মৌষল পর্ব্ব
পর্ব্বাধ্যায় বিভাগ
| মৌষল পর্ব্বাধ্যায় |
মৌষল পর্ব্বাধ্যায়।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! অনন্তর ষত্রিংশ বৎসর সমুপস্থিত হইলে, ধর্মরাজ' বিবিধ দুর্নিমিত্তসমুদায় দর্শন করিতে লাগিলেন। চতুর্দিকে কর্করমিশ্রিত নির্ঘাত'বায়ু প্রবাহিত হইতে লাগিল। পক্ষিগণ দক্ষিণাবর্ত্তমণ্ডল' নির্মাণপূর্ব্বক আকাশে পরিভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিল। মহানদীসমুদায় স্রোতোবিহীন ও দিক্সমুদায় নীহারজালে সমাচ্ছন্ন হইল। অঙ্গারসমাযুক্ত উল্কাসকল গগনমণ্ডল হইতে নিপতিত হইতে লাগিল। সূর্যকিরণ ধূলিজালে সমাচ্ছন্ন হইল। উদয়কালে সূর্য্যের প্রভা তিরোহিত ও সূর্য্যমণ্ডলে কবন্ধসমুদায়' লক্ষিত হইতে লাগিল এবং সূর্য্য ও চন্দ্রের পরিধিমণ্ডল শ্যাম, অরুণ ও ধূসর এই ত্রিবিধ বর্ণে রঞ্জিত হওয়াতে অতি ভয়ানক হইয়া উঠিল। তখন সেই সমুদায় ও অন্যান্য বিবিধপ্রকার দুর্লক্ষণদর্শনে যুধিষ্ঠিরের উদ্বেগের আর পরিসীমা রহিল না।
কিয়দ্দিন পরে তিনি শুনিলেন, বৃষ্ণিবংশ মুষল প্রভাবে বিনষ্ট হইয়াছে। বলদেব ও বাসুদেব উভয়েই ইহলোক পরিত্যাগ করিয়াছেন। তখন তিনি ভ্রাতৃগণকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, হে বীরগণ! ব্রহ্মশাপে বৃষ্ণিবংশ ত একবারে ধ্বংস হইয়া গিয়াছে; এক্ষণে উপায় কি?
যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে অন্যান্য পাণ্ডবগণ ঐ বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া একান্ত দুঃখিত হইলেন। শাঙ্গপাণি বাসুদেবের মৃত্যু সমুদ্রশোষের ন্যায় নিতান্ত অসম্ভব বলিয়া তাঁহাদের বোধ হইতে লাগিল। তখন তাঁহারা সকলেই শোকে একান্ত অভিভূত ও ইতিকৰ্ত্তব্যতাবিমূঢ় হইয়া বিষণ্ণবদনে অবস্থান করিতে লাগিলেন।
জনমেজয় কহিলেন, ভগবন্! মহাত্মা বাসুদেব বিদ্যমান থাকিতে মহারথ অন্ধক, বৃষ্ণি ও ভোজবংশীয়েরা কি নিমিত্ত নিহত হইল?
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ। রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজ্য-লাভের পর ত্রিংশ বৎসর সমুপস্থিত হইলে, বৃষ্ণিবংশমধ্যে কালপ্রভাবে ঘোরতর দুর্নীতি সমুপস্থিত হইয়াছিল, তাঁহারা সেই দুর্নীতিনিবন্ধন পরস্পর পরস্পরের বিনাশসাধন করেন।
জনমেজয় কহিলেন, ব্রহ্মন্। বৃষ্ণি, অন্ধক ও ভোজ-বংশীয় মহাবীরগণ তৎকালে কাহার শাপে কালকবলে নিপতিত হইলেন, তাহা আপনি বিস্তারিতরূপে কীর্ত্তন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! একদা মহর্ষি বিশ্বামিত্র, কণ্ঠ ও তপোধন নারদ দ্বারকানগরে গমন করেন। সারণ প্রভৃতি কতিপয় মহাবীর তাঁহাদিগকে দর্শন করিয়া দৈবদুর্ব্বিপাকবশতঃ শাম্বকে স্ত্রীবেশ ধারণ করাইয়া তাঁহাদিগের নিকট গমনপূর্ব্বক কহিলেন, হে মহর্ষিগণ। ইনি অমিতপরাক্রম বজ্রর পত্নী। মহাত্মা বজ্র পুত্রলাভে নিতান্ত অভিলাষী হইয়াছেন। অতএব আপনারা বলুন, ইনি কি প্রসব করিবেন?
সারণ প্রভৃতি বীরগণ এই কথা কহিলে, সেই সর্ব্বজ্ঞ ঋষিগণ আপনাদিগকে প্রতারিত বিবেচনা করিয়া রোষভরে তাঁহাদিগকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, দুর্বৃত্তগণ! এই বাসুদেব-তনয় শাম্ব, বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশ বিনাশের নিমিত্ত ঘোরতর লৌহময় মুষল প্রসব করিবে। ঐ মুষলপ্রভাবে মহাত্মা বলদেব ও জনার্দ্দন ভিন্ন যদুবংশের আর সকলেই এককালে উৎসন্ন হইবে। মহাত্মা বলদেব যোগবলে কলেবর পরিত্যাগ করিয়া সমুদ্রে প্রবিষ্ট হইবেন এবং বাসুদেব ভূতলে শয়ন করিয়া জরানামক ব্যাধের শরে বিদ্ধ হইয়া পরলোকে গমন করিবেন।
মুনিগণ রোষারুণনেত্রে' সারণাদিগকে এই কথা কহিয়া হৃষীকেশের নিকট সমুপস্থিত হইলেন। মহাত্মা মধুসুদন তাঁহা-দিগের নিকট ঐ বৃত্তান্ত অবগত হইয়া উহা অবশ্যম্ভাবী বিবেচনা করিয়া বৃষ্ণিবংশীয়দিগকে কহিলেন যে, মুনিগণ যাহা কহিয়াছেন, নিশ্চয়ই তাহা ঘটিবে। এই কথা কহিয়া তিনি সেই শাপ-নিবারণের কোন উপায় উদ্ভাবনে সচেষ্ট না হইয়া পুরোমধ্যে প্রবেশ করিলেন।
অনন্তর পরদিন প্রভাতে শাম্ব বৃষ্ণ্যন্ধককুলনাশক এক ঘোরতর মুষল প্রসব করিলেন। ঐ মুষল প্রসূত হইবামাত্র নরপতি সন্নিধানে সমানীত হইল। তখন তিনি রাজপুরুষ-গণদ্বারা সেই মুষল চূর্ণ করাইয়া সমুদ্রে নিক্ষেপ করাইলেন। ঐ সময় আহুক, জনার্দ্দন, বলদেব ও বজ্রর বাক্যানুসারে নগরমধ্যে এই ঘোষণা হইল যে, আজি অবধি নগরমধ্যে কোন ব্যক্তি সুরা প্রস্তুত করিতে পারিবে না। যে কেহ আমাদের অজ্ঞাতসারে সুরা প্রস্তুত করিবে, তাহাকে সবান্ধবে শূলে আরোপিত করা যাইবে। এইরূপ ঘোষণা হইলে নগরবাসী লোকসমুদায় সেই শাসন শিরোধার্য্য করিয়া সুরা প্রস্তুতকরণে এককালে বিরত হইল।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! বৃষ্ণি ও অন্ধকগণ এইরূপে সাবধান হইয়া অবস্থান করিতে আরম্ভ করিলে, কৃষ্ণপিঙ্গলবর্ণ মুণ্ডিতশিরাঃ বিকটাকার কালপুরুষ প্রতিনিয়ত তাঁহাদিগের গৃহে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা কোন কোন সময়ে ঐ পুরুষকে দেখিতে পাইতেন এবং কখন কখন তিনি তাঁহাদিগের দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইতেন। ঐ পুরুষ দৃষ্টিপথে নিপতিত হইলেই তাঁহারা তাঁহার প্রতি অসংখ্য শর নিক্ষেপ করিতেন; কিন্তু কোনরূপেই তাঁহাকে বিদ্ধ করিতে পারিতেন না। অনন্তর দিনে দিনে সেই নগরমধ্যে যদুবংশের বিনাশসূচক ভয়ঙ্কর ঝঞ্ঝাবাত প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল। পথিমধ্যে অসংখ্য মূষিক ও ভগ্ন মৃৎপাত্রসমুদায় দৃষ্টিগোচর হইতে লাগিল। রাত্রিযোগে মূষিকেরা গৃহমধ্যে নিদ্রিত ব্যক্তিদিগের কেশ ও নখ ছেদনপূর্ব্বক ভক্ষণ করিেেত লাগিল। গৃহসারিকাগণ দিবারাত্রি অপ্রীতিকর শব্দে রোদন করিতে লাগিল। সারসেরা উলুকের ন্যায় ও ছাগগণ শৃগালের ন্যায় চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। কালপ্রেরিত রক্তপাদ পাণ্ডুবর্ণ কপোতগণ সতত যাদবদিগের গৃহমধ্যে বিচরণ করিতে প্রবৃত্ত হইল এবং গাভীর গর্তে রাসভ', অশ্বতরীর গর্তে করভকুকুরীর গর্তে বিড়াল ও নকুলীর" গর্তে মূষিক” উদ্ভূত হইতে লাগিল।
ঐ সময় কৃষ্ণ ও বলদেব ব্যতীত যদুবংশীয় আর আর সকলেই ব্রাহ্মণ, দেবতা ও পিতৃগণের দ্বেষ এবং লজ্জা-ভয় পরিত্যাগপূর্ব্বক পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান ও গুরুজনকে অবজ্ঞা করিতে লাগিলেন। পত্নীগণ পতিসংসর্গ ও পতিগণ পত্নীসংসর্গ পরিত্যাগ করিতে লাগিল। যাজককর্তৃক প্রজ্বালিত হুতাশন নীল, লোহিত ও হরিদ্বর্ণ শিখা প্রকটিত করিয়া বামভাগে প্রবণ হইতে লাগিল, সূর্য্যকে প্রতিদিন উদয় ও অস্তগমনসময়ে কবন্ধগণে পরিবৃত বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। পাকশালামধ্যে সুসংস্কৃত অন্নসমুদায় আহার করিবার সময় তন্মধ্যে সহস্র সহস্র কীট লক্ষিত হইতে লাগিল। মহাত্মাদিগের জয় ও পুণ্যাহবাক্য কীর্ত্তন করিবার সময় অসংখ্য লোক সেই স্থান দিয়া ধাবমান হইতেছে বলিয়া বোধ হইতে লাগিল, কিন্তু কেহই কাহারও দৃষ্টিপথে নিপতিত হইল না। যাদবগণ সকলেই নক্ষত্রসমুদায়কে পরস্পর নিপীড়িত দর্শন করিতে লাগিলেন, কিন্তু' স্বীয় জন্মনক্ষত্র কাহারও দৃষ্টিগোচর হইল না'। তাঁহাদিগের গৃহমধ্যে পাঞ্চজন্য নিনাদিত হইলে, চতুৰ্দ্দিকে রাসভগণ ভয়ঙ্করশব্দে চীৎকার করিতে লাগিল।
ঐ সময় একদা ত্রয়োদশীতে অমাবস্যার সংযোগ হইলে মহাত্মা বাসুদেব উহা নিতান্ত দুর্লক্ষণ বিবেচনা করিয়া বৃষ্ণিগণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, হে বীরগণ! ভারতযুদ্ধকালে রাহু যেরূপ দিনে দিবাকরকে গ্রাস করিয়াছিলেন, এক্ষণে আমাদিগের ক্ষয়ের নিমিত্ত সেইরূপ দিন সমুপস্থিত হইয়াছে। তিনি তাঁহাদিগের এই কথা কহিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, এতদিনের পর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধাবসানে ষত্রিংশ বর্ষ পরি পূর্ণ হইল। পূর্ব্বে গান্ধারী পুত্রশোকে নিতান্ত কাতরা হইয়া যাহা কহিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহা সফল হইবার উপক্রম হইয়াছে। সৈন্যসমুদায় ব্যূহিত' হইলে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ভয়ঙ্কর দুর্নিমিত্তদর্শনে যাহা কহিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহার অনুরূপ ঘটনা দর্শন করিতেছি।
মহাত্মা মধুসূদন মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিয়া যদুকুল ধ্বংস করিবার বাসনায় বৃষ্ণিগণকে প্রভাস তীর্থে যাত্রা করিতে আদেশ করিলেন। তখন বৃষ্ণিগণও বাসুদেবের আজ্ঞানুসারে সকলকে প্রভাস তীর্থে গমন করিতে হইবে বলিয়া নগরের চতুর্দিকে ঘোষণা করিতে লাগিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! ঐ সময় প্রতিদিন রজনীযোগে বৃষ্ণিবংশীয় দিগের দুঃস্বপ্ন দর্শন হইতে লাগিল। কামিনীগণ নিদ্রিতাবস্থায় দেখিতে লাগিলেন যেন, এক শুভ্রদশনা কৃষ্ণবর্ণা রমণী হাস্য করিতে করিতে তাঁহাদের মঙ্গলসূত্র' অপহরণপূর্ব্বক ধাবমান হইতেছে এবং পুরুষগণ দেখিতে লাগিলেন যেন, ভয়ঙ্কর গৃধগণ অগ্নিহোত্রগৃহ ও বাসগৃহমধ্যে তাঁহাদিগকে ভক্ষণ করিতেছে। এইরূপ দুঃস্বপ্নদর্শনে তাঁহাদের চিন্তার আর পরিসীমা রহিল না। অনন্তর ভীষণাকার রাক্ষস-গণ তাঁহাদিগের অলঙ্কার, ছত্র, ধ্বজ ও কবচসমুদায়” অপহরণ করিয়া পলায়ন করিতে লাগিল। বাসুদেবের অগ্নিদত্ত বজ্রতুল্য চক্র, সকলের সমক্ষেই আকাশে গমন করিল। উঁহার অশ্ব-সমুদায় দারুকের সমক্ষেই আদিত্যবর্ণ রথ লইয়া সাগরের উপরিভাগ দিয়া প্রস্থান করিল এবং অপ্সরোগণ বলদেবের তালধ্বজ ও বাসুদেবের গরুড়ধ্বজ অপহরণপূর্ব্বক দিবারাত্রি যাদবগণকে তীর্থযাত্রা করিতে আদেশ করিতে লাগিল।
এইরূপ দুর্নিমিত্তসমুদায় উপস্থিত হইলে, বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয় বীরগণ সকলেই সপরিবারে তীর্থ যাত্রা করিতে ইচ্ছা করিয়া বিবিধ ভক্ষ্য-ভোজ্য, পানীয় ও মদ্যমাংস প্রস্তুত করিতে লাগিলেন এবং অচিরাৎ হস্তী, অশ্ব ও রথারোহী অসংখ্য সৈন্যে পরিবৃত হইয়া নগর হইতে বহির্গত হইলেন। তৎকালে তাঁহাদের সৈন্যসমুদায়ের শোভার আর পরিসীমা রহিল না। অনন্তর তাঁহারা সকলে সেই প্রভাস তীর্থে সমুপস্থিত হইয়া ভিন্ন ভিন্ন গৃহে অবস্থানপূর্ব্বক স্ত্রীগণের সহিত অনবরত পানভোজন করিতে লাগিলেন।
ঐ সময় যোগবিদ্ অর্থতত্ত্ব-বিশারদ মহাত্মা উদ্ধব যাদব-গণকে প্রভাস তীর্থে অবস্থিত অবগত হইয়া তথায় গমনপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে সম্ভাষণ করিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলেন। তখন মহাত্মা বাসুদেব কালবিপর্যয়নিবন্ধন তাঁহাকে নিবারণ করা অকর্তব্য বিবেচনা করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাকে অভিবাদন করিলেন। মহাত্মা উদ্ধব বাসুদেবকর্তৃক এইরূপে সম্মানিত হইয়া, তেজোদ্বারা শূন্যমার্গ আচ্ছাদনপূর্ব্বক তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। তৎপরে মহারথ যাদবগণ কালের বশীভূত হইয়া ব্রাহ্মণের নিমিত্ত সমাহৃত অন্নসমুদায় সুরামিশ্রিত করিয়া বানরদিগকে প্রদান করিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে প্রভাস তীর্থে নট, নর্তক ও মত্ত ব্যক্তিগণে পরিপূর্ণ এবং অসংখ্য তৃরীশব্দে প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। বলদেব সাত্যকি, গদ, বজ্র ও কৃতবর্মা বাসুদেবের সমক্ষেই সুরাপান আরম্ভ করিলেন। পরিশেষে সাত্যকি সর্ব্বাপেক্ষা অধিক মত্ত হইয়া কৃতবর্মাকে উপহাস ও অবমাননা করিয়া কহিলেন, হাৰ্দ্দিক্য। ক্ষত্রিয়মধ্যে কেহই এরূপ নিৰ্দ্দয় নাই যে, নিদ্রিত ব্যক্তিদিগকে বিনাশ করিতে পারে। অতএব তুমি যে কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছ, যাদবগণ কখনই তাহা সহ্য করিবেন না।
সাত্যকি এই কথা কহিলে, মহারথ, প্রদ্যুম্ন ও কৃতবর্মাকে অবজ্ঞা করিয়া সাত্যকির বাক্যের প্রশংসা করিতে লাগিলেন। তখন মহাবীর কৃতবর্মা অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া বামহস্ত সঞ্চালন-দ্বারা সাত্যকির ঐ বাক্যে অনাস্থা প্রদর্শনপূর্ব্বক তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, শৈনেয়। মহারাজ ভূরিশ্রবাঃ ছিন্নবাহু হইয়া সংগ্রামে প্রায়োপবেশন করিলে, যখন তুমি তাঁহার মস্তক ছেদন করিয়াছ, তখন তোমার তুল্য নৃশংস আর কেহই নাই। কৃতবর্মা এই কথা কহিলে, মহাত্মা বাসুদেব তাহার বাক্যশ্রবণে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া তির্য্যগ্'ভাবে তাঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তখন সাত্যকি স্যমন্তকমণির অপহরণবৃত্তান্ত উল্লেখ করিয়া কৃতবর্মা অক্রুরদ্বারা যেরূপে মহারাজ সত্রাজিতের বিনাশসাধন করিয়াছিলেন, তাহা আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করিতে লাগিলেন। সত্রাজিতের দুহিতা সত্যভামা সাত্যকির মুখে সেই পিতৃবধবৃত্তান্ত শ্রবণ করিবামাত্র কোপাবিষ্টচিত্তে রোদন করিতে করিতে বাসুদেবের ক্রোড়ে উপবিষ্ট হইয়া তাঁহার কোপানল উদ্দীপিত করিলেন। তখন সাত্যকি সহসা গাত্রোত্থান করিয়া সত্যভামাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভদ্রে। আমি শপথ করিয়া কহিতেছি, আজি ঐ পাপপরায়ণ কৃতবর্ম্মাকে দ্রৌপদ্রীর পাঁচ পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডীর পথের পথিক করিব। পূর্ব্বে এই দুরাত্মা দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামাকে সহায় করিয়া শিবিরমধ্যে নিদ্রিত ব্যক্তিদিগকে নিহত করিয়াছিল। সেই পাপে আজি ইহার আয়ুঃ ও যশঃ নিঃশেষিত হইয়াছে।
মহাবীর সত্যকি এই বলিয়া বাসুদেবের সমক্ষেই খড়্গ দ্বারা কৃতবর্মার মস্তক ছেদনপূর্ব্বক অন্যান্য বীরগণকে প্রহার করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা বাসুদেব তাঁহাকে নিবারণ করিবার নিমিত্ত তাঁহার নিকট ধাবমান হইলেন। ঐ সময় সেই মদমত্ত ভোজ ও অন্ধকবংশীয়গণ কালপ্রভাবে বিমোহিত হইয়া সাত্যকিকে পরিবেষ্টন করিলেন। মহাত্মা বাসুদেব কালের গতি বিবেচনা করিয়া তদ্দর্শনে কিছুমাত্র ক্রুদ্ধ হইলেন না। তখন তাঁহারা সকলে সমবেত হইয়া উচ্ছিষ্টপাত্রদ্বারা সাত্যকিকে নিপীড়ন করিতে লাগিলেন।
মহাবীর সাত্যকি এইরূপে ভোজ ও অন্ধকগণকর্তৃক নিপীড়িত হইলে রুক্মিণীনন্দন মহারথ প্রদ্যুম্ন যুযুধানের পরিত্রাণার্থ সংগ্রামস্থলে সমুপস্থিত হইয়া বাহ্বাস্ফোটন' পূর্ব্বক ভোজদিগের সহিত ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ করিলেন। মহাবীর সাত্যকিও বাহ্বাস্ফোটনপূর্ব্বক অন্ধকদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ সময় ভোজ ও অন্ধকদিগের সংখ্যা অধিক ছিল বলিয়া মহাবীর প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকি তাঁহাদিগকে কোনক্রমে পরাজয় করিতে পারিলেন না। ঐ বীরদ্বয় কিয়ৎক্ষণমাত্র সংগ্রাম করিয়া পরিশেষে বাসুদেবের সমক্ষেই সেই ভোজ ও অন্ধকগণকর্তৃক নিহত হইয়া ভূতলে শয়ন করিলেন।
তখন মহাত্মা বাসুদেব স্বীয় পুত্র প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকিকে বিনষ্ট দেখিয়া কোপাবিষ্টচিত্তে একমুষ্টি এরকা' গ্রহণ করিলেন। বাসুদেব এরকা মুষ্টি গ্রহণ করিবামাত্র উহা মুষলরূপে পরিণত হইল। তখন তিনি তদ্দ্বারা সম্মুখবর্তী ভোজ ও অন্ধকগণকে নিপাতিত করিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় অন্ধক, ভোজ, শৈনেয় ও বৃষ্ণিগণও কালবশতঃ পরস্পর সেই এরকাঘাতে বিনষ্ট হইতে লাগিলেন। তৎকালে কোন ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হইয়া একটিমাত্র এরকা গ্রহণ করিলেও উহা বজ্রের ন্যায় লক্ষিত হইতে লাগিল। ফলতঃ ঐ স্থানের সমুদায় এরকাই ব্রহ্মশাপ-প্রভাবে মুষলরূপে পরিণত হইয়াছিল। ঐ সময় বীরগণ কোপাবিষ্ট হইয়া যে সকল এরকা নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন, তৎসমুদায়ই মুষল ও বজ্রস্বরূপ হইয়া অভেদ্য পদার্থ ভেদ করিতে লাগিল। পিতা পুত্রকে ও পুত্র পিতাকে বিনাশ করিতে আরম্ভ করিলেন।
কুকুর ও অন্ধকবংশীয় বীরগণ মত্ত হইয়া অনলে নিপাতিত পতঙ্গের ন্যায় প্রাণত্যাগ করিতে লাগিলেন। তৎকালে তথা হইতে পলায়ন করিতে কাহারও প্রবৃত্তি হইল না। ঐ সময় মহাত্মা মধূসূদন কালের গতি পরিজ্ঞাত হইয়া মুষলীভূত এরকা গ্রহণপূর্ব্বক সেই ঘোরতর হত্যাকাণ্ড দর্শন করিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে তাঁহার সমক্ষেই এরকাঘাতে শাম্ব, চারুদেষ্ণ, অনিরুদ্ধ ও গদের প্রাণবিয়োগ হইল। তখন তিনি স্বচক্ষে তাহাদের মৃত্যু দর্শন করিয়া কোপাবিষ্টচিত্তে তত্রত্য সমুদায় বীরের প্রাণসংহার করিলেন। ঐ সময় মহাত্মা বজ্র ও দারুক মহামতি মধুসূদনের সমীপে দণ্ডায়মান ছিলেন। তাঁহারা সেই বীরসমুদায়কে নিহত দেখিয়া দুঃখিতচিত্তে বাসুদেবকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, জনার্দ্দন। এক্ষণে ত আপনি অসংখ্য লোকের প্রাণসংহার করিলেন; অতঃপর চলুন আমরা তিনজনে মহাত্মা বলভদ্রের নিকট গমন করি।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহাত্মা বভ্রু ও দারুক এই কথা কহিলে, মহামতি বাসুদেব তাঁহাদের বাক্যে সম্মত হইয়া তাঁহাদিগের সহিত অমিতপরাক্রম বলভদ্রের উদ্দেশ্যে গমন করিয়া ইতস্ততঃ বিচরণ করিতে করিতে দেখিলেন, ঐ মহাবীর অতি নির্জন প্রদেশে বৃক্ষমূলে উপবিষ্ট হইয়া চিন্তা করিতেছেন। মহাত্মা হৃষীকেশ বলভদ্রকে তদবস্থ দেখিয়া দারুককে সম্বোধন-পূর্ব্বক কহিলেন, সারথে! তুমি সত্বর হস্তিনানগরে গমন করিয়া অর্জুনের নিকট যাদবদিগের বিনাশবৃত্তান্তসমুদায় নিবেদন কর। তাহা হইলে তিনি অবিলম্বে দ্বারকায় আগমন করিবেন। বাসুদেব এইরূপ আদেশ করিলে দারুক অবিলম্বে রথারোহণে কৌরবরাজধানীতে প্রস্থান করিলেন।
তখন মহাত্মা কেশব সমীপস্থিত বজ্রকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভদ্র। তুমি অবিলম্বে অন্তঃপুর কামিনীগণের রক্ষার্থ গমন কর। দস্যুগণ যেন ধনলোভে তাহাদিগকে হিংসা না করে।
মহাবীর বজ্র ঐ সময় মদমত্ত ও জ্ঞাতিবধনিবন্ধন নিতান্ত দুঃখিত হইয়া জনাৰ্দ্দনের নিকট উপবেশনপূর্ব্বক বিশ্রাম করিতেছিলেন। মহাত্মা মধুসূদন এই কথা কহিবামাত্র তিনি যেমন স্ত্রীগণের রক্ষার্থ ধাবমান হইলেন, অমনি সেই ব্রহ্মশাপসম্ভূত মুষল এক ব্যাধের লৌহময় মুদ্গরে আবির্ভূত ও তাঁহার গাত্রে নিপতিত হইয়া তাঁহার প্রাণসংহার করিল। তখন মহাত্মা হৃষীকেশ বভ্রুকে নিহত নিরীক্ষণ করিয়া স্বীয় অগ্রজ বলদেবকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহাত্মন্! আমি যে কাল পর্যন্ত কাহারও প্রতি স্ত্রীগণের রক্ষণাবেক্ষণ ভার সমর্পণ করিয়া প্রত্যাগমন না করি, সেই কাল পর্যন্ত আপনি এই স্থানে আমার প্রতীক্ষা করুন।
এই কথা কহিয়া বাসুদেব অচিরাৎ নগরমধ্যে প্রবেশ-পূর্ব্বক পিতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, মহাশয়। যে পর্য্যন্ত ধনঞ্জয় এখানে আগমন না করেন, সেই পর্যন্ত আপনি অন্তঃপুরস্থ কামিনীদিগকে রক্ষা করুন। জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলদেব বনমধ্যে আমার নিমিত্ত প্রতীক্ষা করিতেছেন; অতএব আমি এক্ষণে তাঁহার নিকট চলিলাম। পূর্ব্বে আমি কুরু-পাণ্ডবযুদ্ধে কৌরব ও অন্যান্য নরপতিগণের নিধন দর্শন করিয়াছি, এক্ষণে আবার আমাকে যদুবংশের নিধনও প্রত্যক্ষ করিতে হইল। আজি যাদবগণের বিরহে এই পুরী আমার চক্ষুর শল্য'স্বরূপ বোধ হইতেছে। অতএব আমি অচিরাৎ বনগমন করিয়া বলদেবের সহিত তীব্রতর তপোনুষ্ঠান করিব।
মহামতি বাসুদেব এই কথা কহিয়া, পিতার চরণবন্দন-পূর্ব্বক অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন। তিনি বহির্গত হইবামাত্র অন্তঃপুরমধ্যে বালক ও বনিতাদিগের ঘোরতর আর্তনাদ সমুত্থিত হইল। তখন ধীমান্ বাসুদেব অবলাগণের রোদনশব্দ শ্রবণে পুনরায় প্রতিনিবৃত্ত হইয়া, তাঁহাদিগকে কহিলেন, হে সীমন্তিনীগণ! মহাত্মা ধনঞ্জয় এই নগরে আগমন করিতেছেন, তিনি তোমাদিগের দুঃখমোচন করিবেন। অতএব তোমরা আর রোদন করিও না।
এই কথা কহিয়া মহামতি মধুসূদন অবিলম্বে নির্জন বনপ্রদেশে গমন করিয়া দেখিলেন, বলদেব যোগাসনে আসীন রহিয়াছেন এবং তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে এক বৃহদাকার শ্বেতবর্ণ সর্প বিনির্গত হইতেছে। ঐ সর্পের মস্তক সহস্রসংখ্যক ও মুখ রক্তবর্ণ। সর্প দেখিতে দেখিতে বলদেবের মুখ হইতে বহির্গত হইয়া সমুদ্রাভিমুখে ধাবমান হইল। তখন সাগর, দিব্য নদীসমুদায় জলাধিপতি বরুণ এবং কর্কেটিক, বাসুকি, তক্ষক, পৃথুশ্রবাঃ, বরুণ, কুঞ্জর, মিশ্রী, শঙ্খ, কুমুদ, পুণ্ডরীক, ধৃতরাষ্ট্র, হ্রাদ, ক্রাথ, শিতিকণ্ঠ, উগ্রতেজাঃ, চক্ৰমন্দ, অতিষণ্ড, দুর্মুখ ও অম্বরীষ প্রভৃতি নাগগণ সেই সর্পকে প্রত্যুদ্গমনপূর্ব্বক স্বাগতপ্রশ্ন ও পাদ্য অর্থ্যাদি দ্বারা অর্চ্চনা করিতে লাগিলেন।
এইরূপে সেই সর্প বলদেবের মুখ হইতে বহির্গত হইলে তাঁহার দেহ নিতান্ত নিশ্চেষ্ট হইল। তখন সর্ব্বজ্ঞ দিব্যচক্ষুঃ ভগবান্ বাসুদেব জ্যেষ্ঠভ্রাতা দেহত্যাগ করিলেন বিবেচনা করিয়া চিন্তাকুলিতচিত্তে সেই বিজনবনে পরিভ্রমণ করিতে করিতে ভূতলে উপবেশন করিলেন।
ঐ সময় পূর্ব্বে গান্ধারী তাঁহাকে যাহা কহিয়াছিলেন এবং তিনি উচ্ছিষ্টপায়স পদতলে লিপ্ত না করাতে দুর্ব্বাসাঃ যে সমুদায় বাক্য প্রয়োগ করিয়াছিলেন, সেই সমুদায় তাঁহার স্মৃতিপথে সমুদিত হইল। তখন তিনি নারদ, দুর্ব্বাসাঃ ও কণ্ঠের বাক্য প্রতিপালন, তাঁহার স্বর্গগমনবিষয়ে দেবাতাদিগের সন্দেহভঞ্জন ও ত্রিলোকপালন করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে মর্ত্যলোক পরিত্যাগ করিতে হইবে, বিবেচনা করিয়া ইন্দ্রিয়সংযম ও মহাযোগ অবলম্বনপূর্ব্বক ভূতলে শয়নে করিলেন। ঐ সময় জরা নামক ব্যাধ মৃগবিনাশবাসনায় সেই স্থানে সমাগত হইয়া দূর হইতে যোগাসনে শয়ান কেশবকে অবলোকেনপূর্ব্বক মৃগ জ্ঞান করিয়া তাঁহার প্রতি শর নিক্ষেপ করিল। ঐ শর নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র উহাদ্বারা হৃষীকেশের পদতল বিদ্ধ হইল। তখন সেই ব্যাধ মৃগগ্রহণবাসনায় সত্বর তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিল, এক অনেকবাহুসম্পন্ন, পীতাম্বরধারী, যোগাসনে শয়ান পুরুষ তাহার শরে বিদ্ধ হইয়াছেন। লুব্ধক তাঁহাকে দর্শন করিবামাত্র আপনাকে অপরাধী বিবেচনা করিয়া শঙ্কিতমনে তাঁহার চরণে নিপতিত হইল।
তখন মহাত্মা মধুসূদন তাহাকে আশ্বাসপ্রদানপূর্ব্বক অচিরাৎ আকাশমণ্ডল উদ্ভাসিত করিয়া স্বর্গে গমন করিলেন। ঐ সময় ইন্দ্র অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং রুদ্র, আদিত্য, বসু, বিশ্বদেব, মুনি, সিদ্ধ, গন্ধর্ব্ব ও অপ্সরোগণ তাঁহার প্রত্যুদ্গমনার্থ নির্গত হইলেন। তখন ভগবান্ নারায়ণ তাঁহাদের কর্তৃক সৎকৃত হইয়া তাঁহাদের সহিত স্বীয় অপ্রমেয় স্থানে সমুপস্থিত হইলেন। দেবতা, মহর্ষি, সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরাঃ, ও সাধ্যগণ তাঁহার যথোচিত পূজা করিতে লাগিলেন; মুনিগণ ঋগ্বেদপাঠ ও গন্ধর্ব্বগণ সঙ্গীতদ্বারা তাঁহার স্তব করিতে আরম্ভ করিলেন এবং দেবরাজ ইন্দ্রে আহ্লাদিতচিত্তে তাঁহার অভিনন্দনে প্রবৃত্ত হইলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এদিকে কৃষ্ণসারথি দারুক হস্তিনায় সমুপস্থিত হইয়া পাণ্ডবগণের নিকট যদুকুলের নিধন-বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলে পাণ্ডবগণ উহা শ্রবণ করিয়া নিতান্ত শোকসন্তপ্ত ও ব্যাকুলিতচিত্ত হইলেন। তখন বাসুদেবের প্রিয়সখা মহাবীর ধনঞ্জয় ভ্রাতৃগণকে আমন্ত্রণপূর্ব্বক মাতুল বাসুদেবের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত দারুকের সহিত দ্বারকাভিমুখে যাত্রা করিলেন। অনন্তর তিনি দ্বারকায় সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ঐ নগরী অনাথা রমণীর ন্যায় নিতান্ত হীনদশা প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐ সময় বাসুদেবের অন্তঃপুরস্থ রমণীগণ তাঁহার বিরহে নিতান্ত কাতর হইয়াছিলেন; তাঁহারা অর্জুনকে দর্শন করিবামাত্র উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। বাসুদেবের যে ষোড়শসহস্র মহিষী ছিলেন, তাঁহারা অর্জুনকে সমাগত দেখিয়া হাহাকার করিতে আরম্ভ করিলেন। সেই পতি-পুত্রবিহীনা রমণীগণের আর্তনাদ শ্রবণে অর্জুনের নয়নযুগল বাষ্পাবারিতে পরিপূর্ণ হওয়াতে তিনি তৎকালে কিছুমাত্র দর্শন করিতে সমর্থ হইলেন না। ঐ সময় সেই বীরশূন্য দ্বারকাপুরীকে বৈতরণী' নদীর' ন্যায় তাঁহার বোধ হইতে লাগিল। তিনি বৃষ্ণি ও অন্ধকগণকে উহার জল, অশ্বসমুদায়কে মৎস্য, রথসমুদায়কে উডুপ, বাদিত্র ও রথনির্ঘোষকে তরঙ্গ, গৃহসোপানসমুদায়কে মহাহ্রদ, রত্ন-সমুদায়কে শৈবাল', পথসমুদায়কে আবর্ত্ত, চত্বর 'সমুদায়কে স্তিমিত' হ্রদ' এবং বলদেব ও বাসুদেবকে মহানক্র বলিয়া বোধ করিতে লাগিলেন। অনন্তর তিনি সেই দ্বারকাপুরী ও বাসুদেবের বনিতাদিগকে হেমন্তকালীন” নলিনীর ন্যায় নিতান্ত শ্রীভ্রষ্ট ও প্রভাশূন্য দর্শন করিয়া বাষ্পাকুলিতলোচনে রোদন করিতে করিতে ধরাতলে নিপতিত হইলেন। তখন বাসুদেব মহিষী সত্যভামা রুক্মিণী ও অন্যান্য রমণীগণ অর্জুনের নিকট বেগে ধাবমান হইয়া তাঁহাকে পরিবেষ্টনপূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ রোদন করিলেন এবং তৎপরে তাঁহাকে ধরাতল হইতে উত্থাপনপূর্ব্বক কাঞ্চনময় পীঠে উপবেশন করাইয়া তাঁহার চতুর্দিকে অবস্থান করিতে লাগিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, হে মহারাজ! অনন্তর মহাত্মা অর্জুন মনে মনে বাসুদেবের স্তব করিয়া স্ত্রীগণকে আশ্বাস-প্রদানপূর্ব্বক মাতুলের সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে তাঁহার গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিলেন, মহাত্মা বসুদেব পুত্রশোকে নিতান্ত সন্তপ্ত হইয়া শয়ান রহিয়াছেন। তাঁহাকে তদবস্থ দেখিয়া ধনঞ্জয়ের দুঃখের আর পরিসীমা রহিল না। তখন তিনি বাষ্পপূর্ণনয়নে রোদন করিতে করিতে তাঁহার চরণযুগল বন্দনা করিলেন।
মহাত্মা বসুদেব ভাগিনেয় অর্জুনকে সমাগত দেখিয়া নিতান্ত দৌর্ব্বল্যনিবন্ধন তাঁহার মস্তকাঘ্রাণ করিতে সমর্থ না হইয়া তাঁহাকে আলিঙ্গনপূর্ব্বক পুত্র, পৌত্র, দৌহিত্র' ও বান্ধবগণের নিমিত্ত রোদন করিতে করিতে কহিলেন, ধনঞ্জয়! যাহারা অসংখ্য ভূপতি ও দানবগণকে পরাজিত করিয়াছিল, আজি আমি তাহাদিগকে না দেখিয়াও জীবিত রহিয়াছি। তুমি যে প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকিকে প্রিয়শিষ্য বলিয়া সর্ব্বদা প্রশংসা করিতে এবং যাহারা বৃষ্ণিবংশের অতিরথ' বলিয়া বিখ্যাত ও বাসুদেবের নিতান্ত প্রিয়পাত্র ছিল, এক্ষণে তাহাদিগেরই দুর্নীতিনিবন্ধন এই যদুবংশের ক্ষয় হইয়াছে। অথবা উহাদের এ বিষয়ে দোষ কি? ব্রহ্মশাপই উহার মূল কারণ।
পূর্ব্বে যে কৃষ্ণ মহাবল পরাক্রান্ত কেশী, কংস, শিশুপাল, নিষাদরাজ একলব্য, কাশিরাজ, কালিঙ্গগণ, মাগধগণ, গান্ধারগণ এবং প্রাচ্য, দক্ষিণাত্য ও পার্ব্বতীয় ভূপালগণকে নিহত করিয়াছিলেন; এক্ষণে তিনিই এই যদুকুল ক্ষয় হইতে দেখিয়া উপেক্ষা করিয়াছেন। তুমি, দেবর্ষি নারদ ও অন্যান্য মহর্ষিগণ তোমরা সকলেই যাঁহাকে সনাতন দেবদেব বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাক, তিনি এক্ষণে স্বচক্ষে জ্ঞাতিবধ প্রত্যক্ষ করিয়া উপেক্ষা করিলেন। বোধ হয়, গান্ধারী ও ঋষিগণের বাক্য অন্যথা করিতে তাঁহার বাসনা হয় নাই।
তোমার পৌত্র পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রদ্বারা দগ্ধ হইলে তিনিই তাঁহার জীবনদান করিয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে স্বীয় পরিজনদিগকে রক্ষা করিতে তাঁহার বাসনা হইল না। তাঁহার পুত্র পৌত্র, সখা ও ভ্রাতৃগণ সকলে নিহত হইলে তিনি আমার নিকট আগমনপূর্ব্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, "পিতঃ! আজি এই যদুকুল একবারে নিঃশেষিত হইল; আমার প্রিয়সখা অর্জুন দ্বারকায় আগমন করিলে আপনি তাঁহার নিকট এই কুলক্ষয়ের বিষয় আনুপূর্ব্বিক কীর্ত্তন করিবেন। আমি অর্জুনের নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছি। তিনি এই নিদারুণ সংবাদ শ্রবণ করিলে কখনই হস্তিনায় অবস্থান করিতে পারিবেন না। অর্জুনের সহিত আমার কিছুমাত্র প্রভেদ নাই, অতএব ঐ মহাত্মা এ স্থানে আগমন করিয়া যাহা কহিবেন, আপনি অবিচারিতচিত্তে তাহার অনুষ্ঠান করিবেন। তাঁহার দ্বারাই আপনার ঔর্দ্ধদেহিক কার্য্য সম্পাদন এবং এই বালক ও রমণী-গণের রক্ষা হইবে। তিনি এই স্থান হইতে প্রতিগমন করিবামাত্র এই অসংখ্য প্রাচীর-অট্টালিকাসম্পন্ন দ্বারকাপুরী সমুদ্রজলে প্লাবিত হইয়া যাইবে। আমি এক্ষণে বলদেবের সহিত কোন পবিত্রস্থানে সমুপস্থিত হইয়া কালপ্রতীক্ষায় অবস্থান করিব।”
অচিন্ত্যপরাক্রম মহাত্মা হৃষীকেশ এই বলিয়া আমাকে বালকগণের সহিত এই স্থানে রাখিয়া যে কোথায় গমন করিয়াছেন; কিছুই বলিতে পারি না। আমি নিতান্ত শোকাকুল হইয়া দিবারাত্রি বলদেব, বাসুদেব ও জ্ঞাতিগণকে স্মরণপূর্ব্বক অনাহারে কালহরণ করিতেছি। আর আমার জীবনধারণ ও ভোজন করিতে প্রবৃত্তি নাই। এক্ষণে সৌভাগ্যবশতঃ তোমার সহিত আমার সাক্ষাৎলাভ হইল। অতএব তুমি অবিলম্বে বাসুদেবের বাক্যানুরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান কর। এক্ষণে এই রাজ্য, স্ত্রী ও রত্নসমুদায় তোমারই অধিকৃত হইল। আমি অচিরাৎ তোমার সমক্ষেই প্রাণত্যাগ করিব।
মহাত্মা বসুদেব এই কথা কহিলে শত্রুতাপন মহাবীর ধনঞ্জয় একান্ত বিমনায়মান হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মাতুল! আমি কোন ক্রমেই এই কেশব ও অন্যান্য বীরগণপরিশূন্য রাজধানীদর্শনে সমর্থ হইতেছি না। ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, নকুল, সহদেব, দ্রৌপদী ও আমি আমরা সকলেই একাত্মা। এই যদুকুলক্ষয় শ্রবণ করিলে আমার ন্যায় তাঁহাদেরও যাহার-পর-নাই ক্লেশ হইবে। এক্ষণে মহারাজ যুধিষ্ঠিরেরও মর্ত্যলোক হইতে প্রস্থানসময় সমুপস্থিত হইয়াছে। অতএব আর এ স্থানে অধিক দিন অবস্থান করা আমার উচিত নহে। আমি অচিরাৎ বৃষ্ণিবংশীয় বালক ও বনিতাদিগকে লইয়া ইন্দ্র প্রন্থে গমন করিব।
মহাবীর ধনঞ্জয় মাতুলকে এই কথা কহিয়া দারুককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দারুক! আমি বৃষ্ণিবংশীয় অমাত্য-দিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাসনা করি, অতএব তুমি সত্বর আমাকে তাঁহাদের নিকট লইয়া চল। এই কথা কহিয়া তিনি দারুকের সহিত মহারথ যাদবগণের নিমিত্ত শোক করিতে করিতে তাঁহাদের সভায় সমুপস্থিত হইলেন। অনন্তর তিনি তথায় আসন পরিগ্রহ করিলে, অমাত্যগণ, প্রকৃতিমণ্ডল এবং ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে পরিবেষ্টন করিয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন।
তখন মহাবীর অর্জুন সেই দীনচিত্ত মৃতকল্প ব্যক্তিদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ! আমি অন্ধক-দিগের পরিবারদিগকে লইয়া ইন্দ্রপ্রস্থে গমন করিব। কৃষ্ণের পৌত্র বজ্র ঐ নগরে রাজা হইয়া তোমাদিগকে প্রতিপালন করিবেন। এই নগর অচিরাৎ সমুদ্রজলে প্লাবিত হইবে; অতএব তোমরা অবিলম্বে যান ও রত্নসমুদায় সুসজ্জিত কর। সপ্তম দিবসে সূর্যোদয়সময়ে আমাদিগকে এই নগরের বহির্ভাগে অবস্থান করিতে হইবে; অতএব তোমরা আর বিলম্ব করিও না। শীঘ্র সুসজ্জিত হও।
মহাত্মা ধনঞ্জয় এই কথা কহিলে, তাঁহারা সকলেই সত্বর সুসজ্জিত হইতে লাগিলেন। মহাবীর অর্জুন শোকে একান্ত অভিভূত হইয়া কৃষ্ণের গৃহে সেই রজনী অতিবাহিত করিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে প্রবলপ্রতাপ মহাত্মা বসুদেব যোগাবলম্বন-পূর্ব্বক কলেবর পরিত্যাগ করিয়া উৎকৃষ্ট গতিলাভ করিলেন। তখন তাঁহার অন্তঃপুরমধ্যে ঘোরতর ক্রন্দনশব্দ সমুত্থিত হইয়া সমুদায় পুরী প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। কামিনীগণ মাল্য ও আভরণ পরিত্যাগপূর্ব্বক আলুলায়িত কেশে বক্ষঃস্থলে করাঘাত করিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। তখন মহাত্মা অর্জুন সেই বসুদেবের মৃতদেহ বহুমূল্য নরযানে আরোপিত করিয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন। দ্বারকাবাসিগণ দুঃখশোকে একান্ত অভিভূত হইয়া তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিল। ভৃত্যগণ শ্বেতচ্ছত্র ও যাজকগণ প্রদীপ্ত পাবক' লইয়া সেই শিবিকাযানের অগ্রে অগ্রে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন।
দেবকী, ভদ্রা, রোহিণী ও মদিরা নামে বসুদেবের পত্নীচতুষ্টয় তাঁহার সহমৃতা হইবার মানসে দিব্য অলঙ্কারে বিভূষিতা ও অসংখ্য কামিনীগণে পরিবেষ্টতা হইয়া তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। ঐ সময়ে জীবদ্দশায় যে স্থান বসুদেবের মনোরম ছিল, বান্ধবগণ সেই স্থানে তাঁহাকে উপনীত করিয়া তাঁহার প্রেতকৃত্য সম্পাদন করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন তাঁহার দেবকী প্রভৃতি পত্নীচতুষ্টয় তাঁহাকে প্রজ্বলিত চিতাতে আরোপিত দেখিয়া তদুপরি সমারূঢ় হইলেন।
মহাত্মা অর্জুন চন্দনাদি বিবিধ সুগন্ধ কাষ্ঠদ্বারা পত্নী-সমবেত বসুদেবের দাহকার্য্য সম্পাদন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় সেই প্রজ্বলিত চিতানলের শব্দ সামবেত্তাদিগের বেদাধ্যয়ন ও অন্যান্য মানবগণের রোদনধ্বনিপ্রভাবে পরিবর্দ্ধিত হইয়া সেই স্থান প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল। অনন্তর তিনি বজ্র প্রভৃতি যদুবংশীয় কুমারগণ ও কামিনীগণের সহিত সমবেত হইয়া বসুদেবের উদকক্রিয়া সম্পাদন করিলেন।
এইরূপে বসুদেবের ঔর্দ্ধ দেহিক কার্য্য সম্পাদন হইলে, পরমধার্মিক ধনঞ্জয় যে স্থলে বৃষ্ণিবংশীয়েরা বিনষ্ট হইয়াছিলেন, সেই স্থানে সমুপস্থিত হইলেন। তথায় সেই ব্রহ্মশাপগ্রস্ত মুষল-নিহত বৃষ্ণিগণকে নিপতিত সন্দর্শন করিয়া তাঁহার আর দুঃখের পরিসীমা রহিল না। তখন তিনি জ্যেষ্ঠতানুসারে তাঁহাদিগের সকলের উদকক্রিয়া সম্পাদন করিয়া অন্বেষণদ্বারা বলদেব ও বাসুদেবের শরীরদ্বয় আহরণপূর্ব্বক চিতানলে ভস্মসাৎ করিলেন।
মহাত্মা অর্জুন এইরূপে শাস্ত্রানুসারে বৃষ্ণিবংশীয়দিগের - প্রেতকার্য্য সম্পাদন করিয়া সপ্তম দিবসে রথারোহণে ইন্দ্র-প্রস্থাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তখন বৃষ্ণিবংশীয় কামিনীগণ শোকার্তা হইয়া রোদন করিতে করিতে অশ্ব, গো, গর্দভ ও উষ্ট্রসমাযুক্ত রথে আরোহণপূর্ব্বক তাঁহার অনুগমনে প্রবৃত্ত হইলেন। ভৃত্য, অশ্বারোহী ও রথিগণ এবং পুরবাসী ও জনপদবাসী লোকসমুদায় অর্জুনের আজ্ঞানুসারে বৃদ্ধ, বালক ও কামিনীগণকে পরিবেষ্টন করিয়া গমন করিতে লাগিল। গজারোহিগণ পর্ব্বতাকার গজ সমুদায়ে আরোহণপূর্বক ধাবমান হইল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয় বালকগণ বাসুদেবের ষোড়শ সহস্র পত্নী ও পৌত্র বজ্রকে অগ্রসর করিয়া গমন করিতে লাগিলেন। ঐ সময় ভোজ, বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশের যে কত অনাথা কামিনী পার্থের সহিত গমন করিয়াছিলেন, তাহার আর সংখ্যা নাই। এইরূপে মহারথ অর্জুন সেই যদুবংশীয় অসংখ্য লোকসমভিব্যাহরে দ্বারকানগর হইতে বহির্গত হইলেন।
দ্বারকাবাসী লোকসমুদায় নগর হইতে নির্গত হইলে পর মহাত্মা অর্জুন উঁহাদের সহিত ঐ বিবিধ রত্নপরিপূর্ণ নগরের যে যে অংশ অতিক্রম করিতে লাগিলেন, সেই সেই অংশ অচিরাৎ সমুদ্রজলে প্লাবিত হইতে লাগিল। তখন দ্বারকাবাসী লোকসমুদায় সেই অদ্ভুত ব্যাপার সন্দর্শনে নিতান্ত চমৎকৃত হইয়া “দৈবের কি আশ্চর্য্য ঘটনা” এই কথা বলিতে বলিতে দ্রতপাদে ধাবমান হইল। অনন্তর মহাবীর ধনঞ্জয় সেই যদুবংশীয় কামিনীগণ ও অন্যান্য যোধগণসমভিব্যাহারে ক্রমে ক্রমে নদীতীর, রমণীয় কানন ও পৰ্ব্বতপ্রদেশে অবস্থান করিতে লাগিলেন। কিয়দ্দিন পরে তিনি অতি সমৃদ্ধিসম্পন্ন পঞ্চনদদেশে সমুপস্থিত হইয়া পশু ও ধান্য পরিপূর্ণ প্রদেশে অবস্থিতি করিলেন। ঐ স্থানে দস্যুগণ, ধনঞ্জয় একাকী সেই অনাথা যদুকুলকামিনীগণকে লইয়া যাইতেছেন দেখিয়া অর্থলোভে তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিতে বাসনা করিয়া পরস্পর এইরূপ মন্ত্রণা করিল যে, ধনঞ্জয় একাকী কতকগুলি বৃদ্ধ, বালক ও বনিতা সমভিব্যাহারে গমন করিতেছেন। উঁহার অনুগামী যোধনগণেরও তাদৃশ ক্ষমতা নাই। অতএব চল আমরা উহাদিগকে আক্রমণ করিয়া উহাদের ধন-রত্নসমুদায় অপহরণ করি।
এইরূপ পরামর্শ করিয়া সেই দস্যুগণ লগুড়হস্তে সিংহ-নাদ শব্দে দ্বারকাবাসী লোকদিগকে বিত্রাসিত করিয়া তথায় উপস্থিত হইল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় অনুচরগণের সহিত তাহাদের অভিমুখীন হইয়া হাস্যবদনে তাহাদিগকে কহিলেন, দস্যুগণ। যদি তোমাদিগের জীবিত থাকিবার বাসনা থাকে, তাহা হইলে অচিরাৎ প্রতিনিবৃত্ত হও, নচেৎ আমি নিশ্চয়ই শর-নিকরদ্বারা তোমাদিগকে নিহত করিব। পাণ্ডুনন্দন এইরূপে তাহাদিগকে ভয় প্রদর্শন করিলেও তাহারা তাঁহার বাক্য অগ্রাহ্য করিয়া দ্বারকাবাসী লোকদিগকে আক্রমণ করিল।
তখন মহাবীর ধনঞ্জয় রোষভরে স্বীয় গাণ্ডীব-শরাসনে জ্যারোপণ করিতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু তৎকালে ঐ কার্য্য তাঁহার নিতান্ত কষ্টকর বোধ হইতে লাগিল। পরিশেষে তিনি অতিকষ্টে সেই শরাসনে জ্যারোপণ করিয়া দিব্যাস্ত্রসমুদায় চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু ঐ সময় কোনক্রমে সেই অস্ত্রসমুদায় তাঁহার স্মৃতিপথে সমুদিত হইল না। তখন তিনি স্বীয় ভুজবীর্য্যের হানি ও দিব্যাস্ত্রসমুদায়ের অস্মরণনিবন্ধন নিতান্ত লজ্জিত হইলেন। ঐ সময় বৃষ্ণিবংশীয়দিগের হস্তী অশ্ব ও রথারোহী যোধগণও সেই দস্যুগণকে নিবারণ করিবার নিমিত্ত বিশেষ যত্ন করিতে লাগিল, কিন্তু কোনক্রমেই কৃতকার্য্য হইতে সমর্থ হইল না। দস্যুগণ যে দিকে গমন করিতে লাগিল, মহাবীর অর্জুন যত্নপূর্ব্বক সেই দিক্ রক্ষা করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু কিছুতেই তাহাদিগকে নিবারণ করিতে পারিলেন না।
অনন্তর দস্যুগণ সৈন্যগণের সমক্ষেই অবলাদিগকে অপহরণ করিতে লাগিল এবং কোন কোন কামিনী ইচ্ছাপূর্ব্বক তাহাদিগের সহিত গমন করিতে আরম্ভ করিল। মহাত্মা অর্জুন তদ্দর্শনে নিতান্ত উদ্বিগ্ন বৃষ্ণিবংশীয়দিগের ভৃত্যগণের সহিত মিলিত হইয়া তৃণীর হইতে শরসমুদায় নিষ্কাশনপূর্ব্বক দস্যুগণের প্রতি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহার অক্ষয় তৃণীর মধ্যস্থ বাণসমুদায়ও ক্ষণকালের মধ্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হইল। শরসমুদায় নিঃশেষ হইলে পাণ্ডুনন্দন নিতান্ত দুঃখিত হইয়া শরাসনের অগ্রভাগদ্বারা দস্যুগণকে প্রহার করিতে লাগিলেন, কিন্তু কিছুতেই তাহাদিগকে নিরাকৃত' করিতে পারিলেন না। পরিশেষে সেই দস্যুগণ তাঁহার সম্মুখ হইতেই বৃষ্ণি ও অন্ধকদিগের অতি উৎকৃষ্ট কামিনীগণকে অপহরণ করিয়া পলায়ন করিল। তখন মহাবীর ধনঞ্জয় দিব্যাস্ত্র, ভুজবীর্য্য, তৃণীরস্থ শরসমুদায়ের ক্ষয়-নিবন্ধন নিতান্ত বিমনায়মান হইয়া দৈবদুর্বিপাক স্মরণপূর্ব্বক প্রতিনিবৃত্ত হইলেন।
অনন্তর তিনি সেই হতাবশিষ্ট কামিনীগণ ও রত্নরাশি সমভিব্যাহারে কুরুক্ষেত্রে সমুপস্থিত হইয়া হাৰ্দ্দিক্যতনয় ও ভোজকুলকামিনীগণকে মার্ত্তিকাবতনগরে, অবশিষ্ট বালক, বৃদ্ধ ও বনিতাগণকে ইন্দ্রপ্রস্থে এবং সাত্যকিপুত্রকে সরস্বতীনগরীতে সন্নিবেশিত করিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজ্যভার কৃষ্ণের পৌত্র বজ্রের প্রতি সমর্পিত হইল। ঐ সময় অঙ্কুরের পত্নীগণ প্রব্রজ্যাগ্রহণে উদ্যত হইলে, বজ্র বারংবার তাঁহাদিগকে নিষেধ করিতে লাগিলেন; কিন্তু কিছুতেই তাঁহারা প্রতিনিবৃত্ত হইলেন না। রুক্মিণী, গান্ধারী, শৈব্যা, হৈমবতী ও দেবী জাম্ববতী, ইঁহারা সকলে হুতাশনে প্রবেশপূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিলেন; সত্যভামা প্রভৃতি কৃষ্ণের অন্যান্য পত্নীগণ তপস্যা করিবার মানসে অরণ্যে প্রবিষ্ট হইয়া ফলমূল ভোজনপূর্ব্বক হিমালয় অতিক্রম করিয়া কলাপগ্রামে উপস্থিত হইলেন। অনন্তর মহাত্মা ধনঞ্জয় দ্বারকাবাসী লোকদিগকে যথোপযুক্ত স্থানবিভাগ' প্রদান করিয়া বজ্রের হস্তে সমর্পণ করিলেন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, এইরূপে সমুদায় কার্য্য সম্পাদন কবিয়া মহাত্মা ধনঞ্জয় বেদব্যাসের আশ্রমে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিলেন, মহর্ষি ধ্যানে নিমগ্ন রহিয়াছেন। তখন তিনি তাঁহার নিকট গমন করিয়া "মহর্ষে! আমি অর্জুন, আপনার নিকট আগমন করিয়াছি”, বলিয়া আত্মপরিচয় প্রদান করিলেন। মহর্ষি পাণ্ডুনন্দনকে অবলোকনপূর্ব্বক স্বাগতপ্রশ্ন ও আসন পরিগ্রহ করিতে আদেশ করিয়া তাঁহাকে একান্ত দুঃখিত ও দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিতে দেখিয়া কহিলেন, বৎস! কেহ কি তোমার গাত্রে নখ', কেশ, বস্ত্রাঞ্চল' বা কুম্ভমুখস্থিত' সলিল' প্রক্ষেপ করিয়াছে? তুমি কি রজঃস্বলাগমন বা ব্রহ্মহত্যা করিয়াছ? যুদ্ধে কি তোমাকে কেহ পরাজয় করিয়াছে? আজি তোমাকে এমন শ্রীবিহীন দেখিতেছি কেন? তুমি কাহারও নিকট কখন পরাজিত হও নাই। যাহা হউক, যদি প্রকাশ করিবার কোন বাধা না থাকে, তাহা হইলে কি নিমিত্ত আজি তোমার এরূপ শ্রীভ্রংশ হইয়াছে, তাহা অবিলম্বে কীর্তন কর।
তখন অর্জুন কহিলেন, ভগবন্! সেই নবজলধরসদৃশ নীলকলেবর পঙ্কজলোচন পীতাম্বর ও বলদেব উভয়েই কলেবর পরিত্যাগ করিয়া স্বর্গে গমন করিয়াছেন। ভোেজ, বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশে যে সকল মহাত্মারা সিংহতুল্য মহাবল পরাক্রান্ত ছিলেন, ব্রহ্মশাপনিবন্ধন প্রভাসে পরস্পর পরস্পরের প্রতি মুষলীভূত এরকাপ্রহারপূর্ব্বক পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়াছেন। কালের কি আশ্চর্য্য গতি! যাঁহারা পূর্ব্বে অনায়াসে গদা, পরিঘ ও শক্তির প্রহার সহ্য করিতেন, এক্ষণে তাঁহারা সামান্য তৃণপ্রহারে নিহত হইলেন! এইরূপে সর্ব্বসমেত পাঁচলক্ষ লোক বিনষ্ট হইয়াছে। আর আমি বারংবার সেই প্রবলপ্রতাপ যদুবংশীয়দিগের বিশেষতঃ যশস্বী কৃষ্ণের বিনাশবৃত্তান্ত স্মরণ করিতে সমর্থ হইতেছি না। মহাত্মা বাসুদেবের বিনাশ, সমুদ্রশোষ, পৰ্ব্বত-সঞ্চালন', আকাশপতন' এবং অগ্নির শৈত্যপ্রভাবের ন্যায় নিতান্ত অবিশ্বাস্য বলিয়া বোধ হয়। এক্ষণে বাসুদেব ব্যতীত আর ক্ষণকাল জীবনধারণ করিতে আমার বাসনা নাই।
হে তপোধন! আমি এক্ষণে যাহা কহিলাম, ইহা অপেক্ষাও ক্লেশকর আর একটি বিষয় চিন্তা করিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে। এক্ষণে আমি সেই বৃত্তান্ত কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। যদুবংশ ক্ষয় হইবার পর আমি দ্বারকায় গমনপূর্ব্বক তথা হইতে যাদবকুল-কামিনীগণকে লইয়া আগমন করিতে-ছিলাম। পঞ্চনদদেশে দস্যুগণ আমাকে আক্রমণ করিয়া আমার সমক্ষেই অসংখ্য কামিনীকে অপহরণ করিয়াছে। তৎকাল আমি গাণ্ডীব-শরাসন ধারণ করিয়াও তাহাদিগকে পরাস্ত করিতে পারিলাম না। ঐ সময় আমার পূর্ব্বের ন্যায় বাহুবল রহিল না। আমি দিব্যাস্ত্রসমুদায় এককালে বিস্মৃত হইলাম; ক্ষণকালের মধ্যে আমার তৃণীরস্থিত শরসমুদায় নিঃশেষিত হইল এবং যে শঙ্খচক্রগদাধারী চতুর্ভুজ পীতাম্বর পুরুষ আমার রথের অগ্রে অগ্রে ধাবমান হইয়া শত্রুসৈন্যসমুদায়কে দগ্ধ করিতেন, আমি আর তাঁহাকে দেখিতে পাইলাম না। ঐ মহাপুরুষ পূর্ব্বে অরাতি সৈন্যগণ দগ্ধ করাতেই আমি তাহাদিগকে গাণ্ডীবনির্মুক্ত শরনিকরে বিনাশ করিয়াছিলাম। এক্ষণে ঐ মহাত্মার অদর্শনে আমি নিতান্ত অবসন্ন হইয়াছি এবং আমার সর্ব্বশরীর ঘূর্ণিত | হইতেছে। এক্ষণে কিছুতেই আমি শান্তিলাভে সমর্থ হইতেছি না। সেই বীরবর জনার্দ্দন ব্যতিরেকে আর ক্ষণকাল আমার জীবিত থাকিবার বাসনা নাই। নারায়ণ ইহলোক পরিত্যাগ করিয়াছেন শ্রবণ করিয়া অবধি আমার দিক্সকল শূন্যময় বোধ হইতেছে। এক্ষণে আমি বীর্য্যবিহীন ও শূন্যহৃদয় হইয়া পরিভ্রমণ করিতেছি। অতএব অতঃপর আমার কর্তব্য কি, তাহা কীর্তন করুন।
মহাবীর ধনঞ্জয় এই কথা কহিলে মহর্ষি বেদব্যাস তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, পার্থ! বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয় মহারথ-গণ ব্রহ্মশাপে দগ্ধ হইয়াছে; অতএব তাহাদিগের নিমিত্ত শোক করা তোমার কর্তব্য নহে। ঐ বীরগণের নিধন অবশ্যম্ভাবী বলিয়াই মহাত্মা বাসুদেব উহা নিবারণে সমর্থ হইয়াও উপেক্ষা করিয়াছেন। তিনি মনে করিলে মহর্ষি শাপখণ্ডনের কথা দূরে থাকুক, এই স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্বসংসারকেও অন্যরূপে নির্মাণ করিতে পারেন। সেই পুরাতন মহর্ষি কেবল পৃথিবীর ভারাব-তরণ' করিবার নিমিত্তই বসুদেবের গৃহে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনিও তোমার প্রতি স্নেহনিবন্ধন তোমার রথের অগ্রে অগ্রে গমন করিতেন। এক্ষণে পৃথিবীর ভারাবতরণ করা হইয়াছে বিবেচনা করিয়া তিনি কলেবর পরিত্যাগ করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিয়াছেন।
তুমিও ভীমসেন, নকুল ও সহদেবের সাহায্যে গুরুতর দেবকার্য্য সংসাধন করিয়াছ; এক্ষণে তোমরা সকলেই কৃতকার্য্য হইয়াছ। অতএব অতঃপর ইহলোক হইতে প্রস্থান করাই তোমাদিগের শ্রেয়ঃ। লোকের মঙ্গললাভের সময় সমুপস্থিত হইলেই সুবুদ্ধি, তেজঃ ও অনাগতদর্শন' প্রভৃতি উপস্থিত হইয়া থাকে; আবার অমঙ্গল সময় হইলেই তৎসমুদায়ের ক্ষয় হইয়া যায়। ফলতঃ কালই জগতের বীজস্বরূপ। কালপ্রভাবেই সমুদায় সমুৎপন্ন ও বিলীন হইয়া থাকে। কালই বলবান্ হইয়া আবার দুর্ব্বল এবং ঈশ্বর হইয়াও অন্যের আজ্ঞাবহ হয়। এক্ষণে তোমার অস্ত্রসমুদায়ের কার্য্যশেষ হইয়াছে বলিয়াই উহারা যে স্থান হইতে আগমন করিয়াছিল, সেই স্থানে প্রতিগমন করিয়াছে। আবার যখন উহাদের কার্য্যকাল সমুপস্থিত হইবে, তখন উহারা পুনরায় তোমার হস্তগত হইবে। এক্ষণে তোমা-দিগের স্বর্গগমনকাল সমুপস্থিত হইয়াছে; অতএব তদ্বিষয়ে যত্নবান্ হওয়াই তোমাদের শ্রেয়ঃ।
মহর্ষি বেদব্যাস এই কথা কহিলে, মহাত্মা অর্জুন তাঁহার অনুজ্ঞা' গ্রহণপূর্ব্বক হস্তিনানগরে গমন করিয়া ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের নিকট বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয়দিগের ক্ষয়বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলেন।
