কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

দ্রোণপর্ব্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

অভিমন্যুবধ পর্ব্বাধ্যায়

দ্রোণপর্ব্ব

অভিমন্যুবধ পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও ব্যাসকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

দ্রোণের নিকট দুর্য্যোধনের খেদোক্তি এবং চতুৰ্দ্দশ দিবসের যুদ্ধারম্ভ ও চক্রব্যূহ রচনা।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! অমিতবলশালী অর্জুনের প্রভাবে আমাদিগের সৈন্যসমুদায় ছিন্ন ভিন্ন, দ্রোণের অভিলাষ নিষ্ফল ও যুধিষ্ঠির সুরক্ষিত হইলে যুদ্ধনিজ্জিত, বৰ্ম্মশূন্য, ধূলিধূসরিত সমরজয়ী বিপক্ষগণকর্তৃক পরিত্যক্ত, সাতিশয় হাস্যাস্পদ কৌরবগণ উদ্বিগ্নমনে দশদিক্ অবলোকন করত দ্রোণের অনুমতিক্রমে সমর অবহার করিয়া অর্জুনের অসংখ্য গুণগ্রামের প্রশংসা ও তাঁহার সহিত কৃষ্ণের সখ্যভাব শ্রবণে চিন্তা ও মৌনভাব অবলম্বনপূর্ব্বক অভিশপ্তের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন।

অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন প্রভাতকালে শত্রুর উন্নতি দর্শনে একান্ত বিমনায়মান ও নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া প্রণয় ও অভিমান সহকারে যোদ্ধাদিগের সমক্ষে দ্রোণকে কহিলেন, হে আচার্য্য! আমরা আপনার বধ্য মধ্যে পরিগণিত হইয়াছি; কেননা, আপনি যুধিষ্ঠিরকে সমীপস্থ দেখিয়া আজিও গ্রহণ করিলেন না। আপনি যাহাকে গ্রহণ করিবার অভিলাষ করিবেন, সে আপনার সম্মুখবর্তী হইলে, যদি দেবগণের সহিত পাণ্ডবেরা তাহাকে রক্ষা করেন তাহা হইলেও সে পরিত্রাণ পাইতে পারে না। আপনি অগ্রে প্রসন্ন মনে আমাকে বর প্রদান করিয়া এক্ষণে তাহার অন্যথা করিতেছেন; কিন্তু আর্য্য ব্যক্তিরা কদাচ ভক্ত জনের আশা ভঙ্গ করেন না।

তখন দ্রোণাচার্য্য নিতান্ত লজ্জিত হইয়া দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে মহারাজ! আমি তোমার প্রিয় কার্য্য সাধনার্থ নিরন্তর যত্নবান্ রহিয়াছি; আমাকে কদাচ ঐরূপ জ্ঞান করিও না। দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, রাক্ষস ও উরগগণও অর্জুন-রক্ষিত রাজা যুধিষ্ঠিরকে পরাজয় করিতে সমর্থ হন না। যে স্থানে বিশ্বস্রষ্টা জনাৰ্দ্দন বিরাজমান আছেন এবং অর্জুন সেনাপতি হইয়াছেন, সে স্থানে ভগবান্ শূলপাণি ব্যতিরেকে আর কাহার বল ফলোপধায়ক' হইতে পারে? আজি আমি সত্যই কহিতেছি, পাণ্ডবদিগের মধ্যে বীরপ্রবর এক মহারথকে নিপাতিত এবং দেবগণেরও দুর্ভেদ্য এক ব্যূহ প্রস্তুত করিব; কখনই ইহার অন্যথা হইবে না। এক্ষণে কোন উপায়দ্বারা অর্জুনকে ধর্মরাজের নিকট হইতে অপনীত কর। যুদ্ধে তাহার অজ্ঞাত বা অসাধ্য কিছুই নাই; সে নানা স্থান হইতে সকল বিষয়ই অবগত হইয়াছে।

আচার্য্য দ্রোণ এইরূপ আদেশ করিলে সংশপ্তকগণ পুনরায় অর্জুনকে যুদ্ধার্থ দক্ষিণ দিকে আহ্বান করিতে লাগিল। সুতরাং সংশপ্তকদিগের সহিত অর্জুনের ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। তাদৃশ যুদ্ধ কখন কাহার শ্রবণ বা নয়নগোচর হয় নাই। এদিকে আচার্য্য দ্রোণ চক্রব্যূহ' রচনা করিলেন। উহা তপনশীল মধ্যাহ্নকালীন দিনকরের ন্যায় নিতান্ত দুর্নিরীক্ষ্য হইয়া উঠিল। অভিমন্যু জ্যেষ্ঠতাত যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে সঞ্চরণ করিতে করিতে সেই দুর্ভেদ্য চক্রব্যূহ বারংবার ভেদ করিলেন। পরে তিনি অতি দুষ্কর কার্য্যসংসাধন ও সহস্র সহস্র বীর নিপাতনপূর্ব্বক ছয় বীরের সহিত সমরে ব্যাপৃত ও দুঃশাসন-পুত্রের বশবর্তী হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিলেন। আমরা অতিশয় সন্তুষ্ট হইলাম। পাণ্ডবগণ শোকে নিতান্ত কাতর হইলেন। অনন্তর অবহার করিলাম।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। পুরুষসিংহ অর্জুনের আত্মজ অপ্রাপ্তযৌবন অভিমন্যু বিনষ্ট হইয়াছে, ইহা শ্রবণ করিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। যে ধৰ্ম্মানুসারে রাজ্য-লোলুপ বীরেরা বালকের উপর অস্ত্রাঘাত করিয়াছে, ধৰ্ম্মকর্তারা সেই ক্ষত্রধৰ্ম্ম কি নিদারুণ করিয়াই সৃষ্টি করিয়াছেন! আমার পক্ষ বীরেরা নিতান্ত সুখী, নির্ভীকের ন্যায় বিচরণশীল, বালক অভিমন্যুকে কি প্রকারে বিনাশ করিল? আর অভিমন্যু রথসৈন্য সংহার করিবার বাসনায় যেরূপ রণস্থলে সঞ্চরণ করিয়াছিল, তাহাও কীর্ত্তন কর।

সঞ্চয় কহিলেন, মহারাজ! আপনি আমাকে যে সমস্ত বিষয় জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা সম্যক্ কীর্ত্তন করিতেছি, অবহিত হইয়া শ্রবণ করুন। কুমার অভিমন্যু সৈন্যসংহারার্থ যেরূপে রণস্থলে সঞ্চরণ করিয়াছিলেন, জয়লাভাভিলাষী দুর্নিবার বীরসমুদায় যেরূপে ছিন্ন ভিন্ন হইয়াছিলেন এবং তৃণ, গুল্ম ও পাদপ সমাচ্ছন্ন অরণ্যমধ্যে দাবানল পরিবেষ্টিত বনবাসীদিগের ন্যায় আপনার পক্ষ বীরগণের অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার হইয়াছিল; এক্ষণে তাহা শ্রবণ করুন।

অভিমন্যু বধ-বৃত্তান্ত বর্ণন।

সঞ্জয় কহিলেন, হে নরনাথ! পঞ্চপাণ্ডব ও কৃষ্ণ যুদ্ধে সাতিশয় ভীমকৰ্ম্মা ও দেবগণেরও দুরধিগম্য এবং তাহারা যে একান্ত শ্রমশীল, তাহাও তাঁহাদিগের কর্মদ্বারা ব্যক্ত হইয়াছে। রাজা যুধিষ্ঠির সত্ত্ব', কৰ্ম্ম, অন্বয়', বুদ্ধি, কীর্ত্তি, যশঃ ও সৌন্দর্য্যে অদ্বিতীয়, সতত সত্যধৰ্ম্মনিরত ও দান্ত; তিনি ব্রাহ্মণপূজা প্রভৃতি গুণসমূহে বিভূষিত হইয়া সর্ব্বদাই স্বর্গ ভোগ করিতেছেন।। যুগান্তকালীন অন্তক', জামদগ্ন্য' ও রথস্থ ভীমসেন এই তিনজন সমকক্ষ বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অর্জুনের উপমা পৃথিবীতে নাই। গুরুভক্তি, মন্ত্ররক্ষণনিপুণতা, বিনয়, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, অনুকৃতি ও শূরতা এই ছয় গুণ, নকুলে নিয়ত বিদ্যমান রহিয়াছে। সহদেব শ্রুত, গাম্ভীর্য্য, মাধুর্য্য, সত্ত্ব, রূপ ও পরাক্রমে অশ্বিনীতনয়দ্বয়ের সদৃশ। কৃষ্ণে ও পঞ্চপাণ্ডবে যে সমস্ত গুণ আছে, সেই সকল গুণ একমাত্র অভিমন্যুতে লক্ষিত হইয়া থাকে। রাজা যুধিষ্ঠিরের ধৈর্য্য, কৃষ্ণের চরিত্র, ভীমসেনের কার্য্য, অর্জুনের রূপ, বিক্রম ও শাস্ত্রজ্ঞান এবং সহদেব ও নকুলের বিনয়ের উপমা নাই।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! নিতান্ত দুর্জয় অভিমন্যু কিরূপে রণস্থলে বিনষ্ট হইল, আমি তাহা আনুপূর্ব্বিক শ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! আপনি দুঃসহ শোক সংবরণ করিয়া সুস্থির হউন; আমি আপনার বন্ধুবিনাশ-বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। দ্রোণাচার্য্য চক্রব্যূহ রচনা করিয়া তন্মধ্যে দেবরাজতুল্য মহীপালগণকে সংস্থাপিত করিলেন; উহার দ্বারদেশে সূর্য্যসঙ্কাশ রাজকুমারগণ সন্নিবেশিত হইলেন। তৎকালে সমুদায় রাজতনয় একত্র হইয়াছিলেন; তাঁহারা সকলেই রক্তবর্ণ পতাকা-পরিশোভিত, হেমহারবিভূষিত, চন্দন ও অগুরুচর্চ্চিত, রক্তবর্ণ বিভূষণসম্পন্ন, সূক্ষ্ম রক্তাম্বরধারী, মাল্যদামমণ্ডিত, সুবর্ণখচিত ধ্বজদণ্ডে শোভিত ও কৃতপ্রতিজ্ঞ। সেই দশসহস্র রাজপুত্র একত্র সমবেত হইয়া সমরাভিলাষে অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। তাঁহারা পরস্পর সমদুঃখসুখ, সমসাহস ও হিতানুষ্ঠাননিরত হইয়া আপনার পৌত্র লক্ষ্মণকে অগ্রসর করত পরস্পর স্পর্দ্ধাসহকারে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। শ্বেতচ্ছত্রে ও চামরে উদয়মান দিবাকরের ন্যায়, পুরন্দরসদৃশ শ্রীমান রাজা দুর্য্যোধন মহারথ কর্ণ, কূপ ও দুঃশাসনকর্তৃক পরিবৃত হইয়া দ্রোণাধিকৃত সেনামুখে অবস্থান করিতে লাগিলেন। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ সৈন্যমধ্যে সুমেরু পর্ব্বতের ন্যায় স্থিরভাবে অবস্থান করিলেন। অমরসদৃশ আপনার ত্রিংশৎ তনয় অশ্বত্থামাকে পুরোবর্তী করিয়া সিন্ধুরাজের পার্শ্বে অবস্থান করিতে লাগিলেন। দ্যূতদেবী গান্ধাররাজ শকুনি, শল্য ও ভূরিশ্রবাঃ সিন্ধুরাজের পার্শ্বে শোভমান হইলেন। অনন্তর উভয় পক্ষ বীরগণ মৃত্যু পর্যন্ত পণ করিয়া তুমুল লোমহর্ষণ সংগ্রাম আরম্ভকরিলেন।

অভিমন্যুর প্রতিজ্ঞা।

সঞ্জয় কহিলেন, হে নরনাথ। অনন্তর ভীমসেন প্রমুখ পাণ্ডবগণ, সাত্যকি, চেকিতান, ধৃষ্টদ্যুম্ন, কুন্তিভোজ, দ্রুপদ, অভিমন্যু, শিখণ্ডী, উত্তমৌজাঃ, বিরাট, দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র, শিশুপালনন্দন, ক্ষত্রধৰ্ম্মা, বৃহৎক্ষত্র, ধৃষ্টকেতু, নকুল, সহদেব, ঘটোৎকচ ও যুধামন্যু, মহাবীর্য্য কৈকেয়গণ, শত সহস্র সৃঞ্জয় এবং অন্যান্য যুদ্ধদুৰ্ম্মদ সানুচর বীরবর্গ যুদ্ধার্থী হইয়া সহসা দ্রোণের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণ অসম্ভ্রান্তচিত্তে সন্নিহিত বীরগণকে শর বর্ষণপূর্ব্বক নিবারণ করিলেন। যেমন প্রবল জলপ্রবাহ, দুর্ভেদ্য পৰ্ব্বতকে অতিক্রম করিতে সমর্থ হয় না, যেমন সাগরসকল বেলাভূমি অতিক্রম করিতে পারে না, তদ্রূপ পাণ্ডবপক্ষ বীরগণ দ্রোণাচার্য্যকে উল্লঙ্ঘন করিতে পারিলেন না। ফলতঃ পাণ্ডবেরা সৃঞ্জয়গণের সহিত দ্রোণচাপ-বিনিঃসৃত শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া দ্রোণাচার্য্যের সম্মুখে অবস্থান করিতে অসমর্থ হইলেন। আমরা তখন দ্রোণের অদ্ভুত ভুজবল অবলোকন করিতে লাগিলাম। অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির ক্রোধভরে দ্রোণকে আগমন করিতে অবলোকন করিয়া নানাপ্রকার নিবারণোপায় চিন্তা করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি দ্রোণকে নিবারণ করা অন্যের অসাধ্য বিবেচনা করত অর্জুন ও বাসুদেবসম অমিততেজাঃ অভিমন্যুর উপর দুর্ব্বহ ভার সমর্পণ করিয়া কহিলেন, হে বৎস। আমরা কিরূপে চক্রব্যূহ ভেদ করিব, কিছু হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইতেছি না, এক্ষণে অর্জুন আসিয়া যাহাতে আমাদিগকে নিন্দা না করে, এইরূপ অনুষ্ঠান কর। তুমি, অর্জুন, কৃষ্ণ ও প্রদ্যুম্ন তোমরা চারি জনই চক্রব্যূহ ভেদ করিতে সমর্থ, এ বিষয়ে পঞ্চম ব্যক্তি আর নয়নগোচর হইতেছে না। এক্ষণে পিতৃগণ, মাতুলগণ, সৈন্যগণ তোমার নিকট বর প্রার্থনা করিতেছেন, তুমি ইহাদিগকে বর প্রদান কর। তুমি অবিলম্বে অস্ত্রগ্রহণপূর্ব্বক দ্রোণসৈন্য বিনষ্ট করিতে প্রবৃত্ত হও; নতুবা ধনঞ্জয় উপস্থিত হইয়া আমাদিগকে নিশ্চয়ই নিন্দা করিবে।

অভিমন্যু কহিলেন, আর্য্য। আমি পিতৃগণের জয়াভিলাষী হইয়া অবিলম্বে দ্রোণাচার্য্যের সুদৃঢ় ভয়ঙ্কর সৈন্যসাগরে অবগাহন করিব। আপনি আমাকে দ্রোণসৈন্যবিনাশে আদেশ করিলেন; কিন্তু আমি কোন বিপদাবহ কার্য্যে অগ্রসর হইতে উৎসাহ করি না। রাজা যুধিষ্ঠির কহিলেন, বৎস! তুমি সৈন্য ভেদ করিয়া আমাদিগের প্রবেশদ্বার প্রস্তুত কর, তুমি তথায় গমন করিলে আমরা তোমার অনুগমন করিব। তুমি যুদ্ধে অর্জুন তুল্য, তোমাকে প্রেরণ করিয়া আমরা চতুৰ্দ্দিক্ রক্ষা করত তোমারই অনুগমন করিব। ভীম কহিলেন, বৎস! তুমি একবার যে ব্যূহ ভেদ করিবে, আমরা তথায় সমুপস্থিত হইয়া বারংবার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বীরদিগকে বিনষ্ট করিব।

অভিমন্যু কহিলেন, আর্য্য! যেমন পতঙ্গ ক্রুদ্ধ হইয়া প্রজ্বলিত হুতাশনে প্রবেশ করে, তদ্রূপ আমি নিতান্ত দুরধিগম্য দ্রোণসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিব। আজি আমি মাতৃ ও পিতৃ কুলের হিতকর কার্য্যানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইব; মাতুল ও পিতার প্রিয় কার্য্য অবশ্যই সংসাধন করিব। এক্ষণে সমস্ত প্রাণী একমাত্র শিশুর হস্তে শত্রুসৈন্যসকল বিনষ্ট হইতে নিরীক্ষণ করিবেন। যদি কেহ আজ আমার হস্তে প্রাণ পরিত্যাগ না করে, তাহা হইলে আমি সুভদ্রার গর্ব-সম্ভূত ও অর্জুনের ঔরসে সঞ্জাত নই। যদি আমি একমাত্র রথে আরোহণ করিয়া সমস্ত ক্ষত্রিয়মণ্ডলকে অষ্টধা খণ্ড খণ্ড করিতে না পারি, তাহা হইলে আমি আর আপনাকে অর্জুনের আত্মজ বলিয়া স্বীকার করিব না।

রাজা যুধিষ্ঠির কহিলেন, বৎস! তুমি আজি সাধ্য, রুদ্র ও দেবকল্প, মহাবল পরাক্রান্ত, বসু, হুতাশন ও আদিত্যসম বিক্রমশালী, মহাবীর গণকর্তৃক রক্ষিত নিতান্ত দুরধিগম্য দ্রোণসৈন্য বিনাশ করিতে উৎসাহিত হইয়াছ, অতএব তোমার বল বর্দ্ধিত হউক। মহাবীর অভিমন্যু রাজা যুধিষ্ঠিরের এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া সারথিকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সুমিত্র। তুমি অবিলম্বে দ্রোণসৈন্যাভিমুখে অশ্বচালন কর।

অভিমন্যুর ব্যূহমধ্যে প্রবেশ ও শত্রু নিধন।

সঞ্জয় কহিলেন, হে রাজন! অভিমন্যু "চালাও চালাও” বলিয়া সারথিকে বারংবার আদেশ করিলে সারথি সম্বোধন-পূর্ব্বক তাঁহাকে কহিল, হে আয়ুষ্মন্। পাণ্ডবগণ আপনার উপর গুরুতর ভার সমর্পণ করিয়াছেন; এক্ষণে উহা আপনার উপযুক্ত কি না, সবিশেষ বিবেচনা করিয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হউন। দ্রোণাচার্য্য কার্য্যকুশল ও দিব্যাস্ত্রে সুনিপুণ; আপনি নিরন্তর সুখসম্ভোগে পরিবর্জিত হইয়াছেন। তখন অভিমন্যু হাস্য করিয়া কহিলেন, হে সারথে। ক্ষত্রিয়গণ ও দ্রোণের কথা দূরে থাকুক, অমরগণ-পরিবৃত, ঐরাবতসমারাঢ়, ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্রের সহিতও যুদ্ধ করিব; আজি ক্ষত্রিয়গণের সহিত যুদ্ধ করিতে আমার কিছুমাত্র বিস্ময় নাই। এই সমস্ত শত্রুসৈন্য আমার ষোড়শভাগের উপযুক্ত হইতেছে না; অধিক কি, বিশ্ববিজয়ী মাতুল ও পিতার সহিত সমর করিতেও আমার অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার হয় না। অভিমন্যু এইরূপে সারথির বাক্যে অনাদর প্রদর্শন করিয়া কহিলেন, সূত। তুমি অবিলম্বে দ্রোণসৈন্যাভিমুখে গমন কর।

অনন্তর সারথি অতিশয় অসন্তুষ্টমনে ত্রিবর্ষবয়স্ক সুবর্ণ-মণ্ডিত অশ্বগণকে দ্রোণসৈন্যাভিমুখে চালন করিল। মহাবেগ পরাক্রমশালী অশ্বসকল সারথিকর্তৃক পরিচালিত হইয়া দ্রোণা-ভিমুখে ধাবমান হইল। কৌরবগণ অভিমন্যুকে আগমন করিতে অবলোকন করিয়া দ্রোণাচার্য্যকে পুরোবর্তী করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। এদিকে পাণ্ডবেরাও অভিমন্যু অনুসরণে প্রবৃত্ত হইলেন। যেমন সিংহশাবক হস্তিযূথ প্রাপ্ত হয়, তদ্রূপ কর্ণিকা-রলাঞ্ছিত ধ্বজদণ্ডশালী, সুবর্ণবৰ্ম্মসমালঙ্কৃত অভিমন্যু যুদ্ধার্থী হইয়া নির্ভীকের ন্যায় দ্রোণপ্রমুখ বীরগণকে প্রাপ্ত হইলেন। তখন কৌরবগণ নিতান্ত হৃষ্ট হইয়া অভিমন্যুকে প্রহার করিতে লাগিলেন। যেমন ভাগীরথীর আবর্ত সাগরমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া মুহূর্তকাল তুমুল হইয়া থাকে, তদ্রূপ পরস্পর প্রহরণশীল বীরগণের অতি ভীষণ যুদ্ধ তুমুল হইয়া উঠিল। ইত্যবসরে মহাবীর অভিমন্যু দ্রোণের সমক্ষে ব্যূহ ভেদ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন। অশ্ব, হস্তী ও পদাতিসকল মহাবল পরাক্রান্ত অভিমন্যুকে শত্রুমধ্যে প্রবিষ্ট ও বীর বিনাশে প্রবৃত্ত দেখিয়া হৃষ্টান্তঃকরণে চতুর্দিকে বেষ্টন করিল। বীরগণ নানাপ্রকার বাদ্যধ্বনি, সিংহনাদ, বাহ্বাস্ফোটন, গম্ভীর গর্জন, হুঙ্কার, থাক্ থাক্ শব্দ, ঘোর হলহলা রব, গমন করিও না, আমার নিকট অবস্থান কর, আমি এই স্থানে অবস্থান করিতেছি, এইরূপ কোলাহল, করি-বৃংহিত, ভূষণ-শিঞ্জিত', হাস্য ও অশ্বের খুরধ্বনিদ্বারা ভূমণ্ডল প্রতিধ্বনিত করিয়া অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর অভিমন্যু তাঁহাদিগকে আগমন করিতে নিরীক্ষণ করিয়া মর্মভেদী শরনিকরে বিনাশ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা বিবিধ লক্ষণলাঞ্ছিত শরজালে বিনষ্ট হইয়া শলভের হুতাশন প্রবেশের ন্যায় রণস্থলে নিপতিত হইতে লাগিল। তখন রণস্থল তাহাদিগের অবয়বে কুশসংস্তীর্ণ যজ্ঞবেদীর ন্যায় সমাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল। অভিমন্যু গোধাচৰ্ম্ম বিনির্মিত অঙ্গুলিত্রাণ, শর, শরাসন, অসি, চৰ্ম্ম, অঙ্কুশ, অভীষু', তোমর, পরশু, গদা, অয়োগুড়, প্রাস, ঋষ্টি, পট্টিশ, ভিন্দিপাল, পরিঘ, শক্তি, কম্পন, প্রতোদ, মহাশঙ্খ, কুন্ত, কুচগ্রহ, মুদ্গর, ক্ষেপণীয়, পাশ উপল, কেয়ূর ও অঙ্গদে সুশোভিত মনোহর গন্ধানুলিপ্ত সহস্র সহস্র করযুগল ছেদন করিলেন। বিহগ-রাজচ্ছিন্ন, পঞ্চশীর্ষ ভুজঙ্গের ন্যায় শোণিতলিপ্ত করনিকরে সমরভূমি সুশোভিত হইতে লাগিল। যে সকল মস্তক মনোহর নাসা, আনন ও কেশকলাপে সুশোভিত, সুচারুকুণ্ডল, মাল্য, মুকুট, উষ্ণীষ, মণি ও রত্নে বিরাজিত, বিনাল নলিনের' ন্যায় আকার ও চন্দ্র-সূর্য্যের ন্যায় প্রভাবসম্পন্ন এবং ব্রণশূন্য; যাহা রোষবশতঃ ওষ্ঠপুট দংশন করিয়া রহিয়াছে; যাহা হইতে রুধিরধারা বিনিঃসৃত হইতেছে; জীবনকালে যাহা হিতকর ও প্রীতিকর বাক্য কহিত, অভিমন্যু অরাতিগণের সেই সুগন্ধময় মস্তকসমূহে ধরামণ্ডল আচ্ছন্ন করিলেন। গন্ধর্ব্ব-নগরাকার যে সকল রথ ঈষামুখ, বিচিত্রবেণু ও দণ্ডে যথাবিধি সুসজ্জিত ছিল, অভিমন্যুর শরনিকরে তাহার রথীসকল বিনষ্ট, জঙ্ঘা, অভিঘ্র, নাসা, দশন, চক্র, উপস্কর ও উপস্থ সকল ছেদিত, উপকরণসকল ভগ্ন, আস্তরণসকল নিক্ষিপ্ত, পরিশেষে রথসকলও খণ্ড খণ্ড হইল। অনন্তর তিনি পতাকা, অঙ্কুশ ও ধ্বজসম্পন্ন তৃণ-বৰ্ম্মধারী শত্রুপক্ষে গজারোহী, গজ ও পাদরক্ষকদিগকে গ্রীবাবন্ধনরজ্জু, কম্বল, ঘণ্টা, শুশু ও দশনাগ্রভাগের সহিত নিশিত শরনিকরে ছেদন করিলেন। বনায়ুজ, কাম্বোজ, বাহ্লিক ও পার্ব্বতীয়, স্থিরপুচ্ছ, স্থিরকর্ণ, স্থিরনেত্র, বেগশালী যে সকল অশ্ব শক্তি, ঋষ্টি ও প্রাসযোধী সুশিক্ষিত যোদ্ধৃগণে সমারূঢ় ছিল, তাঁহাদিগের মুকুট ও চামর বিনষ্ট, জিহ্বা ও নয়ন ছিন্ন, অস্ত্র ও যকৃৎ নিষ্কাশিত, আরোহিগণ নিহত এবং চৰ্ম্ম ও বৰ্ম্ম নিকর্তিত হইল। তাহারা মল, মূত্র ও রুধিরধারায় পরিপ্লুত ও গতজীবন হইয়া ক্রব্যাদ্-গণের প্রমোদবর্দ্ধন করিতে লাগিল। যেমন ভগবান্ শূলপাণি ঘোরতর অসুরবল সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ বিষ্ণুর সদৃশ অচিন্ত্যপ্রভাব একাকী অভিমন্যু ঈদৃশ অতি দুষ্কর কার্য্য সমাধান করিয়া, আস্যদেশ হইতে আচ্ছিন্ন গ্রাসের অঙ্গত্রয়সম্পন্ন আপনার সৈন্যসমুদায় বিমর্দিত ও পদাতিগণকে ছিন্ন ভিন্ন করিতে লাগিলেন।

অনন্তর কার্তিকেয় যেমন আসুরী-সেনা নিহত করিয়া-ছিলেন, তদ্রূপ একমাত্র অভিমন্যু কৌরবসৈন্যগণকে নিহত করিতেছেন নিরীক্ষণ করিয়া আপনার পক্ষ বীরগণ ও আপনার পুত্রগণ দশদিক্ অবলোকন করিতে লাগিলেন; তাঁহাদিগের মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। নয়নযুগল নিতান্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল। কলেবর কণ্টকিত ও ঘর্মাক্ত হইতে লাগিল। তখন তাঁহারা শত্রুপরাজয়ে উৎসাহশূন্য ও পলায়নে সমুৎসুক হইয়া জীবিতাভিলাষে গোত্র ও নাম উচ্চারণপূর্ব্বক পরস্পরকে আহ্বান, নিহত পিতা, পুত্র, ভ্রাতা, বন্ধু ও সম্বন্ধীদিগকে পরিত্যাগ এবং করী ও তুরগে আরোহণ করিয়া সত্বরে প্রস্থান করিলেন।

কৌরবগণের সহিত একাকী অভিমন্যুর ঘোর সংগ্রাম।

সঞ্জয় কহিলেন, হে রাজন! অনন্তর মহারাজ দুর্য্যোধন অভিমন্যুর শরে স্বীয় সৈন্যগণকে ছিন্ন ভিন্ন দেখিয়া ক্রোধা-বিষ্ট চিত্তে তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন দ্রোণাচার্য্য দুর্য্যোধনকে অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান দেখিয়া যোদ্ধাদিগকে কহিলেন, হে বীরগণ! তোমরা অবিলম্বে দুর্য্যোধনের অনুসরণ কর, অভিমন্যু আমাদিগের সমক্ষে বীরগণকে বিনাশ করিতেছে; এক্ষণে তোমরা ভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হও এবং কৌরবগণকে পরিত্রাণ কর। তখন মহাবল পরাক্রান্ত সমরবিজয়ী সুহৃদ্গণ তাঁহার আদেশ শিরোধার্য্য করিয়া ভীত মনে দুর্য্যোধনকে বেষ্টন করিলেন। পরে দ্রোণাচার্য্য, অশ্বত্থামা, কৃপ, কর্ণ, কৃতবর্মা, শকুনি, বৃহদ্বল, মদ্ররাজ, ভূরি, ভূরিশ্রবাঃ, শল্য ও পৌরব বৃষসেন অনবরত শরবর্ষণপূর্ব্বক অভিমন্যুকে নিবারিত ও বিমোহিত করিয়া রাজা দুর্য্যোধনকে মুক্ত করিলেন। অভিমন্যু আস্যদেশ হইতে আচ্ছিন্ন গ্রাসের ন্যায় এই ব্যাপার সহ্য করিতে সমর্থ হইলেন না; সুতরাং শরজালে অশ্ব, সারথি ও মহারথদিগকে পরাজুখ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। দ্রোণ প্রভৃতি মহারথগণ আমিষলোলুপ সিংহসদৃশ অভিমন্যুর সিংহনাদ সহ্য করিতে না পারিয়া রথসমূহে তাঁহাকে বেষ্টনপূর্ব্বক বিবিধ লাঞ্ছনলাঞ্ছিত শরজাল পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর অভিমন্যু নিশিত শরনিকরে অন্তরীক্ষেই সেই সমস্ত অস্ত্র নিরস্ত করিয়া তাঁহাদিগকে বিদ্ধ করিলেন। তখন এই ব্যাপার নিতান্ত অদ্ভুত বলিয়া প্রতীয়মান হইতে লাগিল। অনন্তর দ্রোণ প্রভৃতি মহাবীরগণ রোষপরবশ হইয়া সমরে অপরাজুখ অভিমন্যুকে বিনাশ করিবার মানসে আশীবিষসদৃশ শরনিকরে আচ্ছন্ন করিলেন। অভিমন্যু একাকী বেলার ন্যায় বিক্ষোভিত সমুদ্রসদৃশ সেই বলসমুদায় ধারণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে পরস্পর সংহার প্রবৃত্ত উভয় পক্ষের কেহই রণস্থল হইতে পরাজুখ হইলেন না। তখন দুঃসহ নয়, দুঃশাসন দ্বাদশ, কৃপাচার্য্য তিন, দ্রোণ সপ্তদশ, বিবিংশতি সপ্ততি, কৃতবর্মা সাত, বৃহদ্বল আট, অশ্বত্থামা সাত, ভূরিশ্রবাঃ তিন, মদ্ররাজ ছয়, শকুনি দুই, রাজা দুর্য্যোধন তিন শরে অভিমন্যুকে বিদ্ধ করিলে মহাপ্রতাপশালী অভিমন্যু যেন নৃত্য করিতে করিতেই তাঁহাদিগকে তিন তিন শরে বিদ্ধ করিলেন।

দুর্য্যোধন প্রভৃতি বীরগণ অভিমন্যুকে এইরূপ ভয়প্রদর্শন করিলেও তিনি সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া অভ্যাসকৃত বলপ্রদর্শন-পূর্ব্বক বিনতানন্দন গরুড় ও অনিলতুল্য বেগশালী সারথির

আদেশানুবর্তী অশ্বদ্বারা ত্বরমাণ অশ্বকেশ্বরকে নিবারণ করিলেন। শ্রীমান অশ্মকেশ্বর অভিমন্যুর অভিমুখীন হইয়া থাক্ থাক্, বলিয়া দশ শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলে মহাবীর অভিমন্যু সহাস্যমুখে দশ শরে তাঁহার সারথি, অশ্ব, ধ্বজ, বাহুযুগল, ধনুঃ ও মস্তক পৃথিবীতে নিপাতিত করিলেন। তখন অশ্মকে-শ্বরের সৈন্যসমুদায় পলায়ন করিতে লাগিল। অনন্তর কর্ণ, কূপ, দ্রোণ, অশ্বত্থামা, গান্ধাররাজ শকুনি, শল, শল্য, ভূরিশ্রবাঃ, ক্রাথ, সৌমদত্তি, বিবিংশতি, বৃষসেন, সুষেণ, কুণ্ডভেদি, প্রতৰ্দ্দন, বৃন্দারক, ললিখ, প্রবাহু, দীর্ঘলোচন ও দুর্য্যোধন ক্রোধভরে অভিমন্যুর প্রতি শর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। অভিমন্যু শরনিকরে নিতান্ত বিদ্ধ হইয়া কর্ণের প্রতি বৰ্ম্ম ও কায়ভেদী এক শর সন্ধান করিলেন। সেই শর কর্ণের বর্ম্মভেদ করিয়া বল্মীকমধ্যে পন্নগপ্রবেশের ন্যায় ধরণীতলে প্রবেশ করিল। মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণ সেই নিদারুণ প্রহারে ব্যথিত ও বিহ্বল হইয়া ভূকম্পকালীন অচলের ন্যায় নিতান্ত বিচলিত হইয়া উঠিলেন। অনন্তর অভিমন্যু একান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া অন্য নিশিত শরত্রয়ে দীর্ঘলোচন সুষেণ ও কুণ্ডভেদিকে বিদ্ধ করিলে কর্ণ তাঁহার প্রতি পঞ্চবিংশতি নারাচ, অশ্বত্থামা বিংশতি শর ও কৃতবর্মা সাত শর নিক্ষেপ করিলেন। সৈন্যগণ শরাচিত-কলেবর নিতান্ত ক্রুদ্ধ, অর্জুনাত্মজ অভিমন্যু পাশহস্ত অন্তকের ন্যায় রণস্থলে বিচরণ করিতেছেন নিরীক্ষণ করিল। মহাবীর অভিমন্যু সন্নিহিত শল্যকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিয়া কৌরবসৈন্যগণকে বিভীষিকা প্রদর্শনপূর্ব্বক আক্রোশ করিতে লাগিলেন। শল্য মৰ্ম্মভেদী শরনিকরে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া রথো-পন্থে বিষণ্ণ ও বিমোহিত হইলেন। আপনার সৈন্যগণ শল্যকে শরবিদ্ধ নিরীক্ষণ করিয়া সিংহপীড়িত মৃগের ন্যায় দ্রোণাচার্য্যের সমক্ষেই পলায়ন করিতে লাগিল। তখন দেবতা, চারণ, সিদ্ধ ও পিতৃগণ এবং অবনিতলগত ভূতসমুদায় সামরিক যশে অভিমন্যুকে অর্চ্চনা করিতে আরম্ভ করিলে তিনি হুত হুতাশনের ন্যায় অপূর্ব্ব শোভা প্রাপ্ত হইলেন।

অভিমন্যুকর্তৃক শল্য-ভ্রাতৃ বধ ও শল্যসৈন্যগণের পরাজয়।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবীর অর্জুনতনয় এই-- রূপে মহাধনুর্দ্ধরগণকে বিমৰ্দ্দন করিতেছে দেখিয়া আমাদের - কোন্ কোন্ বীর তাঁহাকে নিবারণ করিল?

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর অর্জুনকুমার যেরূপে - দ্রোণসংরক্ষিত রথসৈন্য ভেদ করিবার মানসে সমরক্রীড়া করিয়াছিলেন, শ্রবণ করুন। শল্যের কনিষ্ঠ ভ্রাতা স্বীয় জ্যেষ্ঠকে - অভিমন্যুর শরে নিতান্ত ব্যথিত দেখিয়া ক্রোধভরে বাণ নিক্ষেপ করত তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। লঘুহস্ত মহাবীর অর্জুনতনয় নিশিত শরনিকর নিক্ষেপ করিয়া এককালে তাঁহার মস্তক, হস্ত, পাদ, সাদি, অশ্ব, ছত্র, ধ্বজ, ত্রিবেণু, তল্প', চক্র, যুগ, ঈষা, তৃণীর, অনুকর্ষ, পতাকা ও অন্যান্য রথোপকরণ এবং দুই জন চক্রগোপ্তা ও সারথিকে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় কোন ব্যক্তিই তাঁহাকে নয়নগোচর করিতে সমর্থ হইল না। মহাবীর শল্যানুজ এইরূপে অর্জুনতনয়ের শরে নিহত হইয়া প্রবল বায়ুবেগ-সংরুগ্ন মহাশৈলের ন্যায় ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তাঁহার অনুচরগণ শ্রান্ত ও ভীত হইয়া চতুর্দিকে পলায়ন করিতে লাগিল। তত্রস্থ সমস্ত লোক অর্জুনতনয়ের সেই অলৌকিক কার্য্য সন্দর্শন করিয়া সাধু সাধু, বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিল।

এইরূপে শল্যের অনুজ নিহত হইলে তাঁহার বহুসংখ্যক সৈন্যগণ অর্জুনতনয়কে স্ব স্ব কুল, অধিবাস' ও নাম শ্রবণ করাইয়া বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক ক্রোধভরে তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইল। উহারা কেহ রথে, কেহ গজে, কেহ অশ্বে, কেহ কেহ বা পাদচারে গমনপূর্ব্বক ঘোরতর বাণশব্দ, রথনেমিনিস্বন, হুঙ্কার, সিংহনাদ, জ্যানিস্বন, তল-ধ্বনি ও গর্জন করত অদ্য জীবিতাবস্থায় আমাদের নিকট পরিত্রাণ পাইবে না, বলিয়া অভিমন্যুকে তর্জন করিতে লাগিল। মহাবীর অভিমন্যু তাহাদের বাক্য শ্রবণে ঈষৎ হাস্য করিলেন ও তাহাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাঁহাকে অগ্রে প্রহার করিল, তাহাকে অস্ত্রদ্বারা বিদ্ধ করিয়া বিচিত্র অস্ত্রলাঘব প্রদর্শন করিবার মানসে মৃদুতাসহকারে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। পরে বাসুদেব ও অর্জুনের নিকট প্রাপ্ত অস্ত্রসমুদায় অবিকল তাঁহাদের উভয়ের ন্যায় প্রয়োগ করিতে আরম্ভ করিলেন। সমরকালে তাঁহার বাণসন্ধান ও বাণনিক্ষেপের কিছুমাত্র ভেদ লক্ষিত হইল না। ঐ মহাবীরের চতুদ্দিকে বিস্ফুরিত চাপমণ্ডল শরৎকালীন সুদীপ্ত সূর্য্যমণ্ডলের ন্যায় নয়নগোচর হইতে লাগিল। উঁহার জ্যানির্ঘোষ ও তলশব্দ বর্ষাকালীন পয়োধরবিনির্মুক্ত অশনিনির্ঘোষের ন্যায় শ্রুত হইল। হ্রীমান, অমর্ষী, মানকৃৎ, প্রিয়দর্শন অভিমন্যু বীরগণের মানরক্ষার্থ বাণ ও অস্ত্রদ্বারা মৃদুযুদ্ধ করিতে লাগিলেন। অনন্তর যেমন ভগবান্ ভাস্কর বর্ষাকাল অতীত হইলে প্রখর হইয়া উঠেন, তদ্রূপ মহাবীর অর্জুনতনয় প্রথমে মৃদু হইয়া ক্রমে ক্রমে তীক্ষ্ণতা অবলম্বনপূর্ব্বক সূর্যরশ্মির ন্যায় সুতীক্ষ্ণ রুক্মপুঙ্খ বিচিত্র শরনিকর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন এবং সহস্র সহস্র ক্ষুরপ্র বৎসদণ্ড বিপাঠ অর্দ্ধচন্দ্রসন্নিভ নারাচ, ভল্ল ও অঞ্জলিক-দ্বারা দ্রোণের সমক্ষে রথসৈন্যকে সমাচ্ছাদিত করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে কৌরবসৈন্যগণ মহাবীর অর্জুনতনয়ের ভীষণ শরনিকরে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া সমরে বিমুখ হইতে লাগিলেন।

অভিমন্যুর বীরত্বে দুর্য্যোধনের আক্ষেপ ও অভিমন্যুর সহিত দুঃশাসনের যুদ্ধ।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবীর অর্জুনতনয় অনায়াসে আমার পুত্রের সৈন্যগণকে নিবারণ করিতেছে শুনিয়া আমার হৃদয় লজ্জা ও সন্তোষে যুগপৎ আক্রান্ত হইতেছে। এক্ষণে অসুরগণের সহিত কার্তিকেয়ের সংগ্রামের ন্যায় কৌরবগণের সহিত অভিমন্যুর সংগ্রাম সবিস্তরে কীর্তন কর।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর অভিমন্যু একাকী যে বহুসংখ্যক বীরগণের সহিত তুমুল সংগ্রাম করিয়াছিলেন, তদ্বিষয় সবিস্তরে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। রথারূঢ় মহাবীর অভিমন্যু উৎসাহসহকারে সমরোৎসাহী অরাতিনিপাতন কৌরবপক্ষ রথিগণের উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। ঐ মহাবীর সমরাঙ্গনে অলাতচক্রের ন্যায় ভ্রমণ করত দ্রোণ, কর্ণ, কূপ, শল্য, অশ্বত্থামা, ভোজ, বৃহদ্বল, দুর্য্যোধন, সৌমদত্তি, শকুনি অন্যান্য বহুসংখ্যক নৃপতি ও নৃপতিতনয় এবং সৈন্যগণকে সত্বরে শরবিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় তাঁহার লঘুচারিত্ব'-প্রযুক্ত তাঁহাকে চতুৰ্দ্দিকে বর্তমান বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। হে মহারাজ! আপনার পক্ষ সৈন্যগণ অমিততেজাঃ অভিমন্যুর এইরূপ অসামান্য সমরদক্ষতা সন্দর্শন করিয়া একান্ত বিত্রাসিত ও প্রকম্পিত হইতে লাগিল।

তখন প্রতাপশালী মহাবীর দ্রোণাচার্য্য অভিমন্যুর অসাধারণ পরাক্রম সন্দর্শনে হর্ষোৎফুল্ললোচন হইয়া দুর্য্যোধনের মৰ্ম্ম বিঘট্টিত করিয়াই যেন কৃপকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, ভদ্র! ঐ দেখ, মহাবীর সুভদ্রাতনয় ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব, ভীমসেন ও অন্যান্য বান্ধব, সম্বন্ধী এবং মধ্যস্থ-গণকে সন্তোষিত করত পাণ্ডবগণের অগ্রে গমন করিতেছেন। আমার মতে উঁহার সমান সমরবিশারদ ধনুর্দ্ধর আর কেহই নাই। ঐ মহাবীর ইচ্ছা করিলে অনায়াসে সমুদায় কৌরবসৈন্য সংহার করিতে পারেন, কিন্তু কি নিমিত্ত ইচ্ছা করিতেছেন না, বলিতে পারি না। তখন মহারাজ দুর্য্যোধন বর্ণ, বাহীক, দুঃশাসন, শল্য ও অন্যান্য ভূপতিগণকে কহিতে লাগিলেন; হে ভূপগণ। দেখ, সমুদায় ক্ষত্রিয়গণের আচার্য্য ব্রহ্মবিদাগ্রগণ্য দ্রোণ মোহ-বশতঃ অর্জুনতনয়কে নিধন করিতে ইচ্ছা করিতেছেন না। আমি সত্য করিয়া কহিতেছি যে, আচার্য্য বধোদ্যত হইয়া সংগ্রাম করিলে মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক, উঁহার নিকট যমেরও নিস্তার নাই। কিন্তু অর্জুন উঁহার শিষ্য; শিষ্য, পুত্র ও তাহাদের ধার্মিক অপত্য, নিতান্ত স্নেহের ভাজন হয়, বলিয়াই আচার্য্য অভিমন্যুকে রক্ষা করিতেছেন। অর্জুননন্দন দ্রোণকর্তৃক রক্ষিত হইয়াই আপনাকে বীর্য্যবান্ বোধ করিতেছে, অতএব সেই পৌরুষা-ভিমানী মূঢ়কে শীঘ্র সংহার কর।

বীরগণ দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণে ক্রুদ্ধচিত্তে অভিমন্যুকে নিধন করিবার বাসনায় সত্বরে দ্রোণাচার্য্যের সমক্ষে তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন দুঃশাসন দর্পসহকারে দুর্য্যোধনকে কহিলেন, মহারাজ। যেমন রাহু দিবাকরকে গ্রাস করে, তদ্রূপ আজি আমি সমুদায় পাঞ্চাল ও পাণ্ডুপুত্রগণের সমক্ষে অভিমন্যুকে সংহার করিব। তখন মহাভিমানী কৃষ্ণ ও অর্জুন আমার হস্তে অভিমন্যুর নিধনবার্তা শ্রবণ করিলে অবশ্যই প্রাণত্যাগ করিবে; পরে পাণ্ডুর অন্যান্য পুত্রগণও কৃষ্ণার্জুনের মৃত্যু-সংবাদ শ্রবণে বন্ধুবান্ধবগণ-সমভিব্যাহারে জড়ের ন্যায় অসমর্থ হইয়া একদিনে কৃতান্তের করালকবলে নিপতিত হইবে, সন্দেহ নাই। হে বুরুরাজ। এইরূপে এক অভিমন্যু নিহত হইলে তোমার সমুদায় শত্রু নিহত হইবে; অতএব আমার মঙ্গলচিন্তা কর। আমি তোমার শত্রুগণকে সংহার করিতেছি।

হে রাজন! আপনার পুত্র দুঃশাসন এই বলিয়া উচ্চস্বরে ধ্বনি করত ক্রোধভরে অভিমন্যুর অভিমুখীন হইয়া তাঁহার উপর শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর অভিমন্যুও তাঁহার উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর দুঃশাসন ক্রুদ্ধ হইয়া মত্তমাতঙ্গের ন্যায় অভিমন্যুর সহিত সংগ্রাম করিতে লাগিলেন। পরে সেই রথশিক্ষাবিশারদ বীরদ্বয় রথদ্বারা সব্য ও দক্ষিণে বিচিত্র মণ্ডলাকারে বিচরণপূর্ব্বক সংগ্রাম আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় সকলে তুমুল পণব, মৃদঙ্গ, দুন্দুভি, ক্রকচ, মহানক', ঝর্ঝর ও ভেরীধ্বনি এবং সাগর-নিনাদ-সদৃশ সিংহনাদ করিতে লাগিলেন।

অভিমন্যুকর্তৃক দুঃশাসনের পরাজয়।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! শরবিক্ষতগাত্র মহাবীর অভিমন্যু গর্বিত বচনে স্বীয় অমিত্র মহাবীর দুঃশাসনকে কহিতে লাগিলেন, হে বৃথাক্রোধপরায়ণ, অধর্মনিরত, বীরাভিমানী পুরুষ! অদ্য সৌভাগ্যক্রমে সংগ্রামে তোমাকে নয়নগোচর করিতেছি; তুমি যে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সমক্ষে সভামধ্যে কটূক্তিদ্বারা ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে কোপিত করিয়াছিলে এবং কপট দ্যুত আশ্রয়পূর্ব্বক বলমদে মত্ত হইয়া মহাবীর ভীমসেনকে যে কুবাক্য বলিয়াছিলে, আজি তাহার ফল প্রাপ্ত হইবে। অরে দুৰ্ম্মতে। আজি অবিলম্বেই পরবিত্তাপহরণ, ক্রোধ, অশান্তি, লোভ, অজ্ঞানতা, দ্রোহ, অত্যাহিত' এবং আমার গুরুগণের রাজ্য হরণ প্রভৃতি অধর্ম্মের ফললাভ করিবে। আমি সমরে সৈন্যগণসমক্ষে শরনিকরদ্বারা অতি সত্বরে তোমাকে শাস্তি প্রদান করিয়া ক্রোধপরায়ণা দ্রুপদাত্মজা ও অমর্ষপরবশ মহাবীর বৃকোদরের নিকট আনৃণ্য লাভ করিব। যদি তুমি সমর পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন না কর, তবে আমার নিকট কখনই তোমার জীবন রক্ষা হইবে না।

মহাবীর অর্জুনতনয় এইরূপে তর্জন করিয়া দুঃশাসনের বিনাশের নিমিত্ত কাল', অগ্নি ও অনিলের ন্যায় তেজঃসম্পন্ন ভীষণ বাণ নিক্ষেপ করিলেন। অভিমন্যুনিক্ষিপ্ত সায়ক দুঃশাসনের জক্রদেশ ভেদ করিয়া সর্পের বল্মীকপ্রবেশের ন্যায় পুঙ্খের সহিত ভূতলে প্রবিষ্ট হইল। মহাবীর অর্জুনতনয় শরাসন আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক পুনরায় দুঃশাসনকে পঞ্চ বিংশতি শরে বিদ্ধ করিলেন। মহাবাহু দুঃশাসন অভিমন্যুর শরে গাঢ়বিদ্ধ ও ব্যথিত হইয়া রথোপন্থে শয়ান ও মূর্ছিত হইলেন। তখন সারথি তাঁহাকে অচেতন নিরীক্ষণ করিয়া সত্বরে সংগ্রামস্থল হইতে অপসৃত করিলে সমুদায় পাণ্ডব, দ্রৌপদেয়, পাঞ্চাল ও কেকয়গণ এবং বিরাট দুঃশাসনকে দেখিয়া ঘোরতর সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। পাণ্ডবপক্ষ সৈন্যগণ সমরপরিতুষ্ট হইয়া নানাবিধ বাদ্যবাদন করিয়া বিস্মিতচিত্তে প্রধান শত্রু দুঃশাসনের পরাজয়কারী মহাবীর অভিমন্যুর বিক্রম দেখিতে লাগিল। ধৰ্ম্ম, পবন, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের প্রতিমূর্ত্তিলক্ষিত ধ্বজ বিভূষিত স্যন্দনে সমারূঢ় মহাবীর দ্রৌপদীতনয়গণ, মহাবল পরাক্রান্ত সাত্যকি, চেকিতান, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, কৈকেয়, ধৃষ্টকেতু এবং মৎস্য, পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ যুধিষ্ঠির প্রমুখ পাণ্ডবগণ-সমভিব্যাহারে দ্রোণসৈন্যগণকে ছিন্ন ভিন্ন করিবার মানসে সত্বরে ধাবমান হইলেন। তখন সমরে অপরাজুখ জয়াভিলাষী উভয়পক্ষ বীরগণের ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভহইল। এইরূপে অতি ভয়ঙ্কর সমর সমুপস্থিত হইলে কুরুরাজ দুর্য্যোধন কর্ণকে কহিলেন, অঙ্গরাজ! ঐ দেখ, আদিত্যতুল্য প্রতাপশালী মহাবীর দুঃশাসন সমরে শত্রুসৈন্যকে নিধন করিয়া পরিশেষে অভিমন্যুর বশীভূত হইয়াছে এবং পাণ্ডবগণ মহাবল সিংহের ন্যায় ক্রোধাবিষ্টচিত্তে অর্জুনতনয়কে রক্ষা করিবার নিমিত্ত সমরক্ষেত্রে ধাবমান হইতেছে।

অভিমন্যুর সহিত কর্ণের সংগ্রাম ও সংগ্রামে কর্ণের পরাজয়।

হে মহারাজ। তখন আপনার পুত্রের পরম হিতকারী মহাবীর কর্ণ ক্রোধান্বিত চিত্তে সুতীক্ষ্ণ সায়কসমুদায়দ্বারা অভিমন্যুকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার অনুচরগণের উপর তীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। দ্রোণসমীপগমনাভিলাষী মহামতি অর্জুনতনয় সত্বরে ত্রিসপ্ততি শরে কর্ণকে বিদ্ধ করিয়া কৌরবপক্ষ রথিশ্রেষ্ঠদিগকে ব্যথিত করিতে লাগিলেন। তথাপি তাঁহাদের মধ্যে কেহই সেই মহাবীর পুরন্দর-পৌত্রকে দ্রোণ-সমীপগমনে বিরত করিতে পারিলেন না। তখন সমুদায় ধনুর্দ্ধর অপেক্ষা অভিমানী জয়াভিলাষী পরশুরামের শিষ্য মহাবীর কর্ণ শত শত উত্তম অস্ত্রে অভিমন্যুকে পীড়িত করিতে লাগিলেন। কিন্তু মহাবলপরাক্রান্ত অমরসদৃশ অর্জুনতনয় তাহাতে কিছুমাত্র ব্যথিত হইলেন না। তিনি শিলাশিত আনতপর্ব্ব বহুসংখ্য ভল্লদ্বারা শূরগণের শরাসন ছেদন করিয়া কর্ণের উপর শরাঘাত করিতে লাগিলেন এবং শরাসন-বিনির্মুক্ত আশীবিষসন্নিভশরনিকরে তাঁহার ছত্র, ধ্বজ, অশ্বসমুদায় ও সারথিকে ছেদন করিয়াছিলেন। অনন্তর মহাবীর কর্ণ অভিমন্যুর উপর সন্নতপর্ব্ব পাঁচ শর নিক্ষেপ করিলে, মহাবীর অর্জুনতনয় অনায়াসে সেই সকল সহ্য করিয়া মুহূর্ত্তমধ্যে একবাণে তাঁহার ধ্বজ ও শরাসন ছেদনপূর্ব্বক ভূতলে পাতিত করিলেন। তখন কর্ণের ভ্রাতা তাঁহাকে তদবস্থ নিরীক্ষণপূর্ব্বক সুদৃঢ় কাৰ্ম্মক সমুদ্যত করিয়া সত্বরে অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। পাণ্ডবগণ ও তাঁহাদের অনুচরবর্গ কর্ণের সেইরূপ দুর্দশা দেখিয়া উচ্চস্বরে চীৎকার, বাদিত্রবাদন ও অভিমন্যুর প্রশংসা করিতে লাগিলেন।

অভিমন্যুকর্তৃক কর্ণ-ভ্রাতৃ বধ ও কর্ণের সংগ্রাম ত্যাগ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! কর্ণের ভ্রাতা বারংবার গর্জন ও শরাসনজ্যা-বিকর্ষণ করত সত্বরে অভিমন্যু ও কর্ণের রথের মধ্যস্থলে সমুপস্থিত হইয়া দশ বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক অভিমন্যুকে ও তাহার সারথিকে ছত্র, ধ্বজ ও অশ্বের সহিত বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর অভিমন্যু স্বীয় পিতা পিতামহের ন্যায় অমানুষ কৰ্ম্ম করিয়া পরিশেষে কর্ণের ভ্রাতার শরে পীড়িত হইলেন দেখিয়া কৌরবগণের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। তখন মহাবীর অভিমন্যু দর্পসহকারে এক বাণ পরিত্যাগ করিয়া কর্ণের ভ্রাতার মস্তক ছেদনপূর্ব্বক ভূতলে পাতিত করিলেন। মহাবীর কর্ণ অভিমন্যু-শরনিহত ভ্রাতাকে বায়ুবেগে পৰ্ব্বত হইতে নিপতিত কর্ণিকারের ন্যায় ভূতলে পতিত দেখিয়া সাতিশয় ব্যথিত হইলেন।

এইরূপে মহাবীর অর্জুনতনয় কর্ণকে সমরবিমুখ করিয়া কঙ্কপত্রযুক্ত শরনিকর নিক্ষেপ করত অন্যান্য বীরগণের প্রতি ধাবমান হইলেন এবং সেই বিবিধ চতুরঙ্গ কৌরব সৈন্যগণকে ক্রোধভরে বাণ বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। কর্ণ অভিমন্যুর শরনিকরে সমাহত ও ব্যথিত হইয়া মহাবেগে রণস্থল হইতে প্রস্থান করিলেন; সৈন্যগণ তদ্দর্শনে রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিতে লাগিল। বারিধারা ও শলভনিকরসদৃশ মহাবীর অভিমন্যুর শরসমূহে গগনমণ্ডল সমাচ্ছাদিত হইলে কোন বস্তুই দৃষ্টিগোচর হইল না। কৌরবপক্ষ সৈন্যগণ অভিমন্যুর শরে জর্জরিত হইয়া সকলেই পলায়ন করিল। কেবল মহাবীর সিন্ধুরাজ সেই স্থানে অবস্থান করিতে লাগিলেন।

তখন মহাবীর অর্জুনতনয় শঙ্খ বাদনপূর্ব্বক কৌরব সৈন্যমধ্যে নিপতিত হইয়া কক্ষদহন দহনের ন্যায় বাণানলে শত্রুগণকে দগ্ধ করিতে লাগিলেন এবং মুহূর্তমধ্যে অসংখ্য রথ, নাগ, অশ্ব ও পদাতিকগণকে সংহার করিয়া ভূতল কবন্ধময় করিলেন। কৌরবসৈন্যগণ অভিমন্যুর শরে নিতান্ত কাতর হইয়া জীবনরক্ষার্থ চতুর্দিকে ধাবমান হইয়া স্বপক্ষগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। অর্জুনতনয় বিক্ষিপ্ত বিষমবিপাঠ সকল রথ, নাগ ও অশ্বসমুদায় নিধন করিয়া ধরাতলে পতিত হইল। আয়ুধ, অঙ্গুলিত্রাণ, গদা ও অঙ্গদ সমবেত, হেমাভরণভূষিত সহস্র সহস্র ছিন্ন বাহু এবং অসংখ্য সায়ক, শরাসন, খড়া, নরকলেবর ও মাল্য, কুণ্ডলসনাথ নরমস্তকসকল ধরাতলে নিপতিত হইতে লাগিল। রাশি রাশি দিব্য ভূষণ ভূষিত আসন, কষাদণ্ড, অক্ষ, চক্র, যুগ, শক্তি, চাপ, অসি, ধ্বজ, চৰ্ম্ম ও শরসমুদায় এবং অসংখ্য মৃত ক্ষত্রিয়, মৃত গজ ও মৃত তুরঙ্গ নিপতিত হওয়াতে রণস্থল ক্ষণকালমধ্যে অগম্য ও ভয়ানক হইয়া উঠিল। বধ্যমান রাজপুত্রসকল পরস্পর ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলে সমরাঙ্গনে ভীরুজনভয়াবহ ঘোরতর শব্দ সমুত্থিত হইয়া চতুৰ্দ্দিক্ প্রতিধ্বনিত করিল। ঐ সময় মহাবীর অর্জুননন্দন অসংখ্য শত্রুসৈন্য এবং রথ, অশ্ব ও গজসমুদায় সংহার করত কৌরবসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া অনলের কক্ষ-দহনের ন্যায় অরাতিগণকে সংহারপূর্ব্বক চতুর্দিকে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। সৈন্যগমনসম্ভূত প্রভূত পার্থিব ধূলি সমুত্থিত হওয়াতে আমরা তৎকালে সেই অসংখ্য গজ, অশ্ব ও মনুষ্য-গণের প্রাণনাশক মহাবীর অভিমন্যুকে নয়নগোচর করিতে পাইলাম না বটে, কিন্তু ক্ষণকাল পরেই মহাবীর অর্জুনতনয় মধ্যাহ্নকালীন ভাস্করের ন্যায় অরাতিগণকে তাপিত করত সৈন্যমধ্যে দৃষ্ট হইয়া শোভা পাইতে লাগিলেন।

শিব-বরে বলীয়ান্ জয়দ্রথকর্তৃক চক্রব্যূহ রক্ষা।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! পরম-সুখোচিত বাহুবল-দর্পিত সমরকুশল বালক অর্জুনতনয় ত্রিহায়ণ' উৎকৃষ্ট অশ্ব-যোজিত রথে আরোহণ করিয়া প্রাণপণে সংগ্রাম করিবার বাসনায় সমরসাগরে অবগাহন করিলে পাণ্ডবসৈন্যগণের মধ্যে কোন্ কোন্ মহাবীর তাঁহার অনুগমন করিয়াছিলেন?

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, নকুল, সহদেব, মৎস্যদেশীয়গণ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, বিরাট, দ্রুপদ, কৈকেয় ও ধৃষ্টকেতু প্রভৃতি অভিমন্যুর আত্মীয় তাঁহাকে রক্ষা করিবার মানসে তাঁহার অনুসরণক্রমে সমরে ধাবমান হইলেন। কৌরব-সৈন্যগণ পাণ্ডবপক্ষ বীরগণকে সমরে ধাবমান অবলোকন করিয়া রণে পরাত্মখ হইল। তখন আপনার জামাতা উগ্রধন্বা মহাতেজস্বী সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ কৌরবসৈন্যগণকে স্থির করিবার মানসে দিব্যাস্ত্র সমুদায় প্রয়োগপূর্ব্বক পুত্রবৎসল পাণ্ডবগণকে সসৈন্যে নিবারণ করিয়া মত্ত মাতঙ্গের ন্যায় রণস্থলে বিচরণ করিতে লাগিলেন।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবাহু জয়দ্রথ একাকী পুত্ররক্ষাভিলাষী, অতিক্রুদ্ধ পাণ্ডবগণকে নিবারণ করিয়া সমরে অতিভার বহন করিয়াছেন; আমি জয়দ্রথের বল বীর্য্য অদ্ভুত জ্ঞান করিতেছি; তুমি সবিস্তারে তাঁহার সমরবৃত্তান্ত বর্ণন কর। মহাবীর সিন্ধুরাজ এমন কি দান, হোম, যজ্ঞ বা তপস্যা করিয়া-ছিলেন যে একাকী রোষপরবশ পাণ্ডবগণকে নিবারণ করিলেন?

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ যৎকালে দ্রৌপদীকে হরণ করিয়াছিলেন, সেই সময় মহাবীর ভীমসেন তাঁহাকে পরাজয় করেন; মহাবীর জয়দ্রথ সেই অভিমানে নিতান্ত দুঃখিতমনে প্রিয়ভোগ্য বস্তু হইতে ইন্দ্রিয়গণকে নিবৃত্ত এবং ক্ষুৎ পিপাসা ও আতপক্লেশ সহ্য করিয়া নিতান্ত কৃশ ও শিরাব্যাপ্ত-কলেবর হইয়া তপোনুষ্ঠান এবং বেদোচ্চারণপূর্ব্বক বরলাভার্থ দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনা করিতে লাগিলেন। অনন্তর ভক্তবৎসল ভগবান্ ভূতনাথ জয়দ্রথের প্রতি দয়া করিয়া তাঁহাকে স্বপ্নাবস্থায় কহিতে লাগিলেন, হে জয়দ্রথ! আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি; স্বাভিলষিত বর প্রার্থনা কর। তখন সিন্ধুরাজ প্রণিপাতপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, হে দেবদেব! আমি যেন আপনার বরপ্রভাবে একাকী রথারূঢ় হইয়া মহাবল পরাক্রান্ত পঞ্চপাণ্ডবকে নিবারিত করিতে পারি। প্রমথনাথ কহিলেন, হে সিন্ধুরাজ! আমি বর প্রদান করিতেছি, তুমি অর্জুন ব্যতীত আর চারিজন পাণ্ডবকে নিবারণ করিতে পারিবে। জয়দ্রথ মহাদেবের বাক্য শ্রবণে 'তথাস্তু” বলিয়া স্বীকার করিয়া জাগরিত হইলেন।

হে মহারাজ! মহাবীর সিন্ধুরাজ মহাদেবের সেই বরপ্রভাবে ও দিব্যাস্ত্রবলে একাকী পাণ্ডবসৈন্যগণকে নিবারিত করিলেন। তাঁহার জ্যানির্ঘোষ ও তলধ্বনি শ্রবণে শত্রুপক্ষ ক্ষত্রিয়গণ ভীত এবং কৌরবসৈন্যগণ আহ্লাদিত হইলেন। কৌরবপক্ষ বীরগণ জয়দ্রথের উপর সমুদায় ভার সমর্পিত দেখিয়া সাহসপূর্ব্বক শরাসন আকর্ষণ করিয়া যুধিষ্ঠিরের সৈন্যাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন।

জয়দ্রথের সহিত যুদ্ধে পাণ্ডবগণের পরাজয়।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আপনি আমাকে সিন্ধু-রাজের পরাক্রমের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, অতএব তিনি যেরূপে পাণ্ডবগণের সহিত সংগ্রাম করিয়াছিলেন, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তিনি গন্ধর্ব্বনগরসদৃশ বিবিধ ভূষণে ভূষিত, বায়ুবেগগামী সারথির বশংবদ প্রকাণ্ড সিন্ধুদেশীয় অশ্বসমুদায়ে যোজিত রথে আরোহণ করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। রথের উপরিভাগে রজতময় বরাহ-কেতু সাতিশয় শোভা পাইতে লাগিল। মহাবীর সিন্ধুরাজ শ্বেতছত্র, পতাকা ও ব্যজনাদি রাজচিহ্নদ্বারা নভোমণ্ডলস্থ তারাপতির ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। তাঁহার লৌহময় বরূথ মুক্তা, হীরা, মণি ও স্বর্ণে বিভূষিত হইয়া জ্যোতিষ্কমণ্ডলীসঙ্কুল আকাশমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল।

অনন্তর মহাবীর জয়দ্রথ মহাচাপ বিস্ফারণপূর্ব্বক অসংখ্য শরনিকর নিক্ষেপ করিয়া অভিমন্যু-বিদারিত ব্যূহ পূরিত করিলেন এবং সাত্যকিকে তিন, ভীমকে আট, ধৃষ্টদ্যুম্নকে যষ্টি, বিরাটকে দশ, দ্রুপদকে পাঁচ, শিখণ্ডীকে দশ, যুধিষ্ঠিরকে সপ্ততি, কৈকেয়গণকে পঞ্চবিংশতি ও দ্রৌপদীতনয়গণকে তিন তিন বাণে বিদ্ধ করিয়া অন্যান্য বীরগণকে অসংখ্য শরনিকরে তাড়িত করিতে লাগিলেন। উহা অদ্ভুতবৎ প্রতীয়মান হইতে লাগিল। প্রতাপশালী মহাবীর ধর্ম্মনন্দন হাসিতে হাসিতে নিশিত ভল্ল নিক্ষেপপূর্ব্বক জয়দ্রথের শরাসন ছেদন করিলে সমরবিশারদ সিন্ধুরাজ নিমেষমধ্যে অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরকে দশ ও অন্যান্য বীরগণকে তিন তিন শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর জয়দ্রথের সমরলাঘব অবগত হইয়া সত্বরে তিন ভল্ল নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার ধনুঃ, ধ্বজ ও ছত্র ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত সিন্ধুপতি অবিলম্বে অন্য শরাসনে জ্যারোপণপূর্ব্বক বাণ নিক্ষেপ করিয়া ভীমের কেতু, ধনুঃ ও অশ্বগণকে ছেদন করিলে মহাবাহু বৃকোদর সেই হতাশ্ব রথ হইতে সত্বরে অবতরণপূর্ব্বক সিংহ যেমন পর্ব্বতাগ্রে আরোহণ করে তদ্রূপ সাত্যকির রথে আরোহণ করিলেন।

হে মহারাজ! আপনার পক্ষ সৈন্যগণ জয়দ্রথের সেই কার্য্য নিরীক্ষণ করিয়া যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইয়া উচ্চস্বরে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিল। মহাবীর সিন্ধুরাজ একাকী ক্রোধপরবশ পাণ্ডবসমুদায়কে অস্ত্রপ্রভাবে নিবারণ করিয়াছেন বলিয়া সকলেই তাঁহার প্রশংসা করিলেন। পূর্ব্বে মহাবীর অভিমন্যু যোদ্ধাদিগের সহিত কৌরবপক্ষ অসংখ্য হস্তী সংহার করিয়া পাণ্ডবগণকে যে পথ প্রদর্শন করিয়াছিলেন, এক্ষণে মহাবীর সিন্ধুরাজ স্বীয় প্রভাবে সেই পথ নিরোধ করিলেন। মৎস্য, পাঞ্চাল, কৈকেয় ও পাণ্ডবগণ বহু যত্নসহকারে জয়দ্রথের নিকট সমুপস্থিত হইলেন; কিন্তু তাঁহার প্রভাব সহ্য করিতে সমর্থ হইলেন না। তৎকালে বিপক্ষ পক্ষ যে যে বীর দ্রোণের সৈন্যগণকে ভেদ করিতে চেষ্টা করিল, মহাবাহু জয়দ্রথ - বরপ্রভাবে তৎসমুদায়কেই নিবারণ করিলেন।

অভিমন্যুকর্তৃক বসাতীয়ের পরাজয় ও মৃত্যু।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! জয়লাভার্থী পাণ্ডবগণ সিন্ধুরাজ জয়দ্রথকর্তৃক এইরূপ নিরুদ্ধ হইলে উভয় পক্ষে ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল। তেজস্বী অভিমন্যু সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়া মকরবিক্ষোভিত মহাসাগরের ন্যায় সৈন্যগণকে ক্ষোভিত করিতে আরম্ভ করিলে, কৌরবপক্ষ বীরগণ প্রাধান্য ক্রমে অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। তাঁহার সহিত তাঁহা-দিগের দারুণ সম্মদ হইতে লাগিল। কুরুবীরগণ নিরবচ্ছিন্ন শরনিকর বর্ষণ করিয়া রথসমূহদ্বারা অভিমন্যুকে রুদ্ধ করিলে, অভিমন্যু বৃষসেনের সারথিকে বিনাশ ও কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া অশ্বগণকে বিদ্ধ করিলেন। বায়ুবেগগামী অশ্বগণ সহসা বৃষসেনকে রণস্থল হইতে অপসারিত করিল। এই অবসরে অভিমন্যুর সারথিও রথ লইয়া অন্যত্র প্রস্থান করিল। মহারথগণ হৃষ্টচিত্তে সাধু সাধু, বলিয়া কোলাহল করিতে লাগিলেন।

অনন্তর মহাবীর বসাতীয় রোষাবিষ্ট সিংহসদৃশ অভিমন্যুকে শরনিকরে শত্রুবিমৰ্দ্দনপূর্ব্বক নিকটে আগমন করিতে নিরীক্ষণ করিয়া দ্রুতবেগে তাঁহার অভিমুখীন হইয়া যষ্টি শরে তাঁহাকে সমাচ্ছন্ন করিলেন এবং কহিলেন, হে বীর। আমি জীবিত থাকিতে কদাচ তুমি জীবিতাবস্থায় আমার হস্তগ্রহ' হইতে মুক্তিলাভ করিতে সমর্থ হইবে না। তখন সুভদ্রানন্দন অভিমন্য শরসমূহে সেই লৌহময় বৰ্ম্মধারী বসাতীয়ের হৃদয় বিদ্ধ করিলে তিনি তৎক্ষণাৎ গতাসু হইয়া ক্ষিতিতলে নিপতিত হইলেন। বসাতীয়কে গতাসু দেখিয়া নানাপ্রকার কার্মুক বিস্ফারিত করত কৌরবপক্ষ ক্ষত্রিয়গণ অভিমন্যুকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত চতুর্দিকে বেষ্টন করিলেন। এই যুদ্ধ সাতিশয় ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল। অভিমন্যু ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তাঁহাদিগের - শর, শরাসন, শরীর ও মাল্যদামমণ্ডিত কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তকসকল - ছেদন করিলেন। খড়্গ, অঙ্গুলিত্রাণ; পট্টিশ ও পরশুসম্পন্ন, সুবর্ণাভরণভূষিত, ছিন্ন হস্তসকল ইতস্ততঃ নিরীক্ষিত হইতে লাগিল। তখন মাল্যদাম, আভরণ, বস্ত্র, ধ্বজদণ্ড, বৰ্ম্ম, চৰ্ম্ম, হার, মুকুট, ছত্র, চামর, উপস্কর', অধিষ্ঠান, ঈষাদণ্ড, বিমথিত অক্ষ, ভগ্ন চক্র, ভগ্ন যুগ, অনুকর্ষ, পতাকা, অশ্ব, সারথি, ভগ্ন রথ ও হস্তী দ্বারা পৃথিবী পরিপূর্ণ হইল। রণস্থল মহাবল পরাক্রান্ত নানা জনপদের অধীশ্বর জয়াভিলাষী নিহত ক্ষত্রিয়গণে পরিপূর্ণ ও অতি ভীষণ হইয়া উঠিল। তখন অভিমন্যু ক্রোধাবিষ্ট হইয়া রণস্থলে দিক্ বিদিক্ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তৎকালে তাঁহার রূপ আর কাহারও নয়নগোচর হইল না। কেবল কাঞ্চন বৰ্ম্ম, আভরণ, কাৰ্ম্মক ও শরনিকর নেত্রগোচর হইতে লাগিল। এইরূপে মহাবীর অভিমন্যু যখন দিবাকরের ন্যায় সমরমধ্যে অবস্থানপূর্ব্বক শরজালে যোদ্ধাদিগকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন তখন কেহই তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইল না।

অভিমন্যুর হস্তে শল্যপুত্র রুক্সরথের মৃত্যু ও নিপীড়িত দুর্য্যোধনের সমর হইতে পলায়ন।

সঞ্জয় কহিলেন, হে রাজন! যেমন প্রলয়কাল উপস্থিত হইলে কৃতান্ত সমস্ত ভূতের প্রাণ সংহার করিয়া থাকেন, তদ্রূপ সুররাজসমবিক্রম অভিমন্যু বীরগণকে বিনষ্ট করিতে লাগিলেন এবং সৈন্যসকলকে আলোড়িত করিয়া অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিলেন। পরে যেমন সমুদ্ধত শার্দুল মৃগকে গ্রহণ করে, তদ্রূপ তিনি সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়া সত্যশ্রবাকে গ্রহণ করিলেন; অনন্তর তাঁহাকে আকর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে মহারথগণ বিবিধ অস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক সত্বরে অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন এবং "আমিই সর্ব্বাগ্রে, আমিই সর্ব্বাগ্রে” এই বলিয়া স্পর্দ্ধা-পূর্ব্বক অভিমন্যুবিনাশের অভিলাষে গমন করিতে লাগিলেন। যেমন সাগরমধ্যে তিমি ক্ষুদ্র মৎস্যদিগকে গ্রাস করিয়া থাকে, তদ্রূপ অভিমন্যু ধাবমান ক্ষত্রিয়সৈন্যগণকে সংহার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। যেমন নদীসকল সমুদ্র হইতে প্রতিনিবৃত্ত হয় না, তদ্রূপ সমরে অপরাজুখ অভিমন্যুর সন্নিহিত সৈন্যগণ আর প্রতিনিবৃত্ত হইল না। তখন কৌরবসেনা মহাগ্রাহ-গৃহীতের’ ন্যায়, বায়ুবেগক্ষুভিত ঘূর্ণায়মান সাগরস্থিত নৌকার ন্যায়, নিতান্ত ভয়বিহ্বল হইয়া কম্পিত হইতে লাগিল।

অনন্তর মহাবল পরাক্রান্ত নির্ভীক মদ্রেশ্বরতনয় রুস্মরণ, সন্ত্রস্ত সৈন্যদিগকে আশ্বস্ত করিয়া কহিলেন, হে সৈন্যগণ। তোমরা ভীত হইও না; আমি জীবিত থাকিতে অভিমন্যু কি করিবে? আমি উঁহাকে জীবন্ত গ্রহণ করিব, তাহার সন্দেহ নাই। তিনি এই বলিয়া সুসজ্জিত রথে আরোহণপূর্ব্বক অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন এবং তিন বাণে তাঁহার বক্ষঃস্থল, তিন বাণে দক্ষিণ বাহু ও তিন বাণে বাম বাহু বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। অভিমন্যু তৎক্ষণাৎ তাঁহার শরাসন, বাহুযুগল এবং সুন্দর নয়ন ও সুন্দর ভ্রূসুশোভিত মস্তক, ছেদন করিয়া ক্ষিতিতলে নিপাতিত করিলেন। যুদ্ধদুৰ্ম্মদ শল্যতনয় রুক্সরথের প্রিয়বয়স্য সুবর্ণখচিত ধ্বজশালী রাজকুমারগণ তাঁহাকে বিনষ্ট দেখিয়া তালপ্রমাণ কাৰ্ম্মক আকর্ষণ ও শরবর্ষণপূর্ব্বক অভিমন্যুকে চতুৰ্দ্দিকে বেষ্টন করিলেন। শিক্ষাবলসম্পন্ন তরুণবয়স্ক একান্ত অমর্ষণস্বভাব বীরগণ শরনিকরে অভিমন্যুকে সমাচ্ছন্ন করিয়াছেন দেখিয়া দুর্য্যোধন সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন এবং অভিমন্যু শমনসদনে গমন করিয়াছেন বোধ করিলেন। রাজকুমারগণ নানালক্ষণলাঞ্ছিত সুবর্ণপুঙ্খ শরজালে নিমেষমধ্যে অভিমন্যুকে দৃষ্টি পথের অতীত করিলেন। আমরা রথ, ধ্বজদণ্ড, তাঁহার সারথিকে ও তাঁহাকে শলভসমাচ্ছন্নের ন্যায় নিরীক্ষণ করিতে লাগিলাম। তখন অভিমন্যু তোদনদণ্ড পীড়িত মাতঙ্গের ন্যায় গাঢ়বিদ্ধ ও নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া গান্ধর্ব্ব অস্ত্র গ্রহণ করিয়া মায়াজাল বিস্তার করিলেন। মহাবীর অর্জুন তপোনুষ্ঠানপূর্ব্বক তুম্বুরুপ্রমুখ গন্ধর্ব্ব হইতে ঐ অস্ত্র প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। উহা পরিত্যাগ করিবামাত্র বিপক্ষেরা বিমোহিত হইল। অভিমন্যু ক্ষিপ্রহস্তে গান্ধর্ব্ব অস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক অলাতচক্রের ন্যায় কখন শত কখন বা সহস্র প্রকার নিরীক্ষিত হইতে লাগিলেন। পরে তিনি রথচালন ও অস্ত্রমায়াদ্বারা মহীপালগণকে বিমোহিত করিয়া তাঁহাদের কলেবর শতধা খণ্ড খণ্ড করিলেন। জীবগণের জীবন নিশিত শরনিকরে নির্গত হইয়া পরলোকে গমন করিল এবং দেহ পৃথিবীতে নিপতিত রহিল। অনন্তর অভিমন্যু নিশিত ভল্লে কতকগুলি রাজপুত্রের কাৰ্ম্মক, অশ্ব, সারথি, ধ্বজ, অঙ্গদসমলঙ্কৃত বাহু ও মস্তক সকল ছেদন করিলেন। যেমন পঞ্চবর্ষীয় ফলসম্পন্ন, আম্রকানন ভগ্ন হইয়া পতিত হয়, তদ্রূপ একশত রাজপুত্র অভিমন্যু শরে নিহত হইয়া ভূতলে নিপতিত হইলেন। তখন ক্রুদ্ধ আশীবিষসঙ্কাশ, সুখোচিত, রাজকুমারগণকে একমাত্র অভিমন্যুকর্তৃক নিহত নিরীক্ষণ করিয়া মহারাজ দুর্য্যোধনের অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার হইল এবং তাঁহাকে রথী, কুঞ্জর, অশ্ব ও পদাতিসকল বিমৰ্দ্দিত করিতে দেখিয়া রোষাবিষ্ট চিত্তে সত্বরে তাঁহার সন্নিধানে গমন করিলেন। উভয়ের অসম্পূর্ণ সংগ্রাম ক্ষণকালের নিমিত্ত তুমুল হইয়া উঠিল। অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন শরজালে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া সমরে পরাজুখ হইলেন।

অভিমন্যুকর্তৃক দুর্য্যোধননন্দন লক্ষ্মণের প্রাণসংহার।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! তুমি অনেক ব্যক্তির সহিত একের তুমুল সংগ্রাম ও জয়লাভ কীর্ত্তন করিতেছ। এক্ষণে তাহার বিক্রম বিশ্বাসের অযোগ্য ও নিতান্ত অদ্ভুতের ন্যায় বোধ হইতেছে। কিন্তু যাঁহাদিগের ধর্মই আশ্রয়, তাঁহাদের এইরূপ বিক্রম অদ্ভুত বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। যাহা হউক, এক্ষণে একশত রাজপুত্র নিহত ও দুর্য্যোধন বিমুখ হইলে আমার পক্ষ বীরগণ অভিমন্যুর সহিত কিরূপ আচরণ করিলেন?

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! আপনার পক্ষ বীরগণের মুখ-মণ্ডল শুষ্ক, নয়নযুগল চঞ্চল, গাত্র কণ্টকিত ও অনবরত স্বেদজল নির্গত হইতে লাগিল। তখন তাঁহারা বিজয়লাভে নিতান্ত উৎসাহশূন্য হইয়া পলায়নে কৃতসঙ্কল্প হইলেন এবং নিহত ভ্রাতা, পিতা, পুত্র, সুহৃৎ, সম্বন্ধী ও বান্ধবগণকে পরিত্যাগ করিয়া হস্তী ও অশ্বদিগকে ত্বরান্বিত করত গমন করিতে লাগিলেন।

অনন্তর দ্রোণাচার্য্য, অশ্বত্থামা, কূপ, দুর্য্যোধন, কর্ণ, কৃতবর্মা ও সৌবল তাঁহাদিগকে ছিন্ন ভিন্ন দেখিয়া ক্রোধভরে অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। তিনি তাঁহাদিগকে বিমুখপ্রায় করিলে সুখভোগপ্রবৃদ্ধ, বালকতা ও দর্পবশতঃ নির্ভয়, মহা-তেজাঃ লক্ষ্মণ একাকী অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। পুত্রবৎসল রাজা দুর্য্যোধন লক্ষ্মণের অনুগমন করিলেন এবং অন্যান্য মহারথগণ দুর্য্যোধনের অনুসরণ করিতে লাগিলেন। যেমন বারিধর পর্ব্বতোপরি বারিধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ তাঁহারা অভিমন্যুর উপর শরবর্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হইলে অভিমন্যু সমীরণের অম্বুজা-মন্থনের' ন্যায় তাঁহাদিগকে প্রমথিত করিতে লাগিলেন। অনন্তর যেমন মত্ত মাতঙ্গ অন্য মত্ত মাতঙ্গকে প্রাপ্ত হইয়া থাকে, তদ্রূপ অভিমন্যু পিতৃসমীপবর্ত্তী, উদ্যতকাৰ্ম্মক, নিতান্ত দুর্দ্ধর্য, কুবেরপুত্রসদৃশ, প্রিয়দর্শন, মহাবীর লক্ষ্মণকে প্রাপ্ত হইলেন। লক্ষ্মণ নিশিত শরনিকরে অভিমন্যুর বক্ষঃস্থল ও বাহুদ্বয়ে প্রহার করিলে অভিমন্যু দণ্ডাহত ভুজঙ্গের ন্যায় অতিশয় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া আপনার পৌত্র লক্ষ্মণকে কহিলেন, হে লক্ষ্মণ! তোমাকে পরলোক গমন করিতে হইবে; এই সময় সুন্দররূপে ইহলোক সন্দর্শন কর; আমি তোমার বান্ধবগণ সমক্ষেই তোমাকে যমালয়ে প্রেরণ করিব। এই বলিয়া তিনি নির্মোকমুক্ত উরগসদৃশ এক ভল্ল নিক্ষেপ করিলেন। উহা নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র লক্ষ্মণের নাসাবংশ`সুশোভিত, ভ্রূযুগলোপেত, কেশকলাপ ও কুণ্ডলসমলঙ্কৃত মস্তক ছেদন করিল।

সকলে লক্ষ্মণকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া হাহাকার করিতে লাগিল; রাজা দুর্য্যোধন উচ্চস্বরে ক্ষত্রিয়গণকে কহিতে লাগিলেন, হে ক্ষত্রিয়গণ! তোমরা অভিমন্যুকে সংহার কর। অনন্তর দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা ও হাৰ্দ্দিক্য এই ছয়জন রথী অভিমন্যুকে বেষ্টন করিলেন; অভিমন্যু নিশিত শরনিকরে, তাঁহাদিগকে বিদ্ধ ও পরাজুখ করিয়া মহাবেগে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের সৈন্যমধ্যে নিপতিত হইলেন। কলিঙ্গ ও নিষাদগণ এবং মহাবল পরাক্রান্ত ক্রাথপুত্র গজসৈন্যদ্বারা তাঁহার পথ রোধ করিলেন। তখন উভয় পক্ষে ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। অনন্তর মহাবীর অভিমন্যু দুর্দ্ধর্ষ করিবল ছিন্ন ভিন্ন করিতে লাগিলেন; বোধ হইল যেন, সমীরণ নভোমণ্ডলে জলদজাল ছিন্ন ভিন্ন করিতেছে। পরে ক্রাথপুত্র শরনিকরে অভিমন্যুকে নিবারণ করিলে দ্রোণ প্রভৃতি রথীসকল পুনরায় আগমন করিয়া দিব্যাস্ত্রজাল বিস্তারপূর্ব্বক অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। অভিমন্যু শরজালে তাঁহাদিগকে নিবারণ করিয়া ক্রাথপুত্রকে পীড়িত করিতে লাগিলেন এবং অসংখ্য শরে তাঁহার ছত্র ও ধ্বজ ছিন্ন এবং সারথি ও অশ্বগণকে বিনষ্ট করিয়া পরিশেষে কুল, শীল, শ্রুত, বীর্য্য, কীর্ত্তি ও অস্ত্রবলসম্পন্ন ক্রাথপুত্রকে নিহত করিলেন। তদ্দর্শনে অন্যান্য বীরগণ সমরে পরাজুখ-= প্রায় হইলেন।

বৃক্ষারক ও বৃহদ্বল বীরদ্বয়ের পরলোক গমন।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। কুলানুরূপ কার্য্যকারী ব্যূহমধ্যে প্রবিষ্ট তরুণ অপলায়ী অভিমন্যু ত্রিহায়ণ, বলবান, কুলনী অশ্বগণকর্তৃক বাহিত হইয়া যেন নভোমণ্ডলে সন্তরণ করিতেছেন নিরীক্ষণ করিয়া কোন্ কোন্ বীর তাঁহাকে নিবারণ করিয়াছিল?

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। অভিমন্যু ব্যূহমধ্যে প্রবেশ করিয়া আপনার পক্ষ ক্ষিতিপালগণকে নিশিত শরনিকরে পরাজুখ করিলে দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা ও হাদিক্য এই ছয় রথী অভিমন্যুকে বেষ্টন করিলেন। সৈন্যগণ জয়দ্রথের প্রতি গুরুতর ভার সমর্পিত হইয়াছে দেখিয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবমান হইলেন। অন্যান্য বীরগণ তালপ্রমাণ শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক অভিমন্যুর উপর শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। অভিমন্যু সেই সর্ব্ববিদ্যাবিশারদ বীরগণকে শরনিকরে স্তম্ভিত করিয়া পঞ্চশৎ শরে দ্রোণকে, বিংশতি শরে বৃহদ্বলকে, অশীতি শরে কৃতবর্মাকে, ষষ্টি শরে কূপকে এবং আকর্ণাকৃষ্ট রুক্মপুঙ্খ মহাবেগগামী দশ শরে অশ্বত্থামাকে বিদ্ধ করিলেন; অনন্তর বিপক্ষগণমধ্যে পীত, নিশিত, কর্ণি অস্ত্রে কর্ণের কর্ণ বিদ্ধ করিলেন; পরে কৃপাচার্য্যের পার্ফি, সারথিদ্বয় ও অশ্বগণকে নিপাতিত করিয়া দশ শরে তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন এবং আপনার পুত্র ও বীরগণের সমক্ষে কৌরবকুলের কীর্ত্তিবর্দ্ধন বৃক্ষারক নামে মহাবীরকে বধ করিলেন। অভিমন্যু নির্ভীকের ন্যায় প্রধান প্রধান কৌরববীরকে নিপীড়িত করিতেছেন দেখিয়া অশ্বত্থামা পঞ্চবিংশতি ক্ষুদ্রকে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলে তিনিও ধার্তরাষ্ট্রগণ সমক্ষে অবিলম্বে শাণিত শরনিকরে অশ্বথামাকে বিদ্ধ করিলেন। অশ্বত্থামা সুতীক্ষ্ণ যষ্টি শরে মৈনাক পর্ব্বতোপম অভিমন্যুকে বিদ্ধ করিয়াও বিচলিত করিতে সমর্থ হইলেন না। পরে সুবর্ণপুঙ্খ দ্বিসপ্ততি শরে তাঁহাকে পুনর্ব্বার বিদ্ধ করিলেন। পুত্রবৎসল দ্রোণাচার্য্য একশত শর, পিতৃরক্ষার্থী অশ্বত্থামা যষ্টি শর, কর্ণ দ্বাবিংশতি ভল্ল, কৃতবর্মা চতুৰ্দ্দশ ভল্ল, বৃহদ্বল পঞ্চাশৎ ভল্ল এবং শারদ্বত দশ ভল্ল তাঁহার উপর নিক্ষেপ করিলেন। অভিমন্যু তাঁহাদিগকে দশ দশ শরে প্রহার করিলেন। কোশলরাজ কর্ণি অস্ত্রে তাঁহার হৃদয়দেশে আঘাত করিলে অভিমন্যু তাঁহার ফাজ, কাৰ্ম্মক, সারথি ও অশ্বগণকে ভূতলে নিপাতিত করিলেন। অনন্তর কোশলরাজ বিরথ হইয়া খড়ণ ও চর্ম গ্রহণপূর্ব্বক অভিমন্যুর কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক ছেদন করিবার অভিলাষ করিলেন। অভিমন্যু শরদ্বারা কোশলাধিপতি বৃহছলের হৃদয় বিদ্ধ করিবামাত্র তিনি ভূতলে নিপতিত হইলেন। তখন অশুভ বাক্য প্রযোক্তা খড়া কার্মুকধারী দশ সহস্র ভূপাল রণে ভগ্ন হইতে লাগিলেন। মহাবীর অভিমন্যু বৃহদ্বলকে নিহত ও শরনিকরে সকলকে স্তম্ভিত করিয়া রণস্থলে সঞ্চরণ করিতে আরম্ভ করিলেন।

অশ্বকেতু, চন্দ্রকেতুপ্রমুখ বীরগণের নিধন ও অভিমন্যু বধের চক্রান্ত।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। মহাবীর অর্জুনতনয় কর্ণের কর্ণদেশে সুশাণিত কর্ণিক নিক্ষেপ করিয়া তাঁহার গাত্রে পঞ্চাশৎ শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবাহু কর্ণ অভিমন্যুর শরাঘাতে সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার গাত্রে শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। সুভদ্রানন্দন কর্ণের শরে বিদ্ধ হইয়া অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিলেন এবং ক্রোধভরে কর্ণের উপর অসংখ্য শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। অভিমন্যুর বিষম শরনিকরে কর্ণের ক্ষত-বিক্ষত গাত্র হইতে রুধিরধারা বিনির্গত হওয়াতে তাঁহারও অপূর্ব্ব শোভা হইল। ঐ দুই মহাবীরই পরস্পরের শরে বিদ্ধ ও রুধিরাক্তকলেবর হইয়া পুষ্পিত কিংশুক তরুর ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন।

মহাবীর অভিমন্যু কর্ণের ছয় জন মহাবল পরাক্রান্ত সচিবের অশ্ব, সারথি, ধ্বজ ও রথ ছেদনপূর্ব্বক তাহাদিগকে সংহার করিলেন এবং অন্যান্য মহারথগণকে দশ দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন। উহা অদ্ভুতের ন্যায় প্রতীয়মান হইয়া উঠিল। অনন্তর মহাবীর অর্জুনতনয় ছয় বাণে মাগধের পুত্রকে সংহার করিয়া যুব অশ্বকেতুকে অশ্বগণ ও সারথির সহিত শমনসদনে প্রেরণ করিলেন এবং ক্ষুরপ্রদ্বারা কুঞ্জরকেতু মার্ত্তিকাবতিক ভোজকে সংহার করিয়া শরনিকর নিক্ষেপ করত সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবাহু দুঃশাসনতনয় চারি বাণে অভিমন্যুর চারি অশ্ব ও এক বাণে তাঁহার সারথিকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহাকে দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর অর্জুনতনয় দুঃশাসনতনয়ের শরাঘাতে ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে দশ বাণে বিদ্ধ করিয়া রোষারক্ত নয়নে উচ্চস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে দুঃশাসনতনয়। তোমার পিতা নিতান্ত কাপুরুষ; তিনি সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিয়াছেন। তুমি এই যুদ্ধে আমার হস্তে কদাপি পরিত্রাণ পাইবে না।

মহাবীর অর্জুনতনয় দুঃশাসনপুত্রকে এই কথা বলিয়া তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া কর্মার-পরিমার্জিত, নারাচ নিক্ষেপ করিলে মহাবাহু অশ্বত্থামা সত্বরে তিন তীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপপূর্ব্বক অভিমন্যুনিক্ষিপ্ত নারাচ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর অর্জুনতনয় অশ্বত্থামাকে প্রহার না করিয়া শল্যের উপর শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর মদ্ররাজ সত্বরে অভিমন্যুর বক্ষঃ-স্থলে গৃধুপক্ষযুক্ত নয় বাণ বিদ্ধ করিলেন। উহা অদ্ভুতবৎ প্রতীয়মান হইল। তখন সমরবিশারদ অর্জুননন্দন সত্বরে শল্যের শরাসন ছেদন এবং উভয় পার্ফি সারথিকে সংহার করিয়া তাঁহাকে ছয় অয়োময় শরে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর শল্য অভিমন্যুর শরে জর্জরিত হইয়া সেই হতাশ্ব রথ পরিত্যাগপূর্ব্বক অন্য রথে আরূঢ় হইলেন। সমরনিপুণ অর্জুনতনয় শত্রুঞ্জয়, চন্দ্রকেতু, মহামেঘ, সুরতা ও সূর্য্যভাম এই পাঁচ বীরকে সংহার করিয়া শকুনিকে শর বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। সুবলনন্দন অভিমন্যুকে তিন বাণে বিদ্ধ করিয়া দুর্য্যোধনকে কহিলেন, মহারাজ! এক্ষণে সকলে একত্র হইয়াই অর্জুনতনয়কে সংহার করা কর্ত্তব্য; নচেৎ অভিমন্যু এক এক করিয়া আমাদিগকে বিনাশ করিবে; অতএব দ্রোণ ও কূপ প্রভৃতির সহিত উহার বধোপায় চিন্তা কর। তখন মহাপ্রতাপ-শালী কর্ণ দ্রোণাচার্য্যকে কহিলেন, ব্রহ্মন্! অবিলম্বে অভিমন্যুর বধোপায় বলুন, নচেৎ অর্জুনতনয় আমাদের সকলকেই সংহার করিবে। মহারথ দ্রোণাচার্য্য কর্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর সমুদায় কৌরব পক্ষ বীরগণকে কহিতে লাগিলেন, হে বীরগণ! তোমরা কি এ পর্যান্ত অর্জুনতনয়ের অণুমাত্র অবকাশ দেখিয়াছ? অর্জুনতনয়ের লঘুচারিত্ব অবলোকন কর; অর্জুনতনয় অভিমন্যু চারিদিক্ ভ্রমণ করিতেছে, তথাপি উহার কিছুমাত্র অবকাশ লক্ষিত হইতেছে না। ঐ মহাবীর এত শীঘ্র শর সন্ধান ও পরিত্যাগ করিতেছে যে, রথোপরি কেবল উহার চাপমণ্ডল লক্ষিত হইতেছে। অরাতিনিপাতন মহাবীর সুভদ্রাতনয় শরজালে আমাকে একান্ত ব্যথিত ও মোহিত করিয়াও সন্তুষ্ট করিতেছে। কৌরবপক্ষ মহারথগণ ক্রোধপরবশ হইয়াও উহার যে অণুমাত্র অবকাশ প্রাপ্ত হইতেছেন না, তাহাতে আমার আনন্দের আর পরিসীমা রহিল না। মহাবীর অর্জুনতনয় ক্ষিপ্রহস্তে শরদ্বারা দশ দিক্ সমাবৃত করাতে গাণ্ডীবধারী মহাবীর অর্জুন হইতে উহার কিছুমাত্র বিভিন্নতা দৃষ্ট হইতেছে না।

তখন মহাবাহু কর্ণ অর্জুনতনয়ের শরে আহত হইয়া পুনরায় দ্রোণকে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্। বীরগণের সমর পরিত্যাগ করা উচিত নয় বলিয়া আমি অভিমন্যুর শরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়াও এ স্থানে অবস্থান করিতেছি। ঐ মহাতেজাঃ অর্জুন-কুমারের পাবকসদৃশ পরম দারুণ শরনিকরে আমার হৃদয় বিদলিত হইতেছে।

মহাবীর দ্রোণাচার্য্য কর্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর হাসিতে হাসিতে কহিলেন, হে রাধেয়। মহাবীর অভিমন্যুর কবচ অভেদ্য। আমি উহার পিতাকে কবচ ধারণে সুশিক্ষিত করিয়াছি, ঐ বীরও তাঁহার নিকট তদ্বিষয়ে সুশিক্ষিত হইয়াছে, সন্দেহ নাই। কিন্তু সাতিশয় যত্নসহকারে সুতীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিয়া উঁহার ধনুঃ, জ্যা, অশ্ব, সারথি ও উভয় পার্কি সারথিকে অনায়াসে ছেদন করা যাইতে পারে; অতএব যদি সমর্থ হও, তবে উঁহার শরাসন প্রভৃতি ছেদন করিয়া উঁহাকে সমরবিমুখ কর; পশ্চাৎ সংগ্রাম করিও। যতক্ষণ উঁহার করে শরাসন থাকিবে, ততক্ষণ উঁহাকে পরাজয় করা সমুদায় দেব ও অসুর-গণেরও সাধ্য নহে। অতএব যদি উঁহাকে পরাজয় করিবার বাসনা থাকে, তাহা হইলে অবিলম্বে উঁহাকে বিরথ ও শরাসন-শূন্য কর।

মহাবীর কর্ণ দ্রোণের বাক্য শ্রবণানন্তর সত্বরে শর নিক্ষেপপূর্ব্বক অভিমন্যুর শরাসন ছেদন করিলে ভোজ তাঁহার অশ্বসমুদায় ও কূপ তাঁহার পার্ফি সারথিদ্বয়কে সংহার করিলেন। অন্যান্য বীরগণ তাঁহার উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সেই করুণরসশূন্য ছয় মহারথ সত্বরে এক কালে একাকী বালক অভিমন্যুকে প্রহার করিতে আরম্ভকরিলেন। তখন ছিন্নশরাসন রথবিহীন অর্জুনতনয় স্বীয় বীরধর্ম প্রতিপালন করত খড়া ও চৰ্ম্ম ধারণপূর্ব্বক আকাশ-মার্গে সমুত্থিত হইয়া মহাবেগে কৌশিকাদি' গতিদ্বারা গরুড়ের ন্যায় আকাশে বিচরণ করিতে লাগিল। রন্ধ্রদর্শনতৎপর মহা-ধনুর্দ্ধরগণ এই অভিমন্যু অসিহস্তে আমার উপর নিপতিত হইবে মনে করিয়া উর্দ্ধদৃষ্টি হইয়া তাঁহাকে বাণ বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন; অরাতিনিপাতন মহাবীর দ্রোণ সত্বরে তাঁহার খড়োর মণিময় মুষ্টিদেশে সুতীক্ষ্ণ নারাচ নিক্ষেপপূর্ব্বক ছেদন করিলেন এবং কর্ণ শাণিত শরনিকরে তাঁহার চর্ম ছেদন করিলেন। এই-রূপে অসি, চৰ্ম্ম ও বাণসমুদায় ছিন্ন হইলে মহাবীর অর্জুনতনয় চক্র গ্রহণপূর্ব্বক পুনরায় ভূতলে অবতীর্ণ হইয়া ক্রোধভরে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। ঐ সময়ে চক্ররেণু'-সমুজ্জ্বল-কলেবর মহাবীর অভিমন্যু চক্র ধারণপূর্ব্বক সমরে বাসুদেবের অনুকরণ করত সাতিশয় ভয়ানক হইয়া উঠিলেন। তৎকালে অমিততেজাঃ, সিংহনাদ-সহকারী, বীরগণ মধ্যস্থিত মহাবীর অভিমন্যুর দেহ হইতে শোণিত বিনির্গত হইয়া বদন রক্তবর্ণ ও ভ্রূকুটিদ্বারা ললাটফলক কুটিল হওয়াতে অপূর্ব্ব শোভা হইল।

ষষ্ঠ মহারথকর্তৃক অভিমন্যু বধ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! সুভদ্রানন্দকর মহাবীর অভিমন্যু চক্র ধারণ করিয়া সমরে দ্বিতীয় বিষ্ণুর শোভা পাইতে লাগিলেন; তাঁহার কেশকলাপ বায়ুবেগে উদ্ধৃত হইতে লাগিল এবং আয়ুধপ্রধান চক্র উদ্যত হইয়া শোভা পাইতে লাগিল, তখন তিনি দুঃসমীক্ষ্য' হইয়া উঠিলেন। ভূপতিগণ তাঁহার সেই অলৌকিক রূপ সন্দর্শন করিয়া সাতিশয় উদ্বিগ্ন হইয়া তাঁহার চক্র খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর অর্জুনতনয় সত্বরে গদা গ্রহণপূর্ব্বক অশ্বত্থামার অভিমুখে ধাবমান হইলে মহাবাহু দ্রোণনন্দন প্রজ্বলিত অশনির ন্যায় সেই অভিমন্যুর গদা অবলোকন করিয়া রথোপস্থ হইতে তিন লম্ফে পলায়ন করিলেন। তখন মহাবীর অর্জুনতনয় গদাদ্বারা তাঁহার অশ্ব-সমুদায় এবং পার্ফি সারথিদ্বয়কে সংহার করিয়া বীরগণের শরনিকরে বিদ্ধগাত্র হইয়া শল্পকীর ন্যায় নয়নগোচর হইতে লাগিলেন। পরে সুবলনন্দন কালিকেয়কে নিহত করিয়া তাঁহার অনুচর সপ্তসপ্ততি গান্ধারকে নিহত করিলেন। অনন্তর ব্রহ্ম-বসাতীয় দশ রথী এবং কৈকেয়দিগের সাত রথী ও দশ মাতঙ্গ বিনষ্ট করিয়া গদাদ্বারা দুঃশাসনতনয়ের রথ ও অশ্বগণকে চূর্ণ করিয়া ফেলিলেন।

দুঃশাসনতনয় ক্রোধভরে ভীষণ গদা সমুদ্যত করিয়া থাক্ থাক্, বলিয়া অভিমন্যুর প্রতি ধাবমান হইলেন। পূর্ব্বকালে মহাদেব ও অন্ধক যেমন পরস্পরের উপর গদাঘাত করিয়া-ছিলেন, তদ্রূপ মহাবীর অভিমন্যু ও দুঃশাসনতনয় পরস্পরকে সংহার করিবার বাসনায় পরস্পরের প্রতি গদাঘাত করিতে লাগিলেন। সেই বীরদ্বয় গদাযুদ্ধ করত পরস্পর গদাঘাতে ভূতলে পতিত হইয়া নিপতিত ইন্দ্রধ্বজদ্বয়ের ন্যায় শোভমান হইলেন। তখন কুরুকুল-কীর্ত্তিবর্দ্ধন মহাবীর দুঃশাসনতনয় সত্বরে অগ্রে সমুত্থিত হইয়া উত্তিষ্ঠমান মহাবাহু অর্জুনতনয়ের মস্তকে গদাঘাত করিলেন। অরাতিকুল-নিপাতন মহাবীর অভিমন্যু দুঃশাসননন্দনের দারুণ গদাঘাতে ও সমরপরিশ্রমে মোহিত এবং অচেতন হইয়া ভূতলে নিপতিত হইলেন।

হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর অর্জুনতনয় একাকী অরাতি পক্ষ সমুদায় সৈন্যগণকে বিক্ষোভিত করিয়া পরিশেষে বহুসংখ্যক শত্রুকর্তৃক নিহত হইয়া পদ্মবনপ্রমার্থী ব্যাধগণের হস্তে নিহত বনগজের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তখন আপনার পক্ষ মহাবল পরাক্রান্ত মহারথগণ সমরাঙ্গনে নিপতিত মহাবীর অর্জুনতনয়কে চতুর্দিকে পরিবেষ্টন করিলেন এবং দাবদহনানন্তর নিদাঘকালীন প্রপান্ত' পাবকের ন্যায়, অস্তগত আদিত্যের ন্যায়, শুষ্কসাগরের ন্যায়, তরুশৃঙ্গ মদনা-নন্তর নিবৃত্ত সমীরণের ন্যায়, পূর্ণচন্দ্রনিভানন কাকপক্ষে আবৃতনেত্র সেই অভিমন্যুকে ভূতলে পতিত দেখিয়া পরমাহ্লাদ-সহকারে সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহাদের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। এদিকে পাণ্ডবপক্ষ বীরগণের নেত্র হইতে অবিরল বারিধারা নিপতিত হইতে লাগিল। ঐ সময় গগনচর ভূতগণ অভিমন্যুকে আকাশচ্যুত চন্দ্রের ন্যায় নিপতিত নিরীক্ষণ করিয়া উচ্চস্বরে কহিতে লাগিল যে, মহাবীর দ্রোণ, কর্ণ প্রভৃতি ধৃতরাষ্ট্র পক্ষ ছয় জন মহারথ এই বালককে সংহার করিয়াছেন, ইহা আমাদের মতে নিতান্ত ধৰ্ম্মবিরুদ্ধ কৰ্ম্ম হইয়াছে। মহাবীর অভিমন্যু নিহত হইয়া ধরাতলে নিপতিত এবং রুধিরসংপ্লুত রুক্মপুঙ্খ শরনিকর বীরগণের কুণ্ডলশোভিত মস্তক, বিচিত্র উষ্ণীষ, পতাকা, চামর, চিত্র, কম্বল, উত্তম আয়ুধ, রথ, অশ্ব ও গজগণের অলঙ্কার, নির্মোকনিন্মুক্ত ভীষণ ভুজঙ্গসদৃশ নিশিত খড়া, শরাসন, ছিন্ন শক্তি, ঋষ্টি, প্রাস, কম্পন ও অন্যান্য আয়ুধসমুদায় ইতস্ততঃ নিক্ষিপ্ত হওয়াতে ভূমণ্ডল পূর্ণচন্দ্র ও গ্রহ নক্ষত্র বিভূষিত নভোমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। অর্জুনতনয়ের শরে ভূতলে নিপাতিত শোণিতদিগ্ধাঙ্গ আরোহী সমবেত নির্জীব ও শ্বাসাবশিষ্ট অশ্বসমুদায়ে রণস্থল বন্ধুর' হইয়া উঠিল। মহামাত্র, অঙ্কুশ, চৰ্ম্ম, আয়ুধ ও কেতু সমবেত শরনিহত পর্ব্বতাকার গজসকল অশ্ব, সারথি ও যোদ্ধা সমবেত প্রক্ষুভিত হ্রদসদৃশ রথসমুদায় এবং বিবিধায়ুধধারী পদাতিসমুদায়ে রণস্থল ভীরুজনভয়াবহ ঘোর রূপ ধারণ করিল।

হে মহারাজ। এইরূপে অপ্রাপ্তবয়স্ক মহাবীর অর্জুনতনয় সমরভূতলে নিপতিত হইলে কৌরবপক্ষ বীরগণের আনন্দ ও পাণ্ডবপক্ষদিগের বিষাদের পরিসীমা রহিল না। পাণ্ডবসৈন্যগণ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সমক্ষেই পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। মহারাজ যুধিষ্ঠির অর্জুনতনয়ের নিধন-নিবন্ধন বীরগণকে পলায়ন করিতে দেখিয়া কহিলেন, হে মহাবল পরাক্রান্ত বীরগণ। সমরবিশারদ মহাবাহু অভিমন্যু সমরে পরাজুখ না হইয়া শত্রুহস্তে প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়াছে; তোমরা স্থির হও; ভীত হইয়া পলায়ন করিও না; আমরা অবিলম্বে শত্রুগণকে পরাজয় করিব। কৃষ্ণার্জুনসমপ্রভাব মহাবীর অর্জুনতনয় সমরে আশীবিষসদৃশ রাজপুত্রগণ, দশ সহস্র সৈন্য, মহারথ কৌশল্য, বৃহদ্বল এবং অসংখ্য রথ, অশ্ব, মাতঙ্গ এবং নরগণকে সংহার করিয়াও পরিতৃপ্ত হয় নাই। ঐ মহাবীর অগ্রে ঐ সমুদায় শত্রুপক্ষদিগকে নিধন করিয়া পশ্চাৎ শত্রুহস্তে সমরে প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক নিশ্চয়ই ইন্দ্রভবনে বা অন্য কোন পুণ্য-নির্জিত পবিত্র সনাতন স্থানে গমন করিয়াছে। সেই পুণ্যাত্মার নিমিত্ত শোক করা কদাপি বিধেয় নয়। মহাতেজাঃ মহারাজ ধর্মরাজ এই বলিয়া সেই সমুদায় দুঃখিত সৈন্যগণের দুঃখমোচন করিতে লাগিলেন।

ত্রয়োদশ দিবসের যুদ্ধে দুই পক্ষের বিশ্রাম।

সঞ্জয় কহিলেন, হে রাজন! আমরা এইরূপে শত্রুপক্ষ বীরশ্রেষ্ঠকে নিহত করিয়া তাঁহাদের শরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া রুধিরোক্ষিত' কলেবরে সায়ংকালে শিবিরে যাত্রা করিলাম। ভগবান্ মরীচিমালী রক্তোৎপলতুল্য কলেবর ধারণ-পূর্ব্বক অস্তাচলচূড়া অবলম্বন করিলেন। দিবস ও রজনীসন্ধি সমুপস্থিত হইল। চতুৰ্দ্দিকে অশিব শিবানিনাদ হইতে লাগিল। ক্রমে ভগবান্ ভাস্কর উৎকৃষ্ট অসি, শক্তি, ঋষ্টি, বরূথ, চর্ম ও অলঙ্কারসমুদায়ের প্রভা হরণপূর্ব্বক আকাশ ও ভূমণ্ডল যেন একাকার করিয়াই স্বীয় প্রিয় কলেবর পাবক মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। ঐ সময় আমরা ও আমাদের বিপক্ষগণ, আমরা উভয় পক্ষই সমরব্যায়ামে বিমোহিতপ্রায় হইয়া সংগ্রামস্থল অবলোকন করত মন্দ মন্দ গমন করিতে লাগিলাম; দেখিলাম, রণভূমি বজ্রাহত অভ্রংলিহাগ্র' অচলশৃঙ্গসদৃশ পতাকা, অঙ্কুশ, বৰ্ম্ম ও সাদি-সমবেত নিপতিত মাতঙ্গনিকরে ব্যাপ্ত হইয়াছে এবং রথী, যন্ত্রী, বিভূষণ, অশ্ব, সারথি, পতাকা ও কেতুবিহীন চূর্ণিত প্রকাণ্ড রথসমূহে শোভা পাইতেছে; বোধ হইতেছে যেন, শত্রুগণ শরনিকরে সেই সকল রথের প্রাণ নাশ করিয়াছে। বীরগণের শরনিকরে সাদি-সমভিব্যাহারে নিহত, মহার্হ ভূষণ-বিভূষিত বিবিধ রথাশ্বসমুদায় বিস্ফারিতলোচন, বিনির্গতান্ত্র ও বহিষ্কৃত-জিহ্বাদর্শন হইয়া ধরাতলে নিপতিত থাকাতে রণভূমি ঘোর রূপ ধারণ করিয়াছে। মহামূল্য চৰ্ম্ম, আভরণ, বসন, অস্ত্র ও শস্ত্রে বিভূষিত মহার্ঘ শয়নোচিত মহাবীরগণ হস্তী, অশ্ব, রথ ও অনুচরবর্গের সহিত অনাথের ন্যায় ধরাতলে শয়ান রহিয়াছেন। বিকটাকার শৃগাল, কুকুর, কাক, বক, সুপর্ণ, বৃক, তরক্ষু, রক্তপায়ী পক্ষী, রাক্ষস ও পিশাচগণ হৃষ্টচিত্তে রণনিহত প্রাণিগণের চৰ্ম্মভেদ করিয়া রুধির, বসা, মজ্জা ও মাংস ভক্ষণ করিতেছে। রাক্ষসগণ শবসমুদায় আকর্ষণ করিয়া হাস্য করিতেছে।

হে মহারাজ! সমরক্ষেত্রে বীরগণকর্তৃক দুস্তর বৈতরণীর ন্যায় অতি ভীষণ শোণিতনদী প্রবাহিত হইল। রথসকল উহার উড়ুপস্বরূপ, হস্তিগণ পর্ব্বতস্বরূপ, মনুষ্যগণের মস্তকসমুদায় উৎপলস্বরূপ, মাংস কদমস্বরূপ ও নানাবিধ অস্ত্র-শস্ত্র মালাস্বরূপ শোভা পাইল। উহাতে অসংখ্য প্রাণিগণের শরীর ভাসিতে লাগিল। বিকটদর্শন ভয়াবহ পিশাচ, শৃগাল, কুকুর, পিশিতাশন পক্ষিগণ পরমানন্দে ঐ নদীতে পান-ভোজন করত ভীষণস্বরে চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। সৈন্যগণ সায়ংকালে বিধ্বস্তভূষণ শত্রুসদৃশ রণনিহত মহাবীর অভিমন্যুকে হব্যবিহীন যজ্ঞীয় হুতাশনের ন্যায় নিরীক্ষণ করিয়া যমরাজ্যবর্দ্ধন নৃত্যপরায়ণ কবন্ধকুলসঙ্কুল ভীমদর্শন সমরভূমি ক্রমে ক্রমে পরিত্যাগ করিতে লাগিল।

অভিমন্যুর মৃত্যুতে যুধিষ্ঠিরের দুঃখ প্রকাশ।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে রথযূথপতি মহাবীর অভিমন্যু সমরে নিপতিত হইলে পাণ্ডবপক্ষ বীরসমুদায় রথ, কবচ ও শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক দুঃখিতচিত্তে অভিমন্যুকে চিন্তা করত যুধিষ্ঠিরের চতুর্দিকে উপবেশন করিলেন।

মহারাজ ধৰ্ম্মনন্দন ভ্রাতৃপুত্রনিধনে একান্ত কাতর হইয়া বিলাপ করিতে লাগিলেন; হায়। মহাবীর অভিমন্যু আমার প্রিয়চিকীর্ষায় ব্যূহ ভেদপূর্ব্বক সিংহ যেমন গোগণমধ্যে প্রবিষ্ট হয়, তদ্রূপ দুর্ভেদ্য দ্রোণসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল! যাহার প্রভাবে মহাধনুর্দ্ধর, সমরদুৰ্ম্মদ, অস্ত্র-শস্ত্রবিশারদ বিপক্ষ পক্ষ বীরগণ রণে ভগ্ন হইয়া পলায়ন করিয়াছে, যে মহাবীর আমাদের প্রধান শত্রু দুঃশাসনকে সংগ্রামে অতি অল্প ক্ষণের মধ্যেই বিসংজ্ঞ ও বিমুখ করিয়াছে এবং অনায়াসে দ্রোণসৈন্যরূপ মহাসাগর পার হইয়াছে, সেই সমরবিশারদ অভিমন্যু দুঃশাসন-তনয়ের সহিত সংগ্রাম করিয়া শমনসদনে গমন করিল! আজি আমি কিরূপে পুত্রবৎসল ধনঞ্জয় ও পুত্রের অদর্শনা একান্তকাতরা সুভদ্রাকে অবলোকন করিব! কৃষ্ণ ও অর্জুন এ স্থানে আগমন করিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহাদিগকে কি প্রত্যুত্তর প্রদান করিব! আমিই কৃষ্ণ ও অর্জুনের জয় লাভও প্রিয়ানুষ্ঠান করিবার মানসে এই অপ্রিয় কার্য্য করিয়াছি। লুব্ধ ব্যক্তি কদাপি দোষ জানিতে পারে না; লোভ মোহ হইতে উৎপন্ন হয়। আমি রাজ্যলোলুপ হইয়া এই মহৎ অনিষ্টপাত অবলোকন করিতে সমর্থ হই নাই! যে সুকুমার কুমারকে ভোজ্য, যান, শয্যা ও ভূষণ প্রদান করা উচিত, আমরা তাহার উপরেই সংগ্রামের প্রধান ভার সমর্পণ করিয়াছিলাম; সৎস্বভাবসম্পন্ন অশ্ব যেমন বিষম সঙ্কটে পতিত হইলে তাহার মঙ্গল হয় না, তদ্রূপ সমরাভিজ্ঞ বালক অভিমন্যুর এই বিষম সঙ্কটে কিরূপে মঙ্গল হইবে!

যাহা হউক অদ্য আমরা ক্রোধপ্রদীপ্ত অর্জুনের দীন নয়নানলে দগ্ধ হইয়া অভিমন্যুর সহিত ভূতলে শয়ন করিব।

যে অর্জুন নিতান্ত অলুব্ধ, মতিমান্, লজ্জাশীল, রূপবান্, মানপ্রদ, সত্যপরায়ণ, ধীর প্রকৃতি ও মহাবল পরাক্রান্ত, পণ্ডিতগণ যাঁহার উৎকৃষ্ট কার্য্যের প্রশংসা করেন, যে মহাবীর হিরণ্যপুরবাসী ইন্দ্রশত্রু নিবাতকবচ ও কালকেয়গণকে নিহত করিয়াছেন, যিনি চক্ষুর নিমেষমাত্রে পুলোমনন্দনগণকে সগণে নিধন করিয়াছেন এবং যিনি শরণাগত শত্রুগণকেও অভয়প্রদান করেন, আজি আমরা সেই অর্জুনের পুত্রকে নিদারুণ কৌরব-সৈন্যের ভয় হইতে রক্ষা করিতে পারিলাম না! মহাবীর ধনঞ্জয় পুত্রবধে ক্রুদ্ধ হইয়া নিশ্চয়ই কৌরবগণকে সংহার করিবেন এবং ক্ষুদ্রসহায় ক্ষুদ্রাশয় স্বপক্ষক্ষয়কারী দুরাত্মা দুর্য্যোধনও আত্মীয়গণের নিধন দর্শনে নিশ্চয়ই প্রাণ পরিত্যাগ করিবে। এই অসাধারণ পুরুষকারসম্পন্ন অর্জুনতনয়কে সংগ্রামস্থলে নিপতিত নিরীক্ষণ করিয়া আজি আমাদিগের জয় লাভ, রাজ্য লাভ বা সুরলোক প্রাপ্তি কিছুই প্রীতিজনক বলিয়া বোধ হইতেছে না।

শোকার্ত যুধিষ্ঠিরের সমীপে ব্যাসদেবের আগমন।

সঞ্জয় কহিলেন, হে নরনাথ! অনন্তর মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বিলাপমান' ধৰ্ম্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠিরের নিকট সমুপস্থিত হইলে যুধিষ্ঠির তাঁহাকে যথোচিত উপচারে অর্চ্চনা করিয়া উপবেশন-পূর্ব্বক ভ্রাতৃ পুত্রবধজনিত শোকাকুলিতচিত্তে কহিতে লাগিলেন ভগবন্! স্থিরবুদ্ধিসম্পন্ন বালক অভিমন্যু নিতান্ত নিরুপায় হইয় যুদ্ধ করিতেছিল; ইত্যবসরে বহুসংখ্যক অধার্মিক মহারণ তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া বিনাশ করিয়াছে। আমি অভিমন্যুকে কহিয়াছিলাম, তুমি আমাদিগের সমরপ্রবেশের দ্বার প্রস্তুত কর। অভিমন্যু আমার বাক্যে ব্যূহমধ্যে প্রবেশ করিলে আমরা তাহার অনুসরণ করিতেছিলাম; কিন্তু জয়দ্রথ আমাদিগকে নিবারণ করিল। যুদ্ধজীবী পুরুষেরা তুল্য ব্যক্তির সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইবে; কিন্তু বিপক্ষেরা যেরূপ যুদ্ধ করিয়াছে, উহা নিতান্ত বিসদৃশ হইয়াছে, তাহার সন্দেহ নাই। আমি তন্নিমিত্ত সাতিশয় সন্তপ্ত ও শোকবাষ্পে নিতান্ত সমাকুল হইতেছি; এই বিষয় বারংবার চিন্তা করিয়া কিছুতেই শান্তি লাভ করিতে সমর্থ হইতেছি না।

ভগবান্ ব্যাস শোকাবেগসন্তপ্ত রাজা যুধিষ্ঠিরকে এইরূপে বিলাপ ও পরিতাপ করিতে দেখিয়া কহিলেন, হে সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ। তোমার সদৃশ মহাত্মারা বিপদে কদাচ বিমোহিত হন না। অভিমন্যু বালকের অসদৃশ' কার্য্যানুষ্ঠান ও বহুসংখ্যক শত্রু হনন করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছে। মৃত্যু, দেব, দানব ও গন্ধর্ব্বদিগকেও হরণ করিয়া থাকে; মৃত্যুকে অতিক্রম করা নিতান্ত দুঃসাধ্য।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে মহাত্মন্। এই সমুদায় মহাবল পরাক্রান্ত ভূপতিগণ নিহত হইয়া ধরাতলে সৈন্যমধ্যে নিপতিত রহিয়াছেন। ইঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ অযুত-নাগতুল্য পরাক্রম-শালী এবং কেহ কেহ বায়ুবেগতুল্য বলবান্। ইঁহারা পরস্পর সংগ্রাম করিয়াই নিহত হইয়াছেন। সংগ্রাম স্থলে ইঁহাদিগকে সংহার করিতে অন্য কাহারও সাধ্য নাই। পরস্পরকে পরাজয় করিবার বাসনাই ইঁহাদের হৃদয়ে সতত জাগরূক ছিল। এক্ষণে ইঁহারা কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন। এই সমুদায় ভীমবিক্রম ভূপতিগণ নিহত হওয়াতে অদ্য মৃত্যু এই শব্দের সার্থকতা সম্পাদিত হইল। ইঁহারা এক্ষণে নিশ্চেষ্ট নিরভিমান ও শত্রু-গণের বশীভূত হইয়াছেন। হে মহর্ষে! এই নিহত ভূপতিগণকে অবলোকন করিয়া আমার এই সংশয় সমুপস্থিত হইয়াছে যে, মৃত্যু কে, কোথা হইতে উৎপন্ন হইয়াছে এবং কি নিমিত্তই বা প্রজাগণকে সংহার করে? আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক এই বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিয়া আমার সন্দেহ ভঞ্জন করুন।

ব্যাস ও শোকার্ত যুধিষ্ঠিরের কথোপকথন।

অনন্তর ভগবান্ ব্যাস রাজা যুধিষ্ঠিরকে আশ্বাস প্রদান করিবার নিমিত্ত কহিতে লাগিলেন, মহারাজ! পূর্ব্বকালে মহর্ষি নারদ এ বিষয়ে রাজা অকম্পনের নিকট যাহা কীর্ত্তন করিয়া-ছিলেন, সেই প্রাচীন ইতিহাস শ্রবণ করুন। আমি জানি, রাজা অকম্পনও নিতান্ত দুর্বিষহ পুত্রশোক প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অতএব আমি মৃত্যুর উৎপত্তি কীর্ত্তন করিতেছি, তাহা শ্রবণ করিলে আপনি স্নেহবন্ধনজনিত দুঃখ হইতে মুক্তিলাভকরিবেন। হে বৎস। এই পুরাবৃত্ত বেদাধ্যয়নের ন্যায় ফলপ্রদ, পবিত্র, অরিবিনাশক, মঙ্গলেরও মঙ্গল, ধন্য, আয়ুষ্কর, শোক-নাশক ও পুষ্টিবর্দ্ধন; আপনি ইহা শ্রবণ করুন। পুত্র, রাজ্য ও সম্পল্লাভার্থী দ্বিজগণ এই উপাখ্যান 'প্রতিনিয়ত প্রাতঃকালে শ্রবণ করিবেন।

পূর্ব্বকালে সত্যযুগে অকম্পন নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি রণস্থলে শত্রুগণের বশবর্তী হইলেন এবং নারায়ণতুল্য বলবান, শ্রীমান, শিক্ষিতাস্ত্র, মেধাবী, দেবরাজসদৃশ হরি নামে তাঁহার এক পুত্রও রণস্থলে শত্রুগণে পরিবৃত হইয়া হস্তী ও বহুসংখ্যক যোদ্ধাদিগের উপর সহস্র সহস্র শর বর্ষণ এবং অতি দুষ্কর কার্য্য সংসাধন করিয়া সৈন্যমধ্যে নিহত হইলেন। রাজা অকম্পন পুত্রের প্রেতকার্য্য সমাধানান্তে দিবা রাত্রি শোকে একান্ত কাতর হইয়া কিছুতেই সুখলাভ করিতে সমর্থ হইলেন না। অনন্তর দেবর্ষি নারদ তাঁহার পুত্রবিনাশজনিত শোক অবগত হইয়া তাঁহার সন্নিধানে আগমন করিলেন। রাজা অকম্পন দেবর্ষি নারদকে সমাগত দেখিয়া যথোচিত উপচারে অর্চ্চনা-পূর্ব্বক শত্রুগণের জয়লাভ ও আপনার পুত্রের বিনাশবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বর্ণন করিয়া কহিলেন, ভগবন্! শত্রুগণ পরাক্রম প্রকাশপূর্ব্বক আমার মহাবল পরাক্রান্ত পুত্রকে বিনাশ করিয়াছে। এক্ষণে এই মৃত্যু কে এবং ইহার বল, বীর্য্য ও পৌরুষই বা কিরূপ? আমি ইহার যাথার্থ্য শ্রবণ করিতে অভিলাষ করি।

বরদ নারদ তাঁহার এই সমস্ত বাক্য শ্রবণ করিয়া পুত্রশোকবিনাশন এই উপাখ্যান কীর্ত্তন করিতে লাগিলেন। মহারাজ! আমি এই বিস্তীর্ণ উপাখ্যান যেরূপ শ্রবণ করিয়াছি, আপনি তাহা শ্রবণ করুন। সর্ব্বলোেক-পিতামহ ভগবান্ কমলযোনি প্রথমে প্রজা সমস্ত সৃষ্টি করিলেন। অনন্তর এই বিশ্ব বিনষ্ট হইতেছে না দেখিয়া সাতিশয় চিন্তিত হইলেন; কিন্তু সৃষ্টি-সংহারবিষয়ে কিছুই অবধারণ করিতে পারিলেন না। অনন্তর তাঁহার রোষপ্রভাবে আকাশ হইতে এক অগ্নি সমুত্থিত হইল। উহা সংসারস্থ দেশ সমস্ত ভস্মসাৎ করিবার নিমিত্ত চারিদিকে ব্যাপ্ত হইতে লাগিল। এইরূপে ক্রোধভরে সকলকে বিত্রাসিত করত ভগবান্ ব্রহ্মা জ্বালাসমাকুল চরাচর সমস্ত জগৎ ও নভোমণ্ডল ভস্মসাৎ করিলেন; স্থাবর জঙ্গমাত্মক ভূতসকল বিনষ্ট হইল।

অনন্তর জটাজুটমণ্ডিত ভূতপতি ভগবান্ ভবানীপতি পিতামহ ব্রহ্মার শরণাগত হইলেন। ব্রহ্মা লোকের হিতকামনায় সমাগত ভূতপতিকে দেখিয়া তেজঃপ্রভাবে প্রজ্বলিত হইয়া কহিলেন, হে বৎস! তুমি আমার ইচ্ছানুসারে জন্ম গ্রহণ করিয়াছ; এক্ষণে বল, তোমার কিরূপ মনোরথ সফল করিতে হইবে? আমি তোমার প্রিয় কার্য্যসকল অনুষ্ঠান করিব।

ব্রহ্মার ও রুদ্রের সৃষ্টি-সংহার-বিষয়ে কথোপকথন

রুদ্র কহিলেন, হে প্রভো! প্রজাসৃষ্টি-বিষয়ে তুমি যত্ন করিয়াছিলে এবং তুমিই নানাবিধ ভূতসমুদায় সৃষ্টি করিয়া পরিবর্দ্ধিত করিয়াছ। এক্ষণে সেই সকল প্রজা তোমার রোষানলে দগ্ধ হইতেছে। তদ্দর্শনে আমার অন্তঃকরণে করুণার সঞ্চার হইয়াছে, অতএব তুমি প্রসন্ন হও।

ব্রহ্মা কহিলেন, হে রুদ্র! সৃষ্টি-সংহারবিষয়ে আমার অভিলাষ ছিল না; কিন্তু পৃথিবীর হিতকামনায় আমার ক্রোধ উপস্থিত হইল; এই দেবী বসুন্ধরা দুর্ভর ভারে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া ভূতসংহারার্থ আমাকে অনুরোধ করেন; কিন্তু আমি এই অনন্ত জগতের সংহারকারণ কিছুই উদ্ভাবন করিতে সমর্থ হইলাম না, এই নিমিত্ত আমার হৃদয়ে ক্রোধের আবির্ভাব হইল।

রুদ্র কহিলেন, হে জগন্নাথ! প্রসন্ন হও, বিশ্বসংহারের নিমিত্ত সমুৎপন্ন ক্রোধ পরিত্যাগ কর; স্থাবর-জঙ্গমাত্মক ভূতল-সকল বিনাশ করিও না। তোমার প্রসাদে ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান এই ত্রিবিধ জগৎ বিদ্যমান থাকুক। তুমি রোষাবিষ্ট হইয়া যে অগ্নি সৃষ্টি করিয়াছ, উহা নদী, প্রস্তর, বৃক্ষ, পল্লব, তৃণ ও উলপ প্রভৃতি স্থাবর-জঙ্গমাত্মক জগৎ ভস্মসাৎ করিতেছে। এক্ষণে প্রসন্ন হইয়া যাহাতে ক্রোধের উপশম হয়, ইহাই আমার অভিলষণীয় বর। হে দেব! সৃষ্ট পদার্থসকল বিনষ্ট হইতেছে; অতএব তুমি তেজঃ সংহার কর; উহা তোমাতেই বিলীন হউক; হিতাভিলাষপরতন্ত্র হইয়া প্রজাদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। এই সমস্ত প্রাণী যাহাতে বিদ্যমান থাকে, তাহার অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হও, উৎপন্ন প্রজাসকল যেন নির্মূল না হয়। তুমি আমাকে লোকমধ্যে অধিদেব পদে নিযুক্ত করিয়াছ। হে ত্রিলোকীনাথ। এই চরাচর বিশ্ব বিনাশ করিও না; তুমি প্রসাদোম্মুখ' হইয়াছ বলিয়া তোমাকে এইরূপ কহিতেছি।

অনন্তর লোকপিতামহ ব্রহ্মা প্রজাদিগের হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত পুনরায় অন্তরাত্মাতে স্বীয় তেজঃ ধারণপূর্ব্বক অগ্নির উপসংহার করিয়া সৃষ্টিহেতু প্রবৃত্তি-ধৰ্ম্ম ও মোক্ষহেতু নিবৃত্তি ধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিলেন। তিনি যখন ক্রোধজনিত হুতাশনকে সংহার করেন, তৎকালে তাঁহার সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার হইতে কৃষ্ণ, রক্ত ও পিঙ্গলবর্ণ, রক্তজিহ্ব, রক্তাস্য ও রক্তলোচন, বিমল-কুণ্ডলালঙ্কৃত, বিবিধ ভূষণে বিভূষিত এক নারী প্রাদুর্ভূত হইলেন। ঐ নারী নির্গত হইবামাত্র ব্রহ্মা ও রুদ্রকে নিরীক্ষণপূর্ব্বক হাস্য করিতে করিতে দক্ষিণ দিক্ আশ্রয় করিলেন। ব্রহ্মা তাঁহাকে মৃত্যু বলিয়া আহ্বান করত কহিলেন, তুমি আমার সংহার-বুদ্ধিপ্রভাবে ক্রোধ হইতে প্রাদুর্ভূত হইয়াছ; অতএব তুমি আমার নিয়োগবশতঃ কি জড়, কি পণ্ডিত, এই পৃথিবীস্থ সমুদায় প্রজাগণকে সংহার কর, তাহা হইলে তোমার মঙ্গল হইবে। কমললোচনা মৃত্যু ব্রহ্মার এই কথা শ্রবণ করিয়া কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করত মধুর স্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। পিতামহ ব্রহ্মা লোকের হিতসাধনার্থ তৎক্ষণাৎ অঞ্জলিপুটে তাঁহার নয়নজল গ্রহণ করিয়া ঐ নারীকে নানা প্রকারে অনুনয় করিলেন।

কন্যারূপিণী মৃত্যুর প্রতি ব্রহ্মার আদেশ ও বরদান।

কিয়ৎক্ষণ পরে মৃত্যু দুঃখ অপনীত করিয়া সন্নমিত লতার ন্যায় কৃতাঞ্জলিপুটে ব্রহ্মাকে কহিলেন, ভগবন্! আপনি কেন এই পাপীয়সীকে সৃষ্টি করিলেন? এক্ষণে আমি এই অহিত ক্রুর কৰ্ম্ম নিতান্ত অধৰ্ম্মমূলক জানিয়াও কিরূপে ইহার অনুষ্ঠান করিব? আমি স্বধর্মানুষ্ঠানে অতিশয় ভীত হইতেছি, আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হউন। আমি যাহাদের একান্ত প্রিয়তর পুত্র, মিত্র, ভ্রাতা, পিতা ও ভর্তাদিগকে বিনাশ করিব, তাহারা অবশ্যই আমার অনিষ্ট চিন্তা করিবে; এই নিমিত্ত আমার অত্যন্ত শঙ্কা হইতেছে। আমি প্রিয়াবিয়োগে দীনভাবে রোরুদ্যমান প্রজাদিগের অনর্গল নিপতিত নেত্রজল হইতে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া আপনার শরণাপন্ন হইলাম। এক্ষণে কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিতেছি, আপনি প্রসন্ন হউন। আমি কদাচ যমালয়ে গমন করিতে পারিব না। আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার এই অভিলাষ সফল করুন। ধেনুকাশ্রমে গমনপূর্ব্বক কঠোর তপস্যাদ্বারা আপনার আরাধনা করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইয়াছে; আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক আমাকে তদ্বিষয়ে আদেশ করুন, আমি এইমাত্র বর প্রার্থনা করি। আমি কদাচ বিলাপমান প্রাণিগণের প্রিয়তম প্রাণ বিনাশ করিতে সমর্থ হইব না। হে পিতামহ! আপনি আমাকে অধৰ্ম্ম হইতে রক্ষা করুন।

ব্রহ্মা কহিলেন, হে মৃত্যু! তুমি প্রজাসংহারার্থ সমুৎপন্ন হইয়াছ; অতএব আমার নিয়োেগানুসারে কোন বিচার না করিয়া লোকবিনাশে প্রবৃত্ত হও। লোকক্ষয় অবশ্যই হইবে; ইহা কদাচ অন্যথা হইবার নহে। অতএব তুমি আমার আজ্ঞা প্রতিপালন কর, এই বিষয়ে কেহই তোমাকে নিন্দা করিবে না।

মৃত্যু ব্রহ্মার বাক্য শ্রবণে নিতান্ত ভীতা হইয়া কৃতাঞ্জলি-পুটে ব্রহ্মার মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রহিলেন। লোকের হিতসাধনোদ্দেশে লোকবিনাশে কোনমতেই তাঁহার অভিলাষ হইল না। পিতামহ ব্রহ্মা তৎকালে মৌনভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন এবং অবিলম্বেই হাস্যমুখে লোেকরক্ষার্থে প্রসন্ন হইলেন। এইরূপে সর্ব্বলোেক-পিতামহ কমলযোনি ক্রোধ পরিত্যাগ করিলে সমুদায় লোক অপমৃত্যুগ্রস্ত না হইয়া পূর্ব্ববৎ অবস্থান করিতে লাগিল। তখন সেই কন্যা প্রজাসংহারবিষয়ে অঙ্গীকার না করিয়া ব্রহ্মার নিকট বিদায় গ্রহণপূর্ব্বক তথা হইতে অপসৃত হইলেন এবং অবিলম্বে ধেনুকাশ্রমে উপস্থিত হইয়া অতি কঠোর ব্রত অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। তিনি সমুদায় ইন্দ্রিয়সেব্য প্রিয়বস্তু হইতে ইন্দ্রিয়গণকে নিবৃত্ত করিয়া প্রজাগণের হিতার্থ একবিংশতি পদ্ম বৎসর এক পদে দণ্ডায়মান রহিলেন। পরে পুনরায় একবিংশতি পদ্মবৎসর' একপদে অবস্থান করিলেন। অনন্তর অযুত পদ্ম বৎসর মৃগগণের সহিত সঞ্চরণ করিতে লাগিলেন। পরে পুনরায় সুশীতল নিৰ্ম্মল জলসম্পন্ন পবিত্র নন্দা তীর্থে গমন করিয়া নিয়মপূর্ব্বক অষ্টোত্তর সহস্র বৎসর সলিলে কালাতিপাত করিলেন। এইরূপে নন্দাতীর্থে বিগতপাপ হইয়া প্রথমতঃ অতি পবিত্র কৌশিকী তীর্থে উপস্থিত হইলেন। তথায় বায়ু ভক্ষণ ও জল পান করিয়া পুনরায় নিয়মানুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। পরে পঞ্চগঙ্গ ও বেতস তীর্থে তপোবিশেষদ্বারা দেহ পরিশুষ্ক করিলেন। অনন্তর গঙ্গা ও প্রধান মহামেরু তীর্থে গমনপূর্ব্বক প্রাণায়াম পরায়ণ হইয়া প্রস্তরের ন্যায় নিশ্চেষ্টভাবে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তৎকালে হিমালয়ের শিখরদেশে গমনপূর্ব্বক অঙ্গুলির উপর নির্ভর করিয়া নিখর্ব্ববৎসর' অবস্থান করিলেন। পূর্ব্বকালে দেবগণ ঐ স্থানে যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ঐ কন্যা পুষ্কর, গোকর্ণ, নৈমিষ ও মলয় তীর্থে অভিলষিত নিয়মানুষ্ঠানপূর্ব্বক দেহ পরিশুষ্ক করিতে লাগিলেন। এইরূপে তিনি অনন্যমনে একমাত্র ব্রহ্মাকে প্রতিনিয়ত ভক্তি প্রদর্শনপূর্ব্বক প্রসন্ন করিলেন।

তখন অব্যয় ভূতভাবন ভগবান্ ব্রহ্মা শান্ত ও প্রীতমনে তাঁহাকে কহিলেন, হে মৃত্যু! তুমি কি নিমিত্ত এইরূপ অতি কঠোর তপোনুষ্ঠান করিতেছ? তখন মৃত্যু পুনরায় ব্রহ্মাকে কহিলেন, হে ভগবন্! প্রজারা সুস্থ হইয়া কালযাপন করিতেছে; তাহারা বাক্যেও অন্যের অপকার করে না; আমি কখনই তাহাদিগকে বিনষ্ট করিতে পারিব না। এক্ষণে আপনার নিকট এই বর প্রার্থনা করি। আমি অধৰ্ম্মভয়ে ভীত হইয়া তপোনুষ্ঠান করিয়াছি। অতএব আপনি আমাকে অভয় প্রদান করুন। আমি একান্ত কাতরা ও নিরপরাধা; প্রার্থনা করি, আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার আশ্রয় হউন। অনন্তর ত্রিকালজ্ঞ পিতামহ ব্রহ্মা কহিলেন, হে কন্যে! এই সমস্ত প্রজা সংহার করিলে তোমার কিছুমাত্র অধৰ্ম্ম হইবে না, আমার বাক্য কদাচ অন্যথা হইবার নয়। অতএব তুমি অশঙ্কিতচিত্তে চতুর্ব্বিধ প্রজা সংহার কর; তোমার সনাতন ধর্ম লাভ হইবে, লোকপাল যম, ব্যাধিসকল ও দেবগণ তোমার সহায় হইবেন এবং আমিও তোমার সহায়তা সম্পাদন করিব। আর তুমি পাপ হইতে বিমুক্ত ও রজোগুণ-রহিত হইয়া যেরূপে খ্যাতিলাভে সমর্থা হইবে, পুনরায় এমন একটি বরও তোমাকে প্রদান করিব।

অনন্তর মৃত্যু প্রণত ব্রহ্মাকে প্রসন্ন করত কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, ভগবন্! যদি আমা ব্যতিরেকে এই কার্য্য অনুষ্ঠিত না হয়, তবে আপনার এই আজ্ঞা আমাকে শিরোধার্য্য করিতে হইল, কিন্তু আমি যাহা নিবেদন করিতেছি, আপনি তাহা শ্রবণ করুন। লোভ, ক্রোধ, অসূয়া, ঈর্ষা, দ্রোহ, মোহ ও নির্লজ্জতা এই সকল পরুষ ইন্দ্রিয়বৃত্তি প্রাণিগণের দেহ ভেদ করিবে। তখন ব্রহ্মা কহিলেন, হে মৃত্যু! তুমি যাহা কহিলে তাহাই হইবে, এক্ষণে তুমি লোকবিনাশে প্রবৃত্ত হও, তোমার অধর্ম হইবে না এবং আমিও তোমার অনিষ্ট চেষ্টা করিব না। আমার করতলে তোমার যে সমুদায় অশ্রুবিন্দু নিপতিত রহিয়াছে, উহা প্রাণিগণের আত্মসম্ভূত ব্যাধি রূপে প্রাদুর্ভূত হইয়া প্রাণ সংহার করিবে; তাহা হইলে তোমার অধৰ্ম্ম হইবে না। তুমি এক্ষণে ভয় পরিত্যাগ কর। তুমি প্রাণিগণের ধর্ম, ধর্ম্মের অধীশ্বর, ধর্মপরায়ণা ও ধর্ম্মের কারণ; এক্ষণে ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক প্রাণিগণের প্রাণবিনাশে প্রবৃত্ত হও। তুমি কাম ও রোষ বিসর্জন করিয়া জীবগণের জীবন সংহার কর; তাহা হইলে তোমার অক্ষয় ধৰ্ম্মলাভ হইবে। অধর্ম দুরাচারদিগকে নির্মূল করিবে; তুমি আমার বাক্যানুসারে কার্য্য করিয়া আপনাকে পবিত্র কর, তুমি অসাধু জীবগণকে পাপে নিমগ্ন করিবে।

নারদ কহিলেন, মহারাজ। অনন্তর সেই কন্যা আপনার, "মৃত্যু” এই নাম হইল দেখিয়া নিতান্ত ভীতা ও অভিশাপভয়ে একান্ত শঙ্কিতা হইয়া তৎক্ষণাৎ ব্রহ্মার বাক্য স্বীকার করিলেন। সেই মৃত্যু কাম ক্রোধ পরিত্যাগ করিয়া অসংসক্তরূপে অন্তকালে প্রাণিগণের প্রাণ নাশ করিয়া থাকেন। প্রাণীদিগেরই মৃত্যু হয়; রোগ নামধারী ব্যাধি প্রাণিগণ হইতেই সম্ভূত হইয়া থাকে, তন্দ্রারা তাহারা সাতিশয় নিপীড়িত হয়। অতএব আপনি জীবনান্তে জীবগণের নিমিত্ত বৃথা শোক করিবেন না। ইন্দ্রিয়সকল জীবনান্তে জীবগণের সহিত পরলোকে গমন ও স্ব স্ব কার্য্য সংসাধনপূর্ব্বক প্রতিনিবৃত্ত হইয়া থাকে; এইরূপ দেবগণও মনুষ্যের ন্যায় পরলোক গমন ও স্ব স্ব কার্য্য সংসাধন করিয়া থাকেন। ভীমরূপ, ভীমনাদ, সর্ব্বগামী, উগ্র, অনন্ততেজাঃ প্রাণবায়ু কেবল দেহই ভেদ করিয়া থাকে; উহার যাতায়াত নাই। সকল দেবতারাও মর্ত্যসংজ্ঞাধারী। হে মহারাজ! এক্ষণে আপনি স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত শোক করিবেন না। তিনি স্বর্গে সুরম্য বীরলোক প্রাপ্ত হইয়া দুঃখ পরিত্যাগ ও সাধুসমাগম লাভপূর্ব্বক প্রতিনিয়ত আনন্দিত হইতেছেন। প্রজাদিগের মৃত্যু দেবনিদ্দিষ্ট; মৃত্যু কাল উপস্থিত হইলে প্রজাদিগের প্রাণ নাশ করিয়া থাকে। প্রাণিগণ স্বয়ংই বিনষ্ট হয়; মৃত্যু দণ্ড ধারণপূর্ব্বক তাহাদিগকে হিংসা করেন না, এই ব্রহ্মসৃষ্টি সত্যটি পণ্ডিতেরা সম্যক্ অবগত হইয়া মৃতব্যক্তিদিগের নিমিত্ত কদাচ শোক করেন না। হে মহারাজ! আপনি দৈববিহিত এইরূপ সৃষ্টি অবগত হইয়া পুত্রের বিনাশনিবন্ধন শোক অবিলম্বে পরিত্যাগ করুন।

মহারাজ অকম্পন প্রিয় সখা নারদের নিকট এইরূপ অর্থবহুল বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ভগবন্! আমি এই ইতিহাস শ্রবণ করিয়া বিগতশোক, প্রীত ও কৃতার্থ হইলাম, এক্ষণে আপনাকে অভিবাদন করি। এইরূপে ভূপতি অকম্পন বিগতশোক হইলে দেবর্ষি নারদ অবিলম্বে নন্দনকাননে প্রস্থান করিলেন। হে ধর্মরাজ! এই ইতিহাস শ্রবণ ও অন্যের নিকট কীর্ত্তন করা উভয়ই ধন্য, পুণ্যজনক, যশস্কর, আয়ুষ্কর ও স্বর্গলাভের হেতুভূত। হে ধৰ্ম্মরাজ! তুমি এই অর্থভূয়িষ্ঠ বাক্য শ্রবণপূর্ব্বক ক্ষত্রধৰ্ম্ম ও বীরগণের উৎকৃষ্ট গতি অবগত হইয়া ধৈর্য্যাবলম্বন কর। চন্দ্রাংশসম্ভূত মহারথ অভিমন্যু অসংখ্য ধনুর্জারীদিগের সমক্ষে শত্রুগণকে বিনাশপূর্ব্বক সংগ্রাম করত অসি, গদা, শক্তি ও কাৰ্ম্মকদ্বারা বিনষ্ট ও রজোগুণবিরহিত হইয়া পুনরায় চন্দ্রে বিলীন হইয়াছেন। অতএব তুমি ধৈর্য্যাব-লম্বনপূর্ব্বক অপ্রমত্ত ও ক্রুদ্ধ' হইয়া ভ্রাতৃগণ-সমভিব্যাহারে সত্বরে যুদ্ধার্থ নির্গত হও।

মৃত্যু-বিষয়ক প্রশ্নে ব্যাসকর্তৃক সৃঞ্জয়োপাখ্যান।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মৃত্যুর উৎপত্তি ও অদ্ভুত কাৰ্য্যসমুদায় শ্রবণপূর্ব্বক ব্যাসকে প্রসন্ন করিয়া পুনরায় কহিলেন, ভগবন্। পূর্ব্বতন রাজর্ষিগণ ইন্দ্রতুল্য পরাক্রমশালী, পুণ্যকর্মা, সত্যবাদী ও পাপশূন্য ছিলেন; আপনি তাঁহাদের কার্য্য ও শোকাপনোদন বাক্যে আমাকে আশ্বাসিত করুন এবং কোন্ রাজর্ষি কি পরিমাণে দক্ষিণা দান করিয়াছিলেন, তাহাও কীর্ত্তন করুন।

ব্যাস কহিলেন, হে যুধিষ্ঠির! মহারাজ শ্বিত্যের সৃঞ্জয় নামে এক আত্মজ ছিলেন। মহর্ষি পৰ্ব্বত ও নারদের সহিত তাঁহার সখ্যভাব ছিল। একদা তাঁহারা সৃঞ্জয়ের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত তাঁহার আবাসে প্রবেশ করিলেন। সৃঞ্জয় তাঁহাদিগের যথোচিত উপচারে অর্চ্চনা করিলে তাঁহারা সাতিশয় প্রীত হইয়া পরম সুখে তথায় কিয়দ্দিবস অবস্থান করিতে লাগিলেন। একদা রাজা সৃঞ্জয় তাঁহাদিগের সহিত সুখ স্বচ্ছন্দে উপবেশন করিয়াছেন, এই অবসরে তাঁহার একটি অবিবাহিতা দুহিতা তথায় সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অভিবাদন করিলেন। সৃঞ্জয় পার্শ্বস্থা কন্যাকে অভিলাষানুরূপ আশীর্ব্বাদদ্বারা অভিনন্দন করিলেন। মহর্ষি পর্ব্বত ঐ কন্যাকে নিরীক্ষণ করিয়া ঈষৎ হাস্য করত কহিলেন, মহারাজ! এই সর্ব্বলক্ষণসম্পন্না কন্যা কাহার? ইনি সূর্য্যের প্রভা বা অনলের শিখা; অথবা শশধরের কান্তি, কিংবা শ্রী, লজ্জা, কীর্ত্তি, ধৃতি, পুষ্টি ও সিদ্ধির অন্যতমা হইবেন। নৃপতি সৃঞ্জয় দেবর্ষি পর্ব্বতের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, সখে! এইটি আমার কন্যা, এক্ষণে আমার নিকট বর প্রার্থনা করিতেছে। তখন নারদ কহিলেন, মহারাজ! তুমি যদি মঙ্গললাভের অভিলাষী হও, তাহা হইলে এই কন্যাটি। ভার্য্যার্থ আমাকে প্রদান কর। রাজা সৃঞ্জয় পরম প্রীতিসহকারে তৎক্ষণাৎ তাঁহার বাক্যে অঙ্গীকার করিলেন।

তখন মহর্ষি পৰ্ব্বত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া নারদকে কহিলেন, আমি পূব্বেই ইঁহাকে মনে মনে বরণ করিয়াছি, পশ্চাৎ তুমি ইঁহাকে বরণ করিলে; অতএব তুমি স্বেচ্ছাক্রমে স্বর্গগমনে সমর্থ হইবে না। নারদ কহিলেন, ইনি আমারই ভার্য্যা এইরূপ জ্ঞান, এইরূপ বাক্য ও এইরূপ অধ্যবসায় এবং উদক প্রক্ষেপপূর্ব্বক দান আর পাণিগ্রহণ মন্ত্র এই কয়েকটি পরিণয়ের লক্ষণ বলিয়া প্রখ্যাত আছে। এই সমস্ত বিষয় সম্পাদিত হইলেই ভার্য্যাত্ব সম্পাদিত হয়, এমত নহে; সপ্তপদীগমনই ভার্য্যাত্ব সম্পাদক বলিয়া উল্লিখিত হইয়া থাকে; এই কন্যা তোমার ভার্য্যা না হইতেই তুমি যখন আমাকে অভিসম্পাত করিলে, তখন তুমিও আমা ব্যতিরেকে স্বর্গগমনে সমর্থ হইবে না। এইরূপে সেই দেবর্ষিদ্বয় পরস্পর পরস্পরকে অভিশাপ প্রদান করিয়া তথায় অবস্থান করিতে লাগিলেন।

এদিকে রাজা সৃঞ্জয় পুত্রপ্রার্থনায় বিশুদ্ধ মনে পরম যত্ন-সহকারে অন্ন, পান ও বস্ত্র প্রদানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণগণের আরাধনায় প্রবৃত্ত হইলেন। একদা বেদবেদান্তপারগ স্বাধ্যায়নিরত ব্রাহ্মণগণ সৃঞ্জয়ের প্রতি প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে পুত্র প্রদান করিবার অভিলাষে মহর্ষি নারদের সমীপে গমনপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্! আপনি মহারাজকে একটি অভিলষিত পুত্র প্রদান করুন। নারদ ব্রাহ্মণ-গণের বাক্যে স্বীকার করিয়া সৃঞ্জয়কে কহিলেন, মহারাজ! ব্রাহ্মণগণ প্রসন্ন হইয়া তোমার একটি পুত্র প্রার্থনা করিতেছেন। এক্ষণে তোমার যেরূপ পুত্র লাভের ইচ্ছা থাকে, প্রার্থনা কর; তোমার মঙ্গল হইবে। তখন রাজা সৃঞ্জয় কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, হে মহাত্মন্! আপনার বরপ্রভাবে আমার যেন সর্ব্বগুণসম্পন্ন কীর্ত্তিমান, যশস্বী, ও অসাধারণ তেজঃসম্পন্ন এক পুত্র জন্মে এবং তাহার মূত্র, পুরীষ, ক্লেদ ও স্বেদ যেন কাঞ্চনময় হয়। নারদ সৃঞ্জয়ের বাক্যে স্বীকার করিয়া তাঁহাকে অভিলষিত বর প্রদান করিলে অতি অল্প কালের মধ্যে তাঁহার প্রার্থনানুরূপ এক পুত্র জন্মিল। ঐ পুত্র ক্ষিতিতলে সুবর্ণষ্ঠীবী' নামে প্রখ্যাত হইয়াছিলেন। ঐ পুত্র মহর্ষির বরপ্রভাবে ক্রমে অপরিমিত ধন পরিবর্দ্ধিত করিলে রাজা সৃঞ্জয় সমস্ত অভীষ্ট বস্তু সুবর্ণময় করিয়া লইলেন। তখন তাঁহার গৃহ, প্রাকার, দুর্গ, ব্রাহ্মণালয়, শয্যা, আসন, স্থান ও স্থলী সমস্ত কাঞ্চনময় হইয়া কালসহকারে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। কিয়দ্দিন পরে দস্যুগণ নৃপতনয়ের এই বৃত্তান্ত শ্রবণ ও তাঁহাকে নিরীক্ষণপূর্ব্বক দলবদ্ধ হইয়া ভূপতির অনিষ্টচেষ্টায় প্রবৃত্ত হইল। উহাদের মধ্যে কেহ কেহ কহিল, আমরা স্বয়ং গিয়া রাজার পুত্রকে গ্রহণ করিব; ঐ পুত্রই সুবর্ণের আকর; অতএব উহাকে হস্তগত করিতে যত্ন করা আমাদের অবশ্যকর্তব্য।

অনন্তর লুব্ধস্বভাব দস্যুগণ ঐরূপ পরামর্শ করিয়া নূপ-সদনে' প্রবেশপুরঃসর বলপূর্ব্বক রাজকুমার সুবর্ণষ্ঠীবীকে লইয়া অরণ্যে পলায়ন করিল। তথায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া তাঁহাকে খণ্ড খণ্ড করিয়া ছেদন করল, কিন্তু কিছুই অর্থলাভকরিতে সমর্থ হইল না। রাজকুমারের প্রাণনাশ হইলে সেই বরসঞ্জাত ধন বিনষ্ট হইয়া গেল; তখন মূর্খ দস্যুগণ জ্ঞানশূন্য হইয়া পরস্পর পরস্পরকে বিনাশ করিতে লাগিল। এইরূপে তাহারা সেই অভূতপূর্ব্ব রাজকুমারকে সংহারপূর্ব্বক পরস্পর বিনষ্ট হইয়া ঘোর নরকে গমন করিল।

এদিকে রাজা সৃঞ্জয় সেই বরপ্রদত্ত পুত্রকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া দুঃখিত মনে করুণ বচনে বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। দেবর্ষি নারদ রাজাকে পুত্রশোকে নিতান্ত কাতর জানিয়া তাঁহার সন্নিধানে আগমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! আমরা ব্রহ্মবাদী মহর্ষি; আমরা সততই তোমার গৃহে অবস্থান করিতেছি; কিন্তু তোমাকেও বিষয়বাসনায় অপরিতৃপ্ত হইয়া কালগ্রাসে নিপতিত হইতে হইবে। আমরা শ্রবণ করিয়াছি, অবিক্ষিতের পুত্র মরুত্তও মৃত্যুগ্রস্ত হইয়াছিলেন। ঐ মহাত্মা সুরগুরু বৃহস্পতির প্রতি স্পর্দ্ধা প্রকাশ করিয়া সংত্তর্ব যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। ভগবান্ শূলপাণি উহাকে বিবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান করিতে দেখিয়া হিমাচলের সুবর্ণময় এক প্রত্যন্ত পৰ্ব্বত প্রদান করিয়াছিলেন: বৃহস্পতি ও ইন্দ্র প্রভৃতি অমরগণ যজ্ঞান্তে উঁহার নিকট উপনীত হইতেন। উঁহার যজ্ঞভূমির পরিচ্ছদ সকল সুবর্ণময় ছিল। অন্নার্থী ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় প্রভৃতি বর্ণত্রয় উঁহার যজ্ঞকালে অভিলাষানুরূপ পবিত্র অন্ন ভোজন করিয়া পরিতৃপ্ত হইতেন এবং বেদপারগ প্রহৃষ্ট ব্রাহ্মণগণ দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, মধু প্রভৃতি উৎকৃষ্ট ভোজ্য, বস্ত্র ও অলঙ্কার প্রভৃতি সমস্ত অভিলাষানুরূপ দ্রব্য প্রাপ্ত হইতেন। দেবগণ রাজা মরুত্তের গৃহে দ্রব্যসামগ্রী পরিবেশন করিতেন। বিশ্বদেবগণ তাঁহার সভাসদ ছিলেন। অমরগণ হবিঃদ্বারা পরিতৃপ্ত হইয়া প্রচুর পরিমাণে বারি বর্ষণপূর্ব্বক সেই মহাবল পরাক্রান্ত রাজার শস্যসকল পরিবর্দ্ধিত করিতেন। তিনি ব্রহ্মচর্য্যানুষ্ঠান, বেদাধ্যয়ন ও শ্রাদ্ধাদি দ্বারা নিরন্তর ঋষি, দেবতা ও পিতৃলোকের তৃপ্তিসাধন করিতেন। তিনি স্বেচ্ছাক্রমে শয়ন, আসন, যান ও দুস্ত্যজ সুবর্ণ রাশি অধিক পরিমাণে ব্রাহ্মণগণকে দান করিয়াছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র নিরন্তর তাঁহার শুভ চিন্তা করিতেন। তিনি প্রজাগণকে নির্বিঘ্নে রাখিয়া পরম শ্রদ্ধাসহকারে জিত অক্ষয়লোকসকল প্রাপ্ত হইয়াছেন; তিনি যৌবনাবস্থায় পুত্র, কলত্র, বান্ধব, অমাত্য ও প্রজাবর্গ-সমভিব্যাহারে সহস্র বৎসর রাজ্য শাসন করিয়া-ছিলেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা তপঃ, সত্য, দয়া ও দানসম্পন্ন এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা পুণ্যবান্ সেই মরুত্ত রাজাও কালগ্রাসে নিপতিত হইয়াছেন; অতএব তুমি সেই অযাজ্ঞিক ও অনাধ্যায়ী, পুত্রের নিমিত্ত আর শোক করিও না।

দেবর্ষি নারদকর্তৃক সুহোত্রর মৃত্যু-বৃত্তান্ত বর্ণন।

নারদ কহিলেন, মহারাজ! অদ্বিতীয় বীর নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ রাজা সুহোত্রও মৃত্যুমুখে নিপতিত হইয়াছেন। অমরগণ তাঁহার সাক্ষাৎকার-লাভার্থী হইয়া প্রতিনিয়ত উপস্থিত হইতেন। তিনি ধর্মানুসারে রাজ্য অধিকার করিয়া ঋত্বিক্, ব্রাহ্মণ ও পুরোহিত-গণকে আপনার হিতজনক বিষয়সকল জিজ্ঞাসা করত তাঁহা--দিগের মত গ্রহণ করিতেন। তিনি প্রজাপালন, ধৰ্ম্ম, দান, যজ্ঞ ও শত্রুজয় ইহা সবিশেষ অবগত হইয়া ধৰ্ম্মানুসারে ধনাগমের ইচ্ছা করিতেন। তিনি দেবগণকে ধর্মানুসারে আরাধনা ও ভুজবলে শত্রু জয় করিয়া ম্লেচ্ছ ও তস্করশূন্য অবনী উপভোগ করত নিজ গুণে প্রজারঞ্জন করিয়াছিলেন। পর্জন্য তাঁহার নিমিত্ত সংবৎসর হিরণ্য বর্ষণ করিতেন। তন্নিবন্ধন পূর্ব্বকালে তাঁহার রাজ্যে হিরণ্ময়ী স্রোতস্বতীসকল সর্ব্বত্র প্রবাহিত হইত। ঐ সমুদায় নদীতে রাজ্যস্থ সমুদায় প্রজারই অধিকার ছিল। কুজ ও বামনগণ ঐ সমুদায় নদী হইতে অনায়াসে প্রতিপালিত হইত। পর্জন্য সুবর্ণময় গ্রাহ, কর্কট, বহুবিধ মৎস্য ও অন্যান্য অসংখ্য জলজন্তু বর্ষণ' করিতেন। ঐ রাজ্যে সুবর্ণময়ী বাপীসকল ক্রোশপরিমিত ছিল। রাজা সুহোত্র সুবর্ণময় সহস্র সহস্র নক্র, মকর ও কচ্ছপসকল অবলোকন করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। তিনি কুরুজাঙ্গলে বিস্তীর্ণ যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া ব্রাহ্মণগণকে অপরিমিত সুবর্ণ দান করিতে লাগিলেন এবং পরিশেষে প্রভূত দক্ষিণাদান-সহকারে শত সহস্র অশ্বমেধ, রাজসূয়, পবিত্র ক্ষত্রিয় যজ্ঞ ও অন্যান্য নিত্য নৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপের অনুষ্ঠান করিয়া অভিলষিত গতি লাভ করিলেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক সত্য, তপঃ, দান ও দয়াসম্পন্ন এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা পুণ্যবান্ সেই সুহোত্র ভূপতিও মৃত্যুমুখে নিপতিত হইয়াছেন; অতএব তুমি সেই অযাজ্ঞিক ও অধ্যয়নাদিশূন্য পুত্রের নিমিত্ত অনুতাপ করিও না।

পৌরবোপাখ্যান।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! মহাবীর রাজা পৌরবও কালগ্রাসে নিপতিত হইয়াছেন। তিনি দশ লক্ষ শ্বেতবর্ণ অশ্ব দান করিয়াছিলেন। তাঁহার অশ্বমেধ যজ্ঞে নানা দেশসমাগত, অধ্যয়নরীতিজ্ঞ ও ব্রহ্মানুষ্ঠানকুশল অসংখ্য পণ্ডিতগণের সমাগম হয়। ঐ সকল বেদস্নাত, বিদ্যাস্নাত', ব্রতস্নাত, বদান্য, প্রিয়দর্শন পণ্ডিতগণ পৌরবের নিকট উৎকৃষ্ট ভিক্ষা, আচ্ছাদন, গৃহ, শয্যা, আসন ও বাহন প্রাপ্ত হইয়া পরম পরিতুষ্ট হইয়াছিলেন। নিয়ত উদ্যোগবিশিষ্ট, ক্রীড়ানিরত, নট, নৰ্ত্তক ও গন্ধর্ব্ব এবং সুবর্ণচূড় পক্ষী ও বর্দ্ধমানক গৃহ সতত তাঁহাদের সন্তোষসাধন করিত। মহারাজ পৌরব প্রতি যজ্ঞে মদস্রাবী সুবর্ণবর্ণ দশ সহস্র হস্তী, ধ্বজপতাকাপরিশোভিত রথ, সহস্র সহস্র সুবর্ণালঙ্কৃতা কন্যা, রথযুক্ত সুপ্রসিদ্ধ অশ্ব ও গজ এবং গৃহ, গোশত, কাঞ্চনমালালঙ্কৃত দেহ, সহস্র-ধেনু ও ভৃত্যসকল দান করিতেন। পুরাণবেত্তা মহাত্মাগণ এইরূপ কহিয়া থাকেন যে, রাজা পৌরব সেই সুবিস্তীর্ণ যজ্ঞে হেমশৃঙ্গ, রৌপ্যখুর, কাংস্যদোহনপাত্র সমবেত সবৎস ধেনু, দাস দাসী, খর, উষ্ট্র, মেষ, ছাগ, বিবিধ রত্ন ও অন্নপর্ব্বতসকল দক্ষিণা প্রদান করিয়াছিলেন। সেই যাজ্ঞিক অঙ্গরাজ পৌরব ক্রমে স্বধর্মানুগত সর্ব্বকামপ্রদ যাগ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা-পেক্ষা সমধিক সত্য, তপঃ, দান ও দয়াসম্পন্ন এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা পুণ্যবান্ সেই পৌরবরাজও মৃত্যুমুখে নিপতিত হইয়াছিলেন; অতএব এক্ষণে তুমি সেই অযাজ্ঞিক ও অধ্যয়নাদি শূন্য পুত্রের নিমিত্ত অনুতাপ করিও না।

রাজা সৃঞ্জয়ের নিকট পুনরায় নারদের শিবিরাজের মৃত্যুকথা বর্ণন।

নারদ কহিলেন, মহারাজ! উশীনরতনয় শিবিরাজও কালকবলে নিপতিত হইয়াছেন। তিনি প্রতিনিয়ত প্রধান প্রধান শত্রুসকল বিনাশ করিয়া অদ্রি, দ্বীপ, অর্ণর ও অরণ্য সমাচ্ছন্ন এই পৃথিবী রথঘর্ঘরশব্দে নিনাদিত ও আপনার বশীভূত করিয়া-ছিলেন এবং বিপুল অর্থ অধিকার করিয়া ভূরি দক্ষিণা দানসহকারে বিবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। সমুদায় ভূপালগণই তাঁহাকে সংগ্রামের উপযুক্ত বলিয়া জ্ঞান করিতেন। মহাত্মা শিবিরাজ বাহুবলে সমুদায় পৃথিবী পরাজয় করিয়া হস্তী, অশ্ব, পশু, ধান্য, মৃগ, গো, ছাগ ও মেষ প্রদানপূর্ব্বক বহু ফলশালী অশ্বমেধ যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পাদনপূর্ব্বক সহস্র সহস্র কোটি নিষ্ক ও বহুসংখ্যক ভূমি ব্রাহ্মণসাৎ করিয়াছিলেন। বর্ষার যতগুলি ধারা, আকাশের যতগুলি তারা, গঙ্গার যতগুলি বালুকা, সুমেরুর যতগুলি উপলখণ্ড এবং সাগরে যতগুলি রত্ন ও জলজন্তু আছে, তিনি যজ্ঞানুষ্ঠান কালে ততগুলি গো দান করেন। প্রজাপতি ব্রহ্মা শিবিরাজের কার্যভার বহন করে, এমন নৃপতি কি ভূত, কি ভবিষ্যৎ, কি বর্তমান কোন কালেই লাভ করিতে সমর্থ হন নাই। শিবিরাজ সর্ব্বকার্য্যসমন্বিত বহুবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান করেন। ঐ সমস্ত যজ্ঞে অসংখ্য সুবর্ণময় যূপ, আসন, গৃহ, প্রাকার ও তোরণ নির্মিত এবং পবিত্র সুস্বাদু অন্ন-পান প্রস্তুত হইত। প্রিয়বাদী অযুত অযুত ব্রাহ্মণগণ ঐ যজ্ঞে আগমন করিতেন।

তাঁহার যজ্ঞস্থানে দধি-দুগ্ধের হ্রদ ও নদী এবং ধবল অন্নপৰ্ব্বত প্রস্তুত হইত। তৎকালে কেবল, স্নান কর এবং স্বেচ্ছানুসারে পান ও ভোজন কর, এইরূপ শব্দ সর্ব্বদা সমুত্থিত হইত। রুদ্রদেব এই দানশীল রাজার পবিত্র কার্য্যে অতিমাত্র সন্তুষ্ট হইয়া তোমার ধন, শ্রদ্ধা, কীর্ত্তি, ক্রিয়া, ভূতগণের প্রিয়তা ও স্বর্গ অক্ষয় হউক, এই বলিয়া তাঁহাকে বর প্রদান করিয়াছিলেন। রাজা শিবি এই সমস্ত অভিলষিত বর লাভ করিয়া যথাকালে দেবলোকে গমন করিয়াছেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক সত্য, তপঃ, দয়া ও দানসম্পন্ন, তোমার পুত্র অপেক্ষা সমধিক পুণ্যবান্ সেই শিবিরাজকেও কালগ্রাসে নিপতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি সেই অযাজ্ঞিক ও অধ্যয়নাদিশূন্য পুত্রের নিমিত্ত অনুতাপ করিও না।

রামোপাখ্যান।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! দশরথাত্মজ মহারাজ রামচন্দ্রকেও মৃত্যুমুখে নিপতিত হইতে হইয়াছে। প্রজাগণ ঐ মহাত্মাকে স্ব স্ব ঔরস পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিত। ঐ অসংখ্য-গুণসম্পন্ন, অমিততেজাঃ, মহানুভব রাম পিতার নির্দেশানুসারে বনিতা-সমভিব্যাহারে চতুৰ্দ্দশ বৎসর অরণ্যে বাস করিয়া-ছিলেন। তৎকালে ঐ মহাবীর জনস্থানে অবস্থান করত তত্রত্য তপস্বিগণের রক্ষার্থ চতুৰ্দ্দশ সহস্র রাক্ষস বধ করেন। রাক্ষস-রাজ রাবণ ঐ স্থানে তাঁহাকে লক্ষ্মণ সমভিব্যাহারে বিমোহিত করিয়া তাঁহার ভার্য্যা জানকীকে অপহরণ করেন। মহাবল পরাক্রান্ত মহাবীর রাম রাবণের এই অপরাধে নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া সেই অরাতিগণের অনির্জিত, সুরাসুরের অবধ্য, দেব-ব্রাহ্মণ-কণ্টক পাপাত্মাকে সগণে' বিনাশ করিয়াছিলেন।

প্রজানুগ্রহকারী, দেবগণাভি পূজিত, সুরর্ষিগণ-সেবিত মহাত্মা দাশরথির কীর্ত্তি অদ্যাপি ধরাতলে দেদীপ্যমান রহিয়াছে। ঐ সর্ব্বভূতানুকম্পী মহাত্মা বিবিধ রাজ্য লাভ করিয়া ধৰ্ম্মা-নুসারে প্রজাপালন করত মহাযজ্ঞ ও ত্রিগুণদক্ষিণ শত অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করিয়া হবিদ্বারা পুরন্দরের প্রীতিসাধন এবং অন্যান্য বিবিধ যজ্ঞানুষ্ঠানদ্বারা ক্ষুৎপিপাসা পরাজয়পূর্ব্বক দেহিগণের সমুদায় রোগ নিবারণ করিয়াছিলেন। অসাধারণ-গুণসম্পন্ন সতত স্বতেজে দেদীপ্যমান দশরথতনয় রাম তৎকালে সমুদায় জীবগণকে অতিক্রম করিয়া শোভা পাইতে লাগিলেন। ঐ মহাত্মার রাজ্যশাসন সময়ে ভূমণ্ডলে ঋষি, দেবতা ও মনুষ্যগণের একত্র সহবাস হইয়াছিল; প্রাণিগণের বল এবং প্রাণ, অপান, সমান, উদান ও ব্যান বায়ুর হ্রাস হয় নাই; তেজঃপদার্থসকল দেদীপ্যমান হইয়াছিল। কোন অনর্থ ঘটনা হইত না, সমুদায় প্রজা দীর্ঘায়ুঃ হইয়াছিল; কেহই যৌবনাবস্থায় কালগ্রাসে পতিত হয় নাই; দেবগণ প্রীতিপ্রফুল্ল চিত্তে চতুর্ব্বেদ বিধানানুসারে বিবিধ হব্য, কব্য, নিস্পৃর্ত্ত ও হত প্রাপ্ত হইতেন; দেশমধ্যে দংশ, মশক ও হিংস্র সরীসৃপ-সমুদায়ের সম্পর্ক ছিল না; সলিলমধ্যে কাহারও মৃত্যু হইত না; দহন অকালে দগ্ধ করিতেন না; কেহই অধৰ্ম্মপরায়ণ, লুব্ধ বা মূর্খ ছিল না এবং সর্ব্ববর্ণের সমুদায় প্রজা সজ্জনোচিত ইষ্ট কার্য্যে তৎপর থাকিত।

ঐ সময় রাক্ষসগণ জনস্থানে স্বধা' ও পূজা বিনষ্ট করিয়া-ছিল, মহাত্মা দশরথতনয় তাহাদিগকে সংহার করিয়া পিতৃলোক ও দেবগণকে স্বধা ও পূজা প্রদান করেন। ঐ মহাত্মার রাজ্য সময়ে পুরুষগণ সহস্রপুত্রসম্পন্ন হইত ও সহস্র বৎসর জীবিত থাকিত। জ্যেষ্ঠগণ কনিষ্ঠগণদ্বারা শ্রাদ্ধকৃত্য সম্পাদন করিত না। যুবা, শ্যাম, লোহিতাক্ষ, মত্তমাতঙ্গবিক্রম, আজানু-লম্বিতবাহু, সিংহস্কন্ধ, সর্ব্বজনপ্রিয়, মহাবল পরাক্রান্ত দাশরথি একাদশ সহস্র বৎসর রাজ্য করিয়াছিলেন। তাঁহার রাজ্যসময়ে প্রজাগণের রাম, রাম ব্যতীত প্রায় অন্য কোন কথা ছিল না এবং জগৎ নিতান্ত অভিরাম' হইয়াছিল। মহাত্মা রাম পরিশেষে আপনার দুই পুত্র ও ভ্রাতৃত্রয়ের ছয় পুত্রকে আট রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ ও উদ্ভিজ্জ এই চতুর্বিধ প্রজা লইয়া স্বর্গে গমন করেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশালী এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ মহাত্মা দাশরথিকেও কালগ্রাসে পতিত হইতে হইয়াছে। অতএব তুমি অযাজ্ঞিক অধ্যয়নাদিরহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর অনুতাপ করিও না।

নারদকর্তৃক পুনরায় ভগীরথের বৃত্তান্ত কীর্ত্তন।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! মহারাজ ভগীরথও করাল কালকবলে নিপতিত হইয়াছেন। ঐ মহারথ ভাগীরথীতীর কাঞ্চনযূপে ব্যাপ্ত করিয়াছিলেন। তিনি রাজা ও রাজপুত্রগণকে পরাভব করিয়া হেমালঙ্কারবিভূষিত দশ লক্ষ কন্যা ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করেন। ঐ সমুদায় কন্যা রথারূঢ়; রথসমুদায় চারি চারি অশ্বে যুক্ত; প্রত্যেক রথের পশ্চাৎ হেমমালী শত মাতঙ্গ; প্রত্যেক মাতঙ্গের পশ্চাৎ সহস্র অশ্ব, প্রত্যেক অশ্বের পশ্চাৎ শত গো এবং গোগণের পশ্চাৎ অসংখ্য অজ ও ছাগ ছিল। মহারাজ ভগীরথের ভূরি ভূরি দক্ষিণাপ্রদানসময়ে গঙ্গা জনৌঘ আক্রমণে ব্যথিত হইয়া তাঁহার ক্রোড়ে উপবেশন করিলেন। জাহ্নবী সেই দিন হইতে ভগীরথের কন্যা হইয়া ভাগীরথী নামে বিখ্যাত হন এবং পুত্রের ন্যায় ভগীরথের পূর্ব্বপুরুষগণকে উদ্ধার করেন। ভগবতী ভাগীরথী যে স্থানে ভগীরথের উরুদেশে উপবেশন করেন, ঐ স্থান উর্ব্বশী তীর্থ বলিয়া খ্যাত হইয়াছে। হে সৃঞ্জয়! সূর্য্যসদৃশ তেজঃসম্পন্ন গন্ধর্ব্বগণ মধুরভাষী দেব, মনুষ্য ও পিতৃগণের নিকট এই গাথা কীর্ত্তন করিয়া থাকেন।

হে শ্বিত্যনন্দন! এইরূপে ভগবতী গঙ্গা ইক্ষাকুবংশাতংস ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠাতা মহাত্মা ভগীরথকে পিতৃত্বে বরণ করেন। ইন্দ্র বরুণপ্রভৃতি সুরগণ ভগীরথের যজ্ঞ অলঙ্কৃত করিয়া যজ্ঞাংশ গ্রহণ ও যজ্ঞবিঘ্ন নিরাকরণ করিয়াছিলেন। যে যে ব্রাহ্মণ যে যে স্থানে থাকিয়া যে যে প্রিয় বস্তু প্রার্থনা করিতেন, মহাত্মা ভগীরথ সেই সেই ব্রাহ্মণকে সেই সেই স্থানে অর্থসমুদায় প্রদান করিতেন। ব্রাহ্মণদিগকে তাঁহার কিছুই অদেয় ছিল না। পরিশেষে ঐ মহাত্মা ব্রাহ্মণগণের প্রসাদে ব্রহ্মলোকে গমন করিলেন। মরীচিপায়ী মহর্ষিগণ মোক্ষ ও স্বর্গ লাভের নিমিত্ত চন্দ্র ও সূর্য্যের ন্যায় ব্রহ্মবিদ্যা ও কৰ্ম্মবিদ্যা সুনিপুণ মহাত্মা ভগীরথের নিকট গমনপূর্ব্বক তাঁহার উপাসনায় প্রবৃত্ত হইতেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া, দাক্ষিণ এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ মহাত্মা ভগীরথকেও কালগ্রাসে পতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদিরহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর অনুতাপ করিও না।

মহারাজ দিলীপের মৃত্যু-বৃত্তান্ত।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়। ইলবিলতনয় মহাত্মা দিলীপও মৃত্যুমুখে নিপতিত হইয়াছেন। ঐ মহাত্মা তত্ত্বজ্ঞানার্থসম্পন্ন পুত্রপৌত্রশালী অযুত অযুত ব্রাহ্মণগণদ্বারা শত শত যজ্ঞ সম্পাদন করিয়াছিলেন। ঐ ভূপাল বিবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া ব্রাহ্মণগণকে এই বসুপূর্ণ বসুন্ধরা প্রদান করেন। উহার যজ্ঞে পথসমুদায় সুবর্ণময় হইয়াছিল। ইন্দ্রাদি দেবগণ ঐ মহাত্মার যজ্ঞসময়ে ক্রীড়া করতই যেন চষাল', প্রচষাল' ও হিরণ্ময় যূপে অধিষ্ঠান করিয়াছিলেন। ঐ যজ্ঞে সমাগত মনুষ্যগণ অপরিমিত রাগখাণ্ডব' ভোজনে মত্ত হইয়া পথিমধ্যে শয়ান থাকিত। মহাত্মা দিলীপ সলিলের উপর রথারোহণে সংগ্রাম করিতেন, কিন্তু তাঁহার রথচক্র কদাপি সলিলমধ্যে নিমগ্ন হইত না। এই অদ্ভুত ক্ষমতা মহাত্মা দিলীপ ব্যতীত আর কাহারও ছিল না। যাঁহারা দৃঢ়ধন্বা, সত্যবাদী, দাক্ষিণ্যশালী মহারাজ দিলীপকে দেখিয়াছিলেন, তাঁহাদেরও স্বর্গলাভ হইয়াছে। মহারাজ দিলীপের আলয়ে স্বাধ্যায়ঘোষ জ্যানির্ঘোষ এবং পান কর, ভোজন কর ও আহার কর, এই সকল শব্দ কখনই বিলুপ্ত হইত না। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশালী এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ সেই মহাত্মা দিলীপকেও কালগ্রাসে নিপতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদি রহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর অনুতাপ করিও না।

কীর্ত্তিমান্ মান্ধাতার উপাখ্যান।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! যুবনাশ্বের পুত্র সুর, অসুর ও মনুষ্যগণের বিজেতা মহারাজ মান্ধাতাকেও করাল কালকবলে পতিত হইতে হইয়াছে। স্বর্গবৈদ্য অশ্বিনীকুমারদ্বয় মান্ধাতাকে তাঁহার পিতার গর্ভ হইতে নিষ্কাশিত করেন। একদা মান্ধাতার পিতা মহারাজ যুবনাশ্ব মৃগয়ায় গমন করিয়া নিতান্ত তৃষ্ণাতুর ও শ্রান্তবাহন হইয়াছিলেন। ঐ সময় তিনি যজ্ঞধূম লক্ষ্য করিয়া যজ্ঞস্থলে গমনপূর্ব্বক পৃষদাজ্য' ভক্ষণ করেন। ঐ পৃষদাজ্যের প্রভাবে মহারাজ যুবনাশ্বের গর্ভ হইল। ভিষগাগ্রগণ্য অশ্বিনী-কুমারদ্বয় যুবনাশ্বকে তদবস্থ দেখিয়া তাঁহার গর্ভ হইতে সুকুমার নবকুমার নিষ্কাশিত করিয়া তাঁহার ক্রোড়ে সংস্থাপন করিলেন। দেবগণ সেই দেবসদৃশ তেজঃসম্পন্ন বালককে পিতার অঙ্কে শয়ান দেখিয়া পরস্পর কহিতে লাগিলেন, এই বালক কি পান করিয়া জীবন ধারণ করিবে? তখন সুররাজ পুরন্দর কহিলেন, এই বালক আমার অঙ্গুলি পান করুক। সুররাজ এই কথা কহিবা মাত্র তাঁহার অঙ্গুলিসমুদায় হইতে অমৃতময় দুগ্ধ নিঃসৃত হইতে লাগিল। সুররাজ অনুগ্রহ করিয়া এই বালক মাংধাতা অর্থাৎ আমার অঙ্গুলি পান করুক বলিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত সুরগণ যুবনাশ্বতনয়ের নাম মান্ধাতা রাখিলেন। তখন ইন্দ্রের হস্ত হইতে ঘৃত ও দুগ্ধের ধারা নিঃসৃত হইয়া যুবনাশ্বতনয়ের মুখে নিপতিত হইতে লাগিল। মান্ধাতা এইরূপে সুররাজের অঙ্গুলি পান করিয়া দিন দিন সমধিক পরিমাণে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিলেন। তিনি দ্বাদশ দিনে দ্বাদশ হস্ত পরিমিত ও মহাবল পরাক্রান্ত হইয়া উঠিলেন।

হে সৃঞ্জয়! ধর্মাত্মা, ধৃতিমান, সত্যপ্রতিজ্ঞ, জিতেন্দ্রিয়, মহাবলশালী, যুবনাশ্বতনয় মান্ধাতা এক দিনে সমুদায় পৃথিবী পরাজয় করেন। মহারাজ জনমেজয়, সুধন্বা, গয়, শূল, বৃহদ্রথ, অমিত ও নৃগ মান্ধাতার কার্মুকবলে পরাজিত হন। সূর্য্যের উদয়স্থান অবধি অস্তগমন স্থান পর্য্যন্ত যে সকল প্রদেশ আছে, তৎসমুদায় অদ্যাপি মান্ধাতার ক্ষেত্র বলিয়া অভিহিত হইতেছে। মহাত্মা মান্ধাতা শত অশ্বমেধ ও শত রাজসূয়ের অনুষ্ঠান করিয়া পদ্মরাগ-খনিসম্পন্ন সুবর্ণাকর যুক্ত দশ যোজন দীর্ঘ এক যোজন বিস্তৃত মৎস্যসকল ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করিয়াছিলেন। ঐ যজ্ঞে দর্শনার্থী সমাগত জনগণ ভোজনাবশিষ্ট বহু প্রকার সুস্বাদু ভক্ষ্য, ভোজ্য ও অন্ন ভোজন করিয়া সমধিক তৃপ্তি লাভ করিয়াছিল। যজ্ঞস্থানে নানাবিধ ভক্ষ্য, পান এবং অন্ন পর্ব্বতের অপূর্ব্ব শোভা হইয়াছিল। সূপরূপ পঙ্ক, দধিরূপ ফেন ও গুড়রূপ সলিলশালিনী মধুক্ষীরবাহিনী নদীসকল ঘৃত হ্রদে গমন করত অন্নপর্ব্বত অবরোধ করিত। অসংখ্য দেব, অসুর, নর, যক্ষ, গন্ধর্ব্ব, উরগ, পক্ষী এবং বহুসংখ্যক বেদান্তপারগ ব্রাহ্মণ ও ঋষিগণ ঐ যজ্ঞে সমুপস্থিত হইয়াছিলেন। তথায় কোন ব্যক্তিই মূর্খ ছিল না। মহাবীর মান্ধাতা অর্ণবমেখলা' বসুপূর্ণা বসুন্ধরা ব্রাহ্মণসাৎ করিয়া স্বীয় যশঃপ্রভাবে দশ দিক্ আবরণপূর্ব্বক পরিশেষে কলেবর পরিত্যাগ করত পুণ্যার্জিত লোকে গমন করেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশীল এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ মহাত্মা মান্ধাতাকেও কালগ্রাসে পতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদিরহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর শোক করিও না।

যযাতি রাজার উপাখ্যান।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়। নহুষতনয় যযাতিকেও মৃত্যুমুখে নিপতিত হইতে হইয়াছে। ঐ মহাত্মা শত রাজসূয়, শত অশ্বমেধ, সহস্র পুণ্ডরীক, শত বাজপেয়, সহস্র অতিরাত্র, অসংখ্য চাতুর্মাস্য, বহুবিধ অগ্নিষ্টোম ও অন্যান্য অসংখ্য ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক পৃথিবীস্থ যাবতীয় ব্রাহ্মণদ্বেষী ম্লেচ্ছগণকে পরাজয় করিয়া তাহাদের সম্পত্তিসমুদায় বিপ্রসাৎ করিয়াছিলেন। ঐ মহাত্মা দেবাসুরের যুদ্ধসময়ে দেবগণের সহায়তা করিয়া এই অবনীমণ্ডল চতুর্দ্ধাবিভাগপূর্ব্বক চারি-জন ঋত্বিকে প্রদান, নানাবিধ যাগ যজ্ঞের অনুষ্ঠান এবং ধর্মানুসারে দেবযানী ও শর্মিষ্ঠার গর্ন্তে অপত্যোৎপাদন করেন। ঐ অমরোপম মহীপাল দ্বিতীয় দেবরাজের ন্যায় আপনার ইচ্ছানুসারে সমুদায় দেবারণ্যে বিহার করিতেন।

পরিশেষে তিনি অশেষ ভোগ্য বস্তুর উপভোগেও বিষয়--বাসনার শান্তি হইল না দেখিয়া স্বীয়পুত্র পুরুকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া ভার্য্যাসমভিব্যাহারে অরণ্যে প্রবেশ করেন। তিনি বন-গমনকালে এই কথা কহিয়াছেন যে ভূমণ্ডলমধ্যে যাবতীয় ব্রীহি, যব, হিরণ্য, পশু ও স্ত্রী আছে, তৎসমুদায়ই যদি এক জনের উপভোগ্য হয়, তথাপি তাহার বিষয়বাসনা বিলুপ্ত হয় না; লোকে এই বিবেচনা করিয়া শান্তিপথ অবলম্বন করিবে। মহারাজ যযাতি এইরূপে সমুদায় বিষয়বাসনা পরিত্যাগ করিয়া ধৈর্য্য অবলম্বনপূর্ব্বক অরণ্যে প্রস্থান করিয়াছিলেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশীল এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ সেই মহাত্মা যযাতিকেও কালগ্রাসে নিপতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদিরহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর অনুতাপ করিও না।

মহারাজ অম্বরীষের মৃত্যুকথা কীর্ত্তন।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়। নাভাগতনয় মহাত্মা অম্বরীষকেও শমনসদনে গমন করিতে হইয়াছে। ঐ মহাত্মা একাকী দশ লক্ষ ভূপতির সহিত সংগ্রাম করিয়াছিলেন। অস্ত্রযুদ্ধবিশারদ, ঘোরদর্শন অরাতিগণ জিগীযাপরবশ হইয়া অশিববাক্য প্রয়োগ করত তাঁহার সহিত সংগ্রাম করিতে আসিয়াছিল। তিনি স্বীয় বাহুবল ও অস্ত্রবলে অনায়াসে তাহাদের ছত্র, ধ্বজ, অস্ত্র ও রথ ছেদন এবং অনেকের প্রাণ সংহার করিয়া তাহাদিগকে বশীভূত করিলেন। হতাবশিষ্ট শত্রুগণ জীবনরক্ষার্থ বর্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক আমরা আপনার শরণাপন্ন হইলাম, এই কথা বলিয়া অম্বরীষের শরণাগত হইল।

এইরূপে মহাবীর অম্বরীষ সেই সমুদায় ভূপতিগণকে বশীভূত ও সমুদায় বসুন্ধরা অধিকৃত করিয়া বিধানানুসারে শত শত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেন। ঐ যজ্ঞে সমাগত ব্যক্তিগণ অতি সুস্বাদু অন্ন ভোজন করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণগণ যথাবিধি পূজা গ্রহণানন্তর সুস্বাদু মোদক', পূরিক', পূপং, শঙ্কুলী, করম্ভ, পৃথুমৃদ্বীক, সুপক্ক সূপ', অন্ন, নৈমেয়ক', রাগখাণ্ডব' পারক, বিবিধ সুরভি মিষ্টান্ন, ঘৃত, মধু, দুগ্ধ, তোয়, দধি এবং সুস্বাদু ফল মূল ভক্ষণ করিয়া পরম পরিতৃপ্ত হইয়াছিলেন। অনেক লোক মদ্যপান পাপজনক জানিয়াও সুখলাভবাসনায় যথাকালে সুরাপান করিয়া গীত-বাদ্য করিতে আরম্ভ করিল। অনেকে মত্ত হইয়া অম্বরীষের স্তুতিসংযুক্ত গাথা গান করত নৃত্য করিতে লাগিল; কেহ কেহ বা ধরাতলে নিপতিত হইল।

ঐ সমুদায় যজ্ঞে মহারাজ অম্বরীষ দশ প্রযুত যাজককে শত সহস্র ভূপতির রাজ্য এবং ব্রাহ্মণগণকে দক্ষিণা স্বরূপ হিরণ্যকবচযুক্ত, শ্বেতচ্ছত্র-পরিশোভিত, হিরণ্যস্যন্দন-সমারূঢ় অনুযাত্র, পরিচ্ছদসম্পন্ন, কোদণ্ড সমবেত অসংখ্য ভূপতি ও রাজপুত্র প্রদান করিয়াছিলেন। মহর্ষিগণ মহারাজ অম্বরীষের যজ্ঞ দর্শনে প্রীত হইয়া কহিয়াছিলেন যে, মহাত্মা নাভাগনন্দন যেরূপ অমিতদক্ষিণ যজ্ঞ করিলেন, এমন যজ্ঞ পূর্ব্বে কেহই করিতে পারে নাই, পরেও কেহ করিতে পারিবে না। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশীল এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ সেই মহাত্মা অম্বরীষকেও মৃত্যুগ্রাসে পতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদিরহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর বৃথা শোক করিও না।

মহাত্মা শশবিন্দুর উপাখ্যান।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়। মহারাজ শশবিন্দুও কাল-কবলে কবলিত হইয়াছেন। ঐ সত্যপরাক্রম শ্রীমান্ মহাত্মা বিবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তাঁহার এক লক্ষ ভার্য্যা ছিল। তাঁহাদের প্রত্যেকের গর্ভে ভূপতির এক এক সহস্র তনয় উৎপন্ন হয়। রাজকুমারেরা সকলেই মহাবল পরাক্রান্ত বেদপারগ হিরণ্যকবচধারী ও মহাধনুর্দ্ধর ছিলেন। তাঁহারা সকলেই বহু সংখ্যক অশ্বমেধ ও নিযুতসংখ্যক অন্যান্য প্রধান যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। মহারাজ শশবিন্দু স্বয়ং অশ্বমেধের অনুষ্ঠান করিয়া ঐ সমুদায় তনয় ব্রাহ্মণদিগকে দক্ষিণা স্বরূপ প্রদান করেন। ঐ সকল প্রত্যেক রাজপুত্রের পশ্চাৎ অসংখ্যক রথ, গজ ও সুবর্ণালঙ্কৃতা রাজকন্যা গমন করিয়াছিল। প্রত্যেক কন্যার সহিত শত গজ, প্রত্যেক গজের সহিত শত রথ, প্রত্যেক রথের সহিত শত অশ্ব, প্রত্যেক অশ্বের সহিত সহস্র গাভী ও প্রত্যেক গাভীর সহিত পঞ্চাশৎ ছাগ গমন করে।

হে সৃঞ্জয়! মহারাজ শশবিন্দু এইরূপে মহাযজ্ঞ অশ্বমেধে ব্রাহ্মণগণকে অপর্যাপ্ত ধন সম্প্রদান করিয়াছিলেন। লোকে অশ্বমেধে যতগুলি বৃক্ষের যূপ প্রস্তুত করিয়া থাকে, মহারাজ শশবিন্দুর যজ্ঞে ততগুলি বৃক্ষের যূপ এবং আর ততগুলি সুবর্ণময় যূপ নির্মিত হইয়াছিল। ঐ যজ্ঞে এক ক্রোশ উচ্চ অসংখ্য অন্নপৰ্ব্বত ও পানীয় হ্রদ প্রস্তুত হয়। অশ্বমেধ সমাপ্ত হইলে মহারাজ শশবিন্দুর ত্রয়োদশ রাজ্য অবশিষ্ট ছিল। ঐ মহাত্মা বহুদিন রাজ্য ভোগ ও প্রজাপালন করিয়া পরিশেষে অমরলোকে গমন করেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশালী এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ মহাত্মা শশবিন্দুকেও কালকবলে নিপতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক অধ্যয়নাদিরহিত স্বীয় তনয়ের নিমিত্ত আর বৃথা অনুতাপ করিও না।

মহারাজ গয়ের জীবন-বৃত্তান্ত।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়। অমূর্ত্তরয়ার পুত্র গয়ও কালকবলে নিপতিত হইয়াছেন। ঐ মহীপাল শত বৎসর কেবল হুতাবশিষ্ট ভক্ষণপূর্ব্বক জীবন ধারণ করিয়াছিলেন। ভগবান্ হুতাশন গয়ের উৎকট নিয়ম দর্শনে পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে বর প্রদান করিতে আগমন করিলে তিনি কহিলেন, হে হুতভুক্! আমার অভিলাষ এই যে, আমি যেন তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য, ব্রত, নিয়ম ও গুরুর প্রসাদপ্রভাবে বেদজ্ঞ হই, যেন স্বধৰ্ম্মে অবস্থান-পূর্ব্বক অন্যের হিংসা না করিয়া অক্ষয় ধনলাভ ও শ্রদ্ধাসহকারে অন্ন দান করিতে পারি; বিপ্রগণকে প্রত্যহ ধন প্রদান করিতে যেন আমার শ্রদ্ধা থাকে; কেবল সবর্ণা ভার্য্যার গর্ভেই যেন আমার পুত্রোৎপত্তি হয়; আমার মনঃ যেন ধর্মে নিরত হয় এবং ধর্মানুষ্ঠানসময়ে কোন বিঘ্ন না জন্মে। ভগবান্ অগ্নি গয়ের বাক্য শ্রবণে পরম পরিতুষ্ট হইয়া "তথাস্তু” বলিয়া তাঁহাকে তাঁহার অভিলষিত বর প্রদানপূর্ব্বক অন্তর্হিত হইলেন।

এইরূপে মহারাজ গয় অগ্নির বরে সমুদায় অভিলষিত বিষয় প্রাপ্ত হইয়া ধর্মানুসারে অরাতিগণকে পরাজয়পূর্ব্বক একশত বৎসর দর্শপৌর্ণমাস, নবশস্যেষ্টি', চাতুর্মাস্য প্রভৃতি বিবিধ ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। পরম শ্রদ্ধাসহকারে একলক্ষ ছয় অযুত গো, দশসহস্র অশ্ব ও একলক্ষ নিষ্ক প্রদান করিলেন এবং সমুদায় নক্ষত্রে নক্ষত্রদক্ষিণা প্রদান এবং সোম ও অঙ্গিরার ন্যায় বিবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ মহাত্মা অশ্বমেধের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক মণিরূপ কর্কর-সমবেত সুবর্ণময়ী পৃথিবী নির্মাণ করিয়া ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করেন। ঐ যজ্ঞে নানারত্ন বিভূষিত, সর্ব্বভূতমনোহর বহুমূল্য সুবর্ণযূপ সকল নিৰ্ম্মিত হইয়াছিল। মহাত্মা গয় তৎসমুদায় প্রহৃষ্টচিত্তে ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য ব্যক্তিগণকে প্রদান করিলেন। সমুদ্র, বন, দ্বীপ, নদী, নদ, নগর, রাজ্য, স্বর্গ ও আকাশে যে যে প্রাণী বাস করে, তাহারা সকলেই গয়ের যজ্ঞে পরিতৃপ্ত হইয়া কহিয়াছিল যে, মহারাজ গয় যেমন যজ্ঞ করিলেন, এরূপ যজ্ঞ আর কোথাও অনুষ্ঠিত হয় নাই। ঐ যজ্ঞে ত্রিশ যোজন দীর্ঘ, ষড়বিংশ যোজন আয়ত, চতুর্বিংশ যোজন উচ্চ এবং মণি, মুক্তা ও হীরক খচিত সুবর্ণময়ী বেদী নিৰ্ম্মিত হইয়াছিল। মহাত্মা গয় ব্রাহ্মণগণকে সেই বেদী, বিবিধ বসন, ভূষণ ও যথোচিত দক্ষিণা প্রদান করিলেন। ঐ যজ্ঞ অবসান হইলে, পঞ্চবিংশতি অন্নপৰ্ব্বত, অসংখ্য রসনদী এবং রাশি রাশি বস্ত্র, আভরণ ও গন্ধদ্রব্য অবশিষ্ট ছিল। মহারাজ গয়ের কীর্ত্তিস্বরূপ অক্ষয়করণ বট ও পবিত্র ব্রহ্মসরঃ অদ্যাপি বিদ্যমান রহিয়াছে। ঐ কীর্ত্তিদ্বয়ের প্রভাবেই মহাত্মা গয় ত্রিলোক-বিখ্যাত হইয়াছেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও জ্ঞানশালী এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ সেই মহাত্মা গয়কেও কালগ্রাসে পতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদিরহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর বৃথা অনুতাপ করিও না।

মহাত্মা রন্তিদেবের জীবনান্ত কথন।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! সঙ্কতিতনয় মহাত্মা রন্তিদেবকেও শমনসদনে গমন করিতে হইয়াছে। ঐ মহাত্মার ভবনে দুই লক্ষ পাচক সমাগত অতিথি ব্রাহ্মণগণকে দিবারাত্র পক্ক অপক্ক খাদ্যদ্রব্য পরিবেশন করিত। মহাত্মা রন্তিদেব ন্যায়োপার্জিত অপর্যাপ্ত ধন ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করিয়াছিলেন। তিনি বেদাধ্যয়ন করিয়া ধর্মানুসারে শত্রুগণকে বশীভূত করেন। ঐ মহাত্মার যজ্ঞসময়ে পশুগণ স্বর্গলাভেচ্ছায় স্বয়ং যজ্ঞস্থলে আগমন করিত। তাঁহার অগ্নিহোত্র যজ্ঞে এত পশু বিনষ্ট হইয়াছিল যে, তাহাদের চর্মরস মহানস হইতে বিনির্গত হইয়া এক মহানদী প্রস্তুত হইল। ঐ নদী চৰ্ম্মণ্বতী নামে অদ্যাপি বিখ্যাত রহিয়াছে। মহাত্মা রন্তিদেব, তোমায় নিষ্ক প্রদান করিতেছি, তোমায় নিষ্ক প্রদান করিতেছি, বলিয়া সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণকে অনবরত নিষ্ক প্রদান করিতেন। তিনি এক দিনে এক কোটি নিষ্ক দান করিয়াও, অদ্য অতি অল্প দান করা হইল, বলিয়া পুনরায় নিষ্ক প্রদানে প্রবৃত্ত হইতেন। ফলতঃ তাঁহার ন্যায় দাতা আর কাহাকেও দৃষ্টিগোচর হয় না। মহাত্মা সস্কৃতিনন্দন এই বলিয়া ব্রাহ্মণগণকে ধন দান করিতেন যে, যদি আমি ব্রাহ্মণের হস্তে ধন প্রদান না করি, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমাকে চিরস্থায়ী মহাদুঃখে নিপতিত হইতে হইবে। তিনি শত বৎসর পঞ্চদশ দিন প্রত্যহ সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণগণের প্রত্যেককে গোশত সমবেত সুবর্ণ বৃষভ ও অষ্টশত সুবর্ণ নিষ্ক প্রদান করিতেন। ঐ মহাত্মা সমুদায় অগ্নিহোত্রোপকরণ, যজ্ঞোপকরণ, করক', কুম্ভ, স্থালী, পিঠর', শয়ন, আসন, যান, প্রাসাদ, গৃহ, বিবিধ বৃক্ষ ও বিবিধ অন্ন ঋষিদিগকে প্রদান করিয়াছিলেন। মহাত্মা রস্তি।দেবের সমুদায় দ্রব্যই সুবর্ণময় ছিল।

পুরাণবিৎ ব্যক্তিগণ রন্তিদেবের অলৌকিক সমৃদ্ধি সন্দর্শনে বিস্মিত হইয়া এই কথা কহিয়া গিয়াছেন যে, মহাত্মা রন্তিদেবের যেরূপ সম্পত্তি, এরূপ সম্পত্তি অন্য কোন মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক, কুবেরের ভবনেও দৃষ্ট হয় না। অতএব নিশ্চয় বোধ হইতেছে যে, রন্তিদেবের ভবন অমরাবতী। মহাত্মা সস্কৃতিনন্দনের ভবনে প্রত্যহ এত অধিক অতিথি সমাগত হইত যে, মণিকুণ্ডলধারী সূদগণ' একবিংশতি সহস্র বলীবদের মাংস পাক করিয়াও অতিথিগণকে কহিত, অদ্য তোমরা অধিক পরিমাণে সৃপ ভক্ষণ কর, আজি অন্য দিনের ন্যায় অপর্যাপ্ত মাংস নাই। পরিশেষে যে কিছু সুবর্ণ অবশিষ্ট ছিল, মহানুভব রন্তিদেব তৎসমুদায় যজ্ঞে ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করিলেন। ঐ মহাত্মার প্রত্যক্ষেই দেবগণ হব্য ও পিতৃগণ কব্য এবং ব্রাহ্মণগণ যথাকালে সমুদায় অভিলষিত দ্রব্য ভোগ করিতেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশালী এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা অধিক পুণ্যবান্ সেই মহাত্মা রন্তিদেবকেও কালগ্রাসে পতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদি রহিত স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত অনুতাপ করিও না।

ভরতোপাখ্যান।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়। দুষ্মন্ততনয় ভরতকে কাল-কবলে কবলিত হইতে হইয়াছে। ঐ মহাত্মা শৈশবাবস্থায় অরণ্যে অন্যের দুষ্কর কার্য্য করিয়াছিলেন। তিনি হিমসবর্ণ, নখদংষ্ট্রায়ুধ, মহাবল পরাক্রান্ত সিংহসমুদায়কে স্বীয় বাহুবলে নিবীর্য্য করিয়া আকর্ষণ ও বন্ধন করিতেন; ক্রুরস্বভাব উগ্রতর ব্যাঘ্রগণকে দমনপূর্ব্বক বশীভূত করিতেন; মনঃশিলা-সংযুক্ত ধাতুরাশি-বিলিপ্ত বিবিধ ব্যাল ও হস্তী সমুদায়ের দংষ্ট্রাগ্রহণপূর্ব্বক তাহাদিগকে বিমুখ ও শুষ্কাস্য করিয়া বশীভূত করিতেন এবং মহাবল পরাক্রান্ত মহিষগণকে আকর্ষণ, শত শত গর্বিত সিংহগণকে বলপূর্ব্বক দমন ও সৃমর, গণ্ডার এবং অন্যান্য জন্তুদিগকে বন্ধন ও দমনপূর্ব্বক প্রাণমাত্র অবশিষ্ট রাখিয়া বিমুক্ত করিতেন। তপোবনস্থ ব্রাহ্মণগণ দুষ্মন্ততনয়ের সেই ভয়ানক কার্য্য দেখিয়া তাঁহাকে সর্ব্বদমন বলিয়া আহ্বান করিতেন। ভরতের জননী শকুন্তলা তাঁহাকে সতত পশুগণকে কষ্ট প্রদান করিতে দেখিয়া পশুহিংসা করিতে নিষেধ করিয়া দিলেন।

মহাত্মা ভরত যমুনাতীরে একশত, সরস্বতীতীরে তিনশত ও গঙ্গাতীরে চতুঃশত অশ্বমেধ অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তৎপরে পুনরায় সহস্র অশ্বমেধ ও শত রাজসূয় সুসম্পন্ন করিয়া ভূরিদক্ষিণ অগ্নিষ্টোম, অতিরাত্র, উত্থ্য, বিশ্বজিৎ ও সহস্র সহস্র বাজপেয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন; এইরূপে শকুন্তলানন্দন ভরত নানাবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া ব্রাহ্মণগণকে প্রচুর ধনদানে পরিতৃপ্ত করিলেন। ঐ সময় তিনি মহর্ষি কণ্ঠকে বিশুদ্ধ-সুবর্ণ-বিনিৰ্ম্মিত সহস্র পদ্ম' মুদ্রা প্রদান করেন। ভরতের যজ্ঞানুষ্ঠান-কালে ইন্দ্রাদি দেবগণ, দ্বিজগণ-সমভিব্যাহারে সমবেত হইয়া শতব্যামপরিমিত সুবর্ণময় যূপ সমুচ্ছিত করিয়াছিলেন। অদীন-চিত্ত, অরাতিনিপাতন, অপরাজিত, মহারাজচক্রবর্তী মহাত্মা ভরত মনোহর রত্নসমুদায়বিভূষিত বহুসংখ্যক অশ্ব, হস্তী, রথ, উষ্ট্র, ছাগ, মেষ এবং অসংখ্য দাস, দাসী, ধন, ধান্য, সবৎসা পয়স্বিনী ধেনু, গ্রাম, গৃহ, ক্ষেত্র, বিবিধ পরিচ্ছদ ও প্রচুর পরিমিত সুবর্ণ ব্রাহ্মণগণকে প্রদান করিয়াছিলেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক তপঃ, সত্য, দয়া ও দানশালী এবং তোমার 'পুত্র অপেক্ষা অধিকতর পুণ্যবান্ সেই মহাত্মা ভরতকেও কালগ্রাসে নিপতিত হইতে হইয়াছে; অতএব তুমি অযাজ্ঞিক, অধ্যয়নাদিশূন্য স্বীয় পুত্রের নিমিত্ত আর অনুতাপ করিও না।

মহারাজ পৃথুর জীবনকথা।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! বেণরাজতনয় পৃথুও কাল-গ্রাসে নিপতিত হইয়াছেন। মহর্ষিগণ তাঁহার রাজসূয় যজ্ঞে তাঁহাকে সাম্রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়াছিলেন। মহাপ্রভাবশালী বেণতনয় স্বীয় বাহুবলপ্রভাবে পৃথিবীস্থ সমুদায় বীরগণকে পরাজয় করেন। তাঁহা দ্বারা পৃথিবীমণ্ডল প্রোথিত' হইয়াছিল, এই নিমিত্ত তিনি পৃথু নামে বিখ্যাত হইয়াছেন। তিনি প্রাণিগণকে ক্ষত হইতে পরিত্রাণ করিয়া স্বীয় ক্ষত্রিয়ত্ব সার্থক করিয়াছেন। প্রজাসকল পৃথুকে নিরীক্ষণ করিয়াছিল, আমরা সকলেই ইহার প্রতি অনুরক্ত হইয়াছি; এই নিমিত্ত তিনি প্রজাগণের অনুরাগ-ভাজন হইয়া রাজা উপাধি প্রাপ্ত হন। তাঁহার রাজ্যশাসনসময়ে ভূমিসকল কৃষ্ট না হইয়াও অভীষ্ট ফল উৎপাদন করিত। ধেনুসকল কামদুঘা' হইয়াছিল। কমলসকল মধুপরিপূর্ণ থাকিত। কুশসমুদায় সুবর্ণময় ও সুখাবহ ছিল। প্রজাগণ সেই সমস্ত কুশের চীর পরিধান ও কুশাস্তরণে শয়ন করিত। তাহারা কেহই নিরাহার থাকিত না; সকলেই অমৃতকল্প স্বাদু ও মৃদু ফলসকল আহার করিত এবং সকলেই রোগশূন্য সফলকাম ও নির্ভয়চিত্ত হইয়া স্বেচ্ছানুসারে বৃক্ষ ও গিরিগুহায় বাস করিত। তৎকালে রাজ্য ও পুরের বিভাগ ছিল না। প্রজাগণ হৃষ্টমনে সুখে স্বচ্ছন্দে স্ব স্ব অভিলাষানুরূপ কাল যাপন করিত। যখন পৃথু রাজা সমুদ্রযাত্রা করিতেন, তৎকালে সলিলরাশি স্তম্ভিত হইয়া থাকিত। পর্ব্বতসকল তাঁহার গমনকালে পথ প্রদান করিত। তোরণাদি দ্বারা তাঁহার রথধ্বজ ভগ্ন হইত না।

একদা সমুদায় শৈল, বনস্পতি, দেবতা, অসুর, নর, উরগ, যক্ষ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরাঃ, সপ্তর্ষি ও পিতৃগণ সুখাসীন পৃথু রাজার সন্নিধানে গমন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! তুমি আমাদের সম্রাট্, ক্ষত্রিয়, রাজা, রক্ষক, প্রভু ও পিতা; এক্ষণে আমরা যদ্দ্বারা নিরন্তর তৃপ্তি লাভ করিতে সমর্থ হই, আমাদিগকে এইরূপ অভিলষিত বর প্রদান কর।

তখন মহারাজ পৃথু তাঁহাদিগকে "তথাস্তু” বলিয়া আজগর শরাসন ও ভয়ঙ্কর শর গ্রহণপূর্ব্বক মুহূর্তকাল চিন্তা করিয়া পৃথিবীকে কহিলেন, হে বসুন্ধরে! তোমার মঙ্গল হউক, তুমি ইঁহাদিগের নিমিত্ত অভিলষিত দুগ্ধ ক্ষরণ কর, তাহা হইলে আমি ইঁহাদিগকে অভিলাষানুসারে অন্ন প্রদান করিব। পৃথিবী কহিলেন, মহারাজ! আপনি আমাকে দুহিতা বলিয়া জ্ঞান করিবেন। পৃথুরাজ “তথাস্তু” বলিয়া দোহনের সমস্ত উদ্যোগ করিলেন। তখন ভূতসমুদায় তাঁহাকে দোহন করিতে লাগিল।

বনস্পতিগণ দোহনের অভিলাষে সর্ব্বাগ্রে সমুত্থিত হইল। বৎসলা বসুন্ধরা বৎস, দোগ্ধা ও পাত্র লাভের অভিলাষে উত্থিত হইলেন। তখন পুষ্পিত শালবৃক্ষ বৎস, বটবৃক্ষ দোগ্ধা, ছিন্ন অঙ্কুর দুগ্ধ ও উদুম্বর পবিত্র পাত্র হইল। পর্ব্বতগণের দোহনসময়ে উদয় পর্ব্বত বৎস, মহাগিরি সুমেরু দোগ্ধা, রত্ন ও ওষধি সকল দুগ্ধ ও পাত্র প্রস্তরময় হইয়াছিল। তৎপরে দেবগণ দোগ্ধা ও তেজস্কর প্রিয়বস্তু সকল দুগ্ধ হইল। তদনন্তর অসুরগণ আম্রপাত্রে মদ্য দোহন করিলেন। ঐ সময়ে দ্বিমূর্ছা দোগ্ধা ও বিরোচন বৎস হইয়াছিলেন। মনুষ্যগণ কৃষি ও শস্য দোহন করিলেন। ঐ সময়ে স্বায়ত্ত্বব মুনি বৎস ও পৃথু দোগ্ধা হইয়াছিলেন। নাগগণ অলাবু পাত্রে বিষ দোহন করিলেন। তৎকালে ধৃতরাষ্ট্র দোগ্ধা ও তক্ষক বৎস হইয়াছিলেন। সপ্তর্ষিগণ বেদ দোহন করিলেন। তৎকালে বৃহস্পতি দোগ্ধা, ছন্দঃ পাত্র ও সোমরাজ বৎস হইয়াছিলেন। যক্ষগণ আম্রপাত্রে অন্তর্দ্ধান' দোহন করিল। তৎকালে কুবের দোগ্ধা ও বৃষধ্বজ বৎস হইয়াছিলেন। অপ্সরাঃ ও গন্ধর্ব্বগণ পদ্মপারে পবিত্র গন্ধ দোহন করিলেন। তৎকালে চিত্ররথ বৎস ও বিশ্বরুচি দোগ্ধা হইয়া-ছিলেন। পিতৃগণ রজত পাত্রে সুধা দোহন করিলেন। তৎকালে বৈবস্বত বৎস ও অন্তক দোগ্ধা হইয়াছিল। হে শ্বিত্যনন্দন। বনস্পতি প্রভৃতি দোগ্ধাগণ যে সমস্ত পাত্র ও বৎস দ্বারা অভিলষিত দুগ্ধ দোহন করিয়াছিলেন, ঐ সকল পাত্র ও বৎস অদ্যাপি বিদ্যমান রহিয়াছে।

প্রবল প্রতাপশালী মহারাজ পৃথু বিবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া সমুদায় প্রাণিগণকে অভিলষিত দ্রব্য প্রদানপূর্ব্বক পরিতুষ্ট করিয়াছিলেন। ঐ মহাত্মা অশ্বমেধ যজ্ঞে পৃথিবীস্থ সমুদায় বস্তুর সুবর্ণময়ী প্রতিমূর্ত্তি প্রস্তুত করিয়া বিপ্রসাৎ করেন। তিনি যষ্টিসহস্র ও যষ্টিশত সুবর্ণময় হস্তী এবং মণিরত্নে সমলঙ্কৃত সুবর্ণময় পৃথিবী নির্মাণ করিয়া দ্বিজাতিদিগকে প্রদান করিয়া-ছিলেন। হে সৃঞ্জয়। রাজা পৃথু তোেমা অপেক্ষা সমধিক সত্য, তপঃ, দয়া ও দানশীল এবং তোমার পুত্র অপেক্ষা সমধিক পুণ্যবান। সেই পৃথু নৃপতিও কালকবলে কবলিত হইয়াছেন; অতএব তুমি সেই অযাজ্ঞিক ও অধ্যায়নাদিশূন্য পুত্রের নিমিত্ত অনুতাপ করিও না।

জামদগ্ন্যোপাখ্যান।

নারদ কহিলেন, হে সৃঞ্জয়! বীরবর্গ-পরিপূজিত মহাবল পরাক্রান্ত, যশস্বী, মহাতপাঃ পরশুরামও অতৃপ্ত হইয়া মৃত্যুমুখে নিপতিত হইবেন। তিনি এই পৃথিবীতে সুখময় ও উৎকৃষ্ট শ্রী লাভ করিয়াও কিছুমাত্র বিকৃত হন নাই। তাঁহার উৎকৃষ্ট চরিত্র চিরকালই অপরিবর্তিত রহিয়াছে। ক্ষত্রিয়গণ তাঁহার পিতাকে পরাভব ও বৎসহরণ করিলে তিনি কাহারও পরামর্শ গ্রহণ না করিয়াই নিতান্ত দুর্জয় মহাবীর্য্য কার্তবীর্য্যকে সংহার করেন। তিনি স্বীয় শরাসনপ্রভাবে একাদিক্রমে চতুঃষষ্টি অযুত কালগ্রস্ত ক্ষত্রিয় বিনাশ করিয়া পুনরায় অন্য চতুৰ্দ্দশ সহস্র ব্রাহ্মণদ্বেষী ক্ষত্রিয়গণকে আক্রমণ ও সংহার করিয়াছিলেন। ঐ মহাবীর মুষলদ্বারা সহস্র, অসিদ্বারা সহস্র ও উদ্বন্ধনে সহস্র হৈহয়কে সমরে বিনাশ করেন। ঐ সংগ্রামে পিতৃবধজনিত ক্রোধে প্রদীপ্ত জামদগ্ন্যকর্তৃক অসংখ্য রথ ভগ্ন এবং অশ্ব, গজ ও বীরগণ বিনষ্ট হইয়া ভূতলশায়ী হইয়াছিল। তৎকালে জামদগ্ন্য পরশুদ্বারা দশ সহস্র বীরকে সমরে বিনাশ করিয়াছিলেন। হে রাম! মহর্ষি ভৃগুর প্রতি ধাবমান হও, ব্রাহ্মণগণ এই কথা বলিবামাত্র তিনি ক্রোধসন্তপ্ত হইয়া কাশ্মীর, দরদ, কুন্তি, ক্ষুদ্রক, মালব, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, বিদেহ রক্ষোবাহ বীতহোত্র, ত্রিগত্ত মার্ত্তিকাবত, শিবি ও অন্যান্য নানাদেশসম্ভূত সহস্র সহস্র ভূপতিগণকে বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। এইরূপে তাঁহার হস্তে শত সহস্র কোটি ক্ষত্রিয় বিনষ্ট হয়।

অনন্তর জামদগ্ন্য ইন্দ্রগোপ-সবর্ণ, বন্ধুজীবসন্নিভ রুধির-প্রবাহে সরোবরসকল পরিপূর্ণ ও অষ্টাদশ দ্বীপ আপনার বশীভূত করিয়া প্রভূত দক্ষিণা দানসহকারে শত শত যজ্ঞানুষ্ঠান করেন। মহর্ষি কশ্যপ জামদগ্ন্যের নিকট অষ্টনল পরিমাণে সমুন্নত, বিধানানুসারে সর্ব্বরত্নে পরিপূর্ণ পতাকা শত-পরিশোভিত, সুবর্ণময় বেদী এবং গ্রাম্য ও আরণ্যক পশুগণে পরিপূরিত এই অখণ্ড ভূমণ্ডল প্রতিগ্রহ করিয়াছেন। মহাবীর পরশুরাম অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক এই পৃথিবী দস্যুশূন্য ও শিষ্টজনসঙ্কুল করিয়া মহর্ষি কশ্যপকে প্রদান করেন। ঐ যজ্ঞে মহর্ষি কশ্যপকে সুবর্ণালঙ্কারবিভূষিত শত সহস্র মাতঙ্গও প্রদত্ত হইয়াছিল।

হে শ্বিত্যনন্দন! মহাবীর পরশুরাম একবিংশতি বার এই পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয়া করিয়া শত শত যাগযজ্ঞানুষ্ঠানপূর্ব্বক সমুদায় ভূমণ্ডল বিপ্রসাৎ করেন। মহাতপাঃ কশ্যপ রামের নিকট এই সপ্তদ্বীপা পৃথিবী প্রতিগ্রহ করিয়া কহিলেন, হে রাম! তুমি আমার আদেশানুসারে এই পৃথিবী হইতে নির্গত হও। তখন মহাবীর রাম ব্রাহ্মণের আজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া শর নিক্ষেপ-পূর্ব্বক রত্নাকরকে উৎসারিত করত মহেন্দ্র পর্ব্বতে বাস করিতে লাগিলেন। হে সৃঞ্জয়! তোমা অপেক্ষা সমধিক সত্য,তপঃ, দয়া ও দানসম্পন্ন, তোমার পুত্র অপেক্ষা সমধিক পুণ্যবান্ ভৃগুকুল-কীর্ত্তিবর্দ্ধন মহাযশস্বী রামও মৃত্যুমুখে নিপতিত হইবেন; অতএব তুমি সেই অধ্যয়নাদিশূন্য, অযাজ্ঞিক পুত্রের নিমিত্ত আর অনুতাপ করিও না। হে মহারাজ। এই সমস্ত অসংখ্য গুণসম্পন্ন ভূপালগণ মৃত্যুগ্রস্ত হইয়াছেন এবং আরও কত শত রাজা কালকবলে নিপতিত হইবেন।

মহর্ষি নারদকর্তৃক সৃঞ্জয়ের মৃত পুত্র প্রাপ্তি ও যুধিষ্ঠিরের শোক শান্তি।

ব্যাসদেব কহিলেন, হে ধর্মরাজ! রাজা সৃঞ্জয় পুণ্যজনক আয়ুষ্কর এই ষোড়শরাজিক' উপাখ্যান শ্রবণপূর্ব্বক তৃষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন দেবর্ষি নারদ তাঁহাকে তদবস্থ অবলোকন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! আমি যে সমস্ত উপাখ্যান কীর্ত্তন করিলাম, তুমি ত' তৎসমুদায় শ্রবণ ও তৎসমুদায়ের মর্মাবধারণ করিয়াছ? অথবা ঐ সকল উপাখ্যান শূদ্রাপতির শ্রাদ্ধের ন্যায় নিতান্ত নিষ্ফল হইয়া গেল?

তখন সৃঞ্জয় কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, হে তপোধন! পূর্ব্বতন যাজ্ঞিক রাজর্ষিগণের উৎকৃষ্ট উপাখ্যান শ্রবণ করিয়া বিস্ময়বশতঃ আমার সমুদায় শোক দিনকরকরাপসারিত। অন্ধকারের ন্যায় অপনীত হইয়াছে, আমি বিগতপাপ ও ব্যথাশূন্য হইয়াছি, এক্ষণে আজ্ঞা করুন, আমাকে কি করিতে হইবে? নারদ কহিলেন, মহারাজ! তুমি ভাগ্যবলে বিগতশোক হইয়াছ; এক্ষণে স্বীয় অভিলষিত বর প্রার্থনা কর, অবশ্যই তাহা প্রাপ্ত হইবে; আমরা মিথ্যাবাদী নহি। সৃঞ্জয় কহিলেন, ভগবন্। আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হওয়াতেই আমি কৃতার্থ ও পরমাহ্লাদিত হইয়াছি; আপনি যাহার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন, তাহার কোন বিষয়ই অসুলভ হয় না। তখন নারদ কহিলেন, মহারাজ! দস্যুগণ তোমার পুত্রকে বৃথা নিহত করিয়াছে; আমি তাহাকে প্রোক্ষিত পশুর ন্যায় ঘোর নরক হইতে উদ্ধার করিয়া তোমায় প্রদান করিতেছি।

অনন্তর প্রসন্নচিত্ত দেবর্ষি নারদ-প্রভাবে রাজা সৃঞ্জয়ের সেই কুবেরতনয়সদৃশ অদ্ভুত পুত্র প্রাদুর্ভূত হইল; সৃঞ্জয় পুত্রলাভে সাতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইয়া প্রভূত দক্ষিণা দানসহকারে বহুবিধ যাগ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেন। হে ধর্মরাজ। সেই সুবর্ণষ্ঠীবী অকৃতকার্য্য, নিতান্ত ভীত, অযাজ্ঞিক ও অপত্যবিহীন ছিলেন এবং যুদ্ধেও বিনষ্ট হন নাই। এই নিমিত্তই পুনরায় তিনি জীবিত হইলেন। কিন্তু মহাবীর অভিমন্যু সৈন্যগণের অভিমুখীন হইয়া সহস্র সহস্র শত্রুগণকে সন্তপ্ত করত কৃতার্থতা লাভ করিয়া রণে নিহত হইয়াছেন। লোকে ব্রহ্মচর্য্য, প্রজ্ঞা, শাস্ত্রজ্ঞান ও প্রধান যজ্ঞানুষ্ঠানদ্বারা যে সমস্ত অক্ষয় লোক লাভ করিয়া থাকে, মহাবীর অভিমন্যুরও সেই সমুদায় লোক প্রাপ্তি হইয়াছে। বিদ্বান্ লোকেরা পুণ্য কার্য্যদ্বারা প্রতিনিয়ত স্বর্গপ্রাপ্তির প্রত্যাশা করিয়া থাকেন; কিন্তু স্বর্গবাসীরা কদাচ এই পৃথিবীতে অধিবাস করিবার প্রার্থনা করেন না; অতএব সেই স্বর্গস্থ অর্জুনাত্মজ অভিমন্যুকে অত্যল্প অপ্রাপ্য পার্থিব সুখ উপভোগের নিমিত্ত পৃথিবীতে আনয়ন করা কোনমতেই সুসাধ্য নহে। যোগীরা সমাধিবলে পবিত্র দর্শন হইয়া যে গতি লাভ করিয়া থাকেন এবং উৎকৃষ্ট যজ্ঞানুষ্ঠায়ী ও কঠোর তপস্বীদিগের যে গতিহইয়া থাকে, মহাবীর অর্জুনতনয় অভিমন্যু সেই অক্ষয়া গতি লাভ করিয়াছেন। মহাবীর অভিমন্যু দেহান্তে দেহান্তর লাভ করিয়া অমৃতময় স্বীয় রশ্মিপ্রভাবে বিরাজিত হইতেছেন। ঐ মহাবীর এক্ষণে স্বীয় চান্দ্রমসী তনু লাভ করিয়াছেন; অতএব তাঁহার নিমিত্ত আর শোক করা কর্তব্য নহে।

হে যুধিষ্ঠির! এক্ষণে তুমি এই সমস্ত অবগত হইয়া ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক শত্রুবিনাশে প্রবৃত্ত হও। বরং জীবিত ব্যক্তি-দিগের নিমিত্ত শোক করা আমাদের কর্তব্য; কিন্তু স্বর্গপ্রাপ্ত মহাত্মাদের নিমিত্ত অনুতাপ করা কদাপি বিধেয় নহে। শোক করিলে তাহার পাপ পরিবর্দ্ধিত হয়; এই নিমিত্ত পণ্ডিতেরা শোক পরিত্যাগপূর্ব্বক মঙ্গললাভার্থ যত্নবান হইবে। হর্ষ, অভিমান ও সুখ প্রাপ্তির অভিলাষ করা বিধেয়; বুধগণ এইরূপ অবধারণ করিয়া কদাচ শোকাকুল হন না। ফলতঃ শোক শোকান্তরের উৎপাদন করিয়া থাকে। এক্ষণে তুমি এই সমস্ত সম্যক্ অবগত হইয়া উত্থিত ও যত্নবান্ হও; আর বৃথা শোকাকুল হইও না। তুমি মৃত্যুর উৎপত্তি, অনুপম তপঃ ও সর্ব্বভূতসমতা এবং সম্পত্তির অস্থৈর্য্য ও সৃঞ্জয়ের মৃত পুত্রের পুনরায় জীবন-প্রাপ্তির বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিলে; এক্ষণে আর শোক করিও না, আমি চলিলাম; এই বলিয়া ভগবান্ ব্যাস তথা হইতে অন্তর্দ্ধান হইলেন।

নিৰ্ম্মল নভোমণ্ডলসদৃশ শ্যামকলেবর ভগবান্ ব্যাস এইরূপ আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক অন্তর্হিত হইলে ধৰ্ম্মনন্দন মহারাজ যুধিষ্ঠির মহেন্দ্রপ্রতিম তেজস্বী, ন্যায়োপার্জিতবিত্ত, পূর্ব্বতন নৃপতিদিগের যজ্ঞ সম্পত্তির বিষয় শ্রবণে পরম পরিতুষ্ট হইয়া মনে মনে উহার সবিশেষ প্রশংসা করত শোক পরিত্যাগ করিলেন; কিন্তু অর্জুনকে কি বলিব, এই মনে করিয়া পুনরায় চিন্তাসাগরে নিমগ্ন হইলেন।

অভিমন্যুবধ পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।