কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

দ্রোণপর্ব্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

প্রতিজ্ঞা পর্ব্বাধ্যায়

দ্রোণপর্ব্ব

প্রতিজ্ঞা পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও ব্যাসকে নমস্কার করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

ত্রয়োদশ দিবসের যুদ্ধশেষে অর্জুনের স্ব-শিবিরে গমন।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! প্রাণিগণের ক্ষয়কর সেই ভয়ানক দিবা অবসান হইলে দিনকর অস্ত গমন করিলেন। সন্ধ্যাকাল সমুপস্থিত হইল এবং সৈন্যগণ স্কন্ধাবারে গমন করিতে আরম্ভ করিল। ঐ সময় কপিকেতন ধনঞ্জয় দিব্যাস্ত্রজালে সংশপ্তকগণকে সংহারপূর্ব্বক সেই জয়শীল রথে আরোহণ করিয়া স্বশিবিরে গমন করিতে লাগিলেন। গমনকালে সাশ্রুকণ্ঠে গোবিন্দকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কেশব! কেন অদ্য আমার হৃদয় ভীত, বাক্য স্খলিত, অঙ্গ স্পন্দিত ও গাত্র অবসন্ন হইতেছে? ক্লেশজনক অমঙ্গল চিন্তা আমার হৃদয় হইতে অপসারিত হইতেছে না, আমি চারিদিকে উৎপাত ও বহুবিধ অনিষ্টসূচক লক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া নিতান্ত বিত্রাসিত হইয়াছি। হে মধুসূদন! এই সমুদায় অমঙ্গলসূচক ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়া অমাত্য সমবেত মহারাজ যুধিষ্ঠিরের কুশল বিষয়ে আমার সংশয় জন্মিতেছে।

বাসুদেব কহিলেন, ধনঞ্জয়! অমাত্য সমবেত মহারাজ যুধিষ্ঠির নিশ্চয়ই জয় লাভ করিবেন; তুমি দুর্ভাবনা পরিত্যাগ কর; তোমাদের অতি অল্পমাত্র অনিষ্ট হইবে।

অনন্তর মহাবীর বাসুদেব ও অর্জুন সন্ধ্যোপাসনা করিয়া রথারোহণপূর্ব্বক যুদ্ধবৃত্তান্ত কথোপকথন করিতে করিতে শিবিরে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, শিবির আনন্দশূন্য, দীপ্তিশূন্য ও নিতান্ত শ্রীভ্রষ্ট হইয়া রহিয়াছে। তখন অরাতি-নিপাতন ধনঞ্জয় আকুলহৃদয় হইয়া কেশবকে কহিলেন, হে জনার্দ্দন! আজি মঙ্গল তূর্য্যনিস্বন এবং দুন্দুভিনাদ সহকৃত শঙ্খ ও পটহের শব্দ হইতেছে না; করতালসমবেত বীণাবাদন রহিত হইয়াছে এবং বন্দিগণ আমার নিকটে স্তুতিযুক্ত, মনোহর মঙ্গল গীতসকল গান ও পাঠ করিতেছে না। যোদ্ধৃগণ আমাকে দেখিয়াই অধোমুখে পলায়ন করিতেছে; উহারা পূর্ব্বের ন্যায় আমার নিকট স্ব স্ব অনুষ্ঠিত কার্য্যের পরিচয় প্রদান করিতেছে না। হে মাধব! আজি আমার ভ্রাতৃগণ কি কুশলে আছেন? আত্মীয়গণকে দেখিয়া আমার মনে বিরুদ্ধ ভাবের উদয় হইতেছে। হে নারদ! পাঞ্চালরাজ, বিরাট ও আমার যোদ্ধৃগণ সকলে কি কুশলে আছে? আমি সংগ্রাম হইতে আগমন করিতেছি, কিন্তু অভিমন্যু ভ্রাতৃগণের সহিত প্রফুল্ল চিত্তে সহাস্যবদনে কেন আমার প্রত্যুদ্গমন করিল না?

অভিমন্যুর জন্য অর্জুনের শোক।

অর্জুন ও বাসুদেব এইরূপে কথোপকথন করিতে করিতে শিবিরে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিলেন, পাণ্ডবগণ নিতান্ত অসুস্থ ও বিচেতন প্রায় হইয়া রহিয়াছেন। দুৰ্ম্মনায়মান ধনঞ্জয় শিবিরমধ্যে সমুদায় ভ্রাতা ও পুত্রগণকে অবলোকন করিলেন, কিন্তু অভিমন্যুকে দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি নিতান্ত বিষণ্ণ হইয়া কহিলেন, হে বীরগণ! তোমাদের সকলেরই মুখবর্ণ অপ্রসন্ন হইয়াছে এবং তোমরা কেহই আমাকে অভিনন্দন করিতেছ না। বৎস অভিমন্যু কোথায়? আমি শুনিয়াছি, দ্রোণ চক্রব্যূহ নির্মাণ করিয়াছিলেন; অল্পবয়স্ক অভিমন্যু বিনা তোমাদের মধ্যে এমন আর কেহই নাই যে, তাহা ভেদ করিতে সমর্থ হয়। কিন্তু আমি তাহাকে ব্যূহ হইতে বিনির্গমন বিষয়ে উপদেশ প্রদান করি নাই। তোমরা কি সেই বালককে ব্যূহে প্রবেশিত করিয়াছিলে? পরবীরহা মহাধনুর্দ্ধর সুভদ্রানন্দন কি শত্রুগণের বহুসৈন্য ভেদ করিয়া যুদ্ধে বিনষ্ট হইয়াছে? বল, লোহিতাক্ষ, মহাবাহু, পৰ্ব্বতজাত সিংহসদৃশ, উপেন্দ্রোপম, মহাবীর অভিমন্যু কি প্রকারে যুদ্ধে নিহত হইল? কোন্ ব্যক্তি কালমোহিত হইয়া দ্রৌপদী, কেশব ও কুন্তীর নিরন্তর প্রীতিভাজন সুভদ্রার প্রিয় পুত্রকে বিনাশ করিল? বিক্রম, শ্রুতি ও মাহাত্ম্যের বৃষ্ণিবীর মহাত্মা কেশবের সমকক্ষ মহাবীর অভিমন্যু কি প্রকারে সংগ্রামে বিনষ্ট হইল? সুভদ্রার দয়াভাজন, আমার নিরন্তর লালিত শৌর্য্যশালী পুত্রকে যদি দেখিতে না পাই, নিশ্চয়ই যমলোক অবলোকন করিব। মৃদুকুঞ্চিত-কেশান্ত মৃগশাবকাক্ষ মত্তবারণবিক্রান্ত শালপোতসদৃশ সমুন্নত মহাবীর অভিমন্যু সতত সম্মিত প্রিয়ভাষী; শান্ত গুরুবাক্যের অনুগত; অমৎসর, মহোৎসাহ, যুদ্ধাভিনন্দী, অরাতিগণের ভয়বর্দ্ধন, আত্মীয়গণের প্রিয় ও হিতচারণে নিযুক্ত, পিতৃগণের জয়াভিলাষী, অভূতপূর্ব্ব যোদ্ধা ও সংগ্রামে নির্ভয় ছিল এবং বালক হইয়াও যুবজনের ন্যায় কার্য্য করিত। আমি যদি সেই প্রিয় পুত্রের সন্দর্শন প্রাপ্ত না হই, তাহা হইলে নিশ্চয়ই প্রাণ পরিত্যাগ করিব। যদি প্রদ্যুম্ন, কেশব ও আমার নিরন্তর প্রীতিভাজন, রথিগণনায় মহারথ বলিয়া পরিগণিত, যুদ্ধে আমা অপেক্ষা অর্দ্ধগুণ অধিক, তরুণবয়স্ক, মহাবাহু পুত্রকে দেখিতে না পাই, নিশ্চয়ই জীবন পরিত্যাগ করিব। প্রিয় তনয়ের সেই সুন্দর নাসা, সুন্দর ললাট, সুন্দর চক্ষুঃ, সুন্দর ভ্রূ ও সুন্দর ওষ্ঠ সমন্বিত মুখচন্দ্র নিরীক্ষণ, সেই তন্ত্রীশব্দের ন্যায়, পুংস্কোকিলরবের ন্যায় মনোহর বাণী শ্রবণ এবং সেই দেবগণদুর্লভ, অপ্রতিম রূপ অবলোকন না করিলে আমার শান্তিলাভের সম্ভাবনা কোথায়? অভিবাদন-দক্ষ, পিতৃগণের বাক্যে অনুরক্ত অভিমন্যুকে না দেখিলে আমার হৃদয় কোনমতেই সুস্থির হইবে না।

সুকুমার, মহাহ-শয়নোচিত, মহাবীর অভিমন্যু অসংখ্য সহায়সম্পন্ন হইয়াও আজি অনাথের ন্যায় ভূমিতলে শয়ন করিয়া আছে, সন্দেহ নাই। যে বীর শয়ান করিয়া অমরাঙ্গনাগণ-কর্তৃক উপাসিত হইত, আজি অশিব শিবাগণ ভ্রমণ করিতে করিতে সেই বাণবিদ্ধ কলেবর মহাবীরকে আকর্ষণ করিতেছে। পূর্ব্বে সূত, মাগধ ও বন্দিগণ মধুরস্বরে স্তুতি পাঠ করিয়া যে মহাবীরকে প্রবোধিত করিত, আজি শ্বাপদগণ তাহার চতুর্দিকে বিকৃত স্বরে চীৎকার করিতেছে। যে মুখচন্দ্র পূর্ব্বে ছত্রচ্ছায়ায় সমাবৃত থাকিত, আজি ধূলিপটল নিশ্চয়ই তাহা সমাচ্ছন্ন করিবে। হা পুত্র! আমি তোমায় বারংবার নিরীক্ষণ করিয়াও অবিতৃপ্ত থাকিতাম; এক্ষণে কাল এই ভাগ্যহীনের নিকট হইতে তোমাকে বলপূর্ব্বক অপহরণ করিল। আজি পুণ্যবিদ্গণের আশ্রয় স্বীয় প্রভায় প্রদীপ্ত, মনোহর যমপুরী তোমাদ্বারা অধিকতর শোভমান হইতেছে এবং যম, বরুণ, ইন্দ্র ও কুবের তোমাকে প্রিয় অতিথি লাভ করিয়া অর্চ্চনা করিতেছেন, সন্দেহ নাই।

নৌকা ভগ্ন হইলে বণিক্ যেমন বিলাপ করে, ধনঞ্জয় সেইরূপ বিলাপ করিয়া নিতান্ত দুঃখিত চিত্তে যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, মহারাজ! অভিমন্যু কি শত্রুবিমৰ্দ্দনপূর্ব্বক মহাবীরগণের সহিত সংগ্রাম করত স্বর্গের অভিমুখীন হইয়াছে? অসহায় অভিমন্যু যত্নাতিশয়সহকারে মহাবল পরাক্রান্ত বীরপুরুষদিগের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে সাহায্যলাভার্থী হইয়া আমাকে চিন্তা করিয়াছিল, সন্দেহ নাই। বোধ হয় আমার বালক পুত্র অভিমন্যু কর্ণ, দ্রোণ ও কূপ প্রভৃতি নৃশংসগণকর্তৃক নানা চিহ্নে চিহ্নিত, সুধৌতাগ্র তীক্ষ্ণ সায়কনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া হ তাত! এক্ষণে আমাকে পরিত্রাণ কর, এই বলিয়া বারংবার বিলাপ করিতে করিতে ভূমিতলে নিপতিত হইয়াছে অথবা মহাবীর অভিমন্যু আমার ঔরসজাত, সুভদ্রার গর্ভসম্ভূত ও বাসুদেবের ভাগিনেয়, সে এরূপ আর্তনাদ করিবার পাত্র নয়।

আমার হৃদয় বজ্রসারময় ও নিতান্ত কঠিন সন্দেহ নাই, এই নিমিত্তই সেই দীর্ঘবাহু আরক্তলোচন পুত্রের অদর্শনে এখনও বিদীর্ণ হইতেছে না। নৃশংসগণ মহাধনুর্দ্ধর হইয়া কি প্রকারে বাসুদেবের ভাগিনেয়, আমার পুত্র সেই বালকের উপর মর্মভেদী শরজাল নিক্ষেপ করিল? অদীনাত্মা অভিমন্যু প্রতিদিন প্রত্যুদ্‌-গমনপূর্ব্বক আমাকে অভিনন্দন করিত। আজি আমি শত্রুগণকে সংহার করিয়া আগমন করিতেছি, কিন্তু সে কেন আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতেছে না? নিশ্চয়ই সে রুধিরাক্তকলেবরে সমরাঙ্গনে শয়ান হইয়া নিপতিত আদিত্যের ন্যায় স্বীয় দেহপ্রভায় ধরাতল শোভমান করিতেছে। সুভদ্রার নিমিত্ত আমার যৎপরোনাস্তি সন্তাপ জন্মিতেছে, সে সমরে অপরাজুখ পুত্রকে নিহত শ্রবণপূর্ব্বক শোকাকুল হইয়া নিশ্চয়ই প্রাণ পরিত্যাগ করিবে! হায়! অদ্য সুভদ্রা ও দ্রৌপদী অভিমন্যুকে না দেখিয়া আমাকে কি বলিবে এবং তাহারা দুঃখার্ত্ত হইলে আমিই বা কি বলিয়া তাহাদিগকে সান্ত্বনা করিব! যদি বধূকে শোককর্ষিত চিত্তে রোদন করিতে দেখিয়া আমার হৃদয় সহস্রধা হইয়া না যায়, তাহা হইলে ইহা বজ্রসারময় সন্দেহ নাই।

আমি গর্বিত ধার্তরাষ্ট্রগণের সিংহনাদ শ্রবণ করিয়াছি। বাসুদেবও বৈশ্যানন্দন যুযুৎসুকে বীরগণের প্রতি এইরূপ তিরস্কার বাক্য প্রয়োগ করিতে শুনিয়াছেন যে, হে অধার্মিক মহারথগণ। তোমরা অর্জুনকে পরাজয় করিতে অসমর্থ হইয়া এক বালকের প্রাণ সংহারপূর্ব্বক বৃথা আনন্দিত হইতেছ। অচিরাৎ পাণ্ডবগণের বল দেখিতে পাইবে। তোমরা যখন সংগ্রামে কেশব ও অর্জুনের বিপ্রিয়াচরণ করিয়াছ, তখন তোমাদের শোকসময় সমুপস্থিত হইয়াছে, তবে কেন বৃথা প্রীতিপ্রফুল্ল চিত্তে সিংহের ন্যায় গর্জন করিতেছ? তোমরা অবিলম্বে এই পাপকর্ম্মের ফল প্রাপ্ত হইবে। অধর্ম্মের ফল অতি সত্বরেই সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। মহামতি যুযুৎসু কোপাবিষ্ট ও দুঃখান্বিত হইয়া তাহাদিগকে এই কথা বলিতে বলিতে অস্ত্র পরিত্যাগপূর্ব্বক অপসৃত হইলেন। হে কৃষ্ণ! তুমি যুযুৎসুর বাক্য শ্রবণ করিয়াছিলে, কিন্তু আমাকে কি নিমিত্ত জ্ঞাত কর নাই? আমি ঐ বৃত্তান্ত জানিতে পারিলে তৎক্ষণাৎ সেই নৃশংস মহারথগণের সকলকেই শরানলে দগ্ধ করিতাম।

মহাত্মা বাসুদেব ধনঞ্জয়কে পুত্রশোকে নিতান্ত কাতর হইয়া সাশ্রুনয়নে চিন্তা করিতে দেখিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা করত কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! এরূপ হইও না; অপলায়ী শূরগণের, বিশেষতঃ যুদ্ধোপজীবী ক্ষত্রিয়গণের সকলেরই এই পথ। ধর্মশাস্ত্রজ্ঞেরা অপরাজুখ যুধ্যমান শূরগণের এইরূপ গতিই বিধান করিয়াছেন অতএব নিশ্চয়ই তাহাদিগকে সংগ্রামে প্রাণ পরিত্যাগ করিতে হইবে। অভিমন্যু পুণ্যকৰ্ম্মাদিগের লোকে গমন করিয়াছে, সন্দেহ নাই। সমুদায় বীরগণই সংগ্রামে অভিমুখ হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিতে হইবে আকাঙ্ক্ষা করিয়া থাকেন; মহাবীর অভিমন্যু মহাবল পরাক্রান্ত রাজপুত্রগণকে সংগ্রামে সংহার করিয়া বীরজনা-কাঙ্ক্ষিত মৃত্যু প্রাপ্ত হইয়াছে; অতএব তুমি শোক করিও না। পূর্ব্বতন ধৰ্ম্মসংস্থাপকগণ যুদ্ধমৃত্যুই ক্ষত্রিয়গণের সনাতন ধর্ম বলিয়া স্থির করিয়া গিয়াছেন। তুমি শোকসমাবিষ্ট হইয়াছ বলিয়া তোমার এই ভ্রাতৃগণ, সুহৃদ্গণ ও ভূপতিগণ সকলেই দীনমনাঃ হইয়াছে, তুমি শান্ত বাক্যে ইঁহাদিগকে আশ্বাসিত কর। বেদিতব্য বিষয় তোমার বিদিত হইয়াছে, অতএব তোমার শোক করা নিতান্ত অনুচিত হইতেছে।

মহাবীর ধনঞ্জয় অদ্ভুতকৰ্ম্মা বাসুদেবকর্তৃক এইরূপ আশ্বাসিত হইয়া শোককর্ষিত ভ্রাতৃগণকে কহিলেন, হে ভ্রাতৃগণ! সেই দীর্ঘবাহু কমলায়তলোচন অভিমন্যু যে প্রকার যুদ্ধ করিয়া-ছিল, শ্রবণ করিতে আমার ইচ্ছা হইতেছে। তোমাদের সমক্ষে স্বীয় পুত্রের বৈরিগণকে হস্তী, রথ, অশ্ব ও পরিবারগণের সহিত সংহার করিব। তোমরা সকলে কৃতাস্ত্র ও শস্ত্রপাণি; তোমাদের সমক্ষে বজ্রপাণি সুররাজও কি অভিমন্যুকে যুদ্ধে বিনষ্ট করিতে পারে? হায়! যদি পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণকে আমার পুত্রের রক্ষণে অসমর্থ জানিতাম, তাহা হইলে আমি স্বয়ংই তাহাকে রক্ষা করিতাম। তোমরা রথারূঢ় হইয়া শরজাল বর্ষণ করিতেছিলে, তথাপি শত্রুগণ কি প্রকারে অন্যায় সংগ্রাম করিয়া অভিমন্যুর প্রাণ সংহার করিল? কি আশ্চর্য্য! এখন জানিলাম, তোমাদের কিছুমাত্র পৌরুষ বা পরাক্রম নাই, এই জন্য অভিমন্যু তোমাদের সমক্ষেই নিপাতিত হইয়াছে। অথবা সকলই আমার দোষ; কেননা, তোমাদিগকে নিতান্ত দুর্ব্বল, ভীরু ও অকৃতনিশ্চয় জানিয়াও আমি এস্থান হইতে গমন করিয়াছিলাম। তোমরা যদি আমার পুত্রকেও রক্ষা করিতে অক্ষম হইলে, তবে তোমাদের বৰ্ম্ম, শস্ত্র ও আয়ুধসকল কি ভূষণের নিমিত্ত এবং বাক্য কি সভামধ্যে বক্তৃতা করিবার নিমিত্ত?

পুত্রশোকসন্তপ্ত ধনঞ্জয় এই কথা বলিয়া অশ্রুপূর্ণ মুখে ধনুঃ ও খড়া হস্তে অবস্থান করত ক্রুদ্ধ কৃতান্তের ন্যায় মুহুর্মুহুঃ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তৎকালে যুধিষ্ঠির ও বাসুদেব ব্যতীত আর কোন সুহৃদ্‌ই তাঁহার সহিত আলাপ বা তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইলেন না। ঐ দুই জন সকল অবস্থাতেই অর্জুনের অনুকূল ছিলেন এবং অর্জুন তাঁহাদিগকে অত্যন্ত সম্মান ও প্রীতি করিতেন, এই নিমিত্ত তাঁহারা তৎকালে তাঁহার সহিত আলাপ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। তখন যুধিষ্ঠির, পুত্রশোকাধিকাতর রাজীবলোচন ক্রোধসন্তপ্তচিত্ত অর্জুনকে কহিতে লাগিলেন।

অভিমন্যুর বীরত্ব ও নিধন-বৃত্তান্ত বর্ণন।

হে মহাবাহো! তুমি সংশপ্তকসৈন্যগণের সহিত সংগ্রাম করিতে গমন করিলে দ্রোণাচার্য্য সৈন্যগণকে সংব্যুহিত' করিয়া আমাকে গ্রহণ করিবার নিমিত্ত দৃঢ়তর যত্ন করিতে লাগিলেন। তখন আমরা রথসৈন্য প্রতিব্যূহিত করিয়া দ্রোণাচার্য্যকে নিবারণ করিতে সমুদ্যত হইলাম। বহুসংখ্যক বীরপুরুষ আমাকে রক্ষা করত দ্রোণাচার্য্যকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তখন দ্রোণাচার্য্য আমাদিগকে নিশিত শরনিকরে নিতান্ত উৎপীড়ন করত আঘাত করিতে আরম্ভ করিলেন। আমরা দ্রোণকর্তৃক এরূপ নিপীড়িত হইলাম যে, তাঁহার সৈন্য ভেদ করা দূরে থাকুক, তাঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেও পারিলাম না। তখন অপ্রতিম-বীর্য্যসম্পন্ন সুভদ্রাকুমারকে কহিলাম, বৎস। দ্রোণাচার্য্যের সৈন্যভেদ কর। বীর্য্যবান্ অভিমন্যু আমাদের নিয়োগানুসারে উৎকৃষ্ট অশ্বের ন্যায় সেই অসহ্য ভারবহনের উপক্রম করিল। গরুড় যেমন সমুদ্রমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ সেই বালক দ্রোণসৈন্যের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হইল। আমরা অনুগমন করিলাম এবং সে যেরূপে সৈন্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল, সেইরূপে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিলাম; কিন্তু ক্ষুদ্র জয়দ্রথ রুদ্রের বরদান প্রভাবে আমাদিগের সকলকেই নিবারণ করিল। তখন মহাবীর দ্রোণ, কূপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, কোশলরাজ বৃহদ্বল ও কৃতবর্ম্মা এই ছয় জন রথী সেই অসহায় বালককে বেষ্টন করিলেন। মহাবীর অভিমন্যু সাধ্যানুসারে যত্ন করিয়াও তাঁহাদের শরে বিরথ হইল। তখন দুঃশাসনের পুত্র অবিলম্বে তাহার সমীপে গমনপূর্ব্বক স্বয়ংসংশয়াপন্ন হইয়া তাহার প্রাণসংহার করিল। পরম ধার্মিক মহাবীর অভিমন্যু প্রথমতঃ সহস্র মনুষ্য, অশ্ব, রথ ও মাতঙ্গ এবং তৎপরে পুনরায় আট সহস্র রথ, নয় শত হস্তী, সহস্র রাজপুত্র এবং অলক্ষিত বহু বীর ও রাজা বৃহদ্বলকে সংহারপূর্ব্বক স্বয়ং স্বর্গে গমন করিয়াছেন। হে ধনঞ্জয়! আমাদিগের এই শোকজনক ব্যাপার এইরূপে সমুৎপন্ন হইয়াছে।

তখন পুত্রবৎসল ধনঞ্জয় যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া হা পুত্র! বলিয়া নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক ধরাতলে নিপতিত হইলেন। সকলে বিষণ্ণবদন হইয়া অর্জুনকে বেষ্টন-পূর্ব্বক অনিমেষ নয়নে পরস্পর অবলোকন করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎক্ষণ পরে মহাবীর ধনঞ্জয় সংজ্ঞা লাভপূর্ব্বক ক্রোধে অধীর হইয়া উঠিলেন; এবং জ্বরগ্রস্তের ন্যায় কম্পিত হইয়া মুহুর্মুহু নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তাঁহার নেত্র হইতে অশ্রুধারা বিগলিত হইতে লাগিল। তখন তিনি করে কর নিপীড়ন ও উন্মত্তের ন্যায় দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, কালি জয়দ্রথকে বিনাশ করিব। যদি জয়দ্রথ মৃত্যুভয়ে ভীত হইয়া ধার্তরাষ্ট্রগণকে পরিত্যাগ না করে, যদি আমাদিগের পুরুষোত্তম কৃষ্ণের বা আপনার শরণাপন্ন না হয়, নিশ্চয়ই কল্য আমার শরে বিনষ্ট হইবে। সেই পাপাত্মা আমার সৌহৃদ্য বিস্মৃত হইয়া দুর্য্যোধনের প্রিয় কার্য্য করিতেছে এবং সেই পাপাত্মাই অভিমন্যু বধের হেতু হইয়াছে; অতএব কালি তাহাকে সংহার করিব। দ্রোণই হউন, আর কূপই হউন, যে কেহ তাহার রক্ষার্থে আমার সহিত যুদ্ধ করিবেন, তাঁহাদিগকে আমার শরনিকরে আচ্ছাদিত হইতে হইবে। হে পুরুষশ্রেষ্ঠগণ! আমি যাহা কহিলাম, যদি সংগ্রামে সেই প্রকার কার্য্য না করি, তাহা হইলে যেন আমার পুণ্যলব্ধ লোকসকল লাভ না হয়। যদি জয়দ্রথকে বধ না করি, তাহা হইলে মাতৃহন্তা, পিতৃঘাতী, গুরুদাররত, খল, সাধুগণের প্রতি অসূয়াপরবশ, তাঁহাদিগের পরিবাদদাতা', গচ্ছিত ধনের অপহারক, বিশ্বাসঘাতী, ভুক্তপূর্ব্ব স্ত্রীর নিন্দক, অযশস্বী, ব্রহ্মঘাতী, গোঘাতী, বৃথাপায়সভোজী', বৃথাযবান্নভোজী, বৃথাশাকভোজী, বৃথাতিলান্নভোজী, বৃথাসংযাবভোজী, বৃথাপিষ্টকভোজী, বৃথামাংসভোজী এবং বেদাধ্যায়ী, প্রশংসিত ব্রাহ্মণ বৃদ্ধ ও গুরুর অবমন্তা যে লোকে গমন করে, আমিও যেন সেই লোক প্রাপ্ত হই। যদি জয়দ্রথকে বধ না করি, তাহা হইলে যে ব্যক্তি পাদদ্বারা ব্রাহ্মণ, গো, অগ্নি স্পর্শ করে এবং যে ব্যক্তি জলে শ্লেষ্মা, পুরীষ ও মূত্র পরিত্যাগ করে, আমি যেন তাহাদিগের কষ্টকর গতি প্রাপ্ত হই। যদি জয়দ্রথকে বধ না করি, তাহা হইলে যে ব্যক্তি নগ্ন হইয়া স্নান করে, যাহার নিকট অতিথি বিমুখ হয়, যে ব্যক্তি উৎকোচ গ্রহণ, মিথ্যাবাক্য-প্রয়োগ ও প্রবঞ্চনা করে এবং যে নীচাশয় ভৃত্য, পুত্র, স্ত্রী ও আশ্রিতগণকে প্রদান না করিয়া তাহাদের সমক্ষে স্বয়ং মিষ্টান্ন ভক্ষণ করে, আমি যেন তাহাদিগের ভয়ানক গতি প্রাপ্ত হই। যদি জয়দ্রথকে বধ না করি, তাহা হইলে যে নৃশংসাত্মা আশ্রিত, সাধু ও বাক্যানুবর্তী ব্যক্তিকে প্রতিপালন না করিয়া পরিত্যাগ করে, যে পাপাত্মা উপকারকের নিন্দা করে, যে পূজনীয় প্রতিবেশ্যকে শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য দান না করিয়া অযোগ্য ব্যক্তিকে দান করে, যে ব্যক্তি মদ্যপান করে, যে মর্য্যাদা ভেদ করে, বৃষলী' গমন করে, যে ব্যক্তি কৃতঘ্ন এবং ভ্রাতৃনিন্দক, আমি অবিলম্বে যেন তাহাদিগের গতি প্রাপ্ত হই। যদি কল্য জয়দ্রথকে বধ না করি, তাহা হইলে এ স্থলে যে সকল অধার্মিকের নাম কীর্ত্তন করিলাম এবং যে সকল অধার্মিকের নাম কীর্ত্তিত হইল না, আমি যেন তাহাদিগের গতি প্রাপ্ত হই।

আমি পুনরায় অন্য প্রতিজ্ঞা করিতেছি, শ্রবণ করুন। যদি পাপাত্মা জয়দ্রথ জীবিত থাকিতে দিবাকর অস্তগত হন, তাহা হইলে আমি এই স্থানেই প্রজ্বলিত হুতাশনে প্রবিষ্ট হইব। অসুর, সুর, মনুষ্য, পক্ষী, সর্প, পিতৃলোক, রাক্ষস, ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি এবং স্থাবর-জঙ্গমাত্মক অন্যান্য প্রাণিগণ কেহই আমার শত্রুকে রক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন না। অভিমন্যুর শত্রু যদি পৃথিবী, আকাশ, দেবপুর, দৈত্যপুর বা রসাতলে প্রবিষ্ট হয়, তথাপি আমি শরশত দ্বারা তাহার মস্তক ছেদন করিব।

মহাবীর ধনঞ্জয় এই কথা বলিয়া বামে ও দক্ষিণে গাণ্ডীব শরাসন নিক্ষেপ করিলেন। শরাসনের শব্দ ধনঞ্জয়ের শব্দ অতিক্রম করিয়া নভোমণ্ডল স্পর্শ করিল। মহাবীর অর্জুন এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিলে বাসুদেব পাঞ্চজন্য শঙ্খের ধ্বনি করিতে আরম্ভ করিলেন। অর্জুনও দেবদত্ত শঙ্খ বাদিত করিতে লাগিলেন। পাঞ্চজন্য শঙ্খ কেশবের মুখবায়ুতে পরিপূর্ণ হইলে তাহার ছিদ্র হইতে নির্ঘোষ নিঃসৃত হইয়া জগতীতল, পাতাল, আকাশ ও দিপালগণকে বিকম্পিত করিল। তখন পাণ্ডব-গণের সহস্র সহস্র বাদ্যধ্বনি ও সিংহনাদ প্রাদুর্ভূত হইতে লাগিল।

জয়দ্রথকে আশ্বাস দান।

চরগণ জয়লোলুপ পাণ্ডবগণের সেই মহাশব্দ শ্রবণ করিয়া সংবাদ প্রদান করিলে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ উত্থানপূর্ব্বক নিতান্ত দুঃখিত, বিমুগ্ধচিত্ত ও শোকসাগরে নিমগ্নপ্রায় হইয়। অনেক বিবেচনা করত ভূপালগণের সভায় গমন করিলেন এবং অর্জুনের ভয়ে নিতান্ত ভীত ও লজ্জিত হইয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, হে ভূপালগণ! পাণ্ডুর ক্ষেত্রে কামপরবশ ইন্দ্রের ঔরসে সমুৎপন্ন দুর্বুদ্ধি ধনঞ্জয় আমাকে শমনভবনে প্রেরণ করিবার সঙ্কল্প করিতেছে; অতএব আপনাদিগের মঙ্গল হউক, আমি প্রাণরক্ষার নিমিত্ত স্বস্থানে প্রস্থান করি, অথবা আপনারা সকল বীর অস্ত্রবলে আমাকে রক্ষা করুন। পার্থ আমাকে নিধন করিবার বাসনা করিয়াছে, আপনারা আমাকে অভয় প্রদান করুন। দ্রোণ, দুর্য্যোধন, কূপ, কর্ণ, শল্য, বাহ্লিক ও দুঃশাসন প্রভৃতি বীরগণ যম নিপীড়িত ব্যক্তিকেও পরিত্রাণ করিতে সমর্থ; অতএব অর্জুন একাকী আমাকে সংহার করিতে ইচ্ছা করিয়া কৃতকার্য্য হইতে পারে যথার্থ বটে; কিন্তু আমার বোধ হইতেছে, আপনারা সমস্ত ভূপাল একত্র হইয়াও আমাকে পরিত্রাণ করিতে পারিবেন না। আমি পাণ্ডবগণের হর্ষধ্বনি শ্রবণ করিয়া নিতান্ত ভীত হইয়াছি; মুমুর্মুর ন্যায় আমার গাত্র অবসন্ন হইতেছে। নিশ্চয়ই গাণ্ডীবধন্বা আমাকে বধ করিতে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন; সেই নিমিত্ত পাণ্ডবগণ শোককালেও হৃষ্ট হইয়া চীৎকার করিতেছে। ভূপালগণের কথা দূরে থাকুক, দেব, গন্ধর্ব্ব, অসুর, ভুজঙ্গ ও রাক্ষসগণও অর্জুনের প্রতিজ্ঞা অন্যথা করিতে সমর্থ নন। অতএব হে ভূপতিগণ। আপনাদিগের মঙ্গল হউক, আপনারা অনুজ্ঞা করুন, অমি পলায়নপূর্ব্বক লুক্কায়িত হইয়া থাকি, তাহা হইলে পাণ্ডবগণ আমার দর্শন প্রাপ্ত হইবে না।

জয়দ্রথ ভয়ব্যাকুলিত চিত্তে এইরূপ বিলাপ করিতে আরম্ভ করিলে আত্মকার্য্য-সাধন-তৎপর রাজা দুর্য্যোধন তাঁহাকে কহিলেন, সিন্ধুরাজ! ভীত হইও না; তুমি ক্ষত্রিয় বীরগণের মধ্যে অবস্থান করিলে কে তোমার সহিত যুদ্ধ করিতে সাহস করিবে? আমি, কর্ণ, চিত্রসেন, বিবিংশতি, ভূরিশ্রবাঃ, শল, দুর্দ্ধর্ষ বৃষসেন, পুরুমিত্র, জয়, ভোেজ, কামোজরাজ সুদক্ষিণ, সত্যব্রত মহাবাহু বিকর্ণ, দুর্মুখ, দুঃশাসন, সুবাহু, উদ্যতায়ুধ কলিঙ্গ, অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ, দ্রোণ, অশ্বত্থামা, শকুনি ও অন্যান্য অসংখ্য ভূপাল, আমরা সকলে সসৈন্যে তোমার চতুর্দিকে গমন করিব। তুমি দুর্ভাবনা পরিত্যাগ কর। তুমি স্বয়ং রথিশ্রেষ্ঠ এবং শৌর্য্যশালী; তবে পাণ্ডবগণকে ভয় করিতেছ কেন? আমার একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা তোমাকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত যত্নসহকারে যুদ্ধ করিবে। অতএব তুমি ভীত হইও না; তোমার ভয় দূরীভূত হউক।

হে রাজন। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ আপনার পুত্র দুর্য্যোধনকর্তৃক এই প্রকার আশ্বাসিত হইয়া সেই রাত্রিতে তাঁহার সহিত দ্রোণাচার্য্যের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন এবং তাঁহাকে অভিবাদন-পূর্ব্বক উপবিষ্ট হইয়া বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, আচার্য্য। দূরস্থ লক্ষ্যে শরনিপাতন, লঘুত্ব ও দৃঢ়বেধনে অর্জুনের সহিত আমার প্রভেদ কি বলুন। আমি আপনার নিকট অর্জুন ও আমার যুদ্ধ-বিদ্যার তারতম্য অবগত হইতে ইচ্ছা করি। আপনি অনুগ্রহ করিয়া অর্জুনের ও আমার যথার্থ বিদ্যা ব্যাখ্যা করুন।

দ্রোণ কহিলেন, বৎস! তোমার ও অর্জুনের গুরূপদেশ সমান; কিন্তু অর্জুন যোগ ও দুঃখাবস্থাননিবন্ধন তোমা অপেক্ষা উৎকর্ষ লাভ করিয়াছে। যাহা হউক, তোমাকে অর্জুনের নিমিত্ত ভীত হইতে হইবে না; আমি তোমাকে ভয় হইতে রক্ষা করিব, সন্দেহ নাই। মদ্ভুজরক্ষিত ব্যক্তির প্রতি অমরগণও প্রভাব প্রকাশ করিতে পারেন না। আমি এমন ব্যূহ ব্যূহিত করিব যে, পার্থ তাহা কদাচ উত্তীর্ণ হইতে পারিবে না। অতএব যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও, ভীত হইও না; স্বধৰ্ম্ম প্রতিপালনপূর্ব্বক পিতৃ-পৈতামহের পথে অনুগমন কর। তুমি যথাবিধি বেদাধ্যয়ন, হোম ও যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছ, অতএব মৃত্যু তোমার পক্ষে ভয়ঙ্কর নয়। যদি তুমি অর্জুনের সহিত সংগ্রামে নিহত হও, তাহা হইলে মূঢ় মনুষ্যগণের দুর্লভ মহাভাগ্য লাভ করিয়া স্বীয় ভুজবীৰ্য্যার্জিত যৎপরোনাস্তি উৎকৃষ্ট দিব্য লোকসকল লাভকরিবে। কৌরব, পাণ্ডব ও বৃষ্ণি এবং আমি, অশ্বত্থামা ও অন্যান্য মনুষ্যগণ সকলেই অচিরস্থায়ী। আমরা সকলেই বলবান্ কালকর্তৃক পর্যায়ক্রমে নিহত হইয়া স্ব স্ব কৰ্ম্ম লইয়া পরলোকে গমন করিব। হে সিন্ধুরাজ! তপস্বিগণ তপস্যা করিয়া যে সকল লোক প্রাপ্ত হন, ক্ষত্রিয় বীরগণ ক্ষত্রিয় ধর্ম্মের অনুগত হইয়া সেই সমস্ত লোক লাভ করেন।

সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ মহাবীর দ্রোণাচার্য্যকর্তৃক এইরূপ আশ্বাসিত হইয়া অর্জুনের ভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক যুদ্ধ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। তখন সমুদায় কৌরবসৈন্য হৃষ্টচিত্ত হইয়া সিংহনাদ ও বাদিত্র বাদন করিতে আরম্ভ করিল।

অর্জুনকর্তৃক জয়দ্রথবধের প্রতিজ্ঞা ও কৃষ্ণের মন্ত্রণা।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এ দিকে মহাত্মা বাসুদেব ধনঞ্জয়ের জয়দ্রথবধের প্রতিজ্ঞা শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে ধনঞ্জয়। তুমি আমার সহিত মন্ত্রণা না করিয়া ভ্রাতৃগণের সম্মতিক্রমে জয়দ্রথকে বধ করিব, বলিয়া যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছ, ইহা অত্যন্ত সাহসের কর্ম হইয়াছে। এই যে বিষম ভার উপস্থিত হইয়াছে, ইহাতে কি প্রকারে আমরা সকল লোকের উপহাস হইতে পরিত্রাণ পাইব? আমি দুর্য্যোধনের শিবিরে চরগণকে প্রেরণ করিয়াছিলাম; এই তাহারা ত্বরায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া এই বার্তা নিবেদন করিতেছে যে, তুমি জয়দ্রথবধে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইলে অস্মৎপক্ষীয় বাদিত্রনাদসহকৃত সুমহান্ সিংহনাদ কৌরবগণের শ্রবণগোচর হইয়াছিল। সবান্ধব ধার্তরাষ্ট্রগণ সেই শব্দে নিতান্ত ভীত হইলেন এবং এই সিংহনাদ অকারণ নয়, মহাবীর ধনঞ্জয় অভিমন্যুবধ শ্রবণে কাতর হইয়া রোষবশতঃ রাত্রিতেই যুদ্ধ করিতে বহির্গত হইবেন, সন্দেহ নাই, বিবেচনা করিয়া যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। কৌরবগণের হস্তী, অশ্ব, পদাতি ও রথসমূহের ভীষণধ্বনি প্রাদুর্ভূত হইল। হে রাজীবলোচন! সত্যব্রত কৌরবগণ এইরূপে যত্নপূর্ব্বক যুদ্ধসজ্জা করিতেছে, এমন সময় তোমার জয়দ্রথবধের সত্য প্রতিজ্ঞা তাহাদের শ্রবণগোচর হইল। দুর্য্যোধনের অমাত্যগণ তোমার দারুণ প্রতিজ্ঞা শ্রবণে সকলেই ক্ষুদ্র মৃগের ন্যায় ভীত ও দুৰ্ম্মনায়মান হইতে লাগিল।

তখন সিন্ধু-সৌবীরাধিপতি জয়দ্রথ নিতান্ত দুঃখিত হইয়া অমাত্যগণের সহিত আপনার শিবিরে আগমনপূর্ব্বক সমুদায় করিয়া রাজসমাজে দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে কুরুনন্দন! ধনঞ্জয় আমাকে তাহার পুত্রহন্তা বলিয়া কালি আক্রমণ করিবে, সে সেনাগণের মধ্যে আমার প্রাণ সংহার করিতে প্রতিজ্ঞা করিয়াছে। দেব, গন্ধর্ব্ব, অসুর, সর্প বা রাক্ষসগণ সব্যসাচীর সেই প্রতিজ্ঞা অন্যথা করিতে সমর্থ নন। অতএব আপনারা সংগ্রামে আমাকে রক্ষা করুন; ধনঞ্জয় যেন আপনাদের মস্তকে পদার্পণ করিয়া লক্ষ্য গ্রহণ করিতে না পারে। যদি আপনারা সংগ্রামে আমাকে রক্ষা না করেন, তাহা হইলে অনুজ্ঞা করুন, আমি স্বস্থানে প্রস্থান করি।

কুরুরাজ দুর্য্যোধন জয়দ্রথের বাক্য শ্রবণে তাঁহাকে নিতান্ত ভীতজ্ঞান করিয়া অবাশিরাঃ' ও বিমনায়মান হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন। রাজা জয়দ্রথ দুর্য্যোধনকে কাতর দেখিয়া মৃদুস্বরে আপনার হিতকর বাক্য কহিতে লাগিলেন, হে রাজন! মহাযুদ্ধে অস্ত্রদ্বারা অর্জুনের অস্ত্রসকল প্রতিহত করিতে পারে, আমাদের মধ্যে এমন ধনুর্দ্ধর বীর দৃষ্টিগোচর হয় না। অর্জুন বাসুদেবের সাহায্যে গাণ্ডীব ধনুঃকম্পন করিলে সাক্ষাৎ পুরন্দর হইলেও তাহার সম্মুখে অবস্থান করিতে পারেন না; শুনিয়াছি, ধনঞ্জয় পূর্ব্বে হিমালয় পর্ব্বতে পাদচারে মহাবীর প্রভু মহেশ্বরের সহিত সংগ্রাম এবং দেবরাজের নির্দেশানুসারে এক রথে হিরণ্যপুরবাসী সহস্র দানবের প্রাণ সংহার করিয়াছে। আমার বোধ হয়, ধনঞ্জয় ধীমান্ বাসুদেবের সহিত মিলিত হইলে অমরগণের সহিত ভুবনত্রয়কে বিনষ্ট করিতে পারে। এই জন্য আমি ইচ্ছা করিতেছি যে, হয় আপনারা আমাকে পলায়নে অনুজ্ঞা করুন; না হয়, বীর্য্যশালী মহাত্মা দ্রোণ পুত্রের সহিত আমাকে রক্ষা করিতে প্রবৃত্ত হউন।

হে অর্জুন। রাজা দুর্য্যোধন জয়দ্রথের বাক্যানুসারে তাহার রক্ষার্থে আচার্য্যের নিকট অনেক প্রার্থনা করিয়াছেন। সদুপায়সকল বিহিত এবং অশ্ব ও রথসকল সজ্জিত হইয়াছে; কর্ণ, ভূরিশ্রবাঃ, অশ্বত্থামা, দুর্জয় বৃষসেন, কূপ, শল্য এই ছয় জন সমরে অগ্রসর হইবেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য এক দুর্ভেদ্য ব্যূহ রচনা করিবেন; উহার পূর্ব্বাদ্ধ শকট ও পশ্চার্দ্ধ পদ্মের ন্যায় হইবে। পদ্মের মধ্যস্থলে সূচী নামে গূঢ় ব্যূহ নির্মিত হইবে এবং জয়দ্রথ অসংখ্য বীরগণে রক্ষিত হইয়া সেই সূচী ব্যূহের পার্শ্বে অবস্থান করিবেন। হে পার্থ! উল্লিখিত ছয় রথী ধনুঃ, অস্ত্র, বল, বীর্য্য ও ঔরস প্রভাবে নিতান্ত অসহনীয়'। এই ছয় জনকে পরাজয় না করিলে জয়দ্রথকে প্রাপ্ত হওয়া যাইবে না। হে ধনঞ্জয়! ঐ ছয় জনের প্রত্যেকের বীরত্বের বিষয় চিন্তা কর; তাঁহারা মিলিত হইলে শীঘ্র তাঁহাদিগকে পরাজয় করা সাধ্যায়ত্ত নয়। অতএব আত্মহিত ও কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত মন্ত্রণাভিজ্ঞ সচিব ও সুহৃদ্গণের সহিত মন্ত্রণা করা আমাদের কর্তব্য।

জয়দ্রথ বধে অর্জুনের প্রতিজ্ঞা।

অর্জুন কহিলেন, হে মধুসূদন। তুমি দুর্য্যোধনের যে ছয় জন রথীকে অধিকতর বলবান্ বোধ করিতেছ, আমার বোধ হয়, তাহাদিগের বীরত্ব আমার বীরত্বের অর্দ্ধ ভাগেরও সমান নহে। তুমি দেখিবে, আমি জয়দ্রথবধার্থে সংগ্রামে গমন করিয়া অস্ত্রদ্বারা উল্লিখিত বীরগণের অস্ত্র ছিন্ন ভিন্ন ও সিন্ধুরাজের মস্তক ভূতলে নিপাতিত করিব; দ্রোণাচার্য্য তদ্মর্শনে স্বগণ সমভিব্যাহারে বিলাপ করিবেন। যদি সুররাজ ইন্দ্র, অশ্বিনী-কুমারদ্বয়, গরুড়, আকাশ, স্বর্গ, পৃথিবী এবং সমুদায় সাধ্য, রুদ্র, বসু, দেবতা, বিশ্বদেব, গন্ধর্ব্ব, পিতৃলোেক, সাগর, পর্ব্বত, দিক্, দিপতি, গ্রাম্য ও আরণ্য প্রাণী ও অন্যান্য স্থাবর জঙ্গমগণ সিন্ধুরাজের পরিত্রাতা হন, তথাপি কালি তুমি তাহাকে আমার শরনিকরে নিহত নিরীক্ষণ করিবে। আমি সত্যদ্বারা শপথ ও আয়ুধ স্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, অগ্রে তাহাকেই আক্রমণ করিব, দুরাত্মা দুর্য্যোধন দ্রোণাচার্য্যের উপরেই এই সংগ্রামের জয় পরাজয় নির্ভর করিয়াছে; অতএব আমি দ্রোণেরই সেনাগ্রভাগ ভেদ করিয়া সিন্ধুরাজের নিকট গমন করিব। কালি তুমি দেখিবে যে, মহাধনুর্দ্ধরগণ বজ্রবিদারিত পর্ব্বতশৃঙ্গসমূহের ন্যায় আমার সুতীক্ষ্ণ নারাচনিচয়ে বিদীর্য্যমাণ হইতেছে এবং মনুষ্য, মাতঙ্গ ও তুরঙ্গসমুদায় নিশিত' শরসম্পাতে বিদীর্ণ কলেবর ও নিপতিত হইয়া শোণিতধারা মোক্ষণ করিতেছে। গাণ্ডীবনিক্ষিপ্ত মনোমারুতগামী' শরনিকর সহস্র সহস্র নর, বারণ ও অশ্বের প্রাণ সংহার করিবে। আমি যম, কুবের, বরুণ, ইন্দ্র ও রুদ্র হইতে যে সকল ভীষণ অস্ত্র লাভ করিয়াছি, নরপতিগণ এই যুদ্ধে তৎসমুদায় নয়নগোচর করিবেন। কালি তুমি দেখিবে যে যাঁহারা সিন্ধুরাজকে রক্ষা করিতেছেন তাঁহাদিগের অস্ত্রসমুদায় আমার ব্রহ্ম-অস্ত্রে বিনাশিত এবং শরবেগচ্ছেদিত নরপতিগণের মস্তকসমূহে ধরামণ্ডল আচ্ছাদিত হইতেছে। আমি রাক্ষসগণকে পরিতৃপ্ত, শত্রুগণকে দ্রাবিত, সুহৃদ্গণকে আনন্দিত ও সিন্ধুরাজকে নিহত করিব। অশেষা-পরাধী অনাত্মীয়, পাপদেশ-সমুৎপন্ন সিন্ধুরাজ আমাকর্তৃক নিহত হইয়া আত্মীয়গণকে শোকাকুল করিবে। কালি পাপাচার পরায়ণ জয়দ্রথকে সমুদায় রাজার সহিত শরনিকরে বিদীর্ণ দেখিতে পাইবে। কালি প্রভাতে আমি এরূপ কার্য্য করিব যে, দুরাত্মা দুর্য্যোধন এই ভূমণ্ডলে আমার সদৃশ ধনুর্দ্ধর আর কেহই নাই, বলিয়া নিশ্চয় করিবে। গাণ্ডীব দিব্য ধনুঃ, আমি যোদ্ধা ও তুমি সারথি; তবে আমার অজেয় আর কি আছে? হে ভগবন্! তোমার প্রসাদে যুদ্ধে আমার কিছুই অপ্রাপ্ত নাই; তুমি আমার পরাক্রম নিতান্ত অসহ্য জানিয়াও কেন আমাকে তিরস্কার করিতেছ? চন্দ্রের শোভা ও সমুদ্রের জল যেমন স্থির, আমার প্রতিজ্ঞাও সেইরূপ অচল জানিবে। হে মধুসূদন। আমার এবং আমার অস্ত্র, দৃঢ় ধনুঃ ও বাহুবলের অবমাননা করিও না। আমি এরূপে সংগ্রামে গমন করিব যে, আমার অবশ্যই জয়লাভহইবে; আমি কখন পরাজিত হইব না। আমি যখন প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তখন তুমি মনে স্থির কর যে, জয়দ্রথ বিনাশ প্রাপ্ত হইয়াছে। ব্রাহ্মণে সত্য, সাধুতে নম্রতা, যজ্ঞে শ্রী ও নারায়ণে জয় প্রতিনিয়তই বিরাজমান থাকে।

ইন্দ্রনন্দন ধনঞ্জয় মহাত্মা হৃষীকেশকে এই কথা বলিয়া আদেশ করিলেন যে, হে কেশব! যাহাতে রজনী প্রভাত হইবামাত্র আমার রথ সুসজ্জিত হয়, সাতিশয় উদ্যমসহকারে তাহার চেষ্টা কর।

মহাত্মা হৃষীকেশকর্তৃক সুভদ্রাকে সান্ত্বনাদান।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! শোকদুঃখাকুল বাসুদেব ও ধনঞ্জয় সেই রাত্রিতে নিদ্রাসুখ অনুভব করিতে পরিলেন না। তাঁহারা কেবল ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গের ন্যায় দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণ নর ও নারায়ণকে জাতক্রোধ জানিয়া না জানি কি দুর্ঘটনা ঘটিবে এই চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া নিতান্ত ব্যথিত হইলেন। নিদারুণ, কক্ষ, অমঙ্গল-সূচক বায়ু প্রবাহিত হইতে লাগিল। দিবাকরে কবন্ধ ও অর্গল দৃষ্ট হইল; বিনা মেঘে বজ্রাঘাত, নির্ঘাত ও বিদ্যুৎপাত হইতে লাগিল; পৃথিবী, শৈল ও কাননের সহিত বিকম্পিত এবং সাগরসকল ক্ষুব্ধ হইল; নদীসকল প্রতিকূলস্রোতে প্রবাহিত হইতে লাগিল; রাক্ষসগণের প্রমোদ ও যমরাজ্যে সংবর্দ্ধনের নিমিত্ত রথী, অশ্ব, মনুষ্য ও মাতঙ্গের ওষ্ঠাধর, স্ফুরিত হইতে লাগিল এবং বাহনসকল মল-মূত্র পরিত্যাগ ও রোদন করিতে আরম্ভ করিল। হে মহারাজ! আপনার সৈন্যগণ এই সমস্ত লোমহর্ষণ নিদারুণ উৎপাত দর্শনে ও মহাবল সব্যসাচীর কঠোর প্রতিজ্ঞা শ্রবণে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া উঠিল।

এদিকে মহাবাহু ধনঞ্জয় বাসুদেবকে কহিলেন, হে কেশব। তুমি তোমার ভগিনী সুভদ্রাকে এবং আমার পুত্রবধূ ও তাঁহার বয়স্যাগণকে সান্ত্বনাবাক্যে আশ্বাসিত করিয়া তাঁহাদের শোকাপনোদন কর।

তখন নিতান্ত দুৰ্ম্মনায়মান বাসুদেব অর্জুনের গৃহে গমনপূর্ব্বক পুত্রশোকাকুলা ভগিনীকে আশ্বাস প্রদান করত কহিলেন, সুভদ্রে! কুমারের নিমিত্ত সুষার' সহিত আর শোক করিও না; কাল সকল প্রাণীকেই ধ্বংস করিয়া থাকে। সৎকুল-জাত ধৈর্য্যশালী ক্ষত্রিয়ের যেরূপে প্রাণ পরিত্যাগ করা উচিত, তোমার পুত্র সেইরূপেই প্রাণত্যাগ করিয়াছে; অতএব আর শোক করিবার আবশ্যক নাই। মহারথ ধীর, পিতৃতুল্য পরাক্রম-শালী অভিমন্যু ভাগ্যক্রমেই বীরগণের অভিলষিতা গতি প্রাপ্ত হইয়াছে। মহাবীর অভিমন্যু ভূরি ভূরি শত্রু সংহার করিয়া পুণ্যজনিত সর্ব্বকামপ্রদ অক্ষয় লোকে গমন করিয়াছে, সাধুগণ তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য, শাস্ত্র ও প্রজ্ঞাদ্বারা যেরূপ গতি অভিলাষ করেন, তোমার কুমারের সেইরূপ গতিই লাভ হইয়াছে। হে সুভদ্রে! তুমি বীরজননী, বীরপত্নী, বীরনন্দিনী ও বীরবান্ধবা; অতএব তনয়ের নিমিত্ত শোকাকুলা হওয়া তোমার উচিত নহে; তোমার পুত্র পরমা গতি লাভ করিয়াছে। হে বরারোহে! পাপাত্মা শিশুঘাতক সিন্ধুরাজও বন্ধু-বান্ধবগণের সহিত এই গর্ব্বের প্রতিফল প্রাপ্ত হইবে। ঐ পাপকারী রজনী প্রভাত হইলে অমরাবতীতে প্রবেশ করিলেও ধনঞ্জয়ের নিকট পরিত্রাণ পাইবে না। কালি অবশ্যই তোমার শ্রবণগোচর হইবে যে, সিন্ধুরাজের মস্তক সমন্ত পঞ্চকের বহিঃপ্রদেশে সমানীত হইয়াছে; অতএব শোক পরিত্যাগ কর, রোদন করিও না। শস্ত্রজীবিগণ যেরূপ গতিলাভ করিয়া থাকেন, শৌর্য্যশালী অভিমন্যু ক্ষত্রধৰ্ম্ম অনুসারে সেই গতি প্রাপ্ত হইয়াছে! বিশালবক্ষাঃ, মহাবাহু, সমরে অপরাজুখ, রথিগণের নিহন্তা, পিতৃ ও মাতৃপক্ষের অনুগত, বীর্য্যবান্, শৌর্য্যশালী, মহারথ অভিমন্যু সহস্র সহস্র শত্রুকে সংহার করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছে; অতএব তুমি শোক পরিত্যাগ কর। হে ভদ্রে! পার্থ যাহা প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তাহা অবশ্যই সফল হইবে; কদাচ অন্যথা হইবে না। তোমার স্বামীর চিকীর্ষিত' বিষয় কখনই নিষ্ফল হয় নাই। যদি সমুদায় মনুষ্য, সর্প, পিশাচ, রাক্ষস, পতঙ্গ, সুর ও অসুরগণও রণক্ষেত্রগত সিন্ধুরাজের সহিত মিলিত হন, তথাপি সিন্ধুরাজ তাঁহাদিগের সহিত বিনষ্ট হইবে।

অভিমন্যুর নিমিত্ত সুভদ্রার বিলাপ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! পুত্রশোকাধিকাতরা সুভদ্রা মহাত্মা কেশবের বাক্য শ্রবণ করিয়া বিলাপ করিতে লাগিলেন; হা বৎস! হতভাগিনীর পুত্র! তুমি পিতৃতুল্য পরাক্রান্ত হইয়া যুদ্ধে কি প্রকারে নিধনপ্রাপ্ত হইলে! আমি কি বলিয়া তোমার ইন্দীবরশ্যাম, সুদর্শন, চারুলোচন মুখমণ্ডল রণরেণু-সমাচ্ছন্ন অবলোকন করিব! হে সমরাপরাজুখ মহাবীর! আজি তুমি ও সমরাঙ্গনে নিপতিত হওয়াতে মনুষ্যগণ তোমাকে ভূতলে সমুদিত চন্দ্রের ন্যায় অবলোকন করিতেছে। হায়! পূর্ব্বে যাহার শয্যা মনোহর আস্তরণে সমাচ্ছন্ন থাকিত, সেই সুখলালিত অভিমন্যু বাণবিদ্ধ হইয়া কি প্রকারে ভূমিতলে শয়ান রহিয়াছে! হ যে মহাভুজ বীর পূর্ব্বে বরাঙ্গনাগণের সহবাসে কালযাপন করিত, আজি সেই যুদ্ধে নিপতিত হইয়া কি প্রকারে শিবাগণের সহবাসী হইয়া আছে! সূত, মাগধ ও বন্দিগণ হৃষ্ট হইয়া যাহাকে স্তব করিত, আজি রাক্ষসগণ তাহার নিকট ভীষণ রবে চীৎকার করিতেছে! হা বৎস! পাণ্ডব, বৃষ্ণি ও পাঞ্চালগণ তোমার সহায় থাকিতে কে তোমাকে অনাথের ন্যায় সংহার করিল? হে পুত্র! তোমাকে দর্শন করিয়া এই মন্দভাগিনীর নয়নযুগল পরিতৃপ্ত হয় নাই; অতএব আজি আমি তোমার চন্দ্রানন নিরীক্ষণ করিবার নিমিত্ত অবশ্যই শমন-ভবনে গমন করিব। বিশাললোচনশালী মনোহরকেশকলা পসম্পন্ন চারুবাক্যযুক্ত সুগন্ধ ও ব্রণশূন্য তোমার সেই মুখমণ্ডল আবার কবে আমার নয়নগোচর হইবে! ভীমসেন, ধনঞ্জয় ও অন্যান্য ধনুর্দ্ধরগণের বলে ধিক্, বৃষ্ণিবীর-গণের বীরত্বে ধিক্, পাঞ্চালগণের সামর্থ্যে ধিক্ এবং কৈকেয়, চোদ, মৎস্য ও পাঞ্চালগণকে ধিক্; তুমি সংগ্রামে গমন করিলে ইঁহারা তোমাকে রক্ষা করিতে সমর্থ হইলেন না। আমার শোকব্যাকুল লোচন অভিমন্যুর অদর্শনে সমুদায় পৃথিবী শূন্যের ন্যায় অবলোকন করিতেছে? হে বীর! তুমি বাসুদেবের ভাগিনেয়, গাণ্ডীবধন্বার পুত্র ও স্বয়ং অতিরথ; তুমি আজি সমরে নিপাতিত হইয়াছ, ইহা আমি কি প্রকারে অবলোকন করিব? হে বীর! তুমি স্বপ্নগত ধনের ন্যায় দৃষ্ট ও বিনষ্ট হইলে। হায়! এখন জানিলাম, মনুষ্যগণের সমুদায় দ্রব্যই জলবুদ্বুদের ন্যায় অনিত্য। হা বৎস! তোমার এই তরুণী ভার্য্যা মনোবেদনায় নিতান্ত কাতরা হইয়াছে, আমি কি প্রকারে ইহাকে সান্ত্বনা করিব! বৎস! আমি তোমার দর্শনে নিতান্ত উৎসুক, কিন্তু তুমি আমাকে ফলকালে' পরিত্যাগ করিয়া অকালে প্রস্থান করিলে। যখন তুমি কেশবনাথ হইয়াও সংগ্রামে অনাথের ন্যায় নিহত হইয়াছ, তখন কৃতান্তের গতি প্রজাগণেরও নিতান্ত দুর্জেয়, সন্দেহ নাই। হে বৎস! যাগশীল, দানশীল, ব্রাহ্মণ, কৃতাত্মা, ব্রহ্মচারী, পুণ্য-তীর্থাবগাহী, কৃতজ্ঞ, বদান্য, গুরুশুশ্রূষানিরত ও সহস্রদক্ষিণাপ্রদ ব্যক্তির যে গতি, তোমার সেই গতি লাভ হউক। অপরাজুখ বীরগণ যুদ্ধ করিতে করিতে অরাতিগণকে নিহত করিয়া পশ্চাৎ স্বয়ং নিহত হইলে যে গতি প্রাপ্ত হন, তুমি সেই গতি লাভকর। যাঁহারা সহস্র গোদান, যজ্ঞার্থে দান, উপকরণসম্পন্ন অভিমত গৃহ দান, শরণ্য' ব্রাহ্মণগণকে রত্ন দান এবং দণ্ডাইকে দণ্ড প্রদান করেন, তাঁহাদিগের যে পবিত্র গতি, তোমার সেই গতি লাভ হউক। সংসিতব্রত' মুনিগণ ব্রহ্মচর্য্যদ্বারা এবং পুরুষগণ একমাত্র পত্নী পরিগ্রহদ্বারা যে গতি প্রাপ্ত হন, তুমি সেই গতি লাভ কর। ভূপালগণ সদাচার, চারি বর্ণের মনুয্যগণ পুণ্য ও পুণ্যবানেরা পুণ্যের সুরক্ষণদ্বারা যে সনাতনী গতি লাভ করেন, তুমি সেই গতি প্রাপ্ত হও। যাঁহারা দীনগণের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করেন, যাঁহারা সতত সংবিভাগ করেন, যাঁহারা পিশুনতা হইতে নিবৃত্ত হইয়াছেন, যাঁহারা সতত ব্রতানুষ্ঠান ধর্মানুশীলন ও গুরুশুশ্রুষায় নিরত থাকেন, অতিথি-গণ যাঁহাদের নিকট বিমুখ হন না, যাঁহারা নিতান্ত ক্লিষ্ট, বিপন্ন ও পুত্রশোকানলে দগ্ধ হইয়াও আত্মার ধৈর্য্য রক্ষা করেন, যাঁহারা সর্ব্বদা মাতা-পিতার সেবায় নিরত থাকেন এবং আপনার পত্নীতে নিরত হন, যে মনীষিগণ পরদারপরাজুখ হইয়া ঋতু-কালে স্বীয় ভার্য্যা গমন করেন, যাঁহারা গতমৎসর হইয়া সর্ব্ব-ভূতের প্রতি সমদৃষ্টি হন, যাঁহারা অন্যের মর্মপীড়া প্রদানে বিরত থাকেন, যাঁহারা ক্ষমাশীল হন এবং যাঁহারা মধু, মাংস, মদ্য, দম্ভ, মিথ্যা ও পরপীড়ন পরিত্যাগ করেন, তুমি তাঁহাদিগের গতি লাভ কর। হ্রীমান্ সর্ব্বশাস্ত্রজ্ঞ জ্ঞানতৃপ্ত জিতেন্দ্রিয় সাধুগণের যে গতি, তোমারও সেই গতি হউক।

সুভদ্রা দীনা ও শোকাকুলা হইয়া এইরূপ বিলাপ করিতেছেন, এমন সময়ে দ্রুপদনন্দিনী উত্তরাকে সমভিব্যাহারে লইয়া তথায় আগমন করিলেন। তখন তাঁহারা সকলেই নিতান্ত দুঃখিতচিত্তে সাতিশয় রোদন ও বিলাপ করত উন্মত্তার ন্যায় সংজ্ঞাহীনা হইয়া ধরাতলে নিপতিতা হইলেন। বাসুদেব নিতান্ত দুঃখিত হইয়া অচেতনপ্রায় রোদনশীলা, মর্ম্মবিদ্ধা, কম্পিত-কলেবরা ভগিনীর গাত্রে জলসেচন ও তাঁহাকে সমুচিত হিতবাক্যে আশ্বাস প্রদান করিয়া কহিলেন, সুভদ্রে! পুত্রের নিমিত্ত আর শোক করিও না; পাঞ্চালি! উত্তরাকে আশ্বাস প্রদান কর; ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠ অভিমন্যু ক্ষত্রিয়গণের উপযুক্ত গতি লাভকরিয়াছে। হে বরাননে! আমার এই মানস যে, যশস্বী অভিমন্যু যে গতি লাভ করিয়াছেন, আমাদিগের কুলজাত পুরুষগণ সকলেই সেই গতি প্রাপ্ত হউন। তোমার মহারথ পুত্র একাকী যেরূপ কৰ্ম্ম করিয়াছে, আমরা ও আমাদের সুহৃদ্গণ সকলে একত্র হইয়া সেইরূপ কৰ্ম্ম সম্পাদন করিতেছি।

মহাবাহু বাসুদেব ভগিনী, দ্রৌপদী ও উত্তরাকে এইরূপ আশ্বাসিত করিয়া পার্থের নিকট গমনপূর্ব্বক ভূপালগণ, বন্ধুগণ ও অর্জুনকে অনুজ্ঞা করিয়া অন্তঃপুরে প্রবিষ্ট হইলেন। তাঁহারাও স্ব স্ব আলয়ে গমন করিলেন।

অর্জুনের প্রতিজ্ঞা পালনার্থে শ্রীকৃষ্ণের মন্ত্রণা।

সঞ্জয় কহিলেন, তখন বাসুদেব ধনঞ্জয়ের অপ্রতিম ভবনে প্রবিষ্ট হইয়া উদক স্পর্শপূর্ব্বক সুলক্ষণসম্পন্ন স্থণ্ডিলে' বৈদূর্য্যসন্নিভ কুশসমূহে প্রস্তুত মঙ্গল শয্যা বিস্তৃত করিয়া সমুচিত বিধানানুসারে মঙ্গল মাল্য, লাজ ও গন্ধ দ্বারা অলঙ্কৃত এবং উত্তম উত্তম আয়ুধে পরিবৃত করিলেন। অনন্তর পরিচারকগণ বিনীতভাবে রাত্রিকর্তব্য ও ত্রৈয়ম্বক' বলি সম্পাদন করিল। তখন ধনঞ্জয় উদকস্পর্শ করিয়া প্রীতচিত্তে গন্ধ ও মাল্য দ্বারা বাসুদেবকে অলঙ্কৃত করিয়া রাত্রির সমুচিত উপহার প্রদান করিলেন। বাসুদেব ঈষৎ হাস্য করত অর্জুনকে কহিলেন, অর্জুন! তোমার কল্যাণ হউক। তুমি শয়ন কর, আমি চলিলাম।

অর্জুনের প্রিয়ঙ্কর ভগবান্ বিষ্ণু তাঁহাকে এই কথা বলিয়া দ্বারদেশে গৃহীতাস্ত্র রক্ষকগণকে নিযুক্ত করিয়া দারুক-সমভি-ব্যাহারে স্বীয় শিবিরে প্রবিষ্ট হইলেন এবং ভূরি ভূরি কর্তব্য চিন্তা করত শুভ্র শয্যায় শয়ন করিয়া পার্থের হিতের নিমিত্ত যোগাবলম্বনপূর্ব্বক তেজোদ্যূতিবিবর্দ্ধন শোকদুঃখাপহ উপায় বিধান করিতে লাগিলেন।

হে মহারাজ! সেই রাত্রিতে পাণ্ডবগণের শিবিরে কেহই নিদ্রিত হন নাই; সকলেই জাগরিত থাকিয়া এই চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, মহাত্মা গাণ্ডীবধন্বা পুত্রশোকে সন্তাপিত হইয়া সহসা সিন্ধুরাজকে বধ করিবার যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন; তাহা কি প্রকারে সফল করিবেন? তিনি অতি দুষ্কর বিষয়ে অধ্যবসায় করিয়াছেন। রাজা জয়দ্রথ সামান্য বীর নন। বিশেষতঃ দুর্য্যোধন তাঁহাকে অসংখ্য সৈন্য ও মহাবলপরাক্রান্ত স্বীয় ভ্রাতৃগণকে প্রদান করিয়াছেন। যাহা হউক, এক্ষণে মহাত্মা অর্জুন পুত্রশোকাধিকাতর হইয়া যে দুস্তর প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, সিন্ধুরাজ ও অন্যান্য অরাতিগণকে সংহারপূর্ব্বক তাহা হইতে উত্তীর্ণ হইয়া পুনরাগমন করুন। তিনি যদি কালি জয়দ্রথকে সংহার করিতে না পারেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই হুতাশনে প্রবিষ্ট হইবেন; কদাচ আপনার প্রতিজ্ঞা মিথ্যা করিতে পারিবেন না। মহারাজ যুধিষ্ঠির জয়ের নিমিত্ত অর্জুনের উপর নির্ভর করিয়া আছেন; যদি ধনঞ্জয় প্রাণ পরিত্যাগ করেন, তাহা হইলে তাঁহার কি অবস্থা হইবে! যদি আমরা কোন সৎকর্মের অনুষ্ঠান বা অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিয়া থাকি, তাহা হইলে সেই সকলের ফলে সব্যসাচী অরাতিগণকে পরাজয় করুন। পাণ্ডবপক্ষীয়-গণ এই রূপ জয়বিষয়ক কথোপকথনে অতি কষ্টে রজনী অতিবাহিত করিল।

এ দিকে মহাত্মা বাসুদেব এই রজনীমধ্যেই জাগরিত হইয়া পার্থের প্রতিজ্ঞা স্মরণপূর্ব্বক দারুককে কহিলেন, দারুক! অর্জুন পুত্রবিয়োগে কাতর হইয়া কালি জয়দ্রথকে সংহার করিব বলিয়া, প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন। দুর্য্যোধন পার্থের প্রতিজ্ঞা শ্রবণে যাহাতে জয়দ্রথ নিহত না হয়, মন্ত্রিগণের সহিত তদ্বিষয়িণী মন্ত্রণা করিবে। দুর্য্যোধনের সেই অনেক অক্ষৌহিণী সেনা ও সর্ব্বাস্ত্রবেত্তা সপুত্র দ্রোণাচার্য্য জয়দ্রথের রক্ষায় নিযুক্ত হইবেন; দ্রোণাচার্য্য যাহাকে রক্ষা করেন, দৈত্য ও দানবগণের দর্পহারী অদ্বিতীয় বীর ইন্দ্রও তাহাকে বিনাশ করিতে সমর্থ নন; কিন্তু ধনঞ্জয় যাহাতে সূর্যাস্তের পূর্ব্বে জয়দ্রথকে সংহার করিতে পারেন, আমি অবশ্যই কালি তাহার উপায় করিব। কি দারা, কি মিত্র, কি জ্ঞাতি, কি বান্ধবগণ, অর্জুন অপেক্ষা কেহই আমার প্রিয়তর নয়। আমি মুহূৰ্ত্তমাত্রও অর্জুনশূন্য পৃথিবী অবলোকন করিতে সমর্থ হইব না; ফলতঃ ধনঞ্জয় অবশ্যই কালি সংগ্রামে জয়লাভ করিবেন। আমি স্বয়ং অর্জুনের হিতার্থে অসংখ্য নাগাশ্ব সমবেত বীরগণকে, কর্ণ ও দুর্য্যোধনের সহিত পরাজয় ও সংহার করিব। ত্রিলোকের লোক কালি মহাযুদ্ধে আমার বলবিক্রম নিরীক্ষণ করুক। কালি সহস্র সহস্র ভূপাল, শত শত রাজপুত্র এবং অসংখ্য অশ্ব, হস্তী ও রথ সংগ্রাম হইতে পলায়ন করিবে। আমি তোমার সমক্ষে পাণ্ডবগণের হিতার্থে ক্রুদ্ধ হইয়া সেই সমস্ত কৌরবসৈন্যকে চক্রদ্বারা প্রমথিত ও নিপাতিত করিব। কালি দেব, গন্ধর্ব্ব, পিশাচ, উরগ ও রাক্ষসগণ প্রভৃতি সকলেই অবগত হইবেন যে, আমি সব্যসাচীর কিরূপ সুহৃৎ। যে ব্যক্তি অর্জুনের দ্বেষ করে, সে আমার দ্বেষ্টা এবং যে ব্যক্তি অর্জুনের বশীভূত হয়, সে আমারও বশীভূত। ফলতঃ তুমি অর্জুনকে আমার শরীরাদ্ধ বলিয়া স্থির করিয়া রাখ।

হে দারুক! এই রাত্রি প্রভাত হইলে তোমাকে পূর্ব্বের ন্যায় আমার উৎকৃষ্ট রথ সুসজ্জিত করিয়া আমাকে সমভি-ব্যাহারে লইয়া গমন করিতে হইবে। তুমি রথমধ্যে ছত্র, দিব্য কৌমোদকী গদা, শক্তি, চক্র, ধনুঃ, শর প্রভৃতি সর্ব্বপ্রকার উপকরণ সংস্থাপিত এবং রথোপস্থে রথশোভী, বীর্য্যশালী গরুড়ের ধ্বজস্থান পরিকল্পিত করিয়া সূর্যাগ্নিসদৃশ প্রভাসম্পন্ন বিশ্বকর্মাবিরচিত দিব্য কাঞ্চনজালে বিভূষিত বলাহক, মেঘপুষ্প, শৈব্য ও সুগ্রীব এই চারি অশ্ব রথে সংযোজনপূর্ব্বক স্বয়ং কবচধারী' হইয়া অবস্থান করিও। ঋষভ-রাগ-পরিপূরিত পাঞ্চজন্য শঙ্খের ভৈরবরব শ্রবণমাত্র সত্বরে আমার নিকট আগমন করিবে। আমি এক দিনেই পিতৃম্বস্রেয়ের ক্রোধ ও দুঃখ সমুদায় দূরীকৃত করিব। ধনঞ্জয় যাহাতে ধার্তরাষ্ট্রগণের সমক্ষে জয়দ্রথকে বধ করিতে পারেন, আমি সর্ব্ব প্রকার উপায় অবলম্বনপূর্ব্বক তদ্বিষয়ে যত্নবান্ হইব। হে সারথে! আমি কহিতেছি, ধনঞ্জয় যে যে ব্যক্তিকে সংহার করিতে যত্ন করিবেন, সেই সেই ব্যক্তিকেই মৃত্যুমুখে নিপতিত হইতে হইবে।

দারুক কহিলেন, হে পুরুষোত্তম! আপনি যাঁহার সারথ্য গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহার অবশ্যই জয় লাভ হইবে, কখনই পরাজয়ের সম্ভাবনা নাই। এক্ষণে আপনি যে প্রকার আজ্ঞা করিতেছেন আমি তাহাই করিব। আজি অর্জুনের জয়লাভের নিমিত্তই বিভাবরী সুপ্রভাত হইল।

মহাদেবের নিকট স্বপ্নযোগে অর্জুনসহ শ্রীকৃষ্ণের গমন।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! এদিকে অচিন্ত্যবিক্রম ধনঞ্জয় আত্মকৃত প্রতিজ্ঞা প্রতিপালনের চিন্তা ও ব্যাসদত্ত মন্ত্র স্মরণ করত নিদ্রাগত হইলে মহাতেজাঃ বাসুদেব স্বপ্নে তাঁহার নিকট আগমন করিলেন। ধর্মাত্মা ধনঞ্জয় কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও প্রেম-বশতঃ কোন কালে কোন অবস্থাতেই তাঁহাকে দেখিয়া প্রত্যুত্থান করিতে ক্ষান্ত হইতেন না; সুতরাং এক্ষণেও প্রত্যুত্থান করিয়া বাসুদেবকে আসন প্রদান করিলেন; কিন্তু স্বয়ং তৎকালে উপবেশনের অভিলাষ করিলেন না।

মহাতেজাঃ বাসুদেব ধনঞ্জয়ের অভিপ্রায় অবগত ছিলেন, এক্ষণে উপবেশন করিয়া তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, পার্থ! কাল অতি দুর্জয়, কাল সকল ভূতকেই অবশ্যম্ভাবি বিষয়ে নিয়োজিত করে, অতএব তুমি বিষণ্ণ হইও না। হে পুরুষোত্তম! তুমি কি নিমিত্ত বিষাদসাগরে নিমগ্ন হইয়াছ? হে পণ্ডিতবর! তোমার শোক করা উচিত নয়; শোকে কার্য্য নাশ হয়, অতএব শোক পরিত্যাগ করিয়া কর্তব্য কর্ম্মের অনুষ্ঠান কর। শোক চেষ্টাহীন ব্যক্তির শত্রু। শোককারী ব্যক্তি শত্রুগণকে আনন্দিত ও মিত্রগণকে ক্ষীণ করে এবং স্বয়ং বিনাশ প্রাপ্ত হয়; অতএব শোক পরিত্যাগ করা তোমার অবশ্যকর্তব্য।

অপরাজিত অর্জুন কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে কেশব! আমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, আমার পুত্রহন্তা দুরাত্মা জয়দ্রথকে কালি সংহার করিব; কিন্তু মহারথ ধার্তরাষ্ট্রগণ সকলেই সেই প্রতিজ্ঞাবিঘাতার্থ সিন্ধুরাজকে পৃষ্ঠভাগে সংস্থাপিত করিয়া রক্ষা করিবেন, সন্দেহ নাই। দুরাত্মা জয়দ্রথ একাদশ অক্ষৌহিণীর হতাবশিষ্ট অতি দুর্জয় সৈন্য ও মহারথগণে পরিবৃত হইলে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎকার অতি দুঃসাধ্য হইবে। বিশেষতঃ এক্ষণে দক্ষিণায়ন, দিবাকর অতি শীঘ্র অস্তে গমন করেন, অতএব বোধ হয়, আমি প্রতিজ্ঞা হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারিব না। প্রতিজ্ঞা বিফল হইলে মাদৃশ ব্যক্তি কি প্রকারে জীবিত থাকিতে পারে? এক্ষণে আমার দুঃখপ্রতিকারের আকাঙ্ক্ষা পরিবর্তিত হইতেছে।

বাসুদেব ধনঞ্জয়ের শোকহেতু শ্রবণ করিয়া তাঁহার মঙ্গল নিমিত্ত জয়দ্রথের বধসাধনার্থ জলস্পর্শ করিয়া পূর্ব্বাভিমুখে অবস্থানপূর্ব্বক কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! দেবাদিদেব মহাদেব যাহা দ্বারা সমুদায় দৈত্যগণকে সংহার করিয়াছিলেন, যদি সেই সনাতন পাশুপত অস্ত্র তোমার স্মৃতিপথারূঢ় থাকে, তাহা হইলে কালি নিশ্চয় তাহা দ্বারা জয়দ্রথকে বধ করিতে পারিবে। আর যদি উহা বিস্মৃত হইয়া থাক, তবে মনে মনে সাবধানে মহাদেবের স্মরণ ও ধ্যান কর। তুমি তাঁহার ভক্ত, অবশ্যই তাঁহার প্রসাদে সেই মহৎ অস্ত্র প্রাপ্ত হইবে।

স্বপ্নযোগে অর্জুনকর্তৃক মহাদেবের ধ্যান।

মহাত্মা অর্জুন কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণানন্তর জলস্পর্শ করিয়া একাগ্র চিত্তে ভূমিতলে উপবেশনপূর্ব্বক মহাদেবকে স্মরণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর শুভ লক্ষণ ব্রাহ্ম মুহূর্ত্ত সন্নিহিত হইলে ধনঞ্জয় দেখিলেন যে, আপনি কেশবের সহিত গগনমণ্ডলে উপস্থিত হইয়াছেন। তথায় কেশব তাঁহার দক্ষিণ হস্ত ধারণ করিলে তিনি জ্যোতিষ্কমণ্ডলে সমাকীর্ণ, সিদ্ধচারণ-সেবিত, হিমালয়ের পবিত্র পাদদেশে ও মণিমান্ পৰ্ব্বতে বায়ুবেগে উপস্থিত হইলেন। তথা হইতে উত্তরদিকে শ্বেত পর্ব্বত; কুবেরের বিহার প্রদেশস্থিত প্রফুল্ল সরসিজসম্পন্ন সরোবর এবং পুষ্পফলসঙ্কীর্ণ দ্রুমরাজিবিরাজিত, সিংহ ব্যাঘ্র প্রভৃতি নানাবিধ মৃগগণে পরিপূর্ণ, পবিত্র আশ্রমসম্পন্ন মনোহর বিহগসমূহে উপশোভিত, স্ফটিকসদৃশ অগাধ জলপূর্ণ নদীশ্রেষ্ঠ গঙ্গা ও কিন্নর-গীত-ধ্বনিত হেম-রৌপ্যময় শৃঙ্গে সুশোভিত কুসুমিত মন্দার বৃক্ষে সুবাসিত নানাবিধ ওষধিতে সন্দীপিত মন্দর পর্ব্বতের প্রদেশ প্রভৃতি অদ্ভুতদর্শন পদার্থসকল অবলোকন করত সুচিক্কণ অঞ্জনরাশিসন্নিভ কাল পর্ব্বতে গমন করিলেন। তথায় ভ্রমণ করিতে করিতে ব্রহ্মতুঙ্গ, বহুসংখ্যক নদী, জনপদ, সুশৃঙ্গ, শতশৃঙ্গ, শর্যাতিবন, পবিত্র অশ্বশিরঃ স্থান, আথর্ব্বণের স্থান, বৃষদংশ পর্ব্বত, অপ্সরাঃ ও কিন্নরগণে সমাকীর্ণ মহামন্দর শৈল এবং মনোহর প্রস্রবণ, সুবর্ণ ও নগরসমূহে শোভিত, চন্দ্ররশ্মির ন্যায় প্রভাসম্পন্ন, পৃথিবী ও বহুরত্বের আকর, অদ্ভুতাকার সমুদ্রসকল তাঁহার দৃষ্টিগোচর হইল। এইরূপে মহাবাহু ধনঞ্জয় কৃষ্ণের সহিত অন্তরীক্ষ, স্বর্গ, পৃথিবী ও আকাশে পর্যটন করত বিস্মিত হইয়া গমন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র ও অগ্নির ন্যায় দীপ্তিমান্ এক পৰ্ব্বত তাঁহার নয়নগোচর হইল। তখন তিনি সেই পর্ব্বতের শিখরদেশে গমনপূর্ব্বক দেখিলেন, মহাত্মা বৃষধ্বজ তথায় তপশ্চর্যায় ব্যাপৃত হইয়া অবস্থান করিতেছেন। তাঁহার এরূপ তেজঃ যে, বোধ হয় সহস্র সূর্য্য একত্র দেদীপ্যমান হইতেছে। তাঁহার হস্তে শূল, মস্তকে জটা, পরিধানে বল্কল ও অজিন এবং শরীর শ্বেতবর্ণ ও সহস্রলোচনে সুশোভিত; তাঁহার সঙ্গে পার্ব্বতী ও ভাস্বর ভূতগণ অবস্থান করিতেছেন। তিনি কখন গীত, কখন বাদ্য, কখন শব্দ, কখন হাস্য, কখন নৃত্য, কখন হস্ত-পদাদির আস্ফালন, কখন আস্ফোটন, কখন বা চীৎকার করিতেছেন। তাঁহার গাত্র পবিত্র গন্ধে সুবাসিত হইয়াছে এবং দিব্য ঋষি ও ব্রহ্মবাদিগণ তাঁহার স্তব করিতেছেন।

মহাদেবের সহিত কৃষ্ণ ও অর্জুনের সাক্ষাৎকার ও কৃষ্ণের মহাদেব স্তুতি।

ধর্মাত্মা বাসুদেব সেই শরাসনধারী ভূতনাথ ভবানী-পতিকে অবলোকন করিয়া সনাতন ব্রহ্মনাম উচ্চারণপূর্ব্বক পার্থের সহিত ক্ষিতিতলে মস্তকাবনমন করিলেন। যে মহাত্মা সকল লোকের আদি, অজন্মা', ঈশান, অব্যয়, মনের পরম কারণ আকাশ ও বায়ু স্বরূপ, সমস্ত জ্যোতির আধার, পরপ্রকৃতি, দেব, দানব, যক্ষ ও মানবগণের সাধনীয়, যোগের আধার, পরব্রহ্ম, ব্রহ্মজ্ঞদিগের আশ্রয়, চরাচরের স্রষ্টা ও প্রতিহত্তা এবং বীরত্ব ও প্রচণ্ডতার উদয় স্থান; সূক্ষ্ম অধ্যাত্ম পদলাভার্থী জ্ঞানিগণ যাঁহাকে প্রাপ্ত হন এবং সংহারকালে যাঁহার কোপের উদয় হয়; বাসুদেব বাক্য, মনঃ, বুদ্ধি ও কর্মদ্বারা তাঁহাকে বন্দনা করিলেন। অর্জুনও তাঁহাকে সকল ভূতের আদি এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানের কারণ জানিয়া ভূয়োভূয়ঃ অভিবাদন করিতে লাগিলেন। এইরূপে উভয়ে সেই কারণস্বরূপ, আত্মা-স্বরূপ মহাদেবের শরণাপন্ন হইলেন।

তখন দেবাদিদেব মহাদেব নর ও নারায়ণকে সমাগত দেখিয়া প্রসন্নমনে সহাস্য বদনে স্বাগত প্রশ্ন করিয়া কহিলেন, হে নরোত্তম বীরদ্বয়! তোমরা গাত্রোত্থান কর; তোমাদের ক্লেশ দূর হউক। তোমাদের মনের অভিলাষ শীঘ্র ব্যক্ত কর, যে কার্য্যের অনুরোধে আগমন করিয়াছ, আমি তাহা সম্পাদন করিব। তোমরা আপনাদের কল্যাণ প্রার্থনা কর; আমি তাহা প্রদান করিতেছি।

মহামতি বাসুদেব ও অর্জুন মহাত্মা মহাদেবের বাক্য শ্রবণ করিয়া প্রত্যুত্থান ও অঞ্জলি বন্ধনপূর্ব্বক দিব্য বাক্যে তাঁহার স্তব আরম্ভ করিলেন-হে দেব! তুমি ভব, শর্ব্ব, রুদ্র, বরদ, পশুপতি, উগ্র, কপদী, মহাদেব, ভীম, এ্যম্বক, শান্ত, ঈশান ও মখঘ্ন', তুমি অন্ধকঘাতী, কার্তিকেয়ের পিতা, নীলগ্রীব ও বেধাঃ; তুমি পিণাকী, হবিষ্য, সত্য, বিভু, বিলোহিত, ধূম্র, ব্যাধ ও অপরাজিত; তুমি নিত্য নীল শিখণ্ডী, শূলধারী, দিব্যচক্ষুঃ, হর্তা, পাতা, ত্রিনেত্র ও বসুরেতাঃ; তুমি অচিন্ত্য, অম্বিকানাথ, সর্ব্বদেবস্তুত, বৃষধ্বজ, মুণ্ড, জটিল ও ব্রহ্মচারী; তুমি সলিল-মধ্যস্থ তপস্বী, ব্রহ্মণ্য, অজিত, বিশ্বাত্মা, বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বব্যাপী, তুমি ভূতগণের সেবনীয়, প্রভু ও বেদমুখ, তুমি সর্ব্ব, শঙ্কর ও শিব, তুমি বাক্যের পতি, প্রজাপতি, বিশ্বপতি ও মহতের পতি; তুমি সহস্রশিরাঃ, সহস্রভুজ, সহস্রনেত্র, সহস্রপাদ ও অসংখ্যেয়কৰ্ম্মা; তুমি সংহর্তা, হিরণ্যবর্ণ, হিরণ্যকবচ ও ভক্তানুকম্পী, তোমাকে নমস্কার! হে প্রভো! আমাদের বাঞ্ছা পরিপূর্ণ কর।

হে মহারাজ! বাসুদেব ও অর্জুন অস্ত্রলাভের নিমিত্ত এইরূপ স্তব করিয়া মহাদেবকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন।

মহাদেবের নিকট হইতে অর্জুনের পাশুপত অস্ত্রলাভ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। তখন মহাত্মা ধনঞ্জয় কৃতঞ্জলি-পুটে প্রসন্ন মনে উৎফুল্ল নয়নে সমস্ত তেজোনিধান বৃষধ্বজের প্রতি দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক তাঁহার নিকটে বাসুদেব নিবেদিত স্বকৃত নিশার্হ নিত্য উপহার অবলোকন করিলেন এবং মনে মনে মহাদেব ও বাসুদেবকে পূজা করিয়া মহেশ্বরকে কহিলেন, হে দেব! আমি দিব্য অস্ত্র লাভ করিতে অভিলাষ করি।

মহাদেব ধনঞ্জয়ের অভিলাষ অবগত হইয়া সম্মিতবদনে তাঁহাকে ও বাসুদেবকে স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, হে পুরুষোত্তমদ্বয়! আমি তোমাদিগের মনের অভিলাষ অবগত হইয়াছি; তোমরা যে কামনায় আগমন করিয়াছ, আমি অবিলম্বে তাহা প্রদান করিতেছি। এই স্থানের অতি সন্নিকটে এক অমৃতময় দিব্য সরোবর আছে, সেই সরসীতে দিব্য ধনুঃ ও শর নিহিত রহিয়াছে। ঐ শর ও শরাসনদ্বারা আমি সংগ্রামে সুরারিগণকে সংহার করিয়াছিলাম। তোমরা সেই ধনুর্ব্বাণ আনয়ন কর।

তখন নর ও নারায়ণ "তথাস্তু” বলিয়া মহাদেবের পারিষদগণ-সমভিব্যাহারে শত শত বিস্ময়কর দিব্যপদার্থ-সমাকুল, পরম পবিত্র সর্ব্বার্থসাধক সূর্য্যমণ্ডলসন্নিভ সেই বৃষভধ্বজ নির্দিষ্ট সরোবরে গমন করিলেন। তথায় সলিলের অভ্যন্তরে দুইটি ভুজঙ্গ তাঁহাদিগের নয়নগোচর হইল; একটি নিতান্ত ভীষণ এবং দ্বিতীয়টি সহস্রশীর্ষ ও অগ্নির ন্যায় তেজস্বী। উহার সহস্র মুখ হইতে বিপুল অনলশিখা বিনির্গত হইতেছে। তখন বেদজ্ঞ ধনঞ্জয় ও বাসুদেব জলস্পর্শপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে পরম যত্নসহকারে মহাদেবকে স্মরণ ও অসংখ্য প্রণাম এবং শতরুদ্রীয় বেদ উচ্চারণ করিয়া সেই নাগদ্বয়কে নমস্কার করত আরাধনা করিতে লাগিলেন।

তখন সেই মহাভুজগদ্বয় ভগবান্ রুদ্রের মাহাত্ম্যে নাগরূপ পরিত্যাগপূর্ব্বক শত্রুনাশন শর ও শরাসনের রূপ ধারণ করিল। মহাত্মা বাসুদেব ও ধনঞ্জয় তদ্দর্শনে প্রীত হইয়া সেই প্রভাসম্পন্ন ধনুঃ ও শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক আনয়ন ও মহাদেবকে প্রদান করিলেন। তখন পিঙ্গলাক্ষ ধূমলবর্ণ, তপস্যার আধার এক মহাবল পরাক্রান্ত ব্রহ্মচারী মহাদেবের পার্শ্ব হইতে বিনির্গত হইয়া সেই ধনুঃ গ্রহণ করিলেন এবং দক্ষিণ জঙ্ঘা প্রসার ও বামপদ সঙ্কোচপূর্ব্বক অবস্থান করিয়া শরসমেত সেই শরাসন আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। অচিন্ত্যবিক্রম ধনঞ্জয় তাঁহার মৌর্ব্বী আকর্ষণ ধনুর্দ্ধারণ ও পাদসংস্থান অবলোকন এবং ভবমুখ নিঃসৃত মন্ত্র শ্রবণ করিয়া গ্রহণ করিলেন। তখন বলবান্ প্রভাবশালী ব্রহ্মাচারী সেই সরোবরেই সেই শর ও শরাসন পরিত্যাগ করিলেন। স্মৃতিমান্ অর্জুন মহাদেবকে প্রসন্ন জানিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, আমি পূর্ব্বে অরণ্যানী মধ্যে মহেশ্বরের নিকট যে বর প্রাপ্ত হইয়া--ছিলাম, সেই বর এবং উহার সন্দর্শন সফল হউক। মহাদেব অর্জুনের অভিপ্রায় অবগত হইয়া প্রীতমনে তাঁহাকে ভীষণ পাশুপত অস্ত্র সমর্পণপূর্ব্বক প্রতিজ্ঞা হইতে উদ্ধার হও, বলিয়া বর প্রদান করিলেন। দুর্দ্ধর্য ধনঞ্জয় পুনরায় ঈশ্বর হইতে দিব্য পাশুপত অস্ত্র লাভ করিয়া পুলকিত হইয়া আপনাকে কৃতকার্য্য জ্ঞান করিতে লাগিলেন।

অনন্তর অর্জুন ও বাসুদেব উভয়ে হৃষ্টচিত্তে মহাদেবকে অভিবাদন করিলেন। তৎপরে জম্ভাসুরবধার্থী ইন্দ্র ও বিষ্ণু যেমন মহাসুরনিপাতী মহেশ্বরের অনুমতি অনুসারে প্রীত হইয়া গমন করিয়াছিলেন, তাঁহারাও সেইরূপ তাঁহার অনুমতি লইয়া পরমানন্দে স্বীয় শিবিরে উপস্থিত হইলেন।

যুধিষ্ঠিরের অঙ্গপ্রসাধন।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর কৃষ্ণ ও দারুকের পরস্পর কথোপকথনে সেই রাত্রি অতিবাহিত হইল। রাজা যুধিষ্ঠির জাগরিত হইলেন। পাণিস্বনিক', মাগধ, মাধুপর্কিক, বৈতালিক ও সূতগণ স্তবপাঠ, নর্তকগণ নৃত্য, সুস্বর গায়কগণ কুরুবংশের স্তুতিযুক্ত মধুর সংগীত এবং সুনিপুণ সুশিক্ষিত, হৃষ্টস্বভাব বাদ্যকরগণ মৃদঙ্গ, ঝর্ঝর, ভেরী, পণব, আণক, গোমুখ, শঙ্খ ও দুন্দুভি প্রভৃতি নানাবিধ বাদ্যযন্ত্র বাদন করিতে লাগিল। মহামূল্য শয্যায় শয়ান মহারাজ যুধিষ্ঠির সেই মেঘনির্ঘোষসদৃশ গগনস্পর্শী মহাশব্দে প্রতিবোধিত হইয়া গাত্রোত্থানপূর্ব্বক অবশ্যকর্ত্তব্য কার্য্যানুষ্ঠানের নিমিত্ত স্নানগৃহে গমন করিলেন। তখন স্নাত, শ্বেতাম্বরধারী, তরুণবয়স্ক অষ্টাধিক শত স্নাপক' পরিপূর্ণ কাঞ্চন কুম্ভসমুদায় লইয়া তাঁহার সমীপে সমুস্থিত হইল। রাজা যুধিষ্ঠির লঘুবস্ত্র পরিধানপূর্ব্বক নৃপাসনে উপবেশন করিয়া মন্ত্রপূত চন্দনজলে স্নান করিলেন। সুশিক্ষিত বলবান্ ভৃত্যগণ কষায়দ্রব্যে' তাঁহার গাত্র মার্জিত ও পরিশেষে অধিবাসিত সুগন্ধি জলে ধৌত করিয়া দিল। তিনি জলশোষণের নিমিত্ত মস্তকে রাজহংসসন্নিভ শুভ্র উষ্ণীষ বেষ্টন করিলেন। তৎপরে অঙ্গমনোহর চন্দনলেপন, মাল্য ধারণ ও বস্ত্র পরিধানপূর্ব্বক পূর্ব্বাভিমুখে কৃতাঞ্জলিপুটে অবস্থান করত সাধুগণের পদ্ধতি অনুসারে জপ সমাপন করিয়া বিনীতভাবে প্রদীপ্ত অগ্নিগৃহে প্রবিষ্ট হইলেন এবং পবিত্রসমেত' সমিধ ও মন্ত্রপূত আহুতিদ্বারা অগ্নির অর্চ্চনা করিয়া তথা হইতে বহির্গত হইয়া দ্বিতীয় কক্ষায় প্রবেশ করিলেন। তথায় বেদজ্ঞ, বেদব্রত, স্নাত, দীক্ষান্ত-স্নাত, অনুচর সহস্র সমবেত বৃদ্ধ ব্রাহ্মণগণ ও আট সহস্র গৌরী-গর্ন্তজাত তনয়কে নিরীক্ষণ করিয়া মধু, ঘৃত, ফল, পুষ্প, ও দূর্ব্বা প্রভৃতি মাঙ্গল্য দ্রব্যদ্বারা তাঁহাদিগের স্বস্তিবাচনপূর্ব্বক এক এক ব্রাহ্মণকে এক এক কাঞ্চন-নিষ্ক, অলঙ্কৃত এক শত অশ্ব, বস্ত্র, অভিলষিত দক্ষিণা ও দোহনশীল সবৎস হেমশৃঙ্গ, রৌপ্যখুর, কপিলা ধেনু প্রদান এবং প্রদক্ষিণ করিতে লাগিলেন। তৎপরে স্বস্তিক', বর্দ্ধমান ও কাঞ্চনময় নন্দ্যাবর্ত্ত গৃহ, মাল্য, জলকুম্ভ, প্রজ্বলিত হুতাশন, পরিপূর্ণ অক্ষত পাত্র, মাঙ্গল্যদ্রব্য, রোচনা, অলঙ্কৃত সুলক্ষণা কামিনীগণ, দধি, ঘৃত, মধু, জল ও মাঙ্গল্য পক্ষী প্রভৃতি পূজিত দ্রব্যসকল দর্শন ও স্পর্শ করিয়া বাহ্য কক্ষায় আগমন করিলেন। তথায় তাঁহার পরিচারকগণ সুবর্ণময়, মুক্তা ও বৈদুর্য্যমণিমণ্ডিত, মনোহর আস্তরণে আস্তীর্ণ, উত্তরচ্ছদসমেত, বিশ্বকৰ্ম্মনির্মিত, সর্ব্বতোভদ্র আসন আনয়ন করিল। মহাত্মা যুধিষ্ঠির সেই আসনে উপবেশন করিলে তাঁহার শুভ্রবর্ণ মহামূল্য ভূষণসমুদায় সমানীত হইল। তিনি মুক্তাভরণে সুসজ্জিত হইলে তাঁহার রূপ শত্রুগণের শোকবর্দ্ধন হইয়া উঠিল। ভৃত্যগণ শশধরের ন্যায় পাণ্ডুর, সুবর্ণ দণ্ডমণ্ডিত চামর গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহার চতুর্দিকে বীজন করিতে আরম্ভ করিলে, তিনি চপলাবিলসিত জলধরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তাঁহার সম্মুখে স্তাবকগণ স্তব, বন্দিগণ বন্দনা ও গন্ধর্ব্বগণ গান করিতে আরম্ভ করিল। ঐ সময় বন্দিগণের ঘোরতর শব্দ, রথসমূহের নেমিশব্দ ও অশ্বগণের খুরশব্দ প্রাদুর্ভূত হইল এবং গজঘণ্টা নিনাদ, শঙ্খনিস্বন ও মানবগণের পদশব্দে পৃথিবী যেন কম্পিতা হইতে লাগিল।

ক্ষণকালের মধ্যে সমুদায় শব্দ তিরোহিত হইলে কুণ্ডল-ধারী বদ্ধ খড়্গ, সন্নদ্ধকবচ, তরুণবয়স্ক দ্বারবান্ অভ্যন্তরে আগমনপূর্ব্বক জানুদ্বারা ভূতলে অবস্থান ও মস্তকদ্বারা যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদন করিয়া হৃষীকেশের আগমন সংবাদ নিবেদন করিল। তখন পুরুষশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির পরম পূজিত মাধবের নিমিত্ত আসন ও অর্ঘ্য আনয়ন করিতে আজ্ঞা প্রদান-পূর্ব্বক তাঁহাকে প্রবেশিত ও বরাসনে উবেশিত করিয়া স্বাগত প্রশ্ন ও বিধিবৎ পূজা করিতে লাগিলেন।

শ্রীকৃষ্ণের নিকট যুধিষ্ঠিরের সাহায্য গ্রহণ।

সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির জনার্দ্দনকে প্রত্যাভিনন্দনপূর্ব্বক কহিলেন, হে মধুসূদন! তুমি ত সুখে রজনী অতিবাহিত করিয়াছ? তোমার জ্ঞান সকলও প্রসন্ন হইয়াছে? মহাত্মা বাসুদেবও তাঁহাকে সেইরূপ প্রশ্ন করিলেন। অনন্তর দৌবারিক যুধিষ্ঠিরের নিকট আগমন-পূর্ব্বক করপুটে নিবেদন করিল, মহারাজ! বীরগণ সমুপস্থিত হইয়াছেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বীরগণের আগমনবার্তা শ্রবণ করিয়া তাঁহাদিগকে প্রবেশিত করিতে অনুজ্ঞা প্রদান করিলেন। তখন বিরাট, ভীমসেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি, চেদিপতি ধৃষ্টকেতু, মহারথ দ্রুপদ, শিখণ্ডী, নকুল, সহদেব, চেকিতান, কৈকেয়গণ, কুরুকুলসম্ভূত যুযুৎসু, পাঞ্চালনন্দন উত্তমৌজাঃ, সুবাহু, যুধামন্যু, দ্রৌপদীর পুত্রগণ ও অন্যান্য ক্ষত্রিয়গণ যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞানুসারে তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া নিৰ্ম্মল আসনে উপবেশন করিলেন। মহাত্মা মহাদ্যুতি মহাবল বীর্য্যশালী কৃষ্ণ ও সাত্যকি একাসনে সমাসীন হইলেন।

অনন্তর যুধিষ্ঠির সেই সকল ক্ষত্রিগণের সমক্ষে কমল-লোচন কৃষ্ণকে মধুরবাক্যে কহিলেন, হে জনার্দ্দন! অমরগণ যেমন ইন্দ্রকে আশ্রয় করিয়াছিলেন, আমরা সেইরূপ একমাত্র তোমাকে আশ্রয় করিয়া যুদ্ধে জয় ও সনাতন সুখ প্রার্থনা করিতেছি। তুমি আমাদিগের রাজ্যনাশ, শত্রুগণকর্তৃক প্রত্যাখ্যান ও নানাবিধ ক্লেশ, সকলই অবগত আছ। হে সর্ব্বেশ! হে ভক্তবৎসল! হে মধুসূদন! আমাদের সকলেরই সুখ ও যুদ্ধে গমন তোমাতেই নির্ভর করিতেছে। এক্ষণে আমার এই প্রার্থনা যে, আমার মনঃ যেন তোমার প্রতি প্রসন্ন থাকে এবং তোমার প্রসাদে অর্জুনের প্রতিজ্ঞা যেন সফল হয়। হে বাঞ্চেয়! আজি তুমি তরণীস্বরূপ হইয়া আমাদিগকে দুঃখ ও ক্রোধরূপ মহার্ণব হইতে উদ্ধার কর। সারথি যত্ন করিলে যুদ্ধে যেরূপ কার্য্য করিতে পারে, রিপুবধোদ্যত রথী কদাচ সেরূপ করিতে পারেন না। অতএব হে শঙ্খচক্রগদাধর! এই অতলস্পর্শ কুরুসাগরে নিমগ্ন তরণীহীন পাণ্ডবগণকে উদ্ধার কর। তুমি আপদ-কালে বৃষ্ণিগণকে যেরূপ পরিত্রাণ করিয়া থাক, সেইরূপ আমাদিগকেও এক্ষণে পরিত্রাণ কর। হে দেবদেবেশ! হে সনাতন! হে ক্ষেমঙ্কর! হে বিষ্ণো! হে জিঞ্চো! হে হর! হে কৃষ্ণ! হে বৈকুণ্ঠ! হে পুরুষোত্তম! তোমাকে নমস্কার। নারদ তোমাকে পুরাতন ঋষি, বরদ, শাঙ্গী ও শ্রেষ্ঠ বলিয়া কীর্তন করিয়াছেন। তুমি তাঁহার বাক্য সার্থক কর।

ধৰ্ম্মরাজ সভামধ্যে এই কথা কহিলে বাগ্মী বাসুদেব মেঘগম্ভীর শব্দে প্রত্যুত্তর করিলেন, হে রাজন! নরশ্রেষ্ঠ মহাবল পরাক্রান্ত ধনঞ্জয় যে প্রকার ধনুর্দ্ধর, বীর্য্যবান, অস্ত্রসম্পন্ন, রণবিখ্যাত, অমর্ষী ও তেজস্বী, অমর লোকেও কেহ সেরূপ নাই। সেই তরুণবয়স্ক, বৃষস্কন্ধ, দীর্ঘবাহু, সিংহগতি মহাবীর ধনঞ্জয় আপনার শত্রুগণকে সংহার করিবেন। আমিও অর্জুনের ন্যায় দুর্য্যোধনের সৈন্যগণকে বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইব। আজি মহাবল অর্জুন সেই পাপকৰ্ম্মা ক্ষুদ্রস্বভাব সৌভদ্রঘাতী জয়দ্রথকে সুতীক্ষ্ণ শরনিকরদ্বারা ধরাতল হইতে অপসারিত করিবেন। গৃধ, শ্যেন ও প্রচণ্ড গোমায়ু প্রভৃতি নরমাংসলোলুপ হিংস্র জন্তুগণ তাহার মাংস ভক্ষণ করিবে। অধিক কি বলিব, যদি ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণও জয়দ্রথকে রক্ষা করেন, তথাপি আজি সঙ্কুল যুদ্ধে তাহাকে প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক যমরাজের রাজধানী গমন করিতে হইবে। হে ধর্মরাজ। আজি ধনঞ্জয় নিশ্চয়ই সিন্ধুরাজকে সংহার করিয়া আপনার নিকট আগমন করিবেন, আপনি বিশোক, বিজ্বর ও ঐশ্বর্য্যশালী হউন।

জয়দ্রথ বধার্থ অর্জুনের রথসজ্জা ও যুদ্ধযাত্রা।

সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! তাঁহারা এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, এমন সময়ে ধনঞ্জয়, যুধিষ্ঠির ও অন্যান্য সুহৃদ্গণকে সন্দর্শন করিবার অভিলাষে তাঁহাদের 'সম্মুখে আগমনপূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদন করিয়া তাঁহার অগ্রে দণ্ডায়মান রহিলেন। তখন ধৰ্ম্মরাজ প্রীতি প্রফুল্লচিত্তে আসন হইতে সমুত্থিত হইয়া বাহুদ্বারা তাঁহাকে আলিঙ্গন ও তাঁহার মস্তক আঘ্রাণ করিয়া আশীর্ব্বাদ প্রয়োগপূর্ব্বক সম্মিত-বদনে কহিলেন, অর্জুন! তোমার যেরূপ কান্তি এবং জনার্দ্দন আমাদের প্রতি যেরূপ প্রসন্ন, তাহাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে যে, যুদ্ধে তোমারই জয়লাভ হইবে। তখন ধনঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! আপনার কল্যাণ হউক, আমি কেশবের প্রসাদে অতি আশ্চর্য্য বিষয় দর্শন করিয়াছি। মহাবীর অর্জুন এই বলিয়া সুহৃদ্গণকে আশ্বাসিত করিবার নিমিত্ত স্বপ্নে শিবসমাগমের বিষয় আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলেন। তাঁহারা তচ্ছুবণে বিস্ময়াপন্ন হইয়া মস্তকদ্বারা ধরাতল স্পর্শপূর্ব্বক দেবাদিদেব মহাদেবকে নমস্কার করিয়া ধনঞ্জয়কে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।

অনন্তর ধর্মরাজ সমুদায় সুহৃদ্গণকে সংগ্রামে গমন করিতে আদেশ করিলে, তাঁহারা তাঁহার অনুজ্ঞানুসারে ত্বরমাণ, সুসংরন্ধ ও প্রফুল্লচিত্ত হইয়া যুদ্ধার্থ বহির্গত হইলেন। মহাবীর সাত্যকি, বাসুদেব ও ধনঞ্জয় রাজাকে অভিবাদনপূর্ব্বক হহৃষ্টচিত্তে তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। দুরাধর্ষ সাত্যকি ও বাসুদেব এক রথে আরোহণপূর্ব্বক অর্জুননিবেশনে' উপনীত হইলেন। তথায় বাসুদেব সারথির ন্যায় ধনঞ্জয়ের বানরধ্বজ রথ সুসজ্জিত করিতে লাগিলেন। মেঘগম্ভীরনির্ঘোষ তপ্তকাঞ্চন-প্রভাসম্পন্ন সেই উৎকৃষ্ট রথ সুসজ্জিত হইয়া তরুণ দিবাকরের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। অনন্তর ধনঞ্জয়ের আহ্নিক কার্য্য সমাপ্ত হইলে পুরুষশ্রেষ্ঠ বাসুদেব তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, ধনঞ্জয়! রথ সুসজ্জিত হইয়াছে। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় কিরীট, হেমবৰ্ম্ম, শরাসন ও শর ধারণপূর্ব্বক রথ প্রদক্ষিণ করিয়া তাহাতে আরোহণ করিলেন। তপঃপরায়ণ, বিদ্যাসম্পন্ন, বয়োবৃদ্ধ, ক্রিয়াশালী, জিতেন্দ্রিয়গণ জয়বাদপূর্ব্বক তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। সুমেরুশৃঙ্গে দিবাকরের যেরূপ শোভা হয়, কাঞ্চনমণ্ডিত রথিশ্রেষ্ঠ ধনঞ্জয় সেই জৈত্রেয়' ও সাংগ্রামিক মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত কাঞ্চনময় রথে আরোহণ করিয়া সেইরূপ শোভা ধারণ করিলেন। যেমন অশ্বিনীকুমারযুগল শর্যাতির যজ্ঞে আগমনকালে ইন্দ্রের সহিত রথারোহণ করিয়া-ছিলেন, সেইরূপ যুযুধান ও জনার্দ্দন অর্জুনের সহিত রথারূঢ় হইলেন। বৃত্রাসুরবধার্থ গমনকালে মাতলি যেমন ইন্দ্রের অশ্ব-রশ্মি ধারণ করিয়াছিলেন, সেইরূপ সারথিশ্রেষ্ঠ গোবিন্দ ধনঞ্জয়ের অশ্বরশ্মি ধারণ করিলেন। শশধর যেমন তিমির-নাশের নিমিত্ত বুধ ও শুক্রের সহিত গমন করেন, ইন্দ্র যেমন তারা নিমিত্তক যুদ্ধে বরুণ ও সূর্য্যের সহিত গমন করিয়াছিলেন, সেইরূপ ধনঞ্জয় সিন্ধুরাজকে বধ করিবার নিমিত্ত সাত্যকি ও কৃষ্ণের সহিত রথারোহণপূর্ব্বক গমন করিতে লাগিলেন। বাদকগণ বাদিত্রশব্দ এবং সূত ও মাগধগণ মাঙ্গল্য স্তুতিপাঠ করিতে আরম্ভ করিল। জয়াশীর্ব্বাদ, পুণ্যাহধ্বনি এবং সূত ও মাগধগণের স্তুতিনিনাদ বাদ্যধ্বনির সহিত মিশ্রিত হইয়া বীরগণের হর্ষবর্দ্ধন করিতে লাগিল; ঐ সময় পুণ্যগন্ধবাহী শুভসমীরণ পাণ্ডবগণকে হর্ষিত ও তাঁহাদের অরাতিগণকে শোষিত করিয়া অর্জুনের অনুকূলে প্রবাহিত হইতে লাগিল এবং জয়সূচক বিবিধ শুভ নিমিত্ত প্রাদুর্ভূত হইল।

ধনঞ্জয় জয়লাভের লক্ষণসকল নিরীক্ষণ করিয়া দক্ষিণ পার্শ্বস্থিত মহাধনুর্দ্ধর সাত্যকিকে কহিলেন, হে যুযুধান! আজি যেরূপ নিমিত্তসকল অবলোকন করিতেছি, তাহাতে নিশ্চয় বোধ হইতেছে, আমার জয়লাভ হইবে। অতএব জয়দ্রথ আমার বীর্য্যপ্রভাবে যমলোকে গমন করিবার নিমিত্ত যে স্থানে অবস্থান করিতেছে, আমি সেই স্থানে গমন করিব। কিন্তু জয়দ্রথকে বধ করা যেমন আমার অবশ্যকর্তব্য, ধর্মরাজকে রক্ষা করাও সেইরূপ নিতান্ত আবশ্যক, অতএব আজি রাজার রক্ষার্থে তোমায় নিযুক্ত করিলাম। আমি তাঁহাকে যে প্রকার রক্ষা করিয়া থাকি, তুমিও সেই প্রকার রক্ষা করিবে, সন্দেহ নাই! তোমাকে যুদ্ধে পরাজয় করিতে পারে, এমন লোক নয়নগোচর হয় না। তুমি যুদ্ধে বাসুদেবের সমান; ইন্দ্রও তোমাকে জয় করিতে সমর্থ নহেন। তুমি বা মহারথ প্রদ্যুম্ন মহারাজকে রক্ষা করিবার ভার গ্রহণ করিলে আমি নিশ্চিন্ত হইয়া জয়দ্রথকে বধ করিতে পারি। আমার নিমিত্ত তোমার কিছুমাত্র চিন্তা নাই। যে স্থানে আমি বাসুদেবের সহিত মিলিত হইয়া অবস্থান করি, সেখানে কখনই বিপদ হয় না। অতএব তুমি আমার নিমিত্ত কিছুমাত্র চিন্তিত না হইয়া সাধ্যানুসারে রাজাকে রক্ষা করিও। অরাতি-নিপাতন সাত্যকি অর্জুনের বাক্য স্বীকার করিয়া অবিলম্বে যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করিলেন।

প্রতিজ্ঞা পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।