কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত

আশ্রমবাসিকপর্ব্ব

পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ

আশ্রমবাসিক পর্ব্বাধ্যায়
পুত্রদর্শন পর্ব্বাধ্যায়
নারদাগমন পর্ব্বাধ্যায়

আশ্রমবাসিকপর্ব্ব

আশ্রমবাসিক পর্ব্বাধ্যায়।

নারায়ণ, নর, নরোত্তম, দেবী সরস্বতী ও ব্যাসদেবকে প্রণাম করিয়া জয় উচ্চারণ করিবে।

যুধিষ্ঠিরকর্তৃক রাজ্যশাসন।

জনমেজয় কহিলেন, ব্রহ্মন্! আমার পূর্ব্বপিতামহ মহাত্মা পাণ্ডুনন্দনগণ রাজ্যলাভ করিয়া কতদিন উহা ভোগ করিয়া-ছিলেন? তাঁহারা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করিতেন এবং যশস্বিনী গান্ধারী ও পুত্রহীন অমাত্যহীন' আশ্রয়বিহীন রাজা ধৃতরাষ্ট্রই বা কিরূপে কালযাপন করিয়াছিলেন, তাহা কীর্ত্তন করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! শত্রুসমুদায় নিহত হইবার পর মহাত্মা পাণ্ডবগণ রাজ্যলাভ করিয়া বত্রিংশৎ বৎসর উহা উপভোগ করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে পঞ্চদশ বৎসর ধৃতরাষ্ট্রের মতানুসারে তাঁহাদের রাজ্য প্রতিপালিত হয়। ঐ সময় বিদুর, সঞ্জয় ও বৈশ্যাপুত্র যুযুৎসু ইঁহারা সর্ব্বদা অন্ধ-রাজের সমীপে সমুপস্থিত থাকিতেন। ভীমসেন প্রভৃতি বীরগণ যুধিষ্ঠিরের বশবর্তী হইয়া ধৃতরাষ্ট্রের উপাসনা ও চরণবন্দনা করিতেন। ভোজরাজনন্দিনী কুন্তী প্রতিনিয়ত গুরুপত্নীর ন্যায় গান্ধারীর বশবর্তিনী হইয়া থাকিতেন। দ্রৌপদী, সুভদ্রা ও অন্যান্য পাণ্ডবপত্নীগণ স্বীয় শ্বশ্রু ও শ্বশুরের ন্যায় গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করিতেন। রাজা যুধিষ্ঠির প্রতিনিয়ত মহার্হ শয্যা, পরিধেয় বস্ত্র, আভরণ ও রাজোচিত বিবিধ ভক্ষ্য-ভোজ্য দ্রব্যসমুদায় ধৃতরাষ্ট্রকে অর্পণ করিতেন। দ্রোণাচার্য্যের প্রিয় শ্যালক মহাধনুর্দ্ধর কৃপাচার্য্য ও ভগবান্ বেদব্যাস সতত অন্ধ-রাজের নিকট সমুপস্থিত থাকিতেন। বেদব্যাসের সহিত তাঁহার সর্ব্বদা দেবতা, ঋষি, পিতৃলোক ও রাক্ষসবিষয়ক নানাবিধ কথোপকথন হইত।

মহামতি বিদুর তাঁহার আদেশানুসারে ধর্ম ও ব্যবহার-বিষয়ক কার্য্যসমুদায় সন্দর্শন করিতেন। মহাত্মা বিদুরের সুনীতি-প্রভাবে অতি সামান্য অর্থব্যয়ে সামন্ত নরপতিদিগের নিকট হইতে বহুতর প্রিয়কার্য্য সুসম্পন্ন হইত। তিনি আবদ্ধ ব্যক্তি-দিগের বন্ধনমোচন এবং বধাই ব্যক্তিদিগের প্রাণদান করিতেন। ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির তাহাতে কদাচ বানিষ্পত্তিও করিতেন না।

তিনি বিহারযাত্রাসময়ে ধৃতরাষ্ট্রকে বিবিধ উপভোগ্য বস্তু প্রদান করিতেন। ঐ সময় নানাবিধ পাচকগণ পূর্ব্বের ন্যায় ধৃতরাষ্ট্রের পাককার্য্যে ব্যাপৃত থাকিত; পাণ্ডবগণ মহার্হ বস্ত্র ও বিবিধ মাল্য আহরণ করিয়া তাঁহাকে অর্পণ করিতেন; মৈরেয়, মৎস্য, মাংস, পানীয় ও মধুপ্রভৃতি বিবিধ বিচিত্র ভক্ষ্যদ্রব্যসমুদায় তাঁহার নিমিত্ত প্রস্তুত হইত এবং যে সমুদায় ভূপতি বিহার উপলক্ষে তথায় উপস্থিত হইতেন, তাঁহারা সকলেই পূর্ব্বের ন্যায় তাঁহার উপাসনা করিতেন। কুন্তী, দ্রৌপদ্রী, সুভদ্রা, উলুপী, চিত্রাঙ্গদা, ধৃতকেতুর ভগিনী, জরাসন্ধের কন্যা ও অন্যান্য ভরত-কুলকামিনীগণ সতত গান্ধারীর সেবায় নিযুক্ত থাকিতেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির "রাজা ধৃতরাষ্ট্র পুত্রবিহীন হইয়াছেন; অতএব যাহাতে উঁহাকে কিছুমাত্র দুঃখভোগ করিতে না হয়, তোমরা তাহাই করিবে” এই বলিয়া ভ্রাতৃগণকে প্রতিনিয়ত সতর্ক করিয়া দিতেন। তাঁহারাও তাঁহার আদেশানুসারে ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি সর্ব্বদা সবিশেষ যত্ন করিতেন। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের দুর্নীতিনিবন্ধন যে দুর্ঘটনা হইয়াছিল, বৃকোদরের হৃদয় হইতে তখনও তাহা অপনীত হয় নাই বলিয়া তিনি তাঁহার সুখসাধনবিষয়ে তত যত্নবান্ হইতেন না।

যুধিষ্ঠিরাদির সেবায় ধৃতরাষ্ট্রের প্রীতিলাভ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডব ও ঋষিগণকর্তৃক এইরূপে সম্মানিত হইয়া পূর্ব্বের ন্যায় সুখস্বচ্ছন্দে কালহরণপূর্ব্বক বন্ধুবান্ধবগণের শ্রাদ্ধোপলক্ষে ব্রাহ্মণদিগকে বিবিধ উৎকৃষ্ট বস্তুসমুদায় প্রদান করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সরলস্বভাব মহাত্মা যুধিষ্ঠির তাঁহাকে সেই সমুদায় বস্তু প্রদান-পূর্ব্বক প্রীতমনে অমাত্য ও ভ্রাতৃগণকে কহিলেন, অন্ধরাজ আমার ও তোমাদিগের পরম পূজনীয়। অতএব যিনি উঁহার আজ্ঞানুবর্তী থাকিবেন, তিনি আমার পরম সুহৃৎ; আর যিনি উঁহার আজ্ঞা লঙ্ঘন করিবেন, তিনি আমার শত্রুস্বরূপ হইবেন, সন্দেহ নাই। এক্ষণে উনি স্বীয় পুত্র বন্ধুবান্ধবগণের শ্রাদ্ধোপলক্ষে ইচ্ছানুসারে ধনদান করুন।

যুধিষ্ঠির এইরূপ কহিলে, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র উপযুক্ত ব্রাহ্মণগণকে প্রভূত ধনদান করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জুন, নকুল ও সহদেব, ইঁহারা সকলেই তাঁহার প্রীতির নিমিত্ত তাঁহাকে বিবিধ ধনদান করিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, এই বৃদ্ধ অন্ধরাজকে আমাদিগের নিমিত্তই পুত্রপৌত্রশোকে নিতান্ত অভিভূত হইতে হইয়াছে; অতএব যাহাতে ইনি সেই শোকনিবন্ধন কালকবলে পতিত না হন তদ্বিষয়ে যত্নবান্ হওয়া আমাদের সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। ইঁহার পুত্রগণ জীবিত থাকিতে ইনি যেরূপ সুখ-স্বচ্ছন্দে কালহরণ করিয়াছেন, এক্ষণেও সেইরূপ সুখভোগে কালহরণ করুন। পাণ্ডবগণ এইরূপ চিন্তা করিয়া তাঁহার আজ্ঞানুসারে সমুদায় কার্য্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁহাদিগকে নিতান্ত বিনীত, আজ্ঞানুবর্ত্তী ও ভক্তিমান্ দেখিয়া তাঁহাদিগের প্রতি অতিশয় প্রীত হইলেন। ঐ সময় মহানুভাবা গান্ধারীও পিতৃলোকপ্রাপ্ত পুত্রগণের শ্রাদ্ধোপলক্ষে ব্রাহ্মণদিগকে বিবিধ ধনদান করিয়া পিতৃঋণ হইতে মুক্ত হইলেন।

এইরূপে ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণের সহিত প্রতিনিয়ত অন্ধরাজের যথাযোগ্য সৎকার করিতে আরম্ভ করিলে তিনি কোন বিষয়ে পাণ্ডবগণের দোষ দেখিতে না পাইয়া, তাঁহাদের প্রতি পরম পরিতুষ্ট হইলেন। পতিপরায়ণা গান্ধারীও পুত্রশোক পরিত্যাগ করিয়া তাঁহাদিগের স্বীয় পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের কোনরূপ অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতেন না। অন্ধরাজ ও গান্ধারী তাঁহাকে যে যে কার্য্যে নিয়োগ করিতে লাগিলেন, তৎসমুদায় কঠিন হউক বা সহজ হউক, তিনি প্রীতমনে সম্পাদন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন অন্ধরাজ, ধর্মরাজের এইরূপ সদাচারদ্বারা পরম প্রীত হইয়া মন্দবুদ্ধি দুর্য্যোধনকে স্মরণপূর্ব্বক যাহার পর-নাই অনুতাপযুক্ত হইলেন এবং প্রতিদিন প্রাতঃকালে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক জপাদি ক্রিয়া সমাপন করিয়া পাণ্ড বগণের সংগ্রামে অপরাজয় ও ব্রাহ্মণদ্বারা স্বস্তিবাচন ও অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিয়া তাঁহাদের আয়ুবৃদ্ধি প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। ফলতঃ তৎকালে পাণ্ডবগণ হইতে তাঁহার যেরূপ প্রীতিলাভহইল, পূর্ব্বে তিনি স্বীয় পুত্রগণ হইতেও সেইরূপ প্রীতিলাভে সমর্থ হন নাই। ঐ সময় ব্রাহ্মহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র চারিবর্ণই ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি প্রীত হইলেন। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির দুর্য্যোধনাদির অত্যাচারের বিষয় একবার স্মরণও না করিয়া অন্ধরাজের আজ্ঞানুসারে সমুদায় কার্য্য করিতে লাগিলেন।

ঐ সময় যে ব্যক্তি ধৃতরাষ্ট্রের কোনরূপ অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিত, যুধিষ্ঠির তাহার সহিত শত্রুবৎ ব্যবহার করিতেন। সুতরাং ধর্মরাজের ভয়ে কেহই তৎকালে ধৃতরাষ্ট্রের বা দুর্য্যোধনের দোষকীর্তনে সমর্থ হইত না। মহাত্মা বিদুর ও গান্ধারী ধর্মরাজের সৌজন্যদর্শনে তাঁহার প্রতি নিতান্ত প্রীত হইলেন, কিন্তু ভীমসেন অন্ধরাজকে দর্শন করিবামাত্র মনে মনে নিতান্ত বিরক্ত হইতেন, কেবল যুধিষ্ঠির উঁহার পরিচর্যা করিতেন বলিয়াই নিতান্ত অপ্রীতচিত্তে' তাঁহার শুশ্রুষা করিতেন।

ভীমের পরুষবাক্যশ্রবণে ধৃতরাষ্ট্রের মর্মবেদনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় রাজা যুধিষ্ঠির ও দুর্য্যোধনপিতা ধৃতরাষ্ট্র এই উভয়ের প্রণয়ের কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য দৃষ্ট হয় নাই। ধর্মাত্মা ধৰ্ম্মতনয় ও তাঁহার অন্যান্য ভ্রাতৃগণ সতত সাবধানে অন্ধরাজের পরিচর্যা করিতেন। কেবল মহাবীর বৃকোদর তাঁহার প্রতি বিরক্ত ছিলেন। কৌরবপতি ধৃতরাষ্ট্র যখন স্বীয় পুত্র দুর্য্যোধনকে স্মরণ করিতেন, তখনই তিনি মনোমধ্যে বৃকোদরকে চিন্তা করিয়া যাহার-পর-নাই কষ্ট পাইতেন। মহাবীর বৃকোদরও ধৃতরাষ্ট্রের নাম-গন্ধ হইলেই ক্রোধে অধীর হইয়া উঠিতেন। তিনি গোপনে অন্ধ রাজের অপ্রিয়কার্য্য সাধন এবং কপট পুরুষদ্বারা তাঁহার আজ্ঞা লঙ্ঘন করাইতেন। ধৃতরাষ্ট্রের দুর্মন্ত্রণা ও দুর্ব্যবহারনিবন্ধন যে তাঁহাকে অশেষ ক্লেশভোগ করিতে হইয়াছিল, তাহা তিনি কোনক্রমেই বিস্মৃত হইতে পারেন নাই।

এইরূপে পঞ্চদশবর্ষ অতীত হইলে একদা মহাবাহু ভীমসেন দুর্য্যোধন, দুঃশাসন ও কর্ণকে স্মরণপূর্ব্বক ক্রোধভরে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর অনতিদূরে যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল, সহদেব, কুন্তী ও দ্রৌপদ্রীর অজ্ঞাতসারে অন্যান্য বন্ধুবান্ধবগণের সমক্ষে, বাহাস্ফোট করিতে করিতে কহিলেন, হে বন্ধুগণ! আমি এই পরিঘাকার বাহুযুগল প্রভাবে নানাশস্ত্রপারদর্শী ধৃতরাষ্ট্রতনয়-গণকে নিহত করিয়াছি। আমার এই চন্দনচর্চ্চিত বাহুদ্বয়প্রভাবেই দুরাত্মা দুর্য্যোধন পুত্র ও বান্ধবগণের সহিত শমনসদনে গমন করিয়াছে।

মহাবীর ভীমসেন এইরূপ বিবিধ পরুষবাক্য প্রয়োগ করিলে, বুদ্ধিমতী গান্ধারী সকল কার্য্যই কালপ্রভাবে হইয়া থাকে, বিবেচনা করিয়া কিছুমাত্র দুঃখিত হইলেন না; কিন্তু কৌরবপতি ধৃতরাষ্ট্র ভীমের সেই ভীষণ বাক্যবাণে নিতান্ত ব্যথিত ও নির্বেদযুক্ত হইলেন। তখন তিনি অবিলম্বে স্বীয় সহৃদ্গণকে আহ্বানপূর্ব্বক বাষ্পাকুলনয়নে' তাঁহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে বান্ধবগণ! যেরূপে কুরুবংশ ধ্বংস হইয়াছে, তাহা তোমাদিগের অবিদিত নাই; আমিই ঐ ঘোরতর অনর্থের মূল। কৌরবগণ আমার পরামর্শানুসারেই সংগ্রামে সম্মত হইয়াছিল। আমি যে জ্ঞাতিগণ-ভয়াবহ' দুৰ্ম্মতি দুর্য্যোধনকে রাজ্যে অভিষেক করিয়াছিলাম; মহাত্মা বাসুদেব ঐ দুরাত্মাকে উহার অমাত্যগণের সহিত নিহত করিতে উপদেশ প্রদান করিলে যে, তাঁহার বাক্যে কর্ণপাত করি নাই - বিদুর, ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য্য, ভগবান্ বেদব্যাস, সঞ্জয় ও গান্ধারী আমাকে বারংবার হিতোপদেশ প্রদান করিলেও যে আমি পুত্রস্নেহে একান্ত অভিভূত হইয়া তাঁহাদের বাক্যে সম্মত হই নাই এবং মহামতি বাসুদেবের পরামর্শানুসারে যে গুণশালী মহাত্মা পাণ্ডুতনয়দিগকে তাহাদের পিতৃপরম্পরাগত রাজ্য প্রদান করি নাই, সেই সমুদায় এক্ষণে সহস্র সহস্র শল্যস্বরূপ হইয়া আমার হৃদয়ে বিদ্ধ হইতেছে। এক্ষণে পঞ্চদশ বৎসর পরিপূর্ণ হইবার পর অবধি আমি আপনার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। এখন আমি কোন দিন দিবার চতুর্থভাগে, কোন দিন বা অষ্টমভাগে ক্ষুধানিবারণার্থ যৎকিঞ্চিন্মাত্র আহার করিয়া থাকি। গান্ধারী ভিন্ন আর কেহই উহা অবগত নহে। আমার এইরূপ নিয়ম যুধিষ্ঠিরের কর্ণগোচর হইলে, তিনি নিতান্ত অনুতাপ করিবেন বলিয়া আমি কাহারও নিকট উহা প্রকাশ করি না। প্রতিদিন অজিন ধারণপূর্ব্বক ভূতলে কুশোপরি শয়ান হইয়া জপানুষ্ঠান করিয়া থাকি। যশস্বিনী গান্ধারীও এইরূপ নিয়মানুষ্ঠান করিয়া থাকেন। আমার সমরবিশারদ শতপুত্র যুদ্ধে নিহত হইয়াছে বলিয়া আমি কিছুমাত্র দুঃখিত নহি। কারণ তাহারা ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে সংগ্রামে নিহত হইয়া অনায়াসে স্বর্গলোকে গমন করিয়াছে।

যুধিষ্ঠিরের নিকট ধৃতরাষ্ট্রের স্বীয় দুঃখপ্রকাশ।

মহামতি ধৃতরাষ্ট্র বান্ধবগণকে এই কথা কহিয়া যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস কুস্তীনন্দন। তোমার মঙ্গললাভহউক। আমি তোমাকর্তৃক প্রতিপালিত হইয়া পরমসুখে অবস্থান-পূর্ব্বক বারংবার প্রভূত মহামূল্য বস্তুসমুদায় দান ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিয়া প্রচুর পরিমাণে পুণ্যসঞ্চয় করিয়াছি। পুত্রবিহীনা গান্ধারী ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক আমার পরিচর্যা করিয়াছে। যে সকল দুরাত্মা তোমার ঐশ্বর্য্য অপহবণ ও দ্রৌপদ্রীর কেশাম্বর' কর্ষণ করিয়া-ছিল, তাহারা সকলেই ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে সমরে নিহত হইয়া স্বর্গলোকে গমন করিয়াছে। অতএব তাহাদিগের উদ্ধারার্থ আমার কোন চেষ্টা করিবার প্রয়োজন নাই। এক্ষণে কেবল আমার আপনার ও গান্ধারীর পক্ষে যাহা শ্রেয়ঃ তাহারই চেষ্টা করা কর্তব্য। তুমি ধার্মিকদিগের অগ্রগণ্য রাজা ও জীবগণের পরম গুরু, এই নিমিত্তই আমি তোমাকে কহিতেছি যে, তুমি আমাকে গান্ধারীর সহিত বনগমন করিতে অনুমতি কর। আমি সুবল-নন্দিনীর সহিত বল্কল পরিধানপূর্ব্বক অরণ্যে অবস্থান করিয়া তোমায় আশীর্ব্বাদ করিব। শেষাবস্থায় পুত্রের প্রতি রাজ্যভার সমর্পণ করিয়া বনে গমন করাই আমাদিগের কুলোচিত কার্য্য। আমি তথায় বায়ু ভক্ষণপূর্ব্বক অবস্থান করিয়া পত্নীর সহিত অতি উৎকৃষ্ট তপোনুষ্ঠান করিব। তাহা হইলে তুমিও সেই তপস্যায় ফলভাগী হইবে। কারণ রাজ্যমধ্যে যে সমুদায় শুভ ও অশুভ কার্য্যের অনুষ্ঠান হয়, রাজা অবশ্যই তাহার ফলভাগী হইয়া থাকেন।

যুধিষ্ঠিরের ধৃতরাষ্ট্রকে সান্ত্বনাদান।

মহামতি ধৃতরাষ্ট্র এই কথা কহিলে, ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির নিতান্ত বিষন্নচিত্তে তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, তাত! আপনি দুঃখিতচিত্তে কালহরণ করিলে রাজ্য আমার কখনই প্রীতিকর হইবে না। হায়। আপনি এতদিন আহার পরিত্যাগ ও ভূতলে শয়ন করিয়া কালাতিপাত করিতেছেন, ইহা আমি বা আমার ভ্রাতৃগণ কেহই জানিতে পারি নাই। আমাকে ধিক্! আমার তুল্য দুর্বুদ্ধি রাজ্যলুব্ধ নরাধম আর কেহই নাই। আপনি স্বচ্ছন্দে আহারাদি করিতেছেন বলিয়া আমার বিলক্ষণ বিশ্বাস ছিল, কিন্তু আপনি তাহা না করিয়া গোপনে গোপনে আমায় বঞ্চনা করিয়া অনাহারে কালাতিপাত করিয়াছেন। আপনি দুঃখভোগ করিলে, আমার রাজ্য, ভোগ্য বস্তু, যজ্ঞ ও সুখে প্রয়োজন কি? এক্ষণে আপনার মুখে এই নিদারুণ বাক্য শ্রবণ করিয়া আমার রাজ্য ও আত্মাকে নিতান্ত ক্লেশকর জ্ঞান হইতেছে। আপনি আমাদিগের পিতা, মাতা ও পরম গুরু; অতএব আপনি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিলে আমরা কোথায় অবস্থান করিব?

এক্ষণে আপনি আপনার ঔরসপুত্র যুযুৎসুকে অথবা অন্য কোন ব্যক্তিকে যুবরাজ করিয়া স্বয়ং রাজ্যভোগ করুন; আমি অরণ্যে গমন করি। আমি জ্ঞাতিবধজনিত অকীর্ত্তিতে বিলক্ষণ দগ্ধ হইয়াছি। এক্ষণে আপনি বন গমনপূর্ব্বক আমাকে পুনরায় দগ্ধ করিবেন না। এই রাজ্যে আমার কিছুমাত্র অধিকার নাই। আপনি রাজ্যেশ্বর; আমি আপনার অধীন, অতএব আমি কিরূপে আপনাকে অনুমতি প্রদান করিব? আমরা দুর্য্যোধনের অত্যাচারে স্মরণ করিয়া কিছুমাত্র ক্রুদ্ধ হই নাই। অবশ্যম্ভাবী ভবিতব্যপ্রভাবেই আমাদিগকে তৎকালে মোহের বশীভূত হইয়া ক্লেশভোগ করিতে হইয়াছে। দুর্য্যোধনাদি যেমন আপনার পুত্র ছিল, আপনি আমাদিগকেও সেইরূপ জ্ঞান করিবেন। জননী কুন্তী ও গান্ধারীতে আমার কিছুমাত্র ভেদজ্ঞান নাই। অতএব যদি আপনি আমাকে পরিত্যাগ করিয়া গমন করেন, তাহা হইলে আমি নিশ্চয়ই আপনার অনুগামী হইব। আপনি বনে গমন করিলে, এই নানারত্নবিভূষিতা সসাগরা পৃথিবী কখনই আমার প্রীতিকর হইবে না। অতএব আমি আপনাকে প্রণিপাত করিয়া কহিতেছি, আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হউন। এই রাজ্যস্থ সমুদায় পদার্থে আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে এবং আমরাও আপনার একান্ত বশবর্তী। অতএব আপনি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হইয়া বিষাদ পরিত্যাগ করুন। আমি আপনাদের শুশ্রুষা করিয়া মনের সন্তাপ নিবারণ করিব।

ধৃতরাষ্ট্রের বানপ্রস্থগ্রহণের বাসনা।

ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস। এক্ষণে তপস্যা করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। বৃদ্ধাবস্থায় অরণ্যবাস আশ্রয় করা আমাদিগের কুলোচিত ধৰ্ম্ম। আমি বহুদিন রাজ্যমধ্যে বাস করিয়াছি এবং তুমিও আমার যথোচিত শুশ্রূষা করিয়াছ। এক্ষণে তুমি আমাকে অরণ্যগমনে আদেশ কর।

মহামতি ধৃতরাষ্ট্র ধর্মরাজকে এই কথা কহিয়া মহাত্মা সঞ্জয় ও মহারথ কৃপাচার্য্যকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে বীরদ্বয়! এক্ষণে তোমরা আমার প্রতিনিধিস্বরূপ হইয়া ধৰ্ম্ম-রাজকে সান্ত্বনা কর। আমি স্বয়ং আর বাক্যচালন করিতে পারি না। বার্দ্ধক্য ও বহুক্ষণ বাক্যব্যয়নিবন্ধন আমার মন অবসন্ন ও মুখ পরিশুষ্ক হইয়া গিয়াছে। অন্ধরাজ এই বলিয়া গান্ধারীকে অবলম্বনপূর্ব্বক সহসা মৃতব্যক্তির ন্যায় সংজ্ঞাশূন্য হইলেন।

তখন ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠতাতকে অকস্মাৎ মৃত-কল্প দেখিয়া নিতান্ত ব্যথিতচিত্তে আক্ষেপ করিয়া কহিতে লাগিলেন, হায়! যে মহাত্মা একলক্ষ হস্তীর বল ধারণ করিতেন, যাঁহার বাহুবলে ভীমের লৌহময় প্রতিমূর্ত্তি চূর্ণ হইয়া গিয়াছিল, আজ তিনি এক অবলাকে ধারণপূর্ব্বক মৃতকল্প হইয়া শয়ন করিলেন। আমার তুল্য অধার্মিক ও নরাধম আর কেহ নাই। আমাকে ও আমার শাস্ত্রজ্ঞানে ধিক্! আজি আমার নিমিত্তই ইঁহাকে এতদূর যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইয়াছে। আজি যদি ইনি এবং জননী গান্ধারী ভোজন না করেন, তাহা হইলে আমিও অনাহারে কালহরণ করিব। এই বলিয়া ধর্মরাজ সলিলসিক্ত হস্তদ্বারা অল্পে অল্পে তাঁহার মুখ ও বক্ষঃস্থল মার্জিত করিতে লাগিলেন।

অনন্তর অন্ধরাজ যুধিষ্ঠিরের সেই রত্ন ও ওষধিযুক্ত সুগন্ধময় পবিত্র করস্পর্শদ্বারা ক্রমে ক্রমে সংজ্ঞালাভ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস! তুমি পুনর্ব্বার হস্ত-দ্বারা আমার অঙ্গস্পর্শ ও আমাকে আলিঙ্গন কর। তোমার কর-স্পর্শদ্বারা আমার জীবনলাভ হইল। আমি তোমার মস্তকাঘ্রাণ ও তোমাকে আলিঙ্গন করিতে নিতান্ত বাসনা করিতেছি। আজি আমরা দিবসের অষ্টমভাগে ভোজন করিব, স্থির করিয়াছিলাম, এক্ষণে সেই সময় উপস্থিত হওয়াতেও তোমাকে বহুক্ষণ বিবিধ বাক্যে সান্ত্বনা করাতে আমার শরীর ও মনঃ নিতান্ত অবসন্ন হইয়াছে। এই নিমিত্তই আমার সংজ্ঞা বিলুপ্ত হইয়াছিল। এক্ষণে তোমার অমৃতরসাভিষিক্ত করস্পর্শদ্বারাই আমার চৈতন্যলাভহইয়াছে।

বনবাসের সঙ্কল্পত্যাগার্থ ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরের অনুরোধ।

অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র এই কথা কহিলে, ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির সৌহাদ্দনিবন্ধন করদ্বারা তাঁহার সর্ব্বগাত্র স্পর্শ করিতে লাগিলেন। তখন অন্ধ রাজ কিঞ্চিৎ সুস্থ হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন ও তাঁহার মস্তকাঘ্রাণ করিলেন। বিদুর প্রভৃতি মহাত্মারা নিতান্ত দুঃখিত হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন। উঁহারা নিতান্ত শোকা-বেগনিবন্ধন যুধিষ্ঠিরকে কোন কথা কহিতে পারিলেন না। তখন পতিপরায়ণা গান্ধারী অতিকষ্টে শোকাবেগ সংববরণপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন এবং সমুদায় কৌরবরমণী কুস্তীর সহিত সমবেত হইয়া বাষ্পাকুললোচনে ধৃতরাষ্ট্রের চতুদ্দিক্ পরিবেষ্টন করিয়া রহিলেন।

অনন্তর অন্ধরাজ পুনর্ব্বার যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস। তপস্যা করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে, এ নিমিত্ত আমি ভূয়োভূয়ঃ' তোমার নিকট বনগমনের অনুমতি প্রার্থনা করিতেছি। বারংবার বাক্যব্যয় করিলে আমার মন নিতান্ত অবসন্ন হয়, অতএব আর তুমি আমাকে কষ্ট প্রদান করিও না।

মহামতি ধৃতরাষ্ট্রের এই কথা কহিলে তত্রত্য যোধগণ তাঁহাকে বিষণ্ণ, উপবাস-পরিশ্রান্ত ও অস্থিচর্মাবশিষ্ট অবলোকন করিয়া সকলেই হাহাকার করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা যুধিষ্ঠির তাঁহাকে আলিঙ্গন করিয়া শোকাশ্রু সংবরণপূর্ব্বক পুনরায় কহিলেন, পিতঃ! আমি আপনার প্রিয়কার্য্য সাধন করিতে যেরূপ উল্লসিত হই, রাজ্যভোগ ও জীবনরক্ষা করিতে সেরূপ সন্তুষ্ট হই না; অতএব যদি আমার প্রতি আপনার অনুগ্রহ থাকে ও আপনি আমাকে প্রিয় জ্ঞান করেন, তাহা হইলে এক্ষণে ভোজনক্রিয়া সম্পাদন করুন। পরে আমি আপনার বনগমনবিষয়ে বিবেচনা করিব। ধর্মরাজ এই কথা কহিলে ধৃতরাষ্ট্র তাঁহার বাক্যে সম্মত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, বৎস। আজি আমি তোমার অনুরোধে অবশ্যই পুরোমধ্যে ভোজন করিব।

ধৃতরাষ্ট্রের বনবাসযাত্রায় ব্যাসদেবের অনুমোদন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহামতি ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে এই কথা কহিতেছেন, এমন সময় মহর্ষি বেদব্যাস তথায় উপস্থিত হইয়া ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! রাজা ধৃতরাষ্ট্র যাহা কহিতেছেন, তুমি অবিচারিতচিত্তে তাহাতে সম্মত হও। ধৃতরাষ্ট্র একে বৃদ্ধ, তাহাতে আবার পুত্রশোকে একান্ত কাতর হইয়াছেন, অতএব বোধ হইতেছে, ইনি রাজ্যমধ্যে অবস্থানপূর্ব্বক কখনই কষ্টভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না। যশস্বিনী গান্ধারীও কেবল ধৈর্য্যবশতঃ পুত্রশোক সহ্য করিতেছেন। অতএব আমি তোমাকে কহিতেছি, তুমি উহাদিগকে বনগমনে অনুমতি প্রদান কর। উঁহারা কেন বৃথা রাজধানীতে প্রাণত্যাগ করিবেন। অচিরাৎ বনগমন করিয়া পুরাতন রাজা-দিগের তুল্য গতিলাভ করুন। চরমে বনগমন করাই রাজর্ষি-দিগের প্রধান কৰ্ম্ম।

মহর্ষি বেদব্যাস এই কথা কহিলে, রাজা যুধিষ্ঠির তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভগবন্! আপনি আমাদিগের পূজ্য ও কুলগুরু। আপনি আমার পিতা ও আমি আপনার পুত্রস্বরূপ। ধর্মানুসারে পুত্র পিতার বশবর্তী হইয়া থাকে। অতএব আমি আপনার আজ্ঞা প্রতিপালন করিব, তাহাতে আর সংশয় কি?

যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, ভগবান্ বেদব্যাস পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! নরপতি ধৃতরাষ্ট্র এক্ষণে অতিশয় বৃদ্ধ হইয়াছেন; অতএব আমি ইহাকে বনগমনে অনুজ্ঞা প্রদান করিতেছি। তুমিও ঐ বিষয়ে সম্মত হও। ইনি এক্ষণে বনে গমন করিয়া স্বীয় অভিলাষানুরূপ কার্য্য সম্পাদন করুন। তুমি তদ্বিষয়ে কোন প্রতিবন্ধকতাচরণ করিও না। যুদ্ধে বা বনমধ্যে বিধিপূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করা ভূপতিদিগের পরম ধৰ্ম্ম। তোমার পিতা পাণ্ডু প্রতিনিয়ত পিতার ন্যায় ইঁহার সেবা করিয়াছেন। সেই মহাত্মা যে সময় পৃথিবী প্রতিপালন করিতেন, সেই সময় এই অন্ধরাজ রত্নপৰ্ব্বত পরিশোভিত ভূরিদক্ষিণ যজ্ঞের অনুষ্ঠান, উৎকৃষ্টরূপে প্রজাপালন ও গোসমুদায়ের বন্ধনমোচন প্রভৃতি সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তৎপরে তুমি বনগমন করিলে পর ইনি ত্রয়োদশ বৎসর পুত্রপরিরক্ষিত রাজ্যভোগ ও বিবিধ ধনরাশি প্রদান করিয়াছেন। তুমিও এক্ষণে পঞ্চদশ বৎসর ভৃত্যগণের সহিত ইঁহার ও গান্ধারীর যথোচিত সেবা করিলে। এক্ষণে ইঁহার তপোনুষ্ঠানের সময় উপস্থিত, অতএব তুমি ইহাকে তদ্বিষয়ে অনুমতি প্রদান কর। এখন তোমাদিগের প্রতি উহার অণুমাত্র ক্রোধ নাই। মহাত্মা বেদব্যাস এইরূপে বারংবার ধৃতরাষ্ট্রের বনগমনবিষয়ে অনুমতি করিতে অনুরোধ করিলে, ধৰ্ম্মরাজ অগত্যা তাঁহার বাক্যে সম্মত হইলেন। তখন ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন যুধিষ্ঠিরকে সম্মত দেখিয়া অচিরাৎ স্বস্থানে গমন করিলেন।

মহর্ষি বেদব্যাস প্রস্থান করিলে পর ধর্ম্মনন্দন ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, তাত! আপনার যাহা অভিমত এবং ভগবান্ বেদব্যাস, মহাধনুর্দ্ধর কৃপাচার্য্য, বিদুর, সঞ্জয় ও যুযুৎসু আমাকে যে বিষয়ে অনুরোধ করিয়াছেন, আমি অবশ্যই তাহা সম্পাদন করিব। ইঁহারা সকলেই আমার মান্য ও কুরু কুলের হিতৈষী। এক্ষণে আমি প্রণিপাতপূর্ব্বক আপনার নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি যে, আপনি প্রথমতঃ আহার করুন; পশ্চাৎ অরণ্যাশ্রমে গমন করিবেন।

যুধিষ্ঠিরের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রকর্তৃক রাজ্যপালনের উপদেশ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, মহামতি ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর সহিত জীর্ণ গজপতির ন্যায় অতিকষ্টে মন্দগমনে আপনার আবাসাভিমুখে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। মহাত্মা বিদুর, সঞ্জয় ও কৃপাচার্য্য তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। অনন্তর অন্ধরাজ আপনার গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া পূর্ব্বাহুকৃত্যসমুদায় সমাপনপূর্ব্বক ব্রাহ্মণ-গণকে পরিতৃপ্ত করিয়া ভোেজনক্রিয়া সম্পাদন করিলেন। তখন ধৰ্ম্মশীলা গান্ধারীও কুন্তী ও অন্যান্য বধূগণকর্তৃক অর্চ্চিত হইয়া আহার করিতে লাগিলেন। উহাদিগের আহার সমাপন হইলে পাণ্ডবগণ ও বিদুরাদি মহাত্মারা আহার করিয়া ধৃতরাষ্ট্রের নিকট সমুপস্থিত হইলেন। তখন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরের পৃষ্ঠে হস্ত প্রদান করিয়া কহিলেন, বৎস! তুমি এই অষ্টাঙ্গসংযুক্ত' রাজ্যে সর্ব্বদা সাবধানে অবস্থান করিবে। ধর্মানুসারে যেরূপে রাজ্য রক্ষা করিতে হয়, এক্ষণে তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

তুমি সর্ব্বদা বিদ্যাবৃদ্ধদিগের উপাসনা, তাঁহাদিগের বাক্যশ্রবণ ও সেই বাক্যানুসারে অবিচারিতচিত্তে কার্য্যানুষ্ঠান করিবে। প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করিয়া ঐ সমস্ত জ্ঞানবান্ লোকের সম্মাননা ও কার্য্যকাল সমুপস্থিত হইলে তাঁহাদিগকে কর্ত্তব্য জিজ্ঞাসা করা সর্ব্বতোভাবে বিধেয়। তাঁহারা সম্মানিত হইলে অবশ্যই তোমাকে হিতোপদেশ প্রদান করিবেন। তুমি' অশ্বসমুদায়ের ন্যায় ইন্দ্রিয়গণকে সংযত করিয়া রাখিবে; তাহা হইলে উহারা যত্নপরিরক্ষিত ধনরাশির ন্যায় উত্তরকালে অবশ্যই হিতকর হইয়া উঠিবে। যে মন্ত্রিগণ ছলপরিশূন্য ও দমগুণসম্পন্ন এবং যাঁহারা পিতা ও পিতামহের সময় অবধি কার্য্য সন্দর্শন করিতেছেন, তাঁহাদিগকেই সমুদায় কার্য্যে নিয়োগ করা কর্তব্য। স্বীয় অধিকারস্থ পরীক্ষিত চরদ্বারা শত্রুর অজ্ঞাতসারে সতত তাহার সমাচার জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক।

তুমি যে পুরোমধ্যে বাস করিবে, তাহার প্রাচীর ও তোরণ সুদৃঢ় হওয়া এবং উহার মধ্যে ছয় প্রকোষ্ঠ, বিবিধ অট্টালিকা ও সুদৃঢ় দুর্গ থাকা উচিত। ঐ পুর সর্ব্বদা সাবধানে রক্ষা করা কর্তব্য। উহার দ্বারসকল বৃহৎ, যথাস্থানে সন্নিবেশিত ও সুরক্ষিত হওয়া সর্ব্বতোভাবে উচিত। যে সকল ব্যক্তিদিগের কুলশীল বিশেষরূপে অবগত হইবে, তাঁহাদিগের দ্বারাই কার্য্যসাধন করাইবে। আহার, বিহার, মাল্যপরিধান, শয়ন ও আসনে উপবেশনসময়ে সাবধানে আত্মরক্ষা করিবে। সৎকুল-সম্ভূত সুশীল বিশ্বস্ত বৃদ্ধ ব্যক্তিরা যেন তোমার অন্তঃপুরিকা-গণকে সাবধানে রক্ষা করেন।

কুল, শীল, ও বিদ্যাসম্পন্ন বিনীত সরলস্বভাব ধার্মিক ব্রাহ্মণদিগকে মন্ত্রিপদে নিযুক্ত করিয়া তাঁহাদিগের সহিত মন্ত্রণা করিবে। ঐ সকল ব্যক্তি ভিন্ন অন্য কাহারও সহিত মন্ত্রণা করা বিধেয় নহে। মন্ত্রণাকালে হয় সকলের সহিত, নচেৎ কোন কার্য্যব্যপদেশে অভিলষিত ব্যক্তিদিগকে নিভৃত স্থানে আনয়ন করিয়া তাঁহাদের সহিত মন্ত্রণা করিবে। মন্ত্রণাগৃহ নিভৃত' হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। বন ও অনাবৃত স্থান মন্ত্রণার উপযুক্ত স্থান বটে, কিন্তু রাত্রিকালে ঐ দুই স্থানে মন্ত্রণা করা কদাপি বিধেয় নহে। বানর, পক্ষী, জড় ও পঙ্গুব্যক্তিদিগকে মন্ত্রণাগৃহ হইতে বহিষ্কৃত করা অবশ্য কর্তব্য। মন্ত্রভেদ হইলে নরপতিদিগের যে দোষ উপস্থিত হয়, তাহার প্রতিবিধান করা নিতান্ত সুকঠিন। মন্ত্রভেদ হইলে যে যে দোষ এবং মন্ত্রভেদ না হইলে যে যে শুভফল হয়, তৎসমুদায় তুমি মন্ত্রীদিগের নিকট সতত কীৰ্ত্তন করিবে।

পুরবাসী ও জনপদবাসীদিগের দোষগুণ অবগত হইবার চেষ্টা করা তোমার অবশ্য কর্তব্য। সন্তুষ্টচিত্ত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি-দিগকে বিচারাসনে নিযুক্ত করিয়া যাহাতে তাঁহারা দোষানুরূপ দণ্ডবিধান করেন, তুমি তদ্বিষয়ে সতত যত্নবান্ থাকিবে এবং তাঁহারা দোষানুরূপ দণ্ড করিলেন কি না চরদ্বারা তাহার তথ্যা-নুসন্ধান করিবে। যাহারা উৎকোচ'জীবী, পরদারাপহারী, উগ্রদণ্ডকর্তা, মিথ্যাবাদী, অন্যের অনিষ্টকারী, লুব্ধস্বভাব, পরধনাপহর্তা, অসৎকর্মানুষ্ঠাননিরত, সভাভঙ্গকারী ও বর্ণ-দূষক, দেশকাল বিবেচনা করিয়া তাহাদিগের কখন সুবর্ণদণ্ড ও কখন বা প্রাণদণ্ডের আদেশ করা বিধেয়।

প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করিয়া প্রথমতঃ ব্যয়কার্য্যে নিযুক্ত ব্যক্তিদিগের তত্ত্বাবধারণ এবং তৎপরে অলঙ্কার ধারণ ও আশ্রিত ব্যক্তিদিগকে যথাযোগ্য অর্থদানপূর্ব্বক সৈন্যদিগের তত্ত্বাবধান করা কর্তব্য। সন্ধ্যাকালই দূত ও চরদিগের কার্য্য সন্দর্শনের উপযুক্ত সময়। নিশাশেষে নিদ্রা পরিত্যাগপূর্ব্বক কর্ত্তব্য কার্য্য নির্ণয় এবং মধ্যরাত্রি ও মধ্যাহ্নসময়ে স্বয়ং বিচরণপূর্ব্বক প্রজাদিগের কার্য্য দর্শন করা বিধেয়। তুমি সকল সময়েই কার্য্যের উপায় চিন্তায় প্রবৃত্ত হইবে; আবার উপযুক্ত সময়ে অলঙ্কৃত হইয়া সুস্থচিত্তে অবস্থান করিবে। কার্য্যসমুদায় চক্রের ন্যায় পরিভ্রমণ করিয়া থাকে। তুমি ন্যায়ানুসারে সর্ব্বদা কোষ পরিবর্দ্ধনে যত্নবান্ হইবে। কোষ পরিবর্দ্ধনবিষয়ে ঔদাসীন্য বা অন্যায় ব্যবহারদ্বারা কোষবর্দ্ধন কদাপি কর্তব্য নহে। চরদ্বারা ছিদ্রান্বেষণ-তৎপর শত্রুগণের অভিপ্রায় অবগত হইয়া দূর হইতেই আত্মীয় পুরুষদ্বারা তাহাদিগের বিনাশসাধন করা কর্তব্য। ভৃত্যপদাভিলাষী ব্যক্তিদিগের কার্য্য সন্দর্শন করিয়া তাহাদিগকে অভিলষিত পদে নিযুক্ত করা কর্তব্য। আশ্রিত ব্যক্তি-গণ কোন কার্য্যে নিয়মিতরূপে নিযুক্ত হউক বা না হউক, তাহাদের দ্বারা কার্য্যসাধন করা অবশ্য কর্তব্য।

অধ্যবসায়সম্পন্ন, পরাক্রমশালী, কষ্টসহ', হিতাভিলাষী ও প্রভুভক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতিপদে নিযুক্ত করা উচিত। জনপদবাসী, শিল্পী প্রভৃতি লোকসমুদায় গো-গর্দভাদির ন্যায় কেবল আহারমাত্র গ্রহণ করিয়া যাহাতে তোমার কার্য্যসাধন করে, তুমি তদ্বিষয়ে নিয়ত যত্নবান্ হইবে। সর্ব্বদা কি আপনার, কি শত্রু উভয়েরই রন্ধ্র অন্বেষণ করিবে। স্ব স্ব ব্যবসায়ে সুনিপুণ স্বদেশীয় ব্যক্তিদিগকে সময়ে সময়ে বিহার যাত্রাদির উপলক্ষে উৎসাহ প্রদান করা অবশ্য কর্তব্য এবং গুণী ব্যক্তিদিগের গুণ যাহাতে পরিবর্দ্ধিত হয় ও যাহাতে তাঁহারা গুণ হইতে বিচলিত না হন, তদ্বিষয়ে যত্নবান্ হওয়া সর্ব্বতো-ভাবে বিধেয়।

ধৃতরাষ্ট্র-নির্দিষ্ট বিবিধ রাজনীতি।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, হে বৎস! তুমি সতত আপনার, শত্রুদিগের, উদাসীনগণের এবং আপনার ও শত্রুদিগের হিতা-কাঙ্ক্ষী ব্যক্তিসমুদায়ের মণ্ডলসমুদায় পরিজ্ঞাত হইবে। শত্রু, শত্রুনিএ', শত্রুর পরাজয়ার্থী, শত্রুমিত্রের পরাজয়ার্থী, ছয়প্রকার আততায়ী' এবং মিত্র ও মিত্রের মিত্র এই দ্বাদশবিধ লোকের বিষয় বিদিত হওয়া তোমার অবশ্য কর্তব্য। শত্রুগণ সুযোগ পাইলে অমাত্য, জনপদ, দুর্গ ও বলসমুদায় অনায়াসে ভেদ করিতে পারে, অতএব যাহাতে তাহারা ঐ কার্য্যে সমর্থ না হয়, তদ্বিষয়ে সতর্ক থাকা রাজার অবশ্য কর্তব্য। পূর্ব্বোক্ত স্বাদশবিধ লোকও মন্ত্রীদিগের আয়ত্ত। কৃষ্যাদি যষ্টিপ্রকার গুণকে নীতিবিশারদ আচাৰ্য্যগণ "মণ্ডল” বলিয়া নির্দেশ করিয়া থাকেন। ভূপতিগণ ঐ মণ্ডলের বিষয় বিশেষরূপে পরিজ্ঞাত হইতে পারিলে অনায়াসে রাজ্যরক্ষায় ছয়প্রকার উপায় যথাস্থানে যথানিয়মে প্রয়োগ করিতে পারেন।

স্ব স্ব ক্ষয়, বৃদ্ধি ও স্থিতির বিষয় পরিজ্ঞাত হওয়া ভূপতিগণের অবশ্য কর্তব্য। যখন স্বপক্ষ বলবান্ ও শত্রুপক্ষ দুর্ব্বল হইবে, তখন নরপতি শত্রুদিগকে জয় করিতে চেষ্টা করিবেন। কিন্তু যখন শত্রুপক্ষ বলবান্ ও স্বীয় পক্ষ দুর্ব্বল হইবে, তখন শত্রুদিগের সহিত সন্ধিস্থাপনে চেষ্টা করা তাঁহার সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য। সর্ব্বদা দ্রব্যরাশি সঞ্চয় করিয়া রাখা ভূপালদিগের নিতান্ত আবশ্যক। যখন রাজা যুদ্ধ করিতে সমর্থ হইবেন, তখন তিনি বিপক্ষদিগকে অল্পশস্যোৎপাদিকা ভূমি, পিওলাদি ধাতু ও ক্ষীণবল মিত্র প্রদান করিয়া, তাঁহাদিগের সহিত সন্ধিস্থাপন করিবেন; কিন্তু অন্যে যখন তাঁহার সহিত সন্ধি করিবার নিমিত্ত তাঁহার নিকট সমুপস্থিত হইবে, তখন তিনি উহার নিকট বহুশস্যোৎপাদিকা ভূমি, সুবর্ণ-রৌপাদি ধাতু ও ধলবান্ মিত্রসমুদায় গ্রহণে যত্নবান্ হইবেন। সন্ধি করা আবশ্যক হইলে ভূপতি প্রতিদ্বন্দ্বীর বিশ্বাসার্থ তাহার পুত্রকে আপনার নিকট আনয়ন করিয়া রক্ষা করিবেন। ইহার অন্যথা-চরণে প্রবৃত্ত হওয়া রাজার কদাপি বিধেয় নহে। তিনি বিবিধ যুক্তি ও উপায়দ্বারা বিপদ হইতে মুক্তিলাভের চেষ্টা করিবেন।

দীন, দরিদ্র ও অনাথদিগের প্রতি দয়া করা রাজার নিতান্ত অবশ্যক। যে রাজা স্বয়ং রাজ্যরক্ষা করিতে বাসনা করেন, তিনি শত্রুদিগকে ক্রমে ক্রমে বা এককালে স্তম্ভন', বিনাশ ও তাহাদের কোষভঙ্গ করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিবেন। যে রাজার উন্নতিলাভের বাসনা থাকে, অধীনস্থ রাজাদিগের হিংসা করা তাঁহার নিতান্ত অকর্তব্য। যে রাজা পৃথিবী জয় করিতে ইচ্ছা করিবেন, তাঁহার সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত না হইয়া মন্ত্রীদিগের সহিত মন্ত্রণাপূর্ব্বক তাঁহার আত্মীয়ভেদ করিবার চেষ্টা করাই কর্তব্য। সাধুদিগের প্রতি দয়া ও অসাধুদিগের দণ্ডবিধান করা ভূপতিদিগের নিতান্ত আবশ্যক। বলবান্ ভূপতি দুর্ব্বলদিগের প্রতি কদাচ অত্যাচার করিবে না। যদি কোন পরাক্রান্ত রাজা দুর্ব্বল রাজাকে আক্রমণ করেন, তাহা হইলে দুর্ব্বল ভূপতি প্রথমে মন্ত্রিগণের সহিত তাঁহার শরণাপন্ন হইয়া বেতসের ন্যায় নম্রতা অবলম্বনপূর্ব্বক সামাদি' উপায়' দ্বারা এবং পরিশেষে কোষ, পৌরজন ও অন্যান্য প্রিয়বস্তুদানদ্বারা আত্মরক্ষা করিতে চেষ্টা করিবেন। যদি ঐ সমুদায় উপায় তাঁহার কার্যসিদ্ধি না হয়, তাহা হইলে অগত্যা স্বয়ং যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক মুক্তিলাভ করাই তাঁহার পক্ষে শ্রেয়ঃ।

ধৃতরাষ্ট্রের যুদ্ধাদি রাজনীতিবিষয়ক উপদেশ।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, সন্ধিবিগ্রহের বিষয় বিশেষরূপে অবগত হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। প্রবল প্রতিযোগীর সহিত সন্ধিস্থাপন ও দুর্ব্বল প্রতিযোগীর সহিত যুদ্ধ করিতে হয়। স্থিরচিত্তে আপনার বলাবল বিচার করিয়া পরিশেষে যুদ্ধযাত্রা করা কর্তব্য। যদি শত্রু পরাক্রান্ত এবং তাহার সৈন্যসমদায় বলবান্ ও সন্তুষ্টচিত্ত হয়, তাহা হইলে বুদ্ধিমান্ নরপতি তাহাকে আক্রমণ না করিয়া তাহার পরাজয়ের উপায় চিন্তা করিবেন। কিন্তু শত্রু যদি দুর্ব্বল হয়, তাহা হইলে তিনি অচিরাৎ তাহার অভিমুখীন হইয়া তাহার সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইবেন। যাহাতে শত্রুগণ বিপন্ন, ভেদযুক্ত, নিপীড়িত ও ভীত হয়, সতত তাহার উপায় চিন্তা করা রাজার অবশ্য কর্তব্য। শাস্ত্রবিশারদ ভূপতি আপনার ও শত্রুবর্গের উৎসাহ, প্রভুত্ব ও মন্ত্রণা, এই ত্রিবিধ শক্তি পর্যালোচনা করিয়া যদি আপনাকে অরাতি'গণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলিয়া অবগত হইতে পারেন, তাহা হইলে যুদ্ধযাত্রা করিবেন। যুদ্ধযাত্রাকালে সৈন্যবল, ধনবল, মিত্রবল, ভৃত্য-বল ও শ্রেণীবল' সংগ্রহ করা রাজার অবশ্য কর্তব্য। মিত্রবল অপেক্ষা ধনবল শ্রেষ্ঠ, আর শ্রেণীবল, ভৃত্যবল ও আচারবল' এ তিন বলই পরস্পর সমান।

রাজাদিগকে সময়ে সময়ে নানাপ্রকার বিপদে নিপতিত হইতে হয়। ঐ সকল বিপদে উপেক্ষা না করিয়া সামাদি উপায়দ্বারা ঐ সমুদায় হইতে মুক্তিলাভের চেষ্টা করাই তাঁহাদিগের অবশ্য কর্তব্য। বুদ্ধিমান্ ভূপতি দেশ, কাল এবং আপনার গুণ ও বল সম্যরূপে বিচার করিয়া সৈন্য সংগ্রহ-পূর্ব্বক যুদ্ধযাত্রা করিবেন। যে রাজা স্বয়ং উন্নতিশালী ও পরাক্রান্ত এবং যাঁহার সৈন্যসমুদায় হৃষ্টপুষ্ট, তিনি অকালেও যুদ্ধযাত্রা করিতে পারেন। পরাক্রান্ত ভূপাল শত্রুদিগকে বিনাশ করিবার নিমিত্ত সংগ্রামস্থলে অসংখ্য হস্তী, অশ্ব, রথ, ধ্বজ, পদাতি ও শরপূর্ণ তৃণীরসম্পন্ন বীরগণকে সন্নিবেশিত করিয়া শক্তিসহকারে শুক্রাচার্য্যবিহিত নীতিশাস্ত্রানুরূপ শকট, বজ্র বা পদ্মব্যূহ নির্মাণপূর্ব্বক যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবেন। আপনার অধিকার মধ্যেই হউক বা অন্যের অধিকার মধ্যেই হউক, যুদ্ধ উপস্থিত হইলে নরপতি চরদ্বারা শত্রুদিগের ও স্বয়ং আপনার সৈন্য পরীক্ষা করিয়া পরিশেষে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইবেন। সৈনিক-দিগকে সন্তুষ্ট করিয়া বলবান ব্যক্তিদিগকে সংগ্রামমুখে প্রেরণ করা রাজার অবশ্য কর্তব্য। অগ্রে আপনার বলাবল পরিজ্ঞাত হইয়া পশ্চাৎ সন্ধি স্থাপন বা যুদ্ধযাত্রা করাই শ্রেয়ঃ। যে কোনরূপে হউক, আপনার প্রাণরক্ষা ও উভয় লোকের মঙ্গলচিন্তা করা রাজার অবশ্য কর্তব্য।

যে ভূপতি এই সমুদায় নিয়মের অনুবর্তী হইয়া ধৰ্ম্মা-নুসারে প্রজাপালন করেন তিনি পরলোকে স্বর্গলাভ করিতে সমর্থ হন। এক্ষণে তুমি আমার বাক্যানুরূপ কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া ধর্মানুসারে প্রজাগণের হিতসাধন কর; নিশ্চয়ই ইহলোকে পরম সুখ ও পরলোকে স্বর্গলাভ করিতে পারিবে। পূর্ব্বে মহাত্মা ভীষ্ম, বিদুর ও বাসুদেব তোমাকে এইরূপ ধর্মোপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন; এক্ষণে আমিও প্রীতিপূর্ব্বক তোমার নিকট ইহা কীর্ত্তন করিলাম। সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলে ভূপতির যেরূপ ফললাভ হয়, ধৰ্ম্মানুসারে প্রজাপালন করিলেই তাঁহার সেইরূপ ফললাভ হইয়া থাকে।

বনবাসোদ্যত ধৃতরাষ্ট্রের প্রজাসম্ভাষণ।

যুধিষ্ঠির কহিলেন, তাত। আপনি যেরূপ কহিলেন, আমি তদনুরূপ কার্য্যেরই অনুষ্ঠান করিব। এক্ষণে আপনি পুনরায় আমাকে কিঞ্চিৎ উপদেশ প্রদান করুন। পিতামহ ভীষ্ম স্বর্গগমন করিয়াছেন, মহাত্মা বাসুদেব এস্থানে উপস্থিত নাই এবং মহামতি বিদুর ও সঞ্জয়ও আপনার সহিত বনে গমন করিবেন। সুতরাং আপনার বনগমনের পর আর কে আমাদিগকে উপদেশ প্রদান করিবেন? আপনি আমার হিতৈষী হইয়া আজি আমাকে যে উপদেশ প্রদান করিবেন, আমি অবশ্যই তদনুসারে কার্য্য করিব। আপনি সুখী হউন।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! আমার অত্যন্ত পরিশ্রম হইয়াছে। অতএব তুমি নিবৃত্ত হও। আর আমি বাক্যব্যয় করিতে পারি না। অন্ধরাজ যুধিষ্ঠিরকে এই কথা কহিয়া গান্ধারীর ভবনে প্রবেশপূর্ব্বক আসনে সমাসীন হইলেন। তখন ধৰ্ম্ম-চারিণী দেবী গান্ধারী সেই প্রজাপতিতুল্য ভর্তাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, নাথ! মহর্ষি বেদব্যাস আপনাকে বনগমনে আজ্ঞা করিয়াছেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরও ঐ বিষয়ে সম্মত হইয়াছেন। এক্ষণে আপনি কোন্ দিন বনে গমন করিবেন, তাহা কীর্ত্তন করুন।

ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, গান্ধারি! আমি মহর্ষি বেদব্যাসকর্তৃক অনুজ্ঞাত হইয়াছি, মহাত্মা যুধিষ্ঠিরও আমার বনগমনবিষয়ে সম্মত হইয়াছেন। এক্ষণে আমি প্রজাগণকে এই স্থানে আনয়ন করাইয়া দ্যূতক্রীড়ানিরত মৃত পুত্রদিগের উদ্দেশ্যে কিঞ্চিৎ ধনদান করিয়া অচিরাৎ অরণ্যে গমন করিব।

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীকে এই কথা কহিয়া যুধিষ্ঠিরের নিকট আপনার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলে, ধর্মরাজ অচিরাৎ তাঁহার আদেশানুসারে কুরুজাঙ্গলস্থ প্রজাসমুদায়কে আহ্বান করিলেন। তখন কুরুজাঙ্গালবাসী যাবতীয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র মহাহ্লাদিত হইয়া রাজভবনে আগমন করিতে লাগিলেন। উহারা সমাগত হইলে, নরপতি ধৃতরাষ্ট্র অন্তঃপুর হইতে বহির্গমনপূর্ব্বক সেই সমুদায় প্রজা ও অন্যান্য বন্ধুবান্ধবগণকে সমবেত অবগত হইয়া তাঁহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে মহামান্য ব্যক্তিগণ! আপনারা কৌরবদিগের সহিত একত্র বাস করিয়াছেন। কৌরবদিগের সহিত আপনাদিগের বিলক্ষণ সৌহৃদ্য জন্মিয়াছিল। আপনারা কৌরবগণের পরমহিতৈষী, কৌরবগণও সতত আপনাদের হিতসাধনে যত্নবান্ হইয়া থাকেন। এক্ষণে আমি আপনাদিগের নিকট যাহা প্রার্থনা করিতেছি, আপনাদিগকে অবিচারিতচিত্তে তাহাতে সম্মত হইতে হইবে।

আমি মহর্ষি বেদব্যাস ও কুন্তীতনয় যুধিষ্ঠিরের অনুমতি অনুসারে গান্ধারীর সহিত বনগমন করিতে প্রস্তুত হইয়াছি। এক্ষণে আপনারা আমাকে অনুজ্ঞা প্রদান করুন। আমাদিগের সহিত আপনাদিগের যেরূপ চিরসৌহার্দ্দদ আছে, বোধ হয়, অন্যদেশস্থ নরপতিদিগের সহিত সেরূপ নাই। এক্ষণে আমি ও গান্ধারী আমরা উভয়েই একে নিতান্ত বৃদ্ধ হইয়াছি, তাহাতে আবার আমাদের পুত্রসমুদায় বিনষ্ট' হইয়াছে; বিশেষতঃ আমরা অনেকদিন উপবাস করিয়া অত্যন্ত কৃশ' হইয়াছি, সুতরাং এ সময়ে বনগমন করাই আমাদের শ্রেয়ঃ। যুধিষ্ঠিরের রাজ্যে আমার যথেষ্ট সুখসম্ভোগ হইয়াছে। বোধ হয়, দুর্য্যোধনের অধিকারসময়ে আমার এরূপ সুখভোগ হয় নাই। যাহা হউক, আমি একে জন্মান্ধ, তাহাতে আবার বৃদ্ধ ও পুত্র-পৌত্রবিহীন হইয়াছি, সুতরাং এক্ষণে বনগমন ভিন্ন আর আমার শ্রেয়ো-লাভের উপায়ান্তর নাই। অতএব আপনারা আমাকে বনগমনে অনুমতি প্রদান করুন।

অন্ধরাজ এই কথা কহিলে, কুরুজাঙ্গলবাসী প্রজাসমুদায় বাষ্পাকুলনয়নে গদ্‌দস্বরে রোদন করিতে লাগিল, কেহই কিছুমাত্র উত্তর প্রদান করিল না।

দুর্য্যোধনাদি পুত্রের মন্দকার্য্যের নিমিত্ত ক্ষমাপ্রার্থনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, এইরূপে সেই শোকপরায়ণ প্রজাগণ কোন প্রত্যুত্তর প্রদান না করিয়া অশ্রুপূর্ণনয়নে দণ্ডায়-মান থাকিলে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পুনরায় তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ! নরপতি শান্তনু, ভীষ্ম পরিরক্ষিত বিচিত্রবীর্য্য ও আমার প্রিয় ভ্রাতা পাণ্ডু যেরূপে রাজ্যপালন করিয়া গিয়াছেন, তাহা আপনাদের অবিদিত' নাই। এক্ষণে আমি আপনাদিগকে যেরূপে প্রতিপালন করিয়াছি, তাহা যদি সুন্দররূপ না হইয়া থাকে, তাহা হইলে আপনারা আমাকে তদ্বিষয়ে ক্ষমা প্রদর্শন করুন। দুর্য্যোধন যে সময়ে নিষ্কণ্টকে রাজ্যভোগ করিয়াছিল, সে সময়ে সেও তোমাদিগের নিকট কোন অপরাধ করে নাই। পরিশেষে তাহারই দুর্নীতি ও আমার অপরাধনিবন্ধন এই অসংখ্য নরপতি কালকবলে নিপতিত হইয়াছেন। যাহা হউক, এক্ষণে আমা হইতে যাহা হইয়াছে, তাহা ভালই হউক, আর মন্দই হউক, আমি কৃতাঞ্জলিপুটে কহিতেছি, আপনারা আর উহা স্মরণ করিয়া আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হইবেন না। বৃদ্ধ, পুত্রবিহীন, দুঃখিত ও পূর্ব্বতন নরপতিদিগের পুত্র বলিয়া আমাকে ক্ষমা করুন। এই বৃদ্ধা গান্ধারীও আমার ন্যায় পুত্রহীনা ও শোকে একান্ত কাতরা হইয়াছেন।

এক্ষণে আমরা উভয়েই আপনাদিগের নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি যে, আপনারা প্রসন্ন হইয়া আমাদিগকে বনগমনে অনুমতি প্রদান করুন। আপনারা কি সম্পদ, কি বিপদ্ সকল সময়েই যুধিষ্ঠিরের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখিবেন। ধর্মার্থকুশল অমিতপরাক্রম লোকপালসদৃশ ভীমাদি চারি ব্যক্তি যখন উঁহার মন্ত্রী, তখন উহাকে কখনই বিপদ্‌গ্রস্ত হইতে হইবে না। অতঃপর ভগবান্ ব্রহ্মার ন্যায় এই মহাতেজস্বী রাজা যুধিষ্ঠির আপনা-দিগের প্রতিপালন করিবেন। আমি ইঁহাকে আপনাদিগের হস্তে এবং আপনাদিগকে ইঁহার হস্তে সমর্পণ করিলাম। আপনারা পূর্ব্বাবধি কখনই আমার উপর কুপিত হন নাই। আপনারা একান্ত প্রভুভক্ত। এক্ষণে আমি গান্ধারীর সহিত কৃতাঞ্জলিপুটে আপনাদিগের নিকট প্রার্থনা করিতেছি যে, আপনারা অনুগ্রহ-পূর্ব্বক আমার এই অস্থিরবুদ্ধি, লোভমুগ্ধ, স্বেচ্ছাচারী দুরাত্মা পুত্রদিগের অপরাধ ক্ষমা করিয়া আমাদিগকে বনগমনে অনুমতি করুন।

মধুরবাক্যে ধৃতরাষ্ট্রকে প্রজাগণের অভিনন্দন জ্ঞাপন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এইরূপে অনুনয় করিলে, পৌর' ও জানপদ' প্রজাগণ সকলেই বাষ্পাকুল-লোচনে পরস্পর পরস্পরের মুখাবলোকনপূর্ব্বক বিচেতনপ্রায় হইয়া রহিল। তৎকালে তাহাদিগের মুখ হইতে কোন কথাই ত বিনির্গত হইল না। তখন অন্ধরাজ পুনর্ব্বার তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ধাৰ্ম্মিকগণ! আমি নিতান্ত বৃদ্ধ ও পুত্রবিহীন হইয়াছি, আমার পিতা ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আমাকে অরণ্যগমনে অনুজ্ঞা করিয়াছেন। এক্ষণে আমি ধর্মপত্নীর সহিত প্রণিপাতপুরঃসর করুণস্বরে বারংবার আপনাদিগকে কহিতেছি, আপনারা আমাদিগকে বনগমনে অনুমতি প্রদান করুন।

অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র করুণস্বরে এই কথা কহিলে প্রজাগণ নিতান্ত শোকসন্তপ্ত হইয়া জনক-জননীর ন্যায় শূন্যহৃদয়ে কেহ কেহ করদ্বারা ও কেহ কেহ বা উত্তয়ীয়বসনদ্বারা মুখমণ্ডল আচ্ছাদনপূর্ব্বক রোদন করিতে লাগিল। অনন্তর তাহারা ক্রমে ক্রমে শোকাবেগ সংবরণপূর্ব্বক একবাক্য হইয়া শাম্বনামক এক বেদবেত্তা ব্রাহ্মণের নিকট আপনাদিগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া কহিল, ভগবন্! আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমাদিগের বাক্য অন্ধরাজের নিকট কীর্ত্তন করুন।

তখন সেই বাক্যবিশারদ বেদবেত্তা মহাত্মা শাম্ব অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্রের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! প্রজাগণ আপনাকে কহিতেছে, আপনি যাহা যাহা কহিলেন, তাহার কিছুই মিথ্যা নহে। কৌরবগণের সহিত আমাদের বিলক্ষণ সৌহার্দ্দদ আছে। আপনার বংশে কোন রাজাই প্রজাপালনে পরাজুখ বা প্রজাদিগের অপ্রিয় ছিলেন না। সকলেই পিতা-মাতার ন্যায় প্রজাদিগকে পালন করিয়াছিলেন। মহারাজ দুর্যোধনও আমাদিগের কোন অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করেন নাই। এক্ষণে ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা বেদব্যাস আপনাকে যেরূপ উপদেশ প্রদান করিয়াছেন, আপনি সেইরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান করুন। আমরা আপনার অদর্শনে নিতান্ত শোকাকুল হইব। আপনার গুণসমুদায় কদাচ আমাদের অন্তঃকরণ হইতে দূরীভূত হইবে না।

পূর্ব্বে মহারাজ শান্তনু আপনার পিতা বিচিত্রবীর্য্য ও মহাত্মা পাণ্ডু যেরূপ রাজ্যপালন করিয়াছিলেন, আপনার পুত্র মহারাজ দুর্য্যোধনও সেইরূপে রাজ্য রক্ষা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহা হইতে আমাদিগের বিন্দুমাত্রও অনিষ্ট হয় নাই। আমরা তাঁহাকে পিতার ন্যায় বিশ্বাস করিতাম। এক্ষণেও আমাদিগের যেরূপ সুখ-স্বচ্ছন্দে কাল অতিবাহিত হইতেছে, তাহা আপনার অবিদিত নাই। অতএব প্রার্থনা করি, কুন্তীপুত্র ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সহস্র বর্ষ রাজ্যপালন করুন। তাহা হইলে, আমরা নিশ্চয়ই পরমসুখে কালহরণ করিতে সমর্থ হইব। মহারাজ যুধিষ্ঠির কুরু, সংবরণ ও ভরত প্রভৃতি পুণ্যবান্ রাজর্ষিগণের রীতি-নীতি অবলম্বন করিয়া ধর্মানুসারে পৃথিবী শাসন করিতেছেন। তাঁহার শরীরে দোষের লেশমাত্র নাই। আমরা আপনার প্রসাদে পরমসুখে কালহরণ করিয়াছি। আপনারা পিতা-পুত্রে আমাদিগের কখন কোন অনিষ্ট করেন নাই। আপনি কুলক্ষয় বিষয়ে দুর্য্যোধনের প্রতি যেরূপ দোষারোপ করিতেছেন, তাহা নিতান্ত অমূলক। এবিষয়ে কি দুর্য্যোধন, কি কর্ণ, কি শকুনি, কি আপনি আপনাদিগের কাহারও অপরাধ নাই। দৈববলেই কৌরবগণের ক্ষয় হইয়াছে।

দৈব নিতান্ত দুর্নিবার্য্য। পুরুষকার কখনই উহাকে নিবারণ করিতে পারে না। ভীষ্ম, দ্রোণ, কূপ ও কর্ণ প্রভৃতি কৌরবপক্ষীর যোধগণ এবং সাত্যকি, ধৃষ্টদ্যুম্ন, ভীমসেন, অর্জুন, নকুল ও সহদেব প্রভৃতি পাণ্ডবপক্ষীয় বীরগণ অষ্টাদশ দিবসের মধ্যেই যে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা নিপাতিত করিলেন, ইহা কি দৈববল ভিন্ন কখন সম্ভবপর হইতে পারে? বিশেষতঃ সংগ্রামে শত্রুসংহার ও কলেবর পরিত্যাগ করা ক্ষত্রিয়দিগের পরম ধৰ্ম্ম। এই নিমিত্ত মহাবল পরাক্রান্ত জ্ঞানবিজ্ঞানদর্শী বীরগণ পৃথিবীর অসংখ্য হস্তী, অশ্ব ও মনুষ্যগণকে নিপাতিত করিয়া পরলোকে গমন করিয়াছেন। অতএব আপনার পুত্র দুর্য্যোধন, আপনার ভৃত্যগণ, মহাবীর কর্ণ, শকুনি ও আপনাদিগের মধ্যে কাহাকেও ভূপতিগণের ক্ষয়ের কারণ বলিয়া নিৰ্দ্দেশ করা যায় না। দৈববলেই ঐ কার্য্য সম্পন্ন হইয়াছে। দৈব ভিন্ন উহার অন্য কারণই নাই।

আপনি সমুদায় জগতের গুরু। আমরা আপনাকে ও আপনার পুত্র দুর্য্যোধনকে কদাচ অধার্মিক বলিয়া জ্ঞান করি না। এক্ষণে প্রার্থনা করি, মহারাজ দুর্য্যোধন ব্রাহ্মণের আজ্ঞানুসারে বান্ধবগণের সহিত দুর্লভ স্বর্গসুখ অনুভব করুন। আপনিও তপস্যায় অনুরক্ত হইয়া সনাতন ধর্মসমুদায় পরিজ্ঞাত হউন। পাণ্ডবগণের প্রতি আমাদিগের দৃষ্টিপাতও করিতে হইবে না। ঐ মহাত্মারা পৃথিবীর কথা দূরে থাকুক, সমুদায় স্বর্গলোক প্রতিপালন করিতে পারেন। উঁহারা সম্পন্ন হউন বা বিপন্ন হউন, প্রজাগণ সর্ব্বদা উঁহাদিগের বশীভূত থাকিবে। দীর্ঘদর্শী জিতেন্দ্রিয় মহারাজ যুধিষ্ঠির পুরাতন রাজযিদিগের বিধানানুসারে ব্রাহ্মণগণকে প্রচুর পরিমাণে ধনদান ও শ্রাদ্ধাদি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। উঁহার তুল্য দয়াবান্ সরল ও পবিত্রস্বভাব আর কেহই নাই। উনি আমাদিগের পুত্রবৎ পালন করিয়া থাকেন। উঁহার মন্ত্রীদিগের মধ্যে কেহই ক্ষুদ্রদৃষ্টি বা অল্পজ্ঞান-সম্পন্ন নহেন। উঁহার ভীমসেন প্রভৃতি মহাবল পরাক্রান্ত ভ্রাতৃগণও উহার প্রতি একান্ত অনুরক্ত; সুতরাং তাঁহারা যে আমাদিগের অপ্রিয় কার্য্যের অনুষ্ঠান করিবেন, তাহাও সম্ভবপর নহে।

শিষ্টদিগের প্রতি সরলতা ও দুষ্টদিগের প্রতি তেজঃপ্রকাশ করা তাঁহাদিগের স্বভাবসিদ্ধ। আর মহানুভবা কুন্তী, দ্রৌপদী, চিত্রাঙ্গদা, উলূপী ও সুভদ্রা, ইঁহারাও কদাচ আমাদিগের প্রতিকূল ব্যবহার করিবেন না। আপনি আমাদিগের প্রতি যেরূপ স্নেহ প্রকাশ করিয়াছেন এবং যুধিষ্ঠির এক্ষণে আমাদিগকে যেরূপ স্নেহ করিতেছেন, তাহা আমরা কদাচ বিস্মৃত হইতে পারিব না। প্রজাগণ অধার্মিক হইলেও মহারথ পাণ্ডবগণ ধর্মানুসারে তাহাদিগের প্রতিপালন করিবেন; অতএব আপনি এক্ষণে সন্তাপ পরিত্যাগপূর্ব্বক সুস্থচিত্তে ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করুন।

মহামতি শাম্ব ধৃতরাষ্ট্রের নিকট এই কথা কহিলে, তত্রত্য সমুদায় প্রজাই তাঁহাকে বারংবার সাধুবাদ প্রদানপূর্ব্বক তাঁহার বাক্যে অনুমোদন করিল। তখন অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র প্রজাগণের অভিপ্রায় অবগত হইয়া বারংবার তাহাদিগের বাক্যে অভিনন্দন-পূর্ব্বক তাহাদিগকে বিদায় করিয়া গান্ধারীর সহিত আত্মভবনে প্রবেশ করিলেন।

ধৃতরাষ্ট্র-যাঞ্ছিত ধনদানে ভীমের অনিচ্ছা ও ক্রোধপ্রকাশ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর রজনী প্রভাত হইলে, অন্ধরাজ বিদুরকে যুধিষ্ঠিরের নিকট প্রেরণ করিলেন। মহাত্মা বিদুর যুধিষ্ঠিরের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, রাজন! মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র বনগমনার্থ প্রস্তুত হইয়াছেন। তিনি এই কার্ত্তিকী পূর্ণিমাতে যাত্রা করিবেন। এক্ষণে তিনি সমরনিহত মহাত্মা, ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য্য, সোমদত্ত, বাহ্লীক, তাঁহার পুত্রগণ ও অন্যান্য বান্ধবগণের শ্রাদ্ধসম্পাদনার্থ আপনার নিকট কিঞ্চিৎ ধন প্রার্থনা করিতেছেন। যদি আপনার অভিমত হয়, তাহা হইলে তিনি ঐ ধনদ্বারা সৈন্ধবাপসদ' জয়দ্রথেরও শ্রাদ্ধ করিবেন।

মহাত্মা বিদুর এই কথা কহিবামাত্র রাজা যুধিষ্ঠির ও অর্জুন তাঁহার বাক্যশ্রবণে পরম পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহাকে যথোচিত সম্মাননা করিলেন, কিন্তু জাতক্রোধ ভীমসেন দুর্য্যোধনের দৌরাত্ম্য স্মরণ করিয়া বিদুরের সেই বাক্যে তাদৃশ আস্থা প্রকাশ করিলেন না। তখন মহাবীর অর্জুন বৃকোদরের অভিপ্রায় অবগত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৃকোদর। আমাদিগের পিতৃব্য বৃদ্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র বনগমনে দীক্ষিত হইয়া ভীষ্মাদি মহাত্মাদিগের ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়া সম্পাদনার্থ আপনাকর্তৃক নির্জিত ধন যাজ্ঞা করিতেছেন। অতএব উহা প্রদান করিতে অনুজ্ঞা করা আপনার অবশ্য কর্তব্য। হায়। কালের কি আশ্চর্য্য গতি! পূর্ব্বে যে ধৃতরাষ্ট্রের নিকট আমরা যাজ্ঞা করিয়াছি, এক্ষণে তিনি আমাদিগের নিকট যাজ্ঞা করিতেছেন! যিনি সসাগরা পৃথিবীর অধিপতি ছিলেন, আজি তিনি শত্রুকর্তৃক পরাজিত হইয়া বনগমনে অভিলাষী হইয়াছেন। এক্ষণে আপনি ধৃতরাষ্ট্রকে ধনপ্রদানে অনুমতি করুন। উহাকে ধন প্রদান না করিলে আমাদের অধর্ম এবং অকীর্ত্তি ঘোষণা হইবে। বরং আপনি ধন প্রদান করা উচিত কি না তাহা জ্যেষ্ঠভ্রাতা ধর্মরাজকে জিজ্ঞাসা করুন।

মহাত্মা অর্জুন এই কথা কহিবামাত্র রাজা যুধিষ্ঠির তাঁহার বাক্যে অনুমোদন করিলেন। তখন মহাবীর বৃকোদর ক্রোধাবিষ্ট হইয়া ধনঞ্জয়কে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ধনঞ্জয়! আমরা স্বয়ং মহাবীর ভীষ্ম, সোমদত্ত, ভূরিশ্রবাঃ, বাহীক, মহাত্মা দ্রোণাচার্য্য ও অন্যান্য বান্ধবগণের প্রেতকার্য্য সম্পাদন করিব এবং ভোজ-নন্দিনী কর্ণের ঔর্দ্ধদেহিক কার্য্য সম্পাদন করিবেন। উঁহাদিগের শ্রাদ্ধার্থ ধৃতরাষ্ট্রকে ধনদান করিবার প্রয়োজন কি? আমার মতে দুর্য্যোধনাদির ঔর্দ্ধ দেহিক কার্য্য করাই বিধেয় নহে। আমাদিগের শত্রুগণ যেন কোন স্থানেই আহ্লাদিত না হয়। দুর্য্যোধন প্রভৃতি যে সকল কুলাঙ্গারদ্বারা এই পৃথিবী উৎসন্নপ্রায় হইয়াছে, তাহারা যেন সকলেই ঘোরতর ক্লেশে নিপতিত হয়। তুমি কি দ্রৌপদীর ক্লেশাবহ দ্বাদশ বৎসর বনবাস ও এক বৎসর অজ্ঞাতবাস এককালে বিস্মৃত হইয়াছ? তৎকালে ধৃতরাষ্ট্রের স্নেহ কোথায় তিরোহিত হইয়াছিল? যখন তুমি হৃতসর্ব্বম্ব হইয়া কৃষ্ণাজিন ধারণপূর্ব্বক পাঞ্চালীর সহিত রাজা যুধিষ্ঠিরের অনুগমন করিয়াছিলে, তখন ভীষ্ম, দ্রোণ ও সোমদত্ত, ইঁহারা কোথায় অবস্থান করিয়াছিলেন? যখন তুমি ত্রয়োদশ বৎসর বন্য ফলমূল ভক্ষণ করিয়া বনে বনে ভ্রমণ করিয়াছিলে, তখন তোমার জ্যেষ্ঠতাতের পিতৃস্নেহ কোথায় তিরোহিত হইয়াছিল? দুরাত্মা অন্ধরাজ যে দ্যূতক্রীড়ার সময় "এইবার আমাদের কি লাভহইল" বলিয়া বারংবার বিদুরকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, তাহা কি তুমি একবারে বিস্মৃত হইয়াছ?

মহাবীর বৃকোদর ক্রোধভরে এই কথা কহিলে, অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিয়া মৌনা-বলম্বন করিতে কহিলেন।

ধৃতরাষ্ট্রকে ধনদানে যুধিষ্ঠিরাদির অনুমতি।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, ঐ সময় অর্জুন বৃকোদরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহাশয়! আপনি আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা ও গুরু। আপনাকে আর অধিক বলা আমার কর্তব্য নহে। এক্ষণে আপনার নিকট আমার এইমাত্র বক্তব্য যে, রাজা ধৃতরাষ্ট্র সর্ব্বতোভাবে আমাদিগের পূজ্য। বিশেষতঃ সাধুব্যক্তিরা অন্যকৃত অপকার স্মরণ না করিয়া উপকারই স্মরণ করিয়া থাকেন। ধর্মাত্মা অর্জুন এই কথা কহিলে, ধৰ্ম্মনন্দন তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া বিদুরকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ক্ষত্তঃ'! তুমি আমার আদেশানুসারে কৌরবেন্দ্র ধৃতরাষ্ট্রকে কহিবে যে, তিনি পুত্র ও ভীষ্মাদি বন্ধুবর্গের শ্রাদ্ধার্থ যে পরিমাণে ধনদান করিতে বাসনা করেন, তাহা আমার কোষ হইতে গ্রহণ করুন। ভীমসেন তাহাতে বিরক্ত হইবেন না।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিয়া অর্জুনকে যথেষ্ট প্রশংসা করিলেন। তখন ভীমসেন ধনঞ্জয়ের প্রতি কটাক্ষ' নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় রাজা যুধিষ্ঠির পুনরায় বিদুরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহাত্মন্! যেন নরপতি ধৃতরাষ্ট্র বৃকোদরের প্রতি কোপ প্রকাশ না করেন। বৃকোদর অরণ্যমধ্যে শীত, গ্রীষ্ম ও বৃষ্টিনিবন্ধন অনেক কষ্টভোগ করিয়াছে, তাহা তোমার অবিদিত নাই। তুমি আমার বচনানুসারে জ্যেষ্ঠতাতকে কহিবে যে, তাঁহার যে দ্রব্য যে পরিমাণ গ্রহণ করিতে বাসনা হয়, তিনি তৎসমুদায়ই যেন আমার গৃহ হইতে গ্রহণ করেন। বৃকোদর অত্যন্ত দুঃখিত হইয়া যে অহঙ্কার প্রকাশ করিলেন, তাহা যেন তিনি হৃদয়মধ্যে স্থান দান না করেন। অর্জুনের ও আমার যে সমুদায় ধন আছে, তিনি সেই সমুদায় ধনেরই অধিকারী। তাঁহার যাহা ইচ্ছা হয়, ব্রাহ্মণগণকে তাহা দান ও অন্যান্য ব্যয় করিয়া পুত্র ও বান্ধবগণের নিকট ঋণশূন্য হউন। আমার ধনের কথা দূরে থাকুক, আমার এই শরীরও তাঁহার একান্ত অধীন।

ভীমসেনের কটূক্তি ক্ষমাপণার্থ যুধিষ্ঠিরের নিবেদন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, রাজা যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, ধীমান্ বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, রাজন! আমি প্রথমতঃ যুধিষ্ঠিরের নিকট আপনার বাক্য কীর্ত্তন করিবামাত্র তিনি এবং অর্জুন উভয়ে আপনার বাক্যে যথেষ্ট সমাদর প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিলেন, আমা-দিগের রাজ্য ধন বা প্রাণ যাহাতে জ্যেষ্ঠতাতের অভিলাষ হয়, তিনি তাহাই গ্রহণ করিতে পারেন, কিন্তু মহাবীর বৃকোদর পূর্ব্বতন দুঃখসমুদায় স্মরণ করিয়া আপনার বাক্যে অতিকষ্টে সম্মত হইলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ও মহাত্মা অর্জুন তাঁহারা উভয়ে অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া বৃকোদরকে সম্মত করিয়াছেন। পরিশেষে ধর্মরাজ অনেক অনুনয় করিয়া কহিয়াছেন যে, মহাবীর বৃকোদর পূর্ব্বকৃত বৈর স্মরণ করিয়া আপনার প্রতি যে কিছু অন্যায় আচরণ করিয়াছেন, তাহাতে যেন আপনি দুঃখিত না হন। ঐ মহাবীর সতত ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম ও যুদ্ধেই ব্যাপৃত থাকেন! এই নিমিত্তই উনি অদ্যাপি ক্রোধসংবরণ করিতে পারেন নাই।

যাহা হউক, এক্ষণে বৃকোদরের নিমিত্ত আমি ও অর্জুন আমরা উভয়ে জ্যেষ্ঠতাতের নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি যে, তিনি যেন অনুগ্রহপূর্ব্বক আমাদিগের বিশেষতঃ ভীমের প্রতি প্রসন্ন হন। তিনি এই রাজ্য ও আমাদিগের প্রভু, অতএব পুত্র ও বান্ধবদিগের ঔর্দ্ধদেহিক কার্য্যার্থ তাঁহার যাহা অভিরুচি হয়, তিনি তাহাই করুন। তিনি রত্ন, গাভী, দাস, দাসী, মেষ ও ছাগ প্রভৃতি যাহা দান করিতে বাসনা করেন, তাহাই গ্রহণ করিয়া অনায়াসে ব্রাহ্মণ, অন্ধ ও দীন-দরিদ্রদিগকে প্রদান করুন। তিনি অন্নদান, পানীয়দান ও গোসমূহের জলপানার্থ নিপানদান' প্রভৃতি অসংখ্য পুণ্যকার্য্যের অনুষ্ঠান করুন। হে কৌরবেন্দ্র। রাজা যুধিষ্ঠির ও মহাত্মা ধনঞ্জয় আমাকে এই কথা কহিয়াছেন, এক্ষণে আপনার যাহা অভিরুচি হয়, করুন।

ধৃতরাষ্ট্রের ব্রাহ্মণাদিকে যথেচ্ছ ধনাদি প্রদান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাত্মা বিদুর এই কথা কহিলে, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠির ও অর্জুনের প্রতি সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া, সেই দিন অবধি কার্ত্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত ধনদান করিয়া বনগমন করিতে অভিলাষ করিলেন। অনন্তর তিনি ভীষ্ম, দ্রোণ, সোমদত্ত, বাহীক এবং দুর্য্যোধন প্রভৃতি পুত্রগণ ও জয়দ্রথ প্রভৃতি সুহৃদ্গণের প্রত্যেকের নাম উল্লেখপূর্ব্বক অন্ন, পান, যান, আচ্ছাদন, মণিমুক্তাদি বিবিধ রত্ন, সুবর্ণ, দাস, দাসী, মেষ, ছাগ, কম্বল, গ্রাম, ক্ষেত্র, অলঙ্কৃত অশ্ব, হস্তী ও বরাঙ্গনাসমুদায় প্রদান করিতে লাগিলেন। ঐ সময় যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে সেই ধৃতরাষ্ট্রানুষ্ঠিত শ্রাদ্ধযজ্ঞ এককালে ধনরত্নে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। গণক ও লেখকগণ দিবারাত্রি যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞানুসারে "মহারাজ! এই যাচক ব্রাহ্মণগণকে কি প্রদান করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন" বলিয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল এবং অন্ধরাজ যাঁহাকে শত মুদ্রা প্রদান করিতে কহিলেন, তাহারা যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে তাঁহাকে সহস্র মুদ্রা এবং যাঁহাকে সহস্র মুদ্রা অর্পণ করিতে আদেশ করিলেন, তাঁহাকে দশসহস্র মুদ্রা প্রদান করিতে আরম্ভ করিল।

এইরূপে রাজা ধৃতরাষ্ট্র সলিলবর্ষী জলধরের ন্যায় ধনবর্ষণপূর্ব্বক ব্রাহ্মণগণের তৃপ্তিসাধন করিয়া পরিশেষে প্রচুর পরিমিত বিবিধ মিষ্টান্নদ্বারা সমুদায় বর্ণের ব্যক্তিগণকে আহার করাইয়া পুত্র, পৌত্র ও পিতৃগণের ঔর্দ্ধদেহিক কার্য্য সম্পাদন করিলেন। তৎপরে তিনি আপনার ও গান্ধারীর পারলৌকিক হিতসাধনার্থ পুনরায় ব্রাহ্মণগণকে ধনদানে প্রবৃত্ত হইলেন। মহামতি অন্ধরাজ এইরূপে ক্রমাগত দশদিন অনবরত অর্থদান করিয়া পরিশেষে নিতান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া দানযজ্ঞ সমাপনপূর্ব্বক বন্ধুবান্ধবগণের আনৃণ্য লাভ করিলেন। তিনি যে কয়েক দিন ধনদানে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, সেই কয়েক দিন তাঁহার ভবনে সর্ব্বদা নট ও নর্তকগণ নৃত্য করিয়াছিল।

ধৃতরাষ্ট্রের বনযাত্রায় যুধিষ্ঠিরাদির অনুতাপ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর একাদশ দিবসে অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র প্রাতঃকালে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক ঐ দিন কার্ত্তিকী পূর্ণিমা অবগত হইয়া পাণ্ডবগণকে আহ্বান করিয়া তাঁহাদিগের প্রতি যথোচিত প্রীতি প্রকাশ করিলেন এবং অচিরাৎ বেদবেত্তা ব্রাহ্মণগণদ্বারা যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া বল্কলাজিন' পরিধানপূর্ব্বক গান্ধারী ও অন্যান্য কৌরববধূগণের সহিত স্বীয় ভবন হইতে বহির্গত হইলেন। ঐ সময় কৌরবকুলকামিনীগণের আর্তস্বরে অন্তঃপুর আকুলিত হইয়া উঠিল। তখন অন্ধরাজ লাজ'দ্বারা আপনার গৃহ অর্চ্চিত করিয়া ভৃত্যগণকে ধনরাশি প্রদানপূর্ব্বক অরণ্যযাত্রা করিলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তদ্দর্শনে নিতান্ত শোকসন্তপ্ত হইয়া বাষ্পরুদ্ধকণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে "হা তাত। কোথায় চলিলেন”, বলিয়া ধরাতলে নিপতিত হইলেন। মহাত্মা ধনঞ্জয় নিতান্ত দুঃখিত হইয়া বারংবার দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক ধর্মরাজকে সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন।

অনন্তর যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জুন, নকুল, সহদেব, বিদুর, সঞ্জয়, যুযুৎসু, কৃপাচার্য্য, ধৌম্য ও অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ নিতান্ত শোকাভিভূত হইয়া বাষ্পবারি পরিত্যাগপূর্ব্বক ধৃতরাষ্ট্রের অনুগমন করিতে আরম্ভ করিলেন। কুন্তী ও বস্ত্রা-চ্ছাদিতনয়না' গান্ধারী আপনাদের স্কন্ধদেশে অন্ধরাজের হস্তদ্বয় সন্নিবেশিত করিয়া তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে গমন করিতে লাগিলেন এবং দ্রৌপদী, সুভদ্রা, নবপ্রসূতা উত্তরা, চিত্রাঙ্গদা ও অন্যান্য রমণীগণ কুররীর ন্যায় উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে করিতে তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। ঐ সময় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণের বনিতাগণই শোকাকুলিতচিত্তে চতুৰ্দ্দিক্ হইতে রাজমার্গে আগমন করিতে লাগিল। ফলতঃ পূর্ব্বে পাণ্ডবগণ দ্যুতে পরাজিত হইয়া কৌরবসভা হইতে বহির্গত হইলে পৌরজনেরা যেরূপ দুঃখিত হইয়াছিল, এক্ষণে অন্ধরাজকে অরণ্যে গমন করিতে দেখিয়াও তাঁহাদিগের সেইরূপ ন দুঃখ সমুপস্থিত হইল। যে সমুদায় কুলকামিনী পূর্ব্বে চন্দ্র-সূর্য্যকেও দর্শন করে নাই, এক্ষণে তাহারাও শোকাভিভূতা হইয়া রাজমার্গে আগমন করিতে লাগিল।

বনগমনাভিলাষিণী কুন্তীর ধৃতরাষ্ট্রের সহিত গমন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ধৃতরাষ্ট্র রাজপথে সমুপস্থিত হইলে, অট্টালিকা ও অন্যান্য স্থানসমুদায় হইতে স্ত্রী-

পুরুষদিগের ক্রন্দনকোলাহল শ্রুতিগোচর হইতে লাগিল। তখন অন্ধরাজ বিনীতভাবে অতিকষ্টে ক্রমে ক্রমে সেই নরনারীসঙ্কুল রাজমার্গ অতিক্রমপূর্ব্বক হস্তিনানগরের অত্যুচ্চ বহির্দ্ধার হইতে বহির্গত হইয়া অনুগামী ব্যক্তিদিগকে বিদায় করিতে লাগিলেন। মহাবীর কৃপাচার্য্য ও যুযুৎসু ধৃতরাষ্ট্রকর্তৃক যুধিষ্ঠিরের হস্তে সমর্পিত হইয়া বনগমনবাসনা পরিত্যাগ করিলেন। কিন্তু মহাত্মা বিদুর ও সঞ্জয় কিছুতেই নিবৃত্ত না হইয়া তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন।

অনন্তর ক্রমে ক্রমে সমুদায় পৌরবর্গ প্রতিনিবৃত্ত হইলে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠতাতের আজ্ঞানুসারে কামিনীগণের সহিত নগরমধ্যে প্রবিষ্ট হইতে বাসনা করিয়া স্বীয় জননী কুম্ভীকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মাতঃ। আপনি বধূগণের সহিত নগরে প্রতিনিবৃত্ত হউন, বরং আমি জ্যেষ্ঠতাতের সহিত অরণ্যে গমন করি। ধর্মপরায়ণ মহাত্মা কৌরবনাথ তপস্যা করিতে কৃতনিশ্চয় হইয়াছেন, সুতরাং উঁহারই এক্ষণে অরণ্যবাস আশ্রয় করা কর্তব্য।

কুন্তীর বনবাসাভিলাষে যুধিষ্ঠিরাদির নিষেধ ও কুন্তীর উপেক্ষা।

পাণ্ডবজননী কুন্তী ধর্মরাজকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া বাষ্পাকুলিতলোচনে গান্ধারীকে ধারণপূর্ব্বক গমন করিতে করিতে ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস! তুমি সহদেবের প্রতি কখন তাচ্ছিল্য' করিও না। সে তোমার ও আমার প্রতি একান্ত অনুরক্ত। আর পূর্ব্বে আমি দুর্বুদ্ধিবশতঃ যে মহাবীরকে তোমাদের বিপক্ষে সংগ্রাম করিতে অনুমোদন করিয়াছিলাম, সেই মহাত্মা কর্ণও যেন তোমার স্মৃতিপথের বহির্ভূত না হয়। হায়! আমার তুল্য অভাগ্যবতী আর কেহই নাই। যখন সূর্য্যতনয় বৎস কর্ণকে না দেখিয়া আমার হৃদয় শতধা বিদীর্ণ হইতেছে না, তখন নিশ্চয় বুঝিলাম, উহা লৌহদ্বারা নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। পূর্ব্বে যখন আমি তোমার নিকট তাহার পরিচয় প্রদান করি নাই, তখন আমাকেই তাহার বধবিষয়ে সম্পূর্ণ অপরাধিনী বলিতে হইবে। যাহা হউক, এখন আর তাহার কিছুমাত্র প্রতীকার হইবার সম্ভাবনা নাই। এক্ষণে তুমি ভ্রাতৃগণের সহিত সমবেত হইয়া তোমার সেই জ্যেষ্ঠভ্রাতার প্রীতির নিমিত্ত বিবিধ ধনদান করিবে। কদাপি দ্রৌপদীর অপ্রিয়া-চরণ করিও না। সর্ব্বদা ভীমসেন, অর্জুন ও নকুলের রক্ষণা-বেক্ষণ করিবে। আজি কুরুকুলের ভার তোমার উপর সম্পূর্ণ-রূপে অর্পিত হইল। আমি এক্ষণে অরণ্যে গমন করিয়া তপোনুষ্ঠান এবং তোমার জ্যেষ্ঠতাত ও গান্ধারীর শুশ্রূষা করিব।

মনস্বিনী কুন্তী এই কথা কহিলে, ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির নিতান্ত দুঃখিত হইয়া ভ্রাতৃগণের সহিত ক্ষণকাল অধোবদনে চিন্তা করিয়া জননীকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মাতঃ! এক্ষণে আপনার বুদ্ধি এরূপ বিচলিত হইল কেন? আমার প্রতি এরূপ নিষ্ঠুরবাক্য প্রয়োগ করা আপনার কর্ত্তব্য নহে। আমি কখনই আপনার বনগমনবিষয়ে অনুমোদন করিতে পারিব না; আপনি আমাদিগের প্রতি প্রসন্ন হউন। পূর্ব্বে মহাত্মা বাসুদেবের নিকট বিদুলার বাক্যসমুদায় কীর্ত্তনপূর্ব্বক আমাদিগকে বিবিধরূপে উৎসাহ প্রদান করিয়া এক্ষণে এরূপ কঠিনবাক্য প্রয়োগ করা আপনার নিতান্ত অকর্ত্তব্য। আমরা বাসুদেবের মুখে আপনার উপদেশ শ্রবণপূর্ব্বক আপনার বুদ্ধি-বলে ভূপতিদিগকে নিপাতিত করিয়া রাজ্যলাভ করিয়াছি। এক্ষণে আপনার সেই বুদ্ধি ও জ্ঞান কোথায় গেল? আমাকে ক্ষাত্রধৰ্ম্ম আশ্রয় করিতে অনুজ্ঞা করিয়া এক্ষণে আমায় পরিত্যাগ করা আপনার কখনই কর্ত্তব্য নহে। আপনি রাজ্য ও আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া কিরূপে গহনকাননে বাস করিবেন? অতঃপর আপনি আমাদিগের প্রতি প্রসন্ন হউন।

পাণ্ডবজননী কুন্তী ধৰ্ম্মরাজের এইরূপ করুণবাক্য শ্রবণ করিয়াও প্রতিনিবৃত্তা হইলেন না। তিনি অশ্রুপূর্ণলোচনে অন্ধ-রাজের অনুগমন করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা ভীমসেন তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মাতঃ। এক্ষণে পুত্রনিজ্জিত রাজ্যভোগ ও রাজধৰ্ম্মসমুদায় লাভ করিবার সময় আপনার এরূপ বুদ্ধিবিপর্য্যয় উপস্থিত হইল কেন? যদি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া বনে গমন করাই আপনার অভিপ্রায় ছিল, তবে আপনি কেন আমাদিগের দ্বারা পৃথিবীকে বীরশূন্যা করাইলেন? আর আমরা যৎকালে নিতান্ত বালক ছিলাম, তখনই বা কি নিমিত্ত আমাদিগকে ও মাদ্রীতনয়দ্বয়কে বন হইতে আনয়ন করিয়াছিলেন? এক্ষণে আপনি প্রসন্ন হইয়া বনগমনের বাসনা পরিহারপূর্ব্বক ধর্মরাজের বাহুবলার্জিত রাজ্যভোগ করুন।

ভীমসেন ও অন্যান্য পাণ্ডবগণ এইরূপে বহুবিধ বিলাপ করিলেও মহানুভাবা কুন্তী বনগমনবাসনা পরিত্যাগ করিলেন না। তখন মনস্বিনী দ্রৌপদী বিষণ্ণবদনে রোদন করিতে করিতে সুভদ্রার সহিত তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। কুন্তী তাহাতেও ক্ষান্ত না হইয়া রোরুদ্যমান' পুত্রদিগকে বারংবার সস্নেহনয়নে নিরীক্ষণ করিতে করিতে অন্ধরাজের অনুগমন করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা পাণ্ডবগণ নিতান্ত বিষন্নচিত্তে ভৃত্য ও পরিজনবর্গের সহিত জননীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে আরম্ভ করিলেন।

বিষণ্ণচিত্ত পুত্রদিগের প্রতি কুন্তীর সান্ত্বনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর পাণ্ডবজননী কুন্তী অশ্রুবেগ সংবরণ করিয়া, পুত্রগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎসগণ! পূর্ব্বে তোমরা জ্ঞাতিগণকর্তৃক কপট দ্যুতে পরাজিত হইয়া নিতান্ত দুঃখিত ও অবসন্ন হইয়াছিলে, এই নিমিত্ত আমি তোমাদিগকে যুদ্ধ করিতে উৎসাহিত করিয়াছিলাম। তোমরা মহাত্মা পাণ্ডুর পুত্র, সুতরাং তোমাদিগের নাশ বা যশোহানি হওয়া নিতান্ত অনুচিত। তোমরা ইন্দ্রতুল্য পরাক্রমশালী, সুতরাং তোমাদিগের শত্রুর বশীভূত হওয়া কখন উচিত নহে।

তোমাদিগের জ্যেষ্ঠভ্রাতা যুধিষ্ঠির ভূপতিদিগের অগ্রগণ্য ও ইন্দ্রতুল্য প্রভাবসম্পন্ন। অতএব উহার চিরকাল বনে অবস্থান করা নিতান্ত অনুচিত। অযুত নাগের তুল্য পরাক্রমশালী পৌরুষান্বিত ভীমসেনের ও বাসব'সদৃশ বিক্রমশালী ধনঞ্জয়ের অবসন্নভাবে কালহরণ করা কদাপি বিধেয় নহে। বালক নকুল ও সহদেবের ক্ষুধায় কাতর হওয়া এবং সভামধ্যে এই দ্রুপদ-নন্দিনী কৃষ্ণার ক্লেশ সহ্য করা নিতান্ত অন্যায্য। আমি এই সমুদায় বিবেচনা করিয়াই তোমাদিগকে সংগ্রামে প্রোৎসাহিত করিয়াছিলাম। পূর্ব্বে যখন এই পাঞ্চালী দ্যুতে পরাজিতা হইয়া সভামধ্যে তোমাদিগের সমক্ষেই কদলীর ন্যায় কম্পিতা হইয়া-ছিলেন, যখন দুরাত্মা দুঃশাসন অজ্ঞানবশতঃ দাসীর ন্যায় ইহার কেশাকর্ষণ করিয়াছিল; তখনই আমি বুঝিয়াছিলাম যে, এই কুরুকুল এককালে দগ্ধ হইবে। পাপাত্মা দুঃশাসন এই পাঞ্চালীর কেশাকর্ষণ করিলে, যখন ইনি বারংবার সাহায্য প্রার্থনা করিয়া কুররীর ন্যায় রোদন করিয়াছিলেন, তখন আমার চৈতন্য একবারে বিলুপ্ত হইয়াছিল। আমি সেই নিমিত্তই তোমাদিগের তেজোবর্দ্ধন মানসে বাসুদেবের নিকট বিদুলা-সঞ্জয়-সংবাদ কীর্ত্তন করিয়া তোমাদিগকে উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলাম।

তোমাদিগের বিনাশনিবন্ধন এই রাজবংশের ক্ষয় হওয়া উচিত নহে। যে ব্যক্তি বংশনাশের হেতুভূত হয়, তাহার পুত্রপৌত্রগণও শুভলোকলাভে বঞ্চিত হইয়া থাকে। আমি ভর্তার রাজত্বসময়ে অশেষ সুখভোগ, বিবিধ মহাদান ও যথাবিধি সোমরস পান করিয়াছি। আমি যে বাসুদেবের নিকট বিদুলার বাক্য কীর্তন করিয়া তোমাদিগকে উৎসাহিত করিয়া-ছিলাম, তাহা আমার আপনার সুখসাধনের নিমিত্ত নহে; কেবল তোমাদিগের হিতসাধনের নিমিত্তই আমি ঐ কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। এক্ষণে রাজ্যভোগের বাসনা পরিহার পূর্ব্বক তপস্যাদ্বারা মহাত্মা পাণ্ডুর পবিত্রলোকলাভ করিতেই আমার নিতান্ত বাসনা হইয়াছে। পুত্রনির্জিত রাজ্যভোগে আমার কিছুমাত্র অভিলাষ নাই। অতএব আমি বনবাসী অন্ধরাজ ও তাঁহার মহিষীর শুশ্রূষা করিয়া তপস্যার দ্বারা এই কলেবর শুষ্ক করিব। তোমরা রাজধানীতে প্রতিগমন করিয়া পরমসুখে রাজ্য সম্ভোগ কর। তোমাদিগের ধর্মবুদ্ধি পরিবর্দ্ধিত ও মনঃ প্রশস্ত হউক।

ধৃতরাষ্ট্রাদির অরণ্যে প্রবেশ ও পাণ্ডবাদির প্রতিনিবৃত্তি।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, যশস্বিনী কুন্তী এই কথা কহিলে, পাণ্ডবগণ তাঁহার বাক্য শ্রবণে লজ্জিত হইয়া অন্ধরাজকে প্রণতি ও প্রদক্ষিণপূর্ব্বক পাঞ্চালীর' সহিত প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। ঐ সময় কুন্তীকে বনগমন করিতে অবলোকন করিয়া কামিনীগণ উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিল। তখন রাজা ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী ও বিদুরকে কহিলেন, তোমরা অচিরাৎ যুধিষ্ঠিরের জননী দেবী কুন্তীকে প্রতিনিবৃত্ত কর। যুধিষ্ঠির যাহা যাহা কহিলেন, সে সমুদায়ই যথার্থ। পাণ্ডবজননী মহাফলপ্রদ ঐশ্বর্য্য ও পুত্রগণকে পরিত্যাগ করিয়া কেন বৃথা দুর্গম অরণ্যে গমন করিবেন? উনি রাজ্যে অবস্থান করিলে অনায়াসে দান ও ব্রতাদি আচরণ করিয়া উৎকৃষ্ট তপোনুষ্ঠান করিতে পারিবেন। উঁহার শুশ্রূষায় আমি পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি; অতএব তোমরা উঁহাকে প্রতিনিবৃত্ত হইতে আদেশ কর।

অন্ধরাজ এই কথা কহিলে, সুবলনন্দিনী গান্ধারী কুন্তীর নিকট রাজবাক্যসমুদায় কীর্ত্তন এবং স্বয়ং তাঁহাকে বিশেষরূপে প্রতিগমন করিতে অনুরোধ করিলেন; কিন্তু কোনরূপেই তাঁহাকে নিবৃত্ত করিতে সমর্থা হইলেন না। তখন কৌরবকামিনী-গণ কুন্তীর অভিপ্রায় অবগত হইয়া ও পাণ্ডবগণকে প্রতিনিবৃত্ত হইতে দেখিয়া রোদন করিতে করিতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। অনন্তর পাণ্ডবগণ দুঃখ-শোকে একান্ত কাতর হইয়া অতি দীনভাবে স্ত্রীগণসমভিব্যাহারে যানারোহণপূর্ব্বক পুরোমধ্যে প্রবেশ করিলেন। ঐ সময় হস্তিনানগর এককালে উৎসবশূন্য হইল। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই নিরানন্দ হইয়া রহিল। পাণ্ডবগণ কুন্তীর বিরহে গাভীহীন বৎসের ন্যায় একবারে উৎসাহশূন্য ও শোকে নিমগ্ন হইলেন।

এদিকে রাজা ধৃতরাষ্ট্র ঐ দিন বহুদূর গমন করিয়া ভাগীরথীতীরে অবস্থান করিলেন। বেদপারদর্শী ব্রাহ্মণগণ তাঁহার সহিত মিলিত হইয়া সেই ভাগীরথীতীরস্থিত তপোবনে নিয়মা-নুসারে অগ্নি প্রজ্বালিত করিয়া আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন। ক্রমশঃ সন্ধ্যাকাল সমুপস্থিত হইল তখন তাঁহারা সকলেই সূর্য্যো-পস্থান' করিতে আরম্ভ করিলেন। অনন্তর বিদুর ও সঞ্জয় রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর নিমিত্ত কুশময় শয্যাদ্বয় প্রস্তুত করিলেন। যুধিষ্ঠিরজননী কুন্তী পরমসুখে গান্ধারীর সহিত এক শয্যায় শয়ান হইলেন। বিদুর প্রভৃতি অনুগামীগণ তাঁহাদিগের নিকটে এবং যাজক ব্রাহ্মণগণ যথাস্থানে শয়ন করিলেন। অনন্তর রজনী প্রভাত হইলে তাঁহারা সকলে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক অগ্নিতে আহুতি প্রদান ও পূর্ব্বাহুকৃত্যসমুদায় সমাপন করিয়া ক্রমাগত উত্তরা-ভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। প্রথম দিবস বনে অবস্থান করা তাঁহাদের পক্ষে সাতিশয় কষ্টজনক হইয়াছিল।

বেদব্যাসের নিকট ধৃতরাষ্ট্রের আরণ্যকদীক্ষা গ্রহণ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর তাঁহারা বহুক্ষণ উত্তরাভি-মুখে গমন করিয়া বিদুরের বাক্যানুসারে সেই পবিত্র ভাগীরথী-তীরে অবস্থান করিলেন। ঐ স্থানে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র প্রভৃতি বনবাসিগণ ধৃতরাষ্ট্রের নিকট সমুপস্থিত হইলেন। তখন অন্ধরাজ বিবিধ কথাপ্রসঙ্গে তাঁহাদিগের প্রীতিসাধন এবং শিষ্যসমবেত ব্রাহ্মণগণের পূজা করিয়া তাঁহাদিগকে বিদায় করিলেন। অনন্তর সন্ধ্যাসময় সমুপস্থিত হইলে, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র ও যশস্বিনী গান্ধারী গঙ্গায় অবগাহন করিলেন; তখন বিদুরাদি অন্যান্য অনুগামিগণও গঙ্গাস্নান করিয়া সন্ধ্যাবন্দনাদি ক্রিয়াসমুদায় সমাপন করিতে লাগিলেন। অনন্তর মহাত্মা ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর স্নানক্রিয়া সমাপন হইলে ভোজনন্দিনী কুন্তী তাঁহাদিগকে তীরে সমুপনীত করিলেন। ঐ সময় যাজকগণ অন্ধরাজের নিমিত্ত সেইস্থানে বেদী প্রস্তুত করিয়া দিলেন। নরপতি ধৃতরাষ্ট্র সেই বেদীতে উপবেশনপূর্ব্বক হুতাশনে আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন।

এইরূপে ক্রিয়াসমুদায় সমাপন হইলে অন্ধরাজ অনু-যাত্রিগণের সহিত সেই ভাগীরথীতীর হইতে কুরুক্ষেত্রে যাত্রা করিলেন। কুরুক্ষেত্রের আশ্রমে উপস্থিত হইবামাত্র রাজর্ষি শতযুপের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎকার হইল। ঐ মহাত্মা পূর্ব্বে কেকয়রাজ্যের সিংহাসনে অধিরূঢ় ছিলেন। তিনি পুত্রের প্রতি রাজ্যভার সমর্পণ করিয়া অরণ্যে প্রবেশ করেন। অন্ধরাজ তাঁহার সহিত মিলিত হইয়া বেদব্যাসের আশ্রমে গমন করিলেন এবং অবিলম্বে তাঁহার নিকট দীক্ষিত হইয়া প্রত্যাগমনপূর্ব্বক শতযুপের আশ্রমে অবস্থান করিতে লাগিলেন। মহামতি শতযূপ বেদব্যাসের আদেশানুসারে অন্ধরাজকে আরণ্যবিধি' সমুদায় উপদেশ প্রদান করিলেন। তখন মহাত্মা ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং তপঃ-পরায়ণ হইয়া অনুচরগণকে তপোনুষ্ঠান করিতে অনুমতি দিলেন। তপস্বিনী গান্ধারী ও ভোজনন্দিনী কুন্তী উভয়ে বল্কলাজিন ধারণপূর্ব্বক ইন্দ্রিয়সংযম করিয়া কায়মনোবাক্যে ঘোরতর তপোনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। অন্ধরাজ জটা, অজিন ও বল্কল ধারণপূর্ব্বক অস্থিচর্মাবশিষ্ট হইয়া মহর্ষির ন্যায় ঘোরতর তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হইলেন এবং পরমধার্মিক মহাত্মা সঞ্জয় ও বিদুর উভয়ে চীরবল্কল' ধারণপূর্ব্বক নরপতি ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সেবা ও ঘোরতর তপস্যা করিতে লাগিলেন।

ধৃতরাষ্ট্রের নিকটে দেবর্ষি নারদের রাজর্ষিগণের স্বর্গবাস বর্ণন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর নারদ, পর্ব্বত, দেবল, পরমধার্মিক রাজর্ষি শতযূপ এবং শিষ্যপরিবৃত মহর্ষি দ্বৈপায়ন ও অন্যান্য সিদ্ধগণ ইঁহারা সকলে অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্রের সহিত সাক্ষাৎ করিতে তাঁহার সমীপে সমাগত হইলেন। ভোজনন্দিনী কুন্তী তাঁহাদিগকে দর্শন করিবামাত্র যথানিয়মে তাঁহাদিগের পূজা করিলেন। তখন তাঁহারা তাঁহার পরিচর্য্যায় পরম পরিতুষ্ট হইয়া ধৃতরাষ্ট্রের চিত্তবিনোদনার্থ বিবিধ বিষয়ক কথোপকথন করিতে লাগিলেন।

ঐ সময় তত্ত্বদর্শী দেবর্ষি নারদ কথাপ্রসঙ্গে অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, রাজন! শতযূপের পিতামহ নির্ভীকচিত্ত নরপতি সহস্রচিত্ত কেকয়দেশের অধিপতি ছিলেন। তিনি বৃদ্ধাবস্থায় পরমধার্মিক স্বীয় জ্যেষ্ঠপুত্রের প্রতি রাজ্যভার সমর্পণ করিয়া বনপ্রবেশ করেন। তথায় ঘোরতর তপশ্চরণদ্বারা তাঁহার ইন্দ্রলোকলাভ হইয়াছে। আমি ইন্দ্রলোকে গমনাগমনসময়ে অনেকবার তাঁহাকে দেবেন্দ্রসদনে নিরীক্ষণ করিয়াছি। ভগদত্তের পিতামহ রাজা শৈলেয়ও তপোবলে ইন্দ্রলোকলাভ করিয়াছেন। ইন্দ্রপ্রতিম মহারাজ পৃষধ তপঃ-প্রভাবে স্বর্গারূঢ় হইয়াছেন। সরিদ্বরা নর্মদা যাঁহার সহধর্মিণী হইয়াছিলেন, সেই মান্ধাতৃতনয় নরপতি পুরুকুৎস এবং পরম-ধার্মিক রাজা শশলোমা, ইঁহারা উভয়ে এই তপোবনে তপোনুষ্ঠানপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়াছেন। এক্ষণে তুমিও এই তপোবনে তপোনুষ্ঠান কর; অচিরাৎ মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের প্রসাদবলে সিদ্ধিলাভ করিয়া অনায়াসে গান্ধারীর সহিত ঐ সকল মহাত্মার সালোক্য লাভে সমর্থ হইবে। ইন্দ্রলোকগত নর-পতি পাণ্ডু নিয়ত তোমার অনুধ্যান করিতেছেন। তিনি অবশ্যই তোমার মঙ্গলসাধন করিবেন। ভোজনন্দিনী কুন্তী তোমার ও যশস্বিনী গান্ধারীর শুশ্রূষানিবন্ধন নিশ্চয়ই স্বামীর সালোক্যলাভে সমর্থা হইবেন। মহাত্মা বিদুর' অচিরাৎ ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের প্রবেশ এবং মহামতি সঞ্জয় ইহলোক হইতে স্বর্গলোকে গমন করিবেন। আমি দিব্যচক্ষুঃপ্রভাবে এই সমুদায় বিষয় অবগত হইয়াছি।

ধৃতরাষ্ট্রের ভাবী স্বর্গলোকলাভের আনন্দ।

দেবর্ষি নারদ এই কথা কহিলে, কৌরবেন্দ্র ধৃতরাষ্ট্র পত্নীর সহিত যাহার-পর-নাই আহ্লাদিত হইয়া পরম সমাদরে তাঁহার পূজা করিলেন। ব্রাহ্মণগণও মহা আহ্লাদিত হইয়া দেবর্ষি নারদকে প্রশংসা করিতে লাগিলেন। ঐ সময় রাজর্ষি শতযূপ নারদকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দেবর্ষে! আপনার বাক্য শ্রবণে আপনার প্রতি আমার, কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্রের ও অত্রত্য অন্যান্য ব্যক্তিগণের শ্রদ্ধা পরিবর্দ্ধিত হইয়াছে। আপনি তত্ত্বদর্শী, মানবগণ যে যেরূপ গতিলাভ করিবে, আপনি দিব্যচক্ষুঃপ্রভাবে তৎসমুদায় অবলোকন করিতেছেন। আপনি অনেক নরপতির স্বর্গলোকলাভের বিষয় কীর্ত্তন করিলেন; কিন্তু কৌরবেন্দ্র ধৃতরাষ্ট্র কোন লোকে গমন করিবেন, তাহা কীর্ত্তন করেন নাই। এক্ষণে উনি কোন্ সময়ে কোন্ লোকে গমন করিবেন, তাহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত বাসনা হইতেছে, অতএব আপনি উহা কীর্ত্তন করুন।

রাজর্ষি শতযুপ এই কথা কহিলে, দিব্যদর্শী দেবর্ষি নারদ সেই সভামধ্যে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, রাজন! আমি একদা ইন্দ্রের সভায় সমুপস্থিত হইয়া তথায় পাণ্ডুরাজকে সমাসীন দেখিয়া আসন পরিগ্রহ করিলাম। অনন্তর ঐ সভামধ্যে কথাপ্রসঙ্গে রাজা ধৃতরাষ্ট্রের ঘোরতর তপস্যার কথা উত্থিত হইল। তখন আমি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের মুখে শুনিলাম যে, ধৃতরাষ্ট্রের আর তিন বৎসর পরমায়ুঃ আছে। তৎপরে তিনি গান্ধারীর সহিত দিব্য অলঙ্কারে বিভূষিত হইয়া দিব্য বিমানে আরোহণপূর্ব্বক কুবেরভবনে আগমন করিয়া স্বেচ্ছানুসারে দেবতা, গন্ধর্ব্ব ও রাক্ষসদিগের লোকে সঞ্চরণ করিবেন। হে শতযূপ! এই আমি তোমার জিজ্ঞাসানুসারে দেবগুহ্য বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিলাম। তুমি তপঃপ্রভাবে নিষ্পাপ হইয়াছ; এই নিমিত্তই আমি এই গূঢ় বিষয় তোমার নিকট প্রকাশ করিলাম।

দেবর্ষি এই কথা কহিলে, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও শতরূপ প্রভৃতি অন্যান্য ব্যক্তিগণ তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া একবারে আহ্লাদসাগরে নিমগ্ন হইলেন। এইরূপে নারদ প্রভৃতি মহর্ষিগণ বিবিধ কথাপ্রসঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রকে পরিতুষ্ট করিয়া সকলে স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।

পুরবাসীসহ যুধিষ্ঠিরাদির কুন্তী প্রভৃতির নিমিত্ত বিরহ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, এদিকে পাণ্ডবগণ কামিনী-সমভিব্যাহারে হস্তিনায় আগমনপূর্ব্বক জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র ও জননী কুম্ভীর বনবাসনিবন্ধন শোকে নিতান্ত কাতর হইয়া উঠিলেন। পৌরজনেরা অন্ধরাজের নিমিত্ত সতত অনুতাপ করিতে লাগিল। ঐ সময় হস্তিনার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা' সকলেই শোকাকুল হইয়া পরস্পরকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিতে লাগিল, হায়! পুত্রশোকার্ত বৃদ্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র এবং মনস্বিনী' গান্ধারী ও কুন্তী কিরূপে দুর্গম অরণ্যে বাস করিতেছেন? পূর্ব্বে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রকে কখন অসুখের লেশমাত্র সহ্য করিতে হয় নাই। পাণ্ডবজননী কুন্তী রাজশ্রী ও পুত্রস্নেহ পরিত্যাগ করিয়া অরণ্যে অবস্থানপূর্ব্বক অতিকষ্টে কালহরণ করিতেছেন এবং অন্ধ-রাজের শুশ্রূষায় অনুরক্ত মহাত্মা বিদুর ও সঞ্জয়কেও বিষম যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইতেছে।

পুরবাসী লোকসমুদায় এইরূপে নানাপ্রকার বিলাপ করিতে আরম্ভ করিলে, পাণ্ডবগণ পুত্রবিহীন বৃদ্ধ অন্ধরাজ, জননী কুন্তী ও গান্ধারী এবং মহাত্মা বিদুরের শোকে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর কাতর হইয়া কিছুতেই অধিক দিন পুরোমধ্যে বাস করিতে সমর্থ হইলেন না। ঐ সময় কি রাজ্যসম্ভোগ, কি স্ত্রীসংসর্গ, কি বেদাধ্যয়ন, কিছুতেই তাঁহাদের প্রীতিলাভ হইল না; তাঁহারা বারংবার অন্ধরাজের বনবাস, জ্ঞাতিবধ এবং বালক অভিমন্যু, মহাত্মা কর্ণ, দ্রৌপদীতনয়গণ ও সুহৃদ্গণের নিধনবৃত্তান্ত স্মরণ করিয়া নিতান্ত বিষণ্ণ হইতে লাগিলেন। সর্ব্বদা পৃথিবীকে বীরশূন্যা ও ধনশূন্যা বলিয়া বিবেচনা হওয়াতে কোনররূপেই তাঁহাদিগের শান্তিলাভ হইল না। পুত্রশোকসন্তপ্তা দ্রৌপদী ও সুভদ্রাও নিতান্ত দুঃখিতা হইয়া বিষণ্ণবদনে কালহরণ করিতে লাগিলেন। ফলতঃ তৎকালে উহারা সকলেই কেবল উত্তরার গর্ভ সম্ভূত মহাত্মা পরীক্ষিতকে দর্শন করিয়া প্রাণধারণ করিয়াছিলেন।

মাতা কুন্তী ও ধৃতরাষ্ট্রদিগের দর্শনে যুধিষ্ঠিরের উদ্যোগ।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাত্মা পাণ্ডবগণ এইরূপে মাতা ও জ্যেষ্ঠতাত প্রভৃতির বিরহে নিতান্ত অভিভূত হইয়া পূর্ব্ববৎ রাজকার্য্যে অনুষ্ঠানে এককালে বিরত হইলেন। ঐ সময় কোন বিষয়েই আর তাঁহাদিগের আমোদ রহিল না। তাঁহারা সততই শোকাবিষ্টের ন্যায় কালযাপন করিলেন। ফলতঃ উহারা গাম্ভীর্য্যে সাগরতুল্য হইয়াও তৎকালে শোকে একবারে হতজ্ঞান হইয়া পড়িলেন। তখন তাঁহারা পরস্পর পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিপাত-পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, হায়! আমাদের জননী নিতান্ত কৃশাঙ্গী। তিনি কিরূপে অন্ধরাজ ও গান্ধারীর শুশ্রূষা করিতেছেন? পুত্রবিহীন অন্ধরাজ কিরূপে সেই শ্বাপদসঙ্কুল' বিজন' বিপিনে' কালহরণ করিতেছেন এবং হতবান্ধবা জননী গান্ধারীই বা কিরূপে সেই দুর্গম বনে বৃদ্ধ অন্ধ পতির শুশ্রূষায় নিরতা রহিয়াছেন?

পাণ্ডবগণ এইরূপে কিয়ৎক্ষণ আক্ষেপ করিয়া অন্ধ-রাজকে দর্শন করিবার নিমিত্ত নিতান্ত সমুৎসুক হইলেন। তখন মহাত্মা সহদেব ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে প্রণিপাতপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! আপনি অন্ধরাজকে দর্শন করিতে বাসনা করিয়াছেন, ইহাতে আমার পরম পরিতোষ লাভ হইল। উঁহাকে দর্শন করিবার বাসনা আমার মনোমধ্যে নিরন্তর জাগরূক' রহিয়াছে। আমি কেবল আপনার গৌরবনিবন্ধন আপনার নিকট উহা প্রকাশ করিতে সমর্থ হই নাই। হায়! পূর্ব্বে যে মাতা রমণীয় অট্টালিকায় অবস্থানপূর্ব্বক পরমসুখে কালহরণ করিয়াছিলেন, এক্ষণে তিনি কিরূপে মস্তকে জটাধারণ ও কুশশয্যায় শয়ন করিয়া তপস্বিনীর বেশে অরণ্যে অবস্থান করিতেছেন। আমার কি কখন এমন সৌভাগ্য উপস্থিত হইবে যে, আমি তাঁহার সাক্ষাৎকার লাভ করিতে পারিব? যখন রাজপুত্রী হইয়াও অরণ্যে মাতাকে ক্লেশভোগ করিতে হইতেছে, তখন নিশ্চয় বুঝিলাম, ইহলোকে কেহই চিরকাল একরূপ অবস্থায় কালহরণ করিতে সমর্থ হয় না।

সহদেব এই কথা কহিলে, মহানুভবা দ্রৌপদী বিনয়বাক্যে ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! কখন আমি শ্বশ্রুকে দর্শন করিব? তাঁহাকে জীবিত দর্শন করিলেই আমার জীবন সার্থক হইবে। আপনার বুদ্ধি ও মনঃ ধৰ্ম্ম হইতে যেন কখন বিচলিত না হয়। আজি আপনার প্রসাদে আমাদিগের পরম শ্রেয়োলাভ হইবে। আমি শ্বশুর অন্ধরাজ এবং জননী গান্ধারী ও কুন্তীকে দর্শন করিবার নিমিত্ত প্রস্তুত হইয়া রহিয়াছি।

মহানুভবা দ্রৌপদী এই কথা কহিলে, ধৰ্ম্মরাজ সেনাপতি-দিগকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, হে সৈন্যাধ্যক্ষগণ! তোমরা অবিলম্বে হস্তী, অশ্ব ও রথসমুদায় সজ্জিত কর। সৈন্যগণও সুসজ্জিত হইয়া অগ্রসর হউক। আমি অচিরাৎ অন্ধরাজকে দর্শন করিবার নিমিত্ত অরণ্যে যাত্রা করিব।

মহারাজ যুধিষ্ঠির সৈন্যাধ্যক্ষগণকে এই কথা কহিয়া, অন্তঃপুরের অধ্যক্ষদিগকে কহিলেন, তোমরা সত্ত্বর বিবিধ যান, শিবিকা, শকট ও আপণ সমুদায় সুসজ্জিত কর। শিল্পকর ও কোষাধ্যক্ষেরা কুরুক্ষেত্রের আশ্রমাভিমুখে যাত্রা করুন। পুরবাসী যে কোন ব্যক্তি অন্ধরাজকে দর্শন করিতে বাসনা করেন, তিনি যেন অক্লেশে সুরক্ষিত হইয়া তথায় গমন করিতে' পারেন'। এক্ষণে তোমরা পাচক ও অন্যান্য লোকসমুদায়কে যাত্রা করিতে আদেশ করিয়া ভক্ষ্যভোজ্যসমুদায় শকটে সংস্থাপনপূর্ব্বক অন্ধরাজের আশ্রমাভিমুখে প্রেরণ কর এবং আমরা কল্য প্রভাতে যাত্রা করিব, এই কথা নগরের সর্ব্বত্র ঘোষণা করিয়া দেও। আজিই যেন পথিমধ্যে আমাদের বাসগৃহসমুদায় প্রস্তুত করা হয়। ধর্মরাজ ভ্রাতৃগণের সহিত অধ্যক্ষদিগকে এইরূপে আদেশ করিয়া সেই দিবস পুরোমধ্যে অবস্থান করিলেন। পরদিন প্রভাত হইবামাত্র তিনি গাত্রোত্থানপূর্ব্বক বৃদ্ধ ও অন্তঃপুরিকাদিগকে অগ্রসর করিয়া ভ্রাতৃগণের সহিত পুর হইতে বহির্গত হইলেন এবং লোকসংগ্রহ' করিবার নিমিত্ত সেই দিন অবধি পাঁচ দিন পুরের বহির্ভাগে অবস্থান করিতে লাগিলেন।

যুধিষ্ঠিরের সপরিবারে ধৃতরাষ্ট্র দর্শনার্থ যাত্রা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ষষ্ঠ দিবস উপস্থিত হইলে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির লোকপালসদৃশ অর্জুন প্রভৃতি ভ্রাতৃগণকর্তৃক সুরক্ষিত সৈন্যদিগকে বনগমন করিতে আদেশ করিবামাত্র সৈন্যগণমধ্যে "অশ্বযোজনা কর, রথযোজনা কর”, এইরূপ ঘোরতর কোলাহল শব্দ সমুত্থিত হইল। অনন্তর ধৃতরাষ্ট্রের দর্শনাকাঙ্ক্ষী পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকসমুদায় কেহ কেহ অশ্বে, কেহ কেহ হস্তিপৃষ্ঠে ও কেহ কেহ উষ্ট্রে আরোহণ করিয়া অরণ্যাভিমুখে গমন করিতে লাগিল এবং অনেকে পাদচারেই ধাবমান হইল।

মহাবীর যুযুৎসু ও পুরোহিত ধৌম্য ধর্মরাজের আজ্ঞা-নুসারে আশ্রমগমনে ক্ষান্ত হইয়া পুররক্ষায় নিযুক্ত হইলেন। দ্বিজবর কৃপাচার্য্য যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে সৈন্যসমভিব্যাহারে যাত্রা করিলেন। ঐ সময় রাজা যুধিষ্ঠির রথারোহণপূর্ব্বক ব্রাহ্মণগণে পরিবেষ্টিত হইয়া আশ্রমাভিমুখে যাত্রা করিলে ভৃত্যগণ তাঁহার মস্তকে শ্বেতচ্ছত্র ধারণ করিল। সূত, মাগধ ও বন্দিগণ তাঁহার স্তবপাঠ করিতে লাগিল এবং অসংখ্য রথারোহী সৈন্য তাঁহার সমভিব্যাহারে ধাবমান হইল।

ভীমকৰ্ম্মা ভীমসেন অস্ত্রশস্ত্রগ্রহণপূর্ব্বক পর্ব্বাতাকার হস্তীতে আরোহণ করিয়া বহুসংখ্যক গজারোহী সৈন্যসমভি-ব্যাহারে আশ্রমাভিমুখে যাত্রা করিলেন। মহাবীর অর্জুন শ্বেতাশ্ব-সংযুক্ত অনলসঙ্কাশ দিব্যরথে আরোহণ করিয়া যুধিষ্ঠিরের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। মাদ্রীতনয় নকুল ও সহদেব উভয়ে দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ করিয়া ধর্মরাজের অনুগমনে প্রবৃত্ত হইলেন এবং দ্রৌপদী প্রভৃতি কুলকামিনীগণ অন্তঃপুরাধ্যক্ষ ব্যক্তিগণকর্তৃক পরিরক্ষিত হইয়া শিবিকায় আরোহণপূর্ব্বক অপরিমিত ধনদান করিতে করিতে গমন করিতে লাগিলেন।

তৎকালে সেই বীণাবেণুনিনাদযুক্ত' হস্ত্যশ্বরথসঙ্কুল পাণ্ডবসৈন্যর শোভার আর পরিসীমা রহিল না। পাণ্ডবগণ সেই সৈন্যসমভিব্যাহারে রমণীয় নদীতীর ও সরোবরসমীপে বাস' করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। অনন্তর তাঁহারা ক্রমে ক্রমে কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া পবিত্রতোয়া যমুনানদী অতিক্রমপূর্ব্বক দূর হইতে রাজর্ষি ধৃতরাষ্ট্র ও শতযূপের আশ্রম দর্শন করিলেন। ঐ আশ্রমদ্বয় দর্শনে তাঁহাদের ও তাঁহাদের সমভিব্যাহারী ব্যক্তিগণের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। তখন তাঁহারা সকলেই মহা কোলাহল করিতে করিতে সেই তপোবনে প্রবেশ করিতে লাগিলেন।

যুধিষ্ঠিরাদির সহিত ধৃতরাষ্ট্রের সাক্ষাৎকার।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর পাণ্ডবগণ ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রমের অনতিদূরে রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া বিনীতভাবে পাদচারে সেই আশ্রমে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন তাঁহাদের সৈন্য, পুরবাসী ও অন্তঃপুরবাসিগণ সকলেই যান পরিত্যাগপূর্ব্বক পাদচারে গমন করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে পাণ্ডবগণ অন্ধরাজের সেই মৃগসমাকীর্ণ কদলীবন-সুশোভিত আশ্রমে সমুপস্থিত হইলেন। ঐ স্থানে নিয়তব্রত তাপসগণ মহাকৌতূহলাক্রান্ত হইয়া তাঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আগমন করিলেন। নরপতি যুধিষ্ঠির তাঁহাদিগকে অবলোকন করিয়া বাষ্পাকুললোচনে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে তাপসগণ! এক্ষণে সেই কৌরববংশধর আমাদিগের জ্যেষ্ঠতাত কোথায়? তখন তাপসগণ কহিলেন, মহারাজ! এক্ষণে তিনি যমুনায় অবগাহন, পুষ্পচয়ন ও জল আনয়নের নিমিত্ত গমন করিয়াছেন। আপনারা এই পথে গমন করুন।

তাপসগণ এই কথা কহিলে, পাণ্ডবগণ তাঁহাদের প্রদর্শিত পথে ধাবমান হইয়া দূর হইতে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, কুন্তী ও সঞ্জয়কে দর্শনপূর্ব্বক সত্বর গমন করিতে লাগিলেন। সহদেব কুস্তীকে অবলোকন করিবামাত্র মহাবেগে ধাবমান হইয়া তারস্বরে রোদন করিতে করিতে তাঁহার চরণে নিপতিত হইলেন। ভোজনন্দিনী কুন্তীও সেই প্রিয়পুত্রকে অবলোকন করিবামাত্র বাষ্পাকুলনয়নে আলিঙ্গনপূর্ব্বক তাঁহাকে উত্থাপিত করিয়া গান্ধারীকে কহিলেন, মাতঃ! সহদেব আসিয়াছে। তৎপরে, তিনি যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জুন ও নকুলকে দর্শন করিয়া দ্রুতপদে তাঁহাদিগের নিকট গমন করিতে লাগিলেন। তখন পাণ্ডবগণ জননীকে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে আকর্ষণ পূর্ব্বক সত্বর আগমন করিতে দেখিয়া অচিরাৎ তাঁহার সমীপে গমন-পূর্ব্বক তাঁহার চরণে নিপতিত হইলেন।

ঐ সময় অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র কণ্ঠস্বর ও স্পর্শদ্বারা পাণ্ডব-গণকে অবগত হইয়া আশ্বাস প্রদান করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহারা অশ্রুমোচনপূর্ব্বক কৌরবেন্দ্র ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও স্বীয় মাতা কুন্তীর নিকট যথোচিত বিনয় প্রদর্শন করিয়া তাঁহাদের বারিপূরিত কলসসমুদায় গ্রহণ করিলেন। ঐ সময় কৌরবকুল-কামিনী ও অন্যান্য কুলরমণীগণ এবং পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকসমুদায় একদৃষ্টে অন্ধরাজকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। তখন রাজা যুধিষ্ঠির নাম ও গোেত্র উল্লেখপূর্ব্বক সমুদায় লোকের পরিচয় প্রদান করিলেন। অন্ধরাজ সেই সমুদায় লোকের পরিচয় প্রাপ্ত হইয়া, তাঁহাদের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শনপূর্ব্বক সেই আত্মীয়বর্গে পরিবেষ্টিত হইয়া আপনাকে হস্তিনানগরস্থিত বলিয়া বোধ করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি তারাগণসমাকীর্ণ নভোমণ্ডলের ন্যায় সিদ্ধচারণসেবিত দর্শকগণ-সমাকীর্ণ স্বীয় আশ্রমে প্রতিগমন করিলেন।

সঞ্জয়কর্তৃক ঋষিগণকে যুধিষ্ঠিরাদির পরিচয় প্রদান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মহাবল পরাক্রান্ত ভ্রাতৃগণে পরিবেষ্টিত হইয়া জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রমে উপবিষ্ট হইলে, নানাদেশনিবাসী মহর্ষিগণ তাঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত তথায় সমুপস্থিত হইয়া অন্ধরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ। আপনার আশ্রমে যে সমুদায় স্ত্রী-পুরুষ অবস্থান করিতেছেন, ইঁহাদিগের মধ্যে কাহার নাম যুধিষ্ঠির, কাহার নাম ভীমসেন, কাহার নাম অর্জুন, কাহার নাম নকুল, কাহার নাম সহদেব ও কাহার নাম দ্রৌপদী; ইহা পরিজ্ঞাত হইতে আমাদিগের নিতান্ত বাসনা হইতেছে।

মহর্ষিগণ এই কথা কহিলে, মহাত্মা সঞ্জয় পাণ্ডবগণ, দ্রৌপদী ও অন্যান্য কৌরবরমণীদিগের পরিচয়প্রদানার্থ তাঁহা-দিগকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন, মহর্ষিগণ! ঐ যে সুবর্ণের ন্যায় গৌরবর্ণ, দীর্ঘনেত্র মহাত্মা সিংহের ন্যায় উপবেশন করিয়া রহিয়াছেন, উঁহার নাম যুধিষ্ঠির। ঐ যে মত্তগজেন্দ্রগামী, তপ্তকাঞ্চবর্ণ, দীর্ঘবাহু, মহাবল পরাক্রান্ত বীরপুরুষ অবস্থান করিতেছেন, উঁহার নাম বৃকোদর। ঐ মহাবীরের পার্শ্বে যে শ্যামবর্ণ মহাধনুর্দ্ধর মহাবীর উপবিষ্ট রহিয়াছেন, উঁহার নাম অর্জুন এবং ঐ কুন্তীর সন্নিধানে বিষ্ণু ও ইন্দ্রের ন্যায় যে যুবকদ্বয় অবস্থান করিতেছেন, উঁহাদিগের নাম নকুল ও সহদেব। ঐ দুই বীরপুরুষের তুল্য পরমসুন্দর, বলবান্ ও সচ্চরিত্র আর কেহই নাই। ঐ যে পদ্মপলাশাক্ষী, শ্যামলবর্ণা পরমাসুন্দরী রমণী উপবিষ্টা রহিয়াছেন, উঁহার নাম দ্রৌপদী। উহার পার্শ্বে চন্দ্রপ্রভার ন্যায় গৌরবর্ণা, পরমরূপবতী বাসুদেব-ভগিনী সুভদ্রা অবস্থান করিতেছেন। ঐ যে তপ্তকাঞ্চনের ন্যায় গৌরাঙ্গী পরমসুন্দরী কামিনী উপবিষ্টা রহিয়াছেন, উনি অর্জুনের ভার্য্যা চিত্রাঙ্গদা, উহার অনতিদূরে যে নীলোৎপলবর্ণা রমণী অবস্থান করিতেছেন, উনিই ভীমসেনের কলত্র; উহার নাম কালী। ঐ যে চম্পকদামের ন্যায় গৌরবর্ণা রূপবতী রমণী লক্ষিতা হইতেছেন, উনিই মহারাজ জরাসন্ধের দুহিতা; মাদ্রীর কনিষ্ঠ পুত্র সহদেব উহার পাণি গ্রহণ করিয়াছেন। উঁহার অনতিদূরে মাদ্রীর জ্যেষ্ঠপুত্র নকুলের ভার্য্যা অবস্থান করিতেছেন; ইঁহার নাম করেণুমতী। ঐ যে পরমাসুন্দরী রমণী বালক পুত্রকে ক্রোড়ে করিয়া অবস্থান করিতেছেন, উনি অভিমন্যুর ভার্য্যা বিরাটনন্দিনী উত্তরা। পূর্ব্বে দ্রোণ প্রভৃতি সপ্তরথী উঁহারই ভর্তাকে অন্যায়যুদ্ধে নিহত করিয়াছেন। আর ঐ যে শুক্লাম্বর-ধারিণী সধবাচিহ্ন-বিবর্জিতা রমণীগণকে দর্শন করিতেছেন, উহারা এই বৃদ্ধ অন্ধরাজের পুত্রবধূ। উঁহাদের পতি-পুত্রগণ কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে নিহত হইয়াছেন।

তপোধনগণ! এই আমি আপনাদিগের নিকট সবিস্তর ইহাদিগের পরিচয় প্রদান করিলাম। মহামতি সঞ্জয় এই কথা কহিলে, তাপসগণ স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন এবং পাণ্ডবগণের সৈন্যসমুদায় বাহন পরিত্যাগপূর্ব্বক আশ্রমের অবিদূরে' উপ-বেশন করিল।

যুধিষ্ঠির ও ধৃতরাষ্ট্র উভয়ের কুশল বিনিময়।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর অন্ধরাজ একে একে সকলের কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করিয়া ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস! তুমি ত ভ্রাতৃগণ ও পুরবাসী-দিগের সহিত কুশলে অবস্থান করিতেছ? তোমার অনুজীবী, প্রজা, মন্ত্রী, ভৃত্য ও গুরুজনদিগের ত কোন অমঙ্গল হয় নাই? তাঁহারা ত নির্ভয়ে তোমার অধিকারমধ্যে বাস করিতেছেন? তুমি ত পূর্ব্বতন ভূপতিদিগের পদ্ধতি আশ্রয় করিয়াছ? অন্যায়লব্ধ ধনদ্বারা ততোমার কোষ পরিপূরিত হয় নাই? তুমি ত কি শত্রু, কি মিত্র, কি উদাসীন সকলের সহিত সমান ব্যবহার করিয়া থাক? ব্রাহ্মণগণ ত তোমার নিকট যথাবিধি দান গ্রহণ করিয়া পরিতুষ্ট হন? কি শত্রু, কি পৌরবর্গ, কি ভৃত্য, কি আত্মীয়-স্বজন সকলেই ত তোমার চরিত্রদর্শনে প্রীত হইয়া থাকে? তুমি ত শ্রদ্ধান্বিত হইয়া সর্ব্বদা পিতৃলোক, দেবতা ও অতিথিদিগের অর্চ্চনা করিয়া থাক? তোমার অধিকারস্থ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রগণ ত স্ব স্ব ধর্মে নিরত রহিয়াছেন? তোমার রাজ্যে বালক, বৃদ্ধ ও বনিতাগণকে ত অর্থের নিমিত্ত লালায়িত ও শোকাকুল হইতে হয় না? তোমার গৃহে কুলস্ত্রীগণ ত যথোচিত সৎকৃত হইয়া থাকেন? আর তোমার রাজ্যাধিকার লাভ হওয়াতে আমাদের নিষ্কলঙ্ক রাজবংশের ত যশোহানি হয় নাই?

নীতিবিশারদ অন্ধরাজ এই কথা কহিলে বাক্যবিশারদ ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! আপনার প্রসাদে আমার সমুদায় বিষয়েই মঙ্গললাভ হইয়াছে। এক্ষণে আপনার তপস্যা ও শমদমাদিগুণ ত পরিবর্দ্ধিত হইতেছে? আমার জননী কুন্তী ত আপনার শুশ্রূযায় অনুরক্তা হইয়া বনবাসক্লেশ সফল করিতে পারিবেন? শীতবাতবিশীর্ণা তপঃপরায়ণা জননী গান্ধারী ত পুত্রশোকে কাতরা হইয়া আমাদিগকে অপরাধী জ্ঞান করেন না? মহাত্মা সঞ্জয় ত বুশলে তপোনুষ্ঠান করিতেছেন? এক্ষণে মহাত্মা বিদুর কোথায়? তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আমাদের নিতান্ত ঔৎসুক্য হইতেছে।

ধর্মরাজ এই কথা কহিলে, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস। তোমার পিতৃব্য অগাধবুদ্ধি বিদুর অনাহারে অস্থিচর্মাবশিষ্ট হইয়া ঘোরতর তপোনুষ্ঠান করিতেছেন। ব্রাহ্মণগণ কখন কখন তাঁহাকে এই কাননের অতি নির্জন প্রদেশে দর্শন করিয়া থাকেন।

যুধিষ্ঠিরের দেহে বিদুরের সূক্ষ্মভাবে প্রবেশ।

অন্ধরাজ এই কথা কহিতেছেন, এমন সময়ে মলদিগ্ধাঙ্গ' জটাধারী দিগম্বর' মহাত্মা বিদুর সেই আশ্রমের অতিদূরে লক্ষিত হইলেন। ঐ মহাত্মা একবার আশ্রম দর্শন করিয়াই সহসা প্রস্থান করিলেন। ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির সেই ব্যাপার দর্শন করিবামাত্র সত্বর একাকীই তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। তখন মহাত্মা বিদুর ক্রমে ক্রমে নিবিড় অরণ্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। ধর্মরাজ তদ্দর্শনে "হে মহাত্মন্! আমি আপনার প্রিয় যুধিষ্ঠির; আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত আগমন করিয়াছি" বলিয়া মহাবেগে তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন।

অনন্তর অগাধবুদ্ধি মহাত্মা বিদুর সেই বিজন বিপিনে এক বৃক্ষ অবলম্বন করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। তখন ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির সেই অস্থিচৰ্ম্মবিশিষ্ট মহাত্মা ক্ষত্তার নিকট সমুপস্থিত হইয়া "মহাশয়! আমি আপনার প্রিয়তম যুধিষ্ঠির, আপনার সহিত সাক্ষাৎকার করিতে আগমন করিয়াছি” বলিয়া তাঁহার অগ্রে দণ্ডায়মান হইলেন।

মহাত্মা বিদুর ধর্মরাজকে সেই নির্জন প্রদেশে দণ্ডায়মান দেখিয়া যোগবলে তাঁহার দৃষ্টিতে দৃষ্টি, গাত্রে গাত্র, প্রাণে প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ে ইন্দ্রিয়সমুদায় সংযোজিত করিয়া তাঁহার দেহমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। তখন তাঁহার শরীর স্তব্ধলোচন' ও বিচেতন হইয়া বৃক্ষ অবলম্বন করিয়াই রহিল। ঐ সময় ধৰ্ম্মরাজ আপনাকে পূর্ব্বাপেক্ষা সমধিক বলশালী বোধ করিতে লাগিলেন। তখন বেদব্যাস-কথিত স্বীয় পুরাতন বৃত্তান্তসমুদায় তাঁহার স্মৃতিপথে আরূঢ় হইল।

যুধিষ্ঠিরের প্রতি বিদুর-বিষয়ক দৈববাণী।

অনন্তর তিনি বিদুরের দেহ দগ্ধ করিতে উদ্যত হইলে এই দৈববাণী তাঁহার কর্ণগোচর হইল যে, "মহারাজ। মহাত্মা বিদুর যতিধৰ্ম্ম লাভ করিয়াছেন; অতএব আপনি উঁহার দেহ দগ্ধ করিবে না। উনি সপ্তানিক নামক লোকসমুদায় লাভ করিতে পারিবেন। উহার নিমিত্ত শোক করা আপনার কদাপি বিধেয় নহে।"

ধর্মরাজ এইরূপ দৈববাণী শ্রবণ করিয়া বিদুরের দেহ দগ্ধ করিবার অভিলাষ পরিত্যাগপূর্ব্বক অন্ধরাজের আশ্রমে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া তাঁহার নিকট সমুদায় বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। তখন সেই আশ্চর্য্য ব্যাপার শ্রবণে ভীমসেন প্রভৃতি পাণ্ডবগণ ও অন্যান্য লোকসমুদায়ের বিস্ময়ের পরিসীমা রহিল না। অন্ধরাজ সেই অদ্ভুত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস! তুমি আমার প্রদত্ত জল ও ফলমূল গ্রহণ কর। মনুষ্য যখন যে অবস্থায় অবস্থান করে, তখন তাহাকে সেই অবস্থানুরূপ অতিথিসৎকার করিতে হয়।

অন্ধরাজ এই কথা কহিলে, ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির তাঁহার বাক্যে অঙ্গীকার করিয়া ভ্রাতৃগণ ও অন্যান্য আনুযাত্রিকদিগের সহিত তাঁহার প্রদত্ত ফলমূল ভোজন ও জলপানপূর্ব্বক সে রাত্রি বৃক্ষমূলে অতিবাহিত করিলেন। ঐ রজনীতে আশ্রম-বাসীদিগের সহিত পাণ্ডব গণের শাস্ত্রবিষয়ক বিবিধ কথোপ-কথন হইয়াছিল। তাঁহারা মহামূল্য শয্যা পরিত্যাগপূর্ব্বক জননীর চতুর্দিকে ধরাশয্যায় শয়ন এবং ধৃতরাষ্ট্রের ন্যায় ফলমূলাদি দ্বারা আহারকার্য্য সম্পাদন করিয়াছিলেন।

যুধিষ্ঠিরাদির আশ্রমভ্রমণ ও তাপসদিগকে দ্রব্যদান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর শব্বরী প্রভাত হইলে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পূর্বাহ্ণকৃত্যসমুদায় সমাপন করিয়া জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞানুসারে অন্তঃপুরকামিনী, ভৃত্য, পুরোহিত ও ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে আশ্রমসমুদায় অবলোকনে অভিলাষী হইয়া ইতস্ততঃ পৰ্য্যটন করিতে করিতে দেখিলেন, মুনিগণ স্নানাহ্নিক-ক্রিয়া সমাপনপূর্ব্বক বেদীমধ্যে অগ্নি প্রজালিত করিয়া আহুতি প্রদান করিতেছেন। বেদীসমুদায় বানেয়' পুষ্প, ফল, মূল ও আজ্য'ধূমে পরিপূর্ণ হইয়াছে। মৃগগণ অশঙ্কিতচিত্তে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করিতেছে। ব্রাহ্মণগণের বেদাধ্যয়ন শব্দ, ময়ূরদিগের কেকারব, দাত্যূহ দিগের কলরব, কোকিলগণের কুহুরব ও অন্যান্য পক্ষিগণের শ্রুতিসুখকর সুমধুর নিস্বনে আশ্রমমণ্ডল পরিপূর্ণ হইয়াছে। তখন রাজা যুধিষ্ঠির তাপসগণের নিমিত্ত সমানীত কাঞ্চনময় কলস, উডুম্বর, অজিন, মাল্য, ব্রুক্, ধ্রুব, কমণ্ডলু, স্থালী, লৌহপাত্র ও অন্যান্য নানাবিধ পাত্রসমুদায় তাঁহাদিগকে অর্পণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় যে তাপস যাহা প্রার্থনা করিলেন, ধৰ্ম্মরাজ তাঁহাকে তাহাই প্রদান করিলেন।

এইরূপে রাজা যুধিষ্ঠির আশ্রমের চতুৰ্দ্দিক্ পরিভ্রমণ-পূর্ব্বক বহুতর ধনদান করিয়া পুনরায় ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রমে সমাগত হইয়া দেখিলেন, অন্ধরাজ স্নানাহ্নিকক্রিয়া সমাপন করিয়া গান্ধারীর সহিত একত্র সমাসীন রহিয়াছেন। মনস্বিনী কুন্তী শিষ্যার ন্যায় অতি বিনীতভাবে তাঁহাদিগের অনতিদূরে অবস্থান করিতেছেন। তখন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভীমসেনাদি ভ্রাতৃগণ ও অন্যান্য পরিবারবর্গের সহিত ধৃতরাষ্ট্রের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অভিবাদনপূর্ব্বক তাঁহার আদেশানুসারে কুশাসনে সমাসীন হইলেন। কৌরবেন্দ্র ধৃতরাষ্ট্র সেই আত্মীয়-পরিবারবর্গে পরিবেষ্টিত হইয়া দেবগণসমাবৃত বৃহস্পতির ন্যায় অতি মনোহর শোভা ধারণ করিলেন।

অনন্তর শতযূপ প্রভৃতি কুরুক্ষেত্রনিবাসী ঋষিগণ এবং শিষ্যসমবেত ভগবান্ বেদব্যাস তথায় সমুপস্থিত হইলেন। উঁহারা উপস্থিত হইবামাত্র রাজা ধৃতরাষ্ট্র, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ও ভীমসেনাদি সকলে গাত্রোত্থান করিয়া উঁহাদের অভিবাদন করিলেন। তখন বেদব্যাস ধৃতরাষ্ট্রকে আসন পরিগ্রহ করিতে আদেশপূর্ব্বক সমাগত ব্রাহ্মণগণকে কুশাসনে উপবেশন করাইয়া স্বয়ং উপবেশন করিলেন।

ব্যাসদেবকর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রকে তপস্যা-বিষয়ক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর পাণ্ডবগণ কুশাসনে সমাসীন হইলে, মহর্ষি বেদব্যাস ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, রাজন! এক্ষণে ত নির্বিঘ্নে তোমার তপোনুষ্ঠান হইতেছে? এখন ত তুমি বনবাসের সুখ অনুভব করিতেছ? আর ত এখন তোমার হৃদয়ে পুত্রশোক নাই? তোমার অন্তঃ-করণে জ্ঞানসমুদায় ত নির্মূলরূপে স্ফূর্ত্তি পাইতেছে? তুমি ত দৃঢ়তর অধ্যবসায়সহকারে অরণ্য-বিধির অনুষ্ঠান করিতেছ? ধর্মার্থ তত্ত্বদর্শিনী দুর্য্যোধন-জননী গান্ধারী ত আর শোকে অভিভূত হন না? যিনি গুরুজনের শুশ্রূষার নিমিত্ত পুত্রগণকে পরিত্যাগ করিয়াছেন, সেই দেবী কুন্তী ত অহঙ্কারপরিশূন্যা হইয়া তোমাদিগের শুশ্রূষা করিতেছেন? তুমি ত ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জুন, নকুল ও সহদেবকে সান্ত্বনা 'করিয়াছ? ইঁহাদিগের আগমনে তোমার মনঃ ত আহ্লাদিত হইতেছ? আর ত তোমার মনের মালিন্য নাই? এখন ত তুমি জ্ঞানলাভ করিয়া বিশুদ্ধভাব অবলম্বন করিয়াছ? নির্ব্বৈর, সত্য ও অক্রোধ, এই তিনটি সমুদায় প্রাণীর পক্ষেই হিতকর। তোমার ত ঐ তিনগুণের কোন ব্যাঘাত হয় নাই? এখন ত আর তোমার বনবাসজন্য কোন কষ্ট উপস্থিত হয় না? বন্য ফলমূল আহার ও উপবাস করা ত সহ্য হইতেছে?

সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মস্বরূপ মহাত্মা বিদুর যেরূপে ধর্মরাজের শরীরে প্রবেশ করিয়াছেন, তাহা তুমি অবগত হইয়াছ। মহাত্মা ধর্মই মাণ্ডব্যশাপে নরকলেবর ধারণপূর্ব্বক বিদুররূপে জন্ম-পরিগ্রহ করিয়াছেন। দেবগণমধ্যে বৃহস্পতি ও অসুরগণমধ্যে শুক্রাচার্য্য যেরূপ বুদ্ধিসম্পন্ন, তোমাদের মধ্যে মহাত্মা বিদুরও তদ্রূপ প্রতিভাসম্পন্ন ছিলেন। মহর্ষি মাণ্ডব্য চিরসঞ্চিত তপোবল নষ্ট করিয়া ধর্মকে শাপে অভিভূত করাতেই ঐ মহাত্মার জন্ম হয়। আমি পূর্ব্বে ব্রহ্মার আদেশানুসারে বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে উহাকে উৎপন্ন করিয়াছিলাম। ঐ মহামতি তোমার ভ্রাতা। উহার অসাধারণ ধ্যান ও মনের ধারণানিবন্ধন কবিগণ উঁহাকে ধৰ্ম্ম বলিয়া কীর্ত্তন করেন। উনি সত্য, শান্তি, অহিংসা, দান ও দমগুণদ্বারা বিখ্যাত হইয়াছেন। ঐ অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন মহাত্মা ধর্ম যোগবলে কুরুরাজ যুধিষ্ঠিরকে উৎপাদন করিয়াছেন।। অগ্নি, জল, বায়ু, আকাশ ও পৃথিবী যেমন ইহলোকে ও পরলোকে বিদ্যমান আছেন, ধৰ্ম্মও তদ্রূপ উভয় লোকেই বিদ্যমান রহিয়াছে। উনি এই চরাচর' বিশ্বসংসারে ব্যাপ্ত হইয়া অবস্থান করিতেছেন। নিষ্পাপকলেবর সিদ্ধগণই উঁহার দর্শন-লাভে সমর্থ হন। যিনি ধৰ্ম্ম, তিনিই বিদুর এবং যিনি বিদুর তিনিই যুধিষ্ঠির।

এই দেখ, এই সাক্ষাৎ ধৰ্ম্মস্বরূপ যুধিষ্ঠির তোমার নিকট ভৃত্যভাবে অবস্থান করিতেছেন। যোগবলসম্পন্ন ধীমান্ বিদুর উহাকে দর্শন করিয়া উহার শরীরে প্রবিষ্ট হইয়াছেন। ঐ ধর্মরাজ অচিরাৎ তোমারও মঙ্গলসাধন করিবেন। আমি কেবল তোমার সংশয়চ্ছেদনার্থ এক্ষণে এস্থলে উপস্থিত হইয়াছি। পূর্ব্বে কোন মহর্ষি যে অদ্ভুত কার্য্য সম্পাদন করিতে পারেন নাই, আমি স্বীয় তপোবলপ্রভাবে সেই অদ্ভুত কার্য্য সমাধান করিব। অতঃপর আমার নিকট তোমার যে কোন বিষয় দর্শন বা শ্রবণ করিতে বাসনা হইবে, আমি নিশ্চয়ই তোমাকে তাহা দর্শন বা শ্রবণ করাইব।

আশ্রমবাসিক পর্ব্বাধ্যায় সম্পূর্ণ।

আশ্রমবাসিকপর্ব্ব

পুত্রদর্শন পর্ব্বাধ্যায়।

ব্যাসদেবের নিকট ধৃতরাষ্ট্রাদির স্ব স্ব মৃতপুত্র দর্শনাকাঙ্ক্ষা।

জনমেজয় কহিলেন, ভগবন্! এইরূপে অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র কুন্তী ও গান্ধারীর সহিত অরণ্যবাস আশ্রয়, মহাত্মা বিদুর সিদ্ধি লাভপূর্ব্বক ধর্মরাজের দেহমধ্যে প্রবেশ ও পাণ্ডবগণ সেই ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রমে অবস্থান করিলে, ভগবান্ বেদব্যাস স্বীয় প্রতিজ্ঞানুসারে ধৃতরাষ্ট্রকে কিরূপ অদ্ভুত বিষয় দর্শন করাইলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরই বা সেই সমুদায় পুরবাসী ও সৈন্য-সামন্তগণ-সমভিব্যাহারে তথায় কিরূপে কতদিন বাস করিলেন, সেই সমুদায় পরিজ্ঞাত হইতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। আপনি ঐ সমস্ত আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর পাণ্ডবগণ কুরু-রাজ ধৃতরাষ্ট্রকর্তৃক অনুজ্ঞাত' হইয়া তাঁহার আশ্রমে বিবিধ পানীয় ও ভক্ষ্যদ্রব্য পানভোজন করিয়া পরমসুখে বাস করিতে লাগিলেন। এইরূপে এক মাস অতীত হইলে একদা ভগবান্ বেদব্যাস পুনরায় অন্ধরাজের আশ্রমে সমুপস্থিত হইলেন। তখন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডবগণ তাঁহার যথোচিত সৎকারপূর্ব্বক তাঁহাকে উপবেশন করাইয়া আপনারাও উপবেশন করিলেন। ঐ সময় মহর্ষি নারদ, পর্ব্বত ও দেবল এবং গন্ধর্ব্ব বিশ্বাবসু, তুম্বুরু ও চিত্রসেন তথায় সমুপস্থিত হইলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের আদেশানুসারে তাঁহাদিগের যথোচিত সৎকার করিয়া তাঁহাদিগকে পবিত্র আসনসমুদায় প্রদান করিলেন।

মহর্ষিগণ যুধিষ্ঠিরের সৎকারলাভে পরিতুষ্ট হইয়া সেই সমুদায় আসনে উপবিষ্ট হইলে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডবগণ, গান্ধারী, কুন্তী, দ্রৌপদী, সুভদ্রা ও অন্যান্য কৌরববনিতাগণ তাঁহাদিগের চতুৰ্দ্দিক্ বেষ্টন করিয়া উপবেশন করিলেন। ঐ সময় মহর্ষি-গণের দেবতা, অসুর ও পুরাতন মহর্ষি-বিষয়ক বিবিধ ধর্মকথার আন্দোলন' হইতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে তাহাদিগের কথোপকথন সমাপ্ত হইলে ভগবান্ বেদব্যাস প্রজ্ঞাচক্ষুঃ অন্ধ-রাজ ধৃতরাষ্ট্রকে আশ্চর্য্য দর্শন করাইবার মানসে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! তোমার হৃদয়ের ভাব আমার অবিদিত নাই। তুমি গান্ধারীর সহিত পুত্রশোকে নিতান্ত কাতর হইয়াছ এবং কন্তী, দ্রৌপদী ও সুভদ্রাও পুত্রশোকে নিতান্ত অভিভূত হইয়াছেন। আমি তোমার পরিবারগণের সহিত একত্র বাসের কথা শ্রবণ করিয়া তোমাদিগের সংশয় ছেদন করিবার নিমিত্ত এইস্থানে সমুপস্থিত হইয়াছি। এক্ষণে তুমি আমার নিকট স্বীয় অভিলাষ প্রকাশ কর। আজি এই দেবতা, গন্ধর্ব্ব ও মহর্ষিগণ আমার চিরসঞ্চিত তপোবল দর্শন করুন।

অগাধবুদ্ধি মহাত্মা বেদব্যাস এই কথা কহিলে, অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্! আজি আমি আপনাদিগের সমাগমলাভে ধন্য ও অনু-গৃহীত হইলাম। আজি আমার জীবন সফল হইল। আর আমার ইষ্টগতিলাভে কিছুমাত্র সংশয় ও পরলোকে কিছুমাত্র ভয় নাই। আজি আমি আপনাদিগকে দর্শন করিয়া পরম পবিত্র হইলাম। কেবল সেই মন্দবুদ্ধি দুর্য্যোধনের কুব্যবহার স্মরণ করিয়া আমার নিতান্ত দুঃখ হইতেছে। ঐ পাপাত্মা অকারণে এই নিরপরাধ পাণ্ডবগণকে ক্লেশ প্রদান এবং পৃথিবীর অসংখ্য হস্তী, অশ্ব, ও মনুষ্যকে কালকবলে নিক্ষেপ করিয়াছে। মহাত্মা ভূপালগণ তাহারই নিমিত্ত কুরুক্ষেত্রে সমাগত হইয়া কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন। হায়! আমার পুত্র-পৌত্রগণের এবং যে সমুদায় বীর মিত্রের সাহায্যার্থ পিতা, মাতা, পুত্র-কলত্র'দিগকে পরিত্যাগ করিয়া ইহলোক পরিহার' করিয়াছেন, তাঁহাদিগের কি গতিলাভহইল? আমি মহাবল পরাক্রান্ত মহাত্মা ভীষ্ম ও দ্রোণকে স্মরণ করিয়া কোনরূপেই স্থিরচিত্তে অবস্থান করিতে পারিতেছি না; আমার পুত্র পাপাত্মা দুর্য্যোধন রাজ্যলোভেই কুরুকুল ক্ষয় করিয়াছে। আমি ঐ বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া দিবারাত্রি দুঃখানলে দগ্ধ হইতেছি। কোনরূপেই আমার শান্তিলাভ হইতেছে না। অতএব আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার শান্তিলাভের উপায়বিধান করুন।

অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র এইরূপ করুণবাক্য প্রয়োগ করিলে, গান্ধারী, কুন্তী, সুভদ্রা ও অন্যান্য বধূগণের শোক পুনর্ব্বার নূতন হইয়া উঠিল। তখন পুত্রশোকবিধুরা বন্ধনয়না গান্ধারী কৃতাঞ্জলিপুটে শ্বশুর বেদব্যাসকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্। অদ্য ষোড়শ বর্ষ হইল অন্ধরাজের পুত্রগণ নিহত হইয়াছে, কিন্তু অদ্যাপি কোনরূপেই ইঁহার শান্তিলাভ হইতেছে না। সর্ব্বদাই পুত্রশোকে দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া থাকেন। কখনই নিদ্রাসুখ অনুভব করিতে পারেন না। অতএব আপনি ইঁহার সহিত পুত্রগণের সাক্ষাৎকার করাইয়া ইহাকে সুস্থ করুন। আপনি যখন তপোবলে নূতন লোকসমুদয়েরও সৃষ্টি করিতে পারেন, তখন এই অন্ধরাজের সহিত ইঁহার পরলোকগত পুত্রগণের সাক্ষাৎকার করাইবেন, তাহা বিচিত্র কি! এই দেখুন, আপনার পুত্রবধূগণের প্রিয় পুত্রবধূ দ্রৌপদী ও সুভদ্রা পুত্রশোকে নিতান্ত কাতরা হইয়াছে। ভূরিশ্রবার ভার্য্যা পতিশোকে নিতান্ত অভিভূতা হইয়া নানাপ্রকার বিলাপ করিতেছেন। ইঁহার শ্বশুর মহারাজ সোমদত্ত সংগ্রামে কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন। আর আপনার যে একশত পৌত্র সংগ্রামে নিহত হইয়াছে; এই দেখুন, তাহাদিগের বনিতাগণ হাহাকারশব্দে রোদন করিয়া পুনঃপুনঃ আমার ও অন্ধরাজের পুত্রশোক পরিবর্দ্ধিত করিতেছে। হায়। আমার সোমদত্ত প্রভৃতি যে শ্বশুরগণ সংগ্রামে কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন, এক্ষণে তাঁহাদিগের কি গতিলাভ হইয়াছে? যাহা হউক, এক্ষণে অন্ধরাজ, আমি ও কুন্তী আমরা আপনার প্রসাদে যাহাতে শোক হইতে বিমুক্ত হইতে পারি, আপনি তাহার উপায়বিধান করুন।

গান্ধারী ব্যাসের নিকট এই কথা কহিলে, কৃশাঙ্গী কুন্তী স্বীয় প্রচ্ছন্নজাত পুত্র কর্ণকে স্মরণ করিয়া নিতান্ত বিষণ্ণ হইলেন। তখন ভগবান্ বেদব্যাস তাঁহার ব্যাকুলভাব দর্শন করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, বৎসে! এক্ষণে তুমি আপনার অভিপ্রায় ব্যক্ত কর।

কুন্তীকর্তৃক কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত প্রকাশ ও কর্ণদর্শনকামনা।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, তখন ভোজনন্দিনী কুন্তী পূর্ব্ব-কথা প্রকাশ করিবার নিমিত্ত অতি লজ্জিতভাবে বেদব্যাসকে প্রণতিপুরঃসর সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভগবন্! আপনি দেবদেব ও আমার শ্বশুর; অতএব আপনার নিকট আমি আমার পূর্ব্ববৃত্তান্ত যথার্থতঃ প্রকাশ করিয়া অভিপ্রায় ব্যক্ত করিতেছি, শ্রবণ করুন।

পূর্ব্বে একদা অতি কোপনস্বভাব' মহর্ষি দুর্ব্বাসাঃ ভিক্ষার্থ আমার পিতার ভবনে সমুপস্থিত হইলে, আমি পরিচর্য্যাদ্বারা তাঁহাকে পরিতুষ্ট করিয়াছিলাম। তিনি ঐ সময় এমন অনেক কার্য্য করিয়াছিলেন, যাহাতে আমার কোপ হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা; কিন্তু আমি স্বীয় বিশুদ্ধচিত্তপ্রভাবে কিছুতেই রোষাবিষ্ট হই নাই। তখন সেই বরদাতা মুনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া আমাকে বারংবার বরগ্রহণ করিতে অনুরোধ করিতে লাগিলেন। মহর্ষি বারংবার অনুরোধ করাতে আমি শাপভয়ে তাঁহার বাক্যে সম্মত হইলাম।

তখন তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভদ্রে! তুমি ধর্ম্মের জননী হইবে এবং দেবগণের মধ্যে যাঁহাকে আহ্বান করিবে, তিনিই তোমার বশবর্তী হইবেন। এই বলিয়া মহর্ষি | তৎক্ষণাৎ তথায় অন্তর্হিত হইলেন। আমি তদ্দর্শনে একেবারে বিস্ময়সাগরে নিমগ্ন হইলাম। তদবধি সেই ঋষিবাক্য কখনই | আমার মনঃ হইতে অপনীত হয় নাই।

অনন্তর একদা আমি প্রাসাদোপরি আরোহণপূর্ব্বক নবোদিত ভাস্করকে নিরীক্ষণ করিবামাত্র সেই ঋষিবাক্য আমার স্মৃতিপথে আরূঢ় হইল। তখন আমি বাল্যনিবন্ধন ঐ বাক্য পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত নিতান্ত কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া সূর্যকে আহ্বান করিলাম। আমি আহ্বান করিবামাত্র ভগবান্ সহস্ররশ্মি' স্বীয় দেহকে দ্বিধা বিভক্ত করিয়া একাদ্ধদ্বারা স্বর্গ ও মর্ত্যভূমিতে তাপপ্রদান করিতে লাগিলেন এবং অপরাদ্ধদ্বারা আমার নিকট সমুপস্থিত হইলেন। সেই তেজঃপুঞ্জ-কলেবর দিবাকরকে দেখিবামাত্র আমার কলেবর ভয়ে কম্পিত হইতে লাগিল।

তখন তিনি আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বরাননে! বর প্রার্থনা কর। তখন আমি কহিলাম, ভগবন্! আমার এই প্রার্থনা যে, আপনি অচিরাৎ স্বস্থানে প্রস্থান করুন। আমি এই কথা কহিলে, তিনি আমাকে পুনরায় সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভদ্রে! তোমাকে অবশ্যই বরগ্রহণ করিতে হইবে। আমার আগমন কখনই নিরর্থক হইবে না। যদি তুমি বরগ্রহণ না কর, তাহা হইলে আমি তোমাকে এবং তোমার বরদাতা ব্রাহ্মণকে নিশ্চয়ই ভস্মসাৎ করিব। ভগবান্ ভাস্কর এইরূপে ভয় প্রদর্শন করিলে, আমি সেই নিৰ্দ্দোষ ব্রাহ্মণকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত কহিলাম, ভগবন্! যদি আপনি নিতান্ত আমাকে বরপ্রদান করিবেন, তবে এই বর প্রদান করুন যে, আমি যেন আপনার তুল্য পুত্রলাভ করিতে পারি।

আমি এই কথা কহিবামাত্র দিবাকর স্বীয় তেজঃপ্রভাবে আমাকে মুগ্ধ করিয়া আলিঙ্গনপূর্ব্বক পরিশেষে "শোভনে! তুমি আমার অনুরূপ পুত্রলাভে সমর্থ হইবে” বলিয়া স্বর্গে গমন করিলেন। তিনি স্বর্গে গমন করিবার পর আমার এক সুকুমার নবকুমার জন্মিল। তখন আমি ঐ বৃত্তান্ত গোপন করিবার নিমিত্ত পিতার অন্তঃপুরে আগমন করিয়া সেই গূঢ়োৎপন্ন পুত্রকে জলে নিক্ষেপ করিলাম এবং অচিরাৎ সূর্যদেবের প্রভাবে পুনরায় পূর্ব্বের ন্যায় কন্যকাবস্থা' প্রাপ্ত হইলাম। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ-সময়ে আমি সেই বৃত্তান্ত জ্ঞাত থাকিয়াও কেবল স্বীয় মূঢ়তা-নিবন্ধন সেই গুঢ়োৎপন্ন পুত্রকে উপেক্ষা করিয়াছিলাম। এক্ষণে তাহাকে স্মরণ করিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। আমি পূর্ব্বে যাহা করিয়াছিলাম, সপাপই হউক, আর নিষ্পাপই হউক, এক্ষণে আপনার নিকট উহা ব্যক্ত করিলাম। আপনার অবিদিত কিছুই নাই। আপনি আমার ও নরপতির মনোগত ভাবসমুদায় = অবগত আছেন, অতএব আমাদিগের উভয়ের পুত্রদর্শনবাসনা পূর্ণ করুন।

কুন্তী দেবী এই কথা কহিলে, মহর্ষি বেদব্যাস তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, শোভনে! তুমি যাহা কহিলে সে সমুদায়ই সত্য। তুমি কন্যকাবস্থায় সূর্য্যকে আহ্বান করিয়াছিলে বলিয়া তোমার ঐ বিষয়ে কিছুমাত্র পাপ নাই। দেবতারা অণিমাদি ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন; উহারা সঙ্কল্প, বাক্য, দৃষ্টি, স্পর্শ ও প্রীতি উৎপাদন এই পাঁচ প্রকারেই পুত্রোৎপাদনে করিতে পারেন। তুমি মানবী অতএব দেবসম্পর্কে পুত্র উৎপন্ন করাতে তোমার কোন অপরাধ হয় নাই। এক্ষণে তুমি মনোদুঃখ দূর কর। বলবান্ ব্যক্তিদিগের পক্ষে সমুদায় দ্রব্যই পথ্য, সমুদায় বস্তুই পবিত্র, সমুদায় কার্য্যই ধৰ্ম্ম এবং সমুদায় দ্রব্যই স্বকীয়।

ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতির ব্যাসের আদেশে ভাগীরথীতীরে গমন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহর্ষি বেদব্যাস কুন্তীকে এই কথা কহিয়া গান্ধারীকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভদ্রে! তুমি অবিলম্বেই পুত্র, ভ্রাতা ও অন্যান্য বন্ধুবান্ধবগণকে সুপ্তোত্থিতের ন্যায় সন্দর্শন করিবে। কুন্তী কর্ণকে, সুভদ্রা অভিমন্যুকে এবং দ্রৌপদী পঞ্চপুত্র, পিতা ও ভ্রাতাদিগকে দর্শন করিবেন। আমি পূর্ব্বেই পরলোকগত বন্ধুবান্ধবগণের সহিত তোমাদের সাক্ষাৎ-কার করাইতে বাসনা করিয়াছিলাম। এক্ষণে তুমি, কুন্তী ও নরপতি ধৃতরাষ্ট্র আমাকে ঐ বিষয়ে অনুরোধ করাতে আমার সেই ইচ্ছা বলবতী হইয়াছে। অতঃপর সেই সমরনিহত মহাত্মা-দিগের নিমিত্ত শোক করা তোমাদিগের কর্তব্য নহে। তাঁহারা ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন। উঁহারা অবশ্যম্ভাবী দেবকার্য্যসাধনের নিমিত্ত স্বর্গ হইতে মহীতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে যে সমুদায় বীর নিহত হইয়াছেন, উঁহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ গন্ধর্ব্ব, কেহ কেহ অপ্সরাঃ, কেহ কেহ পিশাচ, কেহ কেহ গুহ্যক, কেহ কেহ রাক্ষস, কেহ কেহ যক্ষ, কেহ কেহ সিদ্ধ, কেহ কেহ দেবতা, কেহ কেহ দানব এবং কেহ কেহ বা দেবর্ষি।

ধৃতরাষ্ট্র নামে যে গন্ধর্ব্বাধিপতি বিখ্যাত আছেন, তিনিই এই মর্ত্যলোকে অবতীর্ণ হইয়া তোমার পতি হইয়াছেন। পাণ্ডু-রাজ দেবশ্রেষ্ঠ বিষ্ণুর অংশে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছিলেন। বিদুর ও রাজা যুধিষ্ঠির ইঁহারা উভয়ে ধর্ম্মের অংশ। দুর্য্যোধন কলি, শকুনি দ্বাপর, দুঃশাসনাদি তোমার অন্যান্য পুত্রগণ রাক্ষস, মহাবল পরাক্রান্ত ভীমসেন বায়ু, মহাত্মা ধনঞ্জয় পুরাতন ঋষি নর, কৃষ্ণ নারায়ণ, নকুল ও সহদেব অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং সপ্ত মহারথীতে পরিবেষ্টন করিয়া যে মহাবীরকে বিনাশ করিয়াছেন, সেই অর্জুননন্দন অভিমন্যু চন্দ্রস্বরূপ। মহাবীর কর্ণ সূর্য্যের, দ্রৌপদীর সহোদর ধৃষ্টদ্যুম্ন অগ্নির, শিখণ্ডী রাক্ষসের, দ্রোণাচার্য্য বৃহস্পতির, অশ্বত্থামা রুদ্রদেবের এবং গাঙ্গেয় ভীষ্ম বসুর অংশে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছিলেন। এইরূপে দেবগণ মনুষ্যলোকে অবতীর্ণ হইয়া স্বকার্য্য সাধনপূর্ব্বক পুনরায় স্বর্গলোকে প্রস্থান করিয়াছেন। যাহা হউক, আজি আমি তোমা-দিগের চিরসঞ্চিত মনোদুঃখ দূর করিব। এক্ষণে তোমরা সকলে ভাগীরথীতীরে গমন কর। সেই স্থানে সমরনিহত বন্ধুবান্ধব-গণকে সন্দর্শন করিবে।

মহর্ষি বেদব্যাস এই কথা কহিবামাত্র তত্রত্য সকল লোকেই সিংহনাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক গঙ্গাভিমুখে ধাবমান হইল। রাজা ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবগণ, অমাত্যগণ, মুনিগণ ও সমাগত গন্ধর্ব্বগণসমভিব্যাহারে ভাগীরথীতীরে যাত্রা করিলেন। অনন্তর সেই সমুদায় লোক ক্রমশঃ গঙ্গাতীরে সমুপস্থিত হইয়া স্বেচ্ছানুসারে অবস্থান করিতে লাগিল। রাজা ধৃতরাষ্ট্রও সস্ত্রীক হইয়া পাণ্ডব ও স্বীয় অনুচরগণের সহিত অভিলষিত স্থানে বাস করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাঁহারা সকলে মৃত নরপতি-দিগের দর্শনবাসনায় গঙ্গাতীরে অবস্থানপূর্ব্বক নিশাসমাগম' প্রতীক্ষা করাতে সেই দিবাভাগ তাঁহাদিগের পক্ষে শত বৎসরের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল।

কুরু ও পাণ্ডবাদির মৃত আত্মীয় দর্শন ও ব্যাসকর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রকে দিব্য চক্ষুদান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ভগবান্ ভাস্কর ক্রমে অস্তাচল-চূড়াবলম্বী' হইলে, তত্রত্য লোকসমুদায় সায়ংকালীন' বিধি সমাপনপূর্ব্বক মহাত্মা ব্যাসদেবের নিকট সমুপস্থিত হইল। তখন অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র সমুদায় মহর্ষি ও পাণ্ডবগণের সহিত সমবেত হইয়া পবিত্রচিত্তে সেই গঙ্গাতীরে উপবেশন করিলেন এবং গান্ধারী প্রভৃতি কৌরবরমণীগণ ও অন্যান্য লোকসমুদায় তথায় উপবিষ্ট হইলেন।

অনন্তর ভগবান্ বেদব্যাস ভাগীরথীর পবিত্রজলে অবগাহন করিয়া সংগ্রামনিহত কুরু ও পাণ্ডব পক্ষীয় বীরসমুদায় ও নানানদেশনিবাসী ভূপালদিগকে আহ্বান করিবামাত্র সেই জলমধ্যে পূর্ব্ববৎ কুরু ও পাণ্ডবসৈন্যের তুমুল শব্দ সমুত্থিত হইল। কিয়ৎক্ষণ পরে ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতি মহাবীরগণ ও তাঁহা-দিগের সৈন্যসমান্তসমুদায়, পুত্র ও সৈন্যগণের সহিত মহারাজ বিরাট ও দ্রুপদ, দ্রৌপদীতনয়গণ, সুভদ্রানন্দন অভিমন্যু, মহাবীর ঘটোৎকচ, কর্ণ, শকুনি, দুর্য্যোধন, দুঃশাসন প্রভৃতি ধৃতরাষ্ট্র-তনয়গণ, জরাসন্ধপুত্র সহদেব, মহাবীর ভগদত্ত, জলসন্ধ, ভূরিশ্রবাঃ, শল্য, শাল্ব, অনুজের সহিত বৃষসেন, দুর্য্যোধনতনয় লক্ষ্মণ, ধৃষ্টদ্যুম্নের পুত্র, শিখণ্ডীর পুত্রগণ, অনুজের সহিত ধৃষ্টকেতু, অচল, বৃষক, নিশাচর' অলায়ুধ এবং মহারাজ সোমদত্ত ও চেকিতান প্রভৃতি বীরসমুদায় সমুজ্জ্বল দিব্যমূর্তি ধারণপূর্ব্বক সলিল হইতে সমুত্থিত হইলেন। পূর্ব্বে যে বীরের যেরূপ বেশ, যেরূপ ধ্বজ ও যেরূপ বাহন ছিল, তৎকালে তাহার কিছুই বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হইল না। ঐ সময় তাঁহারা সকলেই নিরহঙ্কার, নির্ব্বৈর ও নিৰ্ম্মৎসর হইয়া দিব্য বস্ত্র, দিব্য কুণ্ডল ও দিব্য মাল্য ধারণপূর্ব্বক অপ্সরোগণের সহিত শোভা পাইতে লাগিলেন এবং গন্ধর্ব্বগণ তাঁহাদিগের নিকট গান ও বন্দিগণ স্তুতিপাঠ করিতে লাগিল।

তখন সত্যবতীপুত্র মহাত্মা বেদব্যাস তপোবলে অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্রকে দিব্যচক্ষুঃ প্রদান করিলেন। অন্ধরাজ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন-প্রভাবে দিব্যচক্ষুঃ লাভ করিয়া পরমাহ্লাদে পুত্রগণকে দর্শন করিতে লাগিলেন। পতিপরায়ণা গান্ধারী সংগ্রামনিহত পুত্রগণ ও অন্যান্য বীরসমুদায়কে দর্শন করিয়া যাহার-পর-নাই সন্তুষ্ট হইলেন এবং তত্রত্য অন্যান্য লোকসমুদায় সেই অচিন্তনীয় লোমহর্ষণ অদ্ভুত কাণ্ড নিরীক্ষণ করিয়া অনিমেষলোচনে অবস্থান করিতে লাগিল।

মৃত ব্যক্তিগণের স্ব স্ব লোকে প্রস্থান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর সেই নিষ্পাপ ক্রোধমাৎসর্য্য-বিহীন কুরু ও পাণ্ডবপক্ষীয় বীরসমুদায় দেবগণের ন্যায় পুলকিতচিত্তে পরস্পর সম্ভাষণ করিতে লাগিলেন। ঐ সময় পুত্র পিতা-মাতার সহিত, ভার্য্যা পতির সহিত, ভ্রাতা ভ্রাতার সহিত ও সখা সখার সহিত মিলিত হইল। পাণ্ডবগণ মহাধনুর্দ্ধর কর্ণ, অভিমন্যুর ও দ্রৌপদেয়গণের সহিত সমবেত হইয়া প্রীতিমনে পরস্পর সুহৃদ্ভাবে অবস্থান করিতে লাগিলেন এবং যোধগণ মহর্ষি বেদব্যাসের প্রভাবে বৈরভাব পরিত্যাগপূর্ব্বক পরস্পর সুহৃদ্ভাব অবলম্বন করিয়া অগাধ আনন্দসাগরে নিমগ্ন হইলেন। এইরূপে কৌরব ও অন্যান্য ভূপালগণ স্ব স্ব পুত্র ও বান্ধবগণের সহিত সমবেত হইয়া স্বর্গবাসী রাজাদিগের ন্যায় পরমসুখে সে রাত্রি যাপন করিতে লাগিলেন। ঐ রজনীতে তথায় শোক, ভয়, ত্রাস, অসন্তোষ ও অযশের লেশমাত্রও ছিল না। সমাগত রমণীগণ স্ব স্ব পিতা, ভ্রাতা ও পতির সহিত মিলিত হইয়া পরমসুখ অনুভব করিয়াছিলেন।

অনন্তর সেই রজনী অতিবাহিত হইলে সমাগত বীরগণ স্ব স্ব পত্নী ও অন্যান্য আত্মীয়গণকে আলিঙ্গনপূর্ব্বক যথাস্থানে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলেন। ভগবান্ বেদব্যাসও তাঁহাদের অভিপ্রায় অবগত হইয়া তাঁহাদিগকে গমনে অনুমতি করিলেন। তখন তাঁহারা সকলেই স্ব স্ব রথ-ধ্বজের সহিত ভাগীরথীর সলিলে অবগাহনপূর্ব্বক অন্তর্হিত হইয়া কেহ কেহ দেবলোক, কেহ কেহ ব্রহ্মলোেক, কেহ কেহ বরুণলোক, কেহ কেহ কুবেরলোক ও কেহ কেহ সূর্য্যলোকে গমন করিলেন। রাক্ষস ও পিশাচদিগের মধ্যে কেহ কেহ উত্তরকুরুতে এবং কেহ কেহ অন্যান্য স্থানে প্রস্থান করিল।

ব্যাসবাক্যে কুরু-কামিনীগণের স্বেচ্ছায় কলেবর ত্যাগ।

এইরূপে সেই বীরসমুদায় অদৃশ্য হইলে, কুরুকুল-হিতৈষী ধর্মপরায়ণ মহাত্মা বেদব্যাস বিধবা রমণীগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সীমন্তিনীগণ! তোমাদের মধ্যে যাঁহার যাঁহার পতিলোকলাভে বাসনা আছে, তাঁহারা অবিলম্বে এই জাহ্নবীজলে অবগাহন কর। বেদব্যাস এই কথা কহিবামাত্র পতিব্রতা কৌরব-কামিনীগণ সেই গঙ্গাজলে অবগাহন করিয়া অচিরাৎ মানুষদেহ হইতে মুক্তিলাভ ও দিব্য-মূর্তিধারণপূর্ব্বক দিব্য আভরণ ও দিব্য মাল্যে বিভূষিত হইয়া বিমানারোহণে পতিলোকে প্রস্থান করিলেন। উঁহারা পরলোকে গমন করিলে তত্রত্য অন্যান্য ব্যক্তিগণ যে যাহা প্রার্থনা করিলেন, ভগবান্ বেদব্যাস তাহাকে তাহাই প্রদান করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সেই নিহত ভূপতি-দিগের পুনরাগমনবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া নানাদেশস্থ মানবগণের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না।

যে ব্যক্তি শ্রদ্ধান্বিত হইয়া এই প্রিয়সমাগমবৃত্তান্ত শ্রবণ করেন, তিনি উভয় লোকেই প্রিয়বস্তুসমুদায় লাভ করিয়া বান্ধবগণের সহিত সুস্থশরীরে পরমসুখে কালহরণ করিতে সমর্থ হন। যে মহাত্মা অন্যকে ইহা শ্রবণ করান, তাঁহার ইহ-লোকে যশঃ ও পরলোকে উৎকৃষ্ট গতিলাভ হইয়া থাকে। মানবগণ স্বাধ্যায়সম্পন্ন, তপোনুষ্ঠাননিরত, দমগুণান্বিত, সদাচার, দানশীল, সরলস্বভাব, শুচি, হিংসাবিহীন, সত্যপরায়ণ, আস্তিক ও শ্রদ্ধান্বিত হইয়া এই অদ্ভুত ব্যাপার শ্রবণ করিলে, নিঃসন্দেহই উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিতে পারেন।

মৃতদেহে আত্মার আবির্ভাবের তত্ত্ব।

সৌতি কহিলেন, মহর্ষিগণ! মহারাজ জনমেজয় এইরূপে বৈশম্পায়নের মুখে দুর্য্যোধনাদির পুনরায় মর্ত্যলোকে আগমন-বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া প্রীতমনে তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ব্রহ্মন্! আপনার বাক্যশ্রবণে আমার পরম পরিতোষ হইল। এক্ষণে আমার মনে এই সন্দেহ সমুপস্থিত হইয়াছে যে, আমার পূর্ব্বপিতামহ দুর্য্যোধনাদি মহাত্মারা সংগ্রামে কলেবর পরিত্যাগ-পূর্ব্বক পরলোকে গমন করিয়াছিলেন, তাঁহারা কিরূপে সেই শরীরে পুনরায় মর্ত্যলোকে আগমন করিলেন?

মহারাজ জনমেজয় এই কথা কহিলে, মহাপ্রভাবসম্পন্ন ব্যাসশিষ্য বৈশম্পায়ন তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, নরনাথ! ভোগ ব্যতীত কখনই কর্মসমুদায়ের বিনাশ হয় না। কর্মপ্রভাবে লোকের শরীর উৎপন্ন হইয়া থাকে। ঐ শরীর যে সমুদায় মহাভূতদ্বারা নির্মিত হয়, তৎসমুদায়ে পরমাত্মার অধিষ্ঠান থাকে বলিয়া দেহ নাশ হইলেও তাহার নাশ হয় না। লোকে পূর্ব্বতন অদৃষ্টপ্রভাবে কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিয়া থাকে। কর্ম অনুষ্ঠিত হইলে, নিশ্চয়ই যথাকালে উহার ফল উৎপন্ন হয়। আত্মা সেই কৰ্ম্ম ও মহাভূতসমুদায়ে লিপ্ত হইয়া সুখ-দুঃখ ভোগ করেন। আত্মার নাশ নাই এবং উনি মহাভূতসমুদায়কেও কখন পরিত্যাগ করেন না। লোকের যে পর্যন্ত কর্মক্ষয় না হয়, সে পর্যন্ত তাহাকে পূর্ব্বতন রূপ অবলম্বন করিয়া থাকিতে হয়; কর্মক্ষয় হইলেই তাহার রূপের অন্যথা হইয়া থাকে। লোকে পরলোকে আত্মকৃত কর্ম্মের ফলভোগ করিয়া পুনরায় যখন ইহলোকে প্রত্যাগমন করে, তৎকালে উহার রূপের পরিবর্তন হয় বটে, কিন্তু যখন তাহার সেই শরীর মহাভূতসমুদায়দ্বারা নির্মিত হয়, তখন ঐ শরীর যে সেই পূর্ব্বতন শরীর, তাহাতে আর সন্দেহ নাই।

অশ্বমেধ যজ্ঞে অশ্বচ্ছেদনসময়ে এই শ্রুত্যনুযায়ী' বাক্য কীর্ত্তিত হইয়া থাকে যে, জন্তুগণ লোকান্তরে গমন করিলেও উহাদের প্রাণ ও শরীর উহাদিগকে পরিত্যাগ করে না। আর তুমিও যজ্ঞভূমিতে উপবিষ্ট হইয়া শ্রবণ করিয়াছ যে, পশুগণ যজ্ঞে নিহত হইয়া দেবতাদিগের পথ অবলম্বনপূর্ব্বক দেবলোকে গমন করে। তুমি যজ্ঞ আরম্ভ করিলে, তোমার হিতার্থী দেব-গণ যজ্ঞস্থলে আগমনপূর্ব্বক নিহত পশুদিগকে স্বর্গে নীত করিয়াছেন। যখন পঞ্চভূত ও আত্মা নিত্য বলিয়া স্থিরসিদ্ধান্ত হইয়াছে, তখন লোকের শরীর অনিত্য হইবে কেন? যাহারা মোহবশতঃ আত্মা নানাশরীর পরিগ্রহ করেন বলিয়া বিবেচনা করে, তাহারাই আত্মীয়বিয়োগে বালকের ন্যায় রোদন করিয়া থাকে। যাঁহারা সংযোগ ও বিয়োগ এই উভয় অকিঞ্চিৎকর বিবেচনা করিয়া নিঃশঙ্ক হইয়া অবস্থান করেন, তাঁহাদিগকে কখনই সংযোগজনিত সুখ ও বিয়োগজনিত দুঃখে অভিভূত হইতে হয় না।

জীবাত্মা কেবল অভিমাননিবন্ধন পরমাত্মা বলিয়া অভিহিত হন না। উনি উৎকৃষ্ট বুদ্ধিপ্রভাবে মোহ হইতে বিমুক্ত হইলেই পরমাত্মার সহিত অভিন্ন হইয়া থাকেন। ফলতঃ মনুষ্যের শরীর ও আত্মা উভয়ই অবিনশ্বর। লোকে যে শরীর পরিগ্রহ করিয়া যে কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, তাহাকে সেই শরীরেই তাহার ফলভোগ করিতে হয়। সে মনোদ্বারা মানসিক ও শরীরদ্বারা শারীরিক কর্ম্মের ফলভোগ করিয়া থাকে।

ব্যাসের প্রসন্নতায় জনমেজয়ের মৃত পিতার দর্শন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! এইরূপে মহাত্মা বিদুর স্বীয় তপোবলে সিদ্ধিলাভ ও রাজা ধৃতরাষ্ট্র মহর্ষি বেদব্যাসের প্রসাদবলে আত্মতুল্য রূপসম্পন্ন স্বীয় পুত্রগণের দর্শনলাভ করিয়াছিলেন। কুরুরাজ জন্মান্ধত্বনিবন্ধন পূর্ব্বে কখনই পুত্রগণকে দর্শন করিতে সমর্থ হন নাই, তৎকালে কেবল মহাত্মা কৃষ্ণদ্বৈপায়নের অনুগ্রহেই উহার পুত্রমুখ নিরীক্ষণ হইল। ঐ সময় ঐ মহর্ষির প্রভাবে অন্ধ রাজের রাজধৰ্ম্ম, বেদ, উপনিষৎ ও বুদ্ধিনিশ্চয়বিষয়ে বিলক্ষণ অধিকার হইয়াছিল।

সৌতি কহিলেন, হে মহর্ষিগণ। মহাত্মা বৈশম্পায়ন এই কথা কহিলে মহারাজ জনমেজয় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ব্রহ্মন্! আমি আপনার মুখে মহাত্মা কৃষ্ণদ্বৈপায়নের প্রভাব শ্রবণ করিয়া নিতান্ত চমৎকৃত হইলাম। এক্ষণে যদি বরদাতা মহর্ষি বেদব্যাস আমাকে আমার পিতার রূপ প্রদর্শন করেন, তাহা হইলে আমি অত্যন্ত উপকৃত ও কৃতার্থ হই এবং আপনার বাক্যেও আমার সমধিক আস্থা জন্মে। অতঃপর ঐ মহর্ষির প্রসাদবলে আমার অভিলাষ পূর্ণ হউক।

মহারাজ জনমেজয় এই কথা কহিবামাত্র তপঃপ্রভাব-সম্পন্ন মহর্ষি বেদব্যাস তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হইয়া পূর্ব্বের ন্যায় বয়োরূপসম্পন্ন' অমাত্যগণ-পরিবৃত রাজা পরীক্ষিতকে এবং মহাত্মা শমীক ও তাঁহার পুত্র শৃঙ্গীকে পরলোক হইতে তথায় সমানীত করিলেন। তদ্দর্শনে জনমেজয়ের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। অনন্তর তিনি সেই যজ্ঞ সমাপন করিয়া পিতাকে যজ্ঞান্ত স্নান করাইয়া স্বয়ং স্নান সমাপনপূর্ব্বক জরৎকারু পুত্র আস্তীককে কহিলেন, ভগবন্! এই যজ্ঞস্থলে শোকনাশন পিতা সমুপস্থিত হওয়াতে আমার এই যজ্ঞ অতি অদ্ভুত বলিয়া বোধ হইতেছে।

তখন আস্তীক কহিলেন, মহারাজ! যাঁহার যজ্ঞে মহর্ষি দ্বৈপায়ন স্বয়ং সমুপস্থিত থাকেন, ইহলোক ও পরলোক উভয় লোকই তাঁহার হস্তগত হয়। এক্ষণে তুমি বিচিত্র উপাখ্যান শ্রবণ করিয়া বিপুল ধৰ্ম্ম লাভ করিলে, তোমার প্রভাবে সর্পসমুদায় ভস্মসাৎ হইল এবং তোমার সত্যবাক্যনিবন্ধন তক্ষক কথঞ্চিৎ মুক্তিলাভ করিল। এক্ষণে মহৎসংসর্গনিবন্ধন তোমার মনের সংশয় দূরীভূত হইয়াছে। তুমি ঋষিগণের যথোচিত পূজা করিয়াছ। চরমে নিশ্চয়ই তোমার, তোমার পিতার সালোক্য' লাভ হইবে। অতঃপর যাঁহারা পরমধার্মিক ও সদ্ব্যবহার-নিরত এবং যাঁহাদিগকে দর্শন করিলে পাপ বিনাশ হয়, তুমি তাঁহাদিগকে নমস্কার কর।

মহাত্মা আস্তীক এই কথা কহিলে, রাজা জনমেজয় তাঁহাকে যথোচিত সম্মান করিয়া পূজা করিতে লাগিলেন।

ধৃতরাষ্ট্রের অনুরোধে যুধিষ্ঠিরাদির হস্তিনাগমন।

অনন্তর পরীক্ষিতনন্দন' ধৃতরাষ্ট্রাদির বনবাসের শেষ বৃত্তান্ত শ্রবণে অভিলাষী হইয়া বৈশম্পায়নকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ব্রহ্মন্! অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র ও রাজা যুধিষ্ঠির ইঁহারা উভয়ে পুত্র-পৌত্রাদিগকে দর্শন করিয়া কি করিলেন, তাহা কীর্ত্তন করুন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র সেই আশ্চর্য্য ব্যাপার অবলোকন করিয়া শোকশূন্য হইয়া পুনরায় স্বীয় আশ্রমে আগমন করিলেন। তখন ঋষিগণ ও অন্যান্য লোকসমুদায় ধৃতরাষ্ট্রের আদেশানুসারে স্ব স্ব স্থানে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। মহাত্মা পাণ্ডবগণও স্ব স্ব পত্নী ও পরিমিত সৈন্য-সমভিব্যাহারে পুনরায় ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রমে গমন করিলেন।

ঐ সময় ত্রিলোকপূজিত মহর্ষি বেদব্যাস ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রমে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, কৌরবেন্দ্র! তুমি বেদবেদাঙ্গ পারদর্শী পরম ধার্মিক জ্ঞানবৃদ্ধ মহর্ষিদিগের নিকট বিবিধ বিচিত্র কথা শ্রবণ করিয়াছ, অতএব এক্ষণে আর শোকে সমাকৃষ্ট হইও না, পণ্ডিত ব্যক্তিরা কখন স্বীয় দুরদৃষ্টনিবন্ধন ব্যথিত হন না। তুমি দেবর্ষি নারদের নিকট দেবরহস্যসমুদায় শ্রবণ করিয়াছ এবং এক্ষণে ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে সমরশায়ী পুত্রগণকে শুভগতি লাভ করিয়া স্বেচ্ছানুসারে ভ্রমণ করিতে দেখিলে। অতঃপর ধীমান যুধিষ্ঠিরকে স্বীয় পত্নী, সুহৃদ্গণ ও ভ্রাতৃগণের সহিত রাজ্যগমনে অনুমতি কর। উঁহারা সকলেই তোমার অনুমতি প্রতীক্ষা করিতেছেন। এক মাসের অধিককাল অতীত হইল উঁহারা এই তপোবনে অবস্থান করিতেছেন; আর অধিক দিন এখানে অবস্থান করা উহাঁদের কর্তব্য নহে। রাজ্য বিবিধ বিঘ্নের আস্পদ, অতএব নিয়ত যত্নপূর্ব্বক উহা রক্ষা করা উঁহাদের সর্ব্বতোভাবে বিধেয়।

অমিত পরাক্রম' মহর্ষি বেদব্যাস এই কথা কহিলে, রাজা ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, বৎস! তোমার মঙ্গল লাভ হউক। তোমার অনুগ্রহে আমার শোকসন্তাপসমুদায় দূরীভূত হইয়াছে। এক্ষণে বোধ হইতেছে, যেন আমি তোমাদিগের সহিত হস্তিনানগরে অবস্থান করিতেছি। তুমি আমার পুত্রের কার্য্য করিয়াছ। আমি তোমার প্রতি পরম পরিতুষ্ট হইয়াছি। এক্ষণে আর আমার শোকের লেশমাত্র নাই। অতঃপর তুমি অচিরাৎ হস্তিনানগরে গমন কর, আর বিলম্ব করিও না। তোমাকে দর্শন করিয়া স্নেহনিবন্ধন আমার তপস্যার ব্যাঘাত হইতেছে। আমি কেবল তোমার দর্শনে একাল পর্যন্ত এই তপঃকৃশ শরীর ধারণ করিয়া রহিয়াছি। শীর্ণপত্রজীবিনী' কুন্তী ও গান্ধারীও আর অধিককাল ইহলোকে অবস্থান করিবেন না। মহর্ষি বেদব্যাসের প্রভাব ও তোমার সমাগমে আমি পরলোক-গত দুর্য্যোধনাদিগকে দর্শন করিলাম। আর আমার জীবিত থাকিবার প্রয়োজন নাই। অতঃপর আমি তোমার আদেশানুসারে ঘোরতর তপস্যা অবলম্বন করিব। এক্ষণে তোমাতে আমাদিগের পিণ্ড, কীর্ত্তি ও কুল প্রতিষ্ঠিত রহিল। তুমি কল্যই হউক, বা অদ্যই হউক হস্তিনানগরে গমন কর, আর বিলম্ব করিও না। তুমি অনেকবার রাজনীতি শ্রবণ করিয়াছ, অতএব এক্ষণে তোমাকে আর কিছু উপদেশ প্রদান করিতে হইবে না।

হস্তিনা-প্রত্যাবর্তনে পরাজুখ যুধিষ্ঠিরের প্রবোধ।

অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র এই কথা কহিলে রাজা যুধিষ্ঠির তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, তাত! আমি নিরপরাধী, আপনি আমাকে পরিত্যাগ করিবেন না। এক্ষণে আমার ভ্রাতৃগণ ও অনুচরগণ হস্তিনানগরে গমন করুন। আমি এই স্থানে অবস্থান করিয়া আপনার ও জননীদ্বয়ের শুশ্রূযা করিব।

ধর্মরাজ এই কথা কহিলে, গান্ধারী তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস! অমন কথা কহিও না। তুমি কৌরব-দিগের বংশধর ও আমার শ্বশুরের জলপিণ্ড স্থল'। তুমি একাল পর্য্যন্ত আমাদিগের যথেষ্ট সেবা করিলে, এক্ষণে অচিরাৎ রাজধানীতে গমন কর। রাজার বচন রক্ষা করা তোমার অবশ্য কর্তব্য।

অন্ধরাজমহিষী গান্ধারী এই কথা কহিলে রাজা যুধিষ্ঠির স্বীয় বাষ্পাকুলিত নেত্রদ্বয় পরিমার্জিত করিয়া কুন্তীকে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, মাতঃ! রাজা ও যশস্বিনী গান্ধারী আমাকে রাজধানীগমনে অনুরোধ করিতেছেন। কিন্তু আমি আপনার একান্ত অনুগত; আপনাকে পরিত্যাগ করিয়া কিরূপে গমন করিব। আপনার তপোবিঘ্ন করিতেও আমার বাসনা নাই। তপস্যা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই। তপস্যাদ্বারা অতি মহৎ ফললাভ হইয়া থাকে। এক্ষণে আমার আর পূর্ব্বের ন্যায় রাজভোগে অভিলাষ নাই। আমার মনঃ সম্পূর্ণভাবে তপস্যায় অনুরক্ত হইয়াছে। বিশেষতঃ এই পৃথিবী লোকশূন্য হওয়াতে আর উঁহার প্রতিপালনে আমার কিছুতেই উৎসাহ হইতেছে না। আমাদিগের বান্ধবগণ বিনষ্ট হইয়াছে আর তাদৃশ সৈন্য সামন্তও নাই। পাঞ্চালগণ একবারে উৎসন্ন হইয়া গিয়াছে। উহাদের বংশরক্ষা করে, এমন আর কেহই নাই। দ্রোণাচার্য্য সমরাঙ্গনে উহাদিগকে নিঃশেষিতপ্রায় করিলে, যাহারা অবশিষ্ট ছিল, আচার্য্যতনয় রজনীযোগে তাহাদিগকেও বিনাশ করিয়াছেন। চেদি ও মৎস্যবংশও নিঃশেষ হইয়াছে। এক্ষণে কেবল বাসুদেবের প্রভাবে একমাত্র বৃষ্ণিবংশই অবশিষ্ট রহিয়াছে। তাঁহাদিগকে দর্শন করিয়া কেবল ধৰ্ম্মসাধনার্থই রাজ্যমধ্যে অবস্থান করিতে আমার বাসনা হয়। এক্ষণে আপনি নির্বিঘ্নে আমাদিগের সকলকে দর্শন করুন। সকলের সহিত আর আপনার দর্শনলাভ হওয়া নিতান্ত কঠিন হইবে। জ্যেষ্ঠতাত এক্ষণে আপনাদের সহিত ঘোরতর তপস্যায় প্রবৃত্ত হইবেন।

কুন্তীর সান্ত্বনায় যুধিষ্ঠিরাদির হস্তিনায় গমন।

ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে, মহাবাহু সহদেব বাষ্পাকুললোচনে তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, রাজন! আমি ত কোনক্রমে মাতাকে পরিত্যাগ করিতে পারিব না। অতএব আপনি অবিলম্বেই রাজধানীতে গমন করুন; আমি এই স্থানে অবস্থানপূর্ব্বক রাজা ও মাতৃদ্বয়ের পদসেবা এবং ঘোরতর তপোনুষ্ঠান করিয়া কলেবর পরিশুদ্ধ করি। সহদেব বিনীতভাবে এই কথা কহিলে, ভোজনন্দিনী কুস্তী তাঁহাকে আলিঙ্গন করিয়া কহিলেন, বৎস। তুমি আমার বাক্যানুসারে হস্তিনানগরে গমন কর। তোমাদিগের শাস্ত্রজ্ঞান পরিবর্দ্ধিত হউক এবং তোমরা পরমসুখে অবস্থান কর। তোমরা এ স্থলে অবস্থান করিলে আমাদিগের তপস্যার ব্যাঘাত হইবে, তোমার স্নেহপাশে বদ্ধ হওয়াতে আমার উৎকৃষ্ট তপস্যা ক্রমশঃ ক্ষীণ হইতেছে। আমাদিগের পরলোকগমনের আর অধিক বিলম্ব নাই, অতএব তুমি এক্ষণে রাজ্যে প্রতিনিবৃত্ত হও।

মনস্বিনী কুন্তী এইরূপে বহুবিধ সান্ত্বনা করিলে, সহদেব ও রাজা যুধিষ্ঠিরের চিত্ত স্থির হইল। তখন পাণ্ডবগণ সকলে সমবেত হইয়া অন্ধরাজের চরণবন্দনপূর্ব্বক অনুনয় করিতে আরম্ভ করিলেন।

ঐ সময় রাজা যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! আপনি যখন আমাদিগকে অনুজ্ঞা করিতেছেন, তখন আমরা অবশ্যই আহ্লাদসহকারে নগরে প্রতিগমন করিব। ধর্মরাজ এই কথা কহিলে, অন্ধরাজ তাঁহাকে অভিনন্দন, ভীমসেনকে সান্ত্বনা এবং অর্জুন, নকুল ও সহদেবকে আলিঙ্গন করিয়া তাহাদিগকে অচিরাৎ হস্তিনায় 'গমন করিতে আদেশ করিলেন। তখন পাণ্ডবগণ গান্ধারী ও কুস্তীকে অভিবাদন এবং তাঁহাদের নিকট বিদায় গ্রহণপূর্ব্বক ধৃতরাষ্ট্রকে বারংবার প্রদক্ষিণ ও নিরীক্ষণ করিয়া হস্তিনাভিমুখে ধাবমান হইলেন। দ্রৌপদী প্রভৃতি কৌরবপত্নীগণ শুশ্রূদ্বয় ও শ্বশুরের পাদবন্দনা করিয়া তাঁহাদিগের কর্তৃক অনুজ্ঞাত ও কর্তব্যবিষয়ে উপদিষ্ট হইয়া পাণ্ডবগণসমভিব্যাহারে নগরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। ঐ সময় উষ্ট্রের চীৎকারধ্বনি ও অশ্বের হ্রেষারবে আশ্রমমণ্ডল পরিপূরিত হইল এবং সারথিগণ "অশ্বযোজনা কর, অশ্বযোজনা কর" বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল।

অনন্তর রাজা যুধিষ্ঠির স্বীয় পত্নী এবং সৈন্যগণসমভিব্যাহারে সবান্ধবে নির্বিঘ্নে পুনরায় হস্তিনানগরে আগমন করিলেন।

পুত্রদর্শন পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।

নারদাগমন পর্ব্বাধ্যায়।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নিকটে দেবর্ষি নারদের আগমন।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! পাণ্ডবগণ তপোবন হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইবার পর দুই বৎসর অতীত হইলে একদা তপোধনাগ্রগণ্য দেবর্ষি নারদ ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নিকট সমুপস্থিত হইলেন। তখন ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির তাঁহার যথোচিত সৎকার করিয়া তাঁহাকে আসন প্রদান করিলেন। দেবর্ষি নারদ সেই আসনে উপবিষ্ট হইলে, ধর্মরাজ তাঁহার কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্! বহুদিনের পর আপনার সহিত আমাদের সাক্ষাৎকার হইল। আপনি কোন্ কোন্ দেশ দর্শন করিয়াছেন, ইহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। আপনিই আমাদিগের পরমা গতি। অতএব আজ্ঞা করুন, আমাকে আপনার কোন্ কার্য্য সাধন করিতে হইবে?

ধৰ্ম্মরাজ এই কথা কহিলে, দেবর্ষি নারদ তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! আমি বহুকালের পর তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম, এরূপ বিবেচনা করিও না। আমি ধৃতরাষ্ট্রের তপোবনে তোমাদিগকে দর্শন করিয়াছি। এক্ষণে আমি গঙ্গা ও অন্যান্য তীর্থসমুদায় দর্শন করিয়া তপোবন হইতে আগমন করিতেছি।

যুধিষ্ঠিরকর্তৃক ধৃতরাষ্ট্র-প্রশ্নে নারদের প্রত্যুত্তর।

তখন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্। গঙ্গাতীরনিবাসী মহাত্মারা আমার নিকট আমার জ্যেষ্ঠতাত মহাত্মা ধৃতরাষ্ট্রের কঠোর তপোনুষ্ঠানের বিষয় কীর্ত্তন করিয়া থাকেন। এক্ষণে তিনি, জননী গান্ধারী ও কুন্তী এবং সূতপুত্র সঞ্জয়, ইঁহারা সকলে কিরূপে কালহরণ করিতেছেন, আপনার মুখে তাহা শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। যদি আপনার সহিত তাঁহাদিগের সাক্ষাৎকার হইয়া থাকে, তাহা হইল তাঁহাদিগের সংবাদ আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।

দেবর্ষি নারদ ধর্মরাজকর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! আমি তোমার জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্রের তপোবনে যে যে বিষয়ে দর্শন ও শ্রবণ করিয়াছি, তৎসমুদায় আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। তোমরা তপোবন হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলে অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র অগ্নিহোত্র, পুরোহিত এবং গান্ধারী, কুন্তী ও সঞ্জয়ের সহিত কুরুক্ষেত্র হইতে গঙ্গাদ্বারে সমুপস্থিত হইয়া বায়ুভক্ষণপূর্ব্বক কঠোর তপোনুষ্ঠান প্রবৃত্ত হইলেন। ঘোরতর তপস্যা করাতে অন্ধরাজের শরীর অস্থিচর্মাবশিষ্ট হইল। মহর্ষিগণ তাঁহাকে যথোচিত সৎকার করিতে লাগিলেন। গান্ধারী কেবল জলমাত্র পান করিয়া এবং কুন্তী এক মাসের পর একদিন ও সঞ্জয় পাঁচ দিনের পর একদিনমাত্র ভোজন করিয়া কালহরণ করিতে লাগিলেন, যাজকেরাও বিধিপূর্ব্বক আহুতি প্রদান করিতে আরম্ভকরিলেন।

নারদকর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রাদির দেহত্যাগ-বিষয় বর্ণন।

এইরূপে ছয় মাস অতীত হইলে অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র কাননাভিমুখে যাত্রা করিলেন। ঐ সময় মহাত্মা সঞ্জয় অন্ধ-রাজের এবং তোমার জননী কুন্তী গান্ধারীর চক্ষুঃস্বরূপ' হইয়া' তাঁহাদের সমভিব্যাহারে গমন করিতে লাগিলেন। অনন্তর একদা অন্ধরাজ গঙ্গাসলিলে অবগাহন করিয়া স্বীয় আশ্রমাভিমুখে আগমন করিতেছেন, এমন সময়ে দাবানল প্রচণ্ড বায়ুসহযোগে ভীষণরূপে প্রজ্বলিত হইয়া সমুদায় বন দগ্ধ করিতে লাগিল। মৃগযূথ ও সর্পসমুদায় সেই তীব্রদহনে' দগ্ধদেহ হইয়া প্রাণত্যাগ করিতে আরম্ভ করিল এবং বরাহগণ নিতান্ত তাপিত হইয়া জলাশয়মধ্যে প্রবিষ্ট হইল। ঐ সময় অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তী অনাহারনিবন্ধন নিতান্ত ক্ষীণ হইয়াছিলেন বলিয়া, কোনক্রমেই তথা হইতে পলায়নপূর্ব্বক সেই বিষম বিপদ হইতে আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হইলেন না। ক্রমে দাবানল তাঁহাদিগের সন্নিহিত হইল। তখন অন্ধরাজ সঞ্জয়কে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, সূতনন্দন! তুমি অবিলম্বে এস্থান হইতে পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা কর, আমরা এই অনলেই জীবন পরিত্যাগ করিয়া পরমগতি লাভ করিব।

অন্ধরাজ এই কথা কহিলে, মহাত্মা সঞ্জয় তাঁহার বাক্য-শ্রবণে নিতান্ত উদ্বিগ্ন হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ। এই বৃথাগ্নিদ্বারা প্রাণত্যাগ করিলে, আপনার সদ্গতি-লাভের সম্ভাবনা নাই আর এই অনল হইতে আপনার পরিত্রাণের কোন উপায় দেখিতেছি না। অতএব এক্ষণে কর্তব্য কি, অবিলম্বে তাহা কীর্ত্তন করুন।

তখন অন্ধরাজ পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন, মহাত্মন্! যখন আমরা গৃহাশ্রম পরিত্যাগ করিয়াছি, তখন এই দাবানলে প্রাণত্যাগ করিলে, কখনই আমাদিগের অসদ্গতি হইবে না। বিশেষতঃ জল, বায়ু বা অনলসহযোগে অথবা প্রায়োপবেশনে প্রাণত্যাগ করা তাপসগণের অবশ্য কর্তব্য। এক্ষণে তুমি অবিলম্বে এস্থান হইতে পলায়ন কর। এই বলিয়া কৌরবনাথ গান্ধারী ও কুন্তীর সহিত পূর্ব্বাস্য হইয়া অনন্যমনে উপবেশন করিলেন। তখন সঞ্জয় তাঁহার সেই অবস্থা দর্শন করিয়া তাঁহাকে প্রদক্ষিণপূর্ব্বক আত্মসংযম করিতে কহিলেন। অন্ধরাজও সঞ্জয়ের বাক্য শ্রবণ করিয়া অচিরাৎ গান্ধারী ও কুন্তীর সহিত আত্মসংযম করিলেন। ঐ সময় ইন্দ্রিয়রোধনিবন্ধন তাঁহাদিগের শরীর কাষ্ঠবৎ নিশ্চল হইয়া রহিল। অনন্তর তাঁহারা তিনজনেই সেই দাবানলে সমাক্রান্ত হইয়া প্রাণত্যাগ করিলেন।

মহাত্মা সঞ্জয় অতিকষ্টে সেই অনল হইতে আত্মরক্ষা করিয়া গঙ্গাকূলে মহর্ষিগণের নিকট আগমন ও সেই বৃত্তান্ত নির্দেশপূর্ব্বক হিমালয়ে প্রস্থান করিলেন। ঐ সময় আমি সেই তাপসগণের নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। সঞ্জয়ের মুখে সেই বৃত্তান্ত শ্রবণ করিবামাত্র তোমাদিগকে উহা জ্ঞাপন করিবার নিমিত্ত তথা হইতে যাত্রা করিলাম। আগমনসময়ে অন্ধরাজ, গান্ধারী ও কুস্তীর কলেবর আমার দৃষ্টিগোচর হইয়াছে। তাপসেরা সেই আশ্রমে সমুপস্থিত হইয়া অন্ধরাজের এবং কুন্তী ও গান্ধারীর পরলোকগমনের বিষয় শ্রবণপূর্ব্বক তাঁহাদের সদ্গতিলাভে শঙ্কা করিয়া কিছুমাত্র শোক করেন নাই। আমি তাঁহাদের মুখেও উহাদের মৃত্যুবৃত্তান্ত সবিশেষ অবগত হইয়াছি। যখন সেই কৌরবনাথ, গান্ধারী ও কুন্তী স্বেচ্ছাপূর্বক অনলে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তখন তাঁহাদের নিমিত্ত শোক করা কদাচ বিধেয় নহে।

দেবর্ষি নারদ এইরূপে ধৃতরাষ্ট্রাদির পরলোক-বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিলে মহাত্মা পাণ্ডবগণের শোকের আর পরিসীমা রহিল না। ঐ সময় অন্তঃপুরে ভয়ঙ্কর আর্তনাদ হইতে লাগিল, পুরবাসীগণ হাহাকার করিতে আরম্ভ করিল এবং মহাত্মা যুধিষ্ঠির মাতাকে স্মরণপূর্ব্বক ভ্রাতৃগণসমভিব্যাহারে উর্দ্ধবাহু হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বারংবার "আমাকে ধিক্”। বলিয়া রোদন করিতে লাগিলেন।

ধৃতরাষ্ট্র ও কুন্তীর নিমিত্ত যুধিষ্ঠিরাদির শোক।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর সেই পুরবাসী ও অন্যান্য লোকসমুদায়ের রোদনধ্বনি উপরত' হইলে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শোকাবেগ সংবরণ করিয়া দেবর্ষি নারদকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্! আমরা জীবিত থাকিতেও যে তপোনুষ্ঠান-নিরত মহাত্মা অন্ধরাজ অনাথের ন্যায় অরণ্যমধ্যে কলেবর পরিত্যাগ করিলেন, ইহার' পর' আক্ষেপের বিষয় আর কি আছে? যখন প্রবল প্রতাপশালী অন্ধ রাজকেও দাবানলে দগ্ধ হইতে হইল, তখন নিশ্চয়ই বুঝিলাম, পুরুষদিগের গতি নিতান্ত দুর্জেয়। হায়! যে মহাত্মার মহাবল পরাক্রান্ত একশত পুত্র ছিল, যিনি অযুতনাগতুল্য পরাক্রান্ত ছিলেন, তাঁহাকেও এক্ষণে দাবানলে দগ্ধ হইতে হইল! পূর্ব্বে পরমা সুন্দরী রমণীগণ পার্শ্বে উপবিষ্ট হইয়া যাঁহাকে তালবৃন্ত বীজন' করিত, আজি তিনি দাবালনে দগ্ধ হওয়াতে গৃধগণ তাঁহাকে পুচ্ছদ্বারা বীজিত' করিতেছে! যিনি সূত ও মাগধগণের স্তুতিবাদ শ্রবণ করিয়া গাত্রোত্থান করিতেন, আজি এই নরাধমের কার্য্যদোষে তাঁহাকে ধরাশয্যা আশ্রয় করিতে হইয়াছে!

আমি পুত্রবিহীনা জননী গান্ধারীর নিমিত্ত অনুতাপ করি না। তিনি পতির অনুগামিনী হইয়া ভর্তৃলোক লাভ করিয়াছেন। এক্ষণে কেবল যিনি পুত্রগণের এই সুসমৃদ্ধ রাজ্যসম্পদ পরিত্যাগ করিয়া বনগামিনী হইয়াছিলেন, সেই জননী কুস্তীকে স্মরণ করিয়া আমার হৃদয় শোকানলে দগ্ধ হইতেছে। আমা-দিগের রাজ্য, বল, পরাক্রম” ও ক্ষত্রিয়ধর্মে ধিক্! আমরা জীবস্মৃত। হায়। কালের গতি অতিশয় সূক্ষ্ম। দেখুন, মনস্বিনী কুন্তী যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, ও অর্জুনের জননী হইয়াও রাজ্য-সম্পদ পরিত্যাগপূর্ব্বক বনে গমন করিয়া অনাথার ন্যায় দাবানলে দগ্ধ হইলেন। আমি তাঁহাকে স্মরণ করিয়া নিতান্ত | ব্যাকুল হইয়াছি। অর্জুন অনর্থক খাণ্ডববন প্রদান করিয়া অনলের তৃপ্তিসাধন করিয়াছিল। এক্ষণে আমি নিশ্চয় বুঝিলাম, হুতাশনের তুল্য অকৃতজ্ঞ ও কৃতঘ্ন আর কেহই নাই। পূর্ব্বে ব্রাহ্মণবেশে অর্জুনের নিকট ভিক্ষা প্রার্থনা করিয়া এক্ষণে তিনি কিরূপে তাঁহার জননীকে দগ্ধ করিলেন?

হুতাশনকে ও অর্জুনের সত্য-প্রতিজ্ঞায় ধিক্। অন্ধরাজ বৃথানলে কলেবর পরিত্যাগ করিয়াছেন শ্রবণ করিয়া আমার চিত্ত নিতান্ত ব্যাকুল হইয়াছে। হায়। সেই মহাবনে তপোনুষ্ঠান-নিরত মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রপূত পবিত্র অগ্নি বিদ্যমান থাকিতে তাঁহার বৃথানলে মৃত্যু হইল কেন? বোধ করি, যখন দাবানল আমার জননীর চতুৰ্দ্দিক্ বেষ্টন করিয়াছিল, তখন তিনি নিতান্ত ভীত হইয়া "হা ধর্মরাজ! হা ভীমসেন! তোমরা শীঘ্র আমার নিকট আগমন কর”, বলিয়া উচ্চঃস্বরে রোদন করিয়াছিলেন। তিনি সমুদায় পুত্র অপেক্ষা সহদেবের প্রতি সমধিক স্নেহ করিতেন, কিন্তু সেও এক্ষণে তাঁহাকে অনল হইতে রক্ষা করিল না।

ধর্মরাজ এই বলিয়া করুণস্বরে রোদন করিতে আরম্ভকরিলে, তাঁহার ভ্রাতৃগণ নিতান্ত শোকাকুল হইয়া যুগান্তকালীন প্রাণিগণের ন্যায় পরস্পরকে আলিঙ্গনপূর্ব্বক ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের সেই ক্রন্দনকোলাহলে প্রাসাদসমুদায় প্রতিধ্বনিত ও আকাশমণ্ডল পরিব্যাপ্ত হইল।

নারদকর্তৃক যুধিষ্ঠিরকে সান্ত্বনাদান।

বৈশম্পায়ন কহিলেন, পাণ্ডবগণ এইরূপ শোকাকুল হইলে, তপোধনাগ্রগণ্য দেবর্ষি নারদ ধর্মরাজকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! আপনার জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র বৃথানলে দগ্ধ হন নাই। আমি গঙ্গাতীরনিবাসী মহর্ষিগণের প্রমুখাৎ শ্রবণ করিয়াছি, অন্ধরাজ গঙ্গাদ্বার হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া অরণ্য-প্রবেশকালে যজ্ঞ সম্পাদনপূর্ব্বক যজ্ঞীয় অনল পরিত্যাগ করিলে, যাজকেরা সেই অনল নির্জনে বনে নিক্ষেপ করিয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিয়াছিলেন। ক্রমে সেই অনল বর্দ্ধিত হওয়াতে তদ্দ্বারা সমুদায় বন দগ্ধ হইয়া যায়। আপনার জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র সেই স্বীয় যজ্ঞানলে দগ্ধ হইয়া ইহলোক পরিহারপূর্ব্বক পরমগতি লাভ করিয়াছেন। আপনি আর তাঁহার নিমিত্ত শোক করিবেন না। আপনার জননী কুন্তীও গুরুশুশ্রূষা-নিবন্ধন সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন, সন্দেহ নাই। অতএব এক্ষণে আপনি ভ্রাতৃগণের সহিত সমাগত হইয়া তাঁহাদিগের তর্পণাদি ক্রিয়া সম্পাদন করুন।

যুধিষ্ঠিরাদি কর্তৃক ধৃতরাষ্ট্রাদির ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়া সমাপন।

দেবর্ষি নারদ এই কথা কহিলে, ধৰ্ম্মপরায়ণ ধর্মরাজ ভ্রাতৃগণ, অন্তঃপুরস্থ কামিনীগণ ও রাজভক্তিপরায়ণ পুরবাসী-গণের সহিত একবস্ত্র পরিধানপূর্ব্বক ভাগীরথীতীরে গমন করিলেন। অনন্তর তাঁহারা সকলেই গঙ্গার পবিত্রজলে অব-গাহনপূর্ব্বক যুযুৎসুকে অগ্রসর করিয়া শাস্ত্রানুসারে অন্ধ-রাজ, গান্ধারী ও কুম্ভীর তর্পণক্রিয়া করিতে লাগিলেন। পরিশেষে সেই উদকক্রিয়া সম্পন্ন হইলে তাঁহারা সকলে তথা হইতে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক নগরের বহির্ভাগে অবস্থান করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ধর্মপরায়ণ মহাত্মা যুধিষ্ঠির বিধিজ্ঞ মানবগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে সুহৃদ্গণ! তোমরা গঙ্গাদ্বারের সন্নিহিত কাননে সমুপস্থিত হইয়া জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কর্তব্য কার্য্যসমুদায় সম্পাদন কর। এই বলিয়া তিনি আত্মীয়গণকে গঙ্গাদ্বারে প্রেরণপূর্ব্বক স্বয়ং নগরের বহির্ভাগে অবস্থান করিতে লাগিলেন। ক্রমে একাদশ দিন অতীত হইল। দ্বাদশ দিনে' ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির পবিত্র বিধিপূর্ব্বক জ্যেষ্ঠ-তাত ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীর শ্রাদ্ধক্রিয়া সম্পাদনপূর্ব্বক ব্রাহ্মণদিগকে দক্ষিণা প্রদান করিলেন।

অনন্তর তিনি ধৃতরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সুবর্ণ, রজত, গাভী ও মহামূল্য শয্যাসমুদায় এবং গান্ধারী ও ভোজনন্দিনী কুন্তীর নামোল্লেখপূর্ব্বক উৎকৃষ্ট বস্তুসমুদায় প্রদান করিলেন। ঐ সময় ব্রাহ্মণগণ শয্যা, খাদ্যদ্রব্য, মণি, রত্ন, যান, আচ্ছাদন ও সমলঙ্কৃত দাসী প্রভৃতি যাহা যাহা প্রার্থনা করিতে লাগিলেন, ধৰ্ম্মরাজ জননী কুন্তী ও গান্ধারীর উদ্দেশ্য তাঁহাদিগকে তৎসমুদায় প্রদান করিলেন।

অনন্তর দানক্রিয়া সমাপন হইলে ধৰ্ম্মরাজ ভ্রাতৃগণ ও অন্যন্য ব্যক্তিদিগের সহিত নগরমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। তাঁহার আদেশানুসারে যে সমুদায় লোক গঙ্গাদ্বারে' গমন করিয়াছিল, তাহারা ধৃতরাষ্ট্রাদির অস্থিসমুদায় গন্ধমাল্যাদি দ্বারা অর্চ্চিত করিয়া গঙ্গায় নিক্ষেপপূর্ব্বক হস্তিনায় প্রত্যাগমন ও নরপতির নিকট সেই বৃত্তান্ত নিবেদন করিল। এই রূপে সমুদায় কার্য্য সম্পন্ন হইলে, দেবর্ষি নারদ ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠিরকে আশ্বাসিত করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। ধৰ্ম্মনন্দন যুধিষ্ঠির মাতা, জ্যেষ্ঠতাত ও অন্যান্য আত্মীয়দিগের নিধননিবন্ধন নিতান্ত দুঃখিত হইয়া রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন।

এইরূপে নরপতি ধৃতরাষ্ট্র কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধাবসানে সমর-নিহত' পুত্র, জ্ঞাতি ও বন্ধুবান্ধবদিগের উদ্দেশ্য বিবিধ বস্তু দান করিয়া পঞ্চদশ বৎসর নগরে ও তিন বৎসর বনে অতিবাহিত করিয়াছিলেন।

নারদাগমন পর্ব্বাধ্যায় সমাপ্ত।
আশ্রমবাসিকপর্ব্ব সমাপ্ত।