্ত ও কৌরব-যোদ্ধৃগণে পরিবৃত হইয়া আমাকে আহ্লাদিত করিতেছে। ঐ দুরাত্মা আজি সমুদায় লোক দ্রোণময় দেখিতেছে এবং জীবন-রাজ্যের আশা পরিত্যাগ করিয়াছে।

কর্ণ কহিলেন, হে কুরুরাজ! মহাবাহু ভীমসেন জীবন থাকিতে কদাপি সংগ্রাম পরিত্যাগ করিবেন না। এই সমুদায় সিংহনাদও তাঁহার সহ্য হইবে না; আর বলবীর্য্যসম্পন্ন, রণদুৰ্ম্মদ, শিক্ষিতাস্ত্র পাণ্ডবগণ যে সহসা সংগ্রামে পরাজিত হইবেন, ইহাও সম্ভবপর নয়। উহারা বিষ, অগ্নি, দ্যূত ও বনবাসের ক্লেশ স্মরণ করিয়া কদাচ সংগ্রাম পরিত্যাগ করিবেন না। অমিততেজাঃ মহাবাহু বৃকোদর সংগ্রামে প্রত্যাগত হইতেছেন, অবশ্যই প্রধান প্রধান রথিগণকে সংহার করিবেন। উহার অসি, শরাসন, শক্তি, হস্তী, অশ্ব, পদাতি ও লৌহদণ্ড প্রভাবে এক এক বারে অসংখ্য সৈন্য নিহত হইবে। মহাবীর সাত্যকি প্রমুখ রথীসমুদায় এবং পাঞ্চাল, কৈকেয়, মৎস্য ও পাণ্ডবগণ ভীমসেনের অনুবর্তী হইয়াছেন। ইহারা সকলেই মহাবীর মহাবল পরাক্রান্ত ও মহারথ; বিশেষতঃ অমর্ষপরায়ণ মহাবীর বৃকোদর ক্রোধভরে উহাদিগকে সংগ্রামে প্রেরণ করিয়াছেন। মেঘমণ্ডল যেমন সূর্য্যকে পরিবৃত করে, তদ্রূপ উক্ত বীরগণ ভীমসেনকে পরিবেষ্টনপূর্ব্বক চতুর্দিক হইতে দ্রোণের প্রতি ধাবমান হইতেছেন। যেমন মুমূর্ষু পতঙ্গগণ দীপের উপর নিপতিত হয়, তদ্রূপ উক্ত বীরগণ একাগ্র মনে জীবিতনিরপেক্ষ হইয়া অরক্ষিত দ্রোণাচার্য্যকে নিপীড়িত করিবেন। উঁহারা সকলেই কৃতাস্ত্র; সুতরাং দ্রোণকে নিবারণ করা উহাদের দুঃসাধ্য হইবে না। আমার মতে আজি দ্রোণের উপর অতি ভার পতিত হইয়াছে; অতএব তাঁহার সমীপে ত্বরায় গমন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। যেমন বৃকগণ মহাগজকে সংহার করে, তদ্রূপ পাণ্ডবপক্ষ যোদ্ধৃগণ সমবেত হইয়া যেন মহাবীর দ্রোণকে বিনাশ করিতে না পারে।

মহারাজ দুর্য্যোধন কর্ণের বাক্য শ্রবণ করিয়া ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। ঐ সময় এইমাত্র দ্রোণবধাভিলাষী, নানা বর্ণের অশ্বসমুদায় যোজিত রথে সমারূঢ় পাণ্ডবগণের ঘোরতর নিনাদ হইতে লাগিল।

দ্রোণাভিমুখীন পাণ্ডবগণের নানাবিধ বর্ণের অশ্বযোজিত রথযাত্রা বর্ণন।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! ভীমসেন প্রভৃতি যে যে মহাবীর ক্রোধভরে দ্রোণের অভিমুখীন হইয়াছিলেন, তাঁহাদের সকলের রথচিহ্নসমুদায় কীর্তন কর।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর বৃকোদর ঋষ্যবর্ণ অশ্বযোজিত রথে আরোহণ করিয়া সংগ্রামস্থলে সমুপস্থিত হইলে, মহাবীর সাত্যকি রজত বর্ণ অশ্বযোজিত রথে আরোহণ-পূর্ব্বক ধাবমান হইলেন। তখন দুষ্পধর্ষ যুধামন্যু ক্রোধভরে সারঙ্গ' বর্ণ অশ্বযোজিত রথে ও পাঞ্চালরাজতনয় মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন মহাবেগশালী সুবর্ণমণ্ডিত, পারাবত বর্ণ অশ্বসংযোজিত রথে আরোহণ করিয়া সংগ্রামস্থলে গমন করিতে লাগিলেন। ধৃষ্টদ্যুম্নের তনয় মহাবীর ক্ষত্রধৰ্ম্মা স্বীয় পিতার রক্ষা ও সিদ্ধি লাভের নিমিত্ত রক্তবর্ণ হয় যোজিত রথে আরূঢ় হইয়া ধাবমান হইলেন। শিখণ্ডীনন্দন মহাবাহু ক্ষত্রদেব স্বয়ং পদ্মপত্রসন্নিভ, মল্লিকাসদৃশাক্ষ' অশ্বসমুদায় চালনপূর্ব্বক সংগ্রামে গমন করিতে লাগিলেন। শুক্লপক্ষ বিভূষিত কাম্বোজ দেশীয়, দর্শনীয় অশ্বগণ নকুলকে বহন করত কৌরবসমুদায়ের প্রতি ধাবমান হইল। মেঘসদৃশ হয়গণ উত্তমৌজাকে বহন করত তুমুল সংগ্রামে গমন করিতে লাগিল। তিত্তিরবর্ণ বায়ুবেগগামী অশ্বগণ উদ্যতায়ুধ মহাবীর সহদেবকে তুমুল সংগ্রামে সমুপস্থিত করিল। দন্তসবর্ণ, কৃষ্ণকেশরযুক্ত মহাবেগ অশ্বগণ মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বহন করিতে লাগিল। সৈন্যগণ সুবর্ণভূষণ বিভূষিত বায়ুবেগগামী হয়সমুদায়ে সমারূঢ় হইয়া ধর্মরাজের অনুগমন করিল। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ সুবর্ণমণ্ডিত ও যুধিষ্ঠিরের অনুগামী সৈন্যগণ অভিরক্ষিত হইয়া যুধিষ্ঠিরের পশ্চাৎ সংগ্রামে গমন করিলেন। মহাধনুর্দ্ধর শান্তভী সর্ব্বশব্দসহ', দিব্যাভরণভূষিত অশ্বসমুদায়ে সংযোজিত রথে অধিরূঢ় হইয়া ভূপতিগণের মধ্যে অবস্থান করিতে লাগিলেন। মৎস্যরাজ বিরাট মহারথগণ-সমভিব্যাহারে সান্তভীর পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। কৈকেয়গণ, মহাবীর শিখণ্ডী ও ধৃষ্টকেতু স্ব স্ব সৈন্য লইয়া বিরাটের অনুগমন করিতে লাগিলেন। পাটলপুষ্প বর্ণ অশ্বগণ অরাতিনিপাতন মহারাজ মৎস্যরাজকে বহন করত নিরতিশয় শোভা ধারণ করিল। হরিদ্রা বর্ণ, হেমমালা বিভূষিত বেগশালী অশ্বগণ বিরাটরাজের পুত্রকে বহন করিতে লাগিল। সুবর্ণ বর্ণ হেমমালা বিভূষিত, যুদ্ধবিশারদব লোহিত ধ্বজসম্পন্ন, বৰ্ম্মিত দেহ, কৈকয়দেশীয় পঞ্চ ভ্রাতা ইন্দ্রগোপসবর্ণ অশ্বসংযুক্ত রথে আরোহণ করিয়া বারিবর্ষণকারী জীমূতের' ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। আমপাত্রবর্ণ, তুম্বুরু-কর্তৃক প্রদত্ত দিব্য অশ্বগণ অমিততেজাঃ দ্রুপদতনয় শিখণ্ডীকে বহন করিতে লাগিল। পাঞ্চাল দেশীয় দ্বাদশ সহস্র মহারথ যুদ্ধার্থ নির্গত হইলেন। তাহাদের মধ্যে ষট্ সহস্র শিখণ্ডীর অনুগমন করিলেন। সারঙ্গ বর্ণ অশ্বসমুদায় শিশুপালের তনয়কে বহন করিতে লাগিল। চেদীশ্বর মহাবীর ধৃষ্টকেতু অসংখ্য সৈন্য-সমভিব্যাহারে কাম্বোজদেশীয় অশ্বসংযুক্ত রথে আরোহণ করিয়া সংগ্রামে গমন করিলেন। পলালধূমসদৃশ, সুকুমার সিন্ধুদেশীয় অশ্বগণ কৈকেয় বৃহৎক্ষেত্রকে বহন করিতে লাগিল। মল্লিকা-সদৃশাক্ষ, পদ্মবর্ণ দিব্যাভরণভূষিত বাহ্লিজ অশ্বগণ শিখণ্ডীর পুত্র ক্ষত্রদেবকে বহন করিতে লাগিল। স্বর্ণালঙ্কারসম্পন্ন, কৌশেয় ও সবর্ণ ধীরস্বভাব অশ্বগণ অরাতিনিপাতন সেনাবিন্দুকে বহন করিল। ক্রোঞ্চবর্ণ উৎকৃষ্ট হয়গণ সুকুমার মহারথ, কাশিরাজ- তনয়ের বাহন হইল। সারথির প্রীতিকর শ্বেতবর্ণ, কৃষ্ণগ্রীব, বায়ুবেগগামী অশ্বগণ প্রতিবিন্ধ্যকে বহন করিতে লাগিল। মহাবীর অর্জুন সোমের নিকট যে পুত্রটিকে যাজ্ঞা করিয়াছিলেন, সেই সুতসোম মাষ পুষ্পসবর্ণ অশ্বগণকর্তৃক বাহিত হইয়া সংগ্রামে গমন করিলেন। হে মহারাজ! অর্জুনের ঐ পুত্রটি কৌরবদিগের উদয়েন্দু নামক পুরে জন্মগ্রহণ করিয়া সহস্র সোমসদৃশ প্রভাসম্পন্ন ও সোমকসভামধ্যে খ্যাত হইয়াছেন বলিয়া উহার নাম সুতসোম হইয়াছে।

হে মহারাজ! তরুণাদিত্যসঙ্কাশ, শালপুষ্পসন্নিভ অশ্বগণ শতানীককে, কাঞ্চনসদৃশ যোব্রুসম্পন্ন ময়ূরগ্রীবাসবর্ণ অশ্বগণ শ্রুতকৰ্ম্মাকে ও স্বর্ণচাতকপক্ষসন্নিভ হয়সমুদায় পার্থতুল্য শ্রুতনিধি শ্রুতকীর্ত্তিকে সংগ্রামে বহন করিতে লাগিল। সংগ্রামে যাহার প্রভাব কৃষ্ণ ও অর্জুনের প্রভাব অপেক্ষা সার্দ্ধৈকগুণ' অধিক, সেই মহাবীর অভিমন্যু পিঙ্গল বর্ণ অশ্বগণকর্তৃক বাহিত হইলেন। আপনার শত পুত্রের মধ্যে যিনি একাকী সোদরগণকে পরিত্যাগ করিয়া পাণ্ডবগণের নিকট গমন করিযাছেন, সেই মহাবীর যুযুৎসু মহাকায় অশ্বগণকর্তৃক বাহিত হইয়া সংগ্রামে গমন করিলেন। পলালকাণ্ড সবর্ণ দিব্যাভরণ ভূষিত বেগবান্ অশ্বগণ বার্দ্ধক্ষমিকে বহন করিতে লাগিল। সুবর্ণ পত্রযুক্ত বৰ্ম্মভূষিত, সারথির আজ্ঞাবহ, কৃষ্ণপাদ অশ্বগণ কুমার সৌচিত্তিকে বহন করিল। সুবর্ণমণ্ডিতপৃষ্ঠ, সুবর্ণমালাবিভূষিত, শান্ত প্রকৃতি কৌশেয় সদৃশ অশ্বগণ শ্রেণীমানের বাহন হইল। অরুণবর্ণ অশ্বগণ ধনুর্ব্বেদ ও ব্রাহ্ম' বেদপারগ সত্যধৃতিকে বহন করিতে লাগিল। যিনি সংগ্রামস্থলে দ্রোণাচার্য্যের মস্তকছেদন করিয়াছিলেন, সেই পাঞ্চাল সেনানী ধৃষ্টদ্যুম্ন পারাবতসবর্ণ অশ্বযোজিত রথে আরোহণ করিয়া সংগ্রামে গমন করিলেন। মহাবীর সত্যধৃতি সৌচিত্তি, শ্রেণীমান্ বসুদান ও কাশিরাজের পুত্র বিভূ বেগশালী কাম্বোজ দেশীয় হেমমালা বিভূষিত অশ্বসমুদায় লইয়া শত্রুসৈন্যগণকে বিত্রাসিত করত ধৃষ্টদ্যুম্নের অনুগমন করিতে লাগিলেন। হেমমণ্ডিত নানা বর্ণের অশ্ব ও ধ্বজসম্পন্ন বিতত কাৰ্ম্মক কাম্বোজ দেশীয় প্রভদ্রকগণ শরজালে অরাতিসৈন্যগণকে বিকম্পিত করত ধৃষ্টদ্যুম্নের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইল। পিঙ্গল কৌশেয় বর্ণ, সুবর্ণ মালাধারী, অম্লানচিত্ত অশ্বগণ চেকিতানকে বহন করিতে লাগিল। সব্যসাচীর মাতুল, কুন্তিভোজ পুরুজিৎ ইন্দ্রায়ুধ সবর্ণ হয়োত্তম যোজিত রথে আরোহণ করিয়া সংগ্রামে গমন করিলেন। তারকাপুঞ্জ বিচিত্রিত নভোমণ্ডলসদৃশ অশ্বগণ মহারাজ রোচমানকে বহন করিতে লাগিল। লোহিতবর্ণ অশ্বগণ গোপতির পুত্র পাঞ্চাল দেশীয় সিংহসেনকে বহন করিল। পাঞ্চালগণের মধ্যে যিনি - জনমেজয় নামে বিখ্যাত, সেই মহাত্মা সর্ষপপুষ্পসবর্ণ অশ্বসমুদায়ে যোজিত রথে আরোহণপূর্ব্বক সংগ্রামে গমন করিলেন। মহাবেগশালী, হেমমালা বিভূষিত, মাষবর্ণ, দধিপৃষ্ঠ', চন্দ্রমুখ অশ্বসমুদায় পাঞ্চালকে বহন করিতে লাগিল। শরস্তম্ব-সদৃশ, পরকিঞ্জল্ক-বর্ণ, মহাবলপরাক্রান্ত অশ্বসমুদায় দণ্ডধারকে বহন করিল। অরুণবর্ণ মূষিকসবর্ণপৃষ্ঠ অশ্বগণ ব্যাঘ্রদত্তের বাহন হইল। বিচিত্র কৃষ্ণবর্ণ, চিত্রমাল্যবিভূষিত অশ্বগণ পাঞ্চাল দেশীয় সুধন্বাকে বহন করিতে লাগিল। অশনিসমস্পর্শ, ইন্দ্রগোপসন্নিভ, বিচিত্রগতি, চিত্র অশ্বগণ চিত্রায়ুধের বাহন হইল। চক্রবাক্-সদৃশোদর, হেমমালাধারী অশ্বগণ কোশলাধিপতি পুত্র সুক্ষত্রকে বহন করিল। বিচিত্রবর্ণ, সুবর্ণমালামণ্ডিত, অত্যুচ্চ অশ্বগণ সমরনিপুণ, সত্যধৃতি ক্ষেমিকে বহন করিতে লাগিল। মহাবীর শুক্ল শুক্লবর্ণ ধ্বজ, কবচ, ধনুঃ ও অশ্বসমুদায় লইয়া সংগ্রামে অভিমুখীন হইলেন। সমুদ্রসম্ভূত, শশাঙ্কসদৃশ অশ্বগণ সমুদ্রসেনের পুত্র মহাতেজাঃ চন্দ্রসেনকে বহন করিতে লাগিল। নীলোৎপলসন্নিভ, সুবর্ণবিভূষিত, চিত্রমাল্যধারী অশ্বগণ চিত্ররথের বাহন হইল। কলায়পুষ্পসবর্ণ, শ্বেত ও লোহিত রেখায় অঙ্কিত অশ্বগণ রণদুৰ্ম্মদ রথসেনকে বহন করিতে লাগিল। লোকে যাহাকে সমুদায় মনুষ্য অপেক্ষা শৌর্য্যসম্পন্ন বলিয়া থাকে, সেই পটচ্চরনিহন্তা মহাবীর, শুক্লবর্ণ হয়-সংযোজিত রথে আরোহণ করিয়া সমরে গমন করিলেন। কিংশুকসবর্ণ অশ্বগণ চিত্রমাল্য, বিচিত্রবৰ্ম্ম, বিচিত্র আয়ুধ ও বিচিত্র ধ্বজসম্পন্ন চিত্রায়ুধকে বহন করিতে লাগিল। মহাবীর নীল নীলবর্ণ ধ্বজ, কবচ, ধনুঃ ও অশ্বসমুদায় লইয়া সংগ্রামে গমন করিলেন। মহাবীর চিত্র বিচিত্র রত্নচিহ্নসম্পন্ন বরূথ, রথ, ধ্বজ ও শরাসন এবং বিচিত্র অশ্ব, ধ্বজ ও পতাকা লইয়া সমরে গমনোন্মুখ হইলেন। পুষ্করবর্ণ অশ্বগণ রোচমানের পুত্র হেমবর্ণকে বহন করিতে লাগিল। সমরকুশল, শীঘ্রগামী কুক্কুটাঙ্গ সবর্ণ, শ্বেতাশ্বযুক্ত, শোভন অশ্বগণ দণ্ডকেতুকে বহন করিতে আরম্ভ করিল।

পিতা কৃষ্ণের হস্তে নিহত, পাণ্ডবগণের কপাট ভগ্ন ও বন্ধুগণ পলায়িত হইলে যিনি ভীষ্ম, দ্রোণ ও পরশুরামের নিকট অস্ত্র শিক্ষা করিয়া অস্ত্রবিদ্যায় রুক্সি, কর্ণ, অর্জুন ও কৃষ্ণের সমান হইয়া দ্বারকাপুরী উচ্ছিন্ন ও সমুদায় ভূমণ্ডল পরাজিত করিতে বাসনা করিয়াছিলেন, অনন্তর যিনি হিতচিকীর্ষু, প্রাজ্ঞ সুহৃদ্গণের নিবারণে বৈরনির্য্যাতন হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া এক্ষণে স্বীয় রাজ্য শাসন করিতেছেন, সেই পাণ্ড্যাধিপতি সারঙ্গধ্বজ বৈদূর্য্যজাল সংছন্ন, চন্দ্ররশ্মিসন্নিভ অশ্বসমুদায় লইয়া স্বীয় বাহুবলপ্রভাবে দিব্য শরাসন বিস্ফারণপূর্ব্বক দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। বাসকপুষ্পসবর্ণ অশ্বগণ পাণ্ড্যের অনুযায়ী চতুৰ্দ্দশ অযুত রথীকে বহন করিতে লাগিল। নানাবর্ণযুক্ত নানাবিধমুখ অশ্বগণ মহাবীর ঘটোৎকচকে বহন করিল। যিনি সমুদায় কৌরবগণের মত ও স্বীয় অভিলষিত দ্রব্যজাত পরিত্যাগ করিয়া ভক্তিসহকারে একাকী যুধিষ্ঠিরকে আশ্রয় করিয়াছিলেন, সেই মহাবাহু লোহিতনয়ন বৃহন্ত, মহাবল পরাক্রান্ত মহাকায় অশ্বগণ সংযোজিত সুবর্ণময় স্যন্দনে আরোহণপূর্ব্বক সমরে গমন করিলেন। সুবর্ণবর্ণ অত্যুৎকৃষ্ট অশ্বগণ চতুর্দিক হইতে রথিশ্রেষ্ঠ ধর্মজ্ঞ যুধিষ্ঠিরের অনুগমন করিতে লাগিল। দেবরূপী প্রভদ্রকগণ নানাবর্ণের অশ্বসমুদায় লইয়া সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইল। ঐ সমুদায় বীরগণ ভীমসেনের সহিত সমবেত হইয়া ইন্দ্র-সমবেত সুরগণের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। উহারা পাঞ্চাল-তনয় ধৃষ্টদ্যুম্নের সবিশেষ মনোনীত হইয়াছিল।

হে মহারাজ! ঐ সময় দ্রোণাচার্য্য সমুদায় সৈন্যগণকে অতিক্রম করিয়া শোভা পাইতে লাগিলেন। তাঁহার ধ্বজদণ্ডা-গ্রস্থিত কৃষ্ণাজিন ও সুবর্ণময় কমণ্ডলু সাতিশয় শোভা পাইতে লাগিল। মহাবীর ভীমসেনের বৈদূর্য্যমণি নির্মিত লোচনসম্পন্ন মহাসিংহধ্বজ অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিল। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সুবর্ণনির্মিত গ্রহগণপরিবৃত চন্দ্রধ্বজ সাতিশয় শোভমান হইল। উহার ধ্বজে নন্দ ও উপনন্দ নামে দুই বিপুল মৃদঙ্গ যন্ত্রসহকারে সুমধুর স্বরে বাদিত হইয়া হর্ষবর্দ্ধন করিতেছিল। মহাবীর নকুলের ধ্বজে অতি ভীষণ অত্যুগ্র সুবর্ণপৃষ্ঠ শরভ দৃষ্ট হইতে লাগিল। মহাবাহু সহদেবের ধ্বজে শত্রুগণের শোকবর্দ্ধন, ঘণ্টা ও পতাকাযুক্ত, দুর্দ্ধর্য হংস সাতিশয় শোভমান হইল। দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্রের পঞ্চ ধ্বজে ধর্ম, পবন, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের প্রতিমূর্ত্তি শোভা পাইতে লাগিল। কুমার অভিমন্যুর রথে তপ্ত কাঞ্চন বিনিৰ্ম্মিত শার্সপক্ষীসনাথ দৃষ্ট হইল, মহাবীর ঘটোৎকচের ধ্বজে গৃধ শোভা পাইতে লাগিল এবং পূর্ব্বে যেমন রাবণের অশ্বগণ কামচারী ছিল, ঘটোৎকচের অশ্বগণও সেইরূপ কামচারী বোধ হইল।

মহারাজ যুধিষ্ঠির দিব্য মাহেন্দ্র ধনুঃ ও ভীমসেন বায়ব্য শরাসন গ্রহণ করিলেন। ভগবান্ ব্রহ্মা ত্রৈলোক্য রক্ষার নিমিত্ত যে শরাসন নির্মাণ করিয়াছিলেন, মহাবীর ধনঞ্জয় সেই দিব্য অজেয় গাণ্ডীব গ্রহণ করিয়া সংগ্রামে অভিমুখীন হইলেন। মহাবীর নকুল বৈষ্ণব শরাসন, সহদেব আশ্বিন' শরাসন, ঘটোৎকচ অতি ভীষণ পৌলস্ত্য শরাসন এবং দ্রৌপদীর পাঁচপুত্র রৌদ্র', আগ্নেয়', কৌবের্য্য, যাম্য ও গিরিশ ধনুঃ গ্রহণ করিয়া সমরে গমন করিলেন। রোহিণীতনয় বলভদ্র যে রৌদ্র ধনুঃ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তুষ্ট হইয়া সেই ধনুঃ অভিমন্যুকে প্রদান করেন। অর্জুনতনয় সেই শরাসন লইয়া সংগ্রামে ধাবমান হইলেন।

হে মহারাজ! যে সমুদায় ধ্বজের বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিলাম, তদ্ভিন্ন মহাবীরগণের অন্যান্য অসংখ্য হেমমণ্ডিত, অরাতিগণের ভয়াবহ ধ্বজসকল দৃষ্ট হইতে লাগিল। তৎকালে সেই সুরগণপরিবৃত, ধ্বজসঙ্কুল কাপুরুষশূন্য দ্রোণসৈন্য চিত্রার্পিতের ন্যায় বোধ হইল। স্বয়ংবর স্থল সদৃশ সেই সমরাঙ্গণে দ্রোণের প্রতি ধাবমান বীরগণের কেবল নাম গোত্র শ্রবণগোচর হইতে লাগিল।

ধৃতরাষ্ট্রের পূর্ব্বোক্ত ভবিতব্য স্মরণে স্বীয় পুত্রের প্রতি খেদোক্তি ও পুনঃ সমর-বৃত্তান্ত শ্রবণেচ্ছা।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! সংগ্রামস্থলস্থিত বৃকোদর সমবেত উক্ত ভূপতিগণ দেবতাদিগের সৈন্যগণকেও ব্যথিত করিতে পারেন। পুরুষ অদৃষ্টসংযুক্ত হইয়া জন্মপরিগ্রহ করিয়া থাকে, সুতরাং তাহার অভিলষিত বিষয়সকল অন্য প্রকার দৃষ্ট হয়। দেখ, পাণ্ডবতনয় যুধিষ্ঠির দীর্ঘকাল অরণ্যে বাস ও লোকের অজ্ঞাতে বিচরণ করিয়া এক্ষণে সংগ্রামের নিমিত্ত এই মহতী সেনা সংগ্রহ করিয়াছে; আমার পুত্রের দুরদৃষ্ট ব্যতীত ইহার আর কারণ কি? নিশ্চয় বোধ হইতেছে, মনুষ্য অদৃষ্টযুক্ত হইয়াই জন্মগ্রহণ করে, সুতরাং তাহাকে অদৃষ্টের অধীন হইয়া চলিতে হয়; তন্নিমিত্তই সে আপনার ইচ্ছানুসারে সমুদায় কার্য্যসম্পন্ন করিতে পারে না। যুধিষ্ঠির দ্যূতব্যসনপ্রভাবে যৎপরোনাস্তি ক্লেশিত হইয়াছিল, এক্ষণে আপনার অদৃষ্টবলে সহায়সম্পন্ন হইয়াছে। কেকয়, কৌশিক, কোশল, চেদি ও বঙ্গদেশীয়গণ এক্ষণে আমাদের পক্ষ আশ্রয় করিয়াছে। দুরাত্মা দুর্য্যোধন পূর্ব্বে আমাকে কহিয়াছিল যে, পৃথিবীর অধিকাংশই আমার অধীন; যুধিষ্ঠিরের অতি অল্প মাত্র। কিন্তু দুরদৃষ্টের কি অনির্বচনীয় প্রভাব। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য আমাদের অসংখ্য সৈন্যকর্তৃক সুরক্ষিত হইয়াও ধৃষ্টদ্যুম্নের হস্তে নিহত হইলেন; সতত যুদ্ধাকাঙ্ক্ষী, সর্ব্বাস্ত্রপারগ মহাবীর দ্রোণ ভূপতিগণের মধ্যে কিরূপে মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন? হে সঞ্জয়। ভীষ্ম ও দ্রোণের নিধনবার্তা শ্রবণে আমার মহৎ কৃষ্ণ' ও মোহ সমুপস্থিত হইয়াছে! ক্ষণমাত্রও জীবিত থাকিতে বাসনা নাই। পূর্ব্বে মহামতি বিদুর আমাকে পুত্রলোলুপ দেখিয়া যাহা কহিয়াছিলেন, দুরাত্মা দুর্য্যোধনের দুর্মন্ত্রণাপ্রভাবে তৎসমুদায় ঘটিয়াছে। এক্ষণে যদি দুর্য্যোধনকে পরিত্যাগ করিয়া অবশিষ্ট পুত্রগণকে রক্ষা করি, তাহা হইলে কিছুমাত্র নৃশংস ব্যবহার হয় না এবং সকলকেও পরিত্যাগ করিতে হয় না। যে ভূপতি ধৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া অর্থপর হন, তাঁহাকে অবশ্যই ইহলোকে হীন ও ক্ষুদ্র-ভাবাপন্ন হইতে হয়। হে সঞ্জয়! যখন বীরবরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য নিহত হইয়াছেন, তখন এই হতোৎসাহ রাজ্যের আর নিস্তার নাই। আমরা যে পুরুষোত্তমদ্বয়ের প্রভাবে জীবন ধারণ করিতেছিলাম, সেই ধুরন্ধর দ্বয় যখন নিহত হইয়াছেন, তখন আর কিরূপে আমাদের পরিত্রাণ হইবে?

যাহা হউক, এক্ষণে যেরূপে যুদ্ধ হইয়াছিল, তাহা সবিশেব কীর্তন কর। কোন্ কোন্ বীর যুদ্ধ করিয়াছিল? কে কে আক্রমণ করিয়াছিল আর কোন্ কোন্ ক্ষুদ্রাশয়েরা পলায়ন করিয়াছিল? হে সঞ্জয়। মহাবীর ধনঞ্জয় যাহা করিয়াছিলেন, তৎসমুদায় কীর্ত্তন কর। ঐ মহাবীর ও বৃকোদরই আমার মহাভয়ের কারণ। পাণ্ডবগণ সমরে প্রবৃত্ত হইলে আমাদের সৈন্যগণ কিরূপে দারুণ সংগ্রাম করিয়াছিল? পাণ্ডবেরা সংগ্রাম আরম্ভ করিলে তোমাদিগের মনঃ কিরূপ হইয়াছিল? এবং আমাদের পক্ষীয় কোন্ কোন্ বীর পাণ্ডব সৈন্যগণকে নিবারণ করিয়াছিল?

উভয় পক্ষীয় বীরগণের তুমুল সংগ্রাম-বৃত্তান্ত বর্ণন।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! পাণ্ডবগণ সমরক্ষেত্রে গমন করিয়া দ্রোণাচার্য্যকে মেঘাচ্ছাদিত দিবাকরের ন্যায় সমাচ্ছন্ন - করিলে আমাদের পক্ষে মহাসঙ্কট সমুপস্থিত হইল। পাণ্ডবসৈন্য-এ সমুত্থিত ধূলিপটলপ্রভাবে কৌরবপক্ষগণ আবৃত হওয়াতে আমরা দ্রোণকে অবলোকন না করিয়া মৃত বলিয়া স্থির করিলাম। ঐ সময় মহারাজ দুর্য্যোধন পাণ্ডবসৈন্যগণকে দুষ্কর ক্রুরকর্মে প্রবৃত্ত দেখিয়া আপনার সৈন্যগণকে সংগ্রামে প্রেরণ-পূর্ব্বক কহিলেন, হে সেনাগণ। তোমরা মহোৎসাহ সহকারে সাধ্যানুসারে পাণ্ডবসৈন্যগণকে নিবারিত কর। তখন আপনার তনয় মহাবীর দুর্মূর্ষণ দূর হইতে ভীমসেনকে দেখিয়া দ্রোণের জীবনরক্ষামানসে ভীমের উপর অসংখ্য বাণ নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। সাক্ষাৎ মৃত্যুতুল্য ক্রোধান্বিত মহাবীর দুর্মূর্ষণ যেমন ভীমের উপর বাণ নিক্ষেপ করিলেন, মহাবীর বৃকোদরও তদ্রূপ দুৰ্ম্মর্ষণের উপর শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাঁহাদের দুইজনের ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল।

এদিকে অন্যান্য রণপ্রাজ্ঞ মহাবীরগণ আপনাদের প্রভু-কর্তৃক সমাদিষ্ট হইয়া রাজ্য ও মৃত্যুভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক শত্রু-গণকে আক্রমণ করিতে আরম্ভ করিল। সমরোন্মত্ত মহাবীর কৃতবর্মা মত্তবারণবিক্রান্ত সাত্যকিকে, সিন্ধুরাজ ক্ষত্রবর্মাকে ও উগ্রধন্বা মহেম্বাসকে শরনিকরদ্বারা দ্রোণাভিমুখ হইতে নিবারিত করিলেন। ক্ষত্রবর্মা সিন্ধুপতির ধ্বজ ও কাৰ্ম্মক ছেদ করিয়া ক্রোধভরে দশ নারাচদ্বারা তাঁহার সমুদায় মৰ্ম্মস্থান তাড়িত করিতে লাগিলেন। তখন সিন্ধুরাজ সত্বরে অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া লৌহময় শরদ্বারা ক্ষত্রবর্মাকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর সুবাহু পাণ্ডবগণের হিতার্থ সংগ্রামে যতমান স্বীয় ভ্রাতা মহারথ যুযুৎসুকে দ্রোণাচার্য্যের নিকট হইতে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর যুযুৎসু সুশাণিত ক্ষুরপ্রদ্বয়ে সুবাহুর ধনুর্ব্বাণ সুশোভিত বাহুযুগল ছেদন করিলেন। বেলা যেমন সমুদ্রের বেগ প্রতিরোধ করে, তদ্রূপ মদ্ররাজ পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। ধর্মরাজ মদ্ররাজের উপর অসংখ্য মর্মভেদী বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মদ্রাধিপতি ধর্মরাজকে চতুঃষষ্টি শরে বিদ্ধ করিয়া উচ্চস্বরে চীৎকার করিতে লাগিলেন। ধর্মরাজ মদ্ররাজের চীৎকার শ্রবণে যৎপরোনাস্তি ক্রুদ্ধ হইয়া দুই ক্ষুরপ্রদ্বারা তাঁহার ধ্বজ ও শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহারাজ বাহীক অসংখ্য সেনা সমবেত হইয়া মহতী সেনা পরিবৃত মহারাজ দ্রুপদকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। মদস্রাবী মহাযূথাধিপতি মাতঙ্গযুগলের ন্যায় অসংখ্য সৈন্যপরিবৃত উক্ত বৃদ্ধ ভূপতিদ্বয়ের ঘোরতর সংগ্রাম হইল। পূর্ব্বে ইন্দ্র ও অগ্নি যেমন বলিকে বাণবিদ্ধ করিয়াছিলেন, তদ্রূপ অবন্তীদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ মৎস্যাধিগতি বিরাটকে শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মৎস্য ও কৈকেয়গণের যুদ্ধ সুরাসুর সংগ্রামের - ন্যায় অতি ভীষণ হইয়া উঠিল।

নকুলনন্দন শতানীক শরনিকর নিক্ষেপ করত দ্রোণা-ভিমুখে গমন করিতেছিলেন; সভাপতি ভূতকৰ্ম্মা তাঁহাকে নিবারণ করিলেন। তখন নকুলনন্দন ক্রোধভরে তিন সুশাণিত ভল্ল পরিত্যাগ করিয়া ভূতকর্মার বাহুযুগল ও মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর বিবিংশতি দ্রোণাভিমুখে ধাবমান বল-বিক্রমশালী সুতসোমকে নিবারণ করিলেন। তখন সুতসোম ক্রোধভরে অজিহ্মগ শরনিকরদ্বারা স্বীয় পিতৃব্য বিবিংশতিকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীমরথ সুনিশিত লৌহময় শরনিকর বর্ষণ করিয়া শাল্ব এবং তাঁহার সারথি ও অশ্বগণকে সংহার করিলেন। মহাবীর চিত্রসেনের পুত্র ময়ূরসদৃশ অশ্ব-সংযুক্ত রথারূঢ়, সমরাঙ্গণে ধাবমান, মহাবাহু শ্রুতকৰ্ম্মাকে নিবারণ করিলেন। হে মহারাজ! আপনার উক্ত পৌত্রদ্বয় স্ব স্ব পিতৃকুলের হিতসাধনার্থ পরস্পর নিধন-বাসনায় ঘোরতর সংগ্রাম করিতে লাগিলেন। সিংহলাঙ্গুলধ্বজ মহাবাহু অশ্বত্থামা পিতার নাম রক্ষার্থ বিবিধ শর নিক্ষেপপূর্ব্বক সমরাঙ্গনস্থ প্রতিবিন্ধ্যকে নিবারণ করিলে মহাবীর প্রতিবিন্ধ্য ক্রোধভরে তাঁহাকে বাণ বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন কৃষক যেমন বীজকালে ক্ষেত্রে বীজ বপন করে, তদ্রূপ দ্রৌপদীতনয়গণ অশ্বত্থামার উপর শরবর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর অর্জুনকুমার শ্রুতকীর্তি যুদ্ধার্থ দ্রোণাভিমুখে গমন করিতেছিলেন দেখিয়া দুঃশাসনতনয় তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। অর্জুনসদৃশ বলবিক্রমশালী অর্জুনতনয় সুশাণিত তিন ভল্লদ্বারা দুঃশাসননন্দনের শরাসন, ধ্বজ ও সারথির মস্তক ছেদন করিয়া দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। হে মহারাজ। উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণই যাঁহাকে বীরপ্রধান বলিয়া গণনা করে, মহাবীর লক্ষ্মণ সেই পটচ্চরহন্তাকে নিবারণ করিলেন। তখন পটচ্চরনিহস্তা ক্রোধভরে লক্ষ্মণের শরাসন ও ধ্বজ ছেদন করিয়া তাঁহার উপর শরজাল বর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাপ্রাজ্ঞ যুবা বিকর্ণ সমরে ধাবমান যজ্ঞসেনতনয় শিখণ্ডীকে নিবারণ করিলে তিনি বিকর্ণের উপর বাণবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। মহাবীর বিকর্ণ অনায়াসে শিখণ্ডীনিক্ষিপ্ত শরসমুদায় নিরাকৃত করিলেন। মহাবাহু উত্তমৌজাঃ দ্রোণের প্রতি ধাবমান হইয়াছিলেন; মহাবীর অঙ্গদ শরনিকর নিক্ষেপ করত তাঁহাকে নিবারণ করিলেন। উক্ত বীরদ্বয়ের সংগ্রাম তুমুল হইয়া উঠিল। তদ্দর্শনে সমুদায় সৈন্য-গণের আনন্দের আর পরিসীমা রহিল না।

মহাধনুর্দ্ধর দুর্মুখ দ্রোণাভিমুখে ধাবমান মহাবীর পুরু জিৎকে বৎসদন্তদ্বারা নিবারণ করিলেন। মহাবাহু পুরুজিৎ ক্রোধভরে দুম্মুখের ভ্রূদ্বয়ের মধ্যে নারাচ নিক্ষেপ করিলে দুর্মুখের মুখমণ্ডল সুনালপঙ্কজের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। মহাবীর কর্ণ দ্রোণাভিমুখে ধাবমান লোহিতধ্বজ কেকয়দেশীয় পঞ্চ ভ্রাতাকে শরনিকরদ্বারা নিবারণ করিলেন। তাঁহারা কর্ণের শরাঘাতে নিতান্ত সন্তপ্ত হইয়া তাঁহার উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। কর্ণ তাঁহাদিগকে বারংবার শরজালে সমাচ্ছাদিত করিলেন। তৎকালে কর্ণ ও কেকয়দেশীয় পঞ্চ ভ্রাতা পরস্পরের শরজালে পরস্পর অশ্ব, সারথি ও ধ্বজের সহিত অদৃশ্য হইলেন। হে মহারাজ! আপনার তিন পুত্র দুর্জয়, জয় ও বিজয়; নীল, কাশ্য ও জয়ৎসেন এই তিন বীরকে নিবারণ করিলেন। সিংহ, ব্যাঘ্র ও তরক্ষুর সহিত ভল্লুক, মহিষ ও বৃষভের যেমন সংগ্রাম হয়, তদ্রূপ আপনার তিন পুত্রের সহিত উক্ত বীরত্রয়ের ঘোরতর যুদ্ধ দেখিয়া দর্শকগণের আনন্দের পরিসীমা রহিল না। ক্ষেমধূর্তি ও বৃহন্ত দুই ভ্রাতা দ্রোণাভিমুখে ধাবমান সাত্ত্বতকে তীক্ষ্ণ শরনিকরে ক্ষত-বিক্ষত করিলেন। অরণ্যে সিংহের সহিত মত্ত মাতঙ্গদ্বয়ের যেরূপ সংগ্রাম হয়, সাত্ত্বতের সহিত উক্ত ভ্রাতৃদ্বয়ের তদ্রূপ অদ্ভুত যুদ্ধ হইতে লাগিল। ক্রোধপরায়ণ চেদিরাজ অসংখ্য শরনিক্ষেপ করিয়া যুদ্ধাভিনন্দী' অন্বষ্ঠরাজকে দ্রোণের নিকট হইতে নিবারণ করিতে লগিলেন। তখন মহারাজ অন্বষ্ঠ অস্থিভেদিনী শলাকাদ্বারা চেদিরাজকে বিদ্ধ করিলে, চেদিরাজ অম্বষ্ঠের দারুণ প্রহারে একান্ত ব্যথিত হইয়া সশর শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক রথ হইতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। শারদ্বত কৃপ ক্ষুদ্রকসমুদায়দ্বারা ক্রোধপরবশ বার্দ্ধক্ষেমিকে নিবারিত করিলেন। হে মহারাজ! চিত্রযোধী রণমদমত্ত কৃপ ও বার্দ্ধক্ষেমিকে যে যে ব্যক্তি নিরীক্ষণ করিতেছিল, তাহারা সকলেই যুদ্ধাসক্তচিত্ত ও অনন্যমতি হইয়া কার্য্যান্তরবিমূঢ়' হইয়া উঠিল।

মহাবীর সোমদত্তি দ্রোণের যশোবর্দ্ধনপূর্ব্বক মহারাজ মণিমাকে নিবারিত করিয়া সত্বরে তাঁহার শরাসন, ধ্বজ, পতাকা, ছত্র ও সারথিকে রথ হইতে পাতিত করিলেন। তখন অরাতি-নিপাতন যুপকেতু মণিমান্ সত্বরে রথ হইতে লম্ফ প্রদান করিয়া খড়াদ্বারা সোমদত্তির অশ্ব, ধ্বজ, রথ ও সারথিকে ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং সত্বরে আপনার রথে আরোহণপূর্ব্বক অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া স্বয়ং অশ্বচালন করত পাণ্ডবপক্ষ সেনা-গণকে প্রহার করিতে লাগিলেন। মহাবীর বৃষসেন অসুরবধার্থ ধাবমান সুররাজ পুরন্দরসদৃশ পাণ্ড্যকে শরনিকরদ্বারা নিবারণ করিলেন।

মহাবীর ঘটোৎকচ গদা, পরিঘ, খড়া, পট্টিশ, আয়োধন, প্লব, মুষল, মুদ্গর, চক্র, ভিন্দিপাল, পরশু, পাংশু, বায়ু, অগ্নি, সলিল, ভস্ম, লোষ্ট্র, তৃণ ও বৃক্ষসমুদায়দ্বারা সেনাগণকে রুগ্ন, ভগ্ন্যবিনষ্ট, বিদ্রাবিত, বিক্ষিপ্ত ও ভীষিত করিয়া দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন রাক্ষসাগ্রগণ্য অলম্বুষ ক্রুদ্ধচিত্তে নানা অস্ত্র শস্ত্র নিক্ষেপ ও নানাবিধ যুদ্ধ প্রদর্শন করিয়া হিড়িম্বাতনয়কে প্রহার করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বে সম্বর ও ইন্দ্রের যেরূপ সংগ্রাম হইয়াছিল, এক্ষণে উক্ত রাক্ষসদ্বয়ের তদ্রূপ সংগ্রাম হইতে লাগিল।

হে মহারাজ! এইরূপে শত শত রথ, গজারোহী, অশ্বারোহী ও পদাতিগণ ঘোরতর সংগ্রাম করিতে আরম্ভ করিল। ফলতঃ দ্রোণবধের নিমিত্ত তৎকালে যাদৃশ যুদ্ধ হইয়াছিল, সেরূপ সংগ্রাম পূর্ব্বে আর কখন দৃষ্ট হয় নাই। ঐ সময় চতুৰ্দ্দিকে কেবল নানাবিধ ঘোরতর বিচিত্র অতি ভীষণ সংগ্রাম দৃষ্ট হইতে লাগিল।

ভীমের সহিত দুর্য্যোধনের যুদ্ধ ও দুর্য্যোধনের যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! এইরূপে সৈন্যগণ সমর ক্ষেত্রে গমনপূর্ব্বক অংশক্রমে পরস্পরকে আক্রমণ করিলে পর পাণ্ডব পক্ষ ও অস্মৎপক্ষ বীরগণ কিরূপে যুদ্ধ করিয়া-ছিলেন? মহাবীর ধনঞ্জয় সংশপ্তকগণকে কিরূপে আক্রমণ করিলেন? সংশপ্তকেরাই বা তাঁহার সহিত কিরূপ সংগ্রাম করিল?

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! সৈন্যগণ উক্ত প্রকারে সংগ্ৰামাসক্ত হইয়া অংশক্রমে পরস্পরকে আক্রমণ করিলে আপনার পুত্র দুর্য্যোধন স্বয়ং গজসৈন্য লইয়া মহাবীর বৃকোদরের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। মাতঙ্গ যেমন মাতঙ্গকে আক্রমণ করে, বৃষ যেমন বৃষকে আক্রমণ করে, তদ্রূপ মহাবীর দুর্য্যোধন ভীমসেনকে আক্রমণ করিলে সংগ্রামনিপুণ অসাধারণ বাহু বীর্য্যশালী মহাবীর পবনতনয় ক্রোধভরে গজসৈন্যের প্রতি ধাবমান হইয়া অচিরাৎ কুঞ্জরগণকে নিপাতিত করিতে লাগিলেন। পর্ব্বতাকার মাতঙ্গগণ ভীমসেনের নারাচপ্রহারে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া মদক্ষরণ করত ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে আরম্ভকরিল। প্রবল বায়ুবেগে জলধর যেমন ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যায়, তদ্রূপ গজানীকসকল ভীমসেনের প্রহারে শ্রেণীভঙ্গ করিয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইল। সূর্য্য সমুদিত হইয়া যেমন ভূমণ্ডলে কিরণজাল বিকীর্ণ করেন, তদ্রূপ মহাবীর ভীমসেন করিকুলের উপর শরজাল নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। করিগণ ভীমসেনের শরাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত ও রুধিরাক্ত কলেবর হইয়া সূর্যকিরণ-সম্পৃক্ত নভোমণ্ডলস্থ ধারাধরপুঞ্জের ন্যায় শোভা ধারণ করিল।

মহারাজ দুর্য্যোধন এইরূপে ভীমসেনকে করিকুল সংহার করিতে দেখিয়া ক্রোধভরে তাঁহার উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর ক্রোধে লোহিত নেত্র হইয়া অচিরাৎ দুর্য্যোধনকে সংহার করিবার মানসে তাঁহার শরীরে নিশিত সায়কসমুদায় বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবাহু দুর্য্যোধন ভীমশরে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ হইয়া ক্রোধভরে তাঁহার উপর সূর্য্যকিরণসদৃশ নারাচ নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন সত্বরে দুই ভল্লদ্বারা দুর্য্যোধনের ধ্বজস্থিত মণিময় রত্নখচিত নাগ ও তাঁহার হস্তস্থিত কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন।

ঐ সময় ম্লেচ্ছ অঙ্গাধিপতি দুর্য্যোধনকে ভীমকর্তৃক নিতান্ত পীড়িত নিরীক্ষণ করিয়া গজারোহণপূর্ব্বক তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইলেন। মহারীর ভীমসেন অঙ্গাধিপতির মাতঙ্গকে মেঘের ন্যায় গর্জন করত আগমন করিতে দেখিয়া তাহার কুম্ভান্তরে নিশিত নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। ভীমনিক্ষিপ্ত নারাচ কুঞ্জরের কলেবর ভেদ করিয়া ভূতলে প্রবেশ করিল; হস্তীও বজ্রাহত পর্ব্বতের ন্যায় ধরাতলে নিপতিত হইল। হস্তী নিপতিত হইবামাত্র অঙ্গরাজ ভূতলে পতিত হইতেছিলেন; ইত্যবসরে লঘুহস্ত বৃকোদর ভল্লদ্বারা তাঁহার মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর অঙ্গরাজ নিহত হইলে সৈন্যগণ চতুৰ্দ্দিকে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। অশ্ব, হস্তী ও রথীসকল সসম্ভ্রমে ইতস্ততঃ ধাবমান হইয়া অসংখ্য পদাতির প্রাণ সংহার করিতে লাগিল।

ভীমের সহিত ভগদত্তর সংগ্রাম ও ভীমাদির যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন।

এইরূপে সৈন্যগণ রণে ভগ্ন হইয়া চতুর্দিকে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলে প্রাগজ্যোতিষেশ্বর ভগদত্ত কুঞ্জর লইরা ভীমের প্রতি ধাবমান হইলেন। ক্রোধে ব্যাবৃত্তলোচন সেই 'গজরাজ চরণদ্বয় উৎক্ষিপ্ত ও শুণ্ড সংহত করিয়া ভীমকে দগ্ধ করত যেন তাঁহার সমীপে গমনপূর্ব্বক এক কালে রথ ও অশ্বগণকে চূর্ণ করিয়া ফেলিল। মহাবীর ভীমসেন অঞ্জলিকাবেধ বিদ্যা জানিতেন, এই নিমিত্ত পলায়ন না করিয়া পাদচারে ধাবমান হইয়া সেই করিরাজের গাত্রে বিলীন হইলেন। এইরূপে ভীমসেন গজের গাত্রের অভ্যন্তরে থাকিয়া করদ্বারা তাহাকে প্রহার করিতে লাগিলেন। নাগ ভীমসেনের ভীষণ আঘাতে কুলালচক্রের ন্যায় ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিল। তখন অযুত নাগ তুল্য বলশালী মহাবীর বৃকোদর হস্তীর কলেবর হইতে বহির্গত হইয়া তাহার সম্মুখীন হইলেন। নাগরাজ অবসর পাইয়া শুশুদ্বারা ভীমের গ্রীবা আক্রমণ ও জানুদ্বারা তাঁহাকে নিপাতনপূর্ব্বক তাঁহার প্রাণসংহার করিতে সমুদ্যত হইল। তখন মহাবীর বৃকোদর অবিলম্বে মোেটন'দ্বারা করিবরের করবেষ্টন' ও মোচনপূর্ব্বক পুনরায় তাহার গাত্রে প্রবেশ করিয়া স্বপক্ষ হস্তীর আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে পুনরায় তাহার গাত্র হইতে বহির্গত হইয়া মহাবেগে গমন করিলেন। এদিকে, সমুদায় সৈন্যগণ, হা ধিক্! ভীমসেন কুঞ্জর-কর্তৃক হত হইলেন, বলিয়া ঘোরতর চীৎকার করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবসৈন্যগণ হস্তীর ভয়ে ভীত হইয়া বৃকোদরের সমীপে ধাবমান হইল।

এদিকে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বৃকোদরকে নিহত জ্ঞান করিয়া ধৃষ্টদ্যুম্ন-সমভিব্যাহারে ভগদত্তের সমীপে সমাগত হইয়া অসংখ্য রথদ্বারা তাঁহাকে পরিবেষ্টনপূর্ব্বক সহস্র সহস্র তীক্ষ্ণ শরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভগদত্ত অঙ্কুশদ্বারা বিপক্ষ বিনির্মুক্ত শরনিকর নিরাকৃত করিয়া গজদ্বারা পাণ্ডব ও পাঞ্চাল সৈন্য-গণকে আক্রমণ করিলেন। আমরা বৃদ্ধ ভগদত্তকে রণস্থলে অসঙ্কুচিত চিত্তে কুঞ্জর চালন করিতে দেখিয়া আশ্চর্য্যান্বিত হইলাম। তখন মহারাজ দশার্ণাধিপতি বক্রগামী মহাবেগশালী মদস্রাবী মাতঙ্গ লইয়া ভগদত্তের প্রতি ধাবমান হইলেন। পূর্ব্বে সবৃক্ষ পর্ব্বতদ্বয়ের যেরূপ সংগ্রাম হইত, এক্ষণে উক্ত বীরদ্বয়ের কুঞ্জরযুগল তদ্রূপ যুদ্ধ করিতে লাগিল। ভগদত্তের হস্তী মহাবেগে অপাবৃত্ত' হইয়া দশার্ণাধিপতির হস্তীর পার্শ্ব ভেদ করিয়া তাহাকে নিহত করিল। তখন মহাবীর ভগদত্ত অবসর পাইয়া সূর্যরশ্মিসঙ্কাশ সাত তোমর নিক্ষেপপূর্ব্বক স্বীয় শত্রু দশার্ণাধিপতিকে হস্তীর উপরেই সংহার করিলেন।

তখন মহারাজ যুধিষ্ঠির অসংখ্য রথসৈন্যদ্বারা ভগদত্তকে চতুর্দিকে পরিবেষ্টন করিলেন। কুঞ্জরস্থিত মহাবীর ভগদত্ত রথিগণকর্তৃক চারিদিকে পরিবেষ্টিত হইয়া পর্ব্বতোপরি বনমধ্যস্থ প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। রথিগণ চতুর্দিকে মণ্ডলাকারে অবস্থান করিয়া শরজাল নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলে মহাবীর ভগদত্ত গজ লইয়া অসঙ্কুচিত চিত্তে তাঁহাদের মধ্যে অবস্থান করিতে লাগিলেন। অনন্তর সমর-বিশারদ প্রাগজ্যোতিষেশ্বর ভগদত্ত সাত্যকির রথাভিমুখে সেই মহাগজ প্রেরণ করিলেন। করিবর সাত্যকির রথ গ্রহণপূর্ব্বক বেগে নিক্ষেপ করিবামাত্র সাত্যকি লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক রথ হইতে ভূতলে নিপতিত হইয়া পলায়ন করিতে লাগিলেন। তাঁহার সারথিও বৃহৎকায় সিন্ধুদেশীয় অশ্বগণকে পরিত্যাগ-পূর্ব্বক তাঁহার অনুগামী হইল। ঐ অবসরে হস্তী রথমণ্ডল হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া সমুদায় ভূপতিগণকে নিক্ষেপ করিতে লাগিল। ভূপতিগণ সেই আশুগামী নাগকর্তৃক বিত্রাসিত হইয়া তাহাকে শত শত' বলিয়া জ্ঞান করিতে লাগিলেন।

এইরূপে গজারোহী মহাবাহু ভগদত্ত পাণ্ডব ও পাঞ্চাল সৈন্যগণকে সংহার করিতে আরম্ভ করিলে তাহারা রণে ভগ্ন হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। পলায়নকালে গজ ও তুরঙ্গম-গণের ঘোরতর শব্দ হইতে আরম্ভ হইল। তখন মহাবীর বৃকোদর পুনরায় ভগদত্তাভিমুখে ধাবমান হইলে ভগদত্তের হস্তী শুগুবিনির্মুক্ত বারিদ্বারা ভীমের বাহনগণকে বিত্রাসিত করিতে লাগিল। বাহনসকল মহাবীর ভীমকে লইয়া প্রস্থান করিল।

তখন কৃতির পুত্র রুচিপর্ব্বা রথে আরোহণ করিয়া শর বর্ষণ করিতে করিতে সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় ভীমসেনের পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। পৰ্ব্বতপতি সুবর্চ্চাঃ আনতপর্ব্ব শরদ্বারা তাঁহাকে যমালয়ে প্রেরণ করিলেন। মহাবীর রুচিপর্ব্বা রূণে নিপতিত হইলে মহাবীর অভিমন্যু, দ্রৌপদীতনয়গণ, চেকিতান, ধৃষ্টকেতু ও যুযুৎসু হস্তীকে নিহত করিবার বাসনায় ভীষণ ধ্বনি করত বৃষ্টিধারার ন্যায় শরজাল নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে ব্যথিত করিতে লাগিলেন। তখন সমরকুশল মহাবীর ভগদত্ত পাঞ্চি, অঙ্কুশ ও অঙ্গুষ্ঠদ্বারা হস্তীকে সঞ্চালিত করিলেন। করিবর প্রাগজ্যোতিষাধিপতিকর্তৃক সঞ্চালিত হইয়া শুণ্ড প্রসারণ এবং কর্ণ ও নেত্র স্তব্ধ করিয়া সত্বরে গমনপূর্ব্বক যুযুৎসুর বাহন-গণকে আক্রমণ ও সারথিকে সংহার করিল। মহাবীর যুযুৎসু সত্বরে রথ হইতে পলায়ন করিলেন। তখন পাণ্ডবপক্ষীয় যোদ্ধাগণ ভীষণ নিনাদ করিয়া শরনিকরদ্বারা সত্বরে নাগরাজকে বিদ্ধ, করিতে লাগিলেন। ঐ সময় আপনার পুত্র সসম্ভ্রমে অভিমন্যুর রথাভিমুখে ধাবমান হইলেন।

হে মহারাজ! মহাবীর ভগদত্ত ঐ সময় কুঞ্জরপৃষ্ঠ হইতে অরাতিকুলের উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিয়া প্রসূতকর' দিবা-করের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তখন অভিমন্যু দ্বাদশ, যুযুৎসু দশ এবং দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র ও ধৃষ্টকেতু তিন তিন শরে ভগদত্তের হস্তীকে বিদ্ধ করিলেন। করিবর বীরগণকর্তৃক অতি প্রযত্নসহকারে শরবিদ্ধ হইয়া সূর্যকিরণ সম্পৃক্ত জলধরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। অনন্তর নিয়ন্তাকর্তৃক সঞ্চালিত হইয়া স্বীয় সব্যাপসব্যস্থিত সৈন্যগণকে ইতস্ততঃ নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিল। গোপাল বনমধ্যে দণ্ডদ্বারা যেমন পশুগণকে তাড়িত করে, তদ্রূপ মহাবীর ভগদত্ত পাণ্ডবসৈন্য-গণকে বারংবার তাড়িত করিতে লাগিলেন। তখন পাণ্ডবসৈন্য-গণ শ্যেনকর্তৃক আক্রান্ত বায়সগণের ন্যায় চীৎকার করিয়া মহাবেগে ধাবমান হইল।

হে মহারাজ! ঐ সময় ভগদত্তের মহাগজ অঙ্কুশাহত হইয়া সপক্ষ পর্ব্বতের ন্যায় মহাবেগে গমন করিতে লাগিল। বণিক্সণ আপনাদের উভয় পার্শ্বে সমুদ্রতরঙ্গ দেখিয়া যেরূপ ভীত হয়, অরাতি পক্ষীয় সৈন্যগণ সেই মহাগজ সন্দর্শনে তদ্রূপ বিত্রাসিত হইয়া উঠিল। মহাভয়ে পলায়মান হস্তী, অশ্ব, রথ ও পার্থিবগণের চীৎকারে ভূমণ্ডল, আকাশমণ্ডল ও সমুদায় দিগমণ্ডল পরিপূর্ণ হইল। পূর্ব্বে দানবরাজ বিরোচন যেমন সুরক্ষিত দেবসেনামধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন, তদ্রূপ মহাবীর ভগদত্ত সেই মহানাগ লইয়া শত্রুসৈন্যগণের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। পার্থিব ধূলিপটল বায়ুবেগে গগনমণ্ডলে সমুত্থিত হইয়া সৈন্যগণকে সমাচ্ছাদিত করিল। তত্রস্থ মনুষ্যগণ সেই , এক গজকে চতুর্দিকে ধাবমান অসংখ্য গজ বলিয়া বোধ করিতে লাগিল।

অর্জুনের সহিত সংশপ্তকগণের সংগ্রাম ও সংশপ্তক বিনাশ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। আপনি আমাকে অর্জুনের সমর দক্ষতার বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, অতএব মহাবাহু ধনঞ্জয় যাহা করিয়াছেন, শ্রবণ করুন। মহাবীর ভগদত্ত সংগ্রাম-স্থলে ভয়ঙ্কর কার্য্য করিতে আরম্ভ করিলে মহাবীর ধনঞ্জয় সমন্ধুত ধূলিপটল দর্শন ও মানবগণের কোলাহল শ্রবণ করিয়া কৃষ্ণকে কহিলেন, হে মধুসূদন! মহারাজ ভগদত্ত গজ লইয়া সত্বরে নিষ্ক্রান্ত হওয়াতেই এই ঘোরতর নিনাদ উত্থিত হইতেছে। মহাবীর ভগদত্ত গজযানবিশারদ ও পুরন্দরসদৃশ; উনি এই ভূমণ্ডলে গজযোধীদিগের প্রধান; উহার গজের প্রতিগজ' নাই। ঐ গজ কৃতকৰ্ম্মা', জিতক্লম' এবং অস্ত্রাঘাত ও অগ্নিস্পর্শ সহিষ্ণু। অস্ত্রদ্বারা উহাকে বধ করা দুঃসাধ্য। অদ্য ঐ হস্তী একাকীই সমুদায় পাণ্ডবসৈন্য সংহার করিবে। আমরা দুই জন ব্যতীত আর কেহই উহাকে নিবারণ করিতে পারিবে না; অতএব সত্বরে ভগদত্তের সমীপে গমন কর। আজি আমি হস্তীবলে গর্বিত বয়ঃপ্রভাবে প্রদীপ্ত ভগদত্তকে পুরন্দরপুরে আতিথ্য গ্রহণ করাইব। মহাত্মা বাসুদেব অর্জুনের বচনানুসারে ভগদত্তাভিমুখে রথ সঞ্চালন করিতে লাগিলেন।

মহাবীর ধনঞ্জয় ভগদত্তের সহিত সংগ্রাম করিবার বাসনায় তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইয়াছেন, এমন সময় ত্রিগত্তদেশীয় দশ সহস্র ও কৃষ্ণের পূর্ব্বানুচর চারি সহস্র মহারথ, এই চতুৰ্দ্দশ সহস্র সংশপ্তক তাঁহাকে সংগ্রামার্থ আহ্বান করিতে লাগিল। এদিকে ভগদত্ত সৈন্যগণকে সংহার করিতেছে; ওদিকে সংশপ্তকগণ যুদ্ধার্থ আহ্বান করিতেছে; এই উভয় সঙ্কট সমুপস্থিত হওয়াতে মহাত্মা ধনঞ্জয়ের চিত্ত দোলার ন্যায় দুই দিকে ধাবমান হইতে লাগিল। কি করি। এই স্থান হইতে প্রতিনিবৃত্ত হই অথবা যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করি, এই চিন্তা করিয়া মহাবীর ধনঞ্জয় নিতান্ত ব্যাকুল হইলেন। পরিশেষে বহুক্ষণ বিবেচনা করিয়া একাকী বহু সহস্র সংশপ্তকগণকে সংহার করিতে কৃতনিশ্চয় হইয়া তাহাদের অভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। মহাবীর দুর্য্যোধন ও কর্ণ অর্জুনের বধ সাধনার্থই দুই দিকে সংগ্রাম সমুপস্থিত করিয়াছিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় সংশপ্তকবধে কৃতনিশ্চয় হইয়া তাঁহাদের সে আশা বিফল করিলেন।

তখন মহারথ সংশপ্তকগণ অর্জুনের উপর সহস্র সহস্র নতপর্ব্ব শর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। সংশপ্তকগণের শরজালে চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছন্ন হওয়াতে কি অর্জুন, কি কৃষ্ণ, কি অশ্বগণ, কি রথ, কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না। জনার্দ্দন সংশপ্তকগণের পরাক্রম-দর্শনে বিমুগ্ধ ও স্বেদাক্তকলেবর' হইবামাত্র অর্জুন ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপপূর্ব্বক সংশপ্তকগণকে প্রায় সংহার করিলেন। শত শত শর, শরাসন ও জ্যাসনাথ হস্ত এবং শত শত কেতু, অশ্ব, সারথি ও রথিগণ ছিন্নকলেবর হইয়া ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল। দ্রুম', অচল ও অম্বুধরতুল্য' কলেবর, সুসজ্জিত, আরোহিবিহীন, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হস্তিগণ পার্থশরে নিহত হইয়া ধরাতলশায়ী হইল। আরোহিসমেত কুঞ্জরগণ অর্জুনের শরনিকরে ছিন্নকুথ', ছিন্নাভরণ ও গতজীবন হইয়া ধরাশয্যায় শয়ন করিতে লাগিল। বীরগণ ঋষ্টি, প্রাস, অসি, মুদ্গর ও পরশু সমবেত বাহুসকল ভন্ন প্রহারে ছিন্ন হইয়া ধরাতলে পতিত হইল। বালাদিত্য', অম্বুজ' ও চন্দ্রসদৃশ নর-মস্তকসকল অর্জুনশরে ছিন্ন হইয়া ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল।

এইরূপে মহাবীর ধনঞ্জয় ক্রুদ্ধ হইয়া, শত্রুনিপাতে প্রবৃত্ত হইলে সেনাগণ প্রাণনাশক শরনিকরে সন্তাপিত হইয়া উঠিল। হস্তী যেমন পদ্মবন প্রমথিত করে, তদ্রূপ মহাবীর ধনঞ্জয় সৈন্য সংহার করিতেছেন দেখিয়া সকলেই তাঁহাকে "সাধু সাধু”, বলিয়া প্রশংসা করিতে লাগিল। মহামতি মধুসূদন অর্জুনকে ইন্দ্রসদৃশ কৰ্ম্ম করিতে দেখিয়া যৎপরোনাস্তি বিস্মিত হইয়। কৃতাঞ্জলিপুটে কহিতে লাগিলেন, হে পার্থ! অদ্য তুমি সংগ্রামস্থলে যেরূপ কার্য্য করিলে, বোধ হয়, তাহা ইন্দ্র, যম ও কুবেরেরও দুষ্কর। তুমি এককালে শত শত সহস্র সহস্র মহারথ সংশপ্তক-গণকে সংহার করিয়াছ।

মহাবীর ধনঞ্জয় এইরূপে বহুসংখ্যক সংশপ্তককে সংহার করিয়া কৃষ্ণকে ভগদত্তাভিমুখে রথচালন করিতে আদেশ করিলেন।

অর্জুনকর্তৃক সুশর্মার ভ্রাতৃগণ বিনাশ ও ভগদত্তের সহিত সংগ্রাম।

সঞ্জয় কহিলেন, "মহারাজ। মহামতি মধুসূদন অর্জুনের ইচ্ছানুসারে সুবর্ণভূষণমণ্ডিত, বায়ুবেগগামী, অশ্বগণকে দ্রোণসৈন্যাভিমুখে সঞ্চালিত করিতে লাগিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় দ্রোণ-শরাভিতাপিত' স্বীয় ভ্রাতৃগণের সাহায্যার্থ গমন করিতেছেন, এমন সময়ে মহাবীর সুশর্মা ভ্রাতৃগণ-সমভি-ব্যাহারে সংগ্রামার্থ তাঁহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। তখন ধনঞ্জয় কৃষ্ণকে কহিলেন, হে শত্রুসূদন! ঐ দেখ, সুশর্মা ভ্রাতৃগণ সমভিব্যাহারে যুদ্ধার্থ আমাকে আহ্বান করিতেছে, আবার উত্তরদিকে সৈন্যগণ দ্রোণশরে বিদীর্ণ হইতেছে। এইরূপে সংশপ্তকগণ আমার চিত্তকে দোলায়মান করিয়াছে। এক্ষণে সংশপ্তকগণকে সংহার করি অথবা অরাতিশরাদ্দিত' আত্মীয়-গণকে রক্ষা করি? এই উভয়ের কি কর্তব্য বিবেচনা করিয়া বল।

মহামতি বাসুদেব অর্জুনের বাক্য শ্রবণান্তর ত্রিগত্তা-ধিপতি সুশর্মার অভিমুখে রথ সঞ্চালন করিতে লাগিলেন। তখন রণবিশারদ ধনঞ্জয় সাত বাণে সুশর্মাকে বিদ্ধ করিয়া দুই ক্ষুরদ্বারা তাঁহার ধনুঃ ও ধ্বজ ছেদনপূর্ব্বক ছয় বাণে তাঁহার ভ্রাতৃগণকে অশ্বগণ ও সারথি-সমভিব্যাহারে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। মহাবীর সুশর্ম্মা তদ্দর্শনে ক্রোধে অধীর হইয়া অর্জুনের উপর ভীষণ ভুজঙ্গাকার অয়োময় শক্তি ও বাসুদেবের উপর তোমর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় তিন শরে সুশর্মার শক্তি ও তিন শরে তোমর ছেদনপূর্ব্বক শরনিকরদ্বারা তাঁহাকে বিমোহিত করিয়া শরজাল বর্ষণ করত গমন করিতে লাগিলেন। কৌরবসৈন্য মধ্যে কেহই তাঁহাকে নিবারিত করিতে পারিল না।

মহাবীর ধনঞ্জয় বাণদ্বারা মহারথগণকে সংহার করত কক্ষরাশিদহনদহনে'র ন্যায় গমন করিতে লাগিলেন। সৈন্যগণ অগ্নিস্পর্শ সদৃশ দারুণ অর্জুনের বেগ সহ্য করিতে নিতান্ত অসমর্থ হইল। এইরূপে মহাবীর ধনঞ্জয় শরনিকরদ্বারা সৈন্যগণকে বিদ্রাবিত করিয়া গরুড়ের ন্যায় মহাবেগে ভগদত্তাভিমুখে ধাবমান হইলেন। তৎকালে সমরবিজয়ী অর্জুন দ্যুতদেবী দুরাত্মা দুর্য্যোধনের অপরাধজনিত ক্ষত্রিয়বিনাশের নিমিত্ত নিষ্পাপ ও পাণ্ডবগণের ক্ষেমঙ্কর শত্রুগণের অশ্রুবর্দ্ধন গাণ্ডীব শরাসন ধারণ করিয়াছিলেন। কৌরবসেনাগণ পার্থশরে নিক্ষোভিত হইয়া পৰ্ব্বতসংলগ্ন নৌকার ন্যায় বিপন্ন হইল।

তখন ক্রুরমতি দশ সহস্র কৌরবসৈন্য জয় ও পরাজয়ে দৃঢ় নিশ্চয় হইয়া অক্ষুব্ধ চিত্তে অর্জুনকে আহ্বান করিতে লাগিল। সর্ব্বভারসহ মহাবীর পদ্মবন প্রবিষ্ট মাতঙ্গের ন্যায় সেই সৈন্যগণের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া তাহাদিগকে মর্দ্দন করিতে লাগিলেন। কৌরবসৈন্যগণ অর্জুনশরে প্রমথিত হইলে মহাবীর ভগদত্ত ক্রোধভরে সেই হস্তী লইয়া ধনঞ্জয়াভিমুখে ধাবমান হইলেন। নরশ্রেষ্ঠ ধনঞ্জয় রথদ্বারা তাঁহাকে আক্রমণ করিলেন। রথ ও নাগে ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। মহাবীর ভগদত্ত ও ধনঞ্জয় সুসজ্জিত গজ ও রথে আরোহণ করিয়া সংগ্রামস্থলে বিচরণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভগদত্ত মেঘসঙ্কাশ হস্তীর উপর হইতে ইন্দ্রের ন্যায় ধনঞ্জয়ের উপর শরবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিলেন। সমরবিশারদ অর্জুন শরজালদ্বারা অর্দ্ধ পথে ভগদত্তের শরনিকর নিবারণ করিয়া তাঁহার উপর বাণ নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহাবাহু প্রাগজ্যোতিষেশ্বর অনায়াসে অর্জুনের শরনিকর নিরাকৃত এবং তাঁহাকে ও কৃষ্ণকে অসংখ্য শরসমূহে বিদ্ধ করিয়া তাঁহাদিগকে সংহার করিবার মানসে হস্তী সঞ্চালন করিলেন। মহামতি জনাৰ্দ্দন ভগদত্তের হস্তীকে কালান্তক যমের ন্যায় আগমন করিতে দেখিয়া সত্বর রথ দক্ষিণ পার্শ্বস্থ করিলেন। মহারথ ধনঞ্জয় ঐ সুযোগে হস্তী ও তাহার আরোহী ভগদত্তকে পশ্চাৎ হইতে বিনষ্ট করিতে পারিতেন; কিন্তু ধর্ম স্মরণ করিয়া তাহা করিলেন না। তখন সেই মহাগজ অসংখ্য হস্তী, রথ ও অশ্বের উপর আরোহণ করিয়া তৎসমুদায় বিনষ্ট করিতে লাগিল; তদ্দর্শনে অর্জুনের ক্রোধের পরিসীমা রহিল না।

কৃষ্ণের চারিমূর্তির পরিচয় ও অর্জুনকর্তৃক ভগদত্ত বধ।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবীর ক্রোধান্বিত হইয়া ভগদত্তের কি করিলেন, আর ভগদত্তই বা তাঁহার কি করিয়াছিলেন, যথার্থ কীর্ত্তন কর।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। মহাবীর অর্জুন ও বাসুদেব ভগদত্তের সমীপে গমন করিলে তত্রত্য সমুদায় লোকই তাঁহা-দিগকে যমের দশন সন্নিহিত বলিয়া বোধ করিলেন। মহাবীর ভগদত্ত গজস্কন্ধ হইতে কৃষ্ণ ও অর্জুনের উপর অনবরত শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন এবং স্বীয় কার্ম্মক আকর্ণ আকর্ষণ করিয়া হেমপুঙ্খ শিলাশাণিত কৃষ্ণায়াস বিনির্মিত শরনিকরে দেবকীনন্দনকে বিদ্ধ করিলেন। ভগদত্তনিক্ষিপ্ত অগ্নিস্পর্শ শরনিকর দেবকীতনয়কে বিদ্ধ করিয়া ভূতলে প্রবেশ করিল। তখন মহাবীর অর্জুন ভগদত্তের শরাসন ছেদন ও রথরক্ষকে বিনাশ করিয়া তাঁহার সহিত ক্রীড়া করতই যেন সংগ্রাম করিতে লাগিলেন। রণবিশারদ ভগদত্ত অর্জুনের প্রতি চতুৰ্দ্দশ সুতীক্ষ্ণ তোমর নিক্ষেপ করিলে লঘুহস্ত সব্যসাচী ভগদত্ত নিক্ষিপ্ত প্রত্যেক তোমর তিন তিন খণ্ডে ছেদন করিয়া সুতীক্ষ্ণ শরনিকরদ্বারা তাঁহার হস্তীর বর্ম্মছেদন করিয়া ফেলিলেন। সেই মহাগজ অর্জুনের সায়কজালে ছিন্নবৰ্ম্মা ও একান্ত ব্যথিত হইয়া বারিধারাসিক্ত মেঘহীন পর্ব্বতরাজের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। তখন মহাবীর প্রাগজ্যোতিষেশ্বর কৃষ্ণের উপর লৌহময় হেমদণ্ডমণ্ডিত শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। সমরবিশারদ অর্জুন তৎক্ষণাৎ উহা দুই খণ্ডে ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং তৎপরে ভগদত্তের ছত্র ও ধ্বজ ছেদন করিয়া তাঁহাকে দশ শরে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর ভগদত্ত অর্জুনের কঙ্কনপত্রযুক্ত নিশিত শরনিকরে দৃঢ় বিদ্ধ হইয়া একান্ত ক্রুদ্ধ চিত্তে তাঁহার মস্তকে অসংখ্য তোমর নিক্ষেপ করত উচ্চস্বরে চীৎকার করিতে লাগিলেন। ভগদত্ত নিক্ষিপ্ত শরনিকরে অর্জুনের কিরীট পরিবর্তিত হইল। মহাবীর অর্জুন সেই পরিবর্তিত কিরীট যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়া ভগদত্তকে কহিলেন, প্রাগজ্যোতিষেশ্বর! এই সময় সকলকে উত্তমরূপে নিরীক্ষণ করিয়া লও।

মহাবীর ভগদত্ত অর্জুনের বাক্যে যৎপরোনাস্তি ক্রুদ্ধ হইয়া অতি ভীষণ শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহার ও কৃষ্ণের উপর অনবরত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন সমর-বিশারদ ধনঞ্জয় সত্বরে ভগদত্তের শরাসন ও তৃণীর ছেদন করিয়া দ্বিসপ্ততি শরে তাঁহার সমুদায় মৰ্ম্মস্থানে আঘাত করিলেন। মহাবীর ভগদত্ত অর্জুনের শরনিকরে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া ক্রোধভরে বৈষ্ণব অঙ্কুশ অস্ত্র অভিমন্ত্রণপূর্ব্বক অর্জুনের বক্ষঃস্থলে নিক্ষেপ করিলেন। তখন মহাত্মা মধুসূদন পার্থকে আচ্ছাদন করিয়া স্বয়ং সেই ভগদত্ত নিক্ষিপ্ত সর্ব্বঘাতী বৈষ্ণবাস্ত্র বক্ষঃস্থলে গ্রহণ করিলেন, অস্ত্র কৃষ্ণের বক্ষঃস্থলে বৈজয়ন্তী মালা হইয়া অবস্থান করিতে লাগিল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় নিতান্ত ক্লিষ্ট চিত্তে কৃষ্ণকে কহিলেন, হে মধুসূদন। তুমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে যুদ্ধ করিবে না; কেবল আমার অশ্বসংযমন করিবে; এক্ষণে সে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিলে না। যদি আমি ব্যসনাপন্ন বা অরাতিনিবারণে অশক্ত হই, তাহা হইলে যুদ্ধ করা তোমার কর্ত্তব্য; আমি বর্তমান থাকিতে সমরব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা তোমার কদাপি কর্তব্য নয়। আমি যে ধনুর্ব্বাণ ধারণ করিয়া সুর, অসুর ও মানবগণ সমবেত সমুদায় লোক পরাজিত করিতে পারি, তাহা তোমার অবিদিত নাই।

তখন মহাত্মা মধুসূদন ধনঞ্জয়কে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে পার্থ! আমি অতি গুহ্য পুরাবৃত্ত কহিতেছে, শ্রবণ কর। আমি লোকের হিতসাধন ও পরিত্রাণের নিমিত্ত আপনার মূর্ত্তি চারি অংশে বিভক্ত করিয়াছি। আমার এক মূর্তি ভূমণ্ডলে তপশ্চরণ, দ্বিতীয় মূর্ত্তি জগতের সাধু ও অসাধু কর্ম অবলোকন, তৃতীয় মূর্ত্তি মর্ত্যলোক আশ্রয়পূর্ব্বক মানুষ কৰ্ম্মসাধন ও চতুর্থ মূর্তি শয়ন করিয়া সহস্রবর্ষব্যাপী নিদ্রাসুখ অনুভব করিতেছে। ঐ চতুর্থ মূর্তি সহস্র বৎসরের পর সমুত্থিত হইয়া বরাহ ব্যক্তি-গণকে অত্যুৎকৃষ্ট বর প্রদান করে। ঐ সময় পৃথিবী আমার বরপ্রদানকাল জানিয়া স্বীয় পুত্র নরকের নিমিত্ত আমার নিকট যে বর প্রার্থনা করিয়াছিল, শ্রবণ কর; পৃথিবী কহিল, হে নারায়ণ! তোমার বরে আমার পুত্র বৈষ্ণবাস্ত্র প্রাপ্ত হইয়া দেব ও অসুরগণের অবধ্য হউক। আমি কহিলাম, হে বসুন্ধরে! এই বৈষ্ণবাস্ত্র নরকের রক্ষার্থ অমোঘ হউক; ইহার প্রভাবে নরককে কেহই বিনাশ করিতে সমর্থ হইবে না। তোমার পুত্র এই অস্ত্রকর্তৃক সংরক্ষিত হইয়া সর্ব্বলোকের দুরাধর্ষ ও পরবল মদনক্ষম হইবে। পৃথিবী এইরূপে আমার নিকট কৃতকার্য্য হইয়া "তথাস্তু” বলিয়া গমন করিল। নরকাসুরও তদবধি দুর্দ্ধর্ষ হইয়া উঠিল। মহাবীর প্রাগজ্যোতিযেশ্বর নরকের নিকট হইতে সেই অস্ত্র প্রাপ্ত হন। ত্রিলোকমধ্যে ইন্দ্র রুদ্র প্রভৃতি কেহই ঐ অস্ত্রের অবধ্য নন। এই নিমিত্ত আমি স্বীয় প্রতিজ্ঞার অন্যথা করিয়া স্বয়ং অস্ত্রবেগ ধারণ করিলাম। দেবদ্বেষী মহাসুর ভগদত্ত এক্ষণে সেই পরমাস্ত্রবিহীন হইয়াছে। অতএব যেমন আমি লোকহিতার্থ নরকাসুরকে বিনষ্ট করিয়াছিলাম, তদ্রূপ তুমি ঐ দুর্দ্ধর্ষ বৈরীকে বিনষ্ট কর।

মহাবীর ধনঞ্জয় বাসুদেবকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া সহসা ভগদত্তের উপর নিশিত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। অনন্তর অসম্ভ্রান্তচিত্তে ভগদত্তের হস্তীর কুস্তান্তরে' নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। সর্প যেমন বল্মীকের মধ্যে গমন করে, তদ্রূপ অর্জুন নিক্ষিপ্ত বজ্রসম সেই নারাচ করিকুস্তমধ্যে প্রবেশ করিল। ভগদত্ত বারংবার হস্তীকে চালন করিতে লাগিলেন, কিন্তু দরিদ্রের ভার্য্যা যেমন স্বামীর বাক্যে কর্ণপাত করে না, তদ্রূপ গজরাজ প্রাগজ্যোতিষেশ্বরের বাক্য শ্রবণ করিল না। কিয়ৎক্ষণ মধ্যেই করিবর স্তব্ধগাত্র ও দন্তদ্বারা অবনিতলগত হইয়া আর্তস্বরে চীৎকার করত প্রাণ পরিত্যাগ করিল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় অর্দ্ধচন্দ্র বাণে ভগদত্তের হৃদয় ভেদ করিলেন। মহাবীর ভগদত্ত অর্জুনশরে ভিন্নহৃদয় হইয়া শর ও শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। যেমন সন্তাড়িত পদ্মনাল হইতে পত্র নিপতিত হয়, তদ্রূপ ভগদত্তের মস্তক হইতে মহার্ঘ বস্ত্র ধরাতলে নিপতিত হইল। যেমন সুপুষ্পিত কর্ণিকার বৃক্ষ বায়ুবেগে ভগ্ন হইয়া পৰ্ব্বতাগ্র হইতে নিপতিত হয়, তদ্রূপ হেমমালাভূষিত ভগদত্ত স্বর্ণভূষণভূষিত হস্তী হইতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় ইন্দ্র তুল্য পরাক্রম ইন্দ্রের সখা মহাবাহু ভগদত্তকে নিহত করিয়া বলবান্ বায়ু যেমন বৃক্ষসমুদায় ভগ্ন করে, তদ্রূপ কৌরব পক্ষীয় বীরগণকে নিহত করিতে লাগিলেন।

অর্জুনকর্তৃক বৃষক ও অচল বধ।

সঞ্জয় কহিলেন, এইরূপে মহাবীর অর্জুন দেবরাজ ইন্দ্রের প্রিয় সখা প্রাগজ্যোতিষেশ্বর ভগদত্তকে বিনাশ করিয়া প্রদক্ষিণ করিতে লাগিলেন। তখন বৃষক ও অচল নামে গান্ধাররাজের তনয়দ্বয় অর্জুনকে একান্ত নিপীড়িত করিতে আরম্ভ করিলেন। কেহ সম্মুখে কেহ বা পশ্চাদ্ভাগে অবস্থান করিয়া অর্জুনকে মহাবেগে শাণিত সায়কে বিদ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। অর্জুন শাণিত শরনিকরে সুবলনন্দন বৃষকের অশ্ব, সারথি, ধনুঃ, ছত্র, ধ্বজ ও রথ তিল তিল করিয়া ছেদন করিলেন এবং নানাবিধ আয়ুধদ্বারা সৌবলপ্রমুখ গান্ধারগণকে বারংবার ব্যাকুল করিতে লাগিলেন। পরে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া উদ্যতাস্ত্র পঞ্চশত গান্ধারকে যমালয়ে প্রেরণ করিলেন। বৃষক সত্বরে হতাশ্ব রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া ভ্রাতার রথে আরোহণপূর্ব্বক অন্য শরাসন গ্রহণ করিলেন। অর্জুন এক রথারূঢ় বৃষক ও অচলকে বারংবার শরজালে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। যেমন বৃত্র ও বলাসুর সুররাজ ইন্দ্রকে আঘাত করিয়াছিল, তদ্রূপ তাঁহারা অর্জুনকে শরনিকরে বিদ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন এবং যেমন নিদাঘ ও বর্ষাকালীন মাসদ্বয় গ্রীষ্ম ও অম্বুদ্বারা লোককে একান্ত কাতর করিয়া থাকে, তদ্রূপ তাঁহারা আহত না হইয়া অর্জুনকে নিতান্ত নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। অনন্তর মহাবীর অর্জুন এবং রথারূঢ় সংশ্লিষ্ট কলেবর বৃষক ও অচলকে এক শরে বিনাশ করিলেন। তখন সেই সিংহসঙ্কাশ লোহিতলোচন এক লক্ষণাক্রান্ত বীরদ্বয় গতাসু হইয়া রথ হইতে নিপতিত হইলেন। তাঁহাদের মৃত কলেবর দশদিকে অতি পবিত্র যশঃ বিস্তার করিয়া ভূতল প্রাপ্ত হইল।

অর্জুনের সহিত শকুনির মায়াযুদ্ধ ও অর্জুনকর্তৃক নিপীড়িত শকুনির যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন।

অনন্তর আপনার আত্মজগণ সমরে অপরাজুখ বন্ধুজন-প্রিয় দুই মাতুলকে ভূতলশায়ী নিরীক্ষণ করিয়া অর্জুনের প্রতি অনবরত শর প্রয়োগ করিতে লাগিলেন। মায়াবিশারদ শকুনি উভয় ভ্রাতাকে বিনষ্ট দেখিয়া কৃষ্ণ ও অর্জুনকে বিমোহিত করত মায়াজাল বিস্তার করিলেন; তখন লগুড়, অয়োেগুড়, প্রস্তর শতঘ্নী, শক্তি, গদা, পরিঘ, খড়া, শূল, মুদ্গর, পট্টিশ, কম্পন ঋষ্টি, নখর, মুষল, পরশু, ক্ষুর, ক্ষুরপ্র, নালীক, বৎসদন্ত অস্থিসন্ধি, চক্র, বিশিখ, প্রাস ও অন্যান্য নানাবিধ আয়ুধসকল দিক ও বিদিক হইতে অর্জুনের প্রতি নিপতিত হইতে লাগিল। খর, উষ্ট্র, মহিষ, ব্যাঘ্র, সিংহ, সৃমর, চিল্লক, ঋক্ষ, শালাবৃক, গৃধু, কপি, সরীসৃপ ও বিবিধ রাক্ষসগণ ক্ষুধার্ত হইয়া ক্রোধভরে অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইল। তখন দিব্যাস্ত্রবেত্তা অর্জুন শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক তাহাদিগকে প্রহার করিতে প্রবৃত্ত হইলে তাহারা শরতাড়িত হইয়া চিৎকার করত বিনষ্ট হইতে লাগিল।

অনন্তর ঘোরতর অন্ধকার প্রাদুর্ভূত হইয়া অর্জুনের রথ সমাচ্ছন্ন করিলে সেই অন্ধকার হইতে অতি কঠোর বাক্যে অর্জুনকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিল। অর্জুন জ্যোতিষ্ক অস্ত্রে তৎক্ষণাৎ সেই ভয়প্রদ গাঢ়ান্ধকার নিরাশ করিলেন। পরে ভয়ঙ্কর জলপ্রবাহ প্রাদুর্ভূত হইল। অর্জুন জলশোষণ করিবার নিমিত্ত আদিত্যাস্ত্র প্রয়োগ করিলেন। উহা প্রযুক্ত হইবামাত্র প্রায় সমস্ত জলই শুষ্ক হইয়া গেল। এইরূপে মহাবীর অর্জুন হাসিতে হাসিতে অস্ত্রবলে সৌবলবিহিত বিবিধ মায়া বিনাশ করিলেন। তখন শকুনি অর্জুনশরতাড়িত ও নিতান্ত ভীত হইয়া অতি বেগগামী তুরঙ্গমে আরোহণপূর্ব্বক নীচ লোকের ন্যায় পলায়ন করিলেন। অনন্তর মহাবীর অর্জুন আপনার হস্তলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক কৌরবসৈন্যগণের প্রতি শর প্রয়োগ করিতে লাগিলেন। যেমন ভাগীরথীপ্রবাহ পৰ্ব্বতে সংলগ্ন হইয়া দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া যায়, তদ্রূপ সেই সমস্ত সৈন্য অর্জুনশরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া দুই ভাগে বিভক্ত হইল এবং কতকগুলি দ্রোণের নিকট ও কতকগুলি দুর্য্যোধনের নিকট গমন করিল। পরে সৈন্যসকল ধূলিজালে সমাচ্ছন্ন হইলে আমরা আর অর্জুনকে দেখিতে পাইলাম না; কেবল দক্ষিণ দিকে অনবরত গাণ্ডীবনির্ঘোষ শ্রবণ করিতে লাগিলাম। ঐ গাণ্ডীবনির্ঘোষ শঙ্খ, দুন্দুভি ও অন্যান্য বাদ্যধ্বনি অভিভূত করিয়া নভোমণ্ডল স্পর্শ করিতে লাগিল।

অনন্তর দক্ষিণদিকে ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। আমি দ্রোণাচার্য্যের অনুসরণ করিলাম। রাজা যুধিষ্ঠিরের সৈন্যগণ কৌরবসেনাগণকে বিনাশ করিতে লাগিল। যেমন বর্ষাকালে বায়ু মেঘসকলকে অপবাহিত' করিয়া থাকে, তদ্রূপ অর্জুন কৌরব সৈন্যগণকে তাড়িত করিতে লাগিলেন। কোন ব্যক্তিই ভূরি বর্ষণশীল ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্রের ন্যায় শরনিকরবর্ষী অর্জুনকে আগমন করিতে দেখিয়া নিবারণ করিতে সমর্থ হইলেননা। কৌরবগণ পার্থশরাহত ও নিতান্ত ব্যথিত হইয়া ইতস্ততঃ পলায়ন করিবার সময় স্বপক্ষদিগকে বিনাশ করিলেন। অর্জুনবিনির্মুক্ত কঙ্কপত্রবিভূষিত তনুচ্ছেদী শরসকল শরভের ন্যায় দশদিক্ সমাচ্ছন্ন করিয়া নিপতিত হইতে লাগিল। যেমন পন্নগগণ বল্মীকমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ সেই সমস্ত শর তুরঙ্গম, নাগ, পদাতি ও রথিগণকে ভেদ করিয়া ভূগর্তে প্রবেশ করিল। অর্জুন হস্ত্যশ্ব ও মনুষ্যের প্রতি দ্বিতীয় শর পরিত্যাগ করেন নাই; তাহারা প্রত্যেকেই এক মাত্র শরে নিতান্ত নিপীড়িত ও গতাসু হইয়া নিপতিত হইয়াছিল। নিহত মনুষ্য, হস্তী ও অশ্বে রণস্থল পরিপূর্ণ হইল; শৃগাল ও কুকুরেরা কোলাহল করিতে লাগিল; এইরূপে রণক্ষেত্র সাতিশয় বিচিত্র হইয়া উঠিল। পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে ও সুহৃৎ সুহৃৎকে পরিত্যাগ করিয়া আত্মরক্ষায় যত্নবান্ হইলেন; অধিক কি, তৎকালে অনেকেই পার্থশরতাড়িত হইয়া স্ব স্ব বাহনদিগকে পরিত্যাগ করিতে লাগিল।

যুদ্ধে পাণ্ডবগণের দ্রোণবিনাশের সঙ্কল্প ও অশ্বত্থামাকর্তৃক নীল বধ।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। যখন কৌরবসেনাসকল ছিন্ন ভিন্ন হইলে তোমরা দ্রুতপদ সঞ্চারে প্রস্থান করিতে লাগিলে, তৎকালে তোমাদের মনঃ কিরূপ হইল? ছিন্ন ভিন্ন ও স্থান লাভের নিমিত্ত নিতান্ত ব্যাকুল সৈন্যগণকে একত্র করা নিতান্ত দুষ্কর; তাহাই বা কিরূপে সম্পাদিত হইল? তুমি আমার সমক্ষে এই সমস্ত কীর্ত্তন কর।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! সৈন্যসকল এইরূপ বিশৃঙ্খল হইলেও রাজা দুর্য্যোধনের হিতাভিলাষী বীরপুরুষেরা যশঃ রক্ষা করিবার নিমিত্ত দ্রোণাচার্য্যের অনুগমন করিলেন এবং অস্ত্র-সমুদায় সমুদ্যত, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সম্ভ্রান্ত ও রণস্থল নিতান্ত ভীষণ হইলে নির্ভীকের ন্যায় সাধুসম্মত কার্য্য অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। অনন্তর তাঁহারা মহাবীর ভীমসেন, সাত্যকি ও ধৃষ্টদ্যুম্নের সম্মুখে নিপতিত হইলে ক্রুর স্বভাব পাঞ্চালগণ, "দ্রোণকে আক্রমণ কর, দ্রোণকে আক্রমণ কর,” বলিয়া সৈন্যগণকে প্রেরণ করিল এবং আপনার পুত্রগণ "দ্রোণাচার্য্যকে যেন বধ করে না, দ্রোণাচার্য্যকে যেন বধ করে না,” এই বলিয়া কৌরবগণকে প্রেরণ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবগণ কহিতে লাগিলেন, "দ্রোণকে বিনাশ কর" কৌরবগণ কহিতে লাগিল, "দ্রোণকে যেন বিনষ্ট করে না," এইরূপে কৌরব ও পাণ্ডবগণ দ্রোণকে লইয়া যেন দ্যূত ক্রীড়া করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণ পাঞ্চালগণের যে যে রথীকে মথিত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন সেই সেই রথীর নিকট উপস্থিত হইতে লাগিলেন। এইরূপে নির্দিষ্ট ভাগের বিপর্যয় ও রণস্থল সাতিশয় ভীষণ হইয়া উঠিল; বীরগণ ভৈরব রব পরিত্যাগ-পূর্ব্বক বিপক্ষ বীরগণকে আক্রমণ করিতে লাগিলেন।

পাণ্ডবগণ শত্রুপক্ষদিগের নিতান্ত দুরাক্রম্য হইয়া উঠিলেন এবং আপনাদিগের ক্লেশ-পরম্পরা স্মরণপূর্ব্বক শত্রুদিগের সৈন্য বিকম্পিত করিতে লাগিলেন। অনন্তর তাঁহারা রোষপরবশ হইয়া দ্রোণাচার্য্যকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে | সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ যুদ্ধ লৌহশিলা সম্পাতের ন্যায় একান্ত তুমুল হইয়া উঠিল। এরূপ যুদ্ধ বৃদ্ধদিগেরও স্মৃতিপথে উদিত হয় না এবং কেহ কখন দর্শন বা শ্রবণও করে নাই। সেই বীরবিনাশন সংগ্রামে পৃথিবী বলভরে' নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া বিকম্পিত হইতে লাগিল। ইতস্ততঃ ঘূর্ণায়মান কৌরব-সেনাগণের অতি ভীষণ কলরব নভোমণ্ডল স্তব্ধ করিয়া পাণ্ডবসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিল। তখন দ্রোণাচার্য্য সহস্র সহস্র পাণ্ডবসৈন্য প্রাপ্ত হইয়া শাণিত শরনিকরে ছিন্ন ভিন্ন করিতে প্রবৃত্ত হইলে, পাণ্ডবসেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্ন ক্রোধাবিষ্ট হইয়া স্বয়ং দ্রোণকে নিবারণ করিলেন। আমরা দ্রোণ ও পাঞ্চালরাজের অতি অদ্ভুত যুদ্ধ নিরীক্ষণ করিয়া নিশ্চয় বোধ করিলাম যে, এই সংগ্রামের উপমা নাই।

অনন্তর অনলসঙ্কাশ শরস্ফুলিঙ্গসম্পন্ন', কান্মুকজ্বালা-করাল', মহাবীর নীল হুতাশনের তৃণরাশি দহনের ন্যায় কৌরব-সেনাগণকে দগ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন প্রবলপ্রতাপশালী অশ্বত্থামা সর্ব্বাগ্রে সহাস্য-মুখে কহিলেন, হে নীল! যোদ্ধাদিগকে শরানলে দগ্ধ করিলে তোমার কি হইবে? তুমি আমার সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও এবং রোষপরবশ হইয়া শীঘ্র আমাকে প্রহার কর।

তখন মহাবীর নীল পদ্মনিরাকার, পদ্মপলাশলোচন, প্রফুল্লকমলানন অশ্বত্থামাকে শরজালে বিদ্ধ করিলে, অশ্বত্থামা শাণিত তিন ভল্লাস্ত্রে নীলের ধনুঃ, ধ্বজ ও ছত্র খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর নীল রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া বিহঙ্গমের ন্যায় অশ্বত্থামার কলেবর হইতে মস্তক উৎপাটনের অভিলাষ করিলে অশ্বত্থামা হাসিতে হাসিতে নীলের সুন্দরনাসা সুশোভিত কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক ভল্লাস্ত্রে তৎক্ষণাৎ ছেদন করিলেন। সেই পূর্ণচন্দ্রনিভানন, কমললোচন নীল ভূতলে নিপতিত হইবামাত্র পাণ্ডবসেনাগণ নিতান্ত ব্যথিত ও একান্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিল। তখন পাণ্ডবপক্ষ মহারথসকল চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, অর্জুন অবশিষ্ট সংশপ্তকগণ ও নারায়ণী-সেনার সহিত দক্ষিণ-দিকে যুদ্ধ করিতেছেন; সুতরাং তিনি এক্ষণে কি প্রকারে আমাদিগকে পরিত্রাণ করিবেন?

পঞ্চপাণ্ডবের সহিত দ্রোণ-দুর্য্যোধনাদির যুদ্ধ ও অর্জুনকর্তৃক কর্ণের ভ্রাতৃগণ বধ এবং ত্রয়োদশ দিবসের যুদ্ধ বিরতি।

সঞ্জয় কহিলেন, অনন্তর মহাবীর বৃকোদর স্বীয় সৈন্য বিনাশ সহ্য করিতে না পারিয়া যষ্টি শরে বাহীক ও দশ শরে কর্ণকে আঘাত করিলেন। দ্রোণ ভীমের প্রাণনাশের অভিলাষে তীক্ষ্ণ শরে মর্মে প্রহার করিয়া উপর্যুপরি ষড়বিংশতি শরে বিদ্ধ করিলেন। পরে কর্ণ দ্বাদশ, অশ্বত্থামা সাত ও মহারাজ দুর্য্যোধন ছয় বাণে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনও তাঁহাদিগকে বিদ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি পঞ্চাশৎ শরে দ্রোণকে, দশ শরে কর্ণকে, দ্বাদশ শরে দুর্য্যোধনকে ও আট শরে অশ্বত্থামাকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক তাঁহাদিগের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। সেই সুলভমৃত্যু' তুমুল রণস্থলে রাজা যুধিষ্ঠির ভীমসেনকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত যোদ্ধাদিগকে প্রেরণ করিলেন। নকুল, সহদেব ও যুযুধান প্রভৃতি বীরেরা ভীমসেনের সন্নিধানে উপনীত - হইলেন। অনন্তর ভীমসেন প্রভৃতি মহারথগণ সমবেত হইয়া রোষভরে সুরক্ষিত দ্রোণসৈন্যদিগকে বিনাশ করিবার বাসনায় - গমন করিলে, মহাবীর দ্রোণ সেই সকল মহাবল পরাক্রান্ত - মহারথদিগকে অনায়াসে গ্রহণ করিলেন। তখন কৌরবগণ - রাজ্যস্পৃহা ও মৃত্যুভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক পাণ্ডবদিগের নিকট - উপনীত হইলে গজারোহী গজারোহীকে ও রথী রথীকে বিনাশ - করিতে লাগিল; বীরগণ শক্তি, অসি ও পরশু প্রহারে প্রবৃত্ত হইলেন। অনন্তর করিসৈন্যসকল ঘোরতর সমর করিতে - লাগিল। কেহ করিপৃষ্ঠ হইতে কেহ বা অশ্ব হইতে অধঃশিরা হইয়া কেহ বা রথ হইতে শরবিদ্ধ হইয়া ধরাতলে পতিত হইল। । কোন ব্যক্তি বিমৰ্দ্দ কালে বৰ্ম্মশূন্য ও ভূতলে নিপতিত হইলে, একটি হস্তী তাঁহার বক্ষঃস্থল আক্রমণপূর্ব্বক মস্তক চূর্ণ করিয়া ফেলিল। অন্যান্য হস্তীরা নিপতিত বহুসংখ্যক লোককে বিমদ্দিত করিতে লাগিল। কতকগুলি হস্তী ধরণীতলে নিপতিত হইয়া বিশাল দশনদ্বারা অনেকানেক রথীকে ভেদ করিল। কতকগুলি হস্তী দশনসংলগ্নদ্বারা শত শত মনুষ্যকে বিমদ্দিত করত ভ্রমণ করিতে লাগিল। কুঞ্জরসকল নিপতিত অশ্ব, রথ, হস্তী ও পিহিত-লৌহতনুত্র মানবদিগকে স্থূল নলের ন্যায় প্রোথিত করিয়া ফেলিল। লজ্জাশালী ভূপালগণ কাল বশতঃ গৃধপক্ষাত্তীর্ণ | নিতান্ত ক্লেশকর শয্যায় শয়ন করিতে লাগিলেন। পিতা পুত্রকে আক্রমণ করিয়া বিনাশ করিতে লাগিলেন এবং পুত্র মোহপরতন্ত্র হইয়া পিতার মর্য্যাদা অতিক্রম করিতে লাগিল। চারিদিকে রথের অক্ষ ভগ্ন, ধ্বজ ছিন্ন ও ছত্র নিপতিত হইতে লাগিল। কোন অশ্ব ছিন্ন যুগার্দ্ধ লইয়া ধাবমান হইল। অসিদণ্ডমণ্ডিত' বাহুনি-পতিত ও কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক ছিন্ন ভিন্ন হইতে লাগিল; মহাবলপরাক্রান্ত মাতঙ্গগণ রথ সমস্ত আকর্ষণপূর্ব্বক চূর্ণ করিতে আরম্ভ করিল। কোথাও অশ্ব হস্তীকর্তৃক সাতিশয় আহত হইয়া আরোহীর সহিত নিপতিত হইতে লাগিল।

এইরূপে মর্য্যাদাশূন্য ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। হা তাত! হা পুত্র! হা সখে! তুমি কোথায় রহিয়াছ, ঐ স্থানে অবস্থান কর, ধাবমান হইও না, ইহাকে প্রহার কর, উহাকে আনয়ন কর, ঐ ব্যক্তিকে বিনাশ কর, এইরূপ ও অন্যান্যরূপ বাক্য, হাস্য, সিংহনাদ ও গর্জন সহকারে সমুত্থিত হইতেছে, শ্রুতিগোচর হইল। মনুষ্য, অশ্ব ও হস্তীর শোণিত প্রবাহিত হইতে লাগিল; পার্থিব ধূলিজাল উপশমিত হইল; ভীরুস্বভাব মনুষ্যেরা বিমোহিত হইয়া উঠিল। কোন বীরের রথচক্র অন্য বীরের রথচক্রে সংলগ্ন হওয়াতে অস্ত্রপ্রয়োগাবসর অতীত হইলে, তিনি গদাদ্বারা তাঁহার মস্তক চূর্ণ করিলেন। নিরাশ্রয় সমরে আশ্রয়লাভার্থী বীরপুরুষেরা নিদারুণ কেশাকর্ষণ, মুষ্টি এবং নখ ও দন্ত প্রহারে প্রবৃত্ত হইলেন। কোন বীরের খড়াসনাথ উদ্যত বাহুদণ্ড খণ্ড খণ্ড হইয়া গেল; কাহারও বা শর, শরাসন ও অঙ্কুশসমলঙ্কৃত হস্ত ছিন্ন ভিন্ন হইল। কোন ব্যক্তি কাহার উপর, আক্রোশ প্রকাশ করিতে লাগিল; কেহ সমরে পরাজুখ হইল, কোন ব্যক্তি সমকক্ষ ব্যক্তির শিরশ্ছেদন করিল; কেহ চীৎকারপূর্ব্বক ধাবমান হইল; কেহ সাতিশয় ভীত হইয়া চীৎকার করিতে লাগিল; কেহ শাণিত শরে স্বপক্ষকে কেহ বা পরপক্ষকে বিনাশ করিতে লাগিল। গিরিশৃঙ্গসদৃশ কোন মাতঙ্গ নারাচ অস্ত্রে আহত হইয়া বর্ষাকালীন নদীতটের ন্যায় নিপতিত হইল। প্রস্রবণশালী পৰ্ব্বতসদৃশ মদস্রাবী অন্য এক মাতঙ্গ রথী, অশ্ব ও সারথিকে নিপীড়ন করিয়া দণ্ডায়মান রহিল। ভীরুস্বভাব, দুর্ব্বলহৃদয় মনুষ্যেরা শোণিতসিক্ত মহাবীরদিগকে বিনষ্ট হইতে দেখিয়া মোহাবিষ্ট হইতে লাগিল। সকলেই উদ্বিগ্ন হইল, কিছুই পরিজ্ঞাত হইল না। সৈন্যপদোদ্ধৃত ধূলিজালে সমস্ত সমাচ্ছন্ন হইলে সমর বিশৃঙ্খল হইয়া উঠিল।

অনন্তর পাণ্ডব-সেনাপতি নিত্যোৎসাহী পাণ্ডবগণকে, এই সমুচিত অবসর, এই বলিয়া ত্বরান্বিত করিতে লাগিলেন। বাহুবলশালী পাণ্ডবেরা তাঁহার আজ্ঞানুসারে সৈন্য সংহারপূর্ব্বক হংসগণ যেমন সরোবরে গমন করে, তদ্রূপ দ্রোণরথাভিমুখে গমন করিলেন। "উহাকে গ্রহণ কর; ধাবমান হইও না; শঙ্কা পরিত্যাগ কর; উহাকে বিনাশ কর;" দ্রোণাচার্য্যের রথের অভিমুখে এইরূপ তুমুল ধ্বনি হইতে লাগিল। অনন্তর দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, জয়দ্রথ, অবন্তি দেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ এবং শল্য তাঁহাদিগকে নিবারণ করিলেন। পরে জাতক্রোধ নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ, দুর্নিবার পাঞ্চালগণ পাণ্ডবদিগের সহিত শরজালে একান্ত নিপীড়িত হইয়াও আর্য্য ধৰ্ম্মানুসারে দ্রোণাচার্য্যকে পরিত্যাগ করিলেন না। অনন্তর দ্রোণ অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া শত শত শর পরিত্যাগ করিয়া, চেদি, পাঞ্চাল ও পাণ্ডবদিগকে নিতান্ত নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। তাঁহার অশনিশব্দসঙ্কাশ মানবগণের ত্রাসজনন মৌর্ব্বী ও তলধ্বনি চতুদ্দিকে শ্রুতি-গোচর হইতে লাগিল। এইরূপে দ্রোণাচার্য্য পাণ্ডবগণকে বিমর্দিত করিতেছেন; ইত্যবসরে মহাবীর অর্জুন বহুসংখ্যক সংশপ্তককে পরাজয় ও বিনাশ করিয়া শোণিতোদকসম্পন্ন শরৌঘ-মহাবর্ত্ত মহাহ্রদ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া তথায় সমুপস্থিত হইলেন, অবলোকন করিলাম এবং সেই কীর্ত্তিসম্পন্ন সূর্য্যসঙ্কাশ অর্জুনের প্রদীপ্ত কপিধ্বজও নয়নগোচর হইল। পাণ্ডব মধ্যবর্তী, যুগান্তকালীন সূর্য্যস্বরূপ মহাবীর অর্জুন শরনিকররূপ কর-জালে সংশপ্তকসমুদ্র শুষ্ক করিয়া কৌরবগণকে সন্তপ্ত করিতে লাগিলেন। যেমন প্রলয়কালে ধূমকেতু উত্থিত হইয়া সমস্ত প্রাণীকে দগ্ধ করিয়া থাকে, তদ্রূপ তিনি অস্ত্রতেজে কৌরব-গণকে দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। গজারোহী, অশ্বারোহী ও রথারোহিগণ সহস্র সহস্র শরে তাড়িত হইয়া আলুলিতকেশে নিপতিত হইতে লাগিল। কেহ কেহ আর্তনাদ, কেহ কেহ বা চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। কতকগুলি লোক পার্থশরে আহত হইয়া প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক নিপতিত হইল। বীরবর অর্জুন যোদ্ধাদিগের নিয়ম স্মরণ করিয়া উত্থিত, নিপতিত ও পরাজুখ ব্যক্তিদিগকে বিনাশ করিলেন না। কৌরবগণ প্রায় সকলেই বিস্মিত ও সমরে পরাজুখ হইয়া হাহাকার ও কর্ণ! কর্ণ! বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন; মহারথ কর্ণ তৎকালে তাঁহাদিগের সমভিব্যাহারে ছিলেন না; এক্ষণে শরণার্থী কৌরব-গণের রোদনশব্দ শ্রবণ করিয়া ভীত হইও না, বলিয়া অর্জুনের অভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং আগ্নেয়াস্ত্র পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। ধনঞ্জয় প্রদীপ্ত শরাসনধারী, শাণিত শরনিকরসম্পন্ন কর্ণের শরজাল শরসমূহদ্বারা নিবারণ করিলেন। কর্ণও তাঁহার শরসকল শরনিকরে নিবারণ ও শর বর্ষণপূর্ব্বক সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন, ভীম ও সাত্যকি তিন তিন শরে কর্ণকে বিদ্ধ করিলেন। কর্ণ শর বর্ষণপূর্ব্বক অর্জুনের শর নিবারণ করিয়া তিন বাণে ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি তিন বীরের কার্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ছিন্নায়ুধ সেই সকল বীর নির্বিষ ভুজঙ্গের ন্যায় রথ হইতে শক্তি নিক্ষেপপূর্ব্বক সিংহের ন্যায় গর্জন করিতে লাগিলেন। সেই আশীবিষসদৃশ মহাবেগসম্পন্ন শক্তি সমস্ত প্রদীপ্ত হইয়া মহাবেগে কর্ণের প্রতি গমন করিতে লাগিল। কর্ণ তিন তিন শরে সেই সমস্ত শক্তি ছেদন করিয়া অর্জুনের প্রতি শর পরিত্যাগপূর্ব্বক সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। অর্জুনও সাত শরে কর্ণকে বিদ্ধ করিয়া তীক্ষ্ণ বাণে কর্ণের কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে বিনাশ করিলেন। পরে ছয় শরে শত্রুঞ্জয়কে বিনাশ করিয়া ভল্লাস্ত্রে বিপাটের মস্তক ছেদন করিলেন। এইরূপে কর্ণের তিন ভ্রাতা ধার্তরাষ্ট্রগণের সমক্ষে ও কর্ণের সম্মুখে এক মাত্র অর্জুনের হস্তেই বিনষ্ট হইলেন।

অনন্তর ভীমসেন পক্ষিরাজ গরুড়ের ন্যায় রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া খড়াদ্বারা কর্ণপক্ষ পঞ্চদশ বীরকে বিনাশ করিলেন; পরে পুনরায় রথে আরোহণ ও অন্য কাৰ্ম্মক গ্রহণ করিয়া দশ শরে কর্ণকে এবং পঞ্চ শরে সারথি ও অশ্বগণকে বিদ্ধ করিলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন খড়া ও ভাস্বর চর্ম গ্রহণপূর্ব্বক চন্দ্রবর্মা ও নিষদদেশীয় বৃহৎক্ষত্রকে আহত এবং রথে আরোহণ ও অন্য কাৰ্ম্মক গ্রহণ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক চতুঃষষ্টি শরে কর্ণকে বিদ্ধ করিলেন; পরে ভল্লাস্ত্রে তাঁহার কার্ম্মক ছেদন করিয়া পুনরায় তিন বাণে তাঁহার ভুজযুগল ও বক্ষঃস্থলে আঘাত করিলে রাজা দুর্য্যোধন, দ্রোণ ও জয়দ্রথ সাত্যকিরূপ মহাসাগরে নিমজ্জমান কর্ণকে উদ্ধার করিলেন; তাঁহার শত শত পদাতি, অশ্ব ও হস্তী নিতান্ত ভীত হইয়া তাঁহারই পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইল। ধৃষ্টদ্যুম্ন, ভীম, অভিমন্যু, অর্জুন, নকুল ও সহদেব সাত্যকিকে রক্ষা করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে আপনার ও পাণ্ডবপক্ষীয় বীরগণের বিনাশার্থ ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। সকলেই জীবননিরপেক্ষ হইয়া সমরে প্রবৃত্ত হইলেন।

পদাতি, রথী, হস্তী ও অশ্বগণের পরস্পর যুদ্ধ আরম্ভহইল। কোথাও হস্তীসকল রথী ও পদাতির সহিত, রথীসকল হস্তী, পদাতি ও অশ্বের সহিত এবং রথী ও পদাতিগণ রথী ও হস্তীর সহিত, কোথাও বা অশ্বের সহিত অশ্ব, হস্তীর সহিত হস্তী, রথীর সহিত রথী ও পদাতির সহিত পদাতিগণ মাংসাশী পশুগণের হর্ষসূচক যমরাজ্য-বিবর্দ্ধন ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিল। অনন্তর মনুষ্য, রথ, অশ্ব ও হস্তীকর্তৃক বহুসংখ্যক হস্তী, রথ, পদাতি ও অশ্বগণ বিনষ্ট হইল; কোথাও হস্তীকর্তৃক হস্তী, রথিকর্তৃক রথী, অশ্বকর্তৃক অশ্ব, পদাতিকর্তৃক পদাতি, কোথায়ও বা রথিকর্তৃক হস্তী, হস্তীকর্তৃক অশ্ব ও অশ্বকর্তৃক মনুষ্য ছিন্নজিহ্ব, ভগ্নদশন, গলিতনয়ন, প্রমথিতকবচ ও বিগত-ভূষণ হইয়া বিনাশ প্রাপ্ত হইতে লাগিল। ভীমদর্শন মাতঙ্গগণ বহুশস্ত্রসম্পন্ন শত্রুগণকর্তৃক আহত, অশ্ব ও গজচরণে তাড়িত, রথনেমিদ্বারা ক্ষত-বিক্ষত, ক্ষিতিতলে প্রোথিত ও সাতিশয় সমাকুল হইয়া বিনষ্ট হইল। এইরূপে পক্ষী, শ্বাপদ ও রাক্ষসদিগের আহ্লাদকর, অতি ভয়ঙ্কর জনক্ষয় উপস্থিত হইলে মহাবল পরাক্রান্ত বীরগণ একান্ত কুপিত হইয়া বল-পূর্ব্বক পরস্পরকে বিনাশ করত সমরক্ষেত্রে সঞ্চরণ করিতে লাগিলেন এবং শোণিতসিক্ত ও সাতিশয় ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পরস্পর মুখাবলোকন করিতে লাগিল। ইত্যবসরে ভগবান্ মরীচিমালী অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইলে কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষ বীরপুরুষেরা মৃদু পদসঞ্চারে স্ব স্ব শিবিরে গমন করিলেন।

সংশপ্তকবধ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।