দ্রোণপর্ব্ব
পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ
| ঘটোৎকচবধ পর্ব্বাধ্যায় |
ঘটোৎকচবধ পর্ব্বাধ্যায়।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আপনার সেই প্রভৃত গজসমাকীর্ণ মহাসৈন্য পাণ্ডবসেনাদিগকে অতিক্রম করিয়া চারিদিকে যুদ্ধ করিতে লাগিল। পাঞ্চাল ও কৌরবগণ যমরাজ্য-গমনে' কৃতসঙ্কল্প হইয়া পরস্পর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল। বীরগণ বীরগণের সহিত সমাগত হইয়া শর, শক্তি ও তোমর দ্বারা পরস্পরকে বিদ্ধ করত যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিতে লাগিলেন। রথিগণ রথিগণের সহিত মিলিত হইয়া শরনিকর-দ্বারা পরস্পরের গাত্র হইতে রুধিরধারা স্রাবিত করিতে আরম্ভকরিলেন। মদমত্ত মাতঙ্গগণ কোপাবিষ্ট হইয়া বিষাণদ্বারা পরস্পরকে বিদারিত করিতে লাগিল। অশ্বারোহীরা অশ্বারোহি-গণের সহিত সমাগত হইয়া যশোলাভাভিলাষে শর, শক্তি ও পরশুদ্বারা পরস্পরের দেহ ভেদ করিতে আরম্ভ করিল এবং পদাতিগণ শস্ত্রপাণি হইয়া পরম যত্নসহকারে পরস্পরের প্রতি ধাবমান হইল। তখন কেবল নাম, গোত্র ও কুল শ্রবণেই কৌরবগণের সহিত পাঞ্চালদিগের বৈলক্ষণ্য বোধ হইতে লাগিল। হে মহারাজ! এইরূপে যোদ্ধৃগণ পরস্পর পরস্পরকে শর, শক্তি ও পরশু দ্বারা শমনসদনে প্রেরণ করত নির্ভীকচিত্তে রণস্থলে ভ্রমণ করিতে লাগিল। দিবাকরের অস্তগমন-নিবন্ধন সৈন্যগণকর্তৃক দশদিকে পরিত্যক্ত, শরনিকর পূর্ব্বের ন্যায় উদ্ভাসিত হইল না।
পাণ্ডবেরা এইরূপে কৌরবগণের সহিত যুদ্ধ করিতেছেন, এমন সময়ে মহাবীর দুর্য্যোধন সিন্ধুরাজবধজনিত দুঃখে অতিমাত্র কাতর হইয়া রথনির্ঘোষে বসুন্ধরা প্রতিধ্বনিত ও কম্পিত করত জীবিতাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক অরিবাহিনীমধ্যে প্রবেশ করিলেন। তথায় পাণ্ডবদিগের সহিত তাঁহার তুমুল সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। ঐ যুদ্ধে অসংখ্য সেনা বিনষ্ট হইয়া গেল। দিবাকর যেমন মধ্যাহ্নকালে করজালদ্বারা সমুদায় জগৎ তাপিত করেন, তদ্রূপ আপনার পুত্র শরনিকরদ্বারা পাণ্ডবসৈন্য-গণকে সন্তাপিত করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবগণ তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে অসমর্থ ও বিজয়লাভে ভগ্নোৎসাহ হইয়া পলায়নোন্মুখ হইলেন। পাঞ্চালগণ মহাধনুর্দ্ধর দুর্য্যোধনের সুবর্ণপুঙ্খ শাণিত শরনিকরে বিদ্ধ হইয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইতে লাগিলেন এবং পাণ্ডবগণের সৈনিক পুরুষেরা সুতীক্ষ্ণ শরে নিপীড়িত হইয়া রণশয্যায় শয়ন করিতে আরম্ভ করিল। হে মহারাজ! আপনার পুত্র তৎকালে সমরাঙ্গনে যেরূপ কার্য্য করিয়াছিলেন, পাণ্ডবেরা কখনই তদ্রূপ কার্য্য করিতে সমর্থ হন নাই। দ্বিরদ যেরূপ নলিনীবন আলোড়িত করে, তদ্রূপ তিনি পাণ্ডবসৈন্যগণকে প্রমথিত করিয়া ফেলিলেন। পদ্মবন যেমন সূর্য্য ও অনিলপ্রভাবে সলিলবিহীন হইয়া শোভাশূন্য হয়, তদ্রূপ দুর্য্যোধন প্রভাবে পাণ্ডবসৈন্যসমুদায় শোভাহীন হইল।
ঐ সময় পাঞ্চালগণ পাণ্ডবসেনাগণকে নিহত নিরীক্ষণ-পূর্ব্বক ভীমসেনকে অগ্রবর্তী করিয়া আপনার পুত্র দুর্য্যোধনের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর দুর্য্যোধন ভীমসেনকে দশ, নকুলকে তিন, সহদেবকে তিন, বিরাট ও দ্রুপদকে ছয়, শিখণ্ডীকে শত, ধৃষ্টদ্যুম্নকে সপ্ততি, যুধিষ্ঠিরকে সাত, সাত্যকিকে পাঁচ, দ্রৌপদীতনয়গণকে তিন তিন এবং কৈকেয় ও চেদিগণকে অসংখ্য নিশিতশরে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে ঘটোৎকচ ও অন্যান্য অসংখ্য যোধগণকে বিদ্ধ করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন এবং ক্রোধাবিষ্ট অন্তকের ন্যায় সুতীক্ষ্ণ শরনিপাতে হস্তী ও অশ্বগণের দেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন।
তখন পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির দুর্য্যোধনকে এইরূপে অরাতি-সংহারে প্রবৃত্ত দেখিয়া সুতীক্ষ্ণ ভল্লদ্বারা তাঁহার সুবর্ণপৃষ্ঠ কাৰ্ম্মক ত্রিধা ছেদন করিয়া তাঁহাকে শাণিত দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন। সেই যুধিষ্ঠির-নিক্ষিপ্ত তীক্ষ্ণ শরনিকর দুর্য্যোধনের দেহ ভেদ করিয়া ধরাতলে প্রবিষ্ট হইল। তখন পাণ্ডবপক্ষীয় যোদ্ধারা বৃত্রাসুর-বিনাশ-সময়ে দেবতারা যেরূপ পুরন্দরকে পরিবেষ্টন করিয়াছিলেন, তদ্রূপ যুধিষ্ঠিরকে বেষ্টন করিলেন। তৎপরে ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির পুনরায় শর নিক্ষেপ করিলে মহারাজ দুর্য্যোধন অতিমাত্র বিদ্ধ ও অবসন্ন হইয়া রথোপরি অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন পাঞ্চালসৈন্যগণ রাজা দুর্য্যোধন বিনষ্ট হইয়াছে, বলিয়া ঘোরতর চীৎকার করিতে লাগিলেন। ঐ সময় অতি ভীষণ শর-শব্দও শ্রুতিগোচর হইল। দ্রোণাচার্য্য সেই শব্দ শ্রবণে সত্বর তথায় গমনপূর্ব্বক অবলোকন করিলেন যে, মহারাজ দুর্য্যোধন পুনরায় হৃষ্টচিত্তে কার্ম্মুক গ্রহণপূর্ব্বক রাজা যুধিষ্ঠিরকে তিষ্ঠ তিষ্ঠ বলিয়া তাঁহার প্রতি ধাবমান হইতেছেন। হে মহারাজ! ঐ সময় পাঞ্চালগণ জয়লাভার্থ দ্রোণের অভিমুখীন হইলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্যও কুরুপ্রবীর দুর্য্যোধনের রক্ষণেচ্ছায় তাঁহাদিগকে প্রতিগ্রহ করিলেন। হে মহারাজ! তৎপরে যুদ্ধার্থ সমবেত কৌরব ও পাণ্ডবপক্ষীয় যোধগণের নাশজনক ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণ মূঢ় দুর্য্যোধনকে সেই কথা বলিয়া রোষভরে পাণ্ডবমধ্যে প্রবেশ করিলে পাণ্ডবগণ তাঁহাকে ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতে নিরীক্ষণ করিয়া কিরূপে নিবারণে প্রবৃত্ত হইল? যখন দ্রোণ শত্রুসংহারে প্রবৃত্ত হইলেন, তৎকালে অস্মৎপক্ষীয় কোন্ কোন্ বীর তাঁহার দক্ষিণ চক্র ও কোন্ কোন্ বীরই বা তাঁহার বাম চক্র রক্ষা করিল? কোন্ কোন্ রথী তাঁহার পৃষ্ঠবর্তী ও কাহারাই বা তাঁহার সম্মুখবর্তী হইলেন? এক্ষণে স্পষ্টই বোধ হইতেছে যে, সর্ব্বাস্ত্রবিশারদ মহাবীর দ্রোণ রথমার্গে নৃত্য করত পাঞ্চালগণ-মধ্যে প্রবেশ করিলে তাহারা শিশিরসময়ে গোসমুদায় যেমন কম্পিত হয়, তদ্রূপ মহাভয়ে কম্পিত হইয়াছিল। যাহা হউক, সেই সর্ব্বশস্ত্রবেত্তা মহাবীর দ্রোণ হুতাশনসদৃশ স্বীয় প্রভাবে পাঞ্চালসৈন্যগণকে দগ্ধ করত কিরূপে কালগ্রাসে নিপতিত হইলেন?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর অর্জুন সায়াহ্নে জয়দ্রথ বিনাশানন্তর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সহিত সাক্ষাৎকার করিয়া সাত্যকি-সমভিব্যাহারে দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন অসংখ্য সৈন্যপরিবৃত ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ও ভীমসেন, মহাবীর নকুল, ধীমান্ সহদেব, সসৈন্য ধৃষ্টদ্যুম্ন, কৈকেয়গণ সমবেত বিরাট, অসংখ্য সেনাপরিবৃত মৎস্য ও শাল্যগণ, পাঞ্চালগণপরিরক্ষিত মহারাজ দ্রুপদ দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র ও সসৈন্য রাক্ষস ঘটোৎকচ, শিখণ্ডী-পুরঃসর ষসহস্র পাঞ্চাল ও প্রভদ্রকগণ এবং একত্র সমবেত অন্যান্য অসংখ্য মহারথ আচার্য্যাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। ঐ সমস্ত মহাবীরেরা যুদ্ধার্থ গমন করিলে ভীরুজন-ভয়বর্দ্ধিনী ঘোরা রজনী সমুপস্থিত হইল। ঐ রজনীতে বহুতর কুঞ্জর ও যোদ্ধাদিগের প্রাণনাশ হইয়াছিল।
হে মহারাজ! ঐ ভীষণ বিভাবরীতে শিবাগণ গ্রাসসম্পন্ন জ্বালাকরাল মুখ ব্যাদানপূর্ব্বক লোকের অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার করত ঘোরতর চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। ভয়ঙ্কর উলূক-সকল কৌরবসৈন্যগণকে শঙ্কিত করিয়া ভৈরব রব পরিত্যাগ করিতে লাগিল। তখন সৈন্যমধ্যে তুমুল কোলাহল উপস্থিত হইল। ভেরী ও মৃদঙ্গের বিপুল শব্দ, করিনিকরের বৃংহিতধ্বনি, অশ্বগণের হ্রেষারব ও খুরশব্দে রণস্থল তুমুল হইয়া উঠিল। ঐ সময় মহাবীর দ্রোণের সহিত সৃঞ্জয়গণের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভহইল। দিস্খণ্ডল গাঢ়তর তিমিরে সমাচ্ছন্ন ও সৈন্যগণের চরণ-সমুত্থিত ধূলিজাল নভোমণ্ডলে উড্ডীন হইলে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না। কিয়ৎক্ষণ পরে মনুষ্য, অশ্ব ও মাতঙ্গগণের রুধির প্রবাহে ধূলিপটল তিরোহিত হইয়া গেল। নিশাকালে পর্ব্বতোপরি দহ্যমান বংশবনের ন্যায় প্রক্ষিপ্ত শস্ত্রসমুদায়ের ঘোরতর চট্টটা শব্দ হইতে লাগিল। মৃদঙ্গ, আণক, বল্লরী ও পটহশব্দ এবং অশ্বসকলের চীৎকারে সমুদায় রণস্থল একান্ত আকুল হইয়া উঠিল। তখন আমরা মোহে অভিভূত হইলাম। কাহারও আত্ম পর বিবেচনা রহিল না। সকলেই উন্মত্তের ন্যায় হইল। অনন্তর ধূলিপটল শোণিতপ্রবাহে উচ্ছিন্ন হইলে সুবর্ণময় বৰ্ম্ম ও ভূষণপ্রভায় অন্ধকার নিরাকৃত হইল। তখন সেই শক্তি ধ্বজ সমাকুল মণি ও সুবর্ণময় অলঙ্কারে অলঙ্কৃত, ভারতী-সেনাসকল নিশাকালে নক্ষত্রসার্থসঙ্কুল নভোমণ্ডলের ন্যায় অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিল। ঐ সৈন্যমধ্যে গোেমায়ু ও কাকগণ অনবরত কোলাহল, করিসমুদায় বৃংহিতধ্বনি এবং সৈন্যগণ সিংহনাদ ও উৎক্রোশ ধ্বনি করিতে লাগিল।
অনন্তর সমরাঙ্গনে মহেন্দ্রের বজ্রনির্ঘোষসদৃশ লোম-হর্ষণ তুমুল শব্দ সমুত্থিত হইয়া এককালে দিস্খণ্ডল পরিপূর্ণ করিল। মহারাজ। সেই অন্ধকার কালে অঙ্গদ, কুণ্ডল ও নিষ্ক প্রভৃতি বিবিধ স্বর্ণালঙ্কারে বিভূষিত অসংখ্য রথ ও হস্তিসম্পন্ন সেই কৌরবসৈন্য বিদ্যুদ্দামিমণ্ডিত জলদপটলের ন্যায় লক্ষিত হইল। চতুর্দিকে অসি, শক্তি, গদা, খড়া, মুষল, প্রাস ও পট্টিশ প্রভৃতি অস্ত্রসকল বিক্ষিপ্ত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল, যেন অগ্নিবৃষ্টি হইতেছে। হে মহারাজ। দুর্য্যোধন আপনার সেই সৈন্যমেঘের পুরোবর্তী বায়ু; রথ ও নাগ উহার বঙক্তি; বাদিত্রধ্বনি নির্ঘোষ, দ্রোণাচার্য্য ও পাণ্ডব পর্জন্য; খড়া, শক্তি ও গদা অশনি; শরবৃষ্টি বারিধারা এবং অস্ত্র উহার পবনস্বরূপ শোভা পাইতে লাগিল।
যুদ্ধার্থী বীরগণ সেই বিস্ময়কর অতি ভয়াবহ ভারতী-সেনামধ্যে প্রবেশ করিল। এইরূপে সেই প্রদোষসময়ে মহাশব্দ-সঙ্কুল ভীরুগণের ভয়বর্দ্ধন শূরগণের হর্ষজনন ঘোরতর যুদ্ধ উপস্থিত হইলে পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণ সমবেত হইয়া ক্রোধভরে দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। হে মহারাজ। ঐ সময় যে যে বীর আচার্য্যের সমক্ষে সমুপস্থিত হইয়াছিলেন, মহাবীর দ্রোণ তাঁহাদের মধ্যে অনেককে বিমুখ ও অনেককে নিহত করিলেন। সেই সময়ে তিনি একাকীই সহস্র হস্তী, অযুত রথ, প্রযুত পদাতি এবং অর্বুদ অশ্বকে নারাচাস্ত্রে বিদীর্ণ করিয়া ফেলিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ ও ভূরিশ্রবাঃ নিহত হইলে নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ মহাবীর দ্রোণ আমার আত্মজ দুর্য্যোধনকে সেই কথা কহিয়া ক্রোধাবিষ্টচিত্তে পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ মধ্যে প্রবিষ্ট হইলে তোমরা কি মনে করিলে? ধনঞ্জয় অপরাজিত মহাবীর আচার্য্যকে সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিতে দেখিয়া কি বিবেচনা করিতে লাগিল এবং মূঢ় দুর্য্যোধনই বা কোন্ কার্য্য তৎকালোচিত বলিয়া অবধারণ করিলে তৎকালে কোন্ কোন্ বীর দ্রোণের অনুগমনে প্রবৃত্ত হইল? আর কোন্ কোন্ বীরই বা তাঁহাকে শত্রুসংহারে সমুদ্যত দেখিয়া তাঁহার পশ্চাৎ ও সম্মুখে যুদ্ধ করিতে লাগিল? স্পষ্টই বোধ হইতেছে, পাণ্ডবগণ দ্রোণের শরনিকরে নিপীড়িত হইয়া শীতার্ত্ত কৃশ গোসমূহের ন্যায় কম্পিত হইয়াছিল। যাহা হউক, সেই অরাতিনিপাতন মহাবীর পাঞ্চাল গণমধ্যে প্রবেশ করিয়া কিরূপে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন? হে সঞ্জয়! সেই রাত্রিকালে সমস্ত মহারথ ও সৈন্যগণ সমবেত হইয়া বিমর্দিত হইতে লাগিলে তোমাদের মধ্যে কোন্ কোন্ বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি তথায় অবস্থান করিলেন? তুমি কহিতেছ, আমার পক্ষীয় বীরগণ ও মহারথগণ নিহত, পরাভূত ও রথশূন্য হইয়াছেন। এক্ষণে তাঁহারা গাঢ়ান্ধকার-নিমগ্ন পাণ্ডবগণের শরে নিপীড়িত ও মোহাবিষ্ট হইয়া কিরূপ কর্তব্য অবধারণ করিলেন? তুমি কহিতেছ, পাণ্ডবগণ জয়লাভে একান্ত হৃষ্ট ও নিতান্ত সন্তুষ্ট এবং অস্মৎপক্ষীয় বীরগণ অপ্রহৃষ্ট, ভীত ও বিমনস্ক হইতেছে; কিন্তু সেই ঘোর নিশাকালে পাণ্ডব ও কৌরবগণের বিভিন্নতা কিরূপে তোমার অনুমান হইল?
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! সেই রাত্রিকালে ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইলে পাণ্ডবগণ সোমকদিগের সহিত দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন আচার্য্য দ্রুতগামী শরনিকরে কেকয়গণ ও ধৃষ্টদ্যুম্নের আত্মজগণকে যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিলেন। ঐ সময়ে যে যে মহারথ তাঁহার সম্মুখীন হইয়াছিলেন, সকলেই শমনসদনে আতিথ্যগ্রহণ করিলেন। তখন প্রবল প্রতাপশালী মহারাজ শিবি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বলপ্রমার্থী মহারথ দ্রোণাচার্য্যের প্রতি ধাবমান হইলেন। মহাবীর আচার্য্য তাঁহাকে সমাগত সন্দর্শন করিয়া লৌহময় দশ শরে বিদ্ধ করিলে তিনি কঙ্কপত্রভূষিত ত্রিংশৎ বাণে আচার্য্যকে প্রতিবিদ্ধ করিয়া ভল্লাস্ত্রে তাঁহার সারথিকে নিপাতিত করিলেন। মহাবীর দ্রোণাচার্য্য তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া মহাত্মা শিবির অশ্ব ও সারথিকে সংহারপূর্ব্বক তাঁহার উষ্ণীষযুক্ত মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহারাজ দুর্য্যোধন সত্বর দ্রোণের নিকট অন্য এক সারথি প্রেরণ করিলেন। সারথি দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে দ্রোণের অশ্বসঞ্চালন করিতে আরম্ভ করিলে মহাত্মা আচার্য্য অরাতিগণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন।
এদিকে কলিঙ্গরাজের পুত্র পিতৃবধজনিত দুঃখে অতিমাত্র ক্রুদ্ধ হইয়া কলিঙ্গদেশোদ্ভব সৈন্যগণ-সমভিব্যাহারে ভীমের অভিমুখে গমনপূর্ব্বক প্রথমতঃ পাঁচ ও তৎপরে সাত শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। তদনন্তর তাঁহার সারথি বিশোককে তিন বাণে নিপীড়িত করিয়া একবাণে তাঁহার রথধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবল ভীমসেন তদ্দর্শনে ক্রোধভরে স্বীয় রথ হইতে তাঁহার রথে গমনপূর্ব্বক মুষ্টিপ্রহারে তাঁহাকে নিহত করিলেন। ভীমের ভীষণ মুষ্টিপ্রহারে কলিঙ্গরাজতনয়ের অস্থি-সকল চূর্ণ হইয়া পৃথক্ পৃথক্ নিপতিত হইল। মহাবীর কর্ণ এবং কলিঙ্গরাজতনয়ের ভ্রাতা ধ্রুব ও জয়রাত প্রভৃতি বীরগণ কলিঙ্গরাজপুত্রের বিনাশ সহ্য করিতে না পারিয়া আশীবিষসদৃশ নারাচদ্বারা ভীমকে প্রহার করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীম অবিলম্বে ধ্রুবের রথে গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে নিরন্তর শরনিকর বর্ষণ করিতে দেখিয়া মুষ্টিপ্রহার করিলেন। ধ্রুব সেই মহাবল পরাক্রান্ত পাণ্ডুনন্দনের মুষ্ট্যাঘাতে তৎক্ষণাৎ ভূতলে নিপতিত হইলেন। মহাবীর ভীম এইরূপে ধ্রুবকে সংহার করত জয়রাতের রথে সমুপস্থিত হইয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন এবং কর্ণসমক্ষে তাঁহাকে বাম-হস্তে আকর্ষণপূর্ব্বক তলপ্রহারে বিনষ্ট করিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ ভীমের প্রতি কাঞ্চনময় শক্তি প্রয়োগ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ভীম হাস্যমুখে তৎক্ষণাৎ সেই শক্তি গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহারই প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। সুবলনন্দন শকুনি সেই শক্তি কর্ণের প্রতি আগমন করিতে দেখিয়া সত্বর সুতীক্ষ্ণ শরে ছেদন করিয়া ফেলিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে ভীমপরাক্রম ভীমসেন এই সমুদায় মহৎ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া স্বরথে আরোহণপূর্ব্বক পুনরায় আপনার সৈন্যগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন আপনার মহারথ পুত্রগণ ভীমকে ক্রুদ্ধ অন্তকের ন্যায় জিঘাংসা-পরবশ হইয়া আগমন করিতে দেখিয়া শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীম তদ্দর্শনে হাস্যমুখে শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক দুৰ্ম্মদের সারথি ও অশ্বগণকে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। দুৰ্ম্মদ সত্বর দুষ্কর্ণের রথে সমারূঢ় হইলেন। তখন সেই ভ্রাতৃদ্বয় বরুণ ও সূর্য্য যেমন তারকাসুরের অভিমুখীন হইয়াছিলেন, তদ্রূপ ভীমের অভিমুখীন হইয়া শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক তাঁহাকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীম তদ্দর্শনে ক্রোধভরে কর্ণ, দ্রোণ, দুর্য্যোধন, কূপ, সোমদত্ত ও বাহীকের সমক্ষে পাদপ্রহারে ঐ বীরদ্বয়ের রথ ধরাতলে প্রোথিত করিলেন এবং ক্রোধভরে তাঁহাদিগকে মুষ্টিপ্রহারে বিনষ্ট করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। তখন সৈন্যগণমধ্যে হাহাকার শব্দ সমুত্থিত হইল। মহীপালগণ ভীমকে নিরীক্ষণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, এই ভীমসেন সাক্ষাৎ রুদ্রদেব; ইনি ভীমরূপে এক্ষণে ধৃতরাষ্ট্রতনয়গণকে বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। হে মহারাজ! ভূপতিগণ এই বলিয়া মোহাবিষ্টচিত্তে অশ্ব সঞ্চালনপূর্ব্বক প্রত্যেকে পৃথক্ পৃথক্ দিকে পলায়ন করিতে লাগিলেন।
এইরূপে কমললোচন ভীমপরাক্রম ভীম সেই নিশাকালে ধার্তরাষ্ট্র-সৈন্যগণকে সংহারপূর্ব্বক ভূপতিগণের প্রশংসাভাজন হইয়া যুধিষ্ঠির-সন্নিধানে গমন করত তাঁহাকে পূজা করিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব, বিরাট, দ্রুপদ ও কেকয়গণ ভীমকে নিরীক্ষণ করিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন এবং ভগবান্ শঙ্কর অন্ধকাসুরকে সংহার করিয়া আগমন করিলে সুরগণ যেমন তাঁহার সৎকার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ তাঁহারাও ভীমের সৎকার করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! অনন্তর বরুণাত্মজ-সদৃশ আপনার আত্মজগণ দ্রোণসমবেত হইয়া ক্রোধাবিষ্টচিত্তে রথ, পদাতি ও কুঞ্জরগণ-সমভিব্যাহারে যুদ্ধার্থ ভীমকে পরিবেষ্টন করিলেন। তখন সেই জলদজালসদৃশ অন্ধকারসমাচ্ছন্ন ভয়ঙ্কর নিশাকালে বৃক, কাক ও গৃধুগণের আমোদজনক ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভহইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এদিকে মহারথ সোমদত্ত মহাবীর সাত্যকির হস্তে প্রায়োপবিষ্ট স্বীয় পুত্র ভূরিশ্রবার নিধন দর্শনে সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া শৈনেয়কে কহিতে লাগিলেন, হে যুযুধান! তুমি দেবনিৰ্দ্দিষ্ট ক্ষত্রিয়ধর্ম্মের অনুষ্ঠানে রত ও বিজ্ঞ বলিয়া প্রসিদ্ধ; তবে তুমি কিরূপে সেই ক্ষত্রিয়ধর্ম পরিত্যাগ-পূর্ব্বক দস্যুবৃত্তি অবলম্বন করিয়া রণপরাজুখ, অস্ত্র-শস্ত্রত্যাগী, অতি দীন ভূরিশ্রবাকে প্রহার করিলে? বৃষ্ণিবংশে মহাবীর প্রদ্যুম্ন ও তুমি; তোমরা এই দুইজন মহারথ ও মহাতেজস্বী বলিয়া বিখ্যাত আছ; কিন্তু তুমি কিরূপে সেই অর্জুনশরে ছিন্নবাহু, প্রায়োপবিষ্ট ভূরিশ্রবার প্রতি নিষ্ঠুরতাচরণে প্রবৃত্ত হইলে? যাহা হউক, এক্ষণে অবশ্যই তোমাকে নিষ্ঠুরতাচরণের ফলভোগ করিতে হইবে। আজিই শরদ্বারা তোমার মস্তক ছেদন করিব। রে দুরাত্মন্! বৃষ্ণিকুলাঙ্গার! আমি আমার পুত্রদ্বয়, যজ্ঞ ও সুকৃতদ্বারা শপথ করিয়া কহিতেছি যে, যদি অর্জুন তোমাকে রক্ষা না করেন, তাহা হইলে এই রাত্রিমধ্যেই তোমাকে এবং তোমার পুত্র ও অনুজগণকে বিনাশ করিব। যদি আমার এই প্রতিজ্ঞা বিফল হয়, তাহা হইলে যেন আমি ঘোরতর নরকে নিপতিত হই। মহাবল পরাক্রান্ত সোমদত্ত এই কথা বলিয়া ক্রোধভরে শঙ্খধ্বনি ও সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন।
তখন মহাবল পরাক্রান্ত কমললোচন সাত্যকি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া সোমদত্তকে কহিলেন, হে কৌরবেয়! তোমার বা অন্য কাহারও সহিত যুদ্ধ করিতে আমার অন্তঃকরণে কিছুমাত্র ভয়-সঞ্চার হয় না। তুমি সমস্ত সৈন্যপরিরক্ষিত হইয়া যুদ্ধ করিলেও আমি কিছুমাত্র ব্যথিত হই না। আমি ক্ষত্রিয়ধর্মাবলম্বী; তুমি সমরকালে অনর্থক বাক্য প্রয়োগ করিয়া আমাকে বিভীষিকা প্রদর্শন করিতে সমর্থ হইবে না। যদি আমার সহিত তোমার যুদ্ধ করিতে বাসনা হইয়া থাকে, তবে আইস, উভয়েই নিৰ্দ্দয়-ভাবে নিশিত শরপ্রহারে প্রবৃত্ত হই। আমি তোমার মহাবল পুত্র ভূরিশ্রবাকে নিধন এবং শল ও বৃষসেনকে পরাভব করিয়াছি। তুমিও একজন মহাবলশালী, অতএব ক্ষণকাল রণস্থলে অবস্থান কর; আজি পুত্র ও বান্ধবগণ-সমভিব্যাহারে তোমাকে যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিব। তুমি দান, দম, শৌচ, অহিংসা, হ্রী, ধৃতি ও ক্ষমা প্রভৃতি অবিনশ্বর গুণসমূহে | ভূষিত, মৃদঙ্গকেতু রাজা যুধিষ্ঠিরের তেজঃপ্রভাবে নিহতপ্রায় হইয়াছ। এক্ষণে কর্ণ ও সৌবল-সমভিব্যাহারে তোমাকে অবশ্যই শমনসদনে গমন করিতে হইবে। যদি তুমি রণ পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন কর, তাহা হইলে মুক্ত হইতে পারিবে; নতুবা আমি কৃষ্ণের চরণ ও ইষ্টাপূর্ত্তদ্বারা শপথ করিয়া কহিতেছি যে, আজি তোমাকে পুত্রের সহিত বিনষ্ট করিব। হে মহারাজ! সেই পুরুষপ্রধান বীরদ্বয় পরস্পর এইরূপ বাক্য প্রয়োগপূর্ব্বক শরসম্পাতে প্রবৃত্ত হইলেন।
ঐ সময় মহারাজ দুর্য্যোধন অযুত হস্তী ও অশ্ব এবং সহস্র রথ লইয়া সোমদত্তকে পরিবেষ্টনপূর্ব্বক অবস্থান করিতে লাগিলেন। আপনার শ্যালক যুবা শকুনি ও ইন্দ্রসমবিক্রম ভ্রাতৃ-গণ, পুত্র, পৌত্রগণ ও এক লক্ষ অশ্বে পরিবৃত হইয়া মহাধনুর্দ্ধর সোমদত্তকে চতুৰ্দ্দিকে অবস্থানপূর্ব্বক তাঁহার রক্ষায় প্রবৃত্ত হইলেন। মহাবল সোমদত্ত এইরূপে সেই বীরগণকর্তৃক রক্ষিত হইয়া সাত্যকিকে সন্নতপর্ব্ব শরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন রোষপরবশ হইয়া অসংখ্য সৈন্য সমভিব্যাহারে তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইলেন। ঐ সময়ে পরস্পর প্রহরণশীল সৈন্যগণমধ্যে বাতাহত-সমুদ্রনিস্বন-সদৃশ মহাশব্দ সমুত্থিত হইল। মহাবীর সোমদত্ত সাত্যকির প্রতি দশ বাণ নিক্ষেপ করিলে মহাবল পরাক্রান্ত মহাধনুর্দ্ধর সাত্যকিও তাঁহাকে নয় শরে বিদ্ধ করিলেন! মহাবীর সোমদত্ত সাত্যকির শরাঘাতে অতিমাত্র বিদ্ধ ও বিগত-সংজ্ঞ হইয়া রথোপরি মোহপ্রাপ্ত হইলেন। সারথি তাঁহাকে বিহ্বল অবলোকন করিয়া সত্বর রথ লইয়া পলায়ন করিল। তখন মহাবীর দ্রোণাচার্য্য সোমদত্তকে সাত্যকির শরাঘাতে অচৈতন্য অবলোকন করিয়া যুযুধানের বিনাশ-বাসনায় তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। যুধিষ্ঠির প্রভৃতি পাণ্ডবগণ ভারদ্বাজকে আগমন করিতে দেখিয়া সাত্যকির রক্ষার্থ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিলেন।
হে মহারাজ! পূর্ব্বে সুরগণের সহিত ত্রৈলোক্য বিজয়া-ভিলাষী বলিরাজের যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, ঐ সময় পাণ্ডবগণের সহিত আচার্য্যের সেইরূপ সংগ্রাম হইতে লাগিল। তেজঃপুঞ্জ-কলেবর দ্রোণাচার্য্য শরজালে পাণ্ডবসৈন্য সমাচ্ছন্ন ও যুধিষ্ঠিরকে বিদ্ধ করিলেন এবং সাত্যকিকে দশ, ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিংশতি, ভীমসেনকে নয়, নকুলকে পাঁচ, সহদেবকে আট, শিখণ্ডীকে শত, মৎস্যরাজ বিরাটকে আট, দ্রুপদকে দশ, দ্রৌপদীতনয়-দিগকে পাঁচ পাঁচ, যুধামন্যুকে তিন, উত্তমৌজাকে ছয় এবং অন্যান্য সেনাপতিকে অসংখ্য শরে বিদ্ধ করিয়া যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবমান হইলেন। পাণ্ডবসৈন্যগণ এইরূপে দ্রোণশরে বিদ্ধ হইয়া আর্তনাদ পরিত্যাগ করত ভয়ে চারিদিকে পলায়ন করিতে লাগিল।
তখন মহাবীর অর্জুন স্বীয় সৈন্যগণকে দ্রোণশরে ছিন্ন ভিন্ন অবলোকন করিয়া ঈষৎ কোপান্বিতচিত্তে আচার্য্যের প্রতি ধাবমান হইলেন। তদ্দর্শনে পাণ্ডবসৈন্যগণ পুনরায় প্রতিনিবৃত্ত হইল। অনন্তর পুনরায় পাণ্ডবগণের সহিত দ্রোণের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। হুতাশন যেমন তুলারাশি দগ্ধ করিয়া থাকেন, তদ্রূপ মহাবীর দ্রোণ আপনার পুত্রগণে পরিবেষ্টিত হইয়া শরানলে পাণ্ডবসৈন্যগণকে দগ্ধ করিতে লাগিলেন। তৎকালে সেই প্রচণ্ড মার্তণ্ড তুল্য, প্রজ্বলিত পাবকসদৃশ মহাবীর দ্রোণকে কাৰ্ম্মক-মণ্ডলীকৃত করত প্রদীপ্ত শরনিকরে বিপক্ষ সৈন্যগণকে নিরন্তর নিপীড়িত করিতে দেখিয়া কেহই নিবারণ করিতে সমর্থ হইল না। ঐ সময়ে যে যে ব্যক্তি দ্রোণের সম্মুখে নিপতিত হইল, তন্নিক্ষিপ্ত শরনিকর তৎক্ষণাৎ তাহাদিগের শিরশ্ছেদন-পূর্ব্বক ভূতলে নিপতিত হইল। এইরূপে সেই পাণ্ডবসেনা দ্রোণের শরে সমাহত ও নিতান্ত ভীত হইয়া ধনঞ্জয়ের সমক্ষেই পুনরায় পলায়ন করিতে লাগিল। তদ্দর্শনে মহাবীর অর্জুন বাসুদেবকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে গোবিন্দ! এক্ষণে আচার্য্যের রথাভিমুখে অশ্ব চালন কর। বাসুদেব অর্জুনের বাক্যানুসারে রজত, গোক্ষীর, কুন্দ ও চন্দ্রের সদৃশ ধবলাকার অশ্বগণকে দ্রোণের রথাভিমুখে সঞ্চালিত করিতে লাগিলেন। তখন ভীমসেন অর্জুনকে আচার্য্যের প্রতি ধাবমান দেখিয়া সারথি বিশোককে কহিলেন, হে বিশোক! তুমি এক্ষণে আমাকে দ্রোণসৈন্যমধ্যে লইয়া যাও। বিশোক তাঁহার আদেশ শ্রবণমাত্র অর্জুনের পশ্চাৎ পশ্চাৎ অশ্বগণকে সঞ্চালন করিতে আরম্ভ করিল। তখন পাঞ্চাল, সৃঞ্জয়, মৎস্য, চেদি, কারূষ, কোশল ও কৈকয়গণ সেই ভ্রাতৃদ্বয়কে পরম যত্নসহকারে দ্রোণসৈন্যাভিমুখে ধাবমান দেখিয়া তাঁহাদিগের অনুগমন করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় লোমহর্ষণ ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভহইল। মহাবীর অর্জুন দক্ষিণপার্শ্ব ও ভীমসেন উত্তরপার্শ্ব অবলম্বনপূর্ব্বক রথিগণের সহিত আপনার সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। তদ্দর্শনে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সাত্যকি যুদ্ধার্থ আপনার সৈন্যাভিমুখে ধাবমান হইলেন। প্রচণ্ড বায়ুর অভিঘাতে মহা-সাগরের যেমন ঘোরতর শব্দ হইয়া থাকে, তদ্রূপ সেই পরস্পর প্রহারে প্রবৃত্ত সৈন্যগণের ভীষণ কোলাহল হইতে লাগিল। ঐ সময় মহাবীর অশ্বত্থামা সাত্যকিকে নিরীক্ষণপূর্ব্বক ভূরিশ্রবার বিনাশে জাতক্রোধ হইয়া তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তদ্দর্শনে ভীমসেনতনয় মহাবীর ঘটোৎকচ লৌহনির্মিত, ঝক্ষ-চৰ্ম্ম-সমাচ্ছিন্ন ত্রিংশৎনল্ব বিস্তীর্ণ, যন্ত্রসন্নাহযুক্ত', অষ্টচক্র-সমন্বিত মেঘগম্ভীর-নিস্বন, অস্ত্রমালা-সমলঙ্কৃত, শোণিতাদ্র ধ্বজপট পরিশোভিত বিপুল ভয়ঙ্কর রথে আরোহণপূর্ব্বক শূল, মুদ্গর, শেল ও পাদপধারী ভয়ঙ্কর রাক্ষসী-সেনাগণ-সমভি-ব্যাহারে দ্রোণপুত্রের প্রত্যুদ্গমন করিলেন। তাঁহার রথে অশ্ব বা মাতঙ্গগণ সংযোজিত ছিল না; করিনিকরাকার পিশাচগণ উহা আকর্ষণ করিতেছিল এবং বিকট গৃধরাজ পক্ষ ও চরণ বিস্তীর্ণ করিয়া চীৎকার করত উহার সমুত্থিত ধ্বজদণ্ডে উপবিষ্ট রহিয়াছিল। মহীপালগণ তাহাকে যুগান্তকালীন দণ্ডপাণি অন্তকের ন্যায় শরাসন উদ্যত করত আগমন করিতে দেখিয়া অতিশয় ব্যথিত হইলেন। আপনার সৈন্যগণ সেই গিরিশৃঙ্গ-সদৃশ, ভীমরূপ ভয়াবহ দংষ্ট্রাকরাল, বিকট-মুখ, শঙ্কুকর্ণত ঊর্দ্ধকেশ, সন্নতোদর, কিরীটালঙ্কৃত মস্তক, মহাগর্তের ন্যায় বিস্তীর্ণ গলদ্বারযুক্ত, প্রদীপ্তবজ্র, বিপক্ষগণের বিক্ষোভজনক রাক্ষস ঘটোৎকচকে ব্যাদিতাস্য অন্তকের ন্যায় রোষভরে তথায় আগমন করিতে নিরীক্ষণ করিয়া সাতিশয় ভীত ও বায়ুভরে ক্ষুভিত ভাগীরথীর ন্যায় বিচলিত হইল। মাতঙ্গগণ ঘটোৎকচের সিংহনাদ শব্দে একান্ত ভীত হইয়া মূত্র পরিত্যাগ করিতে লাগিল।
অনন্তর রাক্ষসেরা রাত্রিকাল-প্রভাবে অধিকতর বলশালী হইয়া সেই রণস্থলের চতুর্দিকে শিলাবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিল। লৌহময় চক্র, ভুশুণ্ডী, শক্তি, তোমর, শূল, শতঘ্নী ও পট্টিশ প্রভৃতি অস্ত্রসকল চতুৰ্দ্দিকে অনবরত নিপতিত হইতে লাগিল। হে মহারাজ! সমস্ত নরপতি ও আপনার তনয়গণ এবং মহাবীর কর্ণ সেই ভীষণ সংগ্রাম দর্শনে নিতান্ত কাতর হইয়া পলায়নে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ সময় কেবল অস্ত্রবল-দীক্ষিত অশ্বত্থামা একাকী অনাকুলিতচিত্তে সংগ্রামস্থলে অবস্থানপূর্ব্বক সেই ঘটোৎকচ-বিস্তৃত মায়াজাল ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর ঘটোৎকচ তদ্দর্শনে অমর্ষপরবশ হইয়া তাঁহার উপর শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গসমুদয় যেমন বল্মীক-মধ্যে প্রবেশ করে, তদ্রূপ সেই ঘটোৎকচনিক্ষিপ্ত শরসকল অশ্বত্থামার দেহ বিদারণপূর্ব্বক রুধিরলিপ্ত হইয়া ধরাতলে প্রবিষ্ট হইল। তখন প্রবলপ্রতাপশালী লঘুহস্ত অশ্বত্থামা ক্রোধাবিষ্ট হইয়া দশ শরে ভীমপুত্রকে বিদ্ধ করিলেন। ঘটোৎকচ অশ্বত্থামার শরে মর্ম্ম-নিপীড়িত হইয়া তাঁহার বিনাশ-বাসনায় তাঁহার উপর এক কালার্কসদৃশ, মণি-হীরক-বিভূষিত, এক লক্ষ শর সমাযুক্ত, ক্ষুরধার চক্র নিক্ষেপ করিলেন। সেই ঘটোৎকচ-নিক্ষিপ্ত চক্র মহাবেগে অশ্বত্থামার সমীপে সমাগত হইবামাত্র তিনি শরনিকরদ্বারা উহা ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে সেই চক্র ভাগ্যহীন জনের বাসনার ন্যায় বিফল হইলে মহাবীর ভীমতনয় রাহু যেমন ভাস্করকে আচ্ছন্ন করে, তদ্রূপ দ্রৌণিকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিলেন।
ঐ সময় ভিন্নাঞ্জনসন্নিভ' কলেবর ঘটোৎকচতনয় অঞ্জন-পর্ব্বা অশ্বত্থামাকে আগমন করিতে দেখিয়া সুমেরু যেমন বায়ুর প্রতিরোধ করে, তদ্রূপ তাঁহার গতি রোধপূর্ব্বক মেঘ যেমন সুমেরু পর্ব্বতের উপর বারিধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ তাঁহার উপর শরধারা বর্ষণ করিতে লাগিলেন। রুদ্র, উপেন্দ্র ও ইন্দ্রতুল্য পরাক্রমশালী অশ্বত্থামা তদ্দর্শনে অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া এক বাণে অঞ্জনপর্ব্বার ধ্বজ, তিন বাণে ত্রিবেণুক', এক বাণে ধনুঃ, চারি বাণে চারি অশ্ব এবং দুই বাণে সারথিদ্বয়কে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর অঞ্জনপর্ব্বা এইরূপে রথবিহীন হইয়া অশ্বত্থামার উপর খড়াপ্রহারে উদ্যত হইল। দ্রোণপুত্র তৎক্ষণাৎ সুতীক্ষ্ণ শরদ্বারা তাহার হস্ত হইতে সেই স্বর্ণবিন্দুখচিত অসিদণ্ড দ্বিখণ্ড করিলেন। তখন ঘটোৎকচনন্দন ক্রোধভরে গদা বিঘূর্ণন-পূর্ব্বক অশ্বত্থামার প্রতি নিক্ষেপ করিল। মহাবীর দ্রোণাত্মজ তাহাও শরনিকরে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর অঞ্জনপর্ব্বা সহসা আকাশমার্গে সমুত্থিত হইয়া কাল মেঘের ন্যায় গর্জন করত বৃক্ষবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিল। তখন দ্রোণপুত্র তদ্দর্শনে ক্রুদ্ধ হইয়া দিবাকর যেমন স্বীয় করজালে মেঘমণ্ডল ভেদ করিয়া থাকে, তদ্রূপ শরজালে অঞ্জনপর্ব্বার কলেবর ভেদ করিতে লাগিলেন এবং ঘটোৎকচতনয় অন্তরীক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইয়া সেই সুবর্ণখচিত রথে অবস্থানপূর্ব্বক পৃথিবীস্থিত অত্যুচ্চ অঞ্জন-পর্ব্বতের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। অনন্তর মহাবীর অশ্বত্থামা ক্রুদ্ধচিত্তে মহেশ্বর যেমন অন্ধকাসুরকে বিনাশ করিয়া-ছিলেন, তদ্রূপ সেই লৌহবর্ম্মধারী ভীমনপ্তা' অঞ্জনপর্ব্বাকে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন।
হে মহারাজ! মহাবীর ঘটোৎকচ স্বীয় পুত্রকে এইরূপে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া কোপজুলিতচিত্তে দবদহনপ্রবৃত্ত' দাবানল সদৃশ পাণ্ডবসৈন্যসংহারকারী মহাবীর অশ্বত্থামার সমীপে আগমনপূর্ব্বক নির্ভীকচিত্তে কহিতে লাগিলেন। হে দ্রোণনন্দন! তুমি ক্ষণকাল ঐ স্থানে অবস্থান কর। তুমি কদাচ আমার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবে না। পার্ব্বতীনন্দন স্কন্দ যেমন ক্রৌঞ্চ পর্ব্বত বিদীর্ণ করিয়াছিলেন, তদ্রূপ অদ্য আমি তোমাকে বিদীর্ণ করিব। অশ্বত্থামা ঘটোৎকচের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, হে বৎস! তুমি এক্ষণে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া অন্যের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও; পুত্রের সহিত যুদ্ধ করা পিতার কর্ত্তব্য নহে। হে হিড়িম্বানন্দন! তোমার প্রতি আমার কিছু মাত্র ক্রোধ নাই; কিন্তু মনুষ্য রোষপরবশ হইয়া আত্মনাশেও পরাজুখ হয় না। এই নিমিত্তই তোমাকে এ স্থান হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইতে কহিতেছি। তখন পুত্রশোকসন্তপ্ত মহাবীর ঘটোৎকচ রোষ-কষায়িতলোচনে অশ্বত্থামাকে কহিলেন, হে দ্রোণাত্মজ! আমি নীচ লোকের ন্যায় সংগ্রামে কাতর নহি। তবে কেন নিরর্থক বাক্য ব্যয় করিয়া আমাকে বিভীষিকা প্রদর্শন করিবার চেষ্টা করিতেছ? আমি এই সুবিস্তীর্ণ কৌরবকুলে মহাবীর ভীমের ঔরসে উৎপন্ন হইয়াছি; আমি সমরে অপরাজুখ পাণ্ডবগণের পুত্র, রাক্ষসগণের অধিরাজ ও দশাননের ন্যায় মহাবল পরাক্রান্ত। হে দ্রোণাত্মজ! তুমি ক্ষণকাল ঐ স্থানে অবস্থান কর। প্রাণসত্ত্বে তুমি কদাপি অন্যত্র গমন করিতে সমর্থ হইবে না। আজি আমি তোমার যুদ্ধাভিলাষ অপনতী করিব। মহাবীর ঘটোৎকচ এই বলিয়া কুঞ্জরাভিমুখীন কেশরীর ন্যায় ক্রোধভরে অশ্বত্থামার অভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং জলধর যেমন জলধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ অশ্বত্থামার প্রতি রথাক্ষপরিমিত আয়ত শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। মহাবল অশ্বত্থামা হিড়িম্বাতনয়বিসষ্ট সেই শরসমুদায় উপস্থিত হইতে না হইতেই অন্তরীক্ষে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। তৎকালে বোধ হইল। যেন, নভোমণ্ডলে শরজালে একটি স্বতন্ত্র যুদ্ধ হইতেছে। অস্ত্রসমুদায়ের সংঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গসকল সমুৎপন্ন হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল যেন গগনতল খদ্যোতপুঞ্জে সুশোভিত হইয়াছে।
এইরূপে দ্রোণপুত্রকর্তৃক ঘটোৎকচের অস্ত্রমায়া প্রতিহত। হইলে ভীমতনয় প্রচ্ছন্নভাবে পুনর্ব্বার মায়াজাল বিস্তার করিবার বাসনায় উত্তুঙ্গ শৃঙ্গসম্পন্ন পাদপকুল-সমাচ্ছন্ন, শূল, প্রাস, অসি ও মুষলররূপ প্রস্রবণ যুক্ত এক পর্ব্বতের আকার পরিগ্রহ করিলেন। মহাবাহু অশ্বত্থামা সেই অঞ্জনস্তূপসদৃশ মহীধর ও তাহা হইতে অনবরত নিপতিত অস্ত্রজাল নিরীক্ষণ করিয়া কিছুমাত্র বিচলিত হইলেন না। তখন তিনি হাস্যমুখে বজ্রাস্ত্র প্রয়োগ করিয়া সেই শৈলেন্দ্রকে চূর্ণ করিয়া ফেলিলেন।
অনন্তর ঘটোৎকচ ইন্দ্রায়ুধ-বিভূষিত নীল নীরদরূপ ধারণ করিয়া পাষাণ বর্ষণপূর্ব্বক অশ্বত্থামাকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। মহাবীর অশ্বত্থামা বায়ব্যাস্ত্র সন্ধানপূর্ব্বক সেই সমুত্থিত নীল মেঘ অপসারিত করিয়া শরনিকরে দিত্মণ্ডল সমাচ্ছন্ন করত লক্ষ রথীর প্রাণসংহার করিলেন।
অনন্তর মহাবীর ঘটোৎকচ সিংহশাদুলসদৃশ মত্তদ্বিরদ-বিক্রম, বিকটাস্য, বিকৃতমস্তক, বিকৃতগ্রীব, নানাশস্ত্রধারী, কবচ-সমলঙ্কৃত, ভয়ঙ্কর, ক্রোধোদৃত্তলোচন, দেবরাজসম মহাবল পরা-ক্রান্ত, সমরদুৰ্ম্মদ রথারোহী, গজারোহী ও অশ্বারোহী রাক্ষসগণে পরিবৃত হইয়া পুনরায় অশ্বত্থামার অভিমুখে ধাবমান হইলেন। আপনার আত্মজ দুর্য্যোধন তদ্দর্শনে নিতান্ত বিষণ্ণ হইলেন। তখন মহাবীর দ্রোণাত্মজ দুর্য্যোধনকে বিষণ্ণ নিরীক্ষণ করিয়া সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে মহারাজ! তুমি ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক ভ্রাতৃগণ ও ইন্দ্রসমবিক্রম পার্থিবগণের সহিত এই স্থানেই অবস্থান কর। আমি সত্য প্রতিজ্ঞা করিয়া কহিতেছি, তোমার শত্রুগণকে সংহার করিব। তুমি কখনই পরাজিত হইবে না। এক্ষণে যত্নসহকারে স্বীয় সৈন্যগণকে আশ্বাসিত কর। মহারাজ দুর্য্যোধন অশ্বত্থামার বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, হে দ্রোণনন্দন! তোমার মনের এইরূপ ঔদার্য্য ও আমাদের প্রতি এইরূপ গাঢ়তর ভক্তি হওয়া নিতান্ত অদ্ভুত নহে। রাজা দুর্য্যোধন অশ্বত্থামাকে এই কথা বলিয়া শকুনিকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সুবলননন্দ! অর্জুন লক্ষ রথীকর্তৃক পরিবৃত হইয়া সংগ্রাম করিতেছে, তুমি ষষ্টিসহস্র রথী-সমভিব্যাহারে তাঁহার অভিমুখে গমন কর; কর্ণ, বৃষসেন, কূপ, নীল, কৃতবর্ম্মা, দুঃশাসন, নিকুম্ভ, কুণ্ডভেদী, পুরুদ্রুম, পুরঞ্জয়, দৃঢ়রথ, পতাকী, হেমপুঞ্জক, শল্য, আরুণি, ইন্দ্রসেন, সঞ্জয়, বিজয়, কমলাক্ষ, পরক্রার্থী, জয়বর্ম্মা ও সুদর্শন এবং পুরুমিত্রের পুত্রসমুদায়, উদীচ্যগণ ও ছয় অযুত পদাতি তোমার অনুগমন করিবেন। হে মাতুল। দেবরাজ যেমন অসুরগণকে সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ তুমি ভীম, নকুল, সহদেব ও যুধিষ্ঠিরকে বিনাশ কর। আমি এক্ষণে তোমার উপর জয়লাভ নির্ভর করিয়াছি। অতএব কার্তিকেয় যেমন দানবদল দলন করিয়াছিলেন, তদ্রূপ তুমি অশ্বত্থামার শরনিকরে ক্ষতবিক্ষত-কলেবর পাণ্ডবগণকে বিনাশ কর। হে মহারাজ। শকুনি দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণানন্তর আপনার পুত্রগণের সন্তোষ ও পাণ্ডবদিগের বিনাশ সম্পাদনার্থ দ্রুতবেগে গমন করিতে লাগিলেন।
ঐ সময় ইন্দ্র ও প্রহ্লাদের ন্যায় অশ্বত্থামা ও ঘটোৎকচের তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হইল। ঘটোৎকচ কুপিত হইয়া বিষাগ্নিসদৃশ সুদৃঢ় দশ বাণ পরিত্যাগ করিয়া দ্রোণপুত্রের বক্ষঃস্থল আহত করিলেন। অশ্বত্থামা ভীমসুতের শরপ্রহারে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া পবনোদ্ধৃত পাদপের ন্যায় রথমধ্যে বিচলিত হইলেন। তখন ভীমতনয় পুনর্ব্বার অবিলম্বে অঞ্জলিক বাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক করস্থিত সুপ্রভ শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। দ্রোণনন্দন তৎক্ষণাৎ সুদৃঢ় অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া, জলধর যেমন বারিবর্ষণ করিয়া থাকে, তদ্রূপ রাক্ষসগণের প্রতি সুবর্ণপুঙ্খ অরাতিনিপাতন শরজাল নিক্ষেপ করিলেন। বিশালবক্ষাঃ রাক্ষসগণ দ্রোণপুত্রের বাণে নিপীড়িত হইয়া সিংহাদ্দিত মত্ত মাতঙ্গযুথের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। প্রলয়কালে ভগবান্ হুতাশন যেমন জীবগণকে দগ্ধ করিয়া থাকেন, তদ্রূপ মহাবীর অশ্বত্থামা হস্তী, অশ্ব, সারথি ও রথের সহিত রাক্ষসগণকে শরানলে দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। পূর্ব্বকালে দেবাদিদেব মহাদেব আকাশপথে ত্রিপুরাসুরকে দগ্ধ করিয়া যেরূপ দীপ্তি পাইয়াছিলেন, মহাবীর দ্রোণতনয় সেই অক্ষৌহিণী রাক্ষসসেনা ধ্বংস করিয়া সেইরূপ বিরাজিত হইতে লাগিলেন।
তখন মহাবীর ঘটোৎকচ কোপাবিষ্ট হইয়া দ্রোণপুত্রকে বিনাশ করিতে আজ্ঞা প্রদানপূর্ব্বক অসংখ্য রাক্ষস সৈন্যকে প্রেরণ করিলেন। দশনোদ্দীপ্ত-বদন নানাস্ত্রধারী ঘোররূপ নিশাচরগণ ঘটোৎকচের আজ্ঞা প্রাপ্তিমাত্র মুখ ব্যাদানপূর্ব্বক সিংহনাদে বসুন্ধরা প্রতিধ্বনিত করত দ্রোণপুত্রের সংহারার্থ ধাবমান হইয়া তাঁহার মস্তকে সহস্র সহস্র শাণিত শক্তি, শতঘ্নী, পরিঘ, অশনি, শূল, পট্টিশ, খড়া, গদা, ভিন্দিপাল, মুষল, পরশু, প্রাস, অসি, তোমর, কুণপ, কম্পন, শূল, ভূশুণ্ডী, অশ্মগুড়, লৌহময় স্থূন এবং শত্রুদারণ ঘোর মুদারসকল নিক্ষেপ করিতে লাগিল। হে মহারাজ! আপনার পক্ষীয় যোধগণ ভীষণ অস্ত্রসমুদায় অশ্বত্থামার মস্তকোপরি নিপতিত হইতে দেখিয়া সাতিশয় ব্যথিত হইল; কিন্তু মহাবল পরাক্রান্ত দ্রোণতনয় অসম্ভ্রান্ত চিত্তে শিলানিশিত বজ্রকল্প শরনিকর নিক্ষেপপূর্ব্বক অনায়াসে সেই ঘোরতর শরজাল নিবারণ করিয়া সত্বর দিব্য মন্ত্রপূত সুবর্ণপুঙ্খ শরনিকরে বিপুলবক্ষাঃ রাক্ষসকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। নিশাচরগণ অশ্বত্থামার ভীষণ-শর-সমাহত হইয়া সিংহবিদলিত গজযুথের ন্যায় একান্ত সমাকুল হইয়া ক্রোধভরে তাঁহার বিনাশবাসনায় ধাবমান হইল। তখন অস্ত্র-বিদগ্রগণ্য মহাবীর অশ্বত্থামা অতি দুষ্কর আশ্চর্য্যজনক বিক্রম প্রদর্শনপূর্ব্বক একাকী ঘটোৎকচের সমক্ষে প্রজ্বলিত শরানলে সেই রাক্ষসী-সেনা দগ্ধ করত যুগান্তকালীন সংবর্তক হুতাশনের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। ঐ সময় পাণ্ডবপক্ষীয় অসংখ্য নরপতিমধ্যে মহাবল পরাক্রান্ত ঘটোৎকচ ভিন্ন আর কেহই তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইলেন না। পরে রাক্ষসেন্দ্র ভীমতনয় ক্রোধে নয়ন বিঘূর্ণন, করতালি প্রদান ও ওষ্ঠাধর দংশনপূর্ব্বক স্বীয় সারথিকে কহিলেন, হে সারথে। তুমি সত্বর দ্রোণপুত্র-সমীপে রথ সঞ্চালন কর। সারথি আজ্ঞা প্রাপ্তিমাত্র অশ্বত্থামার সমীপে রথ সমানীত করিলেন। ভীমবিক্রম অরাতি-পাতন ঘটোৎকচ পুনরায় সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক জয়পতাকা-সমাযুক্ত বিকট-বেশধারী দ্রোণপুত্রের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া তাঁহার প্রতি অষ্টঘণ্টাযুক্ত দেবনির্মিত অশনি নিক্ষেপ করিলেন। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা কাৰ্ম্মক পরিত্যাগ ও লক্ষ প্রদানপূর্ব্বক সেই অশনি গ্রহণ করিয়া ঘটোৎকচের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। মহাপ্রভাসম্পন্ন সেই ঘোররূপ অশনি রাক্ষসেন্দ্রের অশ্ব, সারথি ও ধ্বজ ছেদনপূর্ব্বক পৃথিবী বিদীর্ণ করিয়া ধরাতলে প্রবিষ্ট হইল। তদ্দর্শনে সকলেই দ্রোণপুত্রকে প্রশংসা করিতে লাগিল। অনন্তর ভীমপরাক্রম ভীমতনয় ধৃষ্টদ্যুম্নের রথে আরোহণপূর্ব্বক ইন্দ্রায়ুধসদৃশ অতি ভীষণ কাৰ্ম্মক গ্রহণ করিয়া পুনরায় অশ্বত্থামার উপর নিশিত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন ও নির্ভীকচিত্তে আচার্য্যপুত্রের বক্ষঃস্থলে আশীবিষসদৃশ সুবর্ণপুঙ্খ শরসমুদায় নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা তাঁহাদের দুইজনের উপর অসংখ্য নারাচ নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তাঁহারাও হুতাশনসদৃশ শরনিকরে তাঁহার নারাচ ছেদন করিয়া ফেলিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে যোধগণের ও মহাবীর অশ্বত্থামার প্রীতিজনক অতি ভীষণ সংগ্রাম উপস্থিত হইল। ঐ সময়ে মহাবীর ভীমসেন সহস্র রথ, তিন শত হস্তী এবং ছয় সহস্র অশ্বে পরিবৃত হইয়া সেই স্থানে আগমন করিলেন। তখন বিক্রমশালী অশ্বত্থামা ঘটোৎকচ ও অনুজসহায় ধৃষ্টদ্যুম্নের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তৎকালে তিনি এরূপ অদ্ভুত পরাক্রম প্রদর্শন করিলেন যে, পৃথিবীমধ্যে আর কেহই সেরূপ পরাক্রম প্রদর্শনে সমর্থ নহেন। তিনি নিমেষ মাত্রে মহাবীর ভীমসেন, ঘটোৎকচ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, নকুল, সহদেব, ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির বিজয় ও কেশব-সমক্ষে সেই অসংখ্য হস্তী, অশ্ব, সারথি ও রথসমবেত এক অক্ষৌহিণী রাক্ষসী-সেনা নিপাত করিলেন। দ্বিরদগণ অশ্বত্থামার অবক্র নারাচে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া শৃঙ্গবিহীন পর্ব্বত-সমুদায়ের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইল। নিকৃত্ত করিশুশুসকল সমরভূমিতে বিলুণ্ঠিত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল, যেন ভীষণ ভুজগগণ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেছে। কাঞ্চনময় দণ্ড ও শ্বেতচ্ছত্রসকল ছিন্ন ও নিপতিত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল, যেন ঐ সময় দ্রোণাত্মজের শরনিকরপ্রভাবে অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যগণ নিহত হওয়াতে সমরাঙ্গনে এক ভীষণ তরঙ্গ-যুক্ত ভীরুজনের মোহজনক শোণিতনদী প্রবাহিত হইল। বৃহদাকার ধ্বজসকল উহার মণ্ডুক'; ভেরীসকল বৃহদাকার কচ্ছপ; শ্বেতচ্ছত্রসমুদায় হংসাবলী; চামর ফেন; কঙ্ক ও গৃধুসকল মহানক্র; অসংখ্য আয়ুধ মৎস্য; বৃহদাকার হস্তীসমুদায় পাষাণ; অশ্বগণ মকর; রথসকল তীরভূমি; পতাকানিচয় তীরস্থিত মনোহর বৃক্ষ; প্রাস, শক্তি ও ঋষ্টি-সকল ডুণ্ডুভ'; মজ্জা ও মাংস পঙ্ক; কবন্ধগণ ভেলক; কেশকলাপ শৈবাল এবং যোধ-গণের আর্তনাদ উহার শব্দস্বরূপ শ্রুত হইতে লাগিল।
মহাবীর অশ্বত্থামা এইরূপে রাক্ষসগণকে নিহত করিয়া ঘটোৎকচকে শরনিকরে নিপীড়িত করিতে আরম্ভ করিলেন। তৎপরে তিনি পুনরায় সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইয়া দ্রুপদ ও মহারথ পাণ্ডবগণকে শরজালে বিদ্ধ করত দ্রুপদপুত্র সুরথকে সংহারপূর্ব্বক সুরথের অনুজ শত্রুঞ্জয়, বলানীক, জয়ানীক ও জয়কে বিনাশ করিয়া ফেলিলেন এবং সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক সুতীক্ষ্ণ শরে পৃষধ্রু ও চন্দ্রসেনকে নিহত করিয়া দশ শরে কুন্তিভোজের দশ পুত্রকে ও সুপুঙ্খ শাণিত তিন শরে শ্রুতায়ুধকে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। তৎপরে সেই মহাবীর ক্রোধাবিষ্ট হইয়া শরাসন আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক ঘটোৎকচকে লক্ষ্য করিয়া এক যমদণ্ডোপম ভয়ঙ্কর শর পরিত্যাগ করিলেন। সেই শর পরিত্যক্ত হইবামাত্র ঘটোৎকচের হৃদয় ভেদপূর্ব্বক ভূগর্তে প্রবিষ্ট হইল। তখন মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন ঘটোৎকচকে নিহত ও নিপতিত বোধ করিয়া অশ্বত্থামার নিকট হইতে পলায়ন করিলেন। তদ্দর্শনে পাণ্ডবসৈন্যগণও সমরে পরাম্মুখ হইতে লাগিল। এইরূপে মহাবীর অশ্বত্থামা শত্রুগণকে পরাজয় করিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন সমরভূমি শরনিকরে ভিন্নকলেবর, নিহত ও নিপতিত গিরিশৃঙ্গসদৃশ রাক্ষসগণে সমাচ্ছন্ন হওয়াতে নিতান্ত দুর্গম ও ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল। হে মহারাজ! তখন আপনার পুত্রগণ ও অন্যান্য বীরগণ এবং সিদ্ধ, গন্ধর্ব্ব, পিশাচ, নাগ, সুপর্ণ, পিতৃলোক, পক্ষী, রাক্ষস, ভূত, অপ্সরাঃ ও দেবতাগণ অশ্বত্থামার প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও যুযুধান ইঁহারা দ্রুপদতনয়গণ, কুন্তিভোজের পুত্রগণ এবং সহস্র সহস্র রাক্ষসগণকে অশ্বত্থামার শরনিকরে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া পরম যত্নসহকারে যুদ্ধে মনোনিবেশ করিলেন। তখন উভয় পক্ষে অতি অদ্ভুত ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। সোমদত্ত সাত্যকিকে পুনরায় অবলোকন-পূর্ব্বক ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীমসেন সাত্যকির সাহায্যার্থ দশ শরে সোমদত্তকে বিদ্ধ করিলে সোমদত্তও তাঁহাকে শত শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত সাত্যকি একান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া পুত্রবিনাশে নিতান্ত সন্তপ্ত, স্থবিরোচিত-গুণগ্রামসমলঙ্কৃত, হাতিরাজয়দশ বন্ধু সোমদত্তকে প্রথমতঃ বজ্রসঙ্কাশ সুতীক্ষ্ণ দশ শর ও ভীষণ শক্তিদ্বারা বিদ্ধ করিয়া পুনর্ব্বার তাঁহার উপর সাত শর প্রয়োগ করিলেন। তখন মহাবীর ভীম সাত্যকির সাহায্যার্থ সোমদত্তের মস্তকে এক সুদৃঢ় ভয়ঙ্কর পরিঘ নিক্ষেপ করিলেন। সাত্যকিও সেই সময় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া সোমদত্তের বক্ষঃস্থলে অনলসঙ্কাশ শাণিত শর পরিত্যাগ করিলেন। সেই ভীষণ পরিঘ ও শর এককালে সোমদত্তের কলেবরে নিপতিত হইলে তিনি মূর্ছিত হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন। মহাবীর বাহীক স্বীয় পুত্রের তদবস্থা দর্শনে বর্ষাকালীন নীরবর্ষী নীরদের ন্যায় অনবরত শর বর্ষণ করত সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর ভীম সাত্যকির সাহায্যার্থ নয় শরে বাহীককে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর প্রতীপতনয় বাহীক তদ্দর্শনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া পুরন্দর-বিনির্মুক্ত অশনির ন্যায় ভীমের বক্ষঃস্থলে এক শক্তি প্রহার করিলেন। মহাবাহু ভীমসেন সেই শক্তিদ্বারা আহত হইয়া একান্ত বিচলিত ও বিমোহিত হইলেন এবং অবিলম্বে পুনরায় সংজ্ঞা লাভ করিয়া বাহ্লীকের প্রতি এক গদা নিক্ষেপ করিলেন। সেই ভীমসেন-প্রেরিত ভীষণ গদা বাহীকের মস্তক চূর্ণ করিয়া ফেলিল। তখন তিনি তৎক্ষণাৎ বজ্রাহত পাদপের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইলেন।
অনন্তর আপনার আত্মজ নাগদত্ত, দৃঢ়রথ, বীরবাহু, অয়োভুজ, দৃঢ়, সুহস্ত, বিজয়, প্রমাথ ও উগ্রযায়ী দাশরথিসদৃশ এই নয় মহাবীর বাহীককে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া ভীমসেনকে নিপীড়িত করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। মহাবীর ভীম তাঁহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া কার্য্যসাধনক্ষম নারাচসকল সন্ধানপূর্ব্বক প্রত্যেকের মর্ম্মদেশ বিদ্ধ করিলেন। তাঁহারা ভীমের নারাচে বিদ্ধ হইয়া মহীরুহগণ যেমন প্রচণ্ড বায়ুসহকারে ভগ্ন হইয়া পর্ব্বতশিখর হইতে নিপতিত হয়, তদ্রূপ গতাসু হইয়া ভূতলে নিপতিত হইলেন। এইরূপে ভীম নয় নারাচে সেই নয় বীরের প্রাণ সংহার করিয়া কর্ণের প্রিয় পুত্র বৃষসেনের প্রতি শরজাল বিস্তার করিতে লাগিলেন। তখন কর্ণের ভ্রাতা বকরথ তাঁহাকে নারাচনিকরে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর ভীম তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে শমনসদনে প্রেরণপূর্ব্বক আপনার সাতজন শ্যালককে বিনাশ করিয়া নারাচদ্বারা শতচন্দ্রকে সংহার করিলেন। তখন বীর গবাক্ষ, শরভ ও বিভু শকুনির ভ্রাতা শতচন্দ্রকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া একান্ত ক্রোধাবিষ্টচিত্তে ভীমসেনের প্রতি দ্রুতবেগে গমনপূর্ব্বক তাঁহার উপর সুতীক্ষ্ণ নারাচনিকর প্রহার করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন সেই জলধারাসদৃশ নারাচ নিকরে তাড়িত হইয়া পাঁচ শরে অলৌকিক বলশালী পাঁচ মহীপালকে বিনাশ করিলেন। অন্যান্য নৃপতিগণ তাঁহাদিগকে বিনষ্ট দেখিয়া সাতিশয় বিচলিত হইলেন। হে মহারাজ! ঐ সময় রাজা যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হইয়া দ্রোণাচার্য্য ও আপনার পুত্রগণের সমক্ষেই আপনার পক্ষীয় অন্বষ্ঠ, মানব, ত্রিগর্ত, শিবি, অভীষাহ, শূরসেন, বাহীক, বসাতি, যৌধেয়, মালব ও মদ্রকগণকে অসংখ্য শরে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। তাঁহাদের মাংস ও শোণিতে পৃথিবী কৰ্দ্দমাক্ত হইল। ঐ সময় যুধিষ্ঠিরের রথ-সমীপে, বধ কর, আহরণ কর, গ্রহণ কর, বিদ্ধ কর, ইত্যাকার তুমুল শব্দ হইতে লাগিল। তখন দুর্য্যোধন-প্রেরিত মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য যুধিষ্ঠিরকে কৌরবসৈন্য বিদ্রাবণ করিতে দেখিয়া তাঁহাকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিয়া তাঁহার উপর বায়ব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করিলেন। ধৰ্ম্মনন্দন স্বীয় অস্ত্রদ্বারা আচার্য্যের অস্ত্র ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে অস্ত্র বিনষ্ট হইলে ভারদ্বাজ রোষপরবশ হইয়া যুধিষ্ঠিরের বিনাশার্থ বারুণ, যাম্য, আগ্নেয়, ত্বাষ্ট্র ও সাবিত্র অস্ত্র প্রয়োগ করিলেন। মহাবাহু যুধিষ্ঠির অকুতোভয়ে স্বীয় অস্ত্র দ্বারা সেই দ্রোণনিক্ষিপ্ত অস্ত্রসমূহ নিরাকৃত করিতে লাগিলেন। তখন দুর্য্যোধনহিতৈষী দ্রোণাচার্য্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া ধর্মরাজের বিনাশ-বাসনায় ঐন্দ্র ও প্রাজাপত্য অস্ত্র আবিষ্কৃত করিলেন। গজসিংহগামী, বিশালবক্ষাঃ, পৃথুলোহিতাক্ষ, অমিততেজাঃ ধৰ্ম্মরাজও মাহেন্দ্র-অস্ত্র আবিষ্কৃত করিয়া দ্রোণাস্ত্র ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন দ্রোণাচার্য্য যৎপরোনাস্তি কোপাবিষ্ট হইয়া যুধিষ্ঠিরের বধকামনায় ব্রহ্মাস্ত্র উদ্যত করিলেন। ঐ সময় রণক্ষেত্র তিমিরাবৃত হওয়াতে আমরা কিছুই জানিতে পারিলাম না। যোদ্ধৃগণ সেই ব্রহ্মাস্ত্র দর্শনে অতিশয় শঙ্কিত হইল। তখন কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠির স্বীয় ব্রহ্ম-অস্ত্রদ্বারা সেই আচার্য্য-নিক্ষিপ্ত ব্রহ্ম-অস্ত্র নিবারণ করিলেন। তদ্দর্শনে আপনার প্রধান প্রধান সৈনিকগণ, ধনুর্দ্ধারী যুদ্ধবিশারদ দ্রোণাচার্য্যও যুধিষ্ঠিরের বারংবার প্রশংসা করিতে লাগিলেন।
অনন্তর দ্রোণাচার্য্য যুধিষ্ঠিরকে পরিত্যাগ করিয়া সরোষ-নয়নে বায়ব্যাস্ত্রদ্বারা দ্রুপদসেনাগণকে তাড়িত করিতে আরম্ভকরিলেন। পাঞ্চালগণ দ্রোণশরে নিপীড়িত হইয়া মহাত্মা অর্জুন ও ভীমসেনের সমক্ষেই ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল। তখন অর্জুন ও ভীমসেন সহসা প্রতিনিবৃত্ত হইয়া অসংখ্য রথদ্বারা অরিসৈন্যগণের অভিমুখীন হইলেন এবং অর্জুন দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ও ভীমসেন উত্তর পার্শ্বস্থ সেনা আক্রমণপূর্ব্বক শরাসনদ্বারা আচার্য্যকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় মহাতেজাঃ মৎস্য, সৃঞ্জয় ও পাঞ্চালগণ সাত্ত্বতদিগের সহিত অর্জুন ও ভীমসেনের অনুগমন করিল। হে মহারাজ! এইরূপে সেই অন্ধকারাবৃত নিদ্রাক্রান্ত কৌরবসেনাগণ মহাবীর ধনঞ্জয়কর্তৃক বিদীর্ণ হইতে লাগিল। মহাবীর দ্রোণ ও আপনার পুত্র দুর্য্যোধন কোনক্রমেই নিবারণ করিতে সমর্থ হইলেন না।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। মহাবীর দুর্য্যোধন পাণ্ডব-সৈন্যগণকে অতিশয় উদ্দীপ্ত অবলোকন ও তাহাদের বিক্রম নিতান্ত অসহ্য জ্ঞান করিয়া কর্ণকে কহিলেন, হে মিত্রবৎসল। এক্ষণে মিত্রকার্য্যের উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইয়াছে; অতএব তুমি অস্মৎপক্ষীয় সমস্ত যোধগণকে পরিত্রাণ কর। উহারা নিশ্বসন্ত ভীষণ ভুজঙ্গসদৃশ মহারথ পাঞ্চাল, কেকয়, মৎস্য ও পাণ্ডবগণে পরিবেষ্টিত হইয়াছে। ঐ ইন্দ্রতুল্য-পরাক্রম, জয়শালী, মহারথ, পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণ হৃষ্টচিত্তে সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতেছে।
কর্ণ দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণানন্তর কহিলেন, হে মহারাজ! আজি আমি পুরন্দর স্বয়ং অর্জুনের রক্ষার্থ সমাগত হইলেও তাঁহাকে পরাজয় করিয়া অর্জুনকে বিনাশ করিব, তুমি আশ্বস্ত হও। আমি সত্য বলিতেছি যে, আজি তোমার প্রিয়ানুষ্ঠানের নিমিত্ত সমাগত পাঞ্চাল ও পাণ্ডুতনয়গণকে বিনাশ করিয়া কার্তিকেয় ইন্দ্রকে যেরূপ বিজয় প্রদান করিয়াছিলেন, তদ্রূপ তোমাকে জয় প্রদান করিব। হে মহারাজ! মহাবীর ধনঞ্জয় সর্ব্বাপেক্ষা সমধিক বলবান্; অতএব তাহার প্রতি আজি সেই বাসবদত্ত অমোঘ শক্তি নিক্ষেপ করিব। মহাধনুর্দ্ধর অর্জুন নিহত হইলেই তাহার ভ্রাতৃগণ, হয় তোমার বশীভূত হইবে, না হয়, পুনরায় বনে গমন করিবে। হে কুরুকুলতিলক। আমি জীবিত থাকিতে তোমার বিষাদ করিবার প্রয়োজন নাই। আমি আজি পাণ্ডবগণের সহিত সমাগত পাঞ্চাল, কেকয় ও বৃষ্ণিগণকে সমরে পরাজয়পূর্ব্বক তাহাদিগকে শরনিকরে খণ্ড খণ্ড করিয়া তোমাকে পৃথিবী প্রদান করিব।
হে মহারাজ! মহাবাহু কৃপাচার্য্য কর্ণের বাক্য শ্রবণে গর্ব্বিতভাবে তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে সূতপুত্র! যদি তোমার বাক্যে কার্যসিদ্ধি হইত, তাহা হইলে তুমি থাকাতেই কুরুনাথ সনাথ হইতেন, সন্দেহ নাই। তুমি কুরুরাজ-সমীপে অনেকবার আত্মশ্লাঘা করিয়া থাক; কিন্তু কখনই তোমার পরাক্রম বা বীর্য্যের ফল কিছুই লক্ষিত হয় না। তুমি কতবার অর্জুনের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলে, কিন্তু কখনই জয়লাভকরিতে সমর্থ হও নাই। গন্ধর্ব্বগণ যখন রাজা দুর্য্যোধনকে হরণ করিতে প্রবৃত্ত হয় তখন সমস্ত সৈন্যগণ যুদ্ধ করিয়াছিল; কেবল তুমি একাকী সর্ব্বাগ্রে পলায়ন করিয়াছিলে। বিরাট নগরের যুদ্ধসময়ে সমস্ত কৌরবগণ পরাজিত হইলেও তুমি ভ্রাতৃগণের সহিত অর্জুনের নিকট পরাজিত হইয়াছিলে। হে সূতনন্দন। তুমি একমাত্র মহাবীর অর্জুনের সহিত যুদ্ধ করিতে অসমর্থ; তবে কিরূপে কৃষ্ণসহায় পাণ্ডবগণকে পরাজিত করিতে উৎসাহী হইতেছ? হে সূতপুত্র। আত্মশ্লাঘা না করিয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া বীর পুরুষের কর্তব্য; অতএব তুমি স্থির হইয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। তুমি শরৎকালীন মেঘের ন্যায় বৃথা গর্জন করিয়া আপনার অকৃতার্থতা প্রদর্শন করিতেছ; কিন্তু রাজা দুর্য্যোধন তাহা বুঝিতে সমর্থ হইতেছেন না। তুমি মহাবীর অর্জুনকে দৃষ্টিগোচর না করিতে এবং তাঁহার বাণের সম্মুখবর্তী না হইতেই মহাগর্জন করিয়া থাক, কিন্তু একবার ধনঞ্জয়ের শরে বিদ্ধ হইলে তোমার তর্জন-গর্জন অতি দুর্লভ হইয়া উঠে। ক্ষত্রিয়েরা বাহুবল, ব্রাহ্মণগণ বাজ্জাল এবং মহাবীর ধনঞ্জয় স্বীয় কাৰ্ম্মকদ্বারা বীরত্ব প্রকাশ করেন, কিন্তু তুমি কেবল কল্পিত মনোরথদ্বারাই শৌর্য্য প্রদর্শন করিয়া থাক। যে মহাবীর রুদ্রকে প্রীত করিয়াছেন, সেই অর্জুনকে প্রতিঘাত করা কাহার সাধ্য?
হে মহারাজ! বীরপ্রধান মহাবীর কর্ণ কৃপাচার্য্যের সেই সমুদায় বাক্য শ্রবণে নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে কৃপাচার্য্য! যথার্থ বীরপুরুষেরা বর্ষাকালীন জল-ধরের ন্যায় নিরন্তর গর্জন এবং ক্ষিতিরোপিত' বীজের ন্যায় আশু ফল প্রদান করিয়া থাকেন। সমরধুরন্ধর বীরগণের সমরাঙ্গনে আত্মশ্লাঘা করা আমার মতে কিছুমাত্র দোষাবহ নহে। যে ব্যক্তি যে ভারবহনে মনে মনে দৃঢ় যত্ন করে, দৈবই তাহার সেই বিষয়ে সাহায্য প্রদান করেন; আমি মনে যাহা কল্পনা করি, তাহা কার্য্যেও পরিণত করিয়া থাকি। হে বিপ্র! আমি যদি বৃষ্ণিগণের সহিত কৃষ্ণসহায় পাণ্ডবগণকে বিনাশ করিয়া গর্জন করি, তাহাতে তোমার কি ক্ষতি হইবে? দূরদর্শী বীরগণ শারদ জলধরের ন্যায় কখনই বৃথা গর্জন করেন না; তাঁহারা স্বীয় সামর্থ্যানুসারে গর্জন করিয়া থাকেন। হে গৌতম! আমি আজি রণে যত্নবান্ কৃষ্ণ ও ধনঞ্জয়কে পরাজিত করিতে সমর্থ হইব বলিয়াই গর্জন করিতেছি। তুমি অবিলম্বেই আমার গর্জনের ফল দর্শন করিবে। আমি আজি রণস্থলে কৃষ্ণসহায় পাণ্ডবতনয়দিগকে বৃষ্ণিগণের সহিত নিহত করিয়া দুর্য্যোধনকে নিষ্কণ্টক পৃথিবী প্রদান করিব।
কৃপাচার্য্য কহিলেন, হে কর্ণ। আমি তোমার এই স্বেচ্ছাকৃত প্রলাপ বাক্য গ্রাহ্য করি না। তুমি সতত কৃষ্ণ, অর্জুন ও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নিন্দাবাদ করিয়া থাক; দেবতা, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, মনুষ্য, উরগ ও পক্ষিগণের অজেয় অর্জুন ও বাসুদেব যাঁহাদের পক্ষ অবলম্বন করিয়াছেন, সেই পাণ্ডবগণের নিশ্চয়ই জয়লাভহইবে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণপ্রিয়, সত্যবাদী, বদান্য, সত্য-ধর্মনিরত, শিক্ষিতাস্ত্র, বুদ্ধিমান, কৃতজ্ঞ এবং পিতৃ ও দেবগণের অর্চ্চনায় নিরত। উঁহার ভ্রাতৃগণও মহাবল পরাক্রান্ত, সর্ব্বাস্ত্র-বিশারদ, ধর্মপরায়ণ, প্রাজ্ঞ, যশস্বী ও গুরুকার্য্য-সাধন-পরতন্ত্র। আর দেখ, ইন্দ্রসমবিক্রম, একান্ত অনুরক্ত মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, দুর্মুখপুত্র জনমেজয়, চন্দ্রসেন, রুদ্রসেন, কীর্ত্তিবর্মা, ধ্রুব, ধর, বসুচন্দ্র, দামচন্দ্র, সিংহচন্দ্র, সুতেজন, গজানীক, শ্রুতানীক, বীরভদ্র, সুদর্শন, শ্রুতধ্বজ, বলানীক, জয়ানীক, জয়প্রিয়, বিজয়, লব্ধলক্ষ্য, জয়াশ্ব, রথবাহন, চন্দ্রোদয়, কামরথ, সপুত্র বিরাট ও তাঁহার ভ্রাতৃসমুদায়, যমজ নকুল ও সহদেব, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, রাক্ষস ঘটোৎকচ, মহারাজ দ্রুপদ ও তাঁহার পুত্রগণ এবং অন্যান্য অনেক মহারথ সমরকার্য্যে তাঁহার সাহায্য করিতেছেন। অতএব উঁহার কিছুতেই ক্ষয় হইবে না। ভীম ও অর্জুন অস্ত্রবলে দেবতা, অসুর, মনুষ্য, যক্ষ, রাক্ষস, ভূত, ভুজঙ্গ ও কুঞ্জরে পরিপূর্ণ এই সমুদায় পৃথিবী নিঃশেষিত করিতেও অসমর্থ নহেন। ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরও রোষপ্রদীপ্ত কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া এই পৃথিবী দগ্ধ করিতে পারেন। হে সূতনন্দন! অমিত-পরাক্রম বাসুদেব যাঁহাদের সাহায্য দান করিবার নিমিত্ত বৰ্ম্ম পরিগ্রহ করিয়াছেন, তুমি তাঁহাদিগকে কিরূপে সমরে পরাজয় করিবে? তুমি যে কৃষ্ণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবার বাসনা করিতেছ, ইহা নিতান্ত অন্যায়।
হে মহারাজ! মহাবীর কর্ণ কৃপাচার্য্যকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া হাস্যমুখে তাঁহাকে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! তুমি পাণ্ডবগণকে লক্ষ্য করিয়া যে সমস্ত কথা কহিলে, সকলই সত্য; তাঁহাদিগের ঐ সমস্ত ও অন্যান্য বহুতর সদ্গুণ বিদ্যমান আছে সন্দেহ নাই। আর তাঁহারা যে, দেবগণসমবেত দেবরাজ ইন্দ্র বা সমুদায় দৈত্য, যক্ষ, গন্ধর্ব্ব, পিশাচ, উরগ ও রাক্ষসগণেরও অজেয়; তদ্বিষয়ে আমি অণুমাত্র সংশয় করি না। কিন্তু দেবরাজ আমাকে এই যে অমোঘ শক্তি প্রদান করিয়াছেন, আমি ইহার প্রভাবে পাণ্ডবগণকে পরাজয় করিতে পারি। এক্ষণে আমি তদ্দ্বারা অর্জুনকেই সংহার করিব। অর্জুন বিনষ্ট হইলে অবশিষ্ট পাণ্ডবেরা কদাচ জয়লাভপূর্ব্বক এই পৃথিবী উপভোগ করিতে সমর্থ হইবে না। তাহারা বিনষ্ট হইলে এই সসাগরা ধরণী অনায়াসেই কৌরবরাজ দুর্য্যোধনের বশবর্তিনী হইবে। হে আচার্য্য। সুনীতি বিস্তার করিলে সকল কার্য্যই সুসিদ্ধ হইয়া থাকে; এই নিমিত্তই আস্ফালন করিতেছি। তুমি ব্রাহ্মণ, বৃদ্ধ ও সংগ্রামকার্য্যে অনিপুণ; বিশেষতঃ পাণ্ডবগণের প্রতি তোমার সাতিশয় পক্ষপাত আছে; এই নিমিত্ত তুমি আমাকে এইরূপ অপমান করিতেছ। যাহা হউক, যদি তুমি পুনরায় আমার প্রতি ঐরূপ অপ্রিয় বাক্য প্রয়োগ কর, তাহা হইলে আমি খাদ্বারা তোমার জিহ্বা ছেদন করিব। হে নির্বোধ। তুমি কৌরবপক্ষীয় সেনাগণকে ভয় প্রদর্শনপূর্ব্বক পাণ্ডবদিগের স্তুতি করিতে বাসনা করিতেছ; অতএব এক্ষণে আমি যাহা বলিতেছি শ্রবণ কর। দুর্য্যোধন, দ্রোণাচার্য্য, শকুনি, দুর্মুখ, জয়, দুঃশাসন, বৃষসেন, মদ্ররাজ, সোমদত্ত, ভূরিশ্রবাঃ, অশ্বত্থামা, বিবিংশতি ও তুমি; তোমরা যে যুদ্ধে বর্তমান রহিয়াছ, তথায় বিপক্ষ ইন্দ্রতুল্য পরাক্রমশালী হইলেও কি জয়লাভ করিতে পারে? ঐ সমুদায় কৃতাস্ত্র, স্বর্গলিঙ্গু, ধর্মপরায়ণ, যুদ্ধপারগ, বীরগণ দেবগণকেও সমরে নিপাতিত করিতে পারেন; উঁহারা পাণ্ডবগণের নিধন ও কৌরবগণের বিজয়-কামনায় বৰ্ম্ম ধারণপূর্ব্বক রণক্ষেত্রে অবস্থিত রহিয়াছেন। যাহা হউক, বিক্রমসম্পন্ন ব্যক্তিগণের জয়লাভ দৈবায়ত্ত। দেখ, মহাবাহু ভীষ্মদেব শরশয্যায় শয়ন করিয়াছেন এবং সমধিক বলসম্পন্ন দেবগণেরও দুর্জয় মহাবীর বিকর্ণ, চিত্রসেন, বাহ্লীক, জয়দ্রথ, ভূরিশ্রবাঃ, জয়, জলসন্ধ, সুদক্ষিণ, রথিশ্রেষ্ঠ শল, বীর্য্যবান্ ভগদত্ত এবং অন্যান্য অসংখ্য মহাবীর সমরে পাণ্ডবগণের হস্তে নিহত হইয়াছেন। অতএব নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, দৈবপ্রতিকূলতাই এই বিনাশের মূল কারণ। হে পুরুষাধম! তুমি যে নিরন্তর দুর্যোধনরিপু পাণ্ডবগণকে স্তব করিতেছ, তাহাদিগেরও ত সহস্র সহস্র বীরপুরুষ নিহত হইয়াছে। পাণ্ডব ও কৌরব এই উভয় পক্ষীয় সেনা ক্ষয় প্রাপ্ত হইতেছে। হে নরাধম! তুমি পাণ্ডবগণকে সতত বলবান্ বলিয়া জ্ঞান কর; কিন্তু আমি তাহাদের কিছুমাত্র প্রভাব দেখিতে পাই না। যাহা হউক, আমি দুর্য্যোধনের হিতার্থ পাণ্ডবগণের সহিত যুদ্ধ করিতে যথাশক্তি যত্ন করিব; কিন্তু জয়লাভ দৈবায়ত্ত।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর মহাবীর অশ্বত্থামা সূতপুত্রকে মাতুল কৃপাচার্য্যের প্রতি এইরূপ কঠোর বাক্য প্রয়োগ করিতে দেখিয়া ক্রোধাবিষ্টচিত্ত সিংহ যেমন মত্তমাতঙ্গের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ কুরুরাজ দুর্য্যোধনের সমক্ষেই অসি নিষ্কাশনপূর্ব্বক কর্ণের প্রতি ধাবমান হইয়া কহিলেন, রে নরাধম! মহাত্মা কৃপাচার্য্য অর্জুনের প্রকৃত গুণসকল কীর্তন করিতেছিলেন; কিন্তু তুমি বিদ্বেষবুদ্ধিপ্রভাবে ইঁহার ভর্ৎসনায় প্রবৃত্ত হইয়াছ। রে মূঢ়। তুমি অহঙ্কারপরতন্ত্র হইয়া কিছুই লক্ষ্য করিতেছ না এবং ধনুর্দ্ধরদিগের সমক্ষে আপনার বলবীর্য্যের শ্লাঘা করিতেছ। যখন মহাবীর অর্জুন তোমাকে পরাজয় করিয়া তোমার সমক্ষেই জয়দ্রথকে বিনাশ করিলেন, তৎকালে তোমার এই বীর্য্য ও অস্ত্রসমুদায় কোথায় ছিল? হে সূতকুলাঙ্গার! যিনি পূর্ব্বে স্বয়ং মহাদেবের সহিত সংগ্রাম করিয়াছিলেন, তুমি সেই অর্জুনকে পরাজয় করিবার নিমিত্ত কেন মনে মনে বৃথা কল্পনা করিতেছ? সুররাজসনাথ সমুদায় দেব ও অসুরগণ কৃষ্ণসহায় অর্জুনকে পরাজয় করিতে সমর্থ হন নাই। তুমি সেই অপরাজিত অদ্বিতীয় বীরকে এই সমস্ত ভূপালগণের সহিত কিরূপে পরাজয় করিতে পারিবে? হে দুর্ব্বদ্ধে! এক্ষণে তুমি এই স্থানে অবস্থান করিয়া আমার বলবীর্য্য অবলোকন কর। আমি অদ্য তোমার মস্তক ছেদন করিব। অশ্বত্থামা এই বলিয়া মহাবেগে তাঁহার শিরশ্ছেদনে সমুদ্যত হইলেন। তদ্দর্শনে কুরুরাজ দুর্য্যোধন ও কৃপাচার্য্য তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন।
তখন কর্ণ দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে রাজন! ঐ ব্রাহ্মণাধম নিতান্ত দুর্ব্বব্বুদ্ধিপরতন্ত্র ও সমরশ্লাঘী; তুমি উহাকে পরিত্যাগ কর। এই দুরাত্মা এক্ষণে আমার ভুজবীর্য্যদর্শন করুক। অশ্বত্থামা কর্ণের বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে কহিলেন, রে সূতপুত্র! আমি তোমাকে ক্ষমা করিলাম; কিন্তু মহাবীর অর্জুন তোমার এই দর্প চূর্ণ করিবেন। তখন দুর্য্যোধন কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! আপনি প্রসন্ন হইয়া ক্ষমা করুন; সূতপুত্রের প্রতি কোপ প্রদর্শন করা আপনার কর্তব্য নহে। আপনাকে এবং কৃপ, কর্ণ,দ্রোণ, মদ্ররাজ ও শকুনিকে অতি গুরুতর কার্যভার বহন করিতে হইবে। ঐ দেখুন, পাণ্ডবগণ কর্ণের সহিত যুদ্ধ করিবার বাসনায় স্পর্দ্ধা প্রকাশপূর্ব্বক আমাদিগের অভিমুখীন হইতেছে।
হে মহারাজ। রাজা দুর্য্যোধন মনস্বী অশ্বত্থামাকে এইরূপে প্রসন্ন করিলে দ্রোণতনয় ক্রোধাবেগ সংবরণ করিলেন। তখন শান্তস্বভাব কৃপাচার্য্য অবিলম্বে মৃদুভাব অবলম্বনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সূতনন্দন! এক্ষণে আমরা তোমাকে ক্ষমা করিলাম, কিন্তু মহাবীর অর্জুন তোমার এই দর্প চূর্ণ করিবেন, সন্দেহ নাই।
হে মহারাজ! অনন্তর সেই যশস্বী পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ মিলিত হইয়া বারংবার তর্জন করত আগমন করিতে আরম্ভকরিলেন। তখন রথিপ্রধান তেজস্বী কর্ণও দেবগণ-পরিবৃত দেবরাজের ন্যায় কৌরবগণে পরিবেষ্টিত হইয়া স্বীয় বাহুবল অবলম্বনপূর্ব্বক অবস্থান করিতে লাগিলেন। অনন্তর পাণ্ডব-দিগের সহিত কর্ণের ভীষণ সংগ্রাম সমুপস্থিত হইল। যশস্বী পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ কর্ণকে নিরীক্ষণ করিয়া কেহ কেহ এই কর্ণ, কেহ কেহ কর্ণ কোথায় এবং কেহ কেহ ওরে দুরাত্মন্ সূতনন্দন! রণস্থলে অবস্থানপূর্ব্বক আমাদিগের সহিত যুদ্ধ কর্, এই বলিয়া উচ্চস্বরে শব্দ করিতে আরম্ভ করিলেন। অন্যান্য যোধগণ কর্ণকে অবলোকনপূর্ব্বক রোেষকষায়িতলোচনে কহিতে লাগিলেন যে, যাবতীয় নৃপসত্তমগণ ঐ অল্পবুদ্ধি গর্বিতচিত্ত সূতপুত্রকে সংহার করুন। উঁহার জীবনে কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। ঐ পাপাত্মা পাণ্ডবগণের অত্যন্ত বিপক্ষ, দুর্য্যোধনের হিতৈষী ও সকল অনর্থের মূল; অতএব উহার প্রাণ সংহার কর। পাণ্ডবপ্রেরিত মহারথ ক্ষত্রিয়গণ এই কথা কহিতে কহিতে কর্ণ বিনাশার্থ ধাবমান হইয়া অসংখ্য শরবর্ষণে চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছাদিত করিতে লাগিলেন। সংগ্রামবিজয়ী লঘুহস্ত বলবান্ সূতনন্দন সেই কালান্তক যমোেপম অদ্ভুত সৈন্যসাগর ও মহাবল পরাক্রান্ত পাণ্ডবগণকে অবলোকন করিয়া কিছুমাত্র ব্যথিত বা শঙ্কিত হইলেন না; প্রত্যুত শর বর্ষণপূর্ব্বক অরাতিসৈন্যগণকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন পাণ্ডবপক্ষীয় যোধগণ শরবর্ষণ ও শরাসন কম্পনপূর্ব্বক পূর্ব্বে দানবগণ যেমন দেবরাজের সহিত সংগ্রাম করিয়াছিল, তদ্রূপ কর্ণের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণ অসংখ্য শর বর্ষণপূর্ব্বক সেই ভূপালগণনির্মুক্ত শরজাল ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় সূতপুত্র এরূপ অদ্ভুত হস্তলাঘব প্রদর্শন করিতে লাগিলেন যে, বিপক্ষবর্গ সমরে যত্নবান্ হইয়াও তাঁহাকে আক্রমণ করিতে সমর্থ হইল না।
এইরূপে মহাবীর কর্ণ নৃপগণের শরসমূহ নিরাকৃত করিয়া তাঁহাদের যুগকাষ্ঠ, ঈষা, ছত্র, ধ্বজ ও ঘোটকসমুদায়ের উপর স্বনামাঙ্কিত নিশিত শরনিকর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তখন কর্ণশরনিপীড়িত ভূপালগণ ব্যাকুলচিত্তে শীতাদিত গোসমূহের ন্যায় ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিলেন। বিপক্ষ পক্ষীয় অসংখ্য অশ্বসকল, গজ ও রথী কর্ণের শরে নিপীড়িত হইতে লাগিল। সমরে অপরাজুখ শূরগণের চতুদ্দিকে বিকীর্ণ মস্তকসমুদায়ে রণভূমি সমাচ্ছন্ন হইল। যোধগণ ইতস্ততঃ নিহত, হন্যমান ও রোরুদ্যমান হওয়াতে সমরক্ষেত্র অতি ভীষণ যমালয়ের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। ঐ সময় মহারাজ দুর্য্যোধন কর্ণের পরাক্রম দেখিয়া অশ্বত্থামাকে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! ঐ দেখুন, মহাবীর কর্ণ বৰ্ম্ম ধারণপূর্ব্বক বিপক্ষ পক্ষীয় সমস্ত ভূপতিগণের সহিত যুদ্ধ করিতেছেন। পাণ্ডবসেনাগণ কর্ণবাণে নিপীড়িত হইয়া পলায়ন করিতেছে। ঐ দেখুন, অর্জুন স্বীয় সৈন্যগণকে কার্তিকেয়নির্জিত অসুরসেনার ন্যায় কর্ণশরে নিজ্জিত দেখিয়া সূতপুত্রের বিনাশার্থ ধাবমান হইতেছে। অতএব যাহাতে ধনঞ্জয় যোধগণের সমক্ষে তাঁহাকে সংহার করিতে না পারে, আপনি এরূপ উপায় অবলম্বন করুন। দুর্য্যোধন অশ্বত্থামাকে এই কথা বলিলে অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য্য, শল্য ও হাৰ্দ্দিক্য দৈত্যসেনাভিমুখীন দেবরাজের ন্যায় অর্জুনকে আগমন করিতে দেখিয়া সূতপুত্রের রক্ষার্থ তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় পাঞ্চালগণ পরিবৃত হইয়া পুরন্দর বৃত্রাসুরের প্রতি যেরূপ ধাবমান হইয়াছিলেন, তদ্রূপ কর্ণের অভিমুখে গমন করিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! সূর্য্যতনয় মহারথ কর্ণ প্রতিনিয়ত অর্জুনের সহিত স্পর্ধা ও তাহাকে পরাজিত করিতে বাসনা করিয়া থাকে। এক্ষণে সেই জাতিবৈর কালান্তক যমসদৃশ ক্রুদ্ধ মহাবীর ধনঞ্জয়কে সহসা অবলোকন করিয়া কি করিল?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! গজ যেমন প্রতিগজের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ মহাবীর কর্ণ ধনঞ্জয়কে ক্রমাগত সন্দর্শন করিয়া তাঁহার প্রতি গমন করিলেন। মহাবীর অর্জুন সেই মহাবেগে সমাগত সূতপুত্রকে সুবর্ণপুঙ্খ সরল শরসমুদায়ে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। মহাবাহু কর্ণ তদ্দর্শনে সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া সত্বর তিন শরে অর্জুনকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় কর্ণের হস্তলাঘব সহ্য করিতে না পারিয়া তাঁহার উপর ত্রিংশৎ শাণিত শর নিক্ষেপপূর্ব্বক ক্রোধভরে এক নারাচে তাঁহার বাম হস্তের অগ্রভাগ বিদ্ধ করিলেন। ধনঞ্জয়ের ভীষণ নারাচের আঘাতে কর্ণের হস্ত হইতে সহসা কাৰ্ম্মক নিপতিত হইল। মহাবল পরাক্রান্ত সূতপুত্র তৎক্ষণাৎ সেই কোদণ্ড গ্রহণপূর্ব্বক হস্তলাঘব প্রদর্শন করিয়া নিমেষমধ্যে অর্জুনকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিলেন। মহাবীর ধনঞ্জয় তদ্দর্শনে হাস্য করত শরনিকর নিক্ষেপপূর্ব্বক কর্ণপরিত্যক্ত শরজাল ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে সেই পরস্পর প্রতীকার-পরায়ণ বীরদ্বয় শরজালে চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছন্ন করিলেন। করিণীর নিমিত্ত বন্য মাতঙ্গদ্বয়ের যেরূপ যুদ্ধ হইয়া থাকে, তৎকালে কর্ণ ও অর্জুনের তদ্রূপ ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল।
অনন্তর মহাধনুর্দ্ধর ধনঞ্জয় সূতপুত্রের পরাক্রম অবলোকন করিয়া সত্বর তাঁহার করস্থিত কাৰ্ম্মকের মুষ্টিদেশ ছেদন ও ভল্লাস্ত্রে চারি অশ্বকে শমনসদনে প্রেরণপূর্ব্বক সারথির মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে মহাবীর কর্ণ অশ্ব, সারথি ও কার্মুকবিহীন হইলে ধনঞ্জয় তাঁহাকে চারি বাণে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর কর্ণ অর্জুনশরে বিদ্ধ হইয়া শল্পকীর' ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন এবং জীবিত-রক্ষার্থ সত্বর সেই অশ্বহীন রথ হইতে অবরোহণপূর্ব্বক কৃপাচার্য্যের রথে সমারূঢ় হইলেন। তখন অর্জুনশরে ক্ষত-বিক্ষতাঙ্গ কৌরবপক্ষীয় সৈন্যগণ সূতপুত্রকে পরাজিত দেখিয়া চারিদিকে পলায়ন করিতে লাগিল। রাজা দুর্য্যোধন তাঁহাদিগকে পলায়ন-পরায়ণ অবলোকন করিয়া নিবারণ করত কহিতে লাগিলেন, হে ক্ষত্রিয়প্রধান বীরগণ। তোমাদের পলায়ন করিবার প্রয়োজন নাই; এই আমি স্বয়ং অর্জুনের বধার্থ সমরাঙ্গনে গমন করিতেছি। আমি অবিলম্বেই অর্জুনকে পাঞ্চালগণের সহিত বিনাশ করিব। আজি আমি গাণ্ডীবধন্বার সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইলে অন্যান্য পাণ্ডবগণ যুগান্তকালের ন্যায় আমার বিক্রম দর্শন করিবে। আমার শরনিকর শলভশ্রেণীর ন্যায় তাঁহাদের দৃষ্টিগোচর হইবে। আজি আমি শরজাল বিস্তার করিতে আরম্ভ করিলে আমার সৈনিক পুরুষেরা বর্ষাকালীন জলধরনির্মুক্ত জলধারার ন্যায় আমার শরধারা সন্দর্শন করিবে। হে বীরগণ! তোমরা অর্জুন হইতে ভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক রণস্থলে অবস্থান কর। আমি আজিই সন্নতপর্ব্ব সায়কনিচয়দ্বারা তাহাদিগকে পরাজয় করিব। মকরাকুল মহার্ণব যেমন তীরভূমি অতিক্রমণে অসমর্থ, তদ্রূপ ধনঞ্জয় আজি আমার পরাক্রম সহ্য করিতে পারিবে না। হে মহারাজ। রাজা দুর্য্যোধন এই কথা বলিয়া অসংখ্য সৈন্য পরিবৃত হইয়া রোষকযায়িত-লোচনে অর্জুনের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন মহাত্মা কৃপাচার্য্য মহাবাহু দুর্য্যোধনকে যুদ্ধে গমন করিতে দেখিয়া অশ্বত্থামাকে কহিলেন, হে দ্রোণনন্দন। ঐ দেখ, রাজা দুর্য্যোধন ক্রোধান্ধ হইয়া পতঙ্গবৃত্তি অবলম্বন-পূর্ব্বক যুদ্ধার্থ অর্জুনের নিকট গমন করিতেছেন। উঁহাকে শীঘ্র নিবারণ কর, নচেৎ উনি আমাদের সমক্ষে অর্জুনের শরে বিনষ্ট হইবেন। উনি যে পর্যন্ত অর্জুন-শরনিকরের পথবর্তী না হইবেন, সেই অবধিই রণস্থলে জীবিত থাকিতে পারিবেন। অতএব উনি নির্মোক-নির্মুক্ত ভীষণ ভুজঙ্গসদৃশ অর্জুনশরে ভস্মীভূত হইতে না হইতেই উঁহাকে যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত কর। হে মহাত্মন্! আমরা উপস্থিত থাকিতে দুর্য্যোধনের অসহায়ের ন্যায় স্বয়ং যুদ্ধার্থ গমন করা কোনক্রমেই উপযুক্ত নহে। বিশেষতঃ দুর্য্যোধন শার্দুলের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইলে উঁহার জীবন রক্ষা করা অতিশয় সুকঠিন হইবে।
হে মহারাজ! অস্ত্রবিশারদ অশ্বত্থামা মাতুলের বাক্য শ্রবণানন্তর সত্বর রাজা দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে গান্ধারীপুত্র! আমি সতত তোমার হিতানুষ্ঠানে যত্ন করিয়া থাকি। অতএব আমি জীবিত থাকিতে আমাকে অনাদর করিয়া স্বয়ং যুদ্ধে গমন করা তোমার উচিত হইতেছে না। হে দুর্য্যোধন! অর্জুনের পরাজয় নিমিত্ত তোমায় কিছুমাত্র ব্যস্ত হইতে হইবে না। তুমি এই স্থানে অবস্থান কর; এক্ষণে আমি ধনঞ্জয়কে নিবারণ করিতেছি।
দুর্য্যোধন কহিলেন, হে ব্রহ্মন্। আচার্য্য পাণ্ডবগণকে সুতনির্বিশেষে রক্ষা করিয়া থাকেন এবং আপনিও প্রতিনিয়ত তাহাদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেন। এক্ষণে আমার দুরদৃষ্ট-বশতঃই হউক বা যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর প্রিয়ানুষ্ঠান করিবার নিমিত্তই হউক, রণস্থলে আপনার পরাক্রম খর্ব্ব হইয়া থাকে। আমি অতিশয় লুব্ধস্বভাব! আমাকে ধিক্! বান্ধবগণ আমার সুখলাভের নিমিত্তই পরাজিত ও সাতিশয় দুঃখপ্রাপ্ত হইতেছেন। যাহা হউক, হে ব্রহ্মন্! আপনি ব্যতিরেকে মহেশ্বরসম মহাবল পরাক্রান্ত শস্ত্রবিদগ্রগণ্য অন্য কোন্ বীর সমর্থ হইয়াও বিপক্ষ-গণের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে? হে গুরুপুত্র! এক্ষণে আপনি প্রসন্ন হইয়া আমার শত্রুবিনাশে প্রবৃত্ত হউন। দেবদানবগণও আপনার অস্ত্রের নিকট অবস্থান করিতে সমর্থ হয় না। অতএব আপনি অনুচরবর্গের সহিত সোমক ও পাঞ্চালগণকে সংহার করুন। পশ্চাৎ আমরা আপনারই ভুজবলে পরিরক্ষিত হইয়া অবশিষ্ট শত্রুগণকে বিনষ্ট করিব। ঐ দেখুন, সোমক ও পাঞ্চালগণ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া দাবানলের ন্যায় আমার সৈন্যমধ্যে বিচরণ করিতেছে। অতএব আপনি উহাদিগকে এবং কেকয়-গণকে নিবারণ করুন। নচেৎ উহারা ধনঞ্জয়কর্তৃক রক্ষিত হইয়া আমাদিগকে নিঃশেষিত করিবে। হে ব্রহ্মন্! আপনি অবিলম্বেই উহাদিগকে বিনাশ করুন। এই কার্য্য এক্ষণেই হউক বা পরেই হউক, আপনাকেই সাধন করিতে হইবে। সাধুসিদ্ধগণ কহিয়া থাকেন যে, আপনি পাঞ্চালগণকে বিনাশ করিবার নিমিত্তই উৎপন্ন হইয়াছেন; আপনার প্রভাবে সমগ্র পৃথিবী পাঞ্চালশূন্য হইবে। হে ব্রহ্মন্! সিদ্ধ পুরুষদিগের বাক্য কদাচ মিথ্যা হইবার নহে; অতএব আপনি অনুচরগণ-সমবেত পাঞ্চালগণকে সংহার করুন। পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণের কথা দূরে থাকুক, অমরগণ আপনার অস্ত্রগোচরে অবস্থান করিতে সমর্থ নহেন। হে পুরুষ-প্রবর! আমি সত্য কহিতেছি যে, সোমক ও পাণ্ডবেরা বল প্রকাশপূর্ব্বক আপনার সহিত যুদ্ধ করিতে কদাচ সমর্থ হইবে না। এক্ষণে আপনি গমন করুন। আর কালবিলম্ব করিবেন না। ঐ দেখুন, আমার সৈন্যগণ ধনঞ্জয়ের শরজালে একান্ত নিপীড়িত হইয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইতেছে। হে আচার্য্যকুমার! আপনি স্বীয় দিব্য তেজঃপ্রভাবে পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণের নিগ্রহ করিতে সমর্থ হইবেন, সন্দেহ নাই।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! যুদ্ধদুৰ্ম্মদ দ্রোণনন্দন অশ্বত্থামা দুর্য্যোধনকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া দেবরাজ দৈত্যবধে যেরূপ যত্ন করিয়াছিলেন, তদ্রূপ অরাতিনিপাতনে যত্নবান্ হইলেন এবং আপনার পুত্র মহাবীর দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে মহাবাহো! পাণ্ডবেরা যে আমার ও পিতার নিতান্ত প্রিয় এবং আমরা পিতাপুত্রেও যে তাহাদিগের প্রীতিভাজন, তাহার সন্দেহ নাই; কিন্তু সংগ্রাম সময়ে সেরূপ হওয়া নিতান্ত অসম্ভব। আমি কর্ণ, শল্য, কূপ ও হার্দিক্যের সহিত মিলিত হইয়া নিঃশঙ্কচিত্তে প্রাণপণে যুদ্ধ করত নিমেষমধ্যে পাণ্ডবসেনা-গণকে সংহার করিতে পারি। আর যদি আমরা সংগ্রামে উপস্থিত হইয়া না থাকি, তাহা হইলে পাণ্ডবগণও নিমেষমধ্যে কৌরবসেনা নিঃশেষিত করিতে পারে; কিন্তু আমরা উভয় পক্ষেই সাধ্যানুসারে যুদ্ধ করিতেছি বলিয়া পরস্পরের তেজঃপ্রভাবে পরস্পরের তেজঃ প্রশমিত হইতেছে। যাহা হউক, আমি নিশ্চয় কহিতেছি, পাণ্ডবগণ জীবিত থাকিতে বলপূর্ব্বক বিপক্ষসেনা পরাজিত করা নিতান্ত দুঃসাধ্য। বলবীর্য্যশালী পাণ্ডুপুত্রগণ আপনাদের নিমিত্ত যুদ্ধ করিতেছে, অতএব তাহারা কেন না তোমার সৈন্যগণকে বিনষ্ট করিবে? তুমি নিতান্ত লুব্ধ, নিকৃতিপরতন্ত্র, সর্ব্ববিষয়ে শঙ্কিত, অভিমানী ও পাপাত্মা; এই নিমিত্তই সতত আমাদিগের প্রতি আশঙ্কা করিয়া থাক। যাহা হউক, আমি জীবিতাশা পরিত্যাগপূর্ব্বক যত্নবান্ হইয়া তোমার নিমিত্ত সংগ্রামে গমন করিতেছি। অদ্য আমি তোমার হিতসাধনার্থ পাঞ্চাল, সোমক, কৈকয় ও পাণ্ডবগণের সহিত যুদ্ধ করিয়া অনেক শত্রুর প্রাণসংহার করিব। অদ্য চেদি, পাঞ্চাল ও সোমকগণ আমার শরে দগ্ধ হইয়া সিংহাদ্দিত গোসমূহের ন্যায় চতুৰ্দ্দিকে ধাবমান হইবে। অদ্য আমি সংগ্রামে এরূপ পরাক্রম প্রকাশ করিব যে, ধৰ্ম্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠির ও সোমকগণ ইহলোক দ্রোণপুত্রময় অবলোকন করিবে। ধৰ্ম্মনন্দন পাঞ্চাল ও সোমকগণকে আমার বাণে সংগ্রামে নিহত দেখিয়া যাহার পর নাই বিষণ্ণ হইবে। ফলতঃ অদ্য যে যে বীর আমার সহিত সংগ্রামে সমাগত হইবে, তাহাদের সকলকে সংহার করিব; তাহারা কদাচ আমার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবে না।
হে মহারাজ! মহাবাহু অশ্বত্থামা আপনার পুত্র দুর্য্যোধনকে এইরূপ কহিয়া তাঁহার হিতের নিমিত্ত ধনুর্দ্ধরদিগকে বিদ্রাবণ'-পূর্ব্বক রণক্ষেত্রে আগমন করিতে লাগিলেন এবং কৈকয় ও পাঞ্চালগণকে কহিলেন, হে মহারথগণ! তোমরা স্থিরচিত্তে যুদ্ধ করত হস্তলাঘব প্রদর্শনপূর্ব্বক আমাকে প্রহার কর। বীরগণ দ্রোণপুত্রকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া বারিধারাবর্ষী জলধরের ন্যায় সকলেই তাঁহার উপর শরবৃষ্টি করিতে লাগিল। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা ধৃষ্টদ্যুম্ন ও পাণ্ডুতনয়দিগের সমক্ষেই তাহাদিগকে শরনিকরে নিপীড়িত করিয়া তাহাদের দশ জনকে ভূমিসাৎ করিলেন। পাঞ্চাল ও সোমকগণ অশ্বত্থামার শরে তাড়িত হইয়া তাঁহাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক চারিদিকে পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন তাহাদিগকে পলায়ন করিতে দেখিয়া মেঘগম্ভীরনিস্বন, সুবর্ণালঙ্কারভূষিত, সমরে অপরাজুখ একশত রথারোহী সৈন্যে পরিবেষ্টিত হইয়া দ্রোণপুত্রের প্রতি গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, হে নির্বোধ আচার্য্য-পুত্র। সামান্য যোধগণকে বিনাশ করিলে কি হইবে? যদি বীরপুরুষ হও, তবে আমার সহিত যুদ্ধ আরম্ভ কর, আমি অবিলম্বেই তোমার প্রাণসংহার করিব; তুমি ক্ষণকাল অবস্থান কর। প্রবল প্রতাপশালী ধৃষ্টদ্যুম্ন এই বলিয়া অশ্বত্থামার প্রতি মর্মভেদী সুতীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপ করিলেন। মধুলোলুপ ভ্রমরগণ যেমন শ্রেণীবদ্ধ হইয়া পুষ্পিত বৃক্ষে গমন করে, তদ্রূপ সেই ধৃষ্টদ্যুম্ন-নিক্ষিপ্ত সুবর্ণপুঙ্খ শরসকল শ্রেণীবদ্ধ হইয়া অশ্বত্থামার শরীরে প্রবেশ করিল। তখন শরপাণি মহাবীর দ্রোণপুত্র এইরূপে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া পদাহত পন্নগের ন্যায় ক্রোধভরে অসম্ভ্রান্তচিত্তে কহিতে লাগিলেন, হে ধৃষ্টদ্যুম্ন। তুমি স্থির হইয়া মুহূর্ত্তকাল অপেক্ষা কর; আমি অবিলম্বেই নারাচদ্বারা তোমাকে যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিব।
অরাতিনিপাতন অশ্বত্থামা ধৃষ্টদ্যুম্নকে এইরূপ কহিয়া তাঁহাকে একেবারে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিলেন। যুদ্ধদুৰ্ম্মদ পাঞ্চালতনয় দ্রোণপুত্রের শরনিকরে এইরূপ সমাচ্ছন্ন হইয়া তাঁহাকে তর্জন করত কহিলেন, হে, বিপ্রতনয়! তুমি আমার প্রতিজ্ঞা ও উৎপত্তির বিষয় বিশেষ অবগত নহ। আমি অগ্রে দ্রোণকে নিহত করিয়া পশ্চাৎ তোমাকে বিনাশ করিব বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছি; তন্নিমিত্ত দ্রোণ জীবিত থাকিতে তোমাকে বিনাশ করিলাম না। আমার অভিপ্রায় এই যে, এই রজনী সুপ্রভাত হইলে অগ্রে তোমার পিতাকে বিনাশ করিয়া পশ্চাৎ তোমাকে শমনসদনে প্রেরণ করিব; অতএব এই সময়ে স্থিরচিত্তে পাণ্ডবগণের প্রতি বিদ্বেষবুদ্ধি ও কৌরবগণের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন কর। তুমি জীবিত থাকিতে কখনই আমার নিকট পরিত্রাণ পাইবে না। হে নরাধম। যে ব্রাহ্মণ ব্রহ্মানুষ্ঠান’ পরিত্যাগপূর্ব্বক ক্ষাত্রধৰ্ম্মানুষ্ঠানে তৎপর হয়, তোমার ন্যায় সে ক্ষত্রিয়েরই বধ্য হইয়া থাকে।
হে মহারাজ! ধৃষ্টদ্যুম্ন এইরূপে কটুবাক্য প্রয়োগ করিলে, দ্বিজোত্তম অশ্বত্থামা তাঁহাকে "তিষ্ঠ তিষ্ঠ” বলিয়া ক্রোধারুণ-লোচনে দগ্ধ করতই যেন, ভীষণ ভুজঙ্গের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। পাঞ্চালসেনা-পরিবৃত মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণপুত্রের শরনিপাতে নিপীড়িত হইয়া কিছুমাত্র কম্পিত হইলেন না; প্রত্যুত স্বীয় ভুজবল অবলম্বন করিয়া অশ্বত্থামার উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে সেই রোষপরায়ণ মহাধনুর্দ্ধর বীরদ্বয় প্রাণপণে পরস্পর পরস্পরের শরসন্নিপাত নিবারণ ও চারিদিকে বাণবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিলেন। সিদ্ধচারণ প্রভৃতি আকাশগামিগণ অশ্বত্থামা ও ধৃষ্টদ্যুম্নের এইরূপ ঘোরতর ভয়ানক যুদ্ধ দর্শন করিয়া তাঁহাদের প্রশংসা করিতে লাগিলেন। তখন সেই পরস্পরবধার্থী বিকট-বেশ বীরদ্বয় শরনিকরে দশ দিক্ সমাচ্ছন্ন করিয়া অলক্ষিতরূপে অতি সুন্দর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তৎকালে বোধ হইল যেন, তাঁহারা কাৰ্ম্মক মণ্ডলীকৃত করিয়া নৃত্য করিতেছেন। এইরূপে তাঁহারা পরস্পর বধে কৃতসঙ্কল্প হইয়া অত্যাশ্চর্য্য ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। যোধগণ তাঁহাদিগকে অরণ্যমধ্যস্থ মাতঙ্গদ্বয়ের ন্যায় যুদ্ধে প্রবৃত্ত দেখিয়া সবিশেষ প্রশংসা করিতে আরম্ভ করিলেন। হে মহারাজ! সেই ভীরুজনের ভয়জনক তুমুল যুদ্ধকালে উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণ একান্ত হৃষ্ট হইয়া সিংহনাদ পরিত্যাগ, শঙ্খধ্বনি ও নানাবিধ বাদ্য বাদন করিতে লাগিলেন। ঐ যুদ্ধে কিয়ৎক্ষণ কাহারও জয় পরাজয় লক্ষিত হইল না।
অনন্তর মহাবীর অশ্বত্থামা মহাত্মা ধৃষ্টদ্যুম্নের কোদণ্ড, ধ্বজদণ্ড, ছত্র, অশ্বচতুষ্টয়, পার্শ্বরক্ষকদ্বয় ও সারথিকে ছেদন করিয়া সন্নতপর্ব্ব শরনিকর বিস্তারপূর্ব্বক সহস্র সহস্র পাঞ্চাল-সৈন্য বিদ্রাবিত করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবসৈন্যগণ দেবরাজ ইন্দ্রের ন্যায় অশ্বত্থামার সেই অদ্ভুত কার্য্য নিরীক্ষণ করিয়া একান্ত ব্যথিত হইল। তখন অশ্বত্থামা এককালে এক এক শত শরে এক এক শত পাঞ্চালকে ও সুশাণিত তিন তিন শরে তিন তিন মহাবীরকে সংহার করত ধৃষ্টদ্যুম্ন ও অর্জুনের সমক্ষেই বহুসংখ্যক পাঞ্চালকে বিনাশ করিলেন। ঘোরতর যুদ্ধে অভিনিবিষ্ট পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ অশ্বত্থামার শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া তাঁহাকে পরিত্যাগপূর্ব্বক ইতস্ততঃ ধাবমান হইল। তাঁহাদিগের রথ-ধ্বজসমুদায় ইতস্ততঃ নিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল।
হে মহারাজ! এইরূপে মহারথ অশ্বত্থামা শত্রুগণকে পরাজয় করিয়া বর্ষাকালীন নীরদের ন্যায় গভীর গর্জন করিতে আরম্ভ করিলেন। হুতাশন যেমন যুগান্তকালে ভূতসমুদায়কে ভস্মসাৎ করিয়া থাকে, তদ্রূপ দ্রোণপুত্র বহুসংখ্যক বীরগণকে সংহার করিয়া ফেলিলেন। তখন কৌরবগণ সেই অরাতিনিপাতন সুররাজসদৃশ দ্রোণপুত্রকে যথোচিত প্রশংসা করিতে লাগিলেন। একষষ্ট্যধিকশততম অধ্যায়।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর ধর্ম্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠির ও ভীম অশ্বত্থামাকে পরিবেষ্টন করিলেন। তদ্দর্শনে রাজা দুর্য্যোধন দ্রোণাচার্য্যের সহিত পাণ্ডবগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন উভয় পক্ষে ভীরুজনের ভয়বর্দ্ধন ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। রাজা যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হইয়া অন্বষ্ঠ, মালব, বঙ্গ, শিবি ও ত্রিগত্তদিগকে যমসদনে প্রেরণ করিলেন। মহাবীর ভীম যুদ্ধদুৰ্ম্মদ অভীষাহ ও শূরসেনদিগকে শরনিকরে ছেদন করিয়া রুধিরধারায় ধরাতল কদমময় করিতে লাগিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ধনঞ্জয় যৌধেয়, অদ্রিজ, মদ্রক ও মালবদিগকে যমালয়ে প্রেরণ করিলেন। দ্বিরদগণ বেগগামী নারাচনিকরে সমাহত হইয়া দ্বিশৃঙ্গ পর্ব্বতের ন্যায় ভূতলে নিপতিত হইল। করিশুশুসকল খণ্ড খণ্ড ও ইতস্ততঃ বিলুণ্ঠমান হওয়াতে সমরভূমি জঙ্গম' ভুজঙ্গসমুদায়ে পরিবৃত বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। কনকচিত্রিত ছত্রসকল চারিদিকে বিক্ষিপ্ত হওয়াতে সমরভূমি চন্দ্র-সূর্য্য প্রভৃতি গ্রহগণ সমাকীর্ণ নভোমণ্ডলের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইল।
ঐ সময় দ্রোণের রথাভিমুখে নির্ভয়ে সংহার কর, প্রহার কর, বিদ্ধ কর, ও ছেদনকর, ইত্যাকার ভয়ঙ্কর শব্দ হইতে লাগিল। তখন মহাবীর দ্রোণ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া সমীরণ যেমন মেঘমণ্ডল অপসারিত করিয়া থাকে, তদ্রূপ বায়ব্যাস্ত্রদ্বারা পাঞ্চালগণকে বিদ্রাবিত করিতে আরম্ভ করিলেন। পাঞ্চালগণ দ্রোণের অস্ত্রপ্রভাবে সমাহত হইয়া ভীম ও অর্জুনের সমক্ষেই ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবীর ভীম ও অর্জুন তদ্দর্শনে অসংখ্য রথারোহী সৈন্য-সমভিব্যাহারে অবিলম্বে তথায় সমুপস্থিত হইলেন এবং অর্জুন আচার্য্যের দক্ষিণ পার্শ্ব ও ভীমসেন বাম পার্শ্ব অবলম্বনপূর্ব্বক তাঁহার প্রতি অনবরত শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন পাঞ্চালগণ, সৃঞ্জয়, মৎস্য ও সোমকগণ ভীম ও অর্জুনের অনুগমন করিলেন। তদ্দর্শনে রাজা দুর্য্যোধনের পক্ষ মহারথগণ সৈন্যগণ-সমভি-ব্যাহারে দ্রোণের সাহায্যার্থ তাঁহার সন্নিধানে সমুপস্থিত হইলেন। তৎকালে দিঘণ্ডল গাঢ় অন্ধকারে আবৃত এবং সৈন্যগণও নিদ্রায় একান্ত অভিভূত হইয়াছিল। মহাবীর অর্জুন এই সুযোগে সেই কৌরবসৈন্যদিগকে পুনরায় বিদীর্ণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। সৈন্যগণ ধনঞ্জয়ের শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া চতুৰ্দ্দিকে পলায়ন করিতে লাগিল এবং কোন কোন মহীপালও স্ব স্ব বাহন পরিত্যাগপূর্ব্বক অর্জুনভয়ে ভীত হইয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর দ্রোণ, রাজা দুর্য্যোধন ও অন্যান্য যোধগণ কোনক্রমে তাঁহাদিগকে নিবারণ করিতে সমর্থ হইলেন না।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এদিকে মহাবীর সাত্যকি সোমদত্তকে অবলোকনপূর্ব্বক ক্রোধভরে সারথিকে কহিলেন, সূত! অবিলম্বে আমাকে সোমদত্ত-সমীপে সমানীত কর; আমি নিশ্চয় কহিতেছি যে, ঐ কৌরবাধমের প্রাণ সংহার না করিয়া সংগ্রাম হইতে নিবৃত্ত হইব না। সারথি সাত্যকির আদেশানুসারে মনোমারুতগামী, শঙ্খবর্ণ, অস্ত্রাঘাতসহিষ্ণু, সিন্ধুদেশীয় অশ্বসমূহ পরিচালন করিতে আরম্ভ করিল। পূর্ব্বে দৈত্যবধোদ্যত সুররাজের অশ্বগণ তাঁহাকে যেরূপ বহন করিয়াছিল, সাত্যকির অশ্বগণও তাঁহাকে তদ্রূপ বহন করিতে লাগিল। তখন মহাবাহু সোমদত্ত সাত্যকিকে মহাবেগে সংগ্রামাভিমুখে আগমন করিতে দেখিয়া বারিধারার ন্যায় শর বর্ষণপূর্ব্বক জলধর দিনকরকে যেরূপ আবৃত করিয়া থাকে, তদ্রূপ তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিলেন। সাত্যকিও অসম্ভ্রান্তচিত্তে কুরুশ্রেষ্ঠ সোমদত্তকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর সোমদত্ত যুযুধানকে যষ্টি শরে বিদ্ধ করিলে সাত্যকিও তাঁহাকে নিশিত শরজালে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। এইরূপে সেই বীরদ্বয় পরস্পরের শরনিকরে বিদ্ধ ও শোণিতাক্ত-কলেবর হইয়া বসন্তকালীন কুসুমিত কিংশুকদ্বয়ের ন্যায় সুশোভিত হইলেন। তাঁহারা ত ৎকালে রোষকযায়িতলোচনে পরস্পরকে দগ্ধ করতই যেন রথমার্গে মণ্ডলাকারে বিচরণপূর্ব্বক বারিবর্ষী অম্বুদের ন্যায় রণক্ষেত্রে অবস্থান করিতে লাগিলেন। ঐ বীরদ্বয় শরসংভিন্ন-কলেবর হইয়া শল্পকীদ্বয়ের ন্যায়, সুবর্ণপুঙ্খ শরজালে সমাচ্ছন্ন হইয়া খদ্যোতাবৃত বৃক্ষদ্বয়ের ন্যায় এবং শরসন্দীপিত-কলেবর হইয়া উল্কাসমবেত কুঞ্জরদ্বয়ের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন।
অনন্তর মহারথ সোমদত্ত অর্দ্ধচন্দ্র বাণদ্বারা সাত্যকির শরাসন ছেদনপূর্ব্বক প্রথমতঃ তাঁহাকে পঞ্চবিংশতি শরে বিদ্ধ করিয়া পুনর্ব্বার তাঁহার প্রতি দশ বাণ পরিত্যাগ করিলেন। তখন মহাবীর সাত্যকি সত্বর সুদৃঢ় অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক সোমদত্তকে পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিয়া সহাস্য বদনে ভল্লদ্বারা তাঁহার কাঞ্চনময় ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। সোমদত্ত স্বীয় ধ্বজ নিপাতিত দেখিয়া অসম্ভ্রান্তচিত্তে সাত্যকিকে পঞ্চবিংশতি শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন সাত্যকি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া নিশিত ক্ষুরপ্রদ্বারা ধনুর্দ্ধর সোমদত্তের শরাসন ছেদনপূর্ব্বক নতপর্ব্ব সুবর্ণপুঙ্খ শতবাণে তাঁহাকে সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত মহারথ সোমদত্ত সত্বর অন্য চাপ গ্রহণ করিয়া যুযুধানকে শরনিকরে আবৃত করিলেন। সাত্যকি তদ্দর্শনে রোষাবিষ্ট হইয়া সোমদত্তকে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলে, সোমদত্ত তাঁহাকে শরজালে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভীমসেন যুযুধানের রক্ষার্থ সোমদত্তকে দশ বাণে আহত করিলেন। সোমদত্ত তদ্দর্শনে অসম্ভ্রান্তচিত্তে ভীমসেনকে শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। অনন্তর মহাবীর সাত্যকি সোমদত্তের বক্ষঃস্থল লক্ষ্য করিয়া সুদৃঢ় ভীষণ পরিঘাস্ত্র পরিত্যাগ করিলেন। কুরুকুলোদ্ভব সোমদত্ত তদ্দর্শনে হাস্যমুখে সেই ঘোরদর্শন পরিঘাস্ত্র দুই খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। লৌহনিৰ্ম্মিত বৃহৎ পরিঘ দ্বিধা-ছিন্ন হইয়া বজ্রবিদারিত ভূধরশিখরের ন্যায় পতিত হইল।
অনন্তর মহারথ সাত্যকি হাসিতে হাসিতে এক ভল্লে সোমদত্তের শরাসন ও পাঁচ শরে শরমুষ্টি ছেদন করিয়া চারি বাণে তুরঙ্গগণকে যমরাজসদনে প্রেরণ করত আনতপর্ব্ব ভল্ল-দ্বারা সারথির মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তৎপরে তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া প্রজ্বলিত পাবকসদৃশ অতি ভয়ানক সুবর্ণপুঙ্খ শাণিত শর নিক্ষেপ করিলেন। সেই শৈনেয়বিমুক্ত শর শ্যেন পক্ষীর ন্যায় মহাবেগে সোমদত্তের বক্ষঃস্থলে নিপতিত হইল। মহারথ সোমদত্ত সাত্যকির সেই শরপ্রহারে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া ভূতলে নিপতিত হইবামাত্র কলেবর পরিত্যাগ করিলেন। কৌরবপক্ষীয় সৈন্যগণ সোমদত্তকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া অসংখ্য রথ-সমভিব্যাহারে সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইল।
এ দিকে পাণ্ডবগণ সমুদায় প্রভদ্রক ও মহতী সেনা সমভিব্যাহারে দ্রুতবেগে দ্রোণসৈন্যের অভিমুখে গমন করিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া দ্রোণাচার্য্যের সমক্ষেই তাঁহার সৈনিক পুরুষদিগকে বিদ্রাবিত করিতে লাগিলেন। আচার্য্য যুধিষ্ঠিরকে কৌরবসৈন্য বিদ্রাবিত করিতে অবলোকন করিয়া রোষকষায়িতলোচনে দ্রুতবেগে তাঁহার সম্মুখীন হইয়া তাঁহাকে সুতীক্ষ্ণ সাত বাণে বিদ্ধ করিলে রাজা যুধিষ্ঠিরও ক্রোধভরে দ্রোণকে পাঁচ বাণে প্রতিবিদ্ধ করিলেন। মহাধনুর্দ্ধর ভারদ্বাজ যুধিষ্ঠিরের শরে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া ক্রোধে সৃক্কণী লেহনপূর্ব্বক তাঁহার ধ্বজ ও কোদণ্ড ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন নৃপশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির সত্বর অন্য এক সুদৃঢ় শরাসন গ্রহণ করিয়া সহস্র শরে দ্রোণাচার্য্যকে তাঁহার অশ্ব, সারথি, ধ্বজ ও রথের সহিত বিদ্ধ করিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। দ্বিজোত্তম দ্রোণাচার্য্য এইরূপে যুধিষ্ঠিরের শরনিকরে নিপীড়িত ও ব্যথিত হইয়া মুহূর্ত্তকাল রথোপরি অবসন্ন হইয়া রহিলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে সংজ্ঞা লাভ করিয়া রোষাবিষ্টচিত্তে ভুজঙ্গের ন্যায় নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত বায়ব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত যুধিষ্ঠির নির্ভীকচিত্তে স্বীয় অস্ত্রদ্বারা সেই বায়ব্যাস্ত্র নিরাকৃত করিয়া আচার্য্যের সুদীর্ঘ শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন ক্ষত্রিয়-মদন দ্রোণাচার্য্য সত্বর অন্য কোদণ্ড গ্রহণ করিলেন। কুরুপুঙ্গব যুধিষ্ঠির শাণিত ভল্লে তাহাও ছেদন করিয়া ফেলিলেন।
হে মহারাজ। ঐ সময় মহাত্মা বাসুদেব যুধিষ্ঠিরকে কহিলেন, হে মহাবাহো! আমি আপনাকে যাহা কহিতেছি, শ্রবণ করুন। আপনি দ্রোণাচার্য্যের সহিত যুদ্ধে নিবৃত্ত হউন, উনি সর্ব্বদা আপনার গ্রহণে যত্ন করিতেছেন, অতএব উঁহার সহিত সংগ্রাম করা আপনার কর্তব্য নহে। বিশেষতঃ যিনি উঁহার বিনাশের নিমিত্ত উৎপন্ন হইয়াছেন, তিনিই উঁহার বধসাধন করিবেন। অতএব আপনি আচার্য্যকে পরিত্যাগ করিয়া দুর্য্যোধনের নিকট গমন করুন। নরপতিরা ভূপাল ভিন্ন অন্য কাহারও সহিত যুদ্ধাভিলাষ করেন না। অতএব যে স্থানে মহাবীর ভীমসেন কৌরবগণের সহিত যুদ্ধ করিতেছেন, আপনি হস্তী, অশ্ব ও রথসমূহে পরিবেষ্টিত হইয়া সেই স্থানে গমন করুন।
অরাতিনিপাতন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বাসুদেবের বাক্য শ্রবণে মুহূর্তকাল চিন্তা করিয়া দ্রুতবেগে ভীমসেন-সমীপে গমন করিলেন এবং দেখিলেন, মহাবীর বৃকোদর ব্যাদিতান অন্তকের ন্যায় কৌরবসৈন্য সংহার করিতেছেন। তখন ধৰ্ম্মরাজ বর্ষা-কালীন মেঘগর্জনসদৃশ রথনির্ঘোষে ভূমণ্ডল প্রতিধ্বনিত করিয়া অরাতিনিপাতন ভীমসেনের পার্ফি গ্রহণ করিলেন। এ দিকে মহাবীর দ্রোণাচার্য্যও সেই প্রদোষসময়ে পাঞ্চালগণকে বিদ্রাবিত করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে সেই ভয়ানক যুদ্ধ প্রবর্তিত এবং অন্ধকার ও ধূলিপটলপ্রভাবে চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছাদিত হইলে ক্ষত্রিয়প্রধান যোধগণ পরস্পরকে আর নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইলেন না। তখন তাঁহারা স্ব স্ব নাম কীর্ত্তন ও অনুমানদ্বারা যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর দ্রোণ, কর্ণ, কূপ এবং ভীম, ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সাত্যকি-ইঁহারা উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণকে ক্ষুভিত করিতে প্রবৃত্ত হইলে তাহারা চারিদিকে ধাবমান হইল এবং স্খলিতবুদ্ধি হইয়া পরস্পরকে বিনাশ করিতে লাগিল। সহস্র সহস্র মহারথও সেই ঘোরতর অন্ধকারে একান্ত বিমোহিত হইয়া পরস্পর সংহারে প্রবৃত্ত হইলেন। প্রধান প্রধান বীরগণ ও অন্যান্য প্রাণিগণ সেই ঘোরতর-তিমির-পরিপূর্ণ সমরস্থলে নিতান্ত শঙ্কিত ও বিমোহিত হইতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! পাণ্ডবগণ সেই অন্ধকার প্রভাবে তোমাদিগকে এইরূপে আলোড়িত করিলে তোমরা হীনতেজাঃ হইয়া কি মনে করিতে লাগিলে? আর কিরূপেই বা সেই তিমিরাচ্ছন্ন প্রদেশে অস্মৎপক্ষীয় ও পাণ্ডবপক্ষীয় সৈন্যগণ দৃষ্টিগোচর হইল?
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! ঐ সময়ে সেনাপতিগণ দ্রোণের আদেশানুসারে হতাবশিষ্ট সৈন্যসকল সংগ্রহ করিয়া ব্যূহ প্রস্তুত করিলেন। মহাবীর দ্রোণ উহার অগ্রে, শল্য পশ্চাদ্ভাগে এবং অশ্বত্থামা ও শকুনি পার্শ্বদেশে অবস্থান করিতে লাগিলেন। মহারাজ দুর্য্যোধন স্বয়ং সেই সৈন্যগণের তত্ত্বাবধারণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি সমস্ত পদাতিদিগকে সান্ত্ববাদ প্রয়োগপূর্ব্বক কহিলেন, হে পদাতিগণ! তোমরা অস্ত্র-শস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া প্রজ্বলিত দীপসমুদায় গ্রহণ কর। পদাতিগণ | তাঁহার আদেশানুসারে হৃষ্টমনে প্রদীপ গ্রহণ করিল। দেবর্ষি, গন্ধর্ব্ব, বিদ্যাধর, অপ্সর, নাগ, যক্ষ ও কিন্নরগণও কুতূহল-সহকারে নভোমণ্ডলে অবস্থানপূর্ব্বক প্রদীপ গ্রহণ করিলেন। দিদেবতারা এবং মহর্ষি নারদ ও পর্ব্বত দুর্য্যোধনের হিতা-নুষ্ঠানার্থ সুগন্ধি তৈলসংযুক্ত প্রদীপসকল অন্তরীক্ষ হইতে নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন সেই ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত সৈন্যসকল অগ্নিপ্রভা এবং মহার্হ আবরণ ও প্রহারার্থ নিক্ষিপ্ত মার্জিত দিব্য শস্ত্রপ্রভায় উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। কৌরবগণ প্রতিরথে পাঁচ পাঁচ, প্রতি গজে তিন তিন ও প্রতি অশ্বে এক এক প্রদীপ প্রজ্বলিত করিলেন। তখন সেই দীপমালা আপনার সৈন্যগণকে আলোক প্রদান করিতে লাগিল। সৈন্যগণ প্রদীপহস্ত পদাতিগণকর্তৃক পরিশোভিত হইয়া নভোমণ্ডলস্থ বিদ্যুদ্দামমণ্ডিত মেঘমণ্ডলের ন্যায় নিরীক্ষিত হইল।
এইরূপে সেই সৈন্যগণ প্রকাশিত হইলে হুতাশনসদৃশ তেজস্বী দ্রোণ তাহাদের মধ্যে গমন করিয়া মধ্যাহ্নকালীন প্রচণ্ড সূর্য্যের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। প্রদীপপ্রভা সুবর্ণময় আভরণ, নিষ্ক, বিশুদ্ধ তৃণীর ও শস্ত্রসমুদায়ে প্রতিফলিত হইয়া রশ্মিজালদ্বারা সমধিক আলোক বিস্তার করিল। তখন যোদ্ধা-দিগের ছত্র, চামর, অসি, প্রদীপ, মহোল্কা ও দোদুল্যমান সুবর্ণমালাসকল সমধিক শোভা পাইতে লাগিল। হে মহারাজ! এইরূপে সেই সমস্ত সৈন্য শস্ত্র, দীপ ও আবরণ প্রভায় সাতিশয় উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। শোণিতসিক্ত শাণিত অস্ত্রসমুদায় বীরগণকর্তৃক বিকম্পিত হইয়া বর্ষাকালীন বিদ্যুতের ন্যায় প্রভাজাল বিস্তার করিতে লাগিল। শত্রুসংহারার্থ মহাবেগে ধাবমান কম্পিত-কলেবর মনুষ্যগণের মুখমণ্ডল সমীরণ-সঞ্চালিত অম্বুদের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। পাদপদল সমাচ্ছন্ন অরণ্য অনলপ্রভাবে প্রদীপ্ত হইলে দিবাকরের প্রভা যেমন সমধিক হইয়া থাকে, তদ্রূপ সেই ভয়ঙ্কর কালে কৌরব-সৈন্যগণের প্রভা অপেক্ষাকৃত অধিক হইয়া উঠিল।
তখন পাণ্ডবগণও কৌরবপক্ষীয় বলসমুদায় দীপমালায় শোভিত হইয়াছে অবগত হইয়া, স্বীয় সৈন্যমধ্যে পদাতিগণকে প্রতিবোধিত করিয়া সেইরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন। তাঁহারা প্রতি গজে সাত সাত, প্রত্যেক রথে দশ দশ, প্রতি অশ্বের পৃষ্ঠে দুই দুই প্রদীপ প্রজ্বলিত করিলেন। ধ্বজ এবং সমস্ত সেনার পার্শ্ব, পশ্চাৎ, অগ্র ও মধ্যভাগে অসংখ্য দীপ প্রজ্বলিত হইল। হে রাজন। এইরূপে সেই উভয় পক্ষীয় সৈন্যমধ্যে অসংখ্য দীপ প্রজ্বলিত হইতে লাগিল। হস্তী, অশ্ব ও রথের উপর এবং পদাতিগণের হস্তে অসংখ্য দীপ থাকাতে পাণ্ডবসেনা আলোকময় হইল। হে মহারাজ। সেই সমুদায় সৈন্য প্রদীপদ্বারা উদ্ভাসিত হইয়া দিবাকরাভিগুপ্ত' হুতাশনের ন্যায় সমধিক তেজস্বী হইয়া উঠিল। উভয় পক্ষীয় প্রদীপপ্রভা পৃথিবী, অন্তরীক্ষ ও দিক্সমুদায়ে অভিব্যাপ্ত হইলে আপনার ও পাণ্ডবগণের সৈন্যসমুদায় সুস্পষ্ট রূপে লক্ষিত হইতে লাগিল। দেবতা, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, অপ্সর ও সিদ্ধগণ নভোমণ্ডলগত আলোকপ্রভাবে উদ্বোধিত হইয়া তথায় সমাগত হইলেন। তখন সেই সংগ্রামস্থল দেব, গন্ধর্ব্ব, অপ্সর ও সিদ্ধগণ এবং রণনিহত দেবলোক প্রস্থানোদ্যত যোধগণে একান্ত সমাকুল হইয়া সুরলোকসদৃশ হইয়া উঠিল। ঐ সময় সেই রথ, অশ্ব ও নাগগণে সমাকুল দীপসমুদায়ে প্রদীপ্ত, নিহত ও পলায়িত অশ্বকূলে সঙ্কুল, সংরব্ধ যোধগণে সমাকীর্ণ অসংখ্য নরনাগাশ্বসম্পন্ন বলসমুদায় সুরাসুর ব্যূহের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। ঐ যুদ্ধে শক্তিসকল প্রচণ্ড বায়ু, রথসমুদায় মেঘ, গজ ও অশ্বগণের গভীর গর্জন মহানির্ঘোষ ও রুধিরপ্রবাহ অনুধারাস্বরূপ' প্রতীয়মান হইল। হে মহারাজ! মধ্যাহ্নকালীন শারদ দিবাকর যেমন করজালে সকলকে সন্তপ্ত করিয়া থাকে, তদ্রূপ মহাবীর অশ্বত্থামা সেই অনলকল্প সংগ্রামে পাণ্ডবগণকে শরজালে নিতান্ত নিপীড়িত করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে সেই ধূলিজাল-সমাচ্ছাদিত রণস্থল প্রদীপশিখায় সুপ্রকাশিত হইলে রথীসকল পরস্পর বিনাশ মানসে শস্ত্র, প্রাস ও অসি ধারণপূর্ব্বক তথায় সমাগত হইয়া পরস্পরকে অবলোকন করিতে লাগিলেন। তখন সেই সহস্র সহস্র প্রদীপ, রত্নখচিত স্বর্ণদণ্ড ও দেব-গন্ধর্ব্ব গৃহীত গন্ধতেল সুবাসিত সমধিক উজ্জ্বল দীপের প্রভায় রণভূমি গ্রহপরিপূর্ণ নভোমণ্ডলের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইল। মহোল্কাসকল লোকের অভাবে বসুন্ধরাকে দগ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াই যেন প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। বর্ষাকালে প্রদোষসময়ে পাদপসমুদায় খদ্যোত-পরিপূর্ণ হইয়া যেরূপ শোভমান হয় দিত্মণ্ডল প্রদীপপ্রভায় উদ্ভাসিত হইয়া তদ্রূপ শোভা পাইতে লাগিল। তখন মহারাজ দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে হস্ত্যারোহিগণ হস্ত্যারোহিগণের সহিত, অশ্বারোহিগণ অশ্বারোহিগণের সহিত এবং রথিগণ রথিগণের সহিত কুতূহলসহকারে ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ করিল। হে মহারাজ! এইরূপে সেই চতুরঙ্গ সেনা ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলে মহাবীর অর্জুন সত্বর মহীপালগণকে বিনাশ করত কৌরবসৈন্যদিগকে বিদ্রাবিত করিতে লাগিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ একান্ত অসহিষ্ণু মহাবীর অর্জুন ক্রোধভরে আমার সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলে তোমাদিগের মনঃ কিরূপ হইল এবং আমার পুত্র দুর্য্যোধনই বা তৎকালোচিত কি কর্ত্তব্য অবধারণ করিল? কোন্ কোন্ বীর অর্জুনের প্রত্যুদ্গমনে প্রবৃত্ত হইলেন? আর কোন্ কোন্ বীরই বা তৎকালে দ্রোণাচার্য্যকে রক্ষা করিতে লাগিলেন? হে সঞ্জয়! মহাবীর দ্রোণাচার্য্য যখন যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন, তখন কোন্ কোন্ বীর তাঁহার দক্ষিণচক্র ও কোন্ কোন্ বীর বামচক্র এবং কোন্ কোন্ বীরই বা তাঁহার পশ্চাদ্ভাগ রক্ষায় প্রবৃত্ত হইলেন? আর কাহারাই বা তাঁহার সম্মুখে গমন করিলেন? হে সঞ্জয়! যিনি রথমার্গে নৃত্য করতই যেন পাঞ্চালসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইয়াছিলেন এবং ধূমকেতুর ন্যায় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া পাঞ্চাল মহারথদিগকে শরানলে দগ্ধ করিয়াছিলেন, সেই মহাবীর দ্রোণ কিরূপে মৃত্যুমুখে নিপতিত হইলেন? হে সঞ্জয়! তুমি বিপক্ষদিগকে অব্যগ্র অপরাজিত ও হৃষ্ট এবং মৎপক্ষীয় রথিগণকে রথশূন্য ও অন্যান্য যোদ্ধাদিগকে নিহত বিবর্ণ ও বিপ্রকীর্ণ বলিয়া নির্দেশ করিতেছ।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! রাজা দুর্য্যোধন যুদ্ধার্থী দ্রোণাচার্য্যের অভিপ্রায় অবগত হইয়া সেই রজনীতে স্বীয় বশংবদ ভ্রাতা মহাবল পরাক্রান্ত বিকর্ণ, চিত্রসেন, সুপার্শ্ব, দুর্দ্ধর্ষ ও দীর্ঘবাহু এবং তাঁহাদিগের পদানুগগণকে কহিলেন যে, তোমরা যত্নসহকারে দ্রোণাচার্য্যের পশ্চাদ্ভাগে অবস্থানপূর্ব্বক তাঁহাকে রক্ষা কর। হাদিক্য তাঁহার দক্ষিণচক্র এবং শল্য বামচক্র, হতাবশিষ্ট ত্রিগৰ্ত্তদেশীয় মহারথগণ তাঁহার পুরোভাগ রক্ষণে নিযুক্ত হউন। আচার্য্য ক্ষমাশীল, বিশেষতঃ পাণ্ডবগণ সাতিশয় যত্নসহকারে যুদ্ধ করিতেছে; অতএব তোমরা ঐকমত্য অবলম্বনপূর্ব্বক তাঁহাকে রক্ষা কর। আচার্য্যও বলবান, ক্ষিপ্রহস্ত ও পরাক্রমশালী। সোমকগণ সমবেত পাণ্ডবদিগের কথা দূরে থাকুক, তিনি একাকী দেবগণকেও পরাজয় করিতে অসমর্থ নহেন। অতএব তোমরা মিলিত হইয়া মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন হইতে দুর্দ্ধর্ষ দ্রোণাচার্য্যের রক্ষণে যত্নবান্ হও। পাণ্ডবসৈন্যমধ্যে ধৃষ্টদ্যুম্ন ভিন্ন আর কোন বীরই আচার্য্যকে পরাজয় করিতে সমর্থ নহে। অতএব প্রাণপণে তাঁহাকে রক্ষা করিলে তিনি অনায়াসে সোমক ও সৃঞ্জয়গণকে সমূলে উন্মুলিত করিতে সমর্থ হইবেন। সেনামুখস্থিত সৃঞ্জয়গণ নিহত হইলে অশ্বত্থামা নিশ্চয়ই ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিপাতিত করিবেন। অর্জুন মহারথ কর্ণের নিকট পরাজিত হইবে এবং আমিও বৰ্ম্মধারী ভীমসেন প্রভৃতি অবশিষ্ট পাণ্ডবগণকে পরাজিত করিব। তাহা হইলে অন্যান্য যোধগণ সহসা হীনবীর্য্য ও আমার অনন্তকালব্যাপী জয়লাভ হইবে, সন্দেহ নাই। অতএব তোমরা রণস্থলে মহারথ দ্রোণাচার্য্যকে রক্ষা কর।
হে ভরতশ্রেষ্ঠ! আপনার পুত্র রাজা দুর্য্যোধন সেই নিশা-কালে সৈন্যগণকে এইরূপ আদেশ করিলে পর বিজয়াভিলাষী উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণের ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। মহাবীর অর্জুন কৌরবসৈন্যগণকে এবং কৌরবগণ অর্জুনকে নানাবিধ শস্ত্রাঘাতে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। মহাবীর অশ্বত্থামা দ্রুপদরাজকে এবং দ্রোণাচার্য্য সৃঞ্জয়গণকে সন্নতপর্ব্ব শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিলেন। তখন সেই পরস্পর প্রহারে প্রবৃত্ত পাণ্ডব, পাঞ্চাল ও কৌরব সৈন্যগণের ঘোরতর আর্তনাদ সমুত্থিত হইল। হে মহারাজ! সেই রাত্রিকালে যেরূপ ভয়ানক যুদ্ধ হইয়াছিল, তদ্রূপ যুদ্ধ আমাদিগের বা পূর্ব্বতন লোকদিগের কখন দৃষ্টিগোচর হয় নাই।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! এইরূপে সেই সৰ্ব্বভূত-বিনাশন ভীষণ রাত্রিযুদ্ধ উপস্থিত হইলে ধৰ্ম্মপুত্র রাজা যুধিষ্ঠির অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যের বিনাশের নিমিত্ত পাণ্ডব, পাঞ্চাল ও সোমকগণকে সম্মুখাভিবর্তিত' ভারদ্বাজের বিনাশে আদেশ করিলেন। পাঞ্চাল ও সোমকগণ যুধিষ্ঠিরের বাক্য শ্রবণ করিয়া ভয়ঙ্কর রব করত দ্রোণাভিমুখে ধাবমান হইলেন। তখন অস্মৎপক্ষীয় বীরগণও রোষাবিষ্ট হইয়া গর্জন করিতে করিতে শক্তি, উৎসাহ ও পরাক্রমানুসারে তাহাদিগের অভিমুখে গমন করিলেন। মহাবীর কৃতবর্মা যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধাবমান হইলেন। সংগ্রামনিপুণ কুরুকুলোদ্ভব ভূরি সাত্যকিকে মত্তদ্বিপের ন্যায় দ্রোণাভিমুখে গমন ও চতুদ্দিকে শর বর্ষণ করিতে দেখিয়া তাঁহার অভিমুখে আগমন করিতে লাগিলেন। মহাবল কর্ণ সহদেবকে দ্রোণাচার্য্যের গ্রহণে যত্নবান্ দেখিয়া তাঁহাকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন। রাজা দুর্য্যোধন জীবিত-নিরপেক্ষ হইয়া ব্যাদিতাস্য শমনের ন্যায় সমাগত প্রতিপক্ষ ভীমসেনের প্রতি ধাবমান হইলেন। শকুনি সর্ব্বযুদ্ধবিশারদ যোধগণাগ্রগণ্য নকুলকে, কৃপাচার্য্য মহারথ শিখণ্ডীকে, দুঃশাসন ময়ূরসবর্ণ অশ্বসংযুক্ত রথে সমারূঢ় প্রতিবিন্ধ্যকে, পিতৃতুল্য প্রভাবশালী অশ্বত্থামা মায়াবিশারদ সম্মুখাগত ভীমসেনতনয় ঘটোৎকচকে, বৃষসেন অসংখ্য সৈন্য ও পদানুগগণে পরিবৃত দ্রোণ গ্রহণার্থী দ্রুপদকে, ক্রুদ্ধচিত্ত মদ্ররাজ দ্রোণনিধনার্থ সমাগত বিরাটকে, নিশাচর অলম্বুষ যোধগণাগ্রগণ্য মহারথ অর্জুনকে এবং আপনার পক্ষীয় অন্যান্য বীরগণ পাণ্ডবপক্ষীয় অন্যান্য বীর-গণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। মহাবীর চিত্রসেন নকুল তনয় শতানীককে মহাবেগে আগমন করিতে দেখিয়া শরনিকর নিক্ষেপপূর্ব্বক তাহাকে রুদ্ধ করিলেন। তখন পাঞ্চালদেশীয় ধৃষ্টদ্যুম্ন অরাতিমৰ্দ্দন ধনুর্দ্ধর দ্রোণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় হস্ত্যারোহী যোধগণ বিপক্ষ পক্ষীয় হস্ত্যারোহিগণের সহিত ভীষণ সমরে প্রবৃত্ত হইয়া পরস্পরকে মদন করিতে আরম্ভ করিল। তুরঙ্গগণ পক্ষবান্ পর্ব্বতের ন্যায় মহাবেগে পরস্পরের অভিমুখে ধাবমান হইল অশ্বারোহিগণ প্রাস, শক্তি ও ঋষ্টি গ্রহণপূর্ব্বক সিংহনাদ করত অশ্বারোহি-গণের সহিত যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিল। বীরগণ গদা, মুষল প্রভৃতি নানাস্ত্র দ্বারা সমরে পরস্পরকে নিহত করিতে লাগিল।
হে মহারাজ! তীরভূমি যেমন উদ্ধত অর্ণবকে নিবারণ করে, তদ্রূপ কৃতবর্মা ক্রুদ্ধ হইয়া ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে নিবারণ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির হার্দিক্যকে প্রথমতঃ পাঁচ ও তৎপরে বিংশতি শরে বিদ্ধ করিয়া "তিষ্ঠ তিষ্ঠ,” বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন। মহাবীর কৃতবর্ম্মা ধর্মরাজের আস্ফালনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ভল্লাস্ত্রে তাঁহার কার্মুক ছেদনপূর্ব্বক তাঁহাকে সাত শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন রাজা যুধিষ্ঠির সত্বর অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া দশ শরে হার্দিক্যের বাহু ও বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। হার্দিক্য ধৰ্ম্মনন্দনের শরে গাঢ়তর বিদ্ধ ও নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া কম্পিত-কলেবরে তাঁহাকে সাত শরে নিপীড়িত করিলে ধর্মরাজ তাঁহার কামুক ও শরমুষ্টি ছেদনপূর্ব্বক তাঁহার প্রতি পাঁচ শাণিত ভল্ল প্রয়োগপূর্ব্বক সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। সেই সমস্ত যুধিষ্ঠিরনিক্ষিপ্ত ভল্ল কৃতবর্মার মহামূল্য হেমপৃষ্ঠ কবচ ভেদ করিয়া বল্মীকমধ্যে প্রবিষ্ট ভীষণ ভুজগের ন্যায় ভূগর্ভে প্রবিষ্ট হইল। তখন মহাবীর হাদ্দিক্য নিমেষমধ্যে অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া রাজা যুধিষ্ঠিরকে প্রথমতঃ ষষ্টি ও তৎপরে দশ শরে বিদ্ধ করিলেন।
অনন্তর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কার্ম্মক পরিত্যাগপূর্ব্বক কৃতবর্মার প্রতি এক ভুজগসদৃশ ভীষণ শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। সেই পাণ্ডব-প্রেরিত হেমচিত্রিত শক্তি হাৰ্দ্দিক্যের দক্ষিণ ভুজদণ্ড ভেদ করিয়া ভূগর্ভে প্রবিষ্ট হইল। ইত্যবসরে রাজা যুধিষ্ঠির পুনরায় কাৰ্ম্মক গ্রহণপূর্ব্বক শরনিকরে হাৰ্দ্দিক্যকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। বৃষ্ণিপ্রবীর মহাবীর হার্দিক্য তদ্দর্শনে ক্রোধভরে নিমেষার্দ্ধমধ্যে যুধিষ্ঠিরের অশ্ব, সারথি ও রথ বিনষ্ট করিয়া ফেলিলেন। তখন পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির খড়া ও চর্ম গ্রহণ করিলেন। হার্দিক্যও এক নিশিত ভল্ল ধারণপূর্ব্বক তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন রাজা যুধিষ্ঠির এক সুবর্ণদণ্ড তোমর গ্রহণপূর্ব্বক সত্বর কৃতবর্মার প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর হার্দিক্য যুধিষ্ঠির-পরিত্যক্ত তোমর সমাগত দেখিয়া হাস্যমুখে দুই খণ্ডে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এবং তৎপরে ক্রোধাবিষ্টচিত্তে শরনিকরে ধর্মনন্দনকে সমাচ্ছন্ন করিয়া তাঁহার বর্ম্মের উপর অনবরত শরনিকর পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। যুধিষ্ঠিরের সুবর্ণালঙ্কৃত বৰ্ম্ম হাৰ্দ্দিক্যশরে সমাচ্ছন্ন হইয়া অম্বরতল পরিভ্রষ্ট তারকাস্তবকের ন্যায় ধরাতলে স্খলিত হইয়া পড়িল। হে মহারাজ! এইরূপে রাজা যুধিষ্ঠিরও কৃতবর্মার শরে ছিন্নবৰ্ম্ম, রথশূন্য ও নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া অবিলম্বে রণস্থল হইতে অপসৃত হইলেন। মহাবীর হাৰ্দ্দিক্য ধৰ্ম্মপুত্রকে পরাজয় করিয়া পুনরায় দ্রোণাচার্য্যের সৈন্যসমুদায় রক্ষা করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এদিকে মহাবীর ভূরি সমাগত মত্ত মাতঙ্গবিক্রম মহারথ সাত্যকিকে নিবারণ করিলেন। মহাবীর সাত্যকি তদ্দর্শনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া শাণিত পাঁচ শরে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলে তাঁহার দেহে শোণিতধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। তখন কুরুকুলোদ্ভব ভূরিও যুদ্ধদুৰ্ম্মদ সাত্যকির বক্ষঃস্থলে দশ শর নিক্ষেপ করিলেন। এইরূপে সেই ক্রোধান্ধ অন্তকসদৃশ মহাবীরদ্বয় রোষারক্তনয়নে শরাসন বিস্ফারণপূর্ব্বক পরস্পরকে ক্ষত বিক্ষত এবং সুদারুণ শর-বৃষ্টিদ্বারা পরস্পরকে সমাচ্ছন্ন করিয়া সমরাঙ্গনে অবস্থান করিতে লাগিলেন। এইরূপে ক্ষণকাল তাঁহাদের সমানরূপ যুদ্ধ হইল। অনন্তর মহাবীর সাত্যকি হাসিতে হাসিতে মহাত্মা ভূরির কোদণ্ড দ্বিখণ্ড করিয়া ফেলিলেন এবং তাঁহার বক্ষঃস্থলে নিশিত নয় বাণ নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহাকে “থাক্ থাক্,” বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভূরি শত্রুশরে ছিন্নশরাসন ও অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া ক্রোধভরে অন্য কাৰ্ম্মক গ্রহণপূর্ব্বক সাত্যকিকে তিন বাণে বিদ্ধ করিয়া হাসিতে হাসিতে সুতীক্ষ্ণ ভল্লে তাঁহার কার্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর সাত্যকি শত্রুশরে শরাসন ছিন্ন হওয়াতে ক্রোধে অন্ধ হইয়া মহাবেগে ভূরির বিপুল বক্ষঃস্থলে শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর ভূরি সেই সাত্যকিনিক্ষিপ্ত শক্তির আঘাতে চূর্ণকলেবর হইয়া আকাশ-ভ্রষ্ট দীপ্তরশ্মি' মঙ্গলগ্রহের ন্যায় রথ হইতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন।
হে মহারাজ! মহারথ অশ্বত্থামা দ্রুতবেগে যুযুধানের অভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং তাঁহাকে থাক্ থাক্, বলিয়া তর্জন করত জলধর যেরূপ পর্ব্বতোপরি বারি বর্ষণ করে, তদ্রূপ তাঁহার উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় মহাবীর ঘটোৎকচ অশ্বত্থামাকে সাত্যকির রথাভিমুখে মহাবেগে আগমন করিতে দেখিয়া সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক কহিলেন, হে দ্রোণনন্দন! তুমি ঐ স্থানে অবস্থান কর; প্রাণসত্ত্বে আমার নিকট হইতে অন্যত্র গমন করিতে সমর্থ হইবে না। কার্তিকেয় যেমন মহিষকে সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ আজি আমি তোমাকে বিনাশ করিব। হে ব্রহ্মন্। আমি অদ্যই তোমার যুদ্ধশ্রদ্ধা অপনীত করিব, সন্দেহ নাই। রোষতাম্রাক্ষ অরাতিঘাতন ঘটোৎকচ অশ্বত্থামাকে এই কথা বলিয়া ক্রোধাবিষ্ট কেশরী যেমন করীন্দ্রকে আক্রমণ করিতে গমন করে, তদ্রূপ দ্রোণপুত্রের অভিমুখে ধাবমান হইলেন এবং জলধর যেমন ধরাতলে জলধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ তাঁহার উপর রথাক্ষপরিমিত ইযুজাল বর্ষণ করিতে লাগিলেন। দ্রোণপুত্র আশীবিষোপম শরনিকরদ্বারা সেই রাক্ষসনির্মুক্ত শরবৃষ্টি নিরাকৃত করিয়া তাহার উপর একশত মর্মভেদী সুতীক্ষ্ণ শর পরিত্যাগ করিলেন। ঘটোৎকচ আচার্য্যপুত্রের শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া সমরমধ্যে সলোম শল্পকীর ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল এবং ক্রোধাবিষ্টচিত্তে অশনিসম শব্দায়মান ভীষণ ক্ষুরপ্র, অর্দ্ধচন্দ্র, নারাচ, বরাহকর্ণ, নালীক ও বিকর্ণ প্রভৃতি শরসমূহে অশ্বত্থামাকে সমাচ্ছন্ন করিলেন। তখন মহাবীর অশ্বত্থামা অনাকুলিতচিত্তে দিব্য মন্ত্রপূত ভীষণ শরনিকর পরিত্যাগপূর্ব্বক সমীরণ যেমন জলধরপটল ছিন্ন ভিন্ন করে, তদ্রূপ সেই রাক্ষস-নির্মুক্ত অশনিসন্নিভ সুদুঃসহ শরজাল নিরাকৃত করিতে লাগিলেন। তখন বোধ হইল যেন, আকাশপথে শরসমুদায় পরস্পর ঘোরতর সংগ্রাম করিতেছে। সেই বীরদ্বয়-নির্মুক্ত শরসমুদায়ের পরস্পর সংঘর্ষণে অসংখ্য স্ফুলিঙ্গ সমুত্থিত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল, যেন নভোমণ্ডল সন্ধ্যাসময়ে খদ্যোতপুঞ্জে বিচিত্রিত হইয়াছে। হে মহারাজ! এইরূপে দ্রোণপুত্র শরজালদ্বারা দশ দিক্ সমাচ্ছন্ন করিয়া আপনার পুত্রগণের হিতার্থ ঘটোৎকচকে অসংখ্য শরে সমাকীর্ণ করিলেন।
অনন্তর সেই ঘোরতর রজনীযোগে ইন্দ্র ও প্রহ্লাদের ন্যায় অশ্বত্থামা ও ঘটোৎকচের পুনরায় যুদ্ধ আরম্ভ হইল। ঘটোৎকচ ক্রুদ্ধ হইয়া কালাগ্নিসদৃশ দশ বাণে দ্রোণনন্দনের বক্ষঃস্থলে আঘাত করিলে মহাবল পরাক্রান্ত অশ্বত্থামা গাঢ়তর বিদ্ধ ও ব্যথিত হইয়া বায়ুসঞ্চালিত পাদপের ন্যায় বিচলিত হইতে লাগিলেন এবং মোহপ্রাপ্ত হইয়া ধ্বজযষ্টি অবলম্বন করিলেন। তখন আপনার সৈন্যগণ দ্রোণতনয়কে নিহত বোধ করিয়া হাহাকার করিতে লাগিল। পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ অশ্বত্থামাকে তদবস্থ দেখিয়া সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন।
অনন্তর মহারথ অশ্বত্থামা সংজ্ঞা লাভ করিয়া বামকরে কাৰ্ম্মক গ্রহণ ও আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক ঘটোৎকচকে লক্ষ্য করিয়া অবিলম্বে এক যমদণ্ডোপম ভীষণ শর নিক্ষপ করিলেন। সেই সুপুঙ্খ শর রাক্ষসের হৃদয় ভেদ করিয়া ভূগর্ভে প্রবিষ্ট হইল। মহাবল পরাক্রান্ত ঘটোৎকচ দ্রৌণিনির্মুক্ত শরে গাঢ়তর বিদ্ধ ও মোহাবিষ্ট হইয়া রথোপরি উপবেশন করিলেন। তখন সারথি তাঁহাকে বিমোহিত দেখিয়া সসম্ভ্রমে অশ্বত্থামার নিকট হইতে অপবাহিত করিল। মহারথ অশ্বত্থামা এইরূপে রাক্ষসেন্দ্র ঘটোৎকচকে বিদ্ধ করিয়া ঘোরতর সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন এবং আপনার দুর্য্যোধন প্রভৃতি পুত্রগণও যোধ-সমুদায়কর্তৃক পূজিত হইয়া মধ্যাহ্নকালীন দিবাকরের ন্যায় সমধিক তেজঃসম্পন্ন হইলেন।
অনন্তর রাজা দুর্য্যোধন আচার্য্যের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত ভীমসেনকে নিশিত শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন ভীমসেন দুর্য্যোধনকে নয় শরে বিদ্ধ করিলে তিনি তাঁহাকে বিংশতি শরে বিদ্ধ করিলেন। এইরূপে তাঁহারা উভয়ে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া নভোমণ্ডলে জলদজাল-সমাবৃত চন্দ্র সূর্য্যের ন্যায় দৃষ্ট হইলেন। পরে রাজা দুর্য্যোধন পাঁচ বাণে ভীমকে বিদ্ধ করিয়া থাক্ থাক্, বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীম নিশিত শরে কুরুরাজের ধ্বজ ও কোদণ্ড খণ্ড খণ্ড করিয়া তাঁহাকে সন্নতপর্ব্ব নবতি শরে বিদ্ধ করিলেন। রাজা দুর্য্যোধন তদ্দর্শনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া অন্য সুদৃঢ় শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক ধনুর্দ্ধরদিগের সমক্ষে নিশিত শরনিকরে ভীমসেনকে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। মহাবীর ভীম সেই দুর্য্যোধনবিমুক্ত শরসমুদায় ছেদন করিয়া তাঁহাকে পঞ্চবিংশতি ক্ষুদ্রকাস্ত্রে বিদ্ধ করিলেন। তখন রাজা দুর্য্যোধন নিতান্ত ক্রুদ্ধ হইয়া ক্ষুরপ্রাস্ত্রদ্বারা ভীমের কার্ম্মক ছেদন করিয়া তাঁহার উপর দশ বাণ নিক্ষেপ করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ভীম তৎক্ষণাৎ অন্য ধনুগ্রহণপূর্ব্বক রাজা দুর্য্যোধনকে নিশিত সাত শরে বিদ্ধ করিয়া লঘুহস্ততা প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। তখন রাজা দুর্য্যোধন সত্বরে তাঁহার সেই কাৰ্ম্মকও ছেদন করিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে আপনার পুত্র জয়শালী দুর্য্যোধন পাঁচবার ভীমের শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর ভীমসেন বারংবার শরাসন ছিন্ন হওয়াতে যৎপরোনাস্তি ক্রুদ্ধ হইয়া এক সর্ব্বলৌহময় সুদৃঢ় শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। সেই যমভগিনীতুল্য হুতাশন-সমপ্রভ ভীষণ শক্তি নভোমণ্ডল সীমন্তিত' করিয়াই যেন দুর্য্যোধনের প্রতি ধাবমান হইলে মহাবীর দুর্য্যোধন যোধগণের সমক্ষে উহা অর্দ্ধপথে দুই খণ্ডে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন ভীমসেন ক্রোধভরে মহাবেগে দুর্য্যোধনের রথ লক্ষ্য করিয়া এক প্রভাবিশিষ্ট গুরুতর গদা নিক্ষেপ করিলেন। ভীমসেনের ভীষণ গদাঘাতে কুরুরাজের রথ অশ্বগণ ও সারথির সহিত চূর্ণ হইয়া গেল। তখন দুর্য্যোধন ভীমের পরাক্রম দর্শনে নিতান্ত ভীত হইয়া পলায়নপূর্ব্বক মহাত্মা নন্দকের রথে সমারূঢ় হইলেন। ভীমসেন সেই রজনীতে মহারথ দুর্য্যোধনকে নিহত বিবেচনা করিয়া কৌরবগণকে তর্জন করত সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। আপনার সেনাগণও নরপতিকে মৃত বোধ করিয়া চতুৰ্দ্দিকে হাহাকার করিতে লাগিলেন। ঐ সময় রাজা যুধিষ্ঠির কৌরবপক্ষীয় যোধগণের আর্তনাদ ও মহাত্মা ভীমসেনের সিংহনাদ শ্রবণে দুর্য্যোধনকে নিহত বিবেচনা করিয়া মহাবেগে বৃকোদর-সমীপে আগমন করিলেন। তখন পাঞ্চাল, কৈকয়, মৎস্য, সৃঞ্জয় ও চেদিগণ দ্রোণের বিনাশ-বাসনায় সুসজ্জিত হইয়া ধাবমান হইলেন। অনন্তর ঘোর তিমির নিমগ্ন, পরস্পর প্রহারনিরত যোধগণের সমক্ষে বিপক্ষদলের সহিত দ্রোণাচার্য্যের তুমুল সংগ্রাম হইতে লাগিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! তখন মহাবীর কর্ণ সহদেবকে দ্রোণ-সন্নিধানে আগমন করিতে দেখিয়া তাঁহার নিবারণে প্রবৃত্ত হইলেন। মহাবীর সহদেব তাঁহাকে প্রথমতঃ নয় শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় নয় শরে বিদ্ধ করিলেন। মহারথ কর্ণও তাঁহাকে নতপর্ব্ব শত শরে বিদ্ধ করিয়া লঘুহস্ততা প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহার জ্যাসম্পন্ন কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মাদ্রীপুত্র সত্বর অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া কর্ণকে বিংশতি শরে বিদ্ধ করিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হইল। অনন্তর মহাবীর কর্ণ ক্রোধভরে শরনিকরে সহদেবের অশ্বসকল বিনাশ করিয়া অবিলম্বে ভল্লাস্ত্রে সারথিকে সংহার করিলেন। তখন সহদেব রথশূন্য হইয়া খড়্গ ও চৰ্ম্ম গ্রহণপূর্ব্বক সমরে প্রবৃত্ত হইলেন। মহাবীর কর্ণ হাস্যমুখে তৎক্ষণাৎ উহা ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন সহদেব কর্ণের | রথ লক্ষ্য করিয়া এক সুবর্ণখচিত অতি গুরুতর ভীষণ গদা নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর কর্ণ সেই সহদেবপ্রেরিত গদা আগমন করিতে দেখিয়া শরজাল নিক্ষেপপূর্ব্বক ভূতলে নিপাতিত করিলেন। সহদেব গদা নিষ্ফল হইল দেখিয়া সত্বর কর্ণের প্রতি এক শক্তি নিক্ষেপ করিলে সূতপুত্র শরনিকরে তাহাও ছেদন করিয়া ফেলিলেন।
তদনন্তর মহাবীর মাদ্রীতনয় সত্বর রথ হইতে অবতরণ-পূর্ব্বক রোষানলে প্রজ্বলিত হইয়াই যেন কর্ণকে লক্ষ্য করিয়া এক রথচক্র পরিত্যাগ করিলেন। সূতনন্দন সেই কালচক্রসদৃশ রথচক্র আগমন করিতে দেখিয়া সহস্র সহস্র শর নিক্ষেপপূর্ব্বক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন সহদেব তাঁহার প্রতি ঈষাদণ্ড, যোক্ত, বিবিধ যুগ, হস্ত্যঙ্গ এবং নিহত অশ্ব ও মনুষ্যসকল নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। কর্ণও শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক তৎ-সমুদায় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মাদ্রীতনয় আপনাকে আয়ুধশূন্য ও কর্ণের শরনিকরে নিবারিত দেখিয়া তৎক্ষণাৎ সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিলেন। মহাবীর কর্ণ ক্ষণকাল তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইয়া হাস্যমুখে অতি নিষ্ঠুর বাক্যে কহিতে লাগিলেন, হে সহদেব! তুমি মহাবল পরাক্রান্ত রথিগণের সহিত কদাচ যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইও না। তুল্য ব্যক্তির সহিত যুদ্ধ করাই তোমার কর্তব্য। হে মাদ্রেয়। তুমি আমার বাক্যে কিছুমাত্র আশঙ্কা করিও না। মহাবীর কর্ণ সহদেবকে এই কথা বলিয়া কাৰ্ম্মক-কোটিদ্বারা তাঁহার অঙ্গস্পর্শ করত পুনরায় কহিলেন, হে সহদেব। ঐ দেখ, ধনঞ্জয় পরম যত্নসহকারে কৌরবগণের সহিত যুদ্ধ করিতেছে; এক্ষণে তুমি অবিলম্বে তাহার সন্নিধানে, না হয়, গৃহাভিমুখে গমন কর।
হে মহারাজ! মহারথ কর্ণ সহদেবকে এইরূপ কহিয়া হাস্যমুখে পাঞ্চাল-সৈন্যগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তিনি তৎকালে আর্য্যা কুন্তীর বাক্য স্মরণ করিয়াই মৃতকল্প সহদেবকে বিনাশ করিলেন না। তখন সহদেব কর্ণশরে নিপীড়িত, বাক্শল্যে বিদ্ধ ও একান্ত বিমনায়মান হইয়া অতিশয় নির্ব্বেদ প্রাপ্ত হইলেন এবং সত্বর পাঞ্চালদেশীয় মহাত্মা জনমেজয়ের রথে আরোহণ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাবীর মদ্ররাজ দ্রোণাচার্য্যের আক্রমণার্থ সসৈন্যে সমাগত বিরাট নৃপতিকে শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বে বলি ও বাসবের যেমন যুদ্ধ হইয়াছিল, এক্ষণে ঐ দুই মহাধনুর্দ্ধরের তদ্রূপ ঘোরতর যুদ্ধ উপস্থিত হইল। মদ্ররাজ সত্বর নতপর্ব্ব শত শরদ্বারা সেনাপতি বিরাট নৃপতিকে আঘাত করিলে বিরাটরাজ প্রথমতঃ শাণিত নয় শরে মদ্ররাজকে প্রতিবিদ্ধ করিয়া পুনরায় ত্রিসপ্ততি ও তৎপরে শত শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর শল্য বিরাটরাজের চারি অশ্ব বিনাশপূর্ব্বক দুই বাণে তাঁহার ছত্র ও ধ্বজ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। বিরাট নৃপতি লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক স্বীয় অশ্ববিহীন রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া কাৰ্ম্মক বিস্ফারিত করত শাণিত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে মহাবীর শতানীক স্বীয় সহোদর বিরাটকে অশ্ববিহীন অবলোকন করিয়া সর্ব্বলোক-সমক্ষে রথারোহণে মদ্ররাজ সমীপে ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর শল্য শতানীককে সমাগত দেখিয়া ক্ষণকাল শরনিকরে বিদ্ধ করিয়া পরিশেষে তাঁহাকে যমরাজের রাজধানীতে প্রেরণ করিলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে মহাবীর শতানীক নিহত হইলে বাহিনীপতি বিরাট তাঁহার রথে আরোহণ করিয়া নয়ন বিস্ফারণ-পূর্ব্বক ক্রোধভরে দ্বিগুণতর বিক্রম প্রকাশ করত শরনিকরে মদ্ররাজের রথ সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর শল্য ক্রোধভরে সেনাপতি বিরাটরাজের বক্ষঃস্থলে নতপর্ব্ব শত শর নিক্ষেপ করিলেন। মহারথ বিরাট নৃপতি শল্যের শরাঘাতে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া রথোপরি অবসন্ন ও মূর্ছাগত হইলেন। সারথি তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া সত্বর সমরাঙ্গন হইতে অপসারিত করিল। তখন সেই বহুল পাণ্ডবসৈন্য শল্যশরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া চতুদ্দিকে ধাবমান হইল। মহাবীর ধনঞ্জয় ও বাসুদেব তদ্দর্শনে সত্বর শল্য-সন্নিধানে আগমন করিলেন। তখন রাক্ষসেন্দ্র অলম্বুষ তুরঙ্গবদন, ঘোরদর্শন, পিশাচসংযুক্ত, রক্তার্দ্র ধ্বজপট পরিশোভিত, মাল্য বিভূষিত, ঋক্ষচৰ্ম্ম সংবৃত, বিচিত্র পক্ষ, বিকটাক্ষ, অনবরত শব্দায়মান, গৃধ্ররাজকর্তৃক অধিষ্ঠিত উন্নত ধ্বজ দণ্ডসম্পন্ন, অষ্টচক্রবিশিষ্ট, লৌহময় রথে আরোহণ করিয়া তাহাদের দুইজনের প্রতি ধাবমান হইলেন।
শৈলরাজ যেমন সমীরণের গতিরোধ করিয়া থাকে, তদ্রূপ সেই বিদলিত অঞ্জনপুঞ্জসদৃশ রাক্ষসরাজ অনবরত শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক অর্জুনকে অবরোেধ করিল। তখন অলম্বুষের সহিত অর্জুনের গৃধ, কাক, বল, উলুক, কঙ্ক ও গোমায়ুগণের হর্ষবর্দ্ধন, দর্শকগণের প্রীতিকর, ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মহাবীর অর্জুন ছয় শরে রাক্ষস অলম্বুষকে নিপীড়িত ও শাণিত দশ বাণে তাঁহার ধ্বজদণ্ড খণ্ড খণ্ড করিয়া তিন শরে সারথি, তিন শরে ত্রিবেণু, এক শরে কার্ম্মক ও চারি শরে অশ্বচতুষ্টয় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন রাক্ষস অলম্বুষ পুনরায় জ্যাসম্পন্ন অন্য শরাসন গ্রহণ করিল। মহাবীর অর্জুন অবিলম্বে তাহাও ছেদন করিয়া তাহাকে নিশিত চারি শরে বিদ্ধ করিলেন। অলম্বুষ অর্জুনশরে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া প্রাণভয়ে সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক পলায়ন করিল।
হে মহারাজ! মহাবীর ধনঞ্জয় এইরূপে অলম্বুষকে পরাজয় করিয়া কুঞ্জর, অশ্ব ও মনুষ্যগণের প্রতি শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক অবিলম্বে দ্রোণ-সন্নিধানে ধাবমান হইলেন। দ্রোণসৈন্যগণ তাঁহার সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া সমীরণোমূলিত মহীরুহসমুদায়ের ন্যায় ভূতলে নিপাতিত হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে সকলেই নিতান্ত ভীত হইয়া ভয়ব্যাকুলিত মৃগযুথের ন্যায় সমর পরিত্যাগপূর্ব্বক চতুৰ্দ্দিকে ধাবমান হইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এদিকে আপনার পুত্র চিত্রসেন নকুলপুত্র শতানীককে সুতীক্ষ্ণ শরনিকরে কৌরবসৈন্য-গণকে বিনষ্ট করিতে দেখিয়া তাঁহার নিবারণে প্রবৃত্ত হইলেন। নকুলনন্দন নারাচাস্ত্রদ্বারা চিত্রসেনকে নিপীড়িত করিলে চিত্রসেন তাঁহাকে প্রথমতঃ নিশিত দশ শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় তাঁহার বক্ষঃস্থলে নয় বাণ নিক্ষেপ করিলেন। তখন নকুলকুমার নতপর্ব্ব শরনিকরে চিত্রসেনের বিচিত্র বৰ্ম্ম ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। মহাবীর চিত্রসেন বৰ্ম্মবিহীন হইয়া নির্মোক-নির্মুক্ত ভুজগের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। তখন নকুলতনয় সুনিশিত শরজালে তাঁহার ধ্বজ ও শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে মহারথ চিত্রসেন বৰ্ম্মহীন ও শরাসনবিহীন হইয়া ক্রোধভরে অরাতিবিদারণ অন্য শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক শতানীককে নতপর্ব্ব শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত শতানীক ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তাঁহার চারি অশ্ব ও সারথিকে নিপাতিত করিলেন। বলবান্ চিত্রসেন তৎক্ষণাৎ রথ হইতে অবরোহণপূর্ব্বক নকুল-তনয়কে পঞ্চবিংশতি শরে নিপীড়িত করিলেন। মহাবীর শতানীক চিত্রসেনকে বাণ বর্ষণ করিতে দেখিয়া অর্দ্ধচন্দ্র বাণে তাঁহার সুবর্ণমণ্ডিত শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। এইরূপে চিত্রসেন অশ্ব, সারথি, রথ ও শরাসনবিহীন হইয়া মহাত্মা হার্দিক্যের রথে আরোহণ করিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় মহাবীর কর্ণপুত্র বৃষসেন মহারথ দ্রুপদকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। যজ্ঞসেন যষ্টি শরে কর্ণপুত্রের বাহুদ্বয় ও বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিলেন। বৃষসেনও রোষাবিষ্ট হইয়া রথস্থ দ্রুপদরাজের বক্ষঃস্থলে সুতীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন সেই বীরদ্বয় পরস্পরের শরজালে বিদ্ধ হইয়া সলোম শল্পকীদ্বয়ের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। সুবর্ণপুঙ্খ নতপর্ব্ব সরল শরনিকরের আঘাতে তাঁহাদের কলেবর শোণিতাক্ত হওয়াতে তাঁহাদিগকে অদ্ভুত কল্পবৃক্ষদ্বয়ের ন্যায় ও বিকশিত কিংশুকদ্বয়ের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল।
অনন্তর মহাবীর বৃষসেন দ্রুপদকে প্রথমতঃ নয় শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় সপ্ততি ও তৎপরে তিন শরে বিদ্ধ করিলেন এবং এক এক বারে সহস্র সহস্র শর পরিত্যাগ করত বর্ষমাণ মেঘের ন্যায় শোভমান হইলেন। তখন মহাবীর দ্রুপদ ক্রুদ্ধ হইয়া নিশিত ভল্লদ্বারা বৃষসেনের শরাসন দুই খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর কর্ণতনয় তৎক্ষণাৎ অন্য এক সুবর্ণমণ্ডিত শরাসন গ্রহণ ও তৃণীর হইতে সুবর্ণবর্ণ নিশিত ভল্ল বহিষ্কৃত করিয়া তাহাতে সংযোজনপূর্ব্বক সোমকগণকে ভীত করত দ্রুপদের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। বৃষসেননিক্ষিপ্ত ভল্ল দ্রুপদ-রাজের হৃদয় ভেদ করিয়া বসুধাতলে প্রবিষ্ট হইল। মহাবীর যজ্ঞসেন সেই ভল্লের আঘাতে মোহপ্রাপ্ত হইলেন। সারথি আপনার কর্তব্য স্মরণপূর্ব্বক তাঁহাকে লইয়া পলায়ন করিল।
হে মহারাজ! এইরূপে সেই মহারথ পাঞ্চালরাজ সমর পরিত্যাগ করিলে কৌরবসৈন্যেরা সেই ভীষণ রজনীযোগে বৰ্ম্মহীন দ্রুপদসেনাগণের প্রতি ধাবমান হইল। তৎকালে প্রদীপ-সকল ইতস্ততঃ প্রজ্বলিত হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল যেন, মেঘশূন্য আকাশমণ্ডল গ্রহগণে সমাকীর্ণ হইয়াছে। অঙ্গদসকল চতুদ্দিকে নিপতিত থাকাতে সমরভূমি বিদ্যুদ্দামরঞ্জিত জলদ-পটলের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। তারকাসুরের সংগ্রামসময়ে দানবগণ যেমন ইন্দ্রের ভয়ে পলায়ন করিয়াছিল, তদ্রূপ সোমকগণ বৃষসেনের শরনিকরে সমাহত হইয়া প্রাণভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবীর কর্ণতনয় তাহাদিগকে পরাজয় করিয়া মধ্যাহ্নকালীন মার্ত্তণ্ডের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষীয় সহস্র নরপতিমধ্যে একমাত্র বৃষসেন স্বীয় তেজঃপ্রভাবে প্রজ্বলিত হইয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন। এইরূপে মহাবীর কর্ণনন্দন সোমক মহারথদিগকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া রাজা যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করিলেন।
হে মহারাজ! এদিকে আপনার পুত্র মহারথ দুঃশাসন প্রতিবিন্ধ্যকে অরাতিনিধনে নিতান্ত তৎপর দেখিয়া তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন সেই বীরদ্বয় সংগ্রামার্থ পরস্পর মিলিত হইয়া নিৰ্ম্মল নভোমণ্ডলস্থ বুধ ও শুক্রাচার্য্যের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। মহাবীর দুঃশাসন অতি ভীষণ কার্য্যে প্রবৃত্ত প্রতিবিন্ধ্যের ললাটে তিন শর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর প্রতিবিন্ধ্য দুঃশাসনের শরে অতিমাত্র বিদ্ধ হইয়া শৃঙ্গবান্ পর্ব্বতের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইলেন এবং দুঃশাসনকে প্রথমতঃ নয় ও তৎপরে সাত শরে বিদ্ধ করিলেন। তখন আপনার পুত্র তীক্ষ্ণ শরনিকরে প্রতিবিন্ধ্যের অশ্বগণকে নিপাতিত করিয়া এক ভল্লে তাঁহার ধ্বজ ও সারথির মস্তক ছেদনপূর্ব্বক তাঁহার রথ, পতাকা, তৃণীর, রথী ও যোজ্র সমুদায় খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। মহাত্মা প্রতিবিন্ধ্য রথবিহীন হইয়াও শরাসন হস্তে অবস্থানপূর্ব্বক অসংখ্য শর নিক্ষেপ করত আপনার পুত্রের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর দুঃশাসন তদ্দর্শনে ক্ষুরপ্রাস্ত্র নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার কোদণ্ড দ্বিখণ্ড করিয়া তাঁহাকে দশ শরে তাড়িত করিলেন। অনন্তর প্রতিবিন্ধ্যের ভ্রাতৃগণ তাঁহাকে রথবিহীন অবলোকন করিয়া বিপুল সৈন্য-সমভি-ব্যাহারে তাঁহার সমীপে সমাগত হইলেন। তখন প্রতিবিন্ধ্য শ্রুতসোমের ভাস্বর রথে আরোহণপূর্ব্বক শরাসন গ্রহণ করিয়া আপনার পুত্রকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে কৌরব-পক্ষীয়েরা দুঃশাসনের সাহায্যার্থ মহতী সেনা-সমভিব্যাহারে আগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে পরিবেষ্টিত করিয়া বিপক্ষগণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। হে মহারাজ। সেই ঘোরতর রজনীযোগে পাণ্ডবগণের সহিত কৌরবগণের যমরাজ্যবর্দ্ধন তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় মহাবল সুবল-নন্দন নকুলকে সৈন্যসংহারে প্রবৃত্ত দেখিয়া তাঁহার সমীপে গমনপূর্ব্বক থাক্ থাক্, বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন। তখন সেই বদ্ধবৈর মহাবীরদ্বয় পরস্পরকে সংহার করিবার মানসে শরাসন আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক পরস্পরের প্রতি অনবরত শরনিকর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাবীর নকুল যেরূপ শর প্রয়োগ করিলেন, শকুনিও স্বীয় শিক্ষাবল প্রদর্শনপূর্ব্বক তদ্রূপ শরজাল বিস্তার করিতে লাগিলেন। তখন সেই বীরদ্বয় শরনিকরে সমাচ্ছন্নকলেবর হইয়া কণ্টকাকীর্ণ শল্পকী ও শাল্মলী বৃক্ষদ্বয়ের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। তাঁহাদের বর্ম্ম শরনিকরে ছিন্ন ভিন্ন ও কলেবর রুধিরধারায় সমাকুল হওয়াতে তাঁহাদিগকে বিচিত্র কল্পবৃক্ষ ও বিকশিত কিংশুক পাদপদ্বয়ের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। তৎপরে তাঁহারা লোচনযুগল বিস্তারপূর্ব্বক রোষানলে পরস্পরকে দগ্ধ করিয়াই যেন, কুটিলভাবে পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন।
অনন্তর মহাবীর সুবলতনয় একান্ত ক্রোধাবিষ্ট হইয়া হাস্যমুখে নিশিত কর্ণিদ্বারা নকুলের হৃদয়ে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর নকুল তন্নিক্ষিপ্ত কর্ণি-অস্ত্রে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া রথমধ্যে বিষণ্ণ ও মোহাবিষ্ট হইলেন। শকুনি সেই প্রবল বৈরী নকুলকে তদবস্থ অবলোকন করিয়া বর্ষাকালীন জলদের ন্যায় গভীর গর্জন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মাদ্রীতনয় সংজ্ঞা-লাভপূর্ব্বক ব্যাদিতবদন কৃতান্তের ন্যায় পুনরায় শকুনির প্রতি ধাবমান হইলেন এবং ক্রোধভরে তাঁহাকে ষষ্টি শরে বিদ্ধ করিয়া শত নারাচে তাঁহার বক্ষঃস্থল ভেদ করিলেন। তৎপরে তাঁহার সশর শরাসনের মুষ্টিদেশ দুই খণ্ডে ছেদনপূর্ব্বক সত্বর ধ্বজদণ্ড খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর পীত নিশিত একমাত্র শরে তাঁহার উরুদ্বয় ভেদ করিয়া সপক্ষ শ্যেনের ন্যায় তাঁহাকে তৎক্ষণাৎ রথমধ্যে নিপাতিত করিলেন। তখন সুবলতনয় নকুল-নিক্ষিপ্ত শরে গাঢ়তর বিদ্ধ হইয়া নায়ক যেমন কামিনীকে আলিঙ্গন করে, তদ্রূপ ধ্বজযষ্টি আলিঙ্গনপূর্ব্বক রথমধ্যে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তাঁহার সারথি তাঁহাকে সংজ্ঞাহীন ও রথমধ্যে নিপতিত নিরীক্ষণ করিয়া সেনামুখ হইতে অবিলম্বে অপসারিত করিল। তদ্দর্শনে অনুচরগণ সমবেত পাণ্ডবেরা পরমাহ্লাদে চীৎকার করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! মহাবীর নকুল ঐরূপে শকুনিকে পরাজয় করিয়া সারথিকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সূত! তুমি এক্ষণে আমাকে দ্রোণসৈন্যাভিমুখে সমানীত কর। সারথি তাঁহার আজ্ঞা প্রাপ্ত হইবামাত্র দ্রোণাভিমুখে অশ্ব চালন করিতে লাগিল।
এদিকে কৃপাচার্য্য মহাবল শিখণ্ডীকে দ্রোণাভিমুখে গমন করিতে দেখিয়া পরম যত্নসহকারে মহাবেগে তাঁহার প্রত্যুদ্গমনে প্রবৃত্ত হইলেন। শিখণ্ডী কূপকে দ্রোণের সাহায্যার্থ দ্রুত বেগে আগমন করিতে দেখিয়া হাস্যমুখে নয় বাণে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন আপনার পুত্রগণের প্রিয়কারী কৃপাচার্য্য শিখণ্ডীকে প্রথমতঃ পাঁচ শরে বিদ্ধ করিয়া পুনরায় বিংশতি শরে বিদ্ধ করিলেন। পূর্ব্বে শম্বরাসুর ও সুররাজ ইন্দ্রের যেরূপ যুদ্ধ হইয়াছিল, এক্ষণে সেই বীরদ্বয়ের তদ্রূপ ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। তাঁহারা বর্ষাকালীন জলদের ন্যায় নভোমণ্ডল শরবৃষ্টিদ্বারা সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। হে মহারাজ! তখন সেই যুদ্ধ পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ভয়ানক হইয়া উঠিল। যোদ্ধাদিগের সেই ভয়জনক ঘোরা রজনী কালরাত্রির ন্যায় বোধ হইতে লাগিল।
অনন্তর মহাবীর শিখণ্ডী অর্দ্ধচন্দ্র বাণে কৃপাচার্য্যের শরাসন ছেদন করিয়া শাণিত শর বিস্তার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন কৃপাচার্য্য ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তাঁহার প্রতি রুক্মদণ্ড, অকুণ্ঠিতাগ্র, কর্মার-পরিমার্জিত এক ভয়ঙ্কর শক্তি নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর শিখণ্ডী সেই আচার্য্য-নিক্ষিপ্ত শক্তি আগমন করিতে দেখিয়া দশ শরে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন। তখন কৃপাচার্য্য সত্বর অন্য শরাসন গ্রহণ করিয়া শাণিত শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক শিখণ্ডীকে সমাচ্ছন্ন করিলেন। শিখণ্ডী সেই আচার্য্য-নির্মুক্ত শরজালপ্রভাবে অবসন্ন হইয়া রথমধ্যে অবস্থান করিতে লাগিলেন। মহাবীর কৃপাচার্য্য তাঁহাকে অবসন্ন নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহার বিনাশ-বাসনায় অনবরত শরবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। পাঞ্চাল ও সোমকগণ দ্রুপদতনয়কে একান্ত অবসন্ন ও সমরে বিমুখ অবলোকন করিয়া সাহায্যার্থ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিলেন। তখন আপনার আত্মজগণও বহুল বল-সমভিব্যাহারে কৃপাচার্য্যকে বেষ্টন করিতে লাগিলেন। অনন্তর উভয় পক্ষে পুনরায় ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। পরস্পর সম্মুখীন রথিগণের মেঘগর্জনসদৃশ তুমুল শব্দ হইতে লাগিল। অশ্বা-রোহী ও গজারোহিগণ পরস্পরের বিনাশে প্রবৃত্ত হওয়াতে সংগ্রামস্থল অতি দারুণ হইয়া উঠিল। ধাবমান পদাতিগণের পদশব্দে মেদিনী ভয়কম্পিত কামিনীর ন্যায় কম্পিত হইতে লাগিল। যেমন বায়সেরা শলভসমুদায় আক্রমণ করে, তদ্রূপ দ্রুতগামী রথে সমারূঢ় রথিগণ রথীদিগকে, মত্তমাতঙ্গগণ মাতঙ্গদিগকে, রোষিত অশ্বারোহিগণ অশ্বারোহীদিগকে ও পদাতিগণ পদাতিদিগকে আক্রমণ করিতে আরম্ভ করিল। সেই রাত্রিযোগে সৈন্যগণের মহাবেগে গমন, পলায়ন ও প্রত্যাগমন নিবন্ধন সমরাঙ্গনে তুমুল শব্দ সমুত্থিত হইল। রথ, হস্তী ও অশ্বগণের উপরিস্থিত প্রদীপসকল অম্বরস্খলিত মহোল্কা-সমুদায়ের ন্যায় বোধ হতে লাগিল। সেই অন্ধতমসাবৃত তমস্বিনী প্রদীপপ্রভায় প্রদীপ্ত হইয়া দিবসের ন্যায় শোভমান হইল। দিবাকর যেমন জগদ্ব্যাপ্ত গাঢ় তিমির বিনষ্ট করিয়া থাকেন, তদ্রূপ সেই প্রজ্বলিত প্রদীপসকল সমরভূমির ঘোরান্ধকার নিরাকৃত করিয়া ভূমণ্ডল, আকাশমণ্ডল ও দিজ্বণ্ডল আলোক-ময় করিল। সেই আলোকপ্রভাবে বীরগণের শস্ত্র, বৰ্ম্ম ও মণিসমুদায়ের প্রভাজাল তিরোহিত হইল। হে মহারাজ! সেই ঘোরতর রাত্রিযুদ্ধে যোধগণ আত্মপরজ্ঞানবিমূঢ় হইতে লাগিলেন। তখন মোহবশতঃ পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে, মিত্র মিত্রকে, মাতুল ভাগিনেয়কে, ভাগিনেয় মাতুলকে এবং আত্মীয়-গণ আত্মীয়গণকে বিনাশ করাতে সংগ্রাম মর্য্যাদাশূন্য ও ভীরুগণের ভয়াবহ হইয়া উঠিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে অতি ভীষণ তুমুল সংগ্রাম সমুপস্থিত হইলে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন সুদৃঢ় শরাসন ধারণপূর্ব্বক বারংবার জ্যাকর্ষণ করত দ্রোণাচার্য্যের সুবর্ণ-বিভূষিত রথের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণ ধৃষ্টদ্যুম্নকে দ্রোণাচার্য্যের বধসাধনে সমুদ্যত দেখিয়া দ্রুপদতনয়ের সাহায্যার্থ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিলেন। তদ্দর্শনে আপনার পুত্রেরাও পরম যত্নসহকারে দ্রোণকে রক্ষা করিতে লাগিলেন। এইরূপে সেই রজনীযোগে উভয় পক্ষীয় সেনা সমবেত হইলে তাহাদিগকে বাতাহত, ক্ষুব্ধসত্ত্ব', অতি ভীষণ সমুদ্রদ্বয়ের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। অনন্তর মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন আচার্য্যের বক্ষঃস্থলে পাঁচ শর নিক্ষেপ করিয়া সিংহনাদ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন দ্রোণাচার্য্য পঞ্চবিংশতি শরে দ্রুপদ-তনয়কে বিদ্ধ করিয়া এক ভল্লে তাঁহার ভাস্বর শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন। দ্রোণশরবিদ্ধ প্রবলপ্রতাপ ধৃষ্টদ্যুম্ন সত্বর সেই ছিন্ন কাৰ্ম্মক পরিত্যাগপূর্ব্বক ক্রোধে ওষ্ঠাধর দংশন করত আচার্য্যের বিনাশ-বাসনায় অন্য এক শরাসন গ্রহণ ও আকর্ণ আকর্ষণ করিয়া দ্রোণের প্রতি এক জীবিতান্তকারী ঘোরতর শর নিক্ষেপ করিলেন। সেই ধৃষ্টদ্যুম্নবিক্ষিপ্ত শর উদিত দিবাকরের ন্যায় সৈন্যসমুদায়কে উদ্ভাসিত করিতে লাগিল। দেব, দানব ও গন্ধর্ব্বগণ সেই ঘোরতর শর সন্দর্শন করিয়া দ্রোণাচার্য্যের মঙ্গল হউক, এই কথা বারংবার কহিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ সেই ধৃষ্টদ্যুম্ন-নির্মুক্ত শর আচার্য্যে রথ সমীপে না আসিতে আসিতেই দ্বাদশ খণ্ডে ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবীর কর্ণ এইরূপে শরনিকরে ধৃষ্টদ্যুম্নের শর ছেদন করিয়া তাঁহাকে শাণিত শরজালে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহারথ অশ্বত্থামা পাঁচ, দ্রোণ পাঁচ, শল্য নয়, দুঃশাসন তিন, দুর্য্যোধন বিংশতি ও শকুনি পাঁচ ভল্লে ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন এইরূপে দ্রোণের পরিত্রাণার্থী সাত মহারথীর শরে বিদ্ধ হইয়া তাঁহাদের প্রত্যেককে তিন তিন শরে প্রতিবিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা ধৃষ্টদ্যুম্নের শরনিকরে নিতান্ত নিপীড়িত ও সকলে সমবেত হইয়া ভীষণ নিনাদ করত তাঁহাকে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময়ে মহাবীর দ্রুমসেন সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া ধৃষ্টদ্যুম্নকে থাক্ থাক্, বলিয়া শরাঘাত করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর দ্রুপদতনয় দ্রুমরাজের প্রতি অতি তীক্ষ্ণ সুবর্ণপুঙ্খ প্রাণনাশক তিন শর নিক্ষেপ করিয়া এক ভল্লে তাঁহার উজ্জ্বল সুবর্ণকুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক ছেদন করিলেন। পরিপক্ক তাল ফল যেমন বাতাহত হইয়া ভূতলে নিপতিত হয়, তদ্রূপ সেই দ্রুমসেনের দংশিতাধর' মুণ্ড ভূতলে নিপতিত হইল। তখন মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন পুনরায় বীরগণকে নিশিত শরনিকরে নিপীড়িত করিয়া এক ভল্লে বিচিত্রযোদ্ধা কর্ণের শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিলেন।
মহাবীর কর্ণ সিংহ যেমন লাঙ্গুল ছেদন সহ্য করিতে অসমর্থ হয়, তদ্রূপ স্বীয় শরাসন ছেদন সহ্য করিতে না পারিয়া রোষকষায়িত-লোচনে নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত সত্বর অন্য শরাসন গ্রহণ ও শর বর্ষণপূর্ব্বক মহাবল পরাক্রান্ত ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতি ধাবমান হইলেন। ঐ সময়ে অন্য ছয় মহারথ কর্ণকে ক্রুদ্ধ নিরীক্ষণ করিয়া পাঞ্চাল পুত্রের বিনাশ-বাসনায় তাঁহাকে বেষ্টন করিলেন। হে মহারাজ! এইরূপে ধৃষ্টদ্যুম্ন কৌরবপক্ষীয় ছয় জন যোদ্ধার মধ্যে অবস্থিত হইলে যোধগণ তাঁহাকে কালকবলে নিপতিত বলিয়া বোধ করিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে মহাবীর সাত্যকি ধৃষ্টদ্যুম্নের সাহায্যার্থ শর বর্ষণ করত তাঁহার সমীপে ধাবমান হইলেন। কর্ণ যুদ্ধদুৰ্ম্মদ যুযুধানকে আগমন করিতে দেখিয়া দশ বাণে তাঁহাকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর সাত্যকি শূরগণের সমক্ষে কর্ণকে দশ শরে বিদ্ধ করিয়া পলায়ন করিও না, ঐ স্থানে অবস্থান কর, বলিয়া আস্ফালন করিতে লাগিলেন। অনন্তর বলি ও বাসবের ন্যায় বলবান্ সাত্যকি ও মহাত্মা কর্ণের ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। ক্ষত্রিয় প্রধান সাত্যকি রথনির্ঘোষে ক্ষত্রিয়গণকে ভীত করিয়া রাজীবলোচন রাধানন্দনকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণও শরাসনশব্দে বসুধা কম্পিত করত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া বিপাট, কর্ণি, নারাচ, বৎসদন্ত ও ক্ষুরপ্র প্রভৃতি শত শত অস্ত্রদ্বারা সাত্যকিকে বিদ্ধ করিলেন। বৃষ্ণিপ্রবীর যুযুধানও কর্ণের উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। তৎকালে তাঁহাদের উভয়েরই যুদ্ধ সমভাবে হইল। তখন আপনার পুত্রগণ কর্ণকে সম্মুখে রাখিয়া নিশিত শরনিকরে সাত্যকিকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। মহাবীর যুযুধান স্বীয় অস্ত্রদ্বারা তাঁহাদিগের ও কর্ণের অস্ত্রজাল নিবারণ করিয়া বৃষসেনের বক্ষঃস্থল বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। বলবীর্য্যশালী বৃষসেন সাত্যকির বাণে বিদ্ধ হইয়া শরাসন পরিত্যাগপূর্ব্বক রথোপরি নিপতিত হইলেন। মহারথ কর্ণ তদ্দর্শনে বৃষসেনকে নিহত বোধ করিয়া পুত্রশোকাকুলচিত্তে সাত্যকিকে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। মহারথ যুযুধানও কর্ণ-শরে নিপীড়িত হইয়া তাঁহাকে বিবিধ বাণে বারংবার বিদ্ধ করিলেন। অনন্তর তিনি দশ বাণে কর্ণকে ও পাঁচ বাণে বৃষসেনকে বিদ্ধ করিয়া অবিলম্বে উভয়ের শরমুষ্টি ও শরাসনদ্বয় ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ ও বৃষসেন সত্বর অতি ভীষণ অন্য শরাসনদ্বয় গ্রহণ ও জ্যারোপণ করিয়া চতুৰ্দ্দিক্ হইতে নিশিত শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক সাত্যকিকে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ! সেই অসংখ্য বীরনিপাতন ভয়ঙ্কর সংগ্রাম সময়ে গাণ্ডীবের ভীষণ নিম্বন অনবরত শ্রবণগোচর হইতে লাগিল। মহাবীর কর্ণ রথনির্ঘোষ ও গাণ্ডীবনিস্বন শ্রবণ করিয়া রাজা দুর্য্যোধনকে কহিলেন, হে মহারাজ! ধনঞ্জয় প্রধান প্রধান বীর ও কৌরবসৈন্যগণকে সংহার করিয়া গাণ্ডীবধ্বনি করিতেছে। অর্জুনের পর্জন্যনির্ঘোষসদৃশ রথনির্ঘোষও শ্রুতিগোচর হইতেছে। অতএব বোধ হয়, ধনঞ্জয় স্বকার্য্য সাধনে সমুদ্যত হইয়াছে। ঐ দেখুন, কৌরবসৈন্যগণ অর্জুনশরে বিদীর্ণ ও ইতস্ততঃ বিপ্রকীর্ণ হইতেছে। উহারা কোনক্রমেই এক স্থানে অবস্থান করিতে সমর্থ হইতেছে না। সমীরণ যেমন জলদজাল ছিন্ন ভিন্ন করিয়া থাকে, তদ্রূপ অর্জুন শরজাল বিস্তারপূর্ব্বক উহাদিগকে ছিন্ন ভিন্ন করিতেছে। এক্ষণে উহারা অর্জুনকে প্রাপ্ত হইয়া মহাসাগরে নিপতিত নৌকার ন্যায় বিদীর্ণ হইতেছে। হে মহারাজ! ঐ দেখুন, যোদ্ধৃগণ গাণ্ডীবনির্মুক্ত শরনিকরে নিপতিত এবং কেহ কেহ ইতস্ততঃ ধাবমান হইয়াছে। উহাদিগের কোলাহল এবং অর্জুনের রথ-সন্নিধানে নভোমণ্ডলের মেঘ-গর্জনের ন্যায় দুন্দুভিনির্ঘোষ, হাহাকার শব্দ ও সিংহনাদ শ্রুতিগোচর হইতেছে। ঐ দেখুন, সাত্যকি আমাদিগের মধ্যস্থলে অবস্থান করিতেছে। আর পাঞ্চাল-রাজপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণাচার্য্যের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইয়া আপনার সহোদর গণকর্তৃক পরিবৃত হইয়াছে। এক্ষণে যদি ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সাত্যকিকে বিনাশ করিতে পারি, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমাদিগের জয়লাভ হইবে। অতএব হে মহারাজ! আমরা সকলে সমবেত হইয়া অভিমন্যুকে যেরূপে সংহার করিয়াছি, ঐ বীরদ্বয়কেও সেইরূপে সংহার করা আমাদের কর্তব্য। ঐ দেখুন, ধনঞ্জয় সাত্যকিকে বহুসংখ্য কৌরবগণের সহিত সমরে প্রবৃত্ত জানিয়া দ্রোণসৈন্যাভিমুখে আগমন করিতেছে। অতএব আপনি সাত্যকি-সন্নিধানে বহুসংখ্য রথিগণকে প্রেরণ করুন। যুযুধান অসংখ্য মহারথপরিবৃত হইলে ধনঞ্জয় আর তাহাকে জ্ঞাত হইতে সমর্থ হইবে না। এক্ষণে বীরগণ সাত্যকিকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত অনবরত শরনিকর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করুন।
হে মহারাজ! অনন্তর আপনার আত্মজ রাজা দুর্য্যোধন কর্ণের অভিপ্রায় অবগত হইয়া শকুনিকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, হে মাতুল! তুমি দশসহস্র হস্তী ও দশসহস্র রথে পরিবৃত হইয়া ধনঞ্জয়-সন্নিধানে গমন কর। দুঃশাসন, দুর্বিষহ, সুবাহু ও দুৰ্ম্মর্ষণ - ইঁহারা বহুসংখ্যক পদাতি-সৈন্যে পরিবৃত হইয়া তোমার অনুগমন করিবেন। তুমি এক্ষণে ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব ও বাসুদেবকে সংহার কর। হে মাতুল। দেবগণ যেমন দেবরাজকে আশ্রয় করিয়া জয়াশা করিয়াছেন, তদ্রূপ আমি তোমারই উপর নির্ভর করিয়া জয়াশা করিয়া থাকি। পূর্ব্বে মহাবীর কার্তিকেয় যেমন অসুর-গণকে সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ তুমি এক্ষণে পাণ্ডবগণকে বিনাশ কর। হে মহারাজ! মহাবল সুবলনন্দন রাজা দুর্য্যোধনের আদেশানুসারে তাঁহারই প্রিয়ানুষ্ঠানার্থ বহুসংখ্য সৈন্য ও আপনার পুত্রগণের সমভিব্যাহারে পাণ্ডব-সংহারার্থ যাত্রা করিলেন। এইরূপে সুবলনন্দন পাণ্ডবসৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলে উভয় পক্ষে ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ হইল। তখন মহাবীর কর্ণ অসংখ্য সৈন্য-সমভিব্যাহারে অনবরত শরনিকর বর্ষণ করত সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইলেন। আপনার পক্ষীয় অন্যান্য বীরগণও সমবেত হইয়া যুযুধানকে পরিবেষ্টন করিলেন। ঐ সময় মহাবীর দ্রোণ ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতি গমন করিয়া তাঁহার ও পাঞ্চালগণের সহিত ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর যুদ্ধদুৰ্ম্মদ কৌরব-পক্ষীয় নরপতিগণ সুবর্ণ ও রত্নে খচিত অসংখ্য রথ এবং বহুসংখ্য হস্তী ও অশ্বারোহী-সমভিব্যাহারে ক্রোধভরে সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইলেন। মহারথগণ সত্যবিক্রম সাত্যকির চতুৰ্দ্দিক্ বেষ্টনপূর্ব্বক সিংহনাদ ও তর্জন-গর্জন করিয়া তাঁহার বিনাশ-বাসনায় তীক্ষ্ণ শরনিকর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। যুদ্ধদুৰ্ম্মদ মহাধনুর্দ্ধর অরাতিনিপাতন সাত্যকি এই বীরগণকে সমাগত অবলোকন করিয়া তাঁহাদের উপর বিবিধ শর পরিত্যাগপূর্ব্বক সন্নতপর্ব্ব বিশিখনিকরদ্বারা তাঁহাদিগের মস্তক এবং ক্ষুরপ্র দ্বারা গজসমুদায়ের শুণ্ড, অশ্বগণের গ্রীবা ও বীরগণের কেয়ূরযুক্ত বাহু ছেদন করিয়া ফেলিলেন। ঐ সময় অসংখ্য স্বেতচ্ছত্র ও চামরনিচয় নিপতিত হওয়াতে সমরভূমি নক্ষত্রমালামণ্ডিত নভোমণ্ডলের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। মহাবীর সাত্যকি এইরূপে সৈন্যগণকে বিনাশ করিতে আরম্ভকরিলে প্রেতগণের চীৎকারের ন্যায় তাঁহাদিগের তুমুল শব্দ সমুত্থিত হইল। সেই শব্দে রণভূমি পরিপূরিত হইলে, সেই ঘোররূপা রজনী অধিকতর ভয়াবহ হইয়া উঠিল।
হে মহারাজ! তখন মহারথ রাজা দুর্য্যোধন সাত্যকি-শরে সৈন্যগণকে উম্মলিত অবলোকন এবং লোমহর্ষণ তুমুল নিনাদ শ্রবণ করিয়া সারথিকে কহিলেন, হে সূত! যে প্রদেশে ঐ তুমুল শব্দ সমুত্থিত হইতেছে, সেই স্থানে অবিলম্বে অশ্ব সঞ্চালন কর। সারথি তাঁহার আদেশানুসারে যুযুধানের অভিমুখে রথ সঞ্চালন করিতে আরম্ভ করিল। বিজিতক্রম বিচিত্রযোদ্ধা রাজা দুর্য্যোধন এইরূপে সাত্যকির প্রতি ধাবমান হইলে মহাবীর যুযুধান শোণিতলোলুপ শাণিত দ্বাদশ শর আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক তাঁহার উপর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর দুর্য্যোধন শৈনেয়ের শরে অগ্রে নিপীড়িত হইয়া অমর্ষিতচিত্তে তাঁহাকে দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন। তখন সমস্ত পাঞ্চালগণের সহিত কৌরবগণের অতি অদ্ভুত যুদ্ধ উপস্থিত হইল। মহাবীর সাত্যকি ক্রোধাবিষ্টচিত্তে আপনার মহারথ পুত্র দুর্য্যোধনের বক্ষঃস্থলে অশীতি সায়ক নিক্ষেপপূর্ব্বক তাঁহার অশ্বগণকে শমনসদনে প্রেরণ করিয়া সারথিকে ভূতলে নিপাতিত করিলেন। তখন মহাবাহু দুর্য্যোধন সেই অশ্বশূন্য রথে অবস্থানপূর্ব্বক সাত্যকির রথের প্রতি নিশিত পঞ্চাশৎ শর পরিত্যাগ করিলেন। সাত্যকি লঘুহস্ততা প্রদর্শনপূর্ব্বক সেই দুর্য্যোধনপ্রেরিত শরনিকর নিবারণ করিয়া এক ভল্লে তাঁহার শরাসনের মুষ্টিদেশ ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তখন রাজা দুর্য্যোধন রথবিহীন ও কার্মুকবিহীন হইয়া তৎক্ষণাৎ কৃতবর্মার রথে আরোহণ করিলেন! এইরূপে দুর্য্যোধন সমরপরাজুখ হইলে সাত্যকি শরনিকরদ্বারা কৌরবসৈন্যগণকে বিদারিত করিতে লাগিলেন।
এদিকে মহাবীর শকুনি বহুসহস্র হস্তী, অশ্ব ও রথদ্বারা অর্জুনকে পরিবেষ্টিত করিয়া তাহার উপর নানাশস্ত্র প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। কালপ্রেরিত ক্ষত্রিয়গণ অর্জুনের প্রতি দিব্যাস্ত্রজাল পরিত্যাগপূর্ব্বক সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। অর্জুন শকুনিকে সমরে পরাজুখ করিবার মানসে সেই সহস্র সহস্র রথী, হস্তী ও অশ্বগণকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। তখন শকুনি রোষকযায়িত-লোচনে বিংশতি শরে অরাতিঘাতন অর্জুনকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার রথের উপর শত শর নিক্ষেপ করিলেন। তখন মহাবীর অর্জুন বিংশতি বাণে শকুনিকে ও তিন তিন বাণে অপরাপর ধনুর্দ্ধারিগণকে বিদ্ধ করিয়া অরাতি-নিক্ষিপ্ত শরনিকর নিবারণপূর্ব্বক বজ্রসম সায়কসমুদায়ে আপনাদের যোধগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! তৎকালে বসুধাতল যোধগণের সহস্র সহস্র ছিন্ন ভুজ ও কলেবর দ্বারা, কুসুমে সমাবৃত, কিরীট-কুণ্ডল-মণ্ডিত, নিষ্কচূড়ামণি-বিভূষিত, উদ্বৃত্তলোচন' ও দংশিতাধর মস্তকসমুদায়দ্বারা চম্পকবিন্যস্ত পৰ্ব্বতসমূহে সমাকীর্ণ বলিয়া বোধ হইতে লাগিল।
তখন বিপুলবিক্রম বীভৎসু' সেই দুরূহ কৰ্ম্ম সম্পাদন করত নতপর্ব্ব পাঁচ বাণে শকুনিকে বিদ্ধ করিয়া তাঁহার সমক্ষে তাঁহার পুত্র উলুকের দেহ বিদারণপূর্ব্বক সিংহনাদে মেদিনীমণ্ডল কম্পিত করিতে লাগিলেন এবং সত্বর শকুনির শরাসন ছেদন করিয়া তাঁহার অশ্বচতুষ্টয়কে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। সুবলনন্দন এইরূপে অর্জুনশরে অশ্ববিহীন হইয়া অবিলম্বে স্বীয় রথ হইতে অবতরণপূর্ব্বক উলুকের রথে সমারূঢ় হইলেন। তখন সমুত্থিত মেঘদ্বয় যেমন পর্ব্বতে বারিবর্ষণ করে, তদ্রূপ এক রথে সমারূঢ় শকুনি ও তাঁহার পুত্র উলুক অর্জুনের উপর অনবরত শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। মেঘাবলী যেরূপ সমীরণ-প্রভাবে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যায়, তদ্রূপ আপনার সেনাগণ অর্জুন-বাণে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া শঙ্কিতচিত্তে দশদিকে পলায়ন করিতে লাগিল। সেই গাঢ়তিমিরাবৃত' রজনীতে অনেক যোদ্ধা স্ব স্ব অশ্ব পরিত্যাগ ও অনেকে স্বয়ং অশ্ব সঞ্চালনপূর্ব্বক সন্ত্রস্তচিত্তে সমর হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইল। হে মহারাজ। এইরূপে বাসুদেব ও ধনঞ্জয় আপনার যোদ্ধৃবর্গকে পরাজিত করিয়া প্রসন্নমনে শঙ্খনিনাদ করিতে লাগিলেন।
ঐ সময় মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন তিন বাণে দ্রোণকে বিদ্ধ করিয়া নিশিত শরদ্বারা তাঁহার শরাসনমৌর্ব্বী ছেদন করিলেন। ক্ষত্রিয়মৰ্দ্দন দ্রোণ তৎক্ষণাৎ সেই, ছিন্ন চাপ ধরাতলে পরিত্যাগ করিয়া অন্য উৎকৃষ্ট শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক সাত বাণে ধৃষ্টদ্যুম্নকে ও পাঁচ বাণে তাঁহার সারথিকে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহারথ ধৃষ্টদ্যুম্ন শরনিকরদ্বারা দ্রোণকে নিবারণ করিয়া দেবরাজ যেমন অসুরসেনা সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ কৌরবসেনাগণকে বিনাশ করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! তৎকালে অসংখ্য কৌরবসৈন্য নিহত হইলে সমরাঙ্গনে উভয় পক্ষীয় সেনাগণের মধ্যে বৈতরণীসদৃশী ঘোরতরা শোণিতনদী প্রবাহিত হইল। সহস্র সহস্র নর, অশ্ব ও হস্তী উহার তরঙ্গে ভাসিতে লাগিল। প্রতাপশালী ধৃষ্টদ্যুম্ন এইরূপে সেই কৌরবসৈন্য বিদারণপূর্ব্বক দেবগণ-পরিবৃত দেবেন্দ্রের ন্যায় শোভমান হইয়া শঙ্খধ্বনি করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন শিখণ্ডী, নকুল, সহদেব, সাত্যকি ও বৃকোদর প্রভৃতি পাণ্ডবপক্ষীয় মহাবীরগণও কৌরবপক্ষীয় সহস্র সহস্র ভূপতির প্রাণ সংহারপূর্ব্বক জয়শালী হইয়া দুর্য্যোধন, কর্ণ, দ্রোণ ও অশ্বত্থামার সমক্ষে বারংবার সিংহনাদ ও শঙ্খনাদ করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর বাক্য প্রয়োগ-সুনিপুণ আপনার আত্মজ রাজা দুর্য্যোধন স্বীয় সৈন্যগণমধ্যে কতকগুলিকে পাণ্ডবগণের শরে নিহত ও কতকগুলিকে পলায়মান দেখিয়া অবিলম্বে কর্ণ ও দ্রোণের সন্নিধানে গমন-পূর্ব্বক ক্রোধভরে কহিতে লাগিলেন, হে বীরদ্বয়! আপনারা অর্জুনশরে জয়দ্রথকে নিহত নিরীক্ষণপূর্ব্বক ক্রোধাবিষ্ট হইয়া সমরানল প্রজ্বলিত করিয়াছেন; কিন্তু এক্ষণে পাণ্ডবসৈন্য-গণকর্তৃক আমার সৈন্যসমুদায় বিনষ্ট হইতেছে দেখিয়া অরাতি-বিনাশে সমর্থ হইয়াও একান্ত অশক্তের ন্যায় উপেক্ষা প্রদর্শন করিতেছেন। যদি আমাকে পরিত্যাগ করাই আপনাদের অভিপ্রেত ছিল, তৎকালে কি নিমিত্ত আপনারা পাণ্ডবগণকে সমরে পরাজয় করিবেন বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছিলেন! আপনারা পাণ্ডবগণকে পরাজয় করিতে স্বীকার না করিলে, আমি কদাচ তাঁহাদের সহিত এই লোকক্ষয়কর যুদ্ধ আরম্ভকরিতাম না। যাহা হউক, যদি এক্ষণে আমাকে পরিত্যাগ করা আপনাদিগের অভিপ্রেত না হয়, তাহা হইলে আপনারা অনুরূপ বিক্রম প্রকাশপূর্ব্বক সংগ্রামে প্রবৃত্ত হউন।
হে মহারাজ! মহাবীর দ্রোণ ও কর্ণ মহারাজ দুর্য্যোধনের বাক্যশ্রবণে দণ্ডঘট্টিত' ভুজঙ্গের ন্যায় ক্রুদ্ধ হইয়া ঘোরতর যুদ্ধ করিবার মানসে সিংহনাদ পরিত্যাগ করত পাণ্ডবপক্ষীয় সাত্যকি প্রভৃতি বীরগণের প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন পাণ্ডবেরাও স্বীয় সৈন্যগণ সমভি-ব্যাহারে সেই মহাবীরদ্বয়ের প্রতি আগমন করিতে লাগিলেন। অনন্তর শস্ত্রবিদগ্রগণ্য মহাবীর দ্রোণ রোষ-পরবশ হইয়া সত্বর সাত্যকিকে দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ দশ, রাজা দুর্য্যোধন সাত, বৃষসেন দশ ও শকুনি সাত শরে যুযুধানকে বিদ্ধ করিলেন। ঐ সময় সোমকগণ দ্রোণা-চার্য্যকে পাণ্ডবসৈন্যসংহারে প্রবৃত্ত দেখিয়া অবিলম্বে তাঁহার উপর শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর দ্রোণ ক্রুদ্ধ হইয়া দিবাকর যেমন স্বীয় করজাল বিস্তারপূর্ব্বক অন্ধকার বিনষ্ট করিয়া থাকেন, তদ্রূপ শরজাল প্রয়োগপূর্ব্বক 'ক্ষত্রিয়গণের প্রাণ সংহার করিতে আরম্ভ করিলেন। পাঞ্চালগণ দ্রোণশরে নিহন্যমান হইয়া তুমুল আর্তনাদ করিতে লাগিলেন এবং কেহ কেহ পুত্র, কেহ কেহ পিতা, কেহ কেহ ভ্রাতা, কেহ কেহ মাতুল, কেহ কেহ ভাগিনেয়, কেহ কেহ বয়স্য এবং কেহ কেহ সম্বন্ধী ও বান্ধবগণকে পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রাণরক্ষার্থ সত্বর পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন। কেহ কেহ মোহাবিষ্ট হইয়া দ্রোণ-অভিমুখেই উপস্থিত হইলেন। ঐ যুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষীয় অসংখ্য সৈন্য শমনসদনে গমন করিল। হতাবশিষ্ট সেনাগণ দ্রোণশরে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া প্রদীপ পরিত্যাগপূর্ব্বক পাণ্ডবগণ, কৃষ্ণ ও ধৃষ্টদ্যুম্নের সমক্ষেই ধাবমান হইল। তৎকালে পাণ্ডব সৈন্যগণ প্রদীপ পরিত্যাগ করিলে দিত্মমণ্ডল গাঢ়তর অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হওয়াতে কেহ কিছুই বিদিত হইতে সমর্থ হইল না। কেবল কৌরবগণের দীপালোকপ্রভাবে পাণ্ডবপক্ষ যোদ্ধাদিগের পলায়ন নয়নগোচর হইতে লাগিল। তখন মহাবীর দ্রোণ ও কর্ণ পাণ্ডবসৈন্যগণকে পলায়মান দেখিয়া শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক তাহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন।
হে মহারাজ! এইরূপে পাঞ্চালগণ বিনষ্ট ও পলায়িত হইলে মহাত্মা জনার্দ্দন নিতান্ত দীনমনাঃ হইয়া ধনঞ্জয়কে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে অর্জুন! মহাবীর সাত্যকি ও ধৃষ্টদ্যুম্ন পাঞ্চালসৈন্যগণ-সমভিব্যাহারে দ্রোণ ও কর্ণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছেন এক্ষণে আমাদিগের সৈন্যগণ, দ্রোণের শরনিকরে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পলায়ন করিতেছে; কিছুতেই নিবৃত্ত হইতেছে না। অতএব আইস, আমরা উহাদিগকে নিবারণ করিবার চেষ্টা করি। তখন কৃষ্ণ ও অর্জুন পলায়মান সৈন্য-দিগকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, হে বীরগণ! তোমরা ভীত হইয়া পলায়ন করিও না; ভয় পরিত্যাগ কর। এই আমরা সৈন্য সংগ্রহপূর্ব্বক ব্যূহ প্রস্তুত করিয়া দ্রোণ ও কর্ণের প্রতি | ধাবমান হইতেছি।
হে মহারাজ! ঐ সময় কেশব বৃকোদরকে আগমন করিতে দেখিয়া ধনঞ্জয়ের হর্ষোৎপাদন করিবার মানসে কহিতে লাগিলেন, হে সখে। ঐ দেখ, সমরশ্লাঘী মহাবীর ভীমসেন সোমক ও পাণ্ডবগণ-সমভিব্যাহারে দ্রোণ ও কর্ণের সহিত যুদ্ধার্থ আগমন করিতেছেন। অতএব আজি তুমি পাঞ্চালদেশীয় মহারথিগণ ও ভীমের সহিত সমবেত হইয়া বিপক্ষ-পক্ষীয় সৈন্যগণকে সংহার কর। মহাবীর ধনঞ্জয় বাসুদেবের বাক্য শ্রবণানন্তর তাঁহার সহিত দ্রোণ ও কর্ণের সমক্ষে সমুপস্থিত হইলেন। তখন পাণ্ডবসৈন্যগণ পুনরায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া অরাতিনিপাতনে প্রবৃত্ত দ্রোণ ও কর্ণের নিকট আগমন করিল। অনন্তর সেই চন্দ্রোদয়ে প্রবৃদ্ধ সাগরদ্বয়ের ন্যায় সমুত্তেজিত উভয় পক্ষের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। কৌরবসৈন্যগণ প্রদীপসকল, পরিত্যাগপূর্ব্বক উন্মত্তের ন্যায় পাণ্ডবদিগের সহিত যুদ্ধ আরম্ভ করিল। ঐ সময় ধূলিপটল ও অন্ধকার প্রভাবে রণস্থল সমাচ্ছন্ন হওয়াতে যোদ্ধারা স্ব স্ব নামোল্লেখপূর্ব্বক যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন স্বয়ংবরসভার ন্যায় সেই সমরাঙ্গনে ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত মহীপালগণের নাম শ্রবণগোচর হইল। ঐ সময় শস্থল মুহূর্তকাল নিঃশব্দ হইয়া রহিল। অনন্তর পুনরায় জয়শীল ও পরাজিত ব্যক্তিরা ক্রোধভরে তুমুল কোলাহল করিতে লাগিলেন। হে মহারাজ! তখন যে যে স্থানে প্রদীপসকল পরিদৃশ্যমান হইল, বীরগণ পতঙ্গের ন্যায় সেই সেই স্থানে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। এইরূপে সেই কৌরব ও পাণ্ডবগণ ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলে বিভাবরী অতি প্রগাঢ়' হইয়া উঠিল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর অরাতিনিপাতন কর্ণ ধৃষ্টদ্যুম্নকে সমরাঙ্গনে অবলোকন করিয়া তাঁহার বক্ষঃস্থলে মর্মভেদী দশ শর নিক্ষেপ করিলে মহাবীর ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁহাকে থাক্ থাক্, বলিয়া পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে সেই মহাবীরদ্বয় পরস্পরকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিয়া শরাসন আকর্ণ আকর্ষণপূর্ব্বক পরস্পরকে সুতীক্ষ্ণ সায়কসমূহে বিদ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর কর্ণ পাঞ্চালপ্রধান ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি ও অশ্বগণকে শমনসদনে প্রেরণপূর্ব্বক নিশিত শরনিকরে তাঁহার কাৰ্ম্মক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত ধৃষ্টদ্যুম্ন এইরূপে অশ্ব, সারথি ও কার্মুকবিহীন হইয়া গদা গ্রহণপূর্ব্বক রথ হইতে কর্ণ-সমীপে গমন করিয়া তাঁহার চারি অশ্ব বিনাশ করিলেন। তৎপরে তিনি বেগে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া অর্জুনের রথে আরোহণপূর্ব্বক পুনরায় কর্ণ-সমীপে গমনোদ্যত হইলে ধৰ্ম্মসূনু' যুধিষ্ঠির তাঁহাকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় মহাতেজস্বী কর্ণ সিংহনাদ, ধনুষ্টঙ্কার ও শঙ্খপ্রস্নাপন করিতে আরম্ভ করিলেন।
হে মহারাজ! ঐ সময় মহারথ পাঞ্চালগণ ধৃষ্টদ্যুম্নকে পরাজিত অবলোকন করিয়া ক্রোধভরে অস্ত্র-শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক জীবিত-নিরপেক্ষ হইয়া কর্ণের অভিমুখীন হইলেন। তৎকালে কর্ণের সারথিও তাঁহার রথে শঙ্খবর্ণ, সিন্ধুদেশোদ্ভব, বেগগামী অন্য অশ্বসমুদায় সংযোজিত করিল। তখন মেঘ যেমন পর্ব্বতোপরি বারিধারা বর্ষণ করে, তদ্রূপ লব্ধলক্ষ্য মহাবীর রাধেয় পাঞ্চালবংশীয় মহারথদিগের প্রতি আয়ত শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। পাঞ্চালসেনাগণ কর্ণকর্তৃক মৰ্দ্দিত হইয়া সিংহাদ্দিত মৃগযুথের ন্যায় ভয়ে পলায়ন করিতে আরম্ভকরিল এবং অনেকে অশ্ব, হস্তী ও রথ হইতে ধরাতলে নিপতিত হইতে লাগিল। মহারথী কর্ণ ধাবমান হস্ত্যারোহী, অশ্বারোহী ও পদাতিগণের মধ্যে ক্ষুরপ্রাস্ত্রে কাহারও বাহু, কাহারও উরু, কাহারও বা কুণ্ডলালঙ্কৃত মস্তক ছেদন করিয়া ফেলিলেন। তৎকালে অন্যান্য মহারথগণ স্ব স্ব গাত্র ও বাহনসকল ছিন্ন ভিন্ন হইলেও কিছুমাত্র অবগত হইতে পারিলেন না। এইরূপে পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ নিতান্ত অস্থির হইয়া উঠিল। তখন তৃণস্পন্দনেও তাহাদিগের মনে কর্ণভ্রম উপস্থিত হইল। তাহারা স্বপক্ষীয় যোদ্ধাদিগকেও কর্ণজ্ঞান করিয়া ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবীর কর্ণ চারিদিকে শরবর্ষণ করত তাহাদিগের পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। যোধগণ কর্ণ ও দ্রোণাচার্য্যের শরপ্রহারে বিচেতন হইয়া চতুৰ্দ্দিক্ নিরীক্ষণ করত পলায়ন করিতে লাগিল। কেহই সমরে অবস্থান করিতে সমর্থ হইল না।
হে মহারাজ। তখন রাজা যুধিষ্ঠির স্বীয় সৈন্যগণকে বিদ্রাবিত অবলোকন করিয়া পলায়ন করিবার মানসে অর্জুনকে কহিলেন, হে ভ্রাতঃ। ঐ দেখ, মহাধনুর্দ্ধর কর্ণ এই ভীষণ রজনীতে প্রখর ভাস্করের ন্যায় অবস্থান এবং তোমার আত্মীয়গণ কর্ণশরে ক্ষত-বিক্ষত হইয়া অনাথের ন্যায় আর্তনাদ করিতেছে। সূতপুত্র যে কখন শরসন্ধান এবং কখনই বা শরনিক্ষেপ করিয়া সৈন্যগণকে আকুলিত করিতেছে, তাহা কিছুই লক্ষিত হইতেছে না। অতএব হে ধনঞ্জয়! এক্ষণে সময়োচিত কার্য্য অবধারণ-পূর্ব্বক যাহাতে সূতপুত্রের বধসাধন হয়, তাহা সম্পাদন কর।
হে মহারাজ! রাজা যুধিষ্ঠির এইরূপ কহিলে মহাবীর অর্জুন কৃষ্ণকে কহিলেন, হে কেশব! আজি ধর্মরাজ সূতপুত্রের বিক্রম দর্শনে ভীত হইয়াছেন। দেখ, সৈন্যগণ বারংবার আমা-দিগকে আক্রমণ করিতেছে, অতএব তুমি অবিলম্বে সময়োচিত কার্য্যের অনুষ্ঠান কর। আমাদিগের সেনাসকল দ্রোণাচার্য্যের শরপীড়িত হইয়া পলায়ন করিতেছে; কেহই রণস্থলে অবস্থান করিতে সমর্থ হইতেছে না। মহাবীর কর্ণও নিশিত শরে প্রধান প্রধান রথীদিগকে বিদ্রাবিত করিয়া নির্ভীকচিত্তে ভ্রমণ করিতেছে। হে বৃষ্ণিশাদুল! ভুজঙ্গম যেমন কাহারও পাদস্পর্শ সহ্য করিতে পারে না, তদ্রূপ আমি এই সংগ্রামস্থলে সূতপুত্রের পরাক্রম সহ্য করিতে সমর্থ হইতেছি না। অতএব হে কৃষ্ণ! তুমি শীঘ্র কর্ণ-সমীপে রথ সঞ্চালন কর। আজি হয়, আমি উহার বিনাশ সাধন করিব, না হয় ঐ দুরাত্মাই আমার বধসাধন করিবে।
বাসুদেব কহিলেন, হে কৌন্তেয়! আমি অলৌকিক-বিক্রমশালী কর্ণকে সুররাজের ন্যায় সমরে বিচরণ করিতে দেখিতেছি। তুমি ও ঘটোৎকচ ভিন্ন আর কেহই উহার প্রতিদ্বন্দ্বী নাই। কিন্তু এক্ষণে কর্ণের অভিমুখীন হওয়া তোমার নিতান্ত অনচিত। সূতপুত্র তোমার বধসাধনার্থ দেদীপ্যমান মহোল্কাসদৃশ দেবরাজ-প্রদত্ত ভীষণ শক্তি অতি যত্নসহকারে রক্ষা করত ঘোররূপে সমরাঙ্গনে অবস্থান করিতেছে; অতএব তোমাদের সতত অনুরক্ত ও হিতৈষী মহাবীর ঘটোৎকচ কর্ণের অভিমুখে গমন করুন। ঐ দেবতুল্য পরাক্রমশালী রাক্ষস মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়াছে এবং দিব্য, আসুর ও রাক্ষস-অস্ত্রে উহার বিশেষ পারদর্শিতা আছে, অতএব ঘটোৎকচ অবশ্যই কর্ণকে পরাজয় করিতে সমর্থ হইবে।
হে মহারাজ! কমললোচন অর্জুন বাসুদেবকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া ঘটোৎকচকে আহ্বান করিলেন। বিচিত্র-কবচমণ্ডিত ভীমসেনকুমার অর্জুনের আহ্বান শ্রবণমাত্র খড়া ও ধনুর্ব্বাণ ধারণপূর্ব্বক তাঁহার সমীপে সমাগত হইয়া তাঁহাকে ও বাসুদেবকে অভিবাদনপূর্ব্বক সগর্ব্ব বচনে কহিলেন, হে মহাত্মন্! আমি উপস্থিত হইয়াছি, আজ্ঞা করুন, কোন্ কার্য্য সম্পাদন করিতে হইবে? তখন বাসুদেব হাস্যমুখে সেই দীর্ঘলোচন, মেঘসঙ্কাশ ভীমতনয়কে কহিলেন, হে ঘটোৎকচ! আমি তোমায় যে কথা কহিতেছি, তাহার শ্রবণ কর। এক্ষণে এই সংগ্রামে তোমার বিক্রম প্রকাশের উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইয়াছে; তুমি ভিন্ন অন্য কেহই পরাক্রম প্রকাশে সমর্থ হইবে না। তোমার নিকট রাক্ষসী-মায়া ও বিবিধ অস্ত্র বিদ্যমান রহিয়াছে; অতএব তুমি যুদ্ধসাগরনিমগ্ন পাণ্ডবগণের প্লবস্বরূপ হও। ঐ দেখ, পাণ্ডবসেনাগণ গোপাল'-তাড়িত গোসমূহের ন্যায় কর্ণশরে বিদ্রাবিত হইতেছে। দৃঢ়বিক্রম ধনুর্দ্ধারী সূতনন্দন পাণ্ডবসেনামধ্যে প্রধান প্রধান ক্ষত্রিয়গণকে বিনাশ করিতেছে। দৃঢ়চাপধারী যোধগণ অসংখ্য শর বর্ষণ করিয়াও কর্ণশরপ্রভাবে সমরে অবস্থান করিতে নিতান্ত অশক্ত হইয়াছে। এই ঘোর নিশীথসময়ে পাঞ্চালগণ কর্ণশরে নিপীড়িত হইয়া সিংহাদ্দিত মৃগের ন্যায় ভয়ে পলায়ন করিতেছে। হে ভীমবিক্রম! ভীমতনয়! এক্ষণে তুমি ভিন্ন কর্ণকে নিবারণ করা আর কাহারও সাধ্য নহে। অতএব তুমি মাতৃকুল, পিতৃকুল এবং আপনার তেজস্বিতা ও অস্ত্রবলের অনুরূপ কার্য্যে প্রবৃত্ত হও। হে হিড়িম্বা-তনয়! মানবগণ পুত্রদ্বারা বন্ধু-বান্ধবগণের সহিত ইহলোকে দুঃখ হইতে বিমুক্ত ও পরলোকে উৎকৃষ্ট গতি প্রাপ্ত হইবার মানসেই পুত্রকামনা করিয়া থাকেন। অতএব তুমি এক্ষণে পিতৃবান্ধবগণকে দুঃখসমুদ্র হইতে উদ্ধার কর। হে ঘটোৎকচ। তুমি সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলে তোমার অস্ত্রবল অতি ভীষণ ও মায়া দুস্তর হইয়া উঠে। তোমার সমান যুদ্ধনিপুণ আর কেহই নাই। অতএব তুমি এই রজনীতে কর্ণসায়কভিন্ন' পাণ্ডবগণকে উদ্ধার কর। হে রাক্ষসশ্রেষ্ঠ। নিশাচরগণ রাত্রিকালে অমিত-বলবিক্রমশালী, নিতান্ত দুর্দ্ধর্ষ ও সংগ্রামনিপুণ হইয়া উঠে। অতএব তুমি এই নিশীথসময়ে মায়াপ্রভাবে ধনুর্দ্ধারী কর্ণকে বিনাশ কর। পার্থগণ ধৃষ্টদ্যুম্নকে অগ্রসর করিয়া দ্রোণকে বিনাশ করিবেন।
হে মহারাজ! অনন্তর কেশবের বাক্যাবসান হইলে মহাবীর ধনঞ্জয় ঘটোৎকচকে কহিলেন, বৎস! সমুদায় পাণ্ডব-সৈন্যমধ্যে তুমি, মহাবাহু সাত্যকি ও মহাবীর ভীমসেন, তোমরা এই তিন জনই আমার মতে সর্ব্বপ্রধান। এক্ষণে তুমি এই। রজনীযোগে কর্ণের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। মহারথ সাত্যকি তোমার পৃষ্ঠরক্ষক হইবেন। পূর্ব্বকালে দেবরাজ যেমন কার্তিকেয়ের সহিত মিলিত হইয়া তারকাসুরকে সংহার করিয়াছিলেন, তদ্রূপ তুমি অদ্য সাত্যকির সহিত মিলিত হইয়া কর্ণকে বিনাশ কর।
ঘটোৎকচ ধনঞ্জয়ের বাক্য শ্রবণান্তর কহিলেন, হে মহাত্মন্! কি কর্ণ, কি দ্রোণ, কি অন্যান্য অস্ত্রবেত্তা ক্ষত্রিয়গণ, আমি সকলকেই পরাজয় করিতে পারি। অদ্য সূতপুত্রের সহিত এরূপ যুদ্ধ করিব যে, যতদিন পৃথিবী থাকিবে, ততদিন লোকে আমার সংগ্রামবৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিবে। অদ্য কি শূর, কি শঙ্কিত, কি বদ্ধাঞ্জলি বিপক্ষ পক্ষীয় কোন ব্যক্তিকেই পরিত্যাগ করিব না। রাক্ষসধর্ম অবলম্বনপূর্ব্বক সকলকেই সংহার করিব।
হে মহারাজ! অরাতিঘাতন মহাবাহু ঘটোৎকচ এই বলিয়া কৌরবসৈন্যগণকে ভীত করত কর্ণের সহিত তুমুল সংগ্রাম করিতে ধাবমান হইলেন। পুরুষশ্রেষ্ঠ সূতনন্দন সেই দীপ্তাস্য' ক্রুদ্ধ নিশাচরকে হাস্যমুখে প্রতিগ্রহ করিলেন। তখন ইন্দ্র ও প্রহ্লাদের ন্যায় কর্ণ ও ঘটোৎকচের ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভহইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় রাজা দুর্য্যোধন ঘটোৎকচকে সূতপুত্রের বিনাশ-বাসনায় গমন করিতে দেখিয়া দুঃশাসনকে কহিলেন, হে ভ্রাতঃ। ঐ দেখ, রাক্ষসেন্দ্র ঘটোৎকচ কর্ণের বিক্রম দর্শন করিয়া উঁহার প্রতি ধাবমান হইয়াছে; অতএব মহাবল পরাক্রান্ত কর্ণ যে স্থলে ঘটোৎকচের সহিত যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইয়াছেন, তুমি সসৈন্যে তথায় গমনপূর্ব্বক যত্নসহকারে তাহাকে রক্ষা কর। ভীমতনয় যেন কর্ণকে প্রমাদকালে' সংহার করিতে সমর্থ না হয়। হে মহারাজ! দুর্য্যোধন দুঃশাসনকে এই কথা কহিতেছেন, ইত্যবসরে মহাবল পরাক্রান্ত বীরাগ্রগণ্য জটাসুরতনয় অলম্বল তাঁহার নিকট আগমন করিয়া কহিল, হে রাজন! আমি আপনার বিখ্যাত শত্রু যুদ্ধদুৰ্ম্মদ পাণ্ডবদিগকে অনুচরগণের সহিত বিনাশ করিতে বাসনা করি। আপনি অনুগ্রহপূর্ব্বক অনুজ্ঞা প্রদান করুন, পূর্ব্বে ক্ষুদ্রাশয় কুন্তীপুত্রেরা আমার পিতা রাক্ষসপ্রধান জটাসুরকে নিপাতিত করিয়াছে; অতএব আপনি অনুজ্ঞা প্রদান করিলে আজি আমি শত্রুগণের শোণিত ও মাংসদ্বারা তাঁহাকে পূজা করিয়া তাঁহার ঋণ হইতে বিমুক্ত হই।
হে মহারাজ। রাজা দুর্য্যোধন জটাসুরতনয়ের বাক্যশ্রবণে অতিশয় প্রীত হইয়া বারংবার তাহাকে কহিতে লাগিলেন, হে রাক্ষসেন্দ্র! আমি দ্রোণাচার্য্য ও কর্ণ প্রভৃতি মহাবীরগণের সাহায্যে অনায়াসে পাণ্ডব-বিনাশে সমর্থ হইব। এক্ষণে তোমাকে অনুমতি প্রদান করিতেছি যে, তুমি শীঘ্র ঘটোৎকচকে বিনাশ কর। ঐ মানুষসম্ভূত দুরাত্মা রাক্ষস অতি ক্রুরকর্মা এবং নিরন্তর পাণ্ডবগণের হিতসাধনে তৎপর। ঐ দুরাত্মা আকাশমার্গে অবস্থানপূর্ব্বক আমাদিগের হস্তী, অশ্ব ও রথসকল চূর্ণ করিতেছে; অতএব উহাকে যমরাজপুরে প্রেরণ কর।
অনন্তর মহাকায় জটাসুরতনয় দুর্য্যোধনের বাক্য স্বীকার করিয়া ভীমপুত্র ঘটোৎকচকে আহ্বানপূর্ব্বক তাহার উপর নানা প্রকার শর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। তখন হিড়িম্বাতনয় একাকী প্রবল বাত্যা যেমন মেঘমণ্ডলকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলে, তদ্রূপ অলম্বল, কর্ণ ও বহুসংখ্যক কুরুসৈন্যগণকে মথিত করিতে আরম্ভ করিল। মহাবীর অলম্বল ঘটোৎকচের মায়াবল নিরীক্ষণ করিয়া তাহাকে নানা লক্ষণসংযুক্ত শরনিকরে বিদ্ধ করত পাণ্ডবসৈন্যগণকে বিদ্রাবিত করিতে লাগিল। পাণ্ডবসৈন্যগণ সমীরণ-সঞ্চালিত জলদজালের ন্যায় চতুৰ্দ্দিকে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া পড়িল। এদিকে আপনার সৈন্যগণও ঘটোৎকচের শরে ক্ষত-বিক্ষত হইয়া প্রদীপ পরিত্যাগপূর্ব্বক সেই অন্ধকারে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। তখন মহাবীর অলম্বল রোষপরবশ হইয়া মাতঙ্গকে যেমন অঙ্কুশদ্বারা বিদ্ধ করে, তদ্রূপ ঘটোৎকচকে শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিল। মহাবীর ঘটোৎকচ তদ্দর্শনে - ক্রুদ্ধ হইয়া অলম্বলের রথ, সারথি ও সমস্ত আয়ুধ খণ্ড খণ্ড - করিয়া অট্ট অট্ট হাস্য করত মেঘ যেমন সুমেরু পর্ব্বতোপরি = বারি বর্ষণ করে, তদ্রূপ কর্ণ, অলম্বল ও কৌরবগণের উপর - শরধারা বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। হে মহারাজ! আপনার - চতুরঙ্গ বল হিড়িম্বাতনয়ের শরনিকরে নিপীড়িত ও সাতিশয় - ক্ষুব্ধ হইয়া পরস্পরকে মৰ্দ্দিত করিতে লাগিল। তখন রথহীন = সারথিবিহীন জটাসুরতনয় ক্রোধভরে ঘটোৎকচকে মুষ্টিপ্রহার করিল। মহাবীর ঘটোৎকচ সেই জটাসুরতনয়ের মুষ্টিপ্রহারে আহত হইয়া ভূমিকম্পকালীন বৃক্ষ, তৃণ ও গুল্ম সমাযুক্ত অচলের ন্যায় বিচলিত হইল এবং অর্গলপ্রতিম বাহু সমুদ্যত করত অগ্রসর হইয়া তাহার উপর মুষ্টিপ্রহার করিল। পরে ভুজযুগলদ্বারা তাহাকে আকর্ষণ করত ভূতলে নিক্ষেপ করিয়া নিষ্পিষ্ট করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে অলম্বল ঘটোৎকচের হস্ত হইতে মুক্ত হইয়া গাত্রোত্থানপূর্ব্বক পুনর্ব্বার তাহার প্রতি ধাবমান হইল এবং ভীমতনয়কে উৎক্ষেপণপূর্ব্বক ভূতলে নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে নিষ্পিষ্ট করিতে আরম্ভ করিল। এইরূপে সেই বৃহদাকার বীরদ্বয়ের লোমহর্ষণ তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল।
অনন্তর তাহারা মায়াজাল বিস্তারপূর্ব্বক পরস্পরকে অতিশয়িত' করিয়া ইন্দ্র ও বলির ন্যায় ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভকরিল। সেই বীরদ্বয় পরস্পর বধার্থী হইয়া কখন পাবক ও অম্বুনিধি; কখন গরুড় ও তক্ষক; কখন মহামেঘ ও প্রবল বায়ু; কখন বজ্র ও ভূধর; কখন কুঞ্জর ও শার্দুল এবং কখন বা রাহু ও ভাস্করের রূপ ধারণপূর্ব্বক বিবিধ মায়া প্রদর্শন করিয়া অতি আশ্চর্য্য যুদ্ধ করিতে লাগিল। তাহারা পরস্পরের উপর পরিঘ, গদা, প্রাস, মুদ্গর, পট্টিশ, মুষল, ও পৰ্ব্বত-শৃঙ্গ নিক্ষেপ এবং কখন রথারোহণে, কখন বা পাদচারে পরিভ্রমণ-পূর্ব্বক পরস্পরের উপর অশ্ম' ও গদা প্রহার করিতে লাগিল। অনন্তর মহাবীর ঘটোৎকচ অলম্বলের বিনাশ-বাসনায় উর্দ্ধে উত্থিত হইয়া শ্যেন পক্ষীর ন্যায় তাহার উপর নিপতিত হইল এবং অবিলম্বে তাহাকে ভূতলে নিপাতনপূর্ব্বক খড়াপ্রহারে তাহার অতি ভীষণ রব-সংযুক্ত বিকৃত-দর্শন মস্তক ছেদন করিয়া ময়দানব-নিপাতন মধুসূদনের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল। হে মহারাজ! ভীমতনয় এইরূপে অলম্বলকে বিনাশ করিয়া কেশাকর্ষণপূর্ব্বক তাহার সেই রক্তাক্ত মস্তক লইয়া দুর্য্যোধনের নিকট গমন করিল এবং গর্বিতভাবে সেই বিকৃত মস্তক তাঁহার রথে নিক্ষেপপূর্ব্বক বর্ষাকালীন জলধরের ন্যায় ভীষণ গর্জন করিয়া কহিল, হে ধৃতরাষ্ট্র-তনয়! এই তোমার বলবিক্রমশালী বন্ধুকে বিনাশ করিলাম। এইরূপে কর্ণকে এবং তোমাকেও শমনভবনে প্রেরণ করিব। আমি যতক্ষণ কর্ণকে নাশ না করিতেছি, ততক্ষণ তুমি প্রীতমনে অবস্থান কর। হে মহারাজ! মহাবীর ভীমনন্দন এই বলিয়াই কর্ণ-সমীপে গমনপূর্ব্বক তাঁহার মস্তকে সুতীক্ষ্ণ শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। অনন্তর কর্ণের সহিত ঘটোৎকচের ঘোরতর বিস্ময়কর অতি ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। সেই নিশীথকালে মহাবীর কর্ণ ও ঘটোৎকচের কিরূপ যুদ্ধ হইল? আর সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসের আকার, রথ, অশ্ব ও আয়ুধসকল কি প্রকার? অশ্ব, ধ্বজ ও কাৰ্ম্মকের প্রমাণ কিরূপ এবং উহার বর্ম্ম ও শিরস্ত্রাণই বা কি প্রমাণ? হে সঞ্জয়! তুমি এই সমস্ত অবগত আছ; এক্ষণে আমার নিকট কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবল পরাক্রান্ত ঘটোৎকচ লোহিতনেত্র, মহাকায়, মহাবাহু, মহাশীর্ষ, শঙ্কুকর্ণ, নির্নতোদর, নীলকলেবর ও বিকৃতাকার; উহার মুখমণ্ডল তাম্রবর্ণ, শ্মশ্রুজাল হরিদ্বর্ণ, হনুদ্বয় সুপ্রশস্ত, রামরাজি ঊর্দ্ধমুখ, আস্যদেশ আকর্ণ-বিদারিত, দশনপংক্তি সুতীক্ষ্ণ, জিহ্বা ও ওষ্ঠ তাম্রবর্ণ এবং সুদীর্ঘ; ভ্রূযুগল আয়ত, নাসিকা স্থূল, গ্রীবাদেশ লোহিতবর্ণ, কলেবর পৰ্ব্বত প্রমাণ, কেশকলাপ বিকটাকারে উদ্বদ্ধ, কটিদেশ স্থূল, নাভি গূঢ় এবং ললাটপ্রান্ত শিখাকলাপে মণ্ডিত। সেই মহামায়া-সম্পন্ন রাক্ষস ভুজদণ্ডে কটক ও অঙ্গদ, অচলসদৃশ বক্ষঃস্থলে হুতাশনতুল্য নিষ্ক, মস্তকে সুবর্ণময় তোরণপ্রতিম বিচিত্র শুভ্র কিরীট, কর্ণে নবোদিত দিবাকরপ্রতিম কুণ্ডলযুগল, গলদেশে সুবর্ণময়ী মালা ও গাত্রে বিপুল কাংস্যময় কবচ ধারণপূর্ব্বক কিঙ্কিণীজাল নির্ঘোষযুক্ত, রক্তবর্ণ ধ্বজপটমণ্ডিত, ঋক্ষচৰ্ম্ম-পরিবৃত, নলপরিমিত, বিবিধ আয়ুধসম্পন্ন, অষ্টচক্রবিশিষ্ট মেঘগম্ভীরনিস্বন মহারথে আরোহণ করিয়া সমরস্থলে সমুপস্থিত হইলেন। মত্ত মাতঙ্গবিক্রম, লোহিতলোচন, নানাবর্ণ, জিতশ্রম, বিপুল জটাজালমণ্ডিত, মহাবল, কামচারী অশ্বসকল মুহুর্মুহুঃ হ্রেষারব পরিত্যাগপূর্ব্বক মহাবেগে উঁহাকে বহন করিতে লাগিল। বিকট লোচন, প্রদীপ্ত বদন, ভাস্বরকুণ্ডল এক রাক্ষস সূর্য্যরশ্মিসদৃশ অশ্ববল্লা গ্রহণপূর্ব্বক উহার অশ্বগণকে সঞ্চালিত করিতে আরম্ভ করিল। রাক্ষসরাজ ঘটোৎকচ সেই সারথির সহিত সমবেত হইয়া অরুণ-সারথিসহ দিবাকরের ন্যায় সমর-স্থলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। প্রকাণ্ড অভ্রখণ্ডে সংযুক্ত উত্তুঙ্গ পর্ব্বতের ন্যায় উহার রথোপরি সমুচ্ছিত রক্তমস্তক ভীষণাকার গৃধুসংযুক্ত গগনস্পর্শী ধ্বজদণ্ড শোভমান হইল।
হে মহারাজ! অনন্তর রাক্ষস ঘটোৎকচ দ্বাদশ অরত্নি বিস্তৃত চারিশত হস্ত দীর্ঘ, সুদৃঢ় জ্যাসম্পন্ন, বজ্রনির্ঘোষ শরাসন আকর্ষণ ও রথাক্ষ পরিমিত শরনিকরদ্বারা চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছন্ন করত সেই বীরবিনাশিনী রজনীযোগে মহাবীর কর্ণের প্রতি ধাবমান হইলেন। উহার শরাসনশব্দ অশনিনির্ঘোষের ন্যায় শ্রুতিগোচর হওয়াতে আপনার সৈন্যগণ নিতান্ত ভীত হইয়া সাগরতরঙ্গের ন্যায় কম্পিত হইতে লাগিল। তখন মহাবীর কর্ণ সেই বিকটলোচন অতি ভীষণ নিশাচরকে আগমন করিতে দেখিয়া সত্বর গর্ব্ব প্রকাশপূর্ব্বক তাহার নিবারণে প্রবৃত্ত হইলেন এবং মাতঙ্গ যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী মাতঙ্গের প্রতি গমন করে এবং যূথপতি বৃষ অন্য বৃষভের প্রতি ধাবমান হয়, তদ্রূপ তিনি শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক তাহার নিকট গমন করিলেন। তখন দেবরাজ ইন্দ্র ও শম্বরাসুরের ন্যায় মহাবীর কর্ণ ও ঘটোৎকচের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। সেই দুই মহাবীর ভীমনিস্বন শরাসনদ্বয় গ্রহণপূর্ব্বক শরনিকরে পরস্পরের কলেবর ক্ষত বিক্ষত করত পরস্পরকে সমাচ্ছন্ন, করিয়া ফেলিলেন এবং আবর্ণ পূর্ণ শর পরিত্যাগপূর্ব্বক পরস্পরের কাংস্যনিৰ্ম্মিত বৰ্ম্ম ভেদ করিয়া পরস্পরকে বিদীর্ণ করিতে আরম্ভ করিলেন। যেমন শাদুলদ্বয় নখদ্বারা, মাতঙ্গদ্বয় দত্তদ্বারা পরস্পরকে প্রহার করিয়া থাকে, তদ্রূপ সেই বীরদ্বয় রথ, শক্তি ও শরনিকরদ্বারা পরস্পরকে প্রহার করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাঁহারা কখন পরস্পরের কলেবর ছেদন, কখন সায়ক সন্ধান ও কখন বা পরস্পরকে শরানলে দহন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তৎকালে কেহই তাঁহাদিগকে নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইল না; তাঁহারা শরজালে ক্ষত-বিক্ষত ও রুধিরধারায় পরিপ্লুত হইয়া গৈরিক ধাতুধারাস্রাবী অচলের ন্যায় শোভা ধারণ করিলেন। ঐ সময় তাঁহারা পরম যত্নসহকারে শরনিকরে পরস্পরের দেহ ভেদ করিয়াও কিছুতেই পরস্পরকে বিচলিত করিতে সমর্থ হইলেন না। এইরূপে সেই নিশাকালে উক্ত মহাবীরদ্বয় প্রাণপণে ঘোরতর যুদ্ধ করিলেন। রণস্থলস্থিত সমস্ত ব্যক্তিই ঘটোৎকচের কার্মুকনির্ঘোষে সাতিশয় ভীত হইল। কর্ণ তাঁহাকে কোনক্রমে অতিক্রম করিতে সমর্থ না হইয়া পরিশেষে দিব্যাস্ত্র বিস্তার করিতে আরম্ভ করিলেন। তদ্দর্শনে মহাবীর ঘটোৎকচ রাক্ষসীমায়া পরিগ্রহ করিয়া শূল, শৈল ও মুদ্গরধারী, ভয়ঙ্কর রাক্ষসসেনায় পরিবৃত হইল। মহীপালগণ সেই দণ্ডধারী ভূতান্তক' কৃতান্তের ন্যায় ঘটোৎকচকে শস্ত্র উদ্যত করত আগমন করিতে দেখিয়া নিতান্ত ব্যথিত হইলেন। মাতঙ্গগণ উঁহার সিংহনাদে একান্ত ভীত হইয়া মূত্র পরিত্যাগ করিতে লাগিল এবং সৈন্যসকল সাতিশয় উদ্বিগ্ন হইল।
অনন্তর সেই রাক্ষসগণ অর্দ্ধরাত্রিপ্রভাবে সমধিক বীর্য্য-শালী হইয়া চতুৰ্দ্দিকে শিলাবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিল। লৌহময় চক্র, ভূশুণ্ডী, শক্তি, তোমর, শূল, শতঘ্নী ও পট্টিশসকল অনবরত নিপতিত হইতে লাগিত। তখন আপনার আত্মজ ও যোদ্ধৃগণ সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ দর্শনে নিতান্ত ব্যথিত হইয়া ইতস্ততঃ ধাবমান হইলেন। কেবল অস্ত্রবলশ্লাঘী' একমাত্র কর্ণ তৎকালে ব্যথিত না হইয়া শরনিকরে সেই রাক্ষসকৃতমায়া নিরাকৃত করিলেন। মহাবীর ঘটোৎকচ মায়া বিফল হইল দেখিয়া একান্ত ক্রোধাবিষ্টচিত্তে সূতপুত্রের সংহারার্থ শরজাল বিস্তার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। রাক্ষস-নিক্ষিপ্ত শরসমুদায় কর্ণের কলেবর ভেদপূর্ব্বক রুধিরলিপ্ত হইয়া ক্রুদ্ধ ভুজঙ্গের ন্যায় ধরণীতলে প্রবেশ করিতে লাগিল। তখন সূতপুত্র ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বলবীর্য্যে ঘটোৎকচকে অতিক্রম করত দশ শরে তাহাকে বিদ্ধ করিলেন। মহাবীর ঘটোৎকচ কর্ণপ্রহিত শরনিকরে মর্ম্মদেশে বিদ্ধ হইয়া ব্যথিত মনে কর্ণকে সংহারার্থ এক সহস্র শরসম্পন্ন নবোদিত দিবাকরসদৃশ, মণিরত্ন-বিভূষিত ক্ষুরধার, দিব্য চক্র গ্রহণপূর্ব্বক তাঁহার উপর নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর কর্ণ সেই রাক্ষসনিক্ষিপ্ত চক্র শরনিকরে খণ্ড খণ্ড করাতে উহা হতভাগ্য পুরুষের মনোরথের ন্যায় নিষ্ফল হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। ঘটোৎকচ তৰ্দ্দশনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া রাহু যেমন দিবাকরকে আচ্ছন্ন করিয়া থাকে, তদ্রূপ শরনিকরে কর্ণকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। রুদ্র, ইন্দ্র ও উপেন্দ্রের তুল্য বিক্রমশালী মহাবীর বর্ণও অসম্ভ্রান্ত হইয়া সত্বর শরনিকর বিস্তারপূর্ব্বক ঘটোৎকচের রথ সমাচ্ছন্ন করিলেন। তখন ঘটোৎকচ তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া এক হেমাঙ্গদ-বিভূষিত গদা নিক্ষেপ করিলেন। মহাবীর কর্ণ উহা শরনিকরদ্বারা ভ্রমণ করাইয়া ভূতলে নিপাতিত করিলেন। অনুপুর মহাবীর ঘটোৎকচ অন্তরীক্ষে উত্থিত হইয়া কৃষ্ণমেঘের ন্যায় গভীর গর্জনপূর্ব্বক বৃক্ষবৃষ্টি করিতে লাগিল।
তখন মহাবীর কর্ণ সূর্য্যরশ্মি যেমন জলদজালকে বিদ্ধ করে, তদ্রূপ নভঃস্থিত' মায়াবী ভীমসেনতনয়কে বিদ্ধ করিলেন। তৎপরে তাহার অশ্বগণকে বিনাশ করত রথ শতধা চূর্ণ করিয়া ধারাবর্ষী জলধরের ন্যায় তাহার উপর শরবর্ষণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ঘটোৎকচের গাত্রে কর্ণশরে অনির্ভিন্ন' অঙ্গুলিদ্বয় মাত্রও স্থান রহিল না। তাহাকে তৎকালে লোমযুক্ত শল্পকীর ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। ঐ মহাবীর কর্ণের শরজালে এরূপ সমাচ্ছন্ন হইয়াছিল যে, উহার কলেবর, অশ্ব, রথ, বা ধ্বজ, কিছুই লক্ষিত হইল না। তখন মায়াবী ঘটোৎকচ স্বীয় অস্ত্রদ্বারা কর্ণের দিব্যাস্ত্র দূরীকৃত করিয়া তাঁহার সহিত মায়াযুদ্ধ আরম্ভ করিল। আকাশমণ্ডল হইতে অলক্ষিতরূপে শরজাল নিপতিত হইতে লাগিল। রাক্ষস মায়াবলে স্বয়ং বিকৃতাকার হইয়া কৌরবসৈন্যকে মুগ্ধ করিয়া বিচরণ করত প্রথমতঃ বিকটাকার মুখব্যাদনপূর্ব্বক সূতপুত্রের দিব্যাস্ত্রনিকর গ্রাস করিল এবং তৎপরেই শতধা সম্ভিন্নদেহ', গতাসু ও নিশ্চেষ্ট হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। তদ্দর্শনে সমস্ত কুরু-পুঙ্গবেরা তাহাকে নিহত বোধে সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর ভীমতনয় অনতিবিলম্বেই আবার দিব্য নূতন দেহ ধারণ করিয়া চতুর্দিকে ভ্রমণ করত কখন মৈনাক পর্ব্বতের ন্যায় শতশীর্ষ, শতোদর ও বৃহদাকার ধারণ, কখন বা অঙ্গুলিপ্রমাণ রূপ ধারণপূর্ব্বক উদ্ধৃত বীচিমালার ন্যায় বক্রভাবে উর্দ্ধে, অবস্থান, কখন বসুধা বিদারণপূর্ব্বক সলিল প্রবেশ, কখন অন্য স্থানে নিমগ্ন হইয়া পুনরায় যথাস্থানে উত্থান করিতে লাগিল।
পরে বর্মধারী হিড়িম্বাতনয় পুনরায় সুবর্ণমণ্ডিত রথে আরোহণ এবং পৃথিবী, আকাশ ও দিঘণ্ডল ভ্রমণ করিয়া কর্ণ সমীপে গমনপূর্ব্বক নির্ভীকচিত্তে কহিল, হে সূতপুত্র! এই স্থানে অবস্থান কর। জীবিতাবস্থায় আমার হস্ত হইতে বিমুক্ত হইবে না। আজিই তোমার রণকণ্ডু' নিরাকৃত করিব। ক্রুর পরাক্রম রাক্ষসেন্দ্র এই বলিয়া রোষকষায়িত-লোচনে আকাশমার্গে উত্থিত হইয়া অট্ট অট্ট হাস্য করিতে লাগিল এবং কেশরী যেমন গজেন্দ্রকে আঘাত করে, তদ্রূপ মহাবীর কর্ণকে রথাক্ষসদৃশ শরনিকরে বিদ্ধ করিতে আরম্ভ করিল। এইরূপে ঘটোৎকচ কর্ণের উপর বারিধারার ন্যায় শরধারা বর্ষণ করিতে আরম্ভকরিলে মহাবীর কর্ণ দূর হইতে সেই শরনিকর ছেদন করিয়া ফেলিলেন। হিড়িম্বাতনয় সেই মায়া নিহত হইল দেখিয়া পুনরায় মায়াপ্রভাবে অন্তর্হিত হইয়া অবিলম্বে উত্তুঙ্গশৃঙ্গ ও তরুনিচয় সমাযুক্ত উন্নত পর্ব্বতরূপ ধারণ করিল। অসংখ্য শূল, প্রাস, অসি ও মুষল উহার প্রস্রবণ স্বরূপ হইল। মহাবীর কর্ণ সেই উগ্র আয়ুধপ্রপাত যুক্ত মহীধর দর্শনে কিছুমাত্র ক্ষুব্ধ হইলেন না, প্রত্যুত দিব্যাস্ত্র প্রয়োগপূর্ব্বক সেই শৈলকেন্দ্রকে বিনষ্ট করিলেন। অনন্তর ঘটোৎকচ আকাশমার্গে গমনপূর্ব্বক ইন্দ্রায়ুধ সংবলিত নীল মেঘ ররূপ ধারণ করিয়া সূতপুত্রের উপর প্রস্তর বৃষ্টি করিতে লাগিল। তখন অস্ত্রবিদগ্রগণ্য কর্ণ বায়ব্যাস্ত্র সন্ধান-পূর্ব্বক সেই কৃষ্ণমেঘরূপ নিশাচরকে আহত করিয়া শরনিকরে দশদিক্ সমাচ্ছন্ন করত তন্নিক্ষিপ্ত অস্ত্রসমুদায়কে সংহার করিয়া ফেলিলেন। তখন মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেনকুমার হাস্য করিয়া মহারথ কর্ণের নিকট মহামায়া প্রকাশ করিলেন। সেই মায়া প্রভাবে মহাবীর কর্ণ সিংহশাৰ্দ্দুলসদৃশ মত্ত মাতঙ্গবিক্রম বৰ্ম্মাস্ত্র-ধারী, রাক্ষসগণে পরিবেষ্টিত ঘটোৎকচকে দেবগণ-পরিবৃত দেবরাজের ন্যায় আগমন করিতে দেখিয়া তাহার সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। রাক্ষস পাঁচ বাণে কর্ণকে বিদ্ধ করিয়া কৌরবপক্ষীয় ভূপালগণের ভয় উৎপাদনপূর্ব্বক ভীষণ শব্দ করত পুনর্ব্বার অঞ্জলিকদ্বারা কর্ণের শরজাল ও করস্থ শরাসন ছেদন করিয়া ফেলিল। তখন কর্ণ সমুচ্ছিত ইন্দ্রায়ুধসদৃশ অন্য ভারসহ শরাসন গ্রহণ করিয়া আকর্ষণপূর্ব্বক আকাশচরদিগের প্রতি সুবর্ণপুঙ্খ শত্রুঘাতন শরনিকর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। রাক্ষসগণ কর্ণের তীক্ষ্ণ সায়কে সিংহাদ্দিত গজযুথের ন্যায় নিতান্ত নিপীড়িত হইল। যুগান্তসময়ে হুতাশন যেমন জীবগণকে দগ্ধ করিয়া থাকেন, তদ্রূপ মহাবীর সূতনন্দন অশ্ব, সারথি ও গজসমবেত রাক্ষসগণকে শরানলে দগ্ধ করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বকালে মহেশ্বর ত্রিপুরাসুরকে সংহার করিয়া যেরূপ শোভা পাইয়াছিলেন, মহাবীর সূতনন্দন সেই রাক্ষসী-সেনা সংহার করিয়া তদ্রূপ শোভমান হইলেন। পাণ্ডবপক্ষীয় সহস্র সহস্র নৃপগণমধ্যে ভীমপরাক্রম, ক্রুদ্ধ অন্তকসদৃশ রাক্ষসেন্দ্র ঘটোৎকচ ভিন্ন আর কেহই কর্ণকে বিনাশ করিতে সমর্থ হইল না। মহোল্কাদ্বয় হইতে যেমন অগ্নিযুক্ত তৈলবিন্দু নিপতিত হয়, তদ্রূপ ক্রুদ্ধ ভীমতনয়ের নেত্রদ্বয় হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতে লাগিল। তখন সে করতল শব্দ ও অধর দংশন করত গজসদৃশ, গর্দভ সংযুক্ত, মায়ানিৰ্ম্মিত রথে আরোহণ করিয়া সারথিকে কহিল, হে সারথে! তুমি শীঘ্র আমাকে কর্ণের নিকটে লইয়া চল।
হে মহারাজ! ভীমকুমার এইরূপে রথে ঘোররূপ আরোহণপূর্ব্বক পুনর্ব্বার কর্ণের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া তাঁহার প্রতি শিবনিৰ্ম্মিত অষ্টচক্র অশনি নিক্ষেপ করিল। মহাবীর কর্ণ তদ্দর্শনে তৎক্ষণাৎ রথে শরাসন সংস্থাপনপূর্ব্বক ভূতলে অবতীর্ণ হইয়া সেই অশনি ধারণ করিয়া তাহার উপরেই পরিত্যাগ করিলেন। নিশাচর তৎক্ষণাৎ রথ হইতে ভূতলে নিপতিত হইল। তখন সেই জ্যোতির্ময় অশনি ঘটোৎকচের অশ্ব, সারথি ও ধ্বজসমবেত রথ ভস্মীকৃত করিয়া বসুধা ভেদপূর্ব্বক পাতালতলে প্রবেশ করিল। দেবগণ তদ্দর্শনে সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন। মহাবীর কর্ণ সেই দেবসৃষ্ট মহাশনি ধারণ করিয়াছেন বলিয়া সকলেই তাঁহাকে প্রশংসা করিতে লাগিল। হে মহারাজ! মহাবীর কর্ণ সেই দুষ্কর কর্ম সমাধান করিয়া পুনরায় স্বীয় রথে আরোহণপূর্ব্বক শরবর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। সেই ভীমদর্শন সংগ্রামে তিনি যেরূপ অদ্ভুত কার্য্য করিলেন, অন্য কোন ব্যক্তিই তাহা করিতে সমর্থ নহে।
তখন সেই বিপুল কলেবর ভয়ঙ্কর রাক্ষস কর্ণবিক্ষিপ্ত নারাচনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া বারিধারাচ্ছন্ন পর্ব্বতের ন্যায় শোভা ধারণপূর্ব্বক পুনরায় অন্তর্হিত হইয়া মায়া ও লঘুহস্ততার প্রভাবে কর্ণের দিব্যাস্ত্রসমূহ সংহার করিতে লাগিল। এইরূপে রাক্ষসের মায়াপ্রভাবে অস্ত্রসমুদায় বিনষ্ট হইলে কর্ণ অসম্ভ্রান্তচিত্তে তাহার সহিত যুদ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন। বলবান্ ভীমতনয় তদ্দর্শনে কোপাবিষ্ট হইয়া মহারথিগণকে ভীত করত স্বয়ং অসংখ্যরূপ ধারণ করিতে লাগিল। তখন নানা দিক্ হইতে সিংহ, ব্যাঘ্র, তরক্ষু, অগ্নিজিহ্ব ভুজঙ্গ ও অয়োমুখ বিহঙ্গমগণ সমরাঙ্গনে আগমন করিতে আরম্ভ করিল। হিমালয়সদৃশ নিশাচর কর্ণ-চাপচ্যুত শরনিকরে সমাচ্ছন্ন হইয়া সেই স্থানেই অন্তর্হিত হইল। ঐ সময় অসংখ্য রাক্ষস, পিশাচ, শালাবৃক' ও বিকৃতানন বৃক-গণ কর্ণকে ভক্ষণ করিবার নিমিত্ত মহাবেগে আগমনপূর্ব্বক উগ্ররবে তাঁহাকে ভীত করিতে লাগিল। তখন মহাবীর কর্ণ শোণিতোক্ষিত' বিবিধ আয়ুধদ্বারা তাহাদিগের প্রত্যেককে বিদ্ধ করিয়া দিবাস্ত্রে রাক্ষসীমায়া সংহারপূর্ব্বক নতপর্ব্ব শরজালে ঘটোৎকচের অশ্বসমূহ সমাহত করিলেন। অশ্বগণ কর্ণের শরাঘাতে ভগ্ন, বিকৃতাঙ্গ ও ছিন্নপৃষ্ঠ হইয়া ঘটোৎকচের সমক্ষেই ধরাতলে নিপতিত হইল। তখন সেই নিশাচর এইরূপে সেই মায়া বিফল হইল দেখিয়া কর্ণকে "এই তোমার মৃত্যুবিধান, করিতেছি” বলিয়া তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিত হইল।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ। মহাবীর কর্ণ ও ঘটোৎকচের এইরূপ মহাযুদ্ধ হইতেছে, এমন সময় মহাবল পরাক্রান্ত রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধ পূর্ব্ববৈর স্মরণপূর্ব্বক বিকট দর্শন অসংখ্য রাক্ষসসৈন্য পরিবৃত হইয়া রাজা দুর্য্যোধনের সমীপে উপস্থিত হইল। পূর্ব্বে মহাবীর ভীমসেন উহার জ্ঞাতি বিক্রমশালী ব্রাহ্মণঘাতী বক, মহাতেজাঃ কির্মীর এবং উহার পরম বন্ধু হিড়িম্বকে বিনাশ করিয়াছিলেন। ভীমসেনের এই বৈরাচরণ মহাবীর অলায়ুধের অন্তঃকরণে এ যাবৎকাল জাগরূক ছিল। এক্ষণে সে নিশা-যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছে অবগত হইয়া ভীমসেনকে নিহত করিবার বাসনায় সমরাভিলাষে মত্ত মাতঙ্গের ন্যায়, রোযাবিষ্ট ভুজঙ্গের ন্যায় সমাগত হইয়া রাজা দুর্য্যোধনকে কহিতে লাগিল, হে মহারাজ! দুরাত্মা ভীমসেন যে আমার পরম বান্ধব হিড়িম্ব, বক ও কির্মীরকে নিধন এবং আমাদিগকে ও অন্যান্য রাক্ষসগণকে পরাভব করিয়া হিড়িম্বাকে বলাৎকার করিয়াছে, তাহা আপনি অবগত আছেন; অতএব আজি আমি কৃষ্ণসহায় পাণ্ডবগণকে এবং সবান্ধব হিড়িম্বা-তনয়কে হস্তী, অশ্ব ও রথের সহিত সংহারপূর্ব্বক অনুচরগণ-সমভিব্যাহারে ভক্ষণ করিব বলিয়া স্বয়ং উপস্থিত হইয়াছি। এক্ষণে আপনি স্বীয় সৈন্যগণকে নিবারণ করুন; আমি পাণ্ডবদিগের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব।
হে মহারাজ। ভ্রাতৃগণ-পরিবৃত রাজা দুর্য্যোধন অলায়ুধের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া তাহাকে কহিলেন, হে রাক্ষসেন্দ্র! আমার সৈনিক পুরুষেরা সকলেই বৈরনির্য্যাতনে সমুৎসুক হইয়াছে; ইহারা কখনই স্থিরচিত্তে অবস্থান করিতে সমর্থ হইবে না; অতএব আমরা তোমাকে তোমার সৈন্যগণের সহিত পুরোবর্তী করিয়া যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইব।
হে কুরুরাজ! রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধ দুর্য্যোধনের বাক্য স্বীকার করিয়া ঘটোৎকচের রথসদৃশ ভাস্কর রথে আরোহণপূর্ব্বক রাক্ষসগণ-সমভিব্যাহারে সত্বর ভীমতনয়ের প্রতি ধাবমান হইল। উহার রথও ঘটোৎকচের রথের ন্যায় নল্ব-প্রমাণ, বহু তোরণে চিত্রিত ও ঋক্ষচর্মে পরিবৃত ছিল। ঐ রথে মাংস-শোণিতভোজী মহাকায় একশত অশ্ব সংযোজিত হইয়াছিল। উহাদের আকার হস্তীর ন্যায় এবং কণ্ঠস্বর রাসভের ন্যায়। ঐ রথের নির্ঘোষ মেঘগর্জনের ন্যায় গভীর। ঘটোৎকচসদৃশ মহাবল পরাক্রান্ত মহাবাহু অলায়ুধের বৃহৎকাৰ্ম্মকও ঘটোৎকচের শরাসনের ন্যায় সুদৃঢ় জ্যাসম্পন্ন, বাণসকল সুবর্ণপুঙ্খ, সুশাণিত ও অক্ষপ্রমাণ এবং সূর্য্য ও অনলসদৃশ; রথকেতু ও গোমায়ুকুলে পরিরক্ষিত ছিল, উহার রূপও ঘটোৎকচের অপেক্ষা ন্যূন ছিল না। রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধ দীপ্ত অঙ্গদ, উষ্ণীষ, মালা, কিরীট, খড়া, গদা, ভূশুণ্ডী, মুষল, হল, শরাসন এবং বারণচৰ্ম্ম সদৃশ বৰ্ম্ম ধারণপূর্ব্বক সেই অনলভাস্বর' রথে সমারূঢ় হইয়া পাণ্ডবসেনা বিদ্রাবিত করত সমরাঙ্গনে চপলাযুক্ত জলদের ন্যায় বিরাজিত হইল। ওদিকে পাণ্ডবপক্ষীয় মহাবল পরাক্রান্ত বৰ্ম্মধারী নরপক্তিগণও হৃষ্টচিত্তে চতুৰ্দ্দিকে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! যেরূপ প্লববিহীন ব্যক্তিগণ প্লবপ্রাপ্ত হইয়া সাগরপার হইবার মানসে আহ্লাদিত হয়, তদ্রূপ সমস্ত কৌরব ও দুর্য্যোধন প্রভৃতি আপনার পুত্রগণ সেই ভীমকৰ্ম্মা বীরপুরুষকে সমাগত দেখিয়া আনন্দিত হইলেন। কৌরবপক্ষীয় ভূপালগণ পুনর্জন্ম বোধ করিয়াই যেন সেই স্বগণপরিবৃত সমাগত রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধকে স্বাগত প্রশ্ন করিয়া পূজা করিতে লাগিলেন।
হে মহারাজ। ঐ সময় কর্ণের সহিত ঘটোৎকচের অতি ভীষণ অলৌকিক সংগ্রাম উপস্থিত হইলে পাঞ্চাল ও কৌরব-পক্ষীয় ভূপালগণ বিস্ময়াপন্ন হইয়া তাঁহাদের বিক্রম দর্শন করিতে আরম্ভ করিলেন। দ্রোণ, কর্ণ ও অশ্বত্থামা প্রভৃতি বীর-গণ সমরে ঘটোৎকচের অলৌকিক কার্য্য অবলোকনপূর্ব্বক অসম্ভ্রান্তচিত্তে কৌরবসৈন্যসমুদায় বিনষ্ট হইল, বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন। আপনার সেনাগণ কর্ণের জীবনাশা পরিত্যাগ করিয়া হাহাকার করত নিতান্ত ভীত হইয়া উঠিল। তখন দুর্য্যোধন কর্ণকে সাতিশয় পীড়িত দেখিয়া রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে রাক্ষসেন্দ্র। কর্ণ ভীমতনয়ের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়া স্বীয় বলবীর্য্যের অনুরূপ কার্য্য করিতেছেন, ভীমসেনকুমার তথাপি মহাবীর নৃপতিগণকে গজভগ্ন পাদপের ন্যায় বিবিধ শস্ত্রে নিপীড়িত করিয়া নিহত করিয়াছে; অতএব আমি এক্ষণে তোমার প্রতি এই ভার অর্পণ করিলাম যে তুমি বিক্রমপ্রকাশপূর্ব্বক ভীম-পুত্রকে নিপীড়িত কর। পাপাত্মা ঘটোৎকচ মায়াবল অবলম্বন-পূর্ব্বক যেন কর্ণকে সংহার করিতে না পারে। মহাবল পরাক্রান্ত অলায়ুধ দুর্য্যোধনের বাক্য শ্রবণানন্তর "যে আজ্ঞা মহাশয়” বলিয়া ঘটোৎকচের প্রতি ধাবমান হইল। তখন ভীমকুমার কর্ণকে পরিত্যাগপূর্ব্বক শরনিকরদ্বারা সমাগত শত্রুকে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। তখন অরণ্যে করিণীর নিমিত্ত মত্ত মাতঙ্গদ্বয়ের যেরূপ সংগ্রাম হইয়া থাকে, তদ্রূপ সেই রাক্ষসদ্বয়ের তুমুল যুদ্ধ উপস্থিত হইল। মহারথ কর্ণও ঐ অবসরে নিশাচর হইতে মুক্ত হইয়া সূর্য্যসমপ্রভ স্যন্দনে আরোহণপূর্ব্বক ভীমসেনের প্রতি ধাবমান হইলেন। ভীমসেন স্বীয় পুত্রকে সিংহাদ্দিত বৃষের ন্যায় অলায়ুধশরে নিপীড়িত দেখিয়া কর্ণকে উপেক্ষা করিয়া অসংখ্য শরনিপেক্ষ করত রাক্ষসের রথাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। অলায়ুধ ভীমকে আগমন করিতে দেখিয়া ঘটোৎকচকে পরিত্যাগপূর্ব্বক তাঁহার অভিমুখে ধাবমান হইল। রাক্ষসান্তকারী বৃকোদর তদ্দর্শনে সহসা তাঁহার সম্মুখীন হইয়া শরবর্ষণদ্বারা সেই স্বগণপরিবেষ্টিত রাক্ষসকে আকীর্ণ করিলেন। তখন অলায়ুধ বারংবার তাঁহার উপর শিলাধৌত সরল শরনিকর বর্ষণ করিতে লাগিল। বিবিধাস্ত্রধারী ভীষণাকার রাক্ষসগণও জিগীষু হইয়া ভীমসেনের প্রতি ধাবমান হইল। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন রাক্ষসগণকর্তৃক এইরূপে তাড়িত হইয়া তাহাদিগের প্রত্যেককে নিশিত পাঁচ পাঁচ বাণে বিদ্ধ করিলেন। নিশাচরগণ ভীমশরে নিপীড়িত হইয়া ভীষণ চীৎকার করত দশ দিকে পলায়ন করিতে লাগিল। মহাবল অলায়ুধ নিশাচরগণকে ভীত দেখিয়া বেগে আগমনপূর্ব্বক ভীমসেনকে শরজালে সমাচ্ছন্ন করিল। ভীমসেন তীক্ষ্ণ শরনিকরদ্বারা তাহাকে আহত করিতে লাগিলেন। অলায়ুধ ভীমনিক্ষিপ্ত শরনিকরের মধ্যে কতকগুলি ছেদন ও কতকগুলি গ্রহণ করিল। তখন ভীমসেন ভীমপরাক্রম রাক্ষসকে লক্ষ্য করিয়া এক অশনিসদৃশ গদা নিক্ষেপ করিলেন। নিশাচর গদাদ্বারা সেই ভীমনিক্ষিপ্ত জ্বালাকুল গদা তাড়িত করিলে উহা ভীমের প্রতি ধাবমান হইল। তখন ভীমসেন শরবর্ষণ করিয়া নিশাচরকে সমাচ্ছন্ন করিতে লাগিলেন। রাক্ষসও নিশিত | শরনিকরে সেই শরসমুদায় ব্যর্থ করিয়া ফেলিল। ঐ সময় ভীষণাকার নিশাচরগণ অলায়ুধের আজ্ঞানুসারে কুঞ্জরগণকে বিনাশ করিতে লাগিল। সেই ভীষণ সংগ্রামে পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয়গণ এবং হস্তী ও অশ্বসমুদায় রাক্ষসশরে নিপীড়িত হইয়া নিতান্ত অসুস্থ হইয়া উঠিল।
হে মহারাজ! তখন মহাত্মা বাসুদেব সেই অতি ভয়াবহ ঘোর সংগ্রাম উপস্থিত দেখিয়া অর্জুনকে কহিলেন, হে ধনঞ্জয়। দেখ, মহাবাহু ভীমসেন নিশাচরের বশীভূত হইয়াছে, তুমি কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া শীঘ্র পদানুসরণে প্রবৃত্ত হইয়া দ্রোণপুরস্কৃত সৈন্যগণকে সংহার কর। ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, যুধামন্যু, উত্তমৌজাঃ ও মহারথ দ্রৌপদীতনয়গণ কর্ণের প্রতি ধাবমান হউন এবং বলবীর্য্যশালী নকুল, সহদেব ও যুযুধান তোমার শাসনে অন্যান্য রাক্ষসগণকে সংহার করুক। এক্ষণে অতি ভয়ানক সময় উপস্থিত হইয়াছে। হে মহারাজ! মহাবাহু কৃষ্ণ এই কথা কহিলে মহারথগণ তাঁহার আজ্ঞাক্রমে কর্ণ ও নিশাচরগণের প্রতি ধাবমান হইলেন।
অনন্তর প্রবল প্রতাপ অলায়ুধ আশীবিষোপম শরনিকর-দ্বারা ভীমসেনের শরাসন ছেদন করিয়া নিশিত শরে তাঁহার অশ্বসমুদায় ও সারথিকে সংহার করিল। তখন বৃকোদর অশ্বহীন ও সারথিবিহীন হইয়া রথ হইতে অবতরণপূর্ব্বক চীৎকার করত অলায়ুধের প্রতি ভয়ঙ্কর গদা পরিত্যাগ করিলেন। রাক্ষস গদাপ্রহারে সেই ভীম-নিক্ষিপ্ত ভীষণ নির্ঘোষ মহাগদা চূর্ণ করিয়া সিংহনাদ করিতে লাগিল। এইরূপে সেই বীরদ্বয়ের তুমুল যুদ্ধ হইতে লাগিল। গদানিপাত শব্দে ভূমণ্ডল কম্পিত হইয়া উঠিল। পরিশেষে তাঁহারা গদা পরিত্যাগপূর্ব্বক পরস্পরের উপর বজ্রসম মুষ্টিপ্রহার এবং যদৃচ্ছালব্ধ ধ্বজ, রথচক্র, যুগ, অক্ষ, অধিষ্ঠান' ও অলঙ্কারাদি নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলেন। তৎপরে উভয়ে রুধিরমোক্ষণপূর্ব্বক মত্ত মাতঙ্গদ্বয়ের ন্যায় পরস্পরকে আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবহিতৈষী হৃষীকেশ তদ্দর্শনে ভীমসেনের উদ্ধারার্থ ঘটোৎকচকে প্রেরণ করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাত্মা বাসুদেব ভীমসেনকে রাক্ষসগ্রস্ত নিরীক্ষণ করিয়া ঘটোৎকচকে কহিলেন, হে মহাবাহো! ঐ দেখ, রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধ তোমার এবং সমস্ত সৈন্যগণের সমক্ষে বৃকোদরকে পরাভব করিতেছে; অতএব তুমি সত্বর কর্ণকে পরিত্যাগপূর্ব্বক অলায়ুধের নিকট গমন-পূর্ব্বক অগ্রে তাহাকে বিনাশ কর; পরে সূতপুত্রের বধ সাধন করিবে।
তখন ঘটোৎকচ বাসুদেবের বাক্যানুসারে কর্ণকে পরিত্যাগ করিয়া বকভ্রাতা রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল। অনন্তর দুই রাক্ষসের তুমুল সংগ্রাম হইতে লাগিল। বিকটদর্শন অলায়ুধের যোধগণ শরাসন গ্রহণপূর্ব্বক মহাবেগে ধাবমান হইল। গৃহীতাস্ত্র মহারথ সাত্যকি, নকুল ও সহদেব তদ্দর্শনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া নিশিত শরনিকরে তাহাদিগের কলেবর বিদীর্ণ করিতে লাগিলেন। এদিকে মহাবীর অর্জুনও ক্ষত্রিয় পুঙ্গবদিগকে শরনিকরে নিরাকৃত করিতে আরম্ভকরিলেন। ঐ সময় ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডী প্রভৃতি পাঞ্চালবংশীয় মহারথগণ সূতপুত্রকর্তৃক বিদ্রাবিত হইলে ভীমপরাক্রম ভীমসেন শর বর্ষণ করত দ্রুতবেগে তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তখন মহাবীর নকুল, সহদেব এবং মহারথ সাত্যকি রাক্ষসদিগকে শমনসদনে প্রেরণপূর্ব্বক প্রত্যাগত হইয়া কর্ণের সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। পাঞ্চালগণও দ্রোণের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন।
হে মহারাজ! এদিকে রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধ অরাতিনিপাতন ঘটোৎকচের মস্তকে এক বৃহদাকার পরিঘ নিক্ষেপ করিল। মহাবল পরাক্রান্ত ভীমতনয় সেই পরিঘের আঘাতে মূর্ছিত হইয়া ক্ষণকাল নিস্তব্ধভাবে রহিল এবং অনতিবিলম্বেই অলায়ুধের রথ লক্ষ্য করিয়া একশত ঘণ্টা সমলঙ্কৃত, দীপ্তাগ্নি-সদৃশ, কাঞ্চনমণ্ডিত গদা নিক্ষেপ করিল। সেই গদার আঘাতে অলায়ুধের অশ্ব, সারথি ও মহাস্বন রথ চূর্ণ হইয়া গেল। তখন রাক্ষসেন্দ্র অলায়ুধ সেই অশ্ব, চক্র ও অক্ষবিহীন, বিশীর্ণধ্বজ, ভগ্নকূবর রথ হইতে ঊর্দ্ধে উত্থিত হইয়া রাক্ষসীমায়া অবলম্বন-পূর্ব্বক রুধির বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। ঐ সময় নভোমণ্ডল বিদ্যুদ্দামরঞ্জিত নিবিড় জলধর পটলে সমাচ্ছন্ন হইল এবং অনবরত বজ্রনিপাত নির্ঘোষ ও ভীষণ চট্টচটা শব্দ হইতে লাগিল। মহাবীর হিড়িম্বাতনয় সেই অলায়ুধ বিহিত মায়া অবলোকনপূর্ব্বক উর্দ্ধে সমুত্থিত হইয়া স্বীয় মায়াপ্রভাবে তাহার মায়া ধ্বংস করিল। মায়াবী মহাবীর অলায়ুধ স্বীয় মায়া প্রতিহত নিরীক্ষণ করিয়া ঘটোৎকচের উপর ঘোরতর প্রস্তরবৃষ্টি করিতে লাগিল। ভীমপরাক্রম ভীমতনয় শরনিকরে সেই ভয়ানক প্রস্তরবৃষ্টি নিরাকৃত করিল, তদ্দর্শনে সকলেই চমৎকৃত হইল। অনন্তর সেই বীরদ্বয় পরস্পরের উপর লৌহময় পরিঘ, শূল, গদা, মুষল, মুদ্গর, পিনাক, করবাল, তোমর, প্রাস, কম্পন, নারাচ, নিশিত ভল্ল, শর, চক্র, পরশু, গজসন্নাহ, ভিন্দিপাল, গোশীর্ষ, উলুখল' এবং মহাশাখা সমাকীর্ণ পুষ্পিত শমী, তাল, কবীর', চম্পক, ইঙ্গুদী, বদরী, রক্তকাঞ্চন, অরিমেদ', বট, অশ্বত্থ ও পিপ্পল প্রভৃতি বিবিধ বৃক্ষ ও গৈরিকাদি ধাতু সমাযুক্ত নানাবিধ পৰ্ব্বতশৃঙ্গসকল নিক্ষেপ করিতে লাগিল। ঐ সকল অস্ত্র-শস্ত্রের সংঘর্ষণে বজ্রনিষ্পেষণের ন্যায় মহাশব্দ সমুখিত হইল। হে মহারাজ! পূর্ব্বকালে কপিরাজ বালি ও সুগ্রীবের যেরূপ সংগ্রাম হইয়াছিল, এক্ষণে মহাবীর ঘটোৎকচ ও অলায়ুধের তদ্রূপ ঘোরতর যুদ্ধ হইতে লাগিল। তখন সেই বীরদ্বয় করে তরবারি গ্রহণপূর্ব্বক পরস্পরের উপর নিক্ষেপ করিয়া পরিশেষে মহাবেগে ধাবমান হইয়া পরস্পরের কেশ গ্রহণ করিল। তখন তাহাদের গাত্র হইতে জলধরের ন্যায় স্বেদজল ও রুধিরধারা বিগলিত হইতে লাগিল। অনন্তর মহাবীর হিড়িম্বাতনয় বলপূর্ব্বক অলায়ুধকে উদ্ভ্রামিত করিয়া তাহার কুণ্ডলবিভূষিত মস্তক ছেদনপূর্ব্বক ঘোরতর সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিল। তখন পাঞ্চাল ও পাণ্ডবগণ সেই বকবন্ধু অলায়ুধকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া ভীষণ সিংহনাদ করিতে লাগিলেন। পাণ্ডবপক্ষে সহস্র সহস্র ভেরী ও অযুত অযুত শঙ্খ বাদিত হইল। হে মহারাজ! দীপমালাবিভূষিতা রজনী পাণ্ডব-গণের অতীব বিজয়াবহ হইয়া উঠিল। অনন্তর মহাবল পরাক্রান্ত ভীমতনয় অলায়ুধের মস্তক লইয়া দুর্য্যোধন-সমীপে নিক্ষেপ করিল। রাজা দুর্য্যোধন রাক্ষসেন্দ্রকে নিহত অবলোকন করিয়া সৈন্যগণের সহিত সাতিশয় বিমনায়মান হইলেন। মহাবীর অলায়ুধ পূব্ববৈর স্মরণপূর্ব্বক দুর্য্যোধনের সমীপে আগমন করিয়া ভীমসেনকে সংহার করিতে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল।
দুর্য্যোধনও তাহার প্রতিজ্ঞা শ্রবণে ভীমকে অলায়ুধের হস্তে নিহত ও ভ্রাতৃগণকে দীর্ঘজীবী বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন; কিন্তু এক্ষণে অলায়ুধকে ঘটোৎকচের হস্তে নিহত দেখিয়া ভীমসেনের দুঃশাসন প্রভৃতি ধার্তরাষ্ট্রগণের সংহাররূপ প্রতিজ্ঞা সফল হইবে বলিয়া স্থির করিলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে রাক্ষসরাজ ঘটোৎকচ অলায়ুধকে বিনাশ করিয়া হৃষ্টমনে সেনামুখে অবস্থানপূর্ব্বক সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিল। সৃঞ্জয়গণ সেই ভয়ঙ্কর শব্দ শ্রবণে কম্পিত হইয়া উঠিল। আপনার পক্ষীয় বীরগণ সেই ভীমতনয়ের ভীষণ শব্দ শ্রবণ করিয়া সাতিশয় ভীত হইল। অনন্তর ঐ সময় মহাবীর কর্ণ পাঞ্চাল-গণের প্রতি ধাবমান হইয়া ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডীকে লক্ষ্য করিয়া আকর্ণপূর্ণ নতপর্ব্ব দশ দশ বাণে বিদ্ধ করিলেন এবং নারাচনিকর বিস্তারপূর্ব্বক যুধামন্যু, উত্তমৌজাঃ ও সাত্যকিকে বিকম্পিত করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহারাও দক্ষিণ ও বামহস্তে শরনিকর পরিত্যাগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তৎকালে তাঁহাদিগের কার্মুকসকল কেবল মণ্ডলাকার লক্ষিত হইতে লাগিল। তাঁহাদের জ্যানির্ঘোষ, তলধ্বনি ও রথচক্রের ঘর্ঘর শব্দ বর্ষাকালীন মেঘগর্জনের ন্যায় নিতান্ত তুমুল হইয়া উঠিল। ঐ সময় রণস্থল জলদের ন্যায় শোভমান হইল। জ্যা ও চক্রের ধ্বনি উহার গভীর নিম্বন; কাৰ্ম্মক বিদ্যুদ্দাম ও শরজাল বারিধারা তুল্য প্রতীয়মান হইতে লাগিল। তখন আপনার পুত্রগণের হিতানুষ্ঠাননিরত মহাবীর কর্ণ সমরাঙ্গনে শৈলের ন্যায় অপ্রকম্পিতভাবে অবস্থানপূর্ব্বক সেই অদ্ভুত শরবর্ষণ নিবারণ করিয়া অশনিসদৃশ তোমর ও শাণিত শরনিকরে শত্রুগণকে সমাহত করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার শরাঘাতে কাহার ধ্বজ দণ্ড খণ্ড খণ্ড, কাহার কলেবর ছিন্ন ভিন্ন, কেহ সারথিশূন্য এবং কেহ বা অশ্বশূন্য হইল। এইরূপে সেই বীরগণ সূতপুত্রের ভীষণ শরে সমাহত ও নিতান্ত অসুস্থ হইয়া ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। ঐ সময় মহাবীর ঘটোৎকচ তাঁহা-দিগকে ছিন্ন ভিন্ন ও সমরপরাজুখ দেখিয়া ক্রোধে একান্ত অধীর হইয়া উঠিল এবং সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক সেই সুবর্ণ ও রত্নখচিত রথারোহণে কর্ণ-সন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে বজ্রসঙ্কাশ শরনিকরে বিদ্ধ করিতে লাগিল। তৎপরে সেই দুই মহাবীর কর্ণি, নারাচ, নালীক, দণ্ড, বৎসদন্ত, বরাহকর্ণ, বিপাট, শৃঙ্গ ও ক্ষুরপ্রাস্ত্রদ্বারা নভোমণ্ডল সমাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলেন। সেই তির্য্যগত', সুবর্ণপুঙ্খ শরজাল গগনমণ্ডলে বিচিত্র কুসুম মালার ন্যায় সুশোভিত হইতে লাগিল। এইরূপে সেই অপ্রমিত প্রভাব বীরদ্বয় অস্ত্রজাল বিস্তারপূর্ব্বক সমভাবে পরস্পরকে প্রহার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তৎকালে তাঁহাদিগের কিছুমাত্র ইতর বিশেষ লক্ষিত হইল না। তখন রাহু ও ভাস্করের ন্যায় সেই বীরদ্বয়ের শরনিকর সঙ্কুল, অদ্ভুত, ভয়ঙ্কর সংগ্রাম হইতে লাগিল। হে মহারাজ! ঐ সময় রাক্ষসরাজ ঘটোৎকচ কর্ণকে কোনক্রমে অতিক্রম করিতে না পারিয়া এক সুতীক্ষ্ণ অস্ত্র আবিষ্কৃত করিয়া তাঁহার অশ্ব ও সারথিকে বিনাশপূর্ব্বক অবিলম্বে অন্তর্হিত হইল।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। সেই কূটযোধী নিশাচর অন্তর্হিত হইলে আমার পক্ষীয় বীরগণ তৎকালে কিরূপ বিবেচনা করিলেন, তুমি উহা কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! কৌরবগণ রাক্ষসরাজ ঘটোৎকচকে অন্তর্হিত অবলোকন করিয়া মুক্তকণ্ঠে কহিতে লাগিলেন, এইবার কূটযোধী ঘটোৎকচ নিঃসন্দেহ কর্ণকে সংহার করিবে। কৌরবগণ এই কথা কহিলে কর্ণ লঘুহস্ততা প্রদর্শন-পূর্ব্বক শরজালে চতুৰ্দ্দিক্ সমাচ্ছন্ন করিলেন। তন্নিক্ষিপ্ত শরনিকরে নভোমণ্ডল গাঢ়তর তিমিরে পরিবৃত হইলে, সকল জীব-জন্তুই অদৃশ্য হইল। ঐ সময় মহাবীর কর্ণ যে কখন শর গ্রহণ, কখন শর সন্ধান ও কখনই বা তৃণীরস্পর্শ করিতে লাগিলেন, তাহা কিছুই দৃষ্টিগোচর হইল না। অনন্তর রাক্ষসরাজ ঘটোৎকচ অন্তরীক্ষে ভয়ঙ্কর রাক্ষসীমায়া প্রকাশ করিল। সেই মায়াপ্রভাবে নভোমণ্ডলে দেদীপ্যমান অগ্নিশিখাসদৃশ লোহিত মেঘ সমুত্থিত হইল। সেই মেঘ সহস্র দুন্দুভিনিনাদসদৃশ, নির্ঘোষসম্পন্ন, অসংখ্য বিদ্যুৎ ও প্রজ্বলিত মহোল্কাসকল প্রাদুর্ভূত এবং নিশিত শর, শক্তি, প্রাস, মুষল, পরশু, খড়া, পট্টিশ, তোমর, পরিঘ, লৌহবদ্ধ গদা, শাণিত শূল, শতঘ্নী, প্রকাণ্ড শিলাখণ্ড, সহস্র সহস্র অশনি, বজ্র, চক্র ও বহু সংখ্য ক্ষুর চতুৰ্দ্দিকে নিপতিত হইতে লাগিল। মহাবীর কর্ণ শরনিকর বর্ষণপূর্ব্বক সেই শস্ত্রবৃষ্টি নিবারণ করিতে সমর্থ হইলেন না। তখন কৌরবপক্ষীয় অশ্বসকল শরাহত, মাতঙ্গগণ বজ্রাহত ও রথসমুদায় শস্ত্রাহত হইয়া ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল। উহাদের পতনকালে ঘোরতর শব্দ সমুত্থিত হইল। রাজা দুর্য্যোধনের সৈন্যগণ নানাবিধ আয়ুধের আঘাতে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিল এবং একান্ত বিষণ্ণ ও মুমূর্ষুপ্রায় হইয়া হাহাকার করিতে আরম্ভ করিল; কিন্তু মহাবীরগণ আর্য্যস্বভাববশতঃ তৎকালে সমর পরিত্যাগ করিলেন না।
হে মহারাজ! তখন আপনার পুত্রগণ সেই রাক্ষসকৃত ঘোরতর শস্ত্রবৃষ্টি নিপতিত ও সৈন্যগণকে বিনষ্ট দেখিয়া নিতান্ত ভীত হইলেন। যোধগণ হুতাশনের ন্যায় প্রদীপ্তজিহ্ব শত শত শিবাগণকে ঘোর চীৎকার ও রাক্ষসগণকে ভীষণ সিংহনাদ করিতে দেখিয়া সাতিশয় ব্যথিত হইতে লাগিলেন। তখন সেই দীপ্তানন, দীপ্তজিহ্ব, তীক্ষ্ণদংষ্ট্র, শৈলসদৃশ কলেবর, নিতান্ত ভয়ঙ্কর রাক্ষসগণ নভোমণ্ডলে আরোহণ ও শক্তি গ্রহণপূর্ব্বক বারি-ধারাবর্ষী জলধরের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। আপনার সৈন্যগণ সেই রাক্ষসগণের শর, শক্তি, শূল, গদা, পরিঘ, বজ্র, পিনাক, অশনি, চক্র ও শতঘ্নীদ্বারা বিমথিত হইয়া ভূতলে নিপতিত হইতে লাগিল। রাক্ষসগণ আপনার সৈন্যগণের প্রতি অনবরত শূল, অংশু, শুণ্ড, অশ্মগুড়, শতঘ্নী এবং লৌহপট্রসন্নদ্ধ ঘৃণা'সকল পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিল। তখন সকলেই মোহে একান্ত আক্রান্ত ও অভিভূত হইল। বীরগণ বিশীর্ণ অস্ত্র, চূর্ণ মস্তক ও চূর্ণ কলেবর হইয়া ভূতলে শয়ন করিতে লাগিলেন। অশ্বগণ ছিন্ন, কুঞ্জরগণ প্রমথিত ও রথসমুদায় শিলাঘাতে নিষ্পিষ্ট হইয়া গেল। হে মহারাজ! ঘোররূপ নিশাচরগণ এইরূপে অনবরত শস্ত্র বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে ভীত বা প্রাণরক্ষার্থ প্রার্থনাপরতন্ত্র ব্যক্তিগণও নিষ্কৃতি লাভ করিতে সমর্থ হইলেন না। এইরূপে সেই কালকৃত কুরুকুলক্ষয় ও ক্ষত্রিয়গণের অভাব কাল সমুপস্থিত হইলে কৌরবগণ ছিন্ন ভিন্ন ও পলায়ন পরায়ণ হইয়া মুক্তকণ্ঠে কহিতে লাগিলেন, হে কৌরবগণ! তোমরা এক্ষণে পলায়ন কর; আর নিস্তার নাই। দেবরাজ ইন্দ্র দেবগণের সহিত সমবেত হইয়া পাণ্ডবগণের উপকার সাধনার্থ আমাদিগকে সংহার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। হে মহারাজ! কৌরবগণ এইরূপ ঘোরতর বিপদ-সাগরে নিমগ্ন হইলে কোন ব্যক্তিই দ্বীপস্বরূপ হইয়া তাঁহাদিগকে আশ্রয় প্রদান করিতে সমর্থ হইলেন না। এইরূপে সেই তুমুল সংগ্রাম সমুপস্থিত এবং কৌরবসৈন্যগণ ছিন্ন ভিন্ন হইয়া চতুৰ্দ্দিকে ধাবমান হইলে রণস্থলে কে কৌরবপক্ষীয় আর কেই বা পাণ্ডবপক্ষীয় কিছুই অবগত হইতে পারিলাম না। চতুৰ্দ্দিক্ শূন্যময় বোধ হইতে লাগিল। তৎকালে কেবল একমাত্র কর্ণ অস্ত্রজালে সমাচ্ছন্ন হইয়া রণস্থলে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তিনি সেই রাক্ষসের মায়া প্রতিহত করিবার নিমিত্ত ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া অন্তরীক্ষ শরনিকরে সমাচ্ছন্ন করত দুষ্কর ক্ষত্রিয়োচিত কার্য্য অনুষ্ঠান করিলেন। তিনি তৎকালে কিছুতেই বিমোহিত হইলেন না। তখন সৈন্ধব ও বাত্ত্বিকগণ ভীতচিত্তে কর্ণকে অবিমোহিত নিরীক্ষণ করিয়া অসঙ্কুচিত চিত্তে তাঁহার প্রশংসা করত রাক্ষস-রাজ ঘটোৎকচের বিজয় ব্যাপার অবলোকন করিতে লাগিলেন।
ইত্যবসরে মহাবীর ঘটোৎকচ এক চক্রযুক্ত শতঘ্নী নিক্ষেপ করিয়া এককালে কর্ণের চারি অশ্ব বিনষ্ট করিল। অশ্বগণ গতাসু এবং দশন, অক্ষি ও জিহ্বা শূন্য হইয়া জানুদ্বয় সঙ্কুচিত করত ভূতলে নিপতিত হইল। তখন মহাবীর কর্ণ সেই হতাশ্ব রথ হইতে অবতরণপূর্ব্বক কৌরবগণকে পলায়মান ও ঘটোৎকচের মায়াপ্রভাবে স্বীয় দিব্যাস্ত্র নিহত নিরীক্ষণ করিয়াও অবিচলিত চিত্তে তৎকালোচিত কার্য্য চিন্তা করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সমস্ত কৌরবগণ সেই ভয়ঙ্কর মায়া দর্শন করিয়া কর্ণকে কহিলেন, হে সূতনন্দন! এই সমস্ত কৌরবসৈন্য বিনষ্ট হইতেছে; অতএব তুমি সত্বর এই নিশীথসময়ে সেই বাসবদত্তা শক্তিদ্বারা নিশাচরকে সংহার কর। ভীমসেন ও অর্জুন আমাদের কি করিবে? আজি বীরগণ এই ঘোর সংগ্রামে নিশাচরের হস্ত হইতে মুক্ত হইলে অনায়াসে পাণ্ডবগণের সহিত যুদ্ধ করিতে পারিবেন। অতএব তুমি অবিলম্বে শক্তিদ্বারা এই দুরাশয় রাক্ষসের প্রাণ সংহার কর। ইন্দ্রতুল্য কৌরবগণ যেন এই রাত্রিযুদ্ধে সৈন্যগণ-সমভিব্যাহারে বিনষ্ট না হন।
হে মহারাজ! তখন মহাবীর কর্ণ সেই নিশীথসময়ে সৈন্যগণকে শঙ্কিত দর্শন ও কৌরবগণের ভয়ঙ্কর কোলাহল শ্রবণ করিয়া ঘটোৎকচের বিনাশার্থ সেই ইন্দ্রপ্রদত্ত শক্তি পরিত্যাগ করিতে অভিলাষী হইলেন। পূর্ব্বে সুররাজ ইন্দ্র কর্ণের কুণ্ডলদ্বয় গ্রহণপূর্ব্বক উহাকে ঐ শক্তি প্রদান করেন। মহাবীর কর্ণ অর্জুনকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত বহুদিন অতি যত্নসহকারে উহা রক্ষা করিয়াছিলেন। এক্ষণে তিনি ঘটোৎকচের অমিত পরাক্রম সহ্য করিতে অসমর্থ হইয়া তাহার বিনাশ-বাসনায় সেই পাশযুক্ত, যমের ভগিনীর ন্যায়, অন্তকের জিহ্বার ন্যায় প্রদীপ্ত, ভীষণ শক্তি গ্রহণ করিলেন। ভীমসেনকুমার সেই কর্ণবাহুস্থিত অরাতিনিপাতন প্রজ্বলিত শক্তি সন্দর্শনে ভীত হইয়া বিন্ধ্য পর্ব্বতের পাদসদৃশ কলেবর ধারণপূর্ব্বক পলায়ন করিতে লাগিল। অন্তরীক্ষস্থিত প্রাণিগণ সেই ভয়ঙ্করী শক্তি দর্শন করিয়া ভীষণ শব্দ আরম্ভ করিল। ঐ সময় প্রচণ্ড বায়ু প্রবাহিত সনির্ঘাত অশনি নিপতিত হইতে লাগিল। হে মহারাজ। মহাবীর সূতপত্র সেই শত্রুঘাতিনী শক্তি নিক্ষেপ করিবামাত্র উহা ঘটোৎকচের মায়া ভস্মীকৃত করিয়া তাহার হৃদয় ভেদপূর্ব্বক ঊর্দ্ধমুখে নক্ষত্রমালার অন্তর্গত হইল।
এইরূপে ভীমসেনকুমার মহাবীর ঘটোৎকচ বিচিত্র বিবিধাস্ত্রদ্বারা মহাবল পরাক্রান্ত রাক্ষস ও মনুষ্যগণের সহিত সংগ্রাম ও অন্যান্য বিবিধ আশ্চর্য্য কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া অসংখ্য শত্রু সংহারপূর্ব্বক পরিশেষে বাসবদত্ত শক্তির আঘাতে অতি ভীষণ চীৎকার করত প্রাণত্যাগ করিল। ভীমকৰ্ম্মা ভীমতনয় সূতপুত্রের ভীষণ শক্তির আঘাতে মর্মাহত হইয়া যে স্থানে নিপতিত হইল, তত্রত্য এক অক্ষৌহিণী কৌরবসৈন্য তাহার দেহভরে বিপ্রোথিত' হইয়া গেল। হে মহারাজ! নিশাচর এইরূপে হতজীবিত হইয়াও স্বীয় প্রকাণ্ড শরীরদ্বারা আপনার বহু সংখ্যক সৈন্য সংহার করিয়া পাণ্ডবগণের প্রিয়কার্য্য সাধন করিল। অনন্তর কৌরবগণ মহাবীর ঘটোৎকচকে নিহত ও তাহার মায়া বিনষ্ট অবলোকন করিয়া পরমাহ্লাদে সিংহনাদ, শঙ্খনিস্বন এবং ভেরী, মুরজ ও আনকের নিনাদ করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বে দেবরাজ যেমন বৃত্রাসুরকে সংহার করিয়া সুরগণকর্তৃক পূজিত হইয়াছিলেন, তদ্রূপ কর্ণ ঘটোৎকচের প্রাণসংহারপূর্ব্বক কৌরবগণকর্তৃক পূজিত হইয়া দুর্য্যোধনের রথে আরোহণ করত স্বীয় সৈন্যমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! মহাত্মা পাণ্ডবগণ মহাবীর হিড়িম্বাতনয়কে নিহত ও পর্ব্বতের ন্যায় নিপতিত নিরীক্ষণ করিয়া শোকে বাষ্পাকূলনেত্র হইলেন; কিন্তু অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন বাসুদেব হর্ষসাগরে নিমগ্ন হইয়া পাণ্ডবগণকে নির্ব্যথিত করত সিংহনাদ পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। তিনি রথরশ্মি সংযত করিয়া অর্জুনকে আলিঙ্গনপূর্ব্বক বাতোদ্ধুত বনস্পতির ন্যায় রথোপরি নৃত্য আরম্ভ করিলেন এবং অনতি-বিলম্বেই পুনর্ব্বার অর্জুনকে আলিঙ্গন করিয়া বারংবার আস্ফোটনপূর্ব্বক পুনর্ব্বার সিংহনাদ পরিত্যাগে প্রবৃত্ত হইলেন।
হে মহারাজ। ঐ সমরে মহাবীর অর্জুন কেশবকে সাতিশয় সন্দর্শন করিয়া উৎকণ্ঠিতচিত্তে কহিলেন, হে মধুসূদন। আমাদিগের প্রধানতম সৈন্যগণ ও আমরা সকলেই হিড়িম্বা-তনয়কে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া অতিশয় শোকার্ত হইয়াছি; অতএব তুমি সাতিশয় আহ্লাদ প্রকাশ করিতেছ। তোমার এই অনুপযুক্ত সময়ে আহ্লাদ প্রকাশ সমুদ্রশোষণের' ন্যায় ও মেরুসঞ্চালনের ন্যায় নিতান্ত আশ্চর্য্য বোধ হইতেছে। যাহা হউক, তোমার এই আহ্লাদের অবশ্যই কোন মহৎ কারণ আছে। যদি উহা গোপনীয় না হয়, তাহা হইলে যথাবৎ কীর্ত্তন কর; উহা শুনিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইয়াছে।
বাসুদেব কহিলেন, হে ধনঞ্জয়! আমি যে জন্য সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়াছি, তাহা কহিতেছি, শ্রবণ কর। মহাবীর কর্ণ আজি ঘটোৎকচের উপর বাসবদত্ত শক্তি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের অতিশয় প্রীতিকর কার্য্য অনুষ্ঠান করিয়াছে। হে ধনঞ্জয়! তুমি এখন কর্ণকে সমরভূমিতে নিপতিত বলিয়া বোধ কর। এই পৃথিবী মধ্যে এমন কোন বীরপুরুষ নাই যে, কার্তিকেয়-সদৃশ শক্তিধারী সূতপুত্রের অভিমুখে অবস্থান করিতে পারে; কিন্তু আমাদের ভাগ্যক্রমে কর্ণের কবচ ও কুণ্ডল অপহৃত হইয়াছে এবং অদ্য উহার শক্তিও ঘটোৎকচের উপর নিক্ষিপ্ত ও উহার নিকট হইতে অপসৃত হইল। সূতপুত্রের কবচ এবং কুণ্ডল থাকিলে ঐ বীর একাকীই সুরগণের সহিত ত্রিলোক পরাজয় করিতে সমর্থ হইত। কি দেবরাজ, কি কুবের, কি বরুণ, কি যম কেহই কর্ণ-সমীপে অবস্থান করিতে সমর্থ হইতেন না। তুমি গাণ্ডীব এবং আমি সুদর্শন চক্র উদ্যত করিয়া উহাকে পরাজিত করিতে পারিতাম না; কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র তোমার হিতসাধনার্থ কর্ণকে কবচ ও কুণ্ডলবিহীন করিয়াছে। মহাবীর রাধেয় পূর্ব্বে কবচ ও কুণ্ডলদ্বয় ছেদন করিয়া পুরন্দরকে প্রদান করাতে "বৈকর্ত্তন” নামে বিখ্যাত হইয়াছে। আজি কর্ণকে মন্ত্রবল শিথিলিত ক্রুদ্ধ আশীবিষের ন্যায়, স্নিগ্ধজ্বাল অনলের ন্যায় বোধ হইতেছে। মহারথ কর্ণ যে দিন ইন্দ্রের নিকট কবচ ও কুণ্ডলদ্বয়ের বিনিময়ে শক্তি প্রাপ্ত হইয়াছে, সেই দিন অবধি ঐ মহাবীর উহা দ্বারা তোমাকে বিনাশ করিবে বলিয়া স্থির করিয়াছিল। এক্ষণে ঐ বীর শক্তিশূন্য হইয়াছে; উহা হইতে তোমার আর কিছু মাত্র শঙ্কা নাই। যাহা হউক, হে ধনঞ্জয়। আমি শপথ করিয়া বলিতেছি যে, কর্ণ এক্ষণে শক্তিশূন্য হইলেও তুমি ভিন্ন অন্য কেহই উহাকে বিনাশ করিতে সমর্থ হইবেন না। কর্ণ নিয়ত ব্রতানুষ্ঠানে তৎপর, সত্যবাদী, তপস্বী, ব্রহ্মচারী এবং অরাতিগণেরও প্রতি দয়াবান্ বলিয়া "বৃষ” নামে বিখ্যাত হইয়াছে। ঐ মহাবাহু রণদক্ষ এবং নিরন্তর শরাসন উদ্যত করত কেশরী যেমন বনমধ্যে মত্ত মাতঙ্গগণকে মদহীন করে, তদ্রূপ মহারথগণকে মদহীন করিয়া মধ্যাহ্নকালীন শারদ মার্ত্তণ্ডের ন্যায় যোদ্ধৃগণের দুৰ্দ্দর্শনীয় হইয়া সমরাঙ্গনে বিচরণ করিয়া থাকে। ঐ মহাবীর বর্ষাকালীন বারিধারাবর্ষী জলধরের নায় শরনিকর বর্ষণে প্রবৃত্ত হইলে ত্রিদশগণও শরজালবিস্তার করিয়া উহাকে পরাজয় করিতে সমর্থ হন না। উহার শরপ্রভাবে তাঁহাদিগেরই শরীর হইতে মাংস ও শোণিত বিগলিত হইতে থাকে; কিন্তু এক্ষণে সূতপুত্র কবচ, কুণ্ডল ও বাসবদত্ত শক্তি-বিহীন হইয়া সামান্য মানুষের ন্যায় অবস্থান করিতেছে। এক্ষণে কর্ণের বধোপায় অবধারণ করিয়া দিতেছি, শ্রবণ কর। সূতপুত্রের রথচক্র নিমগ্ন হইলে সেই ছিদ্রে আমার সঙ্কেত অবগত হইয়া সাবধানে উহাকে বিনাশ করিবে। কর্ণ উদ্যতায়ুধ হইয়া সংগ্রামে নিযুক্ত থাকিলে বজ্রধর বাসবও উহাকে পরাজয় করিতে সমর্থ হন না। যাহা হউক, হে ধনঞ্জয়! আমিই তোমার হিতার্থ বিবিধ উপায় উদ্ভাবনপূর্ব্বক ক্রমে ক্রমে মহাবলপরাক্রান্ত জরাসন্ধ, শিশুপাল, নিষাদরাজ একলব্য এবং হিড়িম্ব, কির্মীর, বক, অলায়ুধ, উগ্রকৰ্ম্মা, ঘটোৎকচ প্রভৃতি রাক্ষসের বধসাধন করিয়াছি।
অর্জুন কহিলেন, হে কৃষ্ণ! তুমি আমাদিগের হিত-সাধনের নিমিত্ত কিরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া জরাসন্ধ প্রভৃতি ভূপালগণকে নিপাতিত করিলে, তাহা কীর্ত্তন কর।
বাসুদেব করিলেন, হে অর্জুন! মহাবল পরাক্রান্ত জরাসন্ধ, চেদিরাজ ও নিষাদরাজ পূর্ব্বে নিহত না হইলে এক্ষণে নিতান্ত ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিত। সেই মহারথগণ জীবিত থাকিলে দুর্য্যোধন অবশ্যই তাহাদিগকে সমর-কার্য্যে বরণ করিত, সেই | সমুদায় অমরোপম কৃতাস্ত্র যুদ্ধদুৰ্ম্মদ মহাবীর আমাদের চির-বিদ্বেষ্টা ছিল; তাহারা অবশ্যই কৌরবপক্ষ অবলম্বনপূর্ব্বক দুর্য্যোধনকে রক্ষা করিত। সূতপুত্র, জরাসন্ধ, চেদিরাজ ও নিষাদরাজ ইহারা সমবেত হইয়া দুর্য্যোধনকে আশ্রয় করিলে এই সমুদায় পৃথিবীও পরাজয় করিতে সমর্থ হইত। হে পার্থ। আমি যেরূপ উপায় করিয়া তাহাদিগকে বিনাশ করিয়াছি, তাহা শ্রবণ কর। উপায় ব্যতীত সুরগণও তাহাদিগকে পরাজিত করিতে সমর্থ নহেন। তাহারা প্রত্যেকে সমরে লোকপাল রক্ষিত সমস্ত দেবসেনার সহিতও সংগ্রাম করিতে সমর্থ ছিল। জরাসন্ধ বলদেবকর্তৃক তাড়িত হইয়া ক্রোধভরে আমাদিগের বিনাশার্থ এক পাবক-তুল্য প্রভাসম্পন্ন, সর্ব্বসংহারক্ষম, অশনিসদৃশ গদা ক্ষেপণ করিল। জরাসন্ধনির্মুক্ত গদা আকাশমণ্ডল সীমন্তিত করিয়াই যেন আমাদের প্রতি ধাবমান হইল। মহাবীর বলদেব সেই গদা দর্শন করিয়া তাহার প্রতিঘাতার্থ স্থূণাকর্ণ নামক অস্ত্র পরিত্যাগ করিলেন। গদা বলদেবের অস্ত্রে প্রতিহত হইয়া ভূতলে পতিত হওয়াতে বোধ হইলে যেন অবনী বিদীর্ণ ও ভূধরসকল কম্পিত হইয়া উঠিল। হে ধনঞ্জয়! মহাবীর জরাসন্ধ দুই মাতার গর্তে জন্ম গ্রহণ করে; উহার মাতৃদ্বয় উহার অর্দ্ধ অর্দ্ধ কলেবর প্রসব করিয়াছিল। "জরা" নামে এক রাক্ষসী উহার সেই অর্দ্ধ কলেবরদ্বয় যোজিত করে। এই নিমিত্তই ঐ বীর "জরাসন্ধ” নামে বিখ্যাত হইয়াছিল। সেই নিশাচরী জরা, সেই গদা ও স্থূণাকর্ণ নামক অস্ত্রের আঘাতে পুত্র ও বান্ধবগণের সহিত হতজীবিত হইয়া ভূতলে পতিত হইল। হে ধনঞ্জয়! মহাবীর জরাসন্ধ এইরূপে গদাবিহীন হইয়াছিল বলিয়া মহাবীর ভীমসেন তোমার সমক্ষেই তাহাকে নিপাতিত করিয়াছেন। যদি সেই প্রবল প্রতাপশালী জরাসন্ধ গদা হস্তে অবস্থান করিত, তাহা হইলে ইন্দ্রাদি দেবগণ তাহাকে বিনাশ করিতে অসমর্থ হইতেন। হে ধনঞ্জয়! মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য তোমার হিতের নিমিত্তই ছদ্মবেশে আচার্য্যত্ব প্রদর্শনপূর্ব্বক নিষাদরাজ একলব্যের অঙ্গুষ্ঠ ছেদন করিয়াছিলেন। অভিমানী দৃঢ়রিক্রমশালী নিষাদাধিপতি অঙ্গুলিত্রাণ ধারণপূর্ব্বক বনে বনে ভ্রমণ করিয়া দ্বিতীয় পরশু-রামের ন্যায় শোভা পাইতেন। একলব্যের অঙ্গুষ্ঠ থাকিলে সমুদায় উরগ, রাক্ষস, দেব ও দানবগণও তাহাকে পরাজিত করিতে পারিতেন না। মনুষ্যগণও তাহাকে দর্শন করিতে অসমর্থ হইত; কিন্তু সেই দৃঢ়মুষ্টিসম্পন্ন দিবারাত্র বাণনিক্ষেপে সমর্থ, কৃতী নিষাদরাজ অঙ্গুষ্ঠবিহীন হইলে আমি তোমার হিতসাধনার্থ সমরে নিপাতিত করিয়াছি। হে পার্থ! আমি তোমার সমক্ষেই চেদিরাজকে সংহার করিয়াছি। ঐ বীরও সমরে সমস্ত সুরাসুরের অপরাজিত ছিল। আমি তোমার সাহায্যে চেদিরাজ ও অন্যান্য অসুরের বিনাশসাধন এবং লোকের হিতবর্দ্ধনের নিমিত্তই জন্মগ্রহণ করিয়াছি। হে ধনঞ্জয়! ভীমসেন দশাননসদৃশ বল-শালী ব্রাহ্মণগণের যজ্ঞবিঘাতক নিশাচর হিড়িম্ব, বক ও কির্মীরকে বিনাশ করিয়াছেন। মহাবীর ঘটোৎকচ অলায়ুধকে নিপাতিত করিয়াছে। এক্ষণে উপায়প্রভাবে কর্ণের শক্তিদ্বারা ঘটোৎকচেরও প্রাণবিয়োগ হইল। যদি সূতপুত্র বাসবদত্ত শক্তিদ্বারা ঘটোৎকচকে নিহত না করিত, তাহা হইলে আমাকেই বৃকোদরের পুত্রকে বধ করিতে হইত। আমি কেবল তোমাদিগের মঙ্গলসাধনের নিমিত্তই পূর্ব্বে উহার জীবন নাশ করি নাই। ঐ নিশাচর ব্রাহ্মণদ্বেষী, যজ্ঞনাশক, ধৰ্ম্মলোপ্তা' ও পাপাত্ম; এই নিমিত্তই কৌশলক্রমে নিপাতিত হইল। ঐ রাক্ষসের বিনাশে কর্ণের ইন্দ্রদত্ত শক্তিও বিফলীকৃত হইয়াছে। হে অর্জুন! আমি ধৰ্ম্মসংস্থাপনের নিমিত্ত এই দৃঢ়তর প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, যাহারা ধৰ্ম্মনাশক তাহাদিগকে অবশ্যই সংহার করিব। আমি শপথ করিয়া কহিতেছি, যে স্থানে ব্রহ্ম, সত্য, দম, শৌচ, ধৰ্ম্ম, শ্রী, লজ্জা, ক্ষমা ও ধৈর্য্য অবস্থান করে, আমি সেই স্থানেই সর্ব্বদা বর্তমান থাকি। হে পার্থ! তুমি কর্ণ সংহারের নিমিত্ত চিন্তা করিও না। আমি তোমাকে এরূপ উপদেশ প্রদান করিব যে, তদনুসারে কার্য্য করিলে অবশ্যই তাহাকে বিনাশ করিতে পারিবে। মহাবীর বৃকোদর যেরূপে সমরে দুর্য্যোধনকে নিপাতিত করিবেন আমি তাহারও উপায় করিয়া দিব। যাহা হউক, শত্রুসৈন্যগণ তুমুল শব্দ করিতেছে; তোমার সৈন্যগণও দশ দিকে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছে; লব্ধলক্ষ্য কৌরবগণ ও সংগ্রামবিশারদ দ্রোণাচার্য্যও অস্মৎপক্ষীয় সেনাসংহারে প্রবৃত্ত হইয়াছেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! সূতপুত্র কর্ণ কি নিমিত্ত সকলকে পরিত্যাগ করিয়া একমাত্র অর্জুনের প্রতি সেই একপুরুষঘাতিনী শক্তি নিক্ষেপ করিল না? ধনঞ্জয় নিহত হইলে | সৃঞ্জয় ও পাণ্ডবগণ বিনষ্ট ও জয়শ্রী আমাদেরই হস্তগত হইত। পূর্ব্বে অর্জুন প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন যে, আমি যুদ্ধে আহূত হইয়া কদাচ প্রতিনিবৃত্ত হইব না। অতএব তাহাকে সমরে আহ্বান করা কর্ণের অতি কর্তব্য ছিল। মহাবীর কর্ণ কি নিমিত্ত ধনঞ্জয়কে আহ্বানপূর্ব্বক দ্বৈরথযুদ্ধে প্রবর্তিত করিয়া বাসবদত্ত শক্তিদ্বারা সংহার করিল না? আমার আত্মজ দুর্য্যোধন নিতান্ত নির্বোধ ও সহায়শূন্য এবং বিপক্ষেরা তাহাকে একান্ত নিরুপায় করিয়াছে; সুতরাং সেই নরাধম কিরূপে শত্রুসংহার করিবে? সে যে শক্তির উপর নির্ভর করিয়া বিজয়লাভের অভিলাষ করিত, বাসুদেব কৌশলক্রমে সেই দিব্য শক্তি রাক্ষস ঘটোৎকচের প্রতি নিক্ষেপ করাইয়া উহা একান্ত নিষ্ফল করিয়াছেন; যেমন পরস্পর যুদ্ধে প্রবৃত্ত বরাহ ও কুকুরের অন্যতরের মৃত্যু হইলে চণ্ডালেরই লাভ হইয়া থাকে, তদ্রূপ কর্ণ ও ঘটোৎকচের এই দুইজনের মধ্যে অন্যতর বীর বিনষ্ট হইলে বাসুদেবেরই পরম লাভ, সন্দেহ নাই। যদি ঘটোৎকচ কর্ণকে বিনাশ করিতে পারে, তাহা হইলে পাণ্ডবগণের অতিশয় উপকার হয়, অথবা যদি মহাবীর কর্ণ ঘটোৎকচকে সংহার করিতে সমর্থ হয়, তাহা হইলেও তাহার একপুরুষঘাতিনী শক্তির বিনাশে পাণ্ডবগণের হিতকর কার্য্য সাধন করা হয়। বাসুদেব বুদ্ধিবলে এইরূপ অবধারণ করিয়া পাণ্ডবগণের হিতসাধনের নিমিত্তই সূতপুত্রদ্বারা ঘটোৎকচের বিনাশসাধন করিয়াছেন, সন্দেহ নাই।
সঞ্জয় কহিলেন, মহারাজ! মহাবীর কর্ণ শক্তিদ্বারা অর্জুনকেই সংহার করিতে কৃতনিশ্চয় হইয়াছিলেন। মহাবুদ্ধি-সম্পন্ন জনার্দ্দন কর্ণের এই অভিলাষ অবগত হইয়া অমোঘ শক্তি প্রতিহত করিবার নিমিত্ত মহাবল পরাক্রান্ত ঘটোৎকচকে তাঁহার সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে নিয়োজিত করিয়াছিলেন। যদি তিনি তৎকালে কর্ণের হস্ত হইতে মহারথ অর্জুনকে রক্ষা না করিতেন, তাহা হইলে আমরা নিঃসন্দেহ কৃতকার্য্য হইতাম। হে কুরুরাজ! সেই যোগিগণের ঈশ্বর বাসুদেব ঐরূপ কৌশল না করিলে ধনঞ্জয় অশ্ব, ধ্বজ ও রথের সহিত কর্ণের হস্তে কলেবর পরিত্যাগ করিতেন, সন্দেহ নাই। অর্জুন কৃষ্ণের উপায়বলেই রক্ষিত হইয়া সম্মুখীন শত্রুগণকে পরাজয় করিয়া থাকেন। অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন বাসুদেবই সেই অব্যর্থ শক্তি হইতে অর্জুনকে রক্ষা করিয়াছিলেন; নচেৎ উহা বজ্রাহত বৃক্ষের ন্যায় তাঁহাকে নিপাতিত করিত।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। আমার আত্মজ দুর্য্যোধন নিতান্ত বিরোধী', কুমন্ত্রণাপরতন্ত্র ও প্রজ্ঞাভিমানী'; তাহার নিমিত্তই এই অর্জুনের বধোপায় নিষ্ফল হইয়াছে। যাহা হউক, মহাবীর কর্ণ সকল শস্ত্রধারীদিগের অগ্রগণ্য ও মহাবুদ্ধিসম্পন্ন; সে কি নিমিত্ত অর্জুনের প্রতি সেই অমোঘ শক্তি প্রয়োগ করিল না? হে সঞ্জয়। তুমিও বিস্মৃত হইয়াছিলে? তুমি কেন ইহা তৎকালে কর্ণকে স্মরণ করিয়া দিলে না?
তখন সঞ্জয় রাজা ধৃতরাষ্ট্রের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, মহারাজ! রাজা দুর্য্যোধন, শকুনি, দুঃশাসন ও আমরা প্রতি রাত্রিতেই সূতপুত্রকে কহিতাম, হে কর্ণ! তুমি সমস্ত সৈন্য পরিত্যাগপূর্ব্বক ধনঞ্জয়কে সংহার কর; তাহা হইলে আমরা পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণকে কিঙ্করের ন্যায় নির্দেশানুবর্তী করিতে পারিব। অথবা অর্জুন বিনষ্ট হইলেও কৃষ্ণ পাণ্ডবগণের অন্য-তমকে সমরে দীক্ষিত করিবেন; অতএব তুমি অর্জুনকে বিনষ্ট না করিয়া কৃষ্ণকেই বিনাশ কর। কৃষ্ণ পাণ্ডবগণের মূলস্বরূপ, যুধিষ্ঠির বৃক্ষস্বরূপ, অর্জুন স্কন্দস্বরূপ, ভীমসেন প্রভৃতি বীরগণ শাখাস্বরূপ এবং পাঞ্চালেরা পত্রস্বরূপ। পাণ্ডবদিগের কৃষ্ণই আশ্রয় কৃষ্ণই বল, কৃষ্ণই নাথ এবং কৃষ্ণই পরমা গতি। অতএব হে কর্ণ! তুমি পর্ণ, শাখা ও স্কন্দ পরিত্যাগ করিয়া মূলস্বরূপ কৃষ্ণকে বিনাশ কর। যদি বাসুদেব নিহত হইয়া সমর শয্যায় শয়ন করেন, তাহা হইলে শৈল, সাগর ও অরণ্য পরিশোভিত সমুদায় বসুন্ধরা তোমার বশবর্তী হইবে, সন্দেহ নাই। হে মহারাজ! আমরা প্রতি রজনীতেই হৃষীকেশকে সংহার করিবার নিমিত্ত এইরূপ অবধারণ করিতাম; কিন্তু যুদ্ধকালে উহার সম্যক্ পরিবর্তন হইয়া যাইত। মহাত্মা বাসুদেব সতত ধনঞ্জয়কে রক্ষা করিয়া থাকেন; তিনি সূতপুত্রের সমক্ষে তাঁহাকে অবস্থাপিত করিতেন না। তিনি সেই অমোঘ শক্তি নিষ্ফল করিবার নিমিত্ত অন্যান্য রথীদিগকে কর্ণের সহিত সমরে প্রবর্তিত করিতেন। হে মহারাজ! যখন বাসুদেব এইরূপে কর্ণের হস্ত হইতে অর্জুনকে রক্ষা করেন, তখন যে তিনি আত্মরক্ষায় উপেক্ষা প্রদর্শন করিবেন, কদাচ ইহা সম্ভবপর নহে। ফলতঃ আমি অনেক অনুসন্ধান করিয়া দেখিলাম যে, জনাৰ্দ্দনকে পরাজয় করিতে সমর্থ, এমন কেহই এই ত্রিলোকমধ্যে জন্মগ্রহণ করে নাই।
হে মহারাজ! ঘটোৎকচ বধের পর সত্যবিক্রম সাত্যকি কৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, হে বাসুদেব! কর্ণ ধনঞ্জয়ের প্রতি সেই অমিত পরাক্রান্ত শক্তি প্রয়োগ করিবে বলিয়া স্থিরনিশ্চয় করিয়াছিল কিন্তু কি নিমিত্ত তাহার অন্যথাচরণ করিল? বাসুদেব সাত্যকির এই কথা শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে শিনিপ্রবীর। দুঃশাসন, শকুনি ও জয়দ্রথ দুর্য্যোধনের সহিত পরামর্শ করিয়া সতত কর্ণকে কহিত, হে সূতপুত্র। তুমি কুস্তীনন্দন ধনঞ্জয় ভিন্ন অন্য কাহারও প্রতি এই শক্তি কদাচ প্রয়োগ করিও না। ধনঞ্জয় দেবগণমধ্যে সুররাজ ইন্দ্রের ন্যায়, পাণ্ডবগণমধ্যে সাতিশয় যশস্বী; তাহাকে সংহার করিতে পারিলে সৃঞ্জয় ও পাণ্ডবগণ হুতাশনবিহীন সুরগণের ন্যায় বিনষ্টপ্রায় হইবে, সন্দেহ নাই। হে সাত্যকি! দুঃশাসন প্রভৃতি কৌরবপক্ষীয় বীরগণ বারংবার এইরূপ কহিলে 'কর্ণও তাহাদের বাক্যে অঙ্গীকার করিয়াছিল এবং এই শক্তিদ্বারা ধনঞ্জয়েরই বধসাধন করিতে হইবে, ইহা সততই তাহার অন্তঃকরণে জাগরূক থাকিত; কিন্তু আমি তাহাকে বিমোহিত করিলাম বলিয়াই সে অর্জুনের প্রতি সেই শক্তি প্রয়োগ করে নাই। হে শৈনেয়। আমি যে পর্য্যন্ত না অর্জুনের এই মৃত্যুর প্রতীকার করিয়াছিলাম, ততদিন আমার নিদ্রা ও হর্ষ এককালে তিরোহিত হইয়াছিল। এক্ষণে সেই অমোঘ শক্তি রাক্ষসরাজ ঘটোৎকচের প্রতি প্রযুক্ত হইয়াছে দেখিয়া ধনঞ্জয়কে কৃতান্তের করাল আস্যদেশ হইতে আচ্ছিন্ন বলিয়া বোধ হইতেছে। ধনঞ্জয়কে রক্ষা করা আমার যেমন কর্তব্য, আপনার জীবন এবং পিতা, মাতা, ভ্রাতা ও তোমাদিগকে রক্ষা করা তদ্রূপ নহে। অধিক কি, বিশ্বরাজ্য অপেক্ষাও যদি কোন বস্তু দুর্লভথাকে, আমি অর্জুনবিহীন হইয়া তাহাও প্রার্থনা করি না। হে যুযুধান। ধনঞ্জয়কে পুনর্জীবিতের ন্যায় নিরীক্ষণ করিয়া আমার এইরূপ গুরুতর হর্ষ উপস্থিত হইয়াছে। রাত্রিকালে কর্ণকে নিবারণ করিতে পারে, ঘটোৎকচ ভিন্ন এমন আর কেহই নাই; এই নিমিত্তই আমি ভীমতনয়কে যুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলাম।
হে মহারাজ! ধনঞ্জয়ের হিতানুষ্ঠান-পরতন্ত্র মহাত্মা বাসুদেব সাত্যকিকে তৎকালে এইরূপ কহিয়াছিলেন।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়। কর্ণ, দুর্য্যোধন ও শকুনি প্রভৃতি বীরগণের বিশেষতঃ তোমার অতিশয় নীতিবিরুদ্ধ কার্য্য দেখিতেছি। তোমরা সকলে ত অবগত ছিলে যে, সেই বাসবদত্ত শক্তি একজনকে অবশ্যই সংহার করিতে পারে এবং ইন্দ্রাদি দেবগণের মধ্যেও কেহ উহা সহ্য বা নিবারণ করিতে সমর্থ নহেন; তবে কর্ণ কি নিমিত্ত একাল পর্যন্ত সেই একপুরুষঘাতিনী শক্তি দেবকীপুত্র বা অর্জুনের প্রতি প্রয়োগ করেন নাই?
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! আমরা প্রতিদিন সমরাঙ্গন হইতে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক রজনীযোগে পরামর্শ করিয়া কর্ণকে কহিতাম, হে কর্ণ! কল্য প্রভাতেই তুমি এই একপুরুষঘাতিনী শক্তি হয় কেশব, না হয় অর্জুনের প্রতি নিক্ষেপ করিবে! দৈবের কি বিড়ম্বনা, পরদিন প্রভাতেই কি কর্ণ, কি অন্যান্য যোধগণ সকলেই উহা বিস্মৃত হইত। হে মহারাজ! দৈবই সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান, তাহার প্রভাবে সূতনন্দন হতবুদ্ধি হইয়া দেবকীপুত্রের বা ইন্দ্রপরাক্রম অর্জুনের প্রতি সেই কালরাত্রি-স্বরূপিণী বাসবী-শক্তি নিক্ষেপ করেন নাই।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে সঞ্জয়! তোমরা স্ব স্ব বুদ্ধি, দৈব ও কেশবের প্রভাবে বিনষ্ট হইলে। বাসবদত্ত শক্তি তৃণতুল্য ঘটোৎকচকে বিনাশ করিয়া ব্যর্থ হইল। মহারীর কর্ণ, আমার পুত্রগণ ও অন্যান্য ভূপালসমুদায় এই নীতি বহির্ভূত কার্য্য-নিবন্ধনই শমনভবনে গমন করিলেন। যাহা হউক, হিড়িম্বাতনয় নিহত হইলে কৌরব ও পাণ্ডবগণের পুনরায় কিরূপ যুদ্ধ উপস্থিত হইল? কীর্ত্তন কর। যে যে পাঞ্চালেরা সৃঞ্জয়গণের সহিত দ্রোণের অভিমুখে ধাবমান হইয়াছিল, তাহারা কি প্রকারে যুদ্ধ করিতে লাগিল? মহাবীর দ্রোণাচার্য্য ভূরিশ্রবাঃ ও সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের বিনাশ-নিবন্ধন, অতিশয় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তৃম্ভমাণ শার্দুলের ন্যায়, ব্যাদিতাস্য কৃতান্তের ন্যায় প্রাণপণে অরাতি-সৈন্যমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক শর বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলে পাণ্ডব ও সৃঞ্জয়গণ কিরূপে তাঁহার প্রত্যুদ্গমন করিল? দুর্য্যোধন, অশ্বত্থামা ও কৃপাচার্য্য প্রভৃতি যে যে বীরগণ আচার্য্যের রক্ষায় নিযুক্ত ছিলেন, তাঁহারা সংগ্রামস্থলে কি করিলেন? আমাদের পক্ষীয় বীরগণ দ্রোণাচার্য্যবধার্থী ধনঞ্জয় ও বৃকোদরের উপর কিরূপ বাণবৃষ্টি করিল? কৌরবগণ জয়দ্রথের ও পাণ্ডব-গণ ঘটোৎকচের বিনাশে সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়াছিল, তাহারা সেই রাত্রিতে পরস্পর কিরূপ যুদ্ধ করিতে লাগিল? এই সমুদায় বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন কর।
সঞ্জয় কহিলেন, হে মহারাজ! সেই ঘোরা রজনীতে মহাবীর কর্ণ ঘটোৎকচকে নিহত করিলে কৌরবপক্ষীর যোধগণ পরমাহ্লাদে সিংহনাদ পরিত্যাগ করত বেগে আগমনপূর্ব্বক পাণ্ডবসৈন্যসমুদায় বিনাশ করিতে আরম্ভ করিলে রাজা যুধিষ্ঠির অতি দীনভাবে ভীমসেনকে কহিলেন, হে ভ্রাতঃ! তুমি শীঘ্র কৌরবসৈন্যগণকে বিনাশ কর। আমি ঘটোৎকচের নিধনে বিমোহিত প্রায় হইয়াছি। ধৰ্ম্মরাজ ভীমসেনকে এই কথা বলিয়াই অশ্রুপূর্ণমুখে স্বীয় রথে আসীন হইয়া কর্ণের বিক্রম সন্দর্শন-পূর্ব্বক বারংবার দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করত মহামোহে অভিভূত হইলেন। মহাত্মা হৃষীকেশ যুধিষ্ঠিরকে নিতান্ত ব্যথিত অবলোকন করিয়া কহিলেন, হে ধর্মরাজ! প্রাকৃতজনের ন্যায় শোক প্রদর্শন করা আপনার কর্ত্তব্য নহে; অতএব আপনি শোক সংবরণপূর্ব্বক গাত্রোত্থান করিয়া সমরভার বহন করুন। আপনি এরূপ শোকপরবশ হইলে বিজয়লাভে সংশয় উপস্থিত হইবে।
২ে মুম্বাজ! ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির বাসুদেবের বাক্য শ্রবণানন্তর পাণিতলদ্বারা নেত্রদ্বয় পরিমার্জিত করত কহিলেন, হে মহাবাহো! ধৰ্ম্মপথ কিছুই আমার অবিদিত নাই। অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি ব্রহ্মহত্যা পাপে লিপ্ত হয়। দেখ, অর্জুন অস্ত্র শিক্ষার্থ গমন করিলে মহাত্মা হিড়িম্বাতনয় বালক হইয়াও আমাদিগের অনেক সাহায্য করিয়াছিল। ঐ মহাধনুর্দ্ধর কাম্যকবনে আমার শুশ্রূষা করিত এবং ধনঞ্জয়ের অনুপস্থিতি কাল পর্যন্ত আমাদিগের সহিত একত্র বাস করিয়াছিল। ঐ যুদ্ধাভিজ্ঞ মহাবীর গন্ধমাদন গমনকালে আমাদিগকে দুর্গম স্থান হইতে উদ্ধার ও পরিশ্রান্ত পাঞ্চালীকে পৃষ্ঠে পৃষ্ঠে বহন করিয়াছিল। মহাবীর ভীমতনয় আমার নিমিত্ত এইরূপ অনেক দুষ্কর কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছে। হে জনার্দ্দন! সহদেবের প্রতি আমার যেরূপ স্বাভাবিক স্নেহ আছে, রাক্ষসেন্দ্র ঘটোৎকচের প্রতি তদপেক্ষা দ্বিগুণ ছিল। ভীমতনয় আমার অতিশয় ভক্ত ও প্রিয়পাত্র ছিল! তজ্জন্যই আমি শোকসন্তপ্ত ও মোহপ্রাপ্ত হইতেছি। হে বায়ে! ঐ দেখ, কৌরবেরা আমাদিগের সৈন্যসমুদায় বিদ্রাবিত করিতেছে। মহারথ দ্রোণাচার্য্য ও কর্ণ পরম যত্নসহকারে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া মত্তমাতঙ্গদ্বয় যেমন নলবন প্রমথিত করে, তদ্রূপ পাণ্ডবসৈন্যগণকে মদ্দিত করিতেছেন। কৌরবেরা ভীমসেনের ভুজবলে ও অর্জুনের বিবিধ অস্ত্রশিক্ষায় অবজ্ঞা প্রদর্শনপূর্ব্বক বিক্রম প্রকাশ করিতেছে। ঐ দেখ, দ্রোণ, কর্ণ ও দুর্য্যোধন, ঘটোৎকচের নিধননিবন্ধন আহ্লাদসাগরে নিমগ্ন হইয়াছে। হে জনাৰ্দ্দন! তুমি এবং আমরা জীবিত থাকিতে সূতপুত্র কিরূপে সর্ব্বসমক্ষে মহাবল পরাক্রান্ত ভীমতনয়ের বিনাশ সাধন করিল? যখন দুরাত্মা ধৃতরাষ্ট্রতনয়েরা অভিমন্যুকে বিনাশ করে, সে সময়ে মহারথ ধনঞ্জয় রণস্থলে উপস্থিত ছিল না, আমরাও সকলে সিন্ধুরাজকর্তৃক রুদ্ধ ছিলাম। দ্রোণাচার্য্যই পুত্র-সমভি-ব্যাহারে অভিমন্যু বিনাশের কারণ হইয়াছিলেন। তিনি তাহার বধোপায় উদ্ধাবন করিয়া দেন; অশ্বত্থামা তাহার অসিদণ্ড দ্বিখণ্ড করিয়া ফেলে, নৃশংস কৃতবর্মা বিপন্ন বালকের অশ্বগণকে পার্ফি ও সারথির সহিত নিহত করে এবং অন্যান্য ধনুর্দ্ধরেরা তাহার বিনাশ সাধন করেন। হে যাদবশ্রেষ্ঠ; অভিমন্যু বধে জয়দ্রথের অতি সামান্য অপরাধ ছিল, তন্নিমিত্ত অর্জুন জয়দ্রথকে বিনাশ করাতে আমি অধিক আহ্লাদিত হই নাই। এক্ষণে যদি শত্রুবিনাশ করা আমাদিগের অবশ্য কর্তব্য হইয়া থাকে, তাহা হইলে আমার মতে অগ্রে দ্রোণ ও কর্ণকে বিনাশ করা কর্তব্য। ঐ দুইজনই আমাদিগের দুঃখের আদি কারণ; উহাদিগের সাহায্যেই দুর্য্যোধন আশ্বাসযুক্ত হইয়াছে। হে মাধব! যে সংগ্রামে দ্রোণ ও কর্ণকে অনুচরগণের সহিত বিনাশ করা কর্ত্তব্য, অর্জুন সেই যুদ্ধে মহাবীর জয়দ্রথকে বিনাশ করিয়াছে। যাহা হউক, এক্ষণে সুতপুত্রকে নিগ্রহ করা আমার অবশ্যই কর্তব্য হইয়াছে। অতএব আমি তাহার সহিত সংগ্রাম করিবার নিমিত্ত চলিলাম। ঐ দেখ, ভীমপরাক্রম ভীমসেন দ্রোণসৈন্য সমভিব্যাহারে সমরে প্রবৃত্ত হইয়াছে।
হে মহারাজ! রাজা যুধিষ্ঠির এই বলিয়া ভীষণ শরাসন বিস্ফারিত ও শঙ্খ প্রধ্নাপিত করিয়া সত্বর কর্ণের অভিমুখে ধাবমান হইলেন। ঐ সময়ে শিখণ্ডী অসংখ্য রথ, তিনশত হস্তী, পাঁচশত অশ্ব ও তিন সহস্র প্রভদ্রক সৈন্যে পরিবেষ্টিত হইয়া ধর্মরাজের অনুগমন করিলেন। পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণ ভেরী ও শঙ্খধ্বনি করিতে লাগিলেন। তখন মহাবাহু বাসুদেব ধনঞ্জয়কে কহিলেন, হে অর্জুন! ঐ দেখ, ধর্মরাজ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া সূতপুত্রের বিনাশ-বাসনায় গমন করিতেছেন। অতএব উহার উপর নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত থাকা আমাদের কর্ত্তব্য নহে। মহাত্মা হৃষীকেশ এই বলিয়া সত্বর রথসঞ্চালনপূর্ব্বক দূরগত ধর্মপুত্রের, অনুগমনে প্রবৃত্ত হইলেন।
হে মহারাজ। ঐ সময়ে মহর্ষি বেদব্যাস শোকবিমূঢ় সন্তপ্তচিত্ত যুধিষ্ঠিরকে সূতপুত্রের বিনাশ-বাসনায় সহসা গমন করিতে দেখিয়া তাঁহার সমীপে আগমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে রাজন। অর্জুন সৌভাগ্যক্রমে সমরাঙ্গনে সূতপুত্রের হস্তে পরিত্রাণ পাইয়াছে। মহাবীর কর্ণ ধনঞ্জয়ের নিধন-কামনায় বাসবদত্ত শক্তি রক্ষা করিয়াছিল। ভাগ্যক্রমে ধনঞ্জয় কর্ণের সহিত দ্বৈরথযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন নাই। অর্জুন কর্ণের সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইলে অবশ্যই ঐ বীরদ্বয় পরস্পরের প্রতি দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করিতেন। অর্জুনের অস্ত্রে কর্ণের অস্ত্র ছিন্ন হইলে সূতপুত্র নিশ্চয়ই তাঁহার উপর বাসবদত্ত শক্তি নিক্ষেপ করিত। তোমার নিদারুণ ব্যসন উপস্থিত হইত। ভাগ্যক্রমে সূতপুত্র তাহা না করিয়া সেই শক্তিদ্বারা ঘটোৎকচকে বিনাশ করিয়াছে। হে ভরতবংশাবতংশ। দৈবই তোমার মঙ্গলের নিমিত্ত রাক্ষসকে নিহত করিয়াছে। পুরন্দরপ্রদত্ত শক্তি কেবল নিমিত্ত মাত্র। অতএব তুমি এক্ষণে ক্রোধ ও শোক সংবরণ কর। জীবমাত্রেরই সংহার আছে। এক্ষণে তুমি ভ্রাতৃগণ ও মহাত্মা নরপতিগণের সমভিব্যাহারে কৌরবগণের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও। আজি হইতে পঞ্চম দিবসে বসুন্ধরা তোমার হস্তগত হইবে। তুমি নিরন্তর ধর্মানুষ্ঠানে তৎপর হও। পরম প্রীতমনে অনৃশংসতা, তপঃ, দান, ক্ষমা ও সত্যের অনুষ্ঠান কর। যে স্থানে ধৰ্ম্ম সেই স্থানেই জয়। হে কুরুরাজ! মহর্ষি বেদব্যাস যুধিষ্ঠিরকে এই বলিয়া সেই স্থানেই অন্তর্হিত হইলেন।
