দ্রোণপর্ব্ব
পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ
| জয়দ্রথবধ পর্ব্বাধ্যায় |
জয়দ্রথবধ পর্ব্বাধ্যায়।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। পাণ্ডবগণ অভিমন্যুশোকে নিতান্ত কাতর হইয়া পরদিন কি করিলেন? আমাদের পক্ষীয় কোন্ কোন্ বীর পাণ্ডবগণের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলেন? কৌরবগণ অরাতিনিপাতন সব্যসাচীর অসাধারণ কার্য্যসকল অবগত থাকিয়াও কিরূপে তাদৃশ অন্যায় কার্য্যের অনুষ্ঠানপূর্ব্বক নির্ভয়ে অবস্থান করিলেন? পুত্রশোকসন্তপ্ত কালান্তক যমোপম কপিধ্বজ ধনঞ্জয় ক্রোধভরে শরাসন বিধূনন করত সংগ্রামস্থলে আগমন করিলে অস্মৎপক্ষীয় বীরগণ কি প্রকার তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিলেন? এবং নিরীক্ষণ করিয়াই বা কি করিলেন? আর সংগ্রামস্থলে দুর্য্যোধনেরই বা কি অবস্থা ঘটিয়াছিল? হে সঞ্জয়! এই সমুদায় বৃত্তান্ত আমার নিকট কীর্তন কর।
আজি আর আনন্দধ্বনি আমার শ্রবণগোচর হইতেছে না। জয়দ্রথের ভবনে যে সকল মনোহর শ্রুতিমধুর ধ্বনি হইত, আজি তাহা তিরোহিত হইয়াছে। আজি আমার পুত্রগণের শিবির হইতে সূত ও মাগধগণের স্তুতিপাঠ এবং নর্তকগণের শব্দ আমার শ্রবণবিবরে প্রবেশ করিতেছে না। কৌরবগণের যে বীরনাদে আমার কর্ণকুহর নিরন্তর নিনাদিত হইত, আজি তাহারা দীনভাবাপন্ন হওয়াতে সেই শব্দ শ্রুতিগোচর হইতেছে না। আমি পূর্ব্বে সত্যধৃতি সোমদত্তের নিবেশনে আসীন হইলেই মধুর শব্দ শ্রবণ করিতাম; কিন্তু আজি তাহা শ্রবণ করিতেছি না। হে সঞ্জয়। এই সমুদায়ই আমার পরিবেদনের' কারণ। হায়। আমি কি পুণ্যহীন। আজি পুত্রগণের নিবেশন নিরুৎসাহ ও আর্তস্বরে নাদিত নিরীক্ষণ করিতেছি। বিবিংশতি, দুর্মুখ, চিত্রসেন, বিকর্ণ ও অন্যান্য পুত্রগণের তাদৃশ বীরনাদ আর শ্রুতিগোচর হয় না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যগণ শিষ্য হইয়া যাঁহার উপাসনা করেন; যে মহাধনুর্দ্ধর আমার পুত্রগণের প্রধান অবলম্বন; যিনি বিতণ্ডা, আলাপ, সংলাপ' ও বিবিধ মনোহর গীত বাদ্যদ্বারা দিবারাত্র কালযাপন করিতেন এবং কৌরব, পাণ্ডব ও সাত্ত্বতগণ সতত যাঁহার উপাসনা করিত, আজি সেই অশ্বত্থামার গৃহে পূর্ব্বের ন্যায় শব্দ হইতেছে না। যে সকল গায়ক ও নর্তক মহাধনুর্দ্ধর অশ্বত্থামাকে নিরন্তর উপাসনা করিত, আজি তাহাদের শব্দ শ্রুতিগোচর হয় না। বিন্দ ও অনুবিন্দের শিবিরে সায়ংসময়ে যে মহাধ্বনি হইত এবং কৈকেয়গণের শিবিরে অনিন্দিতস্বভাব সৈন্যগণ নৃত্যকালে যে মহান্ তাল ও গীতধ্বনি করিত, আজি তাহা তিরোহিত হইয়াছে। যে সকল যাজক যজ্ঞ করিতে করিতে শ্রুতনিধি ভূরিশ্রবার উপাসনা করিতেন, আজি তাঁহাদিগের শব্দ শ্রুতিপথে প্রবিষ্ট হইতেছে না। পূর্ব্বে দ্রোণাচার্য্যের গৃহে অবিরত মৌর্ব্বীধ্বনি, বেদধ্বনি এবং তোমর, অসি, রথ ধ্বনিত হইত, আজি তাহা শ্রবণ করিতেছি না। নানা দেশীয় গীত ও বাদিত্রধ্বনিও আজি অন্তর্হিত হইয়াছে।
হে সঞ্জয়! মহাত্মা জনার্দ্দন যে সময়ে সকল লোকের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনার্থ সন্ধিস্থাপনের অভিলাষে বিরাটনগর হইতে আগমন করিলেন, আমি তখন মূর্খ দুর্য্যোধনকে কহিয়া-ছিলাম যে, দুর্য্যোধন। এই সময় কৃষ্ণের সাহায্যে পাণ্ডবগণের সহিত সন্ধি স্থাপন কর। আমার মতে সন্ধি সংস্থাপন সময়োচিত হইতেছে, অতএব আমার বাক্য লঙ্ঘন করিও না। মহাত্মা বাসুদেব তোমার হিতার্থেই সন্ধিপ্রার্থনা করিতেছেন; যদি তুমি তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান কর, তাহা হইলে সংগ্রামে কদাচ তোমার জয়লাভ হইবে না। হে সঞ্জয়! আমি এইরূপে বারংবার দুর্য্যোধনকে সন্ধিস্থাপনে অনুরোধ করিলাম, কিন্তু ঐ কুলাঙ্গার কালপরিপাকবশতঃ আমার বাক্যে অনাস্থা প্রদর্শনপূর্ব্বক কর্ণ ও দুঃশাসনের মতের অনুবর্তী হইয়া কেশবকে প্রত্যাখ্যান করিল। আর দেখ, দ্যূতক্রীড়ায় আমার বা মহাত্মা বিদুর, জয়দ্রথ, ভীষ্ম, শল্য, ভূরিশ্রবাঃ, পুরুমিত্র, জয়, অশ্বত্থামা, কূপ ও দ্রোণের আমাদের কাহারও সম্মতি ছিল না। আমার পুত্র যদি তৎকালে আমাদের মতের অনুবর্তন করিত, তাহা হইলে চিরজীবী হইয়া জ্ঞাতি ও মিত্রের সহিত নিরাপদে পরম সুখে কালযাপন করিত।
আমি তাহাকে আরও কহিয়াছিলাম যে, পাণ্ডবগণ স্নিগ্ধ-স্বভাব, মধুরভাষী, প্রিয়ংবদ, কুলীন, মান্য ও প্রাজ্ঞ, তাহারা অবশ্যই সুখ লাভ করিবে। ধর্মের প্রতি যাঁহার দৃষ্টি থাকে, তিনি ইহলোকে সকল সময়ে সর্ব্বত্র সুখসম্ভোগ এবং পরকালে কল্যাণ ও প্রসন্নতা লাভ করেন। সামর্থ্যসম্পন্ন পাণ্ডবগণ পৃথিবীর অর্দ্ধভাগ ভোগ করিবার উপযুক্ত। এই কুরুকুলোপভুক্ত সমুদ্রবেষ্টিত ভূমণ্ডলে তোমাদের ন্যায় তাহাদেরও অধিকার আছে। আর তাহারা রাজ্য-লাভানন্তর ধর্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক কদাচ তোমাদিগকে অভিভব করিবে না; ধর্ম্মের অনুগত হইয়াই অবস্থান করিবে। আমার জ্ঞাতিগণ, শল্য, সোমদত্ত, মহাত্মা ভীষ্ম, দ্রোণ, বিকর্ণ, বাহিক, কূপ ও অন্যান্য মহাত্মা ভরতবংশীয়গণ তোমার নিমিত্ত পাণ্ডব-গণকে যে সকল হিতকর কথা কহিবেন, তাহারা অবশ্যই তাহা শ্রবণ ও তদনুসারে আচরণ করিবে। কেহই পাণ্ডবগণকে তোমার বিপক্ষতাচরণে অনুরোধ করিবে না। যদিও করে, তাহাও কোন কার্য্যকারক হইবে না; কারণ কৃষ্ণ কদাচ ধর্ম পরিত্যাগ করেন না। পাণ্ডবগণ তাঁহার অনুগত, আর আমি ধর্মাত্মা পাণ্ডবগণকে ধর্মানুগত বাক্য কহিলে, তাহারা অন্যথা করিতে পারিবে না।
হে সঞ্জয়! আমি বিলাপসহকারে অনেকবার দুর্য্যোধনকে এইরূপ কহিয়াছিলাম, কিন্তু সে মূঢ় কালপ্রেরিত হইয়া তাহা শ্রবণ করিল না; অতএব স্পষ্টই বোধ হইতেছে, আমাদের আর নিস্তার নাই। দেখ, যে সংগ্রামে মহাবীর বৃকোদর, অর্জুন, বৃষ্ণিবীর, সাত্যকি, পাঞ্চালাধিপতি উত্তমৌজাঃ, দুর্জয় যুধামন্যু, দুর্দ্ধর্য ধৃষ্টদ্যুম্ন, অপরাজিত শিখণ্ডী, সোমকতনয় ক্ষত্রবৰ্ম্মা, কেকয়দেশীয় ভূপতিগণ, চৈদ্য, চেকিতান, কাশ্যের পুত্র বিভু, বিরাট, মহারথ দ্রুপদ এবং পুরুষপ্রধান নকুল ও সহদেব যোদ্ধা এবং মহামতি মধুসূদন মন্ত্রী; কোন্ জীবিতার্থী ব্যক্তি সে সমরে সম্মুখীন হইতে সাহস করিতে পারে? ফলতঃ দুর্য্যোধন, কর্ণ, শকুনি ও দুঃশাসন ভিন্ন আমাদের পক্ষীয় আর কোন বীরই সংগ্রামে অরাতিগণনিক্ষিপ্ত নিশিত শরনিকর সহ্য করিতে সমর্থ নহে। হে সঞ্জয়! ভগবান্ মধুসূদন যাহাদের অশ্বরশ্মি ধারণ করেন, বৰ্ম্মধারী অর্জুন যাহাদের যোদ্ধা, কখনই তাহাদিগের পরাজয়ের সম্ভাবনা নাই। আমি তোমার মুখে ভীষ্মের ও দ্রোণের নিধনবার্তা শ্রবণ করিয়া বোধ করিতেছি যে, এক্ষণে আমার পুত্রগণ দীর্ঘদর্শী মহাত্মা বিদুরের পূর্ব্বোক্ত বাক্য সফল হইতেছে | দেখিয়া এবং নির্বোধ দুর্য্যোধন আমার সেই বিলাপ স্মরণ করিয়া যৎপরোনাস্তি অনুতাপ করিতেছে। শৈলের ও অর্জুনের শরে সৈন্যগণকে অভিভূত ও রথসকল বীরশূন্য সন্দর্শন করিয়া নিশ্চয়ই আমার পুত্রেরা বিষাদার্ণবে নিমগ্ন হইতেছে। হিমাত্যয়ে সমীরণসহায় হুতাশন যেমন শুষ্ক তৃণসকল দগ্ধ করে, তদ্রূপ ধনঞ্জয় আমার সৈন্যগণকে সংহার করিতেছে।
হে সঞ্জয়! অর্জুনতনয় অভিমন্যু রণে নিহত হইলে তোমাদিগের অন্তঃকরণ কিরূপ হইয়াছিল? মহাবীর গাণ্ডীবধন্বার অপকার করিয়া তাহার ক্রোধবেগ সহ্য করে, আমাদের পক্ষে এমন কেহই নাই। হায়! লোভপরতন্ত্র, দুর্বুদ্ধি, ক্রোধবিকৃতাত্মা, রাজ্যলোলুপ দুর্য্যোধনের দুর্নীতি-নিবন্ধনেই আমার সমুদায় পুত্রেরা এই বিপদে নিপতিত হইয়াছে। যাহা হউক, এক্ষণে অভিমন্যু-বধানন্তর দুর্য্যোধন, দুঃশাসন, সৌবল ও কর্ণ ইহারা এই বিষম বিপত্তি সময়ে কিরূপ কর্ত্তব্য অবধারণ করিল এবং দুব্বুদ্ধি দুর্য্যোধন তৎকালে সুনীতি বা দুর্নীতির অনুবর্তী হইল, তৎসমুদায় আদ্যোপান্ত বর্ণন করিয়া আমার উৎকণ্ঠা দূর কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! যুদ্ধ সম্পর্কীয় সমস্ত ব্যাপারই আমার প্রত্যক্ষ হইয়াছে; আমি তৎসমুদায় বর্ণন করিতেছি, আপনি সুস্থির হইয়া শ্রবণ করুন। আপনার দুর্নীতি-নিবন্ধনেই এই বিষয় রামন উপস্থিত হইয়াছে। হে রাজন। বিগত-সলিল প্রদেশে সেতুবন্ধন যেমন কোন ফলোপধায়ক হয় না, আপনার অনুতাপও এক্ষণে সেইরূপ নিতান্ত নিষ্ফল হইতেছে, অতএব শোক পরিত্যাগ করুন। কৃতান্তের অদ্ভুত নিয়ম অতিক্রম করা নিতান্ত দুঃসাধ্য। হে ভরতশ্রেষ্ঠ! যদি পূর্ব্বে কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠির ও স্বীয় পুত্রগণকে দ্যূত হইতে নিবৃত্ত করিতেন, যদি যুদ্ধকাল সমুপস্থিত হইলে ক্রুদ্ধ কুরু-পাণ্ডবদিগকে সান্ত্বনা করিয়া যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত করিতেন, যদি পূর্ব্বে কৌরবগণকে অবাধ্য দুরাত্মা দুর্য্যোধনের সংহারে আদেশ করিতেন, অথবা যদি ঐ দুরাত্মাকে সৎপথে সংস্থাপনপূর্ব্বক পিতার উচিত কার্য্য করিয়া ধর্মানুসারে কৰ্ম্ম করিতেন, তাহা হইলে কখনই আপনাকে এই দারুণ ব্যসনে নিমগ্ন হইতে হইত না এবং পাণ্ডব, পাঞ্চাল, বৃষ্ণি ও অন্যান্য ভূপালগণও আপনার বুদ্ধিব্যভিচার জানিতে পারিতেন না। হে রাজন! আপনি ইহলোকে বিজ্ঞতম বলিয়া প্রথিত আছেন, তবে কি নিমিত্ত সনাতন ধর্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক দুর্য্যোধন, কর্ণ ও শকুনির মতাবলম্বী হইলেন? অতএব স্পষ্ট বোধ হইতেছে, আপনি নিতান্ত বিষয়াসক্ত; এক্ষণে আপনার এই বিলাপ বাক্য বিষমিশ্রিত মধু বলিয়া আমার বোধ হইতেছে। মহাত্মা মধুসূদন পূর্ব্বে আপনাকে যুধিষ্ঠির ভীষ্ম ও দ্রোণ অপেক্ষাও সমধিক সম্মান করিতেন, কিন্তু যে অবধি আপনাকে অধার্মিক বলিয়া জানিয়াছেন, সেই অবধি আর তাদৃশ সম্মান করেন না। হে মহারাজ! আপনার কুসন্তানগণ পাণ্ডবগণের প্রতি যাহার-পর-নাই কটুবাক্য প্রয়োগ করিলেও আপনি তৎকালে পুত্রগণের রাজ্যকামনায় সে সমুদায় অনায়াসে উপেক্ষা করিয়াছিলেন, এক্ষণে আপনাকে তাহার ফলভোগ করিতে হইবে। আপনি তৎকালে পাণ্ডবগণকে বঞ্চনা করিয়া পিতৃ-পৈতামহোপভুক্ত রাজ্য লাভ করিয়াছিলেন, এক্ষণে সেই পাণ্ডবগণকর্তৃক নির্জিত সমুদায় ভূমণ্ডল উপভোগ করুন। পূর্ব্বে মহারাজ পাণ্ডু কৌরব-গণের বিপক্ষাপহৃত রাজ্য ও যশঃ প্রত্যুদ্ধৃত করিয়াছিলেন। তৎপরে তাঁহার পুত্রগণ তাঁহা অপেক্ষা সমধিক যশোলাভ করিয়া রাজ্য করেন; কিন্তু এক্ষণে আপনি রাজ্যলোভবশতঃ তাঁহাদিগকে পৈতৃক রাজ্যচ্যুত করিয়া তাঁহাদের যশঃ বিলুপ্ত করিয়াছেন। যাহা হউক, এক্ষণে যুদ্ধকালে পুত্রদিগকে তিরস্কার ও তাহাদের দোষ কীর্ত্তন করা আপনার কর্তব্য নয়। কৌরবপক্ষীয় মহাবল পরাক্রান্ত ক্ষত্রিয়গণ জীবননিরপেক্ষ হইয়া অগাধ পাণ্ডবসৈন্য-সাগরে অবগাহনপূর্ব্বক সংগ্রাম করিতেছেন। হে মহারাজ! শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন, সাত্যকি ও বৃকোদর যে সকল সৈন্যের রক্ষায় নিযুক্ত রহিয়াছেন, কৌরবগণ ভিন্ন অন্য কোন্ ব্যক্তি তাহাদিগের সহিত সংগ্রামে সাহসী হইতে পারে? অর্জুন যাহাদিগের যোদ্ধা, জনার্দ্দন যাহাদিগের মন্ত্রী এবং সাত্যকি ও বৃকোদর যাহাদিগের রক্ষিতা, কৌরবগণ বা তাহাদের বশবর্তী বীরগণ ব্যতীত আর কোন্ ধনুর্দ্ধারী ব্যক্তি সেই পাণ্ডবগণের পরাক্রম সহ্য করিতে সমর্থ হয়? ফলতঃ ক্ষত্রধর্মাবলম্বী অনুরক্ত ব্যক্তিগণ যাহা করিতে পারে, কৌরবপক্ষীয় বীরগণ প্রাণপণে তাহাই করিতেছে, কোন অংশে ত্রুটি করিতেছে না। যাহা হউক, এক্ষণে পাণ্ডবদিগের সহিত কুরুদিগের যেরূপ সংগ্রাম হইয়াছিল, তাহা বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! সেই রজনী প্রভাত হইলে শস্ত্রধারিগণের অগ্রগণ্য মহাবীর দ্রোণাচার্য্য স্বীয় সৈন্যসমুদায় লইয়া ব্যূহরচনা করিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় মহাবল পরাক্রান্ত অমর্ষপূর্ণ সৈন্যগণের নানাপ্রকার কোলাহল শ্রবণ-গোচর হইতে লাগিল। উহাদের মধ্যে অনেকে শরাসন বিস্ফারণ এবং কেহ কেহ জ্যাপরিমার্জন ও নিশ্বাস পরিত্যাগ করত ধনঞ্জয় কোথায়, বলিয়া চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল; কেহ কেহ কোষনিষ্কাশিত সুনিৰ্ম্মিত, উৎকৃষ্ট মুষ্টিসম্পন্ন, আকাশসন্নিভ, নিশিত অসি নিক্ষেপ করিতে লাগিল; সহস্র সহস্র বীর সংগ্রাম করিবার মানসে অসিমার্গে ও শরাসনমার্গে বিচরণপূর্ব্বক শিক্ষানৈপুণ্য প্রদর্শনে প্রবৃত্ত হইল; কেহ কেহ চন্দনদিগ্ধ, স্বর্ণ ও হীরকে বিভূষিত ঘণ্টা সংযুক্ত গদা উৎক্ষেপণপূর্ব্বক অর্জুনকে আহ্বান করিতে লাগিল; কেহ কেহ বলমদে উন্মত্ত হইয়া উদ্ভুিত ইন্দ্রধ্বজসদৃশ পরিঘদ্বারা আকাশমার্গ আচ্ছাদন করিয়া ফেলিল এবং অনেকে সংগ্রাম-মানসে বিচিত্র মাল্যে বিভূষিত হইয়া নানা প্রহরণ ধারণপূর্ব্বক অর্জুন কোথায়, মানী ভীমসেন কোথায়, কৃষ্ণ কোথায় এবং তাহাদের সুহৃদ্বর্গই বা কোথায়, বলিয়া আস্ফালন করিতে আরম্ভ করিল।
তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য শঙ্খনিনাদ ও স্বয়ং অশ্ব সঞ্চালনপূর্ব্বক প্রবল বেগে পরিভ্রমণ করত ব্যূহ রচনা করিতে লাগিলেন। অনন্তর সমরোৎসাহী দ্রোণসৈন্যগণ যথাস্থানে সন্নিবেশিত হইলে জয়দ্রথকে কহিলেন, হে সিন্ধুরাজ! তুমি সৌমদত্তি, মহারথ কর্ণ, অশ্বত্থামা, শল্য, বৃষসেন, কূপ, এক লক্ষ অশ্ব, ষড়যুত রথ, চতুৰ্দ্দশ সহস্র মত্ত হস্তী ও একবিংশতি সহস্র বৰ্ম্মধারী পদাতি লইয়া আমার ছয় ক্রোশ অন্তরে অবস্থান কর। তথায় পাণ্ডবের কথা দূরে থাকুক, ইন্দ্রাদি দেবগণও তোমাকে আক্রমণ করিতে সমর্থ হইবে না; অতএব তুমি আশ্বাসিত হও। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ দ্রোণের বাক্যে আশ্বাসিত হইয়া গান্ধারদেশীয় মহারথ ও বৰ্ম্মধারী পাশাপাশি অশ্বারোহিগণ সমভিব্যাহারে দ্রোণনিদ্দিষ্ট স্থানে গমন করিলেন। চামরালঙ্কৃত সুবর্ণবিভূষিত ত্রিসহস্র সিন্ধুদেশীয় অশ্ব ও সপ্তসহস্র অন্যবিধ অশ্ব তাঁহার সমভিব্যাহারে গমন করিতে লাগিল।
হে মহারাজ। তখন আপনার পুত্র দুর্মর্ষণ সুনিপুণ আরোহী সমারূঢ়, বৰ্ম্মধারী ভীষণাকার সার্দ্ধসহস্র মত্তমাতঙ্গ লইয়া যুদ্ধার্থে সমুদায় সৈন্যের অগ্রভাগে অবস্থান করিতে লাগিলেন। আপনার পুত্র দুঃশাসন ও বিকর্ণ সিন্ধুরাজের অর্থসিদ্ধির নিমিত্ত অগ্রগামী সৈন্যগণের মধ্যে রহিলেন; ঐ সময় মহাবীর দ্রোণাচার্য্য মহাবল পরাক্রান্ত অসংখ্য ভূপতি এবং বহুসংখ্যক রথ, অশ্ব, গজ ও পদাতিদ্বারা এক ব্যূহ রচনা করিলেন। ঐ ব্যূহের পূর্ব্বাদ্ধ শকটাকার ও পশ্চার্দ্ধ চক্রাকার; উহার দৈর্ঘ্য চতুর্বিংশতি ক্রোশ ও পশ্চার্দ্ধের বিস্তৃতি দশ ক্রোশ। মহাবীর দ্রোণ ঐ ব্যূহের পশ্চার্দ্ধস্থিত পদ্মাকৃতি ব্যূহমধ্যে সূচী নামে দুর্ভেদ্য গূঢ় এক ব্যূহ নির্মাণ করিলেন। ধনুর্দ্ধারী মহাবীর কৃতবর্মা সূচীমুখে সমবস্থিত হইলেন, কৃতবর্ম্মার পশ্চাৎ কাম্বোজ ও জলসন্ধ এবং তৎপশ্চাৎ রাজা দুর্য্যোধন ও কর্ণ অবস্থান করিতে লাগিলেন। শত সহস্র যুদ্ধবিশারদ বীরপুরুষ শকটের অগ্রভাগ রক্ষায় নিযুক্ত হইলেন। মহারাজ জয়দ্রথ অসংখ্য সৈন্যের সহিত তাহাদের সকলের পশ্চাৎ সেই সূচীনামক গূঢ় ব্যূহের পার্শ্বে অবস্থান করিলেন। মহাবাহু দ্রোণাচার্য্য শ্বেতবৰ্ম্ম ও উৎকৃষ্ট উষ্ণীষ ধারণপূর্ব্বক শরাসন বিস্ফারণ করত ক্রুদ্ধ অন্তকের ন্যায় শকটের মুখে অবস্থান করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণ স্বয়ং তাঁহাকে রক্ষা করিতে লাগিলেন। আচার্য্যের রক্তাশ্বযুক্ত রথ এবং বেদী ও কৃষ্ণাজিন-সম্পন্ন ধ্বজ নিরীক্ষণ করিয়া কৌরবগণের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। সিদ্ধ ও চারণগণ সেই দ্রোণনিৰ্ম্মিত ক্ষুব্ধার্ণবসদৃশ অদ্ভুত ব্যূহ অবলোকন করিয়া সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। সমুদায় প্রাণিগণের বোধ হইল যে, এই ব্যূহ শৈল, সাগর ও অরণ্য সমাকুল বিবিধ জনপদপূর্ণ এই পৃথিবীকে গ্রাস করিতে পারে। মহারাজ দুর্য্যোধন সেই অসংখ্য রথী, পদাতি, অশ্ব ও নাগে সমাকীর্ণ, ভয়ঙ্কর অরাতিগণের হৃদয়-ভেদকারী অদ্ভুত শকটব্যূহ অবলোকন করিয়া যাহার পর নাই আনন্দিত হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে সৈন্যসমুদায় যথাস্থানে সংস্থাপিত হইলে সংগ্রামস্থলে ভেরী মৃদঙ্গ প্রভৃতি বহুবিধ বাদ্যোদ্যম হইতে লাগিল। সেনাগণের গভীর গর্জন বাদিত্রের নিম্বন ও শঙ্খের ভীষণ শব্দে সমরক্ষেত্র পরিপূর্ণ হইল এবং ভরতবংশীয় বীরগণ ক্রমে ক্রমে সমরস্থল আচ্ছাদিত করিলেন। হে মহারাজ! সেই ভীষণ সমরে সব্যসাচী অর্জুন রণক্ষেত্রে লক্ষিত হইলেন। তাঁহার সম্মুখে অসংখ্য কৃষ্ণবর্ণ বায়স ক্রীড়া করিতে লাগিল। আমাদের সেনাগণের দক্ষিণপার্শ্বে অশিবদর্শন শিবা ও ঘোর দর্শন অন্যান্য পশুগণ ভয়ঙ্কর স্বরে চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। সেই ভয়াবহ সময়ে সহস্র সহস্র নির্ঘাতধ্বনিও উত্থিত হইতে লাগিল। সসাগরা পৃথিবী কম্পিতা হইল, সনির্ঘাত রুক্ষ বায়ু মহাবেগে কর্করসমুদায় সঞ্চালন করত প্রবাহিত হইতে লাগিল।
তখন নকুলপুত্র সুবিজ্ঞ শতানীক ও ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডব সৈন্যের ব্যূহ রচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। হে মহারাজ! ঐ সময় আপনার পুত্র দুর্মূর্ষণ সহস্র রথ, শত হস্তী, ত্রিসহস্র অশ্ব ও দশসহস্র পদাতি দ্বারা সার্দ্ধসহস্র ধনুঃ পরিমিত ভূমি সমাচ্ছন্ন করিয়া সর্ব্বসৈন্যের অগ্রভাগে অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি গর্বিত বাক্যে কহিলেন, হে বীরগণ! বেলা যেমন সমুদ্রবেগ নিবারণ করে, সেরূপ অদ্য আমি গাণ্ডীবধারী যুদ্ধদুৰ্ম্মদ প্রতাপ-শালী অর্জুনকে নিবারণ করিব। আজি তোমরা সংগ্রামে অমর্ষ-শীল ধনঞ্জয়কে প্রস্তরে সংলগ্ন পর্ব্বত শৃঙ্গের ন্যায় অবলোকন করিবে। হে যুদ্ধাভিলাষী রথিগণ! তোমাদের কাহারও যুদ্ধ করিবার প্রয়োজন নাই। আমি একাকী পাণ্ডব পক্ষীয় সমুদায় বীরগণের সহিত সংগ্রাম করিয়া স্বীয় যশঃ ও মান বর্দ্ধন করিব। ধনুর্দ্ধারী মহামতি দুৰ্ম্মর্ষণ এই বলিয়া ধনুর্দ্ধরগণে পরিবৃত হইয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন বিচিত্র কবচ, সুবর্ণময় কিরীট, শুভ্র মাল্য, শুভ্র বসন, উত্তম অঙ্গদ ও মনোহর কুণ্ডলে বিভূষিত, খড়াধারী, উত্তম রথারূঢ় নারায়ণসহায় নিবাতকবচনিহন্তা মহাবীর ধনঞ্জয় দুৰ্ম্মর্ষণের বাক্যে ক্রুদ্ধ হইয়া গাণ্ডীব বিধুনন করিতে লাগিলেন। তৎকালে তাঁহাকে অমর্ষণ' অন্তকের ন্যায়, বজ্রধারী বাসবের ন্যায়, কালপ্রেরিত দণ্ডপাণি যমের ন্যায়, অক্ষোভ্য শূলপাণির ন্যায়, পাশধারী বরুণের ন্যায়, প্রজা-সংজিহীর্ষু যুগান্তকালীন হুতাশনের ন্যায় ও সমুদিত দিনকরের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। তিনি কৌরবসৈন্যের সম্মুখে রথ সংস্থাপনপূর্ব্বক শঙ্খধ্বনি করিলেন। তখন মহাত্মা মধুসূদনও অশঙ্কিতচিত্তে শঙ্খপ্রধান পাঞ্চজন্য প্রশ্নাপিত করিতে লাগিলেন। কৃষ্ণার্জুনের শঙ্খনিনাদে সেনাগণ রোমাঞ্চিতগাত্র, কম্পিত-কলেবর ও বিচেতনপ্রায় হইল। যেমন অশনিনিস্বনে সমুদায় প্রাণী শঙ্কিত হয়, সেইরূপ কৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খনাদে সমস্ত সৈন্য ভীত হইয়া উঠিল। বাহনসকল মল-মূত্র পরিত্যাগ করিতে লাগিল। হে মহারাজ! এইরূপে সেই দারুণ শঙ্খনাদে সমুদায় বাহন ও সৈন্যগণ উদ্বিগ্ন হইল; কেহ কেহ ভয়ে সংজ্ঞাহীন এবং অনেকে পলায়ন করিতে লাগিল। হে রাজন! অর্জুনের ধ্বজস্থিত কপি তত্ৰত্য অন্যান্য জন্তুগণের সহিত মুখ ব্যাদান--পূর্ব্বক কৌরবসৈন্যগণের ত্রাসোৎপাদন করিয়া মহাশব্দ করিতে আরম্ভ করিল। ঐ সময় কৌরবপক্ষীয় সেনাগণের মধ্যে পুনরায় শঙ্খ, ভেরী, মৃদঙ্গ ও আণক প্রভৃতি নানাপ্রকার হর্ষজনক বাদিত্র বাদিত হইতে লাগিল। বাদিত্রনিস্বন, সিংহনাদ, আস্ফোট ও মহারথগণের চীৎকারে সংগ্রামস্থল পরিপূর্ণ হইল। হে রাজন! ইন্দপুত্র অর্জুন সেই ভীরুগণের ভয়বর্দ্ধন তুমুল শব্দ শ্রবণে পরমাহ্লাদিত হইয়া কৃষ্ণকে কহিতে লাগিলেন।
অর্জুন কহিলেন, হে হৃষীকেশ। যে স্থানে দুৰ্ম্মর্ষণ অবস্থান করিতেছে, সেই স্থলে শীঘ্র রথ লইয়া গমন কর। আমি এই গজসৈন্য ভেদ করিয়া অরিবাহিনীর মধ্যে প্রবেশ করিব। তখন মহাবাহু কেশব অর্জুনের আদেশানুসারে দুৰ্ম্মর্ষণের অভিমুখে অশ্বচালন করিলেন। অনন্তর অর্জুনের সহিত কৌরবগণের অতি ভীষণ সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। ঐ যুদ্ধে অসংখ্য রথী, নর ও মাতঙ্গ প্রাণ পরিত্যাগ করিল। মেঘ যেমন পর্ব্বতোপরি বারি বর্ষণ করে, সেইরূপ মহাবীর পার্থ অরাতিগণের উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। কৌরব পক্ষীয় রথিগণও সত্বরে কৃষ্ণ ও অর্জুনের উপর শরজাল বিস্তার করিলেন। তখন মহাবাহু ধনঞ্জয় রোষপরবশ হইয়া শরদ্বারা রথিগণের মস্তক ছেদন করিতে লাগিলেন। দংশিতাধর, উদ্ভ্রান্তনয়ন, কুণ্ডলালঙ্কৃত, উষ্ণীষসুশোভিত, নরমস্তকে ধরাতল সমাকীর্ণ হইয়া গেল; সমন্তাৎ বিকীর্ণ যোদ্ধৃগণের মস্তকসমুদায় পুণ্ডরীকবনের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। স্বর্ণনির্মিত বৰ্ম্মসকল রুধিরাক্ত হইয়া সৌদামিনীমণ্ডিত মেঘমালার ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিল। পরিপক্ক তালফলসকল ধরাতলে নিপতিত হইলে যেরূপ শব্দ হয়, সৈন্যগণের মস্তকসমুদায় রণক্ষেত্রে নিপতিত হওয়াতে সেইরূপ শব্দ সমুত্থিত হইল। কবন্ধগণ কেহ কেহ শরাসন অবলম্বন ও কেহ কেহ খড়া নিষ্কাশনপূর্ব্বক প্রহারো-দ্যত হইয়া দণ্ডায়মান রহিল। বীরপুরুষেরা অর্জুনকে পরাজয় করিতে একাগ্রচিত্ত হইয়া স্ব স্ব শিরঃপতন বৃত্তান্ত অবগত হইতে পারিলেন না। তুরঙ্গমগণের মস্তক, গজযুথের শুণ্ড এবং বীরগণের বাহু ও মস্তকসমুদায়ে রণস্থল সমাচ্ছাদিত হইল।
হে মহারাজ! ঐ সময় আপনার সৈন্যগণ সমুদায় জগৎ অর্জুনময় অবলোকন করত কেহ কেহ এই পার্থ, কেহ কেহ পার্থ কোথায় গমন করিতেছে, বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। এইরূপে সেই যোদ্ধৃগণ কালপ্রভাবে সকলকেই অর্জুন জ্ঞান করিয়া আপনারা পরস্পর পরস্পরকে আঘাত করিতে আরম্ভকরিল। কেহ কেহ স্বয়ং স্বশরীরে অস্ত্রাঘাত করিতে লাগিল। রক্তাক্ত-কলেবর সংজ্ঞাহীন বীরগণ রণশয্যায় শয়ান ও দারুণ বেদনায় একান্ত কাতর হইয়া স্ব স্ব বান্ধবগণের নাম কীর্ত্তন করত আর্তনাদ করিতে আরম্ভ করিল। ভিন্দিপাল, পাশ, শক্তি, ঋষ্টি, পরশু, নির্ব্যহ, খড়া, শরাসন, তোমর, বাণ, বৰ্ম্ম, আভরণ, গদা ও অঙ্গদযুক্ত ভীষণ ভুজগাকার অর্গলপ্রতিম বাহুসকল বাণনিকৃত্ত' হইয়া কখন সমুত্থিত কখনও বা মহাবেগে বিলুণ্ঠিত হইতে লাগিল। ফলতঃ তৎকালে যে যে ব্যক্তি পার্থের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, পার্থের শরনিকর তাহাদের সকলের শরীরে প্রবিষ্ট হইয়া তাহাদিগকে সংহার করিল। ঐ সময় মহাবীর অর্জুন কখন যে রথোপরি নৃত্য করিতেছেন, আর কখনই বা শরাসন গ্রহণ করিতেছেন, তাহার কিছুমাত্র বিশেষ লক্ষিত হইল না। তিনি হস্তলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক অতি সত্বরে শরনিক্ষেপ করিয়া রণভূমিস্থ সমুদায় বীরগণকেই বিস্ময়াবিষ্ট করিলেন। অসংখ্য হস্তী, গজনিয়ন্তা', অশ্ব, অশ্বারোহী, রথী ও সারথি অর্জুনের নিশিত শরে বিনষ্ট হইতে লাগিল। পাণ্ডুতনয় সেই রণস্থলে কি ভ্রমণকারী, কি যুধ্যমান, কি সম্মুখে সমুপস্থিত সকলকেই যমসদনে প্রেরণ করিলেন। মরীচিমালী গগনমণ্ডলে সমুদিত হইয়া যেমন গাঢ়ান্ধকার বিনষ্ট করেন, সেইরূপ মহাবীর অর্জুন কঙ্কপত্রবিভূষিত শরনিকরদ্বারা সমস্ত গজসৈন্য সংহার করিতে লাগিলেন। পার্থশরনির্ভিন্ন করিসমুদায় রণক্ষেত্রে নিপতিত হওয়াতে বোধ হইল, পৃথিবী প্রলয়কালে ভূধরে সমাকীর্ণ হইয়াছে।
হে মহারাজ! ঐ সময় রোষাবিষ্ট মহাবীর ধনঞ্জয় মধ্যাহ্ন কালীন সূর্য্যের ন্যায় শত্রুগণের দুর্নিরীক্ষ্য হইয়া উঠিলেন। কৌরবসৈন্যগণ তাঁহার শরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া শঙ্কিত-চিত্তে সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিল। বেগবান্ বায়ু যেমন মেঘমণ্ডল ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলে, সেইরূপ মহাবীর ধনঞ্জয় কৌরবসৈন্য বিমদ্দিত করিলেন। রথী ও অশ্বারোহিগণ অর্জুনশরে নিপীড়িত হইয়া প্রতোদ', চাপকোটি, হুঙ্কার, কশাঘাত, পার্ষিঘাত ও উগ্র বাক্যদ্বারা রথসঞ্চালন করত সত্বরে পলায়ন করিতে লাগিল; গজারোহিগণ পাদাঙ্গুষ্ঠ ও অঙ্কুশ প্রহারদ্বারা মাতঙ্গগণকে সঞ্চালিত করত দ্রুতবেগে ধাবমান হইল এবং অনেকে অর্জুনের শরে বিমোহিত হইয়া তাঁহার অভিমুখে গমন করিতে আরম্ভ করিল। হে মহারাজ! এইরূপে আপনার পক্ষীয় বীরগণ হতোৎসাহ ও বিমনায়মান হইতে লাগিল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। এইরূপে মহাবীর কিরীটী অস্মৎপক্ষীয় সৈন্যগণকে সংহার করিতে আরম্ভ করিলে কোন কোন্ বীর সেই সমরে ধনঞ্জয়ের সম্মুখীন হইয়াছিল? তৎকালে কোন মহাবীর কি অর্জুনের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন, অথবা সকলেই কি তাঁহার নিকট পরাজিত ও হতশ্বাস হইয়া অকুতোভয় মহাবীর দ্রোণাচার্য্যের আশ্রয় গ্রহণের নিমিত্ত শকটব্যূহে প্রবেশ করিলেন?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! ইন্দ্রতনয় ধনঞ্জয় নিশিত শরনিকরদ্বারা সৈন্যসংহারে প্রবৃত্ত হইলে অস্মৎপক্ষীয় অসংখ্য বীর নিহত এবং সকলেই হতোৎসাহ ও পলায়ন-পরায়ণ হইল; কেহই অর্জুনকে অবলোকন করিতে সমর্থ হইল না। তখন আপনার পুত্র মহাবীর দুঃশাসন সৈন্যগণের তদ্রূপ অবস্থা অবলোকন করিয়া ক্রোধভরে যুদ্ধার্থ অর্জুনাভিমুখে গমন করিলেন। ঐ সুবর্ণ-কবচ-সমাবৃত, সুবর্ণশিরস্ত্রাণধারী, অমিত-পরাক্রম মহাবীর অসংখ্য নাগ-সৈন্যদ্বারা সব্যসাচীকে পরিবৃত করিতে লাগিল। গজঘণ্টার শব্দ, শঙ্খের ধ্বনি, জ্যাস্ফালননিনাদ ও করিবৃংহিতদ্বারা ভূমণ্ডল, দিঘণ্ডল ও আকাশমণ্ডল সমাচ্ছন্ন হইল। হে মহারাজ! ঐ মুহূর্ত্ত অতি ভীষণ হইয়া উঠিল। দুঃশাসনের করিসৈন্য যেন পৃথিবীমণ্ডল গ্রাস করিতে লাগিল।
পুরুষশ্রেষ্ঠ ধনঞ্জয় অঙ্কুশচালিত লম্বিতশুণ্ড গজগণকে পক্ষবিশিষ্ট পর্ব্বতের ন্যায় ক্রোধভরে আগমন করিতে দেখিয়া উচ্চস্বরে সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক তাহাদের উপর শরনিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন এবং মকর যেমন উত্তাল-তরঙ্গ-মালাসঙ্কুল, বাতাহত মহাসাগরে প্রবেশ করে, তদ্রূপ সেই করিসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। সমরাঙ্গনস্থ সকলেই তাঁহাকে প্রলয়কালীন মার্তণ্ডের ন্যায় অবলোকন করিতে লাগিল। অশ্বগণের খুরশব্দ, রথসমুদায়ের চক্রনির্ঘোষ, জনসমূহের চীৎকার, কাৰ্ম্মকের জ্যানির্ঘোষ, নানাবিধ বাদিত্রের শব্দ, গাণ্ডীবনিনাদ এবং পাঞ্চজন্য ও দেবদত্ত শঙ্খের নিস্বনে নর ও নাগগণ মন্দবেগ ও অচেতন হইয়া পড়িল। মহাবীর ধনঞ্জয় অসংখ্য সায়কদ্বারা তাহাদের কলেবর ভেদ করিতে লাগিলেন। কুঞ্জরগণ গাণ্ডীব নিক্ষিপ্ত শত শত তীক্ষ্ণ বিশিখপ্রহারে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ হইয়া ঘোরতর চীৎকার করত ছিন্নপক্ষ অদ্রির ন্যায় অনবরত ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল। অনেক হস্তী দন্ত ও শুণ্ডের সন্ধি, কুম্ভ এবং গণ্ডদেশে দারুণ আঘাত প্রাপ্ত হইয়া রাক্ষসের ন্যায় বারংবার চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল।
তখন মহাবীর কিরীটী সন্নতপর্ব্ব ভল্লদ্বারা গজারূঢ় পুরুষগণের মস্তক ছেদন করিতে লাগিলেন। গজারোহিগণের কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তকসকল ধরাতলে নিপতিত হইতে আরম্ভহইলে বোধ হইল যেন, মহাত্মা পার্থ পদ্মনিচয়দ্বারা দেবার্চ্চনা করিতেছেন। মাতঙ্গগণ রণস্থলে ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিলে মনুষ্যগণ যন্ত্রবদ্ধ, ব্রণার্ত ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া করিগণের অঙ্গে লম্বমান হইতে লাগিল। ঐ যুদ্ধে অনেকবার অর্জুনের এক সুশাণিত শরে দুই তিন জন মনুষ্য বিদীর্ণ হইয়া ধরাতলে নিপতিত হইল। হস্তিগণ নারাচদ্বারা গাঢ় বিদ্ধ হইয়া রুধির বমন করত আরোহীর সহিত দ্রুমবান্ পর্ব্বতের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল। মহাবীর অর্জুন সন্নতপর্ব্ব ভল্লদ্বারা রথিগণের মৌর্ব্বী, ধ্বজ, ধনুঃ, যুগ' ও ঈষা' ছেদন করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি যে কখন শরগ্রহণ, কখন শরসন্ধান, কখন শরাকর্ষণ, আর কখনই বা শরমোচন করিতে লাগিলেন, তাহা কিছুমাত্র লক্ষিত হইল না। কেবল এইমাত্র বোধ হইতে লাগিল যে, যেন মহাবীর ধনঞ্জয় শরাসন মণ্ডলাকার করিয়া রণস্থলে নৃত্য করিতেছেন। ঐ সময় অনেক মাতঙ্গ অর্জুনের নারাচে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া রক্তোদ্গার করত ভূতলে শয়ন করিতে লাগিল।
হে মহারাজ! সেই রণস্থলে চতুৰ্দ্দিকেই অসংখ্য কবন্ধ সমুত্থিত হইল। কাৰ্ম্মক, অঙ্গুলিত্র, খড়া, কেয়ূর ও কনকালঙ্কার-ভূষিত ছিন্ন বাহুসকল দৃষ্ট হইতে লাগিল। দিব্য-ভূষণ-ভূষিত আসন, ঈষাদণ্ড, চক্রবিমথিত অক্ষ, ভগ্ন যুগ, নিপতিত মহাধ্বজ, রাশি রাশি মালা, আভরণ ও বস্ত্র এবং রণনিহত অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও চর্মচাপধারী ক্ষত্রিয়গণ ইতস্ততঃ সঙ্কীর্ণ হওয়ায় রণভূমি অতি ঘোরদর্শন হইয়া উঠিল। হে রাজন! এইরূপে দুঃশাসনের সৈন্যগণ অর্জুনশরে নিতান্ত নিপীড়িত ও ব্যথিত হইয়া রণ পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিল। দুঃশাসনও পার্থশরে জর্জরিতাঙ্গ হইয়া সৈন্যগণ-সমভিব্যাহারে দ্রোণের আশ্রয় গ্রহণার্থে শকটব্যূহে প্রবেশ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! সব্যসাচী মহারথ অর্জুন এইরূপে দুঃশাসনের সৈন্য বিনাশ করিয়া সিন্ধুরাজকে আক্রমণ করিবার মানসে দ্রোণাচার্যের সৈন্যাভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং ব্যূহসম্মুখে দ্রোণাচার্য্যকে অবস্থিত দেখিয়া কৃষ্ণের অনুমতিক্রমে কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আপনি আমার মঙ্গল চিন্তা ও কল্যাণ করুন। আমি আপনার প্রসাদে এই দুর্ভেদ্য চমূমধ্যে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা করিতেছি। সত্য বলিতেছি, আমি আপনাকে পিতার সমান, কৃষ্ণের সমান ও জ্যেষ্ঠভ্রাতা ধর্মরাজের সমান জ্ঞান করিয়া থাকি। হে তাত! আপনি অশ্বত্থামাকে যেরূপে রক্ষা করিয়া থাকেন, আমাকেও সর্ব্বদা সেইরূপে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য। আমি আপনার অনুগ্রহে রণস্থলে নরোত্তম সিন্ধুরাজকে বিনাশ করিতে ইচ্ছা করিয়াছি, অতএব আপনি আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করুন।
মহাবীর দ্রোণাচার্য্য অর্জুনের বাক্য শ্রবণে হাস্য করত কহিলেন, হে অর্জুন! তুমি অগ্রে আমাকে জয় না করিয়া কদাচ জয়দ্রথকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে না। দ্রোণাচার্য্য এই বলিয়া হাসিতে হাসিতে তীক্ষ্ণ শরজালদ্বারা অর্জুন ও তাঁহার রথ, অশ্ব, ধ্বজ ও সারথিকে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় ক্ষত্রধৰ্ম্মানুসারে স্বীয় সায়কদ্বারা দ্রোণের শরজাল নিবারণপূর্ব্বক ভীষণাকার বাণসকল নিক্ষেপ করত তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইয়া তাঁহাকে নয় বাণে বিদ্ধ করিলেন। দ্রোণাচার্য্য স্বীয় সায়কদ্বারা অর্জুনের বাণ ছেদনপূর্ব্বক বিষাগ্নি-সদৃশ শরদ্বারা কৃষ্ণ ও অর্জুনকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় মহাত্মা ধনঞ্জয়, কিরূপে আচার্য্যের শরাসন ছেদন করিবেন এই চিন্তা করিতেছেন, ইত্যবসরে বীর্য্যবান্ দ্রোণ সত্বরে তাঁহার চাপজ্যা ছেদনপূর্ব্বক শরদ্বারা রথধ্বজ, ঘোটক ও সারথিকে বিদ্ধ করিয়া সহাস্য বদনে অর্জুনকে সায়কসমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তখন অস্ত্রবিদগ্রগণ্য মহাবীর পার্থ সত্বরে কার্মুকে অপর জ্যা আরোপণ করিয়া আচার্য্যকে হস্তলাঘব প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত একেবারে ছয় শত শর নিক্ষেপ করিলেন। পরে কখন সপ্তশত, কখন সহস্র ও কখন অযুত সংখ্যক বাণ নিক্ষেপ করিয়া দ্রোণাচার্য্যের সেনাগণকে বিনাশ করিতে লাগিলেন। অসংখ্য মনুষ্য, মাতঙ্গ ও তুরঙ্গ অর্জুনের শরে বিদ্ধ হইয়া ধরাতলে নিপতিত হইল। রথিগণ ধনঞ্জয়ের শরপ্রভাবে অস্ত্র, ধ্বজ, সারথি ও অশ্ববিহীন এবং নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক রথ হইতে ধরাতলে নিপতিত হইতে লাগিল। মাতঙ্গসকল বজ্রচূর্ণিত পর্ব্বতশৃঙ্গের ন্যায়, বাতাহত মেঘের ন্যায়, হুতাশনদগ্ধ গৃহের ন্যায়, সমরাঙ্গনে নিপতিত হইল। সহস্র সহস্র অশ্ব হিমালয়প্রস্থে বারিবেগাহত হংসকুলের ন্যায় ভূতলশায়ী হইতে লাগিল। যুগান্তকালীন সূর্য্য যেমন কর-কিরণজালদ্বারা অগাধ জলরাশি ক্ষয় করেন, তদ্রূপ মহাবীর পার্থ শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক অসংখ্য রথ, অশ্ব, হস্তী ও পদাতি বিনষ্ট করিলেন।
তখন মেঘ যেমন রবিকিরণ আচ্ছন্ন করে, তদ্রূপ মহাবীর দ্রোণাচার্য্য স্বীয় শরনিকরদ্বারা ধনঞ্জয়ের শরজাল সমাচ্ছন্ন করিয়া তাঁহার বক্ষঃস্থলে এক অরাতিঘাতক নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় আচার্য্যের নারাচপ্রহারে ভূমিকম্পকালীন অচলের ন্যায় ব্যাকুলিত হইলেন এবং অবিলম্বে ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক দ্রোণকে শরবিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণাচার্য্য পাঁচ বাণে বাসুদেবকে ও ত্রিসপ্ততি বাণে অর্জুনকে বিদ্ধ করিয়া তিন শর প্রহারে তাঁহার রথধ্বজ বিপাটিত করিলেন এবং হস্তলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক নিমেষমধ্যে শরবৃষ্টিদ্বারা তাঁহাকে অদৃশ্য করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় আমরা দেখিলাম, দ্রোণাচার্য্যের সায়কসকল অনবরত নিপতিত হইতেছে এবং তাঁহার ভীষণ শরাসন মণ্ডলাকারই রহিয়াছে। হে মহারাজ! দ্রোণবিসৃষ্ট কঙ্কপত্র-ভূষিত শরসকল কেবল বাসুদেব ও ধনঞ্জয়ের প্রতিই ধাবমান হইল।
তখন মহামতি বাসুদেব দ্রোণ ও অর্জুনের সেই ভয়ানক যুদ্ধ সন্দর্শন করিয়া প্রকৃত কার্য্যসাধন চিন্তা করত অর্জুনকে কহিলেন, হে মহাবাহু ধনঞ্জয়! আমাদের আর কালক্ষেপ করা কর্ত্তব্য নয়। দ্রোণের সহিত অনেকক্ষণ সংগ্রাম করা হইয়াছে; অতএব চল উহাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক অন্যত্র গমন করি। মহাবীর অর্জুন কেশবের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহাকে "তোমার যাহা অভিরুচি” এই কথা বলিয়া দ্রোণকে প্রদক্ষিণপূর্ব্বক বাণ পরিত্যাগ করত বিবৃতমুখে গমন করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য অর্জুনকে অন্যত্র গমন করিতে দেখিয়া কহিলেন, হে পাণ্ডব! এক্ষণে কোথায় গমন করিতেছ? তুমি না সমরে শত্রু পরাজয় না করিয়া প্রতিনিবৃত্ত হও না? তখন অর্জুন বলিলেন, হে আচার্য্য! আপনি আমার গুরু, শত্রু নহেন। আমি আপনার পুত্রসমান শিষ্য। বিশেষতঃ আপনাকে যুদ্ধে পরাভব করিতে পারে, এমন কেহই নাই।
জয়দ্রথ-বধোৎসুক মহাবাহু বীভৎসু দ্রোণকে এই কথা বলিয়া সত্বর কৌরবসৈন্যের প্রতি ধাবমান হইলেন। পাঞ্চালদেশীয় মহাত্মা যুধামন্যু ও উত্তমৌজাঃ চক্ররক্ষক হইয়া তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। এইরূপে পুত্রশোকে সন্তপ্ত মহাবল পরাক্রান্ত ধনঞ্জয় জীবিতাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায়, মত্তমাতঙ্গের ন্যায় সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে আরম্ভ করিলে কৌরবপক্ষীয় জয়, কৃতবর্মা, সাত্ত্বত, কাম্বোজ ও শ্রুতায়ুঃ তাঁহাকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন ঐ বীরগণের অনুগামী দশ সহস্র রথী এবং অভীষাহ, শূরসেন, শিবি, বশাতি, মাবেল্লক, ললিখ, কৈকেয়, মদ্রক, নারায়ণ, গোপাল ও পূর্ব্বে কর্ণকর্তৃক পরাজিত কাম্বোজদেশীয় বীরগণ দ্রোণাচার্য্যকে পুরোবর্তী করিয়া প্রাণপণে বিচিত্র যোদ্ধা নরশ্রেষ্ঠ অর্জুনকে নিবারণ করিতে প্রবৃত্ত হইল; এইরূপে পরস্পর স্পর্দ্ধাশীল যোদ্ধারা সকলে মিলিত হইয়া অর্জুনের সহিত লোমহর্ষণ তুমুল যুদ্ধ করত ঔষধাদি যেমন ব্যাধি নিবারণ করে, তদ্রূপ জয়দ্রথবধোৎসুক ধনঞ্জয়কে নিবারণ করিতে আরম্ভকরিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে কৌরবসৈন্যগণ অর্জুনকে প্রতিরোধ ও মহাবীর দ্রোণাচার্য্য দ্রুতবেগে তাঁহার অনুসরণ করিতে আরম্ভ করিলে রথিশ্রেষ্ঠ মহাবল পরাক্রান্ত পার্থ ব্যাধিগণ যেমন দেহ সন্তাপিত করে, তদ্রূপ সূর্য্যরশ্মিসন্নিভনিশিত শরনিকরদ্বারা শত্রুসৈন্যকে নিতান্ত তাপিত করিতে লাগিলেন। প্রতাপশালী পাণ্ডুতনয়ের বিষম বিশিখপ্রভাবে কৌরবপক্ষীয় অশ্বসকল গাঢ়বিদ্ধ, রথসমুদায় ছিন্ন ভিন্ন, আরোহী সমবেত কুঞ্জরগণ ধরাতলে নিপতিত, ছত্রসকল নিকৃত্ত ও রথসকল চক্রবিহীন হইল। সৈন্যগণ অর্জুনের শরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া চতুৰ্দ্দিকে পলায়ন করিতে লাগিল। হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর ধনঞ্জয় তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ করিলে তাঁহার শরজালপ্রভাবে সংগ্রামস্থলে আর কিছুই লক্ষিত হইল না। তখন তিনি আপন প্রতিজ্ঞা সত্য করিবার মানসে অজিহ্মগামী' বাণদ্বারা সেই কৌরববাহিনী কম্পিত করিয়া মহারথ দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। মহাবীর দ্রোণ স্বশিষ্য অর্জুনের উপর মর্মভেদী অজিহ্মগামী পঞ্চবিংশতি বাণ নিক্ষেপ করিলেন। অস্ত্রবিদ্যাগ্রগণ্য ধনঞ্জয় শর নিক্ষেপপূর্ব্বক দ্রোণের শরবেগ নিবারণ করত ধাবমান হইলেন এবং সন্নতপর্ব্ব ভল্লদ্বারা আচার্য্যের ভল্লাস্ত্র ছেদনপূর্ব্বক ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করিলেন। হে মহারাজ! রণস্থলে দ্রোণাচার্য্যের এই এক আশ্চর্য্য নিপুণতা দেখিলাম যে, যুবা অর্জুন যুদ্ধে সাধ্যানুসারে যত্ন করিয়াও কোনক্রমে তাঁহাকে বিদ্ধ করিতে পারিলেন না। মহামেঘ যেমন পর্ব্বতোপরি অনবরত বারি বর্ষণ করে, তদ্রূপ মহাবীর দ্রোণ পার্থের উপর শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাতেজাঃ অর্জুনও ব্রহ্মাস্ত্রদ্বারা আচার্য্যের সায়কসমুদায় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন দ্রোণাচার্য্য অর্জুনকে পঞ্চবিংশতি বাণে বিদ্ধ করিয়া বাসুদেবের বক্ষঃস্থলে ও ভুজদ্বয়ে সপ্ততি বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মতিমান্ ধনঞ্জয় তদ্দর্শনে হাস্য করিয়া শাণিত সায়কবর্ষী আচার্য্যকে নিবারণ করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহারথ বাসুদেব ও অর্জুন কল্পান্তকালীন অগ্নি-সদৃশ দ্রোণের শর প্রহারে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া তাঁহাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক ভোজরাজের সৈন্যাভিমুখে ধাবমান হইলেন।
মহাবীর ধনঞ্জয় এইরূপে দ্রোণের শরনিকর হইতে মুক্ত হইয়া ভোজসৈন্যের উপর বাণ নিক্ষেপ করত কৃতবর্মা ও কাম্বোজ-রাজ সুদক্ষিণের মধ্যস্থলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন নরশ্রেষ্ঠ কৃতবর্মা অনাকুলিত চিত্তে কঙ্কপত্রভূষিত দশ শরদ্বারা দুর্দ্ধর্ষ অর্জুনকে বিদ্ধ করিলে অর্জুনও শরপীড়িত হইয়া প্রথমে শত ও তৎপরে তিন বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক কৃতবর্মাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর কৃতবর্ম্মা, কৃষ্ণ ও অর্জুনের প্রত্যেকের উপর পঞ্চবিংশতি শর প্রয়োগ করিয়া হাস্য করিতে লাগিলেন। মহাবীর অর্জুন তদ্দর্শনে রোষাবিষ্ট হইয়া সত্বরে কৃতবর্মার কাৰ্ম্মক ছেদনপূর্ব্বক ক্রুদ্ধ আশীবিষসদৃশ অগ্নি-শিখাকার একবিংশতি শর দ্বারা তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। মহারথ কৃতবর্মা অবিলম্বে অন্য এক শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক পাঁচ বাণে অর্জুনের বক্ষঃস্থল ভেদ ও পুনরায় তাঁহার উপর শাণিত পাঁচ বাণ নিক্ষেপ করিয়া বীরনাদ করিতে লাগিলেন। মহাবীর অর্জুনও কৃতবর্মার বক্ষঃস্থলে নয় বাণ নিক্ষেপ করিলেন।
মহামতি কেশব অর্জুনকে কৃতবর্মার সহিত বহুক্ষণ সংগ্রাম করিতে দেখিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, আমাদিগের আর কালবিলম্ব করা কর্তব্য নয়। তখন তিনি অর্জুনকে কহিলেন, হে পার্থ! কৃতবর্মার প্রতি দয়া করিবার প্রয়োজন নাই, সম্বন্ধের অনুরোধ পরিত্যাগপূর্ব্বক সত্বরে উহাকে সংহার কর। মহাবীর অর্জুন কেশববাক্যে অবিলম্বে শর নিক্ষেপপূর্ব্বক কৃতবর্মাকে মূর্ছিত করিয়া মহাবেগে কাম্বোজ সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। মহাবীর কৃতবর্ম্মা ধনঞ্জয়কে সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট দেখিয়া সশর শরাসন কম্পিত করত তাঁহার চক্ররক্ষক পাঞ্চালদেশীয় যুধামন্যু ও উত্তমৌজাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তিনি যুধামন্যুর উপর তিন ও উত্তমৌজার উপর চারি বাণ নিক্ষেপ করিলেন। তখন তাঁহারা উভয়ে কৃতবর্মাকে দশ দশ শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় তিন তিন শর নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার রথের ধ্বজ ও কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর কৃতবর্মা তদ্দর্শনে ক্রোধে অধীর হইয়া সত্বরে অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক সেই বীরদ্বয়ের ধনুচ্ছেদন করিয়া তাঁহাদের উপর অসংখ্য বাণ বর্ষণ করিলেন।
তখন তাঁহারাও অন্য কার্মুকে জ্যা রোপণপূর্ব্বক তাঁহাকে প্রহার করিতে লাগিলেন।
ইত্যবসরে মহাবীর অর্জুন অরাতিসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। মহাবীর যুধামন্যু ও উত্তমৌজাঃ কৌরবসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইতে যাহার পর নাই চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু কৃতবর্মার শরে নিবারিত হইয়া কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। অরিনিসূদন ধনঞ্জয় কৌরবসৈন্যগণমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া সত্বরে তাহাদিগকে সংহার করিতে আরম্ভ করিলেন; কৃতবর্ম্মাকে সম্মুখে প্রাপ্ত হইয়াও বিনাশ করিলেন না। মহাবীর রাজা শ্রুতায়ুধ পার্থকে কৌরবসৈন্যমধ্যে গমন করিতে দেখিয়া ক্রোধভরে শরাসন কম্পিত করত সত্বরে তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহার উপর তিন ও জনাৰ্দ্দনের উপর সপ্ততি সায়ক নিক্ষেপপূর্ব্বক সুতীক্ষ্ণ ক্ষুরপ্রদ্বারা অর্জুনের ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া যেমন মহামাত্র' হস্তীর উপর অঙ্কুশাঘাত করে, তদ্রূপ শ্রুতায়ুধের উপর নতপর্ব্ব নবতি সায়ক নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর শ্রুতায়ুধ অর্জুনের পরাক্রম দর্শনে নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার উপর সপ্তসপ্ততি নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত পাণ্ডুতনয় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া শ্রুতায়ুধের ধনুঃ ও তৃণীর ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং সাত বাণে তাহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিয়া ক্রোধভরে গর্জন করিতে লাগিলেন। মহাবীর শ্রুতায়ুধ পাণ্ডবের পরাক্রম দর্শনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া সত্বরে অন্য কার্মুক গ্রহণপূর্ব্বক নয়বাণে অর্জুনের বাহু ও বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। তখন অরাতিনিসূদন মহাবল পরাক্রান্ত মহারথ ধনঞ্জয় শ্রুতায়ুধের উপর সপ্ততি নারাচ ও সহস্র সহস্র শর নিক্ষেপ-পূর্ব্বক সত্বরে তাহার সারথি ও অশ্বগণকে বিনাশ করিয়া হাস্য করিতে লাগিলেন। বলবীর্য্যসম্পন্ন মহারাজ শ্রুতায়ুধ এইরূপে পার্থের শরে অশ্বহীন ও সারথিবিহীন হইয়া ক্রোধভরে রথ পরিত্যাগপূর্ব্বক গদা হস্তে পার্থের অভিমুখে ধাবমান হইলেন।
হে মহারাজ! ঐ শ্রুতায়ুধ মহীপতি বরুণের পুত্র। শীততোয়ামহানদী পর্ণাশা উহার জননী। মহানদী পর্ণাশা এই পুত্র অরাতিগণের অবধ্য হউক, বলিয়া বরুণের নিকট বর প্রার্থনা করিলে তিনি প্রীত হইয়া কহিলেন, সরিদ্বরে! আমি এই দিব্যাস্ত্র প্রদান করিতেছি, ইহার প্রভাবেই তোমার পুত্র অবধ্যতা লাভ করিবে। হে ভদ্রে। মনুষ্য কদাচ অমর হইতে পারে না। এই ভূমণ্ডলে যে জন্ম পরিগ্রহ করিয়াছে, তাহাকে অবশ্যই কালকবলে পতিত হইতে হইবে। যাহা হউক, আমি বলিতেছি, তোমার এই পুত্র দুই অস্ত্রের প্রভাবে রণস্থলে শত্রুদিগের অজেয় হইবে; তুমি মনোদুঃখ পরিত্যাগ কর। বরুণদেব এই বলিয়া শ্রুতায়ুধকে মন্ত্রের সহিত গদা প্রদান করিলেন। শ্রুতায়ুধ গদা গ্রহণ করিলে ভগবান্ জলাধিপতি কহিলেন, বৎস শ্রুতায়ুধ। যে ব্যক্তি যুদ্ধে প্রবৃত্ত না হইবে, তাহার উপর এই গদা কদাচ প্রয়োগ করিও না; যদি কর, তাহা হইলে ইহা প্রতীপগামিনী হইয়া তোমাকেই বিনাশ করিবে।
হে মহারাজ! মহাবীর শ্রুতায়ুধ সেই বরুণদত্ত গদা-প্রভাবেই ত্রিলোকমধ্যে দুর্জয় হইয়া উঠেন। তিনি সেই গদা সমুদ্যত করিয়া অর্জুনের রথাভিমুখে ধাবমান হইলেন। কিন্তু দৈবদুর্বিপাকবশতঃ জলাধিপতির বাক্য রক্ষা না করিয়া তদ্দ্বারা জনাৰ্দ্দনকে প্রহার করিলেন। মহাবীর বাসুদেব অনায়াসে স্বীয় পীন স্কন্ধদেশে সেই গদাঘাত সহ্য করিলেন। প্রবল বায়ু যেমন বিন্ধ্যগিরিকে কম্পিত করিতে অসমর্থ হয়, তদ্রূপ সেই গদা মধুসূদনকে কম্পিত করিতে পারিল না; প্রত্যুত বরুণের বাক্যা-নুসারে উহা প্রত্যাগমনপূর্ব্বক অমর্ষণ মহাবীর শ্রুতায়ুধকে শমন-সদনে প্রেরণ করিয়া ধরাতলে নিপতিত হইল। গদা প্রতিনিবৃত্তি ও অরাতিনিপাতন শ্রুতায়ুধকে নিহত দেখিয়া কৌরবসৈন্যমধ্যে হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল। হে মহারাজ। মহাবীর শ্রুতায়ুধ সমরপরাজুখ কেশবকে গদাপ্রহার করিয়া-ছিলেন বলিয়াই জলাধিরাজের বাক্যানুসারে স্বীয় গদাঘাতেই প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক সমুদায় ধনুর্দ্ধরগণ সমক্ষে বায়ুবেগে ভগ্ন বনস্পতির ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইলেন। কৌরবপক্ষীয় সমস্ত সৈন্য ও সেনাপতিগণ শত্রুতাপন শ্রুতায়ুধকে নিহত দেখিয়া চতুৰ্দ্দিকে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন।
তখন কাম্বোজরাজের পুত্র মহাবীর সুদক্ষিণ মহাবেগ-শালী অশ্বসংযোজিত রথে আরোহণ করিয়া অরিনিসূদন অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর পার্থ সুদক্ষিণকে সমাগত দেখিয়া তাঁহার উপর সাত বাণ নিক্ষেপ করিলে শরসকল বৰ্ম্ম ভেদ করিয়া ধরাতলে প্রবেশ করিল। মহাবীর সুদক্ষিণ গাণ্ডীবপ্রেরিত তীক্ষ্ণশরে গাঢ়বিদ্ধ হইয়া ক্রোধভরে প্রথমতঃ অর্জুনকে দশ ও বাসুদেবকে তিন শরে বিদ্ধ করিয়া তৎপরে পুনরায় অর্জুনের উপর পাঁচ বাণ নিক্ষেপ করিলেন।
তখন মহাবীর ধনঞ্জয় সুদক্ষিণের ধনুঃ ও রথধ্বজ ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে দুই সুতীক্ষ্ণ ভল্লদ্বারা বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর সুদক্ষিণ অর্জুনের ভল্লাঘাতে ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে তিন বাণে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার উপর এক অতি ভয়ানক ঘণ্টাযুক্ত লৌহময় শক্তি নিক্ষেপপূর্ব্বক সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। সুদক্ষিণনিক্ষিপ্ত মহাশক্তি প্রজ্বলিত মহোল্কার ন্যায় মহারথ অর্জুনের উপর নিপতিত হইয়া কলেবর বিদারণপূর্ব্বক ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল। মহাতেজাঃ অর্জুন শক্তির আঘাতে মূর্ছিতপ্রায় হইলেন এবং ক্ষণকালমধ্যে প্রকৃতিস্থ হইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক সৃক্কণী' লেহন করত কঙ্কপত্রালঙ্কৃত চতুৰ্দ্দশ নারাচদ্বারা সুদক্ষিণকে এবং তাঁহার অশ্ব, ধ্বজ, ধনুঃ ও সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে ভূরি ভূরি অস্ত্র নিক্ষেপপূর্ব্বক রথ খণ্ড খণ্ড করিয়া সুতীক্ষ্ণ সায়কদ্বারা তাঁহার হৃদয় বিদীর্ণ করিয়া ফেলিলেন। ধনঞ্জয়ের বিষম শরপ্রভাবে কাম্বোজরাজতনয় সুদক্ষিণের বর্ম ছিন্ন, গাত্র শিথিল এবং মুকুট ও অঙ্গদ পরিভ্রষ্ট হইল। তিনি যন্ত্রমুক্ত ধ্বজের ন্যায় ধরাশয্যা গ্রহণ করিলেন। বসন্তাগমে পর্ব্বতশিখরজাত শাখাবৃত কর্ণিকার যেমন বায়ুবেগে ভগ্ন হইয়া নিপতিত হয়, সেইরূপ কাম্বোজরাজতনয় সমরাঙ্গনে নিপতিত হইলেন। সেই মহাহাভরণ-ভূষিত তপ্তকাঞ্চন-মালালঙ্কৃত প্রিয়দর্শন, তাম্রলোচন মহাবীর অর্জুনের শরে প্রাণত্যাগ করিয়া ধরাশয্যা গ্রহণ করিলে বোধ হইতে লাগিল, সানুমান্ পৰ্ব্বত রণস্থলে সমবস্থিত রহিয়াছে। হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর শ্রুতায়ুধ ও কাম্বোজরাজতনয় সুদক্ষিণ নিহত হইলে দুর্য্যোধনের সমুদায় সৈন্যগণ মহাবেগে ধাবমান হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর সুদক্ষিণ ও শ্রুতায়ুধের নিধন দর্শনে কৌরবপক্ষীয় সমস্ত সৈনিক পুরুষেরা ক্রোধভরে মহাবেগে অর্জুনের অভিমুখে গমন করিতে লাগিল। অভিযাহ, শূরসেন, শিবি, বশাতিদেশীয় বীরগণ সকলেই ধনঞ্জয়ের উপর সত্বরে শরবর্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় এককালে তাহাদিগের যষ্টিশত সেনাকে শরনিপীড়িত করিলেন। যেমন ক্ষুদ্র মৃগ ব্যাঘ্রভয়ে পলায়ন করে, তদ্রূপ কৌরবসৈন্যগণ অর্জুনের ভয়ে ভীত হইয়া রণস্থল হইতে পলায়ন করিতে লাগিল এবং পুনরায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া চতুৰ্দ্দিক্ হইতে সমরবিজয়ী শত্রুনাশন অর্জুনকে অবরোধ করিল। তখন মহাবল পরাক্রান্ত ধনঞ্জয় গাণ্ডীবনির্মুক্ত শরনিকরদ্বারা অরাতি-সৈন্যগণের বাহু ও মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর অর্জুনের শরে অসংখ্য নরমস্তক ছিন্ন ও নিপতিত হওয়াতে রণভূমিমধ্যে মস্তকশূন্য স্থান নয়নগোচর হইল না। সহস্র সহস্র কাক ও গৃধু উড্ডীয়মান হওয়াতে রণস্থল যেন মেঘাচ্ছন্ন হইল।
হে মহারাজ! এইরূপে অর্জুনের শরে সমুদায় কৌরব-সৈন্য উৎসন্ন হইতে আরম্ভ হইলে শ্রুতায়ুঃ ও অচ্যুতায়ুঃ নামে দুই মহাবীর ধনঞ্জয়ের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ বিপুল-পরাক্রম স্পর্ছাশালী সৎকুলোদ্ভব বীরদ্বয় আপনার পুত্রের হিতসাধন ও স্বীয় মহীয়সী কীর্ত্তি লাভের নিমিত্ত অর্জুনকে বিনাশ করিবার মানসে অতি সত্বরে উভয় পার্শ্ব হইতে শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন এবং মেঘ যেমন বারিবর্ষণদ্বারা তড়াগ পরিপূর্ণ করে, তদ্রূপ নতপর্ব্ব সহস্র বাণদ্বারা অর্জুনকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় মহারথ শ্রুতায়ুঃ ক্রোধভরে ধনঞ্জয়ের উপর নিশিত তোমরাস্ত্র নিক্ষেপ করিলেন। শত্রুকর্ষণ অর্জুন দারুণ অস্ত্রাঘাতে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া কেশবকে মোহিতপ্রায় করত স্বয়ং মোহপ্রাপ্ত হইলেন। ইত্যবসরে মহারথ অচ্যুতায়ুঃ অতিতীক্ষ্ণ শূলদ্বারা ধনঞ্জয়কে তাড়িত করিতে লাগিলেন। ক্ষতে ক্ষার প্রদান করিলে যেরূপ কষ্ট হয়, মহাবীর অর্জুন অচ্যুতায়ুর শূলপ্রহারে সেইরূপ কষ্ট অনুভব করত ধ্বজযষ্টি অবলম্বন করিয়া রহিলেন। কৌরবসৈন্যগণ ধনঞ্জয়ের সেইরূপ অবস্থা সন্দর্শনে তাঁহাকে নিহত বোধ করিয়া উচ্চস্বরে সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিল। মহাত্মা কৃষ্ণ পার্থকে বিচেতন দেখিয়া শোকসন্তপ্ত হইয়া মধুর বাক্যে তাঁহাকে আশ্বাসিত করিতে লাগিলেন। ঐ সময় লব্ধলক্ষ্য হইয়া শ্রুতায়ুঃ ও অচ্যুতায়ুঃ বাণবৃষ্টিদ্বারা ধনঞ্জয় ও বাসুদেবকে রথ, চক্র, যুগন্ধর, অশ্ব, ধ্বজ ও পতাকার সহিত সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই আশ্চর্যান্বিত হইল।
হে রাজন! ঐ সময় মহাবীর ধনঞ্জয় পুনর্জীবিতের ন্যায় ক্রমে সংজ্ঞা লাভপূর্ব্বক আপনার রথ ও কেশবকে শরজালে সমাচ্ছন্ন এবং শত্রুদ্বয়কে অচলের ন্যায় সম্মুখে দণ্ডায়মান দেখিয়া ঐন্দ্রান্ত্রের আবির্ভাব করিলেন। সেই অস্ত্র হইতে সহস্র সহস্র নতপর্ব্ব বাণ সমুৎপন্ন হইয়া শ্রুতায়ুঃ ও অচ্যুতায়ুর বাহু ও মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিল। এইরূপে ঐ বীরদ্বয় অর্জুনের শরে নিহত হইয়া বায়ুবেগভগ্ন পাদপদ্বয়ের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইলেন। তাঁহাদের শরসকলও পার্থবাণবিদারিত হইয়া নভোমণ্ডলে বিচরণ করিতে লাগিল। এইরূপে মহাবীর অর্জুন ঐ বীরদ্বয়কে ও তাঁহাদের শরসকল সংহার করিয়া মহারথগণের সহিত যুদ্ধ করত ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! শ্রুতায়ুঃ ও অচ্যুতায়ুর নিধন সমুদ্র শোষণের ন্যায় একান্ত বিস্ময়কর হইয়া উঠিল। তখন মহাত্মা পার্থ ঐ বীরদ্বয়ের পদানুগ পঞ্চাশৎ রথ নিহত করিয়া প্রধান প্রধান যোদ্ধাদিগকে বিনাশ করত কৌরবসেনাগণকে আক্রমণ করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় শ্রুতায়ুঃ ও অচ্যুতায়ুর পুত্র নিয়তায়ুঃ ও দীর্ঘায়ুঃ স্ব স্ব পিতার নিধন দর্শনে শোকে নিতান্ত কর্ষিত হইয়া রোষকষায়িত লোচনে বিবিধ শর নিক্ষেপ করত অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় তদ্দর্শনে ক্রোধে অধীর হইয়া মুহূর্তমধ্যেই সন্নতপর্ব্ব শর নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন এবং মত্তমাতঙ্গ যেমন পদ্মসমবেত সরোবর আলোড়িত করে, তদ্রূপ সেই কৌরব-সৈন্য ছিন্ন ভিন্ন করিতে লাগিলেন। কোন ক্ষত্রিয়ই তাঁহাকে নিবৃত্ত করিতে সমর্থ হইল না। তখন বঙ্গদেশীয় সহস্র সহস্র সুশিক্ষিত ক্রোধনস্বভাব গজারোহীরা এবং পূর্ব্ব, দক্ষিণ ও কলিঙ্গ প্রভৃতি দেশে সমুৎপন্ন ভূপালগণ দুর্য্যোধনের আজ্ঞানুসারে পর্ব্বতপ্রমাণ কুঞ্জরসমুদীয় দ্বারা অর্জুনকে আক্রমণ করিতে লাগিল। গাণ্ডীবধন্বা তদ্দর্শনে ক্রোধভরে সত্বরে তাহাদের মস্তক ও ভূষণালঙ্কৃত বাহুসমুদায় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। সমরভূমি সেই সমুদায় মস্তক ও বাহু দ্বারা সমাচ্ছন্ন হইয়া ভুজগবেষ্টিত কনকশিলার ন্যায় শোভা ধারণ করিল। সায়কোন্মথিত মস্তক ও বাহুসকল বীরগণের দেহ হইতে স্খলিত হইয়া বৃক্ষ হইতে ভূতলে পতনোন্মুখ পক্ষীসমুদায়ের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। শরবিদ্ধ শোণিতস্রাবী কুঞ্জরসকল বর্ষাকালীন গৈরিক ধাতুযুক্ত জলস্রাবী পর্ব্বতসমুদায়ের ন্যায় দৃষ্ট হইল। গজপৃষ্ঠগত বিকৃতদর্শন বিবিধবেশধারী ম্লেচ্ছগণ বিচিত্র নিশিত শরে নিহত হইয়া রুধিরাক্তকলেবরে ভূতলে শয়ন করিতে লাগিল। আরোহী ও পাদরক্ষক সমবেত নারাচ প্রভৃতি নানাবিধ অস্ত্রসম্পন্ন তীক্ষ্ণবিষ আশীবিষসদৃশ সহস্র সহস্র মাতঙ্গ অর্জুনের শরে গাঢ়বিদ্ধ ও ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ হইয়া কতকগুলি শোণিত বমন, কতকগুলি উৎক্রোশ, কতকগুলি শয়ন ও কতকগুলি ভ্রমণ এবং অধিকাংশ অত্যন্ত ভীত হইয়া আপনাদিগকেই মর্দ্দন করিতে আরম্ভ করিল।
তখন বিকটবেশ, বিকটচক্ষুঃ, আসুরিক মায়াভিজ্ঞ যবন, পারদ, শক, বাহীক ও প্রাগজ্যোতিষদেশসম্ভূত নানা যুদ্ধবিশারদ কালান্তক যমসদৃশ ম্লেচ্ছগণ এবং দার্ব্বাতিসার, দরদ ও পুণ্ড্র প্রভৃতি দেশে সঞ্জাত অসংখ্য সৈন্যগণ মহাবীর অর্জুনের উপর শরবৃষ্টিপাত করিতে লাগিল। মহাবীর ধনঞ্জয় তাহাদিগকে সমরে প্রবৃত্ত দেখিয়া অবিলম্বে তাহাদের উপর শর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার শরাসন-নির্মুক্ত শরনিকর শলভ-শ্রেণীর ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। তিনি মেঘচ্ছায়ার ন্যায় শরচ্ছায়া বিস্তার করিয়া সুশাণিত অস্ত্রদ্বারা মুণ্ডিত, অর্দ্ধমুণ্ডিত, অপবিত্র, জটিলবজ্র, একত্র সমবেত সমুদায় ম্লেচ্ছদিগকে সংহার করিলেন। গিরিগহ্বরনিবাসী গিরিচারিগণ তাঁহার শরে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ হইয়া ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল। কাক, কঙ্ক, বৃক প্রভৃতি শোণিতলোলুপ প্রাণিগণ আনন্দসহকারে অর্জুনের শাণিত শরে নিপাতিত গজ ও অশ্বারোহী ম্লেচ্ছদিগের রুধির পান করিতে আরম্ভ করিল।
হে মহারাজ! মহাবীর ধনঞ্জয়ের ভীষণ শরপ্রবাহে হস্তী, অশ্ব ও রথসমারূঢ় অসংখ্য রাজপুত্রগণের দেহ হইতে অনবরত শোণিতধারা বিনির্গত হওয়াতে সমরক্ষেত্রে রক্ততরঙ্গসম্পন্ন নিহত করিকুল সমাকীর্ণ সাক্ষাৎ যুগান্তকালীন কালসদৃশ মহানদী প্রবাহিত হইল। নিহত হস্তী, অশ্ব, রথী, পদাতিগণ উহার সংক্রমস্বরূপ', শরনিকর প্লবস্বরূপ', কেশকলাপ শৈবাল ও শাদ্বলস্বরূপ এবং ছিন্ন অঙ্গুলিসমুদায় ক্ষুদ্র মৎস্যস্বরূপ শোভা পাইতে লাগিল। ইন্দ্র বারিবর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে যেরূপ কি উন্নত, কি অবনত, সমুদায় প্রদেশই একাকার হইয়া যায়, সেইরূপ কৌরবসৈন্যগণের গাত্রনিঃসৃত শোণিতপ্রবাহে রণস্থল একাকার হইল। হে রাজন! এইরূপে মহাবীর অর্জুন ক্রমে ক্রমে ষসহস্র অশ্ব ও দশশত ক্ষত্রিয় বীরগণকে শমনভবনে প্রেরণ করিলেন। শরবিক্ষতাঙ্গ সুসজ্জিত হস্তীসমুদায় বজ্রতাড়িত শৈলের ন্যায় ভূতলশায়ী হইল। যেমন মত্ত মাতঙ্গ নলবন মর্দ্দন করত ভ্রমণ করে, সেইরূপ মহাবীর ধনঞ্জয় অসংখ্য গজ, বাজি ও রথ বিনাশ করত রণস্থলে বিচরণ করিতে আরম্ভ করিলেন। অনল যেমন সমীরণ সাহায্যে ভূরি ভূরি বৃক্ষ, লতা, গুল্ম এবং শুষ্ক কাষ্ঠ ও তৃণসমাকীর্ণ মহারণ্য দগ্ধ করে, তদ্রূপ মহাবীর ধনঞ্জয় কেশবের সাহায্যে নিশিত শরদ্বারা অসংখ্য কৌরবসৈন্য সংহারপূর্ব্বক রথসমুদায় শূন্য নরদেহে ধরাতল সমাচ্ছন্ন করিয়া চাপহস্তে রণস্থলে যেন নৃত্য করিতে লাগিলেন।
এইরূপে মহারথ ধনঞ্জয় বজ্রতুল্য শরপ্রভাবে রণস্থল শোণিতময় করিয়া রোষাবিষ্টচিত্তে কৌরবসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। মহাবীর অন্বষ্ঠাধিপতি শ্রুতায়ুঃ তাঁহাকে সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে দেখিয়া সাধ্যানুসারে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত অর্জুন অবিলম্বে কঙ্কপত্রভূষিত তীক্ষ্ণ শর সমুদায়দ্বারা অন্বষ্ঠরাজের অশ্বসমুদায় সংহার ও কার্মুক ছেদন করিয়া ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর অন্বষ্ঠ-রাজ অর্জুনের কার্য্য দর্শনে ক্রোধান্ধ হইয়া গদাহস্তে মহারথ কেশব ও পার্থের নিকট গমনপূর্ব্বক গদাদ্বারা রথের গতি নিবারণ ও কেশবকে তাড়না করিতে লাগিলেন। অরাতিনাশন অর্জুন কেশবকে গদা-তাড়িত দেখিয়া যৎপরোনাস্তি ক্রুদ্ধ হইলেন এবং মেঘ যেমন উদয়োন্মুখ সূর্য্যকে আচ্ছাদিত করে, তদ্রূপ সুবর্ণপুঙ্খ শরদ্বারা গদাপাণি মহারথ অন্বষ্ঠকে সমাচ্ছন্ন করিয়া অপর শরনিকরে তাঁহার গদা খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। মহাবীর অন্বষ্ঠ সেই গদা ছিন্ন দেখিয়া অবিলম্বে অন্য মহাগদা গ্রহণপূর্ব্বক বারংবার অর্জুন ও বাসুদেবকে প্রহার করিতে লাগিলেন। তখন সমর-বিশারদ অর্জুন দুই ক্ষুরপ্রদ্বারা তাঁহার গদাযুক্ত ইন্দ্রধ্বজাকার ভুজদ্বয় ছেদনপূর্ব্বক অন্য এক বাণে তাঁহার শিরশ্ছেদন করিলেন। মহাবীর অন্বষ্ঠ অর্জুনের শরে নিহত হইয়া বসুন্ধরা অনুনাদিত করত যন্ত্রমূক্ত ইন্দ্রধ্বজের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইলেন। ঐ সময় অরাতিনিপাতন অর্জুন অসংখ্য রথ, গজ ও অশ্বে পরিবেষ্টিত হইয়া ঘনঘটাচ্ছন্ন দিবাকরের ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর ধনঞ্জয় জয়দ্রথবধার্থে দুর্ভেদ্য দ্রোণসৈন্য ও ভোজসৈন্য ভেদ করিয়া তন্মধ্যে প্রবিষ্ট, কাম্বোজরাজতনয় সুদক্ষিণ ও মহাবল পরাক্রান্ত শ্রুতায়ুধ বিনষ্ট এবং সৈন্যসকল ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পলায়ন-পরায়ণ হইলে, আপনার আত্মজ রাজা দুর্য্যোধন সত্বরে রথে আরোহণ-পূর্ব্বক দ্রোণাচার্য্যের নিকট গমন করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! অর্জুন এই সমস্ত সৈন্য প্রমথিত করিয়া গমন করিয়াছে। এক্ষণে ভয়ঙ্কর লোকক্ষয়কর কালে অর্জুনবিনাশের নিমিত্ত বুদ্ধিপূর্ব্বক কার্য্যাবধারণ করা আপনার কর্ত্তব্য হইতেছে। আপনিই আমাদিগের প্রধান আশ্রয়; অতএব অর্জুন যাহাতে জয়দ্রথকে সংহার করিতে না পারে তাহার উপায় নির্দেশ করুন। হুতাশন যেমন সমীরণের সাহায্যে শুষ্ক তৃণসকল ভস্মসাৎ করে, তদ্রূপ ধনঞ্জয় ক্রোধভরে আমার সৈন্যসমুদায় বিনষ্ট করিতেছে। পূর্ব্বে জয়দ্রথের রক্ষক ভূপালগণের স্থির বিশ্বাস ছিল যে, ধনঞ্জয় প্রাণসত্ত্বে কদাচ দ্রোণাচার্য্যকে অতিক্রম করিবে না। কিন্তু এক্ষণে তাঁহারা তাহাকে সৈন্য ভেদপূর্ব্বক আপনাকে অতিক্রম করিতে দেখিয়া সাতিশয় সংশয়াপন্ন হইয়াছেন। হে মহাত্মন্! আমি পার্থকে আপনার সমক্ষে সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে দেখিয়া অস্মৎপক্ষীয় বীরগণকে নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর এবং আপনাকে সৈন্যশূন্য বলিয়া বিবেচনা করিতেছি। হে মহাভাগ! আমি আপনাকে পাণ্ডবগণের হিতানুষ্ঠানে নিরত জানিয়া ইতি-কর্ত্তব্যতাবিমূঢ় হইতেছি। আমি সাধ্যানুসারে আপনার সহিত সদ্ব্যবহার এবং আপনার প্রীতি করি, কিন্তু তৎসমুদায় আপনার হৃদয়ঙ্গম হয় না। আমরা আপনার একান্ত ভক্ত; তথাচ আপনি আমাদিগের হিতাভিলাষ করেন না; প্রত্যুত আমাদের অপকারে প্রবৃত্ত পাণ্ডবদিগকে নিরন্তর প্রীতি করিয়া থাকেন। আপনি আমাদিগের আশ্রয়ে জীবিকা নির্ব্বাহ করিয়াই আমাদিগের অপকারে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। আপনি যে মধুলিপ্ত ক্ষুরসদৃশ তাহা আমি এতকাল অবগত ছিলাম না। যদি আপনি অর্জুননিগ্রহে স্বীকার না করিতেন, তাহা হইলে আমি গ্রহগমনোন্মুখ সিন্ধুরাজ জয়দ্রথকে কদাচ নিবারণ করিতাম না। আমি দুর্বুদ্ধিপ্রভাবে আপনার অস্ত্রবলে পরিত্রাণেচ্ছা করিয়া মোহবশতঃ সিন্ধুরাজকে আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক মৃত্যুমুখে নিক্ষেপ করিয়াছি। বরং মনুষ্য কৃতান্তের করাল দ্রংষ্টান্তরে নিপতিত হইয়া মুক্তিলাভে সমর্থ হয়, কিন্তু জয়দ্রথ অর্জুনের বশবর্তী হইলে কদাচ পরিত্রাণ পাইবে না। অতএব হে মহাত্মন্! সিন্ধুরাজ যাহাতে অর্জুন হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারেন, এরূপ উপায় করুন। আমার এই আর্ত্তপ্রলাপে রোষপরবশ হইবেন না।
দ্রোণাচার্য্য রাজা দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণানন্তর কহিলেন, মহারাজ। তুমি আমার আত্মজ অশ্বত্থামার তুল্য; আমি তোমার বাক্যে দোষারোপ করি না। এক্ষণে আমি যাহা নিশ্চয় বলিতেছি, তুমি তাহা শ্রবণ ও তদনুসারে কার্য্য কর। কৃষ্ণ সারথিশ্রেষ্ঠ; তাঁহার অশ্বসকল অতিশয় বেগগামী এবং মহাবীর অর্জুন অত্যল্পমাত্র পথ প্রাপ্ত হইয়া শীঘ্র গমন করিতে সমর্থ হয়। তুমি কি নিরীক্ষণ করিতেছ না যে, অর্জুনের গমনকালে তাঁহার নিক্ষিপ্ত শরনিকর তাঁহার রথের এক ক্রোশ পশ্চাৎ নিপতিত হইতেছে। হে মহারাজ! আমি এক্ষণে অতিশয় বৃদ্ধ হইয়াছি; সুতরাং শীঘ্র গমনে সমর্থ নহি। বিশেষতঃ পাণ্ডবদিগের সেনাগণ আমাদের সেনামুখে সমুত্থিত হইয়াছে। আর আমিও সকল ধনুর্দ্ধারীদিগের সমক্ষে যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিব বলিয়া ক্ষত্রিয়মধ্যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি; এক্ষণে যুধিষ্ঠিরও অর্জুনকর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া ঐ অগ্রে অবস্থান করিতেছে। অতএব আমি এ সময় ব্যূহ পরিত্যাগ করিয়া অর্জুনের সহিত যুদ্ধ করিব না। তুমি এই জগতের পতি, মহাবল পরাক্রান্ত ও জয়লাভে সুনিপুণ; অতএব যে স্থানে পার্থ অবস্থান করিতেছে, তুমি স্বয়ং সহায়সম্পন্ন হইয়া নির্ভয়ে তথায় গমনপূর্ব্বক সেই তুল্যাভিজন' তুল্যকৰ্ম্মা একমাত্র পাণ্ডুতনয়ের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও। তখন দুর্য্যোধন কহিলেন, হে আচার্য্য! আপনি সমুদায় শস্ত্রধারি-গণের অগ্রগণ্য, ধনঞ্জয় আপনাকেও অতিক্রম করিয়াছে! অতএব আমি কিরূপে তাহাকে নিবারণ করিতে সমর্থ হইব? আমি কুলিশধারী পুরন্দরকেও সমরে পরাজয় করিতে পারি, কিন্তু অর্জুনকে পরাজয় করিতে কোন মতেই সমর্থ হইব না। যে মহাবীর অস্ত্রবলে ভোজরাজ, হার্দিক্য ও আপনাকে পরাজয় এবং সুদক্ষিণ, শ্রুতায়ুধ, শ্রুতায়ুঃ, অচ্যুতায়ুঃ, অন্বষ্ঠপতি ও অসংখ্য ম্লেচ্ছগণকে বিনাশ করিয়াছে, আমি কিরূপে সেই দহনোন্মুখ হুতাশনসদৃশ দুর্দ্ধর্ষ অস্ত্রবিশারদ অর্জুনের সহিত যুদ্ধ করিব? আজি আপনিই বা কিরূপে অর্জুনের সহিত আমার যুদ্ধ সম্ভবপর বলিয়া বিবেচনা করিলেন? হে আচার্য্য! আমি ভৃত্যের ন্যায় আপনার অধীন; এক্ষণে আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার যশোরক্ষা করুন।
দ্রোণাচার্য্য কহিলেন, হে রাজন! ধনঞ্জয় যথার্থই দুর্দ্ধর্য, কিন্তু তুমি যেরূপে তাহার বলবীর্য্য সহ্য করিতে সমর্থ হইবে, আমি এক্ষণে তাহার উপায় বিধান করিতেছি। আজি ধনুর্দ্ধরগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করুন যে, মহাবীর ধনঞ্জয় কৃষ্ণের সমক্ষে তোমার সহিত যুদ্ধ করিতে অসমর্থ হইতেছে। হে মহারাজ! আমি তোমার শরীরে এই কবচ বন্ধন করিয়া দিতেছি, ইহার প্রভাবে মনুষ্যাস্ত্র তোমার শরীরে বিদ্ধ হইবে না। যদি সমুদায় সুর, অসুর, যক্ষ, উরগ, রাক্ষস ও মনুষ্যগণ তোমার সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন, তাহা হইলেও তোমার কিছুমাত্র ভয় নাই। কি কৃষ্ণ, কি অর্জুন, কি অন্য কোন শস্ত্রধারী বীর, কেহই তোমার এই কবচে শরক্ষেপ করিয়া কৃতকার্য্য হইতে পারিবেন না; অতএব তুমি এই কবচ ধারণ করিয়া যুদ্ধার্থ সমরে অমর্ষপরায়ণ অর্জুনের প্রতি ধাবমান হও; সে কদাচ তোমার বাহুবল সহ্য করিতে সমর্থ হইবে না।
ব্রহ্মবিদগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য এই বলিয়া স্বীয় বিদ্যাবলে সেই ভীষণ সংগ্রামস্থলস্থিত বীরগণের বিস্ময়োৎপাদন ও দুর্য্যোধনের জয়লাভের নিমিত্ত সত্বরে উদকস্পর্শ করিয়া যথাবিধি মন্ত্রজপ করত দুর্য্যোধনের গাত্রে এক তেজঃপ্রজ্বলিত অদ্ভুত কবচ আসঞ্জিত' করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে রাজন! যাবতীয় শ্রেষ্ঠতর সরীসৃপ এবং একচরণ, বহুচরণ ও চরণহীন প্রাণি-গণের নিকট তুমি নিরন্তর মঙ্গল লাভ কর। ভগবান্ ব্রহ্মা, ব্রাহ্মহ্মণগণ, স্বাহা, স্বধা, শচী, লক্ষ্মী, অরুন্ধতী, অসিত, দেবল, বিশ্বামিত্র, অঙ্গিরাঃ, বশিষ্ঠ, কশ্যপ, লোকপাল, ধাতা, বিধাতা, দিকসকল, দিকপালগণ, ষড়ানন কার্তিকেয়, ভগবান্ ভাস্কর, দিগগজচতুষ্টয়, ক্ষিতি, গগন, গ্রহগণ এবং যযাতি, নহুষ, ধুন্ধুমার ও ভগীরথ প্রভৃতি সমস্ত রাজর্ষিরা তোমার মঙ্গল বিধান করুন। যিনি রসাতলে অবস্থানপূর্ব্বক নিরন্তর ধরা ধারণ করিতেছেন, সেই পন্নগশ্রেষ্ঠ অনন্ত তোমার মঙ্গলানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হউন।
হে গান্ধারীতনয়! পূর্ব্বকালে ইন্দ্রাদি দেবগণ বৃত্রাসুরের সহিত সংগ্রামে পরাজিত, ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ ও বলবীর্য্যবিহীন হইয়া ভয়ে ব্রহ্মার শরণাগত হইয়াছিলেন, তাঁহারা সকলে কৃতাঞ্জলি-পুটে কমলযোনিকে কহিলেন, হে দেবসত্তম! আপনি বৃত্রমৰ্দ্দিত সুরগণের একমাত্র গতি হইয়া ইঁহাদিগকে এই মহৎ ভয় হইতে রক্ষা করুন। তখন ভগবান্ পদ্মযোনি স্বীয় পার্শ্বস্থিত বিষ্ণু ও শত্রুাদি সুরগণকে বিষণ্ণ দেখিয়া কহিতে লাগিলেন, হে দেবগণ। তোমাদিগকে ও ব্রাহ্মণগণকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য, কিন্তু এক্ষণে আমি বৃত্রাসুরকে সংহার করিতে সমর্থ নহি। বিশ্বকর্মার অতি দুঃসহ তেজঃপ্রভাবে বৃত্রাসুরের জন্ম হইয়াছে। পূর্ব্বকালে বিশ্বকর্মা দশ লক্ষ বৎসর তপশ্চরণপূর্ব্বক মহেশ্বরের নিকট অনুজ্ঞা লাভ করিয়া সেই অসুরকে সৃষ্টি করিয়াছেন। দুরাত্মা বৃত্রাসুর দেবাদিদেব মহাদেবের প্রসাদে তোমাদিগকে বিনাশ করিতে সমর্থ হইয়াছে। হে দেবগণ। মন্দর পর্ব্বতে গমন করিলে তপশ্চরণনিদান, দক্ষযজ্ঞবিনাশন, সর্ব্বভূতপতি, ভগনেত্র-নিপাতন, ভগবান্ পিনাকপাণির সহিত সাক্ষাৎকার লাভ হয়, অতএব তোমরা অবিলম্বে তথায় গমন কর; তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ হইলেই বৃত্রাসুরকে পরাজয় করিতে পারিবে। তখন সুরগণ ব্রহ্মার পরামর্শানুসারে তাঁহার সহিত মন্দর পর্ব্বতে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, তথায় কোটিসূর্য্যসঙ্কাশ তেজোরাশি ভগবান্ পিনাকপাণি বিরাজিত হইতেছেন। তিনি দেবগণকে সমাগত দেখিয়া স্বাগত প্রশ্ন করিয়া কহিলেন, হে সুরগণ। আমাকে তোমাদিগের কি কৰ্ম্ম সম্পাদন করিতে হইবে? আমার দর্শন অমোঘ; অতএব অবশ্যই তোমাদিগের অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে। সুরগণ মহেশ্বরের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে দেব! দুরাত্মা বৃত্রাসুর আমাদিগের তেজঃ ক্ষয় করিয়াছে। এই দেখুন, আমাদিগের কলেবর তাহার প্রহারে জীর্ণ হইয়া গিয়াছে। যাহা হউক, এক্ষণে আমরা আপনার শরণাপন্ন হইলাম, আপনি আমাদিগকে রক্ষা করুন। তখন মহাদেব কহিলেন, হে দেবগণ! মহাবল পরাক্রান্ত প্রাকৃত জনের দুর্নিবার্য্য বৃত্রাসুর যে বিশ্বকর্মার তেজঃপ্রভাবে সমুৎপন্ন হইয়াছে, ইহা তোমাদের অবিদিত নাই; যাহা হউক, দেবগণের সাহায্য করা আমার অবশ্যকর্ত্তব্য। হে ইন্দ্র। তুমি আমার গাত্রস্থিত এই ভাম্বর কবচ গ্রহণ করিয়া মনে মনে এই মন্ত্র পাঠ করত ধারণ কর।
বরদাতা মহাদেব এই বলিয়া ইন্দ্রকে বৰ্ম্ম ও বর্ম্মধারণ মন্ত্র প্রদান করিলেন। তখন দেবরাজ সেই বৰ্ম্ম পরিধানপূর্ব্বক বৃত্রসৈন্যের অভিমুখীন হইলেন। বৃত্রাসুর তাঁহার উপর নানাবিধ অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে লাগিল, কিন্তু কোন ক্রমেই তাঁহার সন্ধিস্থল ভেদ করিতে সমর্থ হইল না। কিয়ৎক্ষণ পরে দেবরাজ অবসর পাইয়া সেই সংগ্রামে বৃত্রকে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। হে দুর্য্যোধন! সুররাজ পুরন্দর বৃত্রাসুর-নিধনানন্তর সেই হরদত্ত বৰ্ম্ম ও মন্ত্র অঙ্গিরাকে প্রদান করেন। তৎপরে অঙ্গিরাঃ স্বীয় মন্ত্রবেত্তা পুত্র বৃহস্পতিকে ও বৃহস্পতি ধীমান্ অগ্নিবেশ্যকে প্রদান করিয়াছিলেন; মহাত্মা অগ্নিবেশ্য উহা আমাকে প্রদান করিয়াছেন। হে নৃপসত্তম! অদ্য তোমার দেহরক্ষার্থ সেই বৰ্ম্ম মন্ত্রপূত করিয়া তোমার গাত্রে বন্ধন করিতেছি।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আচার্য্যপুঙ্গব দ্রোণ দুর্য্যোধনকে এই কথা বলিয়া পুনরায় মৃদুস্বরে কহিলেন, হে পার্থিব! পূর্ব্বকালে ব্রহ্মা সংগ্রাম সময়ে বিষ্ণুর শরীরে এবং তারকাময় যুদ্ধে ইন্দ্রের শরীরে যেমন দিব্য কবচ বন্ধন করিয়া-ছিলেন, সেইরূপ আজি আমি তোমার গাত্রে ব্রহ্মসূত্রদ্বারা কবচ বন্ধন করিয়া দিতেছি। মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য এই বলিয়া যথাবিধি মন্ত্র পাঠপূর্ব্বক দুর্য্যোধনের শরীরে কবচ বন্ধন করিয়া তাঁহাকে সেই ভয়াবহ যুদ্ধে প্রেরণ করিলেন। হে রাজন! মহাবাহু দুর্য্যোধন এইরূপ আচার্য্যকর্তৃক বদ্ধকবচ হইয়া ত্রিগত্তদেশীয় সহস্র রথ, বিপুল বলশালী সহস্র মত্ত মাতঙ্গ, নিযুত অশ্ব, অন্যান্য মহা রথগণ-সমভিব্যাহারে নানাবিধ বাদিত্র বাদন-পূর্ব্বক বিরোচনতনয় বলির ন্যায় মহাড়ম্বরে অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। এইরূপে দুর্য্যোধন অগাধ সমুদ্রের ন্যায় ধাবমান হইলে কৌরবসৈন্যমধ্যে মহাশব্দ সমুত্থিত হইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে রাজা দুর্য্যোধন সমর প্রবিষ্ট কৃষ্ণ ও অর্জুনের পশ্চাৎ ধাবমান হইলে পাণ্ডবেরা সোমকগণ সমভি-ব্যাহারে ঘোরতর গভীর নিনাদ করিয়া সোমকগণ সমভি-ব্যাহারে ঘোরতর গভীর নিনাদ করিয়া প্রবলবেগে দ্রোণাচার্য্যকে আক্রমণ করিলেন। তখন ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। হে রাজন! তৎকালে ভগবান্ মরীচিমালী গগনমণ্ডলের মধ্যভাগে অবস্থান করিতেছিলেন। ঐ সময় ব্যূহের অগ্রভাগে কৌরব ও পাণ্ডবদিগের যেরূপ লোমহর্ষণ অদ্ভুত তুমুল সংগ্রাম হইতে লাগিল, তদ্রূপ সমর পূর্ব্বে আর কখন আমরা দর্শন বা শ্রবণ করি নাই। অসংখ্য সৈন্যসমবেত পাণ্ডবেরা ধৃষ্টদ্যুম্নকে অগ্রসর করিয়া শরবর্ষণদ্বারা দ্রোণসৈন্য সমাচ্ছন্ন করিলেন। কৌরবগণও দ্রোণাচার্য্যকে পুরস্কৃত করিয়া সুতীক্ষ্ণ সায়কনিকরে ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রমুখ পাণ্ডবগণকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন।
উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণ গ্রীষ্মকালীন বায়ুতাড়িত উদ্ধত মহামেঘদ্বয়ের ন্যায় শোভা ধারণ করিয়া বর্ষাকালীন সলিলপূর্ণ জাহ্নবী ও যমুনার ন্যায় মহাবেগে ধাবমান হইল। বায়ুবেগ-সঞ্চালিত মেঘ যেমন বারিধারা বর্ষণ করিয়া অগ্নি প্রশমিত করে, তদ্রূপ সেই সংগ্রামে অসংখ্য অশ্ব, হস্তী ও রথে পরিবৃত মহাবীর দ্রোণাচার্য্য শরবর্ষণদ্বারা পাণ্ডবগণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। বর্ষাকালে প্রবল সমীরণ সাগরমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া যেমন জলরাশি ক্ষুব্ধ করে, তদ্রূপ দ্বিজশ্রেষ্ঠ দ্রোণ 'পাণ্ডবসৈন্য-মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া তাহাদিগকে সংক্ষুব্ধ করিলেন। তখন পাণ্ডবসৈন্যগণ যেমন সলিলরাশি প্রবলবেগে মহাসেতু ভেদ করিতে ধাবমান হয়, তদ্রূপ দ্রোণাচার্য্যকে ভেদ করিবার নিমিত্ত পরম যত্নসহকারে তাঁহার প্রতি ধাবমান হইল। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য অচল যেমন জলবেগ নিবারণ করে, তদ্রূপ সংক্রুদ্ধ পাণ্ডব, পাঞ্চাল ও কেকয়দিগকে নিবারিত করিতে লাগিলেন। প্রবলপ্রতাপ নরপতিগণ চতুৰ্দ্দিক্ হইতে পাঞ্চালগণকে আক্রমণ করিলেন। তখন নরশ্রেষ্ঠ ধৃষ্টদ্যুম্ন শত্রুসৈন্যগণকে ভেদ করিবার মানসে পাণ্ডবদিগের সাহায্যে মহাবীর দ্রোণকে বারংবার আঘাত করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ধৃষ্টদ্যুম্নের উপর যেরূপ শর নিক্ষেপ করিলেন, ধৃষ্টদ্যুম্নও তাঁহার উপর তদ্রূপ শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। হে রাজন! শক্তি, প্রাস ও ঋষ্টি-সম্পন্ন মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন তৎকালে সংগ্রামক্ষেত্রে মহামেঘের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। তাঁহার তরবারি পুরোবর্তী বায়ুর ন্যায়, মৌর্ব্বী বিদ্যুতের ন্যায়, শরাসননিস্বন অশনিনির্ঘোষের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। ঐ মহাবীর উপলখণ্ডের ন্যায় শাণিত শরনিকর নিক্ষেপ করিয়া দশ দিক্ সমাচ্ছন্ন, অসংখ্য রথী ও অশ্বসমুদায় ছেদন করিয়া সেনাগণকে প্লাবিত করিলেন। মহাবীর দ্রোণ বাণবর্ষণ করত পাণ্ডবদিগের যে যে রথমার্গে গমন করিলেন, মহাতেজাঃ ধৃষ্টদ্যুম্ন স্বীয় শরংপ্রভাবে সেই সেই স্থান হইতে তাঁহাকে প্রতিনিবৃত্ত করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য রণস্থলে অসাধারণ যত্ন করিলেও তাঁহার সৈন্যগণ তিন ভাগে বিভক্ত হইল। কতকগুলি সৈন্য ভোজরাজের নিকট গমন করিল, কতকগুলি জলসন্ধের শরণাপন্ন হইল এবং অবশিষ্ট দ্রোণের নিকট অবস্থানপূর্ব্বক পাণ্ডবগণকর্তৃক নিহত হইতে লাগিল।
রথিশ্রেষ্ঠ দ্রোণাচার্য্য যতবার সৈন্যগণকে সংযোজিত করিলেন, মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন ততবারই ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলিলেন। অরণ্যে রক্ষকবিহীন পশুসকল যেমন ক্রুর শ্বাপদগণকর্তৃক নিহত হয়, সেইরূপ কৌরবপক্ষীয় অসংখ্য সৈন্য পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণের হস্তে প্রাণ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তৎকালে সকলেরই মনে এইরূপ উদয় হইল যে, সেই তুমুল সংগ্রামে সাক্ষাৎ কাল ধৃষ্টদ্যুম্ন শরবিমোহিত যোদ্ধৃবর্গকে গ্রাস করিতেছে। হে মহারাজ! কুনৃপের রাজ্য যেমন দুর্ভিক্ষ, ব্যাধি ও তস্কর দ্বারা উৎসন্ন হয়, সেইরূপ আপনার সেনাগণ পাণ্ডবগণের শরপ্রভাবে ধ্বংস হইতে লাগিল। ঐ সময় অর্ককিরণমিশ্রিত শস্ত্র ও বৰ্ম্ম সমুদায় এবং সেনাগণের চরণসমুত্থিত ধূলিপটলদ্বারা রণভূমিস্থ ব্যক্তি-গণের চক্ষুঃপীড়া সমুৎপন্ন হইল।
এইরূপে পাণ্ডবেরা সেই ত্রিধাভূত কৌরবসৈন্যগণকে সংহার করিতে আরম্ভ করিলে বীরবরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য ক্রোধে কম্পিতকলেবর হইয়া শরবর্ষণদ্বারা পাঞ্চালদিগকে সমাচ্ছন্ন করিলেন এবং সায়কদ্বারা সৈন্যগণকে বিদ্ধ ও নিপাতিত করত সমরক্ষেত্রে দেদীপ্যমান কালাগ্নির ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তিনি মাতঙ্গ, তুরঙ্গ, রথ ও পদাতিগণকে এক এক বাণে ভেদ করিতে আরম্ভ করিলেন। তৎকালে দ্রোণের শরাসন-বিমুক্ত শরনিকর সহ্য করিতে সমর্থ হয়, পাণ্ডবদিগের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তিকেই দৃষ্টিগোচর হইল না। পাণ্ডবসৈন্যগণ দ্রোণসায়ক ও সূর্যকিরণে যুগপৎ সন্তাপিত হইয়া ইতস্ততঃ 'পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। যেমন হুতাশন শুষ্ক বন উৎসন্ন করে, তদ্রূপ মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্নও কৌরবসৈন্যগণকে বিনষ্ট করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন উভয় পক্ষীয় সেনাগণ এইরূপে দ্রোণ ও ধৃষ্টদ্যুম্নের সায়কে নিতান্ত বিদ্ধ হইয়া জীবিতাশা পরিত্যাগ-পূর্ব্বক সাধ্যানুসারে যুদ্ধ করিতে লাগিল; কেহই প্রাণভয়ে সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিল না। হে মহারাজ। আপনার তিন পুত্র মহারাজ বিবিংশতি, চিত্রসেন ও বিকর্ণ কুন্তীপুত্র ভীমসেনকে অবরোধ করিলেন। অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ এবং বীর্য্যবান্ ক্ষেমধূর্ত্তি এই তিন জন আপনার তিন পুত্রের অনুগমন করিলেন। সৎকুলসম্ভূত মহাতেজস্বী মহারথ বাত্নীক নৃপতি অমাত্য ও সেনাগণ-সমভিব্যাহারে দ্রৌপদীতনয়দিগকে অবরোধ করিতে লাগিলেন। মহারাজ! শৈল্য সহস্র সৈন্যে পরিবৃত হইয়া কাশিরাজের মহাবল পরাক্রান্ত পুত্রকে আক্রমণ করিলেন। মদ্রদেশাধিপতি শল্য জ্বলন্ত পাবকসদৃশ অজাতশত্রু যুধিষ্ঠিরকে অবরোধ করিতে লাগিলেন। অমর্যপরায়ণ, কবচাবৃত, দুঃশাসন স্বসৈন্য সংস্থাপনপূর্ব্বক মহারথ সাত্যকির অভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং চারিশত মহাধনুর্দ্ধর সৈন্য লইয়া চেকিতানকে আক্রমণ করিলেন। গান্ধাররাজ শকুনি চাপ, শক্তি ও খড়াধারী সপ্তশত গান্ধার-দেশীয় সৈন্য লইয়া মাদ্রীপুত্র নকুলকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ বান্ধবের বিজয় বাসনায় ধনুর্ব্বাণ ধারণ করিয়া প্রাণপণে বিরাটরাজের সহিত সংগ্রাম করিতে আরম্ভ করিলেন। বাহীক নৃপতি সমরে অপরাজিত মহাবল পরাক্রান্ত দ্রুপদতনয় শিখণ্ডীকে পরাভূত করিতে সমুদ্যত হইলেন। অবন্তিনগরাধিপতি সৌবীর সৈন্য-সমভিব্যাহারে ক্রোধ পরিপূর্ণ প্রভদ্রকগণ সমবেত মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর অলায়ুধ, ক্রুরকর্মা ক্রোধপরায়ণ রাক্ষস ঘটোৎকচের প্রাণ সংহার করিবার নিমিত্ত দ্রুতবেগে সংগ্রামক্ষেত্রে ধাবমান হইলেন। মহারথ কুন্তিভোেজ অসংখ্য সৈন্য সমভিব্যাহারে ভীষণপ্রকৃতি রাক্ষসেন্দ্র অলম্বুষকে নিবারণ করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ কূপ প্রভৃতি মহাধনুর্দ্ধর মহারথগণে পরিবৃত হইয়া সমুদায় সেনার পশ্চাদ্ভাগে অবস্থান করিতেছিলেন। দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা তাঁহার দক্ষিণ ভাগে ও সূতপুত্র কর্ণ বামভাগে অবস্থানপূর্ব্বক তাঁহার চক্র রক্ষা করিতে লাগিলেন। সৌমদত্তি প্রভৃতি বীরগণ তাঁহার পৃষ্ঠরক্ষায় নিযুক্ত হইলেন। যুদ্ধবিশারদ, নীতিজ্ঞ, মহাধনুর্দ্ধর কূপ, বৃষসেন, শল ও শল্য প্রভৃতি বীরগণ এইরূপে সিন্ধু-রাজের রক্ষার উপায় বিধান করিয়া ঘোরতর যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এই সময় কৌরব ও পাণ্ডবগণের যে আশ্চর্য্য যুদ্ধ হইয়াছিল, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। মহাবাহু পাণ্ডবগণ ব্যূহমুখে দ্রোণাচার্য্যকে আক্রমণ করিয়া তাঁহার সৈন্যগণকে ভেদ করিবার মানসে ঘোরতর সংগ্রাম করিতে আরম্ভ করিলেন। দ্রোণাচার্য্যও যশোলাভের আশায় আপনার ব্যূহ রক্ষা করত স্বীয় সৈন্য-সমভিব্যাহারে পাণ্ডবগণের সহিত তুমুল যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন আপনার পুত্রগণের হিতৈষী অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ ক্রোধান্বিতচিত্তে দশ বাণে বিরাটরাজকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর বিরাটরাজও সেই অনুচরবেষ্টিত মহাবল পরাক্রান্ত বীরদ্বয়ের বাণে আহত হইয়া তাঁহাদের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। অরণ্যমধ্যে মদস্রাবী মত্তমাতঙ্গদ্বয়ের সহিত কেশরীর যেরূপ যুদ্ধ হয়, উক্ত বীরদ্বয়ের সহিত বিরাটরাজের সেইরূপ অতি ভীষণ সংগ্রাম আরম্ভ হইল। মহাবল পরাক্রান্ত শিখণ্ডী, মর্মাস্থিভেদ্য' তীক্ষ্ণবাণ পরিত্যাগ করিয়া বাহীক ভূপতিকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। বাহীকও ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার উপর হেমপুঙ্খ, শিলানিশিত নতপর্ব্ব নয় বাণ নিক্ষেপ করিলেন। তাঁহাদের সংগ্রামে ভীরুগণের ত্রাসজনক ও শূরগণের হর্ষবর্দ্ধন হইল। তাঁহাদিগের শরজালে এককালে সমুদায় দিক্ ও আকাশ-মণ্ডল সমাচ্ছন্ন হওয়াতে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না। যেমন মাতঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গের সহিত যুদ্ধ করে, সেইরূপে শিবিরাজ গোবাসন মহারথ কাশিরাজের পুত্রের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিতে লাগিল। যেমন জীবের মনঃ পঞ্চেন্দ্রিয়কে পরাজয় করিতে যত্নবান্ হয়, সেইরূপ বাহীকরাজ কোপান্বিত হইয়া মহারথ দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রকে পরাজয় করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাঁহারাও যেমন ইন্দ্রিয়ার্থ সকল শরীরের সহিত সর্ব্বদা যুদ্ধ করে, তদ্রূপ শর বর্ষণপূর্ব্বক বাহীকরাজের সহিত তুমুল সংগ্রাম করিতে আরম্ভ করিলেন।
হে মহারাজ! আপনার পুত্র দুঃশাসন নতপর্ব্ব নয় তীক্ষ্ণ বাণে বৃষ্ণিবংশাবতংস সত্যবিক্রম সাত্যকিকে বিদ্ধ করিলে তিনি ঈষৎ মূর্ছিত হইলেন এবং অবিলম্বে সংজ্ঞা লাভ করিয়া কঙ্ক-পত্রযুক্ত দশ বাণে দুঃশাসনকে বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে ঐ বীরদ্বয় পরস্পর পরস্পরের বাণে বিদ্ধ হইয়া পুষ্পিত কিংশুক বৃক্ষদ্বয়ের ন্যায় সংগ্রামস্থলে শোভা পাইতে লাগিলেন। ক্রোধপূর্ণ মহাবীর অলম্বুষ মহাবল পরাক্রান্ত কুন্তিভোজের শরে নিতান্ত নিপীড়িত হইলে তাঁহাকে বিবিধ বাণে বিদ্ধ করত কৌরববাহিনী মুখে ভীষণ নিনাদ করিতে আরম্ভ করিল। সৈন্যগণ পূর্ব্বকালীন জম্ভাসুর ও ইন্দ্রের সমরের ন্যায় মহাবীর কুন্তিভোজ ও অলম্বুষের সংগ্রাম অবলোকন করিতে লাগিল। মাদ্রীপুত্র নকুল ও সহদেব কোপান্বিত হইয়া কৃতবৈর বলবান্ শকুনির উপর শর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন।
হে মহীপাল। এইরূপে সমরক্ষেত্রে তুমুল জনসংক্ষয় সমুপস্থিত হইল। পাণ্ডবগণের ক্রোধাগ্নি আপনার দুর্নীতিপ্রভাবে সমুৎপন্ন, কর্ণকর্তৃক বর্দ্ধিত ও আপনার পুত্রগণকর্তৃক সংরক্ষিত হইয়া এক্ষণে এই সসাগরা ধরিত্রীকে দগ্ধ করিতে সমুদ্যত হইয়াছে। যাহা হউক, এক্ষণে সমরবৃত্তান্ত শ্রবণ করুন। মহাবীর শকুনি পাণ্ডুপুত্র নকুল ও সহদেবের শরপ্রহারে রণবিমুখ হইয়া পরাক্রম প্রকাশে অসমর্থ ও ইতিকর্ত্তব্যতাবিমূঢ় হইলেন। মহাবীর মাদ্রীতনয়দ্বয় শকুনিকে সমরবিমুখ দেখিয়া পুনরায় তাঁহার উপর বারিধারার ন্যায় অসংখ্য বাণ বর্ষণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে সুবলনন্দন সেই মহাবীরদ্বয়ের সন্নতপর্ব্ব বিবিধ শরে বিদ্ধ হইয়া মহাবেগে অশ্ব সঞ্চালনপূর্ব্বক দ্রোণসৈন্যমধ্যে প্রস্থান করিলেন। মহাবীর ঘটোৎকচ মহাবেগে অলায়ুধ রাক্ষসের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। পূর্ব্বকালে রাম ও রাবণের যেরূপ বিষম সংগ্রাম হইয়াছিল, ঐ মহাবল পরাক্রান্ত রাক্ষসদ্বয়েরও সেইরূপ যুদ্ধ হইতে লাগিল। রাজা যুধিষ্ঠির মদ্ররাজ শল্যকে প্রথমতঃ পঞ্চশত বাণে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় সাত বাণে বিদ্ধ করিলেন। পূর্ব্বে শম্বরের সহিত অমররাজ ইন্দ্রের যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, মদ্ররাজের সহিত রাজা যুধিষ্ঠিরের সেইরূপ অদ্ভুত সংগ্রাম উপস্থিত হইল। হে মহারাজ! আপনার পুত্র বিবিংশতি, চিত্রসেন ও বিকর্ণ ইঁহারা অসংখ্য সৈন্যপরিবৃত হইয়া ভীমসেনের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। এইরূপে সেই লোমহর্ষণ তুমুল সংগ্রাম সমুপস্থিত হইলে পাণ্ডবেরা সেই ত্রিধাভূত কৌরব-সৈন্যগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর ভীমসেন মহাবাহু জলসন্ধকে ও অসংখ্য সৈন্যসমবেত রাজা যুধিষ্ঠির কৃতবর্ম্মাকে এবং সূর্য্যসদৃশ প্রতাপশালী মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন শরবর্ষণ করত দ্রোণকে আক্রমণ করিলেন। তখন যুদ্ধতৎপর ধনুর্দ্ধারী ক্রোধ-পরায়ণ কৌরব ও পাণ্ডবদিগের পরস্পর ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। হে মহারাজ! এইরূপে সেই অসংখ্য জন-সংক্ষয় সমরে সেনাগণ নির্ভীকচিত্তে যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলে বলবীর্য্যসম্পন্ন দ্রোণাচার্য্য পরাক্রান্ত পাঞ্চালপুত্রের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়া অসংখ্য শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। মহাবীর দ্রোণ ও মহাবল পরাক্রান্ত ধৃষ্টদ্যুম্ন উভয় পক্ষীয় অসংখ্য সৈন্যগণের মস্তক ছেদনপূর্ব্বক ইতস্ততঃ নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলে বোধ হইতে লাগিল যে, সমরাঙ্গনের চতুর্দিকে পুণ্ডরীকবন সমুৎপন্ন হইয়াছে। ঐ সময় সংগ্রামস্থলের চতুর্দিকে বীরগণের বস্ত্র, আভরণ, শস্ত্র, ধ্বজ, বৰ্ম্ম ও আয়ুধসকল বিকীর্ণ হইল। শূরগণের শোণিতাক্ত সুবর্ণনিৰ্ম্মিত তনুত্রাণসকল সৌদামিনী-সংবলিত জলদপটলের ন্যায় লক্ষিত হইতে লাগিল। তখন অন্যান্য মহারথগণ তালপ্রমাণ শরাসন আকর্ষণ করিয়া শরদ্বারা হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যগণকে নিপাতিত করিতে আরম্ভ করিলেন। অসংখ্য বীরগণের মস্তক, অসি, চৰ্ম্ম, চাপ ও কবচসকল ইতস্ততঃ বিকীর্ণ হইতে লাগিল।
হে মহারাজ! ঐ সময় সমরক্ষেত্রে বহুসংখ্যক কবন্ধ সমুত্থিত হইল। মাংসলোলুপ গৃধু, কঙ্ক, বল, শ্যেন, বায়স ও শৃগালসমুদায় হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যগণের মাংস ভোজন, শোণিত পান, কেশ ছেদন, মজ্জা ভক্ষণ এবং শরীর ও মস্তকসমুদায় আকর্ষণ করিতে লাগিল। তখন সংগ্রামনিপুণ কৃতাস্ত্র, রণদীক্ষিত যোদ্ধৃগণ বিজয়াকাঙ্ক্ষী হইয়া তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ করিলেন। সৈনিক পুরুষেরা নির্ভয়ে অসিমার্গে বিচরণ এবং ক্রোধভরে ঋষ্টি, শক্তি, প্রাস, শূল, তোমর, পট্টিশ, গদা ও পরিঘ প্রভৃতি আয়ুধ এবং ভুজদ্বারা পরস্পরকে সংহার করিতে লাগিল। রথিগণ রথীদিগের সহিত, অশ্বারোহিগণ অশ্বারোহীদিগের সহিত, মাতঙ্গগণ মাতঙ্গদিগের সহিত ও পদাতিগণ পদাতি-দিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইল। অসংখ্য মত্ত মাতঙ্গ উন্মত্তের ন্যায় চীৎকার করত পরস্পরের প্রতি আঘাত ও পরস্পরকে সংহার করিতে আরম্ভ করিল।
হে মহারাজ! সেই ঘোরতর সংগ্রামসময়ে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণাচার্য্যের অশ্বগণের সহিত আপনার অশ্বসমুদায় মিলিত করিলেন। বায়ুবেগশালী পারাবতসবর্ণ ও রক্তবর্ণ অশ্ব-গণ একত্র মিলিত হইয়া বিদ্যুৎসংবলিত মেঘের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। তখন অরাতিনিপাতন মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন, দ্রোণাচার্য্যকে সমীপস্থ দেখিয়া দুষ্কর কর্ম নির্ব্বাহ করিবার মানসে কাৰ্ম্মক পরিত্যাগপূর্ব্বক অসিচৰ্ম্ম গ্রহণ করিলেন এবং রথদণ্ড অবলম্বনপূর্ব্বক দ্রোণের রথে গমন করিয়া কখন অশ্বগণের উপরে, কখন অশ্বগণের পশ্চাদ্ভাগে ও কখন যুগমধ্যে অবস্থান করিলেন। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন খড়াহন্তে দ্রোণের রক্তবর্ণ অশ্বগণের উপর বিচরণ করিতে আরম্ভ করিলে আচার্য্য তাঁহার কিছুমাত্র রন্ধ্র অবলোকনে সমর্থ হইলেন না। শ্যেনপক্ষী আমিষগ্রহণার্থ অরণ্যে যেরূপ ভ্রমণ করে, মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণকে বিনষ্ট করিবার নিমিত্ত রণক্ষেত্রে সেইরূপ বিচরণ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে বীরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য শত বাণে ধৃষ্টদ্যুম্নের চর্ম, দশ শরে অসি, চতুঃযষ্টি শরে অশ্বসমুদায় এবং দুই ভল্লে তাঁহার ধ্বজ, ছত্র, পৃষ্ঠরক্ষক ও সারথিকে ছেদনপূর্ব্বক শরাসন আকর্ণ আকর্ষণ করিয়া তাঁহার উপর অশনিসদৃশ জীবিতান্তক বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মহাবল সাত্যকি তদ্দর্শনে অবিলম্বে চতুৰ্দ্দশ তীক্ষ্ণ বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক সেই দ্রোণবিমুক্ত শর ছেদন করিয়া সিংহমুখে নিপতিত মৃগের ন্যায় ধৃষ্টদ্যুম্নকে দ্রোণ হইতে রক্ষা করিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সেই মহারণে সাত্যকিকে ধৃষ্টদ্যুম্নের রক্ষক অবলোকন করিয়া সত্বরে তাঁহার উপর ষড়বিংশতি শর পরিত্যাগপূর্ব্বক সৃঞ্জয়গণকে সংহার করিতে লাগিলেন। মহাবীর সাত্যকি তদ্দর্শনে ক্রোধান্বিত হইয়া দ্রোণের বক্ষঃস্থলে ষড়বিংশতি শর নিক্ষেপ করিলেন। তখন বিজয়া-ভিলাষী পাঞ্চালদেশীয় রথিগণ সাত্যকিকে দ্রোণাচার্য্যের অভিমুখীন দেখিয়া সত্বরে ধৃষ্টদ্যুম্নকে সমর হইতে অপসারিত করিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। বৃষ্ণিপ্রবীর সাত্যকি দ্রোণ-নির্মুক্ত শর ছেদনপূর্ব্বক ধৃষ্টদ্যুম্নকে মুক্ত করিলে শস্ত্রধারিগণের অগ্রগণ্য মহাধনুর্দ্ধর দ্রোণাচার্য্য সাত্যকির উপর ক্রুদ্ধ হইয়া কিরূপে সংগ্রাম করিলেন?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ক্রোধভরে শরাসন গ্রহণ করিয়া সুবর্ণপুঙ্খ শর ও নারাচসমুদায় নিক্ষেপ করত ব্যাদিতাস্য, বিকটিতদশন, তাম্রাক্ষ মহাসর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক সাত্যকির অভিমুখে ধাবমান হইলেন। তাঁহার লোহিতবর্ণ অশ্বগণ এরূপ বেগে গমন করিতে লাগিল যে, দর্শনমাত্র বোধ হয় উহারা আকাশমার্গে গমন বা পর্ব্বতোপরি সমুত্থান করিতেছে। তখন শত্রুজেতা মহাশূর সাত্যকি শক্তি খড়াধারী অমর্যপরায়ণ দ্রোণাচার্য্যকে বেগশালী রথে আরোহণপূর্ব্বক কাৰ্ম্মক আকর্ষণ এবং অসংখ্য শর ও নারাচ নিক্ষেপ করত অশনিনির্ঘোযশালী বারিধারাবর্ষী বায়ুবেগ-চালিত বিদ্যুদ্দামরঞ্জিত মহামেঘের ন্যায় আগমন করিতে দেখিয়া ঈষৎ হাস্য করত সারথিকে কহিলেন, হে সূত! তুমি অবিলম্বে এই স্বধর্ম্মবিবর্জিত দুর্য্যোধনের আশ্রিত রাজপুত্রদিগের আচার্য্য শূরাভিমানী ব্রাহ্মণের অভিমুখে অশ্ব পরিচালন কর। সারথি সাত্যকির বাক্যানুসারে তৎক্ষণাৎ রজতসঙ্কাশ বায়ুবেগসম অশ্বগণকে দ্রোণাচার্য্যের সমীপে সমানীত করিল।
হে মহারাজ। অনন্তর অরাতিনিপাতন দ্রোণাচার্য্য ও শিনিবংশাবতংস সাত্যকি উভয়ে তুমুল সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়া পরস্পরের প্রতি বারিধারার ন্যায় বহুসহস্র শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ঐ মহাবীরদ্বয়ের শরজালে আকাশমার্গ ও দশদিক্ সমাচ্ছন্ন হইলে প্রভাকরের প্রভাবিনাশ ও সমীরণের গতিরোধ হইল। এইরূপে উভয়ের বাণ বর্ষণে রণস্থল নিবিড় অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হইলে অন্যান্য বীরগণ উহা নিতান্ত অনিবার্য্য বোধ করিয়া সংগ্রাম পরিত্যাগপূর্ব্বক অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন নরশ্রেষ্ঠ দ্রোণ ও সাত্যকি অবিশেষে পরস্পরের উপর শর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। ধরাভিঘাতজ তাঁহাদের শরসন্নিপাতের গভীর শব্দ দেবরাজপ্রেরিত অশনিনিস্বনের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। নারাচবিদ্ধ বীরগণের কলেবর আশীবিষ-বিদষ্ট সর্পের ন্যায় অতি ভীষণ হইয়া উঠিল। যুদ্ধোন্মত্ত মহাবীর দ্রোণ ও সাত্যকির নিরন্তর জ্যানির্ঘোষ বজ্রাহত শৈলশৃঙ্গের শব্দের ন্যায় শ্রবণগোচর হইতে লাগিল। উভয়ের রথ, সারথি ও অশ্বসমুদায় স্বর্ণপুঙ্খ শরে বিদ্ধ হইয়া বিচিত্র শোভা ধারণ করিল। অকুটিল নির্মল নারাচ নির্মোক নির্মূক্ত ভুজঙ্গের ন্যায় নিপতিত হইতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে তাঁহারা উভয়ে উভয়ের ছত্র ও ধ্বজ ছেদনপূর্ব্বক মদস্রাবী বারণদ্বয়ের ন্যায় শোণিতাক্ত-কলেবর হইয়া বিজয়-বাসনায় পরস্পরের প্রতি জীবিতান্তকর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় সেনাগণের গর্জন ও উৎক্রোশ' এবং শঙ্খ-দুন্দুভির নিম্বন এককালে তিরোহিত হইল। সৈন্যসকল তৃষ্ণীভূত ও যোদ্ধৃবর্গ যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইয়া কৌতূহলাক্রান্ত চিত্তে দ্রোণ ও সাত্যকির দ্বৈরথযুদ্ধ' অবলোকন করিতে লাগিল। যাবতীয় রথী, গজারোহী, অশ্বারোহী ও পদাতিগণ তাঁহাদের উভয়ের চতুর্দিকে ব্যূহ নির্মাণপূর্ব্বক দণ্ডায়মান হইয়া অনিমেষ নয়নে যুদ্ধ দর্শন করিতে আরম্ভ করিল। মুক্তাবিদ্রুমশোভিত, মণিকাঞ্চনবিভূষিত ধ্বজ, বিচিত্র আভরণ, হিরণ্ময় কবচ, পতাকা, চিত্রকম্বল, নির্মূল শাণিত শস্ত্র, বাজিগণের চামর এবং গজ-সমুদায়ের সুবর্ণ ও রজত নির্মিত কুম্ভমালা ও দত্তবেষ্টনের প্রভাপ্রভাবে সেনানিচয় বকপংক্তিবিরাজিত খদ্যোতসমুদ্দ্যোতিত সৌদামিনীসংবলিত বর্ষাকালীন জলদপটলের ন্যায় লক্ষিত হইতে লাগিল। এইরূপে উভয় পক্ষীয় সেনাগণ মহাত্মা সাত্যকি ও দ্রোণাচার্য্যের সেই অপূর্ব্ব যুদ্ধ দর্শন করিতে আরম্ভ করিল। ব্রহ্মা ও চন্দ্র প্রভৃতি দেবতা এবং সমুদায় সিদ্ধ, চারণ, বিদ্যাধর ও মহোরগগণ বিমানাগ্রে অবস্থানপূর্ব্বক সেই বীরদ্বয়ের বিচিত্র গমন, প্রত্যাগমন ও আক্ষেপ দর্শন করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত বীরদ্বয় স্ব স্ব লঘুহস্ততা প্রদর্শনপূর্ব্বক পরস্পরকে তীক্ষ্ণবাণে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মহাবীর সাত্যকি সুদৃঢ় সায়কনিকরে দ্রোণাচার্য্যের শরসমুদায় ও শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। অরাতিনিপাতন দ্রোণ অবিলম্বে অন্য শরাসন জ্যাযুক্ত করিলেন। মহাবীর সাত্যকি তাহাও তৎক্ষণাৎ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে শিনি-বংশাবতংস সাত্যকি ষোড়শবার দ্রোণাচার্য্যের শরাসন ছেদন করিলে আচার্য্য তাহার অলৌকিক ক্রিয়া ও ইন্দ্রের ন্যায় হস্তলাঘব দর্শন করিয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন, মহাবীর পরশুরাম, কার্তবীর্য্য ও পুরুষশ্রেষ্ঠ ভীষ্মের যেরূপ অস্ত্রবল, মহাত্মা সাত্যকিরও সেইরূপ অস্ত্রবল দৃষ্ট হইতেছে। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য এইরূপে মনে মনে সাত্যকির ভূয়সী প্রশংসা করিয়া পরম পরিতোষ লাভ করিলেন। ইন্দ্রাদি দেব, গন্ধর্ব্ব, সিদ্ধ ও চারণগণ দ্রোণাচার্য্যের হস্তলাঘব অবগত ছিলেন, কিন্তু সাত্যকির লঘুহস্ততা অবগত ছিলেন না, এক্ষণে তাঁহার অসাধারণ ক্ষমতা সন্দর্শন করিয়া পরম পরিতুষ্ট হইলেন।
অনন্তর অস্ত্রবিদ্যাবিশারদ ক্ষত্রিয়মৰ্দ্দন দ্রোণাচার্য্য অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া অস্ত্র সন্ধান করিলেন। সাত্যকিও অবিলম্বে স্বীয় অস্ত্রদ্বারা তাঁহার অস্ত্র ছেদন করিয়া তাঁহার উপর তীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইলেন। সমরকৌশলাভিজ্ঞ কৌরবপক্ষীয় যোদ্ধৃগণ সাত্যকির সংগ্রামকৌশল ও অসাধারণ অতিমানুষ কৰ্ম্ম অবলোকন করিয়া তাঁহাকে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান করিতে আরম্ভ করিলেন। দ্রোণাচার্য্য যে যে অস্ত্র নিক্ষেপ করিলেন, সাত্যকিও সেই সেই অস্ত্র প্রয়োগ করিতে লাগিলেন।
ধনুর্ব্বেদপারদর্শী শত্রুতাপন দ্রোণাচার্য্য তদ্দর্শনে কথঞ্চিৎ সম্ভ্রান্ত হইলেন এবং পরিশেষে যৎপরোনাস্তি ক্রোধান্বিত হইয়া সাত্যকির বিনাশ-বাসনায় দিব্য আগ্নেয়াস্ত্র গ্রহণ করিলেন। মহাবীর সাত্যকি দ্রোণকে রিপুঘ্ন' ভীষণ আগ্নেয়াস্ত্র গ্রহণ করিতে অবলোকন করিয়া দিব্য বারুণাস্ত্র ধারণপূর্ব্বক সিংহনাদ করিতে লাগিলেন; এইরূপে সেই বীরদ্বয় দিব্যাস্ত্র গ্রহণ করিলে চতুর্দিকে হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল। তৎকালে খেচর প্রাণিগণও আকাশ-বিচরণ পরিত্যাগ করিল। ঐ মহাবীরদ্বয়ের শরাসন-সমাহিত দিব্যাস্ত্রদ্বয় পরস্পরের প্রভাবে পরস্পর ব্যর্থ হইয়া গেল। হে মহারাজ। ঐ সময় ভগবান্ ভাস্কর অস্তগমনোন্মুখ হইলেন। তখন রাজা যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, নকুল ও সহদেব সাত্যকিকে রক্ষা করিতে লাগিলেন। বিরাটরাজ ও কেকয় নরপতি এবং মৎস্য শাল্যদেশীয় বীরগণ, ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি বীরগণের সহিত দ্রোণাচার্য্যের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন সহস্র সহস্র রাজপুত্রগণ দুঃশাসনকে অগ্রবর্তী করিয়া অরাতিপরিবারিত দ্রোণাচার্য্যকে রক্ষা করিবার মানসে তাঁহার নিকট গমন করিলেন। উভয় পক্ষের তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হইল। পার্থিব-রেণু ও বীরগণের শরজালে সমরস্থল পরিব্যাপ্ত হইলে সকলেই ভয়বিহ্বল হইল এবং কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না; তখন সংগ্রাম কার্য্য অতি অনিয়মে সম্পাদিত হইতে লাগিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। ঐ সময় দিনমণি অস্তাচল শিখরাভিমুখী হইলে দিবস ক্রমে অবসন্ন হইতে লাগিল এবং দিনকরের প্রচণ্ড কিরণ মন্দীভূত হইল; তখন যোদ্ধৃবর্গের মধ্যে কেহ কেহ সংগ্রামে প্রবৃত্ত, কেহ কেহ বিরত, কেহ কেহ পুনর্বার সমাগত হইল এবং কেহ কেহ রণস্থলেই অবস্থিত হইতে লাগিল। এইরূপে সেই দিনাবসান সময়ে জয়াভিলাষী সেনাগণ পরস্পর সংগ্রামে সংসক্ত হইলে মহাত্মা বাসুদেব ও অর্জুন সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। মহাত্মা জনার্দ্দন যে যে স্থানে রথ চালন করিলেন, মহাবীর ধনঞ্জয় নিশিত শরনিকরে সৈন্যগণকে অপসারিত করিয়া সেই সেই স্থানে রথ গমনের পথ করিতে লাগিলেন। মহাবীর অর্জুনের রথ যে যে স্থানে গমন করিল, সেই সেই স্থানে কৌরবসৈন্যগণ তাঁহার শাণিত শরে বিদীর্ণ হইয়া গেল। বলবীর্য্যসম্পন্ন বাসুদেব উত্তম, মধ্যম ও অধম এই ত্রিবিধ মণ্ডল প্রদর্শনপূর্ব্বক স্বীয় রথশিক্ষানৈপুণ্য প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলেন। কালাগ্নিতুল্য স্নায়ুনদ্ধ', নামাঙ্কিত, বায়ুবেগগামী বৈণব' ও আয়স শরসমুদায় পক্ষিগণ সমভিব্যাহারে বিপক্ষদিগের রুধির পান করিতে লাগিল। মহাত্মা মধুসূদন এরূপ বেগে রথ সঞ্চালন করিতে লাগিলেন যে রথারূঢ় অর্জুনের ক্রোশগামী শরনিকর অরাতিগণের বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিবার পূর্ব্বেই তিনি এক ক্রোশ অন্তরে উপনীত হইলেন। বাসুদেবসঞ্চালিত অশ্বগণকে গরুড় ও বায়ুর ন্যায় বেগে গমন করিতে দেখিয়া সমুদায় লোক বিস্ময়াপন্ন হইল। মহাবীর অর্জুনের মনোমারুতগামী রথ সংগ্রামস্থলে যেরূপ বেগে গমন করিতে লাগিল, সূর্য্য, ইন্দ্র, রুদ্র ও কুবেরের রথও সেরূপ বেগে গমন করিতে সমর্থ নহে। এইরূপে শত্রুনিপাতন কেশব সমরাঙ্গনে রথ সমানীত করিয়া সেনামধ্যে অশ্বগণকে পরিচালিত করিলেন। অশ্বগণ সমরবিশারদ বীরগণের অস্ত্রা-ঘাতে ক্ষত-বিক্ষত ও ক্ষুৎপিপাসায় নিতান্ত কাতর হইয়াছিল, সুতরাং রণভূমিস্থ রথসমুদায়ের মধ্যস্থলে উপস্থিত হইয়া অতি কষ্টে স্যন্দন আকর্ষণ করত বিচিত্র মণ্ডলে বিচরণ এবং নিহত মনুষ্য, নাগ, অশ্ব ও রথসমূহের উপরিভাগ দিয়া ক্রমে ক্রমে গমন করিতে লাগিল।
হে মহারাজ! ঐ সময় অবন্তিদেশীয় বিন্দ ও অনুবিন্দ মহাবীর অর্জুনকে ক্লান্তবাহন দেখিয়া সেনাগণ-সমভিব্যাহারে তাঁহার সম্মুখীন হইয়া তাঁহাকে চতুঃষষ্টি, বাসুদেবকে সপ্ততি এবং তাঁহাদের অশ্বগণকে শত বাণে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর অর্জুন কোপান্বিত হইয়া তাহাদের উপর মর্মভেদী নতপর্ব্ব নয় বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত বিন্দ ও অনুবিন্দ অর্জুনের শরাঘাতে নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে ও কেশবকে শরবর্ষণে সমাচ্ছন্ন করত সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর অর্জুন দুই ভল্লদ্বারা অবিলম্বে তাঁহাদিগের বিচিত্র শরাসনদ্বয় ও কনকোজ্জ্বল ধ্বজযুগল ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবল বিন্দ ও অনুবিন্দ তৎক্ষণাৎ অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া ক্রোধভরে অর্জুনের উপর শরবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। পাণ্ডুনন্দন তদ্দর্শনে ক্রোধে কম্পিত-কলেবর হইয়া পুনরায় দুই শরে তাঁহাদের দুই জনের শরাসন ছেদন করিলেন এবং সুবর্ণপুঙ্খ শিলাশিত বিশিখজালে তাঁহাদিগের সারথি, পদাতি, পৃষ্ঠরক্ষক ও অশ্বসকল সংহার করত ক্ষুর-প্রাস্ত্রদ্বারা বিন্দের মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর বিন্দ অর্জুনের শরে গতাসু হইয়া বাতভগ্ন পাদপের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইলেন। তখন রথিপ্রধান মহাবল পরাক্রান্ত অনুবিন্দ জ্যেষ্ঠভ্রাতা বিন্দের নিধনদর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া সেই হতাশ্ব রথ পরিত্যাগপূর্ব্বক গদাহস্তে অর্জুনাভিমুখে গমন করিয়া মধুসূদনের ললাটে গদাঘাত করিলেন। মহাত্মা বাসুদেব অনুবিন্দের গদাঘাতে অণুমাত্র কম্পিত না হইয়া মৈনাক পর্ব্বতের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন সব্যসাচী ধনঞ্জয় ক্রোধভরে ছয় বাণে অনুবিন্দের ভুজদ্বয়, পাদদ্বয়, মস্তক ও গ্রীবা ছেদন করিয়া ফেলিলেন।
এইরূপে মহাবীর বিন্দ ও অনুবিন্দ নিহত হইলে তাঁহাদের অনুগামিগণ ক্রোধভরে শর বর্ষণ করত অর্জুনের অভিমুখে ধাবমান হইল। মহাবীর ধনঞ্জয় অবিলম্বে তীক্ষ্ণ শরে তাঁহাদিগকে সংহার করিয়া নিদাঘকালীন অরণ্যদহন হুতাশনের ন্যায়, মেঘনির্মুক্ত দিবাকরের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ অর্জুনকে অবলোকন করিয়া প্রথমতঃ নিতান্ত ভীত হইলেন, কিন্তু পরিশেষে তাঁহাকে শ্রান্ত ও জয়দ্রথকে দূরস্থ অবধারিত করিয়া প্রসন্নচিত্তে সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক চতুৰ্দ্দিক্ হইতে পার্থকে আক্রমণ করিতে লাগিলেন। পুরুষর্ষভ অর্জুন তাহাদিগকে ক্রোধভরে আগমন করিতে দেখিয়া কৃষ্ণকে মৃদুবচনে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে মাধব। আমাদিগের অশ্বসকল শরাদ্দিত ও ক্লান্ত হইয়াছে; জয়দ্রথও অতি দূরে অবস্থান করিতেছে। অতএব এক্ষণে তোমার মতে কি করা কর্ত্তব্য? তুমি সর্ব্বাপেক্ষা প্রাজ্ঞতম ও পাণ্ডবগণের নেত্রস্বরূপ; পাণ্ডবেরা তোমার বুদ্ধিকৌশলেই সংগ্রামে শত্রুগণকে পরাজিত করিতে সমর্থ হইবে। যাহা হউক, এক্ষণে আমার মতে অশ্বগণকে বন্ধনমুক্ত করিয়া বিশল্য করা কর্তব্য। জনার্দ্দন অর্জুনের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ভ্রাতঃ! তুমি যাহা কহিতেছ, তাহাতে আমার সম্পূর্ণ সম্মতি আছে। তখন অর্জুন কহিলেন, হে সখে! তুমি এই স্থানে অবস্থানপূর্ব্বক আপনার কর্তব্য কর্ম সম্পাদন কর; আমি সমুদায় সৈন্যগণকে নিবারণ করিতেছি।
মহাবীর অর্জুন এই বলিয়া অসম্ভ্রান্ত চিত্তে রথ হইতে অবতরণপূর্ব্বক গাণ্ডীবশরাসন ধারণ করিয়া অচলের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন বিজয়াকাঙ্ক্ষী ক্ষত্রিয়গণ ধনঞ্জয়কে ধরণীতলস্থ দেখিয়া, এই আক্রমণ করিবার উপযুক্ত সময়, এইরূপ বিবেচনা করত অসংখ্য রথ-সমভিব্যাহারে শরাসন আকর্ষণ ও বিচিত্র অস্ত্রসমুদায় নিক্ষেপপূর্ব্বক মত্ত মাতঙ্গগণ যেমন সিংহের অভিমুখে ধাবমান হয়, তদ্রূপ তাঁহার অভিমুখে গমন ও তাঁহাকে অবরোধ করিলেন। মহাবীর অর্জুন ক্ষত্রিয়গণের শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া মেঘাচ্ছাদিত দিবাকরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। ঐ সময় রণস্থলে অরাতিনিপাতন পার্থের অদ্ভুত ভুজবল লক্ষিত হইল। তিনি স্বীয় অস্ত্রপ্রভাবে বিপক্ষাস্ত্র নিরাকৃত ও সমুদায় যোদ্ধৃগণকে সমাচ্ছন্ন করিয়া সৈন্যগণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। বাণের প্রগাঢ় সঙ্ঘর্ষণে আকাশমার্গে প্রজ্বলিত পাবকের আবির্ভাব হইল। অসংখ্য বীরগণ জয়াভিলাষী হইয়া ক্রুদ্ধচিত্তে বহুসংখ্য শোণিতোক্ষিত' মদস্রাবী মাতঙ্গ ও অশ্বগণ সমভিব্যাহারে একমাত্র অর্জুনকে পরাজয় করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের রথসমুদায় সাগরের ন্যায় দৃষ্ট হইল। শরনিকর উহার তরঙ্গ, ধ্বজ আবর্ত্ত, হস্তী নক্র, পদাতি মৎস্য, উষ্ণীষ কমঠ এবং ছত্র ও পতাকা-সমুদায় ফেনের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। মহাবীর ধনঞ্জয় কেবল বেলাস্বরূপ' হইয়া সেই অক্ষোভ্য রথসাগর নিবারণ করিলেন। তখন মহাত্মা বাসুদেব অশঙ্কিতচিত্তে পুরুষপ্রধান অর্জুনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, সখে! অশ্বগণ জলপানের নিমিত্ত উৎসুক হইয়াছে; ইহাদিগের জলপান করা নিতান্ত আবশ্যক, অবগাহনে তাদৃশ আবশ্যকতা নাই, কিন্তু সমরক্ষেত্রে একটিও কূপ দেখিতে পাই না, ইহারা কোথায় জলপান করিবে? মহাবীর অর্জুন কৃষ্ণের এই কথা শ্রবণে এই জলাশয় রহিয়াছে, বলিয়া তৎক্ষণাৎ অশ্বগণের জলপান নিমিত্ত অস্ত্রদ্বারা অবণী বিদারণপূর্ব্বক হংস, কারণ্ডব, চক্রবাকসুশোভিত মৎস্য, কুৰ্ম্ম সমাকীর্ণ ঋষিগণসেবিত নিৰ্ম্মলসলিলসম্পন্ন বিকশিত-কমলদলোপশোভিত সুবিস্তীর্ণ সরোবর প্রস্তুত করিলেন। দেবর্ষি ি নারদ সেই তৎক্ষণ-বিনির্মিত সরোবর সন্দর্শনার্থ তথায় সমাগত হইলেন। তখন বিশ্বকর্মসদৃশ অদ্ভুতকর্মা অর্জুন তথায় শরবংশ, শরস্তম্ভ ও শরাচ্ছাদন'সম্পন্ন অদ্ভুত শরগৃহ নির্মাণ করিলেন। মহাত্মা কৃষ্ণ পার্থের এই আশ্চর্য্য কার্য্য সন্দর্শনে চমৎকৃত হইয়া হাস্য করত তাঁহাকে ভূয়োভূয়ঃ সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে মহাত্মা অর্জুনের প্রভাবে সমরস্থলে সলিল সমুৎপন্ন, শরগৃহ নিৰ্ম্মিত ও শত্রুসৈন্যগণ নিরাকৃত হইলে মহাদ্যুতি বাসুদেব রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া কঙ্কপত্রযুক্ত বাণে নির্ভিন্ন তুরঙ্গমগণকে মুক্ত করিলেন। যাবতীয় সিদ্ধ ও চারণগণ এবং সমুদায় সৈনিক পুরুষ মহাবীর অর্জুনের এই অদৃষ্টপূর্ব্ব কার্য্য সন্দর্শন করিয়া তাঁহাকে বারংবার সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। মহারথগণ কোন-ক্রমেই অর্জুনকে নিবারণ করিতে পারিলেন না দেখিয়া সকলেই আশ্চর্য্যান্বিত হইলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় প্রভৃত গজ, বাজি ও অসংখ্য রথের আক্রমণেও অশঙ্কিত হইয়া সমুদায় পুরুষকে অতিক্রমপূর্ব্বক আশ্চর্য্য যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহীপালগণ অর্জুনের উপর অসংখ্য শরবৃষ্টি করিতে লাগিলেন; কিন্তু মহাত্মা বাসবনন্দন তাহাতে কিছুমাত্র ব্যথিত হইলেন না। সাগর যেমন নদীগণকে অনায়াসে ধারণ করে, সেইরূপ বীর্য্যবান্ পার্থ বীরগণ নির্মুক্ত শত শত শর, গদা ও প্রাসসমুদায় অব্যগ্রচিত্তে ধারণ করিতে লাগিলেন। তাঁহার অস্ত্রবেগে ও নিজ বাহুবলে নরেন্দ্রগণের উত্তম উত্তম বাণসকল বিফল হইয়া গেল। এক লোভ যেমন সমুদায় সদ্গুণ নিবারণ করে, সেইরূপ অর্জুন একাকী ভূমিস্থ হইয়াও রথারূঢ় অসংখ্য ভূপতিগণকে নিবারণ করিলেন। তখন কৌরবেরাও পার্থ ও বাসুদেবের অদ্ভুত পরাক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করত কহিতে লাগিলেন যে, মহাপ্রভাব অর্জুন ও বাসুদেব রণক্ষেত্রে অশ্বগণকে রথ হইতে মুক্ত করিয়াছেন, ইহা অপেক্ষা আর কি আশ্চর্য্য ব্যাপার আছে? ঐ বীরদ্বয় সমরস্থলে অসাধারণ তেজঃ প্রকাশপূর্ব্বক আমা-দিগকে ভয়বিহ্বল করিয়াছেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় অশ্ববিদ্যা সুনিপুণ মহাত্মা মধুসূদন সৈন্যগণ-সমক্ষে সেই অর্জুননিৰ্ম্মিত শরগৃহে অশ্বগণকে সমানীত করিয়া তাহাদের শ্রম, গ্লানি ও বেপথু নিবারণ করিলেন এবং স্বহস্তে তাহাদের শল্যোদ্ধার ও গাত্র পরিমার্জনপূর্ব্বক তাহাদিগকে জলপান করাইলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে অশ্বগণের উদকপান, স্নান, ভক্ষণ ও ক্লমবিনোদন সমাধান হইলে মহাত্মা কৃষ্ণ হৃষ্টচিত্তে তাহাদিগকে পুনরায় উত্তম রথে সংযোজিত করিলেন এবং অর্জুন-সমভিব্যাহারে তাহাতে আরোহণ করিয়া দ্রুতবেগে গমন করিতে লাগিলেন। কৌরবেরা মহাবীর অর্জুনের রথে বিগততৃষ্ণ অশ্বগণ সংযোজিত হইয়াছে দেখিয়া পুনর্ব্বার বিমনায়মান হইলেন। তাঁহারা ভগ্নদর্শন সর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, হায়! কৃষ্ণ ও অর্জুন গমন করিয়াছে; আমাদিগকে ধিক্। ঐ সময় একরথারূঢ়, বৰ্ম্মাচ্ছাদিত দেহ, অরাতিঘাতন কৃষ্ণ ও অর্জুন ক্রীড়া করতই যেন কৌরব সৈন্যগণকে সংহারপূর্ব্বক যত্নবান্ ক্ষত্রিয়গণের সমক্ষে স্বীয় বীর্য্য প্রকাশ করত গমন করিতে লাগিলেন। তখন অন্যান্য সৈন্যগণ তাঁহাদিগকে দ্রুতবেগে গমন করিতে দেখিয়া উচ্চস্বরে কহিল, হে কৌরবগণ! ঐ দেখ, কেশব ধনুর্দ্ধারিগণের সমক্ষে রথযোজন করিয়া আমাদিগকে ছিন্ন ভিন্ন করত জয়দ্রথের অভিমুখে অশ্বচালন করিতেছেন। অতএব তোমরা অবিলম্বে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে সংহার করিতে যত্নবান্ হও।
হে মহারাজ! সেই সময় কোন কোন ভূপতি সমরক্ষেত্রে সেই অদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হায়! দুর্য্যোধনের অপরাধেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, সমস্ত সৈন্য, ক্ষত্রিয়গণ ও সমুদায় পৃথিবী এককালে উৎসন্ন হইল! উপায়ানভিজ্ঞ দুর্য্যোধন ইহা বুঝিতে পারিতেছে না। কেহ কেহ বলিলেন, সিন্ধুরাজের আর নিস্তার নাই; তিনি অবশ্যই শমনসদনে গমন করিবেন; এক্ষণে তাঁহার নিমিত্ত কর্ত্তব্য থাকে কুরুরাজ তাহার অনুষ্ঠান করুন। হে রাজন! ঐ সময় মহাবীর অর্জুন অক্লান্ত তুরঙ্গমযুক্ত রথে আরোহণপূর্বক সিন্ধুরাজের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। কৌরবপক্ষীয় যোদ্ধৃগণ সেই শস্ত্রধরাগ্রগণ্য, কালান্তক যমোপম, মহাবাহু অর্জুনকে কোনক্রমে নিবারণ করিতে পারিলেন না। শত্রুতাপন পাণ্ডব জয়দ্রথের অভিমুখে গমনার্থে মৃগকুলনিহন্তা মৃগরাজের ন্যায়, কৌরবসৈন্যগণকে বিদ্রাবণ ও বিলোড়ন করিতে লাগিলেন। মহাত্মা মধুসূদন সৈন্যসাগর-মধ্যে অবগাহনপূর্ব্বক সত্বরে অশ্বচালন ও পাঞ্চজন্য নিনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। অর্জুনের অশ্বগণ এরূপ প্রবলবেগে গমন করিল যে, তদ্বিসৃষ্ট' শরনিকর তাঁহার পশ্চাদ্ভাগে নিপতিত হইতে লাগিল। অনন্তর সমুদায় নরপতি ও অন্যান্য ক্ষত্রিয়গণ জয়দ্রথ-বধাভিলাষী ধনঞ্জয়কে পুনরায় চতুৰ্দ্দিক্ হইতে আক্রমণ করিলেন। এইরূপে সৈন্যসকল অর্জুনাভিমুখে গমন করিলে, মহারাজ দুর্য্যোধন সত্বরে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। অনেক সৈন্য মহাবীর ধনঞ্জয়ের পবনোদ্ধৃত ও পতাকান্ত জলদগম্ভীরনিস্বন, কপিধ্বজ রথ দর্শন করিয়া বিষণ্ণ হইতে লাগিল। ঐ সময় পার্থিব রজোরাশি সমুত্থিত হইয়া দিনকরকে সমাচ্ছন্ন করিলে বাণাদ্দিত বীরগণ কৃষ্ণ ও অর্জুনকে অবলোকন করিতে অসমর্থ হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আপনার পক্ষীয় ভূপতিগণ বাসুদেব ও ধনঞ্জয়কে সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইতে দেখিয়া প্রথমতঃ ভয়ে পলায়নোন্মুখ হইলেন। পরিশেষে তাঁহারা সত্ত্বসঙ্কুক্ষিত' হইয়া ক্রোধভরে স্থিরচিত্তে ধনঞ্জয়ের অভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। যাঁহারা ক্রোধোত্তেজিত হইয়া অর্জুনের সহিত যুদ্ধে গমন করিলেন, তাঁহারা সাগরে পতিত তরঙ্গিণীর ন্যায় আর প্রতিনিবৃত্ত হইলেন না। তদ্দর্শনে অনেক অসাধু ক্ষত্রিয় বেদবিমুখ নাস্তিকের ন্যায় নরকগমনের ভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক সমর পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিলেন। তখন পুরুষশ্রেষ্ঠ কেশব ও অর্জুন দ্রোণের সেনাসমূহ বিদারণ ও রথিগণকে অতিক্রমপূর্ব্বক অস্ত্রজাল হইতে বিমুক্ত হইয়া রাহুবদনবিনিঃসৃত চন্দ্র-সূর্য্যের ন্যায় মহাজালবিমুক্ত মকরাস্য-বিনির্গত মৎস্যদ্বয়ের ন্যায় নিরীক্ষিত হইতে লাগিলেন এবং মকর যেমন সমুদ্র সংক্ষোভিত করে, সেইরূপ শস্ত্রদ্বারা কৌরবপক্ষীয় সেনাগণকে বিক্ষোভিত করিয়া ফেলিলেন।
হে মহারাজ। যখন মহাবীর অর্জুন ও বাসুদেব দ্রোণাচার্য্যের সৈন্যমধ্যে অবস্থান করিতেছিলেন, তৎকালে আপনার পুত্রগণ ও তৎপক্ষীয় যোদ্ধাসকল মনে মনে স্থির করিয়াছিলেন যে, কৃষ্ণ ও অর্জুন কদাপি দ্রোণাচার্য্য ও হাৰ্দ্দিক্যের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবেন না; অতএব সিন্ধুরাজের আর কোন বিপদের আশঙ্কা নাই। জয়দ্রথের জীবিতরক্ষা বিষয়ে কৌরবপক্ষীয়গণের মনে এই বলবতী আশার সঞ্চার হইয়াছিল, কিন্তু কৃষ্ণ ও অর্জুন দ্রোণকে অতিক্রম করিয়া গমন করিলে তাঁহাদের সে আশা একেবারে উম্মলিত হইল। তাঁহারা প্রজ্বলিত | পাবকতুল্য প্রতাপশালী মহাবীর কৃষ্ণ ও অর্জুনকে দ্রোণসৈন্য ও ভোজসৈন্য অতিক্রম করিতে দেখিয়া এককালে জয়দ্রথের আশা পরিত্যাগ করিলেন। তখন অরাতিকুল-ভয়বর্দ্ধন, নির্ভীকচেতাঃ কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয় পরস্পর জয়দ্রথ-বধ-বিষয়ণী মন্ত্রণা করত কহিলেন, কৌরবপক্ষীয় ছয়জন মহারথী জয়দ্রথের চতুৰ্দ্দিকে অবস্থানপূর্ব্বক উহাকে রক্ষা করিতেছে; কিন্তু ঐ দুরাত্মা একবার আমাদের নয়নগোচর হইলে কদাচ বিমুক্ত হইতে সমর্থ হইবে না। অধিক কি বলিব, যদি দেবগণের সহিত দেবরাজ স্বয়ং সমরে উহাকে রক্ষা করেন, তথাপি আজি উহার নিস্তার নাই। হে মহারাজ! মহাবাহু কৃষ্ণ ও অর্জুন জয়দ্রথকে অন্বেষণ করত পরস্পর এইরূপ কহিতে লাগিলেন। তাঁহাদের সেই সকল কথা আপনার পুত্রগণের কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। ঐ সময় অর্জুন মরুভূমি অতিক্রমণানন্তর বারিপানে পরিতৃপ্ত মাতঙ্গদ্বয়ের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। বণিকেরা ব্যাঘ্র, সিংহ ও গজসমাকীর্ণ ভূধর অতিক্রম করিয়া যেরূপ প্রফুল্লিত হয়, জরা-মৃত্যুবিহীন অরিনিসূদন মধুসূদন ও অর্জুনকে সেইরূপ হৃষ্টচিত্ত বোধ হইতে লাগিল। আপনার পুত্রগণ তদ্দর্শনে চতুর্দিকে চীৎকার করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর কৃষ্ণ ও অর্জুন প্রজ্বলিত জ্বলনতুল্য, আশীবিষসদৃশ দ্রোণ, হাৰ্দ্দিক্য এবং অন্যান্য নরপতিগণের শরজাল হইতে বিমুক্ত হইয়া ইন্দ্র ও অগ্নির ন্যায়, দ্যুতিমান' ভাস্করদ্বয়ের ন্যায় সমধিক শোভা ধারণ করিলেন। লোকে সমুদ্র হইতে সমুত্তীর্ণ হইলে যেরূপ হৃষ্ট হয়, উক্ত বীরদ্বয় অর্ণবসদৃশ দ্রোণসৈন্য হইতে উত্তীর্ণ হইয়া সেইরূপ আহ্লাদিত হইলেন। তাঁহারা ভারদ্বাজের শাণিত শর প্রহারে রুধিরাক্ত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল যেন, পর্ব্বতদ্বয় মধ্যে কর্ণিকার পুষ্প প্রস্ফুটিত হইয়াছে। সেই মহাবীরদ্বয় শক্তিরূপ আশীবিষ, নারাচরূপ মকর ও ক্ষত্রিয়রূপ সলিলশালী, দ্রোণরূপ হ্রদ এবং জ্যাঘোষরূপ অশনিনিস্বন, গদা ও খড়ারূপ বিদ্যুৎ সংবলিত দ্রোণাস্ত্ররূপ মেঘ হইতে বিমুক্ত হইয়া অন্ধকারবিনির্মুক্ত চন্দ্র ও সূর্য্যের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তাঁহারা দ্রোণের অস্ত্রজাল হইতে বিমুক্ত হইলে সকলেরই বোধ হইতে লাগিল যেন, ঐ মহাবীরদ্বয় বাহুদ্বারা বর্ষাকালীন সলিলপূর্ণ, গ্রাহগণ-সমাকুল সমুদ্রগামী নদীসমুদায় হইতে সমুত্তীর্ণ হইলেন। হে মহারাজ! যেমন ব্যাঘ্রদ্বয় মৃগ-জিঘাংসায় দণ্ডায়মান থাকে, সেইরূপ সেই মহাবীরদ্বয় সমীপস্থ জয়দ্রথের বিনাশেচ্ছায় তাঁহাকে অবলোকন করত অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের মুখবর্ণ নিরীক্ষণ করিয়া কৌরব-পক্ষীয় সমুদায় যোধগণ জয়দ্রথকে বিনষ্ট বলিয়া অবধারিত করিলেন।
তখন লোহিতলোচন কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয় সিন্ধুরাজকে সন্দর্শন করিয়া হৃষ্টচিত্তে মুহুর্মুহুঃ সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় অভীযুহস্ত' শৌরি ও ধনুষ্মান্ ধনঞ্জয় সূর্য্য ও পাবকের সমান প্রতাপশালী হইয়া উঠিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে অরাতি-নিসূদন মধুসূদন ও ধনঞ্জয় দ্রোণসৈন্য হইতে মুক্ত হইয়া জয়দ্রথকে সমীপে অবলোকন করত যাহার পর নাই আহ্লাদিত হইলেন এবং আমিষলোলুপ শ্যেন পক্ষীর ন্যায় বিক্রম প্রকাশ-পূর্ব্বক ক্রোধভরে সিন্ধুরাজের সমীপে গমন করিতে লাগিলেন। তখন দ্রোণসন্নদ্ধ' দুর্ভেদ্য কবচধারী অশ্বসংস্কারবিৎ বিপুল-পরাক্রম রাজা দুর্য্যোধন সেই বীরদ্বয়কে সিন্ধুরাজের অভিমুখে ধাবমান হইতে দেখিয়া তাঁহার রক্ষার্থ একরথে কৃষ্ণ ও পার্থকে অতিক্রমপূর্ব্বক কৃষ্ণের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। তখন কৌরবসৈন্যমধ্যে বিবিধ বাদিত্র ও শঙ্খধ্বনির সহিত সিংহনাদ সমুত্থিত হইতে লাগিল। অনলতুল্য তেজস্বী যে যে বীরগণ সিন্ধুরাজের রক্ষায় নিযুক্ত ছিলেন, তাঁহারা সকলে দুর্য্যোধনকে কৃষ্ণ ও অর্জুনের পুরোবর্তী দেখিয়া যাহার পর নাই আহ্লাদিত হইলেন। তখন মহাত্মা কেশব অনুচর পরিবৃত রাজা দুর্য্যোধনকে অতিক্রমণ করিতে দেখিয়া অর্জুনকে তৎকালোচিত কথা কহিতে আরম্ভ করিলেন।
কৃষ্ণ কহিলেন, হে ধনঞ্জয়। ঐ দেখ, দুর্য্যোধন আমা-দিগকে অতিক্রম করিয়াছে। দুর্য্যোধন অতি অদ্ভুত পরাক্রমশালী; আমার মতে ইহার তুল্য রথী আর কেহই নাই। ঐ মহাধনুর্দ্ধর অতিশয় অস্ত্রকুশল ও যুদ্ধদুৰ্ম্মদ। ঐ কৃতী রাজপুত্র চিরকাল সুখে লালিত হইয়াছে। উহার অস্ত্রসকল অত্যন্ত দৃঢ়। সকল মহারথেরাই উহার বহুমান করে। ঐ দুরাত্মা নিরন্তর তোমা-দিগের দ্বেষ করিয়া থাকে। অতএব হে অনঘ! এক্ষণে উহার সহিত যুদ্ধ করা তোমার নিতান্ত আবশ্যক। এই সংগ্রামে জয় ও পরাজয় তোমারই আয়ত্ত। হে অর্জুন। তুমি অবিলম্বে দুর্য্যোধনের উপর সেই চিরসঞ্চিত ক্রোধবিষ নিক্ষেপ কর। যে দুরাত্মা পাণ্ডবদিগের অনর্থপাতের নিদান, সেই আজি তোমার সহিত যুদ্ধে সমাগত হইয়াছে। অতএব এক্ষণে তুমি কৃতকার্য্য হইতে চেষ্টা কর। রাজা দুর্য্যোধন রাজ্যার্থী হইয়া কেন তোমার সহিত যুদ্ধে উপস্থিত হইল? যাহা হউক, ঐ পাপাত্মা ভাগ্যক্রমেই এক্ষণে তোমার বাণগোচর' হইয়াছে; অতএব যাহাতে অচিরাৎ জীবন পরিত্যাগ করে, শীঘ্র তাহার উপায় কর। ঐশ্বর্য্যমদমত্ত দুর্য্যোধন দুঃখের লেশমাত্রও ভোগ করে নাই। ঐ দুরাত্মা তোমার সাংগ্রামিক পরাক্রম কিছুমাত্র অবগত নহে। হে পার্থ! এক দুর্য্যোধনের কথা দূরে থাকুক, সমুদায় সুরাসুর ও মানবগণ একত্র হইলেও তোমাকে পরাজয় করিতে সমর্থ হয় না। দুরাত্মা দুর্য্যোধন ভাগ্যক্রমে আজি তোমার রথ-সমীপে উপস্থিত হইতেছে। অতএব পুরন্দর যেমন বৃত্রাসুরকে বিনাশ করিয়া-ছিলেন, সেইরূপ তুমিও ইহাকে বিনাশ কর। ঐ পাপাত্মা নিরন্তর তোমার অনিষ্টচেষ্টা, শঠতাপূর্ব্বক দ্যূতক্রীড়ায় ধর্মরাজকে বঞ্চনা এবং সতত তোমাদিগের প্রতি ভূরি ভূরি নৃশংস ব্যবহার করিয়াছে। অতএব তুমি কোন বিচার না করিয়া ঐ পাপপরায়ণ নৃশংসকে সংহার কর। হে অর্জুন! শঠতা-সহকারে রাজ্যাপহরণ, বনবাস ও দ্রৌপদীর সেই সকল ক্লেশ স্মরণ করিয়া সংগ্রামে পরাক্রম প্রকাশ করা তোমার অবশ্য-কর্তব্য। আজি দুরাত্মা দুর্য্যোধন সৌভাগ্যক্রমে তোমার কার্য্যে ব্যাঘাত করিবার চেষ্টায় তোমার সহিত যুদ্ধ করিতে বাসনা করত তোমার বাণপথের পথবর্তী হইয়া বিচরণ করিতেছে। আজি দৈবক্রমে তোমাদিগের মনোরথ সফল হইল। অতএব হে পার্থ! পূর্ব্বকালে দেবাসুর-যুদ্ধে যেমন দেবরাজ ইন্দ্র জম্ভাসুরকে বিনাশ করিয়াছিলেন, তদ্রূপ আজি তুমি কুরু-কুলকলঙ্কভূত ধৃতরাষ্ট্রতনয়কে নিপাত করিয়া দুরাত্মাদিগের মূলচ্ছেদন ও শত্রুতার শেষ কর। ঐ দুরাত্মার নিধনে উহার সৈন্যসকল অনাথ হইলে তুমি অনায়াসে তাহাদিগকে বিনাশ করিতে পারিবে।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাত্মা কেশব এই কথা বলিলে অর্জুন তাঁহার বাক্য স্বীকার করত কহিলেন, হে বাসুদেব! তুমি যাহা কহিলে ইহা আমার অবশ্যকর্ত্তব্য। অতএব অন্যান্য কার্য্য পরিত্যাগপূর্ব্বক যে স্থানে দুর্য্যোধন অবস্থিতি করিতেছে, অবিলম্বে সেই স্থানে গমন কর। হে মাধব। যে দুরাত্মা এত দীর্ঘকাল অকণ্টকে আমাদিগের রাজ্য ভোগ করিয়াছে, আজি কি রণস্থলে পরাক্রম প্রকাশপূর্ব্বক তাহার মস্তক ছেদন করিয়া সেই দুঃখভোগের অযোগ্যা দ্রৌপদীকে কেশাকর্ষণদুঃখ হইতে পরিত্রাণ করিতে সমর্থ হইব? হে মহারাজ! কৃষ্ণ ও অর্জুন পরস্পর এইরূপ বলিতে বলিতে দুর্য্যোধনকে আক্রমণ করিবার মানসে পরমানন্দে সংগ্রামস্থলে শ্বেতাশ্বসমুদায় সঞ্চালিত করিতে লাগিলেন। তখন আপনার পুত্র দুর্য্যোধন তাঁহাদিগের নিকটে উপস্থিত হইয়া সেই দারুণ ভয়াবহ সময়ে কিছুমাত্র শঙ্কিত হইলেন না; প্রত্যুত অগ্রসর হইয়া অর্জুন ও হৃষীকেশকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তদ্দর্শনে সকল ক্ষত্রিয়েরাই তাঁহাকে ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয় সৈন্যগণমধ্যে সিংহনাদ সমুত্থিত হইল। তখন আপনার পুত্র দুর্য্যোধন অর্জুনকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। শত্রুতাপন কুন্তী নন্দন দুর্য্যোধনকর্তৃক নিবারিত হইয়া ক্রোধে একান্ত অধীর হইলেন। দুর্য্যোধনও তাঁহার উপর যারপরনাই ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন। ভীষণরূপধারী ভূপতিগণ চতুৰ্দ্দিক্ হইতে সেই পরস্পরের প্রতি ক্রুদ্ধ দুর্য্যোধন ও ধনঞ্জয়কে অবলোকন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর দুর্য্যোধন বাসুদেব ও অর্জুনকে ক্রুদ্ধ দেখিয়া হাস্য করত যুদ্ধার্থ তাঁহাদিগকে আহ্বান করিলেন। কেশব ও ধনঞ্জয় দুর্য্যোধনের আহ্বানে একান্ত হৃষ্টচিত্ত হইয়া সিংহনাদ করত শঙ্খবাদন করিতে লাগিলেন। কৌরবগণ সেই বীরদ্বয়কে আহ্লাদিত দেখিয়া এককালে দুর্য্যোধনের জীবিতাশা পরিত্যাগ করিলেন এবং তাঁহাকে অগ্নিমুখে আহুত স্থির করিয়া নিতান্ত শোকার্ত হইলেন। কৌরবপক্ষীয় যোধগণ ভয়ে কাতর হইয়া রাজা হত হইলেন, রাজা হত হইলেন, এই বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন। তখন মহারাজ দুর্য্যোধন স্বপক্ষীয় সৈন্যগণের আর্তনাদ শ্রবণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে বীরগণ! তোমরা ভয় পরিত্যাগ কর, আমি এখনই কৃষ্ণ ও অর্জুনকে যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিব। কুরুরাজ সৈনিক পুরুষদিগকে এইরূপ আশ্বাস প্রদান করিয়া ক্রোধভরে অর্জুনকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, হে পার্থ! যদি তুমি পাণ্ডুরাজের ঔরসে জন্মপরিগ্রহ করিয়া থাক, তাহা হইলে দিব্য পার্থিব প্রভৃতি যে সকল অস্ত্র শিক্ষা করিয়াছ, তৎসমুদায় আমাকে প্রদর্শন কর। কেশবের যতদূর ক্ষমতা আছে, উনি তাহা প্রকাশ করুন। হে ধনঞ্জয়! তুমি আমার পরোক্ষে যে যে কার্য্য করিয়াছ, আজি আমার প্রত্যক্ষে সেই সমুদায় প্রকাশ কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। রাজা দুর্য্যোধন অর্জুনকে এই কথা বলিয়া মৰ্ম্মভেদী তিন শরে তাঁহাকে, চারি শরে তাঁহার চারি তুরঙ্গকে ও দশ বাণে কেশবকে বিদ্ধ করিয়া ভল্লাস্ত্রদ্বারা তাঁহার প্রতোদ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় দুর্য্যোধনের উপর বিচিত্রপুঙ্খ শিলাশাণিত চতুৰ্দ্দশ বাণ নিক্ষেপ করিলেন। অর্জুননিক্ষিপ্ত শরনিকর দুর্য্যোধনের বর্ম্মে লগ্ন হইবামাত্র ব্যর্থ হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। মহাবীর অর্জুন তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া পুনরায় শর নিক্ষেপ করিলেন। তৎসমুদায় দুর্য্যোধনের বর্ম্ম সংস্পর্শে ব্যর্থ হইল। তখন শত্রুতাপন কৃষ্ণ পার্থনিক্ষিপ্ত অষ্টাবিংশতি বাণ বিফল হইল দেখিয়া তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে ভরতশ্রেষ্ঠ! আজি যে ভূধরের গতিসদৃশ অদৃষ্টপূর্ব্ব ঘটনা অবলোকন করিতেছি। কি আশ্চর্য্য! তোমার বাণসকল ব্যর্থ হইল! আজি কি পূর্ব্বাপেক্ষা তোমার গাণ্ডীবের, মুষ্টির বা ভুজদ্বয়ের বলহানি হইয়াছে? আজি কি তোমার সহিত দুর্য্যোধনের শেষ সন্দর্শন হইবে না? হে অর্জুন! আজি আমি তোমার শরনিকর ব্যর্থ দেখিয়া নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্ট হইতেছি। তোমার অরাতিকলেবরবিদারক অশনিসদৃশ শরসকল কোন কার্য্যকারকই হইল না! একি বিড়ম্বনা।
অর্জুন কহিলেন, হে মাধব। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য দুর্য্যোধনশরীরে আমার অস্ত্রের অভেদ্য দারুণ কবচ সন্নিবেশিত করিয়াছেন। কেবল মহাত্মা আচার্য্য ঐ কবচ অবগত আছেন এবং আমি তাঁহার নিকট উহা অবগত হইয়াছি, এতদ্ভিন্ন ত্রিলোকমধ্যে আর কেহই এই কবচ বৃত্তান্ত জ্ঞাত নহেন। হে গোবিন্দ। মনুষ্যনিক্ষিপ্ত বাণের কথা দূরে থাকুক, ইন্দ্রের অশনিতেও উহা বিচ্ছিন্ন হইবার নহে। হে কেশব! তুমি ত্রিলোকের ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান বৃত্তান্ত অবগত আছ। তুমি এ বিষয়টি যেরূপ অবগত আছ, এমন আর কেহই নাই; তবে কি নিমিত্ত আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়া মুগ্ধ করিতেছ? হে কেশব। দুরাত্মা দুর্য্যোধন আচার্য্যদত্ত কবচ ধারণ করিয়া নির্ভয়ে রণস্থলে অবস্থিতি করিতেছে। কিন্তু এই কবচ ধারণ করিয়া কি করা কর্তব্য, তাহার কিছুই অবগত নহে; কেবল স্ত্রীলোকের ন্যায় গাত্রে ধারণ করিয়া আছে; অতএব তুমি আজি আমার ধনুঃ ও বাহুদ্বয়ের বীর্য্য পর্যবেক্ষণ কর। দুরাত্মা দুর্য্যোধন কবচরক্ষিত হইলেও আজি উহাকে পরাজয় করিব। আমার গাত্রে যে কবচ রহিয়াছে, ইহা প্রথমতঃ দেবাদিদেব মহাদেব অঙ্গিরাকে প্রদান করিয়াছিলেন; তৎপরে অঙ্গিরাঃ বৃহস্পতিকে ও বৃহস্পতি পুরন্দরকে সমর্পণ করেন। সুরপতি উপহারের সহিত ইহা আমাকে প্রদান করিয়াছেন। যাহা হউক, যদি দুর্য্যোধনের কবচ দেবসম্ভূত হয়, অথবা ব্রহ্মা স্বয়ং উহা নির্মাণ করিয়া থাকেন, তথাপি আজি দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন উহা দ্বারা রক্ষিত হইতে পারিবে না।
মহাবীর অর্জুন এইরূপ কহিয়া শরসমুদায় মন্ত্রপূত করত আকর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে অশ্বত্থামা দূর হইতে সর্ব্বাস্ত্র-নাশক অস্ত্রদ্বারা তৎসমুদায় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তদ্দর্শনে মহাবীর ধনঞ্জয় বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কেশবকে কহিলেন, হে জনার্দ্দন! আমি পুনর্ব্বার এ অস্ত্র প্রয়োগ করিতে সমর্থ নহি। এই অস্ত্র আমাকর্তৃক দুইবার প্রযুক্ত হইলে উহা আমাকে বা আমার সৈন্যগণকে বিনাশ করিবে। হে মহারাজ! এইরূপে অর্জুনের বাণ ছিন্ন হইলে মহাবীর দুর্য্যোধন আশীবিষসদৃশ নয় বাণে কৃষ্ণকে ও নয় বাণে অর্জুনকে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় তাঁহাদিগের উপর শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয়েরা তদ্দর্শনে যাহার পর নাই আহ্লাদিত হইয়া সিংহনাদ ও বাদিত্র বাদন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন বিপুলবীর্য্যশালী মহাবীর ধনঞ্জয় দুর্য্যোধনের প্রতি রোষাবিষ্ট হইয়া সৃক্কণী লেহন করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহার আপাদমস্তক বৰ্ম্মরক্ষিত নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার গাত্রে শর নিক্ষেপ করিতে সমর্থ হইলেন না। পরিশেষে অন্তকসদৃশ শরনিকরে দুর্য্যোধনের শরমুষ্টি শরাসন, অশ্ব-সমুদায়, পার্ফি ও সারথিকে ছেদনপূর্ব্বক তীক্ষ্ণ বাণদ্বয়ে রথ খণ্ড খণ্ড করিয়া অবিলম্বে তাঁহার হস্ততলদ্বয় বিদ্ধ করিলেন। কৌরবপক্ষীয় ধনুর্দ্ধরেরা পার্থশরপীড়িত দুর্য্যোধনকে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত দেখিয়া তাঁহার রক্ষার্থ সহস্র সহস্র রথ, গজ, বাজী ও রোষাবিষ্ট পদাতিসমূহ-সমভিব্যাহারে আগমন ও ধনঞ্জয়কে বেষ্টন করিয়া তাঁহার উপর বাণ বর্ষণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে মহাবীর অর্জুন ও গোবিন্দ সেই মহাবীরগণের অস্ত্রজালে ও জনসমূহে পরিবৃত হইলে কেহই আর তাঁহাদিগকে অবলোকনে সমর্থ হইল না। তখন মহাবীর অর্জুন নিশিত অস্ত্রদ্বারা সেই সৈন্যসমুদায় আহত করিতে আরম্ভ করিলেন। শত শত রথী ও মাতঙ্গ বিকলাঙ্গ হইয়া সমরভূমিতে শয়ন করিতে লাগিল। তদ্দর্শনে হতাবশিষ্ট অর্জুনশরতাড়িত সৈন্যগণ চতুৰ্দ্দিকে এক ক্রোশ ভূমি অবরোধ করিয়া তাঁহার উপর শরবর্ষণ করত তাঁহার রথের গতি রোধ করিল। তখন বৃষ্ণিবীর কৃষ্ণ অর্জুনকে কহিলেন, হে ধনঞ্জয়। তুমি ধনুর্বিস্ফারণ কর, আমি শঙ্খধ্বনি করিতে আরম্ভ করি। মহাবীর অর্জুন বাসুদেবের বাক্যানুসারে গাণ্ডীব ধনুঃ বিস্ফারিত করিয়া শরাঘাতে রিপুগণকে নিপাতিত করিতে আরম্ভ করিলেন। ধূলিধূসরিত-পক্ষ্মপটল' কেশব ঘর্মাক্তবদনে পাঞ্চজন্য বাদন করিতে লাগিলেন। বাসুদেবের শঙ্খনাদ ও অর্জুনের গাণ্ডীব-নিস্বনে কৌরবপক্ষীয় কি বলবান, কি দুর্ব্বল সকলেই ভূতলে নিপতিত হইল। তখন অর্জুনের, রথ সেই সেনাজাল হইতে বিমুক্ত হইয়া বায়ুপ্রেরিত মেঘের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল।
ঐ সময় সিন্ধুরাজের রক্ষক মহাধনুর্দ্ধর বীরপুরুষেরা সহসা পার্থকে নিরীক্ষণ করিয়া অনুচরগণ সমভিব্যাহারে বাণশব্দ, শঙ্খনিস্বন ও ভীষণ সিংহনাদ করিয়া বসুন্ধরাকে কম্পিতা করিতে আরম্ভ করিলেন। বাসুদেব ও ধনঞ্জয় কৌরবগণের সেই ভয়ঙ্কর শব্দ শ্রবণ করিয়া শঙ্খবাদন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের সেই শঙ্খশব্দে ভূধর, অর্ণব ও দ্বীপ সমবেত সমুদায় ভূতল পাতালতল এবং দশদিক্ পরিপূর্ণ হইয়া গেল। কুরু ও পাণ্ডব সৈন্যমধ্যে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি হইতে লাগিল। তখন কৌরবপক্ষীয় সমুদায় মহারথগণ কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয়কে নিরীক্ষণ করিয়া প্রথমতঃ অতিশয় ভীত হইলেন, কিন্তু তৎপরেই ক্রোধে অধীর হইয়া সত্বরে তাঁহাদিগের অভিমুখে গমন করিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে কৌরবগণ সুবর্ণচিত্রিত, শব্দায়মান, জ্বলন্ত অনলসদৃশ, ব্যাঘ্রচর্মাবৃত রথদ্বারা দশদিক্ সন্দীপন এবং রুক্মপৃষ্ঠ দুর্নিরীক্ষ্য ক্রুদ্ধ ভুজগসদৃশ শব্দায়মান কাৰ্ম্মক গ্রহণ করিয়া মহাবীর অর্জুন ও কৃষ্ণের নিধনবাসনায় সত্বরে তাঁহাদের প্রতি ধাবমান হইলেন। সন্নন্ধ-কবচ মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ, শল্য, কর্ণ, বৃষসেন, জয়দ্রথ, কূপ, মদ্ররাজ ও রথিশ্রেষ্ঠ অশ্বত্থামা এই আট জন মহারথ বায়ু-বেগগামী-অশ্ব-সংযোজিত, ব্যাঘ্রচৰ্ম্মাচ্ছাদিত, ঘনঘটাগভীর-নিস্বন, হেমবিভূষিত রথে আরোহণ করিয়া নিশিত শরনিকর নিক্ষেপপূর্ব্বক মহাবীর অর্জুনের দশদিক্ সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। সৎকুলসম্ভূত' দ্রুতগামী বিচিত্র অশ্বগণ সেই মহারথগণকে বহন করত দিক্সকল উদ্ভাসিত করিয়া অসাধারণ শোভা ধারণ করিল। কৌরব পক্ষীয় প্রধান প্রধান যোধগণ পৰ্ব্বত, নদী ও অর্ণবসম্ভূত সদ্বংশজ, বেগবামী, অত্যুত্তম তুরঙ্গে আরোহণপূর্ব্বক আপনার পুত্রের রক্ষার্থ চতুৰ্দ্দিক্ হইতে সত্বরে ধনঞ্জয়ের রথের প্রতি ধাবমান হইয়া শঙ্খনাদে সসাগরা ধরিত্রী ও স্বর্গ পরিপূরিত করিতে লাগিলেন। তখন সর্ব্বদেবপ্রবর মহাত্মা বাসুদেব ও ধনঞ্জয়ের পাঞ্চজন্য ও দেবদত্ত শঙ্খ প্রশ্নাপিত করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহাদিগের সেই শঙ্খশব্দে সমুদায় শব্দ অন্তর্হিত এবং পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দশদিক্ পরিপূর্ণ হইয়া গেল।
হে মহারাজ! সেই ভীরুজনের ত্রাসজনন ও শূরগণের হর্ষবর্দ্ধন, নিদারুণ শঙ্খনিনাদসময়ে ভেরী, মৃদঙ্গ, ঝর্ঝর ও আণক প্রভৃতি বাদিএসকল বাদিত হইলে দুর্য্যোধনহিতৈষী, সসৈন্যে যুদ্ধার্থ সমুপস্থিত মহাধনুর্দ্ধর নানা দিক্দেশীয় নরপতিরা কৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খনিনাদ সহ্য করিতে অসমর্থ হইয়া রোষভরে স্ব স্ব শঙ্খ প্রধুাপিত করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের সেই নির্ঘাতশব্দসদৃশ শঙ্খনিস্বনে সমুদায় দিমণ্ডল ও আকাশমণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইল। কৌরবপক্ষীয় সমুদায় রথী, গজ সেই ভীষণ শব্দে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিল। তখন মহাবীর দুর্য্যোধন ও সেই আট জন মহারথ জয়দ্রথের রক্ষার্থ অর্জুনকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর অশ্বত্থামা বাসুদেবের উপর ত্রিসপ্ততি বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক অর্জুনের উপর তিন এবং তাঁহার ধ্বজ ও অশ্বসমুদায়ের উপর পাঁচ শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় কেশবকে শরাহত দেখিয়া রোষকষায়িতলোচনে অশ্বত্থামাকে ছয় শর, কর্ণকে দশ ও বৃষসেনকে তিন শরে বিদ্ধ করিয়া শল্যের মুষ্টিস্থিত সশর শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর শল্য তৎক্ষণাৎ অপর শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক অর্জুনকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহারথ ভূরিশ্রবাঃ সুবর্ণপুঙ্খ শিলাসিত তিন বাণে, কর্ণ দ্বাত্রিংশৎ বাণে, বৃষসেন সাত বাণে, জয়দ্রথ ত্রিসপ্ততি বাণে, কূপ দশ বাণে এবং মদ্ররাজ পুনরায় দশ বাণে অর্জুনকে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে অশ্বত্থামা প্রথমতঃ পার্থের উপর ষষ্টিসংখ্যক শর নিক্ষেপপূর্ব্বক পুনর্ব্বার তাঁহাকে পাঁচ, বাসুদেবকে বিংশতি শরে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন কৃষ্ণসারথি অর্জুন ঈষৎ হাস্য করত স্বীয় হস্তলাঘবতা প্রদর্শনপূর্ব্বক সেই সকল বীরগণকে শরনিকরে তাড়িত করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি কর্ণকে দ্বাদশ, বৃষসেনকে তিন, সৌমদত্তিকে তিন, শল্যকে দশ, গৌতমকে পঞ্চবিংশতি ও সৈন্ধবকে শত শরে বিদ্ধ করিয়া সত্বরে শল্যের মুষ্টিস্থিত সশর শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে অশ্বত্থামাকে প্রথমতঃ অগ্নিশিখাকার আট বাণ প্রহার করিয়া পুনরায় তাঁহার উপর সপ্ততি শর নিক্ষেপ করিলেন। তখন মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ ক্রোধপ্রদীপ্ত হইয়া হৃষীকেশের করস্থিত অশ্বরশ্মি ছেদনপূর্ব্বক অর্জুনের উপর ত্রিসপ্ততি বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় তদ্দর্শনে অতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন এবং প্রবল বাত্যা যেমন মেঘমণ্ডল ছিন্ন ভিন্ন করে, তদ্রূপ সেই কৌরবপক্ষীয় বীরগণকে সুতীক্ষ্ণ শরনিকরদ্বারা ছিন্ন ভিন্ন করিতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! পাণ্ডবপক্ষীয় ও অস্মৎ-পক্ষীয় সেই বিবিধাকার অসামান্য শোভাসম্পন্ন ধ্বজসমুদায়ের বিষয় কীর্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহারথগণের রথস্থিত নানা-প্রকার ধ্বজসমূহের নাম ও আকার এবং বর্ণ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। সংগ্রামস্থলে মহারথদিগের রথোপরি সুবর্ণাভরণ-ভূষিত, সুবর্ণ-মাল্যমণ্ডিত, সুবর্ণময় বিবিধ প্রকার ধ্বজসমুদায় প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় ও অত্যুচ্চ সুমেরু পর্ব্বতের কাঞ্চন-শৃঙ্গের ন্যায় লক্ষিত হইতে লাগিল। ঐ সমুদায় ধ্বজের উপরিস্থিত নানারাগরঞ্জিত, ইন্দ্রায়ুধপ্রতিম, বিচিত্র পতাকাসকল বায়ুবিকম্পিত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল, যেন নর্তকীরা বনমধ্যে নৃত্য করিতেছে।
গাণ্ডীবধন্বা ধনঞ্জয়ের ধ্বজস্থিত পতাকা সমলঙ্কৃত, সিংহ-লাঙ্গুলধারী বিকটাস্য, ভীষণাকার কপিবর সংগ্রামস্থলে কৌরব-পক্ষীয় সৈন্যগণের ত্রাসোৎপাদন করিতে লগিল। মহাবীর অশ্বত্থামার শত্রুজসদৃশ পবনকম্পিত, বালসূর্য্য প্রতিম, অত্যুচ্ছিত, কাঞ্চনময় ধ্বজাপ্রভাব কৌরবগণের হর্ষবর্দ্ধন করিল। মহাবীর কর্ণের মাল্য ও পতাকাযুক্ত সুবর্ণময় হস্তিকক্ষা-ধ্বজ বায়ুবিকম্পিত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল যেন উহা আকাশমার্গ ভেদ করত নৃত্য করিতেছে। পাণ্ডবগণের আচার্য্য তপঃসম্পন্ন গৌতমতনয়ের রথে বৃষধ্বজ শোভা পাইতে লাগিল। ত্রিপুরবিজয়ী দেবাদিদেব মহাদেব বৃষদ্বারা যেরূপ শোভমান হন, গৌতমপুত্র মহাত্মা কৃপাচার্য্য সেই রথস্থ বৃষভ-ধ্বজদ্বারা তদ্রূপ শোভা ধারণ করিলেন। সেইরূপ মহাত্মা বৃষসেনের ধ্বজে মণিরত্নাদিমণ্ডিত ময়ূর সেনাগ্রভাগশোভিত করত বিরাজিত হইতে লাগিল। ঐ ময়ূর হঠাৎ নেত্রপথে পতিত হইলে বোধ হয় যেন, উহা কিছু বলিতে বাসনা করিয়াছে। মহাত্মা বৃষসেন সেই ময়ূরদ্বারা সমরাঙ্গনে কার্তিকেয়ের ন্যায় শোভমান হইলেন। মদ্ররাজ শল্যের ধ্বজাগ্রভাগে সর্ব্ববীজ-প্রসবিনী শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবতার ন্যায়, অগ্নিশিখাকার সুবর্ণময় লাঙ্গল শোভা পাইতে লাগিল। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের ধ্বজোপরি বালার্কসদৃশ হেমাভরণভূষিত বরাহ নয়নগোচর হইল। পূর্ব্ব-কালে দেবাসুর যুদ্ধসময়ে সূর্য্য যেমন শোভমান হইয়াছিলেন, মহাবীর জয়দ্রথ সেই বরাহদ্বারা সেইরূপ শোভা ধারণ করিলেন। যজ্ঞশীল ধীমান সৌমদত্তির কনকময় যুপধ্বজ মখশ্রেষ্ঠ রাজসূয় যজ্ঞের উজ্জিত যুপের ন্যায় বিরাজমান হইতে লাগিল। ঐরাবত যেমন দেবরাজের সৈন্যগণকে শোভিত করে, তদ্রুপ মহারাজ শল্যরাজের ধ্বজস্থিত বিচিত্র সুবর্ণময় ময়ূরসমুদায়ে পরিশোভিত মাতঙ্গধ্বজ আপনার সৈন্যগণের শোভা সম্পাদন করিল। আপনার পুত্র দুর্য্যোধন রথস্থ সুবর্ণমণ্ডিত শব্দায়মান কিঙ্কিণী-শতসমাযুক্ত মণিময় নাগধ্বজদ্বারা অতীব শোভমান হইলেন। হে রাজন! আপনার পক্ষীয় এই নয় মহাধ্বজ যুগান্তকালীন সূর্য্যের ন্যায় আপনার বাহিনীমণ্ডল প্রদীপ্ত করিল। তন্মধ্যে মহাবীর অর্জুনের একমাত্র বানরধ্বজ শোভা পাইতে লাগিল। হুতাশনদ্বারা হিমাচল যেরূপ দেদীপ্যমান হয়, মহাবীর ধনঞ্জয় ধ্বজস্থিত কপিদ্বারা তদ্রূপ প্রদীপ্ত হইলেন।
অনন্তর শত্রুতাপন মহারথগণ অর্জুনকে পরাভব করিবার নিমিত্ত বিচিত্রাকার বৃহৎ শরাসনসমুদায় গ্রহণ করিতে লাগিলেন। তখন অদ্ভুতকর্মা অর্জুন ও স্বীয় শত্রুবিনাশন গাণ্ডীব ধনুগ্রহণপূর্ব্বক বাণবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার শরপ্রভাবে ও আপনার দুৰ্ম্মন্ত্রণানিবন্ধন নানা দিগদেশ হইতে অভ্যাগত প্রভূত হস্ত্যশ্বরথসম্পন্ন বহুতর নরপতিরা কালকবলে নিপতিত হইতে লাগিলেন। তখন দুর্য্যোধন প্রভৃতি মহারথগণ ও মহাবীর অর্জুন পরস্পরের প্রতি গর্জন করত পরস্পরকে ভর্ৎসনা করিতে আরম্ভ করিলেন। মহারাজ! ঐ সময় কৃষ্ণসারথি মহাবীর ধনঞ্জয় সেই সকল মহারথগণকে পরাজয় ও জয়দ্রথকে সংহার করিবার মানসে একাকী তাহাদের সহিত সংগ্রামে মিলিত হইয়া সর্ব্বাপেক্ষা শোভা পাইতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই বিস্ময়াপন্ন হইল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় গাণ্ডীব বিধূনন ও শরজাল বিস্তার করত কৌরবপক্ষীয় যোধগণকে অদৃশ্য করিলেন। তাঁহারাও চতুৰ্দ্দিক্ হইতে শরবর্ষণ করিয়া শত্রুতাপন অর্জুনকে অদৃশ্য করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে পাণ্ডুনন্দন অর্জুন অরাতিশরনিকরে অদৃশ্য হইলে সৈন্যমধ্যে কোলাহল ধ্বনি সমুত্থিত হইল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। মহাবীর অর্জুন জয়দ্রথের সমীপে সমুপস্থিত হইলে দ্রোণসমাক্রান্ত পাঞ্চালগণ কৌরব-পক্ষীয়দিগের সহিত কি করিলেন?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! সেই অপরাহুকালীন লোম-হর্ষণ সংগ্রামসময়ে পাঞ্চালগণ দ্রোণকে সংহার ও কৌরবগণ তাঁহাকে তাহাদের হস্ত হইতে মোচন করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। পাঞ্চালগণ দ্রোণাচার্য্যের নিধনকামনায় গর্জন করত তাহার উপর বাণ বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। পূর্ব্বে দেবাসুরের যেরূপ ঘোর সংগ্রাম হইয়াছিল, এক্ষণে পাঞ্চাল ও কুরুবীরগণের সেইরূপ অদ্ভুত তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল। পাঞ্চালগণ পাণ্ডবগণের সহিত মিলিত হইয়া দ্রোণাচার্য্যের রথসন্নিধানে আপনাদিগের রথ অবস্থাপনপূর্ব্বক তাঁহার সৈন্যগণকে ভেদ করিবার মানসে তাহাদের উপর অসংখ্য মহাস্ত্র নিক্ষেপ করিয়া আচার্য্যের উপর শরজাল বর্ষণ করিতে লাগিলেন। কেকয়দেশীয় মহারথ বৃহৎক্ষত্র অশনিসন্নিভ শাণিত শর পরিত্যাগ করত দ্রোণাচার্য্যের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন কীর্ত্তিমান্ ক্ষেমধূর্তি অসংখ্য তীক্ষ্ণবাণ পরিত্যাগ করত বৃহৎ-ক্ষত্রের সম্মুখে গমন করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত চেদিশ্রেষ্ঠ ধৃষ্টকেতু তদ্দর্শনে ক্রোধে অধীর হইয়া শম্বরাসুরের প্রতি ধাবমান ইন্দ্রের ন্যায়, ক্ষেমধূর্তির প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর বীরধন্বা তাহাকে ব্যাদিতাস্য কালান্তক যমের ন্যায় আগমন করিতে দেখিয়া সত্বর তাহার প্রতি গমন করিলেন।
তখন মহাবীৰ্য্যবান্ দ্রোণাচার্য্য জিগীষু মহারাজ যুধিষ্ঠির ও তাহার সৈন্যগণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। আপনার পুত্র বলবান্ বিকর্ণ, মহাবল পরাক্রান্ত যুদ্ধনিপুণ নকুলের প্রতি ধাবমান হইলেন। শত্রুকর্ষণ দুর্মুখ অসংখ্য বাণ বর্ষণ করিয়া সমাগত সহদেবকে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর ব্যাঘ্রদত্ত শাণিত তীক্ষ্ণ শরে নরব্যাঘ্র সাত্যকিকে মুহুর্মুহুঃ কম্পিত করিতে লাগিলেন। মহাবাহু সৌমদত্তি সায়কবর্ষী নরব্যাঘ্র দ্রৌপদী-তনয়দিগের নিবারণে যত্নবান্ হইলেন। মহারথ ঋষ্যশৃঙ্গতনয় অমর্ষপরায়ণ ভীমসেনকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। পূর্ব্ব-কালে রাম-রাবণের যেরূপ ভীষণ সংগ্রাম হইয়াছিল, এই বীরদ্বয়ের তদ্রূপ তুমুল সংগ্রাম হইল।
তখন ভরতশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির নতপর্ব্ব নবতি বাণে মহাবীর দ্রোণাচার্য্যের সমুদায় মৰ্ম্মস্থল বিদ্ধ করিলেন। আচার্য্যও ক্রুদ্ধ হইয়া তাহার বক্ষঃস্থলে পঞ্চবিংশতি শর নিক্ষেপ করিয়া পুনর্ব্বার ধনুর্দ্ধারীদিগের সমক্ষে তাঁহার দেহ, অশ্ব, ধ্বজ ও সারথিকে লক্ষ্য করত বিংশতি বাণ পরিত্যাগ করিলেন। তখন ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির পাণিলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক শরদ্বারা দ্রোণনির্মুক্ত শরসমূহ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ধনুর্দ্ধরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া সত্বর মহাত্মা ধর্মরাজের ধনুচ্ছেদনপূর্ব্বক অসংখ্য শরে তাহার সর্ব্ব শরীর আবৃত করিলেন। এইরূপে ধর্মরাজ দ্রোণের সায়কে সমাচ্ছন্ন হইয়া দৃষ্টিপথাতীত হইলে রণভূমিস্থ সকল লোকেই তাহাকে নিহত বলিয়া স্থির করিল। কেহ কেহ মনে করিল, যুধিষ্ঠির দ্রোণের শরাঘাতে সমরবিমুখ হইয়া পলায়ন করিয়াছেন। তখন দ্রোণশরে বিপন্ন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সেই ছিন্ন কাৰ্ম্মক পরিত্যাগপূর্ব্বক অন্য দিব্য শরাসন গ্রহণ করিয়া দ্রোণ-প্রেরিত শরসমূহ ছেদন করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। মহারাজ ধৰ্ম্মনন্দন দ্রোণের সমুদায় শর ছেদন করিয়া ক্রোধকম্পিত-কলেবরে স্বর্ণদণ্ডালঙ্কৃত অষ্ট ঘণ্টাবিশিষ্ট গিরিবিদারণে সমর্থ ভীষণ শক্তি সমুৎক্ষেপণ করিয়া প্রফুল্লমনে গভীর নিনাদ করিলেন। তাঁহার ভয়াবহ শব্দ শ্রবণ ও ভীষণ শক্তি সন্দর্শনে সকল প্রাণীই শঙ্কিত হইয়া দ্রোণাচার্য্যের মঙ্গল হউক, বলিয়া চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। অনন্তর সেই নির্মোক-নির্মুক্ত ভুজঙ্গসদৃশ ভীষণ শক্তি যুধিষ্ঠিরের হস্ত হইতে নির্মুক্ত হইয়া আকাশমণ্ডল ও দিগ্বিদিক্ প্রজ্বলিত করত দ্রোণ-সমীপে সমুপস্থিত হইল। অস্ত্রবিদগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য সহসা সেই শক্তি সন্দর্শন করিয়া তাহার নিবারণের নিমিত্ত ব্রহ্মাস্ত্র পরিত্যাগ করিলেন। সেই অব্যর্থ ব্রহ্মাস্ত্র যুধিষ্ঠির-নিক্ষিপ্ত শক্তি ভস্মসাৎ করিয়া তাঁহার স্যন্দনাভিমুখে ধাবমান হইল। তখন বিজ্ঞতম যুধিষ্ঠির ব্রহ্মাস্ত্রদ্বারা দ্রোণের ব্রহ্মাস্ত্র নিবারণপূর্ব্বক তাঁহাকে নতপর্ব্ব নয় বাণে বিদ্ধ করত সুতীক্ষ্ণ ক্ষুরপ্রাস্ত্রে তাঁহার শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য তৎক্ষণাৎ সেই ছিন্ন চাপ পরিত্যাগ করিয়া সহসা ধৰ্ম্মপুত্রের প্রতি গদা নিক্ষেপ করিলেন। ধর্মরাজ সেই দ্রোণ-নির্মুক্ত গদা অবলোকন করিয়া তাহার নিবারণার্থ সত্বর স্বীয় গদা গ্রহণপূর্ব্বক নিক্ষেপ করিলেন। তখন সেই উভয় বীরনিক্ষিপ্ত ভীষণ গদাদ্বয় পরস্পর সঙ্ঘর্ষিত হইয়া অগ্ন্যুৎপাদনপূর্ব্বক মহীতলে নিপতিত হইল।
অনন্তর মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ক্রোধে অধীর হইয়া চারিটি তীক্ষ্ণ শরে তাঁহার অশ্বসমুদায়, এক ভল্লাস্ত্রে শরাসন ও এক বাণে ইন্দ্রধ্বজোপম কেতু ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে তিন শরে নিপীড়িত করিলেন। যুধিষ্ঠির তৎক্ষণাৎ হতাশ্ব রথ হইতে অবরোহণ' পূর্ব্বক অস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া ঊর্দ্ধ হস্তে দণ্ডায়মান রহিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য তাঁহাকে অস্ত্রহীন ও শস্ত্রবিহীন অবলোকন করিয়া অসংখ্য শর নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার সেনা-গণকে আঘাত করিতে লাগিলেন এবং ভীষণ সিংহ যেমন মৃগের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইলেন। এইরূপে মহারাজ যুধিষ্ঠির দ্রোণকর্তৃক অভিদ্রুত হইলে সমুদায় পাণ্ডবপক্ষীয়েরা রাজা দ্রোণকর্তৃক হৃত হইলেন, বলিয়া হাহাকার করিতে লাগিলেন। তখন কুন্তীপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির ত্বরান্বিত হইয়া সহদেবের রথে আরোহণ করিয়া মহাবেগে অশ্বচালনা-পূর্ব্বক পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাবীর ক্ষেমধূর্ত্তি সমর-ক্ষেত্রে সমাগত কেকয়দেশীয় দৃঢ়বিক্রম বৃহৎক্ষত্রের বক্ষঃস্থলে অসংখ্য বাণ বিদ্ধ করিলেন। রাজা বৃহৎক্ষত্রও দ্রোণসৈন্য ভেদ করিবার নিমিত্ত সত্বর তাঁহাকে নতপর্ব্ব নবতি বাণে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন ক্ষেমধূর্তি ক্রুদ্ধ হইয়া শাণিত ভল্লাস্ত্রদ্বারা মহাত্মা বৃহৎক্ষত্রের শরাসন ছেদন করিয়া আনতপর্ব্ব শরনিকরে তাঁহার সর্ব্বশরীর বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর বৃহৎক্ষত্র সহাস্য মুখে অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া মহারথ ক্ষেমধূর্তির অশ্ব, সারথি ও রথ ছেদনপূর্ব্বক শাণিত ভল্লাস্ত্রদ্বারা তাঁহার জ্বলিত-কুণ্ডলমণ্ডিত মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ক্ষেমধূর্তির কুঞ্চিতকেশবিরাজিত কিরীটমণ্ডিত ছিন্ন মস্তক সহসা ভূতলে নিপতিত হইয়া অম্বরচ্যুত' জ্যোতিঃপদার্থের ন্যায় দীপ্তি পাইতে লাগিল। এইরূপে মহাবীর বৃহৎক্ষত্র ক্ষেমধূর্তির প্রাণ সংহার করিয়া প্রসন্নমনে পাণ্ডবগণের সাহায্যার্থ সহসা কৌরব-সৈন্যাভিমুখে ধাবমান হইলেন।
মহাবীর ধৃষ্টকেতু দ্রোণকে আক্রমণ করিবার নিমিত্ত ধাবমান হইলে মহাবল পরাক্রান্ত বীরধন্বা তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। সেই বলবীর্য্যসম্পন্ন বীরদ্বয় বহুসহস্র শরদ্বারা পরস্পরকে বিদ্ধ করিয়া নিবিড়ারণ্যচারী মদোন্মত্ত যূথপতি মাতঙ্গদ্বয়ের ন্যায়, গিরিগহ্বরস্থ ক্রুদ্ধ শার্দ্দলদ্বয়ের ন্যায় পরস্পর জিঘাংসায় ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। সিদ্ধ-চারণগণ বিস্ময়োৎফুল্ললোচনে তাঁহাদের সেই অপূর্ব্ব সংগ্রাম দেখিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর বীরধন্বা ক্রুদ্ধ হইয়া অম্লান মুখে ভল্লাস্ত্রদ্বারা ধৃষ্টকেতুর শরাসন দুই খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। চেদিরাজ ধৃষ্টকেতু অবিলম্বে সেই ছিন্ন চাপ পরিত্যাগ করিয়া সুবর্ণদণ্ডমণ্ডিত লৌহময়ী শক্তি গ্রহণপূর্ব্বক বীরধন্বার রথ লক্ষ্য করিয়া ক্ষেপণ করিলেন। মহাবীর বীরধন্বা সেই বীরঘাতিনী শক্তির আঘাতে ভিন্নহৃদয় হইয়া সহসা রথ হইতে ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। হে মহারাজ! এইরূপে ত্রিগত্তদেশীয় মহারথ বীরধন্বার মৃত্যু হইলে পাণ্ডবপক্ষীয়গণ আপনার সৈন্য সংক্ষয় করিতে আরম্ভ করিলেন।
তখন মহাবীর দুর্মুখ সহদেবের প্রতি যষ্টি শর নিক্ষেপ করিয়া তাঁহাকে তর্জন করত বীরনাদ করিতে লাগিলেন। মাদ্রীনন্দন তাঁহার তর্জ্জনে কোপপূর্ণ হইয়া শাণিত শর নিক্ষেপ-পূর্ব্বক অবলীলাক্রমে দুর্মুখকে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন এবং পরিশেষে নয় বাণে তাঁহাকে গাঢ় বিদ্ধ করিয়া শাণিত ভল্লে তাঁহার কেতু, চারি বাণে চারি অশ্ব, শাণিত ভল্লে সারথির মস্তক ও তীক্ষ্ণ ক্ষুরপ্রে তাঁহার শরাসন ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে পুনরায় পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর দুর্মুখ সেই অশ্ব-বর্জিত স্বীয় রথ পরিত্যাগপূর্ব্বক বিমনায়মান হইয়া নিরমিত্রের রথে সমারূঢ় হইলেন। তখন শত্রুহন্তা সহদেব নিরমিত্রের প্রতি কোপাবিষ্ট হইয়া ভল্লাস্ত্রদ্বারা তাঁহাকে সংহার করিলেন। ত্রিগত্তরাজপুত্র নিরমিত্র সহদেবের শরাঘাতে তৎক্ষণাৎ রথ হইতে ধরাতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। কৌরব-সৈন্যগণ তদ্দর্শনে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া হাহাকার করিতে লাগিল। হে মহারাজ! দশরথাত্মজ রাম নিশাচর খরের প্রাণ সংহার করিয়া যেরূপ শোভমান হইয়াছিলেন, সহদেবও ত্রিগর্ত্তরাজপুত্র নিরমিত্রের জীবন নাশ করিয়া তদ্রূপ শোভা ধারণ করিলেন। ত্রিগর্তেরা রাজপুত্রের নিধন নিরীক্ষণ করিয়া অনবরত আর্তনাদ ও হাহাকার করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! মহাবীর নকুল আপনার পুত্র পৃথুলোচন বিকর্ণকে মুহূর্তমধ্যে পরাজিত করিয়া সকল লোককে বিস্ময়াপন্ন করিলেন। ঐ সময় মহাবীর ব্যাঘ্রদত্ত নতপর্ব্ব শর বর্ষণ করিয়া সেনামধ্যগত সাত্যকিকে অশ্ব, ধ্বজ ও সারথির সহিত অদৃশ্য করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর সাত্যকি হস্তলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক শরদ্বারা ব্যাঘ্রদত্তের শরসমুদায় নিবারণ এবং তাঁহার অশ্ব, সারথি ও ধ্বজ ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে নিপাতিত করিলেন। এইরূপে মগধরাজপুত্র বিনষ্ট হইলে মগধদেশীয় বীরগণ ক্রোধভরে সাত্যকির সম্মুখীন হইয়া তাঁহার উপর অসংখ্য শর, তোমর, ভিন্দিপাল, প্রাস, মুষল, মুদ্গর প্রভৃতি বিবিধ অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে লাগিল। যুদ্ধদুৰ্ম্মদ সাত্যকি সহাস্যমুখে অনায়াসে সেই সকল বীরগণকে পরাজিত করিলেন। হতাবশিষ্ট মাগধগণ প্রাণভয়ে সংগ্রামবিমূঢ় হইয়া চতুর্দিকে পলায়ন করিতে লাগিল। তদ্দর্শনে আপনার সেনাগণও সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন-পরায়ণ হইল। হে মহারাজ! এইরূপে যদুবংশাবতংস সাত্যকি আপনার সৈন্যগণকে নিপাতিত করিয়া ধনুর্বিধূননপূর্ব্বক সংগ্রামে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন; তাঁহার সহিত সংগ্রাম করিতে আর কাহারও সাহস হইল না। তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য কোপাবিষ্ট হইয়া নেত্র বিঘূর্ণনপূর্ব্বক সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! যশস্বী সোমদত্তপুত্র ধনুর্দ্ধারী দ্রৌপদেয়দিগের প্রত্যেককে পাঁচ পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় সাত সাত বাণে বিদ্ধ করিলেন। দ্রৌপদেয়গণ সৌমদত্তির শরে নিতান্ত নিপীড়িত ও বিচেতনপ্রায় হইয়া সংগ্রামে ইতিকর্তব্যতা-বিমূঢ় হইলেন। অনন্তর নকুলপুত্র শতানীক নরর্ষভ সোমদত্ত-পুত্রকে দুই শরে বিদ্ধ করিয়া প্রসন্নচিত্তে সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন শতানীকের অপর ভ্রাতৃচতুষ্টয় অকুটিল তিন তিন বাণে সৌমদত্তিকে আহত করিলেন। মহাবীর সৌমদত্তিও তাঁহাদিগের পাঁচ জনের বক্ষঃস্থলে পাঁচ বাণ নিক্ষেপ করিলেন। তখন সেই পাঁচ ভ্রাতা সৌমদত্তির বাণে পীড়িত হইয়া তাঁহার চতুর্দিকে অবস্থানপূর্ব্বক সায়ক বর্ষণ করিতে লাগিলেন। কোপপূর্ণ অর্জুননন্দন চারিটি শাণিত শরে সোমদত্তনন্দনের অশ্বসমুদায় শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। ভীমসেনতনয় তাঁহার শরাসন ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে নিশিতশরে আহত করিয়া নৃত্য করিতে লাগিলেন। যুধিষ্ঠিরতনয় তাঁহার ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং নকুলপুত্র তাঁহার সারথিকে রথ হইতে নিপাতিত করিলেন। তখন সহদেবনন্দন সৌমদত্তিকে স্বীয় ভ্রাতৃগণের শরে বিমুখীকৃত অবগত হইয়া ক্ষুরপ্রাস্ত্রে তাঁহার শিরচ্ছেদন করিয়া ফেলিলেন। বালসূর্যসদৃশ প্রভাবসম্পন্ন সুবর্ণালঙ্কৃত সৌমদত্তির মস্তক ভূতলে পতিত হইয়া রণস্থল আলোকময় করিল। তখন আপনার সেনাগণ সোমদত্তপুত্রের বিনাশদর্শনে শঙ্কিত হইয়া নানা স্থানে পলায়ন করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ লক্ষ্মণের সহিত যেরূপ যুদ্ধ করিয়াছিলেন, রাক্ষস অলম্বুষ ক্রুদ্ধ হইয়া মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনের সহিত সেইরূপ ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ করিল। ভীমসেনের সহিত রাক্ষসের ঘোর সংগ্রাম সন্দর্শন করিয়া সকলেই বিস্মিত ও আনন্দিত হইলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন | হাস্য করিয়া নয়টি নিশিত শরে রোষপরবশ রাক্ষসেন্দ্র অলম্বুষকে বিদ্ধ করিলেন; ঋষ্যশৃঙ্গনন্দন অলম্বুষ বাণবিদ্ধ হইয়া গভীর নিনাদ করত ভীমসেনের ও তাঁহার অনুগামিগণের সম্মুখীন হইয়া প্রথমতঃ তাঁহাকে নতপর্ব্ব পাঁচ শরে বিদ্ধ ও তাঁহার ত্রিংশৎ রথ বিনষ্ট করিল। পরে পুনরায় তাঁহার চতুঃশত রথ বিনাশপূর্ব্বক তাঁহাকে তীক্ষ্ণ শরে বিদ্ধ করিতে লাগিল। মহাবীর ভীমসেন রাক্ষসের শরপ্রহারে ব্যথিতহৃদয় হইয়া রথোপরি মূর্ছিত ও নিপতিত হইলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে সংজ্ঞা লাভ করিয়া ক্রোধকম্পিত-কলেবরে ঘোর শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক তীক্ষ্ণ শরে অলম্বুষকে পীড়িত করিতে আরম্ভকরিলেন। নীলকজ্জলসদৃশ নিশাচর ভীমের বহুবাণে বিদ্ধ হইয়া সমরাঙ্গনে প্রফুল্ল কিংশুকের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। হে মহারাজ! ঐ সময় অলম্বুষের ভ্রাতৃবধবৃত্তান্ত স্মৃতিপথে সমুদিত হইল। তখন সে ঘোর রূপ ধারণপূর্ব্বক ভীমসেনকে কহিল, রে মূঢ়! আজি সংগ্রামে আমার পরাক্রম দেখ! তুই পূর্ব্বে আমার ভ্রাতা মহাবীর বক রাক্ষসের প্রাণ সংহার করিয়া ভাগ্যক্রমে পরিত্রাণ পাইয়াছিস্! আমি তথায় তৎকালে উপস্থিত থাকিলে অবশ্যই তোকে যমালয়ে প্রেরণ করিতাম। মহাবীর অলম্বুষ ভীমকে এই কথা বলিয়া মুহূৰ্ত্তমধ্যে অন্তর্হিত হইয়া অসংখ্য শরবর্ষণপূর্ব্বক তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিল। ভীমসেন নিশাচরকে অদৃশ্য জানিয়া নতপর্ব্ব শরনিকরে আকাশমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। রাক্ষস ভীমবাণে বিদ্ধ হইয়া তৎক্ষণাৎ রথারোহণ-পূর্ব্বক কখন ভূতলে ও কখন আকাশমণ্ডলে গমন করিতে লাগিল এবং কখন সূক্ষ্ম, কখন বৃহৎ ও কখন স্কুল আকার ধারণপূর্ব্বক অম্বুদের ন্যায় গর্জন ও নানাবিধ বাক্য প্রয়োগ করত আকাশ হইতে চতুর্দিকে বিবিধ শর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। রাক্ষসবিসৃষ্ট শক্তি, কুণপ, প্রাস, শূল, পট্টিশ, তোমর, শতয়ী, পরিঘ, ভিন্দিপাল, পরশু, শিলা, খড়া, লগুড়, ঋষ্টি, বজ্র প্রভৃতি শস্ত্রসকল সংগ্রামমধ্যে বারিধারার ন্যায় নিপতিত হইয়া পাণ্ডুনন্দনের অসংখ্য সৈন্য সংহার করিতে লাগিল। তখন অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও পদাতি বিনষ্ট হইয়া গেল, রথিগণ রথ হইতে পতিত হইতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর অলম্বুষ পাণ্ডবসৈন্য-গণকে সংহার করিয়া সমরাঙ্গনে রাক্ষসগণ সমাকুল শোণিতনদী প্রবাহিত করিল। রথসকল উহার আবর্ত্ত, হস্তীসকল গ্রাহ, ছত্রসমুদায় হংস ও বাহুসকল পন্নগের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। চেদি, পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ ঐ নদীর ভীষণ প্রবাহে ভাসিতে লাগিল। সেই ঘোর রণে পাণ্ডবগণ রাক্ষসের নিঃশঙ্ক-চিত্তে পরিভ্রমণ ও অদ্ভুত পরাক্রম অবলোকন করিয়া অতিশয় উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন। কৌরবসেনাগণের আর আনন্দের পরিসীমা রহিল না। তাহারা লোমহর্ষণ তুমুল বাদিত্রনিম্বন করিতে লাগিল। করতালিশব্দ ভুজঙ্গের যেমন অসহ্য হয়, কৌরবগণের বাদিত্র-নিস্বন ভীমসেনের তদ্রূপ অসহ্য হইল। তখন তিনি কোপে প্রজ্বলিত হইয়া রোষকষায়িতলোচনে ত্বাষ্ট্র অস্ত্র শরাসনে সন্ধান করিলেন। ঐ সময় চতুৰ্দ্দিক্ হইতে সহস্র সহস্র শর প্রাদুর্ভূত হওয়াতে অসংখ্য কৌরবসৈন্য সমর পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিতে লাগিল। তখন সেই ভীমসেন-প্রেরিত ত্বাষ্ট্র-অস্ত্র সমরে নিশাচরের মহামায়া বিনষ্ট করিয়া তাহাকে নিপীড়িত করিতে আরম্ভ করিল। রাক্ষস শরাদিত হইয়া ভীমসেনকে পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রাণরক্ষার্থে দ্রোণাচার্য্যের বাহিনীমুখে ধাবমান হইল।
হে মহারাজ! এইরূপে নিশাচর ভীমকর্তৃক পরাজিত হইলে পাণ্ডবেরা আনন্দিত চিত্তে সিংহনাদ করিয়া দশদিক্ পরিপূরিত করিলেন এবং প্রহ্লাদ পরাজিত হইলে দেবগণ ইন্দ্রকে যেরূপ প্রশংসা করিয়াছিলেন, সেইরূপ তাঁহারা ভীমসেনকে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে অলম্বুষ ভীমের নিকট হইতে পলায়নপূর্ব্বক সংগ্রামস্থলে অশঙ্কিত চিত্তে বিচরণ করিতে লাগিল। তখন হিড়িম্বানন্দন ঘটোৎকচ মহাবেগে ধাবমান হইয়া তাহাকে নিশিত শরে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিল। অলম্বুষও কোপাবিষ্ট হইয়া ঘটোৎকচকে তাড়িত করিতে লাগিল। এইরূপে সেই রাক্ষসদ্বয় পরস্পর মিলিত হইয়া বিবিধ মায়া ধারণপূর্ব্বক সুরেন্দ্র ও শম্বরের ন্যায় ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভকরিল। পূর্ব্বকালে রাম ও রাবণের যেরূপ ভীষণ সংগ্রাম হইয়াছিল, এক্ষণে সেই ভীষণ রাক্ষসদ্বয়ের তদ্রূপ তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল। মহাবীর ঘটোৎকচ বিংশতি নারাচাস্ত্রে অলম্বুষের বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিয়া সিংহের ন্যায় মুহুর্মুঃ গভীর নিনাদ করিতে লাগিল। অলম্বুষও যুদ্ধদুৰ্ম্মদ হিড়িম্বানন্দনকে পুনঃ পুনঃ বাণবিদ্ধ করিয়া বীরনাদে গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। সেই মায়াযুদ্ধবিশারদ মহাবল পরাক্রান্ত নিশাচরদ্বয় রোষিত হইয়া শত শত মায়া বিস্তারপূর্ব্বক পরস্পরকে মোহিত করিয়া মায়াযুদ্ধ আরম্ভ করিল। ঘটোৎকচ যে মায়া প্রকাশ করিল, অলম্বুষের মায়াপ্রভাবে তৎসমুদায় তৎক্ষণাৎ বিনষ্ট হইয়া গেল। তখন ভীমসেন প্রভৃতি পাণ্ডবগণ মায়াযুদ্ধকুশল অলম্বুষের প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া রথারোহণপূর্ব্বক চতুৰ্দ্দিক্ হইতে তাহার সম্মুখে আগমন করিলেন এবং অসংখ্য রথদ্বারা তাহাকে অবরোধ করিয়া তাহার উপর শর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। নিশাচর বীরগণের শরাহত হইয়া উল্কাহত মাতঙ্গের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল এবং অচিরাৎ অস্ত্রমায়াপ্রভাবে বিপক্ষনিক্ষিপ্ত অস্ত্রসকল নিবারণ করিয়া দগ্ধ বন হইতে নির্গত দন্তীর ন্যায় চতুৰ্দ্দিস্থ রথসমূহের মধ্য হইতে বিনির্গত হইল এবং দেব-রাজের অশনিসদৃশ শব্দায়মান ভীষণ শরাসন বিস্ফারণ করত ভীমসেনকে পঞ্চবিংশতি, যুধিষ্ঠিরকে তিন, সহদেবকে সাত, নকুলকে ত্রিসপ্ততি, প্রত্যেক দ্রৌপদেয়কে পাঁচ পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিয়া ঘোরতর গভীর সিংহনাদ করিতে লাগিল। তখন ভীমসেন নয়, সহদেব পাঁচ, যুধিষ্ঠির শত, নকুল চতুঃষষ্টি ও দ্রৌপদেয়রা প্রত্যেকে তিন তিন বাণে অলম্বুষকে বিদ্ধ করিলেন। বলবান্ ঘটোৎকচও ঐ সময় তাহাকে প্রথমতঃ পঞ্চাশৎ শরে আহত করিয়া পুনরায় সপ্ততি শরে নিপীড়িত করত সিংহনাদ করিতে লাগিল। মহাবীর হিড়িম্বাতনয়ের ভীষণ নাদে গিরি, কানন ও জলাশয়াদি সংবলিত সমুদায় বসুন্ধরা এককালে কম্পিতা হইল।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর অলম্বুষ রথিগণের শরনিকরে সমাহত হইয়া তাঁহাদের সকলকে পাঁচ পাঁচ শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন ঘটোৎকচ কোপাবিষ্ট হইয়া পুনর্ব্বার অলম্বুষকে সাত বাণে বিদ্ধ করিলেন। অলম্বুষও শরাদিত হইয়া হিড়িম্বাতনয়ের প্রতি সুবর্ণপুঙ্খ শিলাশিত সায়কসমূহ পরিত্যাগ করিতে লাগিল। যেমন রোষাবিষ্ট মহাবল পন্নগসমূহ পৰ্ব্বত-শৃঙ্গে প্রবেশ করে, সেইরূপ নতপর্ব্ব শরসমূহ ঘটোৎকচের কলেবরে প্রবিষ্ট হইল। তখন ঘটোৎকচ ও সমবেত পাণ্ডবগণ চতুৰ্দ্দিক্ হইতে অলম্বুষের উপর নিশিত শরজাল নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। অলম্বুষ জয়শীল পাণ্ডবগণের বাণে বিদ্ধ হইয়া মনুষ্যের ন্যায় হীনবীর্য্য ও কর্তব্যাবধারণে অক্ষম হইল। সমরনিপুণ মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনপুত্র ঘটোৎকচ অলম্বুষকে তদবস্থ দেখিয়া তাহার বিনাশবাসনায় স্বীয় রথ হইতে তাহার ভিন্নাঞ্জনরাশিসন্নিভ' দগ্ধগিরিশৃঙ্গসদৃশ রথে গমন করিল এবং গরুড় যেমন সর্ম্পকে উত্তোলন করে, তদ্রূপ অলম্বুষকে রথ হইতে উত্তোলনপূর্ব্বক ভূতলে বারংবার নিক্ষেপ করিয়া প্রস্তর-বিক্ষিপ্ত পূর্ণ কুম্ভের ন্যায় তাহাকে চূর্ণ করিয়া ফেলিল। সেনাগণ তাহার এই অদ্ভুত পরাক্রম অবলোকন করিয়া অতিশয় শঙ্কিত হইল। এইরূপে অতি ভীষণ রাক্ষস অলম্বুষ ঘটোৎকচের প্রহারে বিস্ফুটিতাঙ্গ ও চূর্ণিতাস্থি হইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। তখন পাণ্ডব-গণ সেই নিশাচরের বিনাশ দর্শনে পুলকিত হইয়া পতাকা বিধূনন ও সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। কুরুপক্ষীয় সেনা ও বীরগণ ভীমরূপ মহাবল অলম্বুষকে বিশীর্ণ পর্ব্বতের ন্যায় সমরাঙ্গনে নিপতিত দেখিয়া ক্ষুব্ধচিত্তে হাহাকার করিতে আরম্ভকরিলেন। সংগ্রামদর্শনার্থ সমাগত ব্যক্তিরা কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া সেই সমরাঙ্গনে নিপতিত রাক্ষসকে যদৃচ্ছাক্রমে ভূতলে পতিত মঙ্গল গ্রহের ন্যায় অবলোকন করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর ঘটোৎকচ অমিতপরাক্রম অলম্বুষকে পক্ক অলম্বুষ ফলের ন্যায় ভূতলে নিপাতিত করিয়া আহ্লাদিত চিত্তে বলনিপাতন বাসবের ন্যায় ঘোরতর নিনাদ করিতে আরম্ভ করিল। তাহার পিতা ও পিতৃব্যেরা বন্ধুবান্ধব সমভিব্যাহারে তাহাকে সেই দুষ্কর কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে দেখিয়া বারংবার প্রশংসা করিতে লাগিলেন। ঐ সময় পাণ্ডবসৈন্যমধ্যে শঙ্খনাদ ও নানাবিধ বাদ্যনিস্বন আরম্ভ হইল। কৌরবগণ সেই শব্দ শ্রবণ করিয়া ভীষণ নিনাদ করিতে আরম্ভকরিলেন। এইরূপে উভয় পক্ষের ভীষণ শব্দে ত্রিভুবন প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবীর সাত্যকি দ্রোণাচার্য্যকে যুদ্ধে কিরূপে নিবারণ করিলেন, তুমি তাহা আদ্যোপান্ত কীর্তন কর; উহা শ্রবণ করিতে আমার সাতিশয় কৌতূহল হইয়াছে।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! সাত্যকি প্রভৃতি পাণ্ডবপক্ষীয় বীরগণের সহিত দ্রোণাচার্য্যের যেরূপ লোমহর্ষণ সংগ্রাম সমুপস্থিত হইয়াছিল, তাহা শ্রবণ করুন। মহাবীর দ্রোণ সত্য-বিক্রম সাত্যকিকে সৈন্য সংহারে প্রবৃত্ত দেখিয়া স্বয়ং তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। সাত্যকি তাঁহাকে সহসা আগমন করিতে নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার উপর পঞ্চবিংশতি ক্ষুদ্রকাস্ত্র নিক্ষেপ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণও হেমপুঙ্খ নিশিত পাঁচ শরে তাঁহাকে তৎক্ষণাৎ বিদ্ধ করিলেন। সেই সময় অরাতিবিনাশন শর সাত্যকির সুদৃঢ় বৰ্ম্ম ভেদ করিয়া নিশ্বসন্ত পন্নগের ন্যায় ধরণীতলে নিপতিত হইল। তখন সাত্যকি অঙ্কুশাহত মাতঙ্গের ন্যায় নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া অনলসঙ্কাশ পঞ্চাশৎ নারাচাস্ত্রে দ্রোণকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সাত্যকির শরাঘাতে নিতান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া প্রথমতঃ তাঁহাকে অসংখ্য শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় শরজালে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত সাত্যকি দ্রোণাচার্য্যকে তাঁহার উপর নিশিত শরনিকর বিদ্ধ করিতে নিরীক্ষণ করিয়া ইতিকর্ত্তব্যতাবিমূঢ় ও অতিশয় বিষণ্ণ হইলেন। তখন আপনার আত্মজ ও সৈন্যগণ সাত্যকিকে - তদবস্থ অবলোকন করিয়া হৃষ্টান্তঃকরণে বারংবার সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সেই ভয়ঙ্কর সিংহনাদ পরিশ্রবণ ও সাত্যকিকে একান্ত নিপীড়িত নিরীক্ষণ করিয়া সৈন্যদিগকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, হে বীরগণ! যেরূপ রাহু সূর্য্যকে পীড়ন করে, তদ্রূপ দ্রোণাচার্য্য বৃষ্ণিপ্রবর মহাবীর সাত্যকিকে নিতান্ত নিপীড়িত করিতেছেন, অতএব যে স্থানে তিনি দ্রোণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তোমরা সত্বর তথায় ধাবমান হও। ধর্ম্মনন্দন সৈন্যগণকে এই কথা বলিয়া পাঞ্চাল রাজতনয় ধৃষ্টদ্যুম্নকে কহিলেন, হে ধৃষ্টদ্যুম্ন! তুমি কেন এখনও নিশ্চিন্ত হইয়া অবস্থান করিতেছ? অবিলম্বে দ্রোণাচার্য্যের প্রতি ধাবমান হও। দ্রোণাচার্য্য হইতে আমাদের ঘোরতর বিপদ্ উপস্থিত হইয়াছে, তাহা কি তোমার বোধগম্য হয় নাই? যেমন বালক সূত্রসংযত পক্ষী লইয়া ক্রীড়া করে, তদ্রূপ মহাবীর দ্রোণ সাত্যকির সহিত ক্রীড়া করিতেছেন। অতএব তুমি সত্বর ভীমসেন প্রভৃতি বীরগণ-সমভিব্যাহারে সাত্যকির রথাভিমুখে ধাবমান হও। আমি সৈন্যগণের সহিত তোমার অনুগমন করিব। হে পাঞ্চাল! আজি তুমি যমদংষ্ট্রান্তর্গত সাত্যকিকে পরিত্রাণ কর।
রাজা যুধিষ্ঠির এই বলিয়া সাত্যকিকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত বীরগণ-সমভিব্যাহারে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন।
এইরূপে পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণ একমাত্র দ্রোণের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইলে সমরক্ষেত্রে মহান্ কোলাহল সমুপস্থিত হইল।
বীরগণ একত্র সমবেত হইয়া দ্রোণের প্রতি কঙ্কপত্র ও ময়ূরপুচ্ছসুশোভিত সুতীক্ষ্ণ শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। লোকে অভ্যাগত অতিথিদিগকে সলিল ও আসন প্রদানপূর্ব্বক যেমন প্রতিগ্রহ করিয়া থাকে, তদ্রূপ দ্রোণাচার্য্য হাস্যমুখে সেই বীরগণকে প্রতিগ্রহ করিয়া তাঁহাদের উপর অসংখ্য শরবর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা তৎকালে সেই মধ্যাহ্নকালীন দিনকরসদৃশ দ্রোণাচার্য্যকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইলেন না। যেরূপ দিবাকর প্রখর করজালে সকলকে সন্তাপিত করেন, তদ্রূপ ধনুর্দ্ধরপ্রধান দ্রোণ শরনিকরে সেই বীরগণকে সন্তপ্ত করিতে লাগিলেন। তখন পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণ পঙ্কনিমগ্ন মাতঙ্গের ন্যায় কাহারও আশ্রয়লাভে সমর্থ হইলেন না। সূর্য্যের করজাল-সদৃশ দ্রোণাচার্য্যের শরজাল পাণ্ডবসৈন্যগণকে সন্তাপিত করিয়া ইতস্ততঃ নিক্ষিপ্ত হইল। ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রিয় পাঞ্চালদেশীয় সুবিখ্যাত পঞ্চবিংশতি মহারথ দ্রোণশরে কলেবর পরিত্যাগ করিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য পাণ্ডব ও পাঞ্চাল-সৈন্যগণমধ্যে প্রধান প্রধান বীরগণকে বিনষ্ট করিয়া ফেলিলেন। তিনি একশত কৈকেয়কে বিনষ্ট ও অন্যান্য সকলকে ইতস্ততঃ বিদ্রাবিত করিয়া ব্যাদিতান কৃতান্তের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। পাঞ্চাল, সৃঞ্জয়, মৎস্য ও কৈকেয় দেশীয় অসংখ্য বীরগণ তাঁহার শরে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ ও পরাজিত হইয়া অরণ্যমধ্যে হুতাশনপরিবেষ্টিত বনবাসিগণের ন্যায় আর্তস্বর পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিল। তথায় সমরদর্শনার্থ সমাগত দেবতা, গন্ধর্ব্ব ও পিতৃগণ কহিতে লাগিলেন, ঐ দেখ সমস্ত পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণ সৈন্যমণ্ডলী সমভিব্যাহারে পলায়ন করিতেছেন। হে মহারাজ! মহাবীর দ্রোণাচার্য্য যখন শত্রুসংহারে প্রবৃত্ত হইলেন, তৎকালে কেহই তাঁহার সম্মুখীন হইতে বা তাঁহাকে শরবিদ্ধ করিতে সমর্থ হন নাই। দ্রোণের সহিত পাণ্ডবগণের এইরূপ বীরক্ষয়কর ভয়ঙ্কর সংগ্রাম হইতেছে, এমন সময় পাঞ্চজন্য শঙ্খের শব্দ, সহসা যুধিষ্ঠিরের শ্রবণগোচর হইল। ঐ শঙ্খ বাসুদেবের মুখমারুতে পূরিত হইয়া ঘোরতর শব্দ করিতে লাগিল। ঐ সময় জয়দ্রথ-রক্ষক বীরসকল সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন এবং ধার্তরাষ্ট্রগণ অর্জুনের রথাভিমুখে সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতেছিলেন।। সুতরাং তাঁহার গাণ্ডীবনির্ঘোষ এককালে তিরোহিত হইয়া গেল। তখন ধৰ্ম্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠির বাসুদেবের শঙ্খনিম্বন ও কৌরব-গণের সিংহনাদ শ্রবণে বিষণ্ণ হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন। যখন পাঞ্চজন্যনির্ঘোষ শ্রুতিগোচর হইতেছে এবং কৌরবগণ হৃষ্টান্তঃকরণে বারংবার সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতেছে, তখন নিশ্চয়ই অর্জুনের অমঙ্গল ঘটিয়াছে। ধৰ্ম্মরাজ আকুলিত চিত্তে এইরূপ চিন্তা করত মুহুর্মুহুঃ মোহে অভিভূত হইয়াও তৎকালে কর্ত্তব্য কার্য্যের অনুষ্ঠান নিমিত্ত বাষ্পগদ্গদ বচনে সাত্যকিকে কহিলেন, হে শৈনেয়! পূর্ব্বে সাধু ব্যক্তিরা যুদ্ধসময়ে সুহৃদ্-গণের কর্তব্য বিষয়ে যাহা নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন, এক্ষণে সেই কার্য্য অনুষ্ঠানের সময় উপস্থিত হইয়াছে। হে মহাত্মন্! আমি সম্যক্ অনুসন্ধান করিয়া সমুদায় যোদ্ধাদিগের মধ্যে তোমার তুল্য প্রিয়সুহৃৎ আর কাহাকেও দেখিতে পাই না। হে শিনিপুঙ্গব! যে ব্যক্তি নিরন্তর প্রসন্নচিত্ত ও অনুগত থাকে, আমার বিবেচনায় তাহাকেই যুদ্ধে নিয়োগ করা কর্তব্য। তুমি কৃষ্ণের ন্যায় বলবীর্য্যসম্পন্ন এবং তাঁহারই ন্যায় নিরন্তর আমা-দিগকে আশ্রয় প্রদান করিয়া থাক। অতএব আমি তোমার প্রতি যে ভারার্পণ করিতেছি তুমি তাহা বহন কর; আমার অভিলাষ নিষ্ফল করিও না। মহাবীর অর্জুন তোমার ভ্রাতা, বয়স্য ও গুরু; অতএব তুমি বিপক্কালে তাঁহার সাহায্য কর। তুমি সত্যব্রত, পরাক্রান্ত ও মিত্রগণের প্রিয়দর্শন এবং স্বীয় কার্য্য-প্রভাবে লোকমধ্যে সত্যবাদী বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছ। হে শিনি-বংশাবতংস। যে ব্যক্তি মিত্রার্থ যুদ্ধ করিয়া কলেবর পরিত্যাগ করেন, আর যিনি ব্রাহ্মণগণকে সমুদায় পৃথিবী দান করেন, তাঁহাদের উভয়েরই সমান ফল লাভ হয়। আমরা শ্রবণ করিয়াছি, অনেকানেক মহীপাল যজ্ঞানুষ্ঠানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণগণকে সমুদায় পৃথিবী দান করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছেন; এক্ষণে তুমি সংগ্রামে সুহৃদের সাহায্য করিয়া পৃথিবীদানতুল্য অথবা তদপেক্ষা অধিক ফল লাভ কর। আমি কৃতাঞ্জলিপুটে তোমার নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি। হে সাত্যকে! কেবল মহাবাহু বাসুদেব ও তুমি, তোমরা দুই জনে মিত্রগণের অভয়প্রদ হইয়া প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া থাক। আর দেখ, মহাবল পরাক্রান্ত বীরপুরুষই সংগ্রামে যশোলাভার্থী বীরপুরুষের সহায় হইয়া থাকেন, প্রাকৃত ব্যক্তি কদাচ তদ্বিষয়ে সমর্থ হয় না। অতএব এই বিপসময়ে তোমা ভিন্ন অন্য কাহাকেই অর্জুনের রক্ষক দেখিতেছি না।
হে বীর! ধনঞ্জয় আমার হর্ষবর্দ্ধনপূর্ব্বক বারংবার তোমার কার্য্যের শ্লাঘা করিয়া থাকেন। একদা তিনি দ্বৈতবনে সজ্জন সমাজে তোমার পরোক্ষে তোমার প্রকৃত গুণ কীর্তন করত আমাকে কহিয়াছিলেন, মহারাজ! সাত্যকি লঘুহস্ত, অসাধারণ পরাক্রমশালী, চিত্রযোধী, প্রাজ্ঞ, সর্ব্বশাস্ত্রবেত্তা ও মহাবীর; তিনি যুদ্ধে কদাচ বিমোহিত হন না। ঐ বিশালবক্ষঃ বৃষস্কন্ধ মহাবল পরাক্রান্ত মহারথ আমার শিষ্য ও সখা। আমি তাঁহার প্রিয়পাত্র এবং তিনিও আমার নিতান্ত প্রিয়তম। তিনি আমার সহায় হইয়া কৌরবগণকে প্রমথিত করিবেন। যদি মহাবীর কৃষ্ণ, রাম, অনিরুদ্ধ, প্রদ্যুম্ন, গদ, সারণ ও শাম্ব এবং সমুদায় বৃষ্ণিবংশিগণ রণস্থলে আমার সাহায্য করেন, তথাপি আমি নরশ্রেষ্ঠ সত্যবিক্রম সাত্যকিকে সাহায্যার্থ নিয়োগ করিব। তাহার সমান যোদ্ধা আর কেহই নাই। হে সাত্যকে! ধনঞ্জয় এইরূপ তোমার গুণ কীর্ত্তন করিয়া থাকেন; অতএব তুমি সেই অর্জুনের, ভীম ও আমার এই মনোরথ নিষ্ফল করিও না। আমি তীর্থ পর্য্যটন প্রসঙ্গে দ্বারকায় সমুপস্থিত হইয়া অর্জুনের প্রতি তোমার দৃঢ় ভক্তি নিরীক্ষণ করিয়াছি। বিশেষতঃ এক্ষণে আমাদের এই বিপক্কালে তুমি যেরূপ সখ্যভাব প্রদর্শন করিতেছ, আমি অন্য কাহাতেও সেরূপ অবলোকন করি না। তুমি সদ্বংশসম্ভূত, একান্ত ভক্ত, সত্যবাদী ও মহাবল পরাক্রান্ত; অতএব এক্ষণে স্বীয় সখা বিশেষতঃ আচার্য্য ধনঞ্জয়ের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত আপনার অনুরূপ কার্য্যা-নুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হও। দুর্য্যোধন দ্রোণপ্রদত্ত কবচ ধারণ করিয়া সহসা অর্জুনের সমীপে গমন করিয়াছে এবং কৌরবপক্ষীয় অন্যান্য মহারথসকল পূর্ব্বেই তথায় সমুপস্থিত হইয়াছে; অতএব সত্বর তথায় গমন করা তোমার কর্তব্য। যদি মহাবীর দ্রোণ তোমাকে আক্রমণ করেন, তাহা হইলে আমরা ভীমসেন ও সেনাগণ-সমভিব্যাহারে তাঁহাকে নিবারণ করিব।
হে শৈনেয়! ঐ দেখ, কৌরবসৈন্যগণ সমর পরিহার-পূর্ব্বক মহাকোলাহল করিয়া পলায়ন করিতেছে। উহারা পূর্ব্বকালীন বায়ুবেগবিক্ষুব্ধ মহাসাগরের ন্যায় মহাবীর ধনঞ্জয়-কর্তৃক ছিন্ন ভিন্ন হইয়াছে। ঐ দেখ, অসংখ্য মনুষ্য, অশ্ব ও রথ ধাবমান হওয়াতে ধূলিপটল উড্ডীন হইয়া চারিদিক্ সমাচ্ছন্ন করিতেছে। মহাবীর অর্জুন তোমর ও প্রাসধারী মহাবল পরাক্রান্ত সিন্ধু ও সৌবীরবৃন্দে পরিবৃত হইয়াছেন। উহাদিগকে নিবারণ না করিয়া জয়দ্রথকে পরাজয় করা অসাধ্য হইবে; উহারা জয়দ্রথকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন করিবে; ঐ দেখ, শরশক্তি, ধ্বজসম্পন্ন, অশ্ব, নাগ সমাকুল নিতান্ত দুরভিগম্য কৌরবসৈন্য রণস্থলে অবস্থান করিতেছে। দুন্দুভি-নির্ঘোষ, গভীর শঙ্খধ্বনি, সিংহনাদ, রথচক্রের ঘর্ঘর শব্দ, করিবৃংহিত ও শত সহস্র পদাতিগণের পদশব্দ শ্রবণগোচর হইতেছে। ঐ দেখ, হস্তিপকেরা ধরাতল বিকম্পিত করিয়া ধাবমান হইয়াছে। ঐ অগ্রে সৈন্ধবসৈন্য', পশ্চাদ্ভাগে দ্রোণসৈন্য অবস্থান করিতেছে। উহাদের সংখ্যা এত অধিক যে উহারা দেবরাজ ইন্দ্রকেও নিপীড়িত করিতে অসমর্থ নহে।
মহাবীর অর্জুন এই অসীম সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, সুতরাং তাঁহার প্রাণবিয়োগের বিলক্ষণ সম্ভাবনা। অর্জুন বিনষ্ট হইলে আমি কিরূপে প্রাণধারণ করিব! হে শৈনেয়! এক্ষণে তুমি জীবিত থাকিতেও আমাকে এই কষ্ট সহ্য করিতে হইল! প্রিয়দর্শন অর্জুন সূর্য্যোদয়কালে কৌরবসৈন্য-মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছেন; এক্ষণে দিবাও প্রায় অতিবাহিত হইল। মহাবীর অর্জুন এখনও জীবিত আছেন কি না, তাহা কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। কৌরববল সাগরতুল্য, উহা দেবগণেরও দুরধিগম্য। অর্জুন একাকী তাহার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন। তাঁহার বিপদ্ আশঙ্কা করিয়া এক্ষণে এই যুদ্ধবিষয়ে কিছুতেই আমার বুদ্ধিস্ফূর্ত্তি হইতেছে না। ঐ দেখ, মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সংগ্রামে নিতান্ত সমুৎসুক হইয়া তোমার সমক্ষে আমার সৈন্য পীড়ন করিতেছেন। হে শৈনেয়। তুমি দুর্বোধ্য কার্য্যসমুদায় অবধারণ করিতে বিলক্ষণ সমর্থ; এক্ষণে যাহা শ্রেয়স্কর হয়, তাহার অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হও। কিন্তু আমার সকল কার্য্য পরিত্যাগ করিয়া অগ্রে অর্জুনকে পরিত্রাণ করা নিতান্ত কর্তব্য। আমি লোকপালক জগৎপতি বাসুদেবের নিমিত্ত কিছুমাত্র শোক করি না। আমি নিশ্চয় কহিতেছি, তিনি দুর্ব্বল ধার্তরাষ্ট্র-বলের কথা দূরে থাকুক, ত্রিজগৎ একত্র সমবেত হইলেও তাহা পরাজয় করিতে পারেন। মহাবীর অর্জুন সমরাঙ্গনে বহুসংখ্য যোদ্ধা-দিগের শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া পাছে প্রাণ পরিত্যাগ করেন, এই চিন্তা করিয়া আমি মোহে একান্ত অভিভূত হইতেছি। অতএব তুমি আমার বাক্যানুসারে অর্জুনের অনুসরণ কর। তোমার সদৃশ মহাবীরগণেরই অর্জুনের রক্ষার্থ গমন করা কর্ত্তব্য। হে মহাত্মন্! বৃষ্ণিবংশীয়দিগের মধ্যে মহাবাহু প্রদ্যুম্ন ও তুমি উভয়েই অতিরথ বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছ। তুমি অস্ত্রবলে নারায়ণতুল্য, বাহুবলে বলদেবসদৃশ ও পরাক্রম প্রকাশে অর্জুনের সমান। সাধুলোকেরা সাত্যকির অসাধ্য কিছুই নাই, তিনি সর্ব্বযুদ্ধবিশারদ ভীষ্ম ও দ্রোণ অপেক্ষাও প্রভাবসম্পন্ন, এই বলিয়া তোমার প্রশংসা করেন; অতএব আমি যাহা বলিতেছি, তুমি তাহারই অনুষ্ঠান কর। জনগণের, অর্জুনের ও আমার অভিলাষ নিষ্ফল করা তোমার কর্তব্য হইতেছে না। এক্ষণে প্রিয়তর প্রাণরক্ষণে নিরপেক্ষ হইয়া বীরের ন্যায় রণস্থলে বিচরণ কর। হে শৈনেয়! যাদবগণ কদাচ সমরে প্রাণরক্ষার নিমিত্ত যত্ন করেন না। রণক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়া যুদ্ধ না করা ও সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করা যাদবগণের অভ্যস্ত নহে। ঐ সমুদায় ভীরুস্বভাব অসৎ লোকেরই কার্য্য। ধর্মাত্মা ধনঞ্জয় তোমার গুরু এবং বাসুদেব তোমার ও অর্জুনের গুরু; আমি এই নিমিত্তই তোমাকে অর্জুনের নিকট গমন করিতে অনুরোধ করিতেছি। আমি তোমার গুরুর গুরু; অতএব আমার বাক্যে অনাস্থা প্রদর্শন করা তোমার কর্তব্য নয়। হে শৈনেয়! আমি তোমাকে যাহা বলিলাম, ইহা বাসুদেব ও অর্জুনের অনুমোদিত; অতএব এ বিষয়ে আর অণুমাত্রও সংশয় করিও না। এক্ষণে তুমি দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধনের সৈন্যমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক ন্যায়ানুসারে মহারথগণের সহিত সমাগত হইয়া কার্য্যানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হও।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! শিনিপুঙ্গব সাত্যকি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের প্রীতিযক্ত তৎকালোচিত ন্যায়ানুগত বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে মহারাজ! আপনি মহাবীর অর্জুনের নিমিত্ত যে সকল নীতিগৰ্ত্ত যশস্কর বাক্য বলিলেন, তৎসমুদায়ই শ্রবণ করিলাম। এইরূপ সময়ে পার্থের ন্যায় আমাকে অনুরোধ করা আপনার অবশ্যকর্তব্য। আমি ধনঞ্জয়ের রক্ষার্থ জীবন পরিত্যাগ করিতেও স্বীকৃত আছি; বিশেষতঃ আপনি যখন অনুরোধ করিতেছেন, তখন রণস্থলে যে কোন কার্য্য হউক না কেন, সকলই অনুষ্ঠান করা আমার কর্ত্তব্য। আমি আপনার অনুমতিক্রমে দেবতা, অসুর ও মনুষ্য পরিপূর্ণ এই ত্রিলোকের সহিত সংগ্রাম করিতে পারি; অতএব আজি এই দুর্ব্বল | দুর্য্যোধন-বলের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবে, তার আর বিচিত্রতা কি? আমি নিশ্চয়ই রণস্থলে ইহাদিগকে পরাজয় করিব। হে মহারাজ! আমি নির্বিঘ্নে নিরাপদে ধনঞ্জয়ের নিকট গমন করিব এবং দুরাত্মা জয়দ্রথ নিহত হইলে পুনরায় আপনার সন্নিধানে সমুপস্থিত হইব। কিন্তু হে মহারাজ! বাসুদেব ও ধীমান অর্জুন যে কথা কহিয়াছেন, তাহা আপনাকে জ্ঞাপিত করা আমার অবশ্যকর্তব্য। মহাবীর ধনঞ্জয় সমুদায় সৈন্য ও বাসুদেব-সমক্ষে বারংবার আমাকে কহিয়াছেন, হে শৈনেয়! আমি যতক্ষণ জয়দ্রথকে বিনাশ না করিতেছি, তদবধি তুমি অপ্রমত্ত চিত্তে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা কর। আমি তোমার বা মহারথ প্রদ্যুম্নের হস্তে ধর্মরাজকে সমর্পণপূর্ব্বক নিশ্চিন্ত হইয়া জয়দ্রথের প্রতি গমন করিতে পারি। তুমি কৌরবপক্ষের শ্রেষ্ঠ দ্রোণাচার্য্যকে সম্যক্ বিদিত ও তাঁহার প্রতিজ্ঞা শ্রুত হইয়াছ। তিনি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিবার নিমিত্ত অতিশয় যত্ন করিতেছেন এবং তদ্বিষয় সম্পাদনেও অসমর্থ নহেন; অতএব এক্ষণে আমি নরোত্তম ধর্মরাজকে তোমার হস্তে নিক্ষেপ করিয়া জয়দ্রথবধার্থ প্রস্থান করিতেছি; তাহাকে সংহার করিয়া অবিলম্বেই প্রত্যাগত হইব। দেখিও দ্রোণাচার্য্য যেন ধর্মরাজকে গ্রহণ করিতে সমর্থ না হন। ধৰ্ম্মরাজ গৃহীত হইলে আমি সিন্ধুরাজবধে অকৃতকার্য্য ও অতিশয় অসন্তুষ্ট হইব। সত্যবাদী যুধিষ্ঠির সমরে গৃহীত হইলে নিশ্চয়ই আমাদিগকে পুনরায় অরণ্যে প্রস্থান করিতে হইবে, সুতরাং আমাদিগের এই জয়লাভও কোন ফলোপধায়ক হইবে না। অতএব হে শৈনেয়! আজি তুমি আমার প্রিয়ানুষ্ঠান, জয়লাভ ও যশোলাভার্থ ধর্মরাজকে রক্ষা কর।
হে ধর্মরাজ! মহাবীর ধনঞ্জয় দ্রোণাচার্য্যের আশঙ্কায় আপনাকে আমার হস্তে নিক্ষেপ করিয়া গিয়াছেন। এক্ষণে মহাবীর প্রদ্যুম্ন ব্যতিরেকে সেই দ্রোণাচার্য্যের প্রতিযোদ্ধা আর কাহাকেও নিরীক্ষণ করি না। কেহ কেহ আমাকেও তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী বোধ করিয়া থাকেন। অতএব আমি এই আত্মোৎকর্ষ ও আচার্য্য অর্জুনের আদেশ বিফল করিতে কিছুতেই সমর্থ হইতেছি না। আর আপনাকেই বা কিরূপে পরিত্যাগ করিব? দুর্ভেদ্য কবচধারী মহাবীর দ্রোণক্ষিপ্রহস্ততা প্রযুক্ত রণস্থলে আপনাকে প্রাপ্ত হইয়া শিশু যেমন পক্ষী লইয়া ক্রীড়া করে, তদ্রূপ আপনার সহিত ক্রীড়া করিবেন। যদি কৃষ্ণতনয় প্রদ্যুম্ন এই স্থানে থাকিতেন, তাহা হইলে আপনাকে তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিতাম। তিনি মহাবীর অর্জুনের ন্যায় আপনাকে রক্ষা করিতেন। আমি অর্জুনের নিকট গমন করিলে মহাবীর দ্রোণের অভিমুখীন হইতে পারে, আপনার এমন রক্ষক আর কে আছে? অতএব আপনার আত্মরক্ষা করা নিতান্ত কর্তব্য। হে মহারাজ! মহাবীর্য্য অর্জুন ভার গ্রহণ করিয়া কদাচ অবসন্ন হন না; অতএব আজি আপনি তাঁহার নিমিত্ত কোন শঙ্কা করিবেন না। সৌবীরক, সৈন্ধক, পৌরব, উদীচ্য ও দাক্ষিণাত্য যোদ্ধৃগণ এবং কর্ণপ্রমুখ মহারথগণ মহাবীর অর্জুনের ষোড়শাংশেরও উপযুক্ত নহেন। সুর, অসুর, মানব, রাক্ষস, কিন্নর ও মহোরগ প্রভৃতি স্থাবর-জঙ্গমাত্মক ভূতসমুদায় রণস্থলে পার্থের সহিত যুদ্ধ করিতে সমর্থ নহেন। অতএব আপনি তাঁহার নিমিত্ত আশঙ্কা পরিত্যাগ করুন। যথায় মহাবল পরাক্রান্ত অর্জুন ও কৃষ্ণ অবস্থান করিতেছেন, তথায় কার্য্যের বিঘ্ন সম্ভাবনা কোথায়? আপনি আচার্য্য অর্জুনের দৈববল, কৃতাম্রতা, অভ্যাস, অমর্ষ, কৃতজ্ঞতা ও দয়ার বিষয় চিন্তা করুন এবং আমি অর্জুনসন্নিধানে গমন করিলে দ্রোণাচার্য্য যেরূপ অস্ত্রবল প্রদর্শন করিবেন, তাহাও অনুধাবন করিয়া দেখুন। মহাবীর দ্রোণ স্বীয় প্রতিজ্ঞা সফল করিবার নিমিত্ত আপনাকে গ্রহণ করিবার উদ্দেশ্যে সাতিশয় যত্ন করিতেছেন। অতএব আপনার আত্মরক্ষা করা নিতান্ত আবশ্যক। হে মহারাজ! এক্ষণে আমি যাঁহাকে বিশ্বাস করিয়া অর্জুনের নিকট গমন করিতে পারি, আপনার এমন রক্ষক আর কে আছে? আমি সত্যই কহিতেছি, আপনাকে কাহারও হস্তে সমর্পণ না করিয়া কদাচ অর্জুনের নিকট গমন করিব না। অতএব ইহা বারংবার বিচার করিয়া যাহা শ্রেয়স্কর বোধ হয়, তাহা অবধারণপূর্ব্বক আমাকে আজ্ঞা করুন।
ধর্মরাজ সাত্যকির বাক্য শ্রবণান্তর তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে শৈনেয়। তুমি যাহা কহিলে, তদ্বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই; কিন্তু অর্জুনের অনিষ্টাশঙ্কা সতত আমার মনে সমুদিত হইতেছে। অতএব আমি স্বয়ং আত্মরক্ষায় যত্ন করিব। তুমি আমার আদেশানুসারে অর্জুন-সমীপে প্রস্থান কর। আমি আত্মরক্ষণ ও অর্জুনের রক্ষার্থ তোমাকে প্রেরণ, এই দুই বিষয়ের তারতম্য বিচার করিয়া তোমাকে অর্জুন-সমীপে প্রেরণ করাই কর্তব্য বলিয়া প্রতিপাদন করিতেছি। অতএব তুমি অবিলম্বে ধনঞ্জয়ের নিকট গমন করিবার নিমিত্ত প্রস্তুত হও; মহাবল পরাক্রান্ত ভীম, দ্রুপদ, তাঁহার সহোদর, দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র, কেকয়দেশীয় পাঁচ ভ্রাতা, রাক্ষস ঘটোৎকচ, বিরাট, দ্রৌপদ, মহারথ শিখণ্ডী, ধৃষ্টকেতু, কুন্তিভোেজ, নকুল, সহদেব এবং পাঞ্চাল, সৃঞ্জয় ও অন্যান্য ভূপালগণ সাবধান হইয়া আমাকে রক্ষা করিবেন সন্দেহ নাই। তাহা হইলে মহাবীর দ্রোণ ও কৃতবৰ্ম্মা আমাকে আক্রমণ ও নিগ্রহ করিতে সমর্থ হইবেন না; বেলাভূমি যেরূপ মহাসাগরকে নিবারণ করে, তদ্রূপ ধৃষ্টদ্যুম্ন বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক রোষাবিষ্ট দ্রোণকে নিবারণ করিবেন। যথায় তিনি অবস্থান করিবেন, তথায় দ্রোণাচার্য্য মহাবল বলসমুদায়কে কদাচ আক্রমণ করিতে পারিবেন না। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণবিনাশার্থই হুতাশন হইতে উৎপন্ন হইয়াছেন। হে শৈনেয়! এক্ষণে তুমি কবচ, শর, শরাসন ও খড়া ধারণপূর্ব্বক বিশ্বস্তমনে গমন কর। আমার নিমিত্ত তোমার কিছুমাত্র চিন্তা নাই; মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্নই রোষপরবশ দ্রোণাচার্য্যকে নিবারণ করিতে সমর্থ হইবেন।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! যুদ্ধদুৰ্ম্মদ শিনিপুঙ্গব সাত্যকি ধর্মরাজ্যের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া মনে মনে আশঙ্কা করিতে লাগিলেন যে, যদি আমি যুধিষ্ঠিরকে পরিত্যাগ করি, তাহা হইলে অর্জুনের নিকট অপরাধী হইব এবং লোকেও আমাকে ধনঞ্জয়ের নিকট গমন করিতে দেখিয়া ভীত বলিয়া অপবাদ প্রদান করিবে। তিনি মনে মনে বারংবার সেইরূপ চিন্তা করিয়া ধর্মরাজকে কহিলেন, হে মহারাজ! যদি আপনি আপনার রক্ষা-বিষয়ে কৃতনিশ্চয় হইয়া থাকেন, তবে আপনার মঙ্গল হউক; আমি আপনার আজ্ঞানুসারে মহাবীর ধনঞ্জয়ের অনুগমন করি। এই ত্রিলোকমধ্যে অর্জুন অপেক্ষা আমার প্রিয়তর আর কেহই নাই। অতএব আমি সত্য বলিতেছি, আপনার আদেশক্রমে প্রিয়তম পার্থের নিকট গমন করিব। আপনার হিতসাধনের নিমিত্ত আমার কিছুমাত্র অকর্ত্তব্য নাই। গুরুজনের বাক্যরক্ষার ন্যায় আপনার বাক্য রক্ষা করা আমার অবশ্যকর্ত্তব্য; আপনার ভ্রাতা কৃষ্ণ ও অর্জুন আপনার প্রিয়ানুষ্ঠানে যেরূপ নিরত, আমিও তদ্রূপ তাঁহাদের প্রিয়কার্য্য সাধনে তৎপর। অতএব হে প্রভো! আমি আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া অর্জুনের নিমিত্ত ক্রুদ্ধ মৎস্য যেরূপ অগাধজল ভেদ করিয়া গমন করে, তদ্রূপ এই দুর্ভেদ্য দ্রোণসৈন্য ভেদ করিয়া যে স্থানে দুরাত্মা জয়দ্রথ ধনঞ্জয়ভয়ে ভীত হইয়া অশ্বত্থামা, কর্ণ ও কৃপাচার্য্য প্রভৃতি মহারথগণ এবং অসংখ্য সৈন্যগণে সংরক্ষিত হইয়া অবস্থান করিতেছে, সেই স্থানে গমন করিব। মহাবীর অর্জুন জয়দ্রথবধের নিমিত্ত যে স্থানে অবস্থিতি করিতেছেন, বোধ করি, এখান হইতে সে স্থান তিন যোজন অন্তর হইবে। কিন্তু আমি দৃঢ়ান্তঃকরণে বলিতেছি যে, ধনঞ্জয় যোজনত্রয় দূরবর্তী হইলেও আমি তাঁহার নিকট গমন করিয়া সিন্ধুরাজ-বধ পর্যন্ত অপেক্ষা করিব। হে মহারাজ! গুরুজনের অনুমতি ব্যতিরেকে কোন্ বীরপুরুষ যুদ্ধে গমন করিয়া থাকেন? আর তাঁহাদের অনুমতি প্রাপ্ত হইলে মাদৃশ কোন্ ব্যক্তিই বা যুদ্ধবিমুখ হয়?
হে রাজন! যে স্থানে আমায় গমন করিতে হইবে সে স্থান আমি বিশেষরূপে অবগত আছি। আজি আমি হল, শক্তি, গদা, প্রাস, চৰ্ম্ম, খড়া, ঋষ্টি, তোমর ও শর সমুদায়ে সঙ্কীর্ণ এই অগাধ জলধিসদৃশ সেনাসমূহ সংক্ষোভিত করিব। এই যে রণশৌণ্ড' বহুতর ম্লেচ্ছাধিষ্ঠিত অঞ্জনকুলসম্ভূত বারিবর্ষণকারী মেঘের ন্যায় সহস্র সহস্র মাতঙ্গ সাদিগণকর্তৃক সঞ্চালিত হইতেছে, উহারা আর প্রতিনিবৃত্ত হইতে সমর্থ হইবে না, উহাদিগকে বিনাশ না করিলে আমরা জয়ী হইতে পারিব না। আর এই যে সুবর্ণমণ্ডিত রথারূঢ় মহারথ রাজপুত্র গণকে দেখিতেছেন, ইঁহারা সকলেই ধনুর্ব্বেদ-পারদর্শী এবং রথযুদ্ধ, অস্ত্রযুদ্ধ, নাগযুদ্ধ, অসিযুদ্ধ, বাহুযুদ্ধ, গদাযুদ্ধ, মুষ্টিযুদ্ধে বিশেষ নিপুণ, এই সকল কৃতবিদ্য বীরপুরুষেরা কর্ণ ও দুঃশাসনের নিতান্ত অনুগত। ইঁহারা প্রতিনিয়ত সমরস্থলে জয়লাভেচ্ছা করেন; মহাত্মা বাসুদেবও ইহাদিগকে মহারথ বলিয়া প্রশংসা করিয়া থাকেন। ঐ শ্রমক্লমবিহীন বীরবরেরা সতত কর্ণের হিতাভিলাষ করেন ও তাঁহারই বাক্যানুসারে পার্থ হইতে প্রতি-নিবৃত্ত হইয়া সুদৃঢ় বৰ্ম্ম ধারণপূর্ব্বক দুর্য্যোধনের অনুমতিক্রমে আমার নিবারণার্থ অবস্থিতি করিতেছেন। হে কুরুকুলোদ্ভব! আমি আজি আপনার হিতসাধনার্থ এই বীরগণকে রণস্থলে প্রমথিত করিয়া অর্জুনের পদবীতে পদবিক্ষেপ করিব। এই যে, কিরাতাধিষ্ঠিত দিব্যভূষণভূষিত বৰ্ম্মসংচ্ছন্ন অন্য সপ্তশত হস্তী অবলোকন করিতেছেন, পূর্ব্বে কিরাতরাজ স্বীয় জীবন-রক্ষার্থ মহাবীর অর্জুনকে ঐ সমুদায় প্রদান করেন। পূর্ব্বে ইহারা আপনার কার্য্যেই নিযুক্ত ছিল; কিন্তু কালের কি আশ্চর্য্য গতি। এক্ষণে ইহারা আপনার বিপক্ষে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছে! ইহাদের মহামাত্র ম্লেচ্ছ কিরাতগণ সকলেই গজযুদ্ধবিশারদ ও সমরদুৰ্ম্মদ। উহারা পূর্ব্বে সব্যসাচীর নিকট পরাভূত হইয়াছিল, কিন্তু আজি দুরাত্মা দুর্য্যোধনের বশবর্তী হইয়া আপনার বিপক্ষে আমার সহিত যুদ্ধ করিবার অভিলাষে অবস্থান করিতেছে। আজি আমি ঐ যুদ্ধদুৰ্ম্মদ কিরাতগণকে শরনিকরে নিপাতিত করিয়া সিন্ধুরাজবধার্থী ধনঞ্জয়ের অনুগমন করিব।
হে মহারাজ! এই যে, সুবর্ণময় বৰ্ম্মবিভূষিত অঞ্জনকুলোদ্ভব সুশিক্ষিত কর্কশগাত্র ঐরাবতসদৃশ মত্ত মাতঙ্গসকল অবলোকন করিতেছেন, এই সকল গজে অতি কর্কশস্বভাব লৌহবর্ম্মধারী দস্যুগণ আরোহণপূর্ব্বক উত্তর পর্ব্বত হইতে সমর্পিত হইয়াছে। ঐ দস্যুদলে গোযোনি, বানরযোনি, মানুষযোনি প্রভৃতি অনেক যোনিসম্ভূত লোক অবস্থিতি করিতেছে। ঐ সকল হিমদুর্গ'-নিবাসী পাপকর্মা ম্লেচ্ছদল সমবেত থাকাতে সমস্ত সৈন্য ধূমবর্ণ বোধ হইতেছে। হে মহারাজ! কালপ্রেরিত দুরাত্মা দুর্য্যোধন এই সকল রাজমণ্ডল এবং কূপ, সৌমদত্তি, রথিশ্রেষ্ঠ দ্রোণ, সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ ও কর্ণকে সহায় করিয়া আপনাকে কৃতার্থবোধ ও পাণ্ডবদিগকে অবমাননা করিতেছে; কিন্তু ঐ সকল বীর যদি মনের ন্যায় বেগগামী হয়, তথাপি আজি আমার নারাচমুখে নিপতিত হইলে আর পলায়ন করিতে সমর্থ হইবেন না। পরবীর্য্যোপজীবী দুর্য্যোধন সতত তাঁহাদিগকে সম্মান করিয়া থাকেন; কিন্তু আজি তাঁহারা আমার শরনিকরে নিপীড়িত হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিবেন। আর এই যে, সুবর্ণধ্বজ মহারথিগণকে অবলোকন করিতেছেন, উঁহারা কাম্বোজদেশীয় মহারথ; উঁহারা সকলেই কৃতবিদ্য ও ধনুর্ব্বেদপারগ; এক্ষণে উহাদিগকে নিবারণ করা নিতান্ত সুকঠিন; আপনি উহাদের বলবিক্রমের বিষয় শ্রবণ করিয়া থাকিবেন। উঁহারা পরস্পরের হিতার্থ সমবেত হইয়াছেন। ঐ সকল মহাবীর এবং কৌরবগণরক্ষিত দুর্য্যোধনের অনেক অক্ষৌহিণী সেনা ক্রুদ্ধ ও অপ্রমত্তচিত্তে আমাকে নিবারণ করিবার নিমিত্ত অবস্থান করিতেছেন; কিন্তু হুতাশন যেমন তৃণরাশি ভস্মসাৎ করিয়া ফেলে, তদ্রূপ আমি উঁহাদিগকে প্রমথিত করিব; অতএব রথসজ্জাকারিগণ অবিলম্বে বাণপূর্ণ তৃণীর ও অন্যান্য উপকরণসকল আমার রথের যথাস্থানে সংস্থাপিত করুক। এই সংগ্রামে বহুবিধ অস্ত্র গ্রহণ করাই বিধেয়। আচার্য্য রথসজ্জায় যেরূপ উপদেশ প্রদান করিয়াছেন, তদপেক্ষা পঞ্চ-গুণে রথ সুসজ্জিত করা আবশ্যক। কারণ, অত্যুগ্র আশীবিষ-সদৃশ কাম্বোজগণ, নানাস্ত্রধারী বিষকল্প কিরাতগণ, সতত দুর্য্যোধন প্রতিপালিত ও তাঁহার হিতৈষী, ইন্দ্রতুল্য পরাক্রম-শালিগণ এবং দীপ্তপাবকসদৃশ, দুর্জেয় কালপ্রতিম, যুদ্ধদুৰ্ম্মদ অন্যান্য বহুবিধ যোধগণের সহিত আজি সমরস্থলে সম্মিলিত হইতে হইবে। এক্ষণে রথপরিচারকগণ সুলক্ষণাক্রান্ত বিখ্যাত অশ্বগণকে বারিপান ও ভ্রমণ করাইয়া পুনরায় আমার রথে সংযোজিত করুক।
হে মহারাজ! মহাবীর সাত্যকি এই কথা বলিলে রাজা যুধিষ্ঠির তৃণীর, নানাবিধ অস্ত্র ও অন্যান্য উপকরণসকল তাঁহার রথের যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিতে আদেশ করিলেন, পরিচারকগণ তাঁহার রথযোজিত সদশ্বচতুষ্টয়কে মুক্ত করিয়া মত্তকর মদ্য পান এবং স্নান, ভক্ষণ ও ভ্রমণ করাইয়া তাহাদের শল্যোদ্ধার করিল। তখন সাত্যকির প্রিয়সখা সারথি দারুকানুজ সেই সংহৃষ্টমনাঃ স্বর্ণবর্ণাভ, হেমমাল্যবিভূষিত দ্রুতগামী তুরগ-গণকে মণি, মুক্তা, প্রবালে বিভূষিত, পাণ্ডুরবর্ণ পতাকায় সমলঙ্কৃত, উদ্ভুিত ছত্র দণ্ড সমাযুক্ত, সিংহধ্বজসম্পন্ন, হেমভূষণভূষিত রথে যোজিত করিয়া সাত্যকিকে নিবেদন করিল, মহাশয়! রথ সুসজ্জিত হইয়াছে। তখন শ্রীমান্ সাত্যকি স্নানানন্তর পবিত্র হইয়া সহস্র স্নাতককে সুবর্ণমুদ্রা প্রদান করিলেন। ব্রাহ্মণেরা তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। পরে মহাবীর যুযুধান কিরাতদেশোদ্ভব মদ্যপানে বিহ্বলিত ও লোহিতলোচন হইয়া দর্পণ স্পর্শপূর্ব্বক সশর শরাসন গ্রহণ করিয়া অত্যন্ত আহ্লাদিত ও প্রজ্বলিতপাবকতুল্য দ্বিগুণতর তেজস্বী হইয়া উঠিলেন। ব্রাহ্মণেরা তাঁহার স্বস্ত্যয়ন করিতে লাগিলেন। লাজ, গন্ধ ও মাল্য প্রভৃতি বিবিধ মাঙ্গল্য দ্রব্যের অনুষ্ঠান হইল। তখন রথিশ্রেষ্ঠ মহাবীর সাত্যকি সন্নদ্ধকবচ হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে যুধিষ্ঠিরের চরণ বন্দনপূর্ব্বক রথে আরোহণ করিলেন। হৃষ্ট পুষ্টাঙ্গ বায়ুবেগগামী সিন্ধুদেশোদ্ভব ঘোটকসকল তাঁহাকে বহন করিতে লাগিল। ঐ সময় মহাবীর ভীমসেন যুধিষ্ঠিরকর্তৃক সৎকৃত হইয়া তাঁহাকে অভিবাদনপূর্ব্বক সাত্যকির সহিত গমনে প্রবৃত্ত হইলেন। হে মহারাজ। তখন দ্রোণ প্রভৃতির কৌরব-পক্ষীয়েরা সেই শত্রুতাপন বীরদ্বয়কে সেনামধ্যে প্রবিষ্ট হইতে দেখিয়া সকলেই অবহিতচিত্তে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহাবীর সাত্যকি বৰ্ম্মধারী ভীমসেনকে আপনার অনুগমন করিতে দেখিয়া তাঁহাকে অভিবাদনপূর্ব্বক হৃষ্টচিত্তে কহিলেন, হে বৃকোদর। আমার মতে ধৰ্ম্মরাজকে রক্ষা করাই তোমার কর্তব্য। আমি স্বয়ং কৌরবসৈন্য ভেদ করিয়া ইহার মধ্যে প্রবেশ করিব। তুমি আমার বলবিক্রমের বিষয় সবিশেষ অবগত আছ; তোমার বলবিক্রমও আমার নিকট অবিদিত নাই। অতএব যদি আমার হিতকামনা কর, তাহা হইলে তুমি প্রতিনিবৃত্ত হইয়া রাজার রক্ষায় নিযুক্ত হও, ধর্মরাজকে রক্ষা করাই তোমার প্রধানতম কার্য্য। মহাবীর ভীমসেন সাত্যকির বাক্য শ্রবণানন্তর কহিলেন, হে পুরুষোত্তম। তুমি যাহা বলিলে আমি তাহাই করিব। তুমি শীঘ্র গমন কর, তোমার কার্য্য সিদ্ধ হউক। তখন সাত্যকি পুনর্ব্বার বৃকোদরকে কহিলেন, হে ভীমসেন। তুমি যুধিষ্ঠিরের রক্ষার্থ শীঘ্র গমন কর। আজি যখন তুমি আমার বশবর্তী হইয়াছ এবং সুলক্ষণসকল লক্ষিত হইতেছে, তখন অবশ্যই আমার সমরে জয়লাভ হইবে। হে বৃকোদর। আজি দুরাত্মা সিন্ধুরাজ নিহত হইলেই মহাবীর পার্থের সহিত আগমনপূর্ব্বক ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরকে আলিঙ্গন করিব। মহাবীর সাত্যকি এই বলিয়া ভীমসেনকে বিদায় করিয়া ব্যাঘ্র যেরূপ মৃগগণকে অবলোকন করে, সেইরূপ কৌরবপক্ষীয় সৈন্যগণের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে আরম্ভ করিলেন। কৌরবসৈন্যগণ সাত্যকিকে প্রবিষ্ট হইতে দেখিয়া পুনরায় হতজ্ঞান ও কম্পিত হইতে লাগিল। তখন ধর্মরাজের নির্দেশানুবর্তী সাত্যকি অর্জুনদর্শনমানসে অবিলম্বে সেই সৈন্যগণমধ্যে প্রবেশ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। এইরূপে মহবীর সাত্যকি আপনার সৈন্যের প্রতি গমন করিলে তাঁহার পশ্চাৎ মহারাজ যুধিষ্ঠির সেনাপরিবৃত হইয়া দ্রোণাচার্য্যের রথোদ্দেশে ধাবমান হইলেন। ঐ সময় সমরদুৰ্ম্মদ পাঞ্চাল-রাজতনয় এবং রাজা বসুদান ইঁহারা দুইজনে শীঘ্র আগমন কর, প্রহার কর, ধাবমান হও; সমরদুৰ্ম্মদ সাত্যকি যেন অক্লেশে কৌরবসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে পারেন, এই বলিয়া পাণ্ডবসৈন্যমধ্যে চীৎকার করিতে লাগিলেন। তখন মহারথগণ, আজি সমুদায় বীরেরা সাত্যকির জয়লাভ বিষয়ে যত্নবান্ হইবেন, এই বলিতে বলিতে মহাবেগে কৌরবসৈন্যাভিমুখে ধাবমান হইলেন। কৌরব সৈন্যগণও তদ্দর্শনে জয়াভিলাষী হইয়া তাঁহাদিগের অভিমুখে গমন করিতে লাগিল। ঐ সময়ে সাত্যকির রথ-সমীপে মহান্ শব্দ সমুত্থিত হইল। দুর্য্যোধনের সৈন্যসকল চতুৰ্দ্দিক্ হইতে যুযুধানের প্রতি ধাবমান হইতে লাগিল। তখন মহারথ সাত্যকি সেই সৈন্যদিগকে শতধা ছিন্ন ভিন্ন করিয়া অগ্নিসন্নিভ শরদ্বারা পুরোবর্তী ধনুর্দ্ধারী সাতজন মহাবীর ও নানা জনপদস্থ অন্যান্য ভূপালগণকে যমালয়ে প্রেরণ করিলেন। তিনি কখন একবাণে শত ব্যক্তিকে, কখন বা একশত বাণে এক ব্যক্তিকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহারুদ্র যেমন প্রাণিগণকে বিনাশ করেন, সেইরূপ তিনি হস্তী ও হস্ত্যারোহী, অশ্ব ও অশ্বারোহী এবং রথ ও রথীদিগকে বিনাশ করিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় কৌরবপক্ষীয় কোন সৈনিক-পুরুষই সেই শরনিকরবর্ষী সাত্যকির অভিমুখে গমন করিতে সমর্থ হইলেন না। তাঁহারা তৎকর্তৃক মর্দিত ও তাঁহার প্রভাবে মোহিত হইয়া চতুৰ্দ্দিক্ তন্ময়' অবলোকন করত সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিলেন। ভগ্ননীড় রথ, রথচক্র, ছত্র, ধ্বজ, অনুকর্ষ, পতাকা, কাঞ্চনময় শিরস্ত্রাণ, করিকরসদৃশ অঙ্গদযুক্ত চন্দনদিগ্ধ বাহু, ভুজগাকার উরু ও শশধরসদৃশ কুণ্ডলালঙ্কৃত বদনমণ্ডল ছিন্ন ও নিপাতিত হওয়াতে সমরভূমি সমাচ্ছন্ন হইল। পর্ব্বতাকার গজসমুদায় ভূতলশায়ী হইলে বোধ হইতে লাগিল যেন, সমরভূমি ভূধরসমূহে সমাকীর্ণ হইয়াছে। মুক্তাবলীবিভূষিত সুবর্ণযোক্ত ও বিচিত্রাকার বর্ম্ম-বিভূষিত অশ্বগণ মহাবাহু সাত্যকির শরে প্রমথিত ও ভূতলশায়ী হইয়া অতি রমণীয় শোভা ধারণ করিল।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবাহু সাত্যকি আপনার সৈন্যগণকে নিপাতিত ও বিদ্রাবিত করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক যে পথে ধনঞ্জয় প্রবেশ করিয়াছিলেন, সেই পথে গমনোদ্যত হইলেন। দ্রোণাচার্য্য তাঁহাকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর সাত্যকি দ্রোণদর্শনে প্রতিনিবৃত্ত না হইয়া তাঁহার সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য মর্মভেদী শাণিত পাঁচ শরে সাত্যকিকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর যুযুধানও কঙ্কপত্রভূষিত শিলাশিত সুবর্ণপুঙ্খ সাত বাণে তাঁহাকে বিদ্ধ করিয়া গর্জন করিতে লাগিলেন। পরে আচার্য্য ছয় বাণদ্বারা তাঁহাকে ও তাঁহার সারথিকে নিপীড়িত করিলেন। মহাবীর সাত্যকি দ্রোণের বিক্রম সহ্য করিতে না পারিয়া প্রথমতঃ ক্রমে ক্রমে তাঁহাকে দশ, ছয়, আট বাণে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তৎপরে পুনরায় তাঁহাকে দশ বাণে বিদ্ধ করিয়া চারি শরে অশ্ব, এক শরে ধ্বজ ও এক শরে সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর দ্রোণ একবারে পতঙ্গকুলসদৃশ শর-জালে তাঁহাকে এবং তাঁহার অশ্ব, রথ, ধ্বজ ও সারথিকে আচ্ছাদিত করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর সাত্যকিও তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিলেন। তখন দ্রোণাচার্য্য সাত্যকিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে শৈনেয়। তোমার আচার্য্য অর্জুন যেরূপ আজি কাপুরুষের মত আমার সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে রণ পরিত্যাগপূর্ব্বক দক্ষিণদিকে পলায়ন করিয়াছে, যদি তুমি সেইরূপ পলায়ন না কর, তাহা হইলে আজি তোমাকে জীবিত থাকিতে হইবে না। সাত্যকি, দ্রোণের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আপনার মঙ্গল হউক; আমি আর কালবিলম্ব করিতে পারি না। আমাকে ধর্মরাজের আদেশানুসারে ধনঞ্জয়ের নিকট গমন করিতে হইবে। শিষ্যেরা সর্ব্বদা আচার্য্য-পদবীতেই পদ বিক্ষেপ করিয়া থাকে; অতএব আমি আপনাকে পরিত্যাগ করিয়া যে স্থানে আমার গুরু অবস্থান করিতেছেন, সত্বর সেই স্থানে গমন করিব।
হে মহারাজ! মহাবীর শৈনেয় এই বলিয়া সহসা আচার্য্যকে পরিত্যাগপূর্ব্বক গমন করিতে লাগিলেন এবং সারথিকে কহিলেন, হে সারথে! দ্রোণ আমার নিবারণের নিমিত্ত বিশেষ চেষ্টা করিবেন, অতএব তুমি সাবধানে রণস্থলে গমন কর। এই যে অবন্তিদেশীয় মহাপ্রভাবশালী সৈন্যাবলোকন করিতেছ, উহার পরেই সূতপুত্রপ্রমুখ বহুতর দাক্ষিণাত্য সৈন্য, তাহার পরেই উদ্যতাস্ত্র বাহিকদিগের মহাবল পরাক্রান্ত সৈন্য এবং উহার নিকটেই মহাবীর কর্ণের বলসমুদায় অবস্থান করিতেছে। উহারা পরস্পর ভিন্ন; কিন্তু রণস্থলে পরস্পর পরস্পরের সাহায্যে রক্ষিত হইতেছে। তুমি নিঃশঙ্কচিত্তে অনতিদ্রুতবেগে উহাদিগের মধ্যে অশ্ব সঞ্চালন কর। মহাবীর সাত্যকি সারথিকে এই কথা বলিতে বলিতে সহসা আচার্য্যকে পরিত্যাগপূর্ব্বক অসম্ভ্রান্তচিত্তে কর্ণের সৈন্যাভিমুখে গমন করিতে আরম্ভ করিলে দ্রোণাচার্য্য ক্রোধভরে তাঁহার উপর বহুতর বিশিখ প্রহার করত তাঁহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর যুযুধান শাণিত শর নিপাতে কর্ণের সৈন্যগণকে আহত করিয়া অসীম ভারতসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। তিনি প্রবেশ করিবামাত্র কৌরবপক্ষীয় সৈনিক পুরুষেরা ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবীর কৃতবর্মা তদ্দর্শনে রোষাকুলিত মনে সাত্যকির নিবারণে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত সাত্যকি কৃতবর্মাকে ছয় শরে বিদ্ধ করিয়া চারি বাণে তাঁহার চারি অশ্ব বিনাশপূর্ব্বক পুনরায় তাঁহার বক্ষঃস্থলে নতপর্ব্ব ষোড়শ শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর কৃতবর্মা সাত্যকির শরনিকরে নিপীড়িত হইয়া ভীষণ ভুজগসন্নিভ বায়ুবেগগামী বৎসদন্ত বাণ শরাসনে সন্ধানপূর্ব্বক আকর্ষণ করিয়া তাঁহার বক্ষঃস্থলে নিক্ষেপ করিলে উহা সাত্যকির বর্ম্ম ও দেহ ভেদপূর্ব্বক রুধিরলিপ্ত হইয়া ধরাতলে প্রবিষ্ট হইল। অনন্তর পরমাস্ত্রবিৎ কৃতবর্মা স্বীয় শরনিকরে সাত্যকির সশর শরাসন ছেদনপূর্ব্বক ক্রোধভরে তাঁহার বক্ষঃস্থলে সুতীক্ষ্ণ দশ বাণ বিদ্ধ করিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ সাত্যকি ছিন্নকাৰ্ম্মক হইয়া কৃতবর্মার দক্ষিণ করে শক্তি প্রহার করিলেন এবং অবিলম্বে অন্য সুদৃঢ় শরাসন আকর্ষণ করত অসংখ্য শরে তাঁহাকে রথের সহিত সমাচ্ছাদিত করিয়া ভল্লাস্ত্র দ্বারা তাহার সারথির মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। কৃতবর্মার অশ্বগণ সারথিবিহীন হইয়া দ্রুতবেগে ধাবমান হইল। তখন ভোজরাজ ব্যস্তসমস্ত হইয়া স্বয়ং অশ্বরশ্মি গ্রহণপূর্ব্বক শরাসন-হস্তে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে ভোজসৈন্যেরা তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিতে আরম্ভ করিল। তিনি মুহূর্ত্তকালের মধ্যে শ্রমাপনোদন করিয়া স্বয়ং অশ্ব সঞ্চালনপূর্ব্বক শত্রুগণের ত্রাসোৎপাদন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর সাত্যকি কৃতবর্ম্মাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক কাম্বোজ-সৈন্যের সমীপে গমন করিলে কৃতবর্ম্মাও তৎক্ষণাৎ ভীমের অভিমুখে ধাবমান হইলেন
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর যুযুধান ভোেজবল হইতে বিনির্গত হইয়া সত্বর কাম্বোজরাজের সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলে মহাবল পরাক্রান্ত মহারথগণ তাঁহাকে অবলোকন করিল। তখন তিনি অগ্রসর হইতে সমর্থ হইলেন না। ঐ সময় মহাবীন দ্রোণাচার্য্য সাত্যকির অনুসন্ধান পাইয়া কৃতবর্মার প্রতি স্বীয় সৈন্য রক্ষণের ভারার্পণপূর্ব্বক যুদ্ধকামনায় তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন পাণ্ডবপক্ষীয় প্রধান প্রধান বীরগণ সাত্যকির পশ্চাদ্গামী আচার্য্যকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভীমসেন-পরিরক্ষিত পাঞ্চালসৈন্যগণ রথিশ্রেষ্ঠ কৃতবর্ম্মার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তৎকর্তৃক নিবারিত ও হতোৎসাহ হইলেন। মহারথ কৃতবর্মা সেই সমরাভিলাষী বীরদিগকে শরনিকরে তাপিত ও তাঁহাদের বাহনগণকে নিতান্ত ক্লান্ত করিলেন। কিন্তু সেই মহাবীরগণ কৃতবর্ম্মাকর্তৃক এইরূপে দৃঢ় সমাহত হইয়াও যশোলাভাভিলাষে সমরে অপরাজুখ হইয়া ভোজ-সৈন্যগণকে পরাজয় করিবার মানসে অবস্থান করিতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! আমার সৈন্যগণ মহাবল, পরাক্রান্ত, লঘু, বৃত্ত ও আয়তকলেবর, ব্যাধিশূন্য, বৰ্ম্মসমাচ্ছন্ন, বহুশস্ত্র ও পরিচ্ছদসম্পন্ন, শস্ত্রগ্রহণে সুনিপুণ এবং ন্যায়ানুসারে ব্যুহিত। তাহারা সাতিশয় বৃদ্ধ নয়, বালকও নয় এবং কৃশ নয় ও স্থূল নয়। তাহারা আমাদিগের নিকট সৎকৃত হইয়া আমাদেরই অভিলাষানুসারে সতত কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া থাকে। তাহারা আরোহণ, অধিরোহণ, প্রসরণ, প্লুতগমন, সম্যক্ প্রহার, প্রবেশ ও নির্গম বিষয়ে সুদক্ষ এবং হস্তী, অশ্ব ও রথচর্য্যায় পরীক্ষিত। তাহারা পরস্পর বিদ্যাশিক্ষাভিলাষ, সৎকার বা বিবাহাদি সম্বন্ধ-নিবন্ধন আমার সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হয় নাই। তাহারা অনাহতও নহে। আমরা যথাবিধি পরীক্ষা গ্রহণপূর্ব্বক ন্যায়ানুসারে বেতন প্রদান করিয়া তাহাদিগকে সৈন্যমধ্যে সন্নিবিষ্ট করিয়াছি। তাহারা কুলীন, তুষ্ট, পুষ্ট ও অনুদ্ধত এবং সকলেই যশস্বী ও মনস্বী। লোকপালসম পুণ্যকৰ্ম্মা অনেকানেক প্রধান প্রধান সচিবেরা নিরন্তর তাহাদিগকে প্রতিপালন করিতেছেন। আমাদিগের হিতা-নুষ্ঠানপরতন্ত্র মহাবল পরাক্রান্ত বহুসংখ্য ভূপালগণ স্বেচ্ছানুসারে আমাদের নিতান্ত অনুগত হইয়া তাহাদিগকে সতত রক্ষা করিতেছেন। আমার সৈন্যগণ সমন্তাৎ সমাগত নদীসমূহে পরিপূর্ণ মহাসাগরের ন্যায় পক্ষশূন্য পক্ষিসঙ্কাশ রথ, অশ্ব, মদস্রাবী মাতঙ্গগণে পরিপূর্ণ রহিয়াছে। কিন্তু সেই সমুদ্রায় সৈন্য যখন বিনষ্ট হইতেছে, তখন আমার নিতান্ত দুর্ভাগ্য, সন্দেহ নাই। যোদ্ধৃবর্গ ঐ সৈন্যসাগরের অক্ষয় সলিল; বাহনসকল তরঙ্গ; অসি ক্ষেপণী'; গদা, শক্তি, শর ও প্রাসসমুদায় মৎস্য; ধ্বজ ও ভূষণসকল রত্ন ও উৎপল; দ্রোণ উহার গভীর পাতাল, কৃতবর্মা মহাহ্রদ এবং জলসন্ধ মহাগ্রাহস্বরূপ। উহা কর্ণরূপ চন্দ্রের উদয়ে উচ্ছলিত ও ধাবমান এবং বাহনরূপ বায়ুবেগে বিকম্পিত হইয়া থাকে। হে সঞ্জয়! মহাবীর ধনঞ্জয় ও যুযুধান আমার সেই সৈন্যসাগর ভেদ করিয়া যখন গমন করিয়াছে, তখন বোধ হইতেছে, তাহার আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। যাহা হউক, কৌরবগণ ঐ দুই বীর পুরুষকে সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে ও সিন্ধুরাজ জয়দ্রথকে গাণ্ডীবমুক্ত বাণের সমীপবর্তী হইতে দেখিয়া এই ভয়ানক বিপৎকালে কি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলেন? আমি তাঁহাদিগকে মৃত্যুগ্রস্ত বলিয়া অবধারিত করিয়াছি। তাঁহাদের বল, বিক্রম, আর পূর্ব্ববৎ অবলোকিত হইতেছে না। মহাবীর কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয় অক্ষতকলেবরে সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে, তাহাদিগকে নিবারণ করিতে পারে এমন আর কেহই নাই। হে সঞ্জয়! আমি বহুসংখ্য যোদ্ধাদিগকে পরীক্ষা করিয়া ন্যায়ানুসারে বেতন প্রদান ও কতকগুলিকে কেবল প্রিয়বাক্য-দ্বারা নিযুক্ত করিয়াছি। আমার সৈন্যমধ্যে কেহই অসৎকৃত হইয়া অবস্থান করিতেছে না। সকলেই স্ব স্ব কার্য্যানুরূপ অন্ন ও বেতন প্রাপ্ত হইতেছে। তাহাদের মধ্যে কেহ যুদ্ধে অপটু, অল্প বেতনে নিযুক্ত অথবা অবৈতনিক নহে। আমি জ্ঞাতি, পুত্র ও বন্ধু বান্ধবগণের সহিত তাহাদিগকে দান, মান ও আসন প্রদানদ্বারা যথাসাধ্য সৎকার করিয়া থাকি; কিন্তু তাহারা সাত্যকির বাহুবলে বিমদ্দিত ও মহাবীর অর্জুনের দর্শনমাত্রই পরাজিত হইয়াছে। সুতরাং আমার নিতান্ত দুর্ভাগ্য, তাহার সন্দেহ নাই। আমি সংগ্রামস্থলে রক্ষ্য' ও রক্ষক' এই উভয়ের গতি একই প্রকার দেখিতেছি।
হে সঞ্জয়! আমার মূঢ় পুত্র দুর্য্যোধন অর্জুনকে জয়দ্রথের সম্মুখে অবস্থান ও নিরীক্ষণ করিয়া তৎকালোচিত কোন্ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিল এবং আমার পক্ষে বীরগণই বা কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয়কে সমস্ত অস্ত্রজাল নিবারণপূর্ব্বক সেনামধ্যে প্রবেশ করিতে দেখিয়া কিরূপ অবধারণ করিলেন? বোধ হয়, আমার পুত্রেরা কৃষ্ণ ও সাত্যকিকে অর্জুনের সাহায্যার্থ উদ্যত দেখিয়া সাতিশয় শোকাকুল হইতেছে এবং সাত্যকি ও অর্জুনকে সেনাসকল অতিক্রমণ ও কৌরবগণকে পলায়ন করিতে দেখিয়া শোক সংবরণ করিতে সমর্থ হইতেছে না। তাহারা অস্মৎপক্ষীয় রথীদিগকে শত্রুজয়ে উৎসাহশূন্য ও পলায়নে সমুদ্যত, সাত্যকি ও ধনঞ্জয়ের শরে রথোপস্থ সমুদায় সারথিশূন্য ও যোদ্ধাদিগকে নিহত এবং অসংখ্য হস্তী, অশ্ব, রথ ও বীরগণকে ব্যগ্র মনে ধাবমান দেখিয়া যারপরনাই শোকসন্তপ্ত হইতেছে। তাহারা কতকগুলি মাতঙ্গকে অর্জুনশরে পলায়িত ও কতকগুলিকে ভূতলে নিপতিত এবং সাত্যকি ও পার্থের শরে অশ্বসকলকে | আরোহিশূন্য ও মনুষ্যগণকে রথশূন্য নিরীক্ষণ করিয়া নিতান্ত অনুতাপ করিতেছে। পদাতিগণকে সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক ধাবমান দেখিয়া বিজয়লাভের প্রত্যাশা তাহাদের অন্তঃকরণ হইতে একেবারে অন্তর্হিত এবং একান্ত দুর্জয় মহাবীর ধনঞ্জয় ও কৃষ্ণকে ক্ষণমধ্যে দ্রোণসৈন্যগণকে অতিক্রম করিতে দেখিয়া তাহাদের শোকসাগর উচ্ছলিত হইয়াছে।
হে সঞ্জয়! আমি কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয়কে সাত্যকি-সমভি-ব্যাহারে আমার সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইতে শ্রবণ করিয়া একান্ত বিমোহিত হইতেছি। যাহা হউক, মহাবীর শৈনেয় ভোজসৈন্য ভেদ করিয়া পৃতনামধ্যে প্রবিষ্ট হইলে, কৌরবগণ কিরূপ কার্য্য করিলেন এবং পাণ্ডবেরা দ্রোণশরে নিতান্ত নিগৃহীত হইলে কিরূপ যুদ্ধ হইতে লাগিল; এক্ষণে তৎসমুদায় কীর্তন কর। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য বলবান্দিগের অগ্রগণ্য, কৃতাস্ত্র ও সমর-বিশারদ; পাঞ্চালগণ কিরূপে তাঁহাকে শরনিকরে বিদ্ধ করিল? তাহারা অর্জুনেরই জয়লাভার্থী, সুতরাং দ্রোণের সহিত তাহাদের শত্রুভাব বদ্ধমূল হইয়া রহিয়াছে। মহারথ দ্রোণও তাহাদিগের প্রতি বিদ্বেষভাব প্রদর্শন করিয়া থাকেন। হে সঞ্জয়। তুমি সমুদায় বৃত্তান্তই অবগত আছ। এক্ষণে এই সমুদায় বৃত্তান্ত এবং মহাবীর অর্জুন সিন্ধুরাজ-বধার্থ যেরূপ অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তাহাও কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! আপনার অপরাধবশতঃই এই দারুণ ব্যসন সমুপস্থিত হইয়াছে। যাহা হউক, এক্ষণে দুঃখপ্রাপ্ত হইয়া সামান্য লোকের ন্যায় শোক করা আপনার কর্তব্য নহে। পূর্ব্বে প্রাজ্ঞতম বিদুর প্রভৃতি আপনার সুহৃদ্গণ পাণ্ডবগণকে পরিত্যাগ করিতে আপনাকে নিষেধ করিয়াছিলেন; কিন্তু আপনি তাঁহাদের বাক্যে কর্ণপাত করেন নাই। যে ব্যক্তি হিতাভিলাষী সুহৃদ্গণের বাক্য শ্রবণ না করে, তাঁহাকে অতিশয় দুঃখ প্রাপ্ত হইয়া আপনার ন্যায় শোক করিতে হয়। পূর্ব্বে সর্ব্বলোকতত্ত্বজ্ঞ বাসুদেব সন্ধিস্থাপন করিবার নিমিত্ত আপনার নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলেন, কিন্তু আপনি তাঁহার মনোরথ পরিপূর্ণ করেন নাই। তিনি আপনার নির্গুণত্ব, পুত্রগণের প্রতি পক্ষপাত, ধৰ্ম্মে দ্বৈধীভাব, পাণ্ডবগণের প্রতি মৎসরতা ও কুটিল অভিপ্রায় এবং আর্ত্তপ্রলাপ এই সমস্ত অবগত হইয়া কৌরব-গণের বিপক্ষে সমরানল প্রজ্বলিত করিয়াছেন। হে মহারাজ! আপনার অপরাধেই এই বিপুল লোকক্ষয় উপস্থিত হইয়াছে। এ বিষয়ে রাজা দুর্য্যোধনকে দোষী করা আপনার উচিত হইতেছে না। প্রথমে, মধ্যে বা শেষে আপনার কোন সৎকার্য্যই নিরীক্ষিত হয় না। ফলতঃ আপনিই এই পরাজয়ের মূল কারণ। অতএব এক্ষণে স্থিরচিত্তে লোকের অনিত্যতা অবগত হইয়া এই দেবাসুরোপম ঘোরতর যুদ্ধবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করুন। সত্যবিক্রম সাত্যকি সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলে ভীমসেন প্রমুখ পাণ্ডবগণও আপনার সৈন্যাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। তখন একমাত্র মহারথ কৃতবর্মা ক্রোধপরবশ অনুচরগণ-সমবেত পাণ্ডবগণকে সহসা আগমন করিতে দেখিয়া তাঁহাদের নিবারণে প্রবৃত্ত হইলেন। যেমন বেলাভূমি উচ্ছলিত অর্ণবকে অবরোধ করিয়া থাকে, তদ্রূপ মহাবীর কৃতবর্মা পাণ্ডবসৈন্য-গণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবগণ সমবেত হইয়াও হার্দিক্যকে অতিক্রম করিতে সমর্থ হইলেন না। তদ্দর্শনে আমরা সকলেই চমৎকৃত হইলাম। অনন্তর ভীমসেন তিন শরে কৃতবর্মাকে বিদ্ধ করিয়া পাণ্ডবগণকে পুলকিত করত শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন। তখন সহদেব বিংশতি, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পাঁচ, নকুল একশত, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র ত্রিসপ্ততি, ঘটোৎকচ সাত ও ধৃষ্টদ্যুম্ন তিন বাণে কৃতবর্মাকে নিতান্ত নিপীড়িত করিলেন। তৎপরে বিরাট ও দ্রুপদ তিন তিন শরে হাৰ্দ্দিক্যকে বিদ্ধ করিলে শিখণ্ডী তাঁহাকে পাঁচ শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় হাস্যমুখে বিংশতি বাণে বিদ্ধ করিলেন।
তখন মহাবীর কৃতবর্মা তাঁহাদিগের প্রত্যেকের উপর পাঁচ পাঁচ শর নিক্ষেপপূর্ব্বক ভীমসেনকে সাত শরে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার ধনুঃধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া সত্বর সেই ছিন্নকার্ম্মক ভীমের বক্ষঃস্থলে সপ্ততি নিশিত শর প্রহার করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন হাৰ্দ্দিক্যশরে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া ভূমিকম্পকালীন অচলের ন্যায় একান্ত বিচলিত হইতে লাগিলেন। যুধিষ্ঠির প্রমুখ মহাবীরসকল ভীমকে তদবস্থ অবলোকনপূর্ব্বক তাঁহাকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত কৃতবর্মাকে রথসমূহে অবরুদ্ধ করিয়া শরনিকরে নিপীড়িত করিতে আরম্ভ করিলেন।
অনন্তর মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন সংজ্ঞা লাভ করিয়া হেমদণ্ডমণ্ডিত লৌহময়ী শক্তি গ্রহণপূর্ব্বক সত্বর কৃতবর্মার রথাভিমুখে নিক্ষেপ করিলেন। সেই নির্মোক-মুক্ত উরগসদৃশ ভীমভুজ-নির্মুক্ত অতি ভীষণ শক্তি কৃতবর্ম্মার অভিমুখে প্রজ্বলিত হইতে লাগিল। মহাবীর হাৰ্দ্দিক্য সেই যুগান্তানলসঙ্কাশ কনক-ভূষণ শক্তি দুই শরে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। তখন সেই কৃতবর্ম্মবিশিখবিচ্ছিন্ন' শক্তি নভোমণ্ডল-পরিভ্রষ্ট উল্কার ন্যায় দশদিক্ উদ্ভাসিত করিয়া ভূতলে নিপতিত হইল। ভীম-পরাক্রম ভীমসেন শক্তি নিষ্ফল হইল দেখিয়া ক্রোধভরে অন্য মহাস্বন শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক হাৰ্দ্দিক্যকে নিবারণ করত পাঁচ বাণে তাঁহার বক্ষঃস্থল আহত করিলেন। ভোজরাজ কৃতবর্মা ভীমশরে ক্ষত-বিক্ষত কলেবর হইয়া বিকশিত রক্তাশোকের ন্যায় শোভমান হইলেন। অনন্তর তিনি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া হাস্যমুখে ভীমকে তিন শরে বিদ্ধ করিয়া সেই সমস্ত যত্নবান্ মহারথগণকে তিন তিন বাণে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তাঁহারাও সাত সাত শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহারথ কৃতবর্মা রোষপরবশ হইয়া হাস্যমুখে ক্ষুরপ্রাস্ত্রদ্বারা শিখণ্ডীর কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর শিখণ্ডী তদ্দর্শনে ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া অসি ও সুবর্ণ সমলঙ্কৃত ভাস্বর চৰ্ম্ম গ্রহণপূর্ব্বক সত্বর চর্ম বিঘূর্ণিত করত কৃতবর্মার রথা-ভিমুখে অসি নিক্ষেপ করিলেন। সেই ভীষণ অসি কৃতবর্মার সশর শরাসন ছেদনপূর্ব্বক অম্বরতল-পরিভ্রষ্ট জ্যোতির ন্যায় ধরণীতলে নিপতিত হইল। ইত্যবসরে মহারথগণ সায়কদ্বারা কৃতবর্মাকে গাঢ়তর বিদ্ধ করিতে লাগিলেন।
তখন মহাবীর কৃতবর্মা সেই বিশীর্ণ কাৰ্ম্মক পরিত্যাগ-পূর্ব্বক অন্য ধনুগ্রহণ করিয়া তিন তিন শরে পাণ্ডবগণকে ও আট বাণে শিখণ্ডীকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর শিখণ্ডী কৃতবর্মার শরে বিদ্ধ হইয়া সত্বর অন্য ধনুগ্রহণপূর্ব্বক কুৰ্ম্মনখ শরদ্বারা তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। হৃদিকাত্মজ কৃতবর্ম্মা তদ্দর্শনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া শাৰ্দ্দুল যেমন কুঞ্জরের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ মহাত্মা ভীষ্মের মৃত্যুনিদান মহাবীর শিখণ্ডীর প্রতি বল প্রদর্শনপূর্ব্বক মহাবেগে ধাবমান হইলেন। তখন সেই দিগজসঙ্কাশ প্রজ্বলিত-পাবকসদৃশ বীরদ্বয় পরস্পরের প্রতি শরনিকর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহারা কখন শরাসন আস্ফালন, কখন সায়ক সন্ধান এবং কখন বা সূর্যকিরণসন্নিভবহুসংখ্যক শর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। এইরূপে সেই যুগান্তকালপ্রতিম বীরদ্বয় পরস্পরকে সুতীক্ষ্ণ শরে সন্তাপিত করিয়া ভাস্করদ্বয়ের ন্যায় শোভমান হইলেন। মহাবীর কৃতবর্ম্মা মহারথ শিখণ্ডীকে ত্রিসপ্ততি শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় সাত বাণে বিদ্ধ করিলেন। শিখণ্ডী হার্দিক্যের বাণে গাঢ়বিদ্ধ, নিতান্ত ব্যথিত ও মোহে অভিভূত হইয়া সশর শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক রথোপন্থে উপবিষ্ট হইলেন। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ শিখণ্ডীকে বিষণ্ণ দেখিয়া কৃতবর্মাকে যথোচিত সৎকার করত পতাকাসকল কম্পিত করিতে লাগিলেন। তখন শিখণ্ডীর সারথি তাঁহাকে তদবস্থ অবলোকন করিয়া সত্বর রণস্থল হইতে অপসারিত করিল।
হে মহারাজ! পাণ্ডবগণ শিখণ্ডীকে নিতান্ত অবসন্ন দেখিয়া অবিলম্বে রথসমুদায়দ্বারা কৃতবর্মাকে অবরোধ করিলেন; কিন্তু মহাবীর কৃতবর্মা একাকী হইয়াও অদ্ভুত বল প্রকাশপূর্ব্বক সানুচর পাণ্ডবগণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তৎপরে তাঁহাদিগকে পরাজয় করিয়া চেদি, পাঞ্চাল, সৃঞ্জয় ও কৈকেয়-দিগকে পরাজয় করিলেন। পাণ্ডবগণ কৃতবর্মার শরে একান্ত তাড়িত হইয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইতে লাগিলেন; কোনক্রমেই ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক যুদ্ধ করিতে সমর্থ হইলেন না। তখন মহাবীর কৃতবর্মা ভীমসেন প্রমুখ পাণ্ডবগণকে পরাজয় করিয়া বিধূম পাবকের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে পাণ্ডবেরা হার্দিক্যশরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আপনি আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাহা অনন্য মনে শ্রবণ করুন। সেই সমস্ত পাণ্ডবসৈন্য কৃতবর্ম্মার শরপ্রহারে বিদ্রাবিত ও লজ্জায় একান্ত অবনত হইলে আপনার পক্ষীয় বীরেরা অতিশয় হর্ষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। তখন যিনি অগাধ সৈন্যসাগরমধ্যে আশ্রয়লাভার্থী পাণ্ডবগণের দ্বীপস্বরূপ হইয়াছিলেন, সেই মহাবীর সাত্যকি কৌরবপক্ষীয় যোদ্ধাদিগের ভয়ঙ্কর সিংহনাদ শ্রবণ করিয়া সত্বর কৃতবর্মার প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর কৃতবর্ম্মা সাত্যকির প্রতি নিশিত শরনিকর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তখন সাত্যকি সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইয়া চারি শরে কৃতবর্মার চারি অশ্ব ও শাণিত ভল্লে তাঁহার শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক তাঁহার পৃষ্ঠরক্ষক ও সারথিকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। এইরূপে মহাবীর সাত্যকি কৃতবর্ম্মাকে রথশূন্য করিয়া সন্নত পর্ব্ব শরদ্বারা তাঁহার সেনাগণকে মর্দ্দন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। সেনাগণ শৈনেয়ের শরনিকরে নিপীড়িত হইয়া ছিন্ন ভিন্ন হইয়া গেল। সত্যবিক্রম সাত্যকিও সত্বর তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।
হে মহারাজ! মহাবীর সাত্যকি তৎপরে যেরূপ অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তিনি এইরূপে দ্রোণানীক' অতিক্রম ও কৃতবর্ম্মাকে পরাজয় করিয়া হৃষ্টমনে সারথিকে কহিলেন, হে সূত! তুমি নিঃশঙ্কচিত্তে মন্দবেগে রথ চালন কর। মহাবীর সাত্যকি সারথিকে প্রথমতঃ এই কথা বলিয়া অসংখ্য রথ, হস্তী, অশ্ব ও পদাতিগণসঙ্কুল কৌরবসৈন্য অবলোকনপূর্ব্বক পুনরায় কহিলেন, হে সারথে! ঐ যে দ্রোণসৈন্যের বামভাগে সুবর্ণধ্বজপরিশোভিত, মহা-মেঘসন্নিভ মাতঙ্গারোহী বিপুল সৈন্যসমুদায় অবলোকন করিতেছ, উহারা ত্রিগত্তদেশীয় রাজপুত্র, উহারা সকলেই মহাবল পরাক্রান্ত, বিচিত্রযোদ্ধা ও মহারথ; উহাদিগকে নিবারণ করা অতি দুঃসাধ্য। ঐ রাজপুত্রগণ দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে জীবিতনিরপেক্ষ হইয়া রুক্সরথকে অগ্রবর্তী করত আমার সহিত যুদ্ধ করিবার বাসনায় অবস্থান করিতেছেন। অতএব তুমি অবিলম্বে উঁহাদের নিকট আমার অশ্বচালন কর, আমি দ্রোণ-সমক্ষে ত্রিগত্তদিগের সহিত যুদ্ধ করিব।
অনন্তর সারথি সাত্যকির আদেশানুসারে মন্দবেগে অশ্ব চালন করিতে আরম্ভ করিল। কুন্দেন্দুরজতপ্রভ' বায়ুবেগগামী সারথির বশীভূত বল্লমান তুরঙ্গমগণ সাত্যকিকে বহন করিতে লাগিল। তখন বিপক্ষ পক্ষীয় লঘুবেধী মহাবীরসকল তাঁহাকে আগমন করিতে দেখিয়া সুতীক্ষ্ণ বিবিধ সায়ক বর্ষণপূর্ব্বক করিসৈন্যদ্বারা তাঁহাকে অবরোধ করিল। তখন মহাবীর সাত্যকি যেমন গ্রীষ্মাবসানে জলদজাল পর্ব্বতের উপর বারিবর্ষণ করে, তদ্রূপ করিসৈন্যের প্রতি শরবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। মাতঙ্গগণ শিনিবীরসমীরিত অশনি-সমস্পর্শ শরনিকরদ্বারা নিতান্ত নিপীড়িত, শীর্ণদন্ত, ভগ্নকুম্ভ, রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া রণস্থল পরিত্যাগপূর্ব্বক চতুর্দিকে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল; উহাদের মধ্যে কাহার কর্ণ ভিন্ন', কাহার মুখ ও শুণ্ড নিকৃত্ত', কাহার নিয়ন্তা নিহত, কাহার পতাকা নিপতিত, কাহার চর্ম ছিন্ন ও ঘণ্টা চূর্ণ, কাহার ধ্বজদণ্ড খণ্ড খণ্ড এবং কাহারও বা আরোহী বিনষ্ট ও কম্বল পরিভ্রষ্ট হইয়া গেল। এইরূপে সেই সমস্ত জলদোপমনিস্বন মাতঙ্গগণ, সাত্যকির নারাচ, বৎসদন্ত, ভন্ন, অঞ্জলিক, ক্ষুরপ্র ও অর্দ্ধচন্দ্র দ্বারা বিদারিত হইয়া আর্তস্বরে চীৎকার, মল-মূত্র পরিত্যাগ ও শোণিতধারা বর্ষণ করত ইতস্ততঃ ধাবমান হইল। তন্মধ্যে কতকগুলি নিপতিত ও কতকগুলি নিতান্ত ম্লান হইয়া গেল।
এইরূপে সেই করিসৈন্য নিহত হইলে মহাবল পরাক্রান্ত জলসন্ধ পরম যত্নসহকারে সাত্যকির রথাভিমুখে স্বীয় মাতঙ্গ প্রেরণ করিলেন। ঐ সুবর্ণ-বৰ্ম্মধারী কনকাঙ্গদ-সুশোভিত, কিরীট ও কুণ্ডলালঙ্কৃত, রক্তচন্দন-চর্চ্চিত মহাবীর মস্তকে কাঞ্চনময়ী মালা এবং বক্ষঃস্থলে নিষ্ক ও কণ্ঠসূত্র ধারণপূর্ব্বক মাতঙ্গের উপর উপবিষ্ট হইয়া সুবর্ণময় শরাসন বিধূনিত করত বিদ্যুদ্দাম-সংবলিত অম্বুদের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তখন সাত্যকি সেই জলসন্ধের মাতঙ্গকে সহসা আগমন করিতে দেখিয়া যেমন বেলাভূমি মহাসাগরের বেগ অবরোধ করে, তদ্রূপ সেই করিবরকে তৎক্ষণাৎ নিবারণ করিলেন। মহাবীর জলসন্ধ সাত্যকির শরনিকরে স্বীয় কুঞ্জরকে নিবারিত দেখিয়া ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া উঠিলেন এবং সুতীক্ষ্ণ শরনিকরে তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ ও নিশিত ভল্লাস্ত্রদ্বারা শরাসন ছিন্ন করিয়া হাস্যমুখে তাঁহাকে নিশিত পাঁচ শরে বিদ্ধ করিলেন। সাত্যকি জলসন্ধের বহুসংখ্য শরে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়াও কিছুমাত্র বিচলিত হইলেন না। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইলেন। তখন মহাবীর সাত্যকি নিতান্ত ব্যস্তসমস্ত না হইয়া তৎকালে কোন্ শর পরিত্যাগ করা কর্তব্য তাহা অবধারণ ও অন্য ধনুগ্রহণপূর্ব্বক জলসন্ধকে থাক্, থাক্, বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন এবং হাস্যমুখে তাঁহার বক্ষঃস্থলে ষষ্টি শর নিক্ষেপ ও সুতীক্ষ্ণ ক্ষুরপ্রাস্ত্রদ্বারা তাঁহার কার্মুকের মুষ্টিদেশ ছেদনপূর্ব্বক তিন শরে পুনরায় তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন।
মহাবীর জলসন্ধ সশর শরাসন পরিত্যাগ করিয়া সত্বর সাত্যকির প্রতি এক তোমর প্রয়োগ করিলেন। জলসন্ধ-নিক্ষিপ্ত তোমর সাত্যকির বাম ভুজ ভেদ করিয়া নিশ্বসন্ত ঘোর উরগের ন্যায় ধরাতলে নিপতিত হইল। সত্যবিক্রম সাত্যকি জলসন্ধের শরে নির্ভিন্নবাহু হইয়াও তাঁহাকে সুতীক্ষ্ণ ত্রিংশৎ শরে সমাহত করিলেন। তখন মহাবল জলসন্ধ খড়া ও শতচন্দ্রকসঙ্কুল আর্ষভচৰ্ম্ম গ্রহণপূর্ব্বক খড়া বিঘূর্ণিত করিয়া সাত্যকির অভিমুখে নিক্ষেপ করিলেন, খড়্গ পরিত্যক্ত হইবামাত্র সাত্যকির শরাসনছেদনপূর্ব্বক ভূতলে নিপতিত হইয়া অলাত-চক্রের ন্যায় সুশোভিত হইতে লাগিল। মহাবীর সাত্যকি তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া সত্বর শালস্কন্ধসঙ্কাশ, অশনিসমনিস্বন অন্য শরাসন গ্রহণ ও আকর্ষণপূর্ব্বক শরদ্বারা জলসন্ধকে বিদ্ধ করিয়া সহাস্যবদনে দুই ক্ষুরপ্রদ্বারা তাঁহার বিচিত্র-ভূষণ-বিভূষিত বাহুদ্বয় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। জলসন্ধের অর্গলসদৃশ ভুজযুগল ভূধর হইতে পরিভ্রষ্ট পঞ্চশীর্ষ উরগদ্বয়ের ন্যায় গজপৃষ্ঠ হইতে নিপতিত হইল। তৎপরে মহাবীর সাত্যকি অন্য ক্ষুরপ্রদ্বারা জলসন্ধের মনোহর কুণ্ডলযুগলমণ্ডিত দশনরাজি-বিরাজিত মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। সেই জলসন্ধের ভীমদর্শন কবন্ধ রুধিরধারায় তাঁহার মাতঙ্গকে অভিষিক্ত করিতে লাগিল। অনন্তর মহাবীর সাত্যকি সত্বর গজস্কন্ধ হইতে মহামাত্রকে নিপাতিত করিলেন। তখন সেই রুধিরলিপ্তাঙ্গ মাতঙ্গ সাত্যকির শরজালে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া আর্ত্তস্বর পরিত্যাগ-পূর্ব্বক পৃষ্ঠসংশ্লিষ্ট বিলম্বমান আসন, বাহন ও স্বীয় সৈন্যগণকে মর্দ্দন করত ধাবমান হইল। হে মহারাজ! আপনার সৈন্যগণ তদ্দর্শনে হাহাকার শব্দ করিতে লাগিল। যোদ্ধাসকল মহাবীর জলসন্ধকে নিহত দেখিয়া জয়লাভে উৎসাহশূন্য ও সমরে পরাজুখ হইয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইল। ইত্যবসরে মহাবীর দ্রোণ মহাবেগে অশ্ব সঞ্চালনপূর্ব্বক সাত্যকির অভিমুখে গমন করিলেন। কৌরবগণও সাত্যকিকে নিতান্ত উদ্ধত দেখিয়া ক্রোধাবিষ্টচিত্তে দ্রোণের সহিত ধাবমান হইলেন। তখন মহাত্মা দ্রোণ ও কৌরবগণের সহিত সাত্যকির ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে যুদ্ধনিপুণ বীরগণ সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়া সাত্যকির উপর শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সপ্তসপ্ততি, দুৰ্ম্মর্ষণ দ্বাদশ, দুঃসহ দশ, বিকর্ণ ত্রিংশৎ, দুর্মুখ দশ, দুঃশাসন আট ও চিত্রসেন দুই বাণে তাঁহার বামপার্শ্ব ও বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। দুর্য্যোধন ও অন্যান্য শূরগণ অসংখ্য শরবর্ষণ করিয়া তাঁহাকে পীড়িত করিতে লাগিলেন। মহাবীর সাত্যকি সেই বীরগণের শরজালে বিদ্ধ হইয়া দ্রোণাচার্য্যকে তিন, দুঃসহকে নয়, বিকর্ণকে পঞ্চবিংশতি, চিত্রসেনকে সাত, দুৰ্ম্মর্ষণকে দ্বাদশ, বিবিংশতিকে আট, সত্যব্রতকে নয় ও বিজয়কে দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে কলিঙ্গাধিপতি রুক্মাঙ্গদকে কম্পিত করত অবিলম্বে আপনার পুত্র মহারথ দুর্য্যোধনের অভিমুখে ধাবমান হইয়া তাঁহাকে অসংখ্য শরে নিতান্ত নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। তখন সেই মহাবীরদ্বয়ের তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল। তাঁহারা সুতীক্ষ্ণ শরজাল বিস্তার করিয়া পরস্পরকে অদৃশ্য করিলেন। সাত্যকি দুর্য্যোধনের শরাঘাতে রুধিরাপ্লুত হইয়া রসস্রাবী রক্তচন্দন বৃক্ষের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। আপনার পুত্রও সাত্যকির শরে বিদ্ধ হইয়া সুবর্ণময়-শিরোভূষণভূষিত উদ্ভুিত যুপের ন্যায় শোভমান হইলেন।
তখন মহাবীর সাত্যকি ক্ষুরপ্রাস্ত্রদ্বারা অবলীলাক্রমে কুরুরাজের শরাসন ছেদন করিয়া তাঁহাকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। রাজা দুর্য্যোধন বিপক্ষাস্ত্র নিপীড়িত ও তাঁহার বিজয়লক্ষণ সহ্য করিতে নিতান্ত অসমর্থ হইয়া অন্য হেমপৃষ্ঠ শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক শত বাণে সাত্যকিকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর যুযুধান দুর্য্যোধনের শরপ্রহারে ব্যথিত ও ক্রোধান্বিত হইয়া তাঁহাকে অতিশয় আঘাত করিতে লাগিলেন। তখন আপনার অন্যান্য পুত্রগণ নৃপতিকে পীড়িত দেখিয়া বাণবর্ষণদ্বারা সাত্যকিকে সমাচ্ছন্ন করিলেন। মহাবীর সাত্যকি শরজালে সমাবৃত হইয়া তাঁহাদের প্রত্যেককে প্রথমতঃ পাঁচ পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিয়া পুনর্ব্বার সাত সাত শরে আহত করিতে লাগিলেন। পরিশেষে সত্বর আট বাণে দুর্য্যোধনকে বিদ্ধ করিয়া অম্লানবদনে তাঁহার ভীষণ শরাসন ও মণিময় নাগধ্বজ ছেদন, চারি অশ্বের প্রাণসংহার ও ক্ষুরপ্রাস্ত্রে সারথির নিধনপূর্ব্বক মৰ্ম্মভেদী শরদ্বারা তাঁহাকে সমাচ্ছন্ন করিলেন। রাজা দুর্য্যোধন এইরূপে শৈনেয়ের শরে বিদ্ধ হইয়া পলায়নপর্ব্বক ধনুর্দ্ধারী চিত্রসেনের রথে সমারূঢ় হইলেন। দুর্য্যোধনকে রাহুগ্রস্ত নিশাকরের ন্যায় সাত্যকির শরে সমাচ্ছাদিত দেখিয়া সকল লোকেই হাহাকার করিতে লাগিল।
তখন মহারথ কৃতবর্মা ঐরূপ আর্তনাদ শ্রবণ করিয়া ধনুঃ কম্পন ও অশ্বচালনপূর্ব্বক সারথিকে ভর্ৎসনা করত কহিলেন, হে সূত! সত্বর অগ্রসর হও। অনন্তর মহারথ সাত্যকি কৃতবর্মাকে ব্যাদিতাস্য অন্তকের ন্যায় আগমন করিতে দেখিয়া সারথিকে কহিলেন, সারথে। ঐ দেখ, কৃতবর্মা রথারোহণ-পূর্ব্বক অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণ করিয়া যুদ্ধার্থ আগমন করিতেছে, তুমি শীঘ্র উহার অভিমুখে রথ চালন কর। সারথি আজ্ঞাপ্রাপ্তিমাত্র সুসজ্জিত অশ্বসমুদায়কে সঞ্চালিত করিয়া কৃতবর্মার সমীপে সমুপস্থিত হইল। অনন্তর সেই প্রজ্বলিত-পাবকসদৃশ দুই মহাবীর বলবান্ ব্যাঘ্রদ্বয়ের ন্যায় একত্র মিলিত হইলেন। সুবর্ণধ্বজশালী মহাবীর কৃতবর্মা সুবর্ণপৃষ্ঠ শরাসন বিধূননপূর্ব্বক শৈনেয়কে ষড়বিংশতি, তাঁহার সারথিকে পাঁচ এবং অশ্বচতুষ্টয়কে চারি বাণে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার উপর সুবর্ণপুঙ্খ শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন শিনিপৌত্র সাত্যকি ধনঞ্জয়ের দর্শনকামনায় ত্বরান্বিত হইয়া কৃতবর্ম্মার উপর শাণিত অশীতি শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর কৃতবর্মা বলবান্ অরাতির শর প্রহারে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া ভূমিকম্পকালীন ভূধরের ন্যায় কম্পিত হইতে লাগিলেন। সত্যবিক্রম সাত্যকি ঐ অবসরে ত্রিষষ্টি শরে তাঁহার অশ্বচতুষ্টয় ও সাত শরে সারথিকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার উপর এক সংক্রুদ্ধ পন্নগসদৃশ সুবর্ণপুঙ্খ বিশিখ পরিত্যাগ করিলেন। সেই কালদণ্ডসদৃশ শর কৃতবর্মার জম্মুনদময় বিচিত্র বৰ্ম্ম ছেদন ও কলেবর ভেদপূর্ব্বক রুধিরাপ্লুত হইয়া ভূগর্ন্তে প্রবিষ্ট হইল। মহাবীর হাৰ্দ্দিক্যও সেই বিষম শরে নিপীড়িত ও শোণিতাক্ত-কলেবর হইয়া সশর শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক রথোপন্থে নিপতিত হইলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে সত্যবিক্রম সাত্যকি সহস্রবাহু কার্ত্তবীৰ্য্যসদৃশ, অক্ষোভ্য সাগরতুল্য কৃতবর্মাকে নিবারণ করিয়া ইন্দ্র যেরূপ অসুরসেনা অতিক্রম করিয়াছিলেন, তদ্রূপ সর্ব্বসৈন্য সমক্ষে সেই খড়া শক্তি শরাসনবিকীর্ণ, গজাশ্ব-রথসঙ্কুল, রুধিরাভিষিক্ত কৌরবসৈন্য অতিক্রম করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। এদিকে বলবান্ হাৰ্দ্দিক্য সংজ্ঞা লাভ করিয়া শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক সমরে পাণ্ডবগণকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। এইরূপে কৌরবসেনাগণ সাত্যকিকর্তৃক কম্পিত হইলে দ্রোণাচার্য্য শরবৃষ্টিদ্বারা তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিলেন। পূর্ব্বে বলিরাজের সহিত বাসবের যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, সর্ব্ব সৈন্যের সমক্ষে দ্রোণাচার্য্যের সহিত সাত্যকিরও সেইরূপ তুমুল সংগ্রাম উপস্থিত হইল। মহাবীর দ্রোণ যুযুধানের ললাটে সর্পাকৃতি লৌহময় বিচিত্র বাণত্রয় পরিত্যাগ করিলেন। ঐ শরত্রয় ললাটে বিদ্ধ হওয়াতে সাত্যকি ত্রিশৃঙ্গ পর্ব্বতের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। ভারদ্বাজ ঐ অবসরে তাঁহার উপর অশনিসম শব্দায়মান বাণসমূহ পরিত্যাগ করিলেন। পরমাস্ত্রবিৎ সাত্যকি তৎপ্রেরিত প্রত্যেক বাণের উপর দুই দুই শর নিক্ষেপপূর্ব্বক সমুদায় বাণ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর দ্রোণ সাত্যকির এইরূপ হস্তলাঘব দর্শনে হাস্য করিয়া স্বীয় লঘুহস্ততা প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহাকে প্রথমতঃ বিংশতি ও তৎপশ্চাৎ শাণিত পঞ্চাশৎ শরে বিদ্ধ করিলেন। রোষিত সর্পসকল যেরূপ বল্মীক হইতে বিনির্গত হয়, সেইরূপ সেই নিশিত শরসমূহ আচার্য্যের রথ হইতে নিঃসৃত হইতে লাগিল। যুযুধানবিসৃষ্ট রুধিরপায়ী শরনিকরও দ্রোণের রথ সমাচ্ছন্ন করিল; এইরূপে তাঁহারা উভয়েই সমান যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। হস্তলাঘব বিষয়ে কেহ কাহাকে পরাজয় করিতে পারিলেন না।
অনন্তর সাত্যকি দ্রোণাচার্য্যকে নতপর্ব্ব নয় বাণে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার ধ্বজে অসংখ্য শর ও তাঁহার সারথির পর শত বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মহারথ দ্রোণাচার্য্য যুযুধানের হস্তলাঘব অবলোকনপূর্ব্বক সপ্ততি শরে তাঁহার সারথিকে ও তিন তিন শরে অশ্বগণকে বিদ্ধ করিয়া এক শরে তাঁহার ধ্বজ ও হেমপুঙ্খ ভল্লাস্ত্রদ্বারা শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন সাত্যকি কোপপূর্ণ হইয়া শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক গদা গ্রহণ করত দ্রোণের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর দ্রোণ বিবিধ শরবৃষ্টি-দ্বারা সহসা সমাগত পট্টবদ্ধ' লৌহময় গদা নিবারণ করিলেন। সাত্যকি তদ্দর্শনে ক্রোধভরে অন্য শরাসনে গ্রহণপূর্ব্বক শিলা-নিশিত অসংখ্য শরে দ্রোণকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। শস্ত্রধরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্য সেই সিংহনাদ সহ্য করিতে না পারিয়া সাত্যকির রথাভিমুখে সুবর্ণদণ্ডান্বিত লৌহনির্মিত শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। সেই কালসন্নিভ শক্তি শৈনেয়ের শরীর স্পর্শ না করিয়া রথ ভেদপূর্ব্বক ভয়ঙ্কর নিম্বন করত অবনিগর্ভে প্রবিষ্ট হইল। তখন মহাবীর সাত্যকি তীক্ষ্ণ শরে দ্রোণের দক্ষিণ ভুজ সমাহত করিলেন। মহাবীর দ্রোণও অর্দ্ধচন্দ্রাকৃতি বাণদ্বারা মাধবের শরাসন ছেদন ও রথশক্তিদ্বারা সারথিকে মোহিত করিয়া ফেলিলেন। সারথি সেই ভীষণ রথশক্তিদ্বারা সমাহত হইয়া কিয়ৎকাল নিশ্চেষ্টভাবে রথোপরি অবস্থান করিতে লাগিল। সাত্যকি স্বয়ং রথরশ্মি ধারণ করিয়া সারথ্য কার্য্যে নৈপুণ্য প্রদর্শনপূর্ব্বক দ্রোণাচার্য্যের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়া প্রসন্ন মনে তাঁহাকে শত বাণে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর দ্রোণও তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া পাঁচ বাণ পরিত্যাগ করিলেন। শরসকল সাত্যকির কবচ ভেদ করিয়া শোণিত পান করিতে লাগিল। সাত্যকি দ্রোণের শরে নিপীড়িত হইয়া কোপাবিষ্টচিত্তে তাঁহার প্রতি অসংখ্য শর নিক্ষেপপূর্ব্বক এক শরে তাঁহার সারথিকে সংহার করত অন্য শরসমূহদ্বারা অশ্বগণকে বিদ্রাবিত করিলেন। এইরূপে অশ্বগণ বাণপীড়িত হইয়া পলায়ন পরায়ণ হইলে দ্রোণাচার্য্যের সেই রজতনির্মিত রথ রণক্ষেত্রে দীপ্যমান সহস্র সহস্র সূর্য্যের ন্যায় মণ্ডলাকারে পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। তখন কৌরবপক্ষীয় সমুদায় রাজা ও রাজপুত্রগণ শীঘ্র গমন কর, দ্রোণের পলায়মান অশ্বগণকে ধারণ কর, বলিতে বলিতে সাত্যকিকে পরিত্যাগপূর্ব্বক দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। হে মহারাজ! আপনার সেনাগণ মহারথগণকে সাত্যকির শরে সমাহত ও পলায়মান অবলোকন করিয়া সাতিশয় শঙ্কিতচিত্তে সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিল। দ্রোণাচার্য্যও সেই সাত্যকিশরাৰ্দ্দিত বায়ুসম বেগবান্ অশ্বসমুদায় সঞ্চালনপূর্ব্বক ব্যূহদ্বারে উপনীত হইলেন এবং পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ সেই ব্যূহ ভগ্ন করিয়াছেন দেখিয়া আর সাত্যকির নিবারণে যত্ন না করিয়া পাণ্ডব ও পাঞ্চালদিগকে নিবারণপূর্ব্বক ব্যূহ রক্ষা করত উদ্যত কালসূর্য্যের ন্যায় এবং প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! শিনিবংশাবতংস পুরুষ-প্রধান সাত্যকি দ্রোণাচার্য্য ও হাৰ্দ্দিক্য প্রভৃতি বীরগণকে পরাজিত করিয়া সহাস্যমুখে সারথিকে কহিলেন, হে সূত! কৃষ্ণ ও অর্জুন পূর্ব্বেই আমাদের অরাতিগণকে সংহার করিয়াছেন; আমরা নিমিত্তমাত্র হইয়া এই অর্জুননিহত সৈন্যগণকে বিনষ্ট করিতেছি। অরাতিহন্তা সাত্যকি সারথিকে এই কথা বলিয়া বাণ বর্ষণপূর্ব্বক আমিষ লোলুপ শ্যেন পক্ষীর ন্যায় বিচরণ করিতে লাগিলেন। কৌরবগণ সেই সুরেন্দ্রসম-প্রভাব, প্রভৃত-পরাক্রম, পুরুষপ্রবর সাত্যকিকে শশি-শঙ্খসন্নিভ, শ্বেতবর্ণ অশ্ব সংযুক্ত রথে আরোহণপূর্ব্বক শরৎকালীন সূর্য্যের ন্যায় সমর-ক্ষেত্রে বিচরণ করিতে দেখিয়া নিতান্ত ভীত হইলেন। কেহই তাঁহাকে পরাজিত করিতে পারিলেন না। অনন্তর বিচিত্র যুদ্ধবিশারদ কাঞ্চনবৰ্ম্মধারী মহাবীর সুদর্শন ক্রোধপূর্ণ হইয়া শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক সাত্যকিকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তখন সেই মহাবীরদ্বয়ের ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। পূর্ব্বকালে দেবগণ বৃত্রাসুর ও ইন্দ্রের যুদ্ধ দর্শনে যেরূপ প্রশংসা করিয়াছিলেন, তদ্রূপ কৌরবপক্ষীয় যোদ্ধারা সাত্যকি ও সুদর্শনের সংগ্রাম সন্দর্শন করিয়া অতিমাত্র প্রশংসা করিলেন। মহাবীর সুদর্শন সাত্যকির উপর বারংবার সুতীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর সাত্যকি সেই সমুদায় বাণ অঙ্গস্পর্শ না করিতে করিতেই ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ইন্দ্রতুল্য-প্রভাবশালী সাত্যকিও সুদর্শনের প্রতি যে যে বাণ নিক্ষেপ করিলেন, উত্তম রথারূঢ় সুদর্শন উত্তম শরে তৎসমুদায় খণ্ড খণ্ড করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহাবীর সুদর্শন সাত্যকির বাণবেগে স্বীয় শর সমুদায় নিরাকৃত দেখিয়া ক্রোধভরে তাঁহার উপর সুবর্ণময় বিচিত্র বাণ বর্ষণপূর্ব্বক শরাসন আকর্ষণ করিয়া পুনরায় তাঁহার প্রতি অগ্নিসদৃশ তিন শর নিক্ষেপ করিলেন। সুদর্শন-নিক্ষিপ্ত সায়কত্রয় সাত্যকির দেহাবরণ ভেদ করিয়া তাঁহার শরীরে প্রবিষ্ট হইল।
তখন রাজনন্দন সুদর্শন প্রজ্বলিত বাণচতুষ্টয় নিক্ষেপ করিয়া সাত্যকির রজতসঙ্কাশ শ্বেতবর্ণ অশ্বচতুষ্টয় সংহার করিলেন। ইন্দ্রতুল্য-পরাক্রমশালী সাত্যকি এইরূপে সুদর্শনশরে তাড়িত হইয়া ক্রোধভরে সুতীক্ষ্ণ শরনিকরদ্বারা তাঁহার অশ্বগণকে সংহারপূর্বক সিংহনাদ করিতে লাগিলেন এবং তৎপরে শত্রুা-শনিসন্নিভ ভল্লদ্বারা তাঁহার সারথির শিরশ্ছেদনপূর্ব্বক কালা-নলসন্নিত ক্ষুরপ্রদ্বারা সুদর্শনের কুণ্ডলমণ্ডিত পূর্ণশশিসন্নিভমস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। পূর্ব্বে বজ্রধর ইন্দ্র যেরূপ অতিবল বল দানবের শিরশ্ছেদ করত শোভা ধারণ করিয়া-ছিলেন, যদুকুলোদ্ভব মহাত্মা সাত্যকি সুদর্শনের মস্তক ছেদন করিয়া সেইরূপ শোভা পাইতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি সেই সদশ্বযুক্ত রথে উপবিষ্ট হইয়া বাণ বর্ষণদ্বারা কৌরবসৈন্যগণকে নিবারণ ও নিধন করত সকলকে বিস্ময়াপন্ন করিয়া অর্জুন-সমীপে ধাবমান হইলেন। তখন যোধগণ তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! বৃষ্ণিপুঙ্গব মহাবীর সাত্যকি এইরূপে সংগ্রামে সুদর্শনকে নিহত করিয়া পুনরায় সারথিকে কহিলেন, সারথে! যখন শরশক্তিরূপ তরঙ্গ, খড়া-রূপ মৎস্য ও গদারূপ গ্রাহযুক্ত, অসংখ্য রথনাগাশ্বসঙ্কীর্ণ, বিবিধ আয়ুধের নিস্বন ও বাদিত্রের নিনাদসম্পন্ন যোধগণের অসুখস্পর্শ, জিগীযুদিগের দুর্দ্ধর্য, রাক্ষসসদৃশ জলসন্ধসৈন্যে সমাবৃত দ্রোণানীকরূপ মহাসাগর অতিক্রম করিয়াছি, তখন এই অবশিষ্ট সেনা, অস্ত্রসলিলসম্পন্ন 'ক্ষুদ্র নদীর ন্যায় বোধ হইতেছে; অতএব তুমি শীঘ্র অশ্ব চালন কর; আমি অবিলম্বে উহা অতিক্রম করিব। যখন দুর্জয় দ্রোণাচার্য্য ও হার্দিক্যকে পরাজয় করিয়াছি, তখন অর্জুনকে সম্মুখস্থিত বোধ হইতেছে। এই সমুদায় সৈন্য অবলোকন করিয়া আমার কিছুমাত্র ত্রাস হইতেছে না। উহারা প্রদীপ্ত পাবকদগ্ধ শুষ্কতৃণের ন্যায় আমার শরে দগ্ধ হইতেছে। ঐ দেখ, পাণ্ডবপ্রধান অর্জুন যে পথ দিয়া গমন করিয়াছেন, তথায় অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও রথ নিপতিত রহিয়াছে। ঐ কৌরবসেনাগণ অর্জুনের শরে নিপীড়িত হইয়া সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতেছে। তুরঙ্গম, মাতঙ্গ ও রথসমুদায় মহাবেগে গমন করাতে কৌশেয়ারুণ' রজোরাশি উদ্ধৃত হইয়াছে এবং মহাতেজঃসম্পন্ন গাণ্ডীবের গভীর নিনাদ শ্রুতিগোচর হইতেছে। অতএব বোধ করি, মহাবীর ধনঞ্জয় অনতিদূরে অবস্থান করিতেছেন। হে সারথে। এক্ষণে যেরূপ নিমিত্ত সকল দৃষ্ট হইতেছে, তাহাতে নিশ্চয়ই বোধ হয়, দিনমণি অস্তাচলগত না হইতে হইতেই অর্জুন সিন্ধুরাজকে বিনাশ করিবেন। এক্ষণে যে স্থানে অরাতিসৈন্যগণ, দুর্য্যোধন প্রভৃতি বীরগণ যুদ্ধদুৰ্ম্মদ ক্রুরকর্মা বৰ্ম্মধারী কাম্বোজগণ, ধনুর্ব্বাণধারী যবনগণ এবং বিবিধাস্ত্রধারী শক, কিরাত, দরদ, বর্ব্বর ও তাম্রলিপ্তক প্রভৃতি ম্লেচ্ছগণ আমার সহিত সমরার্থী হইয়া অবস্থান করিতেছে, তুমি সেই স্থানে অশ্ব চালন কর। তুমি মনে মনে স্থির করিয়া রাখ যে, আমি এ সমুদায় বীরগণকে রথ, নাগ ও অশ্বের সহিত সংহার করিয়া এই বিষম সঙ্কট হইতে উত্তীর্ণ হইয়াছি।
সারথি সাত্যকির বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে বাঞ্চেয়! যদ্যপি জমদগ্নিপুত্র পরশুরাম, মহারথী দ্রোণাচার্য্য, কৃপাচার্য্য বা মদ্রেশ্বর শল্য ক্রুদ্ধ হইয়া আপনার অভিমুখে আগমন করেন, তথাপি আপনার আশ্রয়ে আমার কিঞ্চিন্মাত্রও শঙ্কা হয় না। অদ্য আপনি সংগ্রামে যুদ্ধদুৰ্ম্মদ ক্রুরকর্মা বৰ্ম্মধারী কাম্বোজগণ, ধনুর্ব্বাণধারী প্রহারনিপুণ যবনগণ এবং নানাস্ত্রধারী কিরাত, দরদ, বর্ব্বর ও তাম্রলিপ্ত প্রভৃতি ম্লেচ্ছগণকে পরাভূত করিয়াছেন, সুতরাং আমার ভয়সঞ্চারের বিষয় কি? পূর্ব্বে আমি কোন সংগ্রামেই কখন ভীত হই নাই, তবে কি নিমিত্ত আজি এই ক্ষুদ্র যুদ্ধে আমার ভয়ের উদয় হইবে? যাহা হউক, এক্ষণে আজ্ঞা করুন, আপনাকে কোন্ পথ দিয়া ধনঞ্জয়ের সমীপে সমানীত করিব? হে আয়ুষ্মন্! আপনি কাহাদের উপর ক্রুদ্ধ হইয়াছেন? কাহাদের মৃত্যু উপস্থিত হইয়াছে? কাহারা শমনভবনে গমন করিতে বাসনা করিয়াছে? কাহারা আপনাকে কালান্তক যমের ন্যায় অবলোকন করিয়া পলায়ন করিবে? যমরাজ কাহাদিগকে স্মরণ করিয়াছেন? আজ্ঞা করুন, তাঁহাদের অভিমুখে রথ চালন করি।
সাত্যকি কহিলেন, হে সূত! তুমি শীঘ্র রথ চালন কর। বাসব যেরূপ দানবদিগকে সংহার করিয়াছেন, সেইরূপ অদ্য আমি এই মুণ্ডিতমুণ্ড কাম্বোজগণকে বিনাশপূর্ব্বক প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করিয়া একান্তপ্রিয় অর্জুনের সহিত সাক্ষাৎ করিব। অদ্য দুর্য্যোধনাদি কৌরবগণ এই সমুদায় সৈন্যকে নিহত দেখিয়া সমরে আমার পরাক্রম অনুভব করিবেন। অদ্য শরবিক্ষত কৌরবসেনার করুণ বিলাপ শ্রবণ করিয়া দুর্য্যোধনকে অবশ্যই অনুতাপিত হইতে হইবে। অদ্য আমি পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ শ্বেতাশ্ব মহাত্মা অর্জুনকে তদুপদিষ্ট পথ প্রদর্শন করিব। অদ্য রাজা দুর্য্যোধন সহস্র সহস্র বীর পুরুষকে আমার বাণে বিগতাসু অবলোকন করিয়া অবশ্যই অনুতাপিত হইবেন। অদ্য কৌরবগণ আমার বাণবর্ষণে লঘুহস্ততা ও শরাসনের অলাতচক্রসদৃশ আকার দর্শন করিবেন। অদ্য দুর্য্যোধন আমার বাণবিদ্ধ রুধিরস্রাবী সৈনিক-গণের বিনাশদর্শনে বিষণ্ণ হইয়া সমরে আমার ভয়ঙ্কর রূপ দর্শনপূর্ব্বক অবশ্যই মনে করিবেন যে, দ্বিতীয় অর্জুন অবনীতে অবতীর্ণ হইয়াছেন। অদ্য আমি কৌরবপক্ষীয় সহস্র সহস্র নৃপের প্রাণ সংহার করিয়া দুর্য্যোধনকে অনুতাপিত এবং পাণ্ডবগণের প্রতি ভক্তি ও স্নেহের নিদর্শন প্রদর্শিত করিব। অন্য কৌরবগণ আমার বলবীর্য্য ও কৃতজ্ঞতা সবিশেষ জ্ঞাত হইবেন।
হে মহারাজ! সাত্যকির সারথি তাঁহার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া শশাঙ্কসদৃশ শ্বেতবর্ণ সাধুবাহী শিক্ষিত অশ্বগণকে চালন করিতে লাগিল। অশ্বগণ আকাশ পান করিবার নিমিত্তই যেন, বায়ুবেগে ধাবমান হইল। তখন যুযুধান অবিলম্বেই যবনগণের সমীপে উপস্থিত হইলেন। তাহারা অনেকে মিলিত হইয়া লঘুহস্ততা প্রদর্শনপূর্ব্বক সেনাগ্রবর্তী সাত্যকির উপর অসংখ্য সায়ক নিক্ষেপ করিতে লাগিল। শৈনেয় নতপর্ব্ব বাণদ্বারা অর্দ্ধপথে সেই শত্রুপক্ষীয় শরজাল ছেদনপূর্ব্বক সুবর্ণপুঙ্খ অজিম্মাগ নিশিত শরনিকরে যবনগণের ভুজ ও মস্তকসমুদায় ছেদন করিলেন। সাত্যকির শরনিকর তাহাদের লৌহময় ও কাংস্যময় বৰ্ম্ম এবং দেহ ভেদ করিয়া পাতালতলে প্রবিষ্ট হইল। এইরূপে শত শত যবন সাত্যকির শরাঘাতে গতাসু হইয়া বসুধাতলে পতিত হইতে লাগিল। তিনি শরাশন আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক শরবর্ষণ করিয়া এক এক বারে পাঁচ, ছয়, সাত বা আট জন যবনকে ভেদ করিতে আরম্ভ করিলেন। সহস্র সহস্র কাম্বোজ, শক, শবর, কিরাত ও বর্ব্বর সাত্যকির শরে জীবন পরিত্যাগপূর্ব্বক ধরাশয্যা গ্রহণ করিলে সমরস্থল তাহাদিগের মাংস ও শোণিতে কদমময় হইয়া গেল। দস্যুগণের ছিন্নকেশ ও দীর্ঘশ্মশ্রুসম্পন্ন, বিবর্হ' বিহঙ্গমসদৃশ মস্তকসমুদায়ে রণস্থল পরিব্যাপ্ত হইল। রুধিরাভিষিক্ত সর্ব্বাঙ্গ অসংখ্য কবন্ধ উত্থিত হওয়াতে সমরক্ষেত্র শোণ-মেঘসমাচ্ছন্ন নভোমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। এইরূপে সেই মহাবীরগণ সাত্যকির অশনিসমস্পর্শ সুপর্ব্ব অজিহ্মগামী শরনিকরে নিহত ও নিপতিত হইয়া বসুন্ধরা সমাবৃত করিল। হতাবশিষ্ট বৰ্ম্মধারী যোধগণ সম্ভগ্ন ও বিচেতনপ্রায় হইয়া অশ্বপৃষ্ঠে পার্ফি ও কশাঘাত করত শঙ্কিতচিত্তে মহাবেগে পলায়ন করিতে লাগিল। হে মহারাজ। এইরূপে পুরুষব্যাঘ্র সত্যবিক্রম সাত্যকি দুর্জয় কাম্বোজ, শক ও যবনগণকে বিদ্রাবণপূর্ব্বক বিজয় লাভ করিয়া সারথিকে রথ চালনের অনুমতি করিলেন। তখন সংগ্রাম-দর্শনার্থী গন্ধর্ব্ব ও চারণগণ সেই অর্জুনের পৃষ্ঠরক্ষার্থ গমনোর্দ্যত যুযুধানের অলৌকিক কার্য্য ও অদ্ভুত পরাক্রম অবলোকন করিয়া ভূরি ভূরি ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয়েরাও বারংবার তাঁহার কার্য্যের প্রশংসা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে মহারথ যুযুধান যুদ্ধে যবন ও কাম্বোজদিগকে পরাজিত করিয়া কৌরবসৈন্য অতিক্রম করত অর্জুনের নিকটে গমন করিতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয় সেনাগণ মৃগঘাতী শার্দুলসদৃশ বিচিত্র কবচ-ধ্বজ-শোভিত নরশ্রেষ্ঠ বৃষ্ণিবীরকে দর্শন করিয়া নিতান্ত ভীত হইল। সুবর্ণাঙ্গদ, সুবর্ণশিরস্ত্রাণ ও সুবর্ণধ্বজে সুশোভিত মহাবীর সাত্যকি রথোপরি সুবর্ণ শরাসন-সঞ্চালিত করত মেরুশৃঙ্গের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তাঁহার ধনুর্মণ্ডল' শরৎকালীন উদিত সূর্য্যমণ্ডলের ন্যায় বিরাজমান হইল। মত্ত দ্বিরদগামী বৃষভস্কন্ধ বৃষভাক্ষ নরর্ষভ সাত্যকি গোগণমধ্যস্থ বৃষের ন্যায়, যূথমধ্যস্থ প্রভিন্ন মাতঙ্গের ন্যায় কৌরবপক্ষীয় সেনাগণমধ্যে শোভা পাইতে লাগিলেন।
এইরূপে মহাবীর সাত্যকি দ্রোণাচার্য্য, ভোেজভূপতি, জলসন্ধ ও কাম্বোজগণের দুস্তর সৈন্য এবং মহাবীর হার্দিক্যকে অতিক্রমপূর্ব্বক দুস্তর কৌরবসৈন্যসাগর উত্তীর্ণ হইলে দুর্য্যোধন, চিত্রসেন, দুঃশাসন, বিবিংশতি, শকুনি, দুঃসহ, দুৰ্ম্মর্ষণ ও ক্রথ প্রভৃতি কৌরবপক্ষীয় অসংখ্য বীরগণ বহুবিধ অস্ত্র-শস্ত্র ধারণ-পূর্ব্বক রোষকষায়িতলোচনে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। অনন্তর পর্ব্বকালীন পবনোদ্ভূত অর্ণবের ন্যায় কৌরব-সেনার ভীষণ শব্দ শ্রুতিগোচর হইতে লাগিল। শিনিপুঙ্গব সাত্যকি সেই বীরগণকে মহাবেগে আগমন করিতে দেখিয়া সারথিকে মন্দবেগে অশ্বসঞ্চালনের অনুমতি প্রদানপূর্ব্বক হাস্যমুখে কহিলেন, হে সূত। ঐ দেখ, দুর্য্যোধনের চতুরঙ্গিণী সেনা রথঘোষে দশদিক্ প্রতিধ্বনিত এবং সাগরসমবেত সমুদায় ভূমণ্ডল ও আকাশমণ্ডল কম্পিত করত আমার অভিমুখে আগমন করিতেছে। বেলা যেমন পূর্ণিমাতেও সংক্ষুব্ধ সাগরের মহাবেগ নিবারণ করে, আমিও তদ্রূপ এই সৈন্যসাগর নিবারিত করিব। আমার ইন্দ্রতুল্য পরাক্রম অবলোকন কর; আমি এক্ষণে নিশিত শরনিকরে শত্রুসৈন্য বিদারণপূর্ব্বক তোমাকে স্বীয় ইন্দ্রতুল্য পরাক্রম প্রদর্শন করিতেছি। তুমি অবিলম্বেই এই চতুরঙ্গিণী সেনাগণকে আমার হুতাশনকল্প শরজালে নিহত অবলোকন করিবে। মহাবীর সাত্যকি সারথিকে এই কথা বলিতেছেন, এমন সময়ে যুযুৎসুর সৈনিক পুরুষেরা ধাবিত হও, জয় লাভ কর, অবস্থানপূর্ব্বক অবলোকন কর, ইত্যাকার নানা প্রকার শব্দ করিতে করিতে তেজস্বী সাত্যকির সম্মুখে সমাগত হইল। তখন বৃষ্ণিবীর শাণিত শরজালে বিপক্ষ পক্ষীয় অসংখ্য বীরগণ, ত্রিশত অশ্ব ও চারিশত কুঞ্জরকে আহত করিলেন। এইরূপে সাত্যকির সহিত কৌরবগণের ঘোরতর তুমুল সংগ্রাম উপস্থিত হইলে বোধ হইল যেন, দেবাসুর-যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছে। মহাবীর সাত্যকি সেই মেঘজালসদৃশ দুর্য্যোধন-সৈন্যগণকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া অনলস্পর্শ শরজালে অনেকের প্রাণ সংহার করিলেন। ঐ সময় সাত্যকির এক বাণও ব্যর্থ হইল না; তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল।
এইরূপে মহাবীর সাত্যকি বেলাস্বরূপ হইয়া সেই অসংখ্য রথনাগাশ্বসঙ্কুল, পদাতিরূপ তরঙ্গে সমাকীর্ণ, কৌরবসৈন্যরূপ মহাসাগর নিবারণ করিলেন। রঙ্গিণী কৌরবসেনা সাত্যকির শরনিকরে ব্যথিত ও ভীত হইয়া শীতাদ্দিত গোসমূহের ন্যায় ভ্রমণ করিতে লাগিল। তৎকালে মহাবীর সাত্যকির শরে বিদ্ধ হয় নাই, এমন পদাতি, রথ, হস্তী, অশ্ব বা অশ্বারোহী নয়নগোচর হইল না। নির্ভয়চিত্ত সাত্যকি হস্তলাঘব ও অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শনপূর্ব্বক যেরূপ সৈন্য সংহার করিলেন, মহাবীর ধনঞ্জয়ও সেরূপ যুদ্ধ করিতে সমর্থ হন নাই।
অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন প্রথমতঃ তিন ও তৎপরে আট বাণে সাত্যকিকে বিদ্ধ করিয়া তিন শরে তাঁহার সারথি ও চারি শরে তাঁহার অশ্বচতুষ্টয়কে বিদ্ধ করিলেন। তখন দুঃশাসন ষোড়শ, শকুনি পঞ্চবিংশতি, চিত্রসেন পাঁচ ও দুঃসহ পঞ্চদশ বাণে তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। বৃষ্ণিশার্দুল সাত্যকি শরাহত হইয়া গর্বিতচিত্তে তিন তিন সুতীক্ষ্ণ বাণে সমুদায় বিপক্ষকে দৃঢ়তর বিদ্ধ করিয়া শ্যেন পক্ষীর ন্যায় সমরে বিচরণ করিতে লাগিলেন। তৎপরে শকুনির শরাসন ও শরমুষ্টি ছেদনপূর্ব্বক দুর্য্যোধনকে তিন, চিত্রসেনকে এক শত, দুঃসহকে দশ ও দুঃশাসনকে বিংশতি বাণে বিদ্ধ করিলেন। তখন শকুনি অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক একবার আট ও পুনর্ব্বার পাঁচ বাণ পরিত্যাগ করিয়া তাঁহাকে আহত করিলে দুঃশাসন দশ, দুঃসহ তিন ও দুর্মুখ দ্বাদশ বাণে তাঁহাকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। মহাবীর দুর্য্যোধনও ঐ সময় ত্রিসপ্ততি শরে সাত্যকিকে ও নিশিত তিন শরে তাঁহার সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। তখন রথিশ্রেষ্ঠ সাত্যকি সেই সমুদায় বীরগণকে পাঁচ পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিয়া দুর্য্যোধনের-সারথির উপর ভল্লাস্ত্র প্রয়োগ করিলেন। সারথি অস্ত্রাঘাতে পীড়িত হইয়া ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। অশ্বগণ সারথিবিহীন হইয়া মহাবেগে সমরস্থল হইতে দুর্য্যোধনকে অপনীত করিল। তখন অন্যান্য বীরগণও তাঁহার রথ লক্ষ্য করিয়া তদভিমুখে পলায়ন করিতে লাগিল। সাত্যকি তাহাদিগকে পলায়ন করিতে দেখিয়া সুবর্ণপুঙ্খ শিলানিশিত তীক্ষ্ণ শরনিকরে তাঁহাদিগকে বিদারণ করত অর্জুনের রথাভিমুখে ধাবমান হইলেন। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ তাঁহাকে লঘুহস্তে শর গ্রহণ, সারথি সংরক্ষণ ও আত্ম-রক্ষা করিতে অবলোকন করিয়া ভূয়োভূয়ঃ প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবীর সাত্যকি কৌরব-সেনা বিদারণ করিয়া অর্জুন-সমীপে গমনে প্রবৃত্ত হইলে, আমার সেই নির্লজ্জ পুত্রেরা কি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিল? সব্যসাচীসদৃশ যুযুধান সমরে উপনীত হইলে তাহারা মুমূর্ষু হইয়া কিরূপে সেই দারুণ সমরে ধৈর্য্যাবলম্বন করিল? সেই সমুদায় রণপরাজিত ক্ষত্রিয়গণই বা কি কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিলেন? আমার পুত্রেরা জীবিত থাকিতে সাত্যকি কিরূপে সমরে অগ্রসর হইল? এই সকল বিষয় আমার নিকট কীর্ত্তন কর। হে বৎস! যুযুধান একাকী বিপক্ষ পক্ষীয় অসংখ্য মহারথগণের সহিত | সংগ্রাম করিয়া তাহাদিগকে বিনষ্ট করিতেছে, তোমার মুখে এই অদ্ভুত কথা শুনিয়া স্পষ্টই বোধ হইল, আমার পুত্রদিগের প্রতি দৈব প্রতিকূল হইয়াছে। কি আশ্চর্য্য। আমার সৈন্যগণ সমুদায় পাণ্ডবগণের কথা দূরে থাকুক, একমাত্র সাত্যকি অপেক্ষাও কি হীনবল হইল? এক্ষণে স্পষ্টই বোধ হইতেছে, সাত্যকি একাকীই যুদ্ধবিশারদ কৃতী দ্রোণাচার্য্যকে পরাজিত করিয়া পশুনাশক সিংহের ন্যায় আমার পুত্রদিগকে সংহার করিবে। যখন কৃতবর্মা প্রভৃতি বীরগণ কোনক্রমেই সাত্যকিকে বিনাশ করিতে পারেন নাই, তখন নিশ্চয়ই আমার পুত্রগণকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে। যাহা হউক, মহাবীর সাত্যকি যেরূপ সংগ্রাম করিয়াছেন, মহাবল পরাক্রান্ত অর্জুনও ঈদৃশ সংগ্রাম করিতে সমর্থ হন নাই।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! কেবল আপনার কুমন্ত্রণা ও দুর্য্যোধনের দুর্বুদ্ধিই এই তুমুল জনক্ষয়ের কারণ। এক্ষণে যাহা ঘটিয়াছে, সমুদায় কহিতেছি, অবহিত হইয়া শ্রবণ করুন। সংশপ্তকগণ আপনার পুত্রের শাসনানুসারে যুদ্ধে দৃঢ়চিত্ত হইয়া পুনরায় সমাগত হইল। তিন সহস্র শক, কাম্বোজ, বাহীক, যবন, পারদ, কুলিঙ্গ, তুঙ্গণ, অন্বষ্ঠ, পিশাচ, বর্ব্বর ও পাষাণহস্ত পার্ব্বতীয়গণ এবং পঞ্চশত মহাবীর দুর্য্যোধনকে অগ্রবর্তী করিয়া পাবকপতনোন্মুখ শলভের ন্যায় সাত্যকির অভিমুখে গমন করিতে লাগিল। ঐ সময় মহারথগণ সহস্র রথ, শত মহারথ, সহস্র হস্তী ও দ্বিসহস্র অশ্ব-সমভিব্যাহারে বিবিধ শর বর্ষণপূর্ব্বক তাঁহার সম্মুখীন হইলেন। দুঃশাসন ঐ বীরগণকে সাত্যকিকে বিনাশ করিতে আদেশ করিয়া তাঁহাকে আক্রমণ করিলেন; কিন্তু কি আশ্চর্য্য! শিনিপ্রবীর মহাবীর সাত্যকি একাকী সেই বহুসংখ্যক বীরের সহিত যুদ্ধ করিয়া অসংখ্য রথ, হস্তী, হস্ত্যারোহী, অশ্বারোহী ও দস্যুদিগের প্রাণসংহার করিতে লাগিলেন। তাঁহার শরনিকর-বিমথিত চক্র, আয়ুধ, ঈষাদণ্ড, অক্ষ, কুঞ্জর, ধ্বজ, বৰ্ম্ম, চৰ্ম্ম, মাল্য, বস্ত্র, আভরণ ও রথাধঃস্থিত কাষ্ঠ ইতস্ততঃ নিপতিত হওয়াতে সংগ্রামস্থল শরৎকালীন গ্রহগণসমাবৃত নভোমণ্ডলের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। অঞ্জন, বামন, সুপ্রতীক, মহাপদ্ম ও ঐরাবত প্রভৃতি মহাগজের বংশে সম্ভূত পর্ব্বতাকার কুঞ্জরগণ সমরে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। মহাবীর সাত্যকি বাণপ্রয়োগানভিজ্ঞ অসংখ্য পার্ব্বতীয় কাম্বোজ ও বাহিকগণ নানা দেশীয় নানা জাতীয় পদাতিগণ এবং প্রধান প্রধান অশ্বগণের প্রাণসংহার করিলেন।
এইরূপে সেই সেনাগণ বিনষ্ট হইলে হতাবশিষ্ট সৈন্যগণ পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবীর দুঃশাসন তাহাদিগকে ভগ্ন দেখিয়া দস্যুগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে ধৰ্ম্মানভিজ্ঞগণ। তোমরা পলায়ন করিতেছ কেন? নিবৃত্ত হইয়া সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও। তাহারা দুঃশাসনের বাক্য শ্রবণ করিয়াও নিবৃত্ত হইল না। তখন তিনি পাষাণবর্ষী পার্ব্বতীয়গণকে যুদ্ধার্থ প্রেরণ করত কহিলেন, হে বীরগণ! তোমরা পাষাণযুদ্ধে সুনিপুণ, কিন্তু সাত্যকি ঐ যুদ্ধ অবগত নহে; অতএব তোমরা অবিলম্বে উহাকে পাষাণ দ্বারা নিহত কর। কৌরবগণ পাষাণযুদ্ধে অভিজ্ঞ নহেন, তাঁহারা ঐ যুদ্ধে পারদর্শী হইলে তোমাদের সাহায্য করিতেন; অতএব তোমরা শীঘ্র ধাবমান হও। শৈলবাসিগণ দুঃশাসনকর্তৃক এইরূপে আদিষ্ট হইয়া সেই শৈনেয়ভীত সৈন্যগণকে অভয় প্রদানপূর্ব্বক সাত্যকির অভিমুখে ধাবমান হইয়া মাতঙ্গ-মস্তকসদৃশ উপলখণ্ড গ্রহণ ও উত্তোলন করত তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল। অন্যান্য সৈন্যগণ দুঃশাসনের আদেশক্রমে সাত্যকির বিনাশকামনায় ক্ষেপণীর' দ্বারা দিক্সকল আচ্ছাদন করিল। শিনিপুঙ্গব সাত্যকি তাহাদিগকে শিলা বর্ষণ করত আগমন করিতে দেখিয়া নিশিত শর ও নাগসদৃশ নারাচাস্ত্র নিক্ষেপপূর্ব্বক তাহাদের নিক্ষিপ্ত পাষাণসমুদায় চূর্ণ করিতে লাগিলেন। প্রস্তরচূর্ণসকল খদ্যোতরাশির ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া প্রভূত সেনার প্রাণসংহার করিলে, রণক্ষেত্রে হাহাকার শব্দ হইতে লাগিল। ঐ সময় প্রথমতঃ পঞ্চশত শিলাবর্ষী বীরপুরুষ সাত্যকির শরে ছিন্নবাহু হইয়া ধরণীতলে নিপতিত হইল। তৎপরে একাধিক শত সহস্র বীর সাত্যকিকে আঘাত না করিয়াই তাঁহার শরে ছিন্নবাহু হইয়া পূর্ব্বোক্ত ব্যক্তিদিগের সহিত ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। মহাবীর সাত্যকি এইরূপে বহুসহস্র পাষাণযুদ্ধবিশারদ বীরের প্রাণসংহার করিয়া সকলকে আশ্চর্য্যান্বিত করিলেন।
তখন শূলধারী অসংখ্য দরদ, তুঙ্গণ, খশ, লম্পক ও পুলিন্দগণ মিলিত হইয়া চতুদ্দিকে শিলাবৃষ্টি করিতে আরম্ভকরিল। মহাবীর সাত্যকিও নারাচাস্ত্রে সেই প্রস্তরসকল ভেদ করিতে লাগিলেন। নিশিত-শর-নির্ভিদ্যমান পাষাণের শব্দ নভোমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হইয়া সংগ্রামস্থ রথী, অশ্ব, হস্তী ও পদাতিসকলকে ভীত ও বিদ্রাবিত করিল। মনুষ্য, অশ্ব ও গজ-সমূহ শিলাচূর্ণে সমাচ্ছন্ন হইয়া ভ্রমর-দংশিতের ন্যায় রণক্ষেত্রে অবস্থান করিতে অসমর্থ হইল। তখন হুতাবশিষ্ট রুধিরাপ্লুত ছিন্নমস্তক কুঞ্জরগণ যুযুধানের রথ পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিল। পর্ব্বসময়ে সাগরের যেরূপ শব্দ হইয়া থাকে, সাত্যকি শরাদ্দিত কৌরবসেনাগণের সেইরূপ মহাকোলাহল হইতে লাগিল।
হে মহারাজ! ঐ সময় মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সেই তুমুল শব্দ শ্রবণ করিয়া সারথিকে কহিলেন, হে সূত। সাত্বতবংশীয় মহারথ সাত্যকি কোপপূর্ণ হইয়া কৌরবসেনাগণকে বহুধা বিদারণ করত সমরক্ষেত্রে সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় বিচরণ করিতেছে। যে স্থানে ঐ তুমুল শব্দ শ্রুত হইতেছে, বোধ হয়, যুযুধান সেই স্থানে পাষাণবর্ষী যোধগণের সহিত সমাগত হইয়াছে। অতএব অবিলম্বে তথায় রথ সঞ্চালন কর। ঐ দেখ, পলায়মান অশ্বগণ শস্ত্রহীন বৰ্ম্মহীন রথিগণকে সমরক্ষেত্র হইতে অপনীত করিতেছে; সারথিরা কোনক্রমেই উহাদিগকে সংযমন করিতে সমর্থ হইতেছে না। সারথি শস্ত্রধরাগ্রগণ্য দ্রোণাচার্য্যের বাক্য শ্রবণানন্তর কহিল, আয়ুষ্মন্! ঐ দেখুন, কৌরবপক্ষীয় সেনা ও যোধগণ সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক ভয়ে চতুৰ্দ্দিকে ধাবমান হইতেছে। এদিকে বলবান্ পাঞ্চালগণ পাণ্ডবগণের সহিত মিলিত হইয়া আপনার বিনাশকামনায় আগমন করিতেছে, সাত্যকিও অতি দূরদেশে গমন করিয়াছে। অতএব এক্ষণে তাহার নিকটে গমন অথবা এই স্থানে অবস্থান এই উভয়ের যাহা কর্তব্য হয়, তাহা স্থির করুন। তাঁহাদের উভয়ের এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, এই সময়ে মহাবীর সাত্যকি সেই রথিগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। রথিগণ সমরে যুযুধানের শরে পীড়িত হইয়া তাঁহার রথ পরিত্যাগপূর্ব্বক দ্রোণসৈন্যমধ্যে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। দুঃশাসন যে সকল রথী-সমভিব্যাহারে সংগ্রামে গমন করিয়াছিলেন, তাঁহারাও শঙ্কিতচিত্তে দ্রোণাচার্য্যের রথ লক্ষ্য করিয়া ধাবমান হইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহাবীর দ্রোণাচার্য্য দুঃশাসনের রথ সম্মুখে অবস্থিত দেখিয়া তাঁহাকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, ওহে দুঃশাসন! রথীসকল কি নিমিত্ত পলায়ন করিতেছে? মহারাজের মঙ্গল ত? সিন্ধুরাজ ত জীবিত আছেন? তুমি রাজপুত্র, রাজসহোদর ও একজন মহারথ; তবে কি নিমিত্ত পলায়ন করিতেছ? সংগ্রামে জয়লাভ করিয়া যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হও। তুমি পূর্ব্বে দ্রৌপদীকে বলিয়াছিলে যে, রে দাসি! আমরা তোকে দ্যূতক্রীড়ায় পরাজয় করিয়াছি; অতএব এক্ষণে তুই স্বেচ্ছাচারিণী হইয়া আমার জ্যেষ্ঠ সহোদর রাজা দুর্য্যোধনের বস্ত্র বহন কর, তোর্ পতিগণ ষণ্ডতিলসদৃশ নিতান্ত অকর্মণ্য; তাহারা আর জীবিত নাই। হে যুবরাজ! পূর্ব্বে দ্রুপদতনয়াকে এই বলিয়া কি নিমিত্ত সমর পরিহারপূর্ব্বক পলায়ন করিতেছ? তুমিই পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণের সহিত ঘোরতর বৈর উপস্থিত করিবার মূলীভূত; কিন্তু এখন রণস্থলে একমাত্র সাত্যকিকে অবলোকন করিয়া কি জন্য ভীত হইতেছ? পূর্ব্বে দ্যূতক্রীড়া-কালে অক্ষগ্রহণ করিয়া কি জানিতে পার নাই যে, এই অক্ষই পরিণামে ভীষণ ভুজগাকার শরস্বরূপে পরিণত হইবে? তুমিই পূর্ব্বে পাণ্ডবগণের প্রতি অসংখ্য অপ্রিয় বাক্য প্রয়োগ করিয়াছিলে; তোমার নিমিত্তই দ্রুপদতনয়া যৎপরোনাস্তি ক্লেশ সহ্য করিয়াছেন। হে মহারথ! এখন তোমার সে মান কোথায়, সে দর্প কোথায় ও সেই বীর্য্যই বা কোথায়? তুমি সর্পসদৃশ পাণ্ডবগণকে রোষিত করিয়া কোথায় পলায়ন করিতেছ? তুমি দুর্য্যোধনের সাহসী সহোদর হইয়া সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করাতে কুরুরাজের এবং কৌরবপক্ষীয় সৈন্যগণের নিতান্ত শোচনীয় অবস্থা সমুপস্থিত হইল। হে বীর! আজি স্বীয় বাহুবলে এই ভয়ার্ত কৌরবসৈন্যগণকে রক্ষা করা তোমার অতীব কর্ত্তব্য। তুমি তাহা না করিয়া সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল শত্রুগণের হর্ষবর্দ্ধন করিতেছ! হে শত্রুনিসূদন! তুমি সেনাপতি হইয়া ভীতচিত্তে রণ পরিত্যাগ করিলে আর কে সমরভূমিতে অবস্থান করিতে সমর্থ হইবে? হে কৌরব! তুমি আজি একমাত্র সাত্যকির সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া পলায়নে কৃতনিশ্চয় হইয়াছ; কিন্তু গাণ্ডীবধন্বা অর্জুন, মহাবীর বৃকোদর এবং মাদ্রীতনয় নকুল ও সহদেবের সহিত রণস্থলে সাক্ষাৎ হইলে কি করিবে? সাত্যকির শরজাল, মহাবীর অর্জুনের সূর্যাগ্নিসদৃশ শরনিকরের তুল্য নহে; তুমি সেই শরজালের আঘাতেই ভীত হইয়া পলায়ন করিলে? যদি পলায়নে নিতান্তই কৃতনিশ্চয় হইয়া থাক, তাহা হইলে মহাবীর অর্জুনের নির্মোক নির্মুক্ত ভুজগাকার নারাচ তোমার শরীরমধ্যে প্রবিষ্ট না হইতে হইতে, মহাত্মা পাণ্ডবগণ তোমাদের শত ভ্রাতাকে বিনাশ করিয়া রাজ্য গ্রহণ না করিতে করিতে, ধৰ্ম্মপুত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির এবং সমরবিজয়ী কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ না হইতে হইতে এবং মহাবাহু ভীমসেন এই মহতী চমুমধ্যে অবগাহন করিয়া তোমার ভ্রাতৃগণকে শমনভবনে প্রেরণ না করিতে করিতে, তুমি পাণ্ডবগণের সহিত সন্ধিস্থাপন করিয়া ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজ্য প্রদান কর। পূর্ব্বে মহাবীর ভীষ্ম তোমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা দুর্য্যোধনকে বলিয়াছিলেন যে, রণস্থলে পাণ্ডবগণকে কখনই পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে না; এক্ষণে তাঁহাদিগের সহিত সন্ধি সংস্থাপন কর। কিন্তু মন্দমতি দুর্য্যোধন তাহা করে নাই। অতএব তুমি ধৈর্য্য অবলম্বনপূর্ব্বক যত্নশীল হইয়া পাণ্ডবদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। সাত্যকি যে স্থানে অবস্থান করিতেছে, শীঘ্র তথায় গমন কর, নচেৎ সমুদায় সৈন্য পলায়ন করিবে।
হে মহারাজ! আপনার পুত্র আচার্য্যের বাক্য শ্রবণ করিয়া কিছুমাত্র প্রত্যুত্তর প্রদান করিলেন না; দ্রোণের বচনসকল যেন তাঁহার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হয় নাই, তিনি এইরূপ ভাণ করিয়া অপ্রতিনিবৃত্ত ম্লেচ্ছগণে পরিবৃত হইয়া যে পথে সাত্যকি গমন করিয়াছিলেন, সেই পথে গমন করিলেন। তথায় যুযুধানের সহিত তাঁহার তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল। এদিকে মহারথ দ্রোণাচার্য্য রোষাবিষ্ট হইয়া বেগে পাঞ্চাল ও পাণ্ডবদিগের প্রতি ধাবমান হইলেন এবং তাঁহাদিগের সৈন্যমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক অসংখ্য যোধগণকে বিদ্রাবিত করিয়া স্বীয় নাম বিশ্রবিত করত পাণ্ডব, পাঞ্চাল ও মৎস্যগণকে বিনাশ করিতে লাগিলেন। অনন্তর দ্যুতিমান পাঞ্চালপুত্র বীরকেতু সৈন্যবিজয়ী দ্রোণাচার্য্যকে আহ্বান করত সন্নতপর্ব্ব পাঁচ শরে বিদ্ধ করিয়া এক বাণে তাঁহার ধ্বজ ও সাত বাণে তাঁহার সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য যত্নবান্ হইয়াও বীরকেতুকে নিবৃত্ত করিতে সমর্থ হইলেন না। তদ্দর্শনে আমরা সকলেই চমৎকৃত হইলাম। তখন ধর্মরাজের জয়াভিলাষী পাঞ্চালেরা সমরভূমিতে দ্রোণকে রুদ্ধ দেখিয়া সকলে চতুৰ্দ্দিক্ বেষ্টন করত তাঁহার উপর হুতাশনসদৃশ সুদৃঢ় শত শত তোমর ও বিবিধ অস্ত্র বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের এই শরজাল দ্রোণের শরনিকরে বিচ্ছিন্ন হইয়া নভোমণ্ডলে পবনচালিত জলধরের ন্যায় শোভমান হইল। তখন শত্রুহন্তা দ্রোণ, সূর্য্য ও অনলসদৃশ অতি ভীষণ শর সন্ধান করত বীরকেতুর প্রতি নিক্ষেপ করিলেন।
দ্রোণনির্মুক্ত শর বীরকেতুর দেহ বিদারণপূর্ব্বক রুধিরাক্ত হইয়া প্রজ্বলিতের ন্যায় ধরাতলে প্রবিষ্ট হইল।
পাঞ্চালনন্দন বীরকেতুও বায়ুভগ্ন চম্পকতরু যেরূপ পর্ব্বতাগ্র হইতে নিপতিত হয়, তদ্রূপ রথ হইতে নিপতিত হইলেন। এইরূপে ধনুর্দ্ধারী মহাবল পরাক্রান্ত রাজপুত্র বীরকেতু নিহত হইলে পাঞ্চালগণ সত্বরে চতুৰ্দ্দিক্ হইতে দ্রোণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় মহাবীর সুধন্বা, চিত্রকেতু, চিত্রবৰ্ম্মা ও চিত্ররথ ভ্রাতৃব্যসনে নিতান্ত ক্লিষ্ট হইয়া দ্রোণের সহিত যুদ্ধ করিবার মানসে বর্ষাকালীন বারিধারাবর্ষী জলধরের ন্যায় শরবর্ষণ করত ধাবমান হইলেন। দ্বিজশ্রেষ্ঠ দ্রোণ সেই মহারথ রাজপুত্রগণের শরে বিদ্ধ হইয়া তাঁহাদিগের নিধন-বাসনায় কোপকম্পিত-কলেবরে তাঁহাদিগের উপর শরজাল বিস্তার করিলেন। পাঞ্চাল রাজকুমারেরা দ্রোণের আকর্ণাকৃষ্টশরাসন-বিমুক্ত শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া ইতিকর্ত্তব্যতাবিমূঢ় হইলেন। মহাযশস্বী আচার্য্য তাঁহাদিগকে মুগ্ধ দেখিয়া ঈষৎ হাস্য করত তাঁহাদের অশ্ব, রথ ও সারথিকে সংহার করিয়া ভল্ল ও নিশিত শরনিপাতে তাঁহাদিগের মস্তক ছেদন করিলেন। কুমারগণ এইরূপে দ্রোণশরে বিগতাসু হইয়া দেবাসুরসংগ্রামস্থ দানবগণের ন্যায় রথ হইতে ক্ষিতিতলে নিপতিত হইলেন। হে মহারাজ! প্রতাপশালী দ্রোণাচার্য্য তাঁহাদিগকে নিহত করিয়া দুরাসদ হেমপৃষ্ঠ কার্ম্মুক বিঘূর্ণন করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন দেবকল্প মহারথ পাঞ্চালগণকে নিহত দেখিয়া অশ্রুমোচন করত ক্রোধভরে ভারদ্বাজের অভিমুখে আগমনপূর্ব্বক তাঁহার উপর সুতীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিলেন। দ্রোণাচার্য্য ধৃষ্টদ্যুম্নের শরে সমাচ্ছাদিত হইলে সংগ্রামস্থলে সহসা হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল। কিন্তু মহাবীর দ্রোণ সেই শরজালে কিছুমাত্র ব্যথিত না হইয়া হাস্য করত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন ক্রোধান্ধ হইয়া তাঁহার বক্ষঃস্থলে নতপর্ব্ব নবতি বাণ নিক্ষেপ করিলেন। | মহাযশস্বী ভারদ্বাজ সেই শরনিকরে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া রথোপরি মূর্ছিত হইলেন। মহাবল পরাক্রান্ত মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণকে তদবস্থ দেখিয়া ক্রোধারুণলোচনে শরাসন পরিত্যাগ-পূর্ব্বক তরবারি ধারণ করিয়া তাঁহার শিরশ্ছেদনবাসনায় সত্বর স্বীয় রথ হইতে লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক তাঁহার রথে আরোহণ করিলেন। মহাবীর দ্রোণ ঐ সময় সংজ্ঞা লাভপূর্ব্বক জিঘাংসু ধৃষ্টদ্যুম্নকে সমীপবর্ত্তী দেখিয়া পুনর্ব্বার ধনুগ্রহণ করত আসন্ন যুদ্ধোপযোগী বিতস্তিপ্রমাণ শর দ্বারা তাঁহাকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁহার বাণে বিদ্ধ হইয়া সত্বর লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক স্বীয়রথে আরোহণ ও নিপুণ কোদণ্ড গ্রহণ করিয়া দ্রোণকে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। ভারদ্বাজও তাঁহাকে প্রহার করিতে লাগিলেন। এইরূপে ত্রৈলোক্যাভিলাষী ইন্দ্র ও প্রহ্লাদের ন্যায় সেই মহাবীরদ্বয়ের ঘোরতর যুদ্ধ উপস্থিত হইল। সেই রণপণ্ডিত মহাবীরদ্বয় বিচিত্র মণ্ডল ও যমক প্রভৃতি বিবিধ গতি প্রদর্শনপূর্ব্বক ইতস্ততঃ বিচরণ করত সায়কনিকরে পরস্পরকে ক্ষত-বিক্ষত করিতে লাগিলেন। পরে যোধগণকে মোহিত করিয়া বর্ষাকালীন জলধর-নির্মুক্ত বারিধারার ন্যায় শরসমুদায় বর্ষণপূর্ব্বক একেবারে ভূমণ্ডল, দিঘণ্ডল ও আকাশমণ্ডল সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। অত্রত্য সমুদায় ক্ষত্রিয় ও সৈনিক পুরুষেরা সেই অদ্ভুত যুদ্ধের প্রশংসাবাদ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় পাঞ্চালগণ, যখন দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তখন "উনি অবশ্যই আজি আমাদিগের বশবর্তী হইবেন" এই বলিয়া চীৎকার করিতে আরম্ভ করিলেন। অনন্তর মহাবীর দ্রোণ সত্বর বৃক্ষের পরিপক্ক ফলের ন্যায় ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথির মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ধৃষ্টদ্যুম্নের অশ্বগণ সারথিবিহীন হইয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইতে লাগিল। তখন মহাবীর দ্রোণ পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণকে বিদ্রাবিত করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে অরাতিনিপাতন প্রবলপ্রতাপ ভারদ্বাজ পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণকে পরাজিত করিয়া পুনর্ব্বার স্বীয় ব্যূহমধ্যে অবস্থান করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবেরা কেহই তাঁহাকে পরাজিত করিতে সমর্থ হইলেন না।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। এদিকে দুঃশাসন বারি-ধারাবর্ষী পর্জন্যের ন্যায় অসংখ্য শরবর্ষণ করত শৈনেয়ের প্রতি ধাবমান হইয়া তাঁহাকে প্রথমতঃ ষষ্টি ও তৎপরে ষোড়শ শরে সমাহত করিলেন। মহাবীর সাত্যকি তাঁহার শরে কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া মৈনাক পর্ব্বতের ন্যায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন ভরতশ্রেষ্ঠ দুঃশাসন নানা দেশীয় মহারথগণের সহিত সমবেত হইয়া অসংখ্য সায়ক বর্ষণ করত মেঘ নিস্বনসদৃশ গভীর গর্জনে দশদিক্ প্রতিধ্বনিত করিয়া সাত্যকিকে আক্রমণ করিলেন। মহাবাহু সাত্যকি তদ্দর্শনে ক্রোধভরে ধাবমান হইয়া শরসন্নিপাতে তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। দুঃশাসনের অগ্রসর অন্যান্য বীরগণ সাত্যকির শরে সমাচ্ছন্ন হইয়া ভীতচিত্তে আপনার পুত্রের সমক্ষেই পলায়ন করিল। তৎকালে একমাত্র দুঃশাসন নির্ভীক মনে রণস্থলে অবস্থানপূর্ব্বক সাত্যকিকে শরনিপীড়িত করত তাঁহার অশ্বগণের উপর চারি ও সারথির উপর তিন বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক শত শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। অরাতি-নিপাতন সাত্যকি ক্রোধজুলিত হইয়া শরসন্নিপাতে দুঃশাসনের রথ, সারথি ও ধ্বজ অদৃশ্য করিয়া ফেলিলেন এবং ঊর্ণনাভযেমন সমাগত মশককে স্বীয় জালে জড়িত করে, তদ্রূপ তিনি দুঃশাসনকে শরজালে জড়িত করিলেন।
হে মহারাজ। ঐ সময় রাজা দুর্য্যোধন দুঃশাসনকে বাণ-সমাচ্ছন্ন দেখিয়া যুদ্ধবিশারদ ত্রিসহস্র ক্রুরকর্মা ত্রিগর্বকে যুযুধানের সহিত যুদ্ধার্থ প্রেরণ করিলেন। তাহারা দুর্য্যোধনের আদেশক্রমে তথায় গমনপূর্ব্বক দৃঢ়তর অধ্যবসায়সহকারে অপরাজুখ হইয়া অসংখ্য শরদ্বারা যুযুধানকে অবরোধ করিতে লাগিল। তখন শিনিপুঙ্গব সাত্যকি সেই শরবর্ষী ত্রিগর্তগণের প্রধানতম পাঁচশত যোদ্ধাকে নিহত করিলেন। তাহারা মারুতবেগবিধ্বস্ত বিপুল বনস্পতিসমুদায়ের ন্যায় ধরাতলে নিপতিত হইল। শৈনেয়ের শরে নিবৃত্ত, শোণিতলিপ্ত অসংখ্য হস্তী, ধ্বজ ও কনকাভরণভূষিত অশ্বসকল নিপতিত হওয়াতে সমরভূমি বিকশিত কিংশুক সমাচ্ছন্নের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। কৌরবপক্ষীয় যোধগণ সাত্যকির শরে বিদ্ধ হইয়া পঙ্কনিমগ্ন মাতঙ্গের ন্যায় কাহারও সহায়তা লাভে সমর্থ হইল না। ভীষণ ভুজঙ্গমগণ যেরূপ গরুড়ের ভয়ে গর্ভমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ সেই কৌরবসৈন্যগণ সকলেই ভীত হইয়া দ্রোণের নিকট পলায়ন করিল। এইরূপে মহাবীর সাত্যকি আশীবিষ-সদৃশ তীক্ষ্ণ শরনিকরে পাঁচ শত যোদ্ধাকে নিপাতিত করিয়া মন্দবেগে ধনঞ্জয়ের নিকট গমন করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে আপনার পুত্র দুঃশাসন তাঁহার উপর সত্বর সন্নতপর্ব্ব নয় বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মহাধনুর্দ্ধর সাত্যকিও তাঁহাকে রুক্সপুঙ্খ নিশিত পাঁচ শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর দুঃশাসন সাত্যকিকে প্রথমতঃ তিন ও তৎপরে পাঁচ শরে আঘাত করিয়া হাস্য করিতে লাগিলেন। মহাবীর শৈনেয় তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার উপর পাঁচ শর নিক্ষেপ ও তাঁহার শরাসন ছেদন করিয়া হাসিতে হাসিতে ধনঞ্জয়ের নিকট ধাবমান হইলেন। মহাবীর দুঃশাসন তাঁহাকে গমন করিতে দেখিয়া রোষাবিষ্ট চিত্তে তাঁহার নিধনবাসনায় লৌহময় শক্তি নিক্ষেপ করিলে বীরবর সাত্যকি তৎক্ষণাৎ কঙ্কপত্র-ভূষিত নিশিত বাণদ্বারা দুঃশাসনের সেই শক্তি ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর দুঃশাসন অন্য এক শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক সাত্যকিকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। মহাবীর সাত্যকি তাঁহার সিংহনাদ শ্রবণে একান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তাঁহার বক্ষঃস্থলে অগ্নিশিখাকার শরসমুদায় নিক্ষেপ করত পুনরায় তাঁহাকে সুতীক্ষ্ণ আট বাণে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর দুঃশাসন বিংশতি সায়কে সাত্যকিকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন পরমাস্ত্রবিৎ মহারথ সাত্যকি দুঃশাসনের বক্ষঃস্থলে সন্নতপর্ব্ব তিন শর নিক্ষেপ করিয়া শাণিত শরসন্নিপাতে তাঁহার ঘোটক ও সারথিকে বিনষ্ট করিলেন এবং এক ভল্লে তাঁহার ধনুঃ, পাঁচ ভল্লে শরমুষ্টি, দুই ভল্লে ধ্বজ ও রথশক্তি ছেদন করিয়া অন্যান্য তীক্ষ্ণ বাণে তাঁহার পৃষ্ঠপোষকদ্বয়কে বিনাশ করিয়া ফেলিলেন। ত্রিগর্ব-সেনাধিপতি দুঃশাসনকে ছিন্নশরাসন, বিরথ, হতাশ্ব ও হতসারথি অবলোকনপূর্ব্বক সত্বর স্বরথে আরোপিত করিয়া রণস্থল হইতে অপসারিত করিতে লাগিলেন। মহাবীর সাত্যকি দুঃশাসন-বিনাশার্থ কিয়ৎক্ষণ তাঁহার অনুধাবন করিলেন, কিন্তু মহাবাহু ভীমসেন সভামধ্যে সর্ব্বসমক্ষে আপনার পুত্রগণকে বিনাশ করিতে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন স্মরণ করিয়া আর তাঁহাকে প্রহার করিলেন না। হে মহারাজ! এইরূপে সত্যপরাক্রম সাত্যকি দুঃশাসনকে পরাজিত করিয়া যে পথে মহাবীর অর্জুন গমন করিয়াছেন, সেই পথে গমন করিতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! আমার সেনামধ্যে কি এমন কোন মহারথ ছিল না, যে সেই অর্জুন-সমীপগামী কৌরবসৈন্য-সংহর্তা সাত্যকিকে প্রহার বা নিবারণ করে? ইন্দ্রতুল্য-পরাক্রম সত্যবিক্রম সাত্যকি, দানবনিপাতন মহেন্দ্রের ন্যায় একাকী সমরস্থলে কিরূপে সেই মহৎ কার্য্য সম্পাদন করিল? অথবা সাত্যকি বহুল সেনা মৰ্দ্দনপূর্ব্বক পথ শূন্য করিয়া গমন করিয়াছিল, তাহাকে আক্রমণ করে এমন কেহই ছিল না। যাহা হউক, সাত্যকি একাকী কিরূপে সেই সংগ্রামে প্রবৃত্ত মহাত্ম-গণকে অতিক্রম করিয়া গমন করিল, তাহা কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আপনার সৈন্যমধ্যে অসংখ্য রথ, নাগ, অশ্ব ও পদাতি বর্তমান ছিল। তাহাদের বিক্রম দর্শন ও কোলাহল শ্রবণে বোধ হইতে লাগিল যেন, যুগান্তকাল সমুপস্থিত হইয়াছে। প্রতিদিন আপনার সৈন্যগণের যেরূপ ব্যূহ হইত, বোধ হয়, সেরূপ ব্যূহ জগতীতলে আর কোথাও হয় নাই। সমরদর্শনার্থ সমাগত দেবগণ ও চারণগণ সেই সমুদায় ব্যূহ দর্শনে চমৎকৃত হইয়া কহিয়াছেন যে, এতাদৃশ ব্যূহ আর কখনই হইবে না। বিশেষতঃ জয়দ্রথবধ সময়ে যেরূপ ব্যূহ রচনা করিয়াছিলেন, তাদৃশ ব্যূহ আর কখনই দৃষ্টিগোচর হয় নাই। ঐ ব্যূহমধ্যে পরস্পর ধাবমান সৈন্যসমুদায়ের প্রচণ্ড বাতাহত সমুদ্রনিস্বনের ন্যায় শব্দ সমুত্থিত হইতে লাগিল। হে নরোত্তম! আপনার ও পাণ্ডবদিগের বলমধ্যে অসংখ্য ভূপালগণ সমবেত হইয়াছিলেন, তাঁহারা ক্রোধান্বিতচিত্তে মহানাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন, নকুল, সহদেব ও ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির-ইঁহারা সকলেই সৈন্যগণকে কহিতে লাগিলেন, হে বীরগণ! তোমরা শীঘ্র আগমন কর, প্রহার কর, ধাবমান হও। মহাবীর অর্জুন ও সাত্যকি অরিসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন; এক্ষণে যাহাতে তাঁহারা শীঘ্র | অনায়াসে জয়দ্রথের রথের প্রতি গমন করিতে পারেন, তাহার চেষ্টা কর। আজি ধনঞ্জয় ও সাত্যকি নিধন প্রাপ্ত হইলে কৌরবেরা কৃতার্থ হইবে এবং আমরা পরাজিত হইব। অতএব তোমরা সত্বর মিলিত হইয়া বেগবান পবন যেরূপ সমুদ্রকে বিক্ষোভিত করে, সেইরূপ কৌরবসৈন্যগণকে বিক্ষোভিত কর। মহাতেজাঃ সৈন্যসকল এইরূপে অভিহিত হইয়া প্রাণপণে কৌরবগণকে আঘাত করিতে লাগিল। সুহৃদের হিতসাধনার্থ অস্ত্রে নিহত হইয়া স্বর্গে গমন করিতে তাহাদের কিছুমাত্র শঙ্কা হইল না। কৌরবপক্ষীয় যোদ্ধারাও যশঃপ্রার্থনা করত যুদ্ধার্থ অবস্থান করিল।
হে মহারাজ! সেই ভয়াবহ তুমুল সংগ্রামে মহাবীর সাত্যকি সমস্ত সৈন্য পরাজিত করিয়া অর্জুনের নিকট গমন করিলেন। চতুর্দিকে বিচিত্র প্রভাবসম্পন্ন কবচসমুদায়ে দিবাকর-কর প্রতিফলিত হওয়াতে সৈনিকগণের দৃষ্টি প্রতিহত হইল। ঐ সময় মহাবীর দুর্য্যোধন বহুযত্নশালী পাণ্ডবগণের সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। তথায় তাঁহাদের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! মহাবীর দুর্য্যোধন সেই অসংখ্য সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট ও বিপদ্গ্রস্ত হইয়া তোরণ পরিত্যাগ-পূর্ব্বক পলায়ন করেন নাই? একে অনেকের সহিত যুদ্ধ, তাহাতে আবার তিনি নরপতি, বিশেষতঃ চিরকাল অতিশয় সুখে সংবর্দ্ধিত হইয়াছেন; অতএব বোধ হয় তাঁহার বিষম সঙ্কট উপস্থিত হইয়াছিল।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! আপনার পুত্র একাকী অনেকের সহিত অতি আশ্চর্য্য সংগ্রাম করিয়াছিলেন, শ্রবণ করুন। মত্ত মাতঙ্গ যেমন নলিনীকুলকে আলোড়িত করে, তদ্রূপ মহাবীর দুর্য্যোধন পাণ্ডবসৈন্যকে মর্দিত করিতে লাগিলেন। মহাবল ভীমসেন ও পাঞ্চালগণ সেনাগণকে নিহত দেখিয়া সকলেই রণস্থলে ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর দুর্য্যোধন ভীমসেনকে দশ, নকুল ও সহদেবকে তিন তিন, ধৰ্ম্মরাজকে সাত, বিরাট ও দ্রুপদকে ছয়, শিখণ্ডীকে শত, ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিংশতি এবং দ্রুপদপুত্রদিগকে তিন তিন শরে বিদ্ধ করিয়া অসংখ্য হস্ত্যারোহী ও রথারোহী যোদ্ধাকে তীক্ষ্ণ শরাঘাতে প্রজান্তক' অন্তকের ন্যায় সংহার করিয়া ফেলিলেন। তিনি কখন শর সন্ধান, আর কখনই বা শর মোক্ষণ করিতে লাগিলেন, তাহা কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না। কেবল এইমাত্র দৃষ্ট হইল যে, তিনি শিক্ষা ও অস্ত্রবলে রিপুগণকে বিনাশ ও মণ্ডলীকৃত-কার্ম্মুক হইয়া অবস্থান করিতেছেন। অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির দুই ভল্লাস্ত্রে দুর্য্যোধনের দুই বৃহৎ কোদণ্ড ছেদনপূর্ব্বক তাঁহার উপর দশ বাণ নিক্ষেপ করিলেন। শরসমুদায় দুর্য্যোধনের বর্ম্মস্পর্শমাত্র ভগ্ন ও ধরাতলে নিপতিত হইল। তখন পাণ্ডবগণ, দেবগণ বৃত্রবধকালে ইন্দ্রকে যেরূপ বেষ্টন করিয়াছিলেন, তদ্রূপ যুধিষ্ঠিরকে বেষ্টন করিলেন। অনন্তর প্রবলপ্রতাপ দুর্য্যোধন অন্য এক শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক “থাক্ থাক্” বলিয়া পাণ্ডব-রাজের প্রতি ধাবমান হইলেন। জয়াভিলাষী পাঞ্চালেরা দুর্য্যোধনকে আগমন করিতে দেখিয়া হৃষ্ট মনে তাঁহার প্রত্যুদ-গমন করিলেন। সেই সময়ে দ্রোণ দুর্য্যোধনের রক্ষার্থ যেরূপ পৰ্ব্বত প্রচণ্ড বায়ুবেগে সঞ্চালিত মেঘাবলীকে নিবারণ করে, তদ্রূপ পাঞ্চালগণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। মহারাজ! সেই সময় কৌরব ও পাণ্ডবদিগের অতি ভীষণ লোমহর্ষণ সংগ্রাম উপস্থিত হইল। মৃতদেহে সমরভূমি শ্মশানসদৃশ হইয়া উঠিল। ঐ সময় মহাবীর ধনঞ্জয় যে দিকে অবস্থান করিতে-ছিলেন, সেই দিকে লোমহর্ষণ মহান্ শব্দ সমুত্থিত হইল। হে মহারাজ! এইরূপে মহাবাহু অর্জুন ও সাত্যকি কৌরবপক্ষীয় সৈন্যের সহিত এবং ব্যূহদ্বারস্থিত দ্রোণাচার্য্য পাণ্ডবসৈন্যগণের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে তাঁহাদের ক্রোধনিবন্ধন ঘোরতর জনসংক্ষয় সমুপস্থিত হইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর অপরাহুসময়ে পুনরায় সোমকদিগের সহিত দ্রোণাচার্য্যের তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল। আপনার প্রিয়চিকীর্ষু মহাধনুর্দ্ধর বীরবরাগ্রগণ্য দ্রোণ শোনাশ্বসংযুক্ত রথে আরোহণপূর্ব্বক অনতিবেগে পাণ্ডবদিগের অভিমুখে ধাবমান হইয়া বিচিত্র পুঙ্খশাণিত শরনিকরে প্রধান প্রধান যোদ্ধাদিগকে বিদ্ধ করত স্বচ্ছন্দে রণস্থলে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তখন কেকয়দেশীয় পঞ্চ ভ্রাতার সর্ব্বজ্যেষ্ঠ সমর-দুৰ্ম্মদ মহারথ বৃহৎক্ষত্র মহামেঘ যেমন গন্ধমাদনে বারি বর্ষণ করে, তদ্রূপ আচার্য্যের উপর তীক্ষ্ণ বিশিখ বর্ষণ করত তাঁহাকে নিপীড়িত করিলেন। আচার্য্য তাঁহার শরাঘাতে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তাঁহার উপর ক্রুদ্ধ আশীবিষসদৃশ শাণিত সুবর্ণপুঙ্খ পঞ্চদশ শর নিক্ষেপ করিলে মহাবীর বৃহৎক্ষত্র সেই দ্রোণনির্মুক্ত বাণসমুদায়ের প্রত্যেককে পাঁচ পাঁচ বাণে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। দ্বিজপুঙ্গব দ্রোণ তাঁহার হস্তলাঘব দর্শন করিয়া হাস্য করত পুনর্ব্বার সন্নতপর্ব্ব আট শর নিক্ষেপ করিলেন। বৃহৎক্ষত্র দ্রোণপরিত্যক্ত শরসমুদায় সমাগত দেখিয়া নিশিত শর নিক্ষেপপূর্ব্বক বিনষ্ট করিয়া ফেলিলেন। কৌরবপক্ষীয় সৈন্যেরা বৃহৎক্ষত্রের সেই দুষ্কর কার্য্য অবলোকন করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট হইল। তখন আচার্য্য বৃহৎক্ষত্রকে প্রশংসা করত তাঁহার প্রতি 'অতি দুর্দ্ধর্ষ দিব্য ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করিলেন। মহাবীর বৃহৎক্ষত্র স্বীয় ব্রহ্মাস্ত্রদ্বারা তৎক্ষণাৎ দ্রোণের ব্রহ্মাস্ত্র ছেদনপূর্ব্বক যষ্টিসংখ্যক সুবর্ণপুঙ্খ শাণিত শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন পুরুষশ্রেষ্ঠ আচার্য্য বৃহৎক্ষত্রের উপরে নিশিত নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। নারাচ বৃহৎক্ষত্রের দেহাভরণ ও গাত্র ভেদ করিয়া কৃষ্ণসর্প যেরূপ বিলমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ ধরাতলে প্রবিষ্ট হইল। মহাবীর কৈকেয় দ্রোণসায়কে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া ক্রোধে নয়ন বিঘূর্ণন-পূর্ব্বক স্বর্ণপুঙ্খ শাণিত সপ্ততি শরে আচার্য্যকে বিদ্ধ করত এক বাণে তাঁহার সারথিকে নিতান্ত নিপীড়িত করিলেন। মহাবীর দ্রোণ বৃহৎক্ষত্রের শরে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া তীক্ষ্ণ বিশিখ প্রয়োগ করত তাঁহাকে ব্যাকুলিত করিয়া চারি শরাঘাতে তাঁহার চারি অশ্বকে বিনাশ করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে এক শরাঘাতে সারথিকে এবং দুই বাণে ছত্র ও ধ্বজছেদন পূর্ব্বক সুপ্রহিত নারাচদ্বারা বৃহৎক্ষত্রের হৃদয় বিদীর্ণ করিয়া তাঁহাকে ধরাতলে পাতিত করিলেন।
এইরূপে কেকয়-বংশোদ্ভব মহারথ বৃহৎক্ষত্র নিহত হইলে শিশুপালপুত্র ধৃষ্টকেতু ক্রোধান্ধ হইয়া সারথিকে কহিলেন, হে সারথে! বৰ্ম্মধারী দ্রোণ সমস্ত কৈকেয়গণ ও পাঞ্চাল-সৈন্যগণ নিপাতিত করত যে স্থানে অবস্থান করিতেছেন, সেই স্থানে রথ সঞ্চালন কর। সারথি ধৃষ্টকেতুর বচন শ্রবণ করিয়া কাম্বোজদেশীয় বেগগামী অশ্বগণকে সঞ্চালনপূর্ব্বক তাঁহাকে দ্রোণ সমীপে সমানীত করিল। বলদর্পিত চেদিরাজ ধৃষ্টকেতু পাবকপতনোন্মুখ পতঙ্গের ন্যায় প্রাণপরিত্যাগের নিমিত্ত দ্রোণের অভিমুখীন হইয়া যষ্টি বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহাকে এবং তাঁহার রথ, ধ্বজ ও অশ্বগণকে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় তাঁহার উপর অসংখ্য তীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। সুপ্ত ব্যাঘ্র প্রতিবোধিত হইলে যেরাপ ক্রুদ্ধ হয়, মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ধৃষ্টকেতুর শরাঘাতে তদ্রূপ ক্রুদ্ধ হইয়া ক্ষুরপ্র অস্ত্রে তাঁহার কোদণ্ড দ্বিখণ্ড করিয়া ফেলিলেন। মহারথ শিশুপালপুত্র সত্বর অন্য কাৰ্ম্মক গ্রহণ করিয়া কঙ্কপত্রভূষিত সায়কদ্বারা দ্রোণকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণ চারি বাণে ধৃষ্টকেতুর চারি অশ্ব বিনাশ করিয়া হাস্যমুখে সারথির মস্তক ছেদনপূর্ব্বক তাঁহার উপর পঞ্চবিংশতি বাণ নিক্ষেপ করিলেন। তখন মহাবীর ধৃষ্টকেতু সত্বর প্রস্তরদৃঢ় কনকবিভূষিত ভীষণ গদা গ্রহণ ও লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক রথ হইতে ধরাতলে অবতীর্ণ হইয়া দ্রোণের প্রতি সেই গদা নিক্ষেপ করত সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গীর ন্যায়, কালরাত্রির ন্যায় সেই গদা সমাগত অবলোকন করিয়া অসংখ্য শরসন্নিপাতে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। গদা দ্রোণশরে ছিন্ন ও নিপতিত হওয়াতে ধরাতল প্রতিধ্বনিত হইল। তখন অমর্যপরায়ণ মহাবীর ধৃষ্টকেতু গদা নিহত হইল দেখিয়া দ্রোণের উপর তোমর ও কনক-ভূষিত শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। সেই শক্তি ও তোমর তার্য্য-নিকৃত্ত ভুজঙ্গদ্বয়ের ন্যায় দ্রোণের পাঁচ পাঁচ বাণে ছিন্ন ও ধরাতলে নিপতিত হইল। অনন্তর প্রবলপ্রতাপ মহাবীর দ্রোণ ধৃষ্টকেতুর বিনাশ জন্য এক সুতীক্ষ্ণ বিশিখ নিক্ষেপ করিলেন। দ্রোণনির্মুক্ত বাণ অমিতপরাক্রম শিশুপালপুত্রের বর্ম্মসংবৃত দেহ বিদীর্ণ করিয়া নলিনীবনগামী হংসের ন্যায় ধরণীতলে পতিত হইল।
এইরূপে মহাবীর দ্রোণ ক্ষুধার্ত চাতক যেরূপ পতঙ্গ বিনষ্ট করে, তদ্রূপ ধৃষ্টকেতুকে বিনষ্ট করিয়া ফেলিলেন।
হে মহারাজ! চেদিরাজ ধৃষ্টকেতু নিহত হইলে তাঁহার পুত্র রোষপরবশ হইয়া তাঁহার ভারবহনে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য মৃগশাবকঘাতী বলবান্ ব্যাঘ্রের ন্যায় তাঁহাকেও হাসিতে হাসিতে যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিলেন।
হে কুরুরাজ। এইরূপে পাণ্ডবসৈন্যগণ বিনষ্ট হইতে আরম্ভ হইলে মহাবীর জরাসন্ধপুত্র স্বয়ং দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং জলদাবলী যেরূপ দিবাকরকে সমাচ্ছন্ন করে, তদ্রূপ তাঁহাকে শরধারায় সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। ক্ষত্রিয়মৰ্দ্দন মহাবীর দ্রোণ রথস্থিত মহারথ জরাসন্ধপুত্রের হস্তলাঘব দর্শন করিয়া অতি সত্বর বাণবৃষ্টি করত তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিয়া সমস্ত ধনুর্দ্ধর-সমক্ষে তাঁহার প্রাণ সংহার করিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে তৎকালে সমরভূমিতে যে যে বীর সেই কালান্তক যমোপম দ্রোণাচার্য্যের সহিত সংগ্রাম করিতে সমাগত হইলেন, মহাবীর দ্রোণ তাঁহাদের সকলকেই সংহার করিতে লাগিলেন। তৎপরে তিনি স্বীয় নামোল্লেখপূর্ব্বক অসংখ্য শরে পাণ্ডবপক্ষীয় যোদ্ধৃগণকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। সেই নামাঙ্কিত দ্রোণনিক্ষিপ্ত শাণিত শরসমুদায় অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যগণকে আহত করিল। আচার্য্যশরপীড়িত পাঞ্চালেরা ইন্দ্র-নিপীড়িত অসুরগণের ন্যায় ও শীতাদ্দিত গোগণের ন্যায় কম্পিত হইতে লাগিল।
হে ভরতকুলতিলক! এইরূপে সৈন্যসকল দ্রোণশরে নিপীড়িত হইলে পাণ্ডবদিগের মধ্যে ঘোরতর আর্তনাদশব্দ সমুত্থিত হইল। ঐ সময় পাঞ্চালবংশোদ্ভব মহারথেরা অতি-প্রতাপে উত্তপ্ত ও ভারদ্বাজের শরজালে নিপীড়িত হইয়া একান্ত ভীতচিত্তে অবস্থান করিতে লাগিলেন এবং অনেকে মোহ প্রাপ্ত হইলেন। তখন চেদি, সৃঞ্জয়, কাশি ও কোশলদেশীয় বীরগণ শক্তিদ্বারা মহাদ্যুতি দ্রোণাচার্য্যকে যমভবনে প্রেরণ করিবার বাসনায় সকলে হৃষ্টচিত্তে "আজি দ্রোণ বিনষ্ট হইয়াছেন", এই কথা বলিতে বলিতে যুদ্ধার্থ তাঁহার অভিমুখে আগমন করিলেন। মহাবীর আচার্য্য সেই যত্নশীল বীরগণকে বিশেষতঃ চেদিশ্রেষ্ঠগণকে যমসদনে প্রেরণ করিলেন। এইরূপে চেদিদেশীয় বীরগণ বিনষ্ট হইলে পাঞ্চালেরা ক্ষীণবল ও দ্রোণশরে নিপীড়িত হইয়া কম্পিত হইতে লাগিল এবং তাঁহার অদ্ভুত কৰ্ম্ম ও অবয়ব' পর্যবেক্ষণ করত মহাবীর ভীমসেন ও ধৃষ্টদ্যুম্নকে আহ্বানপূর্ব্বক চীৎকার করিয়া কহিল, এই ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্য্য নিশ্চয়ই কঠোর তপশ্চরণ করিয়াছিলেন; তাহার প্রভাবেই সংগ্রামে ক্ষত্রিয়প্রধান বীরগণকে দগ্ধ করিতেছেন। ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধ এবং ব্রাহ্মণের তপশ্চরণই প্রধান ধৰ্ম্ম। কৃতবিদ্য তপস্বী দর্শনমাত্রেই লোককে দগ্ধ করিতে পারেন। বহুসংখ্যক প্রধান প্রধান ক্ষত্রিয়েরা আচার্য্যের ঘোরতর অস্ত্রানলপ্রভাবে দগ্ধ হইতেছেন। মহাদ্যুতি দ্রোণাচার্য্য স্বীয় বল ও উৎসাহের অনুরূপ কার্য্য করিয়া সমস্ত প্রাণিগণকে মুগ্ধ করত আমাদিগের বলক্ষয় করিতে আরম্ভ করিয়াছেন।
হে মহারাজ। তখন ধৃষ্টদ্যুম্নতনয় মহাবল পরাক্রান্ত মহাবীর ক্ষত্রবর্মা তাহাদিগের সেই বাক্য শ্রবণ করত ক্রোধান্ধ দ্রোণের অভিমুখীন হইয়া অর্দ্ধচন্দ্র বাণে তাঁহার সশর শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ক্ষত্রিয়মৰ্দ্দন দ্রোণ তদ্দর্শনে সাতিশয় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া অন্য কার্ম্মুক গ্রহণ ও তাহাতে শত্রুনিপাতন ভাস্বর বেগবান্ বাণ সন্ধান করিয়া শরাসন আকর্ণ আকর্ষণ-পূর্ব্বক শর পরিত্যাগ করিলেন। দ্রোণনির্মুক্ত বাণ ক্ষত্রবর্মার হৃদয় বিদারণপূর্ব্বক তাঁহাকে নিপাতিত করিয়া ধরাতলে নিপতিত হইল। এইরূপে ধৃষ্টদ্যুম্নপুত্র নিহত হইলে সমুদায় সৈন্য কম্পিত হইতে লাগিল।
অনন্তর মহাবল পরাক্রান্ত চেকিতান দ্রোণকে আক্রমণ-পূর্ব্বক দশ বাণে বিদ্ধ করিয়া পুনর্ব্বার তাঁহার বক্ষঃস্থলে শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন এবং তৎপরে চারি বাণে তাঁহার চারি অশ্ব ও চারি বাণে সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর দ্রোণ ষোড়শ শরে চেকিতানের দক্ষিণ ভুজ বিদ্ধ করিয়া ষোড়শ শরে তাঁহার ধ্বজ ও সাত শরে সারথিকে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। সারথি নিহত হইলে অশ্বগণ চেকিতানের রথ লইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণ চেকিতানের রথ সারথিবিহীন অবলোকন করিয়া নিতান্ত ভীত হইলেন। ঐ সময়ে পঞ্চাশীতি-বর্ষবয়স্ক আকর্ণপলিত' বৃদ্ধ দ্রোণাচার্য্য চতুৰ্দ্দিকে সমবেত চেদি, পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণকে বিদ্রাবিত করত ষোড়শবর্ষীয় যুবার ন্যায় রণস্থলে বিচরণ করিতে লাগিলেন। শত্রুগণ তাঁহাকে বজ্রহস্ত বাসবের ন্যায় বোধ করিলেন। পরে মহাবাহু মতিমান্ দ্রুপদরাজ বলিতে লাগিলেন, ব্যাঘ্র যেরূপ লোভপরবশ হইয়া ক্ষুদ্র মৃগসমুদায় বিনাশ করে, তদ্রূপ এই লুব্ধ দুরাত্মা দুর্য্যোধন ক্ষত্রিয়গণকে বিনাশ করিতেছেন। পরকালে অবশ্যই উঁহাকে নরকগামী হইতে হইবে। ঐ দুরাত্মার লোভেই শত শত প্রধানতম ক্ষত্রিয়েরা সমরনিহত ও রুধিরলিপ্তগাত্রে নিকৃত্ত বৃষভের ন্যায় শৃগাল ও কুকুরকুলের ভক্ষ্য হইয়া রণভূমিতে শয়ান রহিয়াছেন। হে মহারাজ! অক্ষৌহিণীপতি দ্রুপদরাজ এই কথা বলিয়া পাণ্ডবদিগকে পুরোবর্তী করিয়া অবিলম্বে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে পাণ্ডবগণের ব্যূহ আলোড়িত হইলে, তাঁহারা পাঞ্চাল ও সোমকদিগের সহিত অনতিদূরে গমন করিলেন। সেই যুগান্তকালতুল্য ভয়ঙ্কর লোকক্ষয়কর লোমহর্ষণ সংগ্রামে মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণ বারংবার সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিলে এবং পাঞ্চালগণ হীনবীর্য্য ও পাণ্ডবেরা নিতান্ত নিপীড়িত হইলে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কাহারও আশ্রয় লাভে কৃতকার্য্য হইলেন না। তিনি কিরূপে সমস্ত রক্ষা হইবে, নিরন্তর এই চিন্তা করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি মহাবীর অর্জুনকে নিরীক্ষণ করিবার নিমিত্ত আকুলিতচিত্তে চতুৰ্দ্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন, কিন্তু ধনঞ্জয় বা বাসুদেবকে কোনক্রমেই দেখিতে পাইলেন না; কেবল অর্জুনের বানরলাঞ্ছিত ধ্বজদণ্ড সন্দর্শন ও গাণ্ডীবনির্ঘোষ শ্রবণ করিতে লাগিলেন। তিনি কিয়ৎক্ষণ পরে বৃষ্ণিপ্রবর মহাবীর সাত্যকিকে নিরীক্ষণ করিলেন; কিন্তু তৎকালে নরোত্তম বাসুদেব ও অর্জুনকে অবলোকন না করিয়া কিছুতেই শান্তিলাভ করিতে সমর্থ হইলেন না। তখন তিনি লোকনিন্দাভয়ে ভীত হইয়া সাত্যকির রথের প্রতি দৃষ্টিপাত করত চিন্তা করিতে লাগিলেন, আমি মিত্রগণের অভয়প্রদ মহাবীর সাত্যকিকে অর্জুনের নিকট প্রেরণ করিয়াছি। পূর্ব্বে আমার মনঃ কেবল অর্জুনের নিমিত্তই ব্যাকুল ছিল, কিন্তু এক্ষণে অর্জুন ও সাত্যকি এই উভয়ের নিমিত্ত ব্যাকুলিত হইতেছে। আমি সাত্যকিকে অর্জুনের নিকট প্রেরণ করিয়া এক্ষণে তাঁহার পদানুসরণে কাহাকে প্রেরণ করিব? যদি আমি সাত্যকির অনুসন্ধান না করিয়া যত্নসহকারে ভ্রাতা অর্জুনের অন্বেষণ করি, তাহা হইলে লোকে আমাকে এই বলিয়া নিন্দা করিবে যে, ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির সাত্যকিকে পরিত্যাগ করিয়া ভ্রাতার অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইলেন। অতএব এক্ষণে আমি এই লোকাপবাদ পরিহারের নিমিত্ত মহাবীর বৃকোদরকে সাত্যকির নিকট প্রেরণ করি। অরিনিসূদন অর্জুনের প্রতি আমার যেরূপ প্রীতি আছে, বৃষ্ণিবীর সাত্যকির প্রতিও তদ্রূপ। আমি তাঁহাকে অতি গুরুতর ভার বহনে নিয়োগ করিয়াছি। তিনিও মিত্রের উপরোধেই হউক বা গৌরবলাভের অভিলাষেই হউক, সাগরমধ্যগামী মকরের ন্যায় কৌরবসৈন্য-মধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন। ঐ সাত্যকির সহিত সমরে প্রবৃত্ত অপরাজুখ বীরগণের তুমুল কোলাহল শ্রুতিগোচর হইতেছে।
অতএব এক্ষণে অবসরোচিত কার্য্য অবধারণপূর্ব্বক অর্জুন ও সাত্যকির নিকট ভীমসেনকে প্রেরণ করাই আমার কর্তব্য। এই ভূমণ্ডলে ভীমের অসাধ্য কিছুই নাই। সে একাকী স্বীয় বাহুবলে পৃথিবীর সমুদায় বীরগণের সহিত সংগ্রাম করিতে পারে। আমরা তাহার ভুজবীর্য্য প্রভাবে বনবাস হইতে প্রতি-নিবৃত্ত ও সমরে অপরাজিত হইয়াছি। অতএব ঐ মহাবীর, অর্জুন ও সাত্যকির নিকট গমন করিলে তাহারা অবশ্যই সহায়সম্পন্ন হইবে। সাত্যকি ও অর্জুন সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ, বিশেষতঃ বাসুদেব স্বয়ং তাহাদিগকে রক্ষা করিতেছেন। তাহাদের নিমিত্ত চিন্তা করা একান্ত অনুচিত; কিন্তু আমার মনঃ নিতান্ত উৎকণ্ঠিত হইয়াছে। এক্ষণে স্বীয় উৎকণ্ঠা দূর করাও আমার অবশ্যকর্তব্য। অতএব আমি ভীমসেনকে সাত্যকির পদানুসরণে প্রেরণ করি, তাহা হইলে সাত্যকির প্রতিকার বিধান করা হইবে।
ধৰ্ম্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠির মনে মনে এইরূপ অবধারণ করিয়া সারথিকে কহিলেন, হে সারথে। তুমি আমাকে ভীমের রথাভিমুখে লইয়া চল। অশ্ববিদ্যাকোবিদ সারথি ধর্মরাজের বাক্য শ্রবণ করিয়া ভীমের সমীপে তাঁহার সুবর্ণখচিত রথ সমানীত করিল। রাজা যুধিষ্ঠির ভীমের সন্নিকৃষ্ট হইয়া প্রকৃত অবসর বিবেচনা করিয়া তাঁহাকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, হে ভীম! যে বীর একমাত্র রথে আরোহণপূর্ব্বক দেব, গন্ধর্ব্ব ও দৈত্যগণকে পরাজয় করিয়াছিল, আমি তোমার সেই অনুজ অর্জুনের ধ্বজদণ্ড নিরীক্ষণ করিতেছি না। ধৰ্ম্মরাজ ভীমকে এই কথা বলিয়া শোকে নিতান্ত কাতর হইয়া মোহাবিষ্ট হইলেন। মহাবীর ভীম ধর্মরাজকে একান্ত মোহাবিষ্ট অবলোকন করিয়া কহিলেন, হে ধর্মরাজ! আমি আপনার এরূপ মোহ আর কদাচ দর্শন ও শ্রবণ করি নাই। পূর্ব্বে আমরা দুঃখে অতিশয় কাতর হইলে আপনিই আমাদিগকে প্রবোধ দিতেন। অতএব হে রাজেন্দ্র। এক্ষণে আপনি শোেক পরিত্যাগপূর্ব্বক উত্থিত হউন এবং আজ্ঞা করুন, আমি কি কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিব? এই ভূমণ্ডলে আমার অসাধ্য কার্য্য কিছুই নাই। অনন্তর ধর্মরাজ ভীমের বাক্য শ্রবণ করিয়া কৃষ্ণসর্পের ন্যায় দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক অশ্রুপূর্ণ-লোচনে ম্লানবদনে কহিতে লাগিলেন, হে ভীম! যখন রোষাবিষ্ট বাসুদেবের মুখমারুতে পূরিত পাঞ্চজন্য শঙ্খের নির্ঘোষ শ্রুতিগোচর হইতেছে, তখন আজি নিশ্চয়ই তোমার অনুজ অর্জুন নিহত হইয়া সমরাঙ্গনে শয়ন করিয়াছেন এবং বাসুদেব অর্জুনকে বিনষ্ট দেখিয়া স্বয়ং যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। হে বৃকোদর! পাণ্ডবগণ যে মহাবীরের বলবীর্য্য আশ্রয় করিয়া জীবিত রহিয়াছে, যে মহাবীর বিপকালে আমাদের প্রধান অবলম্বন, সেই মহাবল পরাক্রান্ত মত্ত মাতঙ্গ-বিক্রম প্রিয়দর্শন অর্জুন জয়দ্রথবধার্থ অনেকক্ষণ কৌরবসৈন্য-মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছেন, এখনও প্রত্যাগত হইতেছেন না; এই | আমার শোকের মূল কারণ। মহাবীর ধনঞ্জয় ও সাত্যকির নিমিত্ত আমার শোক ঘৃতপরিবর্দ্ধিত হুতাশনের ন্যায় বারংবার উদ্দীপিত হইতেছে। আমি অর্জুনের বানরলাঞ্ছিত ধ্বজ দর্শন করিতেছি না বলিয়া মোহে অভিভূত হইতেছি। নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, সমরবিশারদ বাসুদেব অর্জুনকে নিহত দেখিয়া স্বয়ং যুদ্ধ করিতেছেন। মহারথ সাত্যকি তোমার অর্জুনের অনুগমন করিয়াছেন; আমি তাঁহার অদর্শনেও বিমোহিত হইতেছি। হে কৌন্তেয়! আমি তোমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা; যদি আমার বাক্য প্রতি-পালন করা তোমার কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা হয়, তাহা হইলে যে স্থানে ধনঞ্জয় ও সাত্যকি রহিয়াছে, তুমি সেই স্থানে গমন কর। তুমি সাত্যকিকে অর্জুন অপেক্ষাও স্নেহাস্পদ বিবেচনা করিবে। সেই মহাবীর আমার প্রিয়ানুষ্ঠান করিবার নিমিত্ত নিতান্ত দুর্গম, সামান্য লোকের অগম্য, একান্ত ভয়ঙ্কর স্থানে সব্যসাচীর নিকট গমন করিয়াছে। হে বীর! এক্ষণে তুমি শীঘ্র গমন কর; কৃষ্ণ, অর্জুন ও সাত্যকিকে নিরাপদ দেখিলে সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক আমাকে সঙ্কেত করিও।
সঞ্জয় কহিলেন, ভীমসেন যুধিষ্ঠিরকে বলিলেন, মহারাজ! পূর্ব্বে প্রজাপতি ব্রহ্মা, ইন্দ্র ও মহেশ্বর যে রথে আরোহণ করিতেন, মহাবীর অর্জুন ও কৃষ্ণ সেই রথে আরোহণপূর্ব্বক গমন করিয়াছেন। অতএব তাঁহাদের আর কিছুই ভয় নাই। যাহা হউক, আমি আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া গমন করিতেছি। আপনি আর শোক করিবেন না। আমি তাঁহাদিগের নিকট উপস্থিত হইয়াই আপনার নিকট সংবাদ প্রেরণ করিব।
হে কুরুরাজ! মহাবল পরাক্রান্ত ভীম এই কথা বলিয়া ধৃষ্টদ্যুম্ন ও অন্যান্য সুহৃদ্গণের হস্তে ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে বারংবার সমর্পণ করিয়া প্রস্থানের উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। পরে তিনি মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্নকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে মহাবাহো! মহারথ দ্রোণ ধর্মরাজকে গ্রহণ করিবার নিমিত্ত যেরূপ উপায় করিতেছেন, তাহা কিছুই তোমার অবিদিত নাই। এক্ষণে ধর্মরাজকে রক্ষা করা আমার যেরূপ আবশ্যক, অর্জুন-সমীপে গমন তদ্রূপ নহে; কিন্তু ধৰ্ম্মনন্দন যে সমস্ত কথা কহিলেন, আমি তাহার প্রত্যুত্তর প্রদানে সমর্থ নহি। নিঃশঙ্ক মনে তাঁহার রক্ষা করাই আমার কর্ত্তব্য; এক্ষণে যে স্থানে মুমূর্ষু সৈন্ধব অবস্থান করিতেছে, আমি মহাবীর অর্জুন ও সাত্যকির অনুসরণক্রমে তথায় প্রস্থান করিব। তুমি সাবধানে ধর্মরাজকে রক্ষা কর; তাঁহাকে রক্ষা করাই সর্ব্বাপেক্ষা মহৎ কার্য্য। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন ভীমের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে বীর! আমি তোমার অভিলাষ পূর্ণ করিব। তুমি কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া প্রস্থান কর। দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিনষ্ট না করিয়া ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে গ্রহণ করিতে সমর্থ হইবেন না। কুণ্ডলযুগলালঙ্কৃত, অঙ্গদপরিশোভিত, তরবারিধারী মহাবীর ভীম এইরূপে ধৃষ্টদ্যুম্নের হস্তে পাণ্ডবরাজ যুধিষ্ঠিরকে সমর্পণ ও ধর্মরাজের পাদবন্দনপূর্ব্বক প্রস্থানের উপক্রম করিলেন। ধর্মরাজ তাঁহাকে আলিঙ্গন ও তাঁহার মস্তক আঘ্রাণ করিয়া শুভ আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন। ভীমসেন অর্চ্চিত সন্তুষ্টচিত্ত ব্রাহ্মণগণকে প্রদক্ষিণ ও অষ্টবিধ মাঙ্গল্য দ্রব্য স্পর্শপূর্ব্বক কৈরাতক' মদ্য পান করিলেন। তখন তাঁহার লোচনযুগল রক্তবর্ণ ও তেজোরাশি দ্বিগুণ পরিবর্দ্ধিত হইয়া উঠিল। অনিল অনুকূলগামী হইয়া তাঁহার বিজয়লাভ সূচিত করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিলেন। তিনি মনে মনে জয়লাভজনিত আনন্দ অনুভব করিতে লাগিলেন। তাঁহার সুবর্ণখচিত মহামূল্য লৌহ-নির্মিত বৰ্ম্ম, বিদ্যুদ্দামমণ্ডিত জলদপটলের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। তিনি শুক্ল, কৃষ্ণ, পীত ও রক্তবর্ণ বস্ত্র পরিধান এবং কণ্ঠত্রাণ ধারণপূর্ব্বক ইন্দ্রায়ুধবিভূষিত অম্বুদের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন।
ইত্যবসরে পুনরায় পাঞ্চজন্য শঙ্খ ধ্বনিত হইল। ধৰ্ম্ম-নন্দন রাজা যুধিষ্ঠির সেই ত্রৈলোক্যত্রাসন' ভয়ঙ্কর শঙ্খধ্বনি শ্রবণগোচর করিয়া পুনর্ব্বার ভীমকে কহিলেন, হে ভীম! ঐ দেখ, শঙ্খোত্তম পাঞ্চজন্য বৃষ্ণিপ্রবীর কৃষ্ণের মুখমারুতে পরিপূরিত হইয়া পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ অনুনাদিত করিতেছে। নিশ্চয়ই বোধ হয়, ধনঞ্জয় ঘোরতর বিপদে নিপতিত হওয়াতে চক্রগদাধর বাসুদেব কৌরবগণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। আজি নিশ্চয়ই আৰ্য্যা কুন্তী, দ্রৌপদী ও সুভদ্রা বন্ধু-বান্ধবগণ সমভিব্যাহারে অশুভ নিমিত্ত সন্দর্শন করিতেছেন। অতএব হে ভীম। তুমি অবিলম্বে অর্জুনের নিকট গমন কর। মহাবীর অর্জুন ও সাত্যকিকে অবলোকন না করিয়া আমি দশদিক্ শূন্যময় দেখিতেছি।
হে মহারাজ। প্রবল প্রতাপশালী ভ্রাতৃহিত-নিরত মহাবীর ভীম এইরূপে বারংবার জ্যেষ্ঠসহোদরকর্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়া গোধাঙ্গুলিত্রাণ বন্ধন ও শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক পুনঃ পুনঃ দুন্দুভি ধ্বনি, শঙ্খনিনাদ ও সিংহনাদ করত শত্রুগণকে ভয়দর্শন করিয়া শরাসন আস্ফালন করিতে লাগিলেন। ঐ শব্দে বীরগণের অন্তঃকরণ অতিশয় বিচলিত হইয়া উঠিল। তখন তিনি জ্যেষ্ঠ-ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে যুদ্ধার্থ নির্গত হইলেন। বিশোক সারথিকর্তৃক সংযোজিত মনোমারুতগামী অশ্বসকল তাঁহাকে বহন করিতে লাগিল। মহাবীর বৃকোদর ধনুর্জ্জা আকর্ষণপূর্ব্বক বিপক্ষপক্ষীয় সেনাদিগকে অনুকর্ষণ' ও শস্ত্রদ্বারা ক্ষত-বিক্ষত করিয়া বিমৰ্দ্দিত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। অসুরগণ যেমন ইন্দ্রের অনুসরণ করিয়াছিলেন, তদ্রূপ পাঞ্চালেরা সোেমকদিগের সহিত তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। অনন্তর দুঃশল, চিত্রসেন, কুম্ভভেদী, বিবিংশতি, দুর্মুখ, দুঃসহ, বিকর্ণ, শল, বিন্দ, অনুবিন্দ, সুমুখ, দীর্ঘবাহু, সুদর্শন, বৃন্দারক, সুহস্ত, সুষেণ, দীর্ঘলোচন, অভয়, রৌদ্রকর্মা, সুবর্মা ও দুর্ব্বিমোচন, আপনার এই সমুদায় পুত্রেরা অসংখ্য সৈন্য ও পদাতিগণ-সমভিব্যাহারে পরম যত্নসহকারে ভীমসেনের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর ভীম সেই সমস্ত বীরগণে পরিবৃত হইয়া তাঁহাদিগকে নিরীক্ষণপূর্ব্বক ক্ষুদ্র মৃগের প্রতি ধাবমান সিংহের ন্যায় তাঁহাদিগের প্রতি গমন করিতে লাগিলেন। ঘনমণ্ডল যেমন দিবাকরকে আচ্ছাদিত করে, তদ্রূপ সেই বীরগণ দিব্যাস্ত্রজাল বিস্তারপূর্ব্বক ভীমকে সমাচ্ছন্ন করিলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর মহাবেগে তাঁহাদিগকে অতিক্রমপূর্ব্বক দ্রোণসৈন্যভিমুখে ধাবমান হইয়া সম্মুখীন করিসৈন্যের প্রতি সুতীক্ষ্ণ শরনিকর বর্ষণ করত অবিলম্বে মাতঙ্গগণকে শরজালে ক্ষত-বিক্ষত করিয়া চতুৰ্দ্দিকে বিদ্রাবিত করিলেন। মৃগকুল যেমন অরণ্যমধ্যে শরতগর্জনে একান্ত বিত্রাসিত হয়, তদ্রূপ সেই দ্বিরদগণ নিতান্ত ভীত হইয়া ভৈরব রব পরিত্যাগপূর্ব্বক ইতস্ততঃ ধাবমান হইল। এইরূপে মহাবল ভীম সেই করিসৈন্য অতিক্রম করিয়া মহাবেগে দ্রোণসৈন্যাভি-মুখে ধাবমান হইলেন। তীরভূমি যেমন মহাসাগরকে অবরোধ করে, তদ্রূপ মহাবীর আচার্য্য তাঁহাকে নিবারণ করিয়া হাস্যমুখে তাঁহার ললাটদেশে নারাচ প্রহার করিলেন। ভীমসেন দ্রোণের নারাচবিদ্ধ ললাট হইয়া উর্দ্ধরশ্মি ভাস্করের ন্যায় অধিকতর শোভা পাইতে লাগিলেন।
অনন্তর আচার্য্য দ্রোণ, অর্জুনের ন্যায় এই ভীমসেনও আমার সম্মান করিবেন, এইরূপ অবধারণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে ভীম। আমি তোমার বিপক্ষ; আজি আমাকে পরাজয় না করিয়া তুমি কোনক্রমেই শত্রুসৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না। যদিও তোমার অনুজ অর্জুন আমার আদেশানুসারে সেনামধ্যে প্রবেশ করিয়াছে; তথাচ তুমি তদ্বিষয়ে কোনক্রমেই কৃতকার্য্য হইতে সমর্থ হইবে না। তখন নির্ভীক ভীমসেন গুরু দ্রোণের বাক্য শ্রবণ করিয়া ক্রুদ্ধমনে আরক্ত-লোচনে তৎক্ষণাৎ কহিলেন, হে ব্রহ্মবন্ধো! নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ মহাবীর অর্জুন বলনিসূদন ইন্দ্রের বল'মধ্যে প্রবেশ করিতে পারেন; তিনি যে তোমার আদেশানুসারে সমরসাগরে প্রবেশ করিয়াছেন, ইহা কখনই সম্ভবপর নহে। তিনি তোমাকে অর্চ্চনা করিয়া সম্মান করিয়াছেন। কিন্তু আমি কৃপাপরবশ অর্জুন নহি; আমি তোমার পরম শত্রু ভীমসেন। হে আচার্য্য! তুমি আমাদের পিতা, গুরু ও বন্ধু এবং আমরা তোমার পুত্র। আমরা এইরূপ বিবেচনা করিয়াই তোমার নিকট প্রণতভাবে অবস্থান করিয়া থাকি, কিন্তু আজি তুমি আমাদিগের প্রতি বিপরীত বাক্য প্রয়োগ করিতেছ। এক্ষণে যদি তুমি আপনাকে আমাদিগের বিপক্ষ বোধ করিয়া থাক, তাহাতে কিছুমাত্র ক্ষতি নাই। আমি অবিলম্বেই তোমার শত্রুর ন্যায় কার্য্যানুষ্ঠান করিব। মহাবীর ভীম এই বলিয়া অন্তক যেমন কালদণ্ড বিঘূর্ণিত করেন, তদ্রূপ গদা বিঘূর্ণনপূর্ব্বক দ্রোণের প্রতি পরিত্যাগ করিলেন। সমরবিশারদ দ্রোণ তৎক্ষণাৎ রথ হইতে অবতীর্ণ হইলেন। তখন ভীম তাঁহার অশ্ব, রথ, সারথি ও ধ্বজ বিপ্রোথিত' করিয়া ফেলিলেন এবং সমীরণ যেমন প্রবল বেগে মহীরুহসমুদায় বিমৰ্দ্দিত করে, তদ্রূপ তাঁহার সৈন্যগণকে মন্থন করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! ঐ সময় আপনার পুত্রগণ পুনরায় ভীমকে পরিবেষ্টন করিলেন। মহাবীর দ্রোণ অন্য রথে আরোহণ করিয়া যুদ্ধার্থ ব্যূহমুখে সমুপস্থিত রহিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত ভীম নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া সম্মুখীন রথ সৈন্যকে লক্ষ্য করত শরনিকর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। আপনার আত্মজগণ ভীমশরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়াও জয়লাভাভিলাষে তাঁহার সহিত ঘোরতর সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন।
অনন্তর দুঃশাসন রোষপরবশ হইয়া ভীমসেনকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত তাঁহার প্রতি এক যমদণ্ডোপম সুতীক্ষ্ণ শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর ভীম সেই দুঃশাসন-প্রেরিত শক্তি সমাগত দেখিয়া দুই খণ্ডে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। অনন্তর ভীমসেন কুম্ভভেদী, সুষেণ ও দীর্ঘনেত্রকে তিন তিন শরে বিদ্ধ করিলেন এবং তৎপরে কুরুকুলকীর্ত্তিবর্দ্ধন মহাবীর বৃন্দারককে শরবিদ্ধ করিয়া যুদ্ধে উদ্যত মহাবল পরাক্রান্ত আপনার পুত্র অভয়, রৌদ্রকর্মা ও দুর্বিমোচন এই তিন জনকে তিন শরে সংহার করিয়া ফেলিলেন। তখন আপনার অন্যান্য আত্মজগণ ভীমশরে প্রহৃত হইয়া তাঁহাকে চতুৰ্দ্দিকে বেষ্টন করিলেন এবং জলধর যেমন ধরণীধরের উপরিভাগে জলধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ ভীমকৰ্ম্মা ভীমের উপর শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। পর্ব্বতে প্রস্তর বর্ষণ করিলে যেমন পর্ব্বতের কিছুমাত্র ক্লেশ হয় না, তদ্রূপ সেই বীরগণের বাণবর্ষণে ভীমের কিছুমাত্র ব্যথা জন্মিল না। তিনি আপনার আত্মজ বিন্দ, অনুবিন্দ ও সুধর্মার প্রতি শরজাল বর্ষণপূর্ব্বক হাস্যমুখে তাঁহাদিগকে যমালয়ে প্রেরণ করিলেন। আপনার পুত্র সুদর্শনও ঐ সময় ভীমশরে বিদ্ধ হইয়া অবিলম্বে ভূতলে নিপতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। পরে মহাবীর ভীম ক্ষণকালমধ্যে সেই সমস্ত রথসৈন্যকে চতুর্দিকে বিদ্রাবিত করিলেন। আপনার পুত্রগণ ভীমভয়ে একান্ত বিহ্বল হইয়া রথনির্ঘোষ করত সহসা মৃগযুথের ন্যায় চারিদিকে ধাবমান হইলেন। ভীম তাঁহাদের সৈন্যগণের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করত কৌরবগণকে শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন আপনার আত্মজগণ ভীমশরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া তাঁহাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক মহাবেগে অশ্বগণকে সঞ্চালিত করত রণস্থল হইতে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে মহাবীর ভীম তাঁহাদিগকে পরাজয় করিয়া বাহ্বাস্ফোটন, সিংহনাদ ও তলশব্দ করিতে লাগিলেন এবং পরিশেষে রথসৈন্যগণকে ভীত ও শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদিগকে নিহত করিয়া রথীদিগকে অতিক্রমপূর্ব্বক দ্রোণসৈন্যাভিমুখে ধাবমান হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর দ্রোণাচার্য্য ভীমসেনকে রথসৈন্য-সমুত্তীর্ণ দেখিয়া তাঁহাকে নিবারণ করিবার মানসে তাঁহার উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীম দ্রোণসমীরিত সেই সমস্ত শর নিরাকরণ করিয়া মায়াবলে বলসমুদায় বিমোহিত করত ধার্তরাষ্ট্রগণের প্রতি ধাব-মান হইলেন। তখন মহীপালগণ আপনার আত্মজগণের আদেশানুসারে মহাবেগে গমন করিয়া ভীমকে বেষ্টন করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীম তদ্দর্শনে সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক হাস্যমুখে তাঁহাদের উপর মহাবেগে দেবরাজনির্মুক্ত অশনির ন্যায় এক শত্রুপক্ষ-বিনাশিনী গদা নিক্ষেপ করিলেন। সেই তেজঃপ্রজ্বলিত মহাগদা স্বীয় ভীষণ রবে ধরণীমণ্ডল পরিপূর্ণ করিয়া সৈন্যগণকে মথিত ও আপনার আত্মজদিগকে নিতান্ত ভীত করিতে লাগিল। আপনার পক্ষ বীরগণ সেই তেজঃপুঞ্জ বিরাজিত গদা মহাবেগে নিপতিত দেখিয়া ভৈরব রব পরিত্যাগ-পূর্ব্বক ইতস্ততঃ ধাবমান হইলেন। রথীসকল সেই গদার দুঃসহ শব্দ শ্রবণে রথ হইতে নিপতিত হইতে লাগিল। অসংখ্য বীরগণ ভীমের গদাঘাতে আহত ও নিতান্ত ভীত হইয়া ব্যাঘ্রদর্শনে ভীত মৃগযুথের ন্যায় রণস্থল হইতে পলায়ন করিতে আরম্ভকরিলেন। এইরূপে মহাবীর ভীম সেই দুর্জয় শত্রুগণকে বিদ্রাবিত করিয়া পতঙ্গরাজ গরুড়ের ন্যায় মহাবেগে সেই সেনা অতিক্রমপূর্ব্বক ধাবমান হইলেন।
অনন্তর মহাবীর দ্রোণ ভীমসেনকে সৈন্যসংহারে প্রবৃত্ত দেখিয়া তাঁহার প্রতি গমন ও শরনিকরে তাঁহাকে নিবারণ করিয়া পাণ্ডবগণের অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার করত সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন ভীমসেনের সহিত দ্রোণের দেবাসুর সংগ্রামসদৃশ ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হইতে লাগিল। দ্রোণাচার্য্য সুতীক্ষ্ণ শরনিকরদ্বারা সহস্র সহস্র বীরগণকে বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। মহাবীর ভীম তদ্দর্শনে রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া নয়নযুগল নিমীলিত করত মহাবেগে পাদচারে দ্রোণাভিমুখে গমন করিলেন এবং বৃষভ যেমন অবলীলাক্রমে বারিবর্ষণ সহ্য করিয়া থাকে, তদ্রূপ দ্রোণের শরবৃষ্টি প্রতিগ্রহ করিতে লাগিলেন। তৎপরে দ্রোণাচার্য্যের রথের ঈষামুখ গ্রহণ করিয়া রথের সহিত তাঁহাকে অতিদূরে নিক্ষেপ করিলেন। দ্রোণাচার্য্য এইরূপে ভীমকর্তৃক নিক্ষিপ্ত হইয়া তৎক্ষণাৎ অন্য রথে আরোহণপূর্ব্বক ব্যূহদ্বারে সমুপস্থিত হইলেন। ঐ সময় ভীমের সারথি মহাবেগে অশ্ব চালনা করিতে আরম্ভ করিল। তদ্দর্শনে সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। তখন মহাবীর ভীম মহাবেগে কৌরবসৈন্য অতিক্রম করিলেন এবং যেমন উদ্ধত বায়ু পাদপদল বিমদ্দিত করে, তদ্রূপ তিনি ক্ষত্রিয়গণকে মর্দ্দন ও নদীবেগ যেরূপ বৃক্ষসকল নিবারিত করে, তদ্রূপ সৈন্যগণকে নিবারণ করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। তৎপরে তিনি হাদ্দিক্যরক্ষিত ভোজসৈন্য প্রমথিত ও তলধ্বনিদ্বারা অন্যান্য সৈন্যগণকে বিত্রাসিত করিয়া শার্দুল যেমন বৃষদিগকে পরাভব করে, তদ্রূপ সৈন্যগণকে পরাজয় করিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর ভীমসেন কৌরবপক্ষীয় ভোজসৈন্য, কাম্বোজসৈন্য ও অন্যান্য যুদ্ধবিশারদ বহুসংখ্যক ম্লেচ্ছগণকে অতিক্রমপূর্ব্বক মহাবীর সাত্যকিকে সংগ্রামে প্রবৃত্ত দেখিয়া পরম যত্নসহকারে অর্জুনদর্শনাভিলাষে বায়ুবেগে গমন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে জয়দ্রথবধার্থ যুদ্ধে প্রবৃত্ত মহাবল পরাক্রান্ত মহাবীর ধনঞ্জয় তাঁহার নেত্রপথে নিপতিত হইলেন। বর্ষাকালে জলদপটল যেমন অতি গভীর গর্জন করিয়া থাকে, তদ্রূপ মহাবীর বৃকোদর অর্জুনকে অবলোকন করিয়া ভয়ঙ্কর সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর অর্জুন ও বাসুদেব তেজস্বী ভীমের সেই ঘোরতর সিংহনাদ শ্রবণে তাঁহাকে দর্শন করিবার নিমিত্ত বারংবার সিংহনাদ পরিত্যাগ করত গর্জমান বৃষভের ন্যায় রণস্থলে সঞ্চরণ করিতে আরম্ভ করিলেন।
এদিকে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভীম ও অর্জুনের সিংহনাদ শ্রবণে নিতান্ত প্রীত, প্রসন্ন ও শোকশূন্য হইয়া বারংবার অর্জুনের বিজয় প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি মদমত্ত ভীমকে সিংহনাদে প্রবৃত্ত দেখিয়া হাস্যমুখে মনে মনে কহিতে লাগিলেন, হে ভীম! তুমি গুরু-আজ্ঞা প্রতিপালন ও অর্জুনের কুশল সংবাদ প্রদান করিলে। তুমি যাহাদের উপর বিদ্বেষভাব প্রদর্শন করিয়া থাক, তাহাদিগের কদাচ জয়লাভহয় না। এক্ষণে বুঝিলাম, মহাবীর অর্জুনও ভাগ্যবলে জীবিত আছেন এবং সত্যবিক্রম সাত্যকিরও মঙ্গল। আমি ভাগ্যক্রমে বাসুদেব ও ধনঞ্জয়ের গর্জনধ্বনি শ্রবণ করিতেছি। যিনি যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজয় করিয়া হুতাশনের তৃপ্তিসাধন করিয়াছেন এবং আমরা যাঁহার বাহুবল অবলম্বন করিয়া প্রাণ ধারণ করিতেছি, সেই অরাতিবিজয়ী অর্জুন ভাগ্যবলে জীবিত অছেন। যিনি একমাত্র শরাসন গ্রহণ করিয়া সুরগণেরও দুর্দ্ধর্ষ নিবাতকবচগণকে জয় করিয়াছিলেন এবং যিনি বিরাটনগরে গোগ্রহণার্থ সমাগত কৌরবগণকে পরাজয় করেন, সেই অর্জুন ভাগ্যবলে জীবিত রহিয়াছেন। যিনি নিজ ভুজবলে চতুৰ্দ্দশ-সহস্র কালকেয়গণকে বিনাশ করিয়াছিলেন এবং দুর্য্যোধনের হিতসাধনার্থ গন্ধর্ব্বরাজ চিত্ররথকে অস্ত্রবলে পরাজয় করিয়াছেন, সেই কিরীট-সমলঙ্কৃত, শ্বেতবাহন, কৃষ্ণসারথি, প্রিয়, ধনঞ্জয় ভাগ্যবলে এক্ষণে জীবিত রহিয়াছেন।
মহাবীর অর্জুন পুত্রশোকে নিতান্ত সন্তপ্ত হইয়া জয়দ্রথের বধরূপ অতি দুষ্কর কার্য্যসাধনার্থ প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তাঁহার সেই প্রতিজ্ঞা কি সফল হইবে? আজি কি দিনমণি অস্তাচলচূড়াবলম্বী না হইতে হইতে বাসুদেব-সুরক্ষিত অর্জুন প্রতিজ্ঞা হইতে উত্তীর্ণ হইয়া আমার নিকট আগমন করিবেন? দুর্য্যোধনহিতানুষ্ঠাননিরত সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ কি অর্জুনশরে নিপতিত হইয়া আমাদিগকে আনন্দিত করিবে? মূঢ় রাজা দুর্য্যোধন সিন্ধুরাজকে নিহত ও ভীমসেনশরে ভ্রাতৃগণকে বিনষ্ট দেখিয়া কি আমাদিগের সহিত সন্ধিস্থাপন করিবেন এবং অন্যান্য যোদ্ধাদিগকে ভূতলে নিপতিত দেখিয়া কি অনুতপ্ত হইবেন? একমাত্র ভীষ্মের নিপাতে আমাদিগের কি বৈরানল নির্ব্বাণ হইবে? রাজা দুর্য্যোধন কি অবশিষ্ট বীরগণকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত আমাদের সহিত সন্ধি করিবেন? হে মহারাজ! এইরূপে কৃপাপরতন্ত্র রাজা যুধিষ্ঠির যখন নানাপ্রকার চিন্তা করিতেছিলেন, তৎকালে কুরু-পাণ্ডবের ঘোরতর যুদ্ধ হইতেছিল। একোনত্রিংশদধিকশততম অধ্যায়।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। এইরূপে মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন মেঘগম্ভীরনির্ঘোষে ঘোরতর সিংহনাদ করিতে আরম্ভকরিলে কোন্ কোন্ বীর তাঁহাকে অবরোধ করিল? ভীমপরাক্রম ভীমসেন ক্রোধাবিষ্ট হইলে তাঁহার সন্নিধানে অবস্থান করিতে পারে, ত্রিলোকমধ্যে এমন কাহাকেও দৃষ্টিগোচর হয় না। সে যখন সাক্ষাৎ কৃতান্তের ন্যায় গদা উদ্যত করে, তখন রণস্থলে অবস্থান করিতে কেহই সমর্থ হয় না। যে ভীম রথদ্বারা কুঞ্জর বিনাশ করিয়া থাকে, তাহার সম্মুখে কে অবস্থান করিবে? তাহার সম্মুখীন হইতে দেবরাজ ইন্দ্রেরও সাহস হয় না। যাহা হউক, এক্ষণে বল, কালান্তক যমোপম মহাবীর ভীমসেন ক্রুদ্ধচিত্তে তৃণদহনে প্রবৃত্ত দাবদহনের ন্যায় আমার পুত্রগণকে সংহার করিতে আরম্ভ করিলে দুর্য্যোধনহিতনিরত কোন্ কোন্ বীরপুরুষ তাঁহার সমক্ষে অবস্থানপূর্ব্বক তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিল। হে সঞ্জয়। মহাবীর ভীমসেনের নিমিত্ত আমার যাদৃশী শঙ্কা হয়, অর্জুন, কৃষ্ণ, সাত্যকি ও ধৃষ্টদ্যুম্নের নিমিত্ত তাদৃশী শঙ্কা হয় না। অতএব হে সঞ্জয়! কোন্ কোন্ ব্যক্তি আমার পুত্রবিনাশে প্রবৃত্ত রোষপ্রদীপ্ত ভীমসেনের সন্নিহিত হইল, তুমি তাহা কীর্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর কর্ণ ভীমসেনকে সিংহনাদ করিতে দেখিয়া তুমুল কোলাহল করত তাঁহার সমক্ষে সমুপস্থিত হইলেন এবং তাঁহার সহিত যুদ্ধার্থী হইয়া ক্রোধভরে সুদৃঢ় শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক বল প্রদর্শন করিবার বাসনায় মহীরুহ যেমন বায়ুর পথ রোধ করে, তদ্রূপ তাঁহার পথ রোধ করিলেন। মহাবীর ভীমসেন কর্ণকে সম্মুখে নিরীক্ষণপূর্ব্বক ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া তাঁহার উপর শিলানিশিত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণও শরপ্রয়োগ করত তৎপ্রযুক্ত শর প্রতিগ্রহ করিলেন। তৎকালে রথী ও অশ্বারোহী প্রভৃতি যে সকল যোধগণ ভীম ও কর্ণের যুদ্ধ অবলোকন করিতেছিলেন, সেই বীরদ্বয়ের তলধ্বনি শ্রবণে তাঁহাদের কলেবর কম্পিত হইতে লাগিল। ক্ষত্রিয়গণ ভীমসেনের ভয়ঙ্কর সিংহনাদ শ্রবণ করিয়া ভূতল ও নভোমণ্ডল অবরুদ্ধ বিবেচনা করিলেন। ঐ সময় মহাবীর ভীমসেন পুনরায় অতি ভীষণ সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। ঐ সিংহনাদপ্রভাবে সমুদায় যোদ্ধাদিগের হস্ত হইতে শরাসন ভূতলে নিপতিত হইল। বাহনসকল সাতিশয় ভীত ও বিমনায়মান হইয়া মল-মূত্র পরিত্যাগ করিতে লাগিল।
ঐ সময় বহুতর ভয়ঙ্কর দুর্নিমিত্ত প্রাদুর্ভূত হইল। অন্তরীক্ষ গৃধু, কঙ্ক ও বায়সে সমাচ্ছন্ন হইয়া গেল। তখন মহাবীর কর্ণ বিংশতি শরে ভীমসেনকে নিতান্ত নিপীড়িত করিয়া সত্বর পাঁচ শরে তাঁহার সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। ভীমসেন তদ্দর্শনে সত্বর কর্ণের প্রতি চতুঃষষ্টি সায়ক প্রয়োগ করিয়া হাস্য করিতে লাগিলেন। তখন কর্ণ ভীমের প্রতি চারি সায়ক নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর বৃকোদর হস্তলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক সন্নতপর্ব্ব সায়কনিকরে ঐ সমুদায় উপস্থিত না হইতে হইতেই খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর মহাবীর কর্ণ শরজালদ্বারা ভীমসেনকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। ভীমসেন কর্ণশরে বারংবার আচ্ছাদিত হইয়া ক্রোধভরে তাঁহার কার্ম্মকের মুষ্টিদেশ ছেদন করিয়া তাঁহাকে দশ শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহারথ কর্ণ শরাসনে জ্যারোপণপূর্ব্বক ভীমকে শরজালে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। ভীমসেন কর্ণের শরাঘাতে সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইয়া মহাবেগে আনতপর্ব্ব তিন শরে তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর কর্ণ বক্ষঃস্থলবিদ্ধ শরত্রয়দ্বারা উত্তুঙ্গ শৃঙ্গত্রয়ের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইলেন। তৎকালে ধাতুধারাস্রাবী ভূধর হইতে যেমন গৈরিক ধাতু নির্গত হয়, তদ্রূপ তাঁহার বক্ষঃস্থল হইতে রুধিরধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। এইরূপে মহাবীর কর্ণ ভীমের শরপ্রহারে নিতান্ত নিপীড়িত ও ঈষৎ বিচলিত হইয়া শরাসনে শর সন্ধানপূর্ব্বক তাঁহাকে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় সহস্র সহস্র বাণ নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর ভীম কর্ণের শরজালে সহসা সমাচ্ছন্ন হইয়া গৰ্ব্ব প্রকাশপূর্ব্বক অবিলম্বে তাঁহার ধনুর্জা ছেদন ও সারথিকে শমনসদনে প্রেরণ করিয়া চারি অশ্বকে বিনাশ করিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ সেই অশ্বশূন্য রথ হইতে সত্বর অবতীর্ণ হইয়া বৃষসেনের রথে সমারূঢ় হইলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে প্রবল প্রতাপশালী মহাবীর ভীম কর্ণকে পরাজয় করিয়া মেঘনির্ঘোষসদৃশ সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। ধৰ্ম্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠির ভীমের সেই সিংহনাদ শ্রবণে কর্ণকে পরাজিত বোধ করিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। পাণ্ডবসৈন্যগণ চারিদিকে শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিল। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ বিপক্ষ সৈন্যগণের সেই তুমুল কোলাহল শ্রবণ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। মহাবীর অর্জুন গাণ্ডীবে টঙ্কার প্রদান ও বাসুদেব শঙ্খধ্বনি করিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় ভীমের ভীষণ সিংহনাদ সেই সমস্ত শব্দ সমাচ্ছাদিত করিয়া সমুদায় সৈন্যদিগের শ্রুতিগোচর হইতে লাগিল। অনন্তর কর্ণ মৃদুভাবে ও দৃঢ়রূপে আজিহ্মগামী শর বর্ষণ আরম্ভ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে সেই সমস্ত সেনা নিপাতিত এবং অর্জুন, সাত্যকি ও ভীমসেন সিন্ধুরাজের প্রতি ধাবমান হইলে আপনার পুত্র দুর্য্যোধন কর্তব্যবিষয়ে বহুবিধ চিন্তা করিয়া অবিলম্বে দ্রোণ-নিকটে গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহার রথ মনঃ ও পবনের ন্যায় মহাবেগে দ্রোণ-সমীপে উত্তীর্ণ হইল। তখন কুরুরাজ রোষে লোহিতলোচন হইয়া দ্রোণাচার্য্যকে কহিলেন, হে গুরো! মহাবীর অর্জুন, ভীমসেন ও সাত্যকি এবং পাণ্ডবপক্ষীয় অনেক মহারথ সংগ্রামে অপরাজিত হইয়া জয়দ্রথের সমীপে গমন করিয়াছে এবং তথায় আমাদিগের প্রভূত সেনাগণকে পরাভূত করিয়া ঘোরতর যুদ্ধ করিতেছে। হে মহাত্মন্! আপনি কিরূপে সাত্যকি ও ভীমসেনের নিকট পরাভূত হইলেন? ইহলোকে আপনার ঈদৃশ পরাজয় সমুদ্র-শোষণের ন্যায় নিতান্ত বিস্ময়কর হইয়াছে। লোকে সাত্যকি, অর্জুন ও ভীমের হস্তে আপনার পরাজয় হইয়াছে শ্রবণ করিয়া আপনাকে যথোচিত নিন্দা করিতেছে। ধনুর্ব্বেদপরায়ণ দ্রোণাচার্য্য কিরূপে সমরে পরাজিত হইলেন বলিয়া আপনার উপর অশ্রদ্ধা প্রদর্শনে প্রবৃত্ত হইয়াছে। আমি অতিশয় মন্দভাগ্য। যখন তিনজন মহারথ আপনাকে অতিক্রমপূর্ব্বক গমন করিয়াছে, তখন এই সমরে আমার অবশ্যই মৃত্যু হইবে। যাহা হউক, যাহা হইয়াছে তাহার নিমিত্ত আর অনুতাপের প্রয়োজন নাই। এক্ষণে সিন্ধুরাজের রক্ষার্থ সময়োচিত উপায় উদ্ভাবনপূর্ব্বক তদনুরূপ কার্য্য করুন।
দ্রোণাচার্য্য কহিলেন, হে মহারাজ! আমি অনেক চিন্তা করিয়া যেরূপ কর্তব্য অবধারণ করিয়াছি, শ্রবণ করুন। পাণ্ডব-পক্ষীয় তিন মহারথ সম্প্রতি অতিক্রান্ত হইয়াছেন। তাঁহাদের নিমিত্ত পশ্চাদ্বর্ত্তী প্রদেশে যেরূপ ভয় হইবার সম্ভাবনা এই অন্যান্য যোধগণের নিমিত্ত অগ্রবর্তী প্রদেশেও তদ্রূপ জয়ের সম্ভাবনা আছে; কিন্তু যেখানে কৃষ্ণ ও অর্জুন রহিয়াছেন, তথায় অধিক ভয়ের আশঙ্কা হইতেছে। যাহা হউক, অর্জুনের হস্ত হইতে সিন্ধুরাজকে রক্ষা করা আমার মতে সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য। সাত্যকি এবং বৃকোদর সিন্ধুরাজের প্রতি গমন করিয়াছেন, অতএব তাঁহার রক্ষার্থ বিশেষ যত্ন করা আমাদের নিতান্ত আবশ্যক। হে মহারাজ! তুমি পূর্ব্বে শকুনির বুদ্ধি শুনিয়া যে দ্যূতক্রীড়া করিয়াছিলে এক্ষণে তাহার পরিণাম উপস্থিত হইয়াছে। তৎকালে সেই সভায় জয় অথবা পরাজয় হয় নাই, এক্ষণে আমরা এই যুদ্ধরূপ ক্রীড়ায় প্রবৃত্ত হইয়াছি, ইহার ত জয় অথবা পরাজয় লাভ হইবে? শকুনি কুরুসভায় অসংখ্য কৌরবগণের সমক্ষে পূর্ব্বে যে সকল অক্ষ লইয়া ক্রীড়া করিয়াছিল, সেই সমস্ত অক্ষ এক্ষণে তোমাদিগের তনুচ্ছিদ' দুরাসদ শররূপে পরিণত হইয়াছে। এক্ষণে সেনাগণকে দুরোদর, শরসমুদায়কে অক্ষ এবং জয়দ্রথকে পণস্বরূপ জ্ঞান কর। অদ্য সিন্ধুরাজকে পণ রাখিয়া শত্রুগণের সহিত আমাদের দ্যূতক্রীড়া হইতেছে; অতএব প্রাণপণে সর্ব্বতোভাবে জয়দ্রথকে রক্ষা করিতে যত্ন করা তোমাদের নিতান্ত আবশ্যক। সিন্ধুরাজের জীবন রক্ষা ও প্রাণনাশ আমাদের জয়পরাজয়ের কারণ। অতএব যেখানে ধনুর্দ্ধারী বীরগণ জয়দ্রথের রক্ষার নিমিত্ত নিযুক্ত রহিয়াছেন, তুমি অবিলম্বে তথায় গমনপূর্ব্বক সেই রক্ষকগণকে রক্ষা কর। আমি এই স্থানে থাকিয়া অপরাপর সৈন্যগণকে প্রেরণ এবং পাণ্ডব সৃঞ্জয়সমবেত পাঞ্চালগণকে নিবারণ করিব।
অনন্তর দুর্য্যোধন আচার্য্যের বাক্যানুসারে উগ্রকর্ম সম্পাদনে সমুদ্যত হইয়া পদানুগৎ-সমভিব্যাহারে মহাবেগে প্রস্থান করিলেন। ঐ সময় পাণ্ডবপক্ষীয় চক্ররক্ষক পাঞ্চাল-দেশীয় যুধামন্যু ও উত্তমৌজাঃ সেনাগণের পার্শ্ব দিয়া অর্জুনের নিকট গমন করিতেছিলেন। হে মহারাজ! পূর্ব্বে মহাবীর ধনঞ্জয় কৌরবসৈন্যগণের সহিত যুদ্ধ করিবার মানসে তাহাদের মধ্যে প্রবিষ্ট হইলে ঐ চক্ররক্ষকদ্বয় তাঁহার অনুগমনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। তৎকালে মহাবীর কৃতবর্মা উহাদিগকে নিবারিত করেন। এক্ষণে কুরুরাজ দুর্য্যোধন ঐ দুই জনকে সেনাগণের পার্শ্ব দিয়া অর্জুনের সমীপে গমনোদ্যত অবলোকন করিয়া সত্বর তাঁহাদিগের সহিত তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। ক্ষত্রিয়-প্রধান প্রসিদ্ধ মহারথ সেই বীরদ্বয়ও তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন যুধামন্যু কঙ্কপত্রালঙ্কৃত ত্রিংশৎ শরে দুর্য্যোধনকে, বিংশতি শরে তাঁহার সারথিকে ও চারি শরে তাঁহার চারি অশ্বকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর দুর্য্যোধন যুধামন্যুর শরাঘাতে ক্রুদ্ধ হইয়া এক বাণে তাঁহার ধ্বজ ও এক বাণে ধনুচ্ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে ভল্লদ্বারা সারথিকে রথ হইতে নিপাতিত করিয়া নিশিত শরচতুষ্টয়ে অশ্ব চতুষ্টয়কে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর যুধামন্যু সরোযনয়নে দুর্য্যোধনের বক্ষঃস্থল লক্ষ্য করিয়া সত্বর বিংশৎ শর পরিত্যাগপূর্ব্বক গর্জন করিতে লাগিলেন। উত্তমৌজাও রোষিত হইয়া হেমবিভূষিত শরনিকরে কুরুরাজের সারথিকে বিদ্ধ করিয়া শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। তখন দুর্য্যোধন উত্তমৌজার পার্ফি, সারথি ও অশ্বচতুষ্টয়কে সংহার করিলেন। মহাবীর উত্তমৌজাঃ এইরূপে হতাশ্ব ও হতসারথি হইয়া অবিলম্বে ভ্রাতা যুধামন্যুর রথে আরোহণপূর্ব্বক শরজালে দুর্য্যোধনের অশ্বগণকে তাড়িত করিতে লাগিলেন। অশ্বগণ উত্তমৌজার শরে তাড়িত হইয়া অবিলম্বে ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। ঐ সময় যুধামন্যু উৎকৃষ্ট শর পরিত্যাগপূর্ব্বক কুরুরাজের তৃণীর ও শরাসন ছেদন করিলেন। তখন মহাবীর দুর্য্যোধন সেই অশ্ব-সারথি-বিবর্জিত রথ হইতে অবরোহণ করিয়া গদা গ্রহণপূর্ব্বক পাঞ্চালদেশীয় বীরদ্বয়ের প্রতি ধাবমান হইলেন। তাঁহারা অরাতিজেতা ক্রুদ্ধ কুরুরাজকে আগমন করিতে দেখিয়া অবিলম্বে রথ হইতে অবতীর্ণ হইলেন। তখন দুর্য্যোধন গদা-প্রহারে তাঁহাদিগের সেই হেমমণ্ডিত রথ, অশ্ব ও সারথিকে ধ্বজের সহিত প্রোথিত করিয়া অবিলম্বে মদ্ররাজরথে আরোহণ করিলেন। পাঞ্চালদেশীয় রাজপুত্রদ্বয়ও অন্য দুই রথে আরূঢ় হইয়া অর্জুনের নিকট গমন করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। এদিকে সেই লোমহর্ষণ তুমুল সংগ্রামে সমুদায় বীরগণ নিতান্ত নিপীড়িত ও ব্যাকুল হইলে অরণ্যে মত্তমাতঙ্গ যেমন মত্তদ্বিপের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ মহাবীর কর্ণ যুদ্ধার্থী ভীমসেন-সমীপে সমুপস্থিত হইলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! অর্জুন-রথের পার্শ্বে মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন ও কর্ণের কিরূপ সংগ্রাম হইল? রাধানন্দন ভীমসেনকর্তৃক পূর্ব্বে পরাজিত হইয়াও কি কারণে পুনরায় তাঁহার নিকট যুদ্ধার্থ আগমন করিল? আর ভীমসেনই বা কি করিয়া সেই প্রসিদ্ধ মহারথ সূতপুত্রের প্রত্যুদ্গমনে প্রবৃত্ত হইল? ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির ভীষ্মদেব ও দ্রোণাচার্য্যকে অতিক্রম করিয়া অবধি ধনুর্দ্ধর কর্ণ ভিন্ন আর কাহাকেও ভয় করে না। কর্ণের ভয়ে তাঁহার শয়ন পর্য্যন্ত পরিত্যক্ত হইয়াছে। বৃকোদর কিরূপে সেই রথিশ্রেষ্ঠ সূতপুত্রের সহিত যুদ্ধ করিল? অর্জুনের রথাভিমুখে কর্ণ ও ভীমের কিরূপ সংগ্রাম হইল? পূর্ব্বে মহাবীর কর্ণ কুন্তীর নিকট ভীমসেনকে আপনার ভ্রাতা বলিয়া অবগত হইয়াছে এবং অর্জুন ভিন্ন আর কোন পাণ্ডবকে বিনষ্ট করিব না, বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছে। তবে এক্ষণে কি নিমিত্ত ভীমের সহিত সংগ্রাম করিল? ভীমই বা কর্ণের পূর্ব্বকৃত বৈর স্মরণ করিয়া তাহার সহিত সংগ্রাম করিতে কিরূপে সাহসী হইল? হে সঞ্জয়। আমার পুত্র মূঢ় দুর্য্যোধন নিরন্তর আশা করিয়া থাকেন যে, কর্ণ সমস্ত পাণ্ডবকে পরাজিত করিবে। ফলতঃ দুর্য্যোধন কেবল কর্ণের উপর নির্ভর করিয়াই জয়াশা করিয়া থাকে, সেই কর্ণ কিরূপে ভীমকৰ্ম্মা ভীমসেনের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল? আমার পুত্রগণ যাহাকে আশ্রয় করিয়া মহারথগণের সহিত শত্রুতা করিয়াছে; যে বীর এক রথে সসাগরা পৃথিবী পরাজয় করিয়াছে; যে ধনুর্দ্ধর সহজ কবচ কুণ্ডল ধারণপূর্ব্বক জন্মগ্রহণ করিয়াছে; ভীমসেন সেই মহাবীর কর্ণকর্তৃক পূর্ব্বকৃত অসংখ্য অপকার স্মরণ করিয়াও কিরূপে তাহার সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইল? যাহা হউক, এক্ষণে বীরদ্বয়ের কিরূপ যুদ্ধ ও কাহারই বা জয়লাভ হইল, তৎসমুদায় আদ্যোপান্ত আমার নিকট কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে নররাজ! ভীমসেন মহারথ কর্ণকে পরিত্যাগপূর্ব্বক কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয়ের নিকট গমন করিতে বাসনা করিলেন। মহাবীর কর্ণ তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া মহাবেগে তাঁহার নিকট গমনপূর্ব্বক জলধর যেমন বৃষ্টিদ্বারা ভূধরকে আচ্ছন্ন করে, তদ্রূপ কঙ্কপত্রবিশিষ্ট শরজাল বর্ষণপূর্ব্বক তাঁহাকে আবৃত করিয়া উচ্চৈঃস্বরে হাস্য করত কহিলেন, হে পাণ্ডুতনয়। তুমি শত্রুদিগের সহিত যুদ্ধ করিতে পার, ইহা আমি স্বপ্নেও অবগত নহি। যাহা হউক, তুমি অর্জুনদর্শনমানসে আমার নিকট হইতে পলায়ন করিয়া কি কুন্তীপুত্রের উপযুক্ত কর্ম করিতেছ? পলায়ন করিও না; এই স্থানে থাকিয়া চতুৰ্দ্দিক্ হইতে আমার প্রতি শরবর্ষণ কর। মহাবীর ভীমসেন কর্ণের সেই প্রকার আহ্বান শ্রবণে ক্রুদ্ধ হইয়া অর্দ্ধমণ্ডলাকারে পরিভ্রমণপূর্ব্বক শরনিকর নিক্ষেপ করত তাঁহার সহিত যুদ্ধারম্ভ করিলেন। বৰ্ম্মধারী কর্ণ সেই দ্বৈরথযুদ্ধে সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ ভীমসেনের সরল শরজালে সমাচ্ছন্ন হইলেন। বৃকোদর প্রথমতঃ কৌরবপক্ষীয় অসংখ্য বীরকে বিনাশ করিয়া বিবাদ শেষ করিবার মানসে কর্ণের প্রতি সুতীক্ষ্ণ বিবিধ বাণ নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহাবল কর্ণ স্বীয় অস্ত্রমায়াপ্রভাবে মত্ত দ্বিরদগামী ভীমসেনের শরবর্ষণ নিবারণ করিলেন। হে মহারাজ। মহাবীর সূতপুত্র রীতিমত যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করিয়াছিলেন। তিনি সমরে আচার্য্যের ন্যায় পর্য্যটনপূর্ব্বক হাস্য করত ক্রোধপূর্ণ বৃকোদরকে অবমাননা করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীমসেন কর্ণের হাস্য সহ্য করিতে না পারিয়া যুধ্যমান বীরগণের সমক্ষে মহামাতঙ্গের উপরে যেমন অঙ্কুশাঘাত করে, তদ্রূপ সূতপুত্রের বক্ষঃস্থলে বৎসদন্ত-সমুদায় নিক্ষেপপূর্ব্বক পুনরায় সুপুঙ্খ সুশাণিত একবিংশতি শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ ভীমসেনের কনকজালজড়িত পবনসদৃশ বেগবান্ অশ্বগণকে পাঁচ পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিয়া বাণজাল বর্ষণপূর্ব্বক নিমেষার্দ্ধমধ্যে বৃকোদরকে সারথি, রথ ও ধ্বজের সহিত আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে তিনি ক্রোধভরে চতুঃষষ্টি শরে ভীমের সূদৃঢ় কবচ ভেদ করিয়া মর্মভেদী নারাচাস্ত্রে তাঁহাকে আহত করিলেন। মহাবাহু বৃকোদর সেই কর্ণকাৰ্ম্মক নিঃসৃত শরসমুদায় লক্ষ্য না করিয়া অসম্ভ্রান্তচিত্তে তাঁহাকে দৃঢ়রূপে আলিঙ্গন করিলেন। তিনি কর্ণের আশীবিষোপম শরজালে বিদ্ধ হইয়া কিঞ্চিন্মাত্রও ব্যথিত হন নাই। পরিশেষে তিনি নিশিত সুতীক্ষ্ণ দ্বাত্রিংশৎ ভল্লদ্বারা কর্ণকে বিদ্ধ করিলেন। কর্ণও অবলীলাক্রমে শরবর্ষণ করিয়া জয়দ্রথবধাভিলাষী মহাবাহু ভীমসেনকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিয়া তাঁহার সহিত মৃদুভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। ভীমসেন পূর্ব্ববের স্মরণপূর্ব্বক কর্ণের সেই অপমান সহ্য করিতে না পারিয়া ক্রোধভরে অবিলম্বে তাঁহার প্রতি শরনিকর নিক্ষেপ করিলেন। ভীমপ্রেরিত সুবর্ণপুঙ্খ শরজাল শব্দায়মান বিহঙ্গ-কুলের ন্যায় ধাবমান হইয়া কর্ণকে আচ্ছন্ন করিল। রথিপ্রধান রাধেয় এইরূপ শলভকুল-সমাচ্ছন্নের ন্যায় ভীমসেনের শরনিকরে সমাবৃত হইয়া তাঁহার উপর সুতীক্ষ্ণ শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর বৃকোদর বহুবিধ ভল্লদ্বারা তাঁহার সেই শরজাল অর্দ্ধপথে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর কর্ণ পুনরায় শরবর্ষণদ্বারা ভীমসেনকে আচ্ছন্ন করিলেন। ভীমসেন কর্ণের শরজালে সমাবৃত হইয়া শলভ-সমাচ্ছন্ন শল্পকীর ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিলেন। দিবাকর যেমন আপনার রশ্মিজাল অনায়াসে ধারণ করেন, তদ্রূপ ভীমসেন কর্ণনিক্ষিপ্ত শরনিকর অক্লেশে ধারণ করিলেন। কর্ণচাপচ্যুত হেমপুঙ্খ শিলাধৌত শরজালে তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ রুধিরাপ্লুত হওয়াতে তিনি বসন্তকালীন বহুকুসুমশোভিত অশোক বৃক্ষের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। পরিশেষে তিনি কর্ণের সমরবিচরণ সহ্য করিতে না পারিয়া ক্রোধে নয়নদ্বয় উদ্বর্তনপূর্ব্বক তাঁহার উপর পঞ্চবিংশতি নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর সূতপুত্র ভীমের শরে বিদ্ধ হইয়া তীব্রবিষ আশীবিষসমাবৃত শ্বেত ভূধরের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন চতুৰ্দ্দশ বাণে কর্ণের মর্ম্ম ভেদপূর্ব্বক সুতীক্ষ্ণ শরনিকরে তাঁহার চাপচ্ছেদন, অশ্বচতুষ্টয় বিনাশ ও সারথিকে সংহার করিয়া অর্করশ্মি-সমপ্রভ নারাচসমুদায়ে বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। সূর্য্যের কিরণজাল যেমন জলধরপটল ভেদ করিয়া ভূমণ্ডলে নিপতিত হয়, তদ্রূপ ভীমনির্মুক্ত নারাচনিকর কর্ণকে বিদ্ধ করিয়া রণস্থলে পতিত হইল। হে মহারাজ! পুরুষাভিমানী কর্ণ এইরূপে ভীমসেনের শরাঘাতে ছিন্নচাপ ও বিকলাঙ্গ হইয়া সত্বর অন্য রথে পলায়ন করিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! যে কর্ণের উপর আমার পুত্রগণের মহতী জয়াশা ছিল, দুর্য্যোধন সেই কর্ণকে রণপরাজুখ অবলোকন করিয়া কি করিল? মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন কিরূপে যুদ্ধ করিল এবং মহাবীর কর্ণই বা সমরাঙ্গনে ভীমসেনকে প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় অবলোকন করিয়া কি কার্য্যের অনুষ্ঠানে প্রবত্ত হইল?
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাবীর কর্ণ পুনরায় যথাবিধি সুসজ্জিত অন্য এক রথে আরোহণপূর্ব্বক বাতোদ্ধৃত মহার্ণবের ন্যায় ভীমসেন-অভিমুখে ধাবমান হইলেন। ঐ সময়ে আপনার পুত্রেরা কর্ণকে রোষপরবশ অবলোকন করিয়া ভীমকে হুতাশনমুখে আহুত বলিয়া বোধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর রাধেয় অতি ভীষণ জ্যানিস্বন ও করতলশব্দ করিয়া ভীমের রথাভিমুখে গমন করিলেন। তখন পুনরায় সূতপুত্রের সহিত ভীমের অতি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ উপস্থিত হইল। পরস্পর-বধার্থী ঐ বীরদ্বয় ক্রোধারুণলোচনে দগ্ধ করিয়াই যেন পরস্পরকে নিরীক্ষণ করত ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গদ্বয়ের ন্যায় গর্জন করিতে লাগিলেন। পরে তাঁহারা পরস্পরকে ক্ষত বিক্ষত করিয়া কোপান্বিত ব্যাঘ্রদ্বয়ের ন্যায়, শীঘ্রগামী শ্যেনদ্বয়ের ন্যায় এবং সংক্রুদ্ধ শরভদ্বয়ের ন্যায় যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন।
হে মহারাজ! পূর্ব্বে দ্যূতক্রীড়া, বনবাস, বিরাটনগরে অবস্থান ও বহুরত্বপূর্ণ রাজ্য অপহরণ জন্য পাণ্ডবগণের যে দুঃখ হইয়াছিল, আপনি পুত্রগণের সহিত মন্ত্রণা করিয়া সুপুত্রা তপস্বিনী কুন্তীকে যে দগ্ধ করিতে সঙ্কল্প ও নিরন্তর পাণ্ডবগণকে ক্লেশ প্রদান করিয়াছিলেন, আপনার দুরাত্মা তনয়েরা সভামধ্যে দ্রৌপদীকে যে ক্লেশ প্রদানে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, দুঃশাসন দ্রুপদ-তনয়ার যে কেশাকর্ষণ করিয়াছিলেন, কর্ণ সভামধ্যে পাণ্ডবগণের প্রতি যে নিদারুণ বাক্য প্রয়োগ করিয়াছিলেন, কৌরবেরা বলিয়াছিলেন, কৃষ্ণে। তোমার ষণ্ডতিলকসদৃশ স্বামীরা নিহত হইয়া নিরয়গামী হইয়াছে, তুমি অন্য কাহাকে পতিত্বে বরণ কর, বলিয়া যে আপনার সমক্ষেই দ্রৌপদীকে অপমান করিয়া-ছিলেন, আপনার পুত্রেরা কৃষ্ণাকে যে দাসীভাবে উপভোগ করিতে বাসনা ও পাণ্ডবগণকে কৃষ্ণাজিনধারী হইয়া যে বনে গমন করিতে আদেশ করিয়াছিলেন এবং আপনার পুত্র দুর্য্যোধন ক্রোধভরে শূন্যহৃদয় বিপন্ন পাণ্ডবগণকে তৃণতুল্য বোধ করিয়া যে আস্ফালন করিয়াছিলেন, ঐ সময় সেই সমুদায় বৃত্তান্ত ভীমসেনের মনে উদয় হইতে লাগিল। তিনি বাল্যকাল অবধি যে যে দুঃখ পাইয়াছিলেন, তৎসমুদায় স্মরণ করিয়া যৎপরোনাস্তি দুঃখিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া সুবর্ণপৃষ্ঠ বৃহদ্ধনুঃ বিস্ফারণপূর্ব্বক প্রাণপণে কর্ণাভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং রাধেয় রথাভিমুখে ভাস্বর শাণিত শরজাল বিস্তার করত দিবাকরের কিরণজাল আচ্ছাদিত করিয়া ফেলিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত মহাবল কর্ণ তদ্দর্শনে হাস্য করিয়া অতি সত্বর স্বীয় শরনিকরদ্বারা ভীমসেনের শরজাল ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে নিশিত নয় শরে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর বৃকোদর অঙ্কুশাহত মাতঙ্গের ন্যায় রাধেয়শরে নিবারিত হইয়া মহাবেগে তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর কর্ণ সমরসমুৎসুক মত্ত মাতঙ্গবিক্রম পাণ্ডু-নন্দনকে বেগে সমাগত দেখিয়া তাঁহার প্রত্যুদ্গমন করিলেন এবং শতভেরীসমনিস্বন শঙ্খ প্রধুাপিত করিয়া পরমাহ্লাদে ভীমসেনের সৈন্যসমুদায় বিক্ষোভিত করিলেন। মহাবীর বৃকোদর হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতিসমবেত স্বীয় সৈন্যগণকে ছিন্ন ভিন্ন নিরীক্ষণ করিয়া কর্ণকে শরধারায় সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ শরনিকরে ভীমকে সমাচ্ছন্ন করিয়া স্বীয় হংসসন্নিভ শ্বেতাশ্বগণের সহিত তাঁহার ঋক্ষসবর্ণ কৃষ্ণাশ্বগণকে সম্মিলিত করিলেন। তদ্দর্শনে কৌরবসৈন্যমধ্যে মহান্ হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল। সেই বীরদ্বয়ের বায়ুবেগ-গামী কৃষ্ণ ও শ্বেতবর্ণ অশ্বগণ সম্মিলিত হইয়া গগনমণ্ডলস্থ সিতাসিতই মেঘের ন্যায় শোভা ধারণ করিল।
হে রাজন! ঐ সময় কৌরবপক্ষীয় মহারথেরা কর্ণ ও বৃকোদরকে ক্রোধে অতিমাত্র আক্রান্ত নিরীক্ষণ করিয়া ভীতমনে কম্পিত হইতে লাগিলেন। সমরাঙ্গন যমরাজের রাজধানীর ন্যায় অতিশয় দুর্নিরীক্ষ্য হইয়া উঠিল। মহারথগণ সেই জনতা-মধ্যে ঐ বীরদ্বয়ের কাহারও জয় পরাজয় স্থির করিতে পারিলেন না; কেবল ঐ বীরদ্বয় পরস্পর সমীপবর্ত্তী হইয়া অস্ত্রযুদ্ধ করিতেছেন, এইমাত্র অবলোকন করিলেন। তখন সেই অরাতি নিপাতন মহারথদ্বয় পরস্পরের বধার্থী হইয়া পরস্পরের প্রতি বাণবর্ষণ করত আকাশমণ্ডল শরসমাচ্ছন্ন করিয়া বারিধারাবর্ষী জলদের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের কঙ্কপত্র বিভূষিত সুবর্ণময় শরনিকরদ্বারা গগনমণ্ডল উল্কাবিভাসিতের' ন্যায়, শরৎ-কালীন সারস-সমাচ্ছন্নের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। ঐ সময় মহাবীর কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয়, ভীমসেনকে কর্ণের সহিত সমরে সম্মিলিত দেখিয়া তাঁহাকে অতিভারাক্রান্ত বিবেচনা করিতে লাগিলেন। অনন্তর কর্ণ ও ভীমসেন পরস্পর পরস্পরের শরনিকর নিরাকৃত করিয়া দৃঢ়তর শর প্রয়োগ করিতে আরম্ভ করিলে অসংখ্য অশ্ব, নর ও হস্তী সমুদায় বিগতাসু হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। তাহাদিগের নিপাতনে অসংখ্য কৌরবসৈন্য বিনষ্ট হইতে লাগিল। এইরূপে মনুষ্য, অশ্ব ও হস্তীসকল নিহত হইলে তাহাদিগের মৃতদেহে ক্ষণকালের মধ্যে সমরভূমি সমাচ্ছন্ন হইয়া গেল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! ভীম লঘুবিক্রম কর্ণের সহিত যখন সংগ্রাম করিতে সমর্থ হইল, তখন তাহার বলবীর্য্য নিতান্ত অদ্ভুত বলিয়া বোধ হইতেছে। যে কর্ণ সর্ব্বশস্ত্রধারী সমরে উদ্যত যক্ষ, অসুর ও মনুষ্যগণের সহিত অমরগণকে নিবারণ করিতে পারে, সে ভীমকে কেন পরাজয় করিতে সমর্থ হইল না? যাহা হউক, ঐ বীরদ্বয়ের প্রাণসংশয়কর যুদ্ধ কিরূপ হইল, তুমি তাহা কীর্তন কর। আমার বোধ হয়, জয় বা পরাজয় উভয়েরই আয়ত্ত। হে সঞ্জয়। আমার পুত্র দুর্য্যোধন কর্ণের সাহায্য লাভ করিয়া সমরে সাত্যকি ও বাসুদেবের সহিত পাণ্ডবগণকে পরাজয় করিবার নিমিত্ত উৎসাহিত হইয়া থাকেন। কিন্তু আমি কর্ণকে ভীমশরে বারংবার পরাজিত শ্রবণ করিয়া মোহে নিতান্ত অভিভূত হইতেছি। এক্ষণে আমার পুত্রের দুর্নীতি প্রভাবেই কৌরবগণ কালকবলে নিপতিত হইতেছেন। কর্ণ পাণ্ডবগণকে কখনই পরাজয় করিতে সমর্থ হইবেন না। তিনি তাহাদিগের সহিত যতবার যুদ্ধ করিয়াছেন, ততবারই পরাজিত হইয়াছেন। অমরগণ-সমবেত সুররাজ ইন্দ্রও যে পাণ্ডবগণকে পরাজয় করিতে সমর্থ নহেন, মন্দবুদ্ধি দুর্য্যোধন তাহা বুঝিতে পারে না। মধুলাভার্থী যেমন বৃক্ষে আরোহণকালে আপনার অধঃপতন অনুধাবন করে না, তদ্রূপ দুরাত্মা দুর্য্যোধন ধনেশ্বরতুল্য ধর্মরাজের ধন হরণ করিয়া আত্মবিনাশ অবধারণ করিতে সমর্থ হইতেছে না। ঐ কৈতব-পরতন্ত্র দুরাত্মা শঠতাপূর্ব্বক মহাত্মা পাণ্ডবগণের রাজ্যাপহরণ করিয়া তাহাদিগকে পরাজিত বোধ করত সতত তাহাদের অবমাননা করিয়া থাকে। আমিও পুত্রবাৎসল্যে একান্ত অভিভূত হইয়া ধৰ্ম্মপরায়ণ পাণ্ডবগণকে বঞ্চিত করিয়াছি। দূরদর্শী যুধিষ্ঠির অনেক বার সন্ধিস্থাপনের বাসনা করিয়াছিল, কিন্তু আমার আত্মজগণ তাহাকে যুদ্ধে অশক্ত বোধ করিয়া তাহার বাক্যে উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়াছে। হে সঞ্জয়। তুমি কহিলে মহাবীর ভীমসেন পূর্ব্বের সেই সমস্ত দুঃখ ও অপকার স্মরণ করিয়া কর্ণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছে। এক্ষণে কর্ণ ও ভীম পরস্পরের বধসাধনে সমুদ্যত হইয়া যেরূপ যুদ্ধ করিয়াছিল তাহা কীর্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! অরণ্যমধ্যে কুঞ্জরযুগলের ন্যায় পরস্পরবধার্থী মহাবীর ভীম ও কর্ণের যেরূপ যুদ্ধ হইয়া-ছিল, শ্রবণ করুন। মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণ একান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক রোষপরবশ ভীমসেনকে মহাবেগ-সম্পন্ন, প্রসন্নমুখ, ত্রিংশৎ শরে বিদ্ধ করিলেন। ভীমসেন নিশিত তিন শরে তাঁহার শরাসন ছেদন করিয়া ভল্লাস্ত্রে তাঁহার সারথির প্রাণ সংহারপূর্ব্বক রথ হইতে তাঁহাকে ভূতলে নিপাতিত করিলেন। তখন কর্ণ তাঁহাকে সংহার করিবার নিমিত্ত কনক-বৈদুর্য্য-সমলঙ্কৃত, দণ্ডসম্পন্ন, কালশক্তির ন্যায় প্রাণান্তকর এক মহাশক্তি গ্রহণ, উৎক্ষেপণ ও সন্ধানপূর্ব্বক বজ্রের ন্যায় ভীমের প্রতি পরিত্যাগ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। দুর্য্যোধন 'প্রভৃতি আপনার আত্মজগণ সেই সিংহনাদ শ্রবণ করিয়া পরম পরিতুষ্ট হইলেন। তখন মহাবীর ভীম অনল ও সূর্য্যপ্রভনির্মোক-নির্মুক্ত ভীষণ ভুজগসদৃশ সেই কর্ণভুজনির্মুক্ত সুদারুণ শক্তি সাত শরে নভোমণ্ডলেই ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং কর্ণের জীবনানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়াই যেন ক্রোধভরে তাঁহার উপর স্বর্ণপুঙ্খ শিলাশিত যমদণ্ডোপম শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন কর্ণও অন্য শরাসন গ্রহণ ও আকর্ষণপূর্ব্বক শরজাল বিস্তার করিতে আরম্ভ করিলেন। ভীমসেন নতপর্ব্ব নয় বাণে সেই কর্ণবিমুক্ত শরসমুদায় ছেদন করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে তাঁহারা কখন গাভীলাভার্থী মত্ত বৃষভদ্বয়ের ন্যায় চীৎকার, কখন আমিষলোলুপ শার্দুলের ন্যায় তর্জন-গর্জন, কখন পরস্পরের প্রতি প্রহার-উদ্যত, কখন পরস্পরের রন্ধ্রান্বেষণ এবং কখন বা গোষ্ঠস্থিত মহাবৃষভদ্বয়ের ন্যায় সক্রোধ নয়নে পরস্পরকে নিরীক্ষণ করিতে আরম্ভকরিলেন। মাতঙ্গদ্বয় যেমন সমাগত হইয়া পরস্পরের উপর দশন প্রহার করিয়া থাকে, তদ্রূপ তাঁহারা রোষকষায়িত লোচনে পরস্পরের প্রতি শর বৃষ্টি বিসর্জন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন এবং কখন হাস্য, কখন ভর্ৎসনা ও কখন বা শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাঁহাদের ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। তখন মহাবীর ভীম কর্ণের কার্ম্মকের মুষ্টিদেশ ছেদন ও ধবল-কায় অশ্বসকলকে যমালয়ে প্রেরণ করিয়া সারথিকে রথোপস্থ হইতে ভূতলে নিপাতিত করিলেন। এইরূপে মহাবীর কর্ণ ভীমশরে হতাশ্ব, হতসারথি ও বিমোহিতপ্রায় হইয়া চিন্তাসাগরে নিমগ্ন হইলেন এবং তৎকালে কি করিবেন, কিছুই অবধারণ করিতে পারিলেন না।
হে মহারাজ! ঐ সময় কুরুরাজ দুর্য্যোধন কর্ণকে একান্ত বিপদাপন্ন অবলোকন করিয়া কম্পিত-কলেবরে ক্রোধভরে দুর্জয়কে কহিলেন, হে দুর্জয়! ঐ দেখ, অগ্রে ভীম কর্ণকে শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত করিতেছে; অতএব তুমি কর্ণের সাহায্যার্থ অবিলম্বে গমনপূর্ব্বক শ্মশ্রুশূন্য ভীমকে বিনাশ কর। তখন আপনার আত্মজ দুর্জয় জ্যেষ্ঠভ্রাতার আজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত ভীমের প্রতি ধাবমান হইলেন এবং ভীমকে নয়, ভীমের অশ্বগণকে আট ও সারথিকে ছয় বাণে নিপীড়িত করত তিন শরে তাঁহার কেতু বিদ্ধ করিয়া পুনরায় তাঁহার প্রতি সাত শর প্রয়োগ করিলেন। তখন ভীম ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া শরনিকরদ্বারা দুর্জয়ের মর্ম্ম বিদ্ধ করিয়া তাঁহাকে অশ্বগণ ও সারথির সহিত যমসদনে প্রেরণ করিলেন। মহাবীর কর্ণ দুঃখিত মনে অবিরল-বাষ্পাকুল-লোচনে সেই দিব্যাভরণ-ভূষিত ক্ষিতিতলে নিপতিত ভুজঙ্গের ন্যায় বিলুণ্ঠমান দুর্জয়কে প্রদক্ষিণ করিতে লাগিলেন। তখন ভীমসেন সেই প্রবল বৈরী কর্ণকে রথশূন্য করিয়া হাস্য-মুখে শতঘ্নীতে যেমন শঙ্কু বিদ্ধ করে, তদ্রূপ কর্ণের গাত্রে শরনিকর বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে মহারথ কর্ণ ভীমের সায়কসমূহে ক্ষত-বিক্ষত কলেবর হইয়াও তৎকালে রোষপরবশ বৃকোদরকে পরিত্যাগ করিলেন না।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহারথ কর্ণ ভীমসেনের ভীষণ শরপ্রভাবে পুনরায় রথশূন্য ও পরাজিত হইয়া সত্বর অন্য রথে আরোহণপূর্ব্বক ভীমসেনকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মাতঙ্গদ্বয় যেমন মিলিত হইয়া বিশাল দশনাগ্রদ্বারা পরস্পরকে প্রহার করিয়া থাকে, তদ্রূপ সেই বীরদ্বয় আকর্ণাকৃষ্ট শরনিকর পরিত্যাগপূর্ব্বক পরস্পরকে প্রহার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন মহাবীর কর্ণ ভীমের প্রতিশর নিক্ষেপপূর্ব্বক সিংহনাদ করিয়া পুনরায় শরনিকরে তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। ভীমসেন তাঁহাকে প্রথমতঃ দশ শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় বিংশতি শরে বিদ্ধ করিলেন। কর্ণ ভীমের বক্ষঃস্থলে নয় বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক এক শাণিত সায়কে তাঁহার ধ্বজ বিদ্ধ করিয়া গর্জন করিতে লাগিল। তখন মহাবীর ভীম যেমন অঙ্কুশদ্বারা হস্তীকে ও কশা দ্বারা অশ্বকে প্রহার করিয়া থাকে, তদ্রূপ ত্রিষষ্টি সায়কে কর্ণকে বিদ্ধ করিলেন।
এইরূপে মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণ ভীমসেন-শরে গাঢ়বিদ্ধ হইয়া রোষকষায়িত লোচনে সৃক্কণী লেহনপূর্ব্বক ভীমের সংহারার্থ ইন্দ্র নির্মুক্ত বজ্রের ন্যায় সর্ব্বদেহ-বিদারণক্ষম এক বাণ নিক্ষেপ করিলেন। সেই বিচিত্রপুঙ্খ শিলীমুখ কর্ণের কার্মুক হইতে নির্মুক্ত হইয়া ভীমের দেহ ভেদপূর্ব্বক ভূগর্ত্তে প্রবিষ্ট হইল। তখন মহাবীর বৃকোদর সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইয়া অবিচারিতমনে এক চতুর্হস্তপরিমিত, ষকোণসম্পন্ন, সুবর্ণ-মণ্ডিত, অশনিসদৃশ গুরুতর গদা গ্রহণপূর্ব্বক সুররাজ যেমন অসুরগণকে সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ সেই গদাঘাতে কর্ণের অশ্বগণকে নিপাতিত করিলেন। তৎপরে শরনিকরে তাঁহার সারথিকে সংহার পূর্ব্বক ক্ষুর প্রদ্বারা ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন কর্ণ নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া সেই অশ্বহীন, সারথিবিহীন, ধ্বজশূন্য রথ পরিত্যাগ করিয়া শরাসন আকর্ষণ-পূর্ব্বক ভূতলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। আমরা তাঁহাকে রথশূন্য হইয়াও শত্রুনিবারণে উদ্যত দেখিয়া একান্ত বিস্ময়া-বিষ্টচিত্তে তাঁহার অসাধারণ বলবীর্য্য অবলোকন করিতে লাগিলাম।
ঐ সময় মহারাজ দুর্য্যোধন কর্ণকে রথশূন্য নিরীক্ষণ করিয়া দুর্মুখকে কহিলেন, হে দুর্মুখ! ভীমসেন কর্ণকে রথভ্রষ্ট করিয়াছে; অতএব তুমি অবিলম্বে উহাকে রথে আরোপিত কর। দুর্মুখ দুর্য্যোধনের বাক্যশ্রবণে সত্বর কর্ণের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া অস্ত্রজাল বিস্তার করত ভীমকে নিবারণ করিতে লাগিলেন; তখন মহাবীর ভীম দুর্মুখকে কর্ণের সাহায্যে প্রবৃত্ত দেখিয়া সন্তুষ্ট মনে সৃক্কণী লেহন করিতে আরম্ভ করিলেন। তৎপরে শর প্রয়োগপূর্ব্বক কর্ণকে নিবারণ করিয়া অবিলম্বে দুর্মুখের প্রতি ধাবমান হইয়া নতপর্ব্ব সুমুখ নয় বাণে তাঁহাকে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। দুর্মুখ বিনষ্ট হইলে মহাবীর কর্ণ তাঁহার রথে আরোহণপূর্ব্বক প্রদীপ্তদিবাকরের ন্যায় শোভমান হইলেন এবং দুর্মুখকে শোণিতলিপ্ত-কলেবর, ভিন্নমর্ম ও শরাসনে শয়ান অবলোকনপূর্ব্বক মুহূর্তকাল যুদ্ধে নিরস্ত হইয়া অশ্রুপূর্ণলোচনে তাঁহাকে প্রদক্ষিণ ও অতিক্রম করিয়া দীর্ঘ ও উষ্ণ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া রহিলেন। ইত্যবসরে মহাবীর ভীমসেন কর্ণের প্রতি চতুৰ্দ্দশ নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। সেই ভীমনিক্ষিপ্ত রুধিরপায়ী হেমচিত্রিত সুবর্ণপুঙ্খ নারাচসমুদায় দশদিক্ উদ্ভাসিত করিয়া তাঁহার কবচ ভেদ ও শোণিত পানপূর্ব্বক ভূতলে প্রবেশ করত বিলমধ্যে অর্দ্ধপ্রবিষ্ট ক্রোধোদ্ধত উরগসমূহের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। তখন মহাবীর কর্ণ অবিচারিতচিত্তে সুবর্ণখচিত ভয়ঙ্কর চতুৰ্দ্দশ নারাচদ্বারা ভীমসেনকে বিদ্ধ করিলেন। ঐ সমস্ত নারাচ ভীমের দক্ষিণ ভুজ ভেদ করিয়া পক্ষিগণ যেমন কুঞ্জমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ ধরণীতলে প্রবিষ্ট হইল। দিবাকর অস্তগত হইলে তাঁহার ভাস্বর অংশুজাল যেরূপ শোভা প্রাপ্ত হয়, কর্ণনিক্ষিপ্ত নারাচনিকর ধরাতলে প্রবেশ করত সেইরূপ শোভা পাইতে লাগিল। মহাবীর ভীম ঐ সকল মৰ্ম্মভেদী নারাচে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া জলধারাস্রাবী অচলের ন্যায় অনবরত রুধির ক্ষরণ করিতে লাগিলেন। তখন তিনি পতগরাজ গরুড়ের তুল্য বেগশালী তিন শরে কর্ণকে এবং সাত শরে তাহার সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। মহাযশাঃ কর্ণ ভীমের বাহুবলে নিতান্ত নিপীড়িত ও একান্ত বিহ্বল হইয়া সমর পরিহারপূর্ব্বক বেগগামী তুরঙ্গ-সমুদায় সঞ্চালন করত পলায়ন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীম সুবর্ণখচিত শরাসন বিস্ফারিত করিয়া প্রজ্বলিত হুতাশনের ন্যায় রণস্থলে অবস্থান করিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। অকিঞ্চিৎকর পুরুষকারে ধিক্! আমি দৈবকে শ্রেষ্ঠ বলিয়া বিবেচনা করি। মহাবীর কর্ণ কৃষ্ণের সহিত পাণ্ডবগণকে রণস্থলে পরাজয় করিবার নিমিত্ত উৎসাহ প্রদর্শন করিয়া থাকে; কিন্তু সে ভীমের শরে নিপীড়িত হইয়া তাহাকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইল না। কর্ণের সমান যোদ্ধা পৃথিবীমধ্যে আর কেহই নাই; আমি এই কথা দুর্য্যোধনের মুখে বারংবার শ্রবণ করিয়াছি। মন্দবুদ্ধিপরায়ণ দুর্য্যোধন পূর্ব্বে আমাকে কহিয়াছিল, কর্ণ মহাবল পরাক্রান্ত দৃঢ়ধম্বা ও ক্রমশূন্য, তিনি আমার সহায় হইলে হতবীর্য্য বিচেতনপ্রায় পাণ্ডবগণের কথা দূরে থাকুক, সুরগণও আমাকে পরাজয় করিতে সমর্থ হন না; কিন্তু এক্ষণে সে কর্ণকে নির্বিষ ভুজঙ্গের ন্যায় পরাজিত ও রণস্থল হইতে পলায়িত নিরীক্ষণ করিয়া কি করিতেছে? কি আশ্চর্য্য। দুরাত্মা দুর্য্যোধন মোহাবিষ্ট হইয়া যুদ্ধে একান্ত অপটু একমাত্র দুর্মুখকে হুতাশনমুখে পতঙ্গের ন্যায় সমরে প্রেরণ করিয়াছিল। মহাবীর অশ্বত্থামা, মদ্ররাজ ও কূপ- ইঁহারা কর্ণের সহিত সমবেত হইয়া ভীমের সমক্ষে অবস্থান করিতে সমর্থ হন না। ইহারা সেই কালান্তক যমসদৃশ ভীমকৰ্ম্মা ভীমসেনের অযুত নাগতুল্য বল ও ক্রুর ব্যবসায় অবগত হইয়া কি নিমিত্ত তাহার রোষানল প্রজ্বলিত করিয়া দিলেন? কিন্তু একমাত্র কর্ণ স্বীয় বাহুবল অবলম্বনপূর্ব্বক ভীমকে অনাদর করিয়া তাঁহার সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। অসুরবিজয়ী সুররাজের ন্যায় ভীমসেন তাঁহাকে পরাজয় করিয়াছে। অতএব ভীমকে সমরে পরাজয় করা কাহারও সাধ্যায়ও নহে। যে ভীম ধনঞ্জয়কে অন্বেষণ করিবার নিমিত্ত দ্রোণকে প্রমথিত করিয়া আমার সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছে; বজ্রপ্রহারে উদ্যত দেবরাজ ইন্দ্রের সম্মুখীন অসুরের ন্যায় কে জীবিতাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক তাঁহার সমক্ষে গমন বা অবস্থান করিতে সমর্থ হইবে? মনুষ্য কৃতান্ত-নিকেতনে গমন করিয়া প্রতিনিবৃত্ত হইতে পারে; কিন্তু ভীমের হস্তে নিপতিত হইলে কিছুতেই প্রতিগমন করিতে সমর্থ হয় না। যাহারা মোহাবিষ্ট হইয়া ক্রোধপরায়ণ ভীমের প্রতি ধাবমান হইয়াছিল, সেই সমস্ত অল্পতেজঃসম্পন্ন মনুষ্যেরা বহ্নিমধ্যে প্রবিষ্ট পতঙ্গের ন্যায় বিনষ্ট হইয়াছে। ভীমসেন রোষপরবশ হইয়া কৌরবগণ-সমক্ষে সভামধ্যে আমার পুত্রগণকে বধ করিবার নিমিত্ত যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, দুঃশাসন দুর্য্যোধনের সহিত তাহা স্মরণ ও কর্ণকে পরাজিত নিরীক্ষণ করিয়া ভয়প্রযুক্তই ভীমের সহিত যুদ্ধ করিতে বিরত হইয়াছে। মূঢ়-মতি দুর্য্যোধন সভামধ্যে বারংবার কহিয়াছিল, আমি কর্ণ ও দুঃশাসনের সহিত মিলিত হইয়া পাণ্ডবগণকে পরাজিত করিব; কিন্তু সে এক্ষণে ভীমের বাহুবলে কর্ণকে পরাজিত ও রথশূন্য নিরীক্ষণ এবং কৃষ্ণের প্রত্যাখ্যান বিষয় স্মরণ করিয়া অতিশয় সন্তপ্ত হইতেছে। সে স্বদোষে ভ্রাতৃগণকে ভীমসেনশরে নিহত দেখিয়া অতিশয় আকুলিত হইয়াছে, সন্দেহ নাই। যাহা হউক, এক্ষণে কোন্ জীবিতলাভার্থী ব্যক্তি সাক্ষাৎ কৃতান্তসদৃশ নিতান্ত ক্রোধাবিষ্ট ভীমায়ুধ ভীমের প্রতিকূলে গমন করিবে? বোধ হয়, মনুষ্য বাড়বানলমধ্যে প্রবিষ্ট হইলে মুক্তিলাভ করিতে - পারে; কিন্তু ভীমের সম্মুখে গমন করিলে তাহার আর কিছুতেই পরিত্রাণ নাই। অর্জুন, কেশব, সাত্যকি ও পাঞ্চালগণ রোষ-পরবশ হইলে প্রাণরক্ষণেও নিরপেক্ষ হইয়া থাকেন। অতএব এক্ষণে নিশ্চয়ই আমার পুত্রগণের প্রাণসংশয় হইয়া উঠিয়াছে।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! আপনি এক্ষণে এই লোকক্ষয় উপস্থিত দেখিয়া শোক করিতেছেন, কিন্তু আপনিই ইহার মূল কারণ সন্দেহ নাই। আপনি পুত্রগণের বাক্যে বৈরানল প্রজ্বলিত করিয়াছেন এবং মনুষ্য যেমন হিতকর ঔষধপানে একান্ত পরাজুখ হয়, তদ্রূপ আপনিও সুহৃদ্গণের বাক্যে অনাদর | প্রদর্শন করিতেছেন। হে নরোত্তম। আপনি স্বয়ং নিতান্ত দুর্জয় কালকূট পান করিয়া আছেন, এক্ষণে তাহার সমগ্র ফল প্রাপ্ত হউন। যোধগণ সাধ্যানুসারে যুদ্ধ করিতেছে, তথাপি আপনি তাহাদের নিন্দায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন। যাহা হউক, এক্ষণে যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছে, তাহা আনুপূর্ব্বিক বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
অনন্তর আপনার আত্মজ দুৰ্ম্মর্ষণ, দুঃসহ, দুৰ্ম্মদ, দুর্দ্ধর ও জয় এই পাঁচ সহোদর কর্ণের পরাজয় দর্শনে একান্ত অসহিষ্ণু হইয়া ভীমের প্রতি ধাবমান হইলেন এবং তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিয়া শলভশ্রেণীর ন্যায় শরনিকরে দশদিক্ সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীম সেই সমস্ত দেবরূপী রাজকুমারগণকে সহসা সমাগত দেখিয়া হাস্যমুখে প্রতিগ্রহ করিলেন। তখন কর্ণ দুৰ্ম্মর্ষণ প্রভৃতি আপনার আত্মজগণকে ভীমের সম্মুখবর্তী দেখিয়া সুবর্ণপুঙ্খ শিলানিশিত সুতীক্ষ্ণ বিশিখ বর্ষণপূর্ব্বক তাঁহার সন্নিহিত হইলেন। ঐ সময় মহাবীর ভীম আপনার পুত্রগণকর্তৃক নিবারিত হইয়াও সত্বর কর্ণের প্রতি গমন করিলেন। তখন আপনার পুত্রগণ কর্ণের চতুর্দিকে অবস্থানপূর্ব্বক ভীমের প্রতি সন্নতপর্ব্ব শরজাল নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া পঞ্চবিংশতি বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক সেই দুৰ্ম্মর্ষণ প্রমুখ পঞ্চভ্রাতাকে অশ্ব ও সারথির সহিত শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। বিচিত্র কুসুম সুশোভিত পাদপদল যেমন সমীরণপ্রভাবে ভগ্ন হইয়া যায়, তদ্রূপ তাঁহারা সারথি-দিগের সহিত গতাসু হইয়া রথ হইতে ভূতলে নিপতিত হইলেন। হে মহারাজ! মহাবীর ভীম এইরূপে কর্ণকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিয়া আপনার আত্মজগণকে বিনাশ করিলেন দেখিয়া সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হইল। তখন সূতপুত্র কর্ণ ভীমের নিশিত শরে নিবারিত হইয়া তাঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। ভীমও রোষারুণলোচনে শরাসন বিস্ফারণপূর্ব্বক বারংবার তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহারথ কর্ণ আপনার আত্মজগণকে ভীমশরে বিনষ্ট দেখিয়া ক্রোধাবিষ্ট ও আত্মরক্ষায় হতাশ হইলেন এবং তাঁহারই প্রত্যক্ষে আপনার পুত্রগণ নিহত হইতেছেন, এই নিমিত্ত তিনি তৎকালে আপনাকে অপরাধী বোধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীম পূর্ব্ববৈর স্মরণপূর্ব্বক রোষপরবশ হইয়া সসম্ভ্রমে কর্ণের প্রতি নিশিত শরনিকর পরিত্যাগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। কর্ণ প্রথমতঃ তাঁহাকে পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় হাস্যমুখে স্বর্ণপুঙ্খ শিলাশিত সপ্ততি সায়কে বিদ্ধ করিলেন। ভীমসেন এই বর্ণনির্মুক্ত শরনিকর লক্ষ্য না করিয়াই তাঁহার উপর আনতপর্ব্ব শত শর নিক্ষেপপূর্ব্বক পুনরায় সুতীক্ষ্ণ পাঁচ বাণে তাঁহার মৰ্ম্মস্থল বিদ্ধ করিয়া এক ভল্লে তাঁহার শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন কর্ণ নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া অন্য কার্মুক গ্রহণপূর্ব্বক শরজালে ভীমসেনকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর ক্রোধভরে কর্ণের সারথি ও অশ্বগণকে সংহার করিয়া পুনর্ব্বার হাস্যমুখে তাঁহার স্বর্ণপৃষ্ঠ কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর মহারথ কর্ণ রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া ক্রোধভরে গদা গ্রহণপূর্ব্বক ভীমের প্রতি প্রয়োগ করিলেন। মহাবীর ভীম সেই কর্ণনির্মুক্ত গদা আগমন করিতে দেখিয়া সর্ব্বসৈন্য-সমক্ষে শরনিকরে নিবারণপূর্ব্বক কর্ণকে সংহার করিবার মানসে অজস্র সহস্র সহস্র শর প্রয়োগ করিতে লাগিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণ শরজালদ্বারা ভীমের শরনিকর নিরাশ করিয়া অসংখ্য সায়ক নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার কবচ ছেদন করিয়া ফেলিলেন এবং সৈন্যগণ সমক্ষে তাঁহকে লক্ষ্য করিয়া পঞ্চবিংশতি ক্ষুদ্রকাস্ত্র নিক্ষেপ করিলেন, তদ্দর্শনে সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হইল।
তখন মহাবীর বৃকোদর ক্রোধাবিষ্ট হইয়া কর্ণের প্রতি নতপর্ব্ব নয় বাণ নিক্ষেপ করিলেন। সেই সমস্ত সুতীক্ষ্ণ শর কর্ণের কবচ ও দক্ষিণ ভুজ ভেদ করিয়া পন্নগগণ যেরূপ বল্মীকমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ ভূগর্ন্তে প্রবিষ্ট হইল। এইরূপে মহাবীর কর্ণ ভীমশরে সমাচ্ছন্ন হইয়া পুনরায় সমরে পরাজুখ হইলেন। তদ্দর্শনে রাজা দুর্য্যোধন ভ্রাতৃগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে ভ্রাতৃগণ। তোমরা যত্নবান্ হইয়া সত্বর কর্ণের রথাভিমুখে ধাবমান হও। হে মহারাজ! তখন আপনার আত্মজ চিত্র, উপচিত্র, চিত্রক্ষ, চারুচিত্র, শরাসন, চিত্রায়ুধ ও চিত্রবৰ্ম্মা ইঁহারা জ্যেষ্ঠভ্রাতা দুর্য্যোধনের আজ্ঞাপ্রাপ্তিমাত্র শরনিকর বর্ষণ করত ভীমের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর ভীম তাঁহারা উপস্থিত হইতে না হইতেই তাঁহাদিগকে এক এক শরে বিনাশ করিলেন। তাঁহারাও তৎক্ষণাৎ বাতভগ্ন মহীরুহের ন্যায় সমর-ভূমিতে নিপতিত হইলেন। তখন মহাবীর কর্ণ আপনার মহারথ | পুত্রগণকে বিনষ্ট দেখিয়া অশ্রুপূর্ণ-লোচনে বিদুরের সেই সমস্ত বাক্য স্মরণ করিতে লাগিলেন। পরে তিনি পুনরায় যথাবিধি সুসজ্জিত অন্য রথে আরোহণ করিয়া সত্বর যুদ্ধার্থ ভীমের সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। তখন ঐ মহাবীরদ্বয় স্বর্ণপুঙ্খ নিশিত শরজালে পরস্পরকে বিদ্ধ করিয়া দিনকরকরজালসংবলিত জলধরযুগলের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। অনন্তর মহাবীর বৃকোদর রোষপরবশ হইয়া প্রভাভাস্বর নিশিত ষত্রিংশৎ ভল্লদ্বারা কর্ণের কবচ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। সূতপুত্র কর্ণও আনতপর্ব্ব পঞ্চাশৎ শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন সেই রক্তচন্দনচর্চ্চিত বীরদ্বয় শরব্রণাঙ্কিত' ও শোণিতসিক্ত-কলেবর হইয়া উদিত চন্দ্র-সূর্য্যের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইলেন। তৎকালে তাঁহাদের বর্ম্ম ছিন্ন ভিন্ন ও দেহ রুধিরোক্ষিত হওয়াতে তাঁহারা নির্মোকমুক্ত উরগদ্বয়ের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন।
অনন্তর সেই বীরদ্বয় দশনপ্রহারে সমুদ্যত ব্যাঘ্রদ্বয়ের ন্যায় পরস্পরকে অস্ত্রপ্রহার ও জলধারাবর্ষী জলধরযুগলের ন্যায় পরস্পরের উপর অনবরত শরধারা বিসর্জন করিতে লাগিলেন এবং মাতঙ্গদ্বয় যেমন বিশাল দশনদ্বারা পরস্পরের দেহ ভেদ করিয়া থাকে, তদ্রূপ তাঁহারা সায়ক বর্ষণপূর্ব্বক পরস্পরের দেহ ভেদ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তাঁহারা কখন সিংহনাদ, কখন শরবর্ষণ, কখন ক্রীড়া, কখন রোষকষায়িত লোচনে পরস্পরকে অবলোকন ও কখন বা রথদ্বারা মণ্ডলাকারে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। সেই সিংহসদৃশ মহাবল পরাক্রান্ত বীরদ্বয় গাভীলাভার্থ সমুৎসুক বৃষভদ্বয়ের ন্যায়, গভীর নিনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক ইন্দ্র ও বৈরোচনের ন্যায় ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ সময় মহাবীর ভীমসেন শরাসন আকর্ষণ করিয়া বিদ্যুদ্দামসংবলিত অম্বুদের ন্যায় সমরাঙ্গনে শোভা পাইতে লাগিলেন। তিনি বারিধারাসদৃশ সুপুঙ্খ শরনিকরদ্বারা পৰ্ব্বতসদৃশ কর্ণকে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তাঁহার কাৰ্ম্মকনিস্বন অশনিনির্ঘোষের ন্যায় শ্রবণগোচর হইল। হে মহারাজ! তখন আপনার পুত্রগণ ভীমের সেই অদ্ভুত বলবীর্য্য অবলোকন করিতে লাগিলেন। এইরূপে মহাবীর ভীম অর্জুন, কেশব, সাত্যকি ও চক্ররক্ষকদ্বয়কে আনন্দিত করিয়া কর্ণের সহিত অতি ভীষণ সমরানল প্রজ্বলিত করিলেন। আপনার আত্মজগণ ভীমের অসাধারণ পরাক্রম, ভুজবীর্য্য ও ধৈর্য্য অবলোকন করিয়া একান্ত বিমনায়মান হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। মত্ত মাতঙ্গ যেমন প্রতিপক্ষ মাতঙ্গের গর্জন সহ্য করিতে পারে না, তদ্রূপ মহারথ রাধেয় ভীমসেনের জ্যানিনাদ সহ্য করিতে পারিলেন না। তিনি ক্ষণকাল ভীমসেনের নিকট হইতে অপসৃত হইয়া বৃকোদরশরে নিপাতিত আপনার পুত্রগণকে অবলোকন করত নিতান্ত বিমনায়মান ও দুঃখিত হইলেন এবং দীর্ঘ ও উষ্ণ নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক পুনরায় ভীমাভিমুখে গমন করিলেন। তিনি ক্রোধে লোহিতনেত্র হইয়া ভীষণ ভুজঙ্গের ন্যায় গর্জনপূর্ব্বক শরবর্ষণ করত ক্ষিপ্তরশ্মি ভাস্করের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। মহাবীর বৃকোদর দিবাকরের করজালের ন্যায় কর্ণের শরজালে সমাচ্ছন্ন হইলেন। পক্ষিগণ যেমন বৃক্ষকোটরে প্রবৃষ্ট হয়, তদ্রূপ ময়ূর-পুচ্ছবিভূষিত, রাধেয়বিসৃষ্ট শরসকল ভীমসেনের সর্ব্বাঙ্গে প্রবেশ করিল। তখন কর্ণচাপচ্যুত সুবর্ণপুঙ্খ শরনিকর উপর্যুপরি পতিত হইয়া শ্রেণীবদ্ধ হংসসমুদায়ের ন্যায় বিরাজিত হইতে লাগিল। তৎকালে বোধ হইল যেন, বাণসকল চাপ, ধ্বজ, ছত্র, ঈষামুখ ও রথের অন্যান্য উপকরণ হইতে বহির্গত হইতেছে। এইরূপে মহাবীর রাধেয় বেগবান্ সুবর্ণময় শরসমুদায় পরিত্যাগ করিয়া আকাশমণ্ডল পরিপূরিত করিলেন; কিন্তু মহাবল বৃকোদর তদর্শনে কিছুমাত্র ভীত হইলেন না। তিনি জীবিত-নিরপেক্ষ হইয়া নয় বাণে সেই কর্ণ নিক্ষিপ্ত অন্তকসদৃশ শরজাল ছিন্ন ভিন্ন করিয়া শাণিত বিংশতি শরে রাধানন্দনকে বিদ্ধ করিলেন। প্রথমে কর্ণ শরজালে ভীমসেনকে যেরূপ সমাচ্ছন্ন করিয়া-ছিলেন, এক্ষণে ভীমসেনও তাঁহাকে সেইরূপ শরজালে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তখন আপনার পক্ষীয় বীরসকল ও চারণগণ ভীমসেনের বিক্রম দর্শনে মহা আহ্লাদিত হইয়া তাঁহাকে ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। ঐ সময় কৌরবপক্ষীয় ভূরিশ্রবাঃ, কৃপাচার্য্য, অশ্বত্থামা, মদ্ররাজ, জয়দ্রথ ও উত্তমৌজাঃ এবং পাণ্ডবপক্ষীয় যুধামন্যু, সাত্যকি, কেশব ও অর্জুন এই দশজন মহারথ ভীমকে ধন্যবাদ প্রদানপূর্ব্বক সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিলেন। তন্নিবন্ধন সমরস্থলে অতি ভয়ঙ্কর লোমহর্ষণ শব্দ সমুত্থিত হইল।
হে কুরুরাজ! তখন আপনার পুত্র রাজা দুর্য্যোধন অতি | সত্বর মহাধনুর্দ্ধর সহোদরগণকে কহিলেন, হে ভ্রাতৃগণ! তোমা-দিগের মঙ্গল হউক। তোমরা শীঘ্র কর্ণের রক্ষণে যত্নবান্ হইয়া তাঁহার নিকট গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে বৃকোদরের হস্ত হইতে পরিত্রাণ কর। নচেৎ ভীমনির্মুক্ত শরনিকর রাধানন্দনকে সংহার করিবে। তখন আপনার সাত পুত্র দুর্য্যোধনের আজ্ঞানুসারে ক্রোধভরে ভীমাভিমুখে ধাবমান হইয়া তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। গ্রীষ্মান্তে জলধর যেমন বারিধারায় পৰ্ব্বতকে আবৃত করে, তদ্রূপ তাঁহারা বৃকোদরকে শরধারায় সমাচ্ছন্ন করিলেন। প্রলয়কালে সপ্তগ্রহ যেমন সুধাংশুকে পীড়িত করে, তদ্রূপ সেই সপ্ত মহারথ ভীমকে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন পূর্ব্ববৈর স্মরণ করত দৃঢ়তর মুষ্টি সুশোভিত শরাসন আকর্ষণ করিতে লাগিলেন এবং সেই বীরগণকে সামান্য মনুষ্য জ্ঞান করিয়া তাহাদের দেহ হইতে প্রাণ নিষ্কাশিত করতই যেন সূর্যরশ্মিসদৃশ সাত শর সন্ধানপূর্ব্বক তাঁহাদিগের উপর নিক্ষেপ করিলেন। ভীমনিক্ষিপ্ত কনকমণ্ডিত শাণিত শরসকল তাঁহাদিগের হৃদয় বিদারণ ও শোণিত পানপূর্ব্বক শোণিতলিপ্ত ও আকাশমার্গে সমুত্থিত হইয়া ব্যোমচারী বহুসংখ্যক গরুড়ের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। আপনার পুত্রেরাও ভিন্নহৃদয় হইয়া রথ হইতে ভূতলে নিপতিত হইলেন। তাঁহাদের পতনসময়ে বোধ হইল যেন, গিরিসানু-সমুৎপন্ন বনস্পতি গজভগ্ন হইয়া ভূতলে নিপতিত হইতেছে। হে মহারাজ! এইরূপে শত্রুঞ্জয়, শত্রুসহ, চিত্র, চিত্রায়ুধ, দৃঢ়, চিত্রসেন ও বিকর্ণ- আপনার এই সাত পুত্র নিপাতিত হইলেন। তন্মধ্যে পাণ্ডবপ্রিয় বিকর্ণের নিমিত্ত বৃকোদর শোকে নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া কহিতে লাগিলেন, হে বিকর্ণ! আমি রণস্থলে তোমাদিগের শত ভ্রাতাকে বিনাশ করিব বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম: সেই প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন-নিবন্ধনই আজি তুমি নিহত হইলে, তুমি আমাদিগের বিশেষতঃ মহারাজ যুধিষ্ঠিরের হিতসাধনে একান্ত তৎপর। হে ভ্রাতঃ। তুমি যুদ্ধই ক্ষত্রিয়ের প্রধান ধৰ্ম্ম, এই মনে করিয়া ন্যায়ানুসারে রণস্থলে আগমন করিয়াছিলে। অতএব তোমার নিমিত্ত অনুতাপ করা ন্যায়ানুগত নহে।
হে কুরুরাজ! ভীমসেন এইরূপে রাধেয়-সমক্ষে আপনার পুত্রগণকে বিনাশ করিয়া ঘোরতর সিংহনাদ পরিত্যাগ করিলেন। ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির মহাধনুর্দ্ধর ভীমসেনের সেই সিংহনাদ শ্রবণ করিয়া আপনাকে জয়শালী বিবেচনা করত অত্যন্ত প্রীত হইলেন এবং সুমহান্ বাদিত্র শব্দ করিয়া ভ্রাতার সিংহনাদ প্রতিগ্রহ করিতে লাগিলেন। এইরূপে যুধিষ্ঠির মহাবীর বৃকোদরের সঙ্কেত শ্রবণে পরম আহ্লাদিত হইয়া অস্ত্রবিদগ্রগণ্য দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। এদিকে রাজা দুর্য্যোধন একত্রিংশৎ সহোদরকে নিহত দেখিয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, মহাত্মা বিদুর যাহা কহিয়াছিলেন, তাহা এক্ষণে সার্থক হইতেছে। মহারাজ দুর্য্যোধন এই প্রকার চিন্তা করতই ইতিকর্তব্যতাবিমূঢ় হইয়া রহিলেন।
হে মহারাজ! আপনার পুত্র দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন ও দুরাত্মা কর্ণ দ্যূতক্রীড়াকালে সভামধ্যে পাঞ্চালীকে সমানীত করিয়া সমস্ত পাণ্ডু পুত্রের, কৌরবগণের ও আপনার সমক্ষে কৃষ্ণাকে সম্বোধনপূর্ব্বক বলিয়াছিলেন যে, কৃষ্ণে। পাণ্ডবেরা বিনষ্ট ও শাশ্বত নরকগামী হইয়াছে, তুমি অন্য কাহাকেও পতিত্বে বরণ কর; এক্ষণে সেই পরুষ বাক্যের ফলোদয় কাল সমুপস্থিত হইয়াছে। আপনার পুত্রেরা মহাত্মা পাণ্ডবগণকে ষণ্ডতিল প্রভৃতি কটুবাক্য বলিয়া তাঁহাদের মনে যে ক্রোধাগ্নি উদ্দীপিত করিয়াছিলেন, মহাবীর ভীমসেন ত্রয়োদশ বৎসরের পর সেই ক্রোধাগ্নি উদিদ্গরণপূর্ব্বক আপনার পুত্র গণকে বিনাশ করিতেছেন। মহাত্মা বিদুর অনেক বিলাপ করিয়াও আপনাকে শান্তিপক্ষ অবলম্বন করাইতে সমর্থ হন নাই; এক্ষণে আপনি পুত্রের সহিত সেই ক্ষত্তার বাক্য লঙ্ঘনের ফল ভোগ করুন। আপনি বৃদ্ধ, ধীর ও তত্ত্বার্থদর্শী হইয়াও দৈববিড়ম্বনাবশতঃ সুহৃদের হিতবাক্য শ্রবণ করিলেন না। এক্ষণে শোক সংবরণ করুন। আমার বোধ হইতেছে, আপনি স্বীয় দুর্নীতি-নিবন্ধন আপনার পুত্রগণের বিনাশহেতু হইয়াছেন। হে কুরুরাজ। মহাবল পরাক্রান্ত বিকর্ণ ও চিত্রসেন প্রভৃতি আপনার যে যে মহারথ পুত্রেরা ভীমের দৃষ্টিপথে নিপতিত হইয়াছিলেন, সকলেই শমনসদনে গমন করিয়াছেন। আপনার নিমিত্তই আমাকে মহাবীর ভীমসেন ও কর্ণের শরে সহস্র সহস্র সৈন্যগণকে নিপাতিত অবলোকন করিতে হইল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। বোধ করি এক্ষণে আমারই সেই মহতী দুর্নীতির পরিণাম সমুপস্থিত হইয়াছে। আমি পূর্ব্বে যাহা হইয়াছে, তাহার নিমিত্ত চিন্তা করা নিতান্ত অনাবশ্যক, এই মনে করিয়া বিগত বিষয়ে উপেক্ষা প্রদর্শন করিতাম; কিন্তু এক্ষণে তাহার প্রতিবিধানের নিমিত্ত নিতান্ত ব্যগ্র হইয়াছি। যাহা হউক, এক্ষণে আমি ধৈর্য্যাবলম্বন করিয়াছি; তুমি আমার দুর্নীতি নিবন্ধন যে মহান্ বীরক্ষয় সমুপস্থিত হইয়াছে, তঘৃত্তান্ত বর্ণন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণ ও ভীম উভয়ে বারিধারাবর্ষী মেঘের ন্যায় শরধারা বর্ষণ করিতে লাগিলেন। ভীমনামাঙ্কিত সুবর্ণপুঙ্খ শাণিত শরসমুদায় কর্ণের জীবন ভেদ করিয়াই যেন তাঁহার শরীরমধ্যে প্রবেশ করিল। কর্ণনির্মুক্ত ময়ূরপুচ্ছলাঞ্ছিত অসংখ্য শরও বৃকোদরকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। ঐ মহাবীরদ্বয়ের শরসমুদায় চতুর্দিকে নিপতিত হওয়াতে কৌরবপক্ষীয় সৈন্যগণ সংক্ষুব্ধ সমুদ্রের ন্যায় ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পড়িল। মহাবীর ভীমসেন স্বীয় শরাসননির্মুক্ত আশীবিষসদৃশ ভীষণ শরনিকরে কৌরবসৈন্যসমুদায়কে বিনাশ করিতে লাগিলেন। বায়ুভগ্ন বনস্পতিসমুদায়ের ন্যায় তীক্ষ্ণশর-নিপাতিত অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যগণে সমরভূমি সমাকীর্ণ হইল। সহস্র সহস্র কৌরবসৈন্যগণ ভীমের শরে গাঢ়বিদ্ধ হইয়া, এ কি আশ্চর্য্য ব্যাপার। এই বলিতে বলিতে সকলে পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবীর কর্ণ ঐ সময় বিমোহিতপ্রায় হইয়া কৌরবপক্ষীয় অসংখ্য সৈন্য সংহার করিলেন। হতাবশিষ্ট সিন্ধু, সৌবীর ও কৌরবসৈন্যসমুদায় মহাবীর কর্ণ ও ভীমসেনের শরে উৎসারিত ও অশ্ব-গজবিহীন হইয়া তাঁহাদিগকে পরিত্যাগ-পূর্ব্বক চতুৰ্দ্দিকে পলায়নে প্রবৃত্ত হইল এবং কহিতে লাগিল, নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, দেবতারা পাণ্ডবের নিমিত্ত আমাদিগকে মুগ্ধ করিতেছেন; নতুবা কর্ণ ও ভীমসেনের শরে আমাদিগেরই বলক্ষয় হইবে কেন? হে মহারাজ! আপনার সেই ভয়ার্ত সেনা-সমুদায় এই বলিতে বলিতে সেই বীরদ্বয়ের শরনিপাতের পথ পরিত্যাগপূর্ব্বক দূরে গমন করিয়া সমরদর্শনার্থ দণ্ডায়মান রহিলেন।
ঐ সময় অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যগণের রুধিরে সমরাঙ্গনে শূরগণের হর্ষবর্দ্ধন ও ভীরুগণের ত্রাসজনন এক ভীষণ রুধিরনদী প্রবাহিত হইল। নিহত অসংখ্য মানুষ্য, হস্তী, অশ্ব ও তাহাদিগের অলঙ্কার এবং রাশি রাশি অনুকর্য, পতাকা, রথভূষণ, চক্র, অক্ষ ও কুবরবিহীন রথ, গভীরনিস্বন সুবর্ণচিত্রিত শরাসন, সুবর্ণপুঙ্খ বাণ, নির্মোকমুক্ত পন্নগসদৃশ প্রাস, তোমর, খড়া ও পরশু, সুবর্ণময়ী গদা, মুষল ও পট্টিশ এবং বিবিধাকার হীরক', শক্তি, পরিঘ ও বিচিত্র শতঘ্নীতে সমরাঙ্গন পরিব্যাপ্ত হইল। শরনিকর-সংছিন্ন রাশি রাশি অঙ্গদ, হার, কুণ্ডল, মুকুট বলয়, অঙ্গুলিবেষ্টন, চূড়ামণি ও উষ্ণীষ, স্বর্ণালঙ্কার, তনুত্রাণ, তলত্র', গ্রৈবেয়, বস্ত্র, ছত্র, ব্যজন এবং অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও নরগণের কলেবর ইতস্ততঃ নিপতিত থাকাতে সমরভূমি গ্রহসমুদায় সমাকীর্ণ আকাশমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। সংগ্রাম দর্শনার্থ সমাগত সিদ্ধ ও চারণগণ সেই মহাবীরদ্বয়ের অচিন্তনীয় ও অমানুষিক কার্য্য দর্শনে সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। হুতাশন যেমন বায়ুসহায় হইয়া কক্ষমধ্যে বিচরণপূর্ব্বক উহা অনায়াসে বিদ্ধ করে, তদ্রূপ মহাবীর ভীমসেন কর্ণ-সমভি-ব্যাহারে সৈন্যমধ্যে বিচরণপূর্ব্বক তাহাদিগকে বিনষ্ট করিতে লাগিলেন। গজদ্বয় যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া যেমন নলবন বিমৰ্দ্দন কর, তদ্রূপ মহাবীর কর্ণ ও ভীমসেন পরস্পর সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়া কৌরবপক্ষীয় অসংখ্য রথ, ধ্বজ, হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যদিগকে মর্দিত করিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর ভীম ও কর্ণ অসংখ্য সৈন্য বিমৰ্দ্দন করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর কর্ণ তিন বাণে ভীমসেনকে বিদ্ধ করিয়া বহুবিধ বিচিত্র শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীমসেন কর্ণের বাণে বিদ্ধ হইয়া ভিদ্যমান অচলের ন্যায় কিঞ্চিন্মাত্রও ব্যথিত হইলেন না। তিনি তৈলধৌত নিশিত কর্ণিদ্বারা কর্ণের কর্ণদেশ ভেদপূর্ব্বক অম্বরস্খলিত" সূর্য্যজ্যোতির ন্যায় তাঁহার সুচারু কুণ্ডল ভূতলে পাতিত করিলেন এবং অম্লানমুখে অন্য ভল্লদ্বারা তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিয়া পুনরায় ললাটদেশে আশীবিযোপম নারাচ প্রয়োগ করিলেন। | সর্পগণ যেমন বল্মীকমধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ ভীমনিক্ষিপ্ত নারাচনিকর সূতপুত্রের ললাটে প্রবিষ্ট হইল। তিনি পূর্ব্বে মস্তকে নীলোৎপলময়ী মালা ধারণ করিয়া যেরূপ শোভা পাইতেন, এক্ষণে ললাটবিদ্ধ নারাচদ্বারা তদ্রূপ শোভা পাইতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণ এইরূপে ভীমের শরে গাঢ়বিদ্ধ ও রুধিরাক্ত-কলেবর হইয়া তৎক্ষণাৎ রথকূবর অবলম্বনপূর্ব্বক নয়নদ্বয় নিমীলিত করিয়া রহিলেন এবং অল্পকালমধ্যে পুনরায় চৈতন্য লাভপূর্ব্বক ক্রোধভরে মহাবেগে ভীমসেনের রথাভিমুখে ধাবমান হইয়া তাঁহার উপর গৃধুপক্ষবিশিষ্ট শতবাণ পরিত্যাগ করিলেন।
তখন মহাবীর ভীমসেন কর্ণের বলবীর্য্যের বিষয় কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া তাঁহাকে অনাদর করত তাঁহার উপর উগ্র শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। কর্ণও রোষপরবশ হইয়া নয়শরে ভীমসেনের বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে সেই শাৰ্দ্দুলসদৃশ পরাক্রান্ত মহাবীরদ্বয় প্রতিচিকীর্ষাপরতন্ত্র' হইয়া বারিবর্ষী মেঘদ্বয়ের ন্যায় বিবিধ শরজাল বর্ষণ ও তলশব্দ প্রয়োগ করত পরস্পরকে শঙ্কিত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন মহাবাহু ভীমসেন ক্ষুরপ্রদ্বারা কর্ণের শরাসন ছেদন করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। মহারথ কর্ণ অবিলম্বে সেই ছিন্ন চাপ পরিত্যাগ করিয়া অন্য সুদৃঢ় শরাসন গ্রহণ করিলেন। তৎকালে কৌরব, সৌবীর ও সৈন্ধব সৈন্যগণকে নিহত, রাশি রাশি বৰ্ম্ম, ধ্বজ ও শস্ত্রদ্বারা পৃথিবী সমাচ্ছন্ন এবং চতুৰ্দ্দিকে হস্ত্যারোহী, অশ্বারোহী ও রথারোহিগণকে নিপতিত নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার সর্ব্বশরীর ক্রোধে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। তখন তিনি সেই শরাসন বিস্ফারণপূর্ব্বক সরোেষনয়নে ভীমসেনের প্রতি দৃষ্টিপাত করত অসংখ্য শর বর্ষণ করিয়া শরৎকালীন মধ্যাহ্নগত ময়ূখমালী' দিনকরের ন্যায় দীপ্তি পাইতে লাগিলেন। তাঁহার ভীষণ কলেবর ভীমের শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া কিরণাবৃত সূর্য্যের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। তিনি যে কোন্ সময় শরসমূহ গ্রহণ, কখন সন্ধান, কখন আকর্ষণ ও কখনই বা বিসর্জন করিলেন, তাহার কিছুই লক্ষিত হইল না। তিনি দুই হস্তে বাণ বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে তাঁহার ভীষণ শরনিকর হুতাশনচক্রের ন্যায় মণ্ডলাকারে প্রকাশ পাইতে লাগিল। তাঁহার কার্মুকনিক্ষিপ্ত সুবর্ণপুঙ্খ নিশিত অসংখ্য শরজাল আকাশমার্গে সমুত্থিত হইয়া সমুদায় দিক্-বিদিক্ ও সূর্য্যপ্রভা সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল এবং ক্রৌঞ্চপক্ষীর ন্যায় শ্রেণীবদ্ধ হইয়া আকাশপথে বিচরণ করিতে আরম্ভ করিল। অধিরথনন্দন কর্ণ পুনরায় সুবর্ণভূষিত শিলাধৌত গৃধপক্ষযুক্ত বেগবান্ বাণ বর্ষণ করিতে লাগিলেন। সেই সুবর্ণনিৰ্ম্মিত শরজাল নিরন্তর ভীমসেনের রথে পতিত হইল। ঐ সমুদায় শর আকাশপথে গমনসময়ে শলভসমূহের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। তিনি এরূপ লঘুহস্তে শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন যে, ঐ শরসকল এক দীর্ঘ শরের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। জলধর যেমন বারিধারা বর্ষণ করিয়া ভূধরকে আচ্ছন্ন করে, তদ্রূপ মহাবীর কর্ণ ক্রুদ্ধ হইয়া সায়ক বর্ষণে ভীমসেনকে সমাচ্ছন্ন করিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় আপনার পুত্রগণ সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে বৃকোদরের বলবীর্য্য, পরাক্রম ও কার্য্য দর্শন করিতে লাগিলেন। ঐ মহাবীর উদ্ধত সাগরসদৃশ ভীষণ শরজাল লক্ষ্য না করিয়া ক্রোধভরে কর্ণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তাহার সুবর্ণপৃষ্ঠ মণ্ডলীকৃত ইন্দ্রায়ুধসদৃশ শরাসন হইতে সুবর্ণপুঙ্খ শরজাল বিনির্গত হইয়া আকাশমণ্ডল সমাচ্ছন্ন করাতে বোধ হইল যেন, নভোমণ্ডলে কনকময়ী মালা লম্বমান রহিয়াছে।
তখন মহাবীর কর্ণের আকাশবিমুক্ত শরজাল ভীমসেনের শরে আহত হইয়া ধরাতলে নিপতিত হইতে লাগিল। ভীমসেন ও কর্ণের কনকপুঙ্খ, সরলগামী, অগ্নিস্ফুলিঙ্গসদৃশ শরজালে নভোমণ্ডল পরিব্যাপ্ত হইল। তখন প্রভাকরের প্রভানাশ ও সমীরণের গতিরোধ হইয়া গেল এবং কোন পদার্থই নয়নগোচর হইল না। ঐ সময় সূতপুত্র কর্ণ মহাত্মা বৃকোদরের বলবীর্য্য অগ্রাহ্য করত তাঁহাকে অসংখ্য শরে সমাচ্ছন্ন করিয়া সমধিক পরাক্রম প্রকাশ করিতে লাগিলেন। ভীমসেনও তাঁহার উপর সহস্র সহস্র শর নিক্ষেপ করিলেন। ঐ বীরদ্বয়বিসৃষ্ট শরনিকর সমীরণের ন্যায় পরস্পর সঙ্ঘটিত হইতে লাগিল। সেই শরনিকরের সঙ্ঘর্ষণে নভোমণ্ডলে হুতাশন প্রাদুর্ভূত হইল। তখন মহাবীর কর্ণ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ভীমসেনকে সংহার করিবার নিমিত্ত কর্মার-পরিমার্জিত নিশিত শরজাল নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর ভীম সমধিক পরাক্রম প্রকাশপূর্ব্বক শরদ্বারা অন্তরীক্ষে কর্ণনিক্ষিপ্ত প্রত্যেক শর তিন তিন খণ্ডে ছেদন করিয়া তাঁহাকে থাক্ থাক্, বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন। পরে তিনি পুনর্ব্বার দহনোন্মুখ হুতাশনের ন্যায় রোষপ্রদীপ্ত হইয়া সুতীক্ষ্ণ শরনিকর বর্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন সেই বীরদ্বয়ের গোধানিৰ্ম্মিত অঙ্গুলিত্রের আঘাতে চটাচট শব্দ সমুত্থিত হইল। ভয়ঙ্কর তলশব্দ, সিংহনাদ, রথঘর্ঘর রব ও জ্যাশব্দে সমরভূমি পরিপূর্ণ হইয়া গেল। অন্যান্য যোদ্ধারা পরস্পর বধাভিলাষী কর্ণ ও ভীমের পরাক্রম দর্শন-মানসে সংগ্রামে বিরত হইলেন। দেবর্ষি, সিদ্ধ ও গন্ধর্ব্বগণ তাঁহাদিগকে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। বিদ্যাধরগণ তাঁহাদের উপর পুষ্পবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিলেন। অনন্তর মহাবীর ভীমসেন ক্রোধাবিষ্ট হইয়া অস্ত্র প্রয়োগপূর্ব্বক কর্ণের অস্ত্রসমুদায় নিবারণ করিয়া তাঁহাকে শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণও ভীমের শরজাল নিবারণ করিয়া তাঁহার প্রতি আশীবিষসদৃশ নয় নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। ভীমসেন নয় বাণে নভোমণ্ডলে সেই নয় নারাচ ছেদনপূর্ব্বক কর্ণকে থাক্ থাক্, বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন এবং তৎপরে ক্রোধভরে তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া যমদণ্ডসদৃশ এক ভীষণ শর নিক্ষেপ করিলেন। প্রবল প্রতাপ কর্ণ সেই ভীমবিসৃষ্ট শর উপস্থিত হইতে না হইতেই হাস্যমুখে তিন শরে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর পুনর্ব্বার ভয়ঙ্কর শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। কর্ণও স্বীয় অস্ত্রবল প্রকাশপূর্ব্বক নিতান্ত নির্ভীকের ন্যায় ঐসমস্ত শর প্রতিগ্রহ করিলেন। পরে তিনি রোষাবিষ্ট হইয়া সন্নতপর্ব্ব শরজালে ভীমের তৃণীর, ধনুর্জা এবং অশ্বগণের রশ্মি ও যোক্ত ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে তাঁহার অশ্বগণকে বিনাশ করিয়া সারথিকে পাঁচ শরে বিদ্ধ করিলেন। ভীমসারথি কর্ণশরে সমাহুত হইয়া সত্বর তথা হইতে মহাবীর যুধামন্যুর রথে গমন করিল।
তখন কালানলসন্নিভ মহাবীর কর্ণ রোষাবিষ্ট হইয়া হাস্যমুখে ভীমের ধ্বজ ও পতাকা ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ভীমসেন তদ্দর্শনে ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া এক কনক-সমলঙ্কৃত শক্তি গ্রহণপূর্ব্বক বিঘূর্ণিত করিয়া কর্ণের রথের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। মিত্রার্থে সংগ্রামে প্রবৃত্ত সূতনন্দন সেই মহোল্কাসদৃশ মহাশক্তি আগমন করিতে দেখিয়া দশ শরে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর মৃত্যু ও জয়ের অন্যতর লাভ করিতে অভিলাষী হইয়া এক সুবর্ণখচিত চৰ্ম্ম ও খড়া গ্রহণ করিলেন। কর্ণ হাস্যমুখে তৎক্ষণাৎ বহুসংখ্য শরে সেই চৰ্ম্ম ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন ভীমসেন ক্রোধভরে সত্বর কর্ণের রথাভিমুখে ভয়ঙ্কর অসি নিক্ষেপ করিলেন। ভীমনিক্ষিপ্ত অসি কর্ণের জ্যাসমবেত কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া অম্বরতলপরিভ্রষ্ট রোষাবিষ্ট ভুজঙ্গের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইল। তখন কর্ণ ভীমকে বিনাশ করিবার বাসনায় হাস্য করিয়া এক সুদৃঢ় জ্যাসম্পন্ন শত্রুবিনাশন শরাসন গ্রহণ করিয়া সুতীক্ষ্ণ সহস্র সহস্র শর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন।
মহাবীর ভীম এইরূপে কর্ণশরে নিপীড়িত হইয়া তাঁহার অন্তঃকরণ একান্ত ব্যথিত করত অন্তরীক্ষে উত্থিত হইলেন। কর্ণ সেই বিজয়াভিলাষী ভীমের অসাধারণ কার্য্য অবলোকন-পূর্ব্বক রথে লীন হইয়া তাঁহাকে বঞ্চিত করিলেন। ভীম তাঁহাকে রথমধ্যে লীন ও ব্যাকুলেন্দ্রিয় নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার ধ্বজ গ্রহণপূর্ব্বক ভূতলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। কৌরব ও চারণগণ ভীমকে পতগরাজ গরুড় যেমন ভুজঙ্গ সংহার করিবার নিমিত্ত যত্নবান্ হয়, তদ্রূপ রথ হইতে কর্ণকে বিনাশ করিতে উদ্যত দেখিয়া তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। এইরূপে ভীম আপনার রথ পরিত্যাগ করিয়া ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম প্রতিপালনপূর্ব্বক যুদ্ধার্থে কর্ণ-সন্নিধানে অবস্থান করিতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণও রোষভরে যুদ্ধার্থ সমুপস্থিত ভীমের সন্নিধানে আগমন করিলেন। তখন সেই মহাবল পরাক্রান্ত বীরদ্বয় সমবেত হইয়া পরস্পর স্পর্দ্ধা প্রকাশপূর্ব্বক বর্ষাকালীন জলদপটলের ন্যায় তর্জন-গর্জন করিতে লাগিলেন। দেবাসুর সংগ্রামের ন্যায় তাঁহাদের ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। তখন মহাবীর কর্ণ অস্ত্রবলে ভীমসেনকে শস্ত্রবিহীন করিয়া তাঁহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। ভীমসেন তদ্দর্শনে ভীত হইয়া অর্জুননিপাতিত পৰ্ব্বতোপম করিসৈন্য অবলোকনপূর্ব্বক, কর্ণ রথ লইয়া কদাচ তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে সমর্থ হইবেন না, এই ভাবিয়া তাহার মধ্যে প্রবেশ করিলেন। তৎপরে রথদুর্গে প্রবিষ্ট হইয়া প্রাণরক্ষা করিবার নিমিত্ত কর্ণকে আর প্রহার করিলেন না এবং আত্মরক্ষা করিবার বাসনায় হনুমান্ যেমন মহৌষধিসম্পন্ন গন্ধমাদন উত্তোলন করিয়াছিলেন তদ্রূপ ধনঞ্জয়শরাহত এক হস্তী উত্তোলিত করিয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণ বিশিখজালে সেই হস্তী ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলিলেন। ভীমসেন তদ্দর্শনে একান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া মাতঙ্গের ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহণপূর্ব্বক কর্ণের প্রতি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তিনি চক্র, অশ্ব প্রভৃতি যে সমস্ত বস্তু রণস্থলে নিপতিত দেখিতে পাইলেন, তৎসমুদায়ই কর্ণের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর কর্ণ নিশিত শরনিকরে ভীমনিক্ষিপ্ত সেই সমস্ত বস্তু তৎক্ষণাৎ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর ভীম কর্ণকে সংহার করিবার বাসনায় বজ্রসার সুদারুণ মুষ্টি উদ্যত করিলেন; কিন্তু তাঁহাকে বিনাশ করিতে সমর্থ হইয়াও অর্জুনের পূর্ব্ব প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিবার নিমিত্ত তৎকালে সূতপুত্রকে সংহার করিলেন না। তখন মহাবীর কর্ণ নিশিত শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক ভীমকে নিতান্ত ব্যাকুল ও বারংবার মোহে অভিভূত করিতে লাগিলেন, কিন্তু তৎকালে আর্য্যা কুন্তীর বাক্য স্মরণ করিয়া সেই নিরস্ত্র ভীমসেনের প্রাণ সংহার করিলেন না। অনন্তর তিনি ধাবমান হইয়া ধনুষ্কোটিদ্বারা ভীমের অঙ্গস্পর্শ করিলেন। ভীম তৎক্ষণাৎ কর্ণের কার্মুক আচ্ছিন্ন করিয়া তাঁহার মস্তকে আঘাত করিতে লাগিলেন। তখন কর্ণ ক্রোধে আরক্তলোচন হইয়া হাস্যমুখে কহিলেন, হে তুবরক! তুমি মূঢ়, উদরপরায়ণ, সংগ্রামকাতর ও বালক। তুমি অস্ত্রবিদ্যা কিছুমাত্র অবগত নও। রণস্থল তোমার উপযুক্ত স্থান নহে। যে স্থানে বহুবিধ ভক্ষ্য, ভোজ্য ও পানীয় আছে, তুমি সেই স্থানেরই যোগ্য। তুমি অরণ্যমধ্যে পুষ্প ও ফলমূল আহার করিয়া ব্রত ও নিয়ম প্রতিপালনে অভ্যস্ত, যুদ্ধ করা তোমার কার্য্য নহে। মুনিব্রত ও যুদ্ধ পরস্পর অনেক ভিন্ন। হে বৃকোদর। তুমি বনবাসনিরত; অতএব রণ পরিত্যাগপূর্ব্বক বন গমন করা তোমার বিধেয়। তুমি আহারের নিমিত্ত স্বীয় গৃহে সুদ, ভৃত্য ও দাসগণের প্রতি ক্রোধ-প্রকাশ করিয়া তাড়না করিতে পার; যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া তোমার সাধ্য নহে। তুমি মুনি জনের ন্যায় বনে গমনপূর্ব্বক ফল আহরণ কর। ফলমূলাহার ও অতিথিসৎকারই তোমার উপযুক্ত কার্য্য, শস্ত্র গ্রহণ করা তোমার উচিত নহে। হে মহারাজ। সূতপুত্র ভীমসেনকে এইরূপ উপহাস করিয়া তিনি বাল্যাবস্থায় যে সকল অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তাহাও তাঁহার কর্ণগোচর করিতে লাগিলেন এবং তৎপরে সেই রণক্লান্ত বৃকোদরকে ধনুষ্কোটিদ্বারা স্পর্শ করিয়া পুনরায় হাসিতে হাসিতে কহিলেন, ওহে ভীম। মাদৃশ ব্যক্তির সহিত যুদ্ধ করা তোমার বিধেয় নহে, আমার সদৃশ ব্যক্তির সহিত যুদ্ধ করিতে হইলে এইরূপ এবং অন্য অবস্থাও ঘটিয়া থাকে; অতএব যেস্থানে কৃষ্ণ ও অর্জুন বিদ্যমান আছেন, তুমি সেই স্থানে গমন কর; তাঁহারা তোমাকে রক্ষা করিবেন। অথবা তুমি বালক, তোমার যুদ্ধে প্রয়োজন কি, অবিলম্বে গৃহে গমন কর।
মহাবীর ভীমসেন কর্ণের সেই নিদারুণ বাক্য শ্রবণ করিয়া হাস্য করত সর্ব্বসমক্ষে তাঁহাকে কহিলেন। রে মূঢ় কর্ণ। আমি তোমাকে অনেকবার পরাজিত করিয়াছি, তবে কেন তুমি বৃথা আত্মশ্লাঘা করিতেছ? পূর্ব্বতন লোকেরা দেবরাজ ইন্দ্রেরও জয় পরাজয় অবলোকন করিয়াছেন। হে দুস্কুলোদ্ভব। তুমি একবার আমার সহিত মল্লযুদ্ধে প্রবৃত্ত হও; তাহা হইলে আজিই আমি সমস্ত রাজগণ-সমক্ষে মহাবল পরাক্রান্ত বৃহৎকায় কীচকের ন্যায় তোমাকে সংহার করিব। তখন মতিমান্ কর্ণ ভীমের অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া সমস্ত ধনুর্দ্ধর-সমক্ষে মল্লযুদ্ধ হইতে বিরত হইলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর কর্ণ ভীমসেনকে রথবিহীন করিয়া কৃষ্ণ ও অর্জুনের সমক্ষে আত্মশ্লাঘা আরম্ভকরিলে কপিধ্বজ অর্জুন কেশবের বাক্যানুসারে কর্ণের উপর শাণিত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। পার্থ-বিসৃষ্ট কনক-সমলঙ্কৃত গাণ্ডীববিনির্গত, ভুজঙ্গাকার শরসমুদায় ক্রৌঞ্চপৰ্ব্বত-গামী হংসের ন্যায় কর্ণের শরীরমধ্যে প্রবেশ করিল। ভীম ইতিপূর্ব্বে মহাবীর কর্ণের শরাসন ছেদন করিয়াছিলেন, এক্ষণে তিনি অর্জুনশরে দৃঢ়তর আহত হইয়া রথারোহণে সত্বর ভীমের নিকট হইতে পলায়ন করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীমসেনও সাত্যকির রথে আরোহণ করিয়া সমরাঙ্গনে ভ্রাতা সব্যসাচীর অনুগমনে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় অন্তকের ন্যায় ক্রোধারুণলোচনে অতি সত্বর কর্ণকে লক্ষ্য করিয়া নারাচ নিক্ষেপ করিলেন। গাণ্ডীবনির্মুক্ত নারাচ ভুজগলোলুপ গরুড়ের ন্যায় অন্তরীক্ষ হইতে কর্ণের উপর পতনোন্মুখ হইল। ঐ সময় মহারথ অশ্বত্থামা ধনঞ্জয়হস্ত হইতে কর্ণকে উদ্ধার করিবার বাসনায় শরদ্বারা আকাশমার্গেই সেই নারাচ দ্বিখণ্ড করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর অর্জুন তদ্দর্শনে রোষপরবশ হইয়া চতুঃষষ্টি শরে দ্রোণপুত্রকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে অশ্বত্থামন্। পলায়ন না করিয়া ক্ষণকাল রণস্থলে অবস্থান কর। শরনিপীড়িত অশ্বত্থামা অর্জুনের বাক্য শ্রবণ না করিয়া সত্বর মত্তমাতঙ্গ-সমাকীর্ণ রথসঙ্কুল সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত কৌন্তেয় গাণ্ডীবনির্ঘোষে অন্যান্য সুবর্ণপৃষ্ঠ কাৰ্ম্মকের নিস্বন তিরোহিত করিয়া পশ্চাদ্ভাগে অনতিদূরে প্রস্থিত অশ্বত্থামাকে শরনিকরে ত্রাসিত করত কঙ্কপত্রালঙ্কৃত নারাচসমূহে নর, বারণ ও অশ্বগণের দেহ বিদারণপূর্ব্বক সমস্ত সৈন্য বিনাশ করিতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। প্রতিদিনই আমার প্রদীপ্ত যশঃ ক্ষীণ এবং বহুসংখ্যক যোদ্ধা বিপক্ষশরে নিহত হইতেছে; অতএব বোধ হয়, দৈব আমাদিগের পক্ষে নিতান্ত প্রতিকূল। মহাবীর ধনঞ্জয় অশ্বত্থামা ও কর্ণকর্তৃক সুরক্ষিত, সুরগণেরও অপ্রবেশ্য কৌরবসৈন্যমধ্যে রোষভরে প্রবেশ করিয়াছে। প্রভূত-বলশালী কৃষ্ণ, ভীম ও শিনিপ্রবীর সাত্যকির সহিত মিলিত হওয়াতে তাহার পরাক্রম পরিবর্দ্ধিত হইয়াছে। হে সঞ্জয়! এই বৃত্তান্ত শ্রবণাবধি অগ্নি যেমন ঘৃত দগ্ধ করে, তদ্রূপ শোকানল আমাকে নিরন্তর দগ্ধ করিতেছে। আমি জয়দ্রথ প্রভৃতি মহীপাল-গণকে যেন কালগ্রাসে নিপতিত বোধ করিতেছি। হে সঞ্জয়! সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ ধনঞ্জয়ের অনিষ্টাচরণ করিয়া এক্ষণে তাহার নেত্রগোচর হইয়া কিরূপে প্রাণরক্ষায় সমর্থ হইবেন? আমার বোধ হইতেছে যেন, সিন্ধুরাজ কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন। যাহা হউক, এক্ষণে সংগ্রামবৃত্তান্ত কীর্ত্তন কর। যে মহাবীর ধনঞ্জয়সাহায্যার্থ নলিনীদলপ্রমার্থী মত্ত মাতঙ্গের ন্যায় বারংবার কৌরবসৈন্যসকল সংক্ষোভিত করিয়া ক্রোধভরে তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন, সেই বৃষ্ণিবংশাবতংস সাত্যকি কিরূপে সংগ্রাম করিলেন?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর মহারথ সাত্যকি বর্ণশরে নিতান্ত নিপীড়িত পুরুষপ্রবীর বৃকোদরকে গমন করিতে দেখিয়া রথারোহণে তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন এবং বর্ষাকালীন জলদজালের ন্যায় গভীর গর্জনপূর্ব্বক ক্রোধে শরৎকালীন দিবাকরের ন্যায় প্রদীপ্ত হইয়া কৌরবপক্ষীয় সেনাগণকে বিকম্পিত করত শত্রুসংহারে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি যখন রজতের ন্যায় ধবল অশ্বসমুদায় সঞ্চালনপূর্ব্বক গমন করিতে লাগিলেন, তৎকালে কৌরবপক্ষীয় কোন বীরই তাঁহাকে নিবারণ করিতে সমর্থ হইলেন না। অনন্তর অমর্ষপূর্ণ সমরে অপরাজুখ, শরাসন ও সুবর্ণ বৰ্ম্মধারী মহারাজ অলম্বুষ সেই মাধবকুলতিলক সাত্যকির সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তখন সেই বীরদ্বয়ের অভূতপূর্ব্ব ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। উভয় পক্ষীয় যোদ্ধারা তাঁহাদিগকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। অলম্বুষ সাত্যকিকে লক্ষ্য করিয়া দশ শর পরিত্যাগ করিলে তিনি তৎসমুদায় উপস্থিত হইতে না হইতেই শরনিকরে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহারাজ অলম্বুষ শরাসন আকর্ণ আকর্ষণ করিয়া পুনরায় অগ্নিকল্প সুতীক্ষ্ণ সুপুঙ্খ তিন শর প্রয়োগ করিলেন। ঐ শরত্রয় সাত্যকির বৰ্ম্মভেদ করিয়া শরীরমধ্যে প্রবিষ্ট হইল। এইরূপে অলম্বুষ অগ্নি ও অনিলসদৃশ প্রভাবসম্পন্ন অতিভাস্বর শরত্রয়ে সাত্যকির দেহ ভেদ করিয়া চারি বাণে তৎক্ষণাৎ তাঁহার ধবলকায় চারি অশ্বকে বিদ্ধ করিলেন।
অনন্তর চক্রধরসদৃশ প্রভাবশালী সাত্যকি মহাবেগসম্পন্ন চারি শরে অলম্বুষের অশ্বগণকে বিনাশ করিলেন। পরে কালানলসন্নিভ ভল্লদ্বারা অলম্বুষের সারথির কণ্ঠ ছেদন করিয়া তাঁহার কুণ্ডলালঙ্কৃত পূর্ণশশিপ্রকাশ বদনমণ্ডল কলেবর হইতে পৃথক্ করিয়া ফেলিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে যদুকুলতিলক সাত্যকি মহারাজ অলম্বুষকে বিনাশ করিয়া কৌরবসৈন্যগণকে নিবারণপূর্ব্বক অর্জুন-সন্নিধানে গমন করিতে লাগিলেন। তাঁহার গোদুগ্ধ কুন্দ, ইন্দু ও হিমসবর্ণ সুবর্ণজালজড়িত সিন্ধুদেশীয় অশ্বগণ তাঁহার অভিলাষানুসারে তাঁহাকে ইতস্ততঃ বহন করিতে লাগিলেন। তখন আপনার আত্মজগণ ও যোধ-সকল যোদ্ধৃ প্রধান দুঃশাসনকে সম্মুখীন করিয়া সাত্যকির অভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং সৈন্যগণের সহিত সাত্যকিকে পরিবেষ্টনপূর্ব্বক তাঁহার উপর শরাঘাত করিতে লাগিলেন। মহাবীর সাত্যকিও অগ্নিকল্প শরনিকরে তাঁহাদিগকে নিবারণ করিয়া সত্বর দুঃশাসনের অশ্বগণকে বিনাশ করিলেন। ঐ সময় মহাবীর অর্জুন ও বাসুদেব মহাবীর সাত্যকিকে নিরীক্ষণ করিয়া সাতিশয় হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! তখন সুবর্ণধ্বজসম্পন্ন ত্রিগত্তদেশীয় মহারথগণ সেই শিনিবংশাবতংস সাত্যকিকে ধনঞ্জয়ের জয়াভিলাষে দুঃশাসনের রথাভিমুখে সমুদ্যত ও অসীম কৌরবসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট দেখিয়া ক্রোধাবিষ্ট চিত্তে চতুৰ্দ্দিক্ হইতে রথসমুদায়দ্বারা তাঁহাকে পরিবৃত করিয়া নিবারণ করত শরজালে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তখন সত্যবিক্রম সাত্যকি একাকী অসি, শক্তি ও গদাসঙ্কুল, তলনিস্বনপূর্ণ, অপার জলধিসদৃশ সেই মহাসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া অনায়াসে ত্রিগর্তদেশীয় পঞ্চশত রাজপুত্রকে পরাজিত করিলেন। মহারাজ।
মহাবীর সাত্যকির এইরূপ অদ্ভুত ক্ষিপ্রগতি দেখিলাম যে, তাঁহাকে পশ্চিমদিকে অবলোকন করিয়া পূর্ব্বদিকে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র পুনরায় তিনি নয়নপথে নিপতিত হইলেন। এইরূপে সেই মহাবীর সাত্যকি একাকী শত রথীর ন্যায় মুহূর্তকালমধ্যে নৃত্য করতই যেন, সমস্ত দিগ্বিদিক্ বিচরণ করিতে লাগিলেন। ত্রিগর্ত-সেনারা সিংহবিক্রান্ত সাত্যকির দ্রুতগতি দর্শনে সন্তপ্ত হইয়া স্বজন-সমীপে প্রস্থান করিল। তখন শূরসেনদেশীয় প্রধানতম বীরগণ অঙ্কুশদ্বারা যেমন মত্ত মাত্তঙ্গকে নিবারণ করে, তদ্রূপ সাত্যকিকে শরনিপীড়িত করিয়া নিবারণ করিতে লাগিলেন। অচিন্ত্যবিক্রম সাত্যকি মুহূর্ত্তকাল তাঁহাদিগের সহিত সংগ্রাম করিয়া দুরতিক্রমণীয় কলিঙ্গদেশীয়দিগের সহিত যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন এবং অবিলম্বে তাহাদিগকে অতিক্রম করিয়া মহাবাহু ধনঞ্জয়কে প্রাপ্ত হইলেন। সন্তরণক্লান্ত ব্যক্তি স্থলভাগ প্রাপ্ত হইলে যেরূপ আহ্লাদিত হয়, যুযুধান পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুনকে অবলোকন করিয়া তদ্রূপ আহ্লাদিত হইতে লাগিলেন।
মহাত্মা কেশব সাত্যকিকে আগমন করিতে সন্দর্শন করিয়া অর্জুনকে কহিলেন, পার্থ! ঐ তোমার পদানুসারী শৈনেয় আগমন করিতেছে। ঐ মহাবীর তোমার শিষ্য এবং প্রাণাধিক প্রিয়সখা। ঐ পুরুষর্ষভ সমস্ত যোদ্ধৃগণকে তৃণতুল্য বোধ করিয়া পরাজয় করিয়াছেন। উনি কৌরবপক্ষীয় যোদ্ধৃগণের প্রতি ঘোরতর উপদ্রব করিয়াছেন; উঁহার শরপ্রভাবে দ্রোণাচার্য্য ও কৃতবর্মা পরাজিত হইয়াছেন। ঐ মহাবীর অস্ত্রে সুশিক্ষিত ও সর্ব্বদা ধর্মরাজের হিতসাধনে নিরত। উনি সৈন্যমধ্যে বহুতর যোধগণকে নিপাত করিয়া অতি দুষ্কর কার্য্যের অনুষ্ঠান এবং একাকী বাহুবল অবলম্বনপূর্ব্বক সৈন্যসমুদায় ভেদ করিয়া দ্রোণাচার্য্য প্রভৃতি বহুতর মহারথদিগের সহিত যুদ্ধ করিয়াছেন। কৌরবদলে উঁহার সদৃশ যোদ্ধা কেহই নাই। সিংহ যেমন গোযূথ হইতে অনায়াসে বহির্গত হয়, তদ্রূপ ঐ মহাবীর অসংখ্য কুরুসৈন্য বিনাশ করিয়া তন্মধ্য হইতে বহির্গত হইয়াছেন। ইঁহার প্রভাবেই অসংখ্য নরপতিদিগের পঙ্কজসদৃশ বদনমণ্ডলে বসুধা সমাকীর্ণ হইয়াছে। উনি জলসন্ধকে বিনষ্ট, দুর্য্যোধন ও তাঁহার ভ্রাতৃগণকে পরাজিত এবং কৌরবগণকে সংহারপূর্ব্বক শোণিত প্রবাহিত করিয়া এক্ষণে তোমার নিকট আগমন করিতেছেন।
মহাবীর অর্জুন কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণে বিমনায়মান হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে মহাবাহো। সাত্যকির আগমনে আমার কিছুমাত্র প্রীতি হইতেছে না। ধৰ্ম্মরাজ সাত্যকিবিহীন হইয়া জীবিত আছেন কি না সন্দেহ। যুযুধানের উপর ধর্মরাজের রক্ষার ভার অর্পিত হইয়াছিল, তবে উনি কিরূপে আমার নিকট আগমন করিতেছেন? অতএব বোধ হয়, ধর্মরাজ দ্রোণকর্তৃক নিগৃহীত হইলেন এবং জয়দ্রথবধেরও বিলক্ষণ ব্যাঘাত উপস্থিত হইল। হে কেশব। ঐ দেখ, ভূরিশ্রবাঃ যুদ্ধার্থে সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইয়াছে। আমি এক জয়দ্রথের নিমিত্ত গুরুভারে আক্রান্ত হইলাম। এখন ধর্মরাজের তত্ত্বাবধারণ ও সাত্যকিকে রক্ষা আমার অবশ্যকর্তব্য। এদিকে দিবাকর প্রায় অস্তাচলশিখরে আরোহণ করিতেছে, জয়দ্রথকেও শীঘ্র বিনাশ করিতে হইবে। হে মাধব! সম্প্রতি মহাবাহু সাত্যকির শরসকল প্রায় নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছে। তিনি স্বয়ং অতিশয় ক্লান্ত হইয়াছেন এবং তাঁহার অশ্বগণ ও সারথি অতিশয় ক্লান্ত হইয়াছে। কিন্তু সহায়সম্পন্ন ভূরিশ্রবাঃ এখনও শ্রান্ত হয় নাই। সাত্যকি কি উঁহার সহিত সংগ্রামে জয় লাভ করিতে পারিবেন? মহাতেজস্বী সত্যবিক্রম যুযুধান কি সমুদ্র পার হইয়া গোষ্পদে অবসন্ন হইবেন? হে কেশব! ধর্মরাজের এ কি বুদ্ধিবিপর্যয় দেখিতেছি! তিনি দ্রোণাচার্য্যের ভয়ে শঙ্কিত না হইয়া সাত্যকিকে আমার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। দ্রোণাচার্য্য আমিষগ্রহণার্থী শ্যেন পক্ষীর ন্যায় সতত ধৰ্ম্মরাজের গ্রহণে অভিলাষ করিয়া থাকেন; অতএব তাঁহার কুশলবিষয়ে আমার অত্যন্ত সন্দেহ জন্মিতেছে।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। অনন্তর মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ যুদ্ধদুৰ্ম্মদ সাত্যকিকে আগমন করিতে দেখিয়া ক্রোধভরে সহসা তাঁহার সন্নিধানে গমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে শৈনেয়! আজি ভাগ্যক্রমে তুমি আমার নেত্রগোচর হইয়াছ। আমি এক্ষণে রণস্থলে চিরসঞ্চিত মনোরথ পূর্ণ করিব, সন্দেহ নাই। যদি তুমি সমরে পরাজুখ না হও, তাহা হইলে প্রাণসত্ত্বে কদাচ আমার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিতে সমর্থ হইবে না, তুমি সতত শৌর্য্যাভিমান করিয়া থাক, আজি আমি তোমার প্রাণ সংহার করিয়া কুরুরাজ দুর্য্যোধনকে আনন্দিত করিব। আজি মহাবীর কৃষ্ণ ও অর্জুন সমবেত হইয়া তোমাকে আমার শরানলে দগ্ধ ও ভূতলে নিপাতিত নিরীক্ষণ করিবেন। তুমি যাঁহার আদেশানুসারে সমরসাগরে প্রবেশ করিয়াছ, সেই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আজি তোমাকে আমার শরজালে বিনষ্ট শ্রবণ করিয়া অতিশয় লজ্জিত হইবেন। আজি তুমি নিহত ও রুধিরোক্ষিত-কলেবর হইয়া রণস্থলে শয়ন করিলে মহাবীর অর্জুন আমার বিক্রমের সম্যক্ পরিচয় লাভ করিবেন। হে শৈনেয়। তোমার সহিত সংগ্রাম-সমাগম আমার চিরপ্রার্থনীয়। পূর্ব্বে দেবাসুর যুদ্ধে দানবরাজ বলির সহিত দেবরাজ ইন্দ্রের যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, তদ্রূপ আজি তোমার সহিত আমার ঘোরতর সংগ্রাম সমুপস্থিত হইলে তুমি আমার বলবীর্য্য ও পৌরুষ সম্যক্ অবগত হইবে। আজি তুমি রামানুজ লক্ষ্মণের শরে নিহত রাবণাত্মজ ইন্দ্রজিতের ন্যায় আমার শরনিকরে বিনষ্ট হইয়া যমরাজের রাজধানীতে গমন করিবে। আজি কৃষ্ণ, অর্জুন ও যুধিষ্ঠির তোমার বিলাপদর্শনে উৎসাহশূন্য হইয়া নিশ্চয়ই যুদ্ধ পরিত্যাগ করিবেন। আজি আমি তোমাকে নিশিত সায়কে সংহার করিয়া তোমার শরনিহত বীরবর্গের রমণীগণকে আনন্দিত করিব। হে মাধব! তুমি সিংহের নয়নপথে নিপতিত ক্ষুদ্র মৃগের ন্যায় আমার নেত্রগোচর হইয়াছ, আর তোমার নিস্তার নাই।
হে মহারাজ! মহাবীর সাত্যকি ভূরিশ্রবার এই সমস্ত বাক্য শ্রবণ করিয়া হাস্যমুখে কহিলেন, হে কৌরবেয়! আমি যুদ্ধে ভীত নহি। কেবল বাক্যদ্বারা আমাকে ভয় প্রদর্শন করা কাহারও সাধ্যায়াত্ত নহে। হে কৌরব। যে আমাকে অস্ত্রশূন্য করিবে, সেই আমাকে সংহার করিতে পারিবে এবং যে আমাকে বিনাশ করিবে, সেই চিরকাল অপ্রতিহতগতি হইয়া অবস্থান করিতে সমর্থ হইবে। যাহা হউক, এক্ষণে বৃথা বাজ্জাল বিস্তার করিবার প্রয়োজন কি। তুমি যাহা কহিলে, তাহা কার্য্যে পরিণত কর। তোমার এই আস্ফালন শরৎকালীন মেঘ-গর্জনের ন্যায় নিতান্ত নিষ্ফল; উহা শ্রবণ করিয়া আমি হাস্য সংবরণে অসমর্থ হইতেছি। এক্ষণে আমাদিগের চির প্রার্থিত যুদ্ধ উপস্থিত হউক। তোমার সহিত সংগ্রাম করিবার নিমিত্ত আমার মনঃ অতিশয় ব্যগ্র হইতেছে। রে নরাধম! আজি আমি তোমাকে বিনাশ না করিয়া কদাচ প্রতিনিবৃত্ত হইব না।
হে মহারাজ! এইরূপে সেই মহাতেজস্বী স্পর্দ্ধাশীল বীরদ্বয় পরস্পরের প্রতি কটূক্তি প্রয়োগপূর্ব্বক করিণী-গ্রহণার্থ রোষাবিষ্ট মদোৎকট মাতঙ্গযুগলের ন্যায় ক্রুদ্ধমনে পরস্পর জিঘাংসাপরবশ হইয়া প্রহারে প্রবৃত্ত হইলেন; মেঘ যেমন জলধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ অনবরত শরজাল বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ সাত্যকিকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করত দশ শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় অনবরত শরজাল বিস্তার করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর সাত্যকি শর বর্ষণপূর্ব্বক সেই সমস্ত সুতীক্ষ্ণ সায়ক উপস্থিত না হইতে হইতেই অন্তরীক্ষে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে সেই বীরদ্বয় পরস্পরের প্রতি অনবরত শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। যেমন শাৰ্দ্দুলদ্বয় নখদ্বারা ও কুঞ্জরদ্বয় দন্তদ্বারা পরস্পরকে প্রহার করিয়া থাকে, তদ্রূপ তাঁহারাও রথ, শক্তি ও বিশিখজালদ্বারা পরস্পরকে প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন তাঁহাদের কলেবর ছিন্ন ভিন্ন ও গাত্র হইতে অনবরত রুধিরধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। এইরূপে তাঁহারা পরস্পর প্রাণ সংহারে প্রবৃত্ত হইয়া পরস্পরকে স্তম্ভিত করিলেন।
অনন্তর সেই ব্রহ্মলোকপুরস্কৃত' বীরযুগল মৃত্যুর পর দেবলোকে গমন করিবার বাসনায় যূথপতি মাতঙ্গদ্বয়ের ন্যায় যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া পরস্পরের প্রতি তর্জন-গর্জন করত প্রহৃষ্ট ধার্তরাষ্ট্রগণ সমক্ষে অনবরত শরবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। সমরদর্শী মনুষ্যেরা করিণীগ্রহণার্থ যুদ্ধে প্রবৃত্ত কুঞ্জরযুগলের ন্যায় তাঁহাদের সেই ঘোরতর যুদ্ধ অবলোকন করিতে লাগিল। তখন সেই মহাবীরদ্বয় পরস্পরের অশ্ব বিনষ্ট ও কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া রথ পরিত্যাগপূর্ব্বক অসিযুদ্ধ করিবার নিমিত্ত একত্র সমবেত হইলেন এবং অতি বৃহৎ বিচিত্র ঋষভ চৰ্ম্ম নিৰ্ম্মিত চৰ্ম্ম গ্রহণ ও কোষ হইতে অসি নিষ্কাশন করিয়া রণস্থলে সঞ্চরণ করিতে লাগিলেন। তৎপরে সেই বিচিত্র বৰ্ম্ম ও কনকাঙ্গদধারী বীরদ্বয় মণ্ডলাকারে ভ্রমণ এবং ভ্রান্ত, উদ্ভ্রান্ত, আপ্লুত, বিপ্লুত, সম্পাত ও সমুদীর্ণ প্রভৃতি বিবিধ গতি প্রদর্শন করিয়া ক্রোধভরে পরস্পরকে অসি প্রহার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তাঁহারা পরস্পরের ছিদ্রান্বেষী হইয়া আশ্চর্য্য বন্ধন' এবং শিক্ষালাঘব ও সৌষ্ঠব প্রদর্শন করিয়া পরস্পরকে আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে সেই বীরদ্বয় সেনাগণসমক্ষে পরস্পরকে কিয়ৎক্ষণ প্রহার করিয়া বিশ্রাম করিতে আরম্ভ করিলেন।
অনন্তর সেই বিস্তীর্ণবক্ষাঃ দীর্ঘভুজ-যুগলসম্পন্ন, বাহুযুদ্ধকুশল বীরদ্বয় পরস্পরের অসি ও শতচন্দ্রক'-সমলঙ্কৃত চৰ্ম্ম ছেদন-পূর্ব্বক বাহুযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন এবং লৌহময় অর্গলতুল্য বাহুযুগলদ্বারা পরস্পরের বাহু বেষ্টন করিয়া ভুজবন্ধন ও ভুজমোক্ষণ প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। অন্যান্য যোদ্ধারা তাঁহাদের শিক্ষাবল সন্দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইলেন। তখন সেই বাহুযুদ্ধে প্রবৃত্ত বীরদ্বয় বজ্রাহত পর্ব্বতের ন্যায় ঘোরতর শব্দ করিতে আরম্ভ করিলেন। তৎপরে যেমন মাতঙ্গদ্বয় বিষাণাগ্রদ্বারা এবং বৃষভদ্বয় শৃঙ্গদ্বারা যুদ্ধ করে, তদ্রূপ তাঁহারা কখন ভুজবন্ধন, কখন মস্তকাঘাত, কখন চরণাকর্ষণ, কখন তোমর, অঙ্কুশ ও চাপ আক্ষেপ প্রদর্শন এবং কখন বা পাতন, উত্থান ও লম্ফপ্রদান করত ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাঁহারা দ্বাত্রিংশৎ ক্রিয়া বিশেষ সম্পন্ন যুদ্ধ প্রদর্শন করিতে আরম্ভ করিলেন।
ঐ সময় মহাবীর সাত্যকির আয়ুধসমুদায় অল্পমাত্রাবিশিষ্ট হইলে বাসুদেব অর্জুনকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! ঐ দেখ, সর্ব্বধনুর্দ্ধরাগ্রগণ্য সাত্যকি রথশূন্য হইয়া সংগ্রাম করিতেছেন। যুযুধান তোমার পশ্চাদ্ভাগে কৌরবসৈন্যগণকে ভেদ করিয়া তন্মধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক মহাবল পরাক্রান্ত যোদ্ধা-দিগের সহিত ঘোরতর যুদ্ধ করিয়াছিল। এক্ষণে ভূরিদক্ষিণ ভূরিশ্রবাঃ উঁহাকে একান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া আগমন করিতে দেখিয়া যুদ্ধার্থ উঁহারা সম্মুখীন হইয়াছেন। ইহা কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত বলিয়া বোধ হইতেছে না। ঐ সময় যুদ্ধদুৰ্ম্মদ ক্রোধা-বিষ্ট ভূরিশ্রবাঃ রথস্থ কৃষ্ণ ও অর্জুনের সমক্ষে মত্তমাতঙ্গের ন্যায় সাত্যকিকে আঘাত করিলেন। মহাবাহু কৃষ্ণ তদ্দর্শনে অর্জুনকে কহিলেন, হে ধনঞ্জয়। ঐ দেখ, বৃষ্ণিবংশাবতংস সাত্যকি অতি দুরূহ কার্য্য সম্পাদনপূর্ব্বক নিতান্ত পরিশ্রান্ত ও ভূরিশ্রবার বশবর্তী হইয়া ভূতলে অবস্থান করিতেছেন। উনি তোমার শিষ্য; উঁহাকে রক্ষা করা তোমার অবশ্যকর্তব্য। ঐ মহাবীর তোমার নিমিত্তই এই বিপদ্গ্রস্ত হইয়াছেন; অতএব উনি যাহাতে ভূরিশ্রবার বশবর্তী না হন, শীঘ্র তাহার চেষ্টা কর। তখন ধনঞ্জয় হৃষ্টচিত্তে বাসুদেবকে কহিলেন, হে কৃষ্ণ! ঐ দেখ, বনমধ্যে মত্তমাতঙ্গের সহিত যূথপতি পশুরাজের যেরূপ ক্রীড়া হইয়া থাকে, তদ্রূপ বৃষ্ণিবীর সাত্যকির সহিত কুরুপুঙ্গব ভূরিশ্রবার ক্রীড়া হইতেছে।
হে ভরতকুলতিলক! মহাবীর ধনঞ্জয় এইরূপ কহিতেছেন, এমন সময়ে ভূরিশ্রবাঃ আঘাত দ্বারা সাত্যকিকে ভূতলে পাতিত করিলেন। তদ্দর্শনে সৈন্যমধ্যে হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল। তখন সিংহ যেমন কুঞ্জরকে আকর্ষণ করে, তদ্রূপ ভূরিশ্রবাঃ সাত্যকিকে আকর্ষণ করিতে লাগিলেন এবং কোষ হইতে খড়া নিষ্কাশনপূর্ব্বক যুযুধানের কেশাকর্ষণ ও বক্ষঃস্থলে পদাঘাত করিয়া তাঁহার কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক ছেদন করিতে উদ্যত হইলেন। ঐ সময়ে মহাবীর সাত্যকি দণ্ডঘটিত কুলালচক্রের ন্যায় কেশধারী ভূরিশ্রবার হস্তের সহিত মস্তক বিঘূর্ণন করিতে লাগিলেন। মহাত্মা বাসুদেব সাত্যকিকে তদবস্থ অবলোকন করিয়া পুনরায় অর্জুনকে কহিলেন, হে মহাবাহো। ঐ দেখ, অন্ধকশ্রেষ্ঠ সাত্যকি ভূরিশ্রবার বশবর্তী হইয়াছেন। উনি তোমার শিষ্য এবং ধনুর্বিদ্যায় তোমা অপেক্ষা ন্যূন নহেন। কিন্তু আজি ভূরিশ্রবাঃ উঁহাকে পরাভব করাতে উঁহার সত্যবিক্রম নাম ব্যর্থ হইতেছে। মহাবীর অর্জুন কৃষ্ণের বাক্য শ্রবণ করিয়া মনে মনে ভূরিশ্রবাকে প্রশংসা করত কহিলেন, কুরুকুল-কীর্ত্তিবর্দ্ধন ভূরিশ্রবাঃ বৃষ্ণিপ্রবীর সাত্যকিকে বিনাশ না করিয়া মৃগেন্দ্র যেমন অরণ্যমধ্যে মহাগজকে আকর্ষণ করে, তদ্রূপ সে আকর্ষণ করিতেছেন, ইহাতে আমি যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইলাম। মহাবীর অর্জুন মনে মনে ভূরিশ্রবার এইরূপ প্রশংসা করিয়া বাসুদেবকে কহিলেন, হে মাধব। আমি নিয়ত সিন্ধু-রাজকেই নিরীক্ষণ করিতেছি, তন্নিমিত্ত ভূরিশ্রবাঃ আমার দৃষ্টিপথে পতিত হন নাই; যাহা হউক, এক্ষণে আমি সাত্যকির রক্ষার্থ এই দুরূহ কার্য্য সম্পাদনে প্রবৃত্ত হইলাম। মহাবীর অর্জুন বাসুদেবকে এই কথা বলিয়া গাণ্ডীব শরাসনে নিশিত ক্ষুরপ্র সংযোজনপূর্ব্বক নিক্ষেপ করিলেন। সেই অর্জুনবিসৃষ্ট দারুণ ক্ষুরপ্র আকাশচ্যুত মহোল্কার ন্যায় ভূরিশ্রবার অঙ্গদ-সুশোভিত খড়া সমবেত বাহু ছেদন করিয়া ফেলিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। মহাবীর ভূরিশ্রবার সেই অঙ্গদমণ্ডিত সখড়া ভুজদণ্ড অদৃশ্য অর্জুন শরে নিকৃত্ত হইয়া জীবলোকের দুঃসহ দুঃখ উৎপাদনপূর্ব্বক পঞ্চাস্য উরগের ন্যায় মহাবেগে ভূতলে নিপতিত হইল। তখন ভূরিশ্রবাঃ আপনাকে নিতান্ত অকর্মণ্য স্থির করিয়া সাত্যকিকে পরিত্যাগপূর্ব্বক ক্রোধভরে অর্জুনকে তিরস্কার করত কহিলেন, হে কৌন্তেয়। আমি অনন্যমনে কাৰ্য্যান্তরে আসক্ত ছিলাম, সেই অবস্থায় তুমি আমার বাহু ছেদন করিয়া নিতান্ত গর্হিত কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছ। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আমার বধবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলে তুমি কি তাঁহাকে কহিবে যে, ভূরিশ্রবাকে সাত্যকিবধরূপ কুৎসিত কার্য্যে প্রবৃত্ত দেখিয়া তাঁহাকে সংহার করিয়াছি। হে ধনঞ্জয়! তুমি যে প্রকারে আমার উপর অস্ত্র নিক্ষেপ করিয়াছ, ঐ রূপে অস্ত্র প্রয়োগ করিতে কি দেবরাজ ইন্দ্র বা ভগবান্ রুদ্র কিংবা মহাবীর দ্রোণ অথবা মহাত্মা কৃপাচার্য্য তোমাকে উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন? তুমি অন্যান্য বীর অপেক্ষা অস্ত্রধৰ্ম্ম সমধিক অবগত আছ, তবে কি বুঝিয়া তোমার সহিত যুদ্ধে অপ্রবৃত্ত ব্যক্তিকে প্রহার করিলে। সাধুলোকেরা প্রমত্ত, ভীত, রথশূন্য, প্রার্থনাপরতন্ত্র ও বিপদাপন্ন ব্যক্তিকে কদাচ প্রহার করেন না; কিন্তু তুমি এই নীচাচরিত নিতান্ত দুষ্কর পাপ কর্মে কিরূপে প্রবৃত্ত হইলে? আর্য্য ব্যক্তি অনায়াসেই সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে পারেন; কিন্তু অসৎ কার্য্য তাঁহার পক্ষে নিতান্ত দুষ্কর হইয়া উঠে। হে মহাত্মন্! মনুষ্য যেরূপ মনুষ্যের সহবাসে কাল-যাপন করে, অবিলম্বে তাহারই স্বভাব প্রাপ্ত হয়, ইহা তোমাতেই সম্যক্ লক্ষিত হইতেছে। দেখ, তুমি রাজবংশে, বিশেষতঃ কুরু-কুলে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছ; তুমি অতি সুশীল ও ব্রতপরায়ণ; কিন্তু এক্ষণে ক্ষত্রিয়ধর্মের বিরুদ্ধাচরণপূর্ব্বক সাত্যকির নিমিত্ত যে অন্যায্য কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে, ইহা বোধ হইতেছে কৃষ্ণেরই অভিপ্রেত; এরূপ অভিপ্রায় তোমাতে কখনই সম্ভাবিত হইতে পারে না। হে পার্থ! বাসুদেবের সহিত যাহার সখ্য ভাব নাই, এমন কোন ব্যক্তিই অন্যের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত প্রমত্ত ব্যক্তিকে এইরূপ বিপদাপন্ন করিতে প্রবৃত্ত হন না। হে অর্জুন! বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয়গণ ব্রাত্যক্ষত্রিয়' এবং স্বভাবতই নিন্দনীয়; তাহারা ক্রোধান্ধ হইয়া কার্য্যানুষ্ঠান করে। তুমি কিরূপে তাহাদিগের মতানুসারে কার্য্যানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলে?
হে মহারাজ! মহাবীর অর্জুন ভূরিশ্রবাঃকর্তৃক এইরূপে অভিহিত হইয়া কহিতে লাগিলেন, হে প্রভো! নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, মনুষ্য জরাজীর্ণ হইলে তাহার বুদ্ধিও জীর্ণ হইয়া যায়। এক্ষণে আমাকে যে সকল কথা কহিলে, তৎসমুদায় নিরর্থক। তুমি কৃষ্ণকে ও আমাকে সম্যক্ জ্ঞাত হইয়াও আমাদিগের নিন্দাবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছ। আমি সংগ্রামধৰ্ম্মজ্ঞ ও সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ হইয়া কি নিমিত্ত অধর্মাচরণ করিব? তুমি ইহা অবগত হইয়াও বিমোহিত হইতেছ। ক্ষত্রিয়গণ পিতা, ভ্রাতা, পুত্র, সম্বন্ধী ও অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবগণে পরিবৃত হইয়া তাঁহাদেরই বাহুবল অবলম্বনপূর্ব্বক যুদ্ধ করিতেছেন। হে মহারাজ। রণস্থলে কেবল আত্মরক্ষা রাজার কর্তব্য নহে; যাহাদিগকে কার্য্যসাধনে নিযুক্ত করা হইয়াছে, অগ্রে তাহাদিগকে রক্ষা করা সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। সেই সকল ব্যক্তি রক্ষিত হইলে রাজা সুরক্ষিত হইয়া থাকেন। মহাবীর সাত্যকি আমা-দিগেরই নিমিত্ত নিতান্ত দুষ্কর প্রাণপরিত্যাগে কৃতসঙ্কল্প হইয়া ঘোরতর সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। তিনি আমার শিষ্য, সম্বন্ধী ও দক্ষিণ বাহুস্বরূপ; যদি তাঁহাকে নিহন্যমান দেখিয়া উপেক্ষা করি, তাহা হইলে অবশ্যই আমাকে পাপভাগী হইতে হইবে। আমি এই কারণে সাত্যকিকে রক্ষা করিয়াছি; অতএব তুমি কি নিমিত্ত আমার উপর বৃথা রোষাবিষ্ট হইতেছ? হে রাজন! তুমি অন্যের সহিত যুদ্ধ করিতেছিলে, সেই অবস্থায় আমি তোমার কর ছেদন করিয়াছি, এই নিমিত্ত তুমি আমাকে নিন্দা করিতেছ; কিন্তু বিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখ, আমি কদাচ নিন্দনীয় নহি। আমি হস্তী, অশ্ব, রথ, পদাতিসমাকুল, সিংহনাদবহুল, অতি গভীর সৈন্যসাগরমধ্যে কখন কবচকম্পন, কখন রথারোহণ, কখন ধনুর্জা আকর্ষণ ও কখন বা শত্রুগণের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম করিতেছিলাম। সেই ভীষণ সমরসাগরে একমাত্র সাত্যকির সহিত এক ব্যক্তির যুদ্ধ কিরূপে সম্ভবপর হইতে পারে? এই মনে করিয়া তৎকালে আমার বুদ্ধিবিভ্রম জন্মিয়াছিল। হে মহাবীর। সমরপারদর্শী সাত্যকি একাকী অসংখ্য মহারথগণের সহিত সংগ্রাম করত তাঁহাদিগকে পরাজয়পূর্ব্বক শ্রান্ত, শ্রান্তবাহন, শস্ত্রনিপীড়িত ও নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া তোমার বশবর্তী হইয়াছিলেন। তুমি কিরূপে তাহাকে পরাজয় করিয়া আপনার শৌর্য্যাধিক্য প্রকাশ করিতে বাসনা করিলে? তুমি খড়াদ্বারা সাত্যকির শিরশ্ছেদ করিতে সমুদ্যত হইয়াছিলে, সুতরাং আমায় তাঁহাকে রক্ষা করিতে হইল। কোন্ ব্যক্তি আত্মীয়কে তদ্রূপ বিপদ্গ্রস্ত দেখিয়া উপেক্ষা করিতে পারে? হে বীর! তুমি তোমার আশ্রিত ব্যক্তির সহিত কিরূপ ব্যবহার করিয়া থাক? যাহা হউক, তুমি আত্মরক্ষায় অমনোযোগী হইয়া পরপীড়নে সমুদ্যত হইয়াছিলে; অতএব এক্ষণে আপনার নিন্দা করাই তোমার কর্তব্য।
হে মহারাজ! মহাযশস্বী যূপকেতু' ভূরিশ্রবাঃ অর্জুন-কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া মহাবীর যুযুধানকে পরিত্যাগ-পূর্ব্বক প্রায়োপবেশনে কৃতসঙ্কল্প হইলেন। তিনি ব্রহ্মলোক-গমনাভিলাষে সব্যহস্তে' শরশয্যা প্রস্তুত করিয়া ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাত্রী দেবতাতে ইন্দ্রিয়গ্রাম সমর্পণ, সূর্য্যে দৃষ্টি সন্নিবেশ ও চন্দ্রে মনঃ সমাধানপূর্ব্বক মহোপনিষদ্ ধ্যান করত যোগারূঢ় হইয়া মৌনব্রত অবলম্বন করিলেন। তখন সমুদায় সৈন্যগণই কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয়কে নিন্দা এবং পুরুষর্ষভ ভূরিশ্রবাকে প্রশংসা করিতে লাগিল। কৃষ্ণ ও অর্জুন নিন্দাবাদ শ্রবণে কটূক্তি প্রয়োগ করিলেন না। ভূরিশ্রবাও প্রশংসিত হইয়া অণুমাত্র আহ্লাদিত হইলেন না। হে রাজন! ঐ সময় মহাবীর ধনঞ্জয় আপনার পুত্রগণের ও ভূরিশ্রবার বাক্য সহ্য করিতে না পারিয়া অক্রুদ্ধমনে গর্বিত বচনে ভূরিশ্রবাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, হে যুপকেতো! আমাদের পক্ষে যে কেহ আমার সম্মুখে উপস্থিত থাকিবে, তাহাকে কেহ বিনাশ করিতে সমর্থ হইবেন না। আমি প্রাণপণে তাহাকে রক্ষা করিব। আমার এই মহাব্রতের বিষয় সমুদায় ক্ষত্রিয়গণই অবগত আছেন। অতএব ইহা বিচার করিয়া আমাকে নিন্দা করা কর্তব্য। যথার্থ ধৰ্ম্ম না জানিয়া আমাকে নিন্দা করা কদাপি বিধেয় নহে। আমি যে, তোমাকে প্রভূত অস্ত্র-শস্ত্রসহকারে অস্ত্রহীন সাত্যকির প্রাণ সংহারে প্রবৃত্ত দেখিয়া তোমার বাহু ছেদন করিয়াছি, তাহা অধৰ্ম্মসঙ্গত নহে; কিন্তু বল দেখি, রথ, বৰ্ম্ম ও শস্ত্রবিহীন বালক অভিমন্যুকে নিহত করা কি ধার্মিক জনের প্রশংসনীয় কার্য্য হইয়াছে? হে মহারাজ! মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ অর্জুনকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া মস্তকদ্বারা ভূমি স্পর্শপূর্ব্বক ধনঞ্জয় ধর্মপথ অবলম্বন করিয়াই তাঁহার বাহু ছেদন করিয়াছেন, ইহা জ্ঞাপন করিবার নিমিত্ত সব্য হস্তদ্বারা স্বীয় দক্ষিণভুজ গ্রহণ ও তাঁহাকে প্রদান করিয়া অধোমুখে তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন অর্জুন ভূরিশ্রবাকে কহিলেন, হে শলাগ্রজ! ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, মহাবীর ভীমসেন, নকুল ও সহদেবে আমার যেরূপ প্রীতি, তোমাতেও সেইরূপ আছে। অতএব আমি মহাত্মা কেশবের আদেশানুসারে কহিতেছি যে, উশীনরতনয় শিবিরাজা যে পবিত্র স্থানে গমন করিয়াছেন, তুমিও সেই স্থানে গমন কর। তখন বাসুদেব কহিলেন, হে ভূরিশ্রবাঃ! তুমি অসংখ্য অগ্নিহোত্র যাগের অনুষ্ঠান করিয়াছ; অতএব বিরিঞ্চি প্রভৃতি সুরগণ আমার যে সকল স্থান প্রার্থনা করেন তুমি অবিলম্বে তথায় গমনপূর্ব্বক আমার সমান হইয়া গরুড়কর্তৃক মস্তকে বাহিত হও।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহাবীর সাত্যকি ভূরিশ্রবার হস্তগ্রহ হইতে বিমুক্ত ও উত্থিত হইয়া অর্জুনশরে ছিন্ন হস্ত, ছিন্ন শুণ্ড গজের ন্যায় উপবিষ্ট, নিরপরাধ, মহাত্মা ভূরিশ্রবার মস্তক ছেদন করিবার বাসনায় খড়া গ্রহণ করিলেন। তখন সমস্ত সৈন্য উচ্চস্বরে তাঁহাকে নিন্দা করিতে লাগিল।. মহাত্মা কৃষ্ণ, অর্জুন, ভীমসেন, উত্তমৌজাঃ, যুধামন্যু, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য্য, কর্ণ, বৃষসেন ও সিন্ধুরাজ বারংবার তাঁহাকে নিষেধ করিলেন, কিন্তু মহাবীর যুযুধান কাহারও বাক্যে কর্ণপাত না করিয়া খড়াঘাতে সেই প্রায়োপবিষ্ট সংযমী ছিন্নবাহু ভূরিশ্রবার মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তিনি অর্জুনাহত ভূরিশ্রবাকে নিধন করিলেন বলিয়া কেহই তাঁহার প্রশংসা করিল না। তখন দেবতা, সিদ্ধ, চারণ ও মানবগণ দেবরাজসদৃশ ভূরিশ্রবাকে - যুদ্ধে প্রায়োপবেশনানন্তর নিহত নিরীক্ষণ করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট চিত্তে তাঁহাকে ধন্যবাদ প্রদান করিলেন। সৈনিক পুরুষেরা কহিতে লাগিলেন, এ বিষয়ে সাত্যকির কোন অপরাধ নাই, ভাগ্যে যাহা ছিল তাহাই ঘটিয়াছে। অতএব আমাদিগের রোষপরবশ হওয়া বিধেয় নহে। ক্রোধ মানবগণের দুঃখের প্রধান কারণ। ভগবান্ বিধাতা সাত্যকির হস্তেই ভূরিশ্রবার বিনাশ নির্দেশ করিয়াছেন, অতএব ভূরিশ্রবাঃ যুযুধানেরই বধ্য, এ বিষয়ে আর বিচার করিবার প্রয়োজন নাই।
তখন মহাবীর সাত্যকি ক্রোধভরে কুরুবংশীয়দিগকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিতে লগিলেন, হে ধৰ্ম্মকঞ্চুকধারী অধার্মিক কৌরবগণ! তোমরা ইতিপূর্ব্বে আমাকে ভূরিশ্রবাকে বিনাশ করিতে বারংবার নিষেধ করত ধার্মিকতা প্রকাশ করিতেছিলে, কিন্তু অতি বালক অস্ত্রহীন সুভদ্রাপুত্র অভিমন্যুকে নিহত করিবার সময় তোমাদিগের ধৰ্ম্ম কোথায় ছিল? আমি পূর্ব্বে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম যে, যে ব্যক্তি কোন কারণে আমাকে ভূতলে পাতিত করিয়া ক্রোধভরে আমার বক্ষঃস্থলে পদাঘাত করিবে, সে মুনিব্রতাবলম্বী হইলেও আমি তাহাকে বিনাশ করিব। যাহা হউক, তোমরা আমাকে অবিচ্ছিন্নবাহু ও প্রতিঘাতে যত্নবান্ দেখিয়াও মৃতজ্ঞান করিয়া আপনাদের নিতান্ত নির্বুদ্ধিতা প্রকাশ করিয়াছ। হে কৌরবপ্রধান যোদ্ধৃগণ! ভূরিশ্রবাকে প্রতিঘাত করা উপযুক্ত কার্য্যই হইয়াছে। মহাবীর অর্জুন আমার প্রতি স্নেহ প্রকাশপূর্ব্বক স্বীয় প্রতিজ্ঞা প্রতিপালনার্থ উহার খড়্গযুক্ত বাহু ছেদন করিয়া কেবল আমাকে বঞ্চিত করিয়াছেন। যাহা হউক, ভাগ্যে যাহা থাকে, দৈবই তাহা সঙ্ঘটন করিয়া দেন। এই সমরাঙ্গনে ভূরিশ্রবাকে নিধন করিতে আমার কি অধর্মাচরণ হইয়াছে? মহাকবি বাল্মীকি কহিয়াছেন যে, স্ত্রীলোককে বিনাশ করা বিধেয় নহে। সকল কালেই অসামান্য যত্নসহকারে অরাতিগণের ক্লেশকর কার্য্যানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হওয়া অবশ্যকর্তব্য।
হে কুরুরাজ! মহাবীর সাত্যকি এইরূপ কহিলে পর, সমস্ত পাণ্ডব ও কৌরবগণ কিছুমাত্র প্রত্যুত্তর প্রদান করিলেন না, কেবল মনে মনে ভূরিশ্রবাকে অভিবাদন করিতে লাগিলেন। তৎকালে সেই অধ্বর', মহাযশস্বী, অরণ্যগত তপোধনসদৃশ, ভূরিসুবর্ণপ্রদ' ভূরিশ্রবার বধে কেহই আহ্লাদিত হইলেন না। মহাবীর ভূরিশ্রবার সুনীল কেশকলাপসমলঙ্কৃত কপোতনেত্রসদৃশ লোহিত নয়নযুক্ত ছিন্ন মস্তক সমরাঙ্গনে নিপতিত হইয়া অশ্বমেধ যজ্ঞভূমিস্থিত পবিত্র অশ্বের ছিন্ন মস্তকের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ এইরূপে সমরাঙ্গনে অস্ত্রাঘাতে নিহত হইয়া দেহ পরিত্যাগ করত স্বীয় পূর্ব্বকৃত পুণ্যে সমুদায় আকাশমণ্ডল পরিব্যাপ্ত করিয়া উর্দ্ধলোকে গমন করিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! যে মহাবীর সাত্যকি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নিকট প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া অনায়াসে সৈন্যসাগর সমুত্তীর্ণ হইল এবং মহাবীর দ্রোণ, কর্ণ, বিকর্ণ ও কৃতবর্ম্মাও যাহাকে পরাজিত করিতে সমর্থ হয় নাই, ভূরিশ্রবাঃ কিরূপে তাহাকে নিগ্রহ করিয়া বলপূর্ব্বক ভূতলে পাতিত করিল?
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আমি এক্ষণে মহাবীর সাত্যকি এবং ভূরিশ্রবার জন্মবৃত্তান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন; তাহা হইলে অনায়াসে আপনার সন্দেহ ভঞ্জন হইবে। মহর্ষি অত্রির পুত্র সোম, সোমের পুত্র বুধ, বুধের পুত্র পুরন্দরসদৃশ পুরূরবাঃ, পুরূরবার পুত্র আয়ুঃ, আয়ুর পুত্র নহুষ, নহুষের পুত্র দেবতুল্য রাজর্ষি যযাতি। দেবযানীর গর্ভে যযাতি রাজার যদু নামে পুত্র সমুৎপন্ন হন। তিনি সর্ব্বজ্যেষ্ঠ; তাঁহার বংশে দেবমীঢ় নামে এক মহাত্মা জন্মগ্রহণ করেন, দেবমীঢ়ের পুত্র ত্রিলোক-প্রসিদ্ধ শূর। শূরের পুত্র মহাযশস্বী বসুদেব। মহাবল পরাক্রান্ত শূর ধনুর্বিদ্যাপারদর্শী ও কার্তবীর্য্যার্জুনের তুল্য ছিলেন। তাঁহারই বংশে শিনি নামে এক মহাত্মা জন্মগ্রহণ করেন। হে মহারাজ! মহাত্মা দেবকরাজের কন্যার স্বয়ংবর সময়ে মহাবীর শিনি সমস্ত ভূপালগণকে পরাজিত করিয়া দেবকনন্দিনীকে গ্রহণ করিয়াছিলেন। ঐ মহাবীর বসুদেবের সহিত দেবকীর পরিণয় সম্পাদন মানসে তাঁহাকে আপনার রথে আরোপিত করিয়া গৃহগমনে সমুদ্যত হইলেন। ঐ সময় মহাতেজস্বী সোমদত্ত শিনির ঐ কার্য্য সহ্য করিতে অসমর্থ হইয়া তাঁহার সহিত সংগ্রাম করিতে লাগিলেন। বেলা দুই প্রহর পর্যন্ত সেই বীরদ্বয়ের অতি অদ্ভুত বাহুযুদ্ধ হইল। পরিশেষে মহাবীর শিনি অসংখ্য ভূপালসমক্ষে বলপূর্ব্বক সোমদত্তকে ভূতলে নিপাতিত করত কেশাকর্ষণপূর্ব্বক তরবারি উদ্যত করিয়া তাঁহাকে পদাঘাত করিতে লাগিলেন। অনন্তর কৃপা প্রকাশপূর্ব্বক তুমি জীবিত থাক, এই কথা বলিয়া তাঁহাকে পরিত্যাগ করিলেন।
হে কুরুরাজ। মহাবীর সোমদত্ত শিনির নিকট সেইরূপ আঘাতিত হইয়া অমর্ষিতচিত্তে ভগবান্ ভূতনাথের আরাধনায় প্রবৃত্ত হইলেন। বরদাতা মহাদেব সোমদত্তের ভক্তিভাবে প্রীত হইয়া তাহাকে বর প্রার্থনা করিতে কহিলেন। তখন সোমদত্ত বলিলেন, হে ভগবন্! আমি এরূপ এক পুত্র প্রার্থনা করি, যে অসংখ্য মহীপাল-সমক্ষে সমরাঙ্গনে শিনির পুত্র বা পৌত্রকে নিক্ষেপ করিয়া পদাঘাত করিতে সমর্থ হইবে। ভগবান্ ভূতপতি প্রার্থনা শ্রবণানন্তর "তথাস্তু” বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন। সোমদত্ত সেই বরপ্রভাবে ঐ ভূরিশ্রবাঃ নামে পুত্র লাভ করিয়াছিলেন। ভূরিশ্রবাঃ মহাদেবের বরপ্রভাবেই সমস্ত নরপতিগণের সমক্ষে সমরক্ষেত্রে সাত্যকিকে পাতিত ও পদাহত করিলেন। হে মহারাজ! আপনি যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন, তৎসমুদায় আপনার কর্ণগোচর করিলাম।
হে কুরুকুলতিলক! সাত্যকিকে কেহই পরাজিত করিতে সমর্থ নহেন। বৃষ্ণিবংশীয়েরা সমরাঙ্গনে লব্ধলক্ষ্য' হইয়া নানা প্রকার যুদ্ধকৌশল প্রকাশ করিয়া থাকেন। উঁহারা দেব, দানব ও গন্ধর্ব্বদিগের বিজেতা এবং কখন বিস্মিত হন না। উঁহারা স্বীয় বাহুবলেই যুদ্ধ করিয়া থাকেন, অন্যের সাহায্য অপেক্ষা করেন না। উঁহাদিগের তুল্য বলবান্ ব্যক্তি কখন দৃষ্টিগোচর হয় নাই, হইবেও না এবং এক্ষণে হইতেছে না। উঁহারা জ্ঞাতিদিগকে অবজ্ঞা করেন না এবং নিয়ত বৃদ্ধগণের আজ্ঞা প্রতিপালন করিয়া থাকেন। মনুষ্যগণের কথা দূরে থাকুক, দেব, দানব, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, উরগ এবং রাক্ষসেরাও বৃষ্ণিদিগকে পরাজয় করিতে সমর্থ নহেন। উঁহারা ব্রাহ্মণ, গুরু ও জ্ঞাতিদিগের দ্রব্যে অভিলাষী নন। আপদ্ উপস্থিত হইলে যে কেহ তাঁহাদিগের দ্বারা রক্ষিত হয়, তাঁহারা কদাপি কাহার দ্রব্যে অভিলাষ করেন না। ঐ সত্যবাদী, ব্রাহ্মণ্যানুষ্ঠাননিরত' মহাত্মারা বিপুল অর্থশালী হইয়াও গর্ব্ব প্রকাশ করেন না। তাঁহারা বিপক্কালে সমর্থ ব্যক্তিদিগকেও দীন বোধে উদ্ধার করিয়া থাকেন। তাঁহারা বেদপরায়ণ, দাতা, নিরহঙ্কার; তন্নিবন্ধন বৃষ্ণিবংশীয়দিগের চক্র সতত অপ্রতিহত থাকে। হে রাজন! যদি কেহ ভূধরবহনে অথবা জলজন্তপূর্ণ মহার্ণব সন্তরণেও সমর্থ হয়, তথাপি সে বৃষ্ণিবীরগণের সহিত সংগ্রামে জয়লাভ করিতে পারে না। হে প্রভো! আপনার যে বিষয়ে সংশয় ছিল, তদ্বিষয়ে আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলাম। যাহা হউক, আপনার দুর্নীতি-নিবন্ধনেই এইরূপ ঘটিতেছে।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ তদবস্থ হইয়া নিহত হইলে পুনরায় যেরূপ যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছিল, তদ্বৃত্তান্ত বর্ণনা কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ পরলোক গমন করিলে পর, মহাবাহু অর্জুন বাসুদেবকে কহিলেন, হে হৃষীকেশ! তুমি অবিলম্বে জয়দ্রথ-সমীপে রথ সঞ্চালন করিয়া আমাকে সফলপ্রতিজ্ঞ' কর। হে মহাবাহো! দিবাকর সত্বর অস্তাচলে গমন করিতেছে। আমাকে অবিলম্বে এই জয়দ্রথবধরূপ মহৎ কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে। কৌরবপক্ষীয় মহারথগণও প্রাণপণে সিন্ধুরাজকে রক্ষা করিতেছেন। অতএব যাহাতে আমি দিবাকর অস্তাচলে গমন না করিতে করিতে জয়দ্রথকে বিনাশপূর্ব্বক স্বীয় প্রতিজ্ঞা সফল করিতে পারি, এরূপ বিবেচনা করিয়া অশ্বসঞ্চালন কর। তখন অশ্বলক্ষণবিৎ মহাবাহু কেশব অবিলম্বে জয়দ্রথের রথাভিমুখে রজতপ্রতিম তুরঙ্গগণকে প্রেরণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর দুর্য্যোধন, কর্ণ, বৃষসেন, শল্য, অশ্বত্থামা, কূপ ও সিন্ধুরাজ অমোঘাস্ত্র মহাবীর ধনঞ্জয়কে শরসদৃশ বেগশীল অশ্বসমুদায় সঞ্চালনপূর্ব্বক আগমন করিতে দেখিয়া সত্বর তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় সিন্ধুরাজকে সম্মুখে অবস্থিত দেখিয়া ক্রোধপ্রদীপ্ত নেত্রে তাঁহাকে যেন দগ্ধ করিতে লাগিল।
হে মহারাজ! ঐ সময় আপনার পুত্র দুর্য্যোধন ধনঞ্জয়কে জয়দ্রথের প্রতি গমন করিতে দেখিয়া কর্ণকে কহিলেন, হে কর্ণ! এক্ষণে অর্জুনের সেই যুদ্ধের সময় উপস্থিত হইয়াছে। অতএব যাহাতে জয়দ্রথ বিনষ্ট না হয়, পরাক্রম প্রদর্শনপূর্ব্বক তাহার চেষ্টা কর। দিবাভাগের আর অতি অল্পমাত্র অবশিষ্ট আছে; শরনিকরে অরাতির বিঘ্নসাধন করিতে আরম্ভ কর। দিনক্ষয়' হইলে নিশ্চয়ই আমরা জয়লাভ করিব। সূর্য্যের অস্তগমন পর্যন্ত সিন্ধুরাজকে রক্ষা করিতে পারিলে অর্জুন বিফল প্রতিজ্ঞ হইয়া অবশ্যই অনলে প্রবেশ করিবে, তাহা হইলে উহার সহোদরেরা অনুগামিগণ-সমভিব্যাহারে এক মুহূর্তও অর্জুনশূন্য পৃথিবীতে প্রাণধারণ করিতে সমর্থ হইবে না। এইরূপে পাণ্ডবগণ বিনষ্ট হইলে আমরা এই সসাগরা ধরিত্রীকে নিষ্কণ্টকে উপভোগ করিব। আজি কিরীটী দৈবপ্রভাবে বিপরীতবুদ্ধি হইয়া কার্য্যাকার্য্য বিবেচনা না করিয়া আত্ম-বিনাশের নিমিত্ত জয়দ্রথবধে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়াছে। হে দুর্দ্ধর্ষ! তুমি জীবিত থাকিতে অর্জুন কিরূপে সূর্য্যের অস্তগমন সময়-মধ্যেই সিন্ধুরাজকে বিনষ্ট করিবে? আমি, মদ্ররাজ, কূপ, অশ্বত্থামা ও দুঃশাসন আমরা সকলে মহাবীর জয়দ্রথকে রক্ষা করিলে অর্জুন কিরূপে উহার বিনাশে সমর্থ হইবে? একে বহুসংখ্য বীর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন; তাহাতে আবার দিবাকর প্রায় অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইলেন; অতএব বোধ হয়, ধনঞ্জয় কখনই জয়দ্রথের বধে কৃতকার্য্য হইতে পারিবে না। হে কর্ণ! এক্ষণে তুমি আমাকে এবং অশ্বত্থামা, শল্য, কূপ অন্যান্য বীরগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া অসামান্য যত্নসহকারে অর্জুনের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হও।
হে মহারাজ! মহাবীর কর্ণ দুর্য্যোধনকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া কহিলেন, হে রাজন! মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন শরজালে বারংবার আমার কলেবর ছিন্ন ভিন্ন করিয়াছে। এক্ষণে আমি রণস্থলে অবস্থান করিতে হয় বলিয়াই অবস্থান করিতেছি। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাহার শরনিকরে একান্ত সন্তপ্ত ও নিতান্ত অবসন্ন হইয়াছে। যাহা হউক, তোমার নিমিত্তই আমি প্রাণধারণ করিয়া আছি; অতএব যাহাতে অর্জুন সিন্ধুরাজকে সংহার করিতে না পারে সাধ্যানুসারে যুদ্ধ করিয়া তাহার চেষ্টা করিব। আমি সমরাঙ্গনে শরনিকর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে ধনঞ্জয় কদাচ জয়দ্রথকে প্রাপ্ত হইতে সমর্থ হইবেন না। হে কুরুরাজ। হিতানুষ্ঠানপরতন্ত্র ভক্তিপরায়ণ লোকে যেরূপ কার্য্য করিয়া থাকে, আমিও তদনুরূপ কার্য্যানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইব, কিন্তু জয়-পরাজয় দৈবায়ত্ত। আজি আমি তোমার প্রিয়-কার্য্য সংসাধন ও সিন্ধুরাজ জয়দ্রথকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত যারপরনাই যত্ন করিব। আজি সৈন্যগণ আমার ও অর্জুনের লোমহর্ষণ অতি দারুণ যুদ্ধ অবলোকন করুক।
হে মহারাজ! তাঁহারা উভয়ে এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, এই অবসরে মহাবীর অর্জুন আপনার সৈন্যসংহার করিতে প্রবৃত্ত হইয়া নিশিত ভল্লদ্বারা সমরে অপরাজুখ বীরগণের অর্গলতুল্য করিশুশুসদৃশ ভুজদণ্ড ও মস্তকসমুদায় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে অশ্বগ্রীবা, করিশুণ্ড ও রথের অক্ষসকল ছেদন রুধিরলিপ্ত-কলেবর, প্রাস-তোমরধারী অশ্বারোহী-দিগকে ক্ষুরদ্বারা দুই তিন খণ্ডে ছেদন করিতে লাগিলেন। অসংখ্য অশ্ব ও মাতঙ্গ তাঁহার শরে নিহত হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। ধ্বজ, ছত্র, চাপ, চামর ও মস্তকসকল চতুর্দিকে পতিত হইতে লাগিল। হুতাশন যেমন প্রাদুর্ভূত হইয়া তৃণরাশি দগ্ধ করে, তদ্রূপ মহাবীর অর্জুন শরানলে কৌরবসৈন্যগণকে দগ্ধ করিয়া অনতিকালমধ্যে ধরণীতল রুধিরাভিষিক্ত করিলেন। হে মহারাজ! মহাবল পরাক্রান্ত নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ সত্যবিক্রম অর্জুন এইরূপে আপনার পক্ষীয় বহুসংখ্য বীরগণকে সংহার করিয়া সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের নিকট সমুপস্থিত হইলেন। তিনি ভীম ও সাত্যকি-কর্তৃক সুরক্ষিত হইয়া প্রজ্বলিত হুতাশনের ন্যায় অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিলেন। আপনার পক্ষীয় বীরগণ অর্জুনকে স্বীয় বীর্য্যপ্রভাবে তদবস্থায় অবস্থান করিতে নিরীক্ষণ করিয়া কিছুতেই সহ্য করিতে পারিলেন না। তখন মহারাজ দুর্য্যোধন, কর্ণ, বৃষসেন, শল্য, অশ্বত্থামা ও কূপ- ইঁহারা রোষাবিষ্ট হইয়া জয়দ্রথকে সমভিব্যাহারে লইয়া অর্জুনকে বেষ্টন করিলেন। সংগ্রামকোবিদ, ব্যাদিতান অন্তকসদৃশ, নিতান্ত ভয়ঙ্কর মহাবীর ধনঞ্জয় ধনুষ্টঙ্কার ও তলধ্বনি করত সমরাঙ্গনে যেন নৃত্য করিতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ নির্ভীকচিত্তে তাঁহাকে জয়দ্রথের নিকট সমুপস্থিত হইলেন। তিনি ভীম ও সাত্যকি-কর্তৃক সুরক্ষিত হইয়া প্রজ্বলিত হুতাশনের ন্যায় অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিলেন। আপনার পক্ষীয় বীরগণ অর্জুনকে স্বীয় বীর্য্যপ্রভাবে তদবস্থায় অবস্থান করিতে নিরীক্ষণ করিয়া কিছুতেই সহ্য করিতে পারিলেন না। তখন মহারাজ দুর্য্যোধন, কর্ণ, বৃষসেন, শল্য, অশ্বত্থামা ও কৃপ- ইঁহারা রোষাবিষ্ট হইয়া জয়দ্রথকে সমভিব্যাহারে লইয়া অর্জুনকে বেষ্টন করিলেন। সংগ্রামকোবিদ, ব্যাদিতান অন্তকসদৃশ, নিতান্ত ভয়ঙ্কর মহাবীর ধনঞ্জয় ধনুষ্টঙ্কার ও তলধ্বনি করত সমরাঙ্গনে যেন নৃত্য করিতে লাগিলেন। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ নির্ভীকচিত্তে তাঁহাকে পরিবেষ্টন ও জয়দ্রথকে পশ্চাদ্ভাগে সংস্থাপন করিয়া কৃষ্ণের সহিত উহাকে সংহার করিতে অভিলাষী হইলেন। হে মহারাজ। ঐ সময় ভগবান্ ভাস্কর লোহিত বর্ণ ধারণ করিলেন। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ তদ্দর্শনে আহ্লাদিত হইয়া সূর্য্যের অচিরাৎ অন্তগমন বাসনা করত ভুজঙ্গভোেগসদৃশ ভুজদ্বারা কাৰ্ম্মক আনত করিয়া অর্জুনের প্রতি সূর্য্যরশ্মিসদৃশ শত শত সায়ক প্রয়োগ করিতে লাগিলেন। সমরদুৰ্ম্মদ মহাবীর অর্জুন তাঁহাদের প্রত্যেক শর দ্বিধা, ত্রিধা ও অষ্টধা ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে শরনিকরে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন সিংহ-লাঙ্গুলকেতু অশ্বত্থামা আপনার শক্তি প্রদর্শন করিবার বাসনায় অর্জুনকে নিবারণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন এবং দশ শরে পার্থ ও সাত শরে বাসুদেবকে বিদ্ধ করিয়া জয়দ্রথকে রক্ষা করত রথমার্গে অবস্থান করিতে লাগিল। কৌরবপক্ষীয় অন্যান্য মহারথগণও মহারাজ দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে রথসমূহে অর্জুনকে চতুর্দিকে বেষ্টন করিয়া সিন্ধুরাজকে রক্ষা করত শরাসন আকর্ষণপূর্ব্বক সায়কনিকর পরিত্যাগ করিতে আরম্ভকরিলেন। ঐ সময় সকলে মহাবীর পার্থের বাহুবল, গাণ্ডীববল ও শরজালের অক্ষয়ত্ব দর্শন করিতে লাগিল। তিনি অস্ত্র প্রয়োগপূর্ব্বক অশ্বত্থামা ও কূপের অস্ত্রজাল নিবারণ করিয়া সেই সিন্ধুরাজের রক্ষায় সমুদ্যত কৌরবপক্ষীয় বীরগণের প্রত্যেককে নয় নয় বাণে বিদ্ধ করিলেন। তখন অশ্বত্থামা পঞ্চবিংশতি, বৃষসেন সাত, দুর্য্যোধন বিংশতি এবং কর্ণ ও শল্য তিন তিন শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিয়া তর্জন-গর্জন ও শরাসন বিধূননপূর্ব্বক তাঁহার চতুর্দিক বেষ্টন করত বারংবার শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন।
অনন্তর সেই মহাবীরগণ অবিলম্বে পরস্পরের রথ সংশ্লিষ্ট করিয়া সূর্য্যের অচিরাৎ অস্তাচল-গমনাভিলাষে ধনুঃ-কম্পন ও সিংহনাদ পরিত্যাগ করিয়া জলধর যেমন পর্ব্বতের উপর জলধারা বর্ষণ করিয়া থাকে, তদ্রূপ অর্জুনের প্রতি সুতীক্ষ্ণ দিব্য শরনিকর নিক্ষেপ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন মহাবীর অর্জুন কৌরবপক্ষীয় বহুসংখ্যক বীরগণকে বিনাশ করিয়া সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের নিকট গমন করিলেন। কর্ণ তদ্দর্শনে ভীমসেন ও সাত্যকির সমক্ষেই অর্জুনকে শরনিকরে নিবারণ করিতে লাগিলেন। অর্জুনও সর্ব্বসৈন্যগণ-সমক্ষে তাঁহাকে দশ শরে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে সাত্যকি তিন, ভীম তিন ও অর্জুন সাত শরে কর্ণকে বিদ্ধ করিলেন। কর্ণ তাঁহাদিগের প্রত্যেককেই যষ্টি শরে বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে বহুবীরের সহিত কর্ণের ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। ঐ সময় আমরা সূতপুত্রের আশ্চর্য্য পরাক্রম অবলোকন করিলাম। তিনি একমাত্র হইয়াও ক্রোধভরে ঐ তিন মহারথকে নিবারণ করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহাবীর অর্জুন শত সায়কে কর্ণের মর্মস্থল আহত করিলে সূতপুত্র রুধিরদিগ্ধদেহ হইয়া পঞ্চাশৎ শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলে মহাবীর অর্জুন কর্ণের হস্তলাঘব দর্শনে নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার কার্ম্মক ছেদনপূর্ব্বক সত্বর নয় বাণে তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিয়া তাঁহাকে সংহার করিবার নিমিত্ত সত্বর এক সূর্য্যসঙ্কাশ সায়ক নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর অশ্বত্থামা সেই অর্জুন-বিসৃষ্ট শর মহাবেগে আগমন করিতেছে দেখিয়া সুতীক্ষ্ণ অর্দ্ধচন্দ্র বাণে উহা ছেদন করিয়া ফেলিলেন। সূতপুত্র সত্বর অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া সহস্র সহস্র সায়কে পাণ্ডবপ্রধান অর্জুনকে সমাচ্ছন্ন করিলেন। সমীরণ যেমন শলভশ্রেণীকে অপসারিত করে, তদ্রূপ প্রবলপ্রতাপ অর্জুন কর্ণবিসৃষ্ট সেই সমস্ত শর তৎক্ষণাৎ নিরাস করিয়া বীরগণ-সমক্ষে পাণিলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। কর্ণ প্রতীকার প্রদর্শন করিবার অভিলাষে সহস্র সহস্র সায়কে অর্জুনকে আচ্ছন্ন করিলেন। এইরূপে সেই বীরদ্বয় বৃষের ন্যায় নিনাদ করত অজিহ্মগ সায়কনিকর পরিত্যাগপূর্ব্বক আকাশমণ্ডল সমাচ্ছন্ন করিয়া আপনারাও তিরোহিত হইলেন। পরে সেই দুই মহাবীর স্ব স্ব নামোল্লেখ-পূর্ব্বক পরস্পরকে তিষ্ঠ তিষ্ঠ, বলিয়া গর্জন করত ক্ষিপ্রহস্তে অত্যাশ্চর্য্য ঘোরতর সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। তৎকালে সংগ্রামস্থলীতে' সকলেই তাঁহাদিগের আশ্চর্য্য রূপ অবলোকন এবং বায়ুবেগগামী সিদ্ধ ও চারণগণ তাঁহাদিগের ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে বীরদ্বয় পরস্পর-বধার্থী হইয়া ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।
তখন মহারাজ দুর্য্যোধন আপনার পক্ষীয় বীরগণকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, হে বীরগণ! কর্ণ আমাকে কহিয়াছেন, তিনি অর্জুনকে বিনাশ না করিয়া কদাচ প্রতিনিবৃত্ত হইবেন না; অতএব এক্ষণে তোমরা সাবধানে সূতপুত্রকে রক্ষা কর। হে মহারাজ! দুর্য্যোধন বীরগণকে এই কথা কহিতেছেন, এমন সময় শ্বেতবাহন অর্জুন কর্ণের বলবীর্য্য দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া আকর্ণাকৃষ্ট চারি শরে তাঁহার চারি অশ্ব বিনষ্ট ও ভল্লাস্ত্রে সারথিকে রথোপস্থ হইতে নিপাতিত করিয়া আপনার পুত্র রাজা দুর্য্যোধনের সমক্ষেই তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণ এইরূপে অর্জুনশর-সমাচ্ছন্ন এবং হতাশ্ব ও হতসারথি হইয়া মোহাবেশ প্রভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া রহিলেন। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা কর্ণকে স্বীয় রথে আরোপিত করিয়া পুনরায় অর্জুনের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ সময় মদ্ররাজ ত্রিংশৎ শরে অর্জুনকে বিদ্ধ করিলে কৃপাচার্য্য বিংশতি শরে বাসুদেবকে বিদ্ধ করিয়া ধনঞ্জয়ের উপর দ্বাদশ শর নিক্ষেপ করিলেন। তৎপরে সিন্ধুরাজ চারি ও বৃষসেন সাত শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে তাঁহারা প্রত্যেকেই কৃষ্ণ ও অর্জুনকে প্রহার করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় অশ্বত্থামাকে চতুঃষষ্টি, মদ্ররাজকে শত ও জয়দ্রথকে দশ ভল্লে এবং বৃষসেনকে তিন ও কৃপাচার্য্যকে বিংশতি শরে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিলেন। পরে আপনার পক্ষ বীরগণ পার্থের প্রতিজ্ঞাপ্রতিঘাতের' নিমিত্ত নিতান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া সত্বর তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন।
অনন্তর মহাবীর অর্জুন কৌরবগণের ত্রাসোৎপাদন করিয়া চতুর্দিকে বারুণাস্ত্র প্রাদুর্ভূত করিলেন। কৌরবেরাও মহার্হ রথারোহণপূর্ব্বক শর বর্ষণ করত অর্জুনের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। এইরূপে মহামোহকর অতি ভীষণ তুমুল সংগ্রাম উপস্থিত হইলে কিরীটা কিছুমাত্র চমৎকৃত না হইয়া শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। তিনি কৌরবগণকৃত দ্বাদশ বর্ষ সমুৎপন্ন ক্লেশপরম্পরা গ্রহণপূর্ব্বক রাজ্যলাভার্থী হইয়া গাণ্ডীবনির্মুক্ত শরনিকরে চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। তখন নভোমণ্ডলে উল্কাসকল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল ও বহুসংখ্যক বায়স নরকলেবরে নিপতিত হইতে লাগিল। ব্যোমকেশ যেমন ক্রোধপরবশ হইয়া পিঙ্গলবর্ণ জ্যা-সম্পন্ন পিনাকদ্বারা শত্রুগণকে সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ মহাবীর অর্জুন গাণ্ডীব শরাসননির্মুক্ত শরনিকরদ্বারা অশ্ব ও গজ-সমুদায়ে সমারূঢ় কৌরবগণের শরজাল নিরাস করিয়া তাঁহা-দিগকে নিপাতিত করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন মহীপালগণ গুর্ব্বী গদা, লৌহময় অর্গল, অসি, শক্তি ও অন্যান্য নানাবিধ অস্ত্র শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক সহসা অর্জুনাভিমুখে ধাবমান হইলেন। মহাবীর অর্জুন তদ্দর্শনে হাস্যমুখে যুগান্তকালীন মেঘ-গম্ভীরনিস্বন মহেন্দ্র-চাপ-প্রতিম গাণ্ডীব শরাসন আকর্ষণ করিয়া কৌরবগণকে শরাসনে দগ্ধ করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর অর্জুন সেই সমস্ত ধনুর্দ্ধরদিগকে রথী, নাগ ও পদাতিগণের সহিত অস্ত্রবিহীন ও নিপাতিত করিয়া যমরাজ্যবর্দ্ধন করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় মহাবীর ধনঞ্জয় কাৰ্ম্মক আকর্ষণ করিলে আপনার পক্ষীয় সৈন্যগণ অন্তকের সুষ্পষ্ট উৎক্রোশ শব্দ'সদৃশ, দেবরাজের অতিগভীর অশনি-নির্ঘোষতুল্য টঙ্কারধ্বনি শ্রবণ করিয়া যুগান্ত-বাতাহত, উত্তাল-তরঙ্গমালাসস্কুল, মীন-মকর-সমাকীর্ণ সমুদ্রজলের ন্যায় অতিশয় উদ্ভ্রান্ত হইয়া নিতান্ত উদ্বিগ্ন হইল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় এককালে দশদিকে বিচিত্র অস্ত্রজাল বিস্তারপূর্ব্বক ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে লাগিলেন। তিনি যে কখন শরগ্রহণ, কখন শরসন্ধান, কখন শরাকর্ষণ, আর কখনই বা শর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন, তাঁহার হস্তলাঘব প্রযুক্ত তাহা কিছুতেই লক্ষিত হইল না। অনন্তর তিনি নিতান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া কৌরবসৈন্যগণের ত্রাসোৎপাদন করত দুরাসদ' ঐন্দ্রাস্ত্র প্রয়োগ করিলেন। সেই অস্ত্রের প্রভাবে অসংখ্য অগ্নিমুখ সুপ্রদীপ্ত দিব্যাস্ত্র প্রাদুর্ভূত হইতে লাগিল। ঐ সমুদায় সূর্যাগ্নিসন্নিভ অস্ত্র অন্তরীক্ষে সমুত্থিত হওয়াতে আকাশমণ্ডল অসংখ্য মহোল্কা-পরিবৃত্তের ন্যায় দুর্নিরীক্ষ্য হইয়া উঠিল। হে মহারাজ। কৌরবেরা ইতিপূর্ব্বে বহু সহস্র সায়ক নিক্ষেপপূর্ব্বক রণস্থলে যে গাঢ় অন্ধকার সমুৎপাদন করিয়াছিলেন, অন্যান্য বীরগণ মনেও উহা নিবারণ করিবার কল্পনা করিতে সমর্থ নহেন; কিন্তু দিবাকর যেমন প্রাতঃকালে স্বীয় করজালদ্বারা গাঢ় অন্ধকার বিনাশ করেন, তদ্রূপ, মহাবীর ধনঞ্জয় পরাক্রম প্রকাশপূর্ব্বক মন্ত্রপূত দিব্যাস্ত্র-প্রভাবে সেই শরান্ধকার অনায়াসে দূরীকৃত করিলেন এবং নিদাঘ সূর্য্য যেমন করজালদ্বারা পল্বলসলিল বিনাশ করেন, তদ্রূপ শরজালদ্বারা কৌরবসৈন্যগণকে নিধন করিতে লাগিলেন। সূর্যকিরণ যেমন ধরাতলে নিপতিত হয়, তদ্রূপ অর্জুনবিসৃষ্ট শরসমুদায় কৌরবপক্ষীয় বীরগণের উপর নিপতিত হইয়া প্রিয় সুহৃদের ন্যায় তাহাদের হৃদয়ে প্রবেশ করিল। ফলতঃ তৎকালে যে যে শূরাভিমানী যোদ্ধা ধনঞ্জয়-সমীপে গমন করিলেন, তৎসমুদায়কেই তাঁহার শরানলে পতঙ্গবৃত্তি লাভ করিতে হইল।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর অর্জুন অরাতিগণের জীবন ও কীর্ত্তি বিলোপ করিয়া মূর্তিমান্ মৃত্যুর ন্যায় রণস্থলে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তিনি কাহারও কিরীটমণ্ডিত মস্তক, কাহারও অঙ্গদযুক্ত বিপুল ভুজ এবং কাহারও বা কুণ্ডলালঙ্কৃত কর্ণ ছেদন করিয়া সাদিগণের প্রাসযুক্ত, নিষাদিগণের তোমরযুক্ত, পদাতিগণের চর্মযুক্ত, রথিগণের কার্ম্মকযুক্ত ও সারথিগণের প্রতোদযুক্ত বাহুসমুদায় খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন এবং দীপ্ত শরনিকর বর্ষণ করত স্ফুলিঙ্গযুক্ত প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় শোভমান হইলেন। ঐ দেবরাজপ্রতিম সর্ব্বশস্ত্রবিশারদ মহাবীর রথারোহণে একেবারে চতুৰ্দ্দিক্ ভ্রমণ করত কখন মহাস্ত্র নিক্ষেপ, কখন রথমার্গে নৃত্য, কখন জ্যাশব্দ, কখন বা তলধ্বনি করিতে লাগিলেন। অন্যান্য নরপতিরা যত্নবান্ হইয়া মধ্যাহ্ন-কালীন সূর্য্যের ন্যায় ঐ প্রতাপশালী বীরকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইলেন না। তিনি সশর শরাসন ধারণ করিয়া বারি-ধারাবর্ষী ইন্দ্রায়ুধসমাযুক্ত বর্ষাকালীন জলধরের ন্যায় বিরাজমান হইলেন।
এইরূপে মহাবীর অর্জুন নিতান্ত দুস্তর ভয়ঙ্কর অস্ত্রজাল বিস্তার করিলে কাহার মস্তক ছিন্ন, কাহার বাহু নিকৃত্ত, কাহার ভুজদণ্ড পাণিশূন্য এবং কাহারও বা পাণিতল অঙ্গুলিবিযুক্ত হইয়া গেল। মদমত্ত মাতঙ্গগণের দন্ত ও শুণ্ড খণ্ড খণ্ড হইল। অশ্বসকল ছিন্নগ্রীব ও রথসমূহ চূর্ণ হইতে লাগিল এবং যোধগণ কেহ ছিন্নান্ত্র, কেহ ছিন্নপাদ ও কেহ কেহ ভগ্নসন্ধি' হইয়া নিশ্চেষ্ট হইয়া পড়িল। হে মহারাজ। ঐ সময় সমরভূমি মৃত্যুর আবাসস্থানের ন্যায়, পশুঘাতী রুদ্রের আক্রীড় ভূমির ন্যায়, ভীরুজনের নিতান্ত ভয়াবহ হইল। মাতঙ্গগণের খণ্ডিত শুণ্ডসমুদায় ইতস্ততঃ নিক্ষিপ্ত থাকাতে রণস্থল ভুজগকুলে সমাকুল বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। অসংখ্য মস্তক সমন্তাৎ বিকীর্ণ হওয়াতে বোধ হইল যে, রণভূমি পদ্মমাল্যে বিভূষিত হইয়াছে। চতুর্দিকে রাশি রাশি বিচিত্র উষ্ণীষ, মুকুট, কেয়ূর, অঙ্গদ, কুণ্ডল, সুবর্ণ বৰ্ম্ম, হস্তী ও অশ্বগণের অলঙ্কার এবং শত শত কিরীট নিপতিত থাকাতে সমরভূমি নববধূর ন্যায় শোভা ধারণ করিল।
হে মহারাজ! ঐ সময় সমরাঙ্গনে ভীষণ বৈতরণী নদীর ন্যায় ভীরুগণের ভয়াবহ এক অগাধ বিচিত্র ধ্বজ-পতাকা পরিশোভিত শোণিত নদী প্রবাহিত হইল। মজ্জা ও মেদ উহার কদ্দম; কেশনিচয় শাদ্বল ও শৈবাল; মস্তক ও বাহুসকল তটস্থিত পাষাণখণ্ড; ছত্র এবং চাপসমূহ তরঙ্গ; রথসমুদায় ভেলা; অশ্বসকল তীরভূমি; কাক ও কঙ্কসমুদায় মহানক্র, গোমায়ুসকল মকর এবং গৃধুকুল উহার গ্রাহসমূহের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। ঐ নদীর মধ্যে অসংখ্য নরকলেবর, গজদেহ, গ্রীবা, অস্থি, রথ, চক্র, যুগ, ঈষা, অক্ষ, কূবর, ভুজগাকার প্রাস, শক্তি, অসি, পরশু ও বিশিখসকল বিকীর্ণ থাকাতে উহা নিতান্ত দুর্গম হইয়া উঠিল। উহার উভয় কূলে শিবাগণ অতি ভীষণ রব এবং অসংখ্য ভূত, প্রেত ও পিশাচগণ নৃত্য করিতে আরম্ভ করিল। গতাসু যোধগণের স্পন্দহীন শত শত দেহ উহার স্রোতে প্রবাহিত হইতে লাগিল।
মহারাজ! মূর্তিমান্ অন্তকের ন্যায় অর্জুনের এইরূপ অদ্ভুত বিক্রম দর্শনে কৌরবগণের মনে অভূতপূর্ব্ব ভয়ের সঞ্চার হইল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় স্বীয় অস্ত্রদ্বারা বীরগণের অস্ত্রসমুদায় ছেদন করত অতি রৌদ্র কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া আপনাকে রৌদ্রকর্মা' বলিয়া পরিচয় প্রদান করিতে লাগিলেন। তিনি রথিগণকে অতিক্রম করিলে কোন বীরই মধ্যাহ্নকালীন প্রচণ্ড মার্তণ্ডের ন্যায় তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইল না। তাঁহার গাণ্ডীব ধনুঃ হইতে শরসমূহ নির্গত হইলে আকাশ-মণ্ডল বকপঙ্ক্তি পরিশোভিত বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। এইরূপে সিন্ধুরাজবধার্থ কৃষ্ণসারথি অর্জুন নারাচ নিক্ষেপ-পূর্ব্বক সমস্ত রথীদিগকে মুগ্ধ করিয়া চতুর্দিকে শর বর্ষণ করত দ্রুতবেগে সমরাঙ্গনে বিচরণ করিতে আরম্ভ করিলেন, তাঁহার শরাসনবিমুক্ত শরনিকর যেন অন্তরীক্ষে ভ্রমণ করিতে লাগিল। ঐ সময় তিনি যে, কখন কাৰ্ম্মক গ্রহণ, কখন শরসন্ধান, আর কখনই বা শরনিক্ষেপ করিলেন, তাহা কিছুই লক্ষিত হইল না। মহাবীর অর্জুন এইরূপে শরনিকরে দিত্মণ্ডল সমাচ্ছন্ন ও সমস্ত রথীদিগকে একান্ত ব্যাকুলিত করত জয়দ্রথের প্রতি ধাবমান হইয়া তাঁহাকে চতুঃষষ্টি শরে বিদ্ধ করিলেন। কৌরব-পক্ষীয় যোধগণ ধনঞ্জয়কে সৈন্ধবাভিমুখে সমুপস্থিত দেখিয়া জয়দ্রথের জীবিতাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক সমরে নিবৃত্ত হইতে লাগিলেন। হে মহারাজ! আপনার পক্ষীয় যে সমস্ত বীর মহাবীর অর্জুনের সম্মুখীন হইয়াছিলেন, অর্জুননির্মুক্ত শরনিকর তাঁহাদের উপর নিপতিত হইয়া প্রাণ সংহার করিল। মহাবীর অর্জুন এইরূপে অনলসঙ্কাশ শরজালদ্বারা আপনার সেই চতুরঙ্গ বল একান্ত ব্যাকুলিত ও সমরাঙ্গন কবন্ধসমাকুল করিয়া জয়দ্রথের প্রতি ধাবমান হইলেন এবং অশ্বত্থামাকে পঞ্চাশৎ, কৃপাচার্য্যকে নয়, শল্যকে ষোড়শ, কর্ণকে দ্বাত্রিংশৎ ও সিন্ধুরাজকে চতুঃষষ্টি শরে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। সিন্ধুরাজ ধনঞ্জয় শরাঘাতে অঙ্কুশাহত মাতঙ্গের ন্যায় ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহার বিক্রম কিছুতেই সহ্য করিতে সমর্থ হইলেন না। তখন তিনি ধনঞ্জয়ের রথ লক্ষ্য করিয়া অবিলম্বে আশীবিষসদৃশ কৰ্ম্মার-পরিমার্জিত কঙ্কপত্রালঙ্কৃত শরনিকর আকর্ণ সন্ধানপূর্ব্বক পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তৎপরে বাসুদেবকে তিন, ধনঞ্জয়কে ছয় নারাচে বিদ্ধ করিয়া আট শরে তাঁহার অশ্ব ও এক শরে ধ্বজদণ্ড বিদ্ধ করিলেন। অনন্তর মহাবীর অর্জুন সৈন্ধবপ্রেরিত সুতীক্ষ্ণ শরনিকর নিরাস করিয়া শরযুগলদ্বারা যুগপৎ জয়দ্রথের সারথির মস্তক ও সুসজ্জিত অগ্নিশিখাসদৃশ বরাহধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন।
ঐ সময় বাসুদেব দিবাকরকে অতি সত্বর অস্তাচলশিখরে আরোহণ করিতে দেখিয়া অর্জুনকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! ঐ দেখ, মহাবল পরাক্রান্ত ছয় জন মহারথ জয়দ্রথকে মধ্যস্থলে সংস্থাপনপূর্ব্বক অবস্থান করিতেছেন। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথও প্রাণ রক্ষার্থে নিতান্ত ভীত হইয়াছে, তুমি ঐ ছয় রথীকে পরাজয় না করিয়া প্রাণপণে যত্ন করিলেও জয়দ্রথকে সংহার করিতে সমর্থ হইবে না। অতএব আমি সূর্য্যকে আবরণ করিবার নিমিত্ত যোগমায়া প্রকাশ করিব; তাহার প্রভাবে দুরাত্মা সিন্ধুরাজ দিবাকরকে অস্তগত নিরীক্ষণপূর্ব্বক আপনার জীবন লাভ ও তোমার বধসাধন হইল বিবেচনা করিয়া হর্ষভরে কদাচ আত্মগোপন করিবে না। সেই সুযোগে তুমি উহাকে অনায়াসে বিনাশ করিতে সমর্থ হইবে; কিন্তু তৎকালে সূর্যদেব অস্তগত হইলেন মনে করিয়া সৈন্ধবসংহারে কদাচ উপেক্ষা প্রদর্শন করিও না। তখন অর্জুন তাহাই হইবে, বলিয়া তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণের বাক্যে স্বীকার করিলেন।
অনন্তর মহাত্মা কৃষ্ণ যোগমায়াপ্রভাবে অন্ধকার সৃষ্টি করিলেন। দিবাকর তিরোহিত হইল। কৌরবপক্ষীয় বীরগণ অর্জুনবিনাশার্থ সাতিশয় হর্ষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। সূর্য্যের অদর্শনে সৈনিক পুরুষগণের আনন্দের পরিসীমা রহিল না। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ আনন উন্নমিত করিয়া দিবাকরকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন বাসুদেব পুনরায় অর্জুনকে কহিলেন, হে অর্জুন! দেখ, জয়দ্রথ নিঃশঙ্কচিত্তে দিবাকর দর্শন করিতেছে, উহাকে সংহার করিবার এই উপযুক্ত অবসর। অতএব তুমি অবিলম্বে উহার মস্তক ছেদন করিয়া আপনার প্রতিজ্ঞা সফল কর।
মহাত্মা কেশব এইরূপ করিলে প্রবলপ্রতাপ অর্জুন সূর্য্য ও অনলসদৃশ শরনিকরে কৌরবসৈন্যগণকে বিনাশ করিয়া কৃপাচার্য্যকে বিংশতি, কর্ণকে পঞ্চাশৎ, শল্যকে ছয়, দুর্য্যোধনকে ছয়, বৃষসেনকে আট, সিন্ধুরাজকে ষষ্টি এবং অন্যান্য কৌরব-সৈন্যদিগকে অসংখ্য শরে বিদ্ধ করিয়া মহাবীর জয়দ্রথের প্রতি ধাবমান হইলেন। জয়দ্রথরক্ষক বীরগণ প্রজ্বলিত পাবকসদৃশ অর্জুনকে অভিমুখে উপস্থিত দেখিয়া অত্যন্ত সংশয়ারূঢ় হইলেন এবং জয়লাভার্থ তাঁহার উপর শরধারা বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন জয়শালী মহাবাহু অর্জুন অরাতিগণের শরজালে সমাচ্ছন্ন হইয়া রোষাবিষ্ট মনে তাঁহাদের বিনাশবাসনায় অতি ভীষণ শরজাল বিস্তার করিলেন। কৌরবপক্ষীয় সৈন্যরা অর্জুনের শরনিকরে সমাহত হইয়া সিন্ধুরাজকে পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিল; তৎকালে ভয়ে দুইজনে একত্র গমন করিতে সাহসী হইল না। মহারাজ! তখন আমরা সেই মহাযশস্বী অর্জুনের কি অদ্ভুত পরাক্রম অবলোকন করিলাম। তিনি যেরূপ যুদ্ধ করিলেন, সেরূপ যুদ্ধ আর কুত্রাপি হয় নাই, হইবেও না। রুদ্র যেমন প্রাণিগণকে বিনাশ করেন, তদ্রূপ ধনঞ্জয় গজ ও গজারোহী, অশ্ব, অশ্বারোহী এবং সারথিদিগকে বিনাশ করিতে লাগিলেন। সেই সময়ে কোন হস্তী, অশ্ব বা মনুষ্যকে অর্জুনশরে অনাহত অবলোকন করিলাম না। ঐ সময় সকলেই রজোরাশি ও অন্ধকারপ্রভাবে দৃষ্টিহীন হইয়া ঘোরতর মোহপ্রাপ্ত হইল। কেহ কাহাকে বিদিত হইতে সমর্থ হইল না। কালপ্রেরিত অসংখ্য সৈন্য অর্জুনশরে মর্মপীড়িত হইয়া কেহ ভ্রমণ, কেহ স্খলিত পদ, কেহ পতিত, কেহ অবসন্ন এবং কেহ বা ম্লান হইতে লাগিল। হে মহারাজ! সেই প্রলয়কালসদৃশ মহাদুস্তর অতি ভীষণ সংগ্রাম সময়ে ধরাতল রুধিরসিক্ত এবং বায়ু প্রবলবেগে প্রবাহিত হইলে পার্থিব রজোরাশি নিরাকৃত হইয়া গেল। রথচক্রসকল নাভিদেশ পর্য্যন্ত রুধিরে নিমগ্ন হইল। আরোহী-বিহীন বেগবান্ কুঞ্জর ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ ও রুধিরনিমগ্ন হইয়া আর্তনাদ করত স্বপক্ষীয় বল মৰ্দ্দনপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিল। সাদিবিহীন অশ্বগণ এবং পদাতিসমুদায় অর্জুনশরে সমাহত হইয়া প্রাণভয়ে ইতস্ততঃ ধাবমান হইল। বীরগণ বৰ্ম্মহীন হইয়া ভয়ে সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক মুক্তকেশে, রুধিরাজ-গাত্রে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন। কেহ কেহ গাঢ় আঘাতে বিনষ্ট হইয়া সমরভূমিতে রহিল এবং অনেকে নিহত হস্তীসমুদায়ের মধ্যে বিলীন হইয়া প্রাণ রক্ষা করিল।
হে মহারাজ। মহাবীর ধনঞ্জয় এইরূপে কৌরবসৈন্য বিদ্রাবিত করিয়া সিন্ধুরাজের রক্ষক কর্ণ, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য্য, শল্য, বৃষসেন এবং দুর্য্যোধনকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। তিনি লঘুহস্ততা প্রযুক্ত যে কখন শর গ্রহণ, কখন শর সন্ধান, আর কখনই বা শর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন, তাহা কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না। কেবল তাঁহার মণ্ডলাকার কাৰ্ম্মক ও সমন্তাৎ সমাকীর্ণ শরজালই আমাদের নেত্রপথে পতিত হইল। অনন্তর মহাবীর অর্জুন অবিলম্বে কর্ণ ও বৃষসেনের শরাসন ছেদনপূর্ব্বক ভল্লাস্ত্রদ্বারা শল্যের সারথিকে রথ হইতে নিপাতিত করিয়া অসংখ্য শরনিপাতে অশ্বত্থামা ও কৃপাচার্য্যকে গাঢ়তর বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে মহাবীর অর্জুন কৌরবপক্ষীয় মহারথগণকে একান্ত ব্যাকুলিত করিয়া অনল-সন্নিভ, অশনিসম দিব্যমন্ত্রপূত নিরন্তর গন্ধমাল্যে অর্চিত, এক ভয়ঙ্কর শর তৃণীর হইতে উদ্ধার করিয়া বিধিপূর্ব্বক বজ্রাস্ত্রের সহিত সংযোজিত করত সত্বর গাণ্ডীব শরাসনে সন্ধান করিলেন। নভোমণ্ডলস্থ প্রাণিগণ তদ্দর্শনে মহানাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তখন বাসুদেব পুনরায় সত্বর ধনঞ্জয়কে কহিলেন, হে অর্জুন। দিবাকর অস্তাচলশিখরে আরোহণ করিতেছেন; অতএব তুমি শীঘ্র দুরাত্মা সিন্ধুরাজের শিরশ্ছেদন কর; কিন্তু আমি সিন্ধুরাজবধবিষয়ে এক উপদেশ প্রদান করিতেছি, তুমি অবহিত হইয়া শ্রবণ কর।
জয়দ্রথের পিতা ত্রিলোকবিশ্রুত মহারাজ বৃদ্ধক্ষত্র বহু-কালের পর জয়দ্রথকে লাভ করেন। জয়দ্রথের জন্মকালে এই দৈববাণী তাঁহার পিতার কর্ণগোচর হইয়াছিল, হে রাজন! তোমার আত্মজ এই জীবলোকে সূর্য্য ও চন্দ্রবংশীয়দিগের ন্যায় কুল, শীল ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহ প্রভৃতি সদ্গুণে ভূষিত হইবেন এবং সকল বীর পুরুষেরাই প্রতিনিয়ত ইঁহার সৎকার করিবে; কিন্তু কোন এক ক্ষত্রিয়প্রধান সুপ্রসিদ্ধ শত্রু ক্রোধাবিষ্ট হইয়া যুদ্ধকালে ইঁহার শিরশ্ছেদন করিবেন। সিন্ধুরাজ বৃদ্ধক্ষত্র এই দৈববাণী | শ্রবণ করিবামাত্র পুত্রস্নেহে অতিমাত্র কাতর হইয়া বহুক্ষণ চিন্তা করত জ্ঞাতিদিগকে কহিলেন, যে ব্যক্তি ঘোরতর সংগ্রামকালে আমার এই একান্ত দুর্ভর ভারবাহী পুত্রের মস্তক ধরণীতলে নিপাতিত করিবে, তাহার মস্তক তৎক্ষণাৎ শতধা বিদীর্ণ হইয়া ভূতলে নিপতিত হইবে, সন্দেহ নাই। মহারাজ বৃদ্ধক্ষত্র এই বলিয়া জয়দ্রথকে রাজ্যে অভিষেক করিয়া বন গমনপূর্ব্বক তপোনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন। হে অর্জুন! তিনি এক্ষণে এই কুরুক্ষেত্রের বহির্ভাগে সমন্তপঞ্চক নামক তীর্থে অতি কঠোর তপস্যা করিতেছেন; অতএব তুমি ভয়ঙ্কর দিব্যাস্ত্রপ্রভাবে জয়দ্রথের কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক ছেদন করিয়া অবিলম্বে তাঁহার অঙ্কে নিপাতিত কর। যদি তুমি স্বয়ং ইঁহার মস্তক ভূতলে নিক্ষেপ কর, তাহা হইলে নিঃসন্দেহ তোমারও মস্তক শতধা বিদীর্ণ হইয়া ভূতলে নিপতিত হইবে। হে ধনঞ্জয়! দিব্যাস্ত্রপ্রভাবে এরূপ অলক্ষিতভাবে জয়দ্রথের মস্তক উঁহার পিতার অঙ্কে নিপাতিত করিবে, যেন তিনি কোনমতেই ঐ বিষয় বিদিত হইতে সমর্থ না হন। হে অর্জুন! ত্রিলোকমধ্যে তোমার অসাধ্য কিছুই নাই।
মহাবীর অর্জুন কৃষ্ণের এই কথা শ্রবণ করিয়া সৃক্কণী লেহনপূর্ব্বক সেই সৈন্ধববধার্থে কৃতসন্ধান ভীষণ শর পরিত্যাগ করিলেন। শ্যেন পক্ষী যেমন বৃক্ষাগ্র হইতে শকুন্তকে হরণ করিয়া থাকে, তদ্রূপ সেই গাণ্ডীবনির্মুক্ত অশনিসদৃশ শর জয়দ্রথের মস্তক হরণ করিল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় শত্রুগণের শোকোদ্দীপন ও মিত্রগণের হর্ষবর্দ্ধন করিবার নিমিত্ত ঐ ছিন্ন মস্তক ধরাতলে নিপতিত না হইতে হইতেই শরনিকরদ্বারা পুনর্ব্বার উর্দ্ধে উত্থাপিত করিয়া সমস্তপঞ্চকের বহির্ভাগে উপনীত করিলেন। ঐ সময় মহারাজ বৃদ্ধক্ষত্র সন্ধ্যোপাসনা করিতেছিলেন। ধনঞ্জয় সেই জয়দ্রথের কুণ্ডলালঙ্কৃত ছিন্নমুণ্ড অলক্ষিতরূপে তাঁহার অঙ্কদেশে নিপাতিত করিলেন। মহারাজ বৃদ্ধক্ষত্র জপসমাপনান্তে আসন হইতে উত্থিত হইবামাত্র সেই জয়দ্রথের ছিন্ন মস্তক ভূতলে নিপতিত হইল। তখন বৃদ্ধক্ষত্রের মস্তকও শতধা বিদীর্ণ হইয়া গেল। তদ্দর্শনে সকলেই অতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কৃষ্ণ ও অর্জুনের ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে অর্জুনশরে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ নিহত হইলে মহাত্মা কৃষ্ণ অন্ধকার প্রতিসংহার করিলেন। তখন আপনার পুত্রগণ সেই বাসুদেবকৃত মায়াজাল বিস্তারের বিষয় সম্যক্ অবগত হইলেন। হে রাজন! আপনার জামাতা সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ এই প্রকারে আট অক্ষৌহিণী সেনা বিনষ্ট করিয়া পরিশেষে অর্জুনশরে কলেবর পরিত্যাগ করিলেন। তদ্দর্শনে আপনার পুত্রগণের নেত্রযুগল হইতে শোকাবেগপ্রভাবে অনর্গল অশ্রুজল নিপতিত হইতে লাগিল। মহাবীর ধনঞ্জয় পাঞ্চজন্য শঙ্খ প্রশ্নাপিত করিতে আরম্ভ করিলেন। ভীমসেন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে প্রতিবোধিত করিয়াই যেন সিংহনাদদ্বারা রোদসী প্রতিধ্বনিত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। যুধিষ্ঠির সেই সিংহনাদ শ্রবণে অর্জুনশরে সিন্ধুরাজ নিহত হইয়াছেন অনুমান করিয়া বাদ্যধ্বনিদ্বারা স্বপক্ষীয় যোদ্ধাদিগকে আনন্দিত করত সংগ্রাম করিবার বাসনায় দ্রোণের সহিত সমাগত হইলেন। ঐ সময় দিবাকর অস্তাচল-চূড়াবলম্বী হইলে সোমকদিগের সহিত দ্রোণাচার্য্যের লোমহর্ষণ ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। সোমকেরা ভারদ্বাজকে বিনাশ করিবার বাসনায় পরম প্রযত্ন-সহকারে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবগণ সিন্ধুরাজবধজনিত জয়লাভে উন্মত্তপ্রায় হইয়া দ্রোণের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইলেন। মহাবীর ধনঞ্জয়ও সিন্ধুরাজকে সংহার করিয়া আপনার পক্ষ মহারথগণের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ করিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। মহাবীর সিন্ধুরাজ নিহত হইলে কৌরবপক্ষীয় বীরগণ কি করিলেন, তাহা কীর্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাবীর কৃপাচার্য্য জয়দ্রথকে নিহত দেখিয়া রোষাবিষ্ট চিত্তে ধনঞ্জয়ের উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। অশ্বত্থামাও ঐ সময় রথারোহণ-পূর্ব্বক অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। এইরূপে মহারথ কৃপাচার্য্য ও অশ্বত্থামা উভয়ে দুই দিক্ হইতে অতি তীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহারথশ্রেষ্ঠ মহাবাহু অর্জুন তাঁহাদের শরনিকরে নিপীড়িত হইয়া অত্যন্ত কাতর হইলেন। তখন তিনি গুরু কৃপাচার্য্য ও গুরুপুত্র অশ্বত্থামাকে বিনাশ করিবার বাসনায় আচার্য্যের ন্যায় বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক স্বীয় অস্ত্রদ্বারা কূপ ও অশ্বত্থামার শরবেগ নিবারণ করিলেন। তৎপরে তাঁহাদের নিধন-বাসনা পরিত্যাগপূর্ব্বক মন্দবেগে শর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। অর্জুননির্মুক্ত শরসমুদায় অনবরত গাত্রে নিপতিত হওয়াতে তাঁহারা দুইজনে অতিশয় কাতর হইয়া উঠিলেন। কৃপাচার্য্য পার্থশরপ্রভাবে মূর্ছিত হইয়া রথোপরি অবসন্ন হইলেন। সারথি তাঁহাকে বিহ্বল দেখিয়া মৃতজ্ঞানে রথ লইয়া পলায়ন করিল। তদ্দর্শনে অশ্বত্থামাও ভীত হইয়া অর্জুনের নিকট হইতে প্রস্থান করিলেন।
ঐ সময় মহাধনুর্দ্ধর ধনঞ্জয় শরপীড়িত কৃপাচার্য্যকে রথোপরি মূর্ছিত অবলোকন করিয়া বিলাপ করত অশ্রুপূর্ণ নয়নে দীন বচনে কহিতে লাগিলেন, বিজ্ঞবর বিদুর কুলান্তক পাপাত্মা দুর্য্যোধন জন্মিবামাত্র মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে কহিয়াছিলেন যে, এই কুলাঙ্গারকে বিনাশ করুন। ইহা হইতেই কৌরবগণের মহাভয় উপস্থিত হইবে। এখন সত্যবাদী বিদুরের সেই কথা সপ্রমাণ হইতেছে। দুরাত্মা দুর্য্যোধনের নিমিত্তই আজি গুরুকে শরশয্যায় শয়ান দেখিতে হইল। অতএব ক্ষত্রিয়দিগের আচার ও বলবীর্য্যে ধিক্; আমার সদৃশ কোন্ ব্যক্তি আচার্য্যের অনিষ্টাচরণে প্রবৃত্ত হয়? মহাত্মা কৃপ ঋষিপুত্র, আমার আচার্য্য ও দ্রোণের প্রিয় সখা; আমি ইচ্ছা না করিয়াও উঁহাকে শরনিকরে নিপীড়িত করিলাম। উনি আমার বাণে নিপীড়িত ও রথোপরি অবসন্ন হইয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ করিতেছেন। উনি আমায় অসংখ্য শরে নিপীড়িত করিলেও আমার উপেক্ষা করা উচিত; কিন্তু আমি বিপরীতাচরণ করিয়াছি। এক্ষণে উনি আমার শরে মূর্ছিত হইয়া আমাকে পুত্রশোক অপেক্ষা অধিকতর দুঃখগ্রস্ত করিলেন। হে কৃষ্ণ। ঐ দেখ, কৃপাচার্য্য দীনভাবে রথোপরি অবসন্ন রহিয়াছেন। যাঁহারা কৃতবিদ্য হইয়া গুরুকে অভিলষিত দ্রব্য প্রদান করেন, তাঁহারা দেবত্ব লাভ করিয়া থাকেন। আর যে দুরাত্মারা কৃতবিদ্য হইয়া শিক্ষকদিগকে বিনাশ করে, তাহারা নিরয়গামী হয়। অতএব আজ আমি শরবর্ষণে আচার্য্যকে রথমধ্যে অবসন্ন করিয়া নরকগমনের কার্য্য করিলাম। কৃপাচার্য্য আমার অস্ত্রশিক্ষাসময়ে কহিয়াছিলেন যে, হে কুরুবংশোদ্ভব! তুমি কখনই গুরুকে প্রহার করিও না; কিন্তু আজি আমি তাঁহাকে শরাঘাত করিয়া তাঁহার বাক্য উল্লঙ্ঘন করিলাম। এক্ষণে রণে অপরাম্মুখ, পূজ্যতম গৌতমপুত্রকে প্রণাম করি, আমি উঁহাকে প্রহার করিয়াছি; আমাকে ধিক্!
হে মহারাজ। অর্জুন এইরূপে বিলাপ করিতেছেন, এমন সময়ে মহাবীর কর্ণ সিন্ধুরাজকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া ধনঞ্জয়ের প্রতি ধাবমান হইলেন। যুধামন্যু, উত্তমৌজাঃ ও সাত্যকি কর্ণকে অর্জুনের সমীপে আগমন করিতে দেখিয়া সহসা তাঁহার প্রতি গমন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ অর্জুন হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া সাত্যকির অভিমুখে ধাবমান হইলেন। তদ্দর্শনে ধনঞ্জয় হাস্যবদনে কৃষ্ণকে কহিলেন, হে হৃষীকেশ। ঐ দেখ, মহাবীর সূতপুত্র সাত্যকির অভিমুখে গমন করিতেছে, ঐ মহাবীর কখনই ভূরিশ্রবার বিনাশ সহ্য করিতে পারিবে না। অতএব শীঘ্র কর্ণের সমীপে রথ সঞ্চালন কর। কর্ণ যেন সাত্যকিকে ভূরিশ্রবার পদবীতে' প্রেরণ করিতে না পারে।
মহাবীর অর্জুন এইরূপ কহিলে, মহাবাহু কেশব তাঁহাকে তৎকালোচিত কথা কহিতে লাগিলেন, হে অর্জুন! মহাবাহু সাত্যকি একাকীই কর্ণের সহিত সংগ্রাম করিতে সমর্থ; তাহাতে আবার যুধামন্যু ও উত্তমৌজাঃ তাঁহার সহায় রহিয়াছে। বিশেষতঃ এখন কর্ণের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হওয়া তোমার কর্তব্য নয়। উঁহার নিকট প্রজ্বলিত মহোল্কাসদৃশী বাসবপ্রদত্ত শক্তি বিদ্যমান রহিয়াছে। ঐ মহাবীর তোমার সংহারার্থই যত্নপূর্ব্বক ঐ শক্তি রাখিয়াছে। অতএব কর্ণ এক্ষণে সাত্যকির নিকট গমন করুক। হে অর্জুন! তুমি যে সময়ে ঐ দুরাত্মাকে তীক্ষ্ণ শরে ভূতলে নিপাতিত করিবে, আমি তাহা বিলক্ষণ অবগত আছি।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। মহাবীর ভূরিশ্রবাঃ ও সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ নিহত হইলে কর্ণের সহিত সাত্যকির কিরূপ সংগ্রাম হইল? সাত্যকি রথবিহীন হইয়াছিলেন; এক্ষণে তিনি কোন্ রথে আরোহণ করিয়া যুদ্ধ করিলেন? আর পাণ্ডবপক্ষীয় চক্ররক্ষক যুধামন্যু ও উত্তমৌজাও বা কিরূপে সংগ্রাম করিলেন? এই সমুদায় বৃত্তান্ত কীর্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আমি আপনার নিকট আপনারই দুরাচারজনিত সমরবৃত্তান্ত বর্ণন করিতেছি, আপনি ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক শ্রবণ করুন। মহাত্মা বাসুদেব অতীত ও অনাগত বিষয় বর্তমানের ন্যায় প্রত্যক্ষ করিয়া থাকেন। যূপকেতু ভূরিশ্রবাঃ যে, সাত্যকিকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবেন, ইহা পূর্ব্বেই তাঁহার হৃদয়ঙ্গম হইয়াছিল। তিনি তন্নিবন্ধন নিজ সারথি দারুককে রথ সুসজ্জিত করিয়া রাখিতে আদেশ করিয়াছিলেন। | হে কুরুরাজ। দেবতা, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, উরগ, রাক্ষস ও মনুষ্যগণের মধ্যে মহাত্মা কৃষ্ণ ও অর্জুনকে পরাজয় করিতে পারে এমন কেহই নাই। পিতামহ প্রভৃতি দেবগণ ও সিদ্ধগণ এই দুই মহাত্মার অতুল প্রভাবের বিষয় সম্যক্ বিদিত আছেন। যাহা হউক, এক্ষণে যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, আপনি অবহিত হইয়া শ্রবণ করুন।
মহামতি বাসুদেব মহাবীর সাত্যকিকে রথশূন্য ও কর্ণকে যুদ্ধে সমুদ্যত অবলোকন করিয়া ঋষভম্বরে' শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন। দারুক সেই শঙ্খধ্বনি শ্রবণে কৃষ্ণের সঙ্কেত বুঝিতে পারিয়া অবিলম্বে সাত্যকির নিকট গরুড়ধ্বজ রথ উপনীত করিলেন। তখন মহাবীর সাত্যকি কেশবের আদেশানুসারে কামগামী স্বর্ণালঙ্কারভূষিত শৈব্য, সুগ্রীব, মেঘপুষ্প ও বলাহক নামক চারি অশ্ব সংযোজিত, সূর্যাগ্নিসঙ্কাশ, বিমানপ্রতিম রথে আরোহণ করিয়া সায়ক বর্ষণপূর্ব্বক কর্ণের প্রতি ধাবমান হইলেন। ঐ সময় চক্ররক্ষক যুধামন্যু ও উত্তমৌজাও ধনঞ্জয়ের রথ পরিত্যাগ করিয়া কর্ণের প্রতি দ্রুতবেগে গমন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ রোষভরে শর বর্ষণপূর্ব্বক সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইলেন। হে মহারাজ! তৎকালে সাত্যকির সহিত কর্ণের যেরূপ সংগ্রাম হইল, ঐরূপ যুদ্ধ ভূলোক বা দ্যুলোকেও দেবতা, গন্ধর্ব্ব, অসুর, উরগ ও রাক্ষসগণ মধ্যেও কদাচ উপস্থিত হয় নাই। সেই উভয় পক্ষীয় চতুরঙ্গ বল তৎকালে ঐ বীরদ্বয়ের মোহকর কার্য্য অবলোকন করিয়া যুদ্ধ হইতে বিরত হইল। তাহারা সেই বীরদ্বয়ের অলৌকিক সংগ্রাম এবং রথস্থ দারুকের গত, প্রত্যাগত, আবৃত্ত, মণ্ডল ও সন্নিবর্তন প্রভৃতি বিবিধ গতি প্রদর্শন সহকারে সারথ্য কার্য্যের অনুষ্ঠান নিরীক্ষণ করিয়া বিস্মিত হইলেন। দেব, দানব ও গন্ধর্ব্বগণ নভোমণ্ডলে অবস্থান করিয়া অনন্যমনে ঐ উভয় বীরের ঘোরতর যুদ্ধ সন্দর্শন করিতে লাগিলেন।
তখন মিত্রার্থ যুদ্ধে প্রবৃত্ত সেই মহাবল পরাক্রান্ত, বীরদ্বয়, পরস্পরের প্রতি শরনিকর বর্ষণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। অমরসঙ্কাশ মহাবীর কর্ণ ভূরিশ্রবাঃ ও জলসন্ধের বিনাশ সহ্য করিতে অসমর্থ হইয়া শর বর্ষণপূর্ব্বক সাত্যকিকে মৰ্দ্দিত করিতে লাগিলেন। তৎপরে তিনি শোকাবেগবশতঃ ভীষণ ভুজগের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক রোষারুণনেত্রে সাত্যকিকে দগ্ধ করিয়াই যেন বারংবার মহাবেগে ধাবমান হইলেন। সাত্যকি তাঁহাকে ক্রোধাবিষ্ট দেখিয়া মাতঙ্গ যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গকে দন্তাঘাত করিয়া থাকে, তদ্রূপ অনবরত শরাঘাত করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে সেই অনুপম পরাক্রমশালী বীরদ্বয় ব্যাঘ্রদ্বয়ের ন্যায় পরস্পর মিলিত হইয়া শরনিকরে পরস্পরকে ক্ষত-বিক্ষত করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহাবীর সাত্যকি শরজালদ্বারা বারংবার কর্ণের কলেবর ভেদ করিয়া ভল্লাস্ত্রে তাঁহার সারথিকে রথোপস্থ হইতে নিপাতিত করিলেন এবং নিশিত শরনিকরে তাঁহার শ্বেতবর্ণ চারি অশ্ব বিনষ্ট ও শত শরে ধ্বজদণ্ড শতধা খণ্ড খণ্ড করিয়া আপনার আত্মজ দুর্য্যোধনের সমক্ষেই তাঁহাকে রথহীন করিলেন। অনন্তর আপনার পক্ষীয় মদ্ররাজ শল্য, কর্ণাত্মজ বৃষসেন ও দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা চতুৰ্দ্দিক্ হইতে সাত্যকিকে পরিবেষ্টন করিতে লাগিলেন। তখন সমস্ত সৈন্য আকুল হইয়া উঠিল; কেহ কিছুই জ্ঞাত হইতে সমর্থ হইল না। সৈন্যগণ কর্ণকে রথশূন্য নিরীক্ষণ করিয়া হাহাকার করিতে লাগিল। হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর কর্ণ মহারাজ দুর্য্যোধনের সহিত বাল্যাবধি সৌহার্দ্দদ স্মরণ ও তাঁহাকে রাজ্য প্রদান করিবার প্রতিজ্ঞা প্রতিপালনপূর্ব্বক সংগ্রাম করত সাত্যকির শরজালে সমাচ্ছন্ন ও একান্ত বিহ্বল হইয়া নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে করিতে দুর্য্যোধনের রথে আরোহণ করিলেন।
মহাবীর সাত্যকি এইরূপে কর্ণকে রথশূন্য করিয়া দুঃশাসন প্রভৃতি শূরগণকে বিরথ ও বিহ্বল করিতে লাগিলেন; কিন্তু ভীমের পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞা স্মরণপূর্ব্বক কিছুতেই তাঁহা-দিগের প্রাণ নাশ করিলেন না। আর মহাবীর অর্জুন পুনর্দ্যত-- সময়ে কর্ণকে সংহার করিবেন বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, তন্নিবন্ধন যুযুধান তাঁহার বিনাশেও ক্ষান্ত হইলেন। কর্ণপ্রমুখ মহারথগণ সাত্যকিকে বধ করিবার নিমিত্ত বারংবার যত্ন করিয়াছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই। ঐ মহাবীর ধর্মরাজের হিতানুষ্ঠানার্থ জীবিতাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়া একমাত্র ধনুঃপ্রভাবে অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা ও অন্যান্য মহারথগণকে পরাজয় করিলেন। এইরূপে বাসুদেব ও অর্জুন-সদৃশ মহাবল পরাক্রান্ত সাত্যকি হাস্যমুখে আপনার সৈন্যগণকে যমালয়ে প্রেরণ করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! এ ভূমণ্ডলে কৃষ্ণ, অর্জুন ও সাত্যকি এই তিনজনই মহাধনুর্দ্ধর; ইঁহাদের তুল্য ধনুর্দ্ধর আর কাহাকেও উপলব্ধি হয় না।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। বলবীর্য্যদর্পিত, দারুক সারথি সমবেত, বাসুদেবসদৃশ মহাবীর সাত্যকি কৃষ্ণের অজেয় রথে আরোহণপূর্ব্বক কর্ণকে রথশূন্য করিয়া কি আর কোন অন্য রথে সমারূঢ় হইয়াছিলেন? ইহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত অভিলাষ হইয়াছে। অতএব আমার সমক্ষে উহা কীর্তন কর। আমার মতে সাত্যকির পরাক্রম নিতান্ত অসহ্য।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! আপনি যাহা কহিলেন, কীর্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। কিয়ৎক্ষণ পরে দারুকের অনুজ যথাবিধি সুসজ্জিত লৌহ ও কাঞ্চনময় পট্টে বিভূষিত, বিচিত্র কূবরযুক্ত, তারা সহস্রখচিত, সিংহধ্বজ ও পতাকাসম্পন্ন, সুবর্ণালঙ্কৃত বায়ুবেগগামী অশ্বগণে সংযুক্ত, মেঘগভীরনিস্বন অন্য এক রথ সাত্যকির নিকট আনয়ন করিল। মহাবীর যুযুধান উহাতে আরোহণ করিয়া কৌরবসৈন্যগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। কৃষ্ণসারথি দারুক স্বেচ্ছানুসারে কৃষ্ণের সন্নিধানে গমন করিলেন। তখন কর্ণের এক সারথিও শঙ্খ ও গোক্ষীরের ন্যায় পাণ্ডুরবর্ণ, কাঞ্চন বৰ্ম্মধারী বেগগামী অশ্বগণে সংযুক্ত, সুবর্ণ কক্ষাযুক্ত, ধ্বজদণ্ডে সুশোভিত, যন্ত্রবদ্ধ, পতাকায় সমলঙ্কৃত, বহুবিধ অস্ত্র-শস্ত্র ও পরিচ্ছদে পরিপূর্ণ রথ সমানীত করিল। মহাবীর কর্ণ তাহাতে আরোহণ করিয়া বিপক্ষগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। হে মহারাজ! আপনি যাহা জিজ্ঞাসা করিতে-ছিলেন, তৎসমুদায় কহিলাম। এক্ষণে আপনার দুর্নীতিজনিত বিনাশবৃত্তান্তও শ্রবণ করুন। এই যুদ্ধে বিচিত্র যোদ্ধা ভীমসেন আপনার দুর্মুখপ্রমুখ একত্রিংশৎ পুত্রকে এবং সাত্যকি ও অর্জুন, ভীষ্ম ও ভগদত্ত প্রভৃতি শত শত বীরগণকে বিনাশ করিলেন। হে মহারাজ! কেবল আপনার দুৰ্ম্মন্ত্রণাপ্রভাবেই এইরূপ লোকক্ষয় হইতেছে।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! আমার এবং পাণ্ডবপক্ষীয় বীরপুরুষগণ রণস্থলে তদবস্থাপন্ন হইলে মহাবীর ভীম কি করিল, তদবৃত্তান্ত কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। রথবিহীন মহাবীর ভীমসেন কর্ণের বাক্যে অতিমাত্র কাতর হইয়া রোযাবিষ্ট চিত্তে ধনঞ্জয়কে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে ভ্রাতঃ। কর্ণ তোমার সাক্ষাতেই আমাকে তুবরক, অস্মর', অস্ত্রমূঢ়', বালক ও সংগ্রাম-কাতর বলিয়া বারংবার কটূক্তি প্রয়োগ করিতেছে। আমি পূর্ব্বে তোমার সমক্ষে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, যে দুরাত্মা আমাকে ঐ প্রকার কটূক্তি করিবে, সে আমার বধ্য। হে পার্থ! তুমিও কর্ণবধের নিমিত্ত পূর্ব্বে প্রতিজ্ঞা করিয়াছ; অতএব এক্ষণে যাহাতে আমাদের উভয়ের সত্য প্রতিপালন হয়, তাহার চেষ্টা কর।
অমিত-পরাক্রম মহাবীর অর্জুন ভীমসেনের বাক্য শ্রবণ করিয়া কর্ণের অভিমুখে গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে সূতপুত্র! তুমি নিতান্ত পাপাশয়, অদূরদর্শী ও আত্মশ্লাঘা-পরায়ণ। যাহা হউক, আমি যাহা কহিতেছি, তাহাতে কর্ণপাত কর। যুদ্ধে বীরপুরুষগণের জয় ও পরাজয় এই উভয়ই হইয়া থাকে। রণস্থলে ইন্দ্রকেও কখন জয়শালী ও কখন পরাজিত হইতে হয়। তুমি মহাবীর সাত্যকিকর্তৃক বিরথ, বিকলেন্দ্রিয় ও মুমূর্ষুপ্রায় হইলে তিনি তোমাকে আমার বধ্য স্মরণ করিয়া জীবিতাবস্থায় পরিত্যাগ করিয়াছেন। এক্ষণে তুমি ভীমসেনকে রথশূন্য করিয়া তাঁহার প্রতি দুর্ব্বাক্য প্রয়োগ করত নিতান্ত অধর্মাচরণ করিতেছ। শত্রুকে পরাজয় করিয়া আত্মশ্লাঘা, পরগ্লানি বা অরাতির প্রতি দুর্ব্বাক্য প্রয়োগ করা বীরপুরুষের কর্তব্য নহে। তুমি সূতপুত্র ও অল্পজ্ঞানসম্পন্ন; এই নিমিত্ত সদ্রতপরায়ণ মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনের প্রতি কটূক্তি করিতেছ। মহাবীর ভীমসেন সমুদায় সৈন্যগণের, কেশবের ও আমার সমক্ষে তোমাকে অনেকবার রথবিহীন করিয়াছেন, কিন্তু তিনি কিছুমাত্র পরুষবাক্য প্রয়োগ করেন নাই। যাহা হউক, তুমি ভীমসেনের প্রতি কটূক্তি প্রয়োগ এবং আমার অসমক্ষে অন্যান্য বীরগণের সহিত সমবেত হইয়া অভিমন্যুকে বিনাশ করিয়া যে গর্ব্ব প্রকাশ করিতেছ, অবিলম্বেই তাহার ফল ভোগ করিবে। হে দুৰ্ম্মতে! তুমি আত্মবিনাশের নিমিত্তই অভিমন্যুর শরাসন ছেদন করিয়াছ। আমি তোমাকে তোমার ভৃত্য, বল ও বাহনের সহিত বিনাশ করিব, সন্দেহ নাই। হে রাধানন্দন! এক্ষণে তোমার মহাভয়াবহ সময় উপস্থিত হইয়াছে। অতএব যাহা কর্তব্য থাকে, তাহা এই সময়েই অনুষ্ঠান কর। আমি এই অস্ত্র স্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আজি তোমার সমক্ষে তোমার পুত্র বৃষসেনকে সংহার করিব। আর যে সমুদায় ভূপতি মোহবশতঃ আমার সম্মুখে আগমন করিবেন, তাঁহাদিগকেও আমার শরে শমনভবনে গমন করিতে হইবে। হে আত্মাভিমানী অজ্ঞান! দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধন নিশ্চয়ই তোমাকে রণে নিপতিত নিরীক্ষণ করিয়া সাতিশয় অনুতাপ করিবে।
এইরূপে মহাবীর ধনঞ্জয় কর্ণের পুত্রকে বিনাশ করিতে প্রতিজ্ঞা করিলে রথিগণ তুমুল কোলাহল করিতে লাগিল। ঐ ভয়াবহ সময়ে দিবাকর করনিকর সঙ্কোচ করিয়া অস্তাচলশিখরে আরোহণ করিলেন। তখন মহাত্মা হৃষীকেশ ধনঞ্জয়কে আলিঙ্গনপূর্ব্বক কহিলেন, হে অর্জুন! তুমি ভাগ্যবলে জয়দ্রথ-বধরূপ প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করিয়াছ। ভাগ্যবলে বৃদ্ধক্ষত্র পুত্রের সহিত নিহত হইয়াছেন। হে অর্জুন! এই ধার্তরাষ্ট্র-সৈন্যমধ্যে মহাবীর কার্তিকেয় অবতীর্ণ হইলেও তাঁহাকে অবসন্ন হইতে হয়, সন্দেহ নাই। যাহা হউক, এই জগতীতলে তোমা ভিন্ন আর কোন ব্যক্তিকেই এই সৈন্যগণের সহিত যুদ্ধ করিতে সমর্থ বলিয়া বিবেচনা হয় না। তোমার তুল্য বা তোমা হইতে সমধিক বলবীর্য্যসম্পন্ন মহাপ্রভাব মহীপালগণ মহাবাহু দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে কৌরবসৈন্যমধ্যে সমবেত হইয়াছেন। তাঁহারা তোমাকে ক্রোধাবিষ্ট অবলোকন ও তোমার সন্নিধানে আগমন করিয়াও তোমার সহিত যুদ্ধ করিতে সমর্থ হন নাই। তোমার বলবীর্য্য রুদ্র, শত্রু ও অন্তকের সদৃশ; অদ্য তুমি যেরূপ পরাক্রম প্রকাশ করিলে, এইরূপ প্রাক্রম প্রদর্শন করিতে কেহই সমর্থ নহে। হে মহাবীর! এক্ষণে তুমি জয়দ্রথকে সংহার করাতে আমি তোমার যেরূপ প্রশংসা করিতেছি, দুরাত্মা কর্ণ অনুচরগণ-সমভিব্যাহারে তোমার শরনিকরে নিহত হইলে আমি পুনরায় তোমাকে এইরূপ প্রশংসা করিব।
তখন মহাবীর অর্জুন বাসুদেবের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে মাধব! আমি তোমার অনুকম্পাতেই অদ্য এই অমরগণেরও দুস্তর প্রতিজ্ঞা-সাগর হইতে উত্তীর্ণ হইয়াছি। হে মধুসূদন! তুমি যাহাদের নাথ, তাহাদের জয়লাভ হওয়া আশ্চর্য্য নহে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তোমার প্রসাদেই সমগ্র পৃথিবী অধিকার করিবেন। হে কৃষ্ণ! আমাদের সমস্ত কার্য্যের ভার তোমাতেই সমর্পিত আছে, সুতরাং এক্ষণে এই জয়লাভ তোমারই হইল। আমরা তোমার কিঙ্কর, আমাদিগকে উত্তেজিত করা তোমার কর্ত্তব্যই হইতেছে।
মহাবীর মধুসূদন অর্জুনকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া হাস্যমুখে তাঁহাকে সেই ভয়ঙ্কর সংগ্রামস্থল প্রদর্শনপূর্ব্বক মন্দভাবে অশ্ব সঞ্চালন করত কহিতে লাগিলেন, হে অর্জুন। ঐ দেখ, মহাবল পরাক্রান্ত পার্থিবগণ যুদ্ধে জয় ও বিপুল যশোলাভের অভিলাষে তোমার সহিত সংগ্রাম করিয়া তোমার শরনিকরে সমাহত ও সমরাঙ্গনে শয়ান রহিয়াছে। ঐ তাঁহা-দিগের শস্ত্র আভরণসকল ইতস্ততঃ বিকীর্ণ রহিয়াছে; রথসকল চূর্ণ, অশ্ব ও হস্তিগণ বিনষ্ট ও বৰ্ম্মসকল ছিন্ন ভিন্ন হইয়া গিয়াছে। ঐ সকল ভূপালের মধ্যে কাহারও প্রাণবিয়োেগ হইয়া গিয়াছে এবং কেহ কেহ এখনও জীবিত আছেন। হে অর্জুন। ঐ সমস্ত অবনীপালগণ গতজীবিত হইয়াও স্ব স্ব প্রভাপ্রভাবে সজীবের ন্যায় লক্ষিত হইতেছেন। ঐ দেখ উঁহাদের অসংখ্য বাহন, সুবর্ণপুঙ্খ শরনিকর ও অন্যান্য বিবিধ অস্ত্র-শস্ত্রদ্বারা রণস্থল সমাচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে এবং বৰ্ম্ম, মণিহার, কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক, উষ্ণীষ, মুকুট, মাল্যদাম, চূড়ামণি, কণ্ঠসূত্র, অঙ্গদ, নিষ্ক ও অন্যান্য নানাবিধ ভূষণদ্বারা রণভূমির অপূর্ব্ব শোভা হইয়াছে। রাশি রাশি অনুকর্ষ, তৃণীর, পতাকা, ধ্বজদণ্ড, অলঙ্কার, আসন, ঈষাদণ্ড, চক্র, বিচিত্র অক্ষ, যুগ, যোক্ত, শর, শরাসন, চিত্রকম্বল, পরিঘ, অঙ্কুশ, শক্তি, ভিন্দিপাল, শূল, পরশু, প্রাস, তোমর, কুন্ত, যষ্টি, শতঘ্নী, ভূশুণ্ডি, খড়া, মুষল, মুদার, গদা, কুণপ, সুবর্ণমণ্ডিত কষা, করিদিগের ঘণ্টা ও বিবিধ অলঙ্কার এবং মহামূল্য নানাবিধ বসন-ভূষণ, ইতস্ততঃ বিকীর্ণ থাকাতে রণস্থল শরৎকালীন গ্রহনক্ষত্রপরিপূর্ণ নভোমণ্ডলের ন্যায় শোভা পাইতেছে। অবনীপালগণ পৃথিবীলাভার্থ নিহত হইয়া, নিদ্রিত পুরুষেরা যেমন মনোরমা প্রিয়তমাকে আলিঙ্গন করিয়া থাকে, তদ্রূপ পৃথিবীকে আলিঙ্গন করিয়া শয়ান রহিয়াছেন; ঐ দেখ, যেমন পর্ব্বতসমুদায়ের গুহামুখ হইতে গৈরিক ধাতুধারা প্রবাহিত হয়, তদ্রূপ শরনিকরে সমাহত ক্ষিতিতলে বিলুণ্ঠমান, ঐরাবতসদৃশ মাতঙ্গগণের শস্ত্রক্ষত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে শোণিত বিনির্গত হইতেছে। সুবর্ণালঙ্কারে অলঙ্কৃত অশ্বগণ নিহত এবং রথী সারথিহীনগন্ধর্ব্ব নগরাকার বিমানসদৃশ রথসকল ধ্বজ, পতাকা, অক্ষ, চক্র, কূবর, যুগ ও ঈষাবিহীন হইয়া ভূতলে নিপতিত হইয়াছে। শরাসন ও চৰ্ম্মধারী সহস্র সহস্র পদাতিক ধূলিধূসরিতকেশ হইয়া রুধিরলিপ্তকলেবরে পৃথিবী আলিঙ্গন-পূর্ব্বক শয়ান রহিয়াছে। ঐ দেখ, তোমার শরজালে যোদ্ধাদিগের দেহ বিদীর্ণ হইয়া গিয়াছে। রণস্থল-নিপতিত কুঞ্জর, রথ ও অশ্বকুল সমাকুল, দুর্নিরীক্ষ্য সমরভূমিমধ্যে অনবরত রুধির, বসা ও মাংস নিপতিত হওয়াতে প্রভূত কৰ্দ্দম সমুৎপন্ন হইয়াছে। অসংখ্য নিশাচর, কুকুর, বৃক ও পিশাচ উহাতে নিরন্তর আমোদ প্রমোদ করিতেছে। হে ধনঞ্জয়। তুমি এই সংগ্রামস্থলে যেরূপ যশস্কর কার্য্যানুষ্ঠান করিয়াছ, ইহা কেবল তোমার ও দৈত্য দানব সংহারকারী সুররাজ ইন্দ্রেরই সাধ্যায়ও; ঐ দেখ, অসংখ্য চামর, ছত্র, ধ্বজ, অশ্ব, হস্তী, রথ, বিচিত্র কম্বল, বল্লা, কুথ' ও মহামূল্য বরূথসকল ইতস্ততঃ বিকীর্ণ থাকাতে রণস্থল বিচিত্র বস্ত্র-সমাচ্ছন্নের ন্যায় শোভা পাইতেছে। সহস্র সহস্র বীর সুসজ্জিত মাতঙ্গ হইতে নিপতিত হইয়া বজ্রভগ্ন পর্ব্বতশিখর হইতে নিপতিত সিংহের ন্যায় শোভা ধারণ করিয়াছে। ঐ দেখ, সাদিগণ অশ্বের সহিত ও পদাতিগণ কাৰ্ম্মকের সহিত নিপতিত হইয়া অনবরত রুধিরধারা ক্ষরণ করিতেছে। হে মহারাজ! এই-রূপে বাসুদেব হৃষ্ট অনুচরগণ-সমভিব্যাহারে অর্জুনকে সমর-স্থল প্রদর্শনপূর্ব্বক পাঞ্চজন্য শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহাত্মা হৃষীকেশ সাতিশয় আহ্লাদিতচিত্তে ধৰ্ম্মপুত্র রাজা যুধিষ্ঠিরের নিকট আগমনপূর্ব্বক তাঁহার পাদবন্দন করত কহিতে লাগিলেন, হে নরোত্তম! আজি আপনার পরম সৌভাগ্য। আজি ভাগ্যক্রমে আপনার শত্রু বিনষ্ট হইয়াছে, মহাবীর অর্জুনও প্রতিজ্ঞা হইতে উত্তীর্ণ হইয়াছেন। অরাতি-নিপাতন ধর্ম্মনন্দন কেশবের বাক্য শ্রবণে পরম আহ্লাদিত হইয়া স্বীয় রথ হইতে অবতরণপূর্ব্বক আনন্দাশ্রুপূর্ণ-লোচনে কৃষ্ণ ও অর্জুনকে আলিঙ্গন করিলেন। তৎপরে নেত্রজল অপনীত করিয়া বাসুদেব ও ধনঞ্জয়কে কহিতে লাগিলেন, হে বীরদ্বয়! আজি ভাগ্যক্রমে পাপাত্মা নরাধম সিন্ধুরাজ নিহত হইয়াছে; তোমরা প্রতিজ্ঞাভার হইতে উত্তীর্ণ হইয়াছে। আমি যাহার পর নাই প্রীতি লাভ করিয়াছি এবং অরাতিগণও শোক-সাগরে নিমগ্ন হইয়াছে। হে মধুসূদন। তুমি ত্রিলোকগুরু, তুমি সহায় থাকিলে ত্রিলোকমধ্যে কোন কার্য্যই দুষ্কর হয় না। হে গোবিন্দ! পূর্ব্বকালে পাকশাসন' যেরূপ তোমার প্রসাদে দানবগণকে পরাজিত করিয়াছেন, তদ্রূপ আমরাও তোমারই প্রসাদে অরাতিগণকে পরাজিত করিতেছি। হে বাঞ্চেয়! তুমি যাহাদের প্রতি পরিতুষ্ট থাক, তাহাদের পক্ষে পৃথিবী-পরাজয়ও অতি তুচ্ছ, ত্রিলোকবিজয়ও তাহাদিগের দুষ্কর হয় না। হে জনার্দ্দন। তুমি ত্রিদশেশ্বর, তুমি যাহাদের নাথ, তাহাদের পাপের লেশমাত্রও থাকে না এবং কদাচ সংগ্রামে পরাজয় হয় না। তোমার প্রসাদেই সুররাজ রণক্ষেত্রে দানবদল দলনপূর্ব্বক ত্রিলোকমধ্যে জয়লাভ করিয়া সুরগণের ঈশ্বর হইয়াছেন। তোমার অনুগ্রহেই দেবগণ অমরত্ব লাভ করিয়া অক্ষয় স্বর্গভোগ করিতেছেন। তোমার প্রসাদেই এই চরাচর পৃথিবীস্থ সমুদায় লোক স্ব স্ব ধৰ্ম্ম অবলম্বনপূর্ব্বক নিত্য জপহোমাদির অনুষ্ঠানে তৎপর রহিয়াছে। পূর্ব্বকালে সমস্ত জগৎ একার্ণবময় হইয়া গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল; কেবল তোমার কৃপাতেই পুনরায় ব্যক্ত হইয়াছিল। তুমি সর্ব্বলোকের অষ্টা, পরমাত্মা, অব্যয়, পুরাণপুরুষ, দেবদেব, সনাতন, পরাৎপর ও পরমপুরুষ; তোমার আদি নাই, নিধনও নাই। তুমি একবার যাহাদিগের নয়নে নিপতিত হও, তাহারা কখনই মুগ্ধ হয় না। তুমি ভক্তজনগণকে আপদ্ হইতে উদ্ধার করিয়া থাক; যে ব্যক্তি তোমার শরণাপন্ন হয়, সে পরমৈশ্বর্য্য লাভ করে। হে পরমাত্মন্! তুমি চারি বেদে গীত হইয়া থাক, আমি তোমাকে প্রাপ্ত হইয়া যারপরনাই ঐশ্বর্য্য ভোগ করিতেছি। হে নরেশ্বর! তুমি পরমেশ্বর, তির্য্যগণের ঈশ্বর এবং ঈশ্বরেরও ঈশ্বর; অতএব তোমাকে নমস্কার। হে মাধব। তুমি জয়লাভে পরিবর্দ্ধিত হও। হে সর্ব্বাত্মন্। হে পৃথুলোচন! তুমি সমস্ত লোকের আদি কারণ। যিনি ধনঞ্জয়ের সখা ও সর্ব্বদা উঁহার হিতসাধনে রত আছেন, তিনিও তোমাকে প্রাপ্ত হইয়া অপার সুখ লাভ করিয়া থাকেন।
হে মহারাজ! রাজা যুধিষ্ঠির এইরূপ কহিলে পর কৃষ্ণ ও অর্জুন উভয়ে পরম আহ্লাদিত হইয়া তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন। হে রাজন। আপনার ক্রোধাগ্নি-প্রভাবেই পাপাত্মা সিন্ধুরাজ ও বিপুল কৌরবসৈন্য দগ্ধ হইয়াছে। আপনার কোপেই কৌরবগণ নিহত হইয়াছে, হইতেছে ও হইবে। হে বীর। দুরাত্মা দুর্য্যোধন আপনাকে কোপান্বিত করিয়াই বন্ধু-বান্ধবগণ-সমভি-ব্যাহারে সমরাঙ্গনে প্রাণত্যাগ করিবে। পূর্ব্বে দেবতারাও যাহাকে পরাভব করিতে সমর্থ হয় নাই, আজি সেই কুরুপিতামহ ভীষ্ম আপনার কোপপ্রভাবেই শরশয্যায় শয়ন করিয়াছেন। আপনি যাহাদিগের দ্বেষ্টা তাহাদিগকে অবশ্যই মৃত্যুমুখে নিপতিত হইতে হয়, তাহারা কখনই সংগ্রামে জয়লাভ করিতে পারে না। আপনি যাহাদের উপর ক্রুদ্ধ হন, তাহাদিগের রাজ্য, প্রাণ, প্রিয়তর পুত্র ও বিবিধ সুখভোগ অচিরাৎ বিনষ্ট হইয়া যায়। হে রাজধর্মপরায়ণ ভূপাল। আপনি যখন ক্রুদ্ধ হইয়াছেন, তখন নিশ্চয়ই কৌরবগণ বন্ধু-বান্ধবগণের সহিত বিনষ্ট হইবে।
হে মহারাজ। মহাত্মা কৃষ্ণ ও অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে এইরূপ কহিতেছেন, এমন সময় অরাতিশরে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ মহাধনুর্দ্ধর মহাবীর ভীমসেন ও মহারথ সাত্যকি তথায় সমুপস্থিত হইয়া পরম গুরু যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদনপূর্ব্বক পাঞ্চালগণে পরিবেষ্টিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে ক্ষিতিতলে দণ্ডায়মান রহিলেন। মহাত্মা ধর্মরাজ, মহাবীর ভীমসেন ও সাত্যকিকে হৃষ্টচিত্তে কৃতাঞ্জলি-পুটে দণ্ডায়মান অবলোকন করিয়া তাঁহাদিগকে অভিনন্দনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, হে বীরদ্বয়! আজি তোমরা ভাগ্যক্রমে দ্রোণরূপ গ্রাহ ও হার্দিক্যরূপ মকরযুক্ত কৌরবসৈন্যরূপ মহাসাগর হইতে উত্তীর্ণ হইয়াছ। আজি ভাগ্যক্রমে পৃথিবীস্থ ভূপতিগণ এবং দ্রোণ ও কৃতবর্মা তোমাদের নিকট পরাজিত হইয়াছেন। ভাগ্যবলে তোমরা বিকীর্ণ অস্ত্রদ্বারা কর্ণকে পরাভূত ও শল্যকে পরাজুখ করিয়াছ। হে যুদ্ধবিশারদ মহারথদ্বয়! আজি ভাগ্যক্রমে তোমাদিগকে সমরাঙ্গন হইতে কুশলে প্রত্যাগত দেখিলাম। তোমরা আমার আজ্ঞা প্রতিপালন ও সম্মান করিয়া থাক এবং কদাচ সংগ্রামে পরাজুখ হও না; তোমরা আমার প্রাণতুল্য।
হে মহারাজ! রাজা যুধিষ্ঠির ভীমসেন ও সাত্যকিকে এইরূপ কহিয়া আনন্দাশ্রুপূর্ণ নেত্রে তাঁহাদিগকে আলিঙ্গন করিলেন। তখন পাণ্ডবপক্ষীয় সৈন্যগণ তাঁহাদিগকে হৃষ্ট দেখিয়া পরমাহ্লাদিতচিত্তে সংগ্রামে মনোনিবেশ করিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এদিকে আপনার আত্মজ দুর্য্যোধন সিন্ধুরাজের নিধনদর্শনে শত্রুজয়ে উৎসাহশূন্য ও নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া বাষ্পাকুললোচনে দীনবচনে ভগ্নদন্ত' ভুজঙ্গের ন্যায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তিনি মহাবীর অর্জুন, ভীম ও সাত্যকির শরনিকর প্রভাবে আপনার সৈন্যগণের সংহার নিরীক্ষণপূর্ব্বক বিবর্ণ, কৃশ ও একান্ত দীনভাবাপন্ন হইয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন, এই পৃথিবীতে অর্জুনের তুল্য যোদ্ধা আর নাই। সে ক্রোধাবিষ্ট হইলে কি দ্রোণ, কি কূপ, কি কর্ণ, কি অশ্বত্থামা কেহই তাহার সম্মুখে অবস্থান করিতে সমর্থ হয় না। মহাবীর পার্থ আমার পক্ষসমুদায় মহারথকে পরাজয় করিয়া সিন্ধুরাজ জয়দ্রথকে সংহার করিল, কিন্তু কেহই তাহাকে নিবারণ করিতে পারিলেন না। এক্ষণে পাণ্ডবগণ নিশ্চয়ই আমার বিপুল বল বিনষ্ট করিবে; সাক্ষাৎ সুররাজ ইন্দ্রও উহাদিগকে রক্ষা করিতে পারিবেন না। আমরা যাঁহাকে আশ্রয়পূর্ব্বক অস্ত্র সমুদ্যত করিয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছি, অর্জুন সেই মহারথ কর্ণকে সমরে পরাজিত করিয়া জয়দ্রথকে নিহত করিল। আমি যাঁহার বলবীর্য্য আশ্রয় করিয়া সন্ধিস্থাপন-লালস বাসুদেবকে তৃণজ্ঞান করিয়াছিলাম, সেই মহারথ কর্ণ আজি সমরে পরাজিত হইয়াছেন।
হে মহারাজ। রাজা দুর্য্যোধন এইরূপ কলুষিত চিত্ত হইয়া দ্রোণকে সন্দর্শন করিবার বাসনায় তৎসন্নিধানে গমনপূর্ব্বক কৌরবগণের নাশ ও বিজয়-বাসনা-পরবশ ধার্তরাষ্ট্রগণের বিনাশবৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্তন করত কহিলেন, হে আচার্য্য! অস্মৎপক্ষীয় মহীপালগণের বিনাশ অবলোকন করুন। তাঁহারা যে মহাবীর ভীষ্মকে সম্মুখবর্তী করিয়া সমরে প্রবৃত্ত হইয়া ছিলেন, শিখণ্ডী তাঁহাকে সংহার পূর্ব্বক পূর্ণ মনোরথ ও বিজয়ান্তরলাভে একান্ত লোলুপ হইয়া পাঞ্চালগণ-সমভিব্যাহারে সেনামুখে অবস্থান করিতেছে। ধনঞ্জয় আপনার শিষ্য, নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ, সাত অক্ষৌহিণী সেনার সংহর্তা মহাবীর জয়দ্রথকে নিহত করিয়াছে। হে আচার্য্য! এক্ষণে আমি কিরূপে আমাদিগের বিজয়াভিলাষী, উপকারনিরত যমসদনে প্রস্থিত সুহৃৎগণের ঋণ হইতে মুক্ত হইব? যে সকল ভূপালগণ আমাকে রাজ্য প্রদান করিতে অভিলাষ করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাঁহারাই সমস্ত ঐশ্বর্য্য পরিত্যাগপূর্ব্বক ধরাসনে শয়ান রহিয়াছেন। আমি অতি কাপুরুষ। আমি এইরূপে মিত্রগণকে মৃত্যুমুখে নিপাতিত করিয়াছি। এক্ষণে সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলেও আমার এই পাপ ধ্বংস হইবে না। আমি অতি লুব্ধস্বভাব ও পাপপরায়ণ। নৃপতিগণ আমারই নিমিত্ত যুদ্ধে জয়লাভার্থী হইয়া কালকবলে নিপতিত হইয়াছেন। এক্ষণে বসুন্ধরা কেন এই মিত্রদ্রোহী পাপাত্মাকে স্থানপ্রদানার্থ বিদীর্ণ হইতেছেন না! আরক্তলোচন নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ মহাবীর ভীষ্ম ভূপালগণমধ্যে আমাকে কি বলিবেন? হে মহারথ! সাত্যকি প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া আমার কার্য্যসাধনার্থ সমুদ্যত মহাবল পরাক্রান্ত জলসন্ধকে বিনাশ করিয়াছে। হায়। অদ্য কাম্বোজরাজ অলম্বুষ ও অন্যান্য সুহৃদ্গণকে নিহত নিরীক্ষণ করিতে হইল। আর আমার প্রাণধারণের আবশ্যক কি? যাহা হউক, এক্ষণে যে সমস্ত বীরেরা আমার বিজয়লাভার্থ সাধ্যানুসারে যত্নবান্ হইয়া সমরে কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন, আজি আমি স্বীয় বিক্রম প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহাদের নিকট ঋণশূন্য হইয়া যমুনায় গমন ও তাঁহাদের উদ্দেশে জলাঞ্জলি প্রদান করিয়া তাঁহাদিগের তৃপ্তিসাধন করিব। আমি ইষ্টাপূর্ত্ত, বলবীর্য্য ও পুত্রের শপথ করিতেছি যে, আমি হয় পাণ্ডবগণকে পাঞ্চালদিগের সহিত বিনাশ করিয়া শান্তিলাভ করিব, না হয় তাহাদের শরে নিহত হইয়া আমার কাৰ্য্যসাধনার্থ নিহত ভূপতিগণের সলোকতা প্রাপ্ত হইব। আমার সাহায্যদানে প্রবৃত্ত বীরপুরুষেরা যথোচিত রক্ষিত না হইয়া এক্ষণে আর আমাদের পক্ষ অবলম্বন করিতে অভিলাষ করেন না। তাঁহারা আমাদের অপেক্ষা পাণ্ডবগণের আশ্রয়গ্রহণ নিতান্ত শ্রেয়স্কর বলিয়া বিবেচনা করিতেছেন। হে আচার্য্য! আপনি সংগ্রামে আমাদিগের মৃত্যু বিধান করিয়া দিয়াছেন। দেখুন, আপনি অর্জুনকে শিষ্য বলিয়া উপেক্ষা প্রদর্শন করাতে আমাদিগের বিজয়াভিলাষী বীরগণ বিনষ্ট হইতেছে। এক্ষণে কেবল কর্ণকে আমাদিগের জয়ার্থী বলিয়া বোধ হইতেছে। হে ব্রহ্মন্! মন্দবুদ্ধি ব্যক্তি যেমন যথার্থ বন্ধু অবগত না হইয়া তাঁহার নিমিত্ত জয়াভিলাষ করত স্বয়ং অবসন্ন হয়, আমার সুহৃদ্গণ আমার নিমিত্ত তদ্রূপ হইতেছেন। আমি অতি মূঢ়, পাপাশয়, কুটিলহৃদয় ও ধনলোভী। আমার নিমিত্তই মহাবীর সিন্ধুরাজ, ভূরিশ্রবাঃ এবং অভীষাহ, শূরসেন, শিবি ও বশাতিগণ অর্জুনের সহিত সংগ্রাম করিয়া বিনষ্ট হইয়াছেন; অতএব আজি আমি সেই সকল মহাত্মাদিগের অনুগমন করিব। যখন তাঁহাদিগের মৃত্যু হইয়াছে, তখন আমার আর জীবন ধারণ করিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। হে পাণ্ডবগণের আচার্য্য! আমি উক্ত মহাবীরগণের অনুগমনে নিতান্ত উৎসুক হইয়াছি; আপনি আমাকে তদ্বিষয়ে অনুজ্ঞা প্রদান করুন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। মহাবীর অর্জুন সিন্ধুরাজ ও ভূরিশ্রবাকে বিনষ্ট করিলে তোমাদের মনঃ কি প্রকার হইল? দুর্য্যোধন কৌরবগণসমক্ষে দ্রোণাচার্য্যকে সেইরূপ কহিলে তিনি তাঁহাকে কি প্রত্যুত্তর প্রদান করিলেন, তৎসমুদায় কীর্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ। মহাবীর জয়দ্রথ ও ভূরিশ্রবাঃ নিহত হইলে আপনার সৈন্যমধ্যে মহান্ আর্তনাদ শব্দ সমুত্থিত হইল। আপনার পুত্রের মন্ত্রণাতে শত শত প্রধান পুরুষেরা নিহত হইলেন দেখিয়া সকলেই তাঁহার পরামর্শে অবজ্ঞা প্রদর্শন করিতে লাগিল। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য আপনার পুত্রের সেই বাক্য শ্রবণে নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া মুহূর্ত্তকাল চিন্তা করিয়া অতি দীনভাবে কহিলেন, দুর্য্যোধন! কেন বৃথা আমাকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করিতেছ? আমি ত তোমাকে সততই বলিয়া থাকি যে অর্জুন অজেয়; শিখণ্ডী অর্জুন-সংরক্ষিত হইয়া মহাবীর ভীষ্মকে নিপাতিত করাতেই ধনঞ্জয়ের অসাধারণ বলবীর্য্য অবগত হওয়া গিয়াছে। আমি দানবগণের অবধ্য মহাবীর ভীষ্মকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া কৌরবসৈন্যগণের সমূলে উন্মুলন স্থির করিয়াছি। আমরা ত্রিলোকমধ্যে যাহাকে সর্ব্বাপেক্ষা মহাবীর বলিয়া বোধ করিতাম, সেই ভীষ্মই সমরশায়ী হইয়াছেন; এক্ষণে আমার আর কি উপায় আছে? হে বৎস! শকুনি কৌরবসভায় যে অক্ষ নিক্ষেপ করিয়াছিল, উহা অক্ষ নহে, শত্রুবিনাশন সুতীক্ষ্ণ শর। ঐ সকল শর এক্ষণে অর্জুনকর্তৃক নিক্ষিপ্ত হইয়া আমা-দিগের যোদ্ধৃগণকে সংহার করিতেছে। হে দুর্য্যোধন। ধীরপ্রকৃতি মহাত্মা বিদুর তোমারই হিতসাধনার্থ তোমাকে বিবিধ উপদেশ প্রদান এবং তোমার সমক্ষে বারংবার বিলাপ ও পরিতাপ করিয়াছিলেন, কিন্তু তুমি অনাদর প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহার বাক্যে কর্ণপাতও কর নাই; তন্নিবন্ধনই এক্ষণে এই ঘোরতর হত্যাকাণ্ড সমুপস্থিত হইয়াছে। যে মূঢ় হিতকারী সুহৃদের বাক্যে অনাস্থা প্রদর্শনপূর্ব্বক আপনার মতানুসারে কার্য্যানুষ্ঠান করিয়া থাকে, সে অবিলম্বে শোচনীয় হয়। হে মহারাজ! তুমি যে সৎকুলসম্ভূতা, ধর্মপরায়ণা, অসৎকারের নিতান্ত অনুপযুক্তা দ্রৌপদীকে আমাদিগের সমক্ষে সভামণ্ডপে আনয়ন করাইয়াছিলে, এক্ষণে সেই অধর্ম্মের ফলভোগ করিতেছ এবং পরলোকে ইহা অপেক্ষাও অধিকতর ফলভোগ করিবে।
তুমি কপটতাচরণপূর্ব্বক যে পাণ্ডবগণকে দ্যূতক্রীড়ায় পরাজয় করত রৌরব চৰ্ম্ম পরিধান করাইয়া অরণ্যে প্রব্রাজিত করিয়াছিলে, এক্ষণে আমরা ভিন্ন অন্য কোন ব্রাহ্মণবাদী মনুষ্য সেই ধর্মপরায়ণ আত্মজতুল্য পাণ্ডবগণের অনিষ্টাচরণ করিবে? তুমি শকুনির সাহায্যে ও মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে পাণ্ডবগণের কোপসংগ্রহ করিয়াছ। দুঃশাসন ও কর্ণ ঐ ক্রোধা-নল সঙ্কুক্ষিত করিয়াছেন এবং তুমি বিদুরের বাক্যে অনাদর প্রদর্শনপূর্ব্বক বারংবার উহা উত্তেজিত করিয়াছ। দেখ, তোমরা সকলে পরাভূত হইয়াও জয়দ্রথের রক্ষার্থ যত্নসহকারে অর্জুনকে নিবারণ করিতে গিয়াছিলে, তবে সিন্ধুরাজ তোমাদিগের মধ্যে কেন বিনষ্ট হইলেন? মহাবীর কর্ণ, কৃপ, শল্য, অশ্বত্থামা ও তুমি সকলে জীবিত থাকিতে জয়দ্রথ কেন কালসদনে আতিথ্য গ্রহণ করিলেন? ভূপালগণ জয়দ্রথকে পরিত্রাণ করিবার নিমিত্ত প্রখর তেজঃ ধারণ করিয়াছিলেন, তবে তিনি কেন সংগ্রামে নিপতিত হইলেন? হে দুর্য্যোধন! সিন্ধুরাজ তোমার বিশেষতঃ আমার পরাক্রমপ্রভাবে ধনঞ্জয় হইতে আত্মরক্ষা করিবার বাসনা করিয়াছিলেন; কিন্তু তিনি তদ্বিষয়ে কৃতকার্য্য হন নাই। এক্ষণে আমি কোন্ স্থানে গমন করিলে জীবিত থাকিব, কিছুই বুঝিতে পারি না। আমি যে পর্যন্ত না ধনঞ্জয়কে পাঞ্চালগণের সহিত সংহার করিতেছি, তদবধি বোধ হইতেছে যেন, পাপাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্নের হস্তে আমার পরিত্রাণ নাই। হে রাজন! সিন্ধুরাজ-রক্ষায় অকৃতকার্য্য হইয়া আমাকে বিলাপ ও পরিতাপ করিতে দেখিয়াও কি নিমিত্ত বাক্যবাণে বিদ্ধ করিতেছ? আর সেই সত্যসন্ধ মহাবীর ভীষ্মের সুবর্ণময় ধ্বজদণ্ড নিরীক্ষণ না করিয়া কিরূপে তোমার মনে জয়লাভের প্রত্যাশা হইতেছে? যে যুদ্ধে সৈন্ধব ও ভূরিশ্রবাঃ মহারথগণের মধ্যবর্তী হইয়াও নিহত হইয়াছেন, তথায় তুমি আর কি বিবেচনা কর? কৃপাচার্য্য এখনও সিন্ধুরাজের পথে পদার্পণ করেন নাই, এই নিমিত্ত আমি তাঁহাকে যথোচিত সৎকার করি। হে দুর্য্যোধন! দেবগণ সমবেত দেবরাজও যাঁহাকে বিনাশ করিতে সমর্থ নহেন, সেই দুষ্করকর্মকারী মহাবীর ভীষ্মকে যখন তোমার ও দুঃশাসনের সমক্ষে নিপাতিত হইতে অবলোকন করিলাম, তখন স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, বসুন্ধরা তোমাকে পরিত্যাগ করিলেন। যাহা হউক, এক্ষণে পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়দিগের সৈন্যসমুদায় আমার সম্মুখে আগমন করিতেছে। আমি তোমার হিতানুষ্ঠানার্থ সমস্ত সৃঞ্জয়গণকে বিনাশ না করিয়া কখনই কবচ মোক্ষণ করিব না। হে রাজন। তুমি আমার পুত্র অশ্বত্থামার নিকট গমনপূর্ব্বক তাহাকে বলিবে যে, তুমি জীবনরক্ষার্থ সোমকদিগকে পরিত্যাগ করিও না। আর তোমার পিতা যে যে বিষয়ে আদেশ প্রদান করিয়াছেন, এক্ষণে তৎসমুদায় প্রতিপালনপূর্ব্বক অনৃশংস্য, দম, সত্য ও সরলতায় মনঃ সমাহিত কর। ধর্মার্থকামে নিরত থাকিয়া ধৰ্ম্ম ও অর্থের পীড়ন না করিয়া সতত ধৰ্ম্মপ্রধান কার্য্যের অনুষ্ঠানে তৎপর হও। মনঃ ও নেত্রদ্বারা ব্রাহ্মণগণকে সন্তুষ্ট ও সাধ্যানুসারে তাঁহাদের পূজা কর। তাঁহারা অগ্নিশিখাসদৃশ; অতএব কদাচ তাঁহাদিগের অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করা বিধেয় নহে। হে মহারাজ! তুমি অশ্বত্থামাকে আমার এই সকল উপদেশবাক্য কহিবে। এক্ষণে আমি তোমার বাক্যশল্যে পীড়িত হইয়া সৈন্যমধ্যে সংগ্রাম করিতে চলিলাম। যদি তুমি সমর্থ হও, তবে সৈন্যসমুদায়কে রক্ষা কর। পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণ অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়াছে, তাহারা রজনীযোগেও যুদ্ধে নিবৃত্ত হইবে না। হে মহারাজ! দ্রোণাচার্য্য দুর্য্যোধনকে এইরূপ কহিয়া পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়দিগের প্রতি ধাবমান হইয়া দিবাকর যেমন নক্ষত্রগণের তেজঃ নাশ করেন, তদ্রূপ ক্ষত্রিয়তেজঃ বিনাশ করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। দ্রোণাচার্য্য এইরূপ কহিলে আপনার পুত্র দুর্য্যোধন রোষাবিষ্টচিত্তে যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইয়া কর্ণকে কহিতে লাগিলেন, হে রাধেয়! দেখ, একাকী অর্জুন একমাত্র কৃষ্ণকে সহায় করিয়া তোমার, দ্রোণাচার্য্যের এবং অন্যান্য প্রধানতম যোদ্ধৃগণের সমক্ষেই দেবগণেরও দুর্ভেদ্য সেই আচার্য্যবিরচিত ব্যূহ ভেদ করিয়া সিন্ধুরাজকে নিহত করিল। সিংহ যেমন অন্যান্য মৃগসমুদায় বিনষ্ট করে, তদ্রূপ অর্জুন আমার ও দ্রোণাচার্য্যের সমক্ষেই প্রধান প্রধান নরপতিগণকে সংগ্রামে বিনাশ করিয়া আমার সৈন্য নিঃশেষিতপ্রায় করিয়াছে। মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য যদি যত্নপূর্ব্বক অর্জুনকে নিগ্রহ করিতেন, তাহা হইলে সে কখনই দুর্ভেদ্য ব্যূহ ভেদপূর্ব্বক সিন্ধুরাজকে বিনাশ করিয়া প্রতিজ্ঞাভার হইতে উত্তীর্ণ হইতে সমর্থ হইত না। অর্জুন মহাত্মা দ্রোণাচার্য্যের অতিশয় প্রিয়; সেই জন্যই আচার্য্য যুদ্ধ না করিয়া তাহাকে পথ প্রদর্শন করিয়াছেন! আমার কি দুর্ভাগ্য। শত্রুতাপন আচার্য্য পূর্ব্বে সিন্ধুরাজকে অভয় প্রদান করিয়া এক্ষণে অর্জুনকে সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে পথ প্রদান করিলেন। যদি তিনি পূর্ব্বেই সিন্ধুরাজকে গৃহে গমনে অনুমতি করিতেন, তাহা হইলে কখনই এরূপ জনক্ষয় উপস্থিত হইত না। আমিও নিতান্ত অনার্য্য, সিন্ধুরাজ যখন জীবনরক্ষার্থ গৃহে গমন করিতে প্রার্থনা করিয়াছিলেন, তখন আমি অভয় প্রদানে আশ্বস্ত হইয়া তাঁহাকে নিবারণ করিলাম! হায়! আজি আমাদের সমক্ষেই আমার চিত্রসেন প্রভৃতি সহোদরেরা ভীমহস্তে কলেবর পরিত্যাগ করিল!
কর্ণ কহিলেন, হে মহারাজ! দ্রোণাচার্য্য জীবিতনিরপেক্ষ হইয়া বল, বীর্য্য ও উৎসাহ অনুসারে যুদ্ধ করিতেছেন; তুমি তাঁহার নিন্দা করিও না। শ্বেতবাহন অর্জুন আচার্য্যকে অতিক্রম করিয়া যে সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে, তদ্বিষয়ে তাঁহার অণুমাত্রও অপরাধ লক্ষিত হইতেছে না। দ্রোণাচার্য্য স্থবির, শীঘ্র-গমনে নিতান্ত অক্ষম ও বাহুব্যায়ামে' একান্ত অশক্ত; কিন্তু কৃষ্ণসারথি মহাবীর অর্জুন কৃতকার্য্য যুবা, শিক্ষিতাস্ত্র, লঘুবিক্রম; লে দুর্ভেদ্য-বৰ্ম্ম-সংবৃতকলেবর ও ভুজবলদর্পিত হইয়া দিব্যাস্ত্রযুক্ত বানরলাঞ্ছিত রথে আরোহণ, অজয় গাণ্ডীব শরাসন ধারণ ও সুতীক্ষ্ণ শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক যে দ্রোণাচার্য্যকে অতিক্রম করিয়াছে, উহা আশ্চর্য্যের বিষয় নহে; সুতরাং আমি তদ্বিষয়ে দ্রোণের কিছুমাত্র দোষ দর্শন করি না। যাহা হউক, যখন ধনঞ্জয় দ্রোণকে অতিক্রম করিয়া সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে, তখন পাণ্ডবগণকে পরাজয় করা তাঁহার সাধ্যায়ত্ত নহে। হে মহারাজ। দৈবনিদ্দিষ্ট বিষয় কদাচ অন্যথা হয় না। দেখ, আমরা সকলেই শক্ত্যনুসারে সংগ্রাম করিতেছিলাম, কিন্তু আমাদের মধ্যে সিন্ধুরাজ নিহত হইলেন! অতএব এই বিষয়ে দৈবই বলবান, তাহার আর কোন সন্দেহই নাই। আমরা তোমার সহিত মিলিত হইয়া শঠতা ও বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক পরম যত্নসহকারে জয়লাভের চেষ্টা করিতেছিলাম; কিন্তু দৈবই আমাদিগের পুরুষকার নষ্ট করিলেন! দুৰ্দ্দৈবগ্রস্ত মনুষ্য যে কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, দৈবই তাহার সেই বিষয়ে বারংবার বিঘ্নসম্পাদন করিয়া থাকেন। মনুষ্য সতত অধ্যবসায়সম্পন্ন হইয়া যে কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়, নিঃশঙ্কচিত্তে তাহার অনুষ্ঠান করা কর্তব্য; কিন্তু সিদ্ধিলাভ দৈবায়ত্ত। আমরা শঠতা প্রকাশ ও বিষ প্রয়োগপূর্ব্বক পাণ্ডবগণকে বঞ্চনা এবং জতুগৃহে দগ্ধ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলাম; তাহারা দ্যুতে পরাজিত ও রাজনীতির অনুসারে অরণ্যে প্রব্রাজিত হইয়াছিল, কিন্তু দৈব আমাদিগের যত্নসম্পাদিত সেই সমস্ত বিষয়ে বিঘ্নানুষ্ঠান করিয়াছেন। অতএব হে মহারাজ! তুমি জীবিতনিরপেক্ষ হইয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। তোমাদের উভয় পক্ষের মধ্যে যাহারা সুদৃঢ় যত্নশালী হইবে, দৈব তাঁহাদেরই অনুকূল হইবেন। পাণ্ডবগণের বুদ্ধিপূর্ব্বক অনুষ্ঠিত অসৎকার্য্য বা তোমার দুর্বুদ্ধিকৃত অসৎ-কার্য্য কদাচ লক্ষিত হয় না; তবে যে তাহাদের জয় ও তোমার পরাজয় হইতেছে, এই বিষয়ে দৈবই প্রমাণ'। মনুষ্যগণ যখন নিদ্রায় অভিভূত হয়, অনন্তকৰ্ম্মা দৈব তখনও জাগরিত থাকে। হে মহারাজ! প্রথম যুদ্ধ আরম্ভের সময় তোমার পক্ষে বহুসংখ্যক সৈন্য ও যোদ্ধা ছিল, কিন্তু পাণ্ডবগণের তাদৃশ ছিল না; তথাচ তাহারা তোমার পক্ষীয় বহুবীরকে সংহার করিল। অতএব স্পষ্টই বোধ হইতেছে, দৈবই আমাদিগের পুরুষকার বিনষ্ট করিতেছেন।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! তাঁহারা উভয়ে এইরূপ বিবিধ - কথা কহিতেছেন, ইত্যবসরে সংগ্রামস্থলে পাণ্ডবগণের সৈন্য - সমুদায় নিরীক্ষিত হইল। তখন উভয় পক্ষে ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। হে রাজন্! কেবল আপনার দুৰ্ম্মন্ত্রণাপ্রভাবেই এই মহান্ জনসংক্ষয় সমুপস্থিত হইয়াছে।
